জয়দেবপুরের গণ বিক্ষোভ



সার্জেন্ট (অব.) সৈয়দ জহিরুল হক
গ্রাফিক : বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

গ্রাফিক : বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে সাধারণ সৈনিক পদে ভর্তি হই। ছয় মাস ট্রেনিং শেষে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টে ব্যাটালিয়ানে জয়দেবপুরে বদলি। সেখানে আমাকে আলফা কোম্পানির ১নং প্লাটুনে পাঠানো হয়। তখন আমার ব্যাটেলিয়ান কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল (বাঙালি) মাসুদুল হাসান খান। এবং আমার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন (পাকিস্তানি) মেজর কাজিম কামাল খান। কোম্পানি অফিসার ছিলেন (ক্যাপ্টেন) জেনারেল এ এস এম নাসিম। তিনি ব্যাটেলিয়ান অ্যাডজুটেন্ট পদেও নিয়োজিত ছিলেন। আরেকজন অফিসার ছিলেন জেনারেল (সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট) (বাঙালি) গোলাম হেলাল মুরশেদ খান। তখন ব্যাটেলিয়ান উপঅধিনায়ক ছিলেন (মেজর) জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে তিনি চট্রগ্রাম বদলি হয়ে গেলে (মেজর) জেনারেল কে. এম. শফিউল্লাহ উপঅধিনায়ক পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন তিনি ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। আমি এ সেক্টরের অধীনেই যুদ্ধ করি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকা গড়ে উঠে ১৯৭০ এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাক ভোটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হন। কিন্তু পাক সামরিক সরকার তার নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতির মনোভাব প্রকাশ করে। তারা চেয়েছিল ভুট্টোকে ক্ষমতায় বসাতে। এ নিয়ে তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জেগে উঠে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর গোটাদেশের আপামর জনগণ বিদ্রাহী হয়ে ওঠে। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে বাঙালি সৈনিকদের ছিল সুসম্পর্ক। কেননা আমরা সবাই বাঙালি।

পাক সামরিক কর্তৃপক্ষ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখা শুরু করে। ১৯ মার্চ ১৯৭১ দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে পাক সামরিক জান্তা সুপরিকল্পিত নীল নকশা তৈরি করে। ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের সাথে প্রায় ৬০/৭০ জন পাকিস্তানি সেনা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে জয়দেবপুরে আসে। সেকেন্ড বেঙ্গল কী অবস্থায় আছে তা পরিদর্শনের জন্য। কিন্তু তাদের বাস্তব লক্ষ্য ছিল সেকেন্ড বেঙ্গলকে নিরস্ত্র করা। জয়দেবপুরের জনগণ এ সংবাদ জানতে পেরে গণমিছিলের ডাক দেয়। অল্প সমেয়র ভিতর জয়দেবপুর রেল ক্রসিং থেকে শুরু করে চৌরাস্তা পর্যন্ত হাজার হাজার লোক সমবেত হলো। ঐ দিন আবার আমাদের কোম্পানির রেশন আনার জন্য আমরা ৪/৫ জন সৈনিক একটি গাড়িতে করে টাঙ্গাইল থেকে জয়দেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। আমি নিজেও সেই গাড়িতে ছিলাম। চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছলে জনগণ আমাদের বিস্তারিত ঘটনা জানাল। বলল, আপনারা জয়দেবপুর পৌঁছতে পরবেন না। আপনারা টাঙ্গাইল ফিরে যান। আপনাদের রেশন এবং ফ্রেশের ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের নেতারা করে দেবে। পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য একজন বাদে আমরা বাকি সেনারা শার্ট লুঙ্গি পরে জনগণের সাথে মিশে যাই। সেদিন চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর বাজার পর্যন্ত ছিল জনতার ঢল। যাতে দ্বিতীয় বেঙ্গল থেকে পাকিস্তানিরা অস্ত্র নিয়ে যেতে না পারে। তারা জয়দেবপুর স্টেশন থেকে দুটি রেলে বগি এনে রাজবাড়ি রেল ক্রসিংয়ের ওপর রেখে দিল। যাতে কোনো পাক সেনা দল জয়দেবপুর থেকে ঢাকায় যেতে না পারে বা ঢাকা থেকে জয়দেপুর প্রবেশ করতে না পারে। অপর দিকে দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকরা পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারাও কিছুটা উগ্র ভাবে ছিল। ব্রিগেড কমান্ডার এসে যখন দেখল পরিস্থিতি ভয়াবহ খারাপের দিকে তখন তারা অস্ত্র নেওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিল।

গণ বিক্ষোভ দেখে ব্রিগেড কমান্ডার প্রথম গাড়িতে দ্বিতীয় বেঙ্গলের বাঙালি সেনাদের এবং পেছনে দ্বিতীয় গাড়িতে পাক সৈনিকদের নিয়ে জয়দেবপুর থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাবার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রেল ক্রসিংয়ে এসে বাঁধার সম্মুখীন হয়। বিদ্রোহী জনগণ পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখল দ্বিতীয় বেঙ্গলের বাঙালি সৈনিকগণ প্রথম গাড়িতে আছে তখন তারা এক কঠিন পরীক্ষায় পড়ে যায়। এদিকে ব্রিগেড কমান্ডার দ্বিতীয় বেঙ্গল অধিনায়ককে আদেশ করল ফায়ার করার জন্য। কিন্তু আমাদের লোকেরা তখন সাইডে কচুরি পানাতে এবং গাছের আগায় ফায়ার করে। এ দেখে ব্রিগেড কমান্ডার গর্জে উঠে বললেন, “তোমার লোকেরা কী গুলি করছে? এখন পর্যন্ত ১০/১২টা লাশ ফেলতে পারল না! হাজার হাজার জনতার সামনে গুলি করলে লাশ পড়ে না এ কেমন কথা? ওদেরকে বলো, সরাসরি মানুষের উপর গুলি করতে।” কিন্তু আমাদের বাঙালি অফিসার ব্রিগেড কমান্ডারকে বুঝিয়ে দিল নিরস্ত্র মানুষের ওপর আমরা গুলি করতে পারি না। অপর দিকে জনতার ভিড়ের মধ্য থেকে দেশি অস্ত্র ও দুটি চাইনিজ রাইফেল দ্বারা পাকিস্তানিদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এ দেখে ব্রিগেডিয়ার আরো রাগান্বিত হয়ে যায়। তখন পাকিস্তানিরা জনগণের ওপর গোলা বর্ষণ করে। এভাবে জনতার ভিড় কমতে থাকে। পরে রেল ক্রসিং থেকে রেলগাড়ির বগিও সরিয়ে ফেলা হয়। ব্রিগেড কমান্ডারও বুঝতে পারে বাঙালি জনতার পাশাপাশি বাঙালি সৈনিকরাও পাকিস্তানিদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। তখন দ্বিতীয় বেঙ্গল কমান্ডার লে. কর্ণেল মাসুদুল হাসান খানকে আদেশ দিয়ে বললেন, যে কোনো উপয়ে হোক আমাদের ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টে পৌঁছার ব্যাবস্থা করে দাও। যাবার সময় ব্রিগেড কমান্ডার লে. কর্নেল মাসুদুল হাসানকে ঢাকায় চলে আসতে হুকুম দিয়ে যান। ২১ মার্চ লে. কর্নেল মাসুদুল হাসান ঢাকায় চলে যান। তার স্থলে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট থেকে (বাঙালি) লে. কর্নেল রাকিবকে সেকেন্ড বেঙ্গলের অধিনায়কের দায়িত্বে পাঠায়।

এর পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাগণ সেকেন্ড বেঙ্গলকে সর্বদিক দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করত। যেভাবে এদেশের সাধারণ মানুষের মনে আন্দোলনে সাড়া দিয়ে ছিল ঠিক সেভাবেই আমরা যারা বাঙালি সৈনিক ছিলাম তাদের মনেও আন্দোলন সাড়া দিয়ে ছিল। পার্থক্য ছিল আন্দলনের প্রারম্ভিক পর্বে ও প্রস্ততি পর্বে আমরা প্রকাশ্যে আন্দেলনের মাঠে নামি নাই। আমরা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম থেকেই আমরা সিগন্যাল প্লাটুনের গোপন কোড নম্বরের মাধ্যমে আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতাম ও সংবাদ আদান প্রদান করতাম।

১৯৭১ সালে আই এস ডিউটির জন্য আমাদের আলফা কোম্পানিকে টাঙ্গাইলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন আমার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন মেজর কাজিম কামাল খান এবং (ক্যাপ্টেন) জেনারেল এ এস এম নাসিম সাহেব তখন আমার কোম্পানির অফিসার এবং ব্যাটালিয়ান অ্যাডজুন্টেন্ট পদে নিযুক্ত ছিলেন। টাঙ্গাইলে আসার পর যখন গোটা দেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আন্দোলন শুরু করে তখন সম্ভবত ২০ মার্চ আমরা (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেবের সাথে পরামর্শ করলাম। “দেশের এ পরিস্থিতি আমাদের করণীয় কী?” নাসিম সাহেব আমাদের বললেন, “তোমরা একটু ধৈর্য ধরো। আমরা যারা বাঙালি অফিসাররা আছি সকলের সম্মতিতে একত্রে একসাথে পাক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হবে।” ২৫ মার্চ রাতে আমাদের সেই সুযোগ এসে যায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভিতর যতগুলো বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল সবগুলোই একত্রে বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেব আমাদেরকে অস্ত্রাগার থেকে নিজ নিজ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে বললেন। আমি অস্ত্রাগার থেকে চায়না ৭.৬২ এম এম এল এম জি এবং ১২ বাক্স এল এম জির গুলি নিয়ে নিই। মহান মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এল এমজির মাধ্যমেই আমি যুদ্ধ করেছি। আমাদের সঙ্গে যে সকল পাঞ্জাবি, পাঠান ও বিহারী সৈনিক ছিল তাদের কাছ থেকে আগেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা নিয়ে নেওয়া হয়। ঐ রাত্রেই আনুমানিক ১২টার দিকে মেজর কাজিম কামাল খানসহ যতগুলো পাঞ্জাবি, পাঠান ও বিহারী অফিসার ও সৈনিক ছিল—তাদের সবাইকে হত্যা করা হলো।

ক্যাপ্টেন নাসিম সাহেব আমাদেরকে গাড়িতে উঠতে বললেন। অতিদ্রুত আমাদের কোম্পানির যাবতীয় সামানা ও রেশনসহ গাড়ি লোড করা হলো। সম্ভবত রাত ২টার দিকে আমরা ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কেননা, তখন আমরা শুনেছিলাম, ময়মনসিংহ বিডিয়ার ক্যাম্পে বাঙালি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে গোলাগুলি চলছে। বাঙালি বিডিয়ারদের সাহয্যার্থে আমরা ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সকালে আমরা মুক্তাগাছা জমিদার বাড়িতে কিছুক্ষণের জন্য নাস্তার করার উদ্দেশ্যে বিশ্রাম নিই। ঐ সময় (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেব আমাকে বললেন, “তোমার বাড়ি নাকি এখান থেকে খুব কাছে, তুমি বাড়িতে গিয়ে তোমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করে ময়মনসিংহে এসে আমাদের সাথে যোগ দেবে।” জবাবে আমি বললাম, “স্যার, আমার পক্ষে বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। কেননা, বিশেষ করে আমার নানি আমাকে যুদ্ধের ময়দানে না-ও আসতে দিতে পারে। তাই আমি যেতে চাচ্ছি না।”

নাস্তা পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই আমরা খবর পাই বিডিআরদের সাথে পাক বাহিনীর গোলাগুলি বন্ধ হয়েছে এবং সমস্ত বাঙালি বিডিআররা আমাদের সাথে যোগ দিতে চাচ্ছে। আমরা এ সংবাদ শোনার পর পুনরায় ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ময়মনসিংহে পৌঁছে আমাদের কোম্পানিকে ময়মনসিংহ সার্কিট হাইজ ও ডাক বাংলাসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিতে বলা হয়।

আমার কোম্পানির এস জেসিও ছিল সুবেদার নূরল আজিম চৌধুরি এবং প্লাটুন অধিনায়ক ছিলেন সুবেদার মনির আহমেদ এবং প্লাটুনসহ অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন নায়েব সুবেদার জনাব আলী। আমরা ময়মনসিংহে দুদিন থাকার পর পাকিস্তানি জঙ্গি বিমান আমাদের ক্যাম্পের উপর দিয়ে চক্কর দিতে থকে। আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের অবস্থান সম্পর্কে তাদেরকে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা ঐ দিন ট্রেন যোগে ভৈরবের দিকে রওনা হই। ঐ সময় রাস্তার দুপাশ থেকে হাজার হাজার জনতা আমাদেরকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানায়। এবং বিভিন্ন রকম ফলমূল খাদ্য, সিগারেট, ম্যাচ ইত্যাদি আমাদের ট্রেনে দিয়ে যায়। সকলেই আমাদের জয়যুক্ত হওয়ার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করছিল।

সেখানে পৌঁছে নাসিম সাহেব আমাদেরকে একটি স্কুল বিল্ডিংয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন। ঐ দিন পাকিস্তান থেকে হঠাৎ করে ক্যাপ্টেন সেলিম সাহেব আমাদের মাঝে উপস্থিত হন। তিনি ইতিপূর্বে আমাদের ব্যাটালিয়ানের অ্যাডজুটেন্ট পদে দায়িত্বে ছিলেন। পরে তাকে পাকিস্তানে বদলি করা হয়। জেনারেল নাসিম সাহেব ও আমরা ক্যাপ্টেন সেলিম সাহেবকে কাছে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। তার কিছুক্ষণ পর দেখা গেল পাকিস্তানি একটি জঙ্গি বিমান ভৈরব শহরের উপর দিয়ে চক্কর চালায়। জঙ্গি বিমানটি চলে যাওয়ার পরপরই আমরা ভৈরব থেকে আশুগঞ্জ চলে যাই। [চলবে…]


ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ২ আশুগঞ্জের বিমান হামলা

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন



রাহাত রাব্বানী
আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তী হয়ে উঠে ছিলেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। গ্রাম থেকে উঠে আসা লড়াকু এই স্কুল শিক্ষক মানুষকে ভালোবাসা দিতে এসেছিলেন,মানুষের ভালোবাসা পেতে এসেছিলেন। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা বিলিয়ে মানুষের পরিপূর্ণ ভালোবাসা পেয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। সুফী সাধক বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টারের চলার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কাঁটা বিছানো সেই পথে হেঁটে হেঁটে সফলতার চূড়ান্ত বিন্দু স্পর্শ করেছিলেন।

শিক্ষকতা পেশার নিয়োজিত ভাওয়াল বীর খ্যাত আহসান উল্লাহ মাস্টার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে মানুষের ভালোবাসাকে পূঁজি করে দুই বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালেই ঘাতকরা তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ৬৬ এর ৬ দফা , ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ নির্বাচনে ভূমিকা রাখা, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি আন্দোলনেই সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পাওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আজীবন আন্দোলন করেছেন, তাদের পক্ষে কথা বলেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেই ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকেই। তুমুল জনপ্রিয় এক নেতৃত্বে পরিণত হন তিনি। জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ঘাতকরা সেটা সহ্য করতে পারেনি। মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন সারা জীবন। টঙ্গীর হায়দারাবাদ গ্রামে জন্ম নেওয় আহসান উল্লাহ মাস্টারের জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। আহসান উল্লাহ মাস্টারের দেখা স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন তারই পুত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। টানা ৪ বারের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বাবার মতোই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথেই হেঁটে চলছেন।

রাজনীতির মাঠে আহসান উল্লাহ পাথর ঘঁষে আগুন জ্বলানো এক রাজনীতিক। তার আলোয় আলোকিত হয়েছিল গাজীপুর। কিন্তু কেমন ছিল আপদমস্তক এ রাজনীতিকের জীবন, গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তার জন্ম শৈশব কৈশোর, যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা- এমন নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক ইজাজ আহমেদ মিলন লিখেছেন ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার: জীবনালেখ্য’। গ্রন্থের পা-ুলিপি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হয়েছে এ যেন বাংলাদেশেরই জীবনালেখ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে আহসান উল্লাহ মাস্টার এক আদর্শের নাম। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের এই বইটা পড়া উচিৎ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আগ্রহী করে তুলবে বইটি।

দীর্ঘদিন গবেষণা করে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহমেদ মিলন রচনা করেছেন ‘জীবনালেখ্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে বইটি বেরোচ্ছে খুব শিগগিরই। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-৩



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[তৃতীয় কিস্তি]

ম্যারির গোপন কষ্ট অনুভব করলেও আবেগাক্রান্ত হন না মিসেস অ্যানি। তার মতামত ও মনোভাব অন্যরকম এবং বহুলাংশে বাস্তবসম্মত। বহু মায়ের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, আবার নতুন সংসার শুরু করলে ম্যারির একাকীত্বের কষ্ট ও অন্যান্য সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে। সে লক্ষ্যে তিনি তার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অন্যদিকে, তাকে ঘিরে মায়ের এসব তৎপরতার কারণে ম্যারি সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন। অবশেষে মায়ের আতিশয্য ও উৎসাহী প্রেমিকবৃন্দের উপদ্রব থেকে বাঁচতে তিনি বাড়িতে কম সময় কাটানোর পথ খুঁজতে থাকেন। টমাস দিনে দিনে বড় হচ্ছে। একা একাই সে তার কাজকর্ম করতে পারে। এদিকে তার স্কুলিং শুরু হয়ে গেছে। ম্যারি ভাবলেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। বাড়িতে মায়ের একতরফা কথা শোনা আর উৎসাহী প্রেমিকদের আনুষ্ঠানিক ও আতঙ্কজনক আগমনের জন্য ক্লান্তিকর অপেক্ষায় দিন কাটানোর কোনো মানে হয় না। তার যতটুকু পড়াশোনা, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাট চাকরি জুটে যাওয়ার কথা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রাক্তনী এবং তার সাবেক স্বামী এখানে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের পরিবারের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। ফলে অল্প-বিস্তর খোঁজ-খবর করতেই বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে অনায়াসে চাকরি হয়ে গেলো ম্যারির। ম্যারি আপাতত হাফ ছেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুসরত পেলেন।

দিনের বেশির ভাগ অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির কাজে কাটিয়ে পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্ত ম্যারি বাড়ি ফিরলে মিসেস অ্যানি ম্যার্গারেট কথাবার্তা বলার সাহস পান না। তার পরিশ্রান্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে কথাবার্তা বলার ভাবনায় ইতি টানেন। এদিকে, লাইব্রেরির কাজে যোগ দিয়ে এক অতলান্ত জগতের দেখা পেয়েছেন ম্যারি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন অসাধারণ নানা বই। বাস্তব জগতের কষ্ট-বেদনা থেকে তিনি যেন মুক্তির স্বাদ পান বইয়ের প্রশান্ত পাতায়। লাইব্রেরিয়ান মিসেস ন্যান্সি অনেক আগে থেকেই ম্যারিকে চেনেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙাগড়াও মিসেস ন্যান্সির অজানা নয়। তিনি নিজে আগ্রহী হয়ে ম্যারিকে চমৎকার সব বই পড়ার জন্য বেছে দেন। কিছু অর্ধ-পঠিত বই ম্যারি সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন। বিশ্রাম ও নিজের কিছু কাজকর্ম করার পর সেগুলো নিয়ে বিছানায় যান তিনি। ক্রমশ তার যাপনের আটপৌরে রুটিনে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। তিনি আর বই একাকার হতে থাকে দিনে দিনে। ম্যারির এমন রুটিন ভেদ করে মা কথা বলার সুযোগ পান খুবই কম। এমন পরিস্থিতি ম্যারির জন্য কম স্বস্তির বিষয় নয়।

ফলে আজকাল মিসেস অ্যানি মার্গারেট ডিনারের সময়টাতেই শুধু ম্যারির সঙ্গে আলাপের সুযোগ নিতে পারেন। তারও কাজ কম নয়। দৌড়াদৌড়িতে তার দিন শুরু হয় মেয়ে লাইব্রেরি ও নাতীর স্কুলে যাবার তাড়ার মধ্যে। তখন দম ফেলার মতো অবস্থায় থাকে না কেউই। বাকী দিন সবাই থাকে সবার কাজে ব্যস্ত। অতএব রাতের খাবারের সময়ই কিছুটা আলাপের অবসর মেলে। তখন টুকটাক কথার বেশি কিছু বলাও সম্ভব হয় না। দিনে দিনে মিসেস অ্যানি মার্গারেটের বকবকানি অনেকটাই হ্রাস পেতে থাকে। পরিস্থিতির পরিবর্তনে মনে মনে খুশি হন ম্যারি।    

কিন্তু রাত নামতেই ম্যারির নিজের মধ্যে দ্বিধা এসে ভর করে। তার মন-প্রাণ চলে যায় অন্ধকারের কালো চাদরে আচ্ছাদিত বাগানে। তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না যে, বাগানের পাইন গাছটি তাকে টানে, নাকি তিনি নিজেই কাছে টেনে নেন পাইনকে? নাকি ক্যাভিনের স্মৃতি, যা আচ্ছন্ন হয়ে আছে পাইনের চারপাশে, তা গাছটির সঙ্গে মিলেমিশে তাকে অলক্ষ্যে ডাকে মধ্যরাতের নিশুতি প্রহরে? ম্যারি এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেন না। তার দ্বিধা ও সংশয় বাড়তে থাকে। তথাপি তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো রাতের কালচে অন্ধকারে, বেগুনী, নীলাভ ফুলকির মাঝ দিয়ে তিনি প্রতিরাতে চলে আসেন বাগানে, পাইনের নৈকট্যে। 

পাইনের কাছে এলে তার শরীর ও মনে অবাক কাণ্ড ঘটে। তিনি নিবিড়ভাবে টের পান স্মৃতির অমোচনীয় স্পর্শ। আগুন দেখে পতঙ্গের ছুটে যাওয়ার মতো তিনি যেন অজানা টানে অন্ধকার বাগানে পাইন গাছের তলে চলে আসেন নিজেরই স্মৃতিকুণ্ডলীতে। তখন নিজের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিনি অতীতের লেলিহান শিখায় অনুভব করেন স্মৃতির দুর্দমনীয় দাপট। তার মনে পড়তে থাকে পাইনের তলে ক্যাভিনের সঙ্গে অতিক্রান্ত অসংখ্য দিবস ও রজনীর টুকরো টুকরো কথা ও অভিজ্ঞান। 

ক্যাভিনের সঙ্গে ম্যারি যখন প্রথম এই বাড়িতে আসেন, তখন প্রায়-জংলার মতো আগাছায় ভরা ছিল পুরো বাগান। অবহেলায় বাড়ন্ত শিশু পাইন গাছটি ছিল ঝোপের আড়ালে। বেশ কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে ক্যাভিন বাগানের চেহারা পাল্টে দেন। আগাছার কবল থেকে উদ্ধার করেন পাইন গাছটিকে। গাছের চারপাশটা সুন্দর করে গুছিয়ে বসার চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে ফেলেন ক্যাভিন। বইপড়া, চা-খাওয়া, ম্যারির সঙ্গের গল্পের সময়গুলো তিনি কাটাতে থাকেন পাইনের তলে। সবসময় ক্যাভিনের একটি সতর্ক নজর থাকে পাইন গাছটির দিকে। গাছটির কখন কি প্রয়োজন, তা নিয়ে ক্যাভিনের আগ্রহের অন্ত নেই।

ম্যারি খেয়াল করেন পাইন নিয়ে ক্যালিনের ব্যস্ততা ও আগ্রহের বিষয়টি। একদিন তিনি সরাসরি জানতে চান,

‘পাইন গাছটিকে এতো ভালোবাসো তুমি? পাইন কি তোমার প্রিয় বৃক্ষ?’

‘না। আমার প্রিয় বৃক্ষ ঝাঁকড়া মাথার জলপাই। আমার পূর্বপুরুষ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছিল। জলপাই তাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এই পাইনকে ভালোবাসি অন্য কারণে।’

‘কি সেই কারণ?’

‘কারণ, এই পাইন আমাদের প্রথম সন্তানের মতো। তোমার, আমার নতুন জীবনে, এই নতুন বাসগৃহে প্রথম আমরা যাকে পেয়েছি, তা এই পাইন গাছ।’

ক্যাভিনের উত্তরে দারুণ চমকে উঠেন ম্যারি। তার ভেতর মাতৃত্বের প্রবল ঢেউ আলোড়ন জাগায়। তিনি গভীর মমতায় শিশু থেকে তারুণ্যের পথে বর্ধিষ্ণু পাইনের দিকে মগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকেন। বেশ অনেকক্ষণ পর ক্যাভিনের কথায় ম্যারির ধ্যান ভাঙে।

‘জানো তো, মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যে থাকলে সন্তানের বিকাশ ভালো হয়। তাদের শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা, সবকিছু চাপমুক্ত হয়। আমরাও যত বেশি পাইনের কাছে থাকবো, ততদ্রুত গাছটিও সাহসী মানুষের মতো সুস্থ ও সবলভাবে বড় হবে।’

এইসব স্মৃতি ও কথোপকথন প্রবলভাবে মনে পড়ে পাইনের কাছে এলে। ম্যারির কষ্টগুলোও বুনো বাতাসের  মতো হু হু করে বাড়তে থাকে। পাইনের সমান্তরালে নিজের সন্তান টমাসের অবয়ব ভাসে চোখে। পিছনের দৃশ্যপটে ক্যাভিনের উপস্থিতি। ম্যারি ভীষণ অবাক হন। যে পিতা একটি অনাথ ও অবহেলিত পাইন গাছকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব দিয়ে লালন করার স্বপ্ন দেখতো, দিন-রাতের অধিকাংশ সময় পাইনের আশেপাশে থাকতো, সে কি করে ঔরসজাত সন্তানের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে চলে গেলো! এই প্রশ্নের উত্তর তিনি অনেক ভেবেও খুঁজে পান না।

ম্যারি নানাভাবে বুঝতে চেষ্টা করেন, 'আকর্ষণ' কত দূর অবধি গেলে শুধুই 'আকর্ষণ' থাকে, আবার কত দূর চলে গেলে 'অবসেশনে' পরিণত হয়? 'অবসেশন’ ও 'আকর্ষণ'-এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ঠিক ঠিক জানতে না পারলেও মানুষ আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন নিয়েই বেঁচে থাকে। কখনো কোনো মানুষের কাছে আসে, কখনো দূরে যায়। মানুষের একা কিংবা যৌথ জীবনে এক রহস্যময় ত্রিভুজের মতো আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন ঘিরে থাকে।

এক সময় বাগান থেকে ঘরে ফিরে আসেন ম্যারি। বিছানায় শুয়ে টের পান তার মাথায় আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো বইছে প্রশ্নের স্রোত। তার আর ঘুম আসে না। সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখেন সকাল হতে অনেক বাকী। তিনি ফোনের মিউজিক অপশনে গিয়ে একটি গান বেছে নেন। তাদের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা পল্লবী নামের এক দক্ষিণ এশীয় তরুণী গানটি তাকে প্রেজেন্ট করেছে। গানের কথাগুলো বাংলায় হলেও সুর তাকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। কখনো সুযোগ হলে গানটি তিনি ইংরেজিতে তর্জমা করার ইচ্ছা রাখেন। তিনি গানটি চালু করে চোখ বন্ধ করেন। কিন্তু তার হৃদয় যেন গানের কথাগুলোর সঙ্গে যৌথতায় গাইছে:

'যদি আর কারে ভালবাসো

যদি আর ফিরে নাহি আসো

তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও

আমি যত দুঃখ পাই গো।'

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

;

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;