পরিযায়ী পাখিরা আসছে



আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওরে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক, ছবি: আ ন ম আমিনুর রহমান

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওরে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক, ছবি: আ ন ম আমিনুর রহমান

  • Font increase
  • Font Decrease

অক্টোবর মাস। সেপ্টেম্বরের ঘাম ঝড়ানো ও অস্বস্তিকর গরম শেষ হয়ে শীতের হালকা আমেজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করেছে। যদিও আগে ভোরবেলা ও সন্ধ্যায় আকাশে উড়ে যাওয়া অতিথি পাখির কলকাকলি শোনা যেত, এখন তা তেমন একটা শুনি না। তবে, শহর থেকে খানিকটা দূরে খাল-বিল-নদী-হাওরের কাছাকাছি গেলে ঠিকই ওদের কলকাকলি শোনা যায়। এমনকি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি খাগড়াছড়ি ও সাজেক গিয়ে বেশ কিছু অতিথি পাখির সঙ্গে দেখা হয়েছে। এই যে অতিথি পাখির কথা বললাম ওরা কী আসলেই আমাদের অতিথি? না, মোটেও না। সঠিকভাবে বললে ওরা হলো পরিযায়ী পাখি বা Migratory Bird। পরিযায়ী পাখির কথা বলার আগে পাখি সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেই।

বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯,৯৩০ প্রজাতি ও ২২,০০০ উপপ্রজাতির পাখির বাস। অনুমান করা হয়, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিগুলোর মোট সংখ্যা ২০-৪০ হাজার কোটি। পুরো ভারতে যেখানে ১,৩১১ প্রজাতির পাখির বাস, সেখানে বাংলাদেশে কমবেশি ৭১৮ প্রজাতির পাখি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, গত কয়েক শতকে ২০০ প্রজাতির পাখি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ১,২০০ প্রজাতির পাখি নানা কারণে হুমকির সম্মুখীন। এদেশের মোট পাখির মধ্যে কমবেশি ৩৪০ প্রজাতি স্থায়ীভাবে বসবাস করে, অর্থাৎ এরা সারাবছর এদেশে থাকে, ডিম পাড়ে ও ছানা তোলে। ওরাই হলো এদেশের আবাসিক পাখি। এছাড়াও প্রায় ৩৭০ প্রজাতির পাখি পরিযায়ী অর্থাৎ বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট সময় এদেশে আসে, বসবাস করে ও সময়মতো মূল আবাসে ফিরে যায়। এসব পাখি এদেশের মানুষের কাছে আগে, এমনকি এখনও, ‘অতিথি পাখি’ নামেই পরিচিত। এদেরই এক বিশাল অংশ এদেশে আসে শীতকালে যারা শীতের পরিযায়ী পাখি নামেও পরিচিত।

বাইক্কা বিলে পরিযায়ী কালো-লেজ জৌরালির ঝাঁক। ছবি- লেখক।

শীতপ্রধান দেশ থেকে আসা এসব পাখি মূল দেশে আবাসস্থল বসবাস অনুপযোগী হওয়া, খাদ্যের অভাব ও প্রচ- শীতের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই বাংলাদেশসহ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য দেশে পরিযায়ন বা Migration করে। এটা ওদের জীবন চক্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে বেড়ানোর কোনো ব্যাপার নেই, আছে জীবন বাঁচানোর তাগিদ। তাই এসব দেশকে ওদের দ্বিতীয় আবাস বা শীতের আবাস বলা যায়। তবে ওরা কিন্তু এসব দেশে বংশবিস্তার করে না। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রমও আছে, যেমন- কুড়া ঈগল শীতকালে এদেশে আসে বংশবৃদ্ধির জন্য।

যদিও পরিযায়ী পাখি বলতে মূলত শীতের পাখিগুলোকেই বোঝানো হয়, তবে কিছু পাখি গ্রীষ্মেও পরিযায়ন করে, যেমন- বিভিন্ন প্রজাতির কোকিল ও হালতি বা সুমচা পাখি। বিভিন্ন প্রজাতির কোকিল এদেশে মার্চ থেকে এপ্রিলে আসে, অন্য উপযুক্ত পাখির বাসায় ডিম পাড়ে, ছানা ফোটে এবং ছানাসহ সকলেই আবার আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে তাদের শীতকালীন আবাসে চলে যায়। অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রজাতির হালতি পাখি ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে এদেশে আসে, জুন থেকে জুলাইয়ে ডিম পাড়ে ও ছানা তোলে, ছানারা বড় হয় ও ৭-৮ মাস এদেশে থেকে অক্টোবরের মধ্যে মূল আবাসে চলে যায়। ওরা গ্রীষ্মের প্রজনন পরিযায়ী পাখি নামে পরিচিত।

সুন্দরবনের ডিমের চরের পাশে পরিযায়ী বড় গুলিন্দার ঝাঁক। ছবি- লেখক।

এছাড়াও বেশকিছু প্রজাতির পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি এদেশে অনিয়মিত। হয়তো এক বছর এল, এরপর আবার ৫ বা ১০ বছর পর এল, অন্যদের মতো প্রতি বছর এল না। এদেরকে তাই যাযাবর বা ভবঘুরে বা অনিয়মিত পরিযায়ী পাখি বলে। আর ওদের সংখ্যাও নেহাত কম না, এদেশে আসা সকল পরিযায়ী পাখির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ওরা। আবার কোনো কোনো প্রজাতির পাখি অন্য কোনো দেশে পরিযায়নের এক পর্যায়ে এদেশে স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে আসে, যেমন- বাদামি চটক, বন খঞ্জন ইত্যাদি। এরা পন্থ-পরিযায়ী পাখি নামে পরিচিত। মূলত হেমন্তে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে অন্য কোনো দেশে পরিযায়নের পথে অল্প সময়ের জন্য এদেশে ওরা যাত্রা বিরতি করে ও বসন্তে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে মূল দেশে ফিরে যাওয়ার সময়ও আরেকবার এদেশে যাত্রা বিরতি করে।

পাখির পরিযায়ন হলো একটি নিয়মিত মৌসুমী স্থানান্তর যা সচরাচর তার প্রজনন এলাকা ও শীতের আবাসের মধ্যে হয়ে থাকে। মেরু গাংচিল তার প্রজনন ক্ষেত্র উত্তর মেরু থেকে শীতের আবাস দক্ষিণ মেরুতে সবচেয়ে লম্বা পথ পাড়ি দেয়। ডোরা-লেজ জৌরালি এক উড়নে প্রায় ১১,০০০ কিলোমিটার উড়ন পথ পাড়ি দিয়ে আলাস্কা থেকে নিউজিল্যান্ডে পরিযায়ন করে।

কর্ণফুলী নদীতে পরিযায়ী ছোট গুলিন্দার ঝাঁক। ছবি- লেখক।

এবার আসা যাক কোন ধরনের পাখিরা এদেশে পরিযায়ন করে?

প্রধানত দুই ধরনের পাখিরা পরিযায়ণ করে। প্রথম ধরন হলো সৈকত, নদী, মোহনা ও জলাভূমির পাখি। কমবেশি ৮২ প্রজাতির পাখি এই ধরনের অর্ন্তভুক্ত; মোট সংখ্যার হিসেবে পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে ওদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এদেশে ওরা মূলত ছয়টি উড়নপথ আবাস্থল, যেমন- হাকালুকি, টাঙ্গুয়া ও হাইল হাওর (বাইক্কার বিলসহ), সোনাদিয়া দীপপুঞ্জ, নিঝুম দ্বীপ (দমার চরসহ) এবং গাঙ্গুইরার চর ছাড়াও রাজশাহীর পদ্মা নদী ও চরাঞ্চল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরইল বিল, যমুনার চর, মেঘনার মোহনা, কাপ্তাই লেক, সুন্দরবন, উপকুলীয় এলাকাব্যাপী বিস্তৃত। সৈকত ও জলচর পাখিগুলোর মধ্যে বেশকিছু মহাবিপন্ন পাখি রায়েছে। যেমন- চামচঠুঁটো চাপাখি, সোনাজঙ্ঘা, মানিকজোড়, খুন্তে বক, বড়ো ভূতিহাঁস, তিলা সবুজ চাপাখি ইত্যাদি।

দ্বিতীয় ধরন হলো বনজঙ্গল, বাগান, কুঞ্জবন ও ঝোপঝাড়ের পাখি। প্রায় ১৫৬ প্রজাতির পাখি এই ধরনের অর্ন্তভুক্ত; মোট প্রজাতির হিসেবে এই ধরনের পাখির প্রজাতি সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। আর ওদের আশ্রয়স্থল সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন মিশ্র চিরসবুজ বন, কেন্দ্রীয় ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন পত্রঝরা বা শালবন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় বাদা বন, গ্রামীণ বন, ঝোপঝাড়, ঘাসবন ও বাঁশবনজুড়ে বিস্তৃত।

সোনাদিয়া দ্বীপপুঞ্জের কালাদিয়া চরে পরিযায়ী সৈক পাখির খোঁজে লেখক।

এদেশের অনেককেই বলতে শুনেছি অতিথি পাখি তথা পরিযায়ী পাখিরা আমাদের খাদ্যে ভাগ বসায়, ওদের মলের মাধ্যমে আমাদের পরিবেশ নষ্ট করে, বিভিন্ন রোগ ছাড়ায় ইত্যাদি ইত্যাদি। কাজেই এগুলো শিকার করে খেয়ে ফেলাই ভালো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ কথা সত্য নয়। আসলে পরিযায়ী পাখি তো আমাদের কোনো অপকার করেই না বরং প্রকৃতি ও পরিবেশের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ওরা আমাদের প্রভূত উপকার করে। যেমন- কৃষির ক্ষতিকারক পোকমাকড় দমনে সাহায্য করে, ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখে, ওদের মল জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি করে ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং পরিবেশের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশ সূচক হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও বর্তমানে এদেশের মানুষের মধ্যে পাখি পর্যবেক্ষণের হিড়িক পড়ে গেছে, যা অত্যন্ত জনপ্রিয় বিনোদনমূলক বিষয়। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক পরিবেশ-পর্যটনের উন্নয়নে এটি সাহায্য করে যা বিলিয়ন ডলার শিল্প হয়ে উঠেছে। কাজেই ধীরে ধীরে এটি দেশের জন্য জৈব-অর্থনীতির সম্ভাব্য একটি উৎস হয়ে উঠছে। প্রতি বছর এদেশে যে সংখ্যক পরিযায়ী পাখি আসে সেগুলোর মধ্যে ৮টি মহাবিপন্ন, ৬টি বিপন্ন ও ৮টি সংকটাপন্ন প্রজাতি।

কাজেই এসব পাখিদের অতিথি না ভেবে আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। এ কথা মনে রাখা উচিত যে, এসব পরিযায়ী পাখি শিকার করে ওদের সংখ্যা কমিয়ে দিলে কোনো কোনো মহাবিপন্ন পাখি, এমনকি এদেশ তথা গোটা বিশ্ব থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আর তা নিশচয়ই আমাদের জন্য ভালো হবে না। কাজেই নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই পরিযায়ী পাখি রক্ষায় সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।

E-mail: [email protected], [email protected]

 

 

 

   

ইতিহাসের পাতায় আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
সুইডেনের প্রেসিডেন্ট ওলোফ পালমেকে গুলি করে হত্যা করা হয়

সুইডেনের প্রেসিডেন্ট ওলোফ পালমেকে গুলি করে হত্যা করা হয়

  • Font increase
  • Font Decrease

বছর ঘুরে বার বার ফিরে আসে একই তারিখ। প্রতিবছর সেই তিথিতে মানুষ স্মরণ করে পূর্ববর্তী দিনগুলো। সেই সাথেই ঘুরে ঘুরে আসে প্রতিদিনের ঐতিহাসিক ঘটনাও।  আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪। জেনে নেওয়া যাক, আজকের দিনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা। 

প্রয়াত সুইডেন প্রেসিডেন্ট ওলোফ পালমে

১৯৮৬ সালে সুইডেনের প্রধান মন্ত্রী ওলোফ পালমের উপর গুলি বর্ষণ করানো হয়, যে ঘটনায় তিনি  মৃত্যুবরণ করেন এবং তার স্ত্রী লিসবেথ পালমে আহত হন। সেন্ট্রাল স্টকহোমের রাস্তায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্ত্রীর সাথে রাতে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় তার পেটে পরপর দু’টো এবং তার স্ত্রীকে পেছন থেকে গুলি করা হয়। ওলোফ দেহরক্ষী রাখতে পছন্দ করতেন না। ট্যাক্সি ড্রইভারের এলার্ম বাজানো এবং দু’জন তরুণীর সাহায্য করার সত্ত্বেও তাকে বাঁচানা যায়নি।

রেল দুর্ঘটনায় ১০ জনের অধিক মৃত্যু

আজকের তারিখে ২০০১ সালে উত্তর ইয়র্কশায়ারের ইস্ট কোস্ট মেইনলাইনে সেলবি রেলদুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন। ১৩ জনের বেশি মানুষ মৃত্যুঝুঁকিতে ছিল এবং ৭০ জনের বেশি মানুষ আহত হন। একটি গাড়ির সাথে সংঘর্ষে গতিশীল রেলটি স্থানচ্যুত হয়।

কুয়েতের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি

কুয়েতের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের পর ইরান অবশেষে জাতিসংঘের ১২ টি প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয়। সেইজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট  জর্জ বুশ ওয়াশিংটনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে কুয়েতকে মুক্ত ঘোষণা করেন।

নিরাপত্তা সমালোচনার জের ধরে জন টেলরের পদত্যাগ

চলতি শতকের শুরুতে বিট্রেনের পারমাণবিক কোম্পানি ব্রিটিশ নিউক্লিয়ার ফুয়েলস(বিএনএফএল) এর প্রধান পদত্যাগ করেন। তৎকালীন চিফ জন টেলর মূলত নিরাপত্তা কেলেঙ্কারি এবং সমালোচনার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেন। ৪বছর চাকরি করার পর ২০০০ সালে তিনি বিএনএফএল ত্যাগ করেন।      

 

;

খাঁচায় জন্ম, খাঁচায় মৃত্যু যে পাখির



রাজু আহম্মেদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা ২৪.কম

ছবি: বার্তা ২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাজরিগর শব্দটি শুনলেই মনে হবে কোন শিকারি কিংবা সাহসী কোন ব্যক্তি বা পশু। নামে ক্ষিপ্রতার আবেশ থাকলেও বাস্তবে শান্ত-সৌন্দর্যের এক ছোট পাখির নাম বাজরিগর।

বাঁকা ঠোঁট। হলুদ, নীল, সাদা বা মিশ্র রঙের গায়ের বরণ। কখনো রঙধনুর সব রঙ নিয়ে জন্ম নেয় পৃথিবীতে। যদিও গায়ের রঙ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতি আছে এই পাখির। তবে রঙ যাই হোক বুদ্ধিমত্তায় অতুলনীয় ছোট পাখিটি। সঙ্গীকে আপন করে নিয়ে আলতো ছোঁয়াতে কখনো ঠোঁটে ঠোঁট, কখনো দায়িত্ববান প্রিয়জন হয়ে সঙ্গীর মাথায় আলতো ছুঁয়ে ভালোবাসার জানান দেওয়ার অনন্য গুণ আছে এই পাখির।

এত সব গুণ আর খুব সহজে পোষ মানতে বাধ্য বাজরিগর পাখিপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে থাকে। শারীরিক কসরতে কারণে না চাইলেও মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পটু বাজরিগর পাখি। তাই তো বাজরিগরকে খাঁচায় বন্দি করে পোষ মানাতে মরিয়া থাকে পাখিপ্রেমীরা। মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে বাণিজ্যিক খামারও গড়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু দেশের পরিবেশ বাজরিগর পাখির জন্য অনুকূল না হওয়ায় খোলা আকাশে এই পাখি পালন সম্ভব নয়। তাই সময়ের সাথে অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলগুলোর বনাঞ্চলের বাজরিগরের বর্তমান সারসংক্ষেপ খাঁচায় জন্ম, খাঁচায় মৃত্যু।

বাজরিগর পাখি পরিচিত একটি পোষা পাখি হলেও স্থান ও অঞ্চল ভেদে এর পরিচিতি আছে ভিন্ন নামে। আমেরিকায় বাজরিগর লিট্টল প্যারাকিট নামে পরিচিত। এছাড়াও এই পাখি বাজি বা শেল প্যারাকিট, ক্যানারি প্যারট, জেব্রা প্যারট, কমন পেট প্যারাকিট, আন্ডুলেটেড প্যারাকিট বাজরিগর এবং বদরী নামেও পরিচিত।

সাধারণত বন্য বাজরিগর লম্বায় প্রায় ৬.৫–৭ ইঞ্চি এবং খাঁচায় প্রায় ৭–৮ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এছাড়া বন্য বাজরিগর ২৫–৩৫ গ্রাম এবং খাঁচায় পালন করা বাজরিগর ৩৫–৪০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাজরিগরের নাকের ছিদ্রের চারপাশে নীল রঙের ঝিল্লি থাকে। এই ঝিল্লি কপাল ও ঠোঁটের মাঝে নাকের ছিদ্রসহ বিস্তৃত। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী বাজরিগরের নাকের ছিদ্রের চারপাশে বাদামি রঙের ঝিল্লি দিয়ে ঘেরা থাকে। এই ঝিল্লি কপাল ও ঠোঁটের মাঝে নাকের ছিদ্রসহ বিস্তৃত।

৮-৯ মাস বয়সে বাজরিগর প্রাপ্তবয়স্ক হয়। এক সাথে ৮-১৩টি ডিম দিতে সক্ষম বাজরিগর পাখি। আর ডিম দেওয়ার সময়ে বাজরিগর পাখির নির্জন জায়গারও প্রয়োজন হয়। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে ১৮ দিন সময় লাগে। বাজরিগর পাখির গড় আয়ু ৪-৫ বছর, তবে খাঁচায় ১০-১২ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

ছোট প্রজাতির এ পাখিটি এর বুদ্ধিমত্তার জন্যও বেশ জনপ্রিয়। শ্রবণ ক্ষমতাও অনেক ভাল। খুব সহজে বড় শব্দ বা বাক্য মনে রাখতে পারে। বাজরিগর তার মালিকের থেকে কোন শব্দ শোনামাত্র এরা মনে রাখতে পারে এবং বার বার তা বলতে থাকে। তাই পাখিপ্রেমীদের আকর্ষণ ও বেশি বাজরিগরে।

বিদেশি পাখি হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায় বাজরিগর পাখি। এছাড়া রাজধানীর কাঁটাবন এলাকার ইউনিভার্সিটি মার্কেটে প্রতিদিনই মেলা বসে বাজরিগর পাখির। উপকূল অঞ্চল এই পাখির আদিস্থল হলেও খাঁচায় এক বা একাধিক সঙ্গী তাদের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। সে বিষয়টিকে মাথায় রেখে ইউনিভার্সিটি মার্কেটে খাঁচায় পাখির পরিবার সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পুরুষ ও নারী বাজরিগরের মিলন ঘটিয়ে বয়স ভেদে জুটি করার চেষ্টা করেছেন তারা। এক সাথে অনেক বাজরিগর পাখি থাকায় কিচিরমিচির আর সৌন্দর্য কাছে টানে পথচারীদের।

নিউ বার্ড প্যারাডাইসের ম্যানেজার মো. নূর হোসেন বলেন, সৌন্দর্য ও নমনীয় হওয়ায় পাখিপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে বাজরিগর। আমরা আগে বিদেশ থেকে আনলেও এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজরিগর পাখির খামার গড়ে উঠেছে । ৫০০-১০০০ টাকায় খাঁচাসহ পাখি মিলছে । আমরা পাখির খাবার সাথে পরিচর্যার সকল বিষয় জানিয়ে দেওয়ায় খুব সহজে পাখিটি পালন করতে পারে যে কেউ।

এদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বাণিজ্যিকভাবে বাজরিগর পাখির খামার গড়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ইমরান হোসেন। মাত্র ১৩ হাজার টাকা দিয়ে এ পাখির বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলে তিনি এখন স্বাবলম্বী। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৩ লাখ টাকার পাখি আছে। এবং বাজরিগর পাখি বিক্রি করেই এখন ইমরানের মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন বাজরিগর পাখি পালনে বেশ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন তিনি।

ইমরান হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমাদের দেশের যে পরিবেশ তাতে খোলা আকাশে বাজরিগর পাঁচ মিনিটও বেঁচে থাকতে পারবে না। অন্য পাখির আক্রমণ ও মাটিতে সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর ও ছোট পশুর আক্রমণ থেকে পালাতেও পারবে না। ফলে দেশে এ পাখি খাঁচা বা ছোট ঘরে পালনই উত্তম।

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে প্রবাদ থাকলেও প্রকৃতি ও পরিবেশ কখনো কখনো তার ব্যতিক্রম চায়। আর তাই তো সৌন্দর্যকে বাঁচিয়ে রাখতে খাঁচায় জন্ম খাঁচায় মৃত্যু বাজরিগর পাখির এখন বড় পরিচয়।

;

ইতিহাসের পাতায় আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ভারতে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিকের বেশি মানুষের মৃত্যু

ভারতে অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিকের বেশি মানুষের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

দিন বয়ে যায় দিনের মতো। তবে তার রেশ রয়ে যায় বহু বছর ধরে। পূর্ব প্রজন্মের কীর্তি অমলিন থেকে যায় ইতিহাসের পাতায়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা থাকে।

আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪। বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া বিশেষ ঘটনা গুলোতে নজর বুলিয়ে দেখা যাক!

২০০২ সালে ট্রেনে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড

২০০২ সালে এইদিনে ভারতের গুজরাটে গোধরা স্টেশনের কাছাকাছি এক রেলগাড়িতে আগুন লেগে যায়। ট্রেনটি  দুর্ঘটনায় ৫৭ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী তীর্থযাত্রী মারা যান। কেউ কেউ ধারণা করেন, এই অগ্নিকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনায় কারণে হয়নি, বরং একদল মুসলিম ধর্মালম্বীর কারণে ঘটেছিল। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা থেকে আহমেদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা করা এই ট্রেনে আনুমানিক ৬ টা ৩০ মিনিটের দিকে আগুন লাগে।      

ভিক্টোরিয়ান হাউজে বোমা তৈরির জিনিস পাওয়া যায়
 

পিসি স্টিফেন টিবল নামের ২২ বছর বয়সী এক পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে পালিয়ে যায় লিয়াম কুইন। আইআরএ-এর বোমা হামলার সাথে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গিয়েছিল। পশ্চিম লন্ডনে ঘটা সেই হত্যাকাণ্ডের ২ ঘণ্টার মধ্যেই ভিক্টোরিয়ান নামেই বিশাল বাংলোতে তল্লাশি চালানো হয়। সেই বাড়িতে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন কমপক্ষে ৬ টি বোমা তৈরির জন্য সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছিল আজকের দিনে।

নাইজেরিয়ায় বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

আজকের তারিখে ১৯৯৯ সালে নাইজেরিয়ান নাগরিকরা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেন। ১৫ বছর ধরে সেনাবাহিনীর অধীনে থাকার পর আজকের দিনে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে সাধারণ জনগণ জড়ো হয়েছিলেন।    

সময়ের সাথে ক্যালেন্ডারের বছর পরিবর্তন হলেও বদলায় না ইতিহাসের গল্প। বছর ঘুরে ঘুরে তারিখের সাথেও সেই গল্পগুলোও সামনে আসে। 

;

প্যারিসের দেওয়ালে উৎকীর্ণ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’!



মায়াবতী মৃন্ময়ী, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্যারিসের দেওয়ালে উৎকীর্ণ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’

প্যারিসের দেওয়ালে উৎকীর্ণ ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’

  • Font increase
  • Font Decrease

বসন্তের সাথে ভালোবাসার আছে এক মধুর সম্পর্ক, আর ভালোবাসার সাথে প্যারিসের। সে কারণে প্যারিসকে বলা হয় 'ভালোবাসার শহর', যার পরতে পরতে মিশে আছে সীমাহীন সৌন্দর্য! দিগন্তময় ভালোবাসা! অযুত হৃদয়ের অনুভূতি আর নিযুত স্বপ্ন! তিন শতাধিক ভাষায় লেখা- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ উৎকীর্ণ করে ভালোবাসার শহর প্যারিসের এক নান্দনিক প্রাচীর জানাচ্ছে ভালোবাসার অন্তহীন বার্তা।

প্রকাণ্ড দেওয়ালের ওপর হস্তাক্ষরে লেখা অজস্র বাক্য- 'আমি তোমাকে ভালবাসি'! অবশ্য সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় লেখা। বর্ণমালা কিংবা হরফের ব্যবহার করা হয়েছে, শৈল্পিক বিন্যাসে। অজানা অজস্র ভাষার ভিড়ে নজর কাড়ে একটি বাংলা বাক্যও- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’!


ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস শিল্পের পাশাপাশি রোমান্সেরও কেন্দ্রবিন্দু। সেই রোমান্সের শহরের মন্টমার্ত্রে আবেসেস উদ্যানেই রয়েছে এই আশ্চর্য দেওয়াল, যা পরিচিত ‘লে মুর দেস জে টা’ইমে’ নামে; যার অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘দ্য ওয়াল অব আই লাভ ইউ’স’ (The Wall Of I Love You's) বা ‘ভালোবাসার প্রাচীর’।

মন্টমার্ত্রে আবেসেসের কেন্দ্রে অবস্থিত এই প্রাচীরে লিখিত রয়েছে কেবলমাত্র একটি বাক্যই লেখা- ‘আই লাভ ইউ’ বা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’! ৪০ বর্গ মিটারের এই দেওয়ালে সবমিলিয়ে এই বাক্যটিই লেখা তিন শতাধিক ভাষায়। এছাড়াও বহু উপভাষায় এই বাক্যের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা আছে। সব মিলিয়ে সেখানে ‘আই লাভ ইউ’ খোদাই করা হয়েছে সহস্রাধিকবার।


কেন এমন অদ্ভুত নামকরণ, সে কারণটিও বেশ চমকপ্রদ। একজন ফরাসি শিল্পী এর উদ্যোক্তা। নাম- ফ্রেডরিক ব্যারন। পরবর্তীতে এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আরেক ফরাসি শিল্পী ক্লেয়ার কিটো। প্রাথমিকভাবে উদ্যোক্তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কারণ, ফ্রেডরিক আদ্যোপান্ত আমুদে মানুষ ও সংগ্রাহক। একদিন স্কুলের দেওয়ালে বা টেবিলে পেন বা কম্পাস দিয়ে ভালোবাসার চিহ্ন খোদাই করার আদলে শুরু করেন ফ্রেডরিক। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় ‘আই লাভ ইউ’ বাক্যটি সংগ্রহ করা এক প্রকার নেশা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর কাছে।


প্রাথমিকভাবে পাড়া-প্রতিবেশীদের থেকেই বিভিন্ন ভাষায় লেখা ‘আই লাভ ইউ’ বাক্যটি সংগ্রহ করতেন ফ্রেডরিক। পরবর্তীতে প্যারিস নগরীতে ঘুরতে আসা ভিন দেশের পর্যটকদের দ্বারস্থ হন তিনি। শুধু বিভিন্ন ভাষাতে এই বাক্যটি বলতেই শেখেননি ফ্রেডরিক বরং নিজের নোটবুকে স্বহস্তে তা লিপিবদ্ধও করে রাখেন তিনি। এমনকী নিজের এই সংগ্রহকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যেতে ফরাসি ক্যালিগ্রাফার ক্লেয়ার কিটোর কাছেও যান তিনি।


এভাবেই ক্লিটো জড়িয়ে পড়েছিলেন ‘ভালোবাসার প্রাচীর’-এর সঙ্গে। এই দেওয়াল তৈরির পরিকল্পনা মূলত তাঁরই। ফ্রেডরিকের এই কর্মযজ্ঞে মুগ্ধ হয়েই মন্টমার্ত্রে আবেসেসে এই দেওয়াল তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। এই কর্মকাণ্ডে শামিল হন আরো এক ফরাসি শিল্পী ড্যানিয়েল বেলোগ। প্যারিসের উদ্যানে গড়ে তোলা হয় ৪০ বর্গ মিটারের প্রকাণ্ড প্রাচীরটি। ২১ x ২৯.৭ সেন্টিমিটারের এনামেল লাভার টাইলস দিয়ে তৈরি এই প্রকাণ্ড প্রাচীর। উল্লেখ্য, ফ্রেডরিকের ‘আই লাভ ইউ’ সংগ্রহের নোটবুকের পাতার আকারকে মাথায় রেখেই নির্ধারিত করা হয়েছিল এই আয়তনটি।


তবে মজার বিষয় হলো, নিজে ক্যালিগ্রাফার হয়েও ভালোবাসার প্রাচীরে এ বাক্যটি লেখার সময় তিনি বিভিন্ন ভাষায় শুধু ক্যালিগ্রাফিই করেননি ক্লিটো বরং ঠিক যেভাবে নিজের ডায়েরিতে বিভিন্ন ভাষায় ‘আই লাভ ইউ’ লিপিবদ্ধ করেছিলেন ফ্রেডরিক, হুবহু সেটাই খোদাই করেন পাথরের দেওয়ালেও।

২০০০ সালে যখন এই প্রাচীর তৈরি হয়েছিল তখন সেখানে সবমিলিয়ে প্রদর্শিত হতো ২৫০টি ভাষায় লেখা ভালোবাসার বার্তা। বর্তমানে সেই সংখ্যাটা ছাড়িয়েছে ৩০০-এর গণ্ডি। বলার অপেক্ষা থাকে না, আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অবলুপ্ত ভাষাগুলি তুলে আনার অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ফ্রেডরিক। তাঁর বিশ্বাস, একমাত্র ভালোবাসাই জুড়ে রাখতে পারে সমস্ত পৃথিবীকে। সরিয়ে রাখতে পারে বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা, হিংসাকে। তারই অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্যারিসের বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘ভালোবাসার প্রাচীর’।

উত্তর ফ্রান্সের 'ইল দ্য ফ্রস' অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রে 'সেন' নদীর তীরে অবস্থিত প্যারিসের আয়তন ১০৫ বর্গ কিলোমিটার। ফ্রান্সের জনসংখ্যার প্রায় ১৮ শতাংশ (২২ লাখ) বাস করেন এই শহরে। প্যারিসকে কেন্দ্র করে অবিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে সুবৃহৎ প্যারিসের 'নগর এলাকা', যার জনসংখ্যা ১ কোটি। এই নগর এলাকা এবং প্যারিস কেন্দ্রিক উপ-শহরগুলো মিলে গঠিত হয় 'প্যারিস মেট্রোপলিটন' এলাকা, যার জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ।

প্যারিসের এই মেট্রোপলিটান এলাকা ইউরোপের মেট্রোপলিটান এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই নগর এলাকাটি অবস্থিত, যা এটিকে বিশ্বনগরীর মর্যাদা দিয়েছে। 'ইল দ্য ফ্রস' বা প্যারিস অঞ্চল ফ্রান্সের অর্থনীতির কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। প্যারিসের 'লা দেফস' ইউরোপের বৃহত্তম পরিকল্পিত বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে ফ্রান্সের প্রধান প্রধান কোম্পানিগুলোর প্রায় অর্ধেক সংখ্যকের সদর দপ্তর অবস্থিত।

বিশ্বের বৃহত্তম ১০০টি কোম্পানির ১৫টির সদর দপ্তরের অবস্থান এই প্যারিসেই। এছাড়াও প্যারিসেই অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দপ্তর রয়েছে। এদের মধ্যে আছে: ইউনেস্কো, ওইসিডি, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সমসহ আরোও অনেক সংস্থা। ফ্রান্স একটি উন্নত দেশ, আর প্যারিস এই উন্নতির ওপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শহরটির অনেক উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে: আইফেল টাওয়ার, শজেলিকে সড়ক, নোত্র দাম গির্জা, লেজাভালিদ, পন্তেও, পালে গার্নিয়ে, লুভ্যর জাদুঘর ইত্যাদি। এই সব এলাকা প্যারিসকে করে তুলেছে অত্যন্ত মোহনীয় ও ভালোবাসাময়!

প্যারিসে বৈশ্বিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মিশ্র পরিবেশ বিরাজমান, যে নগরীর প্রেমে সিক্ত বিশ্ববাসী। পর্যটকদের কাছে এই ভালোবাসার শহরটি সবচেয়ে প্রিয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পর্যটকদের গন্তব্যস্থল প্যারিস। প্রতি বছর প্রায় ৮৪ মিলিয়ন বিদেশি পর্যটক বেড়াতে আসেন প্যারিসে। প্যারিসের প্রতীক 'আইফেল টাওয়ার' থেকে চোখ সরালেই চোখ পড়ে রূপকথার মোনালিসার ল্যুভর মিউজিয়ামের ওপর। ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন 'নটর ডেম ক্যাথেড্রাল'। নেপোলিয়নের বিজয়োল্লাস খচিত তোরণ 'আর্ক ডে ট্রেম্ফে'সহ আরো ঐতিহাসিক গুরুত্ববাহী এলাকা দেখতে পাওয়া যায় ভালোবাসার এই শহরেই।

প্যারিসকে ভালোবাসার শহর বলার আরেক অনন্য কারণ হলো: 'সিন নদীর উপর স্থাপিত ৩৭টি সেতুর মধ্যে পায়ে হাঁটার জন্য নির্ধারিত কিছু সুন্দর সেতুর রেলিংয়ে 'লাভ প্যাডলক' নামে বিশেষ তালা দেখা যায়। প্রেমিক বা প্রেমিকা তাদের একে অপরের নামের প্রথম বর্ণ খচিত করে এই তালাগুলো রেলিংয়ে ঝুলিয়ে চাবিটি সিন নদীতে ফেলে দেয়। প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা প্রকাশের এই অনন্য রীতি প্যারিসকে ভালোবাসার শহর হিসেবে খ্যাতি দিয়েছে।

প্যারিসের আইকন আইফেল টাওয়ার তৈরি হয়েছে ১৮ হাজার ৩৮টি লোহার টুকরো দিয়ে। নবদম্পতিরা বিয়ের প্রথম যুগল ছবি তোলেন টাওয়ারের সামনে। গড়ে প্রতি ১২ মিনিটে একটি সিনেমার শুটিং চলতেই থাকে প্যারিসের এই স্থানটিকে ঘিরে। প্রতি বছর ৭ মিলিয়ন পর্যটক আসেন আইফেল টাওয়ার এলাকায়। পাশেই অবস্থিত ১৩০ মিটার লম্বা, ৪৮ মিটার চওড়া, ৩৫ মিটার উঁচু নটরডেম ক্যাথেড্রাল।

প্যারিসকে মিউজিয়ামের শহরও বলা হয়। প্যারিসে মোট ১৭৩টি মিউজিয়াম অবস্থিত। সবচেয়ে বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম, যেখানে সংরক্ষিত আছে, 'লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর কীর্তি','মোনালিসা'। আরো আছে বিশ্ববিখ্যাত অমর ৩ লাখ ৮০ হাজারটি কীর্তি। ল্যুভর প্রতিটি শিল্পকর্মে যদি ৫ সেকেন্ড করেও সময় দেওয়া হয়, তবে সব দেখতে একজন সাধারণ মানুষের প্রয়োজন হবে ১০০ দিন।

ফ্যাশনেও প্যারিস বিশ্বসেরা। ১৮০০ সাল থেকেই সৌন্দর্যসচেতন মানুষের মিলনমেলা প্যারিস বা বিশ্বের 'ফ্যাশন রাজধানী'। পৃথিবীর সব নামিদামি পারফিউম আর ব্র্যান্ড প্যারিসেই লভ্য। বিশ্বখ্যাত রেস্টুরেন্টগুলোও প্যারিসেই অবস্থিত। ভূমি থেকে ৪০০ ফুট উপরে, আইফেল টাওয়ারে বসে প্যারিসের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য আছে 'লা জুন ভার্ন' রেস্টুরেন্ট।

প্যারিস-ই সেই জায়গা, যেখানে রচিত হয়েছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিসূচক শান্তিচুক্তি, যা 'প্যারিস পিস কনফারেন্স' নামে পরিচিত। এই কনফারেন্সেই সই করেছিল পরাজিত জার্মানির জন্য অবমাননাকর চুক্তি, যাকে বলা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ। আজকের জাতিসংঘ বা তৎকালীন 'লিগ অব নেশনস'-এর ধারণাও প্যারিস থেকে উদ্ভূত। শান্তি, সম্প্রীত ও ভালোবাসার দ্যোতনাময় অতীত ও বর্তমান এই প্যারিসকে ঘিরেই!

;