কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

মালুমঘাট থেকে পলায়ন

[পূর্বপ্রকাশের পর] বাংলাদেশের মালুমঘাটের মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতাল যতদিন থাকবে ততদিন বেকি ডেভি’র প্রথম ‘মেডিকেল ভুলের’ গল্পটি বলে যাওয়া হবে।

নার্সিং বিভাগের তূখোড় পরিচালকের সেই ঐতিহাসিক ভুলটি কী ছিল? যে-কোনোভাবেই হোক তিনি ডা. ডন কেচামকে একজন রোগীর কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন, যার স্পষ্টতই একটা অপারেশনের দরকার ছিল। দেশি নার্সরা যখন এটা বুঝতে পারলেন এবং তার অপারেশন শুরু হলো, তখন রাত বাজে সোয়া নয়টা। সার্জারি থেকে ফিরে, দরজা খুলে ঘরে ঢুকে, ঘুমুতে ইচ্ছা হচ্ছিল না বলে, সে রেডিও খোলে—যা সে কালেভদ্রে করে থাকে। সে ভয়েস অভ আমেরিকাকে ধরতে পারে না সহজে, কেবল সোয়া এগারোটার খবর শেষ করার আগে-বলা সংবাদ শিরোনামের অংশটুকু শুনতে পারে। বেকি সেই সংবাদ সারাংশে শুনতে পায়: “এবারে মালুমঘাটে অবস্থানরত আমেরিকানদের জন্য একটি বিশেষ ঘোষণা। মার্কিন সরকার জরুরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর সবাইকে অতি সত্বর সড়কপথে বার্মা সীমান্তের দিকে রওনা হতে জোরালোভাবে পরামর্শ দিচ্ছে। চট্টগ্রাম দিয়ে দেশত্যাগের পথ বন্ধ। আবারও বলছি: মার্কিন সরকার জোরালোভাবে ...”

বেশ কয়েকমাস বাদে রিড আমাদেরকে এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটটি জানান।

“বিমানে করে দেশত্যাগ-করা দলটি চট্টগ্রামের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে এতটাই বিচলিত হয়ে পড়েছিল যে, তারা জোর দিয়ে বলে, ‘আমাদের সমস্ত লোক যেন দেশ ছেড়ে চলে যায়’।”

“আমাদের আতঙ্ক আরো বেড়ে গেল যখন জানলাম, শহর থেকে পঁচিশ মাইল দূরে চন্দ্রঘোনায় অবস্থিত ব্রিটিশ ব্যাপ্টিস্ট হাসপাতালটিকে কোনোপ্রকার সতর্কবাণী ছাড়াই মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে। তাদের কুষ্ঠরোগীর বিভাগটায় একটা কামানের গোলা এসে আঘাত করে এবং তাতে এক রোগী নিহত হয়। চন্দ্রঘোনার আবাসিকেরা নিশ্চিত ছিল যে, যথেষ্ট আগে থেকে সতর্কবার্তা না দিয়ে মিলিটারিরা সেখানে আক্রমণ করবে না। তারা অপাত্রে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল।”

“সেনারা হাসপাতালে এসেই প্রত্যেকটা শয্যা পরীক্ষা করে দেখছিল সেখানে কোনো আহত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে কিনা। হাসপাতালের কর্মীদেরকে ভয় দেখানোর জন্য তারা বেশ কজন বাঙালিকে হাসপাতাল ভবনের সামনে দাঁড় করিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে।”

“চট্টগ্রামে অবস্থানরত তাদের ব্রিগেডিয়ার সাহেব মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালের কর্মীদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে রাজি হলেন না। যদি মুক্তিবাহিনীর কোনো সদস্য হাসপাতালের আসে তাহলে তারা তক্ষুনি সেখানে অভিযান চালাবে।”

“এটা ছিল একেবারে ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়া একটা সংবাদ। এই খবরটা নিশ্চয়ই দ্রুততার সঙ্গেই মালুমঘাটে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের লোকেরা হয়তো হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছে এতক্ষণে। তাহলে এই খবরটা তাদেরকে কিভাবে পৌঁছানো যায়? চন্দ্রঘোনা আক্রমণের আগে কোনো সতর্কবার্তা পায়নি, মালুমঘাটও একই বিপদের মুখোমুখি। তাছাড়া সেখানে তখন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হারুন রয়েছেন!”

একটিই মাত্র উপায় রয়েছে—ভয়েস অভ আমেরিকা। তাদের সঙ্গে এমন ব্যবস্থা হয় যে, পরিস্থিতি দাবি করলে তারা আমাদের মিশনারিদের প্রতি যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাসমূহ সকাল সাতটা ও সন্ধ্যা সাতটায় তাদের কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করবে আমাদের উদ্দেশে। এখনই সেই সময়। অবশ্য ভয়েস অভ আমেরিকা মালুমঘাটের লোকদের এই মুহূর্তের বিপদ সম্পর্কে কিছু জানে না। ইউএস এইডের সেই কর্মকর্তা আর আমি দুজনে মাথা খাটিয়ে একটা বার্তা তৈরি করি। তখন বিকাল চারটা বাজে। বিস্ময়করভাবে, তিনি ঢাকায় যাওয়ার বিমান পেয়ে যান। তিনি এই বার্তাটি ভয়েস অভ আমেরিকাকে পাঠিয়ে দেন এবং তারা সেটি সেদিন রাতেই প্রচার করে দেয়।

বেকি দৌড়ে এসে সবাইকে এই খবরটা দেয়। আমরা ওয়াল্শের বাড়িতে জমায়েত হই এবং মধ্যরাতের খবর শুনি, কিন্তু তখন সেটাকে আর পুনরাবৃত্তি করা হয় না। আমাদের সমস্ত আলোচনার মধ্যে এই প্রথম আমরা সবাই সহমত হই যে, এই নির্দেশনা মেনে আমাদের বার্মার পথে রওনা দেওয়া উচিত। আমাদের অরণ্যকেন্দ্র হেব্রনে যাওয়ার পরিকল্পনাটিকে প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করা হয়।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, ডা. ওল্‌সেন এবং ডা. ডন কেচাম থাকবেন এবং বাকিরা (সব মিলিয়ে ২৯ জন) চলে যাবে। এটাকে দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে লিখে রাখা হয়। অন্যদের অনুপস্থিতিতে ভিক ওল্‌সেনকে ফিল্ড কাউন্সিল চেয়ারম্যান ও ডনকে সেক্রেটারি নির্বাচন করা হয়। ডিকুকেরা, যারা সদ্য তাঁদের প্রয়োজনীয় দুটো ফিল্ড কাউন্সিল মিটিংয়ে যোগ দেওয়া সম্পন্ন করেছেন, প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পারেন।

সবাই বাড়ি ফিরে গোছগাছ করতে বসে। আশ্চর্যজনকভাবে, অন্যসময় রাত দশটা থেকে বারোটার মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে গেলেও, সেদিন প্রায় ভোর চারটা পর্যন্ত থাকে এবং ততক্ষণে আমাদের গোছানো হয়ে যায় (এমনকি বারান্দার সেইসব পুরনো কাপড় পর্যন্ত)।

একুশে এপ্রিল , বুধবার
তৈরি হবার জন্য খুব ভোরেই উঠে পড়ি। কেউ কি ঘুমিয়েছিল? ‘ভোয়া’র সকাল সাতটার সংবাদেও একই ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করা হয়। আমরা ঢাকার ঐ ভদ্রলোকের সঙ্গে এমন একটা ব্যবস্থা করি যেন আমাদের জন্য সকল ঘোষণাই সকাল ৭টা কিংবা সন্ধ্যা ৭টায় প্রচার করা হয়। প্রথমবার যে-ঘোষণাটা রাত এগারোটায় দেওয়া হয়েছিল সেটা এর গুরুত্ব অনুধাবন করে। আমরা শেষ পর্যন্ত সকাল ৯টায় মালুমঘাট ছেড়ে যাই।

দেশি ভাইবোনেরা এতটাই মন খারাপ করেছিল যে, আমাদের বিদায় নিতে কষ্ট হয়েছিল খুব। কেউ কেউ অবশ্য বুঝেছিল, আমাদের যাওয়া উচিত, তবে তাদের মনে হচ্ছিল পৃথিবীর তলাটা বুঝি খসে পড়ে গেছে। তাদের এতজন প্রভুর চাইতেও মনে হয় আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছিল বেশি। হয়তো ঈশ্বর আমাদের সরিয়ে নিয়েছিলেন তাদেরকে এটাই বোঝাতে যে, তাদেরও কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া উচিত। আমরা যতদিন এখানে থাকতাম তারাও থাকত। কেউ কেউ ধারণা দিয়েছিল, তারা হেব্রনের উদ্দেশে রওনা করবে। অন্যেরা বার্মা কিংবা ভারতে আশ্রয় নেবার কথা ভাবছিল।

একটা মন-ছুঁয়ে-যাওয়া মুহূর্ত ছিল যখন বাঙালিদের ক্রোধ থেকে আমাদের লুকিয়ে রাখা সেই পশ্চিম পাকিস্তানি দারোয়ান, বদ্ধ ঘরের পর্দা তুলে আমাদের চলে যাওয়া গাড়িগুলোকে বিদায়ী সালাম জানিয়েছিল।

আমাদের চট্টগ্রামের শরণার্থীদের এক কিশোর, বাবলার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। সে ঠিক জানত না কী করবে। সে কি একটা ছোট ছেলে যে, এগিয়ে এসে গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে বিদায়-বলা আমাকে ছুঁতে পারবে, নাকি সে এতটাই বড় হয়ে গেছে যে, তাকে দূরত্ব বজায় রেখে ভদ্র আচরণ করতে হবে? সামনের মাসগুলোতে আমরা জানতে পারব, বাবলা মোটেও কোনো ছোট ছেলে নয়, বরং একজন শক্তিশালী, সাহসী মানুষ।

আমরা তিনটা ল্যান্ডরোভারে যাত্রা করি। আমরা যখন পথে নামি তখন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু টেকনাফ পৌঁছানো মাত্র মুষলধারে ঝরতে শুরু করে। ক্রন্দসী আকাশ যেন সেই সকালে আমাদের মনের অবস্থা ও আবেগেরই প্রতিচ্ছবি ছিল।

তবে মেঘ ও বৃষ্টি আবহাওয়াটাকে ঠান্ডা করে দিয়েছিল, তা নাহলে গাড়িতে ঠাসাঠাসি করা এতগুলো লোকের পক্ষে এই গরম সহ্য করা কঠিন হত।

এলিয়ানোর ওয়াল্‌শ বলেন, “প্রভু আমাদেরকে রাতের বিদ্যুৎ আর এই দিনের বেলার রোদের হাত থেকে আশ্রয় দিয়েছিলেন; আমাদের নিজস্ব অগ্নি ও মেঘের স্তম্ভ।”

কক্সবাজারের উপকণ্ঠে বার্মা যাবার রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল। এই ব্যারিকেডটা আবার তালা দিয়ে আটকানো ছিল, আর তার চাবি যার কাছে ছিল তিনি তখন কক্সবাজার শহরে। জে সেটা আনতে গেলেন, আর ততক্ষণে আমরা একটা কফিবিরতি নিলাম। আমরা চিনির সন্ধান করছিলাম কিন্তু কোথাও চিনি পাওয়া গেল না। একজন দোকানি আমাদেরকে মাগনা কিছু দেশি গুড় এনে দেয়।

আমরা টেকনাফ যাওয়ার পথে বাইরে চমৎকার দৃশ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করি। টেকনাফে আমরা জোয়ার আসার জন্য তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করি যাতে করে সাম্পান ভাসতে পারে; সেই অবসরে বন্ধ দোকানের বারান্দায় বসে আমাদের ঝোলা খুলি। সেখান থেকে আমরা পর্ক ও শিমের বিচি, ভিয়েনার সসেজ, রুটি ও মধু-মাখন এবং সেই কে-রেশনের কিছু চকলেট ক্যান্ডি বার করে খাই।

পুরুষেরা সাম্পানে মাল তোলে, আর আমরা ঊনত্রিশজন সেই সাম্পানের খোলা তলদেশে পেতে রাখা বাঁশের বেঞ্চিতে বসে পড়ি। টেকনাফ থেকে ছয় মাইল দূরের মংদাউ যেতে নৌকাযাত্রায় দেড়ঘণ্টা লাগার কথা। আমরা খাঁড়ি ছেড়ে মূল নদীতে পড়ার সময় একটা সাইনবোর্ড দেখি যাতে লেখা, ‘টেকনাফ সীমান্তফাঁড়ি’।

ভালো বাতাস ছিল, তাই মাঝিরা পাল তোলার চেষ্টা করে। প্রথম চেষ্টায় একটা দড়ি ছিঁড়ে যায়, তবে গার্ল স্কাউট জোয়ান ওল্‌সেন সেগুলোকে গিঁট বেঁধে দেয় এবং দ্বিতীয় চেষ্টায় তারা সফল হয়। পাল তোলার পর দ্রুত এগুনো যায়, কিন্তু তারপরও সেটা অনেক লম্বা পথ ছিল। কয়েকবারই আমাদের বলা হয় মাথা নিচু করে বসে থাকতে, যাতে করে তীরবর্তী সীমান্তপ্রহরীরা আমাদের না দেখতে পায়। সন্ধ্যা নামলে তারা আমাদের একটু চুপ করতে বলে (অসম্ভব) যেন আমরা কোনো সন্দেহের উদ্রেক না করি। তাহলে মাঝিদেরকে আরো বড় অঙ্কের ঘুষ দিতে হবে।

মংদাউ তল্লাশি ফাঁড়ির ঘাটে আমরা ভিড়ি সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার দিকে এবং ছোট্ট আরেকটি সাম্পানের ছাদের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে লাফ দিয়ে পিচ্ছিল কাদাভরা তীরে অবতরণ করি। সবাই নিরাপদে নামতে সক্ষম হয়। তারপর আমরা আবিষ্কার করি যে, ওল্‌সেনের স্লাইডগুলো নৌভ্রমণের পুরো তিনঘণ্টাই ছিল সাম্পানের তলায় জমে থাকা পানির ভেতর। আমরা পানির ওপর একটি খোলা বাঁশের ঘরে গিয়ে জড়ো হই। বাচ্চাদের আমরা পিনাট বাটার, রুটি, কিসমিস ও পানি খাইয়ে দিই। একটা বড় কুকুরও এসে সেই ভোজে যোগ দিতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তারা আমাদেরকে একটা ডাকবাংলোয় নিয়ে গেল।

সেখানে আমরা পুরো বিল্‌স পরিবারকে আবিষ্কার করি; তাদেরকে সেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, রেঙ্গুন থেকে তাদের দেশ ছাড়ার ছাড়পত্র আসার অপেক্ষায়। তারা আমাদেরকে দেখে তেমন বিশেষভাবে বিস্মিত হয়নি। তারা যেন জানতোই যে, আমরাও এসে হাজির হব অচিরেই।

এখন তাহলে মোট চৌত্রিশজন হলাম আমরা। এই অতিথিনিবাসে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন, যারা রেঙ্গুনের ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করার কথা ভাবছিলেন। সেখানে মোট ছয়টা চারপেয়েসহ তিনখানা ঘর ছিল আমাদের সবার জন্য। পুরুষ ও ছেলেরা একটা ঘরে শুলো। মার্ক ওল্‌সেন তাঁর টেনিস শু’কে বালিশ বানিয়েছিলেন, আর জো ডিকুক এক তাড়া টয়লেট পেপারকে। রাতের মাঝখানে, মেল বিল্‌সের ঠান্ডা অনুভূত হলে তিনি একজোড়া দরজার পর্দা নামিয়ে নেন, তারপর গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ছোট্ট বাচ্চা ও তাদের মায়েরা এক ঘরে এবং বড় মেয়েরা আরেক ঘরে ছিল।

তেরো বছরের বেকি কেচাম ভেবেছিল মিলিটারিরা এসে তাকে অত্যাচার করছে। সে সারা রাত খালি বলতে থাকে, উফ, উফ! সকাল বেলা আবিষ্কার করে, সে আসলে গায়ে একটা অসমাপ্ত সেলাইয়ের কাপড় জড়িয়ে ছিল, যেটার গায়ে তখনও পিনগুলো লেগে ছিল। ভাগ্য ভালো সেখানে কোনো ইঁদুর কিংবা মশা ছিল না—এবং বাঁদুড়গুলো দরজার বাইরেই অবস্থান করছিল। প্রধান অসুবিধা, রাতটা খুব ঠান্ডা ছিল। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১১)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১০)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৯)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৮)

দশ টাকার শোক



মনি হায়দার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে মানিব্যাগটা উল্টেপাল্টে দ্যাখে রজব আলী।

মানিব্যাগটা খুব পছন্দ হয়েছে তার। বিশেষ করে মানিব্যাগটার বাদামি রংটা। ব্যাগটা চামড়ার তৈরি। রজব আলী নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোকে। বোঝা যায় না কোন্ পশুর চামড়ায় মানিব্যাগটা তৈরি হয়েছে। মানিব্যাগটার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট কুঠরি। রজব আলী কল্পনায় দেখতে পায়- মানিব্যাগটার ভিতরে রাখা টাকায় ভেতরের কুঠুরিগুলো ভরে উঠেছে।

ব্যাগটা প্যান্টের পকেটে নিয়ে যখন হাঁটবে পিছটা ফুলে যাবে, মুহূর্তেই শরীরের কোষে কোষে একটা অন্যরকম অহমিকা অনুভব করে সে।

ভাই, মানিব্যাগটার দাম কতো ? রজব আলী মানিব্যাগঅলাকে জিজ্ঞেস করে।

ব্যাগঅলা রজব আলীর উপর মনে মনে চটে উঠেছে। সেই কতোক্ষণ থেকে ব্যাগটা উল্পেপাল্টে দেখছে। কেনার কথা বলছে না। অথচ রজব আলীর দেখার মধ্যে দুটো ব্যাগ সে বিক্রি করেছে। ফুটপাতের জিনিস এতক্ষণ নাড়াচাড়া কেউ করে না। ব্যাগঅলা রাগ করে কিছু বলতেও পারে না। যদি কেনে ?

আপনি নেবেন ? রজব আলীর দাম জিজ্ঞাসায় ব্যাগঅলা পাল্ট প্রশ্ন ছোড়ে। কারণ রজব আলীকে দেখে তার মনে হয় না এই লোক মানিব্যাগ কিনবে।

রজব আলী একটি বহুজাতিক কোম্পানির অফিসের পিওন। পরনের পোশাকে ঐ বহুজাতিক কোম্পানির পরিচয় আছে। ব্যাগঅলার ধারণা এইসব লোকজন সাধারণত মানিব্যাগ-ট্যাগ কেনে না। তাদের সামান্য টাকা আয়, কোনোভাবে সেই পয়সায় মানিব্যাগ কেনার মানসিকতা বা প্রয়োজনীয়তাও থাকে না।
নেবো।

ইতোমধ্যে ব্যাগঅলার সামনে দামি প্যান্টশার্ট পরা একজন ভদ্রলোক এসেছে। সঙ্গে তন্বী তরুণী। তাদের আসায় চারপাশের আবহাওয়ায় বিদেশী সেন্টের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। ভদ্রলোকের কাছে রজব আলী অযাচিতভাবে হেরে যায়। বাস্তবতার কারণে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে হয় তাকে।

তন্বী তরুণী ও ভদ্রলোক মিলে কয়েকটা মানিব্যাগ দেখে। বাছাই করে। অবশেষে তন্বীয় কথানুযায়ী ভদ্রলোক তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে তারা মানিব্যাগ দেখলো, দাম করলো, কিনলো এবং চলেও গেলো। অথচ রজব আলী বিশ-পঁচিশ মিনিচের মধ্যে মধ্যে দামটাও জানতে পারলো না ! তারা চলে যাওয়ার পর রজব আলী ব্যাগঅলার কাছে যায়।

বললেন না কতো দাম ?

রজব আলীর দিকে আড়চোখে তাকায়, মানিব্যাগ আপনার পছন্দ হয়েছে?

পছন্দ না হলে দাম জিজ্ঞেস করবো কেনো ?

একশো আশি টাকা।

একশো আশি টাকা। রজব আলী মুখ থেকে বিপন্ন শব্দগুলো বের হয়।

বিরক্তি প্রকাশ করে ব্যাগঅলা, অবাক হওয়ার কি আছে? আপনার সামনেই তো দেখলেন তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ বিক্রি করেছি। ঠিক আছে আপনি ঐ সোয়াশ টাকাই দেন।
সোয়াশ টাকা একটা মানিব্যাগের দাম ! রজব আলীর বিস্ময় কোনো বাঁধা মানে না।

ব্যাগঅলা বুঝতে পারে রজব আলী এতো টাকায় ব্যাগ কিনবে না। সবাইতো ঐ টাকাঅলা ভদ্রলোক নয়, বেশি দাম-দর না করেই তাদের হাকানো দামেই কিনবে। রজব আলীরা তো মানিব্যাগই কেনে না। সেখানে রজব আলী যে কিনতে এসেছে সেটাই অনেক। ব্যাগঅলা মানিব্যাগ বিক্রি করলেও তার পকেটে মানিব্যাগ থাকে না। নিজের সঙ্গে রজব আলীর সাদৃশ্য দেখতে পায় ব্যাগঅলা। একই কাতারের ঠেলা-গুতা খাওয়া মানুষ তারা। লোকটাকে ঠকিয়ে লাভ নেই। হয়তো অনেক আশা করে সারা জীবনে একবার একটা মানিব্যাগ কিনতে এসেছে।

আপনি সত্যিই কি মানিব্যাগটা কিনবেন ? নরম কণ্ঠে ব্যাগঅলা জানতে চায়।

কিনবো বলেই তো পছন্দ করেছি। দাম জানতে চাইছি।

তাহলে শোনেন ভাই, অনেক্ষণ ধরে আপনি মানিব্যাগটা দেখছেন, ফাইনাল কথা বলে দিচ্ছি, মানিব্যাগটা আপনি আশি টাকায় নিতে পারবেন। আশি টাকার এক টাকা কমেও বিক্রি করবো না।
রজব আলীর এই মুহূর্তে ব্যাগঅলাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়। কোথায় একশো আশি টাকা, সেখান থেকে একশত পঁচিশ এবং সবশেষে পুরো শতকই নেই; কেবল আশি টাকা। সে পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে মানিব্যাগটা পকেটে রাখে। মানিব্যাগটা পকেটে রাখার সঙ্গে সঙ্গে রজব আলী নিজেকে একজন দামি মানুষ ভাবে। তার পকেটেও অনেকের মতো মানিব্যাগ আছে।

দীর্ঘদিনের একটা আকাক্ষা, একটা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো রজব আলীর। মানিব্যাগ কেনার একটা সিগারেট কেনে। সাধারণত সে সিগারেট টানে না। কিন্তু এই মুহূর্তে একটা সিগারেট টানার ইচ্ছে হলো তার। না, কেবল সিগারেটই নয়, একটা ঝাল দেওয়া পানও কিনলো এবং মুখে দিয়ে পরম আয়াসে চিবুতে লাগলো। সিগারেটটা ধরিয়ে পান চিবুতে চিবুতে রজব আলী একটা রিকশায় উঠলো। পর পর তিনটি কাজ সে করলো-যা সে খুবই কম করে। সিগারেট টানা, পান খাওয়া এবং রিকশায় করে বাসায় ফেরা। তার জীবনেএকটুকুই শ্রেষ্ঠ বিলাসিতা। রিকশা ছুটে চলেছে।

রজব আলীর মাথার কোষে, যেখানে স্বপ্ন বিলাসী বা ইচ্ছের রক্তকণিকা থাকে- সেখানে মানিব্যাগ কেনার শখ জাগলো প্রায় মাস তিনেক আগে। সে, অফিসের বড় সাহেবের ব্যক্তিগত পিওন। চা, চিনি, সিগারেট থেকে শুরু করে যা কিছু দরকার সবই আনে রজব আলী। দীর্ঘদিনের চাকরির কারণে সে বড় সাহেবের খুব বিশ্বস্ত ও অনুরাগী। অফিসে প্রতিদিন অনেক মেহমান আসে।

নানান কিসিমের মানুষের আনাগোনা বড় সাহেবের কাছে। এইসব মেহমান আসলেই বড় সাহেব বেল টিপে রুমের বাইরে হাতলবিহীন চেয়ারে অপেক্ষায় থাকা রজব আলীকে ডাকেন। রজব আলী ত্রস্ত খরগোশের মতো ভেতরে ঢোকে। কিন্তু ঢুকেই খরগোশের মতো মাথা উঁচু রাখতে পারে না। কোথাকার কোন এক অদৃশ্য অপরিমেয় শক্তি এসে তার মাথাটাকে নিচু করে দেয়।

তার দাঁড়ানো পর বড় সাহেব বড় অবহেলায়, নিপুণ নৈপুণ্যে, গাম্ভীর্যের কৌশলী পারম্পর্যে অবলীলায় প্যান্টের ডান দিক থেকে মোগল সম্রাটদের ক্ষমতায় মানিব্যাগটা বের করে টেবিলে রাখেন। মেহমানবৃন্দ গভীর অভিনিবেশে বড় সাহেবের কর্মকান্ড দেখতে থাকেন। মানিব্যাগটা টেবিলে রেখেই বড় সাহেব টেবিলের অন্যপ্রান্তে রাখা দামি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে পরম আদরে রাখেন এবং তৎক্ষণাৎ লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট টানেন আয়েসের সঙ্গে।

সিগারেটে দু’-দিনটি টান দিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝখানে আটকে রেখে মানিব্যাগটা তোলেন ডান হাতে। মানিব্যাগটা টাকার কারণে সবসময় পোয়াতি নারীর মতো ফুলে থাকে। বড় সাহেবের মানিব্যাগে টাকাগুলো অধস্তন, পরাধীনভাবে নিবিড় শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। একহাজার, পাঁচশ, একশ, পঞ্চাশ টাকার অসংখ্য নোট সাজানো পাশাপাশি। দেখতে কতো ভালো লাগে ! রজব আলী দেখে। দেখেই তার আনন্দ।

বাম হাতে মানিব্যাগটা ধরে ডান হাতের দুই আঙ্গুলে বড় সাহেব বেশ কয়েকটা নোট বের করেন। একটা নোট রজব আলীর দিকে বাড়িয়ে দেন, শীগগির নাস্তা নিয়ে আয়।

রজব আলী বিনয়ের সঙ্গে টাকাটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। এবং নাস্তার আয়োজনে নিদারুণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এইভাবেই রুটিন চলছিলো। হঠাৎ মাস তিনেক আগে রজব আলীর মাথায় এই প্রশ্নটা উঁকি দেয়- বড় সাহেবের গাড়ি বাড়ি টাকা মান-সম্মান ক্ষমতা আছে। রজব আলীর কিছুই নেই। কিন্তু একটা মানিব্যাগতো থাকতে পারে। আর যাই হোক বড় সাহেবের মতো মানিব্যাগ থেকে সেও টাকা বের করে বাস কন্ডাকটর, চালের দোকানদার, মাছঅলা, ডালঅলাদের দিতে পারবে।

এই ভাবনা, স্বপ্ন এবং কল্পনার পথ ধরে কয়েকমাস যাবৎ রজব আলী চেষ্টা করে আসছে একটা মানিব্যাগ কেনার। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। বৌয়ের শরীর খারাপ- ডাক্তারের টাকা দেওয়া, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, বই খাতা কেনা- যাবতীয় সাংসারিক কাজের চাপে মানিব্যাগ কেনা সম্ভব হয়নি। আজকে সে বেতন পেয়েছে। এবং সমস্ত চাপ উপেক্ষা করে রজব আলী মানিব্যাগটা কিনেই ফেললো। আসলে কখনো কখনো একটু-আধটু রিস্ক নিতেই হয়। নইলে ছোটখাট স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ হবার নয়।

রিকশায় বসেই সে জামার বুক পকেট থেকে বেতনের বাকি টাকাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে মানিব্যাগে। মানিব্যাগটার পেট ফুলে যায়। হাতে নিয়ে তার দারুণ ভালো লাগে। কিছুক্ষণ হাতে রাখার পর রজব আলী মানিব্যাগটাকে পিছনে প্যান্টের পকেটে রাখে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে প্যান্টের পিছন দিকটা ফিরে ফিরে দ্যাখে- কতোটা ফুলে উঠলো ? তেমন না। যেভাবে বড় সাহেবের পিছন দিকটা ফুলে থাকে, সে রকম নয়। রজব আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

রিকশা বাসার কাছে আসলে সে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যায়। তার মনের মধ্যে ছোট সুখের একটা ছোট পাখি ডানা মেলেছে। গানের সুর ভাজতে ভাজতে রজব আলী দেড় কামরার স্যাঁতস্যাঁতে বাসায় ঢোকে। সে ঢুকলো সংসারে, তাতে সংসারের কিছু যায় আসে না। সংসারটা তার কাছে সীমাহীন অন্ধগলির মোড়। যেখানে অভাব দারিদ্র ক্ষুধার চাহিদা কুমিরের হা মেলে থাকে, সেখানে তার মতো একজন রজব আলীর আসা না আসায় কিছুই যায় আসে না। রজব আলী স্ত্রী মকবুলা বেগম চতুর্থ সন্তান, যার বয়স মাত্র তিনমাস তাকে মাই খাওয়াচ্ছে।

অন্যান্যরা মেঝেতে জটলা পাকাচ্ছে একটা পুরোনো ক্যারামের গুটি নিয়ে। মকুবলা বেগম ঘাড় ফিরিয়ে রজব আলীকে একবার দেখে আবার মাই দিতে থাকে। রজব আলী কি করবে ভেবে পায় না। সাধারণত বেতন নিয়ে বাসায় ফিরলে তরিতরকারি, চাল, ডাল, লবণ, তেল, সাবান, দুই এক প্যাকেট সস্তা বিস্কুট সঙ্গে নিয়ে আসে রজব আলী। আজকে একবারে অন্যরকম একটা জিনিস এসেছে- যার প্রতি তার নিজের মমতা অনেক। সংসারে অন্যদের প্রতিক্রিয়া কি হবে বুঝতে পারছে না।

শুনছো ? রজব আলী স্ত্রীকে ডাকছে।

কনিষ্ঠতম সন্তানের মুখ থেকে মাই সরাতে সরাতে সাড়া দেয় মকবুলা বেগম, কি ?

একটা জিনিস এনেছি।

মকবুলা বেগম সরাসরি তাকায় রজব আলীর দিকে, কি এনেছো ?

অদ্ভুত একটা হাসি রজব আলীল ঠোঁটে, একটা মানিব্যাগ।

দ্রুত ব্যাগটা বের করে মকবুলা বেগমের হাতে দেয় রজব আলী। ব্যাগটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থানুর মতো বসে থাকে মকবুলা বেগম। একবার কোটরের চোখ দিয়ে তাকায় রজব আলীর দিকে। দৃষ্টি ফিরিয়েই ব্যাগটা অবহেলায় রেখে দেয় সে, মানিব্যাগ ফুটাতে কে বলেছে তোমাকে! বেতন পেয়েছো আজ না ?

বেতন পেলে আর মাথা ঠিক থাকে না। মকবুলা বেগমের লং প্লে রেকর্ড বাজা আরম্ভ হলো, বাসায় কিছু নাই। অফিসে যাবার সময় বললাম, ফিরে আসার সময় ছোট বাচ্চাটার জন্য এক কৌটা দুধ এনো। বড় ছেলেটার খাতা পেন্সিল নেই- নিয়ে এসো। তার কোনো খবর নেই। উনি নিয়ে এলেন মানিব্যাগ। ছেলেমেয়ে বৌয়ের মুখে তিন বেলা ভাত জোটাতে পারে না, উনি মানিব্যাগ কিনে ভদ্দরলোক হয়েছেন! কানার আবার স্বপ্ন দেখার শখ!

রজব আলীর মন শরীর স্বপ্ন আকাক্ষাগুলো শাঁখের করাতে কাটছে এখন। হায়, সংসারের জন্য ব্যক্তিগত দুই-একটা স্বপ্নও কি পূরণ করা যাবে না ! সকাল থেকে রাত পর্যন্ততো সংসারের সুখের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সামান্য একটা মানিব্যাগের জন্য স্ত্রী এমনভাবে শ্লেষের কথা বলে-একেক সময় মনে হয় রজব আলী আত্মহত্যা করে। পারে না।

স্ত্রীর শান দেওয়া কথার বান থেকে আপাতত রক্ষা পাবার জন্য না খেয়ে বাইরে চলে আসে রজব আলী। এভাবেই সে অক্ষমতার জ্বালা, বেদনা ও ক্ষরণকে তাড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে। রাস্তায় দোকানে এখানে সেখানে ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে আবার মকবুলা বেগমের সংসারেই ফিরে আসে। পরের দিন রজব আলী যথারীতি অফিসে।

অফিসের লোকজনের কাছে মানিব্যাগটা দেখায়। কেউ দেখে, কেউ আগ্রহবোধ করে না।

বল তো বারেক, অফিসের আরেকজন পিওনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে রজব আলী- মানিব্যাগটা কেমন হয়েছে ?

বারেক মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে- ভালো। খুব ভালো হয়েছে। কতো টাকায় কিনেছো ?
প্রচ্ছন্ন গর্ব রজব আলীর, তুই বল।

আমি কেমনে বলবো ?
অনুমানে।
বারেক কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলে, ত্রিশ-চল্লিশ টাকা।

তোর বাপের মাথা! ধমকে ওঠে রজব আলী। এ রকম একটা মানিব্যাগ জীবনে চোখে দেখেছিস ? কেমন রং এটার ! ভেতরে কতোগুলো ঘর আছে জানিস ! একহাজার, পাঁচশ, একশো, পঞ্চাশ টাকার নোট রাখার আলাদা আলাদা জায়গা আছে। তাছাড়া এই ব্যাগটা বিদেশী। দেশী না।

তোমার মানিব্যাগের যতো দামই থাক, তুমি বাপ তুলে কথা বলবে ? বারেকের আত্মসম্মানে সামান্য ঘা লাগে।

বলবো না, হাজার বার বলবো। এতো শখ করে একশ টাকা দিয়ে একটা মানিব্যাগ কিনলাম। আর তুই কিনা বলিস মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় কিনেছি ! জানিস, এই রকম মানিব্যাগ আছে আমাদের বড় সাহেবের।

হতেই পারে। আমার তো মানিব্যাগ নেই। কখনো ছিলোও না। তাই দাম জানি না। কিন্ত তুমি একটা একশো টাকা মানিব্যাগে জন্য বাবা তুলে কথা বলতে পারো না-

বারেক যখন মানিব্যাগ সংক্রান্ত তর্কে হেরে যাচ্ছিলো, তখনই বড় সাহেব অফিসে ঢোকেন সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু মেহমান নিয়ে। বারেক চট্ করে সরে যায়। রজব আলী দ্রুত দরজা খুলে দাঁড়ায়। বড় সাহেব সঙ্গীদের নিয়ে রুমে ঢোকেন। রজব আলীকে চা আনতে বলেন বড় সাহেব। শুরু হয় রজব আলীর দৌড়।

কয়েকদিন পর বড় সাহেব অফিসে কয়েকজন ক্লায়েন্টের সামনে বসে রজব আলীকে ডাকেন, রজব আলী?

জ্বী স্যার ?
তোমার হয়েছে কি ?

রজব আলী ভেবে পায় না তার কোথায় কখন কি হয়েছে ? ডানে বামে উপরে নিচে তাকায় সে, কই স্যার-কিছু হয় নাইতো।
তোমার হাতে মানিব্যাগ কেনো ?

এই কথার কি জবাব দেবে রজব আলী? হঠাৎ মগজের কোষ কোনো কাজ করে না। সে বুঝে উঠতে পারে না- তার হাতে মানিব্যাগ থাকলে বড় সাহেবের অসুবিধা কি ? কক্ষের সবাই রজব আলীর দিকে চেয়ে আছে। এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। হঠাৎ রজব আলী উপলব্ধি করতে পারে- মানিব্যাগটা থাকার কথা প্যান্টের পকেটে। হাতে নয়। এবং তার আরো মনে পড়লো মানিব্যাগটা কেনার পর থেকে, বিশেষ করে অফিস করার সময় মানিব্যাগটা কারণে-অকারণে তার হাতেই থাকে। কেন থাকে ?

সে কি সবাইকে তার সদ্য কেনা মানিব্যাগটি দেখিয়ে তৃপ্তি পেতে চায় ? যা প্রকারান্তরে অক্ষম অথর্ব মানুষের করুণ মনোবিকৃতি ? নিশ্চয়ই তার অবস্থা দেখে বড় সাহেব, তার পরিষদবর্গ, অফিসের লোকজন হাসছে। রজব আলী নিমিষে নিজেকে বায়ুশূন্য ফাটা একটা পরিত্যাক্ত বেলুন হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করে। লজ্জায় বালুর সঙ্গে সে মিশে যেতে চাইছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে মুশকিল হচ্ছে- সে ইচ্ছে করলেই বালু বা বায়ুর সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। মানুষ হিসাবে তাকে অনড় ও অবিচল থাকতে হয়।

বড় সাহেবের মুখে অদ্ভুত হাসি- রজব ?

জ্বী স্যার ?
মানিব্যাগটা কবে কিনেছো ?

রজব আলী জবাব দেয় না। দিতে পারে না। ভেতরের কে একজন যেন রজব আলীকে থামিয়ে দিয়েছে। যে রজব আলীর ওষ্ঠ জিহ্বা কণ্ঠ ভেতরের ক্ষুধিত শক্তিকে পাথর বানিয়ে জমাট করে রেখেছে। প্রাণপণে চেষ্টা করছে কথা বলতে। পারছে না। সে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কথা বলছো না কেন ? বড় সাহেবের কণ্ঠে এখন কর্তৃত্ব ও অপমানের সুর।

ঢোক গিলে জবাব দেয় রজব আলী- কয়েক দিন আগে।

কতো টাকায় ?

একশ টাকা।

তাই নাকি ! দেখি, বড় সাহেব হাত বাড়ান।

রজব আলী সারা জীবনের সমস্ত অভিশাপ নিজের মাথায় ঢালে-কেন সে মানিব্যাগ কিনতে গেলো ? কিনলোই যদি তাহলে পকেটে না রেখে হাতে রাখার প্রয়োজন হলো কেন ? দেখাতে চেয়েছিলো বড় সাহেবকে ? বড় সাহেবের মানিব্যাগ থাকলে পারলে তার থাকবে না কেন ? প্রতিযোগিতা ? কি অসম প্রতিযোগিতা ? কি ভয়ংকর গ্লানিকর পরাজয় !

কই দাও, বড় সাহেবের হাতটা তখনো বাড়ানো। নিন।

রজব আলী ব্যাগটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়।

কোথায় যাও? তোমার মানিব্যাগ নিয়ে যাও-

আর যেতে পারে না সে কক্ষের বাইরে। কক্ষের ভিতরে রজব আলীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বড় সাহেব মানিব্যাগটাকে উল্টেপাল্টে দেখেন। কক্ষের অন্যান্য সবাই বড় সাহেবের হাতের ব্যাগটাকে তীর্যক চোখে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে। সে হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে তীক্ষ্ন কাঁটা। কাঁটায় বিষ। যা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করছে রজব আলী। এছাড়া তার উপায়ও নেই।

রজব আলী !

বড় সাহেবের ডাকে চোখ তুলে তাকায় সে, স্যার!

নাও তোমার মানিব্যাগ। ব্যাগটা ভালোই কিনেছো।

হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি নিয়ে রজব আলী দরজা খুলে নিমিষে বাইরে চলে আসে। দরজা দ্বিতীয়বার বন্ধ করতে পারে না, তার আগেই বড় সাহেব এবং অন্যান্যদের হাসির ছুরি তীব্র অপমানে রজব আলীর কান এবং মর্মের মূলে আঘাত হানে। মনে হচ্ছে তাদের হাসির হলকা তাকে শান দেয়া ছুরির মতো কাটছে। আর রজব আলী নিজের রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

রজব আলী মানিব্যাগ আর হাতে রাখে না। প্যান্টের পকেটেই রাখে। মাস শেষে মানিব্যাগের ছোট্ট খোপে খুচরো কয়েকটা মাত্র টাকা দেখতে পায় রজব আলী। মানিব্যাগে টাকা নেই, একটা পরিত্যাক্ত রুমালের মতো মনে হয় মানিব্যাগটাকে। এবং রজব আলী বুঝতে পারে- বড় সাহেবের মতো মানুষদের সঙ্গে রজব আলীরা কোনদিন, কোনোকালে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারবে না।

মাস শেষ, রজব আলীর মানিব্যাগের টাকাও শেষ। অথচ বড় সাহেবের মানিব্যাগে মাসের প্রথম দিকে যতো টাকা ছিলো বা থাকে, এখনো সে রকমই আছে। কমে না। বরং বাড়ে। তাহাদের টাকা বাড়তেই থাকে। বাড়বে আমৃতকাল।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে রজব আলী।

দীর্ঘনিঃশ্বাস এবং পুঞ্জিভূত ক্ষোভ নিয়ে নিত্যদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছে রজব আলী। প্রতিদিনের জীবনাচারের সঙ্গে রজব আলী বেশ মানিয়ে নিয়েছে। মানিব্যাগটা তার সঙ্গে থাকছে প্রতিদিনকার মতো- যেমন তার পকেটে থাকছে একটি রুমাল, একটি চিরুনি।

মাসের প্রথম দিকে মানিব্যাগটা ভরা থাকে, মাঝখানের দিকে কমতে কমতে টাকা অর্ধেকেরও কমে এসে পৌঁছে এবং এই কমার গতিটা বলবৎ থাকে গাণিতিক হারে।

মাসের শেষের দিকে রজব আলী মানিব্যাগ বহন করার আর কোন যুক্তি খুঁজে পায় না। কারণ ব্যাগের তলায় পাঁচ-দশটা টাকা পড়ে থাকে বড় অযত্নে, বড় অবহেলায়। কখনো কখনো রজব আলীর মনে হয়- মানিব্যাগটা বোধহয় তাকেই উপহাস করছে। মাস খানেক পরে একদিন।

রজব আলী অফিস থেকে ফিরছে। মাস শেষের দিকে। বাসে প্রচুর ভিড়। বাসে ওঠা মানে জন্তুর খাঁচায় ওঠা। জীবন যে কতো অবাঞ্ছিত, বাসে উঠেই সেটা বুঝতে পারে রজব আলী।

বাস থেকে নেমেই হাত দেয় প্যান্টের পকেটে। পকেটটা খালি, বুকটা ধড়াস ধড়াস করে, মানিব্যাগটা নেই ! এতো সাবধানে থাকার পরও মানিব্যাগটা নিয়ে গেলো?

রজব আলী কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মানিব্যাগটা পকেটমার নিয়ে গ্যাছে। রজব আলী মানিব্যাগটার জন্য ভাবছে না। ভাবছে মানিব্যাগের সর্বশেষ পুরোনো ময়লা দশটি টাকা...। ওই দশ টাকা থাকলে আরো দুই দিন বাস ভাড়া দিয়ে অফিসে আসা-যাওয়া করতে পারতাম।

;

নৃত্য প্রতিযোগিতায় যশোরে সেরা প্রত্যুষা ঘোষ



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম
পুরস্কার গ্রহণ করছেন প্রত্যুষা ঘোষ

পুরস্কার গ্রহণ করছেন প্রত্যুষা ঘোষ

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশব্যাপি ৬৪ জেলার ক্ষুদে নৃত্য শিল্পীদের নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রতিযোগিতায় যশোর জেলার শ্রেষ্ঠ নিত্য শিল্পী হিসেবে 'মঞ্চমুকুল' পুরস্কার পেলেন প্রত্যুষা ঘোষ (স্নেহা)। সারাদেশের প্রতিটি জেলার ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্রবার (৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর সেগুনবাগিচা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন আয়োজিত 'মঞ্চকুঁড়ি ও মঞ্চমুকুল' পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার তুলে দেন পিপলস থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘প্রায় সবদেশেই শিশুদের নিয়ে নাটক হয়। আজকে সারা বিশ্বে যে শিশু নাটক হচ্ছে সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করছি ১৯৯০ সাল থেকে। জার্মানিতে একটি নাট্যোৎসবে ‘ডাকঘর’ নাটকটি নিয়ে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম। ২৫ দেশ সেখানে অংশগ্রহণ করেছিল। ৪ জন জুরি মেম্বার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেন। নাটক ভালো লাগে এমন ৫/৭টি দেশের কথা বলেছিলেন তারা; তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি।’

শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রতিযোগিতা

জানা গেছে, ২৬২টি শিশু-কিশোর, আদিবাসী ও অবহেলিত শিশু-কিশোর ও যুবনাট্য সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন বিগত ৩৩ বছর যাবত নানান কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মঞ্চকুঁড়ি’ ও ‘মঞ্চমুকুল’ পদক প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারে সারা বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৯০ জনকে ‘মঞ্চকুঁড়ি’ ও ‘মঞ্চমুকুল’ পদক প্রদান করা হয়।

দেশব্যাপি প্রতিটি জেলার থানা পর্যায়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগীত  শিল্পী, নাট্য শিল্পী ও নৃত্য শিল্পীদের বাসাই করা হয়। বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি থানা থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় বাছাই প্রক্রিয়া। সব প্রক্রিয়া সম্পন্নের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যটাগরিতে সারাদেশ থেকে ৩৯০ জনকে নির্বাচিত করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

অনুষ্ঠানে সারাদেশের ৬৪ জেলা থেকে নির্বাচিত   প্রায় ৩৯০ শিশু-কিশোরদের 'মঞ্চকুঁড়ি' এবং যুব নাট্যবন্ধুদের 'মঞ্চমুকুল' পদক প্রদান করা হয়।

অনুর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের 'মঞ্চকুঁড়ি' এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের 'মঞ্চমুকুল' পদক  এবং সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

আলোচনা পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট নাট্যকার, গবেষক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজা  হিলালী। অতিথির বক্তব্য রাখেন পিপলস থিয়েটারের সংগীতের প্রধান শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ইয়াসমীন আলী। শিশুদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সামিয়া মুত্তাকিয়া মহুয়া ও পুষ্পিতা বেপারী। আলোচনাপর্বে সভাপতিত্ব করেন পিপলস থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শিশুবন্ধু লিয়াকত আলী লাকী।

;

ভরা শ্রাবণে শ্রাবণী নেই



আকিব শিকদার
অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ভরা শ্রাবণে শ্রাবণী নেই- এই বেদনায় আজ
হৃদ-আকাশে জমেছে মেঘ ধূসর গড়গড়
বুকের ভেতর পদ্মানদীর ভাঙন ভাঙন স্বর
মন ধরে না সাঙ্গ করতে হাতের কোনো কাজ।

ঝির-ঝির-ঝির এই শ্রাবণে নেই রে কাছে তুই।
কামিনী ডালে ফুটেছে ফুল, কেয়ার গুল্মে কেয়া
হাসনাহেনার সবুজ ঝোপে নিকষ কালো ছায়া।
তুই কাছে নেই, বারেবারে তোর স্মৃতিটাই ছুঁই।

লুড্ডু খেলার ছোট্টবেলা রাখলি কি তুই মনে?
শ্রাবণ মাসের প্রভাতবেলায় বকুলতলার কথা
ফুল কুড়ানো, ঝগড়া তুমুল হতো যে কতো সেথা
আজ যে চোখে সেসব ছবি ভাসছে ক্ষণে ক্ষণে।

শ্রাবণ মাসে তুই কাছে নেই- এই বেদনায় আজ
অশ্রু ঝরে চোখের কোণে অশান্ত বাধাহীন
দীর্ঘশ্বাসে থেকে থেকে বাতাস কাঁপানো বীণ
মন ধরে না সাঙ্গ করতে হাতের কোনো কাজ।

;

পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর বার্তা২৪.কম
পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো

পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো

  • Font increase
  • Font Decrease

সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। যে সভ্যতা নিয়ে গৌরব করে পশ্চিমা দুনিয়া, তার বুনিয়াদের মধ্যে লুকিয়ে আছে দখল, লুণ্ঠন, নির্যাতন ও রক্তপাতের ইতিবৃত্ত। প্রতিটি নির্মাণ, উল্লাস ও উৎযাপনের পেছনে চাপা পড়ে আছে গোপন অশ্রুপাত। ফলে সভ্যতার ইতিহাস নামক মুদ্রাটির একপাশে যা রয়েছে, উল্টা পাশে রয়েছে ঠিক বিপরীত চিত্র।

এই সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে তীব্র বিতর্কের মতোই বিদ্যমান রয়েছে প্রচণ্ড ভিন্নমতও। পশ্চিমা-ইতিহাস বয়ানকে মানে না পূর্বদেশের পণ্ডিতরা। ক্যাপিটালিস্ট ইতিহাসকে অস্বীকার করে মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা। ইসলাম সভ্যতার ইতিহাসকে দেখে এদের চেয়ে আলাদা দৃষ্টিকোণে। এসব কারণে, কারো কাছে যা সভ্যতা, আরেক পক্ষের কাছে তা অন্ধকার। যেমন, ইউরোপের কাছে মধ্যযুগ অন্ধকার। কোন মধ্যযুগ? চতুর্থ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর ইউরোপের সময়কাল। যখন গির্জা মানুষকে দাসে পরিণত করেছিল। ধর্মের নামে পুড়িয়ে মারছিল। ঠিক একই সময়কালে, ভারতে, আরবে, চীনে ও বিশ্বের অন্য কিছু স্থানে শিল্প, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও নির্মাণের সমৃদ্ধি ছিল অতুলনীয়। একইভাবে, ইউরোপের উৎকর্ষের পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক লুটতরাজ, লাতিন আমেরিকার আদিবাসী ও আদি-সভ্যতাকে ধ্বংস করার বর্বরতা।

অতএব, সভ্যতা বললেই হয় না, তা কতটুকু সভ্য, মানবিক ও কল্যাণকর, সেটাও বিবেচ্য। এসব বিশ্লেষণ করে সভ্যতার গতি-প্রকৃতি তুলে ধরার প্রয়াস কম নয়। তবে সেগুলো কোনো একটি পক্ষ বা মতের প্রতিনিধিত্বকারী। সামগ্রিকভাবে সভ্যতার প্রতিটি অভিমুখকে ধরে ধরে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা খুবই কম। বাংলা ভাষায় অত্যল্প।

‘পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো‘ নামের গবেষণা গ্রন্থটি সভ্যতার ইতিহাসের এক প্রাঞ্জল বিবরণ। তবে তা কেবল বিবরণই নয়, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নও বটে। গভীর সমীক্ষায় পৃথিবীর ইতিহাসের নানা পর্যায় ও সভ্যতার নানা পর্ব তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। ঘটনার প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে নেপথ্যের গুপ্ত-কার্যকারণ। ফলে সভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। যাদেরকে মহান অভিযাত্রী বলা হয়, তারা যে ছিল লুটেরা জলদস্যু ও দাস-ব্যবসায়ী, সেটাও উদ্ভাসিত হয়েছে। বিভিন্ন জাতিগত হত্যা ও নিধনের অসংখ্য ঘটনার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিলুপ্তিকরণের উপাখ্যানও বের হয়ে এসেছে। সভ্যতার আলো ও অন্ধকারের এমন পরিচ্ছন্ন ও তথ্যনিষ্ঠ বর্ণনা সত্যিই দুর্লভ।

অবাক করা বিষয় হলো, প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার বিপুলায়তন বইটি দীর্ঘদিন গবেষণার মাধ্যমে রচনা করেছেন মফস্বলের এক তরুণ অধ্যাপক। ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যস্থ গ্রন্থটি সভ্যতার ইতিহাসের প্রথম খণ্ড। যার আরো খণ্ডগুলো নিয়ে কাজ করছেন লেখক। প্রচুর দেশি-বিদেশি তথ্য, উপাত্ত ও আকর গ্রন্থ বিশ্লেষণ করে তিনি সভ্যতার ইতিহাসকে পুনঃমূল্যায়ন করার যে প্রচেষ্টা নিয়েছেন, তা সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত।

‘পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো‘ নামের গবেষণা গ্রন্থটির লেখক মুহাম্মদ ফজলুল হক দাউদ, তার জন্ম ১৯৮৩ সালে ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স, ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স এবং এল এল বি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে মফস্বলে স্নাতক পর্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। লেখকের প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে: গল্পগ্রন্থ 'জীর্ণপাতা', রম্য গল্পের বই 'রঙ্গ ব্যঙ্গ', রম্য গল্পের বই 'গা ঘেঁষিয়া দাঁড়াইবেন না'। প্রকাশের পথে আছে: কিশোর উপন্যাস 'জোড়া পাহাড়ের গহীন অরণ্যে', অণুগল্পের বই অল্প কথার গল্প'। লেখক ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস নিয়ে লিখিত বই 'পৃথিবীটা কীভাবে জলদস্যুদের হলো' এর দ্বিতীয় খণ্ড নিয়ে বর্তমানে কাজ করছেন। তাছাড়া বাংলার নবাবী আমল ও ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়ের ইতিহাস নিয়ে লিখিত 'গল্প আড্ডায় নবাবী বাংলা ও মুঘল সন্ধ্যা' এবং নবাব সিরাজ উদ্দৌলার জীবনভিত্তিক ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস 'খোশবাগ' রচনাতেও তিনি ব্যস্ত রয়েছেন।

ইতিহাসচর্চা প্রকৃত প্রস্তাবে গভীর পরিশ্রম ও তথ্যনিষ্ঠার মাধ্যমে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়ার নামান্তর। প্রযুক্তি ও বাণিজ্য প্রভাবিত পরিস্থিতিতে ইতিহাসের কঠিন ও কণ্টকাকীর্ণ পথে অগ্রসর হয়ে সত্যের মুখচ্ছবি উদ্ভাসিত করার মেধা যেমন অনেকের থাকেনা, তেমনি এমন অলাভজনক কাজে মনোনিবেশ করার মানসিকতাও অনেকের হয় না। যখন অধিকাংশই সম্তা লাভ ও লোভের বশবর্তী হয়ে চট-জলদি কিছু হাতিয়ে নিতে আগ্রহী, তখন ইতিহাসের দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার উচ্চাভিলাসী প্রকল্প নিয়ে কাজ করার হিম্মত দেখিয়েছেন লেখক-গবেষক মুহাম্মদ ফজলুল হক দাউদ। তার এই মহতী প্রচেষ্টা সাধুবাদের যোগ্য।

;