জাকাত আদায়ের জন্য যা জানা জরুরি



মুফতি এহতেশামুল হক কাসিমী, অতিথি লেখক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম
জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি, ছবি: সংগৃহীত

জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি। জাকাতের মাধ্যমে ইসলাম সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে চায়। কোরআনে কারিমের সূরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘জাকাত পাবে ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করা দরকার, ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত, নিঃস্ব পথিক। আল্লাহর পথে সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজেও এ অর্থ খরচ করা যাবে।’

ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক জাকাত প্রদান ফরজ যা বাধ্যতামূলক এবং অবশ্য পালনীয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজের কোনো স্থানে যেন ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত না হয়ে ওঠে। যারা প্রয়োজনাতিরিক্ত যথেষ্ট পরিমাণ ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে তারা যেনো তা জমা না করে রাখে, ব্যয় করা বন্ধ না করে দেয়। বরং তা এমনভাবে ব্যয় করে যার ফলে সমাজের আবর্তিত সম্পদ থেকে যেন বঞ্চিতরা জীবিকা অর্জন করতে পারে। এ লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ লোকদের কাছ থেকে নেওয়াই হচ্ছে জাকাত।

জাকাত কোনো প্রকার কর বা শুল্ক নয়। কর রাষ্ট্রের সাধারণ ব্যয় নির্বাহের জন্য আরোপ করা হয়। কাজেই জাকাতকে কর বলা যায় না। এটাকে বড়জোড় বাধ্যতামূলক সামাজিক কর হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে এবং এই কর প্রযোজ্য হবে উদ্ধৃত্ত বিবেচিত সম্পদের ওপর। একজন ব্যক্তি তার হালাল আয় ও সম্পদ হতে সামাজিক জীবনযাত্রার মান রক্ষার জন্য ন্যায্য চাহিদা মেটানোর পর তার উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে।

কারা জাকাত দেবেন
প্রত্যেক মুসলিম যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাকে জাকাত দিতে হবে। নেসাব হচ্ছে ওই সঞ্চিত সম্পদ, যা মানসিকভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষের নিজের মালিকানায় পূর্ণ এক চন্দ্র বছর ছিলো- তাহলে তাকে জাকাত দিতে হবে। অবশ্য ক্ষেতের ফসল, খনিজ সম্পদ, সমুদ্র থেকে পাওয়া সম্পদ ও মাছের ক্ষেত্রে সারা বছর এ সম্পদ হাতে থাকার শর্ত নেই। ফসল আহরণের পরপরই এসবের জাকাত দিতে হয়।

জাকাতের বছর কিভাবে হিসাব করবেন
এ বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মতামত হচ্ছে, শুধু বছরের দিনের হিসাবটা ধরতে হবে। অর্থাৎ যদি কারও জাকাত দেওয়ার বছর হয় ১ রমজান থেকে শাবানের শেষ দিন, তাহলে বছরের শেষের দিনের সম্পদের হিসাব করতে হবে এবং সেদিন নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে জাকাত দিতে হবে।

অবশ্য অন্য অনেক ইসলামি স্কলারদের অভিমত হচ্ছে, জাকাত নির্ধারণ করতে হবে বছরের শুরু ও শেষের দিনের হিসাব ধরে। অর্থাৎ ওপরে উল্লেখিত বছরে যদি কারও ১ রমজান ও শাবানের শেষ দিন নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে শাবানের শেষের দিনের সম্পদের হিসাবের ভিত্তিতে জাকাত দিতে হবে।

জাকাতের তাগাদা দেওয়া হয়েছে কোরআন-হাদিসে
জাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রোকন। যেকোনো মুসলিম পুরুষ অথবা নারী যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন এবং সম্পদের ওপর বছর অতিক্রান্ত হয়, তবে ওই ব্যক্তির ওপর এই সম্পদের জাকাত আদায় করা ফরয। জাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ তা আদায় না করে, তবে সে কঠোর শাস্তির যোগ্য হবেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জাকাত আদায় না করার ফলে ইহকালীন ও পরকালীন বিভিন্ন শাস্তির কথা সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত রয়েছে।

যে ব্যক্তি জাকাত আদায় করে না সে একজন মহাপাপী, ফাসিক ও ফাজির। আর কেউ যদি জাকাতকে অস্বীকার করে এবং মনে করে বা বলে যে, জাকাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই; কে বলে জাকাত ফরয? এতে কোনো ফায়দা নেই অথবা যে বলে, জাকাত ফরজ করে আমাদের উপার্জিত ধনদৌলত কেড়ে নেওয়ার একটা কৌশল করা হয়েছে ইত্যাদি। মোটকথা যেসব কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, জাকাত ফরজ হওয়াকে অস্বীকার করে কিংবা এর ওপর খুব অসন্তুষ্ট ভাব বুঝায়, তবে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।

যে সব সম্পদের জাকাত দিতে হবে
জাকাত নির্ণয়ের প্রক্রিয়া
১. নগদ বা ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ, শেয়ার সার্টিফিকেট, বন্ড বা ওই শ্রেণির ঋণপত্র (আপাতত মূল্য Face value জাকাত বছরের মধ্যে প্রাপ্ত জীবন বীমার অর্থ (পরিপক্কতা Maturity বা জীবিতকালীন সুবিধা Servival benefit বা স্বত্বত্যাগ Surrender করার কারণে), জাকাত বছরের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি Final settlment বা অফেরতযোগ্য উত্তোলনের non-refundable withdrawal), কারণে প্রাপ্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্য ২.৫%
২. স্বর্ণ, রৌপ্য, মূল্যবান পাথর, স্বর্ণ বা রৌপ্যের অলংকার স্বর্ণের ক্ষেত্রে ৭.৫ তোলা, রৌপ্যের ক্ষেত্রে ৫২.৫ তোলা এবং স্বর্ণ-রৌপ্য একত্রে থাকলে ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্য বাজার দামের (Market Value) ২.৫ %
৩. শিল্প বা ব্যবসা-বানিজ্যের মজুদ (তৈরি পণ্য, আধা তৈরি পণ্য ও কাঁচামাল) ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্য লিখিত মূল্য (Book Value) বা বাজার মূল্যের (Market Value) ২.৫%

যার ওপর জাকাত ফরজ
প্রতিটি সম্পদশালী মুসলিম, বালেগ, সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন নর-নারীর ওপর জাকাত ফরজ

নেসাব
নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্যবসায়ী পণ্যের ওপর জাকাত ফরজ। কোন জিনিসের নেসাব কি? তা উত্তমরূপে জেনে রাখা সবার জন্য একান্ত প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ-
শুধু স্বর্ণের নেসাব: সাড়ে সাত ভরি (তোলা)।
শুধু রৌপ্যের নেসাব: সাড়ে বায়ান্ন ভরি (তোলা)।
স্বর্ণ-রূপার একত্রে নেসাব: স্বর্ণ ও রূপা উভয় জিনিসই যদি কারও নিকট থাকে এবং এর কোনোটাই নেসাব পরিমাণ নাও হয়; তবে উভয়টির মূল্য হিসাব করে দেখতে হবে। মূল্য যদি একত্রে রূপার নেসাব পরিমাণ হয়ে যায়, অর্থাৎ ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের সমান হয়ে যায়, তবেই জাকাত আদায় করতে হবে।

নগদ টাকা পয়সার নেসাব
বাজার দর হিসাবে অন্তত ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের পরিমাণ টাকা এক বছরকাল জমা থাকলে এর জাকাত আদায় করতে হবে।

ব্যবসায়ী পণ্যের নেসাব
কোনো জিনিস বিক্রি করার উদ্দেশ্যে রাখা হলেই তাকে ব্যবসার পণ্য মনে করা হবে। ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের সমান মূল্যমান সম্পন্ন ব্যবসার পণ্যের জাকাত দিতে হবে। বছরান্তে তখনকার বাজারদর হিসেবে মূল্য ধরতে হবে। খরিদ মূল্য ধরলে চলবে না।

জাকাত আদায় ফরয হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত
স্বর্ণ, রূপা, টাকা-পয়সা বা ব্যবসার পণ্য নেসাব পরিমাণ হওয়ার পর তৎক্ষনাৎ জাকাত আদায় করা ফরয হয় না; বরং এক বছরকাল নিজের মালিকানাধীন থাকলেই জাকাত আদায় করা ফরয হয়। অতএব নেসাব পরিমাণ হওয়ার সাথে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

বছরের শুরুতে যদি নেসাব পরিমাণ মাল বা টাকা-পয়সা থাকে আর বছরের মধ্যবর্তী সময় নেসাবের চেয়ে কম হয়, আবার বছরের শেষাংশে নেসাবের পরিমাণ হয়ে যায় অথবা বছরের মধ্যবর্তী সময় আরও বৃদ্ধি পায় উভয় অবস্থাতেই বছরান্তে যে পরিমাণ মাল বা টাকা থাকবে তার জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, বছরের শেষে কি পরিমাণ থাকে তাই ধর্তব্য। মধ্য বছরের হ্রাস-বৃদ্ধি ধর্তব্য নয়।

জাকাতের পরিমাণ
সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত আদায় করতে হয়। জাকাত ফরজ হওয়া মালের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। সামান্য কম হলেও জাকাত আদায় হবে না।

বিশেষ কথা
১. অনেক লোককে দেখা যায়, নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ না থাকার কারণে জাকাত দেওয়ার বিষয়ে চুপ থাকেন। কিন্তু তার কাছে সামান্য রূপা রয়েছে, যার ফলে স্বর্ণ ও রূপার সমষ্টিগত মূল্য রূপার নিসাবের পরিমাণ হয়ে জাকাত ফরজ হয়ে রয়েছে- এদিকে খেয়ালই করছেন না। কাজেই বিষয়টির প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছি। স্বর্ণ ও রূপা একত্রে রাখবেন না, যদি রাখেন তবে জাকাতের ব্যাপারে সজাগ থাকবেন।

২. স্বর্ণ-রূপা, তা যে অবস্থাতেই থাকুক অর্থাৎ টুকরা আকারে অর্থবা অলংকার, বাসনপত্র, ঘড়ি, কলম, চশমার ফ্রেম, কাপড়ের আঁচলে জড়ানো আকারে এবং তা ব্যবহারে আসুক বা না আসুক সর্বাবস্থায় জাকাত আদায় করতে হবে।

৩. অনেকে মনে করেন, নিত্য ব্যবহার্য অলংকারের জাকাত দিতে হবে না, কেবল তুলে রাখা অলংকারের জাকাত দিতে হবে। এ ধারণা সম্পুর্ণ ভুল। এরূপ যারা করেছেন তাদেরকে বিগত বছরগুলোর অনাদায়ী জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে। অন্যথায় গোনাহগার হতে হবে।

ভাড়ায় প্রদত্ত জিনিস
ভাড়ায় খাটানো ঘর- বাড়ি, দোকান-গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও মেশিনারি বা অন্যকোনো জিনিসের ক্ষেত্রে বিধান হলো- মূল জিসিনটির জাকাত দিতে হবে না; বরং ভাড়ায় উপার্জিত টাকা বা মেশিন থেকে উৎপাদিত বস্তুর মূল্য নেসাব পরিমাণ হলে তবে বছরান্তে জাকাত আদায় করতে হবে।

কর্জ প্রদত্ত টাকা
কাউকে টাকা কর্জ দিয়ে রাখলে সে টাকা ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তার জাকাত দিতে হবে না। যখনই ফিরে পাওয়া যাবে, তখন বিগত বছরগুলোর জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে, অন্যথায় নয়।

প্রভিডেন্ট ফান্ড
প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা যাখন হাতে আসবে, তখন থেকে বছরান্তে জাকাত দিতে হবে। হাতে আসার পূর্ববর্তী বছরসমূহের জাকাত আদায় করা জরুরি নয়।

বিগত বেতন
চাকরির বেতন, যা কয়েক বছর যাবৎ বাকি রয়ে গিয়েছিল, তা উসূল হওয়ার পূর্ববর্তী বছরসমূহের জাকাত আদায় করা ফরজ হবে না।

বিমা কোম্পানিতে জমাকৃত টাকা
প্রিমিয়াম হিসেবে যে টাকা বিমা কোম্পানিতে জমা করা হয়েছে, প্রতি বছর হিসাব করে তার জাকাত দিতে হবে। ব্যাংকে জমাকৃত টাকারও অনুরূপ জাকাত দিতে হবে।

শরিকানা কারবার
শরিকানা কারবারে লাগানো টাকার জাকাত দিতে হবে। শরিকের অন্যরা যদি জাকাত নাও আদায় করে তবুও নিজের অংশের জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে।

জরুরি পরামর্শ
প্রত্যেক সম্পদশালী লোকের কর্তব্য হলো- চান্দ্রমাস হিসেবে কোনো একটা মাসকে বছরের শুরু বলে ধার্য করে নেওয়া এবং এই শুরু থেকে বার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার হিসাব রেখে নিজের জাকাত দেওয়ার উপযোগী মালের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করে জাকাত আদায় করা। এ কাজের সুবিধার জন্য প্রতি রমজান মাসকে বছর শুরু ধার্য করাই উত্তম। রমজান মাস থেকে পরবর্তী শাবান মাসে এক বছর পূর্ণ হবে। এতে জাকাত আদায় করার কাজটা পবিত্র মাহে রমজানে সমাধা করা যায়। ফলে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়ার সুযোগ হয়।

একটি ভুল ধারণার অপনোদন
অনেকেই মনে করেন, প্রয়োজনাতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন টাকা হাতে থাকলেই জাকাত বা ফিতরা দিতে হবে; তা ঠিক নয়। আসল কথা হলো- সাড়ে বায়ান্ন (ভরি) রূপা বর্তমান বাজার দর অনুসারে মূল্যের সমান টাকা হাতে থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমান বাজারে রূপার দর হলো ২০০ টাকা ভরি। এ হিসেবে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য ১০,৫০০ টাকা। অতএব, অন্ততপক্ষে এই পরিমাণ টাকা অথবা এই মূল্যের প্রয়োজনাতিরিক্ত কোনো সম্পদ হাতে থাকলে নেসাবের মালিক বলে ধরা হবে, অন্যথায় নয়।

জাকাত আদায়ে অবহেলা নয়
আমাদের দেশে দেখা যায়, ব্যবসায়ীদের অনেকে মনোযোগসহকারে যথাযথভাবে হিসাব করে জাকাত আদায় করেন না। সাধারণত দেখা যায়, রমজানের ২৭ তারিখে বেশ কিছু টাকা অথবা শাড়ি-কাপড় গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেন, কিন্তু মালের পরিমাণের সঙ্গে মিলিয়ে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করেন না। এতে কিন্তু জাকাত আদায় হয় না। অতএব একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ আদায় করার মনোভাব নিয়ে যথাযথ হিসাব নিকাশ করে সঠিক পরিমাণ জাকাত সহিশুদ্ধ নিয়তে আদায় করার প্রতি বিশেষ তৎপর হওয়ার জন্য সকলকে অনুরোধ করছি।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া দারুল কোরআন, উত্তর দেওয়ানপুর, মেজরটিলা, সিলেট।

   

হজের সময় সৌদিতে তাপদাহের আশঙ্কা



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
হজের আনুষ্ঠাকিতায় হাজিরা, ছবি: সংগৃহীত

হজের আনুষ্ঠাকিতায় হাজিরা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া হজের সময় সৌদি আরবের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন সৌদি ন্যাশনাল সেন্টার অব মেটিওরোলজির প্রধান আয়মান গোলাম।

আসন্ন হজে উচ্চ তাপমাত্রার জন্য সতর্ক করে প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। আয়মান গোলাম বলেছেন যে, এ বছর হজের মৌসুম চলবে জুনের মাঝামাঝিতে। হজের মৌসুম সৌদি আরবে বছরের সবচেয়ে গরম সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে।

বছরের এই সময়ে সাধারণত সৌদি আরবে তাপমাত্রা এবং বাতাসের আর্দ্রতা দুটোই অনেক বেশি থাকে। ফলে হজে অংশগ্রহণকারীদের সতর্ক থাকতে অবহিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, হজ করতে আসা মুসল্লিদের ওপর তীব্র গরমের প্রভাব কমাতে তাদের বাসস্থানকে পর্যাপ্ত ঠাণ্ডা রাখা হবে হজ আয়োজনকারীদের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে মিনা এবং আরাফাতের ময়দানে তাঁবুতে অবস্থান এবং হজের পাঁচতিন চলাচলে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

রোগীদের হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে সৌদির নির্দেশনা
যারা দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগছেন তাদের হজে যাওয়ার সময় চিকিৎসার নথিপত্র সঙ্গে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সৌদি আরব। রোগীরা হজে গিয়েও যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান তা নিশ্চিত করতেই এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হজ ও উমরা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

হজ ও উমরা মন্ত্রণালয় জানায়, বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হয় এমন কোনো রোগে যদি আপনি ভুগে থাকেন এবং বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে চিকিৎসার নথিপত্র সঙ্গে নিয়ে আসতে ভুলবেন না। যেন সৌদিতে আসার ও যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান।

এ ছাড়া বিদেশি হজযাত্রীদের সৌদি আরবে আসার আগেই ‘নেইসেরিয়া মেনিনজিটিডিস’ ভ্যাকসিন নিতে হবে এবং নিজ দেশের দ্বারা ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়টির প্রমাণপত্র নিতে হবে।

বিদেশি হজযাত্রীদের পোলিও, কোভিড-১৯ এবং ফ্লুয়ের ভ্যাকসিন নেওয়া থাকতে হবে। এতে করে সব হজযাত্রীর স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া সৌদিতে বসবাসরত যারা হজ করতে চান তাদের হজ সংক্রান্ত ভ্যাকসিনগুলো গ্রহণ করতে হবে।

এই ভ্যাকসিন প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে রয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ হজযাত্রীদের পবিত্র মক্কা নগরীতে হজের জন্য যেতে মন্ত্রণালয়ের সেহাতি অ্যাপে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হবে।

;

হজযাত্রী কমেছে ৩৭ হাজারের বেশি



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
হজ ক্যাম্পে প্রবেশ করছেন হাজিরা, ছবি: নূর এ আলম, বার্তা২৪.কম

হজ ক্যাম্পে প্রবেশ করছেন হাজিরা, ছবি: নূর এ আলম, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

হজের খরচ বাড়ায় গত বছরের চেয়ে এবার প্রায় ৩৮ হাজার কমেছে হজযাত্রীর সংখ্যা। করোনা পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এক লাখ ২২ হাজার ৮৮৪ জন বাংলাদেশি হজপালনে যান। যদিও বাংলাদেশের জন্য হজরে কোটা ছিল এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের। গত বছর হজ কোটার বিপরীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কম ছিল নিবন্ধন সংখ্যা। যদিও সরকারি-বেসরকারিভাবে হজে যাওয়ার প্রাক-নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

কিন্তু হজ প্যাকেজের মূল্য বৃদ্ধির দরুণ কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও এবার নির্ধারিত কোটা পূরণ হয়নি। অবশেষ ৮৩ হাজার ২০৯ জন চূড়ান্ত নিবন্ধন করেন। তন্মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চার হাজার ৩১৪ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৮ হাজার ৮৯৫ জন হজপালন করবেন। আর ব্যবস্থাপনাসহ এবার হজে যাচ্ছেন ৮৫ হাজার ১১৭ জন। সে হিসেবে গত বছরের তুলনায় এবার সারাদেশে হজযাত্রীর সংখ্যা কমেছে ৩৭ হাজার ৭৬৭ জন।

যদিও এখন পর্যন্ত সরকারি মাধ্যমে ২ হাজার ৭৭১ জন ও বেসরকারি মাধ্যমে ৭৮ হাজার ২৭৩ জন যাত্রী হজের জন্য প্রাথমিকভাবে নিবন্ধন করে রেখেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতবারের তুলনায় এবার হজের মূল খরচ বেড়েছে। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হজে যাওয়ার আগ্রহ কমেছে মানুষদের মধ্যে। এ কারণে অন্যবারের তুলনায় কমেছে হজযাত্রীর সংখ্যা।

আরও পড়ুন : বদলি হজ কখন করাবেন

হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশনের (হাব) কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেন, হজের ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় হজে যাওয়ার মানুষের সংখ্যা কমেছে।

বিষয়টি নিয়ে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) ও অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) নেতারা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, হজ কোটা পূরণ না হওয়ার প্রভাব তাদের ব্যবসায় পড়বে। কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ায় অনেক ট্রাভেল এজেন্সি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চলতি বছর একজন বাংলাদেশিকে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালনে গড়ে প্রায় সাত থেকে আট লাখ টাকা খরচ হবে, যা অনেক আগ্রহীকে হজ পালনে নিরুৎসাহিত করেছে। বিমানভাড়া, সৌদি আরবে বাসাভাড়া, মক্কা ও মদিনায় যাতায়াত ব্যয়সহ মোয়াাল্লিম ফি অত্যধিক বৃদ্ধির কারণে মূল হজের খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

হাব নেতাদের মতে, আগে মোয়াল্লিমের জন্য নির্ধারিত ফি ছিল এক হাজার থেকে ১২ শ রিয়াল, বর্তমানে তা করা হয়েছে পাঁচ হাজার রিয়াল, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা। বিমানভাড়া করা হয়েছে এক লাখ ৯৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া সৌদি সরকারের শতকরা ১৫ ভাগ ভ্যাট আরোপ অন্যতম।

তাদের মতে, হজের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের করার কিছু নেই। তবে বিমানভাড়া নির্ধারণ বা ভাড়া কম রাখার বিষয়টি সরকার হস্তক্ষেপ করে হজের খরচ কমানোর ব্যবস্থা করতে পারত।

২০০৯ সালে বাংলাদেশের হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ৬২৮ জন, যা ২০১৯ সালে বেড়ে হয় ১ লাখ ২৬ হাজার ৯২৩ জন। করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২২ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা কমে দাড়ায় ৬০ হাজার ১৪৬ জনে।

জিলহজ মাসে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৬ জুন পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হতে পারে। বাংলাদেশ থেকে ৯ মে শুরু হওয়া হজফ্লাইট শেষ হবে ১০ জুন। এই সময়ের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গাইডসহ হজপালনে সৌদি আরব যাবেন ৮৫ হাজার ১১৭ জন।

;

বদলি হজ কখন করাবেন



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
মসজিদে হারামের প্রবেশ পথ, ছবি: সংগৃহীত

মসজিদে হারামের প্রবেশ পথ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্যস্ততার কারণে কেউ হজে যেতে না পারলে অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ করানো যাবে না। কারণ এটি শরিয়ত নির্দেশিত অপারগতা নয়। বদলি হজ কেবল শরিয়তের দৃষ্টিতে মক্কায় যেতে অপারগদের জন্য প্রযোজ্য। বদলি হজের বিধান হলো-

হজ ফরজ হওয়ার পর হজ করা হয়নি, এখন শারীরিকভাবে মক্কায় যেতে অক্ষম এমন ব্যক্তির জন্য অন্য কাউকে পাঠিয়ে হজ করা ফরজ। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

বার্ধক্য বা অসুস্থতা থেকে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম হতে হবে। -মানাসিক লি-মোল্লা আলি কারি

অসিয়ত না করলেও মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা চাইলে তার জন্য বদলি হজ করাতে পারেন। এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো- ওয়ারিশদের সবার স্বতঃস্ফূর্ত অনুমোদন লাগবে এবং ওয়ারিশদের মধ্যে কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকলে তার ভাগের সম্পদ থেকে কিছুই নেওয়া যাবে না। -আদ দুররুল মুখতার

যার পক্ষ থেকে হজ করা হবে, তাকেই খরচ বহন করতে হবে। অসিয়ত করে গেলে প্রথমে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ঋণ আদায় করতে হবে। এরপর অসিয়তের বিধান অনুযায়ী বাকি সম্পদ তিন ভাগ করতে হবে। এর মধ্যে এক ভাগ থেকে অসিয়তের অংশ নিতে হবে। হজের অসিয়ত করে গেলে সেই খরচও এই অংশ থেকে নিতে হবে। -মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা

আরও পড়ুন: হজযাত্রীদের সেবায় সৌদি ঐতিহ্য

বদলি হজের বিনিময়ে মজুরি নেওয়া নাজায়েজ। কারণ ইবাদতের বিনিময়ে কোনো মজুরি নেওয়া যায় না। কেউ দিলে এবং নিলে দুজনেই গোনাহগার হবেন। হজের জন্য প্রয়োজনীয় খরচের বাইরে কোনো ধরনের লেনদেন করা যাবে না। -আল-বাহরুল আমিক

টাকা-পয়সার হিসাবের ঝামেলা এড়ানোর জন্য হজে পাঠানো ব্যক্তি যদি বদলি হজকারীকে বলেন, আপনাকে পুরো টাকা হাদিয়া হিসেবে দিলাম, তাহলে এই টাকা দিয়ে বদলি হজ আদায় হবে না। কারণ হাদিয়া দেওয়ার কারণে বদলি হজকারী ওই টাকার মালিক হয়ে যান। -যুবদাতুল মানাসিক

হজ করেছেন এমন নেককার ব্যক্তিকে বদলি হজের জন্য পাঠানো উত্তম। হজ করেননি এমন ব্যক্তিকে পাঠানো বৈধ। তবে হজ ফরজই হয়নি এমন ব্যক্তিকে পাঠানো মাকরুহে তানজিহি। আর হজ ফরজ হলেও আদায় করেননি এমন ব্যক্তিকে পাঠানো মাকরুহ তাহরিমি তথা নাজায়েজ। -সুনানে আবু দাউদ

;

হজযাত্রীদের সেবায় সৌদি ঐতিহ্য



রাহাফ জামবি
অতীতে হজযাত্রীরা দীর্ঘসময় নিয়ে জাহাজে করে আসতেন জেদ্দায়, ছবি: সংগৃহীত

অতীতে হজযাত্রীরা দীর্ঘসময় নিয়ে জাহাজে করে আসতেন জেদ্দায়, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ষাটের দশকে বেশিরভাগ মানুষ পবিত্র হজপালন করতে আসতেন জলপথে অর্থাৎ জাহাজে। কোনো হজযাত্রীর জেদ্দাবন্দরে পৌঁছাতে চার-পাঁচ মাস সময় লেগে যেত। জেদ্দায় আসার পরে চড়তে হতো মক্কার বাসে। এ সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের যাত্রার সঙ্গী হতেন একজন মুতাওয়িফ।

মুতাওয়িফ হলেন একজন গাইড, হজযাত্রীদের সেবা প্রদানকারী। তিনি মক্কা-মদিনায় হজযাত্রীদের নানাভাবে, নানাক্ষেত্রে সহায়তা করেন এবং তাদের যত্ন নেন, আবাসান ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। ঐতিহ্যগতভাবে একজন মুতাওয়িফ পারিবারিকভাবে দায়িত্বটি পালন করতেন এবং এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এভাবেই রীতিটি হস্তান্তরিত হতো। একসময় এই অতীত রীতি ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

রিয়াদের বাসিন্দা হায়াত ইদ একজন সাবেক মুতাওয়িফ। তিনি অতীতের কথা স্মরণ করে বলেন, এ সময়টাতে তিনি তার সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে, বাড়িতে ধূপ জ্বালিয়ে দূর থেকে আসা হজযাত্রীদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত থাকতেন।

ইদের দাদা একসময় হজযাত্রীদের আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতেন এবং সেগুলো নিজেই পরিষ্কার করতেন। তিনি হজযাত্রীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য সুপারভাইজার এবং অনুবাদক নিয়োগ করতেন। পরে এ দায়িত্ব বর্তায় তার ছেলে ইদের বাবার হাতে।

হায়াত ইদের বাবা জামিল আবদুর রহমান ইদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হজযাত্রীদের ‘শায়খ’ (শায়খ একটি সম্মানসূচক পদবি। এটি সাধারণত ধর্মীয় শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। তবে সৌদি আরবে কোনো বিষয়ে অভিজ্ঞদের পদবি হিসেবেও শায়খ ব্যবহৃত হয়।) ছিলেন বলে জানান তিনি। জনসাধারণের মাঝে মুতাওয়িফদের শায়খ হিসেবেই পরিচিতি ছিল।

ইদ পরিবার বংশ পরম্পরায় হাজিদের সেবা করে আসছেন, ছবি: সংগৃহীত

হায়াত ইদ বলেন, ‘আমার দাদার পাশাপাশি দাদীও মুতাওয়িফ ছিলেন। আমার দাদা ছিলেন ‘জাভার শায়খ’ অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়া থেকে আগত হজযাত্রীদের সেবা করতেন তিনি। আমার দাদা-দাদি মারা যাওয়ার পর আমার বাবা মুতাওয়িফের পদ গ্রহণ করেন।’

যাট ও সত্তরের দশকের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে ৫০ বছর বয়সী ইদ বলেন, হজযাত্রীরা তার পরিবারকে চিঠি পাঠাতেন যেন তাদের আবাসনের সুযোগ হয়। হজযাত্রীদের জন্য ঈদের সময় বাড়তি খাবারেরও প্রস্তুতি নিত তার পরিবার।

শায়খরা হজযাত্রীদের হজের আচার-অনুষ্ঠান এবং তাদের কী করা উচিত সেসব বুঝিয়ে দিতেন। তাদেরকে মক্কা এবং অন্যান্য স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং সঙ্গে করে বাড়ি ফিরে আনার দায়িত্ব ছিল তাদের।

এ সময় তার ভাই আদেল ইদ বলেন, মুতাওয়িফের ভূমিকা অতীতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল কিন্তু এখন এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকায় পরিণত হয়েছে।

হজযাত্রীদের খাবারের প্রস্তুতি, ছবি: সংগৃহীত

প্রত্যেক মুতাওয়িফকে তাদের সামর্থ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্টসংখ্যক হজযাত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হত। কেউ মাত্র ১০০ জনের দায়িত্ব নিত, আবার অনেকে ১ হাজার জনেরও দায়িত্ব নিতে পারত। তবে তাদের অবশ্যই হজযাত্রীদের ভাষা বোঝার জন্য বা তাদের সঙ্গে কথা বলতে দোভাষী নিয়োগ দিতে হত।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মুতাওয়িফ একাই হজযাত্রীদের সেবা করতে পারতেন। তারা নির্দিষ্ট এলাকার হজযাত্রীদের সুষ্ঠুভাবে সেবা প্রদানের জন্য সেসব দেশে ভ্রমণ করতেন এবং তাদের বিভিন্ন বিষয়গুলো শিখে আসতেন। তাদের খাদ্যাভ্যাস, রুচি, আচার-আচরণ ও ভাষা রপ্ত করাও ছিল একজন মুতাওয়িফের বিশেষ গুণ।

ইদ পরিবার ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা হজযাত্রীদের সহায়তা করত। তাই তারা মালয় ভাষা এবং তাদের মেহমানদের পছন্দের মশলা এবং খাবার সম্পর্কে শিখেছিলেন, যেন তারা হজযাত্রীদের যতটা সম্ভব মক্কাকে নিজের বাড়ি অনুভব করাতে পারেন।

একইভাবে ৪৬ বছর বয়সী উইজদান আবদুর রাজ্জাক লুলু বুকাস উত্তরাধিকারসূত্রে মুতাওয়িফের পেশা পেয়েছেন। তিনি মালয় ভাষায় সাবলীল ছিলেন। তার বাবা এবং দাদার কাছ থেকে মালয় ভাষা রপ্ত করেন তিনি।

১৯৯৩ সালে হজযাত্রীদের সঙ্গে আবদুর রাজ্জাক লুলু বুকাস, ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, কিছু জাতীয়তা বা দেশের ভাষা অন্যদের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে আমরা সে দেশের অনুবাদক নিয়োগ দিই। উদাহরণস্বরূপ, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হজযাত্রীদের সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলি। কিন্তু চীনা ভাষা কঠিন, তাই আমরা চীনা যাত্রীদের জন্য একজন দক্ষ অনুবাদক নিয়োগ দিয়েছি।

বুকাস বলেন, কিছু হজযাত্রী ঈদুল আজহায় মুতাওয়িফকে উপহার দেওয়ার জন্য উপহার হিসেবে সোনা বা মুক্তা নিয়ে আসতেন। তার বাবা, আবদুল হান্নান লুলু বুকাস হজযাত্রীদের কাছ থেকে অনেক উপহার পেয়েছেন বলে তার নামের সঙ্গে লুলু যোগ করেছেন যার অর্থ মনিমুক্তা।

মুতাওয়িফ থাকা অবস্থায় ঘটা এক অবিস্মরণীয় পরিস্থিতির বর্ণনা করেন বুকাস। তিনি একজন গর্ভবতী নারী হজযাত্রীর কথা বলেন, যিনি হজে এসে বাচ্চা জন্ম দিয়েছিলেন। তিনিই তখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান এবং ওই নারী নিরাপদে সন্তান জন্ম দেন।

বুকাস বলেন, তিনি বছরের পর বছর ধরে হজের বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তবে বর্তমান সময়ে বেশ ভালোই পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, অতীতে এবং আধুনিক সময়ের হজের মধ্যে পার্থক্য হলো- যাতায়াত ও আবাসনের অসুবিধা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগে কয়েক মাস সময় লেগে যেত। যা এখন মাত্র ঘণ্টায় সমাধান হয়ে যায়। এক্ষেত্রে সৌদি সরকারের প্রশাসনিক সুবিধার বিষয়টির ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ আসমা ইসলাম, নিউজরুম এডিটর, বার্তা২৪.কম

;