কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

মালুমঘাট থেকে পলায়ন

[পূর্ব প্রকাশের পর] বাইশে এপ্রিল, বৃহস্পতিবার
আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য আমাদের রেঙ্গুন থেকে অনুমতি নেওয়ার দরকার ছিল। এটা প্রায় ঈশ্বরপ্রদত্ত যে, বিল্‌সরা এর আগেই সেই অনুমতি প্রার্থনা করেছিল, ফলে ব্যবস্থা সব করাই ছিল। সবাইকেই অভিবাসন ও শুল্কবিষয়ক ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। সেগুলো শেষ হবার পর, পুরো চৌত্রিশজনের দল দুটো ট্রাকে চড়ে ষোলো মাইল দূরে বুথিয়াডংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেই কাঠের আসনগুলো সত্যি খুব শক্ত ছিল!

আমরা চমৎকার একটি দেশের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। বিশেষভাবে আকর্ষণীয় ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় খনন করা সুড়ঙ্গগুলো। বুথিয়াডংয়ে আমরা পিনাট বাটার অথবা চিজ হুইজ স্যান্ডউইচ খেয়েছিলাম, ট্রাকের পেছনটাকে টেবিল ও কাউন্টার বানিয়ে নিয়ে। খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই আমাদেরকে একটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের প্রহরানৌকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

ট্রাকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় সেমি অটোমেটিক রাইফেল-দোলানো দুই সেনাসদস্য। তারা আমাদের সঙ্গে সেই নদী-প্রহরার নৌকা পর্যন্ত যায়। নৌকাটার একটা ওপরতলা ছিল যেখানে মালগুলো রাখা হয়, আর ছিল একটা ছোট্ট গরম নিচতলা। আমরা সবাই নিচতলার দিকে অগ্রসর হই, স্যান্ডুইচ ও কলা খেতে খেতে। পরে মালগুলোকে একটু পুনর্বিন্যাস করাতেই দেখা গেল সবাই ওপরতলাতেই বসতে পারছিল।

নৌকাযাত্রায় আট ঘণ্টা লাগার কথা ছিল। তার মানে রাত নটার দিকে আমাদের আকিয়াব পৌঁছানোর কথা। আমাদের সঙ্গে ছিল সশস্ত্র প্রহরী দুইজন, ও নৌকার মাঝিমাল্লা ছাড়া আরো দুজন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, ও একজন নারী, যার সরকারি পরিচয় আমরা কোনোদিনই উদ্ঘাটন করতে পারিনি। এরা ছিল আমাদেরকে গন্তব্য পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সঙ্গী।

নদীভ্রমণের পথটুকু খুব দৃশ্যময় ছিল, অনেকটা বাংলাদেশের স্টিমারযাত্রার মতোই। রাতের খাবার হিসাবে আমরা ঠান্ডা ডিন্টি মুর বিফ স্টু খাই। কেউ কেউ এটা খেয়েছিল এর আগের ব্যবহৃত ভিয়েনা সসেজের টিন থেকে, আর বাকিরা সরাসরি স্টুর টিন থেকেই। নৌকার মাঝিরা পানি গরম করে দিয়েছিল চা ও কফির জন্য।

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ আমরা নদীতীরবর্তী একটা গ্রামে থামি। আমরা নৌকা থেকে বেরুতে পারিনি, তবে সম্ভবত সারা গ্রামের লোকেরাই এসেছিল আমাদের দেখতে। রাত নয়টায় আমরা আবার যাত্রা করি। প্রথমে জে বলেছিলেন যে, নৌকা থেকে নামার পর আরো দশ ঘণ্টার ট্রাকযাত্রা রয়েছে সামনে, তবে পরে এসে জানান, সেই রাত্রে আমরা নৌকাত্যাগ করতে পারব না। ততক্ষণে আমরা নিজেরাও সেটা জেনে গেছি। আমরা ক্ষণে ক্ষণেই নদীর চরে আটকে যাচ্ছিলাম এবং আমাদের নৌকো প্রায় ডাঙ্গার ওপর উঠে যাচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে মাঝিরা নদীর সঠিক গতিপথ খুঁজে পাচ্ছিল না কিছুতেই। তারা নৌকার মুখ ঘুরিয়ে দেয় এবং উত্তাল জলে গিয়ে পড়ে আচমকা।

বাচ্চারা অভিযোগ করতে শুরু করলে এলিয়ানোর দার্শনিকভাবে বলেন, “আমরা সবাই একই নৌকাই ভাই! আর এটা সবসময়ই সত্য যখন আমরা কোনো জায়গা থেকে পালাতে যাই।” ঘুমানোর জন্য, নিচতলার বাসিন্দারা একটা প্লাস্টিকের পরাত পেতে দিয়ে তার ওপর বাচ্চাদের শুইয়ে দেয়। নারীরা চারপাশের বেঞ্চে বসে থাকে এবং একেকজন পালা করে ঘুমাতে পারে। নিচের ওরা ওপরের একমাত্র বাথরুমটিতে যেতে পারছিল না, তাই তারা একটি বিস্কিটের টিন ব্যবহার করে, তার চারপাশে লুঙ্গি দিয়ে পর্দা বানিয়ে নেয়। এর মধ্যে ওপরতলায় সুটকেসগুলোকে যথাসম্ভব সমতল করে বিছিয়ে রাখা হয়। পুরুষেরা একটু শরীর লম্বা করতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠান্ডায় প্রায় জমে যাবার উপক্রম হয় তাদের। বেকি কেচাম মারির জন্য রাখা শীতের সব সামগ্রী খুঁজে বার করে এবং সেসব দিয়ে তাদের আবৃত করার চেষ্টা চালায়। একজন পুরুষ কাঠের তাকের ওপর ও আরেকজন দুটো টায়ারের ওপর শোয়। জে ও মার্ক একেবারে বাইরে, দুলতে থাকা ডেকের ওপর রাত কাটান। জেন গলিন একটু আরাম করার অবকাশ পেয়েছিলেন মাত্র, আর তখনি তাঁর স্বামী ভুল করে গায়ের ওপর পা তুলে দেন!

২৩শে এপ্রিল, শুক্রবার
ভোরবেলায় মাঝিরা নোঙর টানাটানি শুরু করে। শিশু মিকাইল গলিন একটা উজ্জ্বল হাসি নিয়ে জেগে ওঠে এবং সূর্যোদয়টাও ছিল রাজকীয়। মাঝিরা একটা চরের কোনায় নৌকার খুঁটি বাঁধতে চেষ্টা করে, কিন্তু তেমন সুবিধা করতে পারে না। জে, মেল এবং জো একটা বিশাল বাঁশ খুঁজে পান এবং সেটা দিয়েই নৌকাটাকে বাঁধতে চেষ্টা করেন। আমরা আকিয়াব যাওয়ার নদীপথের খুব একটা দূরে ছিলাম না, কিন্তু তখন আমরা জানতে পারি যে, ইঞ্জিন বিকল। ব্যাটারির কী সমস্যা হচ্ছিল আর হালটাও ঠিক কাজ করছিল না। মাঝিরা আবারও আমাদেরকে নিয়ে চরের অন্যপাশের একটা বাড়ির দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, যেখান থেকে ফোনের মাধ্যমে সাহায্যের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তার পরিবর্তে আমরা একেবারে বিচ্ছিন্ন আরেকটা চরে নৌকোশুদ্ধ আটকা পড়ে যাই। আমরা নিকটবর্তী সাম্পানগুলোকে ডাকতে চেষ্টা করি, এমনকি হর্নও বাজাই, কিন্তু কেউ শুনতে পায় না আমাদের।

আমাদের সত্যিকার কোনো খাবার অবশিষ্ট ছিল না আর, আমরা তাই কে-রেশনের টিন খুলি এবং সবাইকে মল্ট ট্যাবলেট ও পেমিক্যান খাইয়ে দিই। এতে কাজ হয়—কারো আর ক্ষুধা লাগে না।

মাঝিরা একটা পাটাতন নামিয়ে দেয়, আর তার ওপর দিয়ে আমাদের দেহরক্ষীরা নেমে যায় সাম্পান ও সাহায্যের খোঁজে। আমরা দুপুরের খাবার নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। আমরা মাঝিদেরকে আমাদের জন্য ভাত রান্না করে দিতে বলি, কিন্তু তারা জানায়, তাদের চাল নেই। আমরা তাদেরকে বলি, গ্রামের বাজারে গিয়ে চাল কিনে আনতে, কিন্তু তারা সেটা করতেও অস্বীকৃত হয়। শেষ পর্যন্ত জে অন্য তীর থেকে একটা সাম্পান ডেকে এনে সেটা দিয়ে গ্রামের ভেতর চলে যান।

আমাদের চরে আটকানো নৌকাটা বেজায় দুলছিল, এবং পানিকে খুব লোভনীয় মনে হচ্ছিল, তাই বাচ্চারা এবং আরো কেউ কেউ সাঁতার কাটতে নেমে গেল পানিতে। মালুমঘাটের পরে সেটাই ছিল বাচ্চাদের প্রথম স্নান। আমরা সৈকতের ওপর খেলাধুলা করে একটা সুন্দর বিকাল কাটাই।

লম্বা ঘুম দিয়ে উঠে অভিবাসন অফিসারেরা জে’র খোঁজ করেন। তাঁরা যখন শুনলেন যে, তিনি গ্রামের বাজারে গেছেন, রেগে কাঁই হয়ে গেলেন। তারা আমাদের বললেন এটা কতটা বিপজ্জনক, চারিদিকে কম্যুনিস্ট গেরিলাদের আনাগোনা, আর তাছাড়া, আমাদের খাওয়াদাওয়ার দায়িত্ব তো তাদের। হা! আমাদের যখন কিছুই ছিল না, তখন আমরা তাদের দেখেছি ভাত তরকারি দিয়ে আয়েশ করে খেতে।

প্রায় একই সঙ্গে একটা সাম্পানে করে আমাদের সশস্ত্র প্রহরীরা ও তাদের পেছন পেছন একটা পিটি বোটে করে, মেল দেখতে পান, জে আসছেন বাজার থেকে। তিনি একটা বিশাল কলার কাঁদি এবং বস্তা বস্তা ময়দার পাতলা পরতের মতো কী একটা জিনিস নিয়ে এসেছেন। বাজারের লোকেরা খুব বন্ধুবৎসল ছিল, তারা তাকে দুই কাপ চা খাইয়েছে।

আমাদের পুরনো নৌকাটা যখন শুকিয়ে উঠেছে ততক্ষণে জোয়ার শেষ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের মালপত্র ও মানুষদের দুজন করে সেই পিটি বোটের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিই, যেগুলোকে মোট তিনবার আসাযাওয়া করতে করেছে। সাম্পানগুলো কী ভয়ঙ্করভাবেই না দুলছিল!

পিটি বোটের লোকেরাও খুব আন্তরিক ছিল। তারা এমনকি চা-ও দিয়েছিল; একটা কি দুটো কাপে করে, আমাদের সবাইকে। পিটি বোটে করে আমরা প্রায় চল্লিশ মিনিট ভ্রমণ করি, তারপর আমাদের প্রহরী ও মাদাম অমুক আরেকটা সাম্পানে নেমে যান। পিটি বোট আরো পাঁচ মিনিটের মতো সামনে যায়, তারপরে একটা খাঁড়ির মুখে থেমে যায়। বেশ কয়েকটা সাম্পান আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। আবারও সাম্পানযাত্রার কথা ভেবে আমরা মুষড়ে পড়ি, কিন্তু পরক্ষণেই আবিষ্কার করি যে, আমরা আকিয়াব পৌঁছে গেছি এবং এই সাম্পানগুলো আমাদেরকে জেটি পর্যন্ত নিয়ে যাবে মাত্র। ঘাটে দুজন আমেরিকান ছিলেন আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানানর জন্য—একজন বিমানবাহিনীর অ্যাটাশে কর্নেল ওয়াল্‌শ, এবং দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা মি. মার্টিন। আমরা ইমিগ্রেশন দালানে যাই, যেখানে সবাইকে আমেরিকার ক্যান সোডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

কর্নেল ওয়াল্শ ও মি. মার্টিন মন্তব্য করেন, এরকম পরিস্থিতিতে তাঁরা কাউকে এতটা শান্ত ও সুশৃঙ্খল দেখেননি কোনোদিন।

“তারা এমনকি নৌকায় আসতে আসতে গানও গাইছিল,” একজন আরেকজনের কাছে মন্তব্য করেন। আর কী গান গাইছিলাম আমরা? কী আবার:

‘নৌকায় যিশু থাকলে, আমরা ঝড়ের দিকে চেয়ে হাসতে পারি।’

সেই মুহূর্ত থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকল। আবারও আমরা একটা ট্রাকে উঠি গাদাগাদি করে আকিয়াবের রোমান ক্যাথলিক মিশনে যাবার জন্য রওনা হই, যেখানে তখন একজন মাত্র মিশনারি, ফাদার ব্লুম ছিলেন। তিনি বার্মায় আছেন আটাশ বছর ধরে এবং গত দশ বছরে একবারও বার্মার বাইরে যাননি। তিনি বাইরে গেলে আর ফিরতে পারতেন না। তিনি আমাদেরকে এর আগের রাতেই প্রত্যাশা করেছিলেন, তাই বিছানাপত্র তৈরি করে রেখেছিলেন। তবে সেই মুহূর্তে আমরা মূলত স্নানের জন্যই উদগ্রীব ছিলাম। আমাদের গায়ে তখন পরতে পরতে ময়লা। ময়লা কাপড়গুলো খুলে ফেলতে পেরে ভালো লাগছিল। নানারকম খাওয়া প্রস্তুত ছিল: গরুর মাংসের ঝোল, মাছের তরকারি, সব্জি, স্প্যাম, হ্যাস—আর বাচ্চারা কী খেল? রুটি ও পিনাট বাটার।

জে ও মেলকে বার্মার গোয়েন্দাবিভাগ আটকে রাখে, তাঁদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব তথ্য উদ্ধারের আশায়। আমরা তাড়াহুড়ো করে খেয়েদেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ট্রাকে উঠে পড়ি আকিয়াব বিমানবন্দরে যাবার জন্য। সেখানে একটি ছোটো বিমান ভাড়া করা হয়েছে আমাদের জন্য—রেঙ্গুনগামী ইউনিয়ন অভ বার্মা এয়ারওয়েইজ ভিসকাউন্ট।

রেঙ্গুনে আমাদের সঙ্গে আরেকজন দূতাবাসকর্মী দেখা করেন, যারা সবাই মিলে লাল ফিতার দৌরাত্ম সামলান। বিমান কোম্পানির বাস আমাদেরকে ইনিয়া লেক হোটেলে নিয়ে যায়। দূতাবাস আমাদের জন্য রুম ঠিক করে দেয় এবং নাস্তার ব্যবস্থা করে। একজন আমেরিকান মহিলা বাচ্চাদের হাতে হাতে কমিক বই ধরিয়ে দেন, যারা দ্রুত সিঁড়িতে লাইন করে বসে সেসব পড়তে শুরু করে দেয়। গরম জলে স্নান আর সত্যিকার বিছানা পেয়ে সত্যি খুব ভালো লাগছিল আমাদের।

জে মাঝরাত পর্যন্ত জেগে থাকেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মি. হামেলের সঙ্গে গল্প করে।

২৪শে এপ্রিল, শনিবার
লোকমুখে আমরা জানতে পারি যে, চট্টগামের দক্ষিণে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছে। আমরা সবাই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি আমাদের অবস্থা বর্ণনা করার জন্য। আমরা জানতে পারি যে, পাকিস্তান সরকারের কথা অনুয়ায়ী আমরা অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেছি, তাই পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, যেন এই অবস্থায় করাচি দিয়ে পাকিস্তানে পুনঃপ্রবেশের চেষ্টা না করি আমরা। আরো জানতে পারি, নিরপেক্ষ বার্মা সরকারকে নাকি বিব্রত করছি আমরা, তাই তাঁরাও চান আমরা শিগ্রি বার্মা ছেড়ে যাই। আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, আমরা সোমবার বার্মা ত্যাগ করব, তবে একসঙ্গে দল হিসাবেই থাকব, পত্রিকার কাছে কোনো বিবৃতি দেব না, এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাকিস্তানে ফিরে যাবার চেষ্টা করব।

আমাদেরকে উপদেশ দেওয়া হয়, যেন আমরা যতটা সম্ভব লোকচক্ষুর আড়ালে থাকি। আমাদের জন্য আলাদা খাবার ঘরের ব্যবস্থা করা হয়, এবং আমাদেরকে এমন ভাব দেখাতে বলা হয় যেন আমরা থাইল্যান্ডগামী আমেরিকান পর্যটক।

২৫শে এপ্রিল, রবিবার
বাচ্চারা আমেরিকান ক্লাবের সুইমিং পুলে যায়। আমরা বড়রা শেডাগন প্যাগোডা পরিদর্শন করি—হায় পা জ্বলে যাচ্ছিল আমাদের। রেঙ্গুনে বাস-করা বিভিন্ন আমেরিকান পরিবার আমাদেরকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিল ডিনার ও সবাই মিলে মজা করার জন্য। সন্ধ্যায় একটা দল রেঙ্গুন শহরের কেন্দ্রে ইমানুয়েল ব্যাপ্টিস্ট চার্চে প্রার্থনা করতে যায়। সেখানে প্রচণ্ড আওয়াজের মধ্যে বক্তার কথা শোনা যাচ্ছিল না, তবে সংগীত বেশ ভালো ছিল।

আমরা আমেরিকান পর্যটক হিসাবে ভান করব, এই প্রতিশ্রুতি অনুয়ায়ী আমাদের মার্কিন ঠিকানা ব্যবহার করে অতিথি-বই স্বাক্ষর করার জন্য লাইন ধরি। ১৩ বছর বয়সী মার্ক ওল্‌সেন লাইনের গোড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, “মা, মিলাওয়াকি বানান করে কিভাবে?”


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১১)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১০)

   

অনন্তকাল দহন



আকিব শিকদার
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ঝিঝির মতো ফিসফিসিয়ে বলছি কথা আমরা দুজন
নিজেকে এই গোপন রাখা আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

বাঁশের শুকনো পাতার মতো ঘুরছি কেবল চরকী ভীষণ
আমাদের এই ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়ানো আর কতোকাল?
:অনন্তকাল।

তপ্ত-খরায় নামবে কবে প্রথম বাদল, ভিজবে কানন
তোমার জন্য প্রতিক্ষীত থাকবো আমি আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

তোমার হাসির বিজলীরেখা ঝলসে দিলো আমার ভুবন
এই যে আগুন দহন দেবে আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

;

১২৫তম জন্মবর্ষ

মুক্তির অন্বেষী নজরুল



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নজরুল জীবনের ‘আর্তি ও বেদনা’র সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেকালের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নজরুলের আবির্ভাবকালে মুসলমানদের সামাজিক আবহাওয়া এমনই জীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ ছিল যে, কোনো শিল্পীরই সেই আবহাওয়াতে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসার সম্ভব ছিল না। জীবনের প্রথমদিকে তাই কামাল পাশা প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত বীর মুসলিমেরা নজরুল-মানসকে আচ্ছন্ন করেছিল।

কিন্তু অচিরেই তিনি বাঙালির জাগরণের পথিকৃতে রূপান্তরিত হন। বাংলার জাগরণ গ্রন্থে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রণীজন কাজী আবদুল ওদুদ জানাচ্ছেন, ‘নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং যারা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দিলে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’

চরম দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও জীবনের জয়গান গেয়েছেন কবি নজরুল, ছবি- সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে বৃহত্তর পরিসর ও অর্থে গ্রহণ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই (১৯২৭) সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে সাময়িকী ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যে কারণে এদের ‘শিখা গোষ্ঠী‘ নামেও অভিহিত করা হয়।

শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা তথা শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ। ‘বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুলকে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বুদ্ধির মুক্তি, মানব মুক্তি, সমাজের মুক্তি তথা মানুষের শির উচ্চতর করার বাণী উৎকীর্ণ করেছিলেন নজরুল। গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের গানে মুখরিত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম। মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না তাঁর কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। জগতের বঞ্চিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত, স্বাধীনতাহীন বন্দিদের জাগ্রত করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন নজরুল। মানবতার জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন-'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্ …’।

মানুষ আর মানুষের হৃদয়কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। আবার তাঁর কলম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান- ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত জগতের বঞ্চিত ভাগ্যহত’।

শুধু যে কবিতাই লিখেছেন তা তো নয়। তিনি এমন অনেক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। নজরুলের দেশপ্রীতি, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে।

সাম্য ও মানুষের কবি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, ছবি- সংগৃহীত

‘সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাত–ধর্ম ছিল হৃদয়ের প্রেমধর্ম; যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। শুধু লেখনীর দ্বারা নয়, নিজের জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে ঐক্যের আশায় আশাবাদী ছিলেন নজরুল।

তাঁর ব্যক্তিজীবনে এই ভাবনার প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর বিবাহের ক্ষেত্রে, পুত্রদের ক্ষেত্রেও। তাঁর পরিবারের সব সদস্য এবং আপামর বাঙালি এই সত্য নিত্য উপলব্ধি করেন।

১২৫তম জন্মবর্ষে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্য মুক্তির অন্বেষী। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক তথা সুবিশাল সাহিত্যকর্ম বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, নানা কারণে তাৎপর্যবাহী।

কেননা, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনে জর্জরিত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার, হামলা, নির্যাতন।

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ এখন অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন।

এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ-তুল্য কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, বিদ্রোহ, মুক্তি ও মানবতার মহান সাধক।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বৃটিশ-বাংলার সর্বপশ্চিম প্রান্তের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম আর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।'

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানাজন নানামত দিতে থাকেন। এ অবস্থায় স্থাননির্ধারণী সভায় রফিকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন নজরুল তাঁর এক গনে লিখেছেন-

‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’॥

সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর কবর হোক। তাঁর এ প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো। পরবর্তীকালে এ কবর পাকা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ছবি- সংগৃহীত

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবনযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির একটি 'বিদ্রোহী', যা স্পর্শ করেছে রচনার শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক ‘প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক ‘সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ‘ধূমকেতু’তে (২২ আগস্ট, ১৯২২) ছাপা হয়।

বলা বাহুল্য, অসম্ভব পাঠকপ্রিয়তার কারণেই কবিতাটিকে বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ও রচয়িতা কবি নজরুল ‘চির উন্নত শির’ রূপে বিরাজমান।

পুরো বাংলা ভাষা বলয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শাণিত প্রতিবাদ তুলনাহীন। বিদ্রোহীর শতবর্ষকে ‘জাগরণের শতবর্ষ’ রূপে উদযাপন করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী পরিমণ্ডলে আর ১২৫তম জন্মবর্ষে মুক্তির অন্বেষী নজরুলকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি!

 ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

শ্রীপুরের কাওরাইদে নজরুল উৎসব শনিবার



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ কালি নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘ভাগ হয়নিকো নজরুল’ শীর্ষক নজরুল উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে শনিবার। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে এবং নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর সহযোগিতায় এই উৎসবে সেমিনার, আবৃত্তি ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকে তুলে ধরা হবে।

নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর অন্যতম ট্রাস্টি আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক জানান, আয়োজনের শুরুতে শনিবার দুপুর ২টায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সুনীল কান্তি দে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. সাইম রানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ও ছায়ানট (কলকাতা)’র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক।

তিনি আরও জানান, বিকেলে আয়োজনে নজরুলের জাগরণী কবিতা ও গান পরিবেশন করবেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা। আবৃত্তি করবেন-টিটো মুন্সী ও সীমা ইসলাম। নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করবেন শিল্পী ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি থাকবেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার।

‘দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নজরুল চর্চা বেগবান করতে এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এবছর কবি নজরুলের ১২৫তম জন্মবর্ষ। এই বছরটি নজরুলচর্চার জন্য খুবই সবিশেষ। উৎসবে দুই দেশের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে সাময়িকী। সাম্য, মানবতা ও জাগরণের যে বাণী কবি সৃষ্টি করে গেছেন, সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের জন্য তা আলোকবর্তিকা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরুলের এই আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা’-বলেন আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক। 

;

শিশু নজরুল



এ এফ এম হায়াতুল্লাহ
কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত। এটি বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনের দিক দিয়ে বহুগুণ বড় একটি দেশ। বহুজাতির বহু মানুষের বাস সে দেশে। ঐ দেশ অনেকগুলো প্রদেশে বিভক্ত। এই প্রদেশগুলোকে বাংলা ভাষায় রাজ্য বলে অভিহিত করা হয়। এই ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের পূর্বাঞ্চল আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর পশ্চিমাঞ্চল ‘পশ্চিম বঙ্গ’ নামে ভারতের অন্তর্গত রয়ে গেছে।

এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার অধীন আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে এবং ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে জন্মলাভের পর একটি শিশুর কাজী নজরুল ইসলাম নাম রাখেন যে পিতা তার নাম কাজী ফকির আহমদ। আর যে মায়ের কোলে তিনি জন্মান তার নাম জাহেদা খাতুন। এই শিশুটির জন্মের আগে এই পিতামাতার আর-ও ৪ জন সন্তান জন্মের সময়ই মারা গিয়েছিল। শুধু তাদের প্রথম সন্তান কাজী সাহেবজানের বয়স তখন ১০ বছর। অর্থাৎ কাজী নজরুলের সর্বজ্যেষ্ঠ বড় ভাই শিশু কাজী নজরুলের চাইতে ১০ বছরের বড় ছিলেন। নজরুলের পর তার আর-ও একজন ভাই ও বোনের জন্ম হয়েছিল। ভাইটির নাম ছিল কাজী আলী হোসেন এবং বোনটির নাম ছিল উম্মে কুলসুম।

শিশু নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ বই-পুস্তক পড়তে পারতেন। তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাজারের সেবা করতেন। রাজ্য শাসকগণ কর্তৃক বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ অর্থাৎ বিচারকগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতেন। মুসলমান সমাজ থেকে বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজী বলা হত। মুসলমান সমাজে কাজীগণ অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন। নজরুল ইসলাম এইরূপ সম্মানিত পরিবারে জন্মপ্রাপ্ত এক শিশু। তাই জন্মের পর ক্রমশ বেড়ে উঠার পর্যায়ে তিনি পারিবারিকসূত্রেই ভাল-মন্দের পার্থক্য করার এবং হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হয়ে সকলকে সমভাবে ভালবাসার গুণাবলি অর্জন করেন।

মানবজাতির ইতিহাসে যে-সমস্ত মহাপুরুষ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের অধিকাংশই শৈশব থেকে নানারূপ দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়ে সেগুলো জয় করে মহত্ত্ব অর্জন করেছেন। তাদের কেউই একদিনে বড় হয়ে যাননি কিংবা বেড়ে-ও উঠেন নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মানোর আগেই পিতাকে হারিয়েছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে হারিয়েছিলেন জন্মদাত্রী মাকেও। নজরুল তার পিতাকে হারান নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে। পিতা তাকে গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। তখনকার দিনে পড়াশোনা করার জন্যে সরকারি ব্যবস্থা ছিলনা। বাংলাদেশের তখন জন্ম হয়নি।

বিশেষ ভঙ্গিমায় হাবিলদার নজরুল

নজরুলের জন্মভূমি বাংলা প্রদেশ ভারতবর্ষের একটি রাজ্য যা ছিল বিদেশী ব্রিটিশ শাসনাধীন তথা পরাধীন। ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের সাধারণ মানুষ তথা প্রজাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সচেতন হয়ে উঠে-তাদের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়-তারা পরাধীন থাকতে চায় না-স্বাধীনতার প্রত্যাশী হয়। বিদেশী শাসক ব্রিটিশরা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত না করায় জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করত। সেই প্রতিষ্ঠানে প্রধানত মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হত। এইসব প্রতিষ্ঠান মক্তব নামে পরিচিত হত। এগুলো পরিচালনার ব্যয় অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন মক্তব প্রতিষ্ঠারাই দান, সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করার মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। গ্রামীণ একটি মক্তবে নজরুলের পাঠগ্রহণ শুরু। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর।

একবার কিছু শোনে ও দেখেই তিনি তা মনে রাখতে পারতেন। কিন্তু শিশুসুলভ সকল প্রকার চঞ্চলতা-ও তাঁর ছিল। পিতৃবিয়োগের পর সেই চঞ্চলতার যেন ছেদ পড়ল। তার মেধাগুণে তিনি হয়ে উঠলেন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সেই মক্তবেরই শিক্ষক। একজন শিশু শিক্ষক। এক শিশু পড়াতে লাগলেন অন্য শিশুকে। উদ্দেশ্য নিজের অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া। কিছু দেয়ার মাধ্যমে আনন্দ লাভ-যে আনন্দ মহৎ।

তার ভেতরে ছিল এক ভবঘুরে মন। মক্তব ছেড়ে ভর্তি হলেন উচ্চ বিদ্যালয়ে-মাথরুন নবীন চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে। স্থিত হলেন না সেখানে। গ্রামীণ নিসর্গ, প্রকৃতি, ঋতুচক্র যেমন তার মনকে প্রভাবিত করে, অজানাকে জানার এবং অচেনাকে চেনার নিরন্তর কৌতূহল-ও তাকে আন্দোলিত করে। ঘরছাড়া স্বভাবের এই শিশু অন্য সকল মানুষের জীবন ও সংগ্রামের রহস্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ঘর তাকে বাঁধতে পারে না। বিশাল আকাশকেই তার মনে হয় তার মাথার ওপরে খাঁচার মত উপুড় হয়ে তাকে আটকে রেখেছে। তাই তিনি মনে মনে ‘ভূলোক, গোলোক ও দ্যুলোক’ ছাড়াতে চাইতেন কেবলÑনিজেকে মুক্ত করতে চাইতেন। মনের আহ্বানে সাড়া দিতেন, গান শোনাতেন, শুনে শুনে গাইতেন।

তারই পরিক্রমায় গ্রামীণ লোক-নাট্য ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দিলেন। সেখানেও তার দলপতি উস্তাদ শেখ চকোর গোদা ও বাসুদেব তাকে সেরাদের ‘সেরা’ বলে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি শুধু লেটোর দলে গানই গাইলেন না। গানের পালা রচনা করলেন। ‘ মেঘনাদ বধ’, ‘হাতেম তাই’ ‘চাষার সঙ’, ‘আকবর বাদশা’ প্রভৃতি পালা রচনা করতে যেয়ে হিন্দু পুরাণ রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বেদ যেমন পড়লেন, তেমনি পড়লেন কোরান-হাদিস, ইতিহাস-কাব্য প্রভৃতি। মক্তব-বিদ্যালয় ছেড়ে হয়ে গেলেন প্রকৃতির ছাত্র।

কিন্তু আগুন যে ছাই চাপা থাকে না। প্রতিভার আগুনের শিখা দেখে ফেললেন পুলিশের এক দারোগা, যিনি নিজেও কাজী বংশের সন্তান, রফিজুল্লাহ। চাকরি করেন আসানসোলে। কিন্তু তার জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলা। নি:সন্তান রফিজুল্লাহ মায়ায় পড়ে গেলেন শিশু নজরুলের। নিয়ে এলেন জন্মস্থান ময়মনসিংহে। ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে ভর্তি করে দিলেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। কেমন ছিলেন তিনি এখানে ? জন্মভিটা চুরুলিয়া থেকে কয়েকশত কিলোমিটার দূরে-মাতৃআঁচল ছিন্ন পিতৃহীন শিশু! সহপাঠীরা কেউ লিখে রাখেন নি।

১৯১১ সনে ময়মনসিংহে আনীত হয়ে থাকলে পেরিয়ে গেছে একশত তের বছর। সহপাঠীদের কেউ বেঁচেও নেই। কিন্তু বেঁচে আছে নানারূপ গল্প ও কল্পনা। বড় বড় মানুষদের নিয়ে এমনই হয়। তাদেরকে কেন্দ্র করে অনেক কাহিনী তৈরী করা হয়। মানুষ জীবনের গল্প শুনতে ভালবাসে। তাই জীবন নিয়ে গল্প তৈরী হয় কিন্তু তা জীবনের অংশ না-ও হতে পারে। কেউ বলেন নজরুল ময়মনসিংহের ত্রিশালে এক বছর ছিলেন, কেউ বলেন দেড় বছর, কেউবা দু’বছর। প্রথমে ছিলেন কাজী রফিজুল্লাহ’র বাড়ি। এরপরে ছিলেন ত্রিশালের নামাপাড়ায় বিচুতিয়া বেপারির বাড়ি। এই দু’বাড়িতে থাকা নিয়ে অবশ্য কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু তর্ক আছে তার প্রস্থান নিয়ে।

কেউ বলেন তিনি স্কুল-শিক্ষকের কাছে সুবিচার না পেয়ে, কেউ বলেন অভিমান করে চলে গিয়েছিলেন। তবে তিনি কাউকে না বলেই চলে গিয়েছিলেন এটাই প্রতিষ্ঠিত মত। কিন্তু গেলেন কোথায় ? সেই জন্মস্থানে। তবে এবার চুরুলিয়া থেকে বেশ দূরে রাণীগঞ্জের শিহাড়সোল সরকারি স্কুলে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ১৯১৫ সন। পড়াশোনা করলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা। নজরুলের চঞ্চলমতি, ঘরছাড়া ও ভবঘুরে স্বভাবের জন্যে যেন বেমানান। প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হলেন।

মেধাবী বলেই নিয়মিত মাসিক ৭ টাকা বৃত্তি পেতেন। ঐ সময়ের হিসাবে মাসিক ৭ টাকা অনেক টাকা। মাসিক ৩ থেকে ৪ টাকায় সকল প্রকার থাকা-খাওয়ার ব্যয় মিটিয়ে অনায়সে চলা যেত। দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে এন্ট্রান্স বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা। সে প্রস্তুতি চলছে। নিচ্ছেন-ও। হঠাৎ ব্রিটিশ শাসকদল কর্তৃক যুদ্ধযাত্রার ডাক। কিন্তু প্রলোভন দেখানো হলো যে ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জিততে পারলে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে দিয়ে যাবে। জন্মাবধি স্বাধীনতা ও মুক্তি-প্রত্যাশীর হৃদয়ে নাড়া দিল। তিনি সাড়া দেবেন কিনা দোদুল্যমান। কিন্তু কপট ব্রিটিশ জাতি বাঙালিকে উত্তোজিত করার নিমিত্ত অপবাদ ছড়ালো যে বাঙালিরা ভীরু।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার কবিভবনে নজরুল

তারা লড়তে, সংগ্রাম করতে, যুদ্ধে যেতে ভয় পায়। স্বল্পকাল পরের (১৯১৭ সালের মাত্র চার বছর পর লিখিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৯২১ সনে) বিদ্রোহী কবির রক্ত ক্ষোভে নেচে উঠলো। কে রুখে তার মুক্তির আকাক্সক্ষা! বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে নাম লিখিয়ে বাস্তব যুদ্ধযাত্রা করলেন। গন্তব্য করাচি। ১৯১৭-১৯১৯ সাল অব্দি কঠোর সৈনিক জীবন। সুকঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই সাধারণ সৈনিক থেকে হাবিলদার পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি আরবি-ফার্সি সাহিত্যে অধ্যয়নসহ সঙ্গীতে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য মহাকালের এক অবিস্মরণীয় কবি-শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে করাচির জীবনই ছিল এক সাজঘর। যুদ্ধযাত্রার পূর্ব পর্যন্ত নজরুল শিশু। কিন্তু যুদ্ধফেরত নজরুল এক পরিপূর্ণ তরুণ ও চিরকালীন শিল্পী-যার মন ও মানস শিশুর মত আজীবন নিষ্পাপ।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট 

;