পরিযায়ী পাখি: এদেশের প্রজনন পরিযায়ী কোকিলেরা



আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
ঢাকার মিরপুরস্থ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে অস্থির লাল-ডানা ঝুঁটিয়াল কোকিল। ছবি- লেখক।

ঢাকার মিরপুরস্থ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে অস্থির লাল-ডানা ঝুঁটিয়াল কোকিল। ছবি- লেখক।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সাতাশ কি আটাশ বছর আগে সর্বপ্রথম লাল-ডানার ঝুঁটিয়াল পাখিটির ছবি দেখেছিলাম। পরবর্তী বছর দু’য়েক বিভিন্ন স্থানে বেশ ক’বার পাখিটির সন্ধান করেছিলাম। কিন্তু, দেখা পাইনি। এরপর বহু বছর গড়িয়ে গেছে; বহু জায়গায় ওকে খুঁজেছি, কিন্তু ফলাফল একই।

বর্ষায় সুন্দরবনের রূপ দেখতে ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই ‘অভিযাত্রিক সুন্দরবন’-এর ব্যানারে দশজনের টিমে সুন্দরবন গেলাম। পরদিন সকালে লঞ্চের সঙ্গে থাকা কোসা নৌকায় জামতলী খালে ঢুকলাম। আধঘন্টার মতো খালে ঘুরে কিছু পাখির ছবি তুলে যখন খয়েরি-মাথা সুইচোরার ছানার ছবি তুলছি ঠিক তখন লাল-ডানায় পাখিটিকে চোখের সামনে দিয়ে উড়ে যেতে দেখলাম। পাখিটি উড়ে গিয়ে খালপাড়ের কেওড়া গাছে বসল। দ্রুত ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ক্লিক করলাম। কিন্তু, সে দ্রুত উড়ে যাওয়ায় দলের একজন ছাড়া বাকিরা ছবি তুলতে ব্যর্থ হলো। দুপুরে দ্বিতীয়বারের মতো জামতলী গেলাম। সমুদ্র সৈকত থেকে ফেরার পথে আরও দু’বার ওকে কয়েক সেকে-ের জন্য দেখলাম। কিন্তু, দু’বারই ও গাছের ঘন পাতার আড়ালে হারিয়ে গেল। বাঘের ভয়ে ওখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। কাজেই ছবিও তোলা হলো না। এরপর টানা তিনবছর ওর খোঁজ নেই। 

 শূককীট মুখে লাল-ডানা ঝুঁটিয়াল কোকিল। ছবি- লেখক

বিরল একটি কোকিলের ছবি তোলার জন্য এ বছরের ২০ মে মিরপুরস্থ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে গেলাম। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম লাল-ডানার ঝুঁটিয়াল পাখিটিকে গত দু’দিন ধরে অনেকেই দেখেছে। আমরা যখন বেলা এগারটায় পল্লবীর গেটের কাছে লেকের পাশে পাখির ছবি তুলছি সে সময় এক সুহৃদ ফোনে জানাল তারা পাখিটিকে দেখেছে। প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছলাম। কিন্তু ততক্ষণে পাখিটি ঝোপের আড়ালে চলে গেছে। এমনিতেই দূরন্ত পাখিটি গাছের আড়ালে-আবডালে থেকে প্রজাপতি ও মথের শুঁয়াপোকা ধরে খায়। বেলা ১১:৩৫ মিনিটে একযোগে ৭-৮ জনের ক্যামেরার শাটার গর্জে ওঠতেই একটি গাছের পাতার আড়ালে ওকে লাফালাফি করতে দেখলাম। তবে অনেক চেষ্টার পরও অস্থির পাখিটির পরিষ্কার ছবি তুলতে পারলাম না। মিনিট বিশেক চেষ্টার পর অবশেষে অধরা পাখিটির ছবি তুলতে সক্ষম হলাম। এত বছর খোঁজাখুঁজি ও চেষ্টার পর যার ছবি তুললাম সে হলো এদেশের দুর্লভ প্রজনন পরিযায়ী পাখি লাল-ডানা বা লাল-পাখা কোকিল। আজকে এই পাখিসহ কোকিল গোত্রের সকল পরিযায়ী তথা গ্রীষ্মের প্রজনন পরিযায়ী সদস্যদের নিয়ে গল্প সাজিয়েছি।

কোকিল পরভৃত অর্থাৎ কুকুলিফরমেস (Cuculiformes) বর্গের পাখি। এই বর্গের কমবেশি ৪০ ভাগ পাখি, যাদের বেশির ভাগই পুরনো বিশ্ব অর্থাৎ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় বাস করে, তারা বাসা তৈরি করে না; তাই বংশবৃদ্ধির জন্য ওরা অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে ও নিজেদের বংশবৃদ্ধির কাজটি অন্য পাখিকে দিয়ে করিয়ে নেয়। এজন্য ওদেরকে শাবক পরজীবীও (Brood Parasite) বলে। এই বর্গে মোট ১৪৭ থেকে ১৫১ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এই বর্গের একমাত্র গোত্রের নাম পরভৃত বা কুকুলিডি (Cuculidae)। এদেশে এই গোত্রের মাত্র বিশ প্রজাতির পাখির বাস, যার বেশিরভাগই কোকিল (Cuckoo)। এই বিশ প্রজাতির বেশিরভাগ পাখিই বাসা বানায় না। তবে এদের মধ্যে ব্যতিক্রম হলো বনকোকিল বা মালকোহা (Malkoha) এবং কানাকুক্কা বা কুকাল (Coucal), কারণ তারা অন্যান্য পাখির মতো বাসা বানায়, ডিম পাড়ে ও ডিমে তা দিয়ে ছানা ফোটায়। এই গোত্রের অনেক প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রেই স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বেশকিছু প্রজাতি বংশবৃদ্ধি করার জন্য গ্রীষ্মকালে এদেশে আসে যাদেরকে গ্রীষ্মের প্রজনন পরিযায়ী (Summer Breeder) বলে। এদেশে প্রাপ্ত এই গোত্রের ২০টি প্রজাতির মধ্যে দুটি বনকোকিল ও দুটি কানাকুক্কা এবং বাকি ১৬টি প্রজাতি কোকিল। এই কোকিলগুলোর মধ্যে যারা গ্রীষ্মকালে এদেশে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করতে আসে তাদের সম্পর্কেই এখানে আলোচনা করব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গাছের ডালে চাতক পাখি। ছবি- লেখক।  

তবে প্রজনন পরিযায়ী কোকিলদের নিয়ে আলোচনার আগে আবাসিক, পরিযায়ী ও প্রজনন পরিযায়ী পাখি বলতে কি বোঝানো হয় তা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। এদেশের পক্ষীতালিকায় এখন পর্যন্ত ৭২২ প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কমবেশি ৩৪০টি প্রজাতি আবাসিক; অর্থাৎ ওরা সারাবছর এদেশে থাকে, ডিম পাড়ে ও ছানা তোলে। এছাড়াও ৩৭০ প্রজাতিরও বেশি পাখি পরিযায়ী অর্থাৎ বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় এদেশে আসে, বসবাস করে ও সময়মতো মূল আবাসে ফিরে যায়। এসব পাখি এদেশের মানুষের কাছে আগে, এমনকি এখনও, ‘অতিথি পাখি’ নামেই পরিচিত। এদেরই এক বিরাট অংশ আসে শীতে, যারা শীতের পরিযায়ী নামেও পরিচিত। এসব পাখি মূল দেশে আবাসস্থল বসবাস অনুপযোগী হওয়া, খাদ্যের অভাব ও শীতের কবল থেকে বাঁচার জন্যই বাংলাদেশসহ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে পরিযায়ন করে। এটা ওদের জীবনচক্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ওরা সচরাচর শীতের আবাসে বংশবিস্তার করে না; অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে, যেমন- কুড়া বা পালাসেস ফিশ ঈগল এদেশে আসে শীতকালে, ডিম-ছানা তোলে ও ছানাদের বড় করে সঙ্গে নিয়ে চলে যায়।

রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার বিজয়নগরে শুককীট খাচ্ছে চাতক পাখি। ছবি- লেখক

এছাড়াও বেশকিছু পরিযায়ী পাখি এদেশে অনিয়মিত। ওরা অন্যদের মতো প্রতিবছর আসে না, বরং ৫ বা ১০ বছর পর পর আসে। তাই ওরা যাযাবর, ভবঘুরে বা অনিয়মিত পরিযায়ী হিসেবে পরিচিত। ওদের সংখ্যাও নেহাত কম না, এদেশের মোট পরিযায়ী পাখির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এছাড়াও কোনো কোনো পাখি অন্য দেশে পরিযায়নের এক পর্যায়ে এদেশে স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে আসে, যেমন- বাদামি চটক, বন খঞ্জন, লাল-পা তুরমতি ইত্যাদি। ওরা পন্থ-পরিযায়ী (Passage-migrant) নামে পরিচিত। এই পাখিগুলো মূলত সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে অন্য কোনো দেশে পরিযায়নের পথে এদেশে কিছুদিনের জন্য যাত্রা বিরতি করে ও ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে মূল দেশে ফিরে যাওয়ার সময়ও আরেকবার এদেশে যাত্রা বিরতি করে।

যদিও পরিযায়ী পাখি বলতে মূলত শীতের পাখিগুলোকেই বোঝায়, তথাপি কিছু পাখি গ্রীষ্মেও পরিযায়ন করে, যেমন- বিভিন্ন প্রজাতির কোকিল, সুমচা, সুইচোরা, মাছরাঙা ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রজাতির কোকিল এদেশে মার্চ থেকে এপ্রিলে আসে, অন্য উপযুক্ত পাখির বাসায় ডিম পাড়ে, ছানা তোলে এবং ছানাসহ সকলেই আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে শীতকালীন আবাসে চলে যায়।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পান্না কোকিল। ছবি- লেখক

আগেই বলেছি কোকিলরা বাসা বানায় না। ওরা ডিমে তাও দেয় না এবং ছানাদেরও লালন-পালন করে না। ববং ওরা অন্য উপযুক্ত পাখির বাসায় ডিম পাড়ে এবং তাদের মাধ্যমে নিজেদের বংশবৃদ্ধির কাজটি করিয়ে নেয়। কোকিলের বিভিন্ন প্রজাতি, যেমন- কোকিল, পাপিয়া, চোখ গেল, বউ কথা কও, পান্না কোকিল, বেগুনি কোকিল, বাদামি কোকিল, সরগম, ফিঙ্গে কুলি প্রভৃতির স্ত্রী পাখিরা নিজেদের জন্য উপযুক্ত পোষক বা ধাত্রী পাখির বাসায় ধাত্রীর পাড়া ডিম ফেলে দিয়ে ঠিক একই রঙের প্রায় সমান আকারের ডিম পাড়ে। বংশ রক্ষা নিশ্চিত করতে একটি পোষকের বাসায় ডিম না পেড়ে একাধিক বাসায় ১-৩টি করে ডিম পাড়ে। এসব শাবক পরজীবী পাখির ডিম সচরাচর পোষক পাখির ডিমের আগে ফোটে ও পরজীবী পাখিদের সদ্যফোটা চোখ অফোটা ছানারা পোষক পাখির অফোটা ডিম বা সদ্যফোটা ছানা পিঠ দিয়ে ঠেলে ঠেলে বাসা থেকে নিচে ফেলে দেয় যেন ওরা এদের খাবার বা যতেœ ভাগ বসাতে না পারে। আর এভাবেই ছানাগুলো পোষক বাবা-মায়ের যত্নে একদিন বড়ো হয়ে ওঠে। অথচ পোষক পাখি তা টেরই পায় না।

বাসা না বানানো এই কোকিলদের মধ্যে যারা আবাসিক এবং পন্থ-পরিযায়ী নয়, কিন্তু প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করার জন্য অন্য দেশ থেকে গ্রীষ্মকালে এদেশে আসে ওদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লাল-ডানা ঝুঁটিয়াল কোকিল, চাতক ও পান্না কোকিল। এছাড়াও আরও যেসব প্রজাতির কোকিল এদেশে প্রজনন পরিযায়ী হয়ে আসে সেগুলোর মধ্যে বউ কথা কও, ধূসর-পেট কোাকিল ও বেগুনি কোকিল অন্যতম। তবে, প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর মতে ওরা এদেশের আবাসিক পাখি। এছাড়াও এ তালিকায় ছোট কোকিলকেও অর্ন্তভুক্ত করা যায়। তবে, এদেশে গ্রীষ্মের অনিয়মিত এই পরিযায়ী পাখিটির প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির কোন চাক্ষুস প্রমাণ না পাওয়ায় লাল-ডানা ঝুঁটিয়াল কোকিল, চাতক ও পান্না কোকিলের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে। 

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়রণ্যে পান্না কোকিল। ছবি- লেখক

এক. লাল-ডানা ঝুঁটিয়াল কোকিল: ফিচারের শুরুতে লাল ডানার খোপাধারী যে কোকিলটির গল্প বলা হয়েছে সে হলো লাল-ডানা বা লাল-পাখা ঝুঁটিয়াল কোকিল। এটি এদেশের দুর্লভ প্রজনন পরিযায়ী কোকিল। পশ্চিমবঙ্গে বলে গোলা কোকিল। ইংরেজি নাম Chestnut-winged Cuckoo বা Red-winged Crested Cuckoo । বৈজ্ঞানিক নাম Clamator coromandus। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত।

লাল-ডানা কোকিল চাতক পাখির মতোই লম্বালেজী ঝুঁটিদার কোকিল। হাঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন একটি লালচে চাতক। দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৪৬ সেন্টিমিটার ও ওজন ৬৬-৮৬ গ্রাম। কালো মাথায় কালো ঝুঁটি, চোখ ও চঞ্চু কালো। পিঠের উপরটা ও লম্বা লেজ চকচকে নীলচে-কালো। ডানার উপরটা ও প্রান্ত লাল। গাল ও গলা হালকা লালচে। ঘাড়ের উপর অর্ধ সাদা বন্ধনী। বুক-পেট সাদা। চোখের মনি গাঢ় বাদামি। পা ও পায়ের পাতা ধূসর। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি ফ্যাকাশে, দেহের উপরটা লালচে ফুটকিযুক্ত ও ঝুঁটি ছোট। 

গ্রীষ্মকালে দেশের সব ধরনের বনাঞ্চল ও বনের আশেপাশের গাছপালাসম্পন্ন এলাকায় দেখা যায়। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। ঘন ঝোপ বা পাতাঘেরা গাছে লুকিয়ে থাকে বলে সহজে নজরে আসে না। প্রধানত শুঁয়াপোকা ও নরম দেহের কীটপতঙ্গ খায়। দ্রুত ডানা ঝাপটে গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেরায়। স্ত্রী সচরাচর নীরব। পুরুষ অন্য সময় নীরব থাকলেও প্রজনন ঋতুতে উঁচ্চ কন্ঠে ‘ব্রিপ-ব্রিপ-ব্রিপ---’ শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। বাসা না বানানো অন্যান্য কোকিলের মতো ওরাও না বানায় বাসা, না দেয় ডিমে তা, না করে ছানাদের যত্নে। সচরাচর ছাতারে বা পেঙ্গা পাখির বাসায় ওদের ডিমের সঙ্গে মিলিয়ে ২-৩টি নীল ডিম পাড়ে। ছাতারে বা পেঙ্গার ডিম ফোটার আগেই ওদের ডিম ফোটে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

দুই. চাতক: এটি এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান প্রজনন পরিযায়ী খোঁপাধারী কোকিল। পিঁউকাহা, পাপিয়া বা পাকড়া কোকিল নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Pied Cuckoo, Pied Crested Cuckoo বা Jacobin Cuckoo বৈজ্ঞানিক নাম Clamator jocobinus । পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার পাখিটি প্রতি গ্রীষ্মে এদেশে প্রজনন করার জন্য পরিযায়ী হয়ে আসে। পাখিটি বছরের পর বছর একই সময়ে একই জায়গায় পরিযায়ন করে। 

চাতক লম্বালেজি ঝুঁটিয়াল কোকিল। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের গড় দৈর্ঘ্য ৩৩ সেন্টিমিটার যার মধ্যে লেজই ১৬ সেন্টিমিটার । ওজন ৬৫-৭০ গ্রাম। মাথায় কালো ঝুঁটি, দেহের উপরটা কালো ও নিচটা সাদা। লেজের ডগা সাদা। ডানার প্রান্তে সাদা ছোপ থাকে। চোখ বাদামি ও চঞ্চু কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল ধূসর-কালো। নখ কালো। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ ধূসর-বাদামি, গলা-বুকে ধূসর ও দেহতলে পীতাভ আভা থাকে। গ্রীষ্মকালে এদেশের বন, বাগান, আবাদি জমি, খামার, ঝোপঝাড় সর্বত্রই ওদের দেখা যায়। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ৫-৬টির ছোটো দলে থাকে। ঘন ঝোপ বা পাতাঘেরা গাছে লুকিয়ে খাবার খায়। প্রজাপতি ও মথের শূককীট, ছারপোকা, উঁইপোকা, পিঁপড়া ইত্যাদি প্রিয় খাবার। স্ত্রী সচরাচর নীরব। তবে, পুরুষ চাতক ‘পিউ---পি-পি-পিউ---’ শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে জুলাই প্রজননকাল। পুরুষ চাতক পূর্বরাগের সময় সুরেলা কন্ঠে গান গায়। পরভৃত গোত্রের বেশিরভাগ প্রজাতির মতো ওরাও বাসা বানায় না। আর ডিমে তা দেয়া বা ছানার যতœ নেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ছাতারে (Babbler), বুলবুল (Bulbul), ফিঙে (Drongo) পোষক পাখি অর্থাৎ এসব পাখির বাসায় স্ত্রী চাতক চুপিসারে বাসাপ্রতি ২-৩টি করে ডিম পাড়ে, পোষক পাখির ডিমের রঙের সাথে মিল রেখে। ডিম ফোটে পোষক পাখির ডিম ফোটার আগে। ছানারা পোষক পাখির যত্নে বড়ো হয়ে উঠে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

আরও পড়ুন:

আমাদের প্রজাপতি

বাঘের থেকেও বিরল পাখি সুন্দরী হাঁস

পরিযায়ী পাখিরা আসছে


তিন. পান্না কোকিল: এটি বিরল ও সুদর্শন গ্রীষ্মের প্রজনন পরিযায়ী কোকিল। সবুজাভ কোকিল নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Asian Emerald Cuckoo বা Emerald Cuckoo । বৈজ্ঞানিক নাম Chrysococcyx maculatus । প্রতি গ্রীষ্মে পাখিটি এদেশে আসে ডিম-ছানা তোলার জন্য; যদিও না বানায় বাসা, না দেয় ডিমে তা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, চীন, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় দেখা যায়।

কোকিল গোত্রের অন্যতম ছোট এই সদস্যটির দেহের দৈর্ঘ্য ১৭-১৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ২৩-৩০ গ্রাম। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে ভিন্নতা থাকে। পুরুষের পিঠের উপরটা চকচকে পান্না-সবুজ, তাতে থাকে সোনালি-ব্রোঞ্জ আভা। থুতনি, গলা ও বুকেও তাই। বুক-পেটের নিচটা সাদা, তাতে ধাতব ব্রোঞ্জ-সবুজ ডোরা। লেজের নিচটা ধাতব সবুজ, তাতে সাদা ডোরা। স্ত্রীর মাথা ও ঘাড়ের পিছনটা সোনালি লাল। পিঠের পালক ব্রোঞ্জ-সবুজ। গলা-বুক-পেটে সাদার উপর বাদামি-ব্রোঞ্জ ডোরা। লেজে খয়েরি-কালো ডোরা, ডগা সাদা। চোখের রং গাঢ় লাল। চঞ্চু কমলা-হলুদ, আগা কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল গাঢ় বাদামি-সবুজ। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের উপরটায় থাকে লাল-বাদামি ডোরা। থুতনি, গলা ও ঘাড়ে থাকে লালচে কালো দাগ। দেহের নিচটায় রয়েছে অনুজ্জ¦ল সাদা ও বাদামি ডোরা। 

 পান্না কোকিল প্রধানত চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। তবে নিচু ভূমি ও পাহাড়ের ১,৫০০ মিটার উঁচুতেও দেখা যায়। ওরা একাকী বা ৪-৬টির দলে বিচরণ করে। গাছের মগডালে পাতার আচ্ছাদনে লুকিয়ে থাকে, তাই সহজে চোখে পড়ে না। পিঁপড়া, শুঁয়াপোকা ও নরম পোকামাকড় খেতে পছন্দ করে। পূর্ণিমা রাতে পুরুষটি ‘চিরর্র-চিরর্র---’ শব্দে ডাকে।

এদেশে ওরা এপ্রিলের মাঝামাঝি আসে ও জুলাইয়ের শেষে চলে যায়। প্রজনন মৌসুমে পুরুষটি দিনভর ‘চিরর্র-চিরর্র-চিরর্র-চিরর্র---’ শব্দে ডাকতে থাকে। মৌটুসি (Sunbird)  বা মাকড়সাভূকের (Spiderhunter) বাসায় একটি করে সাদার উপর বাদামি বা লালচে ছিটযুক্ত ডিম পাড়ে। যদিও ওদের ডিম আকারে কিছুটা বড়ো হয়, কিন্তু ডিমের রং পোষক বা ধাত্রী পাখির মতোই। পোষকের ডিমের আগেই এই ডিম ফোটে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পান্না কোকিলের ছবি তোলারত অবস্থায় লেখক

E-mail:[email protected], [email protected]

বিশ্বের সবচেয়ে ‘কুৎসিত কুকুর’ এটি!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কুকুরের তথ্য যেমন রয়েছে তেমনি এবার সবচেয়ে কুৎসিত আকৃতির কুকুরেরও তথ্য মিলেছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

স্কাই নিউজ বলছে, চলতি বছরের ২১ জুন (শুক্রবার) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকু্রের প্রতিযোগিতা বসেছে। ওই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ওয়াইল্ড থাং নামে আট বছর বয়সী একটি কুকুর এ তকমা পেয়েছে।

তবে এবারই ওয়াইল্ড থাং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি। এর আগেও ৫ বার এমন প্রতিযোগিতায় প্রাণীটি অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

ওয়াইল্ড থাং এবং তার মালিক অ্যান লুইস। ছবি: সুমিকো মুটস / এনবিসি নিউজ

ওয়াইল্ড থাং এর মালিক অ্যান লুইস বলেন, ওয়াইল্ড থাং কুকুরছানা হিসাবে একটি ভয়ানক রোগ ক্যানাইন ডিস্টেম্পারে সংক্রমিত হয়েছিল। কোন ক্ষতি ছাড়াই অনেক চিকিৎসার পর বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তার দাঁত বেশি বৃদ্ধি না পাওয়ায় জিহ্বা বাইরে থাকে এবং তার সামনের ডান পা ২৪/৭ প্যাডেল আকারে থাকে।

পুরস্কার হিসেবে তাদেরকে ৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫১১ টাকা) দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকুর প্রতিযোগিতা প্রায় ৫০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতাটি আকর্ষণীয় করার জন্য কুকুরগুলোকে বিশেষ এবং অনন্য করে সাজিয়ে তোলা হয়।

;

ট্যাক্সি চালকের অনর্গল ইংরেজি বলার দক্ষতা!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এই সংবাদটি পড়তে হলে আপনাকে ভুলে যেতে হবে শুধু শিক্ষিতরাই সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারেন! কারণ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় এক ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীর সাথে অনর্গল ইংরজিতে কথা বলছেন।

ঘটনাটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে ঘটেছে। দেশটির গণমাধ্যম এনডিতিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এনডিটিভি বলছে, ওই ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীদের সাথে ইংরেজি কথা বলার পাশাপাশি কিভাবে আরও দক্ষ হওয়া যায় সে বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে ধারণ করা ভিডিওটি ভূষণ নামে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, "এমন ঘটনা দেখে আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পরে তার সাথে কথা বলার সময় কিছুটা তোতলা হয়েছিলাম। তার ইংরেজিতে সাবলীলতা দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।"

পরে তার সাথে এ নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ হলো।

ট্যাক্সি চালক বলেন, ইংরেজি শেখা থাকলে আপনি লন্ডন এবং প্যারিসের মতো উন্নত দেশে যেতে পারবেন। এটা বিশ্বব্যাপী ভাষা। এ কারণে ইংরেজি শেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিডিওটিতে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "তার কথা বলার ধরণ ডক্টর এপিজে আবদুল কালামের মতো শোনাচ্ছেন"।

অপর একজন লিখেছেন, "১৬ বছরের শিক্ষার পর তার ইংরেজি আমার চেয়ে অনেক ভালো।"

;

‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার মেঘনা নদীর দেখা মেলে চুনা নদীতে



মৃত্যুঞ্জয় রায়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাতক্ষীরা
ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।

আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।

দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।

বাঁশবাগানে আধখানা চাঁদ
থাকবে ঝুলে একা।


ঝোপে ঝাড়ে বাতির মতো
জোনাক যাবে দেখা।

ধানের গন্ধ আনবে ডেকে
আমার ছেলেবেলা।

বসবে আবার দুচোখে জুড়ে
প্রজাপতির মেলা।

হঠাৎ আমি চমকে উঠি
হলদে পাখির ডাকে।

ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াই
মেঘনা নদীর বাঁকে।

শত যুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে।

সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।

মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা,

পাখির ডানায় লিখেছিলাম-
প্রিয় স্বাধীনতা।

কবি শামসুর রাহমানের প্রিয় স্বাধীনতা কবিতার লাইনের সঙ্গে মিল রেখে বলতে হয়-

শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে থাকা মানুষগুলোর কথা।
চুনা নদী পাড়ি দেবো, ডিঙ্গি নৌকা দিয়া।

আবার আমি যাবো আমার উপকূলের গাঁয়ে।
কাজের জন্য ছুটে বেড়াই, চুনা নদীর বাঁকে।

বনে বাঘ, জলে কুমির আর ডাঙ্গায় লোনা পানির ক্ষত।
সেই চরের মানুষগুলো, এখনো লড়াই করে বাঁচে।

বর্ষাকালের দুপুর বেলা। আকাশে কালো মেঘ খেলা করছে! নদীতে পানি ঢেউ খেলছে! ভেসে আসছে, গেট থেকে জল আসার শব্দ। নদীর এপার ওপার হচ্ছেন ডিঙা নৌকা দিয়ে পাড়ে থাকা মানুষগুলো। ছুটে চলেছেন নারী-পুরুষ একে একে চুনা নদীর তীরে কাজের সন্ধানে। সন্ধ্যা হলেই দেখা মেলে বাড়ি ফেরার তাড়া। রাতের আঁধারে পশুপাখি, জীবজন্তু, পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচেন এই চুনা নদীর পাড়ের মানুষগুলো।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে বসবাস নিত্যসংগ্রামী মানুষদের, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম


এখানকার মানুষজন লড়াই সংগ্রাম করে এখনো টিকে আছেন। টিকে থেকে তাদের রোজ কাজের সন্ধানে অবিরাম ছুটে চলতে হয়। বর্তমানে ভাঙাগড়ার জীবনে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যত নিয়ে বসবাস করছেন তারা। শ্যামনগর উপজেলার কলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত চুনা নদীর চরটি। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারানো ২০-২৫টি জেলে পরিবারের ঠাঁই হয়েছে এখানে। বছরের পর বছর এই চরকে আগলে বসবাস করলেও সব সময় লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের।

তাদের একজন ৩৫ বছর বয়েসি রমেশ চন্দ্র মণ্ডল। দুর্যোগে সহায়-সম্পদ হারিয়ে আশ্রয় নেন চরের এক কোণে। সেখানে মাটির ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস তার। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও ভর করে থাকতে হয়, স্ত্রীর ওপর। তার কষ্টের বিনিময়ে জোটে তাদের একমুঠো ভাত। স্ত্রী একাই লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের নিয়ে এই চরে।

বনে পশুপাখির, জলে কুমির আর স্থলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এভাবে তাদের জীবন প্রবহমান। তাদের জীবন চলার পথে নেই কোনো বিরাম। সংগ্রাম করে টিকে থাকেন সবাই। একে একে সব কিছু হারিয়েও এখানো টিকে থাকতে হয় তাদের।

রমেশের মতো একই অবস্থা ষাটোর্ধ্ব ফকির বিশ্বাসের। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও পেটের দায়ে কাজ করতে হয় তাকে। একবেলা কাজ করলে অপর বেলা কাটে অসুস্থতায়!

ফকির বিশ্বাস বার্তা২৪কমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আশ্রয়ের দুই যুগ লড়াই সংগ্রাম করে টিকে থাকলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। বরং প্রতিবছর ছোটবড় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি। লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে বারংবার!

জীবন কাটে যুদ্ধ করে, ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় পেতে...চুনা নদীর তীরের মানুষের জীবন, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম

চুনা নদীর চরে মাছের পোনা গুনতে দেখা যায় নমিতা রাণী রায়কে। নমিতা রাণী রায় বার্তা২৪.কমকে বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সবসময় চিন্তার ভেতরে থাকতে হয় আমাকে। নদীতে কুমির আর বনে বাঘের আতঙ্ক! তারপর ডাঙায় লোনা পানির ক্ষত। লবণাক্ততায় ভরা জীবনকাল। তারপর চরটি নদীর ধারে হওয়াতে একটু জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। এই লড়াই-সংগ্রাম করেই বেঁচে আছি সেই প্রথম থেকে। মাছের পোনা বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার। আমরা সবাই এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে টিকে আছি।

নমিতা রাণী রায় বলেন, যখন বসতবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়, তখন স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওই সময় অনেক কষ্টে চর এলাকার সবার দিন কাটে। শিশু সন্তানদের সবসময় নজরে রাখতে হয়। অন্যথায় নদীতে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে ছোট-বড় দুর্ঘটনা!

নিত্যদিনের লড়াই-সংগ্রাম

লড়াই সংগ্রামের শেষ নেই উপকূলে থাকা মানুষজনের। সর্বশেষ, ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর আঘাতে নদীর জোয়ারের জলে তলিয়ে যায় তাদের বসতঘর। ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ বলে কথা না! যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জোয়ারের পানিতে তাদের বসতঘর তলিয়ে যায়। তখন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না তাদের। এমনও অনেক সময় গেছে যে, দিনের পর দিন উনুনে আগুন দিতে পারেননি তারা। ওই সময় শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। এমনও দিন গেছে, যেদিন তাদের শুধুমাত্র পানি পান করে বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হয়েছে।

ঘরছোঁয়া জলের বানের দিকে তাকিয়ে থাকেন চুনা নদীর তীরের মানুষজন আর ভাবেন আর কত সংগ্রাম, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়,বার্তা২৪.কম

সত্যি, তাদের ভাষ্যের সঙ্গে বড়ই মিল কবি শামসুর রাহমানের ‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার! ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটা একটা বড় প্রশ্নেরই বটে! জঙ্গল, বন্যা, নদীভাঙনের সঙ্গে অবিরাম সংগ্রাম করে টিকে থাকা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আর অভাবে চরের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন। তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবছর এসব দুর্যোগে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তারা। আবারও লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার তাগিদে ঘুরেও দাঁড়ান তারা।

;

ব্রহ্মপুত্রের বানভাসি নারীদের দুঃখগাথা!



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

  • Font increase
  • Font Decrease

'খ্যাতা-কাপড় সইগ ভিজি গেইছে, পাক-সাকও (রান্না-বান্না) করতে পারি না। আমাদের দেখার মতো মানুষ নাই। স্বামীর জ্বর আসছে, ওষুধ ও নাই। বাচ্চা গুল্যাক সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া নাগে। জ্বর নাগি আছে। যে ঘরত থাকি স্যাটে গরু ছাগলও থাকে। সারাদিন গরু ছাগলের ময়লা পরিষ্কার করতেই যায়। এই বানের পানিতও হামার বইসনা(অবসর) নাই’- কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া বেগম।

তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে। ১২ দিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গবাদিপশু রাখার উঁচু টিলায়।

অপরিচ্ছন্ন এই পরিবেশে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন রাবেয়া বেগমের মেয়ে শাহানাজ বেগম।

শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন শাহানাজ বেগম, ছবি- বার্তা২৪.কম

শাহানাজ বেগম বলছিলেন, 'হামার তো কষ্ট! সংসার হামরা বান হইলেও সামলাই, খরা হইলেও সামলাই। নিজে কম খাইলেও বাচ্চাদের জন্য রান্না করতে হয়। বাচ্চাদের দেখাশোনা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা করতে দিন কাটে। রাইতে পানি বাড়ে কি না দেখার জন্যে জাগি থাকা নাগে। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

শুধু এই দুই নারী-ই নন, কুড়িগ্রামের বানভাসি পরিবারগুলোর নারীদের চিত্র একই।

বন্যাকালীন কর্মহীন হয়ে পড়েন পুরুষেরা। দিনের অধিকাংশ সময় কেউ বাজারে কেউ বা নৌকায় বসে শুয়ে সময় কাটান। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে নারীদের ব্যস্ততা আরো বাড়ে এবং সংসারের কাজ করার প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে চর পার্বতীপুরে ৩০টির মতো পরিবারের বাস। সেখানের প্রায় সব বাড়িই পানির নিচে। সেখানে গেলে ওই চরের বাসিন্দা সামিনা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যায় ঘরের ভেতর একটি মাচার ওপরে।

দুপুর ২টায় দিনের প্রথম রান্না করছেন তিনি। বাইরে নৌকায় বসে সন্তানেরা অপেক্ষা করছেন কখন রান্না শেষ হবে!

সামিনা বেগম বলছিলেন, রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই, ছবি- বার্তা২৪.কম

সামিনা বেগম বলছিলেন, ‘রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই। খালি ভাত আন্দি নুন দিয়া খামো। স্বামীর কাম বন্ধ। তরকারি কেনার ট্যাকাও নাই। হামাক কি কাঈও কিছু দিব্যার নয়’!

একই চরের রেজিয়া বেগম নৌকায় বসে স্বামীর বাজার থেকে ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন। খাবার পানিও বাজার করে আনলে তবেই রান্না হবে।

রেজিয়া বেগম বলেন, সকালে পন্তা খাইছি। স্বামী ২শ টাকা নিয়া হাটে গেইছে। কী যে আনে! নিয়া আইসলে রান্না হবে। বাচ্চার অসুখ, সারাক্ষণ পাহারা দিয়্যা রাখতে হয়। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদন বলছে, রোববার (৭ জুলাই) বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬০১ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত। সরকারি হিসাবেই প্লাবিত এলাকায় ৯৭ হাজার ৭৫০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত একদিনের ব্যবধানে পানিবন্দি মানুষ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার।

এদিকে, পানিবন্দি মানুষের খাদ্যকষ্ট লাঘবে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। রোববার পর্যন্ত জেলার দুর্গত মানুষদের জন্য ৩৮৭ মেট্রিক টন চাল এবং ১৮ হাজার ৯৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘ধরলা ও দুধকুমারের পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের দিকে আমরা নজর দিয়েছি। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, জেলায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে দুধকুমার ও ধরলা নদীও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

রোববার (৭ জুলাই) দুপুরে দেওয়া বার্তায় পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

তবে আগামী ৭২ ঘণ্টা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাসহ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

;