কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৪)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ : আলম খোরশেদ
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈশ্বর আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন

[পূর্ব প্রকাশের পর] প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জাতীয় সংসদ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণায় যেন বারুদে অগ্নিসংযোগ করা হলো। সংঘর্ষ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর আগুন ছড়িয়ে পড়ল সারা শহরে।

এক রাতে আমাদের গির্জার এক পুরোহিত আরেকটি গির্জাপরিবারের জন্য বিছানা, বালিশ, কাঁথা ইত্যাদি চাইতে এলো। তিনি আমাদের বলেন যে, বোমা আর মলোটোভ ককটেল বানানোর সময় বিস্ফোরণে তাদের পাহাড়ের পুরো ওপরের অংশটা জ্বলেপুড়ে গিয়েছিল।

পাকিস্তানি সেনারা ’দুর্বৃত্তদের’ (যারাই তাদের বিরোধিতা করত তাদেরকেই তারা দুর্বৃত্ত আখ্যা দিত) কব্জা করার জন্য অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পাকিস্তানিরা স্বীকার করে যে, হাঙ্গামা থামাতে গিয়ে তারা ১৭২ জন মানুষকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল। লন্ডন অবজার্ভার পত্রিকার ঢাকা প্রতিনিধি অবশ্য এই সংখ্যাটিকে কেবল ঢাকা শহরেই ২০০০ বলে উল্লেখ করেন।

এইসব প্ররোচনা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকে। বরং, ৭ই মার্চ, জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। তিনি জনসাধারণকে আহ্বান করেন কেন্দ্রীয় কোষাগারে কোনো খাজনা কিংবা কর জমা না দিতে এবং কোনোভাবেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা না করতে। তিনি রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ থামানোরও আদেশ দেন। বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যেকার দাঙ্গা ও সংঘর্ষ থামানোর জন্য তিনি এমনকি এটাও ঘোষণা করেন যে, “বাংলাদেশের অধিবাসী সবাই বাঙালি।”

দাঙ্গা এক পর্যায়ে থামে। ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতায় পুলিশ কাজে যেতে অস্বীকার করলেও, অইনশৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং রাস্তায় যানবাহনের চলাচল অব্যাহত থাকে।

ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চকে জাতীয় সংসদ অধিবেশন বসার তারিখ হিসাবে নির্ধারণ করেন। শেখ মুজিব তাঁর অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা প্রদানে নিম্নোক্ত শর্তাবলি আরোপ করেন:

• সামরিক শাসন রদ করতে হবে।
• সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
• দেশের প্রধান শহরগুলোতে সামরিক বাহিনীর হাতে বাঙালি হত্যার তদন্ত করতে হবে।
• নবনির্বাচিত সাংসদদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

অসহযোগিতা আন্দোলন কার্যত দেশের বেসামরিক শাসনভার শেখ মুজিবের হাতেই অর্পণ করে, যদিও তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তখনও, যা পূর্ব পাকিস্তানে অব্যাহত সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও, বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় ও মধ্যস্থতাসভায় তাঁর অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিভাত হচ্ছিল। অবশ্য সার্বিক পরিস্থিতির পর্যালোচনায় এটা প্রতীয়মান ছিল যে, এইসব শান্তিআলোচনা স্রেফ লোকদেখানো ছিল; একটা সর্বাত্মক সামরিক দমনপীড়ন চালানোর জন্য যথেষ্টসংখ্যক সৈন্য আনতেই আসলে এই অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমাদের বার্ষিক ফিল্ড কাউন্সিল মিটিংয়ের সময় আমরা অনেকটা সময় ব্যয় করি আপৎকালীন সময়ের নানাবিধ পরিকল্পনা করে।

আমাদের মিশনটি দলগত কাজে বিশ্বাস ও তার চর্চাও করে। আমরা যে-কোনো সমস্যা বা পরিস্থিতিতে একটা সম্মিলিত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো পর্যন্ত তার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি। তবে এটা ছিল একেবারেই ভিন্ন পরিস্থিতি। অমরা অনুভব করি যে, দেশে থাকা কিংবা দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তি কিংবা পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত; কাউকেই থাকার জন্য জোর করা হবে না, আবার কেউ চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকেও পালিয়ে যাবার অপবাদ দেওয়া হবে না।

মালুমঘাট হাসপাতালের বিশাল মিশনারিদল নৌকা করে সাগরে গিয়ে অপেক্ষমাণ উদ্ধারকারী সমুদ্রগামী জাহাজের মাধ্যমে, অথবা প্রতিবেশী দেশ বার্মার ভেতর দিয়ে জরুরি নির্গমনের কথাও ভেবে রাখে।


আমরা যারা চিটাগাংয়ে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকগোষ্ঠীর সদস্য ছিলাম তাদের কাছে এই মর্মে চিঠি আসে, আমরা যদি দেশত্যাগ করতে ইচ্ছুক হই, তাহলে যেন একটি নির্দিষ্ট পাহাড়শীর্ষে অবস্থিত চত্বরে গিয়ে রাজকীয় বিমানবাহিনীর বিমানের জন্য অপেক্ষা করি।

২১শে মার্চ, রবিবার রাতে আমরা চিটাগাংয়ের কর্মীরা একত্রিত হই আমাদের পরিকল্পনাবিষয়ে আলাপ আলোচনা করার জন্য। আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গুর্‌গানস পরিবারের ছুটিতে যাবার কথা ছিল। তাঁরা যুক্তি দেখান যে, এই প্লেনটা ধরাই তাঁদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে। জিন গুর্‌গানস চলে গেলে রিড মিনিখই হবেন মিশনের একমাত্র পুরুষ সদস্য—ফলে তাঁর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। লিন সিলভারনেইল, যার সঙ্গে আমি শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি বাসা ভাড়া করে থাকতাম, এবং আমি, আমরা কেউই বাক্সপ্যাটরা বেঁধে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার তাড়না বোধ করিনি। আমরা তিনজন তাই থাকার পক্ষে ভোট দিই।

২৩শে মার্চ—পাকিস্তান দিবস! সরকারিভাবে এই দিনটি ছিল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ও অগ্রযাত্রা উদযাপনের জন্য নির্ধারিত, তবে এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণ করাটাও। বাংলাদেশের লাল, সবুজ আর সোনালি রঙের জাতীয় পতাকাখানি সেদিন শহরের সব বাড়ি, দোকানপাট ও গাড়িতে গাড়িতে উড়ছিল। কেবল ঢাকা বেতারকেন্দ্র আর সরকারি দপ্তরগুলোতে ছিল চাঁদতারার সমাহার।

পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে অটুট রাখার লক্ষ্যে ওই একই দিনে এম ভি সোয়াত নামে একটি পাকিস্তানি জাহাজ প্রাণসংহারী অস্ত্রশস্ত্রে বোঝাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। অস্ত্রবাহী জাহাজ ভেড়ার খবরটা দ্রুত শহরময় চাওর হয়ে যায়, আর লোকজন ক্ষোভে ফেটে পড়ে। উৎপাটিত বৃক্ষ, আলকাতরার খালি ড্রাম, সিমেন্টের চাঙর, পরিত্যক্ত গাড়ি—হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে তা-ই রাস্তায় ফেলে সৈন্য ও অস্ত্রসমূহ ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার পথে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। হাজার হাজার বাঙালি লাঠিসোটা নিয়ে বন্দর অভিমুখে যাত্রা করে অস্ত্রখালাস ঠেকানোর উদ্দেশ্যে। এটা বাস্তবিক একটি শোচনীয় দৃশ্য ছিল—এমন বিপুল সাহস পাশাপাশি প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলার এমন সামগ্রিক অভাব!

শেখ মুজিবের আদেশে বন্দরশ্রমিকেরা অস্ত্র খালাস করতে অস্বীকার করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের এই কাজ করতে বাধ্য করা হয়। “যে-কোনো মূল্যে এই অস্ত্র খালাস করতেই হবে,” পশ্চিম পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ারেকে এই কথা বলতে শোনা গিয়েছিল। আর সেই মূল্য শোধ করা হয়েছিল বৈকি—বাঙালির রক্তে। সেদিন বন্দরে কত মানুষ মারা গিয়েছিল আর কতজন আহত হয়েছিল তার সংখ্যা কেউ কোনোদিন জানবে না।

জাহাজের ক্যাপ্টেন নিজেই ছিলেন বাঙালি। তিনি তাঁর নিজের মানুষেরই ধ্বংস বয়ে আনছেন তাঁর জাহাজে করে এই ভাবনা তাঁকে নিশ্চয়ই তাড়া করে ফিরছিল সর্বক্ষণ! বন্দরে পৌঁছানোর পর তিনি নিজেকে তাঁর কামরার শৌচাগারে আটকে রাখেন। তিনদিন পর বন্দরে সমাগত জনতার করুণার ওপর নিজেকে ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আসুন, যদি চান, আমাকে হত্যা করুন আপনারা।” বন্ধুরা তাঁকে উদ্ধার করে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদে লুকিয়ে রাখেন।

২৬শে মার্চ সকালে জেগে উঠে আমরা শুনি চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের প্রসঙ্গে এই দিনটিকে উল্লেখ করা হচ্ছিল, “সংগ্রামের গৌরবময় পঁচিশতম দিন” হিসাবে। আমরা যা জানতাম না, এবং জানিনিও আরো বহু সপ্তাহ ধরে যে, ঢাকায় সেই ‘গৌরবময় সংগ্রাম’-এর ইতি হয়েছিল—অন্তত সাময়িকভাবে। টাইম ম্যাগাজিনের ৫ই এপ্রিলের সংখ্যায় ২৫শে মার্চের রাতটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল:

ঢাকায় ট্যাংক ও ট্রাকভর্তি বেয়নেটধারী সৈন্যরা আল্লাহু আকবর ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে আসছিল তাদের ঘাঁটি থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হওয়িৎজার ট্যাংক থেকে ছোড়া কামান ও রকেটের গোলায় ঢাকার একাধিক অঞ্চল কেঁপে উঠেছিল। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ঝনঝনানির মধ্যে শোনা যাচ্ছিল গ্রেনেডের শব্দ, আর কালো ধোঁয়ার উঁচু স্তম্ভ শহরের মাথা ছাড়িয়ে উঠছিল ক্রমশ।

পরবর্তী সংস্করণ, ১২ই এপ্রিলের টাইম পত্রিকায় আরো বিশদভাবে লেখা হয়।

ঢাকা শহরের ওপর দিয়ে ট্যাংক গড়িয়ে চলে বাড়িঘর গুড়ো করে দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সৈন্যরা ঘুমন্ত ছাত্রদের হত্যা করে নির্বিচারে। নিউমার্কেটের সামনে উর্দুভাষী সৈন্যেরা বাঙালি নগরবাসীদের আত্মসমর্পণের হুকুম জারি করে এবং তারা তাতে তিলমাত্র দেরি করলে সঙ্গেসঙ্গে গুলি করে মেরে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণকবরে, পুরনো ঢাকায় এবং মিউনিসিপালিটির ময়লার ডিপোতে লাশের স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

কিন্তু আমরা চট্টগ্রামে এসবের কিছুই জানতে পারিনি। সকাল পৌনে নয়টায় ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে জাতীয় সংগীত বেজে হঠাৎ করেই তা বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে কেবল রেকর্ড করা গান শোনা যাচ্ছিল।

আমাদের বন্ধু মিস্টার ও মিসেস টমাস দাশ সেদিন বেড়াতে এসেছিলেন। প্রাক্তন স্কুলশিক্ষয়িত্রী মিসেস দাশ ছিলেন লিন সিলভারনেইলের দেশি সহকর্মী। লিন, একজন নার্স, যে ভাষাতত্ত্বের প্রাথমিক জ্ঞান আয়ত্ত করেছিল, গত চারবছর ধরে বাইবেল অনুবাদ করছিল। সে মূল গ্রিক থেকে নিউ টেস্টামেন্টের বিভিন্ন পুস্তকের সহজ ইংরেজি সংস্করণ তৈরি করছিল। মিসেস দাশ ছিলেন তার বাঙালি সহযোগী। লিনের ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে তিনি বাংলা নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম খসড়া রচনা করছিলেন।

তবে মিসেস দাশ কাজ করতে আসেননি। তিনি এবং তাঁর দেবতুল্য স্বামী আমাদেরকে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করতে এসেছিলেন। আমরা একসঙ্গে আলোচনা করি, গান গাই ও প্রার্থনায় যোগ দিই। মিসেস দাশ আমাদেরকে একটি নতুন গান শেখান, চমৎকার এক ভারতীয় সুরে গাঁথা এই গানখানি:
হে যিশু, তুমি আমার;
আমার জীবন বাঁচাও হে যিশু।

পাপী যারা তারা তাঁর কাছে যাবে;
প্রভু আমাকে ত্রাণ দাও।

নদী গভীর, নৌকা ছোটো,
প্রভু পার করো আমায়।

তোমাতেই জয়ী আমি,
এসো প্রভু, আমাকে শক্তি দাও।

আমাদের সবারই প্রভুর দেওয়া শক্তি দরকার, কেননা নদী ছিল গভীর আর নৌকাখানি ছোট।

বন্ধুরা থাকতে থাকতেই আমরা রেডিয়ো খুলি রাত দশটার খবর শুনব বলে। তার পরিবর্তে আমরা সামরিক শাসনের পনেরোটি নির্দেশনার ঘোষণা শুনি। তার মধ্যে ছিল:

পাঁচজনের বেশি মানুষ একসঙ্গে জমায়েত হতে পারবে না।
কোনো রাজনৈতিক সভা করা যাবে না।
সেনাদপ্তরে সকল অস্ত্র জমা দিতে হবে।
সকল ছাপা কিংবা অনুলিপি করার যন্ত্রও সেনাদপ্তরে জমা দিতে হবে।
সবাইকে দ্রুত কাজে যোগ দিতে হবে। ইত্যাদি, ইত্যাদি।

এই নির্দেশগুলো যখন আমরা ইংরেজিতে অনুবাদ করছিলাম তখনও বাইরে রাস্তায় বাঙালিদেরকে প্রতিবাদ করতে শুনছিলাম। দাশদম্পতি তাড়াতাড়ি বিদায় নেন নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য। তাঁরা চলে গেলে আমরা গাড়ি রাখার জায়গাটায় তাকিয়ে দেখি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আমলের পুরনো ট্রাকের ওপর লোকেরা জড়ো হচ্ছে। লাঠিসোটা হাতে তরুণে ঠাসা ট্রাকগুলো বেরিয়ে যাবার সময় চারপাশ জয়বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সেই চিৎকৃত জয়ধ্বনির জন্ম হয়ে গিয়েছিল নয় মাস আগেই।

রিড তাঁর কোনার বাড়ি থেকে হেঁটে আসেন আমাদের ঘরে। “তোমরা সবশেষ নির্দেশগুলোর কথা শুনেছো?” তিনি জিজ্ঞেস করেন। “এসব কিন্তু ভালো মনে হচ্ছে না।”
“আপনি যদি আমাদের এখানে থাকেন তাহলে আমরা একটু নিরাপদ বোধ করব।” আমি কবুল করি।
“ঠিক আছে, আমি কিছুদিনের জন্য থাকব, কিন্তু আমার পক্ষে তো অনির্দিষ্টকাল ধরে থাকা সম্ভব নয়।” তিনি জবাব দেন।

সেই শুক্রবার রাতে আটটা বাজার আগে আগে আমরা রেডিয়ো খুলি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ শোনার জন্য।

হঠাৎ রাস্তায় আমরা একটা জোরালো গুঞ্জনের শব্দ শুনতে পাই। আমরা ভেবেছিলাম এটা আরো বুঝি নতুন কোনো নির্দেশ প্রচার-করা লাউডস্পিকারের শব্দ। বারান্দা দিয়ে দেখি, যে-বাড়িতেই রেডিয়ো রয়েছে তার সামনে লোকের জটলা। আমরা আমাদের রেডিয়োর ডায়াল ঘোরাই যতক্ষণ না বাইরের রেডিয়োগুলোর শব্দের সঙ্গে আমাদেরটা মিলেমিশে এক হয়ে যায়। তখন আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা শুনতে পাই।

তিনি জনগণের উদ্দেশে বলছিলেন: “আপনাদের হাতে যাকিছু অস্ত্র আছে তা নিয়েই ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসুন। যে-কোনো মূল্যে শত্রুর মোকাবিলা করুন, এদেশের পবিত্র মাটি থেকে শেষ শত্রুটিও নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত।”

আমরা জানতাম না যে, এটা ছিল একটা পূর্বে ধারণকৃত টেপ। কারণ এর আগের রাতেই, আলাপ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, মধ্যরাতে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেন। অনেক পরে আমরা একটা গুজব শুনেছিলাম যে, সেদিন তার মালামালের সঙ্গে একজন রাজনৈতিক বন্দীকেও বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তিনি আর কেউ নন, শেখ মুজিবুর রহমান।

ঠিক সময়েই ইয়াহিয়া তাঁর ভাষণ শুরু করেন। কিছু ভূমিকা সেরে তিনি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু করেন।

“এই লোকটি ও তার দল পাকিস্তানের শত্রু। এই অপরাধকে আমরা বিনা শাস্তিতে যেতে দেব না। আমরা কিছু ক্ষমতালোলুপ, দেশদ্রোহী গোষ্ঠীকে আমাদের দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়ে এর ১২ কোটি লোকের ভাগ্য নিয়ে খেলতে দেব না।”

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবকে একজন বিশ্বাসঘাতক বলেন। তিনি বলেন যে, তিনি নিজে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আসতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু মুজিব যুক্তির কথা শুনতে সম্মত ছিলেন না। তিনি তখন পুরো আওয়ামী লীগকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। (এটার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, নিক্সন নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে তাঁর রিপাবলিকান পার্টিকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।)

আমি রাত এগারোটার দিকে শোয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম যখন ভয়েস অভ আমেরিকা খবরে বলে, “শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করেছেন এবং তার নামকরণ করেছেন বাংলাদেশ।” [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৩)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ২)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১)

সাহিত্য পত্রিকা 'কথার কাগজ'র আত্মপ্রকাশ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সাহিত্য পত্রিকা 'কথার কাগজ'র আত্মপ্রকাশ

ছবি: সাহিত্য পত্রিকা 'কথার কাগজ'র আত্মপ্রকাশ

  • Font increase
  • Font Decrease

শ্রাবণ সংখ্যা আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে শিল্প ও সাহিত্যের ছোট পত্রিকা 'কথার কাগজ'-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।

শুক্রবার (১২ জুলাই) বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনে 'কথার কাগজ' শ্রাবণ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শাহানারা স্বপ্না, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্ঝর, স্টুডেন্ট ওয়েজ প্রকাশনীর প্রকাশক মাশফিক তন্ময়, কথার কাগজের প্রধান সম্পাদক কেতন শেখ, নির্বাহী সম্পাদক অয়ন আব্দুল্লাহ প্রমুখ। পত্রিকাটির বার্ষিক শ্রাবণ, কার্তিক ও ফাল্গুন তিনটি সংখ্যায় প্রকাশ হবে।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কথার কাগজের প্রধান সম্পাদক কেতন শেখ বলেন, 'করোনাকালীন ২০২০ সালে কথার কাগজের জন্ম। সে সময় কয়েকজন প্রবাসী আর দেশি লেখক অনলাইনে ব্লগের মাধ্যমে কথার কাগজের লেখালেখি শুরু করি। তরুণ সাহি- ত্যিকদের সঙ্গে প্রবীণ সাহিত্যিকদের লেখালেখির একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায় কথার কাগজ।

প্রকাশক মাশফিক তন্ময় বলেন, 'এক সময় সাহিত্য আন্দোলনের প্রধান বাহন ছিল ছোট পত্রিকা বা লিটলম্যাগ। কিন্তু নানা সংকটে লিটলম্যাগের কলেবর ছোট হয়ে গেছে। প্রকাশকরা অনেকেই অর্থসংকটে তাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে অনলাইনের এই যুগে ছাপা কাগজে কথার কাগজের যাত্রা তরুণ লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।'

শাহানারা স্বপ্না বলেন, 'আশা করি, পত্রিকাটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। শ্রাবণ সংখ্যার প্রথম দর্শনে মনে হচ্ছে এটি পাঠকদের সাহিত্যের খোরাক জোগাবে।'

ফরিদুল ইসলাম নির্ঝর বলেন, 'মানুষের ভাষার প্রতি টান থাকলে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে কাজ করা যায়, এর উদাহরণ কথার কাগজ। সম্পাদকম- গুলীর তিনজনই দেশের বাইরে থেকে এর যাত্রা শুরু করেন। আজকে দেশে এসেই তারা পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন করলেন।'

সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, 'আমাদের তরুণরা বিদেশ চলে যাচ্ছে, আর ফিরছে না। তবে কথার কাগজের সঙ্গে জড়িতরা বিদেশ থেকে সাহিত্য আর দেশের টানে ফিরে এসেছেন। অনলাইনের যুগে যখন অনেক পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এ অবস্থায় তারা কথার কাগজের প্রিন্ট ভার্সন নিয়ে এসেছেন। এটি অনেক ভালো লাগার।' নতুন পত্রিকাটি টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

;

লেখক শেখ হাসিনা কোটিপতি হওয়ার পথে!



আবদুল হামিদ মাহবুব
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখালেখির হাত খুব ভালো। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হননি তখনই তার একাধিক বই প্রকাশ হয়েছে। সম্ভবত তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘ওরা টোকাই কেন’। ঢাকার আগামী প্রকাশনী থেকে বইখানা বের হয়েছিল। ওই প্রকাশনী থেকে আমারও দু’খানা ছড়ার বই প্রকাশ হয়। ১৯৯১ সালে আমার ‘ডিমের ভিতর হাতি’ যখন প্রকাশ হচ্ছিলো তখন আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি ভাই শেখ হাসিনার ‘ওরা টোকাই কেন’ এককপি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন।

বইখানা প্রথম না দ্বিতীয় সংস্করণের ছিলো সেটা মনে নেই। ওই বই কয়েকটি নিবন্ধের সংকলন। অধিকাংশ নিবন্ধেই শেখ হাসিনা তাঁর ভিতরের যন্ত্রণার কথা লিখেছিলেন। লিখেছিলেন দেশ ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কিছু কিছু ইঙ্গিত। পড়েছিলাম তো অনেক আগে। তারপরও লেখাগুলোর অনেক বিষয় মনে রয়ে গেছে। প্রতিটি নিবন্ধ পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার পারিবারিক ছোট লাইব্রেরিতে বইখানা গোছিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু আজ যখন ওই বই খোঁজতে লাগলাম, পেলাম না। অনুমান হচ্ছে আমার বইচোর কোন বন্ধু হয়তো এই বইখানা মেরে দিয়েছেন। অথবা বন্যা অতঙ্কে কয়েকেবার বাসার বইগুলো টানাটানি করার কারণে কোথাও হয়ত খুইয়ে ফেলেছি। তবে আমার ধারণা এই বইয়ের ক্ষেত্রে প্রথমটি ঘটেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অনেক বইয়ের মতো ‘ওরা টোকাই কেন’ নিশ্চয়ই বহুল প্রচারিত হয়েছিল, বেরিয়েছিল অনেক অনেক সংস্করণ। আর বই সমূহের রয়্যারিটিও তিনি হাজার হাজার টাকা পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রাপ্তি ঘটে থাকলে, আমি একজন লেখক হিসাবে অবশ্যই পুলকিত হই। আমি দেখেছি সেই ১৯৯১ সালের পর থেকে আগামী প্রকাশনীর প্রকাশনা ব্যবসারও অনেক উন্নতি হয়েছে। ব্যবসার উন্নতি ঘটার অর্থ প্রকাশকের উন্নতি ঘটা। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা অনেক অনেক ভালো হয়েছে।

পূর্বে দেখতাম একুশের বইমেলায় আগামী প্রকাশনী ছোট্ট স্টল নিত। এখন প্যাভিলিয়ন নেয়। লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্যাভিলিয়নের অঙ্গসজ্জা করা হয়। নিশ্চয় বইয়ের ব্যবসা ভালো হয়। সেকারণেই বইমেলার প্যাভিলিয়ন তৈরিতে বিনিয়োগও বেশি করেন। প্রতিবছরই আগামী প্রকাশনীর কোন না কোন বই কেনার জন্য পাঠকের লাইন পড়ে। পাঠক যখন যে কোন লেখকের বই কেনে, সেটা দেখে আমি একজন লেখক হিসাবে আনন্দিত হই। বইয়ের ব্যবসার উন্নতি হোক। প্রকাশকরা ভালো লাভ করুন, আমি মনে প্রাণে সেটা চাই।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, প্রকাশকের লাভ হলে আমার মতো মফস্বলের লেখকরা কি লাভমান হই? অবশ্যই যৌক্তিক প্রশ্ন। এর জবাব খুব সংক্ষিপ্ত। প্রকাশকরা যখন বই প্রকাশ করে লাভের মুখ দেখবেন, তখন তারা নতুন নতুন বই প্রকাশে আগ্রহী হবেন। নতুবা আমাদের মতো লেখকদের প্রকাশককে উল্টো টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করিয়ে নিতে হবে। এবং আমরা অনেকেই সেটা করছিও।

অনেকে আবার এও বলেন ডিজিটালের এই যুগে এখন আর কেউ বই কিনে পড়ে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে টুকটাক পড়েই তাদের পড়া শেষ করেন। সেই কারণে লেখকরা গাঁটের টাকা খরচ করে বই প্রকাশ করলেও সেগুলো বিক্রি হয় না। আমি এই অপবাদটা মানতে নারাজ। কারণ আমি দেখেছি কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই বইমেলা চলাকালে শত শত কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। আর যারা পড়ুয়া, তারা সারা বছরই খোঁজে খোঁজে রকমারি, প্রথমা, আগামী, শ্রাবণ, ইউপিএলসহ বিভিন্ন আনলাইন বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান থেকে বই আনান।

আমি মফস্বলের একটি শহরে থাকি। আমাদেরে শহরে বইয়ের দোকান আছে অনেক। সেগুলোতে স্কুল কলেজের পাঠ্য ও গাইড বই ছাড়া অন্য বই খুব কমই দেখা যায়। সৃজনশীল বলুন আর মননশীল বলুন, সেইরকম বইয়ের দোকান খুব একটা নাই। আমাদের শহরে প্রকাশনা ব্যবসার সাথে ‘কোরাস’ নামে একটি দোকান চালান বই পাগল এক যুবক মুজাহিদ আহমদ। তাঁর কোরাসেই আমাদের মত পাঠকের উপযোগী কিছু কিছু বই আসে। কিন্তু সবসময় কোরাসও আমাদের মতো পাঠকদের চাহিদার যোগান দিতে পারে না। তারপরও মন্দের ভালো হিসাবে দোকানটি টিকে আছে, টিকে থাক্।

আমাকে প্রায়ই অর্ডার করে ‘রকমারি’ থেকে বই আনাতে হয়। আমার আনানো বই ছাড়িয়ে আনার জন্য আমি নিজে প্রায়ই কুরিয়ার অফিসে যাই। আমি যেদিনই কুরিয়ার অফিসে গিয়েছি, দেখেছি কেবল আমার বই নয়, আমার মতো আরও অন্তত বিশ থেকে পঁচিশ জনের বইয়ের প্যাকেট এসেছে। কুরিয়ার অফিসের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, প্রতিদিনই এভাবে কিছু না কিছু বই নানাজনের নামে আসে। আর আমার নিজের চোখে দেখাটাকেওতো বিশ্বাস করতে হবে। মানুষ যদি বই নাই পড়বে তবে কেনো রকমারি কিংবা অনলাইনের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এতো এতো বইয়ের প্যাকেট আসবে? আমি বলবো বইয়ের পাঠক মোটেই কমেনি বরংচ বেড়েছে।

শুরু করেছিলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বইয়ের প্রসঙ্গ দিয়ে। বই প্রসঙ্গেই বলতে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গও এসে গেল। আমাদের শহরের সেই যে ‘কোরাসে’র কথা বলেছি; ক’দিন আগে এক দুপুরবেলা কোরাসে গিয়ে বই দেখছি। এসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুইজন প্রধান শিক্ষক কোরাসে এসে ঢুকলেন। তাদের দু’জনের হাতেই বেশ বড় সাইজের চারখানা করে বই। ওই দুই প্রধান শিক্ষক আমার পূর্ব পরিচিত। তাদের হাতে বই দেখে আমি উৎফুল্ল হলাম। কি বই? কোথা থেকে আনলেন? এমন প্রশ্ন করে বইগুলো দেখতে চাইলাম। দু’জনই ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার সামনে টেবিলের উপর ধাম্ ধাম্ করে বইগুলো রাখলেন। একজন বললেন, ‘‘আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পড়ার জন্য এই বইগুলো নগদ চব্বিশ’ টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। বলুন ছাত্ররা এই বই পড়তে পারবে? তারা কি কিছু বুঝবে?’’ অন্য প্রধান শিক্ষকের চেহারায় তখনও বিরক্তি রয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘বইগুলো দেখুন, আপনি লেখক মানুষ, আপনিও কিছু বলুন।’

আমি তাদের আনা বইয়ের দিকে মনোযোগ দিলাম। দেখি চার চার আটখানা বই, দুটি বিষয় নিয়ে করা হয়েছে। প্রচ্ছদে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ছবি। বইগুলোর লেখক আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি বইয়ের নাম ‘সকলের তরে সকলে আমরা’। এই বইয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ ও ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত যে ভাষণগুলো দিয়েছেন সেগুলোর বাংলা ও ইংরেজি সংকলন। অপর বইয়ের নাম ‘আহ্বান’। এই বই করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত জাতির উদ্দেশে যেসব ভাষণ দিয়েছেন সেগুলো সংকলিত করে।

দু’খানা বইয়ের-ই কাগজ, ছাপা, বাঁধাই খুবই উন্নত মানের। প্রতি কপি বইয়ের মূল্য ছয়শত টাকা। প্রত্যেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য প্রতিটি বইয়ের দুই কপি করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বিক্রি করেছে। প্রধান শিক্ষকরা এই বইগুলো কিনে নিতে বাধ্য। চারখানা বইয়ের জন্য প্রধান শিক্ষকদের দুই হাজার চারশত টাকা করে অফিসের সংশ্লিষ্ট ক্লার্কের কাছে পরিশোধ করতে হয়েছে। বুঝতে পারি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলেই এই দুই প্রধান শিক্ষক ক্ষুব্ধ। আমি শিক্ষকদের অনুমতি নিয়েই একটি বিদ্যালয়ের জন্য আনা চারখানা বইয়ের ছবি উঠিয়ে নিলাম। এই সময় কোরাসের কর্ণধার মুজাহিদ আহমদ বললো, ‘ভাই, আমি এমন একখান বই প্রকাশের অনুমতি পেলে কোটিপতি হয়ে যেতাম।’

আমি ওই দুই প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে বললাম; ‘প্রধানমন্ত্রীর বই প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, এটাতো আনন্দের বিষয়। কিন্তু আমারও প্রশ্ন হচ্ছে বইগুলো কি প্রাথমিকের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপযোগি? আর প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রিয় এইসব ভাষণ বই আকারে করাটা তো সরকারি খরচেই হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে দিতে হলে বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সংকলন টাকার বিনিময়ে কিনতে হবে কেনো?’

তখন একজন বললেন; ‘ভাই, এই বই রাষ্ট্রিয় ভাবে হয়নি। ব্যবসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের এক দু’জন প্রকাশনীর মাধ্যমে প্রকাশ করে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা কামাই করে নিচ্ছেন।’ উনার কথায় আমি বইয়ের প্রথম দিকের পাতা উল্টালাম। ঠিকইতো প্রকাশক ‘জিনিয়াস পাবলিকেশন্স’-এর মো. হাবিবুর রহমান। দু’খানা বইয়েরই গ্রন্থনা ও সম্পাদনা মো. নজরুল ইসলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার (সচিব)। খেয়াল করে দেখলাম বই দু’খানার কপিরাইট শেখ হাসিনা। বুঝতে পারি যে এই বইগুলোর যে রয়্যালিটি আসবে সেটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীই পাবেন।

এখন একটা হিসাব করে দেখি। বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৬শ ২০টি। এই বই যখন প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বাধ্যতামূলক কিনতেই হবে, তা হলে ৪ কপি করে বই বিক্রি হবে উল্লেখিত বিদ্যালয়গুলোতে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪শ ৮০ কপি। এই বইয়ের মূল্য থেকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের হাতে টাকা আসবে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৮হাজার। বইয়ের কপিরাইট অনুযায়ী শতকরা ১৫ ভাগ রয়্যালিটি নিলেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী পাবেন ২ কোটি ৩৬ লাখ ২৩ হাজার ২শ টাকা। হিসাবে কিন্তু আমার মাথা ঘুরে গেছে। বই থেকে এমন অঙ্কের রয়্যারিটি এদেশে আগে কেউ পেয়েছেন কি না আমি জানি না।

আর এটাতো আমি কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিক্রির হিসাব দিলাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য যখন বাধ্যতামুলক করা হয়েছে, তবে তো উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও এই বইগুলো এভাবেই বিক্রি হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত করলে আরো কতো কতো হাজার বেড়ে যাবে। আমি হিসাব বাড়ালে অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারি।

আমার ঘরেও একজন প্রধান শিক্ষক আছেন। লেখাটার পূর্ণতার জন্য তার কাছে কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিলাম। তিনি খ্যাক্ করে উঠে বললেন, ‘স্কুল আমি চালাই। আমার স্কুলের জন্য কখন কি ভাবে কি কিনবো না কিনবো সেটা তোমাকে বলবো কেনো?’ দেখলাম ঘাটাতে গেলে আবার কি থেকে কি হয়ে যায়। তাই কথা না বাড়িয়ে লেখা শেষ করার দিকেই মনোযোগ রাখলাম।

আমরা যারা লেখক আমাদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, প্রকাশকরা লেখকদের ঠকান। তারা ঠিক মতো লেখকের পাওনা রয়্যালিটি পরিশোধ করেন না। তাই বলে কি প্রধানমন্ত্রীকে ‘জিনিয়াস পাবলিকেশন্স’-এর মো. হাবিবুর রহমান ঠকানোর সাহস করবেন? নিশ্চয় না। এই ভরসাতেই বলতেই পারি বই বিক্রির অর্থে আমাদের লেখক শেখ হাসিনা কোটিপতি হবার পথে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ছড়াকার

ইমেইল: [email protected]

;

দশ টাকার শোক



মনি হায়দার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে মানিব্যাগটা উল্টেপাল্টে দ্যাখে রজব আলী।

মানিব্যাগটা খুব পছন্দ হয়েছে তার। বিশেষ করে মানিব্যাগটার বাদামি রংটা। ব্যাগটা চামড়ার তৈরি। রজব আলী নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোকে। বোঝা যায় না কোন্ পশুর চামড়ায় মানিব্যাগটা তৈরি হয়েছে। মানিব্যাগটার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট কুঠরি। রজব আলী কল্পনায় দেখতে পায়- মানিব্যাগটার ভিতরে রাখা টাকায় ভেতরের কুঠুরিগুলো ভরে উঠেছে।

ব্যাগটা প্যান্টের পকেটে নিয়ে যখন হাঁটবে পিছটা ফুলে যাবে, মুহূর্তেই শরীরের কোষে কোষে একটা অন্যরকম অহমিকা অনুভব করে সে।

ভাই, মানিব্যাগটার দাম কতো ? রজব আলী মানিব্যাগঅলাকে জিজ্ঞেস করে।

ব্যাগঅলা রজব আলীর উপর মনে মনে চটে উঠেছে। সেই কতোক্ষণ থেকে ব্যাগটা উল্পেপাল্টে দেখছে। কেনার কথা বলছে না। অথচ রজব আলীর দেখার মধ্যে দুটো ব্যাগ সে বিক্রি করেছে। ফুটপাতের জিনিস এতক্ষণ নাড়াচাড়া কেউ করে না। ব্যাগঅলা রাগ করে কিছু বলতেও পারে না। যদি কেনে ?

আপনি নেবেন ? রজব আলীর দাম জিজ্ঞাসায় ব্যাগঅলা পাল্ট প্রশ্ন ছোড়ে। কারণ রজব আলীকে দেখে তার মনে হয় না এই লোক মানিব্যাগ কিনবে।

রজব আলী একটি বহুজাতিক কোম্পানির অফিসের পিওন। পরনের পোশাকে ঐ বহুজাতিক কোম্পানির পরিচয় আছে। ব্যাগঅলার ধারণা এইসব লোকজন সাধারণত মানিব্যাগ-ট্যাগ কেনে না। তাদের সামান্য টাকা আয়, কোনোভাবে সেই পয়সায় মানিব্যাগ কেনার মানসিকতা বা প্রয়োজনীয়তাও থাকে না।
নেবো।

ইতোমধ্যে ব্যাগঅলার সামনে দামি প্যান্টশার্ট পরা একজন ভদ্রলোক এসেছে। সঙ্গে তন্বী তরুণী। তাদের আসায় চারপাশের আবহাওয়ায় বিদেশী সেন্টের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। ভদ্রলোকের কাছে রজব আলী অযাচিতভাবে হেরে যায়। বাস্তবতার কারণে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে হয় তাকে।

তন্বী তরুণী ও ভদ্রলোক মিলে কয়েকটা মানিব্যাগ দেখে। বাছাই করে। অবশেষে তন্বীয় কথানুযায়ী ভদ্রলোক তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে তারা মানিব্যাগ দেখলো, দাম করলো, কিনলো এবং চলেও গেলো। অথচ রজব আলী বিশ-পঁচিশ মিনিচের মধ্যে মধ্যে দামটাও জানতে পারলো না ! তারা চলে যাওয়ার পর রজব আলী ব্যাগঅলার কাছে যায়।

বললেন না কতো দাম ?

রজব আলীর দিকে আড়চোখে তাকায়, মানিব্যাগ আপনার পছন্দ হয়েছে?

পছন্দ না হলে দাম জিজ্ঞেস করবো কেনো ?

একশো আশি টাকা।

একশো আশি টাকা। রজব আলী মুখ থেকে বিপন্ন শব্দগুলো বের হয়।

বিরক্তি প্রকাশ করে ব্যাগঅলা, অবাক হওয়ার কি আছে? আপনার সামনেই তো দেখলেন তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ বিক্রি করেছি। ঠিক আছে আপনি ঐ সোয়াশ টাকাই দেন।
সোয়াশ টাকা একটা মানিব্যাগের দাম ! রজব আলীর বিস্ময় কোনো বাঁধা মানে না।

ব্যাগঅলা বুঝতে পারে রজব আলী এতো টাকায় ব্যাগ কিনবে না। সবাইতো ঐ টাকাঅলা ভদ্রলোক নয়, বেশি দাম-দর না করেই তাদের হাকানো দামেই কিনবে। রজব আলীরা তো মানিব্যাগই কেনে না। সেখানে রজব আলী যে কিনতে এসেছে সেটাই অনেক। ব্যাগঅলা মানিব্যাগ বিক্রি করলেও তার পকেটে মানিব্যাগ থাকে না। নিজের সঙ্গে রজব আলীর সাদৃশ্য দেখতে পায় ব্যাগঅলা। একই কাতারের ঠেলা-গুতা খাওয়া মানুষ তারা। লোকটাকে ঠকিয়ে লাভ নেই। হয়তো অনেক আশা করে সারা জীবনে একবার একটা মানিব্যাগ কিনতে এসেছে।

আপনি সত্যিই কি মানিব্যাগটা কিনবেন ? নরম কণ্ঠে ব্যাগঅলা জানতে চায়।

কিনবো বলেই তো পছন্দ করেছি। দাম জানতে চাইছি।

তাহলে শোনেন ভাই, অনেক্ষণ ধরে আপনি মানিব্যাগটা দেখছেন, ফাইনাল কথা বলে দিচ্ছি, মানিব্যাগটা আপনি আশি টাকায় নিতে পারবেন। আশি টাকার এক টাকা কমেও বিক্রি করবো না।
রজব আলীর এই মুহূর্তে ব্যাগঅলাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়। কোথায় একশো আশি টাকা, সেখান থেকে একশত পঁচিশ এবং সবশেষে পুরো শতকই নেই; কেবল আশি টাকা। সে পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে মানিব্যাগটা পকেটে রাখে। মানিব্যাগটা পকেটে রাখার সঙ্গে সঙ্গে রজব আলী নিজেকে একজন দামি মানুষ ভাবে। তার পকেটেও অনেকের মতো মানিব্যাগ আছে।

দীর্ঘদিনের একটা আকাক্ষা, একটা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো রজব আলীর। মানিব্যাগ কেনার একটা সিগারেট কেনে। সাধারণত সে সিগারেট টানে না। কিন্তু এই মুহূর্তে একটা সিগারেট টানার ইচ্ছে হলো তার। না, কেবল সিগারেটই নয়, একটা ঝাল দেওয়া পানও কিনলো এবং মুখে দিয়ে পরম আয়াসে চিবুতে লাগলো। সিগারেটটা ধরিয়ে পান চিবুতে চিবুতে রজব আলী একটা রিকশায় উঠলো। পর পর তিনটি কাজ সে করলো-যা সে খুবই কম করে। সিগারেট টানা, পান খাওয়া এবং রিকশায় করে বাসায় ফেরা। তার জীবনেএকটুকুই শ্রেষ্ঠ বিলাসিতা। রিকশা ছুটে চলেছে।

রজব আলীর মাথার কোষে, যেখানে স্বপ্ন বিলাসী বা ইচ্ছের রক্তকণিকা থাকে- সেখানে মানিব্যাগ কেনার শখ জাগলো প্রায় মাস তিনেক আগে। সে, অফিসের বড় সাহেবের ব্যক্তিগত পিওন। চা, চিনি, সিগারেট থেকে শুরু করে যা কিছু দরকার সবই আনে রজব আলী। দীর্ঘদিনের চাকরির কারণে সে বড় সাহেবের খুব বিশ্বস্ত ও অনুরাগী। অফিসে প্রতিদিন অনেক মেহমান আসে।

নানান কিসিমের মানুষের আনাগোনা বড় সাহেবের কাছে। এইসব মেহমান আসলেই বড় সাহেব বেল টিপে রুমের বাইরে হাতলবিহীন চেয়ারে অপেক্ষায় থাকা রজব আলীকে ডাকেন। রজব আলী ত্রস্ত খরগোশের মতো ভেতরে ঢোকে। কিন্তু ঢুকেই খরগোশের মতো মাথা উঁচু রাখতে পারে না। কোথাকার কোন এক অদৃশ্য অপরিমেয় শক্তি এসে তার মাথাটাকে নিচু করে দেয়।

তার দাঁড়ানো পর বড় সাহেব বড় অবহেলায়, নিপুণ নৈপুণ্যে, গাম্ভীর্যের কৌশলী পারম্পর্যে অবলীলায় প্যান্টের ডান দিক থেকে মোগল সম্রাটদের ক্ষমতায় মানিব্যাগটা বের করে টেবিলে রাখেন। মেহমানবৃন্দ গভীর অভিনিবেশে বড় সাহেবের কর্মকান্ড দেখতে থাকেন। মানিব্যাগটা টেবিলে রেখেই বড় সাহেব টেবিলের অন্যপ্রান্তে রাখা দামি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে পরম আদরে রাখেন এবং তৎক্ষণাৎ লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট টানেন আয়েসের সঙ্গে।

সিগারেটে দু’-দিনটি টান দিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝখানে আটকে রেখে মানিব্যাগটা তোলেন ডান হাতে। মানিব্যাগটা টাকার কারণে সবসময় পোয়াতি নারীর মতো ফুলে থাকে। বড় সাহেবের মানিব্যাগে টাকাগুলো অধস্তন, পরাধীনভাবে নিবিড় শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। একহাজার, পাঁচশ, একশ, পঞ্চাশ টাকার অসংখ্য নোট সাজানো পাশাপাশি। দেখতে কতো ভালো লাগে ! রজব আলী দেখে। দেখেই তার আনন্দ।

বাম হাতে মানিব্যাগটা ধরে ডান হাতের দুই আঙ্গুলে বড় সাহেব বেশ কয়েকটা নোট বের করেন। একটা নোট রজব আলীর দিকে বাড়িয়ে দেন, শীগগির নাস্তা নিয়ে আয়।

রজব আলী বিনয়ের সঙ্গে টাকাটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। এবং নাস্তার আয়োজনে নিদারুণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এইভাবেই রুটিন চলছিলো। হঠাৎ মাস তিনেক আগে রজব আলীর মাথায় এই প্রশ্নটা উঁকি দেয়- বড় সাহেবের গাড়ি বাড়ি টাকা মান-সম্মান ক্ষমতা আছে। রজব আলীর কিছুই নেই। কিন্তু একটা মানিব্যাগতো থাকতে পারে। আর যাই হোক বড় সাহেবের মতো মানিব্যাগ থেকে সেও টাকা বের করে বাস কন্ডাকটর, চালের দোকানদার, মাছঅলা, ডালঅলাদের দিতে পারবে।

এই ভাবনা, স্বপ্ন এবং কল্পনার পথ ধরে কয়েকমাস যাবৎ রজব আলী চেষ্টা করে আসছে একটা মানিব্যাগ কেনার। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। বৌয়ের শরীর খারাপ- ডাক্তারের টাকা দেওয়া, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, বই খাতা কেনা- যাবতীয় সাংসারিক কাজের চাপে মানিব্যাগ কেনা সম্ভব হয়নি। আজকে সে বেতন পেয়েছে। এবং সমস্ত চাপ উপেক্ষা করে রজব আলী মানিব্যাগটা কিনেই ফেললো। আসলে কখনো কখনো একটু-আধটু রিস্ক নিতেই হয়। নইলে ছোটখাট স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ হবার নয়।

রিকশায় বসেই সে জামার বুক পকেট থেকে বেতনের বাকি টাকাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে মানিব্যাগে। মানিব্যাগটার পেট ফুলে যায়। হাতে নিয়ে তার দারুণ ভালো লাগে। কিছুক্ষণ হাতে রাখার পর রজব আলী মানিব্যাগটাকে পিছনে প্যান্টের পকেটে রাখে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে প্যান্টের পিছন দিকটা ফিরে ফিরে দ্যাখে- কতোটা ফুলে উঠলো ? তেমন না। যেভাবে বড় সাহেবের পিছন দিকটা ফুলে থাকে, সে রকম নয়। রজব আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

রিকশা বাসার কাছে আসলে সে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যায়। তার মনের মধ্যে ছোট সুখের একটা ছোট পাখি ডানা মেলেছে। গানের সুর ভাজতে ভাজতে রজব আলী দেড় কামরার স্যাঁতস্যাঁতে বাসায় ঢোকে। সে ঢুকলো সংসারে, তাতে সংসারের কিছু যায় আসে না। সংসারটা তার কাছে সীমাহীন অন্ধগলির মোড়। যেখানে অভাব দারিদ্র ক্ষুধার চাহিদা কুমিরের হা মেলে থাকে, সেখানে তার মতো একজন রজব আলীর আসা না আসায় কিছুই যায় আসে না। রজব আলী স্ত্রী মকবুলা বেগম চতুর্থ সন্তান, যার বয়স মাত্র তিনমাস তাকে মাই খাওয়াচ্ছে।

অন্যান্যরা মেঝেতে জটলা পাকাচ্ছে একটা পুরোনো ক্যারামের গুটি নিয়ে। মকুবলা বেগম ঘাড় ফিরিয়ে রজব আলীকে একবার দেখে আবার মাই দিতে থাকে। রজব আলী কি করবে ভেবে পায় না। সাধারণত বেতন নিয়ে বাসায় ফিরলে তরিতরকারি, চাল, ডাল, লবণ, তেল, সাবান, দুই এক প্যাকেট সস্তা বিস্কুট সঙ্গে নিয়ে আসে রজব আলী। আজকে একবারে অন্যরকম একটা জিনিস এসেছে- যার প্রতি তার নিজের মমতা অনেক। সংসারে অন্যদের প্রতিক্রিয়া কি হবে বুঝতে পারছে না।

শুনছো ? রজব আলী স্ত্রীকে ডাকছে।

কনিষ্ঠতম সন্তানের মুখ থেকে মাই সরাতে সরাতে সাড়া দেয় মকবুলা বেগম, কি ?

একটা জিনিস এনেছি।

মকবুলা বেগম সরাসরি তাকায় রজব আলীর দিকে, কি এনেছো ?

অদ্ভুত একটা হাসি রজব আলীল ঠোঁটে, একটা মানিব্যাগ।

দ্রুত ব্যাগটা বের করে মকবুলা বেগমের হাতে দেয় রজব আলী। ব্যাগটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থানুর মতো বসে থাকে মকবুলা বেগম। একবার কোটরের চোখ দিয়ে তাকায় রজব আলীর দিকে। দৃষ্টি ফিরিয়েই ব্যাগটা অবহেলায় রেখে দেয় সে, মানিব্যাগ ফুটাতে কে বলেছে তোমাকে! বেতন পেয়েছো আজ না ?

বেতন পেলে আর মাথা ঠিক থাকে না। মকবুলা বেগমের লং প্লে রেকর্ড বাজা আরম্ভ হলো, বাসায় কিছু নাই। অফিসে যাবার সময় বললাম, ফিরে আসার সময় ছোট বাচ্চাটার জন্য এক কৌটা দুধ এনো। বড় ছেলেটার খাতা পেন্সিল নেই- নিয়ে এসো। তার কোনো খবর নেই। উনি নিয়ে এলেন মানিব্যাগ। ছেলেমেয়ে বৌয়ের মুখে তিন বেলা ভাত জোটাতে পারে না, উনি মানিব্যাগ কিনে ভদ্দরলোক হয়েছেন! কানার আবার স্বপ্ন দেখার শখ!

রজব আলীর মন শরীর স্বপ্ন আকাক্ষাগুলো শাঁখের করাতে কাটছে এখন। হায়, সংসারের জন্য ব্যক্তিগত দুই-একটা স্বপ্নও কি পূরণ করা যাবে না ! সকাল থেকে রাত পর্যন্ততো সংসারের সুখের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সামান্য একটা মানিব্যাগের জন্য স্ত্রী এমনভাবে শ্লেষের কথা বলে-একেক সময় মনে হয় রজব আলী আত্মহত্যা করে। পারে না।

স্ত্রীর শান দেওয়া কথার বান থেকে আপাতত রক্ষা পাবার জন্য না খেয়ে বাইরে চলে আসে রজব আলী। এভাবেই সে অক্ষমতার জ্বালা, বেদনা ও ক্ষরণকে তাড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে। রাস্তায় দোকানে এখানে সেখানে ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে আবার মকবুলা বেগমের সংসারেই ফিরে আসে। পরের দিন রজব আলী যথারীতি অফিসে।

অফিসের লোকজনের কাছে মানিব্যাগটা দেখায়। কেউ দেখে, কেউ আগ্রহবোধ করে না।

বল তো বারেক, অফিসের আরেকজন পিওনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে রজব আলী- মানিব্যাগটা কেমন হয়েছে ?

বারেক মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে- ভালো। খুব ভালো হয়েছে। কতো টাকায় কিনেছো ?
প্রচ্ছন্ন গর্ব রজব আলীর, তুই বল।

আমি কেমনে বলবো ?
অনুমানে।
বারেক কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলে, ত্রিশ-চল্লিশ টাকা।

তোর বাপের মাথা! ধমকে ওঠে রজব আলী। এ রকম একটা মানিব্যাগ জীবনে চোখে দেখেছিস ? কেমন রং এটার ! ভেতরে কতোগুলো ঘর আছে জানিস ! একহাজার, পাঁচশ, একশো, পঞ্চাশ টাকার নোট রাখার আলাদা আলাদা জায়গা আছে। তাছাড়া এই ব্যাগটা বিদেশী। দেশী না।

তোমার মানিব্যাগের যতো দামই থাক, তুমি বাপ তুলে কথা বলবে ? বারেকের আত্মসম্মানে সামান্য ঘা লাগে।

বলবো না, হাজার বার বলবো। এতো শখ করে একশ টাকা দিয়ে একটা মানিব্যাগ কিনলাম। আর তুই কিনা বলিস মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় কিনেছি ! জানিস, এই রকম মানিব্যাগ আছে আমাদের বড় সাহেবের।

হতেই পারে। আমার তো মানিব্যাগ নেই। কখনো ছিলোও না। তাই দাম জানি না। কিন্ত তুমি একটা একশো টাকা মানিব্যাগে জন্য বাবা তুলে কথা বলতে পারো না-

বারেক যখন মানিব্যাগ সংক্রান্ত তর্কে হেরে যাচ্ছিলো, তখনই বড় সাহেব অফিসে ঢোকেন সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু মেহমান নিয়ে। বারেক চট্ করে সরে যায়। রজব আলী দ্রুত দরজা খুলে দাঁড়ায়। বড় সাহেব সঙ্গীদের নিয়ে রুমে ঢোকেন। রজব আলীকে চা আনতে বলেন বড় সাহেব। শুরু হয় রজব আলীর দৌড়।

কয়েকদিন পর বড় সাহেব অফিসে কয়েকজন ক্লায়েন্টের সামনে বসে রজব আলীকে ডাকেন, রজব আলী?

জ্বী স্যার ?
তোমার হয়েছে কি ?

রজব আলী ভেবে পায় না তার কোথায় কখন কি হয়েছে ? ডানে বামে উপরে নিচে তাকায় সে, কই স্যার-কিছু হয় নাইতো।
তোমার হাতে মানিব্যাগ কেনো ?

এই কথার কি জবাব দেবে রজব আলী? হঠাৎ মগজের কোষ কোনো কাজ করে না। সে বুঝে উঠতে পারে না- তার হাতে মানিব্যাগ থাকলে বড় সাহেবের অসুবিধা কি ? কক্ষের সবাই রজব আলীর দিকে চেয়ে আছে। এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। হঠাৎ রজব আলী উপলব্ধি করতে পারে- মানিব্যাগটা থাকার কথা প্যান্টের পকেটে। হাতে নয়। এবং তার আরো মনে পড়লো মানিব্যাগটা কেনার পর থেকে, বিশেষ করে অফিস করার সময় মানিব্যাগটা কারণে-অকারণে তার হাতেই থাকে। কেন থাকে ?

সে কি সবাইকে তার সদ্য কেনা মানিব্যাগটি দেখিয়ে তৃপ্তি পেতে চায় ? যা প্রকারান্তরে অক্ষম অথর্ব মানুষের করুণ মনোবিকৃতি ? নিশ্চয়ই তার অবস্থা দেখে বড় সাহেব, তার পরিষদবর্গ, অফিসের লোকজন হাসছে। রজব আলী নিমিষে নিজেকে বায়ুশূন্য ফাটা একটা পরিত্যাক্ত বেলুন হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করে। লজ্জায় বালুর সঙ্গে সে মিশে যেতে চাইছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে মুশকিল হচ্ছে- সে ইচ্ছে করলেই বালু বা বায়ুর সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। মানুষ হিসাবে তাকে অনড় ও অবিচল থাকতে হয়।

বড় সাহেবের মুখে অদ্ভুত হাসি- রজব ?

জ্বী স্যার ?
মানিব্যাগটা কবে কিনেছো ?

রজব আলী জবাব দেয় না। দিতে পারে না। ভেতরের কে একজন যেন রজব আলীকে থামিয়ে দিয়েছে। যে রজব আলীর ওষ্ঠ জিহ্বা কণ্ঠ ভেতরের ক্ষুধিত শক্তিকে পাথর বানিয়ে জমাট করে রেখেছে। প্রাণপণে চেষ্টা করছে কথা বলতে। পারছে না। সে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কথা বলছো না কেন ? বড় সাহেবের কণ্ঠে এখন কর্তৃত্ব ও অপমানের সুর।

ঢোক গিলে জবাব দেয় রজব আলী- কয়েক দিন আগে।

কতো টাকায় ?

একশ টাকা।

তাই নাকি ! দেখি, বড় সাহেব হাত বাড়ান।

রজব আলী সারা জীবনের সমস্ত অভিশাপ নিজের মাথায় ঢালে-কেন সে মানিব্যাগ কিনতে গেলো ? কিনলোই যদি তাহলে পকেটে না রেখে হাতে রাখার প্রয়োজন হলো কেন ? দেখাতে চেয়েছিলো বড় সাহেবকে ? বড় সাহেবের মানিব্যাগ থাকলে পারলে তার থাকবে না কেন ? প্রতিযোগিতা ? কি অসম প্রতিযোগিতা ? কি ভয়ংকর গ্লানিকর পরাজয় !

কই দাও, বড় সাহেবের হাতটা তখনো বাড়ানো। নিন।

রজব আলী ব্যাগটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়।

কোথায় যাও? তোমার মানিব্যাগ নিয়ে যাও-

আর যেতে পারে না সে কক্ষের বাইরে। কক্ষের ভিতরে রজব আলীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বড় সাহেব মানিব্যাগটাকে উল্টেপাল্টে দেখেন। কক্ষের অন্যান্য সবাই বড় সাহেবের হাতের ব্যাগটাকে তীর্যক চোখে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে। সে হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে তীক্ষ্ন কাঁটা। কাঁটায় বিষ। যা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করছে রজব আলী। এছাড়া তার উপায়ও নেই।

রজব আলী !

বড় সাহেবের ডাকে চোখ তুলে তাকায় সে, স্যার!

নাও তোমার মানিব্যাগ। ব্যাগটা ভালোই কিনেছো।

হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি নিয়ে রজব আলী দরজা খুলে নিমিষে বাইরে চলে আসে। দরজা দ্বিতীয়বার বন্ধ করতে পারে না, তার আগেই বড় সাহেব এবং অন্যান্যদের হাসির ছুরি তীব্র অপমানে রজব আলীর কান এবং মর্মের মূলে আঘাত হানে। মনে হচ্ছে তাদের হাসির হলকা তাকে শান দেয়া ছুরির মতো কাটছে। আর রজব আলী নিজের রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

রজব আলী মানিব্যাগ আর হাতে রাখে না। প্যান্টের পকেটেই রাখে। মাস শেষে মানিব্যাগের ছোট্ট খোপে খুচরো কয়েকটা মাত্র টাকা দেখতে পায় রজব আলী। মানিব্যাগে টাকা নেই, একটা পরিত্যাক্ত রুমালের মতো মনে হয় মানিব্যাগটাকে। এবং রজব আলী বুঝতে পারে- বড় সাহেবের মতো মানুষদের সঙ্গে রজব আলীরা কোনদিন, কোনোকালে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারবে না।

মাস শেষ, রজব আলীর মানিব্যাগের টাকাও শেষ। অথচ বড় সাহেবের মানিব্যাগে মাসের প্রথম দিকে যতো টাকা ছিলো বা থাকে, এখনো সে রকমই আছে। কমে না। বরং বাড়ে। তাহাদের টাকা বাড়তেই থাকে। বাড়বে আমৃতকাল।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে রজব আলী।

দীর্ঘনিঃশ্বাস এবং পুঞ্জিভূত ক্ষোভ নিয়ে নিত্যদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছে রজব আলী। প্রতিদিনের জীবনাচারের সঙ্গে রজব আলী বেশ মানিয়ে নিয়েছে। মানিব্যাগটা তার সঙ্গে থাকছে প্রতিদিনকার মতো- যেমন তার পকেটে থাকছে একটি রুমাল, একটি চিরুনি।

মাসের প্রথম দিকে মানিব্যাগটা ভরা থাকে, মাঝখানের দিকে কমতে কমতে টাকা অর্ধেকেরও কমে এসে পৌঁছে এবং এই কমার গতিটা বলবৎ থাকে গাণিতিক হারে।

মাসের শেষের দিকে রজব আলী মানিব্যাগ বহন করার আর কোন যুক্তি খুঁজে পায় না। কারণ ব্যাগের তলায় পাঁচ-দশটা টাকা পড়ে থাকে বড় অযত্নে, বড় অবহেলায়। কখনো কখনো রজব আলীর মনে হয়- মানিব্যাগটা বোধহয় তাকেই উপহাস করছে। মাস খানেক পরে একদিন।

রজব আলী অফিস থেকে ফিরছে। মাস শেষের দিকে। বাসে প্রচুর ভিড়। বাসে ওঠা মানে জন্তুর খাঁচায় ওঠা। জীবন যে কতো অবাঞ্ছিত, বাসে উঠেই সেটা বুঝতে পারে রজব আলী।

বাস থেকে নেমেই হাত দেয় প্যান্টের পকেটে। পকেটটা খালি, বুকটা ধড়াস ধড়াস করে, মানিব্যাগটা নেই ! এতো সাবধানে থাকার পরও মানিব্যাগটা নিয়ে গেলো?

রজব আলী কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মানিব্যাগটা পকেটমার নিয়ে গ্যাছে। রজব আলী মানিব্যাগটার জন্য ভাবছে না। ভাবছে মানিব্যাগের সর্বশেষ পুরোনো ময়লা দশটি টাকা...। ওই দশ টাকা থাকলে আরো দুই দিন বাস ভাড়া দিয়ে অফিসে আসা-যাওয়া করতে পারতাম।

;

নৃত্য প্রতিযোগিতায় যশোরে সেরা প্রত্যুষা ঘোষ



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম
পুরস্কার গ্রহণ করছেন প্রত্যুষা ঘোষ

পুরস্কার গ্রহণ করছেন প্রত্যুষা ঘোষ

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশব্যাপি ৬৪ জেলার ক্ষুদে নৃত্য শিল্পীদের নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রতিযোগিতায় যশোর জেলার শ্রেষ্ঠ নিত্য শিল্পী হিসেবে 'মঞ্চমুকুল' পুরস্কার পেলেন প্রত্যুষা ঘোষ (স্নেহা)। সারাদেশের প্রতিটি জেলার ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্রবার (৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর সেগুনবাগিচা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন আয়োজিত 'মঞ্চকুঁড়ি ও মঞ্চমুকুল' পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার তুলে দেন পিপলস থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘প্রায় সবদেশেই শিশুদের নিয়ে নাটক হয়। আজকে সারা বিশ্বে যে শিশু নাটক হচ্ছে সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করছি ১৯৯০ সাল থেকে। জার্মানিতে একটি নাট্যোৎসবে ‘ডাকঘর’ নাটকটি নিয়ে আমরা অংশগ্রহণ করেছিলাম। ২৫ দেশ সেখানে অংশগ্রহণ করেছিল। ৪ জন জুরি মেম্বার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করেন। নাটক ভালো লাগে এমন ৫/৭টি দেশের কথা বলেছিলেন তারা; তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি।’

শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রতিযোগিতা

জানা গেছে, ২৬২টি শিশু-কিশোর, আদিবাসী ও অবহেলিত শিশু-কিশোর ও যুবনাট্য সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন বিগত ৩৩ বছর যাবত নানান কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হয় ‘মঞ্চকুঁড়ি’ ও ‘মঞ্চমুকুল’ পদক প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এবারে সারা বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৯০ জনকে ‘মঞ্চকুঁড়ি’ ও ‘মঞ্চমুকুল’ পদক প্রদান করা হয়।

দেশব্যাপি প্রতিটি জেলার থানা পর্যায়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগীত  শিল্পী, নাট্য শিল্পী ও নৃত্য শিল্পীদের বাসাই করা হয়। বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রতিটি থানা থেকে নির্বাচিতদের নিয়ে জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় বাছাই প্রক্রিয়া। সব প্রক্রিয়া সম্পন্নের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যটাগরিতে সারাদেশ থেকে ৩৯০ জনকে নির্বাচিত করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

অনুষ্ঠানে সারাদেশের ৬৪ জেলা থেকে নির্বাচিত   প্রায় ৩৯০ শিশু-কিশোরদের 'মঞ্চকুঁড়ি' এবং যুব নাট্যবন্ধুদের 'মঞ্চমুকুল' পদক প্রদান করা হয়।

অনুর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের 'মঞ্চকুঁড়ি' এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের 'মঞ্চমুকুল' পদক  এবং সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।

আলোচনা পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট নাট্যকার, গবেষক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজা  হিলালী। অতিথির বক্তব্য রাখেন পিপলস থিয়েটারের সংগীতের প্রধান শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ইয়াসমীন আলী। শিশুদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সামিয়া মুত্তাকিয়া মহুয়া ও পুষ্পিতা বেপারী। আলোচনাপর্বে সভাপতিত্ব করেন পিপলস থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শিশুবন্ধু লিয়াকত আলী লাকী।

;