কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৫)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

বার্তার নিজস্ব অলঙ্করণ

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈশ্বর আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন

[পূর্ব প্রকাশের পর] সাড়ে এগারোটার দিকে বাতি নেভানোর উদ্যোগ নিতেই শুরু হয় গোলাগুলি। প্রথমে এর শব্দটা ছিল অনেকটা পপ-পপ-পপ ধরনের। আমি দেখার চেষ্টা করলাম শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণাকে লোকজন পটকা ফুটিয়ে উদযাপন করছে কিনা। রাস্তাঘাট তখন জনশূন্য ছিল। আমি যখন জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিলাম তখন গুলির শব্দ ও পরিমাণ ক্রমে বাড়ছিল। আমি লিনের রুমে দৌড়ে গিয়ে দেখি সেও কাঁচা ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে। আমরা সাবধানে এক জানালা থেকে আরেক জানালায় ছোটাছুটি করি। এটা যদি বাজি ফোটানোর শব্দই হয় তাহলে লোকজন সব গেল কোথায়? প্রতিটি বিস্ফোরণের মাঝখানে বাইরে কেবল অন্ধকার আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। আমরা আমাদের পর্দাটানা খাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে শহরকেন্দ্রের দিকে দেখার চেষ্টা করছিলাম। আর ঠিক তখনই আমাদের পেছনের দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে চারটি বিশাল আগুনের গোলা উড়ে যায় আকাশে। অবশেষে, আমরা অনুধাবন করি যে, ওগুলো স্বাধীনতার ঘোষণা উদযাপনের বাজি ফোটানোর শব্দ নয়।

আমরা তখন আমাদের বিছানাপত্র বাড়ির সবচেয়ে মাঝখানে অবস্থিত বসার ঘরের মেঝেতে পেতে ঘুমাতে চেষ্টা করি। ভোর রাত অব্দি গোলাগুলি অব্যাহত থাকে। পপ পপ শব্দের মাঝখানে মেশিনগানের রা টা টাট শব্দের ফুলঝুরি ফোটে সারারাত।

শনিবার সকালে আবার সবকিছু শান্ত ও স্বাভাবিক মনে হলে, আমরা বছরের মন্দাকালীন ছয়মাসের জন্য সব্জি টিনবন্দী করার বার্ষিক প্রকল্পের কাজে হাত লাগাই। আমরা গাজর, আলু, ঢেঁড়স, পেঁয়াজ, সিম, টমেটো ইত্যাদি ধুয়ে ও কেটে কুচি কুচি করে বোতলে ভরতে থাকি। বারোটি বয়ম ভরার পর এবং আরো একটি ঝুড়ি ভরা বাকি থাকতে আমরা আবিষ্কার করি যে, প্রেসার কুকারটি কাজ করছে না। অর্থাৎ অল্প কদিনের মধ্যে এইসব সব্জি আমাদের খেয়ে শেষ করতে হবে, তা নাহলে আমাদের সময়, শক্তি ও অর্থ পুরোটাই জলে যাবে।

মধ্যসকালে রিড এই খবর নিয়ে আসেন যে, তিনি তাঁর গাড়িখানি দিয়ে দিয়েছেন। এটা সামান্য ব্যাপার ছিল না; এটাই ছিল আমাদের পালানোর একমাত্র বাহন, যেটাকেও দান করে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তিনি, ঈশ্বরের দূত, আর কোনোদিনই ঈশ্বরের ভালোবাসা প্রচার করতে পারতেন না, যদি তিনি নিজে সেই ভালোবাসাটুকু দেখাতে না পারেন। গাড়িটা নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে যে-এসেছিল সে হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত মণীন্দ্র দাস। ১৯৬৬ সালে সে, তার স্ত্রী ও মাতা একে একে যিশুর ওপর বিশ্বাস আনে। সেই থেকে মণীন্দ্রর শ্বশুরকুলের সবাই তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে এবং জনসমক্ষে অপমানিত করে। তারা কাছাকাছি বাস করলেও কেউ কারো বাড়িতে যেত না, খ্রিস্টানদের সঙ্গে মিশে তার আত্মীয়রা নিজেদের কলুষিত করতে চাইত না। এখন আসন্ন বিধর্মী শুদ্ধি অভিযানে হিন্দুজনগোষ্ঠীর কী অবস্থা হতে পারে তা কল্পনা করে তার শ্বশুর মণীন্দ্রকে অনুনয় করে তাদের গোটা পরিবারকে কোনো ’খ্রিস্টান বাড়িতে’ নিয়ে যেতে। রিড কিভাবে তাদেরকে পালানোর জন্য গাড়িটা না দিয়ে থাকতে পারেন?

“তোমরাও কি হাসপাতালেই চলে যেতে চাও?” রিড আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন। “আমার মনে হয় আমি এখনো চেষ্টা করলে ড্রাইভারকে আটকাতে পারি।”

আবারও আমরা থাকার সিদ্ধান্ত নিই।

রিড দরজার বাইরে বেরুতে না বেরুতেই গুর্‌গানস তাঁর মোটর সাইকেলে চড়ে আমাদের খোঁজখবর করতে আসেন। তিনি জানান নেভাল সদরদপ্তরের পাশ দিয়ে আসার সময় তিনি দেখতে পান রাস্তার বেসামরিক নাগরিকদের দিকে তারা মারণাস্ত্র তাক করে রেখেছে। পরের নিঃশ্বাসেই তিনি জানান যে, তিনি আসলে আমাদেরকে তাঁর বাড়িতে নিতে এসেছেন, তাঁর ও রিডের মোটরসাইকেলে পেছনে বসিয়ে। শহরের সব বিদেশিদের নিয়ে একটি আমেরিকান আবাস তৈরি করা হয়েছে। তার ছাদের ওপর আমেরিকা ও কানাডার পতাকা ওড়ে সবসময়।

আমাদের কী করা উচিত। আমাদের প্রথম দায়িত্ব কি অন্যান্য মিশনারি সদস্য ও আমেরিকান নাগরিকদের সঙ্গে মিলে এক জায়গায় থাকা, যাতে করে নিজেদের মিশনের পুরুষদের আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে না হয়, নাকি আমাদের প্রকৃত দায়িত্ব আসলে আমরা যাদের সেবা করতে এসেছি সেই অসহায় বাঙালিদের প্রতি? আমরা যখন এই দুই সম্ভাবনা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করছিলাম তখন বসু পরিবারের বড় ভাই এসে তার মা ও ছোট বাচ্চাদের একটা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য মিনতি করতে থাকে।

প্রভু আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেন। আমরা তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। আমরা তাদেরকে আমাদের সঙ্গে সেই মার্কিন আবাসেও নিয়ে যেতে পারি না। ফলে আমরা থেকে যাই। রিড আমাদের আগেই বলেছিলেন যদি আমরা প্রয়োজন মনে করি তাহলে তিনি আমাদের সঙ্গে থেকে যেতে পারেন—আমরা তেমনটা মনে করেছিলাম বৈকি।

বসুরা কারা? সারা বসু, বয়স ১৮, আর মাত্র তিন সপ্তাহ পরে গুড ফ্রাইডেতে তার বিয়ে হবার কথা। তার বাগদত্ত শহরের যে-অঞ্চলে বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে সহিংস দাঙ্গা লেগে থাকে, সেখানেই থাকত ও কাজ করত। আমরা তার কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না, তাই ধরেই নিয়েছিলাম যে, সে নিহত হয়েছে। দশ মাস পরে, সীমান্তের ওপারে আত্মীয় ও শরণার্থীদের সঙ্গে কাটিয়ে একদিন সে উদ্ভ্রান্ত ও বিধ্বস্ত চেহারায় এসে হাজির হয়।

রেবেকা ছিল আরেক হাসিমাখা কিশোরী। যুদ্ধ ছিল তার তালিকায় যুক্ত হবার মতো আরেকটি অ্যাডভেঞ্চার মাত্র। দূরদর্শী যে-খ্রিস্টান আবাসিক স্কুলটিতে সে পড়ত, সেটি যুদ্ধ শুরু হবার কয়েকদিন আগেই তাদের শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তা না করলে, চট্টগ্রাম থেকে একশত মাইল, ও ট্রেন, স্টিমারে দেড়দিনের যাত্রাপথের দূরত্বে আরেকটি শহরে সে আটকা পড়ে যেত।

লাকি ও বিউটি ছিল দুই ভীত বাচ্চা মেয়ে, যারা ঠিক বুঝতে পারছিল না চারদিকে কী ঘটছে, আর স্বপন ছিল চোখের তারা-কাঁপানো আরেকটি বাচ্চা ছেলে, কিছু একটা করার জন্য যে সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকত।

স্বপন বরাবরই আমাদের খুব প্রিয় ছিল। কয়েক বছর আগে সে আমাদের আমেরিকানদের খ্রিস্টবিষয়ক ধারণাকে প্রসারিত করতে সাহায্য করেছিল, যিনি সব ভাষার ব্যবধানই উত্তীর্ণ হয়ে যান। ব্যাপারটা ছিল এরকম।

একজন নতুন মিশনারি, মন্টি (ম্যারিলিন) মালম্স্ট্রম সবে এসেছেন। রবিবারের স্কুলের বাঙালি বাচ্চারা, ভাষা ঠিক বুঝতে না পারলেও, তাঁর মধ্যে একজন দয়ালু মানুষকে ঠিকই চিনে নিতে পারে। এই একজন মানুষ যে বাচ্চাদেরকে পছন্দ করে তারা স্রেফ বাচ্চা বলেই।

লিন বাচ্চাদেরকে শিখিয়েছিল কিভাবে প্রার্থনায় অংশ নিতে হয়, এবং তারাই কোনো নির্দিষ্ট দিনে সিদ্ধান্ত নিত তারা কার সঙ্গে প্রার্থনা করবে।

এটা তেমন অবাক-করা ছিল না যে, ক্লাস চলাকালীন এমন একটা উদগ্রীব অনুরোধ শোনা গেল, “আমরা মিস মন্টির সঙ্গে প্রার্থনা করতে চাই।” গোটা ক্লাস তখন বাংলায় ধুয়ো ধরে, “আমরা মিস মন্টিকে চাই।”

“কিন্তু,” লিন প্রতিবাদ করে বলে, “মন্টিতো বাংলা বলতে পারে না; তাকে তাহলে ইংরেজিতে প্রার্থনা করতে হবে।”

স্বপনের কালো চোখ প্রশ্নভরা বিস্ময়বোধে ভরে ওঠে, সে জানতে চায়, “যিশু বুঝি ইংরেজি বোঝেন না?”

বসুপরিবারের মা ছিলেন একজন পরিশ্রমী, ধর্মভীরু নারী যিনি সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রভুকে অনুসরণ করার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

আর ছিলেন বুড়ি দিদিমা। তিনি বধিরতম খাম্বার চেয়েও বধির ছিলেন। প্রত্যেকবার যখন কেউ গুলিগোলার শব্দে ভয় পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকানোর উপক্রম করত, তিনি বলে উঠতেন, “আমি বুঝতে পারি না তোরা কেন এত ভয় পাচ্ছিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছে এটা তো নস্যি।” তখন কিন্তু তিনি ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলেন।

বসুপরিবারের সদস্য কেউকেউ নিখোঁজও ছিলেন। সবচেয়ে বড় ভাইটি—পরিবারটিকে একত্র রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত বোঝার ভারে নুইয়ে পড়া এক তরুণ। মেঝ ভাই—সরকারি টিবি হাসপাতালে তখন চিকিৎসাধীন। এই হাসপাতালটি ছিল শহরের ঠিক উপকণ্ঠে, কুমিরায়, যেখানে হামেশাই পাকিস্তানি সেনা ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে লড়াই হতো। হাসপাতালভরা বিভিন্ন মাত্রার যক্ষ্মারোগীদের ফেলে রেখে ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরা সবাই প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তারা আরো কয়েকদিন টিকে ছিল, চারপাশ দিয়ে গোলাগুলি ছুটে যাওয়ার সময় বিছানার নিচে লুকিয়ে থেকে। খাবারদাবার শেষ হয়ে গেলে, যারা তখনও হাঁটতে পারত, তারা পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, শহরঅভিমুখে চারদিনের এক দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু খুবই অসুস্থ যারা হাঁটতেও পারত না, তাদের কী হয়েছিল?

সবচেয়ে ছোটটি, নির্মল—সবসময় আমাদের সাহায্য করতে চাইত, কিন্তু তার জন্য যতটা সময় ঘরে থাকার দরকার ততটা সে পারত না। খাবার কিংবা অন্য কিছু সংগ্রহের জন্য সে বাইরে গেলে তার মা ভয়ে কাঁপতে থাকত, তার ছেলেকে বুঝি তিনি আর দেখবেন না।

আরো একজন ছিল নিখোঁজ। মার্চের ২ তারিখে, গাড়িঘোড়া সব বন্ধ করে দেওয়া শহরের প্রথম সর্বাত্মক হরতালের দিন সকালবেলায় আমরা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাই।

“আপনারা একটু জলদি আসবেন প্লিজ? আমার বাবা খুব অসুস্থ।”

ভোরের শীতল বাতাস ঠেলে আমাদের বাসা থেকে প্রায় সোয়া মাইল দূরে অবস্থিত বসুদের দুকামরার বাঁশের ঘরে যাই আমরা। বসুর বাবা আমাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর গত সপ্তাহগুলোতে প্রায়শই আমরা ওবাড়িতে গেছি। ডাক্তারেরা তাঁর অপারেশন করেছিলেন এই আশায় যে, তাঁর আলসারটিকে তারা সরিয়ে ফেলতে পারবেন। উল্টো তারা দেখেন তাঁর পেট ক্যান্সারাক্রান্ত টিউমারে ভরা। আমরা তাঁকে কিছু ইঞ্জেকশন আর বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিয়ে কিছুটা আরাম দিতে পেরেছিলাম। আমরা তাঁর ক্ষুধা বাড়ানোর জন্য কিছু পুষ্টিকর খাবারও দিয়েছিলাম। আমরা গিয়ে দেখি সব শেষ! ছয় বাই নয় ফুট ঘরটিতে গাদাগাদি অবস্থায় আমরা একটি ছোট্ট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আদর করছিলাম, আর ঠান্ডা, ভয় আর বেদনায় কাঁপতে থাকা পরিবারটিকে যতটা পারি সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তারপরই তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলোর চিন্তা আমাদের আঘাত করে। এই হরতালের দিনে তো কিছুই চলছিল না। আমরা তাহলে ওর বাবাকে সমাহিত করি কিভাবে? শেষকৃত্যই বা করা হবে কিভাবে? পরিবার ও বন্ধুদেরকে খবরই বা পৌঁছানো হবে কী করে? ছেলেরা এই সাতসকালে শহরময় ঘোরাঘুরি করতে ভয়ও পাচ্ছিল, পাছে সন্দেহজনক তৎপরতার অভিযোগে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, ফলে লিন, রিড আর আমিই বেরিয়ে পড়ি।

বসুদের বাড়ির সামনের বড় রাস্তার উল্টোদিকে অবস্থিত চার্চ অভ ইংল্যান্ডে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়। মৃত্যুর খবরটি মুখে মুখেই ছড়িয়ে গেলে, লোকজন, এমনকি দুই মাইল দূর থেকেও, শ্রদ্ধা জানাতে আসে। কিন্তু শহর থেকে তিন মাইল দূরের কবরস্থানে আমরা মৃতদেহটি নিয়ে যাই কিভাবে? ঝুঁকি নিয়ে হলেও নিজেদের একটি গাড়ি বার করা ছাড়া আর কোনো সমাধান দেখি না আমরা। এদেশে মৃতদেহকে ঠান্ডাঘরে রাখার সুবিধা না থাকাতে, এবং দিনের তাপমাত্রাও দ্রুত বাড়ার কারণে, হরতাল শেষ হওয়া পর্যন্ত কবর দেওয়ার কাজটুকু স্থগিত রাখতে পারিনি আমরা। রিড মিনিখ তাঁর ল্যান্ডরোভারটিকে রাস্তায় বার করে আনেন (এটিকে চালু করতে সবসময়ই একটা বাড়তি ধাক্কার দরকার হতো) এবং প্রার্থনা করতে করতে কোনোমতে গির্জা অব্দি নিয়ে যান। শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হয়ে যাওয়ার পরে, কারা কারা সমাধিক্ষেত্রে যাবেন তা নিয়ে লম্বা বাক্য বিনিময় হয়। অবশেষে শবমিছিল বার হয়, পরিবারের ছেলেদের দুই বন্ধু গাড়ির হুডের ওপর চড়ে বসে, আর চারপাশে ও পেছনে যতজন আঁটে উঠে পড়ে, ‘লাশের গাড়ি’, ‘লাশের গাড়ি’ বলতে বলতে কবরখানার দিকে এগিয়ে চলে।

শেষকৃত্যের চব্বিশদিন পর আজ বসুপরিবারের লোকজন আমাদের বাড়িতে থাকতে আসে। তারা আসার কয়েক মিনিট পরই, জব্বার নামে যে-তরুণটি আমাদের সঙ্গে অনেকদিন যাবত কাজ করছিল সে এসে উপস্থিত হয় তার বউ নিয়ে। সে মুখ-ঢাকা কালো বোরখা পরিহিত ছিল, তার কোলে একটি বাচ্চা আর হাতধরা দুই বছরের আরেকটি। তারা মালপত্র যা পারে হাতে করে নিয়ে আসে, বাকিগুলো ফেলে আসে বাড়িতে, চুরি হয়ে যাবার জন্য। আমাদের ‘শরণার্থী শিবির’ দ্রুত ভরে ওঠে।

তারা, এবং আরো যারা আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে পরে, তাদের জন্য উদ্বেগ আর ভয়ে ভরা দিনগুলো অপেক্ষা করছিল সামনে।

২৮শে মার্চের ডায়রির লেখা আমার: দিনটিকে অবশ্যই রবিবারের মতো লাগছে না। আমরা সকালের নাস্তার জন্য ডালপুরি তৈরি করি। এরপর রিড তাঁর বাড়ি চলে যান গোসল ও শেভ করার জন্য। আমাদের এখানে খুব অল্পই পানি ছিল। বাঙালিরা আমাদের এলাকার পানির লাইন বন্ধ করে দিয়েছিল, যেন নেভাল হেডকোয়ার্টারে ঘাঁটি করে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের একটু শাস্তি হয়। আমাদের কেরোসিনও প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ তখনও বিদ্যুৎ ছিল, ফলে আমরা বৈদ্যুতিক যন্ত্রে রান্না করতে পারছিলাম।

সারাদিনই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে একটা ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছিল বারবার।

“বিশ্ববাসী। জানা গেছে যে, সাগর ও আকাশপথে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরো অনেক সৈন্য এসেছে আমাদের দেশে। আমি তাই পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক দেশকে মুক্তিকামী বাংলাদেশের জনগণের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানচ্ছি।”

তারপর বাংলা ভাষায় চট্টগ্রামের সকল জনগণকে তাদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে একটি নির্দিষ্ট সভাস্থলে যাবার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদেরকে যোদ্ধাদলে সংগঠিত করা হবে। আমাদের এলাকার লোকেরা এই আহ্বানে সাড়া দেয়। আমরা বাড়ির পুরুষদের দলবেঁধে সেখানে যেতে দেখি। কিন্তু আপনি শিকারের বন্দুক কিংবা কুড়ালকে কিভাবে লুকিয়ে নিয়ে যাবেন? যখন দেখা গেল অস্ত্রশস্ত্র হাতে লোকদের দেখে গুলি করে মারা হচ্ছে, তখন এই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো। পরিবর্তে লোকজনদের যার যার মহল্লায় থাকতে বলা হলো। মুক্তিবাহিনীর অধিনায়কেরা নিজেরা গিয়ে তাদেরকে যুদ্ধের কলাকৌশল শিখিয়ে দেবে।

বিদেশি বেতারকেন্দ্রগুলো খবর দেয় যে, ঢাকা থেকে মোট ২৫ জন বিদেশি সংবাদদাতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। লরেন জেন্কিন্স ১২ এপ্রিলের নিউজউইকে ব্যাখ্যা করে লেখেন।

আমরা এতকিছু দেখেছি যা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গেই মানায়... আমাদেরকে বলা হলো বাঁধাছাদা করে আধঘণ্টার মধ্যে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে। তার দুই ঘণ্টা পরে আমাদেরকে চারটি আর্মি ট্রাকে গাদাগাদি করে তুলে সেনাপ্রহরায় ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো, যেখানে আমাদের শরীর তল্লাশি করা হলো এবং অধিকাংশ নোট ও ফিল্ম কেড়ে নেওয়া হলো। একটা বেসামরিক বিমানে করে আমাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো, যেখানে আমাদেরকে আরেকবার তল্লাশি করা হয়। আমার টাইপরাইটার ও রেডিয়ো খুলে ফেলা হয়, এবং রেডিয়োর ব্যাটারির খোপে রাখা দুই রোল ছবি বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়। আমাকে তারপর আরেকটি ঘরে নিয়ে উলঙ্গ-তল্লাশি করে অন্তর্বাসের ভেতর লুকিয়ে রাখা আরেকটি ফিল্মের রোলও নিয়ে নেওয়া হয়। ”তোমার এখন স্রেফ স্মৃতিই সম্বল,” এই বলে এক সেনাসদস্য ব্যাঙ্গের হাসি হাসে।

বিকেল সাড়ে চারটায় আমরা রবিবারের প্রার্থনা সারি। রিড বাইবেলের স্তোত্র ৯১ থেকে পাঠ করেন। আমাদেরকে সাহস ও শক্তি যোগানোর পাশাপাশি তিনি বাংলা বাইবেলের একটি শব্দ নিয়ে কিঞ্চিৎ মজাও করেন। শ্লোক ছয় থেকে তিনি পাঠ করেন, ‘‘The pestillence that walketh in darkness’’, এর বাংলা করতে গিয়ে তিনি ’বিহারী’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন—আর আশা করছিলেন আমরা তাতে ভয় পাব না!

রিড বিভিন্নজনকে ডাকতেন প্রার্থনাসভার নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। কিশোর স্বপনকে দিয়ে তিনি শুরু করেন। আর সব বাঙালির মতোই ঈশ্বর ও প্রভুর বন্দনায় প্রচুর কবিত্বময় বাক্য প্রয়োগ করে সে অবশেষে আসল কথায় আসে।

“প্রভু, আপনি জানেন আমাদের এখানে পানি নেই, আর পানি ছাড়া চলা খুব কষ্ট। দয়া করে আমাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করুন।”

আমাদের ঈশ্বর, যিনি ছোট ছেলেদের বাংলা প্রার্থনাও শোনেন, তিনি স্বপনের আবেদন মঞ্জুর করবেন দ্রুতই। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৪)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ৩)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ২)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১)

   

মহাশূন্যে যাবে জাপানের তৈরি কাঠের স্যাটেলাইট



বিজ্ঞান ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মহাশূন্যে উৎক্ষেপণের জন্য কাঠের স্যাটেলাইট তৈরি করেছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। এটি স্পেসএক্স থেকে মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

বুধবার (২৯ মে) ইয়েমেনের বার্তাসংস্থা সাবা এ বিষয়ে একটি খবর প্রকাশ করেছে।

খবরে জানানো হয়, জাপানের কিয়েটো বিশ্ববিদ্যালয় ও সুমিটোমো ফরেস্ট্রি ফাউন্ডেশন বিশেষজ্ঞেরা ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরের চেষ্টায় এই স্যাটেলাটটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

বুধবার কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা ৪ বছরের কঠোর পরিশ্রম করে কাঠের তৈরি স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছেন। এই স্যাটেলাইটের নামকরণ করা হয়েছে, ‘লিগনোস্যাট’ (LignoSat)। এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম কাঠের তৈরি স্যাটেলাইট। পরিবেশের কথা চিন্তা করে এই স্যাটেলাইটটি তৈরি করা হয়েছে। এটি যখন তার অভিযান শেষ করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তখন এটি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাবে।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘লিগনোস্যাট’ স্যাটেলাইটির আকৃতি ১০ সেন্টিমিটার। এটির পুরুত্ব ৪ থেকে ৫.৫ মিলিমিটার। তবে এটির ভেতরের স্তর হবে অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি এবং এর ভেতরে একটি সোলার প্যানেল থাকবে। সবমিলিয়ে এটার ওজন হবে মাত্র এক কেজি। এই স্যাটেলাইট সম্পূর্ণ সনাতনী জাপানি পদ্ধতিতে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের ‘অ্যাডহেসিভ’ (আঠা) ব্যবহার করা হয়নি।

জাপানি বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ‘লিগনোস্যাট’ স্যাটেলাইটটি স্পেসএক্স থেকে এ বছরই উৎক্ষেপণ করা হবে। তারা আরো জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে এটি পৃথিবীর বাইরে পরীক্ষামূলকভাবে উড়াল সম্প্ন্ন করেছে। স্যাটেলাইটটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে, তা অবশ্য জানানো হয়নি।

;

১২৫তম জন্মবর্ষ

মুক্তির অন্বেষী নজরুল



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নজরুল জীবনের ‘আর্তি ও বেদনা’র সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেকালের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নজরুলের আবির্ভাবকালে মুসলমানদের সামাজিক আবহাওয়া এমনই জীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ ছিল যে, কোনো শিল্পীরই সেই আবহাওয়াতে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসার সম্ভব ছিল না। জীবনের প্রথমদিকে তাই কামাল পাশা প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত বীর মুসলিমেরা নজরুল-মানসকে আচ্ছন্ন করেছিল।

কিন্তু অচিরেই তিনি বাঙালির জাগরণের পথিকৃতে রূপান্তরিত হন। বাংলার জাগরণ গ্রন্থে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রণীজন কাজী আবদুল ওদুদ জানাচ্ছেন, ‘নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং যারা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দিলে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’

চরম দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও জীবনের জয়গান গেয়েছেন কবি নজরুল, ছবি- সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে বৃহত্তর পরিসর ও অর্থে গ্রহণ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই (১৯২৭) সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে সাময়িকী ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যে কারণে এদের ‘শিখা গোষ্ঠী‘ নামেও অভিহিত করা হয়।

শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা তথা শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ। ‘বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুলকে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বুদ্ধির মুক্তি, মানব মুক্তি, সমাজের মুক্তি তথা মানুষের শির উচ্চতর করার বাণী উৎকীর্ণ করেছিলেন নজরুল। গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের গানে মুখরিত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম। মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না তাঁর কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। জগতের বঞ্চিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত, স্বাধীনতাহীন বন্দিদের জাগ্রত করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন নজরুল। মানবতার জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন-'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্ …’।

মানুষ আর মানুষের হৃদয়কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। আবার তাঁর কলম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান- ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত জগতের বঞ্চিত ভাগ্যহত’।

শুধু যে কবিতাই লিখেছেন তা তো নয়। তিনি এমন অনেক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। নজরুলের দেশপ্রীতি, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে।

সাম্য ও মানুষের কবি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, ছবি- সংগৃহীত

‘সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাত–ধর্ম ছিল হৃদয়ের প্রেমধর্ম; যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। শুধু লেখনীর দ্বারা নয়, নিজের জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে ঐক্যের আশায় আশাবাদী ছিলেন নজরুল।

তাঁর ব্যক্তিজীবনে এই ভাবনার প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর বিবাহের ক্ষেত্রে, পুত্রদের ক্ষেত্রেও। তাঁর পরিবারের সব সদস্য এবং আপামর বাঙালি এই সত্য নিত্য উপলব্ধি করেন।

১২৫তম জন্মবর্ষে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্য মুক্তির অন্বেষী। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক তথা সুবিশাল সাহিত্যকর্ম বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, নানা কারণে তাৎপর্যবাহী।

কেননা, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনে জর্জরিত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার, হামলা, নির্যাতন।

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ এখন অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন।

এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ-তুল্য কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, বিদ্রোহ, মুক্তি ও মানবতার মহান সাধক।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বৃটিশ-বাংলার সর্বপশ্চিম প্রান্তের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম আর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।'

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানাজন নানামত দিতে থাকেন। এ অবস্থায় স্থাননির্ধারণী সভায় রফিকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন নজরুল তাঁর এক গনে লিখেছেন-

‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’॥

সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর কবর হোক। তাঁর এ প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো। পরবর্তীকালে এ কবর পাকা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ছবি- সংগৃহীত

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবনযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির একটি 'বিদ্রোহী', যা স্পর্শ করেছে রচনার শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক ‘প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক ‘সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ‘ধূমকেতু’তে (২২ আগস্ট, ১৯২২) ছাপা হয়।

বলা বাহুল্য, অসম্ভব পাঠকপ্রিয়তার কারণেই কবিতাটিকে বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ও রচয়িতা কবি নজরুল ‘চির উন্নত শির’ রূপে বিরাজমান।

পুরো বাংলা ভাষা বলয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শাণিত প্রতিবাদ তুলনাহীন। বিদ্রোহীর শতবর্ষকে ‘জাগরণের শতবর্ষ’ রূপে উদযাপন করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী পরিমণ্ডলে আর ১২৫তম জন্মবর্ষে মুক্তির অন্বেষী নজরুলকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি!

 ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

শ্রীপুরের কাওরাইদে নজরুল উৎসব শনিবার



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ কালি নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘ভাগ হয়নিকো নজরুল’ শীর্ষক নজরুল উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে শনিবার। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে এবং নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর সহযোগিতায় এই উৎসবে সেমিনার, আবৃত্তি ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকে তুলে ধরা হবে।

নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর অন্যতম ট্রাস্টি আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক জানান, আয়োজনের শুরুতে শনিবার দুপুর ২টায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সুনীল কান্তি দে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. সাইম রানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ও ছায়ানট (কলকাতা)’র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক।

তিনি আরও জানান, বিকেলে আয়োজনে নজরুলের জাগরণী কবিতা ও গান পরিবেশন করবেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা। আবৃত্তি করবেন-টিটো মুন্সী ও সীমা ইসলাম। নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করবেন শিল্পী ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি থাকবেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার।

‘দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নজরুল চর্চা বেগবান করতে এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এবছর কবি নজরুলের ১২৫তম জন্মবর্ষ। এই বছরটি নজরুলচর্চার জন্য খুবই সবিশেষ। উৎসবে দুই দেশের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে সাময়িকী। সাম্য, মানবতা ও জাগরণের যে বাণী কবি সৃষ্টি করে গেছেন, সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের জন্য তা আলোকবর্তিকা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরুলের এই আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা’-বলেন আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক। 

;

শিশু নজরুল



এ এফ এম হায়াতুল্লাহ
কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত। এটি বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনের দিক দিয়ে বহুগুণ বড় একটি দেশ। বহুজাতির বহু মানুষের বাস সে দেশে। ঐ দেশ অনেকগুলো প্রদেশে বিভক্ত। এই প্রদেশগুলোকে বাংলা ভাষায় রাজ্য বলে অভিহিত করা হয়। এই ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের পূর্বাঞ্চল আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর পশ্চিমাঞ্চল ‘পশ্চিম বঙ্গ’ নামে ভারতের অন্তর্গত রয়ে গেছে।

এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার অধীন আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে এবং ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে জন্মলাভের পর একটি শিশুর কাজী নজরুল ইসলাম নাম রাখেন যে পিতা তার নাম কাজী ফকির আহমদ। আর যে মায়ের কোলে তিনি জন্মান তার নাম জাহেদা খাতুন। এই শিশুটির জন্মের আগে এই পিতামাতার আর-ও ৪ জন সন্তান জন্মের সময়ই মারা গিয়েছিল। শুধু তাদের প্রথম সন্তান কাজী সাহেবজানের বয়স তখন ১০ বছর। অর্থাৎ কাজী নজরুলের সর্বজ্যেষ্ঠ বড় ভাই শিশু কাজী নজরুলের চাইতে ১০ বছরের বড় ছিলেন। নজরুলের পর তার আর-ও একজন ভাই ও বোনের জন্ম হয়েছিল। ভাইটির নাম ছিল কাজী আলী হোসেন এবং বোনটির নাম ছিল উম্মে কুলসুম।

শিশু নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ বই-পুস্তক পড়তে পারতেন। তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাজারের সেবা করতেন। রাজ্য শাসকগণ কর্তৃক বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ অর্থাৎ বিচারকগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতেন। মুসলমান সমাজ থেকে বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজী বলা হত। মুসলমান সমাজে কাজীগণ অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন। নজরুল ইসলাম এইরূপ সম্মানিত পরিবারে জন্মপ্রাপ্ত এক শিশু। তাই জন্মের পর ক্রমশ বেড়ে উঠার পর্যায়ে তিনি পারিবারিকসূত্রেই ভাল-মন্দের পার্থক্য করার এবং হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হয়ে সকলকে সমভাবে ভালবাসার গুণাবলি অর্জন করেন।

মানবজাতির ইতিহাসে যে-সমস্ত মহাপুরুষ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের অধিকাংশই শৈশব থেকে নানারূপ দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়ে সেগুলো জয় করে মহত্ত্ব অর্জন করেছেন। তাদের কেউই একদিনে বড় হয়ে যাননি কিংবা বেড়ে-ও উঠেন নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মানোর আগেই পিতাকে হারিয়েছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে হারিয়েছিলেন জন্মদাত্রী মাকেও। নজরুল তার পিতাকে হারান নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে। পিতা তাকে গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। তখনকার দিনে পড়াশোনা করার জন্যে সরকারি ব্যবস্থা ছিলনা। বাংলাদেশের তখন জন্ম হয়নি।

বিশেষ ভঙ্গিমায় হাবিলদার নজরুল

নজরুলের জন্মভূমি বাংলা প্রদেশ ভারতবর্ষের একটি রাজ্য যা ছিল বিদেশী ব্রিটিশ শাসনাধীন তথা পরাধীন। ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের সাধারণ মানুষ তথা প্রজাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সচেতন হয়ে উঠে-তাদের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়-তারা পরাধীন থাকতে চায় না-স্বাধীনতার প্রত্যাশী হয়। বিদেশী শাসক ব্রিটিশরা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত না করায় জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করত। সেই প্রতিষ্ঠানে প্রধানত মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হত। এইসব প্রতিষ্ঠান মক্তব নামে পরিচিত হত। এগুলো পরিচালনার ব্যয় অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন মক্তব প্রতিষ্ঠারাই দান, সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করার মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। গ্রামীণ একটি মক্তবে নজরুলের পাঠগ্রহণ শুরু। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর।

একবার কিছু শোনে ও দেখেই তিনি তা মনে রাখতে পারতেন। কিন্তু শিশুসুলভ সকল প্রকার চঞ্চলতা-ও তাঁর ছিল। পিতৃবিয়োগের পর সেই চঞ্চলতার যেন ছেদ পড়ল। তার মেধাগুণে তিনি হয়ে উঠলেন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সেই মক্তবেরই শিক্ষক। একজন শিশু শিক্ষক। এক শিশু পড়াতে লাগলেন অন্য শিশুকে। উদ্দেশ্য নিজের অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া। কিছু দেয়ার মাধ্যমে আনন্দ লাভ-যে আনন্দ মহৎ।

তার ভেতরে ছিল এক ভবঘুরে মন। মক্তব ছেড়ে ভর্তি হলেন উচ্চ বিদ্যালয়ে-মাথরুন নবীন চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে। স্থিত হলেন না সেখানে। গ্রামীণ নিসর্গ, প্রকৃতি, ঋতুচক্র যেমন তার মনকে প্রভাবিত করে, অজানাকে জানার এবং অচেনাকে চেনার নিরন্তর কৌতূহল-ও তাকে আন্দোলিত করে। ঘরছাড়া স্বভাবের এই শিশু অন্য সকল মানুষের জীবন ও সংগ্রামের রহস্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ঘর তাকে বাঁধতে পারে না। বিশাল আকাশকেই তার মনে হয় তার মাথার ওপরে খাঁচার মত উপুড় হয়ে তাকে আটকে রেখেছে। তাই তিনি মনে মনে ‘ভূলোক, গোলোক ও দ্যুলোক’ ছাড়াতে চাইতেন কেবলÑনিজেকে মুক্ত করতে চাইতেন। মনের আহ্বানে সাড়া দিতেন, গান শোনাতেন, শুনে শুনে গাইতেন।

তারই পরিক্রমায় গ্রামীণ লোক-নাট্য ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দিলেন। সেখানেও তার দলপতি উস্তাদ শেখ চকোর গোদা ও বাসুদেব তাকে সেরাদের ‘সেরা’ বলে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি শুধু লেটোর দলে গানই গাইলেন না। গানের পালা রচনা করলেন। ‘ মেঘনাদ বধ’, ‘হাতেম তাই’ ‘চাষার সঙ’, ‘আকবর বাদশা’ প্রভৃতি পালা রচনা করতে যেয়ে হিন্দু পুরাণ রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বেদ যেমন পড়লেন, তেমনি পড়লেন কোরান-হাদিস, ইতিহাস-কাব্য প্রভৃতি। মক্তব-বিদ্যালয় ছেড়ে হয়ে গেলেন প্রকৃতির ছাত্র।

কিন্তু আগুন যে ছাই চাপা থাকে না। প্রতিভার আগুনের শিখা দেখে ফেললেন পুলিশের এক দারোগা, যিনি নিজেও কাজী বংশের সন্তান, রফিজুল্লাহ। চাকরি করেন আসানসোলে। কিন্তু তার জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলা। নি:সন্তান রফিজুল্লাহ মায়ায় পড়ে গেলেন শিশু নজরুলের। নিয়ে এলেন জন্মস্থান ময়মনসিংহে। ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে ভর্তি করে দিলেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। কেমন ছিলেন তিনি এখানে ? জন্মভিটা চুরুলিয়া থেকে কয়েকশত কিলোমিটার দূরে-মাতৃআঁচল ছিন্ন পিতৃহীন শিশু! সহপাঠীরা কেউ লিখে রাখেন নি।

১৯১১ সনে ময়মনসিংহে আনীত হয়ে থাকলে পেরিয়ে গেছে একশত তের বছর। সহপাঠীদের কেউ বেঁচেও নেই। কিন্তু বেঁচে আছে নানারূপ গল্প ও কল্পনা। বড় বড় মানুষদের নিয়ে এমনই হয়। তাদেরকে কেন্দ্র করে অনেক কাহিনী তৈরী করা হয়। মানুষ জীবনের গল্প শুনতে ভালবাসে। তাই জীবন নিয়ে গল্প তৈরী হয় কিন্তু তা জীবনের অংশ না-ও হতে পারে। কেউ বলেন নজরুল ময়মনসিংহের ত্রিশালে এক বছর ছিলেন, কেউ বলেন দেড় বছর, কেউবা দু’বছর। প্রথমে ছিলেন কাজী রফিজুল্লাহ’র বাড়ি। এরপরে ছিলেন ত্রিশালের নামাপাড়ায় বিচুতিয়া বেপারির বাড়ি। এই দু’বাড়িতে থাকা নিয়ে অবশ্য কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু তর্ক আছে তার প্রস্থান নিয়ে।

কেউ বলেন তিনি স্কুল-শিক্ষকের কাছে সুবিচার না পেয়ে, কেউ বলেন অভিমান করে চলে গিয়েছিলেন। তবে তিনি কাউকে না বলেই চলে গিয়েছিলেন এটাই প্রতিষ্ঠিত মত। কিন্তু গেলেন কোথায় ? সেই জন্মস্থানে। তবে এবার চুরুলিয়া থেকে বেশ দূরে রাণীগঞ্জের শিহাড়সোল সরকারি স্কুলে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ১৯১৫ সন। পড়াশোনা করলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা। নজরুলের চঞ্চলমতি, ঘরছাড়া ও ভবঘুরে স্বভাবের জন্যে যেন বেমানান। প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হলেন।

মেধাবী বলেই নিয়মিত মাসিক ৭ টাকা বৃত্তি পেতেন। ঐ সময়ের হিসাবে মাসিক ৭ টাকা অনেক টাকা। মাসিক ৩ থেকে ৪ টাকায় সকল প্রকার থাকা-খাওয়ার ব্যয় মিটিয়ে অনায়সে চলা যেত। দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে এন্ট্রান্স বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা। সে প্রস্তুতি চলছে। নিচ্ছেন-ও। হঠাৎ ব্রিটিশ শাসকদল কর্তৃক যুদ্ধযাত্রার ডাক। কিন্তু প্রলোভন দেখানো হলো যে ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জিততে পারলে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে দিয়ে যাবে। জন্মাবধি স্বাধীনতা ও মুক্তি-প্রত্যাশীর হৃদয়ে নাড়া দিল। তিনি সাড়া দেবেন কিনা দোদুল্যমান। কিন্তু কপট ব্রিটিশ জাতি বাঙালিকে উত্তোজিত করার নিমিত্ত অপবাদ ছড়ালো যে বাঙালিরা ভীরু।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার কবিভবনে নজরুল

তারা লড়তে, সংগ্রাম করতে, যুদ্ধে যেতে ভয় পায়। স্বল্পকাল পরের (১৯১৭ সালের মাত্র চার বছর পর লিখিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৯২১ সনে) বিদ্রোহী কবির রক্ত ক্ষোভে নেচে উঠলো। কে রুখে তার মুক্তির আকাক্সক্ষা! বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে নাম লিখিয়ে বাস্তব যুদ্ধযাত্রা করলেন। গন্তব্য করাচি। ১৯১৭-১৯১৯ সাল অব্দি কঠোর সৈনিক জীবন। সুকঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই সাধারণ সৈনিক থেকে হাবিলদার পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি আরবি-ফার্সি সাহিত্যে অধ্যয়নসহ সঙ্গীতে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য মহাকালের এক অবিস্মরণীয় কবি-শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে করাচির জীবনই ছিল এক সাজঘর। যুদ্ধযাত্রার পূর্ব পর্যন্ত নজরুল শিশু। কিন্তু যুদ্ধফেরত নজরুল এক পরিপূর্ণ তরুণ ও চিরকালীন শিল্পী-যার মন ও মানস শিশুর মত আজীবন নিষ্পাপ।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট 

;