বাঘের থেকেও বিরল পাখি সুন্দরী হাঁস



আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ
কচিখালির কাছে ছুটা কটকা খালের পাড়ে অতি বিরল পুরুষ সুন্দরী হাঁস। ছবি- আমিনুর রহমান

কচিখালির কাছে ছুটা কটকা খালের পাড়ে অতি বিরল পুরুষ সুন্দরী হাঁস। ছবি- আমিনুর রহমান

  • Font increase
  • Font Decrease

সুন্দরবনের গহীনে বাঘের থেকেও বিরল এক বন্যপ্রাণীর বাস। তবে, বন্যপ্রাণীটি বাঘের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণী নয় মোটেও, বরং রহস্যময় এক পাখি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অতি বিরল এই পাখিটির মাত্র ৩০০টির মতো সদস্য বেঁচে আছে যার প্রায় শ-দুয়েক আমাদের সুন্দরবনের বাসিন্দা। আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগে ভাটার সময় সুন্দরবনের গোলগাছে ঘেরা কাদাময় অচেনা এক খালের পাড়ে দূর থেকে পাখিটির দেখা পেয়েছিলাম এক পলকের জন্য; ফলে ভালোভাবে ওকে দেখতে পারিনি, ছবি তোলা তো দূরের কথা। এরপর বহুদিন কেটে গেছে। বহুবার সুন্দরবন গেছি। কিন্তু রহস্যময় পাখিটির দেখা পাইনি কোনদিন। ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি রাতে ফের সুন্দরবন রওয়ানা হলাম রহস্যময় পাখিটির সন্ধানে। বাঘের বৈঠকখানা খ্যাত কচিখালি পৌঁছলাম পরের দিন সন্ধ্যায়। পরদিন সকালটা কচিখালি কাটিয়ে ১০টা নাগাদ বাঘের বাড়ি খ্যাত কটকার পথে রওয়ানা হলাম।

কাদাপানিতে দাঁড়িয়ে পুরুষ সুন্দরী হাঁস। ছবি- লেখক

অভিজ্ঞ সারেং সগির ও মাঝি গাউসের পরামর্শে বড় কটকা খাল দিয়ে না গিয়ে ছোট একটি খাল, যার নাম ছুটা কটকা খাল, দিয়ে এগুতে থাকলাম। কারণ এখানে রহস্যময় ও বিরল পাখিটির থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ভাটা চলছে। কাজেই ক্যামেরা হাতে আমরা সাতজন টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। খালের দুপাশে গোলগাছের সারি, দৃষ্টি সবার এই গোলবনের পলিময় কাদার দিকেই। কিন্তু এভাবে ভারি ক্যামেরা তাক করে আর কতক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়? পরিশ্রান্ত সবাই কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে গেল। কিন্তু আমার দৃষ্টি গোলবনের কাদার দিকেই থাকল। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে হাঁসের মতো কিন্তু অদ্ভুত একটি পাখির চেহারা ভেঁসে ওঠল। ওর ঠোঁটটি হাঁসের মতো চ্যাপ্টা নয় বরং চোখা। পায়ের পাতাও কেমন যেন অন্যরকম, পায়ের আঙ্গুলের সঙ্গে যুক্ত নয়। বিচিত্র এক পাখি! মন্ত্রমূগ্ধের মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। আর আমার আঙ্গুল অজান্তেই শাটারে ক্লিক করে গেল। হঠাৎই বলে ওঠলাম হাঁসপাখি! হাঁসপাখি!! পাখিটি দ্রুত গোলবনের কাদাময় পাড় থেকে পানিতে নেমে গেল। আমি ও অন্য এক আলোকচিত্রী ছাড়া কেউ ওর ছবি তুলতে পারল না।

সুন্দরী খালে ভাসমান পুরুষ সুন্দরী হাঁস। ছবি- লেখক

রহস্যময় পাখিটির আবিষ্কারে মনপ্রাণ আনন্দে ভরে ওঠল। খানিক পর এই খালেই আরও দুটি হাঁসপাখির দেখা পেলাম। পরদিন ভোরে কটকার কাছে সুন্দরী বা হোমরা খালে আরও চারটি একই পাখির পাখির দেখা পেলাম, যার মধ্যে একটি স্ত্রী পাখিও ছিল। এক যাত্রার সাতটি হাঁসপাখির দেখা পাওয়া বিরল দৃষ্টান্ত ও মহাভাগ্যের ব্যাপার। তবে এরপর আরও অনেকবার সুন্দরবন গেছি, কিন্তু পলিমাটিতে পায়ের ছাঁপ দেখলেও হাঁসপাখির দেখা পাইনি।

বাঘের থেকেও বিরল গোলবনের রহস্যময় পাখিটি আর কেউ নয়, এদেশের বিরল ও বিপন্ন এক পাখি সুন্দরী বা গেইলো হাঁস। অন্তত সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালি-মৌয়াল-জোংরাখুটাদের কাছে ওরা এই নামেই পরিচিত। অবশ্য অনেকে এদেরকে গোলবনের হাঁসপাখি বা বাইলা হাঁসপাখি নামেও ডাকে। তবে নাম হাঁসপাখি হলেও আদতে হংস বা Anatidae গোত্রের ধারে-কাছের পাখিও নয় এটি। বরং জলমুরগি, যেমন- রাঙা হালতি, ডুংকর, ডাহুক, কোড়া, কালেম ও সারস ক্রেন পাখিদের নিকটাত্মীয় এটি। পাখিটির ইংরেজি নাম  Masked Finfoot  বা Asian Finfoot। | Helornithidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Heliopais personata (হেলিওপাইস পারসোন্যাটা)। অতি লাজুক পাখিটিকে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় দেখা যায়।

খালের পাড়ে স্ত্রী সুন্দরী হাঁস

সুন্দরী হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৫৬ সেন্টিমিটার। দেহের পালকের মূল রঙ গাঢ় বাদামি। লম্বা গলাটি হালকা বাদামি। পিঠ জলপাই-বাদামি। ডানার প্রাথমিক পালক কালচে জলপাই-বাদামি। বুক-পেট-লেজতল হালকা বাদামি। চোখের পিছন থেকে ঘাড়ের পার্শ্বদিক পর্যন্ত সাদা ডোরা রয়েছে। হলুদ চঞ্চুটি লম্বা ও ড্যাগারের মতো চোখা। পায়ের আঙ্গুলে পর্দা থাকলেও তা হাঁসের মতো পায়ের পাতায় যুক্ত থাকে না। বরং দেখতে অনেকটা মাছের পাখনার মতো। পায়ের রঙ সবুজাভ-হলুদ। স্ত্রী-পুরুষের চেহারায় অল্পবিস্তর পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের ঘাড়, গলার সম্মুখভাগ ও চিবুক কালো, স্ত্রীটির ক্ষেত্রে যা সাদা। পুরুষের চোখ গাঢ় বাদামি ও চঞ্চুর গোড়ায় শিংজাতীয় পদার্থ থাকে। অন্যদিকে, স্ত্রীর চোখ হলুদ ও চঞ্চুর গোড়ায় শিং থাকে না। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কপালের ধূসর ও চঞ্চুর ক্রিম-হলুদ রঙ ছাড়া বাকি সবই দেখতে স্ত্রী পাখির মতো।

আগেই বলেছি সুন্দরী হাঁস বিরল আবাসিক পাখি, বর্তমানে বিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। একমাত্র সুন্দরবনেই দেখা যায়। অতি লাজুক এই পাখিটি একাকী, জোড়ায় বা ছোট পারিবারিক দলে বিচরণ করে। অল্প পানিতে সাঁতার কেটে বা কাদায় হেঁটে চিংড়ি, ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙাচি, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গ ইত্যাদি খায়। ভয় পেলে বা বিপদ দেখলে চঞ্চুসমেত মাথা পানিতে ভাসিয়ে ডুবে থাকে বা দ্রুত দৌড়ে পালায়। এরা হাঁসের মতোই উচ্চস্বরে ‘প্যাক-প্যাক----’ শব্দে ডাকে।

সুন্দরবনে ক্যামেরা হাতে লেখক

জুলাই থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এসময় মাটি বা পানি থেকে ১-৩ মিটার উপরে গাছের বড় শাখায় ঘন পাতার আড়ালে কাঠিকুটি ও শিকড়-বাকড় দিয়ে স্তুপের মতো গোলাকার বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৪-৮টি। লম্বাটে ডিমগুলো ধূসরাভ সাদা, যাতে থাকে গাঢ় ছিটছোপ। সদ্যফোটা ছানার কোমল পালক ধূসর ও চঞ্চুর ওপর সাদা ফোটা থাকে। আয়ুষ্কাল ১০ বছরের বেশি।

E-mail: [email protected], [email protected]

বিশ্বের সবচেয়ে ‘কুৎসিত কুকুর’ এটি!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কুকুরের তথ্য যেমন রয়েছে তেমনি এবার সবচেয়ে কুৎসিত আকৃতির কুকুরেরও তথ্য মিলেছে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম স্কাই নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।

স্কাই নিউজ বলছে, চলতি বছরের ২১ জুন (শুক্রবার) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকু্রের প্রতিযোগিতা বসেছে। ওই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ওয়াইল্ড থাং নামে আট বছর বয়সী একটি কুকুর এ তকমা পেয়েছে।

তবে এবারই ওয়াইল্ড থাং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেনি। এর আগেও ৫ বার এমন প্রতিযোগিতায় প্রাণীটি অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে।

ওয়াইল্ড থাং এবং তার মালিক অ্যান লুইস। ছবি: সুমিকো মুটস / এনবিসি নিউজ

ওয়াইল্ড থাং এর মালিক অ্যান লুইস বলেন, ওয়াইল্ড থাং কুকুরছানা হিসাবে একটি ভয়ানক রোগ ক্যানাইন ডিস্টেম্পারে সংক্রমিত হয়েছিল। কোন ক্ষতি ছাড়াই অনেক চিকিৎসার পর বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তার দাঁত বেশি বৃদ্ধি না পাওয়ায় জিহ্বা বাইরে থাকে এবং তার সামনের ডান পা ২৪/৭ প্যাডেল আকারে থাকে।

পুরস্কার হিসেবে তাদেরকে ৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫১১ টাকা) দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিশ্বের সবচেয়ে কুৎসিত কুকুর প্রতিযোগিতা প্রায় ৫০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতাটি আকর্ষণীয় করার জন্য কুকুরগুলোকে বিশেষ এবং অনন্য করে সাজিয়ে তোলা হয়।

;

ট্যাক্সি চালকের অনর্গল ইংরেজি বলার দক্ষতা!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এই সংবাদটি পড়তে হলে আপনাকে ভুলে যেতে হবে শুধু শিক্ষিতরাই সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারেন! কারণ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায় এক ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীর সাথে অনর্গল ইংরজিতে কথা বলছেন।

ঘটনাটি প্রতিবেশী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রে ঘটেছে। দেশটির গণমাধ্যম এনডিতিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

এনডিটিভি বলছে, ওই ট্যাক্সি চালক তার যাত্রীদের সাথে ইংরেজি কথা বলার পাশাপাশি কিভাবে আরও দক্ষ হওয়া যায় সে বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।

মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে ধারণ করা ভিডিওটি ভূষণ নামে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী শেয়ার করেছেন। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, "এমন ঘটনা দেখে আমি কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পরে তার সাথে কথা বলার সময় কিছুটা তোতলা হয়েছিলাম। তার ইংরেজিতে সাবলীলতা দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।"

পরে তার সাথে এ নিয়ে কিছুক্ষণ আলাপ হলো।

ট্যাক্সি চালক বলেন, ইংরেজি শেখা থাকলে আপনি লন্ডন এবং প্যারিসের মতো উন্নত দেশে যেতে পারবেন। এটা বিশ্বব্যাপী ভাষা। এ কারণে ইংরেজি শেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ভিডিওটিতে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, "তার কথা বলার ধরণ ডক্টর এপিজে আবদুল কালামের মতো শোনাচ্ছেন"।

অপর একজন লিখেছেন, "১৬ বছরের শিক্ষার পর তার ইংরেজি আমার চেয়ে অনেক ভালো।"

;

‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার মেঘনা নদীর দেখা মেলে চুনা নদীতে



মৃত্যুঞ্জয় রায়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সাতক্ষীরা
ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

ছবি: মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরের জীবন

  • Font increase
  • Font Decrease

মেঘনা নদী দেব পাড়ি
কল-অলা এক নায়ে।

আবার আমি যাব আমার
পাড়াতলী গাঁয়ে।

গাছ-ঘেরা ঐ পুকুরপাড়ে
বসব বিকাল বেলা।

দু-চোখ ভরে দেখব কত
আলো-ছায়ার খেলা।

বাঁশবাগানে আধখানা চাঁদ
থাকবে ঝুলে একা।


ঝোপে ঝাড়ে বাতির মতো
জোনাক যাবে দেখা।

ধানের গন্ধ আনবে ডেকে
আমার ছেলেবেলা।

বসবে আবার দুচোখে জুড়ে
প্রজাপতির মেলা।

হঠাৎ আমি চমকে উঠি
হলদে পাখির ডাকে।

ইচ্ছে করে ছুটে বেড়াই
মেঘনা নদীর বাঁকে।

শত যুগের ঘন আঁধার
গাঁয়ে আজো আছে।

সেই আঁধারে মানুষগুলো
লড়াই করে বাঁচে।

মনে আমার ঝলসে ওঠে
একাত্তরের কথা,

পাখির ডানায় লিখেছিলাম-
প্রিয় স্বাধীনতা।

কবি শামসুর রাহমানের প্রিয় স্বাধীনতা কবিতার লাইনের সঙ্গে মিল রেখে বলতে হয়-

শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে থাকা মানুষগুলোর কথা।
চুনা নদী পাড়ি দেবো, ডিঙ্গি নৌকা দিয়া।

আবার আমি যাবো আমার উপকূলের গাঁয়ে।
কাজের জন্য ছুটে বেড়াই, চুনা নদীর বাঁকে।

বনে বাঘ, জলে কুমির আর ডাঙ্গায় লোনা পানির ক্ষত।
সেই চরের মানুষগুলো, এখনো লড়াই করে বাঁচে।

বর্ষাকালের দুপুর বেলা। আকাশে কালো মেঘ খেলা করছে! নদীতে পানি ঢেউ খেলছে! ভেসে আসছে, গেট থেকে জল আসার শব্দ। নদীর এপার ওপার হচ্ছেন ডিঙা নৌকা দিয়ে পাড়ে থাকা মানুষগুলো। ছুটে চলেছেন নারী-পুরুষ একে একে চুনা নদীর তীরে কাজের সন্ধানে। সন্ধ্যা হলেই দেখা মেলে বাড়ি ফেরার তাড়া। রাতের আঁধারে পশুপাখি, জীবজন্তু, পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচেন এই চুনা নদীর পাড়ের মানুষগুলো।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের চুনা নদীর তীরে বসবাস নিত্যসংগ্রামী মানুষদের, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম


এখানকার মানুষজন লড়াই সংগ্রাম করে এখনো টিকে আছেন। টিকে থেকে তাদের রোজ কাজের সন্ধানে অবিরাম ছুটে চলতে হয়। বর্তমানে ভাঙাগড়ার জীবনে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যত নিয়ে বসবাস করছেন তারা। শ্যামনগর উপজেলার কলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত চুনা নদীর চরটি। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারানো ২০-২৫টি জেলে পরিবারের ঠাঁই হয়েছে এখানে। বছরের পর বছর এই চরকে আগলে বসবাস করলেও সব সময় লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের।

তাদের একজন ৩৫ বছর বয়েসি রমেশ চন্দ্র মণ্ডল। দুর্যোগে সহায়-সম্পদ হারিয়ে আশ্রয় নেন চরের এক কোণে। সেখানে মাটির ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস তার। শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও ভর করে থাকতে হয়, স্ত্রীর ওপর। তার কষ্টের বিনিময়ে জোটে তাদের একমুঠো ভাত। স্ত্রী একাই লড়াই সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তাদের নিয়ে এই চরে।

বনে পশুপাখির, জলে কুমির আর স্থলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে এভাবে তাদের জীবন প্রবহমান। তাদের জীবন চলার পথে নেই কোনো বিরাম। সংগ্রাম করে টিকে থাকেন সবাই। একে একে সব কিছু হারিয়েও এখানো টিকে থাকতে হয় তাদের।

রমেশের মতো একই অবস্থা ষাটোর্ধ্ব ফকির বিশ্বাসের। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেও পেটের দায়ে কাজ করতে হয় তাকে। একবেলা কাজ করলে অপর বেলা কাটে অসুস্থতায়!

ফকির বিশ্বাস বার্তা২৪কমকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আশ্রয়ের দুই যুগ লড়াই সংগ্রাম করে টিকে থাকলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি। বরং প্রতিবছর ছোটবড় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি। লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে বারংবার!

জীবন কাটে যুদ্ধ করে, ঝড়-ঝঞ্ঝা মাথায় পেতে...চুনা নদীর তীরের মানুষের জীবন, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়, বার্তা২৪.কম

চুনা নদীর চরে মাছের পোনা গুনতে দেখা যায় নমিতা রাণী রায়কে। নমিতা রাণী রায় বার্তা২৪.কমকে বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সবসময় চিন্তার ভেতরে থাকতে হয় আমাকে। নদীতে কুমির আর বনে বাঘের আতঙ্ক! তারপর ডাঙায় লোনা পানির ক্ষত। লবণাক্ততায় ভরা জীবনকাল। তারপর চরটি নদীর ধারে হওয়াতে একটু জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। এই লড়াই-সংগ্রাম করেই বেঁচে আছি সেই প্রথম থেকে। মাছের পোনা বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার। আমরা সবাই এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করে টিকে আছি।

নমিতা রাণী রায় বলেন, যখন বসতবাড়ি নদীর পানিতে তলিয়ে যায়, তখন স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ওই সময় অনেক কষ্টে চর এলাকার সবার দিন কাটে। শিশু সন্তানদের সবসময় নজরে রাখতে হয়। অন্যথায় নদীতে পড়ে গিয়ে ঘটতে পারে ছোট-বড় দুর্ঘটনা!

নিত্যদিনের লড়াই-সংগ্রাম

লড়াই সংগ্রামের শেষ নেই উপকূলে থাকা মানুষজনের। সর্বশেষ, ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর আঘাতে নদীর জোয়ারের জলে তলিয়ে যায় তাদের বসতঘর। ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ বলে কথা না! যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জোয়ারের পানিতে তাদের বসতঘর তলিয়ে যায়। তখন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না তাদের। এমনও অনেক সময় গেছে যে, দিনের পর দিন উনুনে আগুন দিতে পারেননি তারা। ওই সময় শুকনো খাবার খেয়ে থাকতে হয়েছে তাদের। এমনও দিন গেছে, যেদিন তাদের শুধুমাত্র পানি পান করে বেঁচে থাকার জন্য লড়তে হয়েছে।

ঘরছোঁয়া জলের বানের দিকে তাকিয়ে থাকেন চুনা নদীর তীরের মানুষজন আর ভাবেন আর কত সংগ্রাম, ছবি- মৃত্যুঞ্জয় রায়,বার্তা২৪.কম

সত্যি, তাদের ভাষ্যের সঙ্গে বড়ই মিল কবি শামসুর রাহমানের ‘প্রিয় স্বাধীনতা’ কবিতার! ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটা একটা বড় প্রশ্নেরই বটে! জঙ্গল, বন্যা, নদীভাঙনের সঙ্গে অবিরাম সংগ্রাম করে টিকে থাকা একটা অকল্পনীয় ব্যাপার। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আর অভাবে চরের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন। তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঁধ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাসসহ ঘূর্ণিঝড়। প্রতিবছর এসব দুর্যোগে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তারা। আবারও লড়াই-সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার তাগিদে ঘুরেও দাঁড়ান তারা।

;

ব্রহ্মপুত্রের বানভাসি নারীদের দুঃখগাথা!



কল্লোল রায়, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কুড়িগ্রাম
ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

ছবি: বার্তা২৪, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে পানিবন্দি মানুষ

  • Font increase
  • Font Decrease

'খ্যাতা-কাপড় সইগ ভিজি গেইছে, পাক-সাকও (রান্না-বান্না) করতে পারি না। আমাদের দেখার মতো মানুষ নাই। স্বামীর জ্বর আসছে, ওষুধ ও নাই। বাচ্চা গুল্যাক সারাক্ষণ পাহারা দেওয়া নাগে। জ্বর নাগি আছে। যে ঘরত থাকি স্যাটে গরু ছাগলও থাকে। সারাদিন গরু ছাগলের ময়লা পরিষ্কার করতেই যায়। এই বানের পানিতও হামার বইসনা(অবসর) নাই’- কথাগুলো বলছিলেন রাবেয়া বেগম।

তার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলি মুসার চরে। ১২ দিন থেকে পানিবন্দি হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গবাদিপশু রাখার উঁচু টিলায়।

অপরিচ্ছন্ন এই পরিবেশে শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন রাবেয়া বেগমের মেয়ে শাহানাজ বেগম।

শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে রান্না করছেন শাহানাজ বেগম, ছবি- বার্তা২৪.কম

শাহানাজ বেগম বলছিলেন, 'হামার তো কষ্ট! সংসার হামরা বান হইলেও সামলাই, খরা হইলেও সামলাই। নিজে কম খাইলেও বাচ্চাদের জন্য রান্না করতে হয়। বাচ্চাদের দেখাশোনা, গরু-ছাগলের দেখাশোনা করতে দিন কাটে। রাইতে পানি বাড়ে কি না দেখার জন্যে জাগি থাকা নাগে। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

শুধু এই দুই নারী-ই নন, কুড়িগ্রামের বানভাসি পরিবারগুলোর নারীদের চিত্র একই।

বন্যাকালীন কর্মহীন হয়ে পড়েন পুরুষেরা। দিনের অধিকাংশ সময় কেউ বাজারে কেউ বা নৌকায় বসে শুয়ে সময় কাটান। কিন্তু এই সংকট মুহূর্তে নারীদের ব্যস্ততা আরো বাড়ে এবং সংসারের কাজ করার প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে চর পার্বতীপুরে ৩০টির মতো পরিবারের বাস। সেখানের প্রায় সব বাড়িই পানির নিচে। সেখানে গেলে ওই চরের বাসিন্দা সামিনা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যায় ঘরের ভেতর একটি মাচার ওপরে।

দুপুর ২টায় দিনের প্রথম রান্না করছেন তিনি। বাইরে নৌকায় বসে সন্তানেরা অপেক্ষা করছেন কখন রান্না শেষ হবে!

সামিনা বেগম বলছিলেন, রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই, ছবি- বার্তা২৪.কম

সামিনা বেগম বলছিলেন, ‘রান্নার জন্য পানি ছিল না। খড়ি সইগ ভিজি গেইছে। রান্নার জন্যে তরকারিও নাই। খালি ভাত আন্দি নুন দিয়া খামো। স্বামীর কাম বন্ধ। তরকারি কেনার ট্যাকাও নাই। হামাক কি কাঈও কিছু দিব্যার নয়’!

একই চরের রেজিয়া বেগম নৌকায় বসে স্বামীর বাজার থেকে ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন। খাবার পানিও বাজার করে আনলে তবেই রান্না হবে।

রেজিয়া বেগম বলেন, সকালে পন্তা খাইছি। স্বামী ২শ টাকা নিয়া হাটে গেইছে। কী যে আনে! নিয়া আইসলে রান্না হবে। বাচ্চার অসুখ, সারাক্ষণ পাহারা দিয়্যা রাখতে হয়। হামার কষ্ট কায় দ্যাখে’!

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার প্রতিবেদন বলছে, রোববার (৭ জুলাই) বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬০১ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত। সরকারি হিসাবেই প্লাবিত এলাকায় ৯৭ হাজার ৭৫০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত একদিনের ব্যবধানে পানিবন্দি মানুষ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার।

এদিকে, পানিবন্দি মানুষের খাদ্যকষ্ট লাঘবে সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন। রোববার পর্যন্ত জেলার দুর্গত মানুষদের জন্য ৩৮৭ মেট্রিক টন চাল এবং ১৮ হাজার ৯৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘ধরলা ও দুধকুমারের পানি বাড়ায় বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা দীর্ঘ হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্যানিটেশনের দিকে আমরা নজর দিয়েছি। মানুষের কষ্ট লাঘব করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, জেলায় ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে দুধকুমার ও ধরলা নদীও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

রোববার (৭ জুলাই) দুপুরে দেওয়া বার্তায় পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধরলা ও দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

তবে আগামী ৭২ ঘণ্টা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাসহ সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।

;