দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার


কবির য়াহমদ
দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

দখিনের আনন্দ-দুয়ারে গর্বিত উত্তর-পূর্বের বানভাসী

  • Font increase
  • Font Decrease

দখিনের আনন্দ-দুয়ার পদ্মা সেতু নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আংশিক জন-ভাবনার কথা মাথায় আসলো। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষ বর্তমানে জীবনের জন্যে প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে। প্রবল ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় আক্রান্ত। পাতে নেই ভাত, এমনকি পাতও নেই অনেকের, ঘর আছে তবে আশ্রয় নেই। বানের জল বের করে দিয়েছে অনেককেই। কারো ঘরে হাঁটুসমান পানি, কারো বা তারচেয়ে বেশি অথবা কম। আছে সাপ-জোঁকের ভয়, উনুন চড়ানোর জো নেই; হয় সেখানে পানি নয়তো ঘরে নেই যথেষ্ট উপকরণ। লড়াই টিকে থাকার, বেঁচে থাকার। এমন অবস্থায় থাকা মানুষের মনে পদ্মা সেতুর প্রভাব কতখানি সে আগ্রহ আমার। তার ওপর আছে এইসময়ে একদিকে যেমন বিশাল আয়োজন, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা। এ বিরোধিতা অবশ্য সেতু নির্মাণ ভাবনা থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ সমাধার সকল স্তরে। কেবল কি বিরোধিতা? না, ওখানে ছিল নির্মাণে বাধার বিবিধ পরিকল্পনা, নীলনকশা!

বানভাসীদের ক’জনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী প্রতিক্রিয়া তাদের। স্বাভাবিক মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নৈরাশ্যবাদ ভর করেছে যাদের তাদের অনেকেই নিজেদের হাল নিয়ে উদ্বিগ্ন, করতলে মৃত্যু নিয়ে নিয়ে যারা বাঁচার স্বপ্ন দেখে তাদের চেহারায় খুশিভাব আছে, তারা আনন্দিত। পঞ্চাশোর্ধ মুহিত মিয়া বন্যায় ঘর ছাড়া। পাঁচজনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম। কৃষিনির্ভর, কোরবানি উপলক্ষে অন্যের সহায়তা কয়েকটি গরু কিনেছেন। বন্যায় গোয়ালে পানি উঠে গেছে, ঘরেও হাঁটুসমান পানি, পাশের একটি বাড়িতে গরুগুলো নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তার কথায়, ‘এভাবেই বাঁচা লাগে। একটার লাগি আরেকটা আটকি থাকে না (একটার জন্যে আরেকটা আটকে থাকে না)। পদ্মা সেতু অইছে হুনছি, আমরার পানির লাগি সেতু আটকি যাইবো কেনে (আমাদের বন্যার জন্যে সেতু আটকে যাবে কেন)?’ একই জায়গায় আশ্রিত আরেকজনের সঙ্গে কথা। তার জবাব—‘আমরার কিতা অইতো, পানি কোনদিন নামতো (আমাদের কী হবে, পানি কবে নামবে)?’ এলাকার একটা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত এক নারীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম, বললেন না কিছু। গ্রামে এমনই হয় আসলে!

উত্তর-পূর্বের ভাবনাগুলো জড়ো করতে চাইলাম। কয়েকজনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় মনে হলো মন্তব্য প্রকাশিত হয় মূলত প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের ধরনেই। প্রশ্নকর্তা যে ইঙ্গিতে প্রশ্ন করবেন উত্তর আসবে ও ইঙ্গিতেই। সাধারণের মধ্যে কথার মারপ্যাঁচ নেই। যেভাবে কথাগুলো কানে যায় সেভাবেই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। পদ্মা সেতু নিয়ে এটা যেমন, তেমনি অন্য যেকোনো বিষয়েই। যখন আপনি তুলনা করতে যাবেন তখন কারো কারো আচমকা ব্যাখ্যাহীন কষ্ট ঝরবে। এটা ছোট্ট কোন বিষয় থেকে শুরু করে যেকোনো বড় বিষয়ের সকল পর্যায়েই। উদাহরণ মেলে এইসময়ে একই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত অনেকের মাঝে। খাবার কার পাতে বেশি পড়ল, কার পাতে কম—এসব নিয়েও মানুষ ভাবে, প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর এটা যখন বন্যায় অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের শোনানো হয় ‘তুমি বঞ্চিত’ তখন তারা হতাশ হয়, কষ্ট পায়। এটাকে ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং’ বললে কি অত্যুক্তি হয়? মনে হয় না!

এই ক’দিন অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের ‘ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের’ চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের কানের কাছে বারবার বলা হচ্ছে—‘দেশ যখন বন্যায় আক্রান্ত তখন সরকার পদ্মা সেতু নিয়ে ব্যস্ত’। টেলিভিশনে এসে, বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে একই কথা বারবার বলা হয়েছে, বলা হচ্ছে। একই কথাগুলোয় বানভাসীদের অনেকেই অপ্রাসঙ্গিক হলেও কষ্ট পেয়েছে। কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক তাদের। বিপদে পড়া মানুষেরা সবসময়ই নিজেদের বঞ্চিত ভাবে, বুকের গভীরে জমাট হয়ে পড়া হাহাকারগুলো চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চায়। ব্যক্তিগত কষ্টগুলোয় যেখানে আশাবাদের বাণী শুনিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টার কথা আমাদের তখন সেখানে তাদেরকে কষ্টে আগুন দেওয়ার চেষ্টা অনুচিত। যেখানে অভয় বাণী বাঁচার প্রেরণাদায়ী হয় সেখানে কেন উদ্দেশ্যমূলক হতাশার ঝাঁঝ? এটা কি অমানবিক নয়? 

আমরা দেখেছি, পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রতি ধাপে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরোধিতা। এই সেতু নিয়ে দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যগুলো এখনও বিস্মৃত হয়নি দেশের মানুষ। ‘সরকার সেতু বানাতে পারবে না, জোড়াতালি দিয়ে সেতু বানালেও সে সেতুতে কেউ উঠবেন না’—এমনও বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। বিএনপির বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করে থাকে আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা প্রায়ই কথা বলেন এসব নিয়ে, এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন। এই অভিযোগগুলোর বিপরীতে বিএনপি কখনই নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেনি। তারা কেবলই সেতুর বিরোধিতা করে গেছে, আগেও করেছে, এখনও করছে। সেতু নির্মাণ কাজ সম্পন্নের পর উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেও গ্রহণ করেনি বলেও বক্তব্য দিয়েছে। সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যায়নি বিএনপির প্রতিনিধিদের কেউ।

বিরোধিতার এই অবাক ধারাবাহিকতা কেন? আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা সেতুর মতো বড় স্থাপনা বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে করার সাফল্য দেখিয়েছে বলে; নাকি বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযোগের সেই ‘ষড়যন্ত্র’ সফল হয়নি বলে? শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্ত, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অর্থ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সাফল্যে যে পদ্মা সেতু তার কৃতিত্ব স্বাভাবিকভাবেই নেবে আওয়ামী লীগ। তবে শেষ পর্যন্ত এটা বাংলাদেশেরই সাফল্য। বাংলাদেশের এই সাফল্যে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। দেশে-দেশে পদ্মা সেতু যেখানে বাংলাদেশের অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে এই সংকীর্ণতা থেকে কেন বের হতে পারছে না বিএনপি?

ঘটনা-দুর্ঘটনা, হাসি-কান্না, দুর্যোগ-সুযোগসহ অনেক কিছুই আসবে-যাবে।  এটাই মানুষের জীবন। অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। রাষ্ট্র সমষ্টি মানুষের। এক অঞ্চলের মানুষের দুর্যোগে অন্য অঞ্চল ভারাক্রান্ত হলেও থেমে থাকে না, থাকা সম্ভবও না। একদিকে সিলেট অঞ্চলে আমরা যখন বন্যায় ভাসছি অন্যদিকে দখিনে খুলেছে আনন্দ-দুয়ার। আজ (২৫ জুন ২০২২) আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু-সংগ্রামী তিনি। কারণ কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু থেকে তাদের প্রতিশ্রুত সহায়তা ফিরিয়ে নিয়ে কলঙ্ক লেপ্টে দিতে চেয়েছিল, তখন স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন পদ্মা সেতু করেই ছাড়ব, এবং সেটা নিজস্ব অর্থায়নে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন—‘আমরাও পারি’। শেখ হাসিনা পেরেছিলেন বলে বাংলাদেশ পেরেছে। পদ্মা সেতু যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘দুর্মর’ কবিতা; ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/ অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ ‘পূর্বাভাস গ্রন্থে সুকান্তের পূর্বাভাস—‘এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে/ সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন দান/ দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে/ দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ।’

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বানভাসী হয়েও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ানো পদ্মা সেতুর উদ্বোধনে আমরা গর্বিত। আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন প্রধানমন্ত্রী!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

   

একুশে ফেব্রুয়ারি আত্মপরিচয়ের দিন



তোফায়েল আহমেদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রতি বছর অমর একুশের শহীদ দিবসে মহান ভাষা আন্দোলনের সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তস্রোতের সাথে মিশে আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গৌরবগাঁথা। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলার ছাত্রসমাজ আত্মদান করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল।

রক্তরাঙা অমর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তের প্লাবনের মধ্য দিয়ে আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় আসনে আসীন। শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও মানুষের মতো বাঁচার দাবীর সংগ্রামের দুর্জয় অনুপ্রেরণা সৃষ্টির চির অনির্বাণ শিখার দীপ্তিতে দিগন্ত উদ্ভাসিত করেছে একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের মানুষকে শিখিয়েছে আত্মত্যাগের মন্ত্র, বাঙালিকে করেছে মহীয়ান। জাতি হিসেবে আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সমন্বয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেছি। মহান ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে এসেছে মহত্তর স্বাধীনতার চেতনা। এবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সগৌরবে পালিত হচ্ছে মহান ভাষা আন্দোলনের ৭২তম বার্ষিকী।

প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৪৮-এর ১১ মার্চ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল।

সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম।” (পৃষ্ঠা-৯১, ৯২)। ’৪৮-এর ১১ মার্চ অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বাংলার ছাত্রসমাজ প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। সেদিন যারা মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে সংগ্রাম করে কারাবরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জনাব শামসুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। মার্চের ১১ থেকে ১৫-এই পাঁচদিন কারারুদ্ধ ছিলেন নেতৃবৃন্দ। পাঁচদিনের কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হত না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই,’ ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’-নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না। হক সাহেব আমাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব’।” (পৃষ্ঠা-৯৩, ৯৪)। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিশ্বাস্য আত্মপ্রত্যয় ছিল! তখন কে জানতো যে, ’৪৮-এর এই ১১ মার্চের পথ ধরেই ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনায় স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে! কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতেন! কারণ তিনি দূরদর্শী নেতা ছিলেন, লক্ষ্য স্থির করে কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন। যেদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়, সেদিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি; একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। আর তাই ধাপে ধাপে সমগ্র জাতিকে প্রস্তুত করেছেন চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য।

’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন সংলগ্ন আমতলায় ছাত্রসভা। নুরুল আমীন সরকার আরোপিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি। ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১০ জন মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙবে। ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙলো। সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী গুলি ছুঁড়লে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু তখন কারারুদ্ধ। কারাগারেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি আরো লিখেছেন, ‘মাতৃভাষার অপমান কোন জাতি সহ্য করতে পারে না। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ছাপ্পান্ন জন বাংলা ভাষাভাষী হয়েও শুধুমাত্র বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বাঙালীরা করতে চায় নাই। তারা চেয়েছে বাংলার সাথে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক, তাতে আপত্তি নাই। কিন্তু বাঙালির এই উদারতাটাই অনেকে দুর্বলতা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।’ (পৃষ্ঠা-১৯৮)। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন দেশের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামে গ্রামে মিছিল হতো। সেই মিছিলে স্কুলের ছাত্রদের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মনে আছে তখনকার স্লোগান, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হউক,’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা, বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা’।

’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের সর্বব্যাপী গণবিস্ফোরণ ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সেদিনও খুলনায় পুলিশের গুলিতে ১০ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম একুশে ফেব্রুয়ারি তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুতে বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বাঁধভাঙা জোয়ারে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমাদের আহ্বানে বিগত ১৭ বছরের সমস্ত দৃষ্টান্ত ভঙ্গ করে ঢাকা নগরের অধিবাসীগণ অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের মাধ্যমে মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি প্রাণঢালা শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং প্রশাসনের সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উত্থাপন করে। একটি সুন্দর, নিষ্কলুষ, নির্যাতন-নিপীড়নহীন শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে ১১ দফার ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে এক মোহনায় শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার।

’৬৯-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে প্রথম সরকারি ছুটি আদায় করেছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা উত্তোলন, আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, প্রভাত ফেরি, শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের কর্মসূচি শুরু হয়। শহীদ দিবস উপলক্ষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শহীদ মিনারের পাদদেশে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। ’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারিকে মহান ভাষা আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য ধারা হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম আজ একনায়কত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে। ছাত্র-জনতা শ্রমিক কৃষকের জনপ্রিয় ১১ দফার সংগ্রাম আজ তাই মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য অনুসরণ করছে। ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সংগ্রাম কেবলমাত্র বাংলা ভাষার সংগ্রাম ছিল না।

এ সংগ্রাম ছিল সারা দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ও বাংলা ভাষীদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস।’ শহীদ আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীর, আনোয়ারা, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ ১১ দফা আন্দোলনের ৩৯ জন বীর শহীদ ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের সার্থক উত্তরসূরী। বিকাল ৩টায় পল্টন ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভা তো নয়, যেন জনসমুদ্র। জনসমাবেশের তুলনায় সেদিনের পল্টন ময়দানের আয়তন কম মনে হয়েছে। চতুর্দিক থেকে মানুষের ঢল নেমেছিল। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে চরমপত্র ঘোষণা করে সমস্বরে বলেছিলেন, ‘আগামী ৩রা মার্চের পূর্বে দেশবাসীর সার্বিক অধিকার কায়েম, আইয়ুব সরকারের পদত্যাগ, রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলা প্রত্যাহার, ১১ দফা দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি, সংবাদপত্র ও বাক-স্বাধীনতার উপর হতে সর্বপ্রকার বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে।’ সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় সভাপতির ভাষণে যা বলেছিলাম দৈনিক ইত্তেফাকের পাতা থেকে পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে দিচ্ছি- ‘একুশে ফেব্রুয়ারি এই দিনটি আত্মপ্রত্যয়ের দিন, আত্মপরিচয় দেওয়া ও নেওয়ার দিন। ১৭ বৎসর পূর্বে এই দিনটি ছিল শুধু মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের দিন।

আজ ১৯৬৯ সালে এই দিনটি জনগণের সার্বিক মুক্তি সংগ্রামের দিন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্র সঙ্গীত ইত্যাদি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল হতে নূতনতর যেসব বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে সেসব বিতর্ক ও এদের উত্থাপকদের সতর্ক করে বলছি, বাংলাদেশে জন্মজন্মান্তর বাস করেও যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে শিখে নাই, তাদের স্বরূপ আজ উদঘাটিত। এই শ্রেণির লোকেরা বেঈমান। বাংলায় বেঈমানের কোনো স্থান হবে না এবং স্বাধিকারের সর্বাত্মক সংগ্রাম নিয়ে যদি তারা চিরন্তন পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ঘুঁটি চালানোর প্রয়াস পান তবে আত্মরক্ষার পুরাতন প্রথা পরিত্যাগ করে প্রতি আক্রমণের পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলার অন্যতম বন্দী শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছি, এই মামলায় বন্দী আর কারো গায়ে যদি একটি আঁচড়ও লাগে তবে দেশব্যাপী দাবানল জ্বলে উঠবে। আর নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলছি, শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তাকে কেউ যেন নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার না করেন।’ স্বৈরশাসকের প্রতি চরমপত্র ঘোষণার পর সন্ধ্যায় দেশবাসীর উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে আইয়ুব খান নতি স্বীকার করে ঘোষণা করেন, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ২৩ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ চিত্তে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এরপর ’৫২ ও ’৬৯-এর রক্ত স্রোত পথ বেয়ে আসে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে আমরা বিজয়ী হয়েছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সে-সব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর (আমার হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক) বলেছিলেন, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না। চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জননী জন্মভূমির বীর শহীদদের স্মরণে শপথ নিয়ে বলছি যে, রক্ত দিয়ে হলেও বাংলার স্বাধিকার আদায় করবো। যে ষড়যন্ত্রকারী দুশমনের দল ১৯৫২ সাল হতে শুরু করে বারবার বাংলার ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিককে হত্যা করেছে। যারা ২৩ বছর ধরে বাঙালির রক্ত-মাংস শুষে খেয়েছে, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন বানচালের জন্য, বাঙালিদের চিরতরে গোলাম করে রাখার জন্য তারা আজও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। শহীদের আত্মা আজ বাংলার ঘরে ঘরে ফরিয়াদ করে ফিরছে, বলছে, বাঙালি তুমি কাপুরুষ হইও না। স্বাধিকার আদায় করো। আমিও আজ এই শহীদ বেদী হতে বাংলার জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রস্তুত হও, দরকার হয় রক্ত দিবো। কিন্তু স্বাধিকারের দাবির প্রশ্নে কোন আপোষ নাই।’ অমর একুশে পালনে শহীদ মিনারে ব্যক্ত করা জাতির জনকের এই অঙ্গীকার আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি।

একুশে ফেব্রুয়ারি যুগে যুগে আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। বিশেষ করে ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় আসীন।একুশের চেতনার পতাকা হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুন্দরভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে একের পর এক লক্ষ্যপূরণ করছে। সবধরণের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জনহিতকর এসব সাফল্য বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। মহান একুশের চেতনায় জাগ্রত বাংলার মানুষ অতীতের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের আর্থসামাজিক বিকাশ আরও বেগবান করবে-এই হোক এবারের একুশের অঙ্গীকার।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;

বঙ্গবন্ধুর ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন’ আইন বাস্তবায়ন কতদূর!



আসাদুল হক খোকন
১৯৬৪ সালের অমর একুশের প্রভাতফেরীতে শেখ মুজিবুর রহমান (পরে বঙ্গবন্ধু), পেছনে তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যরা। ছবি: কনস্যুলেট জেনারেল অব বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।

১৯৬৪ সালের অমর একুশের প্রভাতফেরীতে শেখ মুজিবুর রহমান (পরে বঙ্গবন্ধু), পেছনে তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যরা। ছবি: কনস্যুলেট জেনারেল অব বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত।

  • Font increase
  • Font Decrease

কিভাবে বাংলা আমাদের সকলের মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা হলো তার ইতিহাস কম বেশি সকলেরই জানা। তবে যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সবার জানা নেই তা হলো- বর্তমানে মাতৃভাষাভাষি মানুষের সংখ্যা বিবেচনায় ‘বাংলা’ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের চতুর্থ ও বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। আর মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুসারে বিশ্বের বৃহত্তম ভাষা হিসেবে বাংলার অবস্থান সপ্তম। এছাড়া বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ‘২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এটিই বিশ্বের একমাত্র ভাষার আসন দখল করে নিয়েছে। যা বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের সকলের গৌরব।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ৯৮.৯% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এবং বাংলা ভাষা বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছরের অধিক পুরনো। গত সহস্রাব্দির সূচনালগ্নে পাল এবং সেন সাম্রাজ্যের প্রধান ভাষা ছিল বাংলা। সুলতানি আমলে অত্র অঞ্চলের অন্যতম রাজভাষা ছিল বাংলা। মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল বাংলা ভাষায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বাংলার নবজাগরণে ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রন্থনেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসকল দিক বিচার করলে সহজেই অনুমেয়, ভাষা হিসেবে বাংলা কতটা সমৃদ্ধ।

এবার বাংলা ভাষার গোড়ার দিকে কিছুটা দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ হয়। এর ধারাবাহিকতায় পশ্চিম পাকিস্তানের বিবিধ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রভাষাকরণের দাবিতে জীবন উৎসর্গকারীদের স্মৃতি ধরে রাখতে নির্মিত হয় ঢাকা মেডিকাল কলেজের পাশে বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রবর্তিত হয় ‘বাংলা’।

১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষার সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সরকারি অফিস-আদালতের দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করেন। সে আদেশে বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালে সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বাংলা ভাষাপ্রচলন আইন জারি করে। ওই আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিত হইবে। এই ধারা মোতাবেক কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’

এর দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ অনুযায়ী অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। পাশাপাশি দূতাবাস ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব সাইনবোর্ড, নামফলক ও গাড়ির নম্বর প্লেট, বিলবোর্ড এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন বাংলায় লেখা ও প্রচলনের নির্দেশ দেন। সব রকম নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলেন।

আদালতের আদেশের তিন মাস পর একই বছর ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলা হয়। সে আদেশ প্রায় অনেকাংশে বাস্তবায়ন হলেও অফিস-আদালত, গণমাধ্যমসহ সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশে রোলের নিস্পত্তি হয়নি। বিচার বিভাগ অর্থাৎ আইন ও আদালত মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। আদালতের অধিকাংশ রায় বাংলায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালত আইন এবং রেফারেন্সের দোহাই দিয়ে অধিকাংশ রায়ই ইংরেজিতে দেওয়া হচ্ছে। যদিও উচ্চ আদালতের কয়েকজন বরেণ্য বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার প্রয়োজন ও গুরুত্ব নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে ইংরেজি ভাষা শিখতে হবে। বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী দেশ চীন, জাপান, কিউবাসহ অনেক দেশই নিজেদের ভাষার মাধ্যমেই দেশকে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন, ‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর বিদেশি ভাষার পত্তন।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করেননি, বরং তার রচিত বাংলা সাহিত্যকেই ইংরেজিতে অনূদিত করা হয়েছে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা বাংলাভাষী হিসেবে নিজেদের নিয়ে গর্ব করতে পারি না, বরং দু-এক বাক্য ইংরেজি জানলেই নিজেদেরকে স্মার্ট ভাবতে শুরু করি। অন্যদিকে বাংলায় পড়া বা বাংলা জানা মানুষ ইংরেজি জানা মানুষদের সামনে গেলে হীনমন্যতায় ভোগেন। নিজের মায়ের ভাষাকে কণ্ঠে ধারণ করে মাথা উচু করে বলতে পারেন না- বাংলা আমার মাতৃভাষা, নিজের ভাষাকে বাদ দিয়ে যারা অন্যের ভাষাকে অন্তরে ধারণ করেন তারা দেশদ্রোহীর তুল্য! সারা দুনিয়া বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। অথচ ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পরও এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় আদেশ থাকা সত্বেও দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যায়নি। নিশ্চিত করা যায়নি দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই ক্ষেত্র চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রযুক্তি শিক্ষায় পাঠ ও নির্দেশনা বইগুলোর বাংলা অনুবাদও!

সর্বস্তরে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গোড়াতে হাত দিতে হবে। আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো শিক্ষাক্ষেত্র। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে সমাজ, দেশ, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের যদি শৈশব থেকেই ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করা যায়, তাহলে তারা পরবর্তী কর্মজীবনেও ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সক্রিয় থাকবে। আস্তে আস্তে মাতৃ ভাষানুরাগী একটি জাতি গড়ে উঠবে। ভবিষ্যতে কোনো ইংরেজি স্কুলের শিক্ষার্থী যাতে বাংলা স্কুলের শিক্ষার্থীকে ছোট করে না দেখে। না ভাবে, বাংলা একটি নিম্ন মানের ভাষা, নিম্ন মানের মানুষের ছেলে মেয়েরা বাংলায় পড়ে!

প্রশ্ন হতে পারে, সবকিছু কেন বাংলাকেন্দ্রিক হতে হবে? এর উত্তর- বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় যখন কিছু বলা হয় বা প্রচার করা হয় তখন খুব সহজেই সমাজের যেকোন প্রান্তে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়ে যায়। বিজাতীয় ভাষায় যোগাযোগ করা হলে সেখানে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ভাষার সারল্য ও বোধগম্যতা। আপনি কোনো বক্তব্য যখন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে চান তখন তার মাধ্যম যদি ওই জনগোষ্ঠীর নিজের ভাষা না হয় তবে তা কখনো সফল হবে না।

এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশ সব চেয়ে নিরাপদে হেটে চলেছে। দিনের পর দিন নানা কুসংস্কার আচ্ছন্ন জাতিকে সংস্কার করে বৈশ্বিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সামিল করা হয়েছে। নানামুখি উন্নয়ন কর্মকান্ড দৃশ্যমান হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধুর সেই আদেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে আশা করি, অচিরেই বিশেষ করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল কর্মক্ষেত্রে ইংরেজির পাশাপাশি নয় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি চালুর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের অন্তরে এই কষ্ট আর থাকবে না যে, দুঃখ করে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরও অধিকাংশ অফিস আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অঙ্গীকার



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বছর ঘুরে আবার এসেছে অমর একুশ। ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটার ঘর পার হলেই বাংলাদেশের সকল প্রান্তে শোনা যাবে গাফফার চৌধুরীর লেখা শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুরের অমর সৃষ্টি সেই কালজয়ী গান - ‌‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো...’

আমাদের পাশের বাংলাভাষী অঞ্চলসমূহেও এবং বিশ্বের নানা প্রান্ত বসবাসরত বাঙ্গালিরাও পিছিয়ে থাকবেন না। কাল একুশের সারাদিন ব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে পালিত হবে গৌরবের দিনটি। হবে প্রভাতফেরি, শহীদ মিনার সমূহে শহীদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা, বিভিন্ন সংগঠন আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছেন আমাদের সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত, সফিউরেরা। তাঁদের সাথে জেগে উঠেছিল সারা পূর্ব বাংলা। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদায় আসীন করেই জনতা ঘরে ফিরেছেন।

সেই বিজয়ের অনুপ্রেরণায় তাঁরা বার বার পাকিস্তানি লাণ্ছণা, বণ্চণা ও নব্য ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। সেই পথ ধরেই ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি জেনোসাইড শুরুর পর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। নয় মাস ব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিজয় পাকিস্তানি শাসনমুক্ত করে আমাদের মাত্ভূমিকে। বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙ্গালীদের পূণ্য ভূমি হিসাবে অসাম্প্রদায়িক, গনতান্ত্রিক, সমাজ সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ।

একুশের সাথে সাথে উনিশের কথা উল্লেখ করতেই হয়। আসামের বরাক উপত্যকার বাঙ্গালীরা দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৬১ সালের ১৯ মে কাছাড়ের শিলচরে একাদশ তরুণ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাকে তাঁদের বরাক ভূমির জন্য আসামের একটি সরকারি ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ভাষার জন্য প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সেই এগারজনের পুরোভাগেই ছিলেন।

একুশে উনিশের সাথে সাথে মানভূমের বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কথাও চলে আসে।বহু প্রাণ বলিদান ও বহু বছরের সংগ্রামের পর তাঁদের আন্দোলনের সাফল্য আসে। মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী বৃহৎ অংশ নিয়ে পুরুলিয়া জেলা বিহার থেকে এসে পশ্চিম বঙ্গের অংশ হয় ১৯৫৬-তে। তাই বলে ভাষার জন্য সংগ্রাম কেবল বাঙ্গালীরাই করেছে এমন নয়। একটি জাতি বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে ধ্বংস করতে হলে তার সংস্কৃতি এবং ভাষাকে ধ্বংস করার টার্গেট করা হয় আদিকাল থেকেই। দক্ষিণ আমেরিকার উন্নত সভ্যতার মায়া,আজটেক, ইনকা জাতিসত্তাকে স্পেনিয় উপনিবেশবাদীরা ধ্বংস করে দিয়েছিল তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি শেষ করে দেয়ার মাধ্যমে।

আজকের দিনেও একই জুলুম চলছে কুর্দি, ইয়াজিদি, রোহিঙ্গা, উইঘুর ও অন্যান্য বহু জনগোষ্ঠীর ওপর। আমাদের একুশে নতুন মাত্রা পেয়েছে ২০০০ সাল থেকে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর প্যারিস সন্মেলন ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের সকল সদস্য দেশ ২০০০ সাল থেকেই এই দিনটি পালন করে আসছে।

দিবসটির অঙ্গীকার হলো পৃথিবীর বুক থেকে আর কোনও ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেয়া হবে না। প্রতিটি মানুষের নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার জন্মগত অধিকার রয়েছে। পৃথিবীর সকল দেশ ও দেশসমূহের জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পৃথিবীতে এখন মোটামুটিভাবে ৭০০০ ভাষা জীবিত রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবহার হয়ে থাকে। ১৫০০’র মত ভাষা ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেছে। এই সংখ্যা আর বাড়তে না দেয়ার অঙ্গীকার জাতিসংঘের। এখানে উল্লেখ করার মত গর্বের বিষয় রয়েছে আমাদের।

কানাডার ভ্যাংকুভারে বসবাসরত কিছু বাংলাদশি তাঁদের অন্য দেশের বন্ধু বান্ধব দের নিয়ে মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড সোসাইটি গঠন করে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে জাতিসংঘের কাছে এই দাবি তোলেন ১৯৯৮ সালে। বহু দেন-দরবার হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারও এতে সংশ্লিষ্ট হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী সাদেকের ও ভ্যাংকুভারের রফিক ও আবদুস সলামের অক্লান্ত পরিশ্রম ১৯৯৯-তে জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এই সাফল্যের জন্য মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড সোসাইটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে এবং আবদুস সলাম ও রফিক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বেসামরিক সন্মাননা একুশে ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয়েছেন। আমাদের একুশে আজ এভাবেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। চলুন আমরাও অঙ্গীকার করি জগতের সকল ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।

জয় আমাদের বাংলা ভাষার জয়! জয় জগতের সকল মাতৃভাষার জয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;

মিয়ানমার সংঘাতে সতর্ক নানা দেশ, বাংলাদেশ কোন পথ ধরে চলবে?



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের সীমান্তের পাশে মিয়ানমারে যে সশস্ত্র সংঘাত চলছে, তা আসলে জাতিগত আধিপত্য ও ক্ষমতা বিস্তারের লড়াই। বিভিন্ন জাতিসত্তা জোটবদ্ধ হয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সরকারকে সামরিক দিক থেকে পর্যুদস্ত করে চলেছে। জোরালো লড়াই হচ্ছে বাংলাদেশের লাগোয়া মিয়ানমারের সাবেক আরাকান বা বর্তমান রাখাইন প্রদেশে। যে প্রদেশের বাসিন্দা হলো রোহিঙ্গা ও রাখাইন জাতিগোষ্ঠী।

রাখাইনরা বর্তমান লড়াইয়ে অংশ নিলেও রোহিঙ্গারা আগেই স্বদেশ থেকে উৎখাত হয়েছে। ফলে মিয়ানমারের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে 'না ঘর কা, না ঘাট কা' অবস্থায় রয়েছে রোহিঙ্গারা। তাছাড়া, মিয়ানমার সংঘাতে সতর্ক নানা দেশ। এমন পটভূমিতে বাংলাদেশ কোন পথ ধরে এগিয়ে চলবে, তা নির্ধারণ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের আবার আশ্রয়ের প্রস্তাবে বাংলাদেশের না বললেও সীমান্তের ১৯ পয়েন্টে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় আছে বলে গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশিত হয়েছে। এদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

আগেই গুলিবিদ্ধ একজনসহ পাঁচ রোহিঙ্গা টেকনাফে আসেন। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াইয়ের মুখে প্রাণে বাঁচতে রোহিঙ্গারা নিজেদের আদি নিবাস ছেড়ে রাজ্যের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় আসা কয়েক শ’ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে জাতিসংঘ। কিন্তু বাংলাদেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছে, নতুন করে কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়। বরং রাখাইনে জাতিসংঘের সক্রিয়তার বিষয়ে জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ।

গেল সপ্তাহে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আর সেখানেই রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরু থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াইয়ের তীব্রতা বাড়তে থাকে। দুই দেশের সীমান্ত এলাকা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থেকে ওপারের গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। মিয়ানমারের চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির কোনো উন্নতিও হচ্ছে না। বরং সংঘাতের ফলে নতুন করে তৈরি হওয়া শরণার্থী সংকট বাংলাদেশ এবং ভারতের জন্য যে নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করছে তা আগামী দিনে আরও গভীর হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মিয়ানমারের সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে এবং সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো লক্ষণও প্রতীয়মান হচ্ছে না। মিয়ানমার সংঘাতে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে এগিয়ে আসার তাগিদ দিলেও অন্য কোনো বৃহৎ বা আঞ্চলিক শক্তি এ বিষয়ে মুখ খুলছে না। মিয়ানমার সংঘাতে লিপ্ত বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে চীন ও আমেরিকার সংযোগের ব্যাপারে নানা তথ্য প্রকাশ পেলেও বড় দেশ দুটি এখন পর্যন্ত মিয়ানমার ইস্যুতে নিজের সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে চলছে। বরং মিয়ানমারে সশস্ত্র সংঘাতের ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সংকট ক্রমেই দীর্ঘায়িত হওয়ার বিষয়টি সামনে এনে 'ভারত ও বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে' বলে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু।

এমনই পটভূমিতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের একাধিক কর্মকর্তার ঢাকা সফর নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দ্বাদশ নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের অবজারভেশন থাকলেও বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত যুদ্ধে রূপ নেয়া, সীমান্ত পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা, ফের রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তথা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে আচমকা উদ্বেগ তৈরির প্রেক্ষাপটে ঢাকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ওয়াশিংটন। যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সিরিজ সফরে আগ্রহী মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সফরগুলো শুরু করতে চায় ওয়াশিংটন। তবে কোনো মার্কিন কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফর করবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আক্তার সহসাই ঢাকা সফর করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে, রাখাইন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নারিনজারা নিউজ সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মাইন হামলার মাধ্যমে তাংগুপ শহরের কাছে অবস্থিত মা ই সেতু ধ্বংস করে দেয় জান্তা বাহিনী। পরের দিন আরও দুটি সেতু উড়িয়ে দেওয়া হয়। মা ই সেতু ধ্বংস করতে যে মাইন ব্যবহার করা হয়; সেটি বিস্ফোরিত হয়ে স্থানীয় একটি স্কুলসহ আরও কয়েকটি ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি সেনারা রাখাইনের রাজধানী সিত্তেতে প্রবেশের মিন চং (আকা) আহ মিয়ান্ত কায়ুন সেতু ধ্বংস করে দেয়। যা সিত্তে-ইয়াঙ্গুন মহাসড়কের কাছে অবস্থিত। তবে নিজেদের রক্ষায় জান্তা বাহিনী যেসব সেতু ধ্বংস করেছে সেগুলো সাধারণ মানুষ এবং পণ্য পরিবহনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছে বিদ্রোহী ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স।

গত বছরের অক্টোবরে আরাকান আর্মিসহ তিনটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ব্রাদারহুড জোট গঠন করে। এরপর মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা চালানো শুরু করে তারা। ওই হামলায় টিকতে না পেরে অনেক স্থান ছেড়ে চলে গেছে জান্তা বাহিনী।

মিয়ানমারের তিন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধে হারছে জান্তা বাহিনী। রোববার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে ব্রাহারহুড অ্যালায়েন্স একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে তারা জানিয়েছে, জান্তা বাহিনী একের পর এক সেনা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

বিদ্রোহীদের এ জোট আরও দাবি করেছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছোট ও বড় ক্যাম্পের সেনারা বিদ্রোহীদের কাছে খুব দ্রুতই আত্মসমর্পণ করবে। যেসব ক্যাম্পের সেনারা এখনো আত্মসমর্পণ করেনি; তাদের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির (এএ) যোদ্ধারা হামলা অব্যাহত রেখেছে। আর নানামুখী হামলার মাঝখান বিপন্ন রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে নতুন করে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে।

কয়েক পর্যায়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা সরকারিভাবে ১২ লাখ বলা হলেও জন্মহার বৃদ্ধি ও গোপনে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে সংখ্যাটি ১৫ লাখের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে বলে মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী মনে করা হয়। মিয়ানমারের বর্তমান সংঘাতের কারণে তা আরও বেড়ে যেতে পারে। তদুপরি, এটি এমন একটি সংকট যেখানে আমাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা তথা আমাদের সীমান্তের পাশে সংঘাতজনিত অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি আশঙ্কাও জড়িত। কারণ, মিয়ানমারে সংকট এখন চরম পর্যায়ে। দেশটির কেন্দ্রস্থল ছাড়িয়ে গৃহযুদ্ধের ছাপ সর্বত্র। সশস্ত্র লড়াইয়ের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও ভারত। বিশেষ করে, মিয়ানমারে প্রচণ্ড গৃহযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় চলে এসেছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সংঘাতকবলিত বিশ্ব মানচিত্রে মিয়ানমার একটি স্পর্শকাতর দেশ। নিরাপত্তার ঝুঁকি ও স্থিতিশীলতার সংকটে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে মিয়ানমারকে গণ্য করা হয়। মিয়ানমারের সংকট ও সংঘাত দেশটির পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ, ভারত, চীন, থাইল্যান্ডের জন্যেও বিপদের কারণ হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কর্তৃত্ব বজায়ের স্বার্থে মিয়ানমারের বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগী।

নিকট প্রতিবেশী হওয়ায় বাংলাদেশকে সব সময়ই মিয়ানমার বিষয়ে থাকতে হয় সতর্ক। সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহে মিয়ানমারের তীব্র গৃহযুদ্ধ বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা, প্রাণহানি, বোমা ও গোলাবর্ষণের পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের অনুপ্রবেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের জন্য।

বিশেষত, মিয়ানমারের সমস্যা যে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য মারাত্মক বিপদের বার্তাবহ, তারও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে অঘোষিত এক সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। মার্কিন কর্তারাও মিয়ানমার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে করতে তৈরি হচ্ছেন।

অতএব, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধে সৃষ্ট চরম সংঘাতের ফলে বাংলাদেশকেও প্রস্তুত থাকা দরকার। বিশেষ করে, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি, যাতে সে দেশের সংঘাত বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করতে না পারে এবং পরাজিত সেনা, বিদ্রোহী বা নাগরিকদের ঢল এদেশে আসতে না পারে। আগে থেকেই মিয়ানমার থেকে বিশাল রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এই চাপ আরও বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা সমস্যার সম্মুখীন হবে।

যদিও বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, তথাপি এতটুকুই যথেষ্ট কিনা, তা বাংলাদেশকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশ কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী সর্বোচ্চ করলেও অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর মিয়ানমার এমন একটি দেশ, যারা কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে অনুসরণ করার মতো সক্ষম অবস্থানে আছে কিনা সন্দেহ। কারণ, সামরিক স্বৈরাচার, জাতি-নিধন, সংঘাত, গৃহযুদ্ধ, মাদক ব্যবসা, মানবপাচার ও অস্ত্রের চোরাচালান দেশটির সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে শিথিল করে দিয়েছে। যে দেশ নিজের বহুবিধ সমস্যায় ডুবন্ত এবং যার ক্ষমতা কাঠামো বহুধাবিভক্ত, তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সংকট সমাধানের প্রকৃত দিশা পাওয়া অসম্ভব।

ফলে মিয়ানমার পরিস্থিতির কারণে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশকে নিজের সীমান্ত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দিকে অধিক মনোযোগী হতে হবে। কূটনৈতিক পন্থা ছাড়াও বিকল্প সমাধানসূত্র ধরে অগ্রসরের চেষ্টাও করতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে বাংলাদেশের জন্যেও নতুন নতুন বিপদ তৈরি হতে পারে।

বেসামরিক অভিমুখে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশসমূহ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে। কারণ, মিয়ানমারের সংঘাত বাংলাদেশ বা একক কোনও দেশের নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ফলে সমস্যাটি দ্বিপক্ষীয় নয়, বহুপক্ষীয়। যাকে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেইজিং, নয়াদিল্লি, ওয়াশিংটন এবং জাতিসংঘের সঙ্গে দেন-দরবারে লিপ্ত হলে বাংলাদেশকে একাই মিয়ানমারের দিক থেকে আগত যাবতীয় চাপ সামলাতে হবে না।

সামরিক অভিমুখেও সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে হবে বাংলাদেশকে। সামরিক বাহিনীকে সদাপ্রস্তুত রেখে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে চেষ্টা করতে হবে যেন মিয়ানমারের বিবাদের কারণে আমাদের সীমান্তে সংঘাত-পরিস্থিতি তৈরি না হয়। মিয়ানমার সেনা ও বিদ্রোহীরা যখন বাংলাদেশের প্রস্তুতি দেখবে, তখন এদিক থেকে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হবে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র দল আরাকান আর্মিসহ অন্য ফ্যাক্টরগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ স্থাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনকে স্থিতিশীল করা বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি। এতে সীমান্ত উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথ মসৃণ হবে।

সামগ্রিকভাবে মিয়ানমারের পরিস্থিতিগুলো বাংলাদেশের নীতি প্রণেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক কৌশলী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশেষজ্ঞ-গবেষকদের গভীর মনোযোগের আওতায় থাকা অপরিহার্য। সেখানকার চলমান ঘটনাপ্রবাহ এবং বিবদমান বিভিন্ন গোষ্ঠীর পরিকল্পনা ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ ও পর্যবেক্ষণমূলক ধারণা বাংলাদেশকে কার্যকর পন্থা ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে পথ দেখাতে পারবে।

সর্বশেষ খবরে জানা যায়, মিয়ানমারে চলমান পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে একটা যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) দ্বাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এসব কথা বলেন।

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম; প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

  ‘স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

;