বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ার কারণ ও পুনরুদ্ধারের উপায়



মো. বজলুর রশিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একটি নির্দিষ্ট সমাজের সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং সামাজিক নিয়ম দ্বারা বোঝা যায়। বিভিন্ন সমাজ প্রায়শই বয়স্ক ব্যক্তিদের তাদের বয়স এবং জীবনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে আচরণ সংক্রান্ত নিয়ম এবং প্রত্যাশা স্থাপন করে।

অনেক সমাজের বয়স-ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে যা ব্যক্তিদের বয়সের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ভূমিকা, অধিকার এবং দায়িত্ব প্রদান করে। বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রায়ই বিশেষ মর্যাদা এবং কর্তৃত্ব দেওয়া হয়, কারণ তারা সময়ের সাথে সাথে জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বলে দেখা হয়।

প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাকে আন্তঃপ্রজন্মীয় সংহতির প্রকাশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম বয়স্ক ব্যক্তিদের অবদানকে স্বীকার করে এবং মূল্য দেয়। এই সংহতির অনুভূতি সামাজিক সংহতিকে শক্তিশালী করে এবং একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ধারাবাহিকতা এবং স্থিতিশীলতার ধারণা জাগায়।

প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধার ধারণা বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং সমাজে পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু সংস্কৃতি ধার্মিকতা, পিতামাতা এবং গুরুজনদের প্রতি দৃঢ় শ্রদ্ধা এবং আনুগত্যের ওপর জোর দেয়। অন্যান্য সংস্কৃতিতে বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ এবং নির্দেশনা চাওয়ার মাধ্যমে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের জড়িত করে সম্মান প্রকাশ করে থাকে।

এটি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ যে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, বিশ্বায়ন এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্কের গতিশীলতা, ইত্যাদি প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশকে প্রভাবিত করতে পারে।

যদিও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা সাধারণত একটি ইতিবাচক সামাজিক মূল্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে এটি স্বীকার করা অপরিহার্য যে ক্ষমতার গতিশীলতা, আর্থিক অসমতা এবং সাংস্কৃতিক পক্ষপাতগুলি এই দৃষ্টিকোণকে প্রভাবিত করতে পারে। সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিষয়গুলি অধ্যয়ন করেন এবং নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা কীভাবে প্রকাশ পায় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন।

বিভিন্ন সময় বলা হয়ে থাকে যে আমাদের দেশে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কারণকে দায়ী করা যেতে পারে। অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক দশকে দ্রুত আধুনিকায়ন ও পশ্চিমাকরণ হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলি প্রবীণদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিসহ প্রথাগত মূল্যবোধ এবং নিয়মের পরিবর্তন ঘটাতে সহায়ক হয়েছে। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক প্রভাব, যা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ এবং যুব-কেন্দ্রিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয় তা প্রবীণদের সম্মান করার অনুভূত গুরুত্ব হ্রাসে অবদান রাখতে পারে।

ঐতিহ্যবাহী বর্ধিত পারিবারিক কাঠামো যেখানে বেশ কয়েকটি প্রজন্ম একসাথে বসবাস করে এবং যেখানে প্রবীণরা অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল- এই ধরনের পরিবারের বিলুপ্তি তাদের মধ্যে দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়া হ্রাস করতে পারে, সম্ভাব্য আন্তঃপ্রজন্মের বন্ধন এবং সম্মানের সুযোগগুলি হ্রাস করতে পারে। একক পরিবারে বাবা-মা ছাড়া শিশুরা আর কোনো সদসস্যের সংস্পর্শে আসতে পারেনা। এ কারণে তাদের মধ্যে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের অন্যান্য প্রবীণ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ শেখার জায়গা সংকুচিত হয়।

দ্রুত নগরায়ন এবং বিশ্বায়ন জীবনধারা এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। শহুরে এলাকায় প্রায়ই একটি দ্রুতগতির, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থাকে যা প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধার ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের চেয়ে ব্যক্তিগত সাফল্য এবং অর্জনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

অর্থনৈতিক চাপ এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতাও আন্তঃপ্রজন্মের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, পরিবারের অল্পবয়সী সদস্যরা বড়দের যত্ন এবং সমর্থনের চেয়ে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, যার ফলে প্রবীণদের সম্মান করার অনুভূত গুরুত্ব হ্রাস পায়।

শিক্ষার বর্ধিত প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঐতিহ্যগত বিশ্বাস এবং মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিভিন্ন ধারণা এবং দর্শনের সংস্পর্শে আসা তরুণ প্রজন্ম প্রবীণদের সম্মান করাসহ প্রচলিত নিয়মগুলিকে প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে যদিও কিছু দিক থেকে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা হ্রাস পেতে পারে, বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি এবং সম্প্রদায় এখনও তাদের প্রবীণদের সম্মান করার গুরুত্বকে মূল্য দেয় এবং অগ্রাধিকার দেয়। সামাজিক পরিবর্তনগুলি জটিল এবং বহুমুখী এবং এই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে বোঝার জন্য বাংলাদেশি সমাজের মধ্যে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান প্রর্দশনের বিষয়টি পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন যাতে ব্যক্তি, পরিবার, সম্প্রদায় এবং সরকারসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার জড়িত থাকবে। এখানে কিছু কৌশল রয়েছে যা প্রবীণদের প্রতি সম্মান বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

প্রবীণদের সম্মান করার মূল্য এবং গুরুত্ব তুলে ধরে শিক্ষা এবং সচেতনতামূলক প্রচারনা চালানো। এটি সরকারি ঘোষণা, স্কুল পাঠ্যক্রম, কমিউনিটি প্রোগ্রাম এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে করা যেতে পারে। লক্ষ্য হল বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সন্মানবোধ জানানোর উপলব্ধির অনুভূতি জাগানো।

আন্তঃপ্রজন্মমূলক প্রোগ্রাম এবং ক্রিয়াকলাপগুলিকে উৎসাহিত করা যা তরুণ এবং বয়স্ক প্রজন্মকে একত্রিত করে। যেখানে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, সম্প্রদায় পরিষেবা উদ্যোগ, বা সাংস্কৃতিক বিনিময় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই প্রোগ্রামগুলি তরুণ প্রজন্মের প্রবীণদের কাছ থেকে শিখতে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া বিকাশের অনুমতি দেয়।

পরিবার এবং সম্প্রদায়কে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা। এটি আন্তঃপ্রজন্মগত সম্পর্কের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে, প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগের প্রচার এবং সক্রিয় শ্রবণ এবং পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা প্রদান করে অর্জন করা যেতে পারে।

বয়স্ক ব্যক্তিদের অধিকার এবং কল্যাণ রক্ষা করে এমন নীতি এবং আইন তৈরি করা। এতে বয়স্কদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিধান এবং আন্তঃপ্রজন্মমূলক কর্মসূচির জন্য সমর্থন অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। একটি ব্যাপক আইনি কাঠামো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে যা বয়স্ক ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করে এবং সম্মান করে।

প্রবীণদের অবদান এবং জ্ঞানকে তুলে ধরে সাংস্কৃতিক উদযাপন এবং ঐতিহ্যের প্রচার করা। এতে উৎসব, গল্প বলার সেশন এবং স্বীকৃতি অনুষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তিদের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য প্রদর্শন করা তাদের মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ায়।

বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক পরিষেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সহায়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এতে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা, প্রবীণ-বান্ধব অবকাঠামো, এবং তাদের প্রয়োজনগুলিকে সমাধান করার জন্য সামাজিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বয়স্ক ব্যক্তিদের ব্যবহারিক চাহিদা পূরণ করা ও তাদের প্রতি যত্ন ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার জন্য সকলকে উৎসাহিত করা।

গণমাধ্যমে বয়স্ক ব্যক্তিদের ইতিবাচক এবং সম্মানজনক প্রতিনিধিত্বকে উৎসাহিত করা। গণমাধ্যম সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উপলব্ধি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যমে এমন সব বিষয় প্রচার করা যা বয়স্ক ব্যক্তিদের সমাজে মূল্যবান অবদানকারী হিসাবে চিত্রিত করে এবং নেতিবাচক ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে।

এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান পুনরুদ্ধার করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া যার জন্য সমাজের সকল সদস্যের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বয়স্ক ব্যক্তিদের জ্ঞান এবং অবদানকে মূল্যায়ন করে এবং সম্মান করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করার জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাংস্কৃতিক অনুশীলন এবং নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন।

মো. বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

মৃত্যু মিছিলের ভার: বাংলাদেশের অব্যক্ত বেদনা



আবু মকসুদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এর কিছুরই দরকার ছিল না। ছয়টা লাশের ভার হয়তো বাংলাদেশ বইতে পারবে; আগেও অনেকবার অনেক লাশের ভার বয়েছে। কিন্তু আজকের এই লাশগুলো অত্যন্ত অকারণ। এই ভার বইবার কোনো দরকার ছিল না।

অনেক দিন আগে বদর আলী নামে এক বাসের ড্রাইভার মারা গেল। কিছু দিন পরে মারা গেল মনির নামের এক কিশোর। তখনও এই মৃত্যুগুলো ছিল অকারণ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মৃত্যু অকারণেই ঘটে। মৃত্যুর যে মিছিল, সেটা আমরা থামাতে পারি না। থামাতে পারি না কথাটা সত্য নয়; আমরা থামাতে চাই না।

গাজায় যেভাবে বিনা পয়সায় মৃত্যু পাওয়া যায়, বাংলাদেশও গাজা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এখানেও অহরহ পয়সাবিহীন মৃত্যু হচ্ছে।

আজ যে রাস্তার পিচগুলো রক্তাক্ত হলো, কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে ছয় জন প্রাণবন্ত তরুণের জীবনের প্রদীপ নিভে গেল, এগুলোকে কি শুধুমাত্র নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে? এগুলো তো আসলে দুর্ঘটনা নয়; এই মৃত্যুগুলো নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।

এই যে ছয়টি প্রাণ, এরা নিশ্চয়ই কারো সন্তান, কারো পিতা, কারো স্বামী, কারো ভাই। এই মৃত্যুতে কি শুধুমাত্র সন্তান মারা গেল? একজন স্বামী মারা গেল, একজন পিতা মারা গেল, না একজন ভাই মারা গেল?

আসলে মারা গেল সবাই; সন্তানের সাথেই পিতা-মাতা কিংবা উত্তরাধিকারের স্বপ্ন। স্বামীর সাথে স্ত্রী এবং তাদের দাম্পত্য সুখ-দুঃখ। পিতার সাথে পুত্রেরও মৃত্যু হলো। ভাইয়ের সাথে মারা গেল বোন; মারা গেল দুঃসময়ের নির্ভরতা।

একজন পিতা যত দিন বেঁচে থাকবে, তার কি আর বেঁচে থাকা হবে? একজন মায়ের জীবনে কি আর কোনো রং অবশিষ্ট থাকবে? একজন স্ত্রী, স্বামীর ভরসায় যে নতুন জীবন শুরু করেছিল, তার জীবন কি কোনো পার পাবে? বোনের জীবনে কোনদিন উৎসব ফিরে আসবে।

এই তরুণদের চাওয়া ন্যায্য ছিল কিনা, এ নিয়ে আমরা হয়তো তর্ক করতে পারতাম। তাদের উচ্ছ্বাসে যদি কোনো ভুল থেকে থাকে, আমরা দেখিয়ে দিতে পারতাম, সংশোধনের পরামর্শ দিতে পারতাম।

এই বয়সটা একটু আবেগী হবে। তারা হয়তো ভবিষ্যতের চিন্তায় অতিমাত্রায় আবেগী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এজন্য তাদের হত্যা করতে হবে—এটা যুক্তিবিদ্যার কোনো যুক্তিতে প্রয়োগ করা যাবে এমনটা মনে হয় না।

একটা স্লোগান! এই স্লোগানটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে হয়তো যায় না। আমাদের চেতনায় যে দেশ, চেতনায় যে যুদ্ধ, সেই যুদ্ধের সাথে হয়তো এই স্লোগানটা যাবে না। এই তরুণদের হয়তো হঠকারিতা ছিল। এই স্লোগানে বিবেচনাবোধের অভাব ছিল।

এই স্লোগানের কারণে তারা সবাই খারিজ হয়ে গেছে; তাদের বাঙালিত্ব মুছে গেছে—এমনটা ভাবনা বাড়াবাড়ি হবে। কখনো কখনো মানুষ খেদ থেকে কিংবা মনকষ্টে নিজেকে পতিতের জায়গায় ভেবে বসে।

আমরা যদি জাজমেন্টাল না হয়ে, অতি ক্রোধী না হয়ে একটু সময় নিয়ে এই তরুণদের বোঝার চেষ্টা করতাম। আমরা যদি জানতে চাইতাম, আসলেই এরা রাজাকার মানসিকতার কি না, তাহলে হয়তো এই অহেতুক প্রাণহরণ এড়াতে পারতাম। কিছু রাজাকার হয়তো ঝাঁকের কই হয়ে মিশে গেছে কিন্তু সবাইকে রাজাকার ভেবে নেওয়া ভাবনার শুদ্ধতাকে প্রমাণিত করে না।

বাংলাদেশে এমন মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়। আগেই বলেছি লাশ বইবার অলৌকিক শক্তি বাংলাদেশের আছে। কিছু দিন পরেই এই ছয়টি মৃত্যু আমরা ভুলে যাব। নতুন কোনো আবেদ আলীর আবির্ভাব হবে অথবা আমরা পরীমনির ডিম ফুটাবার প্রক্রিয়ায় নান্দনিকতা কতটুকু এই বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে যাব।

এই ছয়টি পরিবার অবশ্য বাকি জীবন আর স্বাভাবিক হবে না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা হয়তো বেঁচে থাকবে, কিন্তু প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত হিসেব করবে যে তাদের সন্তানের, তাদের স্বামীর, তাদের পিতার মৃত্যুর কারণটা আসলে কি। এই অহেতুক মৃত্যুর গ্লানি সারা জীবন তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদী মানুষ। তিনি যে শোকের সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন, পৃথিবীর খুব কম মানুষের পক্ষে এমন সমুদ্র সাঁতরানো সম্ভব।

আমরা আশা করেছিলাম আমাদের এই সংবেদী প্রধানমন্ত্রী তার মহৎ হৃদয় নিয়ে কোটা সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হবেন। যে ছয় জন তরুণ মারা গেছে, তিনি তাদের মাতা হতে পারতেন। এগুলো তারই সন্তান হতে পারতো। তিনি চাইলে এই সন্তানগুলো হয়তো বেঁচে থাকতো।

হয়তো তিনি এখন অশ্রু ফেলছেন। হয়তো এই ছয়টি মৃত্যু তাকে সেই শোক মনে করিয়ে দিচ্ছে যে শোক তিনি মনে প্রাণে ভুলতে চাচ্ছেন।

যেকোনো কারণেই হোক, আমাদের সংবেদী প্রধানমন্ত্রী এই অহেতুক মৃত্যুগুলো রোধ করতে পারলেন না। এজন্য দুঃখবোধ থেকে যাবে।

রাজাকার শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি ঘৃণিত শব্দ। এই শব্দটি নিয়ে কেউ খেলতে যাবেন না। কোনোভাবে এই শব্দের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন না।

আমাদের শ্রদ্ধাভাজন একজন স্যার শুধুমাত্র এই শব্দ উচ্চারণের কারণে তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের মুখ দর্শন করবেন না বলে ওয়াদা করেছেন। অনেক ছাত্র তাদের পিতা-মাতার চেয়ে এই স্যারকে বড় ভাবে। তাদের প্রতিটি স্বপ্ন এই স্যারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। ঘৃণিত রাজাকার শব্দের কারণে স্যার তার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের ত্যাগ করেছেন।

রাজাকার শব্দটি অভিশপ্ত। আমি এখনো যেসব প্রাণ, অর্থাৎ এখনো যেসব তরুণ বেঁচে আছে তাদের কাছে করজোড়ে নিবেদন জানাচ্ছি, রাজাকার শব্দ থেকে দূরে থাকো। এই শব্দ প্রাণঘাতী। যতটুকু সম্ভব এই শব্দ থেকে দূরে থাকো। রাজাকার থেকে দূরে থাকো। রাজাকারী চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে থাকো।

রক্ত এবং প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ, হে প্রিয় তরুণেরা, দেশকে নিয়ে কোনো রকম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে যেও না।

তোমরা যারা বেঁচে আছো, বেঁচে থাকার চেষ্টা করো। কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে হঠকারী কিছু করে ফেলো না। রাজাকার সম্প্রদায় তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইবে, তোমাদের আড়ালে তারা তাদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইবে—তোমরা সতর্ক থেকো।

তোমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের চেষ্টা করো। কোনোভাবেই সশস্ত্র হওয়ার চেষ্টা করবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই সংবেদী। হয়তো কোনো মন খারাপের কারণে তিনি তোমাদের থেকে দূরে আছেন, কিন্তু বেশিক্ষণ দূরে থাকবেন না। সন্তানের মনে কষ্ট একজন মা-ই বুঝতে পারেন। তিনি একজন সংবেদী মা, খুব তাড়াতাড়ি তিনি তোমাদের পাশে এসে হাজির হবেন।

তোমরা যদি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করতে পারো, তাহলে অহেতুক মৃত্যু এড়াতে পারবে। বাংলাদেশকে অহেতুক লাশের ভার বইতে দিও না। তাকেও একটু শান্তিতে থাকতে দাও।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবসী, লিটলম্যাগ ‌‘শব্দপাঠ’ সম্পাদক

;

আমি রাজাকার: মুখের কথা শুনেছ দেবতা, মনের কথা শোনোনি জননীর



অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান
অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

অধ্যাপক ডা. শেখ মো. নাজমুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

আলাপ-আলোচনার স্পিরিট অনুযায়ী আমাদের সমগ্র ছাত্রজীবন কেটেছে রাজাকারবৃত্তের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের ‘সোল এজেন্টের’ দাবিদাররা তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল না। এমনকি শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই তখন বাংলাদেশের মধ্যে ছিল না। তারা আসতে পারেনি, তাদের আসতে দেওয়া হয়নি, আসার পরিবেশও ছিল না। তাদের জন্য পাতা ছিল মৃত্যুফাঁদ।

তারা যখন ছিল না তখন আওয়ামী লীগ ছিল। তারা যখন থাকবে না, তখনো আওয়ামী লীগ থাকবে। আওয়ামী লীগ একটা রাজনৈতিক দল। ফলে এখনকার মানুষগুলো একসময়ে থাকবে না কিন্তু দলটি থেকে যাবে। এই নেতৃত্ব আগামীতে থাকবে না, নতুন নেতৃত্ব এসে দলের হাল ধরবে। ফলে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার বা কোনো ব্যক্তির দল নয়, আওয়ামী লীগ জনমানুষের দল।

আমাদের সময়ে মোবাইল আবিষ্কার হয়নি, ইন্টারনেট বলে কোনো শব্দ তখন আমরা শুনিনি। রেডিও-টিভিও পর্যাপ্ত ছিল না। ছাত্রজীবনের শেষদিকে এসে হোস্টেলে টিভি দিয়েছিল। সেখানে এখনকার মতো এভাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা, স্বাধীনতার কথা বলা হতো না। যা বলা হতো তা খণ্ডিত, বিকৃত ইতিহাস। আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, শেখ মুজিবের নাম উচ্চারণ ছিল নিষিদ্ধ।

তখন পেপার-পত্রিকা তেমন ছিল না। যা-ও ছিল তা কেনার পয়সা আমাদের ছিল না। একদিনের পত্রিকা অনেকসময়ে পরেরদিন আসতো। পত্র-পত্রিকায়ও মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কথা উপেক্ষিত ছিল, খণ্ডিত ছিল, বিকৃত ছিল। রাজাকার, আলবদর, আলশামস শব্দগুলি লেখা নিষিদ্ধ ছিল।

তখনকার বইপত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার কথা এখনকার মতো এতো ব্যাপকভাবে উল্লেখ ছিল না। যা ছিল তাও ছিল বিকৃত-খণ্ডিত।

সেই অবস্থার মধ্যে আমরা ছাত্ররাজনীতি করেছি। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ স্লোগান দিয়েছি, জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েছি। “রাজাকার-আলবদর - এবার তোদের দেবো কবর”, “জামাত-শিবির, রাজাকার – এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়”, জামাত-শিবির, মৌলবাদ -ধর্মের নামে পুঁজিবাদ” স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস-রাজপথ দাপিয়েছি, কাঁপিয়েছি।

আমরা স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের ছাত্র রাজনীতিকদের এড়িয়ে চলেছি। তাদের সাথে পারতপক্ষে এক রুমে থাকিনি। তাদের সাথে একত্রে কোনো কাজ করা থেকে পারতপক্ষে বিরত থেকেছি। আমাদের বন্ধুমহল ভিন্ন ছিল। একই ধারার ছাত্র রাজনীতিকদের সাথেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির সাথে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল কম। তাদেরকে কোনোকিছুতে ছাড় দিতাম না।

সেই রাজনৈতিক বিরূপ অবস্থায় স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো দৃঢ় মানসিক শক্তি ও বোধ আমরা কোথা থেকে পেয়েছি? সহজ উত্তর- কঠিন রাজনৈতিক অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত আদর্শিক চর্চা, ত্যাগ ও পূর্বপুরুষের রক্ত ত্যাগের অগ্নি-চেতনা থেকে। সুন্দর দেশ গড়ার একটা স্বপ্ন থেকে।

ওই সময়ে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ও রাজাকার-শাসিত দেশেও সারাদেশের কোথাও কোনো শিক্ষার্থী, কোনো ছাত্রসংগঠন, কোনো ছাত্রজমায়েত কখনো নিজেকে ‘রাজাকার’ বলে স্বঘোষিত কোনো স্লোগান দেয়নি।

এখনকার সমস্ত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, পেপার মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া দিনরাত স্বাধীনতার কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা বিরামহীনভাবে বলে চলেছে।

এখনকার সকল বইপত্র-ক্রোড়পত্র, মানপত্র-দানপত্র, চুক্তিপত্র-ঋণপত্র, প্রেমপত্র-ছাড়পত্র স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর কথা ক্রমাগত বলে চলেছে।

স্বপক্ষ-বিপক্ষ, পুরুষপক্ষ-নারীপক্ষ, পাত্রপক্ষ-কন্যাপক্ষ সবাই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।

দেশের খালে, বিলে, নদীতে, সমুদ্রে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের জোয়ার চলছে। দেশের প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ডে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চাষ চলছে। এর মধ্যে তবে আজ কেন শিক্ষাঙ্গনে ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান উচ্চারিত হয়? যখন হওয়ার কথা ছিল, তখন তো হয়নি। এ ব্যর্থতা কার?

মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রকৃত শুদ্ধচর্চা না করে, মিডিয়ায় অতিকথন হয়েছে। কথা ও কাজে এতোটাই ফারাক তৈরি হয়েছে যে, নিজেদের প্রচারটাই হয়েছে নিজেদের জন্য আত্মঘাতী। হরিষে বিষাদ।

অনুকরণীয় উদাহরণ তৈরি না করে, অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করে মানুষকে এতোটাই জ্বালিয়েছেন যে, মানুষ আজ ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এই স্লোগান উচ্চারণ করে? প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে সহজেই বোঝা যায়, এটা তাদের মনের কথা না, এটা আপনাদের প্রতি তাদের ধিক্কার, কটূক্তি, স্যাটায়ার। এটা শুধু কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া নয়, এটা তাদের সার্বিক অসন্তুষ্টির প্রতিক্রিয়া।

মুখে স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ ও আদর্শের কথা বলে বলে আপনারা এতোটাই অনাদর্শিক কাজ করেছেন যে, একটা আদর্শিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। আজকের এই স্লোগান সেই আদর্শিক শূন্যতার বাই-প্রোডাক্ট?

নীতি-নৈতিকতা, আদর্শের মানদণ্ডে কোথায় নিয়ে গেছেন দেশটাকে? আজকের এই স্লোগান বলে দেয়, স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মের যে সর্বনাশ করতে পারেনি, সে সর্বনাশ আপনারা করে ফেলেছেন!

‘আমি রাজাকার’ শ্লোগানের মধ্যে ওদের কতোটা ক্ষোভ, দুঃখ, জ্বালা লুকিয়ে আছে সেটা পড়ার চেষ্টা করেছেন? না, করেননি। করলে নিজেদের রাজনৈতিক পরাজয় হবে? নিজের ব্যর্থতা প্রকটভাবে প্রকাশ পাবে? এ জন্য মর্মবাণী না পড়ে, উচ্চারিত বাণীর ভুল ধরে রাজনৈতিক বিজয় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন? কোনোকিছুরই মূলে যাবেন না, সবসময় ইফেক্ট নিয়ে সস্তা বয়ান দিয়ে যাবেন? আর কতো?

তথ্যমতে ৬ জন তরুণকে লাশ বানিয়েছেন। সব মেরে ফেলবেন? বোঝাবেন না? বোঝাতে পারেন না? সরকারি চাকরি ছাড়া তরুণদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন না? অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন না?

ছাত্রলীগকে কেন মাঠে নামিয়েছেন? প্রশাসনিক ব্যাকআপ ছাড়া এখানে ছাত্রলীগই ‘নাই’ হয়ে যাবে। প্রোটেকশন ছাড়া বেরিয়ে দেখুন তো আপনাদের কী অবস্থা হয়? জনসমর্থন কোথায়, কোনদিকে টের পাবেন।

পৃথিবীর কোনো সংবাদপত্রে রোল মডেলের কথা আসেনি। গতকাল পর্যন্ত আলজাজিরা, রয়টার্স, এএফপি-সহ সারা পৃথিবীর বড়ো বড়ো সংবাদপত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে ৫ জন তরুণের হত্যার খবর আজ এসেছে। দেশের জন্য সুনাম বটে!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতা পড়েছেন? বিরক্ত হয়ে জননী সন্তানকে মৃত্যুর অভিশাপ দেবার পর দেবতা জননীকে তার সন্তান সমুদ্রে ফেলে দিয়ে প্রতিজ্ঞা রাখতে আহ্বান জানায়। জননী তখন কেঁদে বলে- মুখের কথা শুনেছ দেবতা, মনের কথা শোনোনি জননীর। ‘আমি রাজাকার’ স্লোগানের মধ্যেও সেই মর্মবাণী, সেই আক্ষেপ, ক্ষোভ, জ্বালা, ব্যথা, স্যাটায়ার লুকিয়ে আছে। উদার বুদ্ধি খাটিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখুন।

মোক্ষদা কহিল, "অতি মূর্খ নারী আমি,
কী বলেছি রোষবশে--ওগো অন্তর্যামী,
সেই সত্য হল? সে যে মিথ্যা কতদূর
তখনি শুনে কি তুমি বোঝনি ঠাকুর?
শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা?
শোননি কি জননীর অন্তরের কথা?'

বিষয়টির যৌক্তিক ও সুষ্ঠু সমাধান করুন, নতুবা প্রজন্ম আজ যেটা স্যাটায়ার করছে আগামীতে সেটা তাদের বিশ্বাসে পরিণত হবে। এমন অবস্থা তৈরি হবে যে, একসময়ে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হাসি-তামাশা হবে। দোহাই আপনাদের এভাবে বিভীষণের ভূমিকা নেবেন না। আপনারা একসময়ে আওয়ামী লীগে থাকবেন না, কিন্তু আওয়ামী লীগ থাকবে।

শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারকে বলব- গোস্বা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাবার ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগকে খুশি করাটা আপনার জন্য জরুরি না, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ওই তরুণদের ভুল ভাঙ্গানোটা আপনার জন্য বেশি জরুরি। ওদের বোঝানোটা জরুরি। ওরা আমাদের সন্তান, ওদেরকে সুপথে আনা আমাদের দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রী রাজনীতি করেন, রাজনীতিক বিজয়ের জন্য তিনি এই বাচ্চাদের সাথে বাগযুদ্ধে নামতে পারেন, ঝগড়া করতে পারেন, পুলিশ দিয়ে মারতে পারেন, কিন্তু আপনি পারেন না। প্রধানমন্ত্রীদের উত্তরসূরি না থাকলে দেশের তেমন কিছু হয় না, কিন্তু জ্ঞানীদের উত্তরসূরি না থাকলে দেশের মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

এই ভূখণ্ডে মহাপ্রতাপশালী পাল বংশ, সেন বংশ, আর্য বংশ, মৌর্য বংশ, মোগল বংশ, খিলজি বংশ, বারো ভূঁইয়া সব শেষ হয়ে গেছে, তাদের কোনো উত্তরসূরি নাই। কিন্তু তখনকার জ্ঞানীদের উত্তরসূরি ঠিকই আছে। আপনি তাদের মহান উত্তরসূরি। এই দেশে অযোগ্য অপদার্থ রাজনীতিবিদদের উত্তরসূরির দরকার নাই কিন্তু আপনার মতো জ্ঞানী মানুষের উত্তরসূরির দরকার আছে। সন্তানদের ধারণ করুণ। ওরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।

লেখক: গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

;

‘সংকট নিরসনে প্রতিশোধের মনোবৃত্তি পুষে না রাখা জরুরি’



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম
ড. মাহবুব উল্লাহ

ড. মাহবুব উল্লাহ

  • Font increase
  • Font Decrease

কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনে উদ্ভূত অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনাকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের প্রতি অবজ্ঞা বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ।

চলমান সংকট নিরসনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সরকার ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা এবং কোন ধরণের প্রতিশোধের মনোবৃত্তি পুষে না রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

কোটা সংস্কার আন্দোলন গণবিস্ফোরণে রূপ নেওয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দেশের নাগরিক সমাজেরও সমালোচনা করেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, আমাদের নাগরিক সমাজ শুধু বিভক্তই নয়, বেশির ভাগই রাষ্ট্রের আনুকূল্য পাওয়ার মোহে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।

বুধবার দুপুরে বার্তা২৪.কম-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ড. মাহবুব উল্লাহ। কথা বলেছেন পরিকল্পনা সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম।

বার্তা২৪.কম: কোটা সংস্কার আন্দোলন সংঘাতময় পরিণতি পাওয়ায় উদ্ভূত অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ এসেছে। স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর নির্দেশনা নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। আপনি বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন...

ড. মাহবুব উল্লাহ: পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলো স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। এবং ইউনিভার্সিটির সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্ষদ হচ্ছে সিন্ডিকেট। অতীতে আমরা যেটা লক্ষ্য করেছি সেটা হলো এই ধরণের কোন সংকট সৃষ্টি হলে ভাইস-চ্যান্সেলর সিন্ডিকেটের মিটিং ডাকেন। সেখানে আলোচনা-পর্যালোচনার পর ইউনিভার্সিটি অনির্দিষ্টকাল বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করে দিতে হবে কিনা সেটা তারা সিদ্ধান্ত নেন। এবার বলা যেতে পারে ইউজিসির মাধ্যমে যেটা হল তা মনে হচ্ছে না, সাধারণ যে নিয়ম বা কনভেনশন তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটির যে স্বায়ত্বশাসন রয়েছে সেইটাকে অবজ্ঞা প্রকাশ করা হল। এটা মোটেও কাম্য ছিল না। সরকার তো খুব ভালো করেই জানে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ যে পর্ষদ গঠিত হয়, এর পেছনে সরকারের নিজস্ব কর্তৃত্ব অনেকখানি আছে। সেটা পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হোক। এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য নিয়োগেও সরকারের পূর্ব অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সরকারের সম্মতি ছাড়া এগুলো হয় না। সরকার নির্দেশনা দিয়েই কাজটা করতে পারত এই বলে যে, এ ধরণের পরিস্থিতিতে ইউনিভার্সিটিগুলো বন্ধ রাখা উচিত। তখন নিশ্চয়ই ভাইস-চ্যান্সেলর দ্বিমত করতেন না। ভাইস-চ্যান্সেলরগণ যেহেতু সবাই একই লাইনের লোক..তো সেই পথে না গিয়ে..মনে হচ্ছে যে এক ধরণের খুব তাড়া ছিল। তড়িঘড়ি করে কাজটা করতে হবে। নিঃসন্দেহে এটা অতীতের সকল কনভেনশন ও যে সমস্ত দৃষ্টান্তের সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বার্তা২৪.কম: গতকাল মঙ্গলবার কোটা আন্দোলনকে ঘিরে দেশজুড়ে সংঘর্ষে ৬ জন নিহত ও বহু আহত হয়েছেন। ছাত্র আন্দোলনে এই রক্তপাত কি এড়ানো যেত না?

ড. মাহবুব উল্লাহ: কোটার প্রশ্নে ছাত্ররা যে অবস্থান নিয়েছে...সেই ২০১৮ সাল থেকে, কখনও তারা বলেনি সম্পূর্ণভাবে কোটা প্রত্যাহার করতে হবে বা বাতিল করতে হবে। তারা বলেছেন কোটার সংস্কার চান। এবং এমন একটা সংস্কার চান যেটা মেধার মূল্যায়নে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করবে। মোটামুটি সরকারি মহলের অনেকেও এর যথার্থতা স্বীকার করেন। এই অবস্থায় যেহেতু এটা যথার্থ সেহেতু সরকার গোড়া থেকে যেটা করতে পারতো, সেটা হলো ছাত্রছাত্রীদের আশ্বস্ত করা এই বলে যে, ‘তোমাদের দাবির যথার্থতা আমরা অনুধাবন করতে পারছি। তবে বিষয়টি সমাধান করতে গেলে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার আছে। সেই ভিত্তিতেই তোমাদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান দেব।’

সেখানে যাদের কোটা পাওয়া উচিত, যৌক্তিতা আছে তাদের জন্য কোটার ব্যবস্থা রেখে বাকী সব বাদ দেওয়া। অনেকে যেটা বলেন যে সমগ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত? তাহলে তাদের সংখ্যানুপাত কত হয়, এবং সেই অনুসারে সেটা করা। ছাত্ররা বলেছেন যে কোটা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হতে পারে। রাজনৈতিক দল বিএনপির কেউ কেউ বলেছেন, এটা দশ থেকে পনের শতাংশ হতে পারে। যাহোক এটা তো একটা আলাপ আলোচনা করে সমঝোতার পরিবেশে সহানুভূতির পরিবেশে জিনিসটা করা যেত। তারপরে যা ঘটলো তা অনমনীয়তার ব্যাপার। দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল। অনেক প্রাণ চলে গেল, অনেকে আহত হল। তবে এটাও মনে রাখতে হবে গত কয়েক দিনের যে ঘটনাবলী তা নিছক কোটা সংশ্লিষ্ট সরকারের ঔদাসীন্যের জন্য নয়। বরং এটা বলা যায় যে, দীর্ঘদিনের পূঞ্জীভূত যে বিক্ষোভ সঞ্চিত হচ্ছিল তার কোন বহিঃপ্রকাশ ঘটানো সম্ভব হচ্ছি না নানা কারণে; সেই জন্য একটা বিস্ফোরণ হয়ে গেছে। তার চাইতেও দুঃখজনক হচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রীদেরকে যেভাবে পেটানো হয়েছে এটা একটা স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে সভ্য দেশে কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। তারপরেও সেখানে বহিরাগতরা, ছাত্র নয় এমন অনেককে ব্যবহার করা হয়েছে। আমি এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ছিলাম, পরে শিক্ষকতা করেছি, আমাদের জানা অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বাইরের লোক দিয়ে ছাত্রআন্দোলন দমন করা, এটা কখনো হয়নি। এটা খুবই নিন্দনীয়, দুঃখজনক-যা মেনে নেওয়া যায় না। তারপরও বলব সকলের সুমতি হোক। যাতে আমরা একটা সুষ্ঠু সমাধানে আসতে পারি। এবং দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও সহনশীলতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। যেখানে ছাত্র-শ্রমিক-কৃষকসহ সবাই তাদের মনের আনন্দে নাগরিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে।

বার্তা২৪.কম: বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সার্বিক অবস্থার উত্তরণ কি উপায়ে হতে পারে বলে মনে করেন...

ড. মাহবুব উল্লাহ: উত্তরণ তো কঠিন ব্যাপার। দেশে একটা ইস্যু এলে আরও অনেক ইস্যু জড়িয়ে যায়। সেটা হয় আমাদের বালখিল্যতার জন্য। আমরা সঠিকভাবে সমস্যাগুলো হ্যান্ডেল করতে পারি না, সে কারণে এগুলো ঘটে। এখন তো বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ-সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কবে নাগাদ খুলবে আমরা জানি না। কবে নাগাদ সরকার বুঝবে বা উপলব্ধি করবে যে খোলার মত পরিবেশ হয়েছে। এই দিক থেকে বললে বলা যায়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের অনেক ক্ষতি হবে। সেশনজট সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজস্ব আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলনও সুরাহা হওয়ার পথে বেশি আলো আমি দেখছি না। কিভাবে সুরাহা হবে সেটা ঠিক বুঝতেও পারছি না। কথা হচ্ছে যে, এটা সুরাহা করার জন্য সবচেয়ে বড় জিনিস যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে আন্তরিকতা এবং কোন ধরণের প্রতিশোধের মনোবৃত্তি পুষে না রাখা। মন থেকে সব কালিমা ধুয়ে মুছে খোলা মন নিয়ে আন্তরিকতা সঙ্গে সমাধানে উদ্যোগী হওয়া। যদিও সেটা যে খুব সহজ হবে তা মনে করা কঠিন। কারণ রক্তপাত হয়ে যাওয়ার পর যেটা দাগ বা ক্ষত সৃষ্টি হয় সেই ক্ষত সহজে মোছা যায় না। মানুষের শরীরে ক্ষত হলে চিকিৎসায় ক্ষত হয়ত শুকিয়ে যায় কিন্তু দাগ থেকে যায়। এটাই হল চিন্তার বিষয়।

বার্তা২৪.কম: সংকটের উত্তাপ প্রশমনে সরকারের বাইরে নাগরিক সমাজের ভূমিকাকে কিভাবে দেখেন?

ড. মাহবুব উল্লাহ: দেশের সুস্থ ও সহনশীল পরিবেশ তৈরি করার ব্যাপারে সিভিল সোসাইটি একটা বড় ভূমিকা পালন করে। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ বিভক্ত। শুধু বিভক্তই নয়, এর বেশির ভাগ রাষ্ট্রের আনুকূল্য পাওয়ার মোহে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। অথচ পাকিস্তান আমলে, এমনকি বাংলাদেশ সৃষ্টির পরেও আমরা লক্ষ্য করেছি, এখানকার নাগরিক সমাজ; বিশেষ করে বিদ্বৎসমাজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, আইনজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবীরা, শিল্পী-কবি সাহিত্যিকরা বড় ভূমিকা পালন করেছেন। আজকে যাদের জাতির বিবেক হিসাবে দায়িত্ব পালন করার কথা তারা প্রায় নিশ্চুপ। নিশ্চুপই নয়, তারা অন্যায়ের প্রতি প্রশ্রয়শীল। এটা খুবই দুঃখজনক, বেদনাদায়ক এবং এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া উচিত। আমি আশাকরব আগামী দিনে বিবেকবান এমন অনেক মানুষ সৃষ্টি হবে।

;

শক্তিপ্রয়োগে কার লাভ?



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কোটা আন্দোলনকারী ও সরকার দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন কয়েশ। আহতদের মধ্যে আছেন যেমন কোটা আন্দোলনকারীরা, তেমনি আছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীও। যদিও কোটা আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বেশি এখানে।

যে কোনো বিচারে যে কোনো সংঘর্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত। এসবে প্রাপ্তির কিছু নাই। থাকে বল প্রয়োগে প্রতিপক্ষকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। রাজধানীর শিক্ষাঙ্গন বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গতকালের অনাকাঙ্ক্ষিত এই সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের মধ্যকার। এখানে ছাত্রলীগ ও কোটা আন্দোলনকারীদের নাম দেওয়া যায় তবে দুপক্ষই শিক্ষার্থীই। সংঘর্ষে পুলিশ প্রশাসন অংশ নেয়নি। কোটা আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগ এখানে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে নেমেছে। মারধরে কোটা আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছে যদিও, তবে তারা সরকার ও সরকারি দলের নানা অংশ ছাড়া সহানুভূতি পাচ্ছে সকল মহল থেকে।

কীভাবে সংঘর্ষের শুরু, কেন ঘটল এমন, এই যে শক্তি প্রয়োগ এতে কার কী লাভ হলো—এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম যা জানাচ্ছে তাতে দেখা যায়, হলে হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান এবং সেখানে কোটা আন্দোলনকারীদের যাওয়া এবং মাইকে স্লোগান দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসার আহবান, ভেতরে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসার চেষ্টা, হলে-হলে ছাত্রলীগের অবস্থান, ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা, এমন নানা অভিযোগ তুলে আন্দোলনকারীরা ইট পাটকেল ছুঁড়ে, ছাত্রলীগও এর জবাব দেয়।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের শুরু যেভাবে’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে প্রথম আলো জানায়, ‘‘আন্দোলনকারীরা বঙ্গবন্ধু হলের ভেতরের ফটকের সামনে গিয়ে রিকশায় থাকা মাইকে ‘বঙ্গবন্ধু হলের ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন। কয়েকজন হলের ভেতরে ঢুকে কক্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের আনতে যান। মিনিট কয়েক পর মিছিলটি বের হয়ে আসে। এ সময় তারা ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’সহ নানা স্লোগান দেন। বঙ্গবন্ধু হল থেকে বের হয়ে আন্দোলনকারীদের মাইক থেকে বলা হয়, তারা খবর পেয়েছেন, কয়েকজন আন্দোলনকারীকে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে আটকে রাখা হয়েছে। এরপর তারা প্রবেশ করেন জিয়াউর রহমান হলে। হলের সামনে গিয়ে তারা ‘দালালদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ নানা স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীদের কয়েকজন ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীদের আনতে হলে প্রবেশ করেন। এ সময় বাইরে আন্দোলনকারীদের জমায়েত থেকে ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আন্দোলনকারীদের মিছিলটি জিয়াউর রহমান হল থেকে বের হয়ে বিজয় একাত্তর হলের ফটকের দিকে যায়। মিছিলটি হলের ফটকে যাওয়ার পর মাইকে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে বিজয় একাত্তর হল সংসদে আটকে রাখা হয়েছে। একপর্যায়ে মাইকে শিক্ষার্থীদের একাত্তর হলের ভেতরে ঢোকার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, ‘সন্ত্রাসীদের ধরে নিয়ে আসুন।’ একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা হলের বাগানে ঢুকে পড়েন। তারা নিচ থেকে ইট ও পাথরের টুকরা, ছেঁড়া জুতা প্রভৃতি হলের বিভিন্ন তলায় থাকা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে ছুড়তে থাকেন। ওপর থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও প্লাস্টিকের বোতল, ঢিল প্রভৃতি ছুড়ছিলেন। দুই পক্ষই পরস্পরকে অকথ্য গালিগালাজ করছিল। এর মধ্যে হলের বাগানে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মারামারি বেধে যায়। এরপর হল শাখার কিছু নেতা আন্দোলনকারীদের দিকে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হলের বিভিন্ন তলা থেকে লাঠিসোঁটা, কাঠ, লোহার পাইপ ও বাঁশ নিয়ে দল বেঁধে নিচে নেমে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেন। আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান, অনেকে দৌড়ে জসীমউদ্‌দীন হলের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিজয় একাত্তর হলে ঘটনার শুরু হলেও আশপাশের হলগুলোর (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও জিয়াউর রহমান হল) ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও সংঘর্ষে যোগ দেন। সংঘর্ষ চলাকালে দুই পক্ষ পরস্পরের দিকে ইট ও পাথরের টুকরা ছুড়তে থাকে। দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের হাতেই ছিল লাঠিসোঁটা ও বাঁশ।’’ [১৬ জুলাই ২০২৪] প্রথম আলোর প্রতিবেদনকে সূত্র হিসেবে উল্লেখের কারণ নানা সময়ে পত্রিকাটি যে কোন আন্দোলনে একটা পক্ষ নিয়ে ফেলে। নির্দিষ্ট বিষয়ে, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য একাধিক নিবন্ধ প্রকাশ করে থাকে। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না যদিও, তবে এই প্রতিবেদনে ধারাবর্ণনায় তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের বিপরীত।

বার্তা২৪.কমের এক প্রতিবেদন বলছে, ‘‘ছাত্রলীগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে দাঁড়াতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১৬ জুলাই) দুপুর আড়াইটায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশে এই হুঁশিয়ারি দেন তারা।’’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘আন্দোলনকারীরা বলেন, তারা (ছাত্রলীগ) আজকে আবার বিকেল ৩টায় টোকাইদের এই ক্যাম্পাসে মহড়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। রাজু ভাস্কর্যে দাঁড়িয়ে এই দেশের শিক্ষার্থীদের হুমকি দেয়। আমরা আজকে তাদের এই রাজু ভাস্কর্যে দাঁড়াতে দেব, দাঁড়াতে দেব, এই টোকাইদের, তখন শিক্ষার্থীরা না না বলেন। তাহলে আজকে আমাদের এই হাজার হাজার লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের এখানে বসে থাকতে হবে।’’

হলে-হলে গিয়ে ‘সন্ত্রাসীদের ধরে নিয়ে আসুন’, ‘টোকাইদের বসতে দেওয়া হবে না’ জাতীয় স্লোগান, ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দিয়ে হলে-হলে ছাত্রলীগের অবস্থান স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। এছাড়া রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার’ বলে যে ধৃষ্টতাপূর্ণ স্লোগান ওঠেছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে-ক্যাম্পাসে সেটা পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। যদিও পরের দিন আন্দোলনকারীদের নেতাদের কয়েকজন বলছেন, তারা নিজেদের রাজাকার দাবি করে স্লোগান দেননি। তারা বলেছেন, ‘তুমি নও আমি নই— রাজাকার রাজাকার’। আর এদিকে, ফেসবুকে একটা অংশ প্রচার করছে স্লোগান নাকি ওঠেছিল, ‘তুমি কে আমি কে— রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যকার ‘স্বঘোষিত রাজাকার’ অংশের স্লোগানের পর মূলত পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরে গেছে। মধ্যরাতের স্লোগানের পর কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের মন্ত্রীদের অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘‘যে বিষয়টি (কোটা) দেশের উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, সেটি আদালতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের কোনো কিছুই করার নেই। বিচারাধীন বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও মন্তব্য করা আদালত অবমাননার শামিল। আমরা বারবার আন্দোলনকারীদের বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত বাদ রেখে অন্য কোনো উপায়ে বা বলপ্রয়োগে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই। আন্দোলনের নামে দুর্ভোগ মেনে নেব না। রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী সভা-সমাবেশ আমরা মেনে নিতে পারি না। আমরা লক্ষ করছি, এ আন্দোলনের কুশীলব বিএনপি-জামায়াত তাদের স্বরূপ উন্মোচিত করেছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত করতে চায়। তাদের কারসাজিতে গতকাল (রবিবার) রাতে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে আঘাত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে। তারা সমগ্র ছাত্রসমাজকে সরকারের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করছে।’’ ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্য প্রাসঙ্গিক। তবে তিনি এও বলেছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে। শিক্ষার্থীদের রাজাকার স্লোগানের কারণে কোনো ধরনের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে কি না জানাতে চাইলে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। [দেশ রূপান্তর, ১৬ জুলাই ২০২৪]

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিশাল অংশের নিজদের ‘রাজাকার’ দাবির পর প্রকৃত অর্থে পুরো দৃশ্যপট পালটে গেছে। এতদিন ছাত্রলীগ আন্দোলনে কোন ভূমিকায় না থেকে কোটা সংস্কারের পক্ষেই বলছিল, সেই ছাত্রলীগ মাঠে হাজির, এবং সংঘর্ষের ঘটনা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ এবং ছাত্রলীগ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। এখন তাই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। শক্তি প্রয়োগের নজির ফুটে ওঠেছে সোমবারের ঘটনায়। এই শক্তি প্রয়োগে দুই পক্ষই সমভাবে দায়ী। উসকানি দিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া যা বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরের ওঠে এসেছে, তাতে মনে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের। এখানে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দিয়ে আপিল বিভাগ কোটা সংস্কারের বিষয়টিকে যেখানে একটা ইতিবাচক সমাধানের পথে নিয়ে যাচ্ছিল, সরকারেরও তাতে সায় আছে, সেই পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। সমাধান যখন সন্নিকটে তখন এইধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টির নেপথ্যে কি কেউ আছে, এটা তাই গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে যৌক্তিকতা আছে। এই যৌক্তিকতা কেউ অস্বীকার করছে না। দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে শুরু করে সরকার—সবাই দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল। প্রধান বিচারপতি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বক্তব্য জানতে চেয়েছেন, তাদেরকে আদালতে এসে বক্তব্য উপস্থাপনেরও পরামর্শ দিয়েছেন। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের যে আন্দোলন সেটা ব্যর্থ হয়নি, বরং একটা সম্মানজনক সমাধানের পথেই যাচ্ছিল। তবু আন্দোলনরতদের আন্দোলন থামেনি, বরং নিজেদের ‘রাজাকার’ দাবি করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে তারা সেটা যেকোনো দেশপ্রেমিক বাঙালি-বাংলাদেশিকে সংক্ষুব্ধ করবে।

তবু আমরা চাই এর সমাধান। এখানে শক্তি প্রয়োগে আন্দোলন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা/নেওয়া এবং বানচাল করে দেওয়ার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে। সংঘর্ষের পর সামাজিক মাধ্যমে আহতদের ছবি ছড়াচ্ছে তাতে মানুষের সহানুভূতিই পাচ্ছে তারা। ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীদের যারাই সংঘর্ষে জড়িয়েছে তাদের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল, অর্থাৎ দুই পক্ষের পূর্ব-প্রস্তুতি ছিল।

এইধরনের শক্তি প্রয়োগের ফল কী হয় সেটা আমাদের চোখে দেখা। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, এবং সেই আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুরের ওপর একের পর এক হামলা, তাকে নেতা বানিয়ে দিয়েছে। ওই আন্দোলনের পথ ধরে নুরুল হক নুর পরে ডাকসুর ভিপি হয়েছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতেও উত্তাপ ছড়িয়েছিলেন বেশ কিছুদিন। নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন, পরে যদিও আন্দোলন ও দলের অর্থ তছরুপের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পথেই বসেছেন। নুরের এই হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জাতীয় রাজনীতির চিত্র হলেও কোটা আন্দোলন ও তার একের পর এক মার খাওয়া তাকে কিছুদিনের জন্যে হলেও আলোচিত এক নেতায় পরিণত করেছিল।

সকল পক্ষ যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে একমত, তখন বিষয়টিকে আর রাজপথে না রাখাই হবে যৌক্তিক। এখানে উসকানি থাকবে, কিন্তু এই উসকানিকে অগ্রাহ্য করে সহনশীল থাকা উচিত ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের। দুই পক্ষ যদি সহনশীল না হয়, তবে যৌক্তিক এই দাবি এবং আন্দোলনটাই শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষের ইগো ইস্যু হয়ে ওঠবে। আমরা চাইব না তেমন কিছু হোক।

;