আমাদের মৌটুসি পাখিরা



ড. আ ন ম আমিনুর রহমান পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বহুপুষ্পিকা গাছে সিঁদুরে মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক।

ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বহুপুষ্পিকা গাছে সিঁদুরে মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক।

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রজাপতি বাদে পৃথিবীতে কোনো উড়ন্ত সৌন্দর্য থাকলে তা হলো পাখি। তবে পাখির রাজ্যে কোনটি সুন্দরতম তা বলা কঠিন। কারণ, একেকটি পাখি একেক দিকে সুন্দর। এদেশের কমবেশি ৭২৩ প্রজাতির পাখির মেলায় সুন্দর পাখির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে, অনেকের মতে মধুচুষকি (Nectariniidae) গোত্র বা পরিবারের পাখিরাই সুন্দরতম, বিশেষ করে মৌটুসি পাখিরা (Sunbird)। কারণ, ওদের সৌন্দর্য সবখানেই ছড়িয়ে আছে-কী গায়ের রঙে, কী ওড়ার ঢঙে, কী গান গাওয়ায়, কী বাসা তৈরিতে? আবার মৌটুসিদের মধ্যে পুরুষ নীলটুনিকে (Purple Sunbird) এদেশের সুন্দরতম পাখি হিসেবে গণ্য করা হয়। 

বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পাখির গোষ্ঠি হামিংবার্ডের (Hummingbird) মতো মৌটুসিরাও বাতাসে স্থির থেকে উড়তে পারে। এরা প্রজাপতি, ভ্রমর ও মৌমাছিদের মতো ফুলে ফুলে নেচে নেচে মধু পান করে বেড়ায়। অত্যন্ত চঞ্চল পাখি এরা, বেশিক্ষণ এক জায়গায় থাকে না। বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে আলোর ঝিলিকের মতো এগাছ থেকে ওগাছে, এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়ে বেড়ায়। পুরুষ পাখি বা টোনা বেশ আমুদে। ফুলের নির্যাস বা মধু পানের জন্য মৌটুসিদের রয়েছে লম্বা ও নিচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট বা চঞ্চু, যা ফুলের ভেতরে ঢুকিয়ে খাঁজকাটা ও রবারের ডগারের মতো জিহ্বাটি দিয়ে মধু পান করে। নির্যাসের অভাবে ছোট ছোট পোকামাকড়ও খেতে পারে। ফুলের বোঁটার ওপর বসে বাদুড়ের মতো ঝুলে পড়ে যেভাবে ফুলের রস চুষে তা দেখতে বেশ লাগে!

ঢাকার রমনা পার্কে হামিংবার্ডের মতো শূন্যে স্থির হয়ে উড়ছে নীলটোনা। ছবি- লেখক

মৌটুসিদের পালক অত্যন্ত বাহারি রঙের। তবে, এই বাহারি রং শুধু পুরুষ বা টোনাদের মধ্যেই দেখা যায় এবং তা শুধু প্রজননকালে সীমাবদ্ধ। বাহারি পালকগুলোর উপর সূর্যের আলো পড়লে চকচক করে উঠে, তখন সৌন্দর্য যেন বহুগুণ বেড়ে যায়!

মৌটুসিরা পুরনো বিশ্ব অর্থাৎ আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার পাখি। বিশ্বে সর্বমোট ১৪৬টি প্রজাতির মৌটুসি দেখা যায়। এদের মধ্যে এদেশে রয়েছে ৯টি, যার ৫টি আবাসিক ও ৪টি পরিযায়ী। এদেশের ৯ প্রজাতির মৌটুসি পাখির মধ্যে আমি এ পর্যন্ত ৬টি প্রজাতির দেখা পেয়েছি। বাকি ৩টি অতি বিরল, সম্প্রতি কেউ দেখেছে বলে শুনিনি। এখানে এই ৬ প্রজাতির মৌটুসি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচরা করা হয়েছে।

১. নীলটুনি (Purple Sunbird): দুর্গাটুনটুনি বা বেগুনটুনি নামেও পরিচিত। এটি এদেশের সুন্দরতম ও বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। যদিও সেই ছোটকাল থেকেই পাখিটিকে দেখছি, কিন্তু ওর প্রথম ছবিটি তুলি ১৯৯৬ সালে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার সাতশৈয়া গ্রামে। ঢাকার আমার বাসার কাঁঠাল গাছে বেশ ক’বার পাখিটি বাসা করেছিল। নীলটুনি মানুষের কাছাকাছি থাকতেই বেশি পছন্দ করে। শহর-বন্দর-গ্রাম-বন-জঙ্গল সবখানেই দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইরান, চীন প্রভৃতি দেশে বিস্তৃত। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Cinnyris asiaticus (সিন্নিরিস এশিয়াটিকাস)।

নীলটুনির দেহের দৈর্ঘ্য অর্থাৎ চঞ্চুর আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত ১০ সেন্টিমিটার লম্বা, যার মধ্যে চঞ্চুটিই ৪ সেন্টিমিটার। পাখিটির রঙের কি বাহার! দূর থেকে নীলটোনাকে একদম কালো দেখায়। কিন্তু কাছে এলে বোঝা যায় এর গাঢ় নীল রঙ, রোদ লাগলে যা উজ্জ্বল ধাতব বেগুনি-নীল দেখায়। মাথা ও পিঠ ধাতব বেগুনি; বুক বেগুনি-কালো। বুক ও পেটের মাঝখানে পিঙ্গল ও লালচে বলয় থাকে। কালো যে কতটা সুন্দর হতে পারে তা নীলটোনাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। তবে এই রূপ শুধু বাসা বাঁধা ও ডিম পাড়ার মৌসুমেই। ছানারা বাসা ছেড়ে উড়ে যাবার পর থেকে এই নীলচে-বেগুনি ও কালো রঙ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হতে হতে একসময় প্রায় মিলিয়ে যায়, শুধু বুকে একটা কালো চওড়া টান ও ডানার উপরিভাগে কালচে রঙটা থাকে। কিশোর নীলটুনিও দেখতে একই রকম। টোনা এত সুন্দর হলেও স্ত্রী বা টুনি ততটা সুন্দর নয়। টুনির পিঠ হলুদাভ-বাদামি। দেহের নিচের অংশ হালকা-হলুদাভ। লেজ ধূসর কালো।

লেখকের বাসা ঢাকার জিগাতলায় কাঠাল গাছে নীলটোনা। ছবি- লেখক

২. সিঁদুরে মৌটুসি (Crimson/Yellow-backed/Scarlet-throated/Scarlet-breasted Sunbird): সিঁদুরে-লাল মৌটুসি নামেও পরিচিত। ছোট্ট সুদর্শন পাখিটি এদেশের অন্যতম সুন্দর ও দুর্লভ আবাসিক পাখি। এটি এদেশের চিরসবুজ ও পাতাঝরা বন, ক্ষুদ্র ঝোপ ও বাঁদাবনে বিচরণ করে। অনেক সময় গ্রাম ও শহরতলীর সুমিষ্ট মধুসম্পন্ন ফুল বাগানেও ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়। পাখিটিকে আমি প্রথম দেখি রংপুরে, ২০১০ সালে। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় একসঙ্গে দেখেছি ময়মনসিংহে ২০১৪ সালে। এছাড়াও প্রতিবছরই দেখি হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রজাতিটিকে ভারত ও চীনসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখির মর্যাদা লাভ করেছে। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Aethopyga siparaja (ইথোপিগা সিপারাজা)।

সিঁদুরে মৌটুসির টোনা লম্বায় প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার ও টুনি ১০ সেন্টিমিটার। ওজনে ৮ থেকে ১১ গ্রাম। টোনা-টুনির পালকের রঙে অনেক পার্থক্য। টোনার গলা, বুক ও বুকের দু-পাশ উজ্জ্বল লাল। চঞ্চুর গোড়া থেকে গলার দু-পাশে গোঁফের মতো ধাতব নীলচে-সবুজ ডোরা রয়েছে। মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ। রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ও গোঁফ চকচক করতে থাকে। পিঠ কালচে গাঢ় বা মেরুন লাল। কোমড়ের পালক হলুদ। লেজের লম্বা পালক সবুজ যার আগার বাইরের দিকটা সাদা। পেট ও পায়ুর পালক হলদে-জলপাই। ডানার গোড়া লালচে-জলপাই ও বাকিটা গাঢ় জলপাই। টুনির দেহের উপরটা জলপাই-সবুজ ও নিচটা হলদে-জলপাই। লেজ গোলাকার, যার আগা সাদা। গলা ও বুকের উজ্জ্বল লাল আভা ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো। টোনা-টুনি নির্বিশেষে পা, আঙুল, নখ ও বাঁকানো চঞ্চুটি কালচে-বাদামি।

বহুপুষ্পিকা গাছে সিঁদুরে মৌটুসির টুনি। ছবি- লেখক

৩. সবুজাভ মৌটুসি (Ruby-cheeked Sunbird/Rubycheek): এটি চুনিকন্ঠি মৌটুসি নামেও পরিচিত। এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখিটিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ, পাতাঝরা ও বাঁদাবন এবং বনের আশেপাশের ঝোপঝাড়ে দেখা যায়। আমি সর্বপ্রথম ওকে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে দেখেছি। পরবর্তীতে সুন্দরবন ও সিলেট বিভাগে দেখেছি। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির বিস্তৃতি রয়েছে। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Anthreptes singalensis (অ্যানথ্রেপ্টেস সিঙ্গালেনসিস)।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে সবুজাভ মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক

সবুজাভ মৌটুসির চঞ্চুর অন্যান্য প্রজাতির মৌটুসির তুলনায় খাটো ও ফুলঝুরির (Flowerpecker) থেকে বড়। দেহের দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১১ সেন্টিমিটার। টোনা ও টুনির দেহের রঙে পার্থক্য থাকে। টোনার মাথার চাঁদি, ঘাড়, পিঠের উপরাংশ, কোমড় ও লেজের উপরটা ধাতব সবুজ বা পান্না। ডানা ও লেজ কিছুটা কালচে। চিবুক চুনি থেকে বেগুনি। গলা ও বুক গাঢ় লালচে-কমলা। পেট ও লেজের তলা হলদে। অন্যদিকে, টুনির দেহের উপরটা অনুজ্জ্বল জলপাই-সবুজ। গলা ও বুক হালকা লালচে-কমলা। পেট ও লেজের তলা হলদে। তবে, টোনার মতো গালে চুনি রঙ দেখা যায় না। টোনা-টুনি নির্বিশেষে চোখ লাল এবং পা, আঙুল ও নখ সবুজাভ-ধূসর। চঞ্চু ছোট, সোজা ও কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে হুবহু মায়ের মতো, তবে দেহের নিচটা পরোপুরি হলুদ।

কাপ্তাই নেভি ক্যাম্পে যাওয়ার পথে গাছের ছায়ায় সবুজাভ মৌটুসির টুনি। ছবি- লেখক

৪. মৌটুসি (Purple-rumped Sunbird): মনচুঙ্গী নামেও পরিচিত। এটি এদেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। নীলটুনির মতো বাগান ও গাছপালাসম্মৃদ্ধ এলাকায় বাস করে। আমি সর্বপ্রথম ওকে ঢাকার রমনা পার্কে দেখেছি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারে দেখা যায়। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Leptocoma zeylonica (ল্যাপটোকোমা জেইলোনিকা)।

মৌটুসির দেহের দৈর্ঘ্য ১০ সেন্টিমিটারের কম। নিচের দিকে বাঁকানো চঞ্চুটি মাঝারি আকারের। টোনা ও টুনির দেহের রঙে পার্থক্য রয়েছে। টোনার দেহের উপরটা গাঢ় মেরুন। মাথা নীলাভ-সবুজ, নির্দিষ্ট কোণ থেকে যা চকচকে দেখায়। ঘাড় গাঢ় সবুজ ও পাছা বেগুনি। কালচে গলায় বেগুনি আভা ও বুকে মেরুন ডোরা। দেহের নিচটা সাদাটে। অন্যদিকে, টুনির দেহের উপরটা জলপাই বা বাদামি। গলা সাদা ও বুক হলদে। লেজের উপরের পালক-ঢাকনি কালো। চোখের উপরে একটি হালকা দাগ থাকতে পারে। টোনা-টুনি নির্বিশেষে চোখের মনি লালচে। চঞ্চু, পা ও আঙুল কালচে।

ঢাকার রমনা পার্কে একটি পুরুষ মৌটুসি। ছবি- লেখক
  

৫. বেগুনি-গলা মৌটুসি (Purple-throated/Van Hasselt’s  Sunbird): বেগুনি-বুক মৌটুসি নামেও পরিচিত। এটি এদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। বনের কিনারা, ছড়ার আশপাশ, বন লাগোয়া আবাদি জমি ও বাগানের ফুলে ফুলে বিচরণ করে নির্যাস পান করে। ওকে প্রথম দেখি শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। পরবর্তীতে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে এবং সবশেষে এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারিতে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মিলে। বেগুনি-গলা মৌটুসির বৈজ্ঞানিক নাম Leptocoma sperta (ল্যাপটোকোমা স্পারটা)।

কাপ্তাই বন বাংলোর একটি গাছে বেগুনি-গলা মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক

পাখিটির দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ১০ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে ঠোঁটই প্রায় ১.৬ সেন্টিমিটার। টোনা ও টুনির চেহারায় কোনো মিল নেই। টোনাটি প্রথম দর্শনে কালচে পাখি। তবে, রোদের আলোয় মাথার চাঁদি ধাতব সবুজ দেখায়। ঘাড়, পিঠ, ডানা ও লেজ কালচে। দেহের পেছনটা ও কোমড় নীল। বুক ও পেটের উপরটা লালচে, তলপেট বাদামি। টুনির দেহের উপরটা জলপাই-বাদামি ও নিচটা হালকা হলুদ। সাধারণ মানুষের পক্ষে অন্যান্য প্রজাতির স্ত্রী মৌটুসি থেকে এটিকে আলাদা করা কঠিন। টোনা-টুনি নির্বিশেষে সরু ও সামনের দিকে বাঁকানো চঞ্চুটি কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কালো। চোখের মনি বাদামি।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বড় ছড়ায় সীমগাছে বেগুনি-গলা মৌটুসির টুনি। ছবি- লেখক
   

৬. সিঁদুরে হলুদ মৌটুসি (Mrs. Gould's sunbird): মিসেস গোল্ডের মৌটুসিও বলা যায়। বিখ্যাত বৃটিশ পক্ষীবিদ জন গোল্ডের স্ত্রী এলিজাবেথ গোল্ডের নামে এই পাখির নাম রাখা হয়েছে, যিনি ছিলেন একজন চিত্রকর। জন গোল্ডের বেশ ক’টি পাখির বইয়ের ছবি উনি এঁকেছেন। অতি সুন্দর বিরল পাখিটি পরিযায়ী হয়ে কালে-ভদ্রে এদেশে আসে। পাখিটিকে প্রথম দেখি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দার গাছে ২০১৯ সালের ৯ মার্চ। পরের দু’বছরও একই সময় ওদের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দেখলাম। মূল আবাস হিমালয়ের আশপাশের দেশ, যেমন- ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, চীনের দক্ষিণাঞ্চল ইত্যাদি। পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Aethopyga gouldiae  (ইথোপিগা গোল্ডি)।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দার গাছে সিঁদুরে হলুদ মৌটুসির টোনা। ছবি- লেখক

সিঁদুরে হলুদ মৌটুসির টোনা লম্বায় ১৪ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে লেজ ৪ ও ঠোঁট ২ সেন্টিমিটার। তবে, টুনি মাত্র ১০ সেন্টিমিটার লম্বা। বাহারি এই পাখিটির রঙের মেলা শুধু টোনার দেহেই। অন্যান্য প্রজাতির মৌটুসির মতো টুনির দেহ অনুজ্জ্বল জলপাই। লেজ ছোট ও গোলাকার। পেট হালকা হলদে। মাথা ও মুখম-ল ধূসর বা নীলচে-ধূসর। অন্যদিকে, বাহারি টোনার মাথার চাঁদি, মুখমণ্ডল, কান-ঢাকনি ও গলা ধাতব নীল থেকে বেগুনি। মাথার পিছন, ঘাড়, পিঠ ও দেহের উপরটা সিঁদুরে লাল। ডানার উপরটা জলপাই। বুক-পেট ও লেজের নিচের দিক হলুদ। লেজের পালক নীল। চোখ বাদামি। চঞ্চু, পা, আঙুল ও নখ কালো।

প্রজাতিভেদে মৌটুসিরা ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রজনন করে। তবে কোন কোন প্রজাতি বছরের যে কোন সময় ডিম-ছানা তুলতে পারে। গ্রামে বাসকারী মৌটুসিরা সাধারণত গেরস্থ বাড়ির আঙিনায় বরই-ডালিম গাছের চিকন ঝুলে পড়া শাখা প্রশাখায় অথবা লাউ-সিম লতানো গাছের ডগায় বাসা বাঁধে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গেরস্থ বাড়ির আশপাশে ছাড়া এরা বাসা বাঁধতেই চায় না। মানুষের সান্নিধ্য এদের চাই-ই চাই। এই যে মানুষের এত কাছে বাসা বাঁধে তবুও সচরাচর তা চোখে পড়ে না। হঠাৎ দেখলে বাসাটাকে ঝোপ-জঙ্গল ছাড়া অন্য কিছু মনে হবে না। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতেই এ ধরনের ছদ্মবেশী (Camouflage) বাসা বানায়। নীলটুনি ও মৌটুসির বাসা দেখতে প্রায় একই রকম।

তবে মৌটুসির তুলনায় নীলটুনির বাসা খানিকটা বড় হয়। শহরের মৌটুসিরা লতানো গাছে, যেমন- কলকে জবা, বাগান বিলাস, মাধবী লতা, মালঞ্চ, ঝুমকো প্রভৃতি ঝোঁপেও বাসা বাঁধে। বাসা মাটি থেকে দুতিন মিটার উঁচুতে থাকে। সিঁদুরে মৌটুসি ছোট গাছ বা ঝোপঝাড়ের ঝুলন্ত সরু ডালে শিকড় বা চিকন আঁশ দিয়ে ঝুলন্ত বাসা বানায়। এদের বাসা নীলটুনির থেকে লম্বা ও চাপানো এবং দেখতে খোসা ছাড়ানো পাকা ধুন্দল-এর মতো। অন্যদিকে, পাহাড়ে বসবাসকারী বেগুনি-গলা মৌটুসি লম্বা থলের মতো ঝুলন্ত বাসা বানায় গাছের সরু শাখায় ঘাস, আঁশ, পাতা, বাকল, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দিয়ে। টোনা-টুনি একসঙ্গে মিলেমিশে বাসা বানায়।

কাঠাল গাছে নিজ বাসায় ডিমে তা দানরত নীলটুনি। ছবি- লেখক

মৌটুসিদের বাসার গড়নে ও সাজসজ্জায় রুচি ও বিলাসের ছাপ দেখা যায়। সৌন্দর্য ও প্রকৌশলী গুণে বাবুইয়ের পরই এদের বাসার স্থান। মাকড়সার জাল দিয়ে বাসার ভিত রচনা করে। বাসাটা দেখতে অনেকটা থলের মতো। বাসায় ঢোকার পথ উপরের দিকে। ঢোকার পথের মুখের উপরে সানশেডের মতো ছাদ থাকে। বৃষ্টির পানি আটকানোর জন্যই হয়তো এ ব্যবস্থা। বাসায় ডিম বাচ্চা রক্ষার জন্যও সব ধরনের ব্যবস্থা আছে।

বাসাটি ঝোঁপ-ঝাড়-লতার সঙ্গে ভালোভাবে আটকানো থাকে, বাতাসে দোলে। বাতাসের সময় ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাসার নিচের দিকে মাকড়সার জাল ও লতাপাতা সূতোর মতো ঝুলানো থাকে। এরা অত্যন্ত বিলাসি পাখি। এদের বাসার ভেতরে থাকে চমৎকার অলংকরণ। মিহি ঘাস, সরু পাতা ও কোমল লতাকাঠি দিয়ে বাসা তৈরি করে। বাসার উপরে ফুলের পাঁপড়ি মাকড়সার আঠা দিয়ে সেঁটে দেয়। গোলাপ পাঁপড়ি, বাগান বিলাসের শুকনো পাঁপড়ি, রঙিন কাগজের টুকরো, শিমুল তুলো, কাশ ফুল, পাটের মিহি সাদা আঁশ ইত্যাদি বাসায় সাঁটা থাকে। বাসার ভেতরে ডিম রাখার জন্য থাকে কোমল বিছানা।

 মেহেরপুরে নিজ বাসায় একটি স্ত্রী মৌটুসি। ছবি- লেখক

এরা প্রতি মৌসুমে নতুন বাসা বানায়। তবে পুরনো বাসাটি শক্তপোক্ত থাকলে অনেক সময় দু’বারও ব্যবহার করতে পারে। আমার বাসার কাঁঠাল গাছে, আমার ঠিক জানালা বরাবর একজোড়া নীলটুনি বাসা বানিয়েছিল। এরা পরপর দুই মৌসুম সেই বাসাটিতে বাচ্চা তুলেছে। তৃতীয় মৌসুমেও বাসাটিকে একটু ঠিকঠাক করে চালিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু একদিন এক ঝড়ে বাসাটি ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে ওরা আর সেটা ব্যবহার করতে পারে নি।

বাসার জায়গা পছন্দ করা ও বাসা তৈরির পুরো দায়িত্ব মেয়ে পাখির। ছেলেটি শুধু মাঝে মাঝে এসে কাজ তদারকি করে। প্রজাতিভেদে স্ত্রী মৌটুসি ২ থেকে ৩টি সাদা, ধূসর বা সবুজাভ সাদা ডিম পাড়ে। তার উপর থাকে লালচে, গোলাপি বা বাদামি ছোপ। টুনি বাসায় বসে যখন ডিমে তা দেয়, তার লম্বা ছুঁচালো ঠোঁটটি দরজার মুখে বেরিয়ে থাকে। এ সময় মৃদু বাতাস এলে অল্প অল্প দোদুল্যমান বাসাটি দেখতে চমৎকার সুন্দর লাগে।

টোনা কখনোই ডিমে তা দেয় না; এ দায়িত্বটুকু টুনির। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হতে ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। বাবা-মা একত্রে মিলে বাচ্চাদের খাইয়ে-দাইয়ে বড় করে তোলে। বাচ্চারা বেশ দ্রুত বাড়ে। ডিম থেকে ফোটার ১৬ থেকে ১৭ দিনের মাথায় বাচ্চারা বাসা ছাড়ে। বাসা ছাড়ার পরও এরা সপ্তাহ দুয়েক বাবা-মার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। এরপর একসময় ঘর বাঁধে। আমাদের মৌটুসিরা ৮ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।

   

গাছেদের পরিচর্যায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

গাছ, আরো গাছ। এখন যেভাবে উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী, তাতে প্রকৃতিতে ধস নামার জন্য হাতে আর খুব বেশি সময়ও নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদেরা। এই সময়ে শুধু নতুন গাছ লাগানোই নয়, পুরনো গাছেদের যত্ন এবং পরিচর্যাও সমান প্রয়োজন। পরিবেশ রক্ষার জন্য একটি ছোট্ট পদক্ষেপকেও স্বাগত জানাচ্ছে বিশ্ব। ঠিক এমনই এক সময়ে সম্প্রতি পার হয়ে যাওয়া ‘বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস’ উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চালু হয়েছে গাছেদের অ্যাম্বুলেন্স সেবা!

জানা যায়, নানা সময়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উপড়ে যায় বহু গাছ। কখনো আবার নির্মাণের কাজে বাধা তৈরির ‘অপরাধে’ নির্বিচারে কেটে ফেলা হয় তাদের। এই অ্যাম্বুলেন্স সেবায় তাদেরই তুলে নিয়ে গিয়ে নতুন করে মাটিতে লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ধারণাটি প্রথম মাথায় এসেছিল পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনকারী ডা. কে আবদুল ঘানির মাথায়। ভারতের সবুজ মানুষ, ‘গ্রিন ম্যান অব ইন্ডিয়া’ বলে পরিচিত ডা. আবদুল ঘানি ইতোমধ্যে ৫০ লাখ গাছ লাগিয়েছেন।

একটি বেসরকারি সংস্থার কাছে তিনি এ প্রস্তাব রাখলে, সংস্থাটি তার চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করতে রাজি হয়।

কীভাবে কাজ করে গাছেদের অ্যাম্বুলেন্স
জানা গেছে, উপড়ে যাওয়া গাছকে নিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় লাগানোর পাশাপাশি এই অ্যাম্বুলেন্স বিভিন্ন জায়গায় বয়ে নিয়ে যায় নানান গাছের বীজও। শহরের মানুষদের মধ্যে গাছ লাগানো-সংক্রান্ত সমস্ত রকম সচেতনতা ও সাহায্য করেন তারা। কোনো গাছ মারা গেলে, তার অংশগুলো ঠিক জায়গায় পৌঁছেও দেন তারা।

এই অ্যাম্বুলেন্সেই থাকেন দক্ষ মালী ও গাছকর্মীরা। তাদের সঙ্গে থাকে বাগান করার নানান জিনিসপত্র- সার, পানি, ঝারি, খুরপি ইত্যাদি।

এই প্রকল্পে বিশেষভাবে সহায়তাকারী বেসরকারি সংস্থা ‘সাসা'-এর কর্মকর্তা সুরেশ কুমার যাদব বলেন, একইসঙ্গে যেমন পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, সেইসঙ্গে গাছের সংখ্যাও কমছে। এই অবস্থায় বড় বড় প্রাপ্তবয়স্ক গাছগুলির মৃত্যু বোধহয় আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কষ্টকর! সে জন্যই কোনো গাছ যাতে প্রাকৃতিক বা বিশেষ কারণে মরে না যায়, সে কারণে সেগুলিকে রক্ষা করার এই উদ্যোগ এই সময়ে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে হয়েছে আমাদের। এ জন্য যেসব যন্ত্রপাতি বা ওষুধপত্র দরকার, তা সবই আমরা রেখেছি অ্যাম্বুলেন্সে। কোথাও থেকে গাছ তুলে এনে অন্য জায়গায় লাগানোর জন্যও অত্যাধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ভারতের এই 'সবুজ মানুষ' ডা. আবদুল ঘানি ইতোমধ্যে ৫০ লাখ গাছ লাগিয়ে ফেলেছেন, ছবি- সংগৃহীত

অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্পের উদ্যোক্তা ডা. আবদুল ঘানি বলেন, কত গাছ ঝড়ে উপড়ে যায়। পড়ে পড়ে মারা যায়। সেগুলো নতুন করে আর লাগানোর ব্যবস্থা করাই হয় না। এই অ্যাম্বুলেন্স আর তা হতে দেবে না। হেল্পলাইনে ফোন করা মাত্রই আমরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে পৌঁছে যাবো এবং বিনামূল্যে গাছটিকে সরিয়ে আনবো।

আবদুল ঘানি আরো বলেন, শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে উপড়ে যাওয়াই নয়, অনেক সময়েই দেখা যায়, গাছের কারণে সমস্যায় পড়ছেন পথচারী বা শহরবাসী। সেগুলি কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। আমাদের জানালে আর এভাবে মারতে হবে না গাছগুলিকে। যত্ন করে তাদের সরিয়ে অন্যখানে লাগিয়ে দেবো আমরা।

;

জলবায়ু মোকাবিলা-পানি ব্যবস্থাপনায় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি: পরিবেশমন্ত্রী



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, জলবায়ু মোকাবিলা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

তিনি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও ক্রায়োস্ফিয়ার সংরক্ষণ বিষয়ে কথার ফুলঝুরি ও প্রতিশ্রুতি প্রদানের চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।

মন্ত্রী এ চ্যালেঞ্জগুলির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম বৈশ্বিক সংহতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ় অবস্থানের আহ্বান জানান।

তাজিকিস্তানের দুশানবেতে ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য পানি’ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সাধারণ অধিবেশনে মঙ্গলবার (১১ জুন) কান্ট্রি স্টেটমেন্ট বিষয়ে বক্তব্য রাখার সময় পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী এসব কথা বলেন।

এ অধিবেশনে বৈশ্বিক নেতা ও স্টেকহোল্ডাররা পানি, জলবায়ু এবং ক্রায়োস্ফিয়ার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, আমাদের কথা এবং প্রতিশ্রুতির চেয়ে পানি, জলবায়ু এবং ক্রায়োস্ফিয়ার বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ এবং কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য অর্জন এবং একটি স্থায়ী ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক সংহতি, রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা এবং নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ সময় মন্ত্রী আরো বলেন, আন্তর্জাতিক দশক ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য পানি’ উদ্যোগের ৩য় হাই লেভেল আন্তর্জাতিক সম্মেলন দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু একটি সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রচেষ্টার সমন্বয় ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে।

তার বক্তব্যে পরিবেশমন্ত্রী বাংলাদেশে এ বৈশ্বিক উদ্যোগগুলির প্রতি অঙ্গীকার এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্বও তুলে ধরেন।

;

স্বাভাবিক ছন্দে ফিরুক প্রাণপ্রকৃতি!



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ তাণ্ডব চালিয়েছে দেশে। ভয়াবহ এই ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মৃতের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান না মিললেও এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত খবরে এ সংখ্যা ১০।

ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতায় লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঘরবাড়ি ছাড়া অগণন। কেবল মানুষই নন, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য সম্পদ, গবাদি পশুও। এই ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদ ও মৃত মানুষের সংখ্যা গোনা হবে কিন্তু গোনা হবে না সেই পশুপাখির সংখ্যা।

মানবিক দৃষ্টিতে মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণের কথা বলছি ঠিক, তবে এটা সম্ভব হবে না। অবশ্য ওই পথে যাবেনও না কেউ। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবপ্রাণ-সম্পদের পাশাপাশি অগণন প্রাণের ক্ষয় হয়। সেদিকে দৃষ্টিও দেওয়া হয় কম। এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েছি আমরা।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রথম আঘাত আসে সুন্দরবনে। বাংলাদেশের ফুসফুস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরবন প্রতিবারই প্রাথমিক আঘাত সামলায় প্রকৃতির। নিজে লণ্ডভণ্ড হয়ে বাঁচিয়ে দেয় উপকূলীয় এলাকাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

এবারও 'রিমাল'কেও বুক চিতিয়ে রুখে দিয়েছে সুন্দরবন। সুন্দরবনের ক্ষতি হলেও আরো ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে এ বন, ছবি-সংগৃহীত

সিডর, আইলাসহ আরো অনেক দুর্যোগের মতো এবারও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবন। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্লাবিত হয়েছে সুন্দরবন।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় ছাড়াও ৩০ ঘণ্টাব্যাপী জলমগ্ন থাকায় বিশাল ক্ষতি হয়েছে সুন্দরবনের। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০টি হরিণের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে, আরো কয়েকটি হরিণ। বনের মধ্যে থাকা ৮০টি পুকুরে লবণ পানি ঢোকায় মিষ্টি পানির উৎস নষ্ট হয়ে গেছে।

এখানে হয়ত বাঘ ও হরিণের সংখ্যাই আমাদের চোখে পড়বে। এর বাইরে আরো অসংখ্য প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে সুন্দরবনে। তারা গুণতিতে আসলেও আলোচনায় আসবে না।

বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানতে বন বিভাগের সদস্যরা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বন ও সাগরের প্রতিকূল যে অবস্থা, তাতে এই পরিদর্শন এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই নির্ণয় সম্ভব হবে না। সময় লাগবে এর। প্রাণ ও সম্পদের এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় কাগজে-কলমে হলেও এই ক্ষতি কিন্তু পূরণীয় নয়।

সুন্দরবনে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করতে বন বিভাগ কাজ করবে কিন্তু উপকূলের মানুষজনের যে ক্ষয়ক্ষতি, সেটা নির্ধারণ হবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাঠপ্রশাসনের দায়িত্বশীলদের অনুমানে ভিত্তিতে। ফলে, বাস্তবতা আর কাগজের মধ্যে থেকে যাবে বিস্তর ব্যবধান। প্রাণপ্রকৃতির ক্ষতির পাশাপাশি এটাও অপূরণীয় এবং একান্তই ব্যক্তিগত অর্থাৎ যার গেছে, তারই কেবল গেছে!

সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় যা কিছু দেওয়া হবে, সেটা স্রেফ স্মারক সাহায্য হিসেবে থেকে যাবে। এধরনের সাহায্য-সহযোগিতা এমনই হয়ে থাকে। তবে মানুষকেই এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে আগেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা।

‘নার্গিস’, ‘মহাসেন’, ‘বিজলি’, ‘মোরা’, ‘রোয়ানু’, ‘মিধিলি’, ‘মোখা’, ‘আমফান’, ‘ফনি’, ‘সিত্রাং’, ‘বুলবুল’, ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘রিমাল’সহ দুর্যোগ মোকাবিলা করেছেন উপকূলীয় মানুষ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপক্ষে জীবনসংগ্রামের লড়ার যে দুরন্ত অভিজ্ঞতা আর সাহস, এখানেও পথ দেখাবে তাদের।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্কয়ী ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং কোটি মানুষ সব হারালেও সেই উপকূলের মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। মোকাবিলা করেছেন ‘নার্গিস’, ‘মহাসেন’, ‘বিজলি’, ‘মোরা’, ‘রোয়ানু’, ‘মিধিলি’, ‘মোখা’, ‘আমফান’, ‘ফনি’, ‘সিত্রাং’, ‘বুলবুল’, ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘রিমাল’সহ নানা নামের ছোটবড় নানা দুর্যোগকে।

প্রতিবারই ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, জলোচ্ছ্বাস হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ, প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রকৃতির এ ধারা চলতেই থাকবে। কখনো ছোট আবার কখনো বা বড় দুর্যোগ আঘাত হানবে। এটাই ভবিতব্য। এটাকে যখন খণ্ডনের সুযোগ নেই, তখনও সুযোগ আছে মোকাবিলার। মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে সেটা মোকাবিলা করে আসছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সহায়তা করছে। এই সহায়তার বাইরে জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচাতে যে বেড়িবাঁধের কথা বলা হয়, সেটা কি পুরোপুরি হচ্ছে আদৌ!

বিভিন্ন মাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, এখনো অনেক বেড়িবাঁধ অরক্ষিত। অনেক জায়গায় সরকারি বরাদ্দ থাকলেও কাজ হয় না ঠিকমতো। ‘রিমাল’ ঘূর্ণিঝড়ের খবরে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে অনেক এলাকায় বেড়িবাঁধ মেরামত করেছেন এবারও। উপকূলবাসীকে বাঁচাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ কাজগুলো করা উচিত। এটা দেশের অন্য যেকোনো মেগা প্রকল্পের চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং বলা যায়, সবচেয়ে জরুরি এটা! কারণ, এখানে মানুষের বেঁচে থাকা আর জীবনমরণের প্রশ্ন!

দেশের একদিকে যেমন তাণ্ডব চালিয়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’, অন্যদিকে কিছু লোক সামাজিক মাধ্যমে ব্যস্ত ‘ভিউ ব্যবসায়’। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ছবি প্রবল আবেগে ভাসিয়েছে সবাইকে। যে ছবিতে দেখা যায়, কর্দমাক্ত স্থানে এক মা তার সন্তানকে জড়িয়ে শুয়ে আছেন। ছবিটি এবারের ঘূর্ণিঝড়ের বলে দাবি করা হয়। অথচ এই ছবিটি ভুয়া। বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠান ‘রিউমার স্ক্যানার’ জানিয়েছে, মা ও তার সন্তানকে আগলে রাখার এই ছবিটি সঠিক নয়। এটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

বার্তা২৪.কমকে ছবিটি যে অসত্য, তা নিশ্চিত করেছেন ‘রিউমার স্ক্যানার’-এর হেড অব অপারেশনস সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী।

'রিউমার স্ক্যানার’-এর হেড অব অপারেশনস সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, ছবিটি আর্টফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে তৈরি, বাস্তবে নয়

প্রতিষ্ঠানটির অনুসন্ধানে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর তাণ্ডবে ভোলার চরফ্যাশনে কর্দমাক্ত স্থানে মা ও সন্তানের দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত ছবিটি বাস্তব নয়। ছবিটি গত মার্চ মাস থেকেই ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে, যা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি।

যে বা যারা ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স-সহ নানান মাধ্যমে ছড়িয়েছেন নিশ্চিতভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সৎ নয়। সামাজিক মাধ্যমের ‘ভিউ ব্যবসার’ কারণে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলেছেন। এখানে তাদের প্রাপ্তির জায়গা হলো কিছু ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ ও ‘শেয়ার’।

সামাজিকমাধ্যম থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ যেখানে রয়েছে, সেখানে তারা এই মানুষের আবেগ ও সমবেদনাকে পুঁজি করে নিজেরা কিছু কামাই করতে চেয়েছেন। এটা অনৈতিক চেষ্টা তাদের। মানুষ যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে প্রাণ বাঁচাতে লড়ছেন, সেখানে তারা মানুষের অসহায়ত্বকে উপলক্ষ করে মানবিকতার নামে অনৈতিক চর্চা করছেন।

সামাজিকমাধ্যম থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ নিতে অনেকেই আবেগ ও সমবেদনাকে পুঁজি করে নিজেরা কিছু কামাই করতে চেয়েছেন, ছবি- রিউমার স্ক্যানার

রিউমার স্ক্যানার নামের প্রতিষ্ঠানটি ফ্যাক্ট চেক করায়, এখন ছবির অসঙ্গতিগুলো নিয়ে কথা বলছেন অনেকেই। দোষারোপ করছেন যারা ছবিটি প্রচার করছেন তাদের। এই প্রচারকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই হয়ত সরল বিশ্বাসে প্রবল আবেগে আলোড়িত হয়েছিলেন। দুর্যোগেও মানবিকতাকে নিয়ে ব্যবসা করার যে কূটচিন্তা যাদের মাথা থেকে এসেছে, তারা সঠিক কাজ করেননি। এটা অন্যায় হয়েছে তাদের। এই ছবি দিয়ে হয়ত বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি কারো কিন্তু এর দ্বারা মানুষের সরল বিশ্বাস, আবেগকে নিয়ে খেলা করা হয়েছে। এ বিষয়টির আইনি প্রতিবিধান থাকলে সেটা অনুসরণ করা উচিত হবে।

ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর আঘাতে প্রাণপ্রকৃতি ও সম্পদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেটা অপূরণীয় হলেও ক্রমে সবকিছু ফিরবে স্বাভাবিক নিয়মে, স্বভাব ছন্দে। এই সময়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ মোকাবিলা করেছে যে, প্রাণপ্রকৃতি, তাদের মধ্যে রয়েছে টিকে থাকার অফুরন্ত শক্তি। দুর্যোগ-পরবর্তী এই পর্বেও তারা বিজয়ী হবে নিশ্চিত।

কবির য়াহমদ: অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

নদী ধ্বংস করে কোনো প্রতিষ্ঠান নয়: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এমপি বলেছেন, নদীর পাড়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান হবে, বড় বড় স্থাপত্য হবে কিন্তু নদীকে রক্ষা করে সেসব প্রতিষ্ঠান করতে হবে, নদীকে ধ্বংস করে নয়।

তিনি বলেন, সরকার নদী রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের মন্ত্রণালয়ে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, সেটা অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করেই করা হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সার্ভে ঠিকমতো না করেই প্রকল্প নেওয়ার নজিরও আছে। তবে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অংশীজনদের মতামত ও সার্ভে সম্পন্ন করে যাতে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়, সেটি আমি কেবিনেটে তুলবো।

রোববার (২৬ মে) দুইদিনব্যাপী রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘জাতীয় নদী সম্মেলন’-এর শেষদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ সব কথা বলেন।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), পানি অধিকার ফোরাম, রিভারাইন পিপল ও বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের যৌথ উদ্যোগে নদী রক্ষায় এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

বালুমহাল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, হাইড্রোগ্রাফিক সমীক্ষা ছাড়া কোথাও কোনো বালুমহাল করতে দেওয়া যাবে না এবং নদীতে কোনো স্লুইসগেট থাকবে না, এটিও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আছে।

এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। কোনো ব্যত্যয় দেখলে আপনারা পরিচয় গোপন করে আমাদের জানাবেন। আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

খালিদ মাহমুদ আরো বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৪০ শতাংশ ড্রেজিং করবে। বাকি ৬০ শতাংশ নিয়মানুযায়ী টেন্ডারের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার অধীনে দেওয়া হয়। বর্তমানে ১শ ৫০টি ড্রেজার মেশিন সরকারের কাছে আছে। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে কাজ সম্পূর্ণ হচ্ছে না।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান সারোয়ার মাহমুদ বলেন, নদী কমিশনের দায়িত্ব মূলত সুপারিশ করা। আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা তাদের দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, নদীর নাব্যতা, নদীদূষণ, নদীদখল, দখল বা অপদখল এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা মাফিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করলে আমাদের লক্ষ্য পূরণ হবে। এজন্য স্থানীয় মানুষদের অভিজ্ঞতার আলোকে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সিএস রেকর্ডে নদীর উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে দেখা যায়, সেটা স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে ব্যক্তি মালিকানার নামে রেকর্ড হয়ে আইনি জটিলতা তৈরি। আইনের অপপ্রয়োগের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জনগণকে আরো সচেতন করতে হবে। অবৈধ দখলকৃত জায়গা শুধু উদ্ধার করলেই হবে না, সরকারের পক্ষ থেকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেখা যায়, এক পক্ষকে উচ্ছেদ করলে আরেক পক্ষ এসে সেটি দখল করে বসবে কিংবা সেই পক্ষেই ফের দখলে চলে আসে।

বাংলাদেশের নদীর জীবন ও অধিকারবিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপনায় গবেষক ও নদী আন্দোলনকর্মী শেখ রোকন নদী রক্ষায় চারটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রস্তাবনা দেন।

নদীকে মুক্তভাবে চলতে দেওয়া, নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নদীর অর্থনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করা, নদীর প্রতিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস করা এবং নদীর পুনরুজ্জীবনের জন্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা; এছাড়াও আমাদের নদীগুলো কোথায় আছে, কেমন আছে, তা জানা, এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আগালে আমরা নদী বাঁচাতে পারবো বলে মনে করেন তিনি।

নদী সুরক্ষায় যুক্ত আন্দোলনকর্মীদের দুই বছরের (২০২৪-২৬) একটি রোডম্যাপ তুলে ধরে বেলা’র প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নদীর অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আমরা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে নিয়ে এসেছি নানাভাবে দখল-দূষণ, বালু-পাথর উত্তোলন করে।

এ সময় দখল-দূষণকারীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করার দাবি করেন তিনি।

এছাড়াও, বালু-পাথর উত্তোলনের রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর গবেষণা করা এবং নদীর উন্নয়নে জনসংযোগ বৃদ্ধি, নদীবিষয়ক ডাটাবেজ তৈরি, অ্যাডভোকেসি ও আইনি উদ্যোগ, নদীর ‘স্বাস্থ্য কার্ড’-এর রূপরেখা প্রণয়ন (শিল্পদূষণ, গৃহস্থালি বর্জ্য, এন্টিবায়োটিক পলি, রাসায়নিক কীটনাশক ও সারের প্রভাব); নদী সংবাদকর্মী প্ল্যাটফর্ম গঠনসহ বেশ কিছু কর্মসূচি তিনি তার রোডম্যাপে উল্লেখ করেন।

এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, নদীর যত দখল, দূষণ এর সবকিছুর সঙ্গে ব্যবসায়ী মহল এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা যুক্ত। নদী নিয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে।

এজন্য তিনি সরকারিভাবে 'নদী সপ্তাহ' ঘোষণার আহ্বান জানান।

মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, সবার মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা আনতে হবে। বর্তমানে সব জায়গায় দায়িত্বহীনতা চরমভাবে বিরাজ করছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মো. শরীফ উদ্দিন, এনডিসি বলেন, আমাদের অনেক ভৌত উন্নয়ন হয়েছে। এখন প্রয়োজন নৈতিক উন্নয়ন। আমাদের নৈতিক চরিত্র পথ দেখাবে আলোর দিকে। নৈতিক চরিত্র উন্নয়ন হলে কেউ আর অন্যায়ভাবে নদী দখল, দূষণ করবে না।

নদী সম্মেলনের সমাপনী দিনের সভাপতি ড. আইনুন নিশাত বলেন, আমাদের দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পলি পরিবাহিত হয়ে আসে, বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে তা দীর্ঘকাল ধরে আর পরিমাপ করা হচ্ছে না। আমাদের বালু উত্তোলন প্রয়োজন কিন্তু তা পরিকল্পিতভাবে হতে হবে এবং যথাযথ মনিটরিং করতে হবে। নদী সম্পর্কে বেসিক ডাটা নেই। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে এরকম সম্মেলন হলে আরো বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. এজাজ, নদী পরিব্রাজক দল-এর মো. মনির হোসেন এবং সিসিডিবি’র নির্বাহী পরিচালক জুলিয়েট কেয়া মালাকার।

এছাড়াও দেশের ৮টি বিভাগ থেকে ৮ জন নদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

অংশীজনদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে অতিবিপন্ন নদীগুলোকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে বিশদ নাগরিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের ৮ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ১শ নদী আন্দোলনকর্মী যোগদান করেন।

;