রণাঙ্গনের অনাকাঙ্ক্ষিত একটি দুর্ঘটনা



সার্জেন্ট (অব.) সৈয়দ জহিরুল হক
গ্রাফিক বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ১জয়দেবপুরের গণ বিক্ষোভ
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ২আশুগঞ্জের বিমান হামলা
ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ৩সিলেটের মাধবপুরের যুদ্ধ


একবার ক্যাপ্টেন নাসিম সাহেব আমাকেসহ ১০/১৫ জনের একটি ছোট দল তৈরি করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেট রোডের ওপর একটি এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন লাগানোর জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সেই দলে ছিলেন সুবেদার মনির আহমেদের নেতৃত্বে বিকিউএস এইচ ফরাজ, বিডিআর মোস্তফা, সিপাহী আবু জাফর, ইসহাক ও আব্দুল জলিল। আমিও সে দলে ছিলাম। রাত ১১টার পর আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম। পাকা রাস্তার পূর্ব পাশে কিছু জঙ্গল ও ঘরবাড়িতে আমরা এ্যাম্বুশে বসি। দুই জন সৈনিক এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন নিয়ে রাস্তার ওপর উঠে পাকা রাস্তা খোদাই করে মাইন লাগিয়ে আমাদের অবস্থানে ফিরে আসে। সম্ভবত রাত একটার দিকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া থেকে সিলেট অভিমুখে যাবার জন্য একটি ট্রাক যখন আমাদের এ্যাম্বুশের মাঝে আসে তখন আমরা একত্রে ঐ ট্রাকের ওপর গুলিবর্ষণ শরু করলাম। ঐ সময় পকিস্তানি বাহিনীও গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার বিপরীত পাশে অবস্থান নিয়ে আমাদের লক্ষ্য করে ফায়ার শুরু করে। উভয় পক্ষে গোলাগুলিতে পাক সেনাদের ২/৪ জন সম্ভবত নিহত হয়েছিল। আমরা ৫/৭ মিনিট ফায়ার করার পর দ্রুত উইড্রল করি। যে পথে এসেছিলাম সেই পথ ধরে ক্যাম্পে ফিরে যাই।

ভোর ৫টায় আমরা ক্যাম্পে পৌঁছালে সকলেই শীতে কাতর হয়ে পড়েছিলাম। এসেই নাসিম সাহেবকে এ্যাম্বুশের বিবরণ বর্ণনা করি। এ সময় চা-নাস্তার জন্য আমরা যার যার মতো বিশ্রাম নিই। কিন্তু সিপাহী জলিল সে চা পান করার জন্য লঙ্গরে প্রবেশ করে। সেখানে বাবুর্চিরা আমাদের জন্য চা, পুরি তৈরি করছিল। জলিল যখন একটি মগে করে চা নিতে যাচ্ছিল তখন একজন বাবুর্চি সিপাহী আব্দুল গফুর মজা করে তাকে বলে বড় কামাই করে এসেছেন, তাকে এখনই চা দিতে হবে। তখন জলিল বলে তোর ক্ষমতা থাকে তো এ বন্দুক চালিয়ে দেখা। বন্দুকও চালাতে পারবি না, তো বাবুর্চিগিরি করবি না, কী করবি? এমন সময় গফুর বলল, আপনার বন্দুকটা দেন, আমি চালিয়ে দেখিয়ে দিই। জলিল ভালো করেই জানত ওর চায়না ৭.৬২ এমএম অটো রাইফেল চালাবার মতো জ্ঞান নেই। কেননা ওরা ট্রেনিং সেন্টারে ব্রিটিশ থ্রিনটথ্রি রাইফেলের প্র্যাক্টিস করেছে মাত্র। এ বিশ্বাসের বলে জলিল নিজের রাইফেল ওকে দেয়। এক্ষেত্রে জলিলের ভুল ছিল দুটি। এক. অপরেশন থেকে আসার পর রাইফেল আনলোড করে নাই। দুই. সেপ্টিক্যাস অফ করে নাই।

গফুর রাইফেল হাতে নিয়ে ওর সামনের দেওয়ালের দিকে লক্ষ্য করে যেই ট্রিগার চাপ দেয় ওমনি একটি বুলেট জলিলের বুক ভেদ করে চলে যায়। ওখানেই ওর মৃত্যু হয়। আমরা দৌড়ে গিয়ে দেখি, ওর কলিজা মাটির দেওয়ালের সাথে আটকে আছে। এ দৃশ্য দেখে আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। ওর আর চা খাওয়া হলো না। গফুরও এ অবস্থা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। নাসিম সাহেব দৌড়ে লঙ্গর খানায় এসে এ দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান। এমন এক মুহূর্তে আমরা একজন সৈনিক হারালাম যখন আমাদের যোদ্ধা সৈনিকের খুবই অভাব ছিল। জলিল প্রায় প্রতিটি অপারেশনে আমাদের সঙ্গেই থাকত। এ মর্মান্তিক ঘটনাটা সম্ভবত নভেম্বরের শেষের দিকে ঘটে। অন্যদিকে রান্নাবান্নার জন্য ববুর্চির অভাব থাকাতে নাসিম সাহেবও একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি রাগে সিপাহী বাবুর্চি গফুরকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন। ওর যখন জ্ঞান ফিরল তখন ও অনেকটা পাগলের মতো প্রলাপ বকতে শুরু করে। আমি জানি না, দেশ স্বাধীনের পর সরকার জলিলের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নিয়েছে। ওর বাবা মা বা আত্মীয় স্বজনরা ওর কোনো সন্ধান পেয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই। ওর বাড়ি ছিল সম্ভবত রাজশাহী অথবা দিনাজপুর। ওর ঠিকানা আজ আমার কিছুই মনে নেই। সম্ভবত তখনকার ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টে রেকর্ডপত্রে ওর নাম, নম্বর ঠিকানা থাকতে পারে। ওকে দাফন করার পর আমরা পুনরায় নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাই। পরবর্তীতে অনেকের অনুরোধে নাসিম সাহেব সিপাহী বাবুর্চি গফুরকে ক্ষমা করে দেন।

একসময় নাসিম সাহেব আমাকে আইনটি কোর্স করার জন্য আমাদের ব্যাটেলিয়ান হেড কোয়ার্টারের ট্রেনিং সেন্টারে পাঠালেন। সেখানে একজন আইনটি হাবিলদার ও একজন আইনটি নায়েক আমাদেরকে কোর্স করান। সেখানে আমাদের ব্যাটেলিয়ানের প্রত্যেক কোম্পানি থেকে ২/১ জন করে সৈনিক পাঠিয়েছিল। তখন একদিন আমাদের ব্যাটালিয়ানের ক্লার্ক অফিসে যাই ক্লার্কদের সাথে দেখা করার জন্য। তখন হেড ক্লার্ক সুবেদার আব্দুল লতিফ হায়াত সাহেব আমাকে দেখ বললেন, “জহির! নাসিম সাহেবকে বলে তোমাকে আমাদের অফিসে ক্লার্কের জন্য নিয়ে আসি।” জবাবে আমি বলেছিলাম, “না, স্যার। যতদিন দেশ স্বাধীন না হবে ততদিন আমি রণাঙ্গনেই থাকব।” আমরা দু সপ্তাহে কোর্স শেষ করে আমাদের কোম্পানিতে ফিরে যাই।

নাসিম সাহেব মাঝে মঝে আমাদের ডিফেন্সে ওপি পোস্টের জন্য আমাকে পাঠাতেন। এবং বিভিন্ন ছোট খাট অপারেশনে ও পেট্রোলিংয়ে আমাকে তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। একদিন সন্ধ্যার সময় আমাদের পুরো কোম্পানিকে রিয়ার হেড কোয়ার্টারে নিয়ে আসলেন। আমাদের প্রত্যেকের নিকট একটি করে বেলচা এবং সামান্য কিছু গুলি নিয়ে নিজ নিজ ব্যক্তিগত হাতিয়ার নিয়ে যেতে বললেন। রাতের মধ্যে ইনফ্লেটেশন করে আমাদের ডিফেন্স থেকে আরো তিন/চার মাইল ভিতরে ঢুকে অবস্থান নিতে বলেন। এবং বললেন, “চলার পথে কেউ কোনো শব্দ করবে না। আমার হুকুম ছাড়া কেউ একরাউন্ড গুলিও করবে না। এবং যার যেখানে অবস্থান হবে সেখানে প্রত্যেকেই দ্রুত একটি করে ফক্সহোল খোদাই করে ডিফেন্স নিয়ে নিবে। ভোর ৫টা থেকে আমাদের আর্টিলারি গানে ফায়ার দিতে থাকবে। একঘণ্টা এ ঘোলাবর্ষণ চলবে। এবং আমি যখন উইড্রল সিগন্যাল দিব তখন তোমরা সকলেই চলে আসবে।” আমরা রাত ২/৩টার ভিতর ফক্সহোল খোদাই করে ডিফেন্স নিয়ে বসি। যথা সমেয় আর্টলারি গোলার ফায়ার শুরু হয়। এবং একঘণ্টার পর তা বন্ধ করে দেয়। দেখি আমাদের ডিফেন্স থেকে মাইল খানেক দূর দিয়ে ভারতীয় একটি ব্যাটালিয়ানের সৈনিক দল পাকিস্তান ডিফেন্স এলাকায় তদন্ত করে যায়। সকাল ৭টার দিকে নাসিম সাহেব উইড্রল সিগন্যাল দিয়ে দিলে আমরা চলে আসি। এত বড় অপারেশনের মাঝে আমাদের এক রাউন্ড গুলিও খরচ করতে হয়নি।

গোটা নয় মাস যুদ্ধকালে প্রতিটি মুহূর্ত শত্রুর মুখোমুখি ছিলাম। যে কোনো মুহূর্তে আমরা একটি বুলেট অথবা একটি আর্টিলারি গোলার খোরাক ছিলাম। সর্বক্ষণ মহান আল্লাহকে ডাকতাম। এবং দোয়া করতাম, “তুমি একমাত্র স্বাক্ষী। আমরা কোনো অন্যায় করিনি। ওরা আমাদের হত্যা করছে। আমাদের মা বোনদের ইজ্জত নষ্ট করছে। আমি কখনো পরের সম্পদের ওপর লোভ করিনি। কোনো নারীর প্রতি কু-দৃষ্টিপাত করিনি। বাড়িতে আমি আমার বৃদ্ধা নানী, মামী, রুগ্ন মা, বাবা এবং ছোট দুবোন, ছোট এক ভাই রেখে এসেছি। আসার সময় কারো সাথে দেখাও করে আসতে পারিনি। একমাত্র তোমার কাছে এসব কিছু সঁপে রেখে এসেছি। হে আল্লাহ! তুমি এদের হেফাজত কর। আমার দেশকে স্বাধীন করো।” এ যুদ্ধে মৃত্যু আমার নিত্যসঙ্গী। যে কোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হতে পারে। তখন এদশের বুকে আমার কোন নাম চিহ্নও থাকবে না। কেউ কোনো দিন আমার খোঁজও নেবে না। আমার বাবা-মা, নানী, ভাই বোনরা জানতেও পারবে না, আমি কোথায় আছি।

যে সমস্ত রাজাকার, আলবদররা যুদ্ধকালীন আমাদেরকে হত্যা করতে চেয়েছিল বিএনপির শাসনামলে তারাই হয়েছিল দেশের হর্তাকর্তা। যে পতাকা আমার বুকে বেঁধে রেখে নয় নয়টি মাস যুদ্ধ করেছিলাম সেই পতাকা তখন তাদের গাড়িতে উড়ত। এসব দেখে আমার খুব কষ্ট লাগত। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশ সেবার পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে রাজাকারদের বিচারের সম্মুখীন করলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জাতির সামনে সম্মানিত করলেন। এর আগে এদেশে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় দিতেও লজ্জা বোধ করতাম।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা সীমাহীন কষ্ট করেছি। কোনো রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে পারিনি। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতে প্রচণ্ড কষ্ট করেছি। বর্ষার সময় একদিকে প্রবল বর্ষণ আর বজ্রপাতের গগণবিদারী শব্দ অপর দিকে শত্রুর আর্টিলারি গোলার গর্জন আর সামনে থেকে ধেয়ে আসা গুলি ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এছাড়াও সিলেটের জোঁক আমাদের দেহ থেকে কত রক্ত খেয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। জনমানবহীন এলাকা ছিল তখন। অনাহারে ও অর্ধাহারে অনেক সময় দিন কাটত আমাদের। শীতের সময় আমাদের কোনো গরম কাপড় ছিল না। মাঝে মাঝে কবরের গর্তের মধ্যেও আমরা ডিফেন্স নিতাম। সর্বদা এলএমজিটাকে আকড়ে ধরে থাকতাম। বারুদের গন্ধে তখন খুব খারাপ লাগত। দেশ স্বাধীনতার দিনটি তখনও অনশ্চিত ছিল। তবে এটা বিশ্বাস ছিল যে, একদিন না একদিন আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে তৎকালীনপূর্ব পাকিস্তানের সর্বদিক থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমন এক সময় আসবে তাদের খাদ্য বস্ত্র, গুলি শেষ হয়ে যাবে। তখন তাদের বাঁচার কোনো রাস্তা থাকবে না। আমরা যুদ্ধকালীন সময় বারবার পেছাতে পেছাতে যখন একেবারে সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছাই তখন নাসিম সাহেব আমাদেরকে বললেন, “ভারতের মাটিতে তোমাদের কোনো স্থান নেই। মরতে হয় দেশের মাটিতেই মরবে।” অবশ্য আমরা পিছু হটছিলাম দুটি কারণে। প্রথমত আমাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাই চাচ্ছিলাম ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেনিং সেন্টার খুলে নতুন যুবকদের ভর্তি করে ট্রেনিং দিয়ে উপযুক্ত করে দেশের ভেতরে গেরিলা তৎপরতা চালাতে। যাতে পাক বাহিনীকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা যায় ও দুর্বল করা যায়। আবার ওদের থেকে বাছাই করে কিছু লোকদেরকে আমাদের রেজিমেন্টে পেস্টিং করে ডিফেন্সকে আরো শক্তিশালী করা। দ্বিতীয়ত আমরা মুখোমুখি যুদ্ধ করে কাল ক্ষেপণ করায় খণ্ড খণ্ড যুদ্ধে প্রতিদিনই ওদের কম বেশি সৈন্য মারা যাচ্ছে।

সর্বশেষ অস্থায়ী ডিফেন্স নিই। সম্ভবত ডিসেম্বরের প্রথম দিকে। এবং ঐ ডিফেন্স ছিল আমাদের সীমান্ত এলাকা থেকে মাইল খানেক ভেতরে। সেখানে ৪/৫ দিন অবস্থান করার পর (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেব এক রাতে রিয়ার হেডকোয়ার্টার থেকে নায়েব সুবেদার জনাব আলী সাহেবকে পাঠালেন আমাদের উইড্রল করে রিয়ার হেডকোয়ার্টারে নিয়ে আসতে। তিনি কিছু লোকের কাছে সংবাদের পাঠিয়ে তাদের উইড্রল করে নিয়ে আসেন। কিন্তু উত্তর দিক থেকে সর্বশেষ অবস্থান ছিল আমার। এবং আমার বামে বিডআর ল্যান্স নায়েক মোস্তফা। আমাদের উভয়ের কাছেই এলএমজি হাতিয়ার ছিল। এছাড়া আরো দুজন রাইফেলধারী সৈনিক ছিল। আমাদেরকে উইড্রল করার কোনো সংবাদ না পৌঁছানোতে আমরা আমাদের ডিফেন্সে রয়েছি। জেনারেল নাসিম সাহেব যখন দেখলেন আমরা চারজন ছাড়া বাকি লোক এসগেছে তখন তিনি জনাব আলীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “লেন্স নায়েক মোস্তফা ও জহির কোথায়?” উত্তরে জনাব আলী সাহেব বললেন, “তাদের অবস্থানে যেতে পারিনি।” এ কথা শুনে নাসিম সাহেব খুব রাগান্বিত হয়ে বললেন, আপনি এখনই গিয়ে ওদেরকে নিয়ে আসুন। এদিকে ভোর হবার আগে ল্যান্স নায়েক মোস্তফা অপর দুজন সৈনিক নিয়ে আমার ডিফেন্সে আসে। এবং বলল, জহির ভাই আমাদের সব লোক চলে গিয়েছে।

এ মুহূর্তে আমরা কী করব? তখন আমি বললাম, ফজর না হওয়া পর্যন্ত চলুন কাছাকাছি কোনো গোপন স্থানে আশ্রয় নেই। এদিকে আমরা খুবই চিন্তিত ছিলাম, না জানি কী ঘটছে? তখন নিকটেই চতুর্দিকে গাছপালা দিয়ে ঘেরা একটি পুকুর পেয়ে তার পাড়ে আশ্রয় নেই। যখন ভোর হলো তখন দেখি আমাদের থেকে প্রায় হাজার গজ সামনে দিয়ে পাক বাহিনীর একটি বিরাট দল এবং কিছু সিভিলিয়ান এ্যাসাল্ট লাইনে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে যাচেছ। এ দেখে আমি ল্যান্স নায়েক মোস্তফাকে বললাম, “চলো, এই এ্যাসাল্ট লাইনের ওপর ফায়ার দিই।” ফায়ার করার জন্য আমি লাইন পজিশনে চলে যাই। কিন্তু ল্যান্স নায়েক মোস্তফা আমাকে বাধা দিল। বলল, আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে। এ মুহূর্তে ফায়ার দিলে ওরা আমাদেরকে ঘেরাও করে ফেলবে এবং হাতে নাতে ধরে ফেলবে। তাই আর ফায়ার দেওয়া হল না। কিছুক্ষণ পর দেখি পাক বাহিনীর এ্যাসাল্ট লইন শেষ হয়ে গেল। আমরা তখন ঐ জায়গা থেকে বেরিয়ে আগরতলা অভিমুখে রওনা হই। জনাব আলী সাহেবকে দেখি, একটি বাড়ির আড়ালে বসে আছে। আমাদের দেখে সে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলো। [চলবে]

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[দ্বিতীয় কিস্তি]

মেয়ের ব্রোকেন ফ্যামিলির বেহাল দশার খবর জেনে একদিন ম্যারির মা এসে হাজির। যথেষ্ট বৃদ্ধ হলেও মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা, এখনো বেশ শক্তপোক্ত ও কর্মঠ। মা আসায় বাড়িটি কিছুটা প্রাণ পেলো। মেয়ে আর নাতীকে নিয়ে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চারপাশে আনন্দময় একটি পরিবেশ গড়ে তুললেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। ক্রুসেড ঘোষণার মতো তিনি বাড়ি থেকে ক্যাভিনের যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে লাগলেন। তার পরিত্যক্ত জামা-কাপড়, বইপত্র, এমনকি দেয়ালে ঝুলানো একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবিও মিসেস অ্যানি গিলবার্টের ক্ষোভ থেকে রেহাই পেলো না। তিনি সময় পেলেই গজগজ করে ক্যাভিনকে অভিসম্পাত করেন এবং তার মেয়ের সকল দুর্গতির জন্য তাকে আসামী করে অভিযোগ করতে থাকেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে পৃথিবীর একমাত্র মন্দ লোক এবং তাদের চরম শত্রু ক্যাভিন।

ক্যাভিনের প্রতি মায়ের প্রচণ্ড ক্ষোভের কোনো প্রতিক্রিয়া জানান না ম্যারি। ক্যাভিন সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে চাইলেও উত্তর দেন না। ক্যাভিনের প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি নিশ্চুপ থাকেন। যদিও ক্যাভিনের পক্ষে বলার মতো কোনো যুক্তি কিংবা বাস্তবতা তার কাছে নেই। আবার ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতেও ম্যারির মন সায় দেয় না। চুপচাপ ম্যারি ভাবেন, “সব কিছু মুছে ফেললে কিংবা সব জিনিস ফেলে দিলেই স্মৃতিরা হারিয়ে যাবে? স্মৃতি তো বস্তুগত বিষয় নয়। সত্ত্বার সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি সহজে হারায় না।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বাড়ি থেকে ক্যাভিনের অস্তিত্ব সাফ করে দিলেন। ক্যাভিন নামে একজন এই বাড়ির বাসিন্দা ছিল, এমন কোনো চিহ্নই আর রইল না। এখানেই থেমে থাকলেন না তিনি। পাড়ায়, বাজারে, যখন যেখানে যান, সেখানেই ক্যাভিনের একটি নিগেটিভ ইমেজ তৈরিতে ব্যস্ত হলেন। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট আসলে খুব নেতিবাচক ও পরচর্চ্চাকারী মানুষ নন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মেয়ের জীবন থেকে চলে যাওয়া ক্যাভিনের স্মৃতিগুলো ওর মন থেকে মুছে ফেলনে নতুন একটা পরিবেশ তৈরি হবে। ম্যারি হয়ত নতুন জীবনও শুরু করতে পারবে। তিনি মেয়ের জন্য গোপনে যুৎসই পাত্র খুঁজতেও তৎপর হলেন। মা হিসেবে এসব কাজকে তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন।

মিসেস অ্যানি গিলবার্টকে দোষ দেওয়া যায় না। কন্যার স্বার্থচিন্তায় সব মায়েরাই এমন করেন। তিনি কোনো ষড়যন্ত্র বা গোপন লুকোছাপার আশ্রয় নেন নি, সব কিছু প্রকাশ্যেই করছেন। ম্যারিকেও তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “তোমাকে এভাবে একাকী ও নিঃসঙ্গভাবে কাটাতে আমি দেবো না। আমার জীবনে তুমি আর তোমার ভাই পিটার ছাড়া কেউ নেই। পিটার ফিলাডেলফিয়ায় চাকরি নিয়ে বেশ আছে। ওকে নিয়ে চিন্তা নেই। তোমার ছেলে টমাসকে নিয়ে আমি থাকবো আর তুমি নতুন করে জীবন শুরু করবে।”

মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে পরিকল্পনাগুলো শুনেন ম্যারি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সম্মতি কিংবা অসম্মতি জানান না। তিনি জানেন, বিধবা মায়ের সঙ্গে তর্ক অর্থহীন। তিনি এসেছেন সাহার্য্য করতে। তাকে মোটেও বিমুখ করা যাবে না। তর্ক-বিতর্ক করে পরিবেশ বিষিয়ে লাভ নেই। বরং চুপ থাকলে এক সময় মা হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কঠিন প্রকৃতির মানুষ। সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন মোটেই। তিনি চা কিংবা কফি পানের জন্য চেনাজানা তরুণদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করেন। ভদ্রতা স্বরূপ ম্যারিকে তাদের সঙ্গ দিতে হয়। তবে নতুন জীবন শুরুর প্রসঙ্গ এলেই ম্যারি প্রসঙ্গান্তরে কিংবা আলোচনা থেকে কোনো উছিলায় সন্তর্পণে সরে আসেন।

বিরক্ত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এক সময় মেয়ের কাছে সোজাসুজি জানতে চান,

“তোমার আসল পরিকল্পনা আমাকে বলো? মধ্য ত্রিশ বয়সের একজন নারী হিসেবে বাকী জীবন একা থাকা তোমার পক্ষে দুরূহ।”

“আমি জানি। কিন্তু এখনই নতুন করে আবার জীবন শুরুর ব্যাপারে আমি মনস্থির করতে পারি নি। আমাকে কিছু সময় দাও।”

এরপর আর কথা চলে না। মিসেস অ্যানি গিলবার্ট চুপ করে ঘরের কাজে মন দেন। তার সন্দেহ হয়, তবে কি ক্যাভিন গোপনে এখনো যোগাযোগ রাখছে? কৌশলে নানা রকমের তদন্ত করে তিনি শঙ্কামুক্ত হন। না, ক্যাভিনের বিন্দুমাত্র সন্ধান এই তল্লাটের কেউ জানে না। ম্যারির সঙ্গেও সামান্যতম যোগাযোগ নেই বেচারার। তাহলে ম্যারি এমন করছে কেন? কেন তার সিদ্ধান্তহীনতা? মিসেস অ্যানি গিলবার্ট এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে মেয়ের আচরণ ও চাল-চলনের দিকে বিশেষ মনোযোগী হন।

প্রথম প্রথম মিসেস অ্যানি গিলবার্ট কিছুই টের পান নি। তার গভীর ঘুমের বাতিক। একবার ঘুমালে কিছুই টের পান না তিনি। একরাতের মধ্য প্রহরে ঘুম ভেঙে দেখেন ম্যারি ঘরে নেই। টমাস একাকী ঘুমাচ্ছে বিছানায়। বাথরুম থেকেও কোনো শব্দ আসছে না। চিন্তিত মিসেস অ্যানি গিলবার্ট অবশেষে ম্যারির দেখা পেলেন বাগানে পাইন গাছের নিচে। জানালা দিয়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা চরাচরে ঈষৎ আলোর ঝলকানির মতো ম্যারিকে দেখা যাচ্ছে। ম্যারির কফি রঙা খয়েরি চুল কালো বাতাসে অনামা রঙের আদলে অদ্ভুত শিহরণে দুলছে।

পর পর কয়েক রাত ঘাপটি মেরে মিসেস অ্যানি গিলবার্ট মেয়ের গতিবিধি অনুসন্ধান করেন। অবশেষে তিনি নিশ্চিত হন যে, রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিয়ে বাড়ির দেওয়ালঘড়ি মধ্যরাত্রির জানান দিলে ম্যারি বিছানা ছেড়ে দেয়। ঠিক বারোটায় চকিতে উঠে দাঁড়ায় ম্যারি। তারপর ধীর পায়ে পৌঁছে যায় বাগানে। খানিক পায়চারী পর স্থির হয় পাইনের তলে।

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের স্মরণ শক্তি বেশ। তাই তিনি খুবই হতবাক হন ম্যারি মধ্যরাতের অদ্ভুত অভ্যাসের কারণে। কারণ, তিনি বিলক্ষণ জানেন, ম্যারি ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ভাবে ভূত বিশ্বাস করে। গ্রামের দিকে তো বটেই, খাস শহরেও সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেতো তার মেয়ে। তাদের এই ক্যাম্পাস সিটির আবাসকে নামেমাত্র শহর বললেও আসলে এটি এক প্রত্যন্ত গ্রাম। সুনির্দিষ্টভাবে একে গ্রাম বলাও ভুল হবে। শহর পেরিয়ে পাহাড়তলির ওপর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা কাঠের বাড়ির একটি আবাসিক ব্লক আর চারপাশে সীমাহীন বন-জঙ্গল। সাঁঝবেলাতেই নিঝুম রাত নেমে আসে জায়গাটিতে। এখানে তার নিজেরও কেমন একটা ভয়-ভয় করে। অথচ তার ভীতু মেয়েটি দ্বিধাহীন পদক্ষেপে দিব্যি মাঝরাতে বাগানে ঘুরছে?

পরদিন নাস্তার টেবিলে ম্যারিকে চেপে ধরেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট।

“ওতো রাতে বাগানে তোমার কি কাজ থাকে?”

ম্যারি প্রশ্ন শুনেও খানিক চমকিত হলেও নির্বিকার থাকেন। তার অভিব্যক্তিতে মনে হয়, ঘটনাটি যেন অতি স্বাভাবিক বিষয়। এতে অবাক হওয়া বা প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই। মায়ের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে তিনি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন,

“আমি পাইন গাছের সান্নিধ্যে যাই।”

“পাইন গাছের কাছে? কেন? তা-ও এতো রাতের বেলা?”

“কারণ আমি খুবই একেলা। পাইন গাছের মতো একাকী।”

মিসেস অ্যানি গিলবার্টের চোখে বিস্ময়। তার মুখ লা-জওয়াব। মেয়ের এমন কথার কি উত্তর দেবেন তিনি জানেন না। এরকম কথা কখনো কারো কাছে শুনেছেন বলে তিনি মনে করতে পারেন না। সম্বিৎ হারানোর মতো অবস্থা হলেও মিসেস অ্যানি নিজেকে সামলে নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলাপ জারি রাখেন।

“সব মানুষই কম-বেশি একাকী। পাইনের মতো একেলা হওয়ার কি আছে?”

“আমি আসলেই পাইনের মতো একেলা। না পারছি কাউকে ছায়া দিতে। না পারছি ঝড়-বাদল-দুর্যোগ সামাল দিতে। রাত হলে আমি আমার দোসর পাইনের কাছে চলে যাই নিঃসঙ্গতা কাটাতে।”

মিসেস ম্যারি আর কোনো কথা বলতে পারেন না। তার চোখ ছলছল করছে। তিনি ঘরের অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে মেয়ের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করেন।

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;

আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক লিবার্টি বেল



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেনসিলভেনিয়াকে বলা হয় আমেরিকার জন্মস্থান। পেনসিলভানিয়া একসময় একটি বৃটিশ উপনিবেশ ছিল এবং এরকম মোট ১৩টি বৃটিশ উপনিবেশ মিলেই তৈরি হয়েছে আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা আমেরিকা। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আমেরিকায় ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও সামরিক সম্পর্ক শুরু হয়। যদিও ভাইকিংসরা কলম্বাসের অনেক অনেক আগেই আমেরিকায় পৌঁছেছিল কিন্তু কলম্বাসের পদার্পণের পরেই এই মহাদেশ ইউরোপিয়ানদের আকর্ষিত করে এবং এক সময় ইংরেজদের দখলে চলে যায় আজকের এই আমেরিকা। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জুলাই উত্তর আমেরিকার ১৩টি উপনিবেশের প্রতিনিধি পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় সম্মেলনে আয়োজন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজদের থেকে ‘স্বাধীনতা ঘোষণা’ করেন।

ইনডিপেন্ডেন্স হল

আজকের আমেরিকা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবে পেনসিলভানিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেস আহবান করা হয়েছিল পেনসিলভেনিয়ার অন্যতম জনবহুল শহর ফিলাডেলফিয়াতে। ফিলাডেলফিয়ার তৎকালীন স্টেট হাউজে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লেখা ও স্বাক্ষরিত হয় যা বর্তমানের ইন্ডিপেন্ডেন্স হল নামে পরিচিত । ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে স্টেট হাউজে স্থাপন করা হয় এক প্রকান্ড বেল বা ঘণ্টা। বেলটি কেবল বিশেষ বিশেষ মুহূর্তেই বাজানো হত। সেই বেল বা ঘণ্টাটি বাজিয়ে আইন প্রনেতারা তাদের মিটিং ডাকতেন এবং শহরের লোকজনকে একসঙ্গে জড়ো করতেন তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনা শোনানোর জন্য। পরবর্তিতে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে সেই ঘণ্টাই লিবার্টি বেল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বেলটি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল বেল ফাউন্ড্রি দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়ে প্রায় ১০০ পাউন্ডে কেনা হয়েছিল এবং ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে ডেলিভারি করা হয়েছিল। লিবার্টি বেলের ওজন প্রায় ২০৮০ পাউন্ড বা ৯৪৩ কেজি। বেলের নিচের অংশের পরিধি ১২ ফুট এবং উপরের দিকে মুকুটের পরিধি ৩ ফুট। আমেরিকাতে আনার পর বেলটি প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাজানোর সময়ই ফেটে যায়, স্থানীয় কারিগর মিঃ জন পাস এবং মিঃ জন স্টো ঘণ্টাটি গলিয়ে আবার নতুন করে তৈরি করেছিলেন।

লিবার্টি বেল

পেনসিলভানিয়া পৌঁছেই আমরা পরিকল্পনা করলাম প্রথমেই আমেরিকার স্বাধীনতার সূতিকাগার ইনডিপেন্ডেস হল এবং লিবার্টি বেল দেখতে যাবো। আমেরিকাতে গিয়ে আমরা উঠেছিলাম ভায়রা ভাই আহমেদ মাহিয়ান মিথুনের বাসায়, খুব সুন্দর ৩ তলা বিশিষ্ট ইনডিভিজুয়াল হাউজ সাথে বিশাল ব্যাকইয়ার্ড। ব্যাকইয়ার্ডের সবুজ ঘাস যেন তুলতুলে কার্পেট, আমার ছোট মেয়ের দারুন পছন্দ হলো তার খালামনির বাসা। এবারের আমেরিকা যাত্রা কিছুটা আমার ছোট মেয়ের ইচ্ছেতেই হয়েছে, ৫ বছর বয়সে সে বাবার থেকে বড় ট্রাভেলার হয়েছে। কয়েকদিন পর পর কান্নাজুড়ে দিত আমেরিকা যাবে বলে, তাই হয়তো আমেরিকা যেতে পেরে তার খালামনির বড়সড় বাড়িতে লাফাতে-ঝাঁপাতে পেরে সে মহাখুশি। ঢাকাতে আমাদের  ছোট্ট ফ্লাটে বাচ্চাদের লাফঝাঁপের সুযোগ একেবারে নেই। যেদিন আমেরিকা পৌঁছলাম তার পরেরদিন বরিশালের এক ছোটভাই পলাশ আমাদের সবাইকে গাড়িতে করে নিয়ে গেল ৫২৬ মার্কেট স্ট্রিটের ইনডিপেন্ডেন্স হল এরিয়াতে, লক্ষ্য লিবার্টি বেল দেখা!

লিবার্টি বেল

লিবার্টি বেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার একটি প্রতীক। অনেকেই বলেন ৪ জুলাই ১৭৭৬ তারিখে, মহাদেশীয় কংগ্রেসের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের সংকেত দেওয়ার জন্য ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল আসলে তা সঠিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস হলো তার ৪ দিন পরে ৮ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র পাঠ উদযাপনের জন্য বাজানো হয়েছিল। বেলটি ১৮৪৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিন উদযাপন করার জন্য বাজানোর সময় এমনভাবে ফেটে যায় যা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও বৃটিশদের সাথে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭৭ সালে অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ব্রিটিশ বাহিনী যখন ফিলাডেলফিয়ায় প্রবেশ করে, তখন কিন্তু এই বেলটি পেনসিলভানিয়ার অ্যালেনটাউন গির্জায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে আবার এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্ডিপেন্ডেন্স হলে। ২০০৩ সালে ইনডিপেন্ডেন্স হল সংলগ্ন ইনডিপেন্ডেস ন্যাশনাল হিস্টোরিক পার্কের এক পাশে লিবার্টি বেল সেন্টার তৈরি করে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। লিবার্টি বেল সেন্টারে প্রবেশে কোন টিকিট কাটতে হয় না। তবে প্রবেশে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে, ভালরকম সিকিউরিটি চেক সম্পন্ন হবার পরেই ঢুকতে পাবেন সেখানে। হলের গেটে পৌঁছে সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢুকে পরলাম হলে। শুরুতেই নানান পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে রুম। এরকম কয়েকটা রুম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম বেলটির কাছে। বেলটির কাছে বেশ ভিড় পেলাম, সবাই বেলের সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় অপেক্ষা করে আমরাও ছবি তুললাম আমেরিকার স্বাধীনতা এবং মুক্তির প্রতীকের সাথে। প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ এই বিখ্যাত লিবার্টি বেল দেখতে আসে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই দেখতে যাবেন আমেরিকার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার এই প্রতীক লিবার্টি বেল।

;

পার্বত্য চট্টগ্রাম 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ' গ্রন্থের প্রিঅর্ডার রকমারি'তে



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের।

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থের। এক বছরের মাঠ পর্যায়ের নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি, যার প্রিঅর্ডার শুরু হয়েছে রকমারি.কম-এ। গ্রন্থটির লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বার্তা২৪.কম-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থ সম্পর্কে লেখক ড. মাহফুজ পারভেজ জানান, বাঙালিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ হলেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব কমই আছে, যেখানে এতোগুলো জনজাতি জড়াজড়ি করে একসঙ্গে রয়েছে অনেক বছর ধরে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিঃসন্দেহে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহ্যগত অঞ্চল।

চিরায়তভাবে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলটি একসময় অশান্ত হয়ে উঠেছিল। অনেক রক্তপাত ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পর অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের উদার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সশস্ত্র বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। বাস্তুচ্যুৎ ও শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অশান্ত পার্বত্যাঞ্চলে নিশ্চিত হয়েছে জনগণের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়ন, জনঅংশগ্রহণ ও স্থিতিশীলতা, যা দুইযুগ স্পর্শ করেছে ২০২১ সালে।

ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, শান্তিচুক্তির দুইযুগের অভিজ্ঞতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের গতিবেগে সমগ্র পার্বত্য জনপদ ও বাসিন্দারা মুখরিত হলেও সেখানে নানা কারণে সঙ্কটের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস, নাশকতা, হত্যা, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ প্রভৃতি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও জনজীবনের শান্তি বিঘ্নিত করার মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে মহল বিশেষের উস্কানি ও অপতৎপরতায়। ফলে মাঝে মধ্যেই উত্তপ্ত ও অস্থির পার্বত্যাঞ্চলে কখনো কখনো শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ইতিবাচক অর্জনসমূহ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে।

তাই নিবিড় গবেষণার আওতায় এনে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে চলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্জনসমূহ পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো শনাক্তকরণ ও সমাধানের রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি প্রণীত হওয়ার পর প্রথম গবেষণা গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি’ (১৯৯৯) প্রকাশ করেন বর্তমান লেখক-গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ। ২০০০ সালে লেখকের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানবাধিকার’ বিষয়ক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড এন্থ্রোপলজি। ২০০৩ সালে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উন্নয়ন পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে সামাজিক বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত থাকেন লেখক। তিনি ২০০৬ সালে সফল ভাবে সম্পন্ন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত ও শান্তি বিষয়ক পিএইচডি গবেষণা। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অর্থায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করেন তিনি। দীর্ঘ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রামÑবিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা’ শীর্ষক অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ উত্তরণ ও অর্জনের পথে বিদ্যমান সমস্যাগুলো ও এর সমাধান তুলে ধরা হয়েছে, যা সমাজ, রাজনীতি, জাতিগত চর্চা, শান্তি ও সংঘাত বিষয়ক অধ্যয়ন এবং নীতিপ্রণেতাদের কাজে লাগার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ মিটাবে বলে গবেষক মনে করেন।

গবেষক ড. মাহফুজ পারভেজ (জন্ম: ৮ মার্চ ১৯৬৬, কিশোরগঞ্জ শহর)-এর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গবেষণা-প্রবন্ধ: বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি; দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো; দ্বিশত জন্মবর্ষে বিদ্যাসাগর; প্রকাশনা শিল্প, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মোহাম্মদ লিয়াকতউল্লাহ। উপন্যাস: পার্টিশনস; নীল উড়াল। ভ্রমণ: রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে। গল্প: ইতিহাসবিদ; ন্যানো ভালোবাসা ও অন্যান্য গল্প; বুড়ো ব্রহ্মপুত্র। কবিতা: মানব বংশের অলংকার; আমার সামনে নেই মহুয়ার বন; গন্ধর্বের অভিশাপ। অগ্রসর ও জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া নিউজ পোর্টাল বার্তা২৪.কম-এর প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন উপন্যাস 'রংধনু', যা অচিরেই গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ রচিত 'শান্তিচুক্তির দুইযুগ: সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের রূপরেখা' গ্রন্থ প্রিঅর্ডার করা যাবে রকমারি.কম-এর লিংকে

;

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১



মাহফুজ পারভেজ
ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

আমেরিকার নামজাদা এই ক্যাম্পাস সিটিতে ভর্তি হয়ে যারা পড়তে এসেছে, তারা কেউ জীবনে নিজের চোখে রংধনু দেখে নি। এক উইকঅ্যান্ডে হাউস টিচার ম্যারি মার্গারেট নিকটবর্তী এক ঝর্ণার পাশে উপত্যকায় শিক্ষার্থী দলটিকে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে তথ্যটি জানতে পারেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবাই একটু বিষণ্ণভাবে অসম্মতিতে মাথা নাড়ায়। শিক্ষার্থীদের কেউ নবাগত ফরাসি, কেউ অভিবাসী ইহুদি, কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যের রিফিউজি। সবাই বড় হয়েছে নাগরিক ঘেরাটোপে ও জাগতিক কোলাহলে। সবার উত্তরের মর্মার্থ হলো, “সত্যি রংধনু তো দেখিনি কখনও! স্টিল ছবি দেখেছি। আর কখনো কখনো ইউটিউবে ক্লিপ।”

ম্যারি বাচ্চাদের দোষ দেন না। কত কষ্ট করে প্রতিযোগিতায় টিকে ওরা পড়তে এসেছে বিশ্বের লিডিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অভিভাবকদের জীবন-সংগ্রামের সমান্তরালের কঠিন পরিস্থিতিতে বইপত্র নিয়ে পড়াশুনার সময় পেয়েছে ছেলেমেয়েগুলো। বাইরের প্রকৃতি ও পরিবেশের দিকে তাকানোর ফুসরত পেয়েছে কমই। তাছাড়া প্রকৃতির নানা দিক ওরা দেখবেই-বা কী করে? এই পোড়া পৃথিবীতে কি আর আকাশ আছে? সবুজ আছে? রক্ষা পাচ্ছে প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য? নিজের মনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে ম্যারি রাচ্চাদের দোষ দিতে পারেন না।  

ম্যারি খেয়াল করেন, রংধনু দেখতে না পারার জন্য কেউই বিশেষ দুঃখিত নয়। তবু তিনি রেইনবো ইস্যুটি তাদের মগজের ভাঁজে রাখতে চান। তিনি জানেন, প্রকৃতি ও নিসর্গের নানা প্রপঞ্চ দেখার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ইমাজিনেশন ও ভিজ্যুয়াল পাওয়ার বাড়াবে। তিনি সবাইকে কাছে ডেকে আনেন। কথা দেন একদিন রংধনু দেখাবেন। “একটা মজার বিষয় জেনো রাখো। রংধনুর শুরু আর শেষ দেখা যায় না, সেগুলো থাকে বাড়ি কিংবা গাছের আড়ালে। মনে থাকবে?” ম্যারির প্রশ্নে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। 

শেষ বিকেলে ফিরে আসার পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকেন ম্যারি। এই সামারে দিন অনেক বড়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও আকাশ স্বচ্ছ। তিনি জানেন, বর্ষা না এলে রংধনু দেখা অসম্ভব। তবু তিনি যেন আনমনে দিগন্তের কোণে কোণে রংধনু খোঁজেন।

রংধনুর সঙ্গে ম্যারি সম্পর্কটাই বেশ অদ্ভুত। কিছুটা নস্টালজিক আর কিছুটা সুপারন্যাচারাল। নিজের দেশের চেয়ে অনেক বেশি রংধনু তিনি দেখতে পেয়েছেন বিদেশের নানা স্থানে। একবারও প্ল্যান করে রংধনু দেখেন নি তিনি। রংধনু নিজেই নিজের খেয়ালে এসে ধরা দিয়েছে তার চোখে। ম্যারি নিজের ঘরের সীমানা পেরিয়ে চরাচরের আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে তন্ময় হয়ে থাকেন রংধনুর সাত রঙে।

“খেতে এসো।”

ডাইনিং টেবিল সাজাতে সাজাতে মৃদ্যু কণ্ঠে ডাক দেন মিসেস অ্যানি গিলবার্ট, ম্যারির মা। ধ্যান-ভেঙে ম্যারি জানলার পাশ থেকে ডাইনিং স্পেসে চলে আসেন। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার দুনিয়ায়। দিন শেষে মায়ের আশ্রয়ে ম্যারি পুনর্জন্ম লাভ করেন। মায়ের হাত চেপে তিনি একটি চেয়ারে বসেন দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল জীবন পেরিয়ে আসা ষাটের কাছাকাছি বয়সের দ্বারপ্রান্তের এক ক্লান্ত রমণীর মতো। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেকগুলো বছর একা থাকতে থাকতে যখন অস্থির ও দিশাহীন অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন ম্যারি, তখনই মা এসে তার পাশে পাহাড়ের মতো অটল আস্থায় দাঁড়ান। সারাদিন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রী আর বাকীটা সময় মা তার জীবনের চৌহদ্দী ও সাহস। অথচ একসময় তারও জীবন ছিল রংধনু রঙে রাঙা, যখন ক্যাভিন ছিল পাশে আর টমাস কোলে। এখন সবাই যার যার জীবনের বিবরে আবদ্ধ। সবাই সবার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত। বিশাল আকাশের গভীরে রংধনুর রঙগুলোর মতো লুকিয়ে রয়েছে সবাই। কেউ কারো পাশাপাশি আসতে পারছে না। বৃষ্টি শেষে রংধনুর মতো খানিকক্ষণের জন্যেও দেখা হয় না ম্যারি আর তার জীবনের একদা রঙিন মানুষগুলোর সঙ্গে।    

অন্যমনস্ক ম্যারিকে দেখতে দেখতে মেয়ের মনের মধ্যে চাপা বেদনা টের পান মিসেস অ্যানি গিলবার্ট। চেষ্টা করেন কথা বলে সান্তনা দিতে।

“ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে?”

“না।”

“হবে কেমন করে? যেমন বাপ তেমনই ছেলে। কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।”

মায়ের ক্ষোভ সঙ্গত। তবু সায় দিতে মন মানে না ম্যারির। ক্যাভিন তো এমনই। চরম বোহেমিয়ান। কখন কোথায় থাকবে, সে নিজেও জানে না। বাতাসের ঝাপ্টায় বেসামাল একখণ্ড ভাসমান মেঘের মতো আকাশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোই যেন তার স্বভাব। নিয়তিও তাকে তেমনই ভানিয়ে বেড়াচ্ছে। তবুও ভেসে ভেসেই জীবন তাদেরকে নিয়ে যৌথতায় বেশ চলছিল। ক্যাভিন একদিন বললো, “তুসি স্থিত হও। আমার মতো ঠিকানাবিহীন হলে তোমার চলবে না।” ততদিনে টমান এসে গেছে। ম্যারির মাতৃত্ব ও নারীত্ব একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশা করছিল মনে মনে। ক্যাভিন তার ইচ্ছের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হয়ে বলে, “কিন্তু আমি তো এক জায়গায় স্থির থাকতে পারবো না। তুমি বরং নিজের মতো শুরু করো। আমার শুভেচ্ছা থাকেবে।”

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ক্যাভিনের দেখা নেই। নেই মানে নেই। ঘরে নেই, আশেপাশে কোথাও নেই। রাতে বিছানা ঠিক করতে গিয়ে বালিশে চাপা ক্যাভিনের চিঠিটি হাতে আসে ম্যারির। চিঠির ভাষ্য অতি সংক্ষিপ্ত। “প্রকৃত অর্থে সঙ্গে না থেকে তোমাকে আটকে রাখা অনৈতিক। সেপারেশন ইউলে সাইন করে দিলাম। আর ব্যাঙ্কের নমিনি। আশা করি মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হবে।”

ম্যারি জানতেন ক্যাভিনের পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সেতুতে ঝুঁলে থাকা, মাঝরাতের অন্ধকারে প্যাসিফিকে সুইমিং করা, হিমালয়ের কোনো গুহায় একাকী কয়েকদিন ধ্যানমগ্ন হওয়া তার কাছে নস্যি। এতো কমিটেড প্রেম, যৌথজীবন, এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি হাওয়া হয়ে গিয়েছে ক্যাভিন। সদ্যজাত পুত্র টমাসের জন্যেও বিন্দুমাত্র পিছুটান অনুভব করে নি লোকটি। রাগে, ক্ষোভে, প্রত্যাখ্যানের অপমানে সারা রাত ঘুমাতে পারে নি ম্যারি। যদিও জানে কোনো ফল হবে না, তবু ছোট্ট ক্যাম্পাস টাউনের আনাচেকানাচে দিনভর ক্যাভিনের খোঁজ করেন ম্যারি। না, তার কোনো খোঁজ নেই। তার গতিবিধির সন্ধানও কেউ জানে না। যদি মন চায়, হয়ত ক্যাভিন নিজেই জানাবে তার হদিস। শত চেষ্টা করেও ম্যারি আর তার কোনো খোঁজ পাবে না। নিজের প্রতিক্রিয়াগুলোও জানাতে পারবে না। ক্যাখিনের খোঁজে ব্যর্থ হয়ে ম্যারি দিন শেষে ঘরে ফিরে আসে চরম হতাশায়। এসেই মনে হয়, পুরো বাড়িটা বড্ড হাহাকার করছে। ঘরগুলো খুবই ফাঁকা আর দমবন্ধ মনে হয় তার। টমাসকে কোলে নিয়ে তিনি চলে আসেন বাড়ির লনে। সাজানো বাগানের মধ্যে একটা লম্বা পাইন ম্যারির খুব প্রিয়। ক্যাভিনকে নিয়ে রাতের পর রাত গল্প করে কাটিয়েছেন তিনি নিঃসঙ্গ পাইনের কাছে। বিচ্ছেদ বেদনা নিয়ে তিনি রাতের অন্ধকারে পাইনের নিচে বসে থাকেন।

রাতের আকাশে রংধনু থাকার কথা নয়। তবু মাঝরাতের দিকে ম্যারির মনে হয় তিনি যেন আবছা আলোয় একটি অস্পষ্ট রংধুন দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তিনি রঙিন আলোর জগতকে ছুঁতে পারছেন না। যন্ত্রণার বুক-চাপা কষ্টে আস্ত একটি রাত নির্ঘুম কেটে যায় তার জীবন থেকে। তিনি অনুভব করেন, প্রিয় মানুষের অভাবে এমন অনেক ঘুমহীন রাত তার জীবনের শূন্যতা পূর্ণ করবে। তার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ ছিন্ন হয়ে যাবে। তিনি বেঁচে থাকবেন ঘুম ও জাগরণের মাঝখানে নিঃসঙ্গ ও একেলা। ঠিক যেন বাগানের সঙ্গীবিহীন পাইন গাছের মতো।   

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

;