কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ : আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ভূমিকা

বই লেখার চেয়ে দূরবর্তী আর কিছু ছিল না আমার মনে। ১৯৭১-এর ঘটনাসমূহ আমার হৃদয়মনে এমন গভীরভাবে দাগ কেটে আছে যে, সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো লিখিত বয়ানের দরকার পড়ে না। আমি সেইসব ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করে রাখি, এহেন পরামর্শের প্রতিক্রিয়া ছিল তাই স্রেফ হেসে উড়িয়ে দেওয়া।

সেই বছরটি আমার মনে যে-স্মৃতি ও অনুভূতির উদ্রেক করে সেগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য দলিলপত্র কোথায় পাব আমি? আর, একটি পাণ্ডুলিপিকে গুছিয়ে তোলার মতো এত সময়ই বা আমার কোথায়? সেই সঙ্গে রয়েছে ইতোমধ্যেই কাজে ঠাসা দিনের ব্যস্ততার মধ্যে আরো কিছু নাছোড় প্রয়োজনের নিরন্তর রক্তচক্ষু প্রদর্শন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে এবং প্রার্থনায় বসে আমি টের পাই, আমি আসলে এই প্রস্তাবনাটিকে মনে মনে বিবেচনা করছি। আমরা যারা সেই দিনগুলোতে বেঁচেছিলাম এবং জেনেছিলাম প্রভুর ওপর নতুনভাবে নির্ভর করা বলতে আসলে কী বোঝায়, শুধু আত্মরক্ষার জন্যমাত্র নয়, বরং জরুরি রসদ সরবরাহর জন্যও বটে, তাদের দায়িত্ব রয়েছে এই বাঁচার কৌশলগুলো অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার।

পড়ার টেবিলের ড্রয়ার ঘেঁটে আমি আঁকিবুঁকিকরা কাগজপত্র, পত্রিকার কাটিং এবং একখানা নোটবই, যাকে আমি মজা করে বলতাম ‘আমার জার্নাল’, খুঁজে বার করি। এইসব আরম্ভ থেকেই উৎপত্তি হলো অবশেষে এই আস্ত গ্রন্থটির।

আমরা যারা এই দেশে কাজ করছিলাম তাদের কাছে নাটকীয় এবং বিয়োগান্ত ঘটনাবলি অপরিচিত ছিল না মোটেও। ১৯৬৩ সালে মিশনারিদলে যোগ দেওয়ার পর থেকে আমরা এই এলাকার বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়গুলো দেখেছি, যে-স্থানটিকে বর্ণনা করা হতো ‘উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড় ডেকে আনা জলবায়ুজনিত শোষণবাটি’ বলে; আমরা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের সবচেয়ে মেধাবী ভাষাবিদ বন্ধুটিকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছি; একসঙ্গে মারাত্মক এক রোগভোগ করেছি, যার কারণে আমাদের হাসপাতাল এবং মিশনের অন্যান্য দপ্তর পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছিল; এই অঞ্চলে খ্রিস্টের নামে নিবেদিত গির্জার জন্মপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে গিয়ে হতাশা ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বেঁকে গিয়েছি।

কিন্তু ১৯৭১-এর ঘটনাসমূহ এর সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।

এই বইয়ের ভেতর দিয়ে আমার, আমার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশি ভাইবোনদের (খ্রিস্টান ও অখ্রিস্টান নির্বিশেষে) যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা বর্ণনার উদ্দেশ্য আমার দ্বিবিধ:
—এই সময়টাতে যে-অসংখ্য ছেলেমেয়ে ও নারীপুরুষ তাদের অব্যর্থ প্রার্থনা ও বস্তুগত সাহায্যের মাধ্যমে আমাদের উপকার করেছেন তাদেরকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগানো
—তাদের সেই প্রার্থনারাশিকে, সত্যিকার ‘শেষহীন প্রার্থনা’টুকু এই নবজাত বাংলাদেশ ও তার পুনর্গঠনে লিপ্ত নবীন সরকারের উদ্দেশ্যে ন্যস্ত করা

বহু লোকেরই ধারণা নেই যে, ঈশ্বর তাদের ভালোবাসেন ও তাদের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে তিনি আগ্রহী এবং যিশু তাদের জন্যই প্রাণ দিয়েছেন। প্রার্থনায় সমবেত বিশ্বের সকল খ্রিস্টধর্মীর প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারি, যাতে করে সকল জাতি ও বর্ণের বিশ্বাসীরা এই সুসমাচারটুকু প্রচার করে যেতে পারেন।

জিনি লকারবি
চিটাগাং, বাংলাদেশ

বার্তা২৪-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণিত অধ্যায়


জয়বাংলার দেশে

এখন মধ্যরাত। জানালাগুলো আটকানো ও অর্গলবদ্ধ। সব দরজায় তালা। সামনের সিঁড়িতে কাঁটাতার বিছানো। বাঁশের আসনে বসা একটা ছোটখাটো সাদাকালো কুকুর, চোর আসার সামান্যতম ইঙ্গিতেও খেঁকিয়ে ওঠার জন্য উৎকর্ণ। কেননা এটা বাংলাদেশ—একটি ক্ষুধার্ত দেশ!

বাইরে তখনও গুঞ্জরিত হচ্ছিল মানুষজনের আওয়াজ। গাড়িরা দ্রুত ধাবমান। একজন রিকশাচালক তার ঘণ্টি বাজায়। বাচ্চারা কাঁদে। ঘুমাতে যাবার আগে বুড়িরা সুপুরি ছেঁচে, দিনের শেষ পানটি মুখে দেবে বলে। পুরুষেরা পায়চারি করে, এবং দিনের এই সময়েও কেউ একজন ঠিকই চিৎকার করে বলে ওঠে, জয় বাংলা! কেননা এটা বাংলাদেশ—একটি সুখী দেশ।

ক্ষুধা এখানে বরাবরই ছিল; আনন্দই বরং নবাগত।

আমি যখন নিউইয়র্কের ব্রুকলিন মেথডিস্ট হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা স্কুলের ছাত্রী ছিলাম, তখনই জীবনে প্রথম জন্ম নামক অলৌকিক ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করি। আমি তখন জানতাম না যে, একদিন, অর্ধেক পৃথিবী দূরে, একটি গোটা জাতির জন্মদৃশ্যের সাক্ষী হবার সৌভাগ্য হবে আমার।

ঐতিহাসিকেরা সম্ভবত এটা স্বীকার করবেন যে, ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তানের দেশ ভাগাভাগির সময় থেকেই একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে বাংলাদেশের উৎপত্তি অনিবার্য ছিল। তবে, আমরা যারা এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছি তাদের কাছে এটা ছিল এক নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক জন্ম। একটা স্বাধীন দেশের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে ছিল না কিছুই। অবশিষ্ট পাকিস্তান থেকে হাজার মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত, একটি শত্রুরাষ্ট্র দ্বারা বিচ্ছিন্ন, পূর্ব পাকিস্তান ছিল ব্রাত্য ও সৎবোনতুল্য। তদুপরি, এই দুই অংশের মধ্যে সাদৃশ্যও ছিল খুব কমই। পশ্চিম পাকিস্তানিরা লম্বা, তাগড়া, সামরিক জাতি; বাঙালিরা ছোটোখাটো, কোমল ও কবিস্বভাবের। পশ্চিম পাকিস্তানিরা আকৃতি, প্রকৃতিতে আরবি-সদৃশ ভাষা উর্দুতে কথা বলে, আর বাঙালিরা তাদের সংস্কৃত-দুহিতা বাংলাকে নিয়ে গর্ব করে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা গম, আটাখেকো জাতি আর বাঙালির পাতে ভাত না থাকলে মনে করে তার খাওয়াই হয়নি বুঝি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা ব্যবসাবুদ্ধিতে দড়, আর বাঙালিরা ঐতিহাসিকভাবে কৃষিকর্মে সিদ্ধহস্ত।

এমনকি আবহাওয়াও ছিল ঐক্যের বিরোধী। পশ্চিম পাকিস্তানের ভূপ্রকৃতি ছিল চরম ভাবাপন্ন: সুউচ্চ পর্বত আর রুক্ষ মরুভূমি, পাহাড় থেকে নেমে আসা জলধারা আর তপ্ত, শুকনো সমতলভূমি। বাংলা হচ্ছে নদী আর শ্যামলবরণ উর্বর কৃষিজমিতে ছাওয়া, ধানচাষের মৌসুমে যা মহামূল্যবান হিরে-মাণিক্যের মতো চকচক করে ওঠে। বস্তুত, যে-একটিমাত্র বন্ধন এই দুটি বিচ্ছিন্ন অংশকে এক করে রেখেছিল সেটি হচ্ছে ইসলাম ধর্ম। তবে পূর্ব অংশে সংখ্যাগুরু মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিশাল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনের মেলামেশার কারণে এমনকি এই বন্ধনটিও বুঝি তেমন মজবুত ছিল না।

পাকিস্তানের গঠনপ্রক্রিয়ার একেবারে ভিত্তিমূলে প্রোথিত এইসব প্রকট পার্থক্যের কারণেই যে এই বৈষম্যেরও সূত্রপাত, সেটা বুঝতে তেমন কষ্ট হওয়ার কথা নয়। বহু ক্ষেত্রেই এই বৈষম্য দৃশ্যমান ছিল। সম্ভবত সবচেয়ে প্রকট ছিল এইগুলো:
এক. পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ও পণ্য, যেমন পাট ও চা, থেকে উপার্জিত অর্থ এবং প্রাপ্ত বিদেশি সাহায্যের সিংহভাগই পূর্বকে বঞ্চিত করে পশ্চিম পাকিস্তানে চালান হয়ে যেত।
দুই. অর্থনৈতিক নীতিমালার পক্ষপাতও ছিল পশ্চিমাংশের প্রতি: শুল্ককাঠামো ও নীতিমালা, আমদানি অনুমতিপত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির কারণে পশ্চিম থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য হতো পূর্ব পাকিস্তান। প্রায়শই সেগুলো হতো অতীব নিম্নমানের, যা সাধারণ বিশ্ববাজার থেকেই অনেক কম দামে কেনা যেত।
তিন. উচ্চশিক্ষার সুযোগ ও বিদেশে পড়াশোনার জন্য বৃত্তিসমূহও অশোভনরকম অধিক হারে বরাদ্দ থাকত পশ্চিম পাকিস্তানি প্রার্থীদের জন্য।
পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের হিসাব মতেই ১৯৬৯-১৯৭০ বছরের অর্থবছরে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৬১ শতাংশ বেশি ছিল।

কিন্তু একজন ঠিকই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এই লাঞ্ছিত, বঞ্চিত বাঙালিদের স্বার্থরক্ষায়। তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান—আদর করে যাকে সবাই ডাকত ‘মুজিব’ বলে। তিনি বাঙালির কাছে কোনো আগন্তুক ছিলেন না। একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি মফস্বলের এক মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা শেষে প্রথমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়ন করেন। সেখানেই তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকেন। তাদের দাবি আদায়ের লক্ষে তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠন করেন। এই অপরাধের জন্য তাঁকে জেলে প্রেরণ করা হয় এবং পরবর্তী দুই দশক তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগারে কেবল আসা-যাওয়া করতে থাকেন। তাঁর অপরাধ যে আসলে কী ছিল সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলা হয়নি, কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাঁকে শত্রু ও পাকিস্তানের প্রতি হুমকি বলে বিবেচনা করত। ১৯৬৬ সালে তিনি ছয় দফা প্রণয়ন করেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি তোলে: স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা কিংবা বিচ্ছিন্নতা নয়! মুজিবের এই রাজনৈতিক মঞ্চ পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অবসান দাবি করে কার্যত। কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দপ্তর থাকবে কেন্দ্রের অধীন আর বাকি সব; শুল্ক, বাণিজ্য ও বিদেশি সাহায্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ ন্যস্ত হবে দুই প্রদেশের ওপর।

বাতাসে বিপদের আভাস পাওয়া যায়।

চট্টগ্রামের জীবন, ঘূর্ণিঝড় আর অন্যবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাঝখানে, কখনোই সেই অর্থে স্বাভাবিক ছিল না (সেটার মানে যা-ই হয়ে থাকুক)। তবে, তার চেয়েও অন্ধকার ও অলক্ষুণে মেঘের ছায়া এই অঞ্চলের নড়বড়ে নিরাপত্তাকে ভয় দেখাচ্ছিল তখন।

রাজনৈতিক সংকট ঘনিয়ে আসছিল।

অশান্ত পূর্ব পাকিস্তানকে, যার জনসংখ্যা ছিল পশ্চিম থেকে কয়েক কোটি বেশি, শান্ত করার জন্য ১৯৭০ সালের কোনো এক সময়ে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

সেই নির্বাচনের সময় অবশ্য পাল্টাতে থাকে, অংশত, সম্ভাব্য তারিখের আগে-আগে এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মানবেতিহাসের ভয়ঙ্করতম জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়টির কারণে, যার আঘাতে প্রায় পাঁচ লক্ষ লোকের মৃত্যু এবং কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটে।

ধ্বংসযজ্ঞের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর সবার চিন্তা আবার নির্বাচনের তারিখের দিকে নিবদ্ধ হয়। দেশের তেইশ বছরের ইতিহাসে সেই প্রথমবারের মতো একটি অবাধ ও উন্মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল।

কিন্তু যেখানে মাত্র বিশ শতাংশ মানুষ সাক্ষর সেখানে নির্বাচনের প্রচারণা চালানো এবং তা বাস্তবায়িত করা কিভাবে সম্ভব? কেমন করে? অবশ্যই ছবি ব্যবহার করে। রাস্তার প্রতিটি কোনা, প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট, দেয়ালের প্রতিটি শূন্যস্থান কোনো না কোনো দলের প্রতীকচিহ্নে ভরে ওঠে। সেগুলো ছিল সাইকেল, গরুর গাড়ি, হাতি, দাঁড়িপাল্লা, ছাতা ইত্যাকার নিত্যব্যবহার্য বস্তুর ছবি, যা এমনকি নিরক্ষর লোকেরাও চিনতে পারত সহজেই। বিশটিরও বেশি দলের সবারই ছিল একটি নির্দিষ্ট প্রতীক। তবে অগুরুত্বপূর্ণ এইসব জিনিসের ছবিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রতীক তথা নৌকার ছবি। [চলবে]

   

কোরবানি



শাহেদ শফিক
কোরবানি

কোরবানি

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি তো হাজির হে আমার রব
তোমার প্রিয় ঘরে
উজাড় করে দিতে পারি সব
প্রভু তোমার তরে।

নত মনে আজ তোমার চরণে
সঁপেছি এই শীর
তুমি তো মহান, চির অম্লান,
মালিক ধরিত্রীর।

আজ দূর হয়ে যাক মনের পশু
ধুয়ে যাক সব জিদ
জাগ্রত হোক কণ্ঠে সবার
বাজুক তোমার গিদ।

তুমি তো আমায় দিয়েছিলে রব
জগতের সব কিছু।
আমি তো ছুটেছি জীবন জুড়ে
পাপের পিছু পিছু।

কী দিয়ে তোমার, সুধিবো ঋণ
নেই যে কিছু আর
তাই তো প্রভু তোমার সকাসে
ছুটি বারং বার।

আজ দূর হয়ে যাক সব বেধাবেধ
পড়রে কালিমা
হিংসা বিভেদ, ফাসাদ ভুলিয়া
ছড়াক মহিমা।

১৭ জুন ২০২৪।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

;

কদম



আকিব শিকদার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঋতুটি শরৎ এখন পঞ্জিকার পাতায়।
বর্ষার আমেজ কাটেনি বুঝি, সারাটি আকাশ
কালো করে নামে বৃষ্টি।
একটানা ভিজে শালবন, মহুয়ার কিশলয়। সতেজ হয়-
লতানো পুঁইয়ের ডগা।

এ বর্ষণ দেখার সৌভাগ্য আমার নেই। দূর পরবাসে
বসে আমি ভাবি- আহ, কি সহজেই ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম
প্রিয় ফুল কদমের কথা...!
পড়ার টেবিলে দুটো কদম, আষাঢ় শ্রাবণে তরতাজা দুটো কদম
জিইয়ে রেখেছি কতো-
কাচের বোতলে। ভেজা বাতাসে কদমের হালকা সুবাস।
তিনটে বছর, মাত্র তিনটে বছর
ভুলিয়ে দিলো চব্বিশ বছরের বর্ষার স্মৃতি, যেন চব্বিশ বছর
পরাজিত তিন বছরের পাল্লায়।

পরিজন ফোন করে খবর নিতে- ‘কি পাঠাবো বল...?
কাঠালের বিচি ভাজা, চিনে বাদাম, ঝুনা নারকেল
নাকি আমের আচার...?’-ওদের তালিকায়
আমার পছন্দ অনুপস্থিত।

সাহেবদের বিলেতী ফুলের ভীড়ে
ঠাঁই নেই কদমের-
যেমন আছে কাঁদা মাটির সুঁদাগন্ধ ভরা বাংলায়।
ক্যালেণ্ডারের পাতায় দেখি
ফুটফুটে কদমের শ্বেত রেণু বিনিময়, আর অন্তরে অনুভবে
রূপ-রস-গন্ধ।

;

একগুচ্ছ কবিতা



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পরাবাস্তবতা-জাদুবাস্তবতা
আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব অথচ বাস্তবের অধিক
অসম্ভব তবু প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার শঙ্কা জাগায়
তারই নাম পরাবাস্তবতা
অন্যভাবে বলতে জাদুবাস্তবতা:
যেমন, এই যে আশ্চর্য সকাল
এর কতtটুকু তুমি দেখো
কতটুকু আমি
আর কতটুকু দিগন্তের ওপাশে অদেখার!
জলের উপর একলা মুখ ঝুঁকিয়ে থাকা
শেষবিকেলের মর্মবেদনা জানে
শিরীষ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ভাসমান পাতা
তুমি আর আমি কতটুকু জানি!
অর্থবোধ্য সীমানা পেরিয়ে
আমাদের যাতায়াত নেই
এমন কোনো ঠিকানায়
যার দিক নেই, চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই!

সম্পর্ক

প্রিজমের টুকরোয় ছিটকে পড়া আলোয়
অধ্যয়ন করছি সম্পর্ক
সম্পর্কের উত্থান-পতন
বাঁক ও শিহরণ
লগ-ইন বা লগ-আউটে
নিত্য জন্মাচ্ছে নতুন সম্পর্ক
সম্পর্কের বিভিন্ন রং
লিখে লিখে মুছে দিচ্ছে ফেসবুক
সন্তরণশীল সম্পর্ক খেলা করছে
মানুষের জীবনের বহুদূরের ভার্চুয়ালে
সম্পর্ক হয়ে গেছে স্বপ্নময় জগতে
মনকে জাগ্রত রাখার কৌশল

জোনাকি

দূরমনস্ক দার্শনিকতায়
রাতের পথে যারা আসে
তারা যাবে দিগন্তের দিকে
আত্মমগ্ন পথিক-পায়ে।
এইসব পদাতিকের অনেকেই আর ফিরবে না
ফিরে আসবে অন্য কেউ
তার চিন্তা ও গমনের ট্র্যাপিজ ছুঁয়ে
অন্য চেহারায়, অন্য নামে ও অবয়বে।
তারপর
গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে সরল রেখায়
আলোর মশালে জ্বলে উঠবে
অনুভবের অসংখ্য জোনাকি।

নিঃসঙ্গতা

নিঃসঙ্গতা শীতের কুয়াশার মতো প্রগাঢ়
তমসাচারী মৃত পাখির নিঃশব্দ কুহুতান-স্মৃতি
নিহত নদীর শ্যাওলাজড়ানো জলকণা
দাবানল-দগ্ধ বনমর্মর:
মায়ায় মুখ আড়াল করে অনন্য বিমূর্ত বিবরে
নিঃসঙ্গতা কল্পলোকে রঙ মাখে
নীলাভ স্বপ্নের দ্যুতিতে
অস্তিত্বে, অনুভবে, মগ্নচৈতন্যে:
জীবনের স্টেজ অ্যান্ড স্ক্রিনে!

আর্কিওপটেরিক্স

পনেরো কোটি বছরের পাথরশয্যা ছেড়ে তিনি
প্রত্নজীববিদের টেবিলে চলে এলেন:
পক্ষী জীবাশ্ম দেখে প্রশ্ন শুরু হলো পৃথিবীময়
‘ডানার হলেই তাকে পাখি বলতে হবে?‘
তাহলে ‘ফ্লাইং ডাইনোসরস‘ কি?
তাদের শরীরে রয়েছে ডানা, কারো কারো দুই জোড়া!
পাখি, একলা পাখি, ভাবের পাখি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান
বিজ্ঞানী থেকে বিপ্লবী কবিগণ
আর্কিওপটেরিক্স কি পাখির আদি-জননী?

;

কবি অসীম সাহা আর নেই



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি অসীম সাহা মারা গেছেন। ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

মঙ্গলবার (১৮ জুন) বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বিষযটি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

তিনি জানান, মাঝখানে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অসীম সাহা মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। অল্প ক’দিন আগেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আজ শুনি তিনি আর নেই। বর্তমানে অসীম সাহাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাকে দেখতে সেখানেই যাচ্ছি।

অসীম সাহার শেষকৃত্য সম্পর্কে তাঁর ছোট ছেলে অর্ঘ্য সাহা বলেন, তাঁর বাবা মরদেহ দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কবি অসীম সাহা। চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষণ্নতায় ভুগছেন কবি। এছাড়া পারকিনসন (হাত কাঁপা রোগ), কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়াবেটিস রোগেও আক্রান্ত হন।

১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নানারবাড়ি নেত্রকোণা জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন কবি অসীম সাহা। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগে। সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

;