কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৬)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

 আমার শত্রুদের উপস্থিতিতে

[পূর্ব প্রকাশের পর] সেই রবিবার বিকালে আমাদের প্রার্থনাসভা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগে খুব কাছেই প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। আমাদের গলির বাঁদিকের মোড়েই গোলাগুলি ও হত্যাযজ্ঞ চলছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সিঁড়িতে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ও নবগঠিত মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আহতদের নিয়ে আসছিল আমাদের কাছে।

“অবশ্যই আমরা আপনাদের সাহায্য করব,” আমরা তাদের বলি। “তবে একটা বড় সমস্যা আছে। আমাদের কোনো পানি নেই।”

বিন্দুমাত্র দেরি না করে অধিনায়ক তাঁর ছেলেদের কাছাকাছি কুয়োতে পাঠিয়ে দিলেন। একটি সুসংগঠিত বালতিবাহিনী তৎক্ষণাৎ পানি আনার কাজে নেমে গেল।

বাড়িতে বালতিভরা পানির আগমন দেখে, স্বপন তার প্রার্থনার ফল ফলেছে বুঝতে পেরে খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠে।

আমরা আহতদের সেবা করার লক্ষ্যে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসি।

প্রথমজনের পায়ে গুলি লেগেছিল; ডিসি হিলের সামনের গোল চক্করের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময়।

এই আহত ছেলেটার বন্ধুরা ভেবেছিল গুলিটা বুঝি তার পায়ে রয়ে গেছে তখনও। তাদেরই একজন মর্চেপরা একটা সাধারণ ছুরি দিয়ে ক্ষতের পাশটা খুঁচিয়ে দেখার জন্য বলছিল আমাদের। আমরা তাকে নিরস্ত করতে না পারায়, লিন আহত ছেলেটিকে একটা ব্যথানাশক অষুধ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে তাকে ১০০ মিলিগ্রাম ডেমেরোল দেওয়ার কথা বলে—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা খুবই নিরীহ মাত্রার অষুধ; কিন্তু পুষ্টিবঞ্চিত, হালকা গড়নের বাঙালিদের জন্য বেশ কড়াই বটে। এটা শুনে এক পর্যায়ে তারা পিছিয়ে যায় এবং আমাকে অন্য একটা ধারালো জিনিস দিয়ে ক্ষতটাকে পরীক্ষা করতে বলে। আমি এর আগে কখনো গুলির ক্ষত চোখে দেখিনি, ফলে ঠিক বুঝতেও পারছিলাম না আমার আসলে কী করা উচিত। রিড আমাকে ব্যাখ্যা করে বলেন গুলিটা পায়ের মধ্যে আস্ত ঢুকে গেলে কেমন দেখাবে, আর প্রথমেই ফেটে গিয়ে যদি ঢোকে তাহলে তাকে কেমন সিমের বিচির টুকরোর মতো দেখাবে।

জানি না বুলেটটা কোথায় গিয়েছিল, আমি কিন্তু সেটা ছেলেটার পায়ের মধ্যে পাইনি। আমাদের খোঁচাখুচি শেষ হবার আগেই সে ঘুমে অচেতন হয়ে যায়। মিসেস বসুর হাতে তাকে জোর করে খাওয়ানোর কয়েকটা মিনিট বাদ দিলে সারাটা রাত সে মূলত অজ্ঞানই ছিল।

এর পরের লোকটিও সাংঘাতিকভাবে আহত ছিল। তার পায়ে পাঁচটি গুলির আঘাতের পাশাপাশি মাথাতেও গুলি লেগেছিল। তার অপারেশনের দরকার ছিল—যা আমার আর লিনের সাধ্যের বাইরে। তাকে তাই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই আমরা ছেড়ে দিই, তার সাথীদেরকে দিয়ে এই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়ে যে, তারা তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবে। তারা সেটা করতে পেরেছিল কিনা, আমরা কখনো জানতে পারিনি।

অন্যদের আঘাতগুলো পরিষ্কার করে আমরা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিই। আমরা এক যুবকের চিকিৎসা করার সময় সারাক্ষণ সে একটা চাইনিজ গ্রেনেড নিয়ে খোঁচাখুচি করছিল। তার রাইফেলটা সে আরেকজনকে রাখতে দিয়েছিল, যে-কিনা সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ভুল করে একটা গুলি ছুড়ে দেয়। আহত ছেলেটা তাতে রেগে কাঁই হয়ে যায়, কেননা তাদের গোলাবারুদের এতটাই সংকট ছিল যে, প্রত্যেকটা গুলির হিসাব রাখতে হতো।

“আমি একটা গুলি নষ্ট করার চেয়ে বরং প্রাণ দিয়ে দেব।” সে ঘোষণা করে।

আমি যখন এইসব বুলেট আর তার ছররা খোঁজার কাজে ব্যস্ত ছিলাম তখন পাশের গলি থেকে একজন ঘুমের অষুধ খুঁজতে আসে।

“আমার বউ ঘুমাতে পারছে না।” সে ব্যাখ্যা করে বলে।

আমার প্রথম প্রতিক্রিয়াটা ছিল রাগের; সে এই সামান্য ব্যাপারে আমাদের সময় নষ্ট করছে বলে। ঘুমাতে পারছে না—তা কে-ই বা এখন ঘুমাতে পারছে? যখন আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় লোকেরা রক্তাক্ত হচ্ছে, বেঘোরে মারা পড়ছে—তখন এটা কোনো সমস্যা হলো! তারপর আমার মনে পড়ে, সেই নারীর তো আর ভরসা করার মতো কেউ নেই। আমি যেমন প্রতি রাতে মর্টার আর মেশিনগানের গুলির শব্দের মধ্যেও ঘুমাতে যাবার আগে প্রভুর শরণ নিতে, তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে পারছিলাম, তার তো তেমন কেউ ছিল না।

রোগীরা চলে যায়। তখন অষুধপত্তরের জঞ্জাল একটু সাফসুতরো করার ইচ্ছা হলেও, মহামূল্য পানির অপচয় করতে মন সায় দেয় না আমাদের।

আমাদের পরবর্তী অতিথি ছিল মালুমঘাটে এবং আরো দক্ষিণের এক গ্রামে পরিবার রেখে নিরাপদে ফিরে আসা মণীন্দ্র ও গাড়ির ড্রাইভার। আমরা তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে দ্বিগুণ খুশি হয়েছিলাম আমাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য রিডের গাড়িটি ফেরত পেয়ে। ফেরার পথে বারবার তাদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হয়; ইঞ্জিন পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে সামনের সিট তুলে ও যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স পর্যন্ত খুলে দেখা হয়।

মণীন্দ্র হাসপাতালে আমাদের সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর ও চিঠি নিয়ে আসে। আমরা সেগুলো পড়তে পড়তে হাসছিলাম। তাদের অবস্থা আমাদের চেয়ে কতই না আলাদা, আমরা যারা এখানে এই অন্ধকার ঘরের মেঝেতে জবুথবু হয়ে বসে আছি। তাদের জানার কোনো উপায় ছিল না মাত্র পঁয়ষট্টি মাইল দূরে আমাদের জীবনে কী ঘটছিল। তারা আমাদেরকে তাদের কাছে চলে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলেছিল, এবং যাওয়ার সময় তাদের জন্য ‘ব্যাংক থেকে টাকা, দোকান থেকে খাবার এবং দর্জিবাড়ি থেকে কাপড়’ নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল।

অথচ ব্যাংক ছিল বন্ধ, দোকানের সব মালপত্র গেছে লুট হয়ে, এবং দর্জি বেচারাকে সম্ভবত মেরেই ফেলা হয়েছে!

ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে, বাইরে যাওয়া তখন খুবই বিপজ্জনক; ফলত মণীন্দ্র, ড্রাইভার, তার বন্ধু, আর সেই ‘অজ্ঞানপ্রায়’ রোগীটি আমাদের বসার ঘরের দখল নেয়। তারা হালকাভাবে রেডিও ছাড়ে। সেইরাতে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে শেষ যে-কথাগুলো শুনি আমরা, তা ছিল এরকম, “শৃঙ্খলা রক্ষার নামে তারা কার্যত কবর খুড়ছিল সারা দেশে।”

সোমবার সকালে বসবার ঘরে গোল হয়ে বসে আমরা আঠারোজন মুড়ি, চা দিয়ে নাস্তা সারি। পায়ে গুলি লাগা ছেলেটি সিদ্ধান্ত নেয় তার কাজে ফেরা উচিত। নির্মল তাকে গলির শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। মোড়টা পেরিয়ে সে আরেকজন অস্ত্রধারী তরুণের সঙ্গে যোগ দেয়। আর তক্ষুণি পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি ছুটে আসে এবং তাদের একজন মাটিতে পড়ে যায়। নির্মল বাড়িতে ছুটে আসে আমাদের এটা জানাতে যে, সেই রোগীটি গুলি খেয়ে মারা গেছে।

আমরা তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করারও সময় পাইনি, তার আগেই দেখি সে আমাদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বলছে, “আমার ব্যান্ডেজটা পড়ে গেছে। আরেকটা লাগিয়ে দেবেন প্লিজ?”

চারদিকে গোলাগুলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমরা লিনের ঘরেই একটি ছোটখাটো চিকিৎসালয় খুলে বসি। তারপরই আমরা আবিষ্কার করি, একটা ফিল্ড হাসপাতালের জন্য আমাদের যন্ত্রপাতি কী অপ্রতুলই না ছিল! আমাদের এমনকি প্যাঁচানো ব্যান্ডেজের কোনো রোল পর্যন্ত ছিল না!

বিভিন্ন মিশনারি দলের সদস্য ভদ্রমহিলারা যারা আমাদেরকে এগুলো পাঠাতে চেয়েছিলেন তাঁদের কথা ভেবে আমি প্রায় কেঁদে ফেলি। আমি সবসময় এই বলে তা প্রত্যাখ্যান করেছি যে, আমাদের সেসব ড্রামভরা রয়েছে। আর এখন যখন ব্যান্ডেজের দরকার পড়েছে, তখন আমরা কিনা বাচ্চাদের দিয়ে আমাদের বিছানার চাদর ছিঁড়ে, পেঁচিয়ে গোল করাচ্ছি।

প্রত্যেক কক্ষে গিয়ে আমরা আসবাবপত্রগুলো ঠেলে ঠেলে জানালার সামনে এনে রাখি। এতে ঘর একটু অন্ধকার হয়ে গেলেও, বুলেটগুলো আমাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই আঘাত করার মতো যথেষ্ট জায়গা খুঁজে নিতে পারত। সেই সকালে খাবার ও কেরোসিন সমস্যাবিষয়ে আমরা কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের সযত্নে মজুদ-করা টিনজাত খাবার খাবে কেবল তিন আমেরিকান। বাঙালিরা টাটকা খাবার যা থাকবে তা-ই খাবে। বাজার থেকে জব্বার ও নির্মলের আনা চালে ভাত রান্না করার পাশাপাশি সেদিন আমাদের টিন-ভরতি করতে না-পারা সব্জিগুলোও ভাজি করা হয়। আমরা যখন এই সব্জিগুলোকে কিভাবে পচে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করব ভেবে হতাশায় মরে যাচ্ছিলাম, তখন ঈশ্বর ঠিকই জানতেন, আমাদের সেগুলো প্রয়োজন পড়বে। আমি মনে মনে ভাবি, “ঈশ্বর কত বুদ্ধিমান!”

আমরা ঠিক করি, অল্প যেটুকু কেরোসিন বাকি আছে আমাদের সেটাকে আমরা খরচ করব না, যাতে করে বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা চুলাটা অন্তত জ্বালাতে পারি। এর অর্থ, ফ্রিজের কেরোসিন ফুরিয়ে গেলে সেটা আমাদেরকে বন্ধ করে দিতে হবে—আর সেটা ঘটতে পারে যে-কোনো সময়। ওটার কাঁটা দুদিন ধরেই প্রায় শূন্য দেখাচ্ছিল। আমরা আমাদের পানি খাওয়া, গোসল করা এবং রেডিও শোনাও কমিয়ে দিয়েছিলাম।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি ছিল না। এটা কখনো শোনা যেত, কখনো না। বাইরে গোলাগুলির শব্দের মধ্যে হঠাৎ করে এর ঘোষকের গলায় ’জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনলে বেশ উত্তেজনা হতো আমাদের। যতবারই এটা শুনতে পাওয়া যেত ততবারই সারা, রেবেকা আর আমি আমাদের বসার ঘরের চারপাশে একপাক নেচে নিতাম। তারা যে তখনও টিকে আছে এটা জানাটাও এক ধরনের ভরসার মতো ছিল আমাদের কাছে। প্রচার থাকুক আর না থাকুক, আমরা রেডিওটা চালিয়েই রাখতাম, যেন তাদের কোনো অনুষ্ঠানই আমাদের বাদ না যায়। যে-তারটার মাধ্যমে আমরা এই রেডিওটা বিদ্যুতের মাধ্যমেও চালাতে পারতাম সেটা একদিন বেশি গরম হয়ে পুড়ে যায়, ফলে ব্যাটারি ব্যবহার করেই তা শুনতে হতো আমাদের, যেগুলো অবশ্য খুব কমই ‘ever-ready’ থাকত।

রেডিও পাকিস্তান খুলে আমরা শুনি তারা খুব তিক্তভাবে অভিযোগ করছে, ভারত, বিবিসি আর ভয়েস অভ আমেরিকার কোনো অধিকার নেই বাংলাদেশ নামটা ব্যবহার করার। পাকিস্তান সরকার জোর দিয়ে বলে যে, সমস্যা মিটে গেছে। অবস্থা সেনাদের নিয়ন্ত্রণে এবং সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। দোকানপাট খোলা এবং লোকজনও রাস্তায় বেরুচ্ছে। আকাশবাণী অন্যদিকে জানায়, ইন্দিরা গান্ধী একে ’বাঙালি নিধনযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করছেন।

লোকজন আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। অনেকে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে দেখতে আসে, আমরা ঠিক আছি কিনা। আমাদের গির্জার সদস্যরা, কিছু তরুণ ছাত্র এবং মিস্টার ও মিসেস দাশও যখনই সময় পেতেন এসে আমাদের খোঁজখবর নিতেন। এদের কেউ কেউ ট্রাকভর্তি লাশ নিয়ে যেতে দেখেছেন শহরের বাইরে। কেউ কেউ নারী ও শিশুদের শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তিও নাকি পড়েছেন। মনোবল-বাড়ানো বক্তৃতাসমূহ, আর শেখ মুজিবের এমন পূর্বে রেকর্ড-করা টেপ, “আমি ভালো আছি এবং চট্টগ্রামেই আছি”, বাজিয়ে শোনানো সত্ত্বেও বাঙালিরা হতাশ হয়ে পড়ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়া ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্যরা শহরের প্রধান প্রধান পাহাড়ের ওপরে ঘাঁটি গেড়ে থাকলেও তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব থাকায় সেই অবস্থান ধরে রাখাটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছিল। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৪)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১)

   

অনন্তকাল দহন



আকিব শিকদার
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ঝিঝির মতো ফিসফিসিয়ে বলছি কথা আমরা দুজন
নিজেকে এই গোপন রাখা আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

বাঁশের শুকনো পাতার মতো ঘুরছি কেবল চরকী ভীষণ
আমাদের এই ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়ানো আর কতোকাল?
:অনন্তকাল।

তপ্ত-খরায় নামবে কবে প্রথম বাদল, ভিজবে কানন
তোমার জন্য প্রতিক্ষীত থাকবো আমি আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

তোমার হাসির বিজলীরেখা ঝলসে দিলো আমার ভুবন
এই যে আগুন দহন দেবে আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

;

১২৫তম জন্মবর্ষ

মুক্তির অন্বেষী নজরুল



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নজরুল জীবনের ‘আর্তি ও বেদনা’র সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেকালের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নজরুলের আবির্ভাবকালে মুসলমানদের সামাজিক আবহাওয়া এমনই জীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ ছিল যে, কোনো শিল্পীরই সেই আবহাওয়াতে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসার সম্ভব ছিল না। জীবনের প্রথমদিকে তাই কামাল পাশা প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত বীর মুসলিমেরা নজরুল-মানসকে আচ্ছন্ন করেছিল।

কিন্তু অচিরেই তিনি বাঙালির জাগরণের পথিকৃতে রূপান্তরিত হন। বাংলার জাগরণ গ্রন্থে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রণীজন কাজী আবদুল ওদুদ জানাচ্ছেন, ‘নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং যারা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দিলে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’

চরম দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও জীবনের জয়গান গেয়েছেন কবি নজরুল, ছবি- সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে বৃহত্তর পরিসর ও অর্থে গ্রহণ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই (১৯২৭) সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে সাময়িকী ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যে কারণে এদের ‘শিখা গোষ্ঠী‘ নামেও অভিহিত করা হয়।

শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা তথা শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ। ‘বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুলকে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বুদ্ধির মুক্তি, মানব মুক্তি, সমাজের মুক্তি তথা মানুষের শির উচ্চতর করার বাণী উৎকীর্ণ করেছিলেন নজরুল। গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের গানে মুখরিত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম। মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না তাঁর কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। জগতের বঞ্চিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত, স্বাধীনতাহীন বন্দিদের জাগ্রত করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন নজরুল। মানবতার জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন-'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্ …’।

মানুষ আর মানুষের হৃদয়কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। আবার তাঁর কলম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান- ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত জগতের বঞ্চিত ভাগ্যহত’।

শুধু যে কবিতাই লিখেছেন তা তো নয়। তিনি এমন অনেক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। নজরুলের দেশপ্রীতি, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে।

সাম্য ও মানুষের কবি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, ছবি- সংগৃহীত

‘সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাত–ধর্ম ছিল হৃদয়ের প্রেমধর্ম; যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। শুধু লেখনীর দ্বারা নয়, নিজের জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে ঐক্যের আশায় আশাবাদী ছিলেন নজরুল।

তাঁর ব্যক্তিজীবনে এই ভাবনার প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর বিবাহের ক্ষেত্রে, পুত্রদের ক্ষেত্রেও। তাঁর পরিবারের সব সদস্য এবং আপামর বাঙালি এই সত্য নিত্য উপলব্ধি করেন।

১২৫তম জন্মবর্ষে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্য মুক্তির অন্বেষী। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক তথা সুবিশাল সাহিত্যকর্ম বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, নানা কারণে তাৎপর্যবাহী।

কেননা, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনে জর্জরিত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার, হামলা, নির্যাতন।

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ এখন অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন।

এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ-তুল্য কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, বিদ্রোহ, মুক্তি ও মানবতার মহান সাধক।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বৃটিশ-বাংলার সর্বপশ্চিম প্রান্তের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম আর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।'

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানাজন নানামত দিতে থাকেন। এ অবস্থায় স্থাননির্ধারণী সভায় রফিকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন নজরুল তাঁর এক গনে লিখেছেন-

‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’॥

সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর কবর হোক। তাঁর এ প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো। পরবর্তীকালে এ কবর পাকা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ছবি- সংগৃহীত

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবনযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির একটি 'বিদ্রোহী', যা স্পর্শ করেছে রচনার শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক ‘প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক ‘সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ‘ধূমকেতু’তে (২২ আগস্ট, ১৯২২) ছাপা হয়।

বলা বাহুল্য, অসম্ভব পাঠকপ্রিয়তার কারণেই কবিতাটিকে বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ও রচয়িতা কবি নজরুল ‘চির উন্নত শির’ রূপে বিরাজমান।

পুরো বাংলা ভাষা বলয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শাণিত প্রতিবাদ তুলনাহীন। বিদ্রোহীর শতবর্ষকে ‘জাগরণের শতবর্ষ’ রূপে উদযাপন করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী পরিমণ্ডলে আর ১২৫তম জন্মবর্ষে মুক্তির অন্বেষী নজরুলকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি!

 ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

শ্রীপুরের কাওরাইদে নজরুল উৎসব শনিবার



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ কালি নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘ভাগ হয়নিকো নজরুল’ শীর্ষক নজরুল উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে শনিবার। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে এবং নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর সহযোগিতায় এই উৎসবে সেমিনার, আবৃত্তি ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকে তুলে ধরা হবে।

নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর অন্যতম ট্রাস্টি আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক জানান, আয়োজনের শুরুতে শনিবার দুপুর ২টায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সুনীল কান্তি দে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. সাইম রানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ও ছায়ানট (কলকাতা)’র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক।

তিনি আরও জানান, বিকেলে আয়োজনে নজরুলের জাগরণী কবিতা ও গান পরিবেশন করবেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা। আবৃত্তি করবেন-টিটো মুন্সী ও সীমা ইসলাম। নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করবেন শিল্পী ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি থাকবেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার।

‘দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নজরুল চর্চা বেগবান করতে এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এবছর কবি নজরুলের ১২৫তম জন্মবর্ষ। এই বছরটি নজরুলচর্চার জন্য খুবই সবিশেষ। উৎসবে দুই দেশের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে সাময়িকী। সাম্য, মানবতা ও জাগরণের যে বাণী কবি সৃষ্টি করে গেছেন, সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের জন্য তা আলোকবর্তিকা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরুলের এই আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা’-বলেন আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক। 

;

শিশু নজরুল



এ এফ এম হায়াতুল্লাহ
কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত। এটি বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনের দিক দিয়ে বহুগুণ বড় একটি দেশ। বহুজাতির বহু মানুষের বাস সে দেশে। ঐ দেশ অনেকগুলো প্রদেশে বিভক্ত। এই প্রদেশগুলোকে বাংলা ভাষায় রাজ্য বলে অভিহিত করা হয়। এই ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের পূর্বাঞ্চল আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর পশ্চিমাঞ্চল ‘পশ্চিম বঙ্গ’ নামে ভারতের অন্তর্গত রয়ে গেছে।

এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার অধীন আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে এবং ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে জন্মলাভের পর একটি শিশুর কাজী নজরুল ইসলাম নাম রাখেন যে পিতা তার নাম কাজী ফকির আহমদ। আর যে মায়ের কোলে তিনি জন্মান তার নাম জাহেদা খাতুন। এই শিশুটির জন্মের আগে এই পিতামাতার আর-ও ৪ জন সন্তান জন্মের সময়ই মারা গিয়েছিল। শুধু তাদের প্রথম সন্তান কাজী সাহেবজানের বয়স তখন ১০ বছর। অর্থাৎ কাজী নজরুলের সর্বজ্যেষ্ঠ বড় ভাই শিশু কাজী নজরুলের চাইতে ১০ বছরের বড় ছিলেন। নজরুলের পর তার আর-ও একজন ভাই ও বোনের জন্ম হয়েছিল। ভাইটির নাম ছিল কাজী আলী হোসেন এবং বোনটির নাম ছিল উম্মে কুলসুম।

শিশু নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ বই-পুস্তক পড়তে পারতেন। তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাজারের সেবা করতেন। রাজ্য শাসকগণ কর্তৃক বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ অর্থাৎ বিচারকগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতেন। মুসলমান সমাজ থেকে বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজী বলা হত। মুসলমান সমাজে কাজীগণ অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন। নজরুল ইসলাম এইরূপ সম্মানিত পরিবারে জন্মপ্রাপ্ত এক শিশু। তাই জন্মের পর ক্রমশ বেড়ে উঠার পর্যায়ে তিনি পারিবারিকসূত্রেই ভাল-মন্দের পার্থক্য করার এবং হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হয়ে সকলকে সমভাবে ভালবাসার গুণাবলি অর্জন করেন।

মানবজাতির ইতিহাসে যে-সমস্ত মহাপুরুষ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের অধিকাংশই শৈশব থেকে নানারূপ দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়ে সেগুলো জয় করে মহত্ত্ব অর্জন করেছেন। তাদের কেউই একদিনে বড় হয়ে যাননি কিংবা বেড়ে-ও উঠেন নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মানোর আগেই পিতাকে হারিয়েছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে হারিয়েছিলেন জন্মদাত্রী মাকেও। নজরুল তার পিতাকে হারান নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে। পিতা তাকে গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। তখনকার দিনে পড়াশোনা করার জন্যে সরকারি ব্যবস্থা ছিলনা। বাংলাদেশের তখন জন্ম হয়নি।

বিশেষ ভঙ্গিমায় হাবিলদার নজরুল

নজরুলের জন্মভূমি বাংলা প্রদেশ ভারতবর্ষের একটি রাজ্য যা ছিল বিদেশী ব্রিটিশ শাসনাধীন তথা পরাধীন। ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের সাধারণ মানুষ তথা প্রজাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সচেতন হয়ে উঠে-তাদের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়-তারা পরাধীন থাকতে চায় না-স্বাধীনতার প্রত্যাশী হয়। বিদেশী শাসক ব্রিটিশরা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত না করায় জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করত। সেই প্রতিষ্ঠানে প্রধানত মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হত। এইসব প্রতিষ্ঠান মক্তব নামে পরিচিত হত। এগুলো পরিচালনার ব্যয় অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন মক্তব প্রতিষ্ঠারাই দান, সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করার মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। গ্রামীণ একটি মক্তবে নজরুলের পাঠগ্রহণ শুরু। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর।

একবার কিছু শোনে ও দেখেই তিনি তা মনে রাখতে পারতেন। কিন্তু শিশুসুলভ সকল প্রকার চঞ্চলতা-ও তাঁর ছিল। পিতৃবিয়োগের পর সেই চঞ্চলতার যেন ছেদ পড়ল। তার মেধাগুণে তিনি হয়ে উঠলেন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সেই মক্তবেরই শিক্ষক। একজন শিশু শিক্ষক। এক শিশু পড়াতে লাগলেন অন্য শিশুকে। উদ্দেশ্য নিজের অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া। কিছু দেয়ার মাধ্যমে আনন্দ লাভ-যে আনন্দ মহৎ।

তার ভেতরে ছিল এক ভবঘুরে মন। মক্তব ছেড়ে ভর্তি হলেন উচ্চ বিদ্যালয়ে-মাথরুন নবীন চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে। স্থিত হলেন না সেখানে। গ্রামীণ নিসর্গ, প্রকৃতি, ঋতুচক্র যেমন তার মনকে প্রভাবিত করে, অজানাকে জানার এবং অচেনাকে চেনার নিরন্তর কৌতূহল-ও তাকে আন্দোলিত করে। ঘরছাড়া স্বভাবের এই শিশু অন্য সকল মানুষের জীবন ও সংগ্রামের রহস্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ঘর তাকে বাঁধতে পারে না। বিশাল আকাশকেই তার মনে হয় তার মাথার ওপরে খাঁচার মত উপুড় হয়ে তাকে আটকে রেখেছে। তাই তিনি মনে মনে ‘ভূলোক, গোলোক ও দ্যুলোক’ ছাড়াতে চাইতেন কেবলÑনিজেকে মুক্ত করতে চাইতেন। মনের আহ্বানে সাড়া দিতেন, গান শোনাতেন, শুনে শুনে গাইতেন।

তারই পরিক্রমায় গ্রামীণ লোক-নাট্য ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দিলেন। সেখানেও তার দলপতি উস্তাদ শেখ চকোর গোদা ও বাসুদেব তাকে সেরাদের ‘সেরা’ বলে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি শুধু লেটোর দলে গানই গাইলেন না। গানের পালা রচনা করলেন। ‘ মেঘনাদ বধ’, ‘হাতেম তাই’ ‘চাষার সঙ’, ‘আকবর বাদশা’ প্রভৃতি পালা রচনা করতে যেয়ে হিন্দু পুরাণ রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বেদ যেমন পড়লেন, তেমনি পড়লেন কোরান-হাদিস, ইতিহাস-কাব্য প্রভৃতি। মক্তব-বিদ্যালয় ছেড়ে হয়ে গেলেন প্রকৃতির ছাত্র।

কিন্তু আগুন যে ছাই চাপা থাকে না। প্রতিভার আগুনের শিখা দেখে ফেললেন পুলিশের এক দারোগা, যিনি নিজেও কাজী বংশের সন্তান, রফিজুল্লাহ। চাকরি করেন আসানসোলে। কিন্তু তার জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলা। নি:সন্তান রফিজুল্লাহ মায়ায় পড়ে গেলেন শিশু নজরুলের। নিয়ে এলেন জন্মস্থান ময়মনসিংহে। ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে ভর্তি করে দিলেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। কেমন ছিলেন তিনি এখানে ? জন্মভিটা চুরুলিয়া থেকে কয়েকশত কিলোমিটার দূরে-মাতৃআঁচল ছিন্ন পিতৃহীন শিশু! সহপাঠীরা কেউ লিখে রাখেন নি।

১৯১১ সনে ময়মনসিংহে আনীত হয়ে থাকলে পেরিয়ে গেছে একশত তের বছর। সহপাঠীদের কেউ বেঁচেও নেই। কিন্তু বেঁচে আছে নানারূপ গল্প ও কল্পনা। বড় বড় মানুষদের নিয়ে এমনই হয়। তাদেরকে কেন্দ্র করে অনেক কাহিনী তৈরী করা হয়। মানুষ জীবনের গল্প শুনতে ভালবাসে। তাই জীবন নিয়ে গল্প তৈরী হয় কিন্তু তা জীবনের অংশ না-ও হতে পারে। কেউ বলেন নজরুল ময়মনসিংহের ত্রিশালে এক বছর ছিলেন, কেউ বলেন দেড় বছর, কেউবা দু’বছর। প্রথমে ছিলেন কাজী রফিজুল্লাহ’র বাড়ি। এরপরে ছিলেন ত্রিশালের নামাপাড়ায় বিচুতিয়া বেপারির বাড়ি। এই দু’বাড়িতে থাকা নিয়ে অবশ্য কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু তর্ক আছে তার প্রস্থান নিয়ে।

কেউ বলেন তিনি স্কুল-শিক্ষকের কাছে সুবিচার না পেয়ে, কেউ বলেন অভিমান করে চলে গিয়েছিলেন। তবে তিনি কাউকে না বলেই চলে গিয়েছিলেন এটাই প্রতিষ্ঠিত মত। কিন্তু গেলেন কোথায় ? সেই জন্মস্থানে। তবে এবার চুরুলিয়া থেকে বেশ দূরে রাণীগঞ্জের শিহাড়সোল সরকারি স্কুলে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ১৯১৫ সন। পড়াশোনা করলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা। নজরুলের চঞ্চলমতি, ঘরছাড়া ও ভবঘুরে স্বভাবের জন্যে যেন বেমানান। প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হলেন।

মেধাবী বলেই নিয়মিত মাসিক ৭ টাকা বৃত্তি পেতেন। ঐ সময়ের হিসাবে মাসিক ৭ টাকা অনেক টাকা। মাসিক ৩ থেকে ৪ টাকায় সকল প্রকার থাকা-খাওয়ার ব্যয় মিটিয়ে অনায়সে চলা যেত। দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে এন্ট্রান্স বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা। সে প্রস্তুতি চলছে। নিচ্ছেন-ও। হঠাৎ ব্রিটিশ শাসকদল কর্তৃক যুদ্ধযাত্রার ডাক। কিন্তু প্রলোভন দেখানো হলো যে ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জিততে পারলে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে দিয়ে যাবে। জন্মাবধি স্বাধীনতা ও মুক্তি-প্রত্যাশীর হৃদয়ে নাড়া দিল। তিনি সাড়া দেবেন কিনা দোদুল্যমান। কিন্তু কপট ব্রিটিশ জাতি বাঙালিকে উত্তোজিত করার নিমিত্ত অপবাদ ছড়ালো যে বাঙালিরা ভীরু।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার কবিভবনে নজরুল

তারা লড়তে, সংগ্রাম করতে, যুদ্ধে যেতে ভয় পায়। স্বল্পকাল পরের (১৯১৭ সালের মাত্র চার বছর পর লিখিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৯২১ সনে) বিদ্রোহী কবির রক্ত ক্ষোভে নেচে উঠলো। কে রুখে তার মুক্তির আকাক্সক্ষা! বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে নাম লিখিয়ে বাস্তব যুদ্ধযাত্রা করলেন। গন্তব্য করাচি। ১৯১৭-১৯১৯ সাল অব্দি কঠোর সৈনিক জীবন। সুকঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই সাধারণ সৈনিক থেকে হাবিলদার পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি আরবি-ফার্সি সাহিত্যে অধ্যয়নসহ সঙ্গীতে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য মহাকালের এক অবিস্মরণীয় কবি-শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে করাচির জীবনই ছিল এক সাজঘর। যুদ্ধযাত্রার পূর্ব পর্যন্ত নজরুল শিশু। কিন্তু যুদ্ধফেরত নজরুল এক পরিপূর্ণ তরুণ ও চিরকালীন শিল্পী-যার মন ও মানস শিশুর মত আজীবন নিষ্পাপ।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট 

;