আমাদের প্রজাপতি



অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে চাতুল (Monkey Puzzle) প্রজাপতি। ছবি- লেখক।

মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে চাতুল (Monkey Puzzle) প্রজাপতি। ছবি- লেখক।

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রজাপতির (Butterfly) মতো এতো সুন্দর পতঙ্গ এই ধরনীতে আর আছে কি? সম্ভবত নেই। কল্পনায় যত রঙ আঁকা যায়, তার সবগুলো রঙেরই প্রজাপতি থাকা সম্ভব। বাহারি কারুকাজযুক্ত রঙির ডানাওয়ালা পতঙ্গগুলোকে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ বাদে বিশ্বের প্রায় সবখানেই দেখা যায়। ছোট্ট বর্নিল নিরীহ পতঙ্গগুলোকে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। রঙিন এই পতঙ্গগুলো যখন নরম ডানায় ভর করে কারো পাশ দিয়ে ধীর গতিতে উড়ে যায় তখন মূগ্ধ দৃষ্টিতে না তাকিয়ে কি থাকা যায় না।

প্রজাপতি লেপিডপটেরা বর্গের সদস্য, গ্রীক ভাষায় যার অর্থ আঁশযুক্ত ডানাওয়ালা পতঙ্গ। প্রজাপতি ছাড়া এই বর্গে আরও রয়েছে মথ (Moth)। আর সেকারণেই মথ প্রজাপতির নিকটাত্মীয়। প্রজাপতির বিভিন্ন গোত্র বা পরিবারগুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- ১. সত্যিকারের প্রজাপতি (True Butterfly), ২. কাপ্তান (The Skipper) ও মথ-প্রজাপতি (Moth-Butterfly)। লেপিডপটেরার বাদবাকি পরিবারগুলোর সদস্যরাই হলো মথ। এ বর্গের ৮৯-৯৪%-ই মথ ও বাকি মাত্র ৬-১১% প্রজাপতি। প্রায় ২০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ওদের উদ্ভব হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। বিশ্বব্যাপী ১৫-২০ হাজার প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৪৩০টি প্রজাতি তালিকাভুক্ত হলেও মোট প্রজাতি সংখ্যা পাঁচশ-এর বেশি হতে পারে। এদেশে বর্তমানে তিনটি প্রজাপতি পার্ক রয়েছে। প্রথমটি চট্রগ্রামের পতেঙ্গায়, দ্বিতীয়টি গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ও তৃতীয়টি গাজীপুরের বাঘের বাজারে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্কের ভেতর।

পুরুষ চোরকাটা কমলা (Leopard Lacewing) প্রজাপতি। ছবি- লেখক

হাতির যেমন শুঁড় (proboscis) আছে প্রজাপতিরও তেমনি শুঁড় রয়েছে যা দিয়ে এরা ফুলের ভিতর থেকে নির্যাস বা রস (Nectar) বের করে আনে। পাপুয়া নিউ গিনির ‘রাণী আলেকজান্দ্রার বিহন’ বিশ্বের বৃহত্তম প্রজাপতি, যার প্রসারিত ডানা ২৫০ থেকে ২৮০ মিলিমিটার এবং উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার ‘পশ্চিমা বামন নীল’ বিশ্বের ক্ষুদ্রতম প্রজাপতি (প্রসারিত ডানা ১০ মিলিমিটার)। ‘বেনুবিহন’ বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রজাপতি (প্রসারিত ডানা ১৪০ থেকে ১৯০ মিলিমিটার) ও ‘সলমা’ ক্ষুদ্রতম (প্রসারিত ডানা ২০ থেকে ২২ মিলিমিটার)। বিশ্বব্যাপী বহু সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি ও মথ রয়েছে, যেমন- নীল প্রজাপতি, সচ্ছ প্রজাপতি, ৮৮ প্রজাপতি ইত্যাদি। এসব প্রজাপতি বা ওদের নিকটাত্বীয় কিছু প্রজাতি এদেশেও রয়েছে, যেমন- বেণুবিহন, শ্বেত ফড়িংলেজী, তিতিমৌরল, মরাপাতা ইত্যাদি। অন্যান্য সুন্দর প্রজাপতির মধ্যে রয়েছে গর্দাপেয়ারী, নিশি সিন্ধুপ, রতœচূড়, চোরকাটা কমলা, নীল শিখীপর্ণ, বিদুষক ইত্যাদি।

আমাদের প্রজাপতির মধ্যে সচরাচর যেগুলোকে দেশজুড়ে দেখা যায় তার মধ্যে উদয়াবল্লী, সাত ডোরা,  নীরদ সিন্ধু, মনমেঘা, কস্তুরী শার্দুল, নীল ডোরা, চোরকাটা কমলা, উষসী বায়স, নীল পুনম, অংশশুচপল, কমলা শিখীপর্ণ, ধূসর শিখীপর্ণ, বনবেদে, নাবিক, কৃষ্ণতরঙ্গ, গুণনকর বনপাল, কুম্ভীধনু, তৃণাঙ্গুরী, উষসী কপিল, ভোল ভ্রামরী, রাগ নকশী, হেমশুভ্র, চৈতালী দূত, তৃণ গোধুম, তৃণ বিদুষক, তিলাইয়া, কৃষ্ণতিলা, পঞ্চতিলা, তিন্নি, নীলবিজুড়ী, মলয় মশাল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দুলর্ভ ও বিরল প্রজাতির মধ্যে রয়েছে বেণুবিহন, কেশবতী, কাজল, চন্দ্রাবল্লী, হলদে খঞ্জর, শ্বেত ফড়িংলেজী, তিতিমৌরল, নীল বায়স, বনমালী, নীল শিখীপর্ণ, পালিপার্বন, দেতাবকী, নিশি সিন্ধুপ, একাঙ্ক গোধুম, বান্দর, ময়ূরী রেণূ, পীতরতœ, চাতুল, নীল খয়ের, আকাশচারী, ভাটুরে বউল, শিখা বউল, জলদ আকাশি, ছিটকুল, সূর্যচঞ্চল, স্বর্ণছরা, ছাযাকরণ ইত্যাদি। মহাবিপন্ন ও বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় রয়েছে স্বর্ণবিহন, সিঁদুরী পদ্মরাগ, চুমকি, সুন্দরী বায়স, শ্বেত শার্দুল, চিত্রল বায়স, সুন্দরী বনদেবী, বনবেণু, রত্মচূড়, উদয়ধনু, রক্তডানা, কৃষ্ণ অধিরাজা, কৃষ্ণ যুবরাজ, তালডিঙি, পিপুলকাঠি, উর্মিমালা, কুল মুকুল, ভাঁড় ইত্যাদি।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাগ নকশী (Common Jezebel) প্রজাপতি। ছবি- লেখক। 

প্রজপাতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক সংস্কার বা কুসংস্কার রয়েছে। যেমন- কারো গায়ে প্রজাপতি বসাকে সৌভাগ্যের লক্ষণ বলে ধরে নেয়া হয়। এদেশে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত লোকের দেহে প্রজপাতি বসলে তার বিয়ের ফুল ফুটলো বলে ধরে নেয়া হয়। সাদা রঙের প্রজপতিকে কোথাও কোথাও সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়। এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রজাপতি নিয়ে বহু পৌরাণিক কাহিনী বা কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় Psyche (সাইকি) অর্থ হলো প্রজাপতি। Psyche-এর শাব্দিক অর্থ Soul বা আত্মা অথবা Mind বা মন। গ্রীকরা বিশ্বাস করে যে, প্রাতিটি মথ প্রজাপতি থেকে বের হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আত্মার জন্ম হয়। প্রজাপতি নিয়ে জাপানী মিথ হলো- যার ঘরে প্রজাপতি প্রবেশ করে, সবচেয়ে পছন্দের ব্যাক্তিটি তাকে দেখতে আসে। দু’টি প্রজাপতি একসঙ্গে উড়াকে চীনারা ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দেখে। ফিলিপিনোরা মনে করে, কোন ঘরে যদি কালো প্রজাপতি প্রবেশ করে বা এর মথ আনা হয় বা জন্ম হয়, তবে ঐ পরিবারের কেউ মারা গেছে বা শীঘ্রই মারা যাবে। প্রাচীন ইউরোপিয়রা মনে করতো মানুষের আত্মা নেয়া হয় প্রজাপতির রূপে, তাই তারা প্রজাপতিকে খুবই শ্রদ্ধা ও ভয়ের সাথে দেখতো। আইরিশরা মনে করে, মৃত ব্যক্তিদের আত্মা স্বর্গে প্রবেশের আগ পর্যন্ত প্রজাপতি হযে থাকে। মেক্সিকোর কোন কোন আদিবাসী বিশ্বাস করে যে, প্রজাপতি হলো পৃতিবীর উর্বরতার প্রতীক। মায়া আদিবাসীরা মনে করে, মৃত যোদ্ধাদের আত্মা প্রজাপতির রূপ নিয়ে পৃথিবীতে বিরাজ করে। আসামের নাগাস অঞ্চলের লোকেদের বিশ্বাস এই যে, আত্মা পৃথিবীতে এক রূপ থেকে অন্য রূপে রূপান্তরিত হচ্ছে। এর সর্বশেষ ধাপে প্রজাপতি হয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই প্রজাপতির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আত্মার রূপান্তরও শেষ হয়।

মৌলভীবাজারের আদমপুর বিটে ভাঁড় (Harlequin) প্রজাপতি। ছবি- লেখক।   

প্রজাপতি দিনের বেলায় ফুল থেকে ফুলে ওড়ে বেড়ায় ও ফুলের রস পান করে। ফুলের পরাগায়ণে অর্থাৎ গাছের বংশবিস্তারে এরা বেশ সাহায্য করে। এদের পঞ্চেন্দ্রিয় উন্নত ধরনের। পূর্ণবয়ষ্ক প্রজাপতির মাথায় একজোড়া প্রায় গোলাকার যৌগিক চোখ বা পুঞ্জাক্ষি (Compound Eye) থাকে যা দিয়ে এরা চারদিক দেখতে পারে। প্রজাপতি পুঞ্জাক্ষির সাহায্যে ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও বস্তু শণাক্ত করতে পারে। এদের লম্বা দেহটি তিনভাগে বিভক্ত, যেমন মাথা, বুক ও উদর বা পেট। উদর লম্বা বেলুনাকার যা দশটি খন্ডে বিভক্ত। সাধারণত দেহ এবং ডানার উপর ও নিচের দিকের রঙ এবং কারুকাজে ভিন্নতা থাকে। মাথার দু’পাশে একটি করে অ্যান্টেনাও রয়েছে। চোখ বাদে পুরো দেহ ছোট ছোট রোম ও চ্যাপ্টা আঁশে আবৃত থাকে। এদের ডানা চারটি ও পা তিন জোড়া।

ঠাণ্ডা মৌসুমে প্রজাপতি উড়তে পারে না। এদের স্বাভাবিক কাজকর্ম বা ওড়াউড়ি করার জন্য পরিবেশের তাপমাত্রা ২৮-২৯- সেলসিয়াস থাকা বাঞ্ছনীয়। এরা শীতল রক্তসম্পন্ন প্রাণী, তাই দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এজন্য পরিবেশের তাপমাত্রা এদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পরিবেশের তাপমাত্রা যদি ১৩- ডিগ্রী সেলসিয়াসের কম থাকে তবে এরা নড়াচড়া করতে পারে না, এমনকি নিজেদের জন্য খাদ্য সংগ্রহেও যেতে পারে না। শীতে প্রজাপতিদের চলাফেরার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের তাপের প্রয়োজন হয়। নতুন জন্ম নেয়া প্রজাপতি উড়তে পারে না। কারণ এদের পাখাগুলো দেহের সাথে লেগে থাকে। প্রজাপতির পুরো দেহ শুষ্ক হওয়ার জন্য কয়েক ঘন্টা সময় লাগে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাদামি শঙ্কু (Chestnut Angle) প্রজাপতি। ছবি- লেখক। 

প্রজাপতির জীবন চক্র চারটি পর্বে বিভক্ত। যথা- ১) ডিম, ২) শুককীট (বা শুঁয়াপোকা), ৩) মূককীট (বা কোকুন) ও ৩) পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গ (বা ইমাগো)। এটিকে বলে সম্পূর্ণ রূপান্তর। প্রজাপতি ও মথের ধরনের উপর নির্ভর করে জীবন চক্রের দৈর্ঘ্য মাস থেকে বছরব্যাপী হতে পারে। জীবন চক্রের প্রথম পর্যায় হলো ডিম। ডিমের আকার ও আকৃতি ওদের ধরনের উপর নির্ভর করে। ডিম ছোট, গোলাকার, ডিম্বাকার বা নলাকার হয় ও কমবেশি সচ্ছ থাকে। স্ত্রী সচরাচর পছন্দনীয় উদ্ভিদ অর্থাৎ পোষক গাছের কচি পাতা, অঙ্কুর বা কাণ্ডে ডিম পাড়ে। বসন্ত ও গ্রীষ্ম ডিম পাড়ার উপযুক্ত মৌসুম, তবে অন্য সময়েও ডিম পাড়তে সক্ষম। স্ত্রী একসঙ্গে প্রচুর ডিম পাড়ে, তবে শেষ পর্যন্ত মাত্র কয়েকটি বেঁচে থাকে। জীবন চক্রের দ্বিতীয় পর্যায় হলো শুককীট। এটি দেখতে লম্বা পোকার মতো যার চোখ বয়ষ্কগুলোর মতো যৌগিক নয় বরং সরল। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর প্রথমেই শুককীট ডিমের খোসাটি খেয়ে ফেলে। ওরা গাছের পাতা খেয়ে ও কয়েকবার (সচরাচর পাঁচবার) দেহের খোলস পাল্টে আকারে বড় হয় ও পরের ধাপে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। বেশিরভাগ শুককীটই গাছের ক্ষতি করে। অবশ্য কোনো কোনো প্রজাতি ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে কৃষকদের উপকারও করে। মূককীট হলো জীবন চক্রের তৃতীয় পর্যায়। এ পর্যায়ে শুককীট খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেহের চারিদিকে একটি খোলস সৃষ্টি করে এবং নিজেকে তার মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। শক্ত খোলসের ভিতরে এটি দ্রুত পরিবর্তিত বা রূপান্তরিত হয়ে মূককীটে পরিণত হয়। এই রূপান্তরে, শুককীটের কলা, অঙ্গ, প্রতঙ্গ ইত্যাদি পরিবর্তিত হয়ে প্রজাপতিতে পরিণত হয়। এক সপ্তাহ থেকে কয়েকমাস, এমনকি বছর পর্যন্ত এটি সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। জীবন চক্রের চতুর্থ বা চূড়ান্ত পর্যায় হলো প্রাপ্তবয়স্ক ধাপ বা ইমাগো। মূককীটের ভিতরে রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর উপযুক্ত সময় ও পরিবেশে সুপ্তিকালশেষে একদিন খোলস কেটে বেরিয়ে আসে প্রজাপতি। এ সময় তার দু’ডানাই ভেঁজা, নরম ও দেহের সঙ্গে ভাঁজ হয়ে থাকে। ডানা পুরোপুরি শুকানোর পর সে ওড়াউড়ি শুরু করে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে উতলকুট (Great Mormon) প্রজাপতি। ছবি- লেখক। 

যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক প্রজাপতির মূল কাজ হলো বংশবিস্তার করা তাই সে সঙ্গী খোঁজে, মিলিত হয়, ডিম পাড়ে ও বংশবিস্তার করে। এই পর্যায়ে কিছু প্রজাপতি ফুল থেকে নির্যাস পান করে। অন্যরা গাছের রস, মল, ভিজা মাটির রস, পচনশীল ও মৃত প্রাণীজ পদার্থ এবং অন্যান্য জৈব পদার্থ থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। প্রজাপতি মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাঁচে, কারণ ওদের জীবকাল গড়ে ৩-৪ সপ্তাহ। তবে, পরিযায়ী প্রকৃতিরগুলো বছরখানেকও বাঁচতে পারে। প্রজাপতিরা সাতটি গোত্রে বিভক্ত। তবে এদেশে হেডিলিডি গোত্রের কোনো প্রজাপতি না থাকায় বাংলাদেশের প্রজাপতিগুলোকে ছয়টি গোত্রেই দেখানো হয়, যেমন- ১) প্যাপিলিওনিডি বা সোয়ালোলেজী প্রজাপতি (উদাহরন- উতলকূট, অভ্রকূট), ২) নিম্ফালিডি বা চারপেয়ে প্রজাপতি (চোরকাটা কমলা, কস্তুরী শার্দুল), ৩) পিয়েরিডি বা সাদা ও হলুদ প্রজাপতি (রাগ নকশী, শুদ্ধ হরিদ্রা), ৪) লাইকিনিডি বা নীল প্রজাপতি (জলদ আকাশী, চাতুল), ৫) রিওডিনিডি বা ধাতবচিহ্নযুক্ত প্রজাপতি (ভাঁড়, বিদুষক) ও হেস্পারিডি বা অধিনায়ক (বাদামি শঙ্কু, শিকনদেও) প্রজাপতি। কোনো কোনো পুরনো শ্রেণিবিন্যাসে কিছু অতিরিক্ত গোত্র, যেমন- ড্যানাইডি, হেলিকোনিডি, লিবিথিইডি, স্যাটিরিডি, অ্যাকারিইডি, অ্যামাসথুসিইডি ইত্যাদিকে স্বীকৃতি দিলেও আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসে এগুলোকে নিম্ফালিডি গোত্রের অর্ন্তগত উপগোত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রজাপতি দেখতে বেশ সুন্দর ও বর্নিল হলেও শুককীটগুলো অনেক ক্ষেত্রেই তেমন একটা সুন্দর হয় না। তাছাড়া এরা গাছের বেশ ক্ষতি করে। অবশ্য কোন কোন প্রজাতির শুককীট ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে কৃষকদের বেশ উপকারও করে। আবার শূককীট বা শুয়াপোকা অনেক পাখির কাছেই অত্যন্ত প্রিয় খাবার। কাজেই অনেক প্রজাতির পাখিও প্রজাপতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। গাছের বৈচিত্র্য তৈরিতে প্রজাপতি ভূমিকা রাখে।

প্রকৃতির সুন্দর সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ফুল, পাখি ও প্রজাপতি অন্যতম। সুন্দর এই প্রজাপতিগুলো দেখে আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু এদের প্রতি আমরা মোটেও সচেতন নই। আামদের দেশের শিশু-কিশোর এমনকি বড়রাও সঠিকভাবে প্রজাপতি চিনে না। এদের উপকারিতা সম্পর্কেও বিশেষ কিছু জানে না। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় উদ্ভিদ ও প্রাণী-পাখির মতো প্রজাপতিরও যে ভূমিকা রয়েছে তা অনেকেরই জানা নেই। প্রজাপতি পরিবেশের সুস্থতার নির্নায়ক। এদেশে বর্তমানে কয় প্রজাতির প্রজাপতি বিলুপ্তির দোড়গোড়ায় ও কয়টি ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার কোন সঠিক হিসাব নেই। কাজেই এ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা প্রয়োজন। তবে আমাদের প্রাকৃতিক গাছগুলোকে সংরক্ষণ করে প্রজাপতিকে রক্ষা করা সম্ভব। কেননা কিছু কিছু গাছ রয়েছে যার ওপর প্রজাপতিরা সরাসরি নির্ভরশীল। তবে কিছু কিছু প্রজাতি মারাত্মকভাবে হুমকীর সম্মূখীন রয়েছে। কাজেই এদের রক্ষা করার ব্যাপারে এখনই সচেতন না হলে এদেরকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

কেশবতী (Common Batwing) প্রজাপতির পাশে লেখক

 E-mail:[email protected], [email protected]

   

ইতিহাসের পাতায় আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
সুইডেনের প্রেসিডেন্ট ওলোফ পালমেকে গুলি করে হত্যা করা হয়

সুইডেনের প্রেসিডেন্ট ওলোফ পালমেকে গুলি করে হত্যা করা হয়

  • Font increase
  • Font Decrease

বছর ঘুরে বার বার ফিরে আসে একই তারিখ। প্রতিবছর সেই তিথিতে মানুষ স্মরণ করে পূর্ববর্তী দিনগুলো। সেই সাথেই ঘুরে ঘুরে আসে প্রতিদিনের ঐতিহাসিক ঘটনাও।  আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪। জেনে নেওয়া যাক, আজকের দিনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা। 

প্রয়াত সুইডেন প্রেসিডেন্ট ওলোফ পালমে

১৯৮৬ সালে সুইডেনের প্রধান মন্ত্রী ওলোফ পালমের উপর গুলি বর্ষণ করানো হয়, যে ঘটনায় তিনি  মৃত্যুবরণ করেন এবং তার স্ত্রী লিসবেথ পালমে আহত হন। সেন্ট্রাল স্টকহোমের রাস্তায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্ত্রীর সাথে রাতে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় তার পেটে পরপর দু’টো এবং তার স্ত্রীকে পেছন থেকে গুলি করা হয়। ওলোফ দেহরক্ষী রাখতে পছন্দ করতেন না। ট্যাক্সি ড্রইভারের এলার্ম বাজানো এবং দু’জন তরুণীর সাহায্য করার সত্ত্বেও তাকে বাঁচানা যায়নি।

রেল দুর্ঘটনায় ১০ জনের অধিক মৃত্যু

আজকের তারিখে ২০০১ সালে উত্তর ইয়র্কশায়ারের ইস্ট কোস্ট মেইনলাইনে সেলবি রেলদুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন। ১৩ জনের বেশি মানুষ মৃত্যুঝুঁকিতে ছিল এবং ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। একটি গাড়ির সাথে সংঘর্ষে গতিশীল রেলটি স্থানচ্যুত হয়।

কুয়েতের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি

কুয়েতের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের পর ইরান অবশেষে জাতিসংঘের ১২ টি প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয়। সেইজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট  জর্জ বুশ ওয়াশিংটনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে কুয়েতকে মুক্ত ঘোষণা করেন।

নিরাপত্তা সমালোচনার জের ধরে জন টেলরের পদত্যাগ

চলতি শতকের শুরুতে বিট্রেনের পারমাণবিক কোম্পানি ব্রিটিশ নিউক্লিয়ার ফুয়েলস(বিএনএফএল) এর প্রধান পদত্যাগ করেন। তৎকালীন চিফ জন টেলর মূলত নিরাপত্তা কেলেঙ্কারি এবং সমালোচনার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেন। ৪বছর চাকরি করার পর ২০০০ সালে তিনি বিএনএফএল ত্যাগ করেন।      

 

;

খাঁচায় জন্ম, খাঁচায় মৃত্যু যে পাখির



রাজু আহম্মেদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাজরিগর শব্দটি শুনলেই মনে হবে কোন শিকারি কিংবা সাহসী কোন ব্যক্তি বা পশু। নামে ক্ষিপ্রতার আবেশ থাকলেও বাস্তবে শান্ত-সৌন্দর্যের এক ছোট পাখির নাম বাজরিগর।

বাঁকা ঠোঁট। হলুদ, নীল, সাদা বা মিশ্র রঙের গায়ের বরণ। কখনো রঙধনুর সব রঙ নিয়ে জন্ম নেয় পৃথিবীতে। যদিও গায়ের রঙ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতি আছে এই পাখির। তবে রঙ যাই হোক বুদ্ধিমত্তায় অতুলনীয় ছোট পাখিটি। সঙ্গীকে আপন করে নিয়ে আলতো ছোঁয়াতে কখনো ঠোঁটে ঠোঁট, কখনো দায়িত্ববান প্রিয়জন হয়ে সঙ্গীর মাথায় আলতো ছুঁয়ে ভালোবাসার জানান দেওয়ার অনন্য গুণ আছে এই পাখির।

এত সব গুণ আর খুব সহজে পোষ মানতে বাধ্য বাজরিগর পাখিপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে। শারীরিক কসরতে কারণে না চাইলেও মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পটু বাজরিগর পাখি। তাই তো বাজরিগরকে খাঁচায় বন্দি করে পোষ মানাতে মরিয়া থাকে পাখিপ্রেমীরা। মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক খামারও গড়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু দেশের পরিবেশ বাজরিগর পাখির জন্য অনুকূল না হওয়ায় খোলা আকাশে এই পাখি পালন সম্ভব নয়। তাই সময়ের সাথে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলগুলোর বনাঞ্চলের বাজরিগরের বর্তমান সারসংক্ষেপ খাঁচায় জন্ম, খাঁচায় মৃত্যু।

বাজরিগর পাখি পরিচিত একটি পোষা পাখি হলেও স্থান ও অঞ্চল ভেদে এর পরিচিতি আছে ভিন্ন নামে। আমেরিকায় বাজরিগর লিট্টল প্যারাকিট নামে পরিচিত। এছাড়াও এই পাখি বাজি বা শেল প্যারাকিট, ক্যানারি প্যারট, জেব্রা প্যারট, কমন পেট প্যারাকিট, আন্ডুলেটেড প্যারাকিট বাজরিগর এবং বদরী নামেও পরিচিত।

সাধারণত বন্য বাজরিগর লম্বায় প্রায় ৬.৫–৭ ইঞ্চি এবং খাঁচায় প্রায় ৭–৮ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এছাড়া বন্য বাজরিগর ২৫–৩৫ গ্রাম এবং খাঁচায় পালন করা বাজরিগর ৩৫–৪০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাজরিগরের নাকের ছিদ্রের চারপাশে নীল রঙের ঝিল্লি থাকে। এই ঝিল্লি কপাল ও ঠোঁটের মাঝে নাকের ছিদ্রসহ বিস্তৃত। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী বাজরিগরের নাকের ছিদ্রের চারপাশে বাদামি রঙের ঝিল্লি দিয়ে ঘেরা থাকে। এই ঝিল্লি কপাল ও ঠোঁটের মাঝে নাকের ছিদ্রসহ বিস্তৃত।

৮-৯ মাস বয়সে বাজরিগর প্রাপ্তবয়স্ক হয়। এক সাথে ৮-১৩টি ডিম দিতে সক্ষম বাজরিগর পাখি। আর ডিম দেওয়ার সময়ে বাজরিগর পাখির নির্জন জায়গারও প্রয়োজন হয়। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ১৮ দিন সময় লাগে। বাজরিগর পাখির গড় আয়ু ৪-৫ বছর, তবে খাঁচায় ১০-১২ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

ছোট প্রজাতির এ পাখিটি এর বুদ্ধিমত্তার জন্যও বেশ জনপ্রিয়। শ্রবণ ক্ষমতাও অনেক ভাল। খুব সহজে বড় শব্দ বা বাক্য মনে রাখতে পারে। বাজরিগর তার মালিকের থেকে কোন শব্দ শোনামাত্র এরা মনে রাখতে পারে এবং বার বার তা বলতে থাকে। তাই পাখিপ্রেমীদের আকর্ষণ ও বেশি বাজরিগরে।

বিদেশি পাখি হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায় বাজরিগর পাখি। এছাড়া রাজধানীর কাঁটাবন এলাকার ইউনিভার্সিটি মার্কেটে প্রতিদিনই মেলা বসে বাজরিগর পাখির। উপকূল অঞ্চল এই পাখির আদিস্থল হলেও খাঁচায় এক বা একাধিক সঙ্গী তাদের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। সে বিষয়টিকে মাথায় রেখে ইউনিভার্সিটি মার্কেটে খাঁচায় পাখির পরিবার সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পুরুষ ও নারী বাজরিগরের মিলন ঘটিয়ে বয়স ভেদে জুটি করার চেষ্টা করেছেন তারা। এক সাথে অনেক বাজরিগর পাখি থাকায় কিচিরমিচির আর সৌন্দর্য কাছে টানে পথচারীদের।

নিউ বার্ড প্যারাডাইসের ম্যানেজার মো. নূর হোসেন বলেন, সৌন্দর্য ও নমনীয় হওয়ায় পাখিপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে বাজরিগর। আমরা আগে বিদেশ থেকে আনলেও এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজরিগর পাখির খামার গড়ে উঠেছে । ৫০০-১০০০ টাকায় খাঁচাসহ পাখি মিলছে । আমরা পাখির খাবার সাথে পরিচর্যার সকল বিষয় জানিয়ে দেওয়ায় খুব সহজে পাখিটি পালন করতে পারে যে কেউ।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বাণিজ্যিকভাবে বাজরিগর পাখির খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ইমরান হোসেন। মাত্র ১৩ হাজার টাকা দিয়ে এ পাখির বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলে তিনি এখন স্বাবলম্বী। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৩ লাখ টাকার পাখি আছে। এবং বাজরিগর পাখি বিক্রি করেই এখন ইমরানের মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন বাজরিগর পাখি পালনে বেশ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন তিনি।

ইমরান হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমাদের দেশের যে পরিবেশ তাতে খোলা আকাশে বাজরিগর পাঁচ মিনিটও বেঁচে থাকতে পারবে না। অন্য পাখির আক্রমণ ও মাটিতে সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর ও ছোট পশুর আক্রমণ থেকে পালাতেও পারবে না। ফলে দেশে এ পাখি খাঁচা বা ছোট ঘরে পালনই উত্তম।

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে প্রবাদ থাকলেও প্রকৃতি ও পরিবেশ কখনো কখনো তার ব্যতিক্রম চায়। আর তাই তো সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে খাঁচায় জন্ম খাঁচায় মৃত্যু বাজরিগর পাখির এখন বড় পরিচয়।

;

ইতিহাসের পাতায় আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ভারতে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিকের বেশি মানুষের মৃত্যু

ভারতে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিকের বেশি মানুষের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

দিন বয়ে যায় দিনের মতো। তবে তার রেশ রয়ে যায় বহু বছর ধরে। পূর্ব প্রজন্মের কীর্তি অমলিন থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা থাকে।

আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া বিশেষ ঘটনা গুলোতে নজর বুলিয়ে দেখা যাক!

২০০২ সালে ট্রেনে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড

২০০২ সালে এইদিনে ভারতের গুজরাটে গোধরা স্টেশনের কাছাকাছি এক রেলগাড়িতে আগুন লেগে যায়। ট্রেনটি  দুর্ঘটনায় ৫৭ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী তীর্থযাত্রী মারা যান। কেউ কেউ ধারণা করেন, এই অগ্নিকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনায় কারণে হয়নি, বরং একদল মুসলিম ধর্মালম্বীর কারণে ঘটেছিল। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা থেকে আহমেদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা করা এই ট্রেনে আনুমানিক ৬ টা ৩০ মিনিটের দিকে আগুন লাগে।      

ভিক্টোরিয়ান হাউজে বোমা তৈরির জিনিস পাওয়া যায়
 

পিসি স্টিফেন টিবল নামের ২২ বছর বয়সী এক পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে পালিয়ে যায় লিয়াম কুইন। আইআরএ-এর বোমা হামলার সাথে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গিয়েছিল। পশ্চিম লন্ডনে ঘটা সেই হত্যাকাণ্ডের ২ ঘণ্টার মধ্যেই ভিক্টোরিয়ান নামেই বিশাল বাংলোতে তল্লাশি চালানো হয়। সেই বাড়িতে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন কমপক্ষে ৬ টি বোমা তৈরির জন্য সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছিল আজকের দিনে।

নাইজেরিয়ায় বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

আজকের তারিখে ১৯৯৯ সালে নাইজেরিয়ান নাগরিকরা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেন। ১৫ বছর ধরে সেনাবাহিনীর অধীনে থাকার পর আজকের দিনে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে সাধারণ জনগণ জড়ো হয়েছিলেন।    

সময়ের সাথে ক্যালেন্ডারের বছর পরিবর্তন হলেও বদলায় না ইতিহাসের গল্প। বছর ঘুরে ঘুরে তারিখের সাথেও সেই গল্পগুলোও সামনে আসে। 

;

প্যারিসের দেওয়ালে উৎকীর্ণ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’!



মায়াবতী মৃন্ময়ী, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্যারিসের দেওয়ালে উৎকীর্ণ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’

প্যারিসের দেওয়ালে উৎকীর্ণ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’

  • Font increase
  • Font Decrease

বসন্তের সাথে ভালোবাসার আছে এক মধুর সম্পর্ক, আর ভালোবাসার সাথে প্যারিসের। সে কারণে প্যারিসকে বলা হয় 'ভালোবাসার শহর', যার পরতে পরতে মিশে আছে সীমাহীন সৌন্দর্য! দিগন্তময় ভালোবাসা! অযুত হৃদয়ের অনুভূতি আর নিযুত স্বপ্ন! তিন শতাধিক ভাষায় লেখা- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ উৎকীর্ণ করে ভালোবাসার শহর প্যারিসের এক নান্দনিক প্রাচীর জানাচ্ছে ভালোবাসার অন্তহীন বার্তা।

প্রকাণ্ড দেওয়ালের ওপর হস্তাক্ষরে লেখা অজস্র বাক্য- 'আমি তোমাকে ভালবাসি'! অবশ্য সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় লেখা। বর্ণমালা কিংবা হরফের ব্যবহার করা হয়েছে, শৈল্পিক বিন্যাসে। অজানা অজস্র ভাষার ভিড়ে নজর কাড়ে একটি বাংলা বাক্যও- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’!


ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শিল্পের পাশাপাশি রোমান্সেরও কেন্দ্রবিন্দু। সেই রোমান্সের শহরের মন্টমার্ত্রে আবেসেস উদ্যানেই রয়েছে এই আশ্চর্য দেওয়াল, যা পরিচিত ‘লে মুর দেস জে টা’ইমে’ নামে; যার অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘দ্য ওয়াল অব আই লাভ ইউ’স’ (The Wall Of I Love You's) বা ‘ভালোবাসার প্রাচীর’।

মন্টমার্ত্রে আবেসেসের কেন্দ্রে অবস্থিত এই প্রাচীরে লিখিত রয়েছে কেবলমাত্র একটি বাক্যই লেখা- ‘আই লাভ ইউ’ বা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’! ৪০ বর্গ মিটারের এই দেওয়ালে সবমিলিয়ে এই বাক্যটিই লেখা তিন শতাধিক ভাষায়। এছাড়াও বহু উপভাষায় এই বাক্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা আছে। সব মিলিয়ে সেখানে ‘আই লাভ ইউ’ খোদাই করা হয়েছে সহস্রাধিকবার।


কেন এমন অদ্ভুত নামকরণ, সে কারণটিও বেশ চমকপ্রদ। একজন ফরাসি শিল্পী এর উদ্যোক্তা। নাম- ফ্রেডরিক ব্যারন। পরবর্তীতে এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আরেক ফরাসি শিল্পী ক্লেয়ার কিটো। প্রাথমিকভাবে উদ্যোক্তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কারণ, ফ্রেডরিক আদ্যোপান্ত আমুদে মানুষ ও সংগ্রাহক। একদিন স্কুলের দেওয়ালে বা টেবিলে পেন বা কম্পাস দিয়ে ভালোবাসার চিহ্ন খোদাই করার আদলে শুরু করেন ফ্রেডরিক। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় ‘আই লাভ ইউ’ বাক্যটি সংগ্রহ করা এক প্রকার নেশা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর কাছে।


প্রাথমিকভাবে পাড়া-প্রতিবেশীদের থেকেই বিভিন্ন ভাষায় লেখা ‘আই লাভ ইউ’ বাক্যটি সংগ্রহ করতেন ফ্রেডরিক। পরবর্তীতে প্যারিস নগরীতে ঘুরতে আসা ভিন দেশের পর্যটকদের দ্বারস্থ হন তিনি। শুধু বিভিন্ন ভাষাতে এই বাক্যটি বলতেই শেখেননি ফ্রেডরিক বরং নিজের নোটবুকে স্বহস্তে তা লিপিবদ্ধও করে রাখেন তিনি। এমনকী নিজের এই সংগ্রহকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে ফরাসি ক্যালিগ্রাফার ক্লেয়ার কিটোর কাছেও যান তিনি।


এভাবেই ক্লিটো জড়িয়ে পড়েছিলেন ‘ভালোবাসার প্রাচীর’-এর সঙ্গে। এই দেওয়াল তৈরির পরিকল্পনা মূলত তাঁরই। ফ্রেডরিকের এই কর্মযজ্ঞে মুগ্ধ হয়েই মন্টমার্ত্রে আবেসেসে এই দেওয়াল তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। এই কর্মকাণ্ডে শামিল হন আরো এক ফরাসি শিল্পী ড্যানিয়েল বেলোগ। প্যারিসের উদ্যানে গড়ে তোলা হয় ৪০ বর্গ মিটারের প্রকাণ্ড প্রাচীরটি। ২১ x ২৯.৭ সেন্টিমিটারের এনামেল লাভার টাইলস দিয়ে তৈরি এই প্রকাণ্ড প্রাচীর। উল্লেখ্য, ফ্রেডরিকের ‘আই লাভ ইউ’ সংগ্রহের নোটবুকের পাতার আকারকে মাথায় রেখেই নির্ধারিত করা হয়েছিল এই আয়তনটি।


তবে মজার বিষয় হলো, নিজে ক্যালিগ্রাফার হয়েও ভালোবাসার প্রাচীরে এ বাক্যটি লেখার সময় তিনি বিভিন্ন ভাষায় শুধু ক্যালিগ্রাফিই করেননি ক্লিটো বরং ঠিক যেভাবে নিজের ডায়েরিতে বিভিন্ন ভাষায় ‘আই লাভ ইউ’ লিপিবদ্ধ করেছিলেন ফ্রেডরিক, হুবহু সেটাই খোদাই করেন পাথরের দেওয়ালেও।

২০০০ সালে যখন এই প্রাচীর তৈরি হয়েছিল তখন সেখানে সবমিলিয়ে প্রদর্শিত হতো ২৫০টি ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা। বর্তমানে সেই সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে ৩০০-এর গণ্ডি। বলার অপেক্ষা থাকে না, আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অবলুপ্ত ভাষাগুলি তুলে আনার অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ফ্রেডরিক। তাঁর বিশ্বাস, একমাত্র ভালোবাসাই জুড়ে রাখতে পারে সমস্ত পৃথিবীকে। সরিয়ে রাখতে পারে বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা, হিংসাকে। তারই অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্যারিসের বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘ভালোবাসার প্রাচীর’।

উত্তর ফ্রান্সের 'ইল দ্য ফ্রস' অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে 'সেন' নদীর তীরে অবস্থিত প্যারিসের আয়তন ১০৫ বর্গ কিলোমিটার। ফ্রান্সের জনসংখ্যার প্রায় ১৮ শতাংশ (২২ লাখ) বাস করেন এই শহরে। প্যারিসকে কেন্দ্র করে অবিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে সুবৃহৎ প্যারিসের 'নগর এলাকা', যার জনসংখ্যা ১ কোটি। এই নগর এলাকা এবং প্যারিস কেন্দ্রিক উপ-শহরগুলো মিলে গঠিত হয় 'প্যারিস মেট্রোপলিটন' এলাকা, যার জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ।

প্যারিসের এই মেট্রোপলিটান এলাকা ইউরোপের মেট্রোপলিটান এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নগর এলাকাটি অবস্থিত, যা এটিকে বিশ্বনগরীর মর্যাদা দিয়েছে। 'ইল দ্য ফ্রস' বা প্যারিস অঞ্চল ফ্রান্সের অর্থনীতির কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। প্যারিসের 'লা দেফস' ইউরোপের বৃহত্তম পরিকল্পিত বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে ফ্রান্সের প্রধান প্রধান কোম্পানিগুলোর প্রায় অর্ধেক সংখ্যকের সদর দপ্তর অবস্থিত।

বিশ্বের বৃহত্তম ১০০টি কোম্পানির ১৫টির সদর দপ্তরের অবস্থান এই প্যারিসেই। এছাড়াও প্যারিসেই অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দপ্তর রয়েছে। এদের মধ্যে আছে: ইউনেস্কো, ওইসিডি, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সমসহ আরোও অনেক সংস্থা। ফ্রান্স একটি উন্নত দেশ, আর প্যারিস এই উন্নতির ওপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শহরটির অনেক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে: আইফেল টাওয়ার, শজেলিকে সড়ক, নোত্র দাম গির্জা, লেজাভালিদ, পন্তেও, পালে গার্নিয়ে, লুভ্যর জাদুঘর ইত্যাদি। এই সব এলাকা প্যারিসকে করে তুলেছে অত্যন্ত মোহনীয় ও ভালোবাসাময়!

প্যারিসে বৈশ্বিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মিশ্র পরিবেশ বিরাজমান, যে নগরীর প্রেমে সিক্ত বিশ্ববাসী। পর্যটকদের কাছে এই ভালোবাসার শহরটি সবচেয়ে প্রিয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পর্যটকদের গন্তব্যস্থল প্যারিস। প্রতি বছর প্রায় ৮৪ মিলিয়ন বিদেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন প্যারিসে। প্যারিসের প্রতীক 'আইফেল টাওয়ার' থেকে চোখ সরালেই চোখ পড়ে রূপকথার মোনালিসার ল্যুভর মিউজিয়ামের ওপর। ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন 'নটর ডেম ক্যাথেড্রাল'। নেপোলিয়নের বিজয়োল্লাস খচিত তোরণ 'আর্ক ডে ট্রেম্ফে'সহ আরো ঐতিহাসিক গুরুত্ববাহী এলাকা দেখতে পাওয়া যায় ভালোবাসার এই শহরেই।

প্যারিসকে ভালোবাসার শহর বলার আরেক অনন্য কারণ হলো: 'সিন নদীর উপর স্থাপিত ৩৭টি সেতুর মধ্যে পায়ে হাঁটার জন্য নির্ধারিত কিছু সুন্দর সেতুর রেলিংয়ে 'লাভ প্যাডলক' নামে বিশেষ তালা দেখা যায়। প্রেমিক বা প্রেমিকা তাদের একে অপরের নামের প্রথম বর্ণ খচিত করে এই তালাগুলো রেলিংয়ে ঝুলিয়ে চাবিটি সিন নদীতে ফেলে দেয়। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা প্রকাশের এই অনন্য রীতি প্যারিসকে ভালোবাসার শহর হিসেবে খ্যাতি দিয়েছে।

প্যারিসের আইকন আইফেল টাওয়ার তৈরি হয়েছে ১৮ হাজার ৩৮টি লোহার টুকরো দিয়ে। নবদম্পতিরা বিয়ের প্রথম যুগল ছবি তোলেন টাওয়ারের সামনে। গড়ে প্রতি ১২ মিনিটে একটি সিনেমার শুটিং চলতেই থাকে প্যারিসের এই স্থানটিকে ঘিরে। প্রতি বছর ৭ মিলিয়ন পর্যটক আসেন আইফেল টাওয়ার এলাকায়। পাশেই অবস্থিত ১৩০ মিটার লম্বা, ৪৮ মিটার চওড়া, ৩৫ মিটার উঁচু নটরডেম ক্যাথেড্রাল।

প্যারিসকে মিউজিয়ামের শহরও বলা হয়। প্যারিসে মোট ১৭৩টি মিউজিয়াম অবস্থিত। সবচেয়ে বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম, যেখানে সংরক্ষিত আছে, 'লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর কীর্তি','মোনালিসা'। আরো আছে বিশ্ববিখ্যাত অমর ৩ লাখ ৮০ হাজারটি কীর্তি। ল্যুভর প্রতিটি শিল্পকর্মে যদি ৫ সেকেন্ড করেও সময় দেওয়া হয়, তবে সব দেখতে একজন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন হবে ১০০ দিন।

ফ্যাশনেও প্যারিস বিশ্বসেরা। ১৮০০ সাল থেকেই সৌন্দর্যসচেতন মানুষের মিলনমেলা প্যারিস বা বিশ্বের 'ফ্যাশন রাজধানী'। পৃথিবীর সব নামিদামি পারফিউম আর ব্র্যান্ড প্যারিসেই লভ্য। বিশ্বখ্যাত রেস্টুরেন্টগুলোও প্যারিসেই অবস্থিত। ভূমি থেকে ৪০০ ফুট উপরে, আইফেল টাওয়ারে বসে প্যারিসের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আছে 'লা জুন ভার্ন' রেস্টুরেন্ট।

প্যারিস-ই সেই জায়গা, যেখানে রচিত হয়েছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিসূচক শান্তিচুক্তি, যা 'প্যারিস পিস কনফারেন্স' নামে পরিচিত। এই কনফারেন্সেই সই করেছিল পরাজিত জার্মানির জন্য অবমাননাকর চুক্তি, যাকে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ। আজকের জাতিসংঘ বা তৎকালীন 'লিগ অব নেশনস'-এর ধারণাও প্যারিস থেকে উদ্ভূত। শান্তি, সম্প্রীত ও ভালোবাসার দ্যোতনাময় অতীত ও বর্তমান এই প্যারিসকে ঘিরেই!

;