কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৬)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

অই তো যায়, টু আ পেনি

[পূর্ব প্রকাশের পর] আমাদের পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, আমরা উদ্বিগ্ন পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে চিঠি পেতে শুরু করি। তার সব ক’টার সুরই এক। “তোমরা নিশ্চয়ই দেশ ছাড়তে পেরে খুব খুশি! তা তোমাদেরকে কবে নাগাদ আমরা আমেরিকায় আশা করতে পারি?”

কিন্তু আমাদের কারুরই আমেরিকার দিকে যাত্রা করার বাসনা ছিল না। আমরা এমনিতেই পূর্ব পাকিস্তান ছাড়তে চাইনি, আর আমাদের মধ্যে যাদের পুনঃপ্রবেশের ভিসা ছিল না, তারা আর কোনোদিন ফিরতে না পারার আতঙ্কে ছিল। আমরা জানি প্রভুই আমাদেরকে বাইরে নিয়ে এসেছেন, যদিও আমরা বুঝিনি এর পেছনে তাঁর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আমরা শুধু এটুকু জানি, আমরা সবাই ফিরতে চাই, এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

যুদ্ধবিদীর্ণ দেশটিতে আমরা আমাদের বাড়িঘর, জিনিসপত্র, বন্ধুবান্ধব এবং আমাদের হৃদয়খানি ফেলে এসেছিলাম।

আমরা মেয়েরা যখন কেনাকাটায় আর বাচ্চাদের ফুর্তিতে রাখার প্রচেষ্টায় আনন্দেই ছিলাম, পুরুষেরা তখন আমাদেরকে ব্যাংককের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত ছিল। পরিস্থিতির জটিলতা ছিল বহুমাত্রিক। তিনটি পরিবারের কিশোরবয়সী বাচ্চারা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মারিতে। আমরা ব্যাংককে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই, আমাদের দলের যারা পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল তাদের কাছ থেকে এরকম চিঠি পেতে শুরু করি যে, কিছু বাচ্চা খুবই আতঙ্কিত হয়ে আছে এবং তারা তাদের বাবামাকে পাশে চাইছিল। যাদের কোনো বাচ্চা ছিল না সেখানে, তাঁরা একগাদা পয়সা খরচ করে সেখানে গিয়ে বেকার বসে থেকে, পূর্ব পাকিস্তানে ফেরার অনুমতি পাবার প্রত্যাশায় দিন গোনার সম্ভাবনায় খুব একটা প্রীত ছিলেন না।

যদিও আমাদের পাকিস্তানে ফিরে যাবার একমাত্র সম্ভাবনা, যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী দেশত্যাগীদের একসঙ্গে দলবেঁধে থাকার মধ্যেই নিহিত ছিল। আমাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু তারা আমাদের দেশ ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করেছিল, সেহেতু নিশ্চয়ই তারাই আমাদেরকে আবার ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে এটা তত সহজ ছিল না। আমেরিকার সরকার যতটা করার করছিল, কিন্তু পাকিস্তান সরকার আমাদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। আমরা তাদের সেই মিথ্যে বুদ্বুদখানি ফাটিয়ে দিয়েছিলাম, “পূর্ব পাকিস্তানে সব স্বাভাবিক রয়েছে।”  যদি সব স্বাভাবিকই থাকত, তাহলে মার্কিন সরকার কেন সবাইকে বিশেষভাবে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল?

এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় এই তথ্যটুকুও যে, আমাদের অর্ধেকেরও বেশির ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। এমনকি স্বাভাবিক অবস্থাতেও আমাদের ফিরতে অসুবিধা হবার কথা।

শহরে আমাদের ঘোরাঘুরির সময় আমরা প্রায়ই পাকিস্তান দূতাবাসের পাশ দিয়ে যেতাম। প্রতিবারই তার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মেল বিল্‌স প্রাণভরে একবার বলে উঠতেন, “জয় বাংলা”। তাঁর স্ত্রী মার্গি, এটা শত্রুর কানে গিয়ে পৌঁছানর ভয়ে এবং তা আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে ভেবে তার স্বামীকে তা বলা থেকে বিরত রাখতে চাইছিল।

“ঠিক আছে,” তিনি রাজি হন। “আমি চুপ থাকব, ভেতরে কিন্তু ঠিকই এটা উচ্চারণ করব।”

জে ওয়াল্‌শ ও মেল বিল্‌স মার্কিন দূতাবাস আর পাকিস্তান দূতাবাসের মধ্যে ছোটাছুটি করছিলেন কেবল। পরেরটাতে প্রভু আমাদের পক্ষে ছিলেন। যার দায়িত্ব ছিল এই অনুমতিপত্র প্রস্তুতের, তিনি ঢাকার মানুষ ছিলেন বলে। জে একটু হালকা বোধ করায় তাঁর সঙ্গে বাংলায় কথাবার্তা শুরু করেন। বাঙালি অফিসারের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তিনি গলা নিচু করে গোপনে তাঁর কাছে দেশের অবস্থা জানতে চান। এরপর থেকে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন আমাদের সাহায্য করতে, যদিও তাঁর শ্রেষ্ঠটাও আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। চূড়ান্ত অনুমোদন আসবে ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তর থেকে।

আমেরিকান পর্যটকেরা থাইল্যান্ডে মাত্র পনেরোদিন থাকতে পারত। তারপর তাদেরকে দেশ ছেড়ে আবার নতুনভাবে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হতো। আমাদের পনেরোদিন অতিবাহিত হবার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিই আমরা পেনাং দ্বীপে একটা ছোটখাটো ছুটি কাটাব। আমরা যখন বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বাসে উঠছিলাম তখন সেখানকার এক কর্মচারী জে-কে বার্তা পাঠান। এই বার্তা আমাদের আনন্দময় ভ্রমণের অনুকূল ছিল না। মার্কিন সরকার এইমাত্র তাদের ইসলামাবাদের পাল্টাপক্ষের কাছ থেকে একটা টেলেক্স পেয়েছেন এই নির্দেশসহ যে, আমরা যেন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রবেশের চেষ্টাও না করি। সেই অংশ থেকেও মিশনারিদের বার করে দেওয়া হচ্ছিল।

তখন প্রভু ছাড়া আর কোনো গতি ছিল না আমাদের। আমাদেরকে অ্যাসেম্বলি অভ গড মিশনারিদের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলো, যারা বলতেন, “যখন তোমাদের মনে হয় যে, প্রভু ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার নেই, তার অর্থ হচ্ছে খাবার ছাড়া আর কিছু খাওয়ার নেই তোমাদের।”

আমরা ঈশ্বরের কাছেই গিয়েছিলাম। আমাদের ব্যক্তিগত এবং দলীয় প্রর্থনাগুলোতে আগের মতো আর বলছিলাম না, “প্রভু আমাদেরকে ফিরিয়ে আনুন,” বরং অনুরোধ করছিলাম, “প্রভু আমাদেরকে বলে দিন আপনি কী চান, আমরা তা-ই করব।”

জে যাদের সঙ্গে ছিলেন তারা আমাদের যাওয়ার কয়েকদিন আগে ব্যাংকক ফিরে গেল। তিনি সবে ফিরেছেন, অমনি পাকিস্তানি দূতাবাস তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে বার্তাটা দেখালেন, “এই মানুষগুলোকে পাকিস্তানে ঢোকার ব্যাপারে যা করার করুন।”

জে গোটা ব্যাপারটা দ্রুতই আন্দাজ করে ফেললেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মনে আসলে একটা সাধারণ ভ্রমণ অনুমতির বিষয়টাই ছিল, যার মাধ্যমে বাবা-মায়েরা তাঁদের বাচ্চাদেরকে তুলে নিয়ে আবার বেরিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু তিনি কর্মকর্তাকে দিয়ে এর এমন এক ব্যাখ্যা করালেন, যার অর্থ দাঁড়ায়, “এদের সবাইকে চার বছরের জন্য বহুপ্রবেশ ভিসা দেওয়া হোক।”

আবারও ঈশ্বর আমাদের এই বিশ্বাসের প্রতিদান দিলেন তাঁর উপহারের ঝুলি খুলে। আমাদের প্রত্যেককে, যাদের স্রেফ একটি ভিসাই দরকার ছিল, এমনকি যাদের ভিসার মেয়াদ ফুরোয়ওনি, তাদেরকে সুদ্ধ সব ভিসার সেরা ভিসাটি দেওয়া হলো। সেই চার বছরের বহুপ্রবেশ ভিসাটির অর্থ হলো, আমরা ভিসা নবায়ন না করেই আগামী চার বছর যতবার ইচ্ছা আসাযাওয়া করতে পারব। আমাদের কোনো কোনো নবাগত মিশনারি জীবনেও এটা পাননি, কেননা পাকিস্তানে আসার আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁরা এটা নিয়ে আসতে পারেননি।

জে আমাদেরকে পেনাংয়ে ফোন করে সুখবরটা দেন এবং আমরা এই পুরস্কার গ্রহণের উদ্দেশ্যে ফিরতি বিমান ধরি সঙ্গে সঙ্গেই। মে মাসের ১৭ তারিখ জে আমাকে, লিনকে আর বেকিকে নিয়ে যান আমাদের পাসপোর্টে ভিসার সিল মারাতে। ফেরার পথে আমেরিকান দূতাবাসে দাঁড়ালে তখনকার কর্তব্য কর্মকর্তা জে-র দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই লোক একেবারে চাঁদের দিকে তির ছোড়েন, তাই না?” তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলেন, “আপনার মনে হয় ওপরে কেউ আছেন আপনার হয়ে কাজ করার জন্য।”

আমাদের ভিসা ও টিকিটের জন্য অপেক্ষা করার সপ্তাহগুলোতে আমরা পত্রিকার খবর গিলছিলাম এবং যে-কেউ পাকিস্তানের ওপর কোনো খবর পড়তে থাকলে অভদ্রের মতো তার কাঁধের ওপর হুমড়ি খেযে পড়ছিলাম। নিউজ উইকের ২৬শে এপ্রিল সংখ্যার এই ধরনের খবরের বিশেষ গুরুত্ব ছিল আমাদের কাছে।

… নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত একটি গৃহযুদ্ধে, ঝটিকা আক্রমণগুলো পরিচিত ছিল তাদের বর্বরতার জন্য। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে, পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি বন্দিদের জোরপূর্বক ট্রাকে তুলে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে বাধ্য করে—যেটা ছিল তাদের প্রিয় শ্লোগান। এই শ্লোগান শুনে লুকিয়ে থাকা বাঙালিরা বেরিয়ে এলে, তাদেরকে নির্বিচারে মেশিনগানের গুলি করে মারে। সিলেট ও কুমিল্লা শহরে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যেরা শত শত বাঙালি কৃষকদের লাশ ফেলে রাখে যত্রতত্র শকুন ও কুকুরের খাদ্য হবার জন্য।

আমরা খবর পাই প্রতি দিন প্রায় এক লাখের মতো বাঙালি শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করছে। সেইসব হাজার হাজার শরণার্থীর বহন করে নিয়ে যাওয়া হাজারো ট্রাজেডির গল্প শুনি আমরা: বাচ্চাদের সামনে বাবা-মাকে হত্যা করা; বাচ্চাদের ওপরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সৈন্যদের বেয়নেটের ডগায় গেঁথে নেওয়া; কমবয়েসি মেয়েদের জোর করে যৌনদাসী করে রাখা; পুরুষদের চোখ উপড়ে ফেলে পিটিয়ে মারা ইত্যাদি।

এইসব নির্মমতার কথা জেনে বরং আমাদের ফেরার ইচ্ছা আরও প্রবল হয়, যাতে করে আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি। তবে সেদিনের সেই অসহ্য গরমে ব্যাংককের রাত্রিতে প্রার্থনারত অনেকেই অনুৎসাহিত ছিল এতে। কিন্তু আমাদের তো পর্বত-চূড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন, আমাদের হাতে ভিসা এসে গেছে।

আমাদের দলের অর্ধেক সিদ্ধান্ত নেন মাঝখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় ছোট্ট বিরতি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যাবার। মালুমঘাট ছাড়ার পর চৌত্রিশজনের আমাদের এই দলটি গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে এতটা সময় একসঙ্গে ছিলাম যে, এমনকি ছোট্ট বারো বছর বয়সী ফিলিপ ওয়াল্‌শও, প্রথম দলের সদস্য তার পরিবারের হাত ধরে অনিচ্ছুকভাবে বলে, “আমি সত্যি মনে করি না আমাদের দল ভাঙা উচিত।”

আমরা যারা ব্যাংককে ছিলাম তারা এই সংবাদ শুনে উল্লাস করি যে, ঢাকার যাত্রাবিরতিতে ডাঃ ওল্‌সেন তাঁর নিজের পরিবার, ওয়াল্‌শ ও কেচামের পরিবারকে অভ্যর্থনা জানান এবং পূর্ব পাকিস্তানে তাঁরা কোথায় থাকবেন তার একটা ছকও আঁটেন। তাঁরা সবাই ফিরে গেছেন, আর আমরা এখানে এই গরম, গুমোট ব্যাংককে আটকে আছি।

পাকিস্তানি দূতাবাস প্রতিজ্ঞা করে যে, ঢাকা প্রত্যাবর্তনের অনুমতি আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের খবর দেবে। কিন্তু অনেক কটা দিন কেটে যায়, কোনো খবর আসে না। ২৯শে মে শুক্রবার মেল বিল্‌স দূতাবাসে আশ্রয় নেন, কিন্তু দুপুরের পরেই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। মুসলিম দেশগুলোতে শুক্রবার দুপুরেই অফিস বন্ধ হয়ে যায়, আর কোনো সরকারই শনিবার ও রবিবার খোলা থাকে না। সেখানে কোনো সম্ভাবনাই ছিল না যে, আমরা রবিবার বিকালের বিমান ধরতে পারব।

আমরা আসলে ৩১শে মে রবিবার রাতে ইভাঞ্জেলিকাল চার্চ অভ ব্যাংককে শুরু হতে যাওয়া বিলি গ্রাহামের ছবি টু আ পেনি দেখার ওপর একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিলাম, কেননা ততদিনে আমাদের কাছে কেনাকাটা করা, চিড়িয়াখানায় যাওয়া এমনকি সুইমিং পুলে সাঁতার কাটাও আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছিল।

প্রার্থনার সময় অনেকেই স্বীকার করেছিলেন যে, আমাদের বিশ্বাস একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছিল। অন্যেরা ইতোমধ্যেই ফিরে গেছেন, তাহলে আমরা নই কেন? ঈশ্বর কি তাহলে চাইছিলেন না যে, আমরা ফিরে যাই? এতগুলো সপ্তাহ এখানে বেকার বসে থাকার পর আমাদেরকে কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রেই ফিরে যেতে হবে? আমরা কি তবে মিশনের পরিচালনা পর্ষদের এই পরামর্শকেই মেনে নেব যে, আমাদের মধ্যে যারা স্বাস্থ্যকর্মী তাদের ফিলিপিন্সে গিয়ে স্বাস্থ্য-কর্মসূচিতে কাজ করা উচিত? লিন সে-রাতে বিশেষ কিছু বলেনি। সে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছিল আগেই: ঈশ্বর আমাদেরকে ফিরিয়ে নেবেন, এই রবিবারেই!

ব্যাংককের ইভাঞ্জেলিকাল চার্চ প্রথমে তাদের প্রার্থনাসভার আয়োজন করে, তারপর সংক্ষিপ্ত বিরতি দিয়ে, রবিবারের স্কুলের ক্লাসগুলো চালায়। সকালের অধিবেশনের উপসংহারে পাদ্রি একটা বার্তা পড়ে শোনান, “এখানে যদি ডাঃ কুক বলে কেউ থাকেন, তাহলে তাঁকে ফোনে ডাকা হচ্ছে।” আমাদের ড. ডিকুক ভাবেন নামটা যথেষ্ট কাছাকাছি, তাই তিনি দৌড়ে গিয়ে সবচেয়ে কাছের যে-ফোন সেটা ধরেন। আমরা তখন রবিবারের স্কুলের উদ্বোধনী প্রার্থনাসংগীত গাইতে শুরু করে দিয়েছি, যখন তিনি আকর্ণবিস্তৃত হাসি নিয়ে ফিরে আসেন। বাকি জমায়েতকে একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করে আমরা দ্রুত হেঁটে, বলা চলে প্রায় উড়ে, চলে যাই লবিতে।

বেচারা জো ডিকুক গল্পটা একটু রসিয়ে বলারও সময় পেলেন না। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স এতগুলো যাত্রী হারাতে চায় না বলে সরকারি কর্তৃপক্ষের ওপর বিশেষ চাপ প্রয়োগ করে। দেশে প্রবেশের অনুমতি এসে পৌঁছেছে পিআইএ অফিসে। আমরা কি বিকাল ৫টার মধ্যে তৈরী হতে পারব? পারব আমরা? অর্ধেক মহিলা ততক্ষণে লিফটে ঢুকে গেছেন প্রায়, হোটেল ত্যাগ করার জন্য, ইভাঞ্জেলিকাল চার্চ তাদের সভাটি হোটেলেই করেছিল। আমি আরো এক তলা সিঁড়ি ভেঙে বাচ্চাদেরকে ক্লাস থেকে বার করে আনি এবং জুনিয়র ক্লাসের ছাত্রদেরকে অন্যদের বিরক্ত না করে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত করি। তারা আমার সঙ্গে হলঘরে এসে দেখা করে।

“ব্যাপার কী?” দশ বছর বয়সী ড্যানি জিজ্ঞাসা করে।“

আমরা আজ বিকালে বাড়ি যাচ্ছি, ড্যানি।” আমি উত্তর করি।

“বাড়ি? মানে আমরা পাকিস্তান ফিরে যাচ্ছি? কী মজা! আমাকে ক্লাসে ফিরে গিয়ে সবাইকে তা বলতে হবে। তারা সবাই প্রার্থনা করছিল যেন আমরা ফিরে যেতে পারি।”

আমাদের প্রার্থনার এমন ইতিবাচক উত্তরের অভিঘাত আমাদের মধ্যে দৃশ্যমান হয়, আমরা যখন অতগুলি সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত নেমে আসি।

“অই যায়, টু আ পেনি!” আমরা ট্যাক্সিতে ওঠার সময় ড্যানি বলে ওঠে। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১১)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১০)

 

 

   

একগুচ্ছ কবিতা



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পরাবাস্তবতা-জাদুবাস্তবতা
আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব অথচ বাস্তবের অধিক
অসম্ভব তবু প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার শঙ্কা জাগায়
তারই নাম পরাবাস্তবতা
অন্যভাবে বলতে জাদুবাস্তবতা:
যেমন, এই যে আশ্চর্য সকাল
এর কতtটুকু তুমি দেখো
কতটুকু আমি
আর কতটুকু দিগন্তের ওপাশে অদেখার!
জলের উপর একলা মুখ ঝুঁকিয়ে থাকা
শেষবিকেলের মর্মবেদনা জানে
শিরীষ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ভাসমান পাতা
তুমি আর আমি কতটুকু জানি!
অর্থবোধ্য সীমানা পেরিয়ে
আমাদের যাতায়াত নেই
এমন কোনো ঠিকানায়
যার দিক নেই, চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই!

সম্পর্ক

প্রিজমের টুকরোয় ছিটকে পড়া আলোয়
অধ্যয়ন করছি সম্পর্ক
সম্পর্কের উত্থান-পতন
বাঁক ও শিহরণ
লগ-ইন বা লগ-আউটে
নিত্য জন্মাচ্ছে নতুন সম্পর্ক
সম্পর্কের বিভিন্ন রং
লিখে লিখে মুছে দিচ্ছে ফেসবুক
সন্তরণশীল সম্পর্ক খেলা করছে
মানুষের জীবনের বহুদূরের ভার্চুয়ালে
সম্পর্ক হয়ে গেছে স্বপ্নময় জগতে
মনকে জাগ্রত রাখার কৌশল

জোনাকি

দূরমনস্ক দার্শনিকতায়
রাতের পথে যারা আসে
তারা যাবে দিগন্তের দিকে
আত্মমগ্ন পথিক-পায়ে।
এইসব পদাতিকের অনেকেই আর ফিরবে না
ফিরে আসবে অন্য কেউ
তার চিন্তা ও গমনের ট্র্যাপিজ ছুঁয়ে
অন্য চেহারায়, অন্য নামে ও অবয়বে।
তারপর
গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে সরল রেখায়
আলোর মশালে জ্বলে উঠবে
অনুভবের অসংখ্য জোনাকি।

নিঃসঙ্গতা

নিঃসঙ্গতা শীতের কুয়াশার মতো প্রগাঢ়
তমসাচারী মৃত পাখির নিঃশব্দ কুহুতান-স্মৃতি
নিহত নদীর শ্যাওলাজড়ানো জলকণা
দাবানল-দগ্ধ বনমর্মর:
মায়ায় মুখ আড়াল করে অনন্য বিমূর্ত বিবরে
নিঃসঙ্গতা কল্পলোকে রঙ মাখে
নীলাভ স্বপ্নের দ্যুতিতে
অস্তিত্বে, অনুভবে, মগ্নচৈতন্যে:
জীবনের স্টেজ অ্যান্ড স্ক্রিনে!

আর্কিওপটেরিক্স

পনেরো কোটি বছরের পাথরশয্যা ছেড়ে তিনি
প্রত্নজীববিদের টেবিলে চলে এলেন:
পক্ষী জীবাশ্ম দেখে প্রশ্ন শুরু হলো পৃথিবীময়
‘ডানার হলেই তাকে পাখি বলতে হবে?‘
তাহলে ‘ফ্লাইং ডাইনোসরস‘ কি?
তাদের শরীরে রয়েছে ডানা, কারো কারো দুই জোড়া!
পাখি, একলা পাখি, ভাবের পাখি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান
বিজ্ঞানী থেকে বিপ্লবী কবিগণ
আর্কিওপটেরিক্স কি পাখির আদি-জননী?

;

কবি অসীম সাহা আর নেই



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি অসীম সাহা মারা গেছেন। ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

মঙ্গলবার (১৮ জুন) বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বিষযটি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

তিনি জানান, মাঝখানে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অসীম সাহা মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। অল্প ক’দিন আগেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আজ শুনি তিনি আর নেই। বর্তমানে অসীম সাহাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাকে দেখতে সেখানেই যাচ্ছি।

অসীম সাহার শেষকৃত্য সম্পর্কে তাঁর ছোট ছেলে অর্ঘ্য সাহা বলেন, তাঁর বাবা মরদেহ দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কবি অসীম সাহা। চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষণ্নতায় ভুগছেন কবি। এছাড়া পারকিনসন (হাত কাঁপা রোগ), কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়াবেটিস রোগেও আক্রান্ত হন।

১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নানারবাড়ি নেত্রকোণা জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন কবি অসীম সাহা। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগে। সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

;

অনন্তকাল দহন



আকিব শিকদার
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ঝিঝির মতো ফিসফিসিয়ে বলছি কথা আমরা দুজন
নিজেকে এই গোপন রাখা আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

বাঁশের শুকনো পাতার মতো ঘুরছি কেবল চরকী ভীষণ
আমাদের এই ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়ানো আর কতোকাল?
:অনন্তকাল।

তপ্ত-খরায় নামবে কবে প্রথম বাদল, ভিজবে কানন
তোমার জন্য প্রতিক্ষীত থাকবো আমি আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

তোমার হাসির বিজলীরেখা ঝলসে দিলো আমার ভুবন
এই যে আগুন দহন দেবে আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

;

১২৫তম জন্মবর্ষ

মুক্তির অন্বেষী নজরুল



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নজরুল জীবনের ‘আর্তি ও বেদনা’র সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেকালের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নজরুলের আবির্ভাবকালে মুসলমানদের সামাজিক আবহাওয়া এমনই জীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ ছিল যে, কোনো শিল্পীরই সেই আবহাওয়াতে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসার সম্ভব ছিল না। জীবনের প্রথমদিকে তাই কামাল পাশা প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত বীর মুসলিমেরা নজরুল-মানসকে আচ্ছন্ন করেছিল।

কিন্তু অচিরেই তিনি বাঙালির জাগরণের পথিকৃতে রূপান্তরিত হন। বাংলার জাগরণ গ্রন্থে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রণীজন কাজী আবদুল ওদুদ জানাচ্ছেন, ‘নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং যারা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দিলে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’

চরম দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও জীবনের জয়গান গেয়েছেন কবি নজরুল, ছবি- সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে বৃহত্তর পরিসর ও অর্থে গ্রহণ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই (১৯২৭) সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে সাময়িকী ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যে কারণে এদের ‘শিখা গোষ্ঠী‘ নামেও অভিহিত করা হয়।

শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা তথা শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ। ‘বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুলকে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বুদ্ধির মুক্তি, মানব মুক্তি, সমাজের মুক্তি তথা মানুষের শির উচ্চতর করার বাণী উৎকীর্ণ করেছিলেন নজরুল। গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের গানে মুখরিত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম। মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না তাঁর কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। জগতের বঞ্চিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত, স্বাধীনতাহীন বন্দিদের জাগ্রত করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন নজরুল। মানবতার জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন-'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্ …’।

মানুষ আর মানুষের হৃদয়কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। আবার তাঁর কলম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান- ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত জগতের বঞ্চিত ভাগ্যহত’।

শুধু যে কবিতাই লিখেছেন তা তো নয়। তিনি এমন অনেক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। নজরুলের দেশপ্রীতি, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে।

সাম্য ও মানুষের কবি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, ছবি- সংগৃহীত

‘সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাত–ধর্ম ছিল হৃদয়ের প্রেমধর্ম; যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। শুধু লেখনীর দ্বারা নয়, নিজের জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে ঐক্যের আশায় আশাবাদী ছিলেন নজরুল।

তাঁর ব্যক্তিজীবনে এই ভাবনার প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর বিবাহের ক্ষেত্রে, পুত্রদের ক্ষেত্রেও। তাঁর পরিবারের সব সদস্য এবং আপামর বাঙালি এই সত্য নিত্য উপলব্ধি করেন।

১২৫তম জন্মবর্ষে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্য মুক্তির অন্বেষী। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক তথা সুবিশাল সাহিত্যকর্ম বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, নানা কারণে তাৎপর্যবাহী।

কেননা, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনে জর্জরিত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার, হামলা, নির্যাতন।

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ এখন অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন।

এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ-তুল্য কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, বিদ্রোহ, মুক্তি ও মানবতার মহান সাধক।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বৃটিশ-বাংলার সর্বপশ্চিম প্রান্তের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম আর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।'

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানাজন নানামত দিতে থাকেন। এ অবস্থায় স্থাননির্ধারণী সভায় রফিকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন নজরুল তাঁর এক গনে লিখেছেন-

‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’॥

সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর কবর হোক। তাঁর এ প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো। পরবর্তীকালে এ কবর পাকা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ছবি- সংগৃহীত

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবনযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির একটি 'বিদ্রোহী', যা স্পর্শ করেছে রচনার শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক ‘প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক ‘সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ‘ধূমকেতু’তে (২২ আগস্ট, ১৯২২) ছাপা হয়।

বলা বাহুল্য, অসম্ভব পাঠকপ্রিয়তার কারণেই কবিতাটিকে বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ও রচয়িতা কবি নজরুল ‘চির উন্নত শির’ রূপে বিরাজমান।

পুরো বাংলা ভাষা বলয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শাণিত প্রতিবাদ তুলনাহীন। বিদ্রোহীর শতবর্ষকে ‘জাগরণের শতবর্ষ’ রূপে উদযাপন করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী পরিমণ্ডলে আর ১২৫তম জন্মবর্ষে মুক্তির অন্বেষী নজরুলকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি!

 ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;