কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

মালুমঘাট থেকে পলায়ন

[পূর্ব প্রকাশের পর] বাইশে এপ্রিল, বৃহস্পতিবার
আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য আমাদের রেঙ্গুন থেকে অনুমতি নেওয়ার দরকার ছিল। এটা প্রায় ঈশ্বরপ্রদত্ত যে, বিল্‌সরা এর আগেই সেই অনুমতি প্রার্থনা করেছিল, ফলে ব্যবস্থা সব করাই ছিল। সবাইকেই অভিবাসন ও শুল্কবিষয়ক ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। সেগুলো শেষ হবার পর, পুরো চৌত্রিশজনের দল দুটো ট্রাকে চড়ে ষোলো মাইল দূরে বুথিয়াডংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেই কাঠের আসনগুলো সত্যি খুব শক্ত ছিল!

আমরা চমৎকার একটি দেশের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। বিশেষভাবে আকর্ষণীয় ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় খনন করা সুড়ঙ্গগুলো। বুথিয়াডংয়ে আমরা পিনাট বাটার অথবা চিজ হুইজ স্যান্ডউইচ খেয়েছিলাম, ট্রাকের পেছনটাকে টেবিল ও কাউন্টার বানিয়ে নিয়ে। খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই আমাদেরকে একটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের প্রহরানৌকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

ট্রাকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় সেমি অটোমেটিক রাইফেল-দোলানো দুই সেনাসদস্য। তারা আমাদের সঙ্গে সেই নদী-প্রহরার নৌকা পর্যন্ত যায়। নৌকাটার একটা ওপরতলা ছিল যেখানে মালগুলো রাখা হয়, আর ছিল একটা ছোট্ট গরম নিচতলা। আমরা সবাই নিচতলার দিকে অগ্রসর হই, স্যান্ডুইচ ও কলা খেতে খেতে। পরে মালগুলোকে একটু পুনর্বিন্যাস করাতেই দেখা গেল সবাই ওপরতলাতেই বসতে পারছিল।

নৌকাযাত্রায় আট ঘণ্টা লাগার কথা ছিল। তার মানে রাত নটার দিকে আমাদের আকিয়াব পৌঁছানোর কথা। আমাদের সঙ্গে ছিল সশস্ত্র প্রহরী দুইজন, ও নৌকার মাঝিমাল্লা ছাড়া আরো দুজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, ও একজন নারী, যার সরকারি পরিচয় আমরা কোনোদিনই উদ্ঘাটন করতে পারিনি। এরা ছিল আমাদেরকে গন্তব্য পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সঙ্গী।

নদীভ্রমণের পথটুকু খুব দৃশ্যময় ছিল, অনেকটা বাংলাদেশের স্টিমারযাত্রার মতোই। রাতের খাবার হিসাবে আমরা ঠান্ডা ডিন্টি মুর বিফ স্টু খাই। কেউ কেউ এটা খেয়েছিল এর আগের ব্যবহৃত ভিয়েনা সসেজের টিন থেকে, আর বাকিরা সরাসরি স্টুর টিন থেকেই। নৌকার মাঝিরা পানি গরম করে দিয়েছিল চা ও কফির জন্য।

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ আমরা নদীতীরবর্তী একটা গ্রামে থামি। আমরা নৌকা থেকে বেরুতে পারিনি, তবে সম্ভবত সারা গ্রামের লোকেরাই এসেছিল আমাদের দেখতে। রাত নয়টায় আমরা আবার যাত্রা করি। প্রথমে জে বলেছিলেন যে, নৌকা থেকে নামার পর আরো দশ ঘণ্টার ট্রাকযাত্রা রয়েছে সামনে, তবে পরে এসে জানান, সেই রাত্রে আমরা নৌকাত্যাগ করতে পারব না। ততক্ষণে আমরা নিজেরাও সেটা জেনে গেছি। আমরা ক্ষণে ক্ষণেই নদীর চরে আটকে যাচ্ছিলাম এবং আমাদের নৌকো প্রায় ডাঙ্গার ওপর উঠে যাচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে মাঝিরা নদীর সঠিক গতিপথ খুঁজে পাচ্ছিল না কিছুতেই। তারা নৌকার মুখ ঘুরিয়ে দেয় এবং উত্তাল জলে গিয়ে পড়ে আচমকা।

বাচ্চারা অভিযোগ করতে শুরু করলে এলিয়ানোর দার্শনিকভাবে বলেন, “আমরা সবাই একই নৌকাই ভাই! আর এটা সবসময়ই সত্য যখন আমরা কোনো জায়গা থেকে পালাতে যাই।” ঘুমানোর জন্য, নিচতলার বাসিন্দারা একটা প্লাস্টিকের পরাত পেতে দিয়ে তার ওপর বাচ্চাদের শুইয়ে দেয়। নারীরা চারপাশের বেঞ্চে বসে থাকে এবং একেকজন পালা করে ঘুমাতে পারে। নিচের ওরা ওপরের একমাত্র বাথরুমটিতে যেতে পারছিল না, তাই তারা একটি বিস্কিটের টিন ব্যবহার করে, তার চারপাশে লুঙ্গি দিয়ে পর্দা বানিয়ে নেয়। এর মধ্যে ওপরতলায় সুটকেসগুলোকে যথাসম্ভব সমতল করে বিছিয়ে রাখা হয়। পুরুষেরা একটু শরীর লম্বা করতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠান্ডায় প্রায় জমে যাবার উপক্রম হয় তাদের। বেকি কেচাম মারির জন্য রাখা শীতের সব সামগ্রী খুঁজে বার করে এবং সেসব দিয়ে তাদের আবৃত করার চেষ্টা চালায়। একজন পুরুষ কাঠের তাকের ওপর ও আরেকজন দুটো টায়ারের ওপর শোয়। জে ও মার্ক একেবারে বাইরে, দুলতে থাকা ডেকের ওপর রাত কাটান। জেন গলিন একটু আরাম করার অবকাশ পেয়েছিলেন মাত্র, আর তখনি তাঁর স্বামী ভুল করে গায়ের ওপর পা তুলে দেন!

২৩শে এপ্রিল, শুক্রবার
ভোরবেলায় মাঝিরা নোঙর টানাটানি শুরু করে। শিশু মিকাইল গলিন একটা উজ্জ্বল হাসি নিয়ে জেগে ওঠে এবং সূর্যোদয়টাও ছিল রাজকীয়। মাঝিরা একটা চরের কোনায় নৌকার খুঁটি বাঁধতে চেষ্টা করে, কিন্তু তেমন সুবিধা করতে পারে না। জে, মেল এবং জো একটা বিশাল বাঁশ খুঁজে পান এবং সেটা দিয়েই নৌকাটাকে বাঁধতে চেষ্টা করেন। আমরা আকিয়াব যাওয়ার নদীপথের খুব একটা দূরে ছিলাম না, কিন্তু তখন আমরা জানতে পারি যে, ইঞ্জিন বিকল। ব্যাটারির কী সমস্যা হচ্ছিল আর হালটাও ঠিক কাজ করছিল না। মাঝিরা আবারও আমাদেরকে নিয়ে চরের অন্যপাশের একটা বাড়ির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেখান থেকে ফোনের মাধ্যমে সাহায্যের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তার পরিবর্তে আমরা একেবারে বিচ্ছিন্ন আরেকটা চরে নৌকোশুদ্ধ আটকা পড়ে যাই। আমরা নিকটবর্তী সাম্পানগুলোকে ডাকতে চেষ্টা করি, এমনকি হর্নও বাজাই, কিন্তু কেউ শুনতে পায় না আমাদের।

আমাদের সত্যিকার কোনো খাবার অবশিষ্ট ছিল না আর, আমরা তাই কে-রেশনের টিন খুলি এবং সবাইকে মল্ট ট্যাবলেট ও পেমিক্যান খাইয়ে দিই। এতে কাজ হয়—কারো আর ক্ষুধা লাগে না।

মাঝিরা একটা পাটাতন নামিয়ে দেয়, আর তার ওপর দিয়ে আমাদের দেহরক্ষীরা নেমে যায় সাম্পান ও সাহায্যের খোঁজে। আমরা দুপুরের খাবার নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। আমরা মাঝিদেরকে আমাদের জন্য ভাত রান্না করে দিতে বলি, কিন্তু তারা জানায়, তাদের চাল নেই। আমরা তাদেরকে বলি, গ্রামের বাজারে গিয়ে চাল কিনে আনতে, কিন্তু তারা সেটা করতেও অস্বীকৃত হয়। শেষ পর্যন্ত জে অন্য তীর থেকে একটা সাম্পান ডেকে এনে সেটা দিয়ে গ্রামের ভেতর চলে যান।

আমাদের চরে আটকানো নৌকাটা বেজায় দুলছিল, এবং পানিকে খুব লোভনীয় মনে হচ্ছিল, তাই বাচ্চারা এবং আরো কেউ কেউ সাঁতার কাটতে নেমে গেল পানিতে। মালুমঘাটের পরে সেটাই ছিল বাচ্চাদের প্রথম স্নান। আমরা সৈকতের ওপর খেলাধুলা করে একটা সুন্দর বিকাল কাটাই।

লম্বা ঘুম দিয়ে উঠে অভিবাসন অফিসারেরা জে’র খোঁজ করেন। তাঁরা যখন শুনলেন যে, তিনি গ্রামের বাজারে গেছেন, রেগে কাঁই হয়ে গেলেন। তারা আমাদের বললেন এটা কতটা বিপজ্জনক, চারিদিকে কম্যুনিস্ট গেরিলাদের আনাগোনা, আর তাছাড়া, আমাদের খাওয়াদাওয়ার দায়িত্ব তো তাদের। হা! আমাদের যখন কিছুই ছিল না, তখন আমরা তাদের দেখেছি ভাত তরকারি দিয়ে আয়েশ করে খেতে।

প্রায় একই সঙ্গে একটা সাম্পানে করে আমাদের সশস্ত্র প্রহরীরা ও তাদের পেছন পেছন একটা পিটি বোটে করে, মেল দেখতে পান, জে আসছেন বাজার থেকে। তিনি একটা বিশাল কলার কাঁদি এবং বস্তা বস্তা ময়দার পাতলা পরতের মতো কী একটা জিনিস নিয়ে এসেছেন। বাজারের লোকেরা খুব বন্ধুবৎসল ছিল, তারা তাকে দুই কাপ চা খাইয়েছে।

আমাদের পুরনো নৌকাটা যখন শুকিয়ে উঠেছে ততক্ষণে জোয়ার শেষ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের মালপত্র ও মানুষদের দুজন করে সেই পিটি বোটের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিই, যেগুলোকে মোট তিনবার আসাযাওয়া করতে করেছে। সাম্পানগুলো কী ভয়ঙ্করভাবেই না দুলছিল!

পিটি বোটের লোকেরাও খুব আন্তরিক ছিল। তারা এমনকি চা-ও দিয়েছিল; একটা কি দুটো কাপে করে, আমাদের সবাইকে। পিটি বোটে করে আমরা প্রায় চল্লিশ মিনিট ভ্রমণ করি, তারপর আমাদের প্রহরী ও মাদাম অমুক আরেকটা সাম্পানে নেমে যান। পিটি বোট আরো পাঁচ মিনিটের মতো সামনে যায়, তারপরে একটা খাঁড়ির মুখে থেমে যায়। বেশ কয়েকটা সাম্পান আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। আবারও সাম্পানযাত্রার কথা ভেবে আমরা মুষড়ে পড়ি, কিন্তু পরক্ষণেই আবিষ্কার করি যে, আমরা আকিয়াব পৌঁছে গেছি এবং এই সাম্পানগুলো আমাদেরকে জেটি পর্যন্ত নিয়ে যাবে মাত্র। ঘাটে দুজন আমেরিকান ছিলেন আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানানর জন্য—একজন বিমানবাহিনীর অ্যাটাশে কর্নেল ওয়াল্‌শ, এবং দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা মি. মার্টিন। আমরা ইমিগ্রেশন দালানে যাই, যেখানে সবাইকে আমেরিকার ক্যান সোডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

কর্নেল ওয়াল্শ ও মি. মার্টিন মন্তব্য করেন, এরকম পরিস্থিতিতে তাঁরা কাউকে এতটা শান্ত ও সুশৃঙ্খল দেখেননি কোনোদিন।

“তারা এমনকি নৌকায় আসতে আসতে গানও গাইছিল,” একজন আরেকজনের কাছে মন্তব্য করেন। আর কী গান গাইছিলাম আমরা? কী আবার:

‘নৌকায় যিশু থাকলে, আমরা ঝড়ের দিকে চেয়ে হাসতে পারি।’

সেই মুহূর্ত থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকল। আবারও আমরা একটা ট্রাকে উঠি গাদাগাদি করে আকিয়াবের রোমান ক্যাথলিক মিশনে যাবার জন্য রওনা হই, যেখানে তখন একজন মাত্র মিশনারি, ফাদার ব্লুম ছিলেন। তিনি বার্মায় আছেন আটাশ বছর ধরে এবং গত দশ বছরে একবারও বার্মার বাইরে যাননি। তিনি বাইরে গেলে আর ফিরতে পারতেন না। তিনি আমাদেরকে এর আগের রাতেই প্রত্যাশা করেছিলেন, তাই বিছানাপত্র তৈরি করে রেখেছিলেন। তবে সেই মুহূর্তে আমরা মূলত স্নানের জন্যই উদগ্রীব ছিলাম। আমাদের গায়ে তখন পরতে পরতে ময়লা। ময়লা কাপড়গুলো খুলে ফেলতে পেরে ভালো লাগছিল। নানারকম খাওয়া প্রস্তুত ছিল: গরুর মাংসের ঝোল, মাছের তরকারি, সব্জি, স্প্যাম, হ্যাস—আর বাচ্চারা কী খেল? রুটি ও পিনাট বাটার।

জে ও মেলকে বার্মার গোয়েন্দাবিভাগ আটকে রাখে, তাঁদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব তথ্য উদ্ধারের আশায়। আমরা তাড়াহুড়ো করে খেয়েদেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ট্রাকে উঠে পড়ি আকিয়াব বিমানবন্দরে যাবার জন্য। সেখানে একটি ছোটো বিমান ভাড়া করা হয়েছে আমাদের জন্য—রেঙ্গুনগামী ইউনিয়ন অভ বার্মা এয়ারওয়েইজ ভিসকাউন্ট।

রেঙ্গুনে আমাদের সঙ্গে আরেকজন দূতাবাসকর্মী দেখা করেন, যারা সবাই মিলে লাল ফিতার দৌরাত্ম সামলান। বিমান কোম্পানির বাস আমাদেরকে ইনিয়া লেক হোটেলে নিয়ে যায়। দূতাবাস আমাদের জন্য রুম ঠিক করে দেয় এবং নাস্তার ব্যবস্থা করে। একজন আমেরিকান মহিলা বাচ্চাদের হাতে হাতে কমিক বই ধরিয়ে দেন, যারা দ্রুত সিঁড়িতে লাইন করে বসে সেসব পড়তে শুরু করে দেয়। গরম জলে স্নান আর সত্যিকার বিছানা পেয়ে সত্যি খুব ভালো লাগছিল আমাদের।

জে মাঝরাত পর্যন্ত জেগে থাকেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. হামেলের সঙ্গে গল্প করে।

২৪শে এপ্রিল, শনিবার
লোকমুখে আমরা জানতে পারি যে, চট্টগামের দক্ষিণে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছে। আমরা সবাই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি আমাদের অবস্থা বর্ণনা করার জন্য। আমরা জানতে পারি যে, পাকিস্তান সরকারের কথা অনুয়ায়ী আমরা অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেছি, তাই পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন এই অবস্থায় করাচি দিয়ে পাকিস্তানে পুনঃপ্রবেশের চেষ্টা না করি আমরা। আরো জানতে পারি, নিরপেক্ষ বার্মা সরকারকে নাকি বিব্রত করছি আমরা, তাই তাঁরাও চান আমরা শিগ্রি বার্মা ছেড়ে যাই। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, আমরা সোমবার বার্মা ত্যাগ করব, তবে একসঙ্গে দল হিসাবেই থাকব, পত্রিকার কাছে কোনো বিবৃতি দেব না, এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাকিস্তানে ফিরে যাবার চেষ্টা করব।

আমাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয়, যেন আমরা যতটা সম্ভব লোকচক্ষুর আড়ালে থাকি। আমাদের জন্য আলাদা খাবার ঘরের ব্যবস্থা করা হয়, এবং আমাদেরকে এমন ভাব দেখাতে বলা হয় যেন আমরা থাইল্যান্ডগামী আমেরিকান পর্যটক।

২৫শে এপ্রিল, রবিবার
বাচ্চারা আমেরিকান ক্লাবের সুইমিং পুলে যায়। আমরা বড়রা শেডাগন প্যাগোডা পরিদর্শন করি—হায় পা জ্বলে যাচ্ছিল আমাদের। রেঙ্গুনে বাস-করা বিভিন্ন আমেরিকান পরিবার আমাদেরকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিল ডিনার ও সবাই মিলে মজা করার জন্য। সন্ধ্যায় একটা দল রেঙ্গুন শহরের কেন্দ্রে ইমানুয়েল ব্যাপ্টিস্ট চার্চে প্রার্থনা করতে যায়। সেখানে প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যে বক্তার কথা শোনা যাচ্ছিল না, তবে সংগীত বেশ ভালো ছিল।

আমরা আমেরিকান পর্যটক হিসাবে ভান করব, এই প্রতিশ্রুতি অনুয়ায়ী আমাদের মার্কিন ঠিকানা ব্যবহার করে অতিথি-বই স্বাক্ষর করার জন্য লাইন ধরি। ১৩ বছর বয়সী মার্ক ওল্‌সেন লাইনের গোড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, “মা, মিলাওয়াকি বানান করে কিভাবে?”


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১১)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১০)

   

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: পূর্ণ স্বীকৃতি কতদূর?



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বলতেই বুঝি বৃটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া এবং বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি দিক নির্দেশক দিন। সেই আন্দোলনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দানা বাঁধে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট আর সমুদ্রসম আত্মত্যাগ এবং অসীম বীরত্বের ফলশ্রুতিতে আমরা পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর বহু পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বাংলাদেশী কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এর নেতৃত্বে পৃথবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের নিয়ে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় দিনটি বিশ্বসভায় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনের জাতিসংঘ ঘোষিত অঙ্গিকার বিশ্বের প্রতিটি ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিদ্যমান প্রায় ৭০০০ ভাষার একটিকে ও আর হারিয়ে যেতে না দেয়া। ইতিমধ্যে আধিপত্যবাদের কারণে ও সচেতন মহলের সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা, সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে।

কাজেই আমাদের বুঝতে হবে, ভাষা আন্দোলনের স্বর্ণখচিত ইতিহাস ও সাফল্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের ((তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য সংগ্রাম করা ও প্রাণ দেয়া একমাত্র জাতিগোষ্ঠী নই। অর্ধ সহস্রাব্দের আগে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ আমেরিকার মায়া,আজটেক,ইনকা নামের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার জাতিসমূহকে জেনোসাইডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে।প্রতি মায়া লোকালয়ে একটি করে পাঠাগার ছিল। এইরকম দশ হাজার লোকালয়ের পাঠাগারের সব বই তারা ধ্বংস করে দেয়। আজকের দিনে মাত্র আদি মায়া ভাষার তিনখানা বই (মেক্সিকো সিটি,মাদ্রিদ ও ড্রেসডেনে) সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধ করেও মায়ানরা পাঠাগারগুলো বাঁচাতে পারেন নি। সাথ সাথে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা।

বাংলাভাষী জনগণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় উল্লেখ্যোগ্য অবদান রয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত মানভূমের বাঙ্গালীদের। বহু বছর সংগ্রাম,রক্ত ও জীবনের মূল্যে তাঁরা তাঁদের দাবি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনের সূচনা আসামের কাছাড়ে।বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ এগার তরুন প্রাণ ঝড়ে পড়েছে এই আন্দোলনে।

১৯৬১-তে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে শামিল হয়। যদিও বরাকের সিংহভাগ জনগণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,তবুও ১৯৬১-তে অহমিয়াকে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ফুসে ওঠেন বরাকের বাঙ্গালীরা।বাংলাভাষা বরাক উপত্যকার অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। সাঁওতাল পরগণার মানভূম জেলা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও তা দীর্ঘকাল বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর সেখানে হিন্দি প্রচলনের কড়াকড়িতে বাংলা ভাষাভাষীরা চাপের মুখে পড়েন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ১৯৪৮ থেকে দীর্ঘ আট বছর চলা এই আন্দোলনের সাফল্যে ১৯৫৬ এর ১ নভেম্বর মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। বিহার থেকে নিয়ে পুরুলিয়াকে যুক্ত করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাথে। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাঁদের সামনে।

এবারে আবার ফিরি ১৯ মে'র ইতিহাসে। আসামের বরাক উপত্যকা আদিকাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। একসময় এই এলাকার অধিকাংশ ডিমাসা জনগোষ্ঠীর কাছাড় রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিমাসা রাজন্যবর্গ ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কালক্রমে ব্রিটিশরা ভারত বিভাগ করে চলে গেলে আসাম প্রদেশের একাংশ সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। সিলেটের একাংশ ও ডিমাসা পার্বত্য ও সমতল অঞ্চল নিয়ে কাছাড় জেলা গঠিত হয়। এই জেলা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (ডিমা হাসাও)এই চার নতুন জেলায় রূপ নিয়েছে।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর থেকেই বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার অধিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকেন। আসাম অহমিয়াদের জন্য এবং বাঙ্গালীরা সেখানে বহিরাগত এমন বক্তব্য ও ওঠে। এখনও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরাও গা ভাসান। বঙ্গাল খেদা আন্দোলনও গড়ে ওঠে একসময়ে। সরকারিভাবে সেসব আন্দোলন ও সহিংসতা দমন হলেও পরবর্তী কালে সময়ে সময়ে এই জাতীয় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।

আসাম রাজ্য বিধান সভায় ভারতের স্বাধীনতার পর পর সদস্যরা বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন।প্রথম আঘাত এলো ভাষার উপর। অহমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা ঘোষণা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর চেষ্টা এবং বিধানসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে আইন চালুর বিরুদ্ধে আসামের বাঙ্গালী জনগণ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আসাম রাজ্য সরকার কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে গেলেন না। তাঁরা অহমিয়া জাতীয়তাবাদ এর সংকীর্ণ মানসিকতার নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বাঙ্গালীরাও সংগঠিত হতে থাকেন।

অনুমান করা যায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।১৯৬০ সালের শেষে আসাম বিধান সভায় ভাষা বিল পাশ হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেলো। বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠলেন। লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকলো।সত্যাগ্রহ,অসহযোগ, হরতাল, রেল রোখো,সংকল্প দিবস, ইত্যাকার অহিংস আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল বরাক উপত্যকা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালের ১৯মে তারিখে বরাকের কেন্দ্রবিন্দু শিলচরের রেলস্টেশনে ভোর থেকে আন্দোলনকারী সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। হাজার হাজার ছাত্র যুবা জনতা রেলস্টেশন প্রাঙ্গন ও রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। তাঁদের সরাতে না পেরে সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। পুলিশ বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। নিহত হন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ মোট ১১ জন ছাত্র যুবা। তাঁরাই একাদশ ভাষা শহীদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা দ্বিতীয় রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়। শিলচর রেলস্টেশনের সামনে স্থাপিত হয় শহীদদের প্রতিকৃতি সম্বলিত শহীদ মিনার। যার পথ ধরে পরবর্তী কালে ছড়িয়ে পড়ে একই আকৃতির শহীদ মিনার সমগ্র বরাক উপত্যকায়। শিলচর রেলস্টেশনের নাম পাল্টে জনতা ভাষা শহীদ রেল স্টশন নাম রেখেছেন। যদিও পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি এখনও তার মেলেনি।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একাদশ শহীদ সহ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সব এলাকার বাঙ্গালিরা কি এই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন? উত্তরটি ‘না’ সূচক। আমাদের কর্তব্য তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী সকলকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হতে শেখে। বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহীদ অমর রহে। বাংলা সহ সকল মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকুক।

এখনও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন নেতৃত্ব দেয়াদের মধ্যে অনেকে। সাথে সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের ও সন্ধান পাওয়া এখনও কষ্টকর নয়। তবে সামনের সিকি শতাব্দীর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। এখনই প্রকৃষ্ট সময় তাঁদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখার। পর্যাপ্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন সেই আন্দোলন,তার কুশীলব এবং শহীদ পরিবার সমূহের বিষয়ে। বীরের সন্মান উপযুক্ত ভাবে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরও অনেক বীরের আমাদের প্রয়োজন। যে মাটিতে বীরের যথাযোগ্য সন্মান নেই, সে মাটিতে বীর জন্মায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ কবি-সাহিত্যিক



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার’ ২০২২ ও ২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন কবি ও সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য কবি আসাদ মান্নান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে কবিতায় পুরস্কার পেয়েছেন- শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক ও রিশাদ হুদা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে মালিক মো. রাজ্জাক। এছাড়া প্রবন্ধে বিলু কবীর, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, অনুবাদে ইউসুফ রেজা এবং কথাসাহিত্য জুলফিয়া ইসলাম।

আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে, কবি খুরশীদ আনোয়ারকে।

কবি আসাদ মান্নান জানান, ২০২৩ সালে কবিতায় মিনার মনসুর ও মারুফুল ইসলাম পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রবন্ধে আসাদুল্লাহ, কথাসাহিত্যে জয়শ্রী দাশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে নাজমা বেগম নাজু, শিশুসাহিত্য আমীরুল ইসলাম এবং অনুবাদে মেক্সিকো প্রবাসী আনিসুজ্জামান।

আগামী ১৯ মে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। পুরস্কার ঘোষণা কমিটির প্রধান ছিলেন কবি শ্যামসুন্দর শিকদার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।

;

ঢাকার মিলনায়তনেই আটকে ফেলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে! 



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে তাদের জন্মজয়ন্তীর জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা কি তবে লুপ্ত হতে চলেছে? দীর্ঘসময় ধরে মহাসমারোহে কয়েকদিন ধরে এসব জন্মজয়ন্তী আয়োজনের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণ দেখিয়ে সেই মাত্রায় আর হচ্ছে না রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর মহাআয়োজন। ঢাকার বাইরে উন্মূক্ত স্থানের বদলে রাজধানীতেই সীমিত পরিসরে মিলনায়তনে আটকে ফেলা হচ্ছে এসব আয়োজনের পরিধিকে। 

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দুই পুরোধা পুরুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে বিশাল আয়োজনে তাদের পরিধিবহুল সৃষ্টিকর্ম ও যাপিত জীবনের আখ্যান তুলে ধরা হতো। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে কবিদের স্মৃতিধন্য স্থানসমূহে এই আয়োজনকে ঘিরে দীর্ঘসময় ধরে চলতো সাজ সাজ রব। যোগ দিতেন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু নানা অজুহাতে পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকাতেই যেমন আটকে যাচ্ছে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় আয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণও কমে এসেছে। 

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এবারও কোন ভিন্নতা থাকছে না জানিয়ে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পালিত হয়। আর মৃত্যুবার্ষিকীগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। যেমন কবি নজরুল ইনস্টিটিউট যেহেতু কবির নামে প্রতিষ্ঠিত, তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ইনস্টিটিউটই আয়োজন করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেভাবে উদযাপিত হয় এবারও সেভাবেই আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৫ মে (২০২৪) বেলা ৪টায় জাতীয় জাদুঘরে শুরু হবে। রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানগুলো কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে অনুষ্ঠিত হত। এই বারও হবে, তবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে হবে না।’

‘ঢাকার বাইরে যেসব জেলাগুলো নজরুলের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট; যেমন-ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা-এসব জেলাগুলোতে নজরুল গিয়েছেন, থেকেছেন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে। এবার জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও ঢাকায় হয়েছে, নজরুলের জন্মজয়ন্তীও ঢাকায় হবে। ঢাকার বাইরে এবার নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে সরকারের কাছে যে যুক্তি তা হচ্ছে-এই সময়ে দেশের উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে। বিশেষত জেলা প্রশাসন এইগুলো আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে থাকে। জেলা প্রশাসনগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকবে। নজরুল জয়ন্তী আয়োজনে মনযোগ হয়ত কম দেবে। যে উদ্দেশ্যে জনমানুষের কাছে পৌছানোর জন্য এই অনুষ্ঠান, তা পরিপূর্ণ সফল হবে না বিধায় এবার এই আয়োজনগুলো ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে’-বলেন সরকারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপনে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আছে। এতে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত ২ এপ্রিল (২০২৪) কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে শিল্পকলা একাডেমিতে এবং নজরুল জয়ন্তী হবে বাংলা একাডেমিতে।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমিতে কিছু রেনুভশন ওয়ার্ক চলমান থাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় মুক্তমঞ্চেও এই আয়োজন না করে জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে নজরুল জয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২৫ মে বেলা ৪টায় উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। স্মারক বক্তা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা।

২৬মে আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসান, এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান। ২৭ মে তৃতীয় দিনের আয়োজনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। শেষ দিনের স্মারক বক্তা কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে জাতীয় কমিটির একজন সদস্যের কাছে জয়ন্তী আয়োজনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যিক ধারা বজায় না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রবীন্দ্র ও নজরুল অনুরাগীরা বলেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-জীবনদর্শন আমাদের পাথেয়। তাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে মহাসমারোহে ঢাকার বাইরে কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে আয়োজনের যে ধারাবাহিকতা ছিল তা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতো। কিন্তু এই আয়োজনকে সীমিত করে রাজধানীর মিলনায়তনে আটকে ফেলা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশকে রূদ্ধ করারই অংশ। এর পেছনে সুক্ষ্ণভাবে কারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

;

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিপাসার্ত ঘোরে

প্রান্তরের মাঝে আছে নিঃস্বতার ডাক
আত্ম অনুসন্ধানের
ফিরতি ঢেউ
আছড়ে পড়ে
আশ্লেষের বালুকাবেলায়
মুমূর্ষু যেমন তীব্র পিপাসায়
জীবনের আলিঙ্গন চায়-
আর্ত রাত্রি হিমেল কামের ঘোর
নীরবে দংশায়
ঘর পোড়ে, আকাক্ষার
বাতি নিভে যায়
কোথায় প্রান্তর, শূন্যতা কোথায়
আছে সে নিকটে জানি
সুদূরের এলানো চিন্তায়
যেখানে গোধূলিদগ্ধ
সন্ধ্যা কী মায়ায়
গুটায় স্বপ্নের ডানা
দেবদারু বনে বীথিকায়
তার দিকে সতৃষ্ণ সমুদ্রঘোর
ছটফট করছি পিপাসায়।

না, পারে না

লখিন্দর জেগে উঠবে একদিন
বেহুলার স্বপ্ন ও সাধনা
বৃথা যেতে পারে না, পারে না।

কলার মান্দাস, নদীস্রোত
সূর্যকিরণের মতো সত্য ও উত্থিত
সুপ্ত লখিন্দর শুয়ে, রোমকূপে তার
জাগৃতির বাসনা অপার
এই প্রেম ব্যর্থ হতে পারে না পারে না

মনসার হিংসা একদিন
পুড়ে টুড়ে ছাই হবে
এমন প্রতীতি নিয়ে স্বপ্নকুঁড়ি নিয়ে
প্রতীক্ষা-পিদিম জ্বেলে টিকে থাকা
এমন গভীর সৌম্য অপেক্ষা কখনো
ম্লান হয়ে নিভে যেতে পারে না পারে না

রেণু রেণু সংবেদবর্ণালি-৮

ক.
আমার না পাওয়াগুলি অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসগুলি
মুক্তি চায়, বেরোতে পারে না
কার্বনের নিঃসরণ
নতুন মাত্রিক আর বিপজ্জনক
সেও তো দূষণ বটে
বলতে পারো প্রণয়দূষণ!

খ.
আদিপ্রাণ বৃক্ষতলে
ছায়াশান্তি মাঙনের সুপ্তি বর্তমান
এসো লই বৃক্ষের শরণ
পরিবেশ প্রশান্তির সেও এক
স্বস্তিমন্ত্র, অনিন্দ্য ধরন।

গ.
নদীকে বইতে দাও নিজস্ব নিয়মে
গলা টিপে ধোরো না ধোরো না,
নদী হচ্ছে মাতৃরূপ বাৎসল্যদায়িনী
দখলে দূষণে তাকে লাঞ্ছিত পীড়িত
হে মানুষ এই ভুল কোরো না কোরো না

ঘ.
উচ্চকিত শব্দ নয় বধিরতা নয়
মৃদু শব্দ প্রকৃতির সঙ্গে কথা কও
শব্দ যদি কুঠারের ঘাতকপ্রতিম
তবে হে মানুষ তোমরা অমৃতের পুত্রকন্যা নও

ঙ.
মৃত্তিকার কাছ থেকে সহনশীলতা শিখি
মৃত্তিকাই আদি অন্ত
জীবনের অন্তিম ঠিকানা
মৃত্তিকাই দেয় শান্তি সুনিবিড়
ক্ষমা সে পরমা
শরীর মূলত মাটি
গন্তব্য যে সরল বিছানা।

ছিন্ন কথন

আমি ভুখা পিপীলিকা
চেয়েছি আলোর দেখা।
পুড়ে যদি মরি তাও
ওগো অগ্নি শান্তি দাও।
অঙ্গার হওয়ার সাধ
এসো মৃত্যু পরমাদ।
চলো ডুবি মনোযমুনায়
এসো এসো বেলা নিভে যায়!

ধ্রুব সত্য

না-পাওয়াই সত্য হয়ে ফুটে থাকে।
পুষ্পিত সে প্রতারণা, চেনা মুশকিল।
বৃতি কুঁড়ি পাপড়িতে মায়াভ্রম লেপটানো
দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা হয়। ছুঁলেই বিপদ।
সেই ফুলে সম্মোহন জড়িয়েমড়িয়ে আছে
কোমলতা লাবণ্যও পুঁজি তার, এমত বিভ্রমে
লোভী ভ্রমরের মতো প্রেমিকারা ছোটে তার কাছে
গিয়ে মোক্ষ পাওয়া দূর, অনুতাপে আহত পাথর
মাথা কুটে মরলেও স্রোতধারা জন্ম নেয় না
যা কিছু হয়েছে পাওয়া, তাও এক দম্ভ সবিশেষ
মর্মে অভ্যন্তরে পশে গতস্য শোচনা নাস্তি
এই বিষ গলাধঃকরণ করে কী যে পাওয়া হলো
হিসাবে নিকাশে মন থিতু নয় সম্মতও নয়
না-পাওয়াই ধ্রুব সত্য চিরন্তন মানুষ-জীবনে!

;