শবেকদর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ইসলামের সব বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য, আত্মিক উৎকর্ষ সাধন

ইসলামের সব বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য, আত্মিক উৎকর্ষ সাধন

  • Font increase
  • Font Decrease

সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘লাইলাতুল কদর রমজান মাসের কোনো এক রাতে হয়।’ মূলতঃ কোরআন নাজিলের জন্য এ রাতের মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে। এই রাত প্রসঙ্গে প্রায় ৪০টির মতো হাদিস রয়েছে। ওই সব হাদিসের সারাংশ হলো, রমজানের শেষ দশকে রাতটি লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

তবে শেষ দশকের কথা থাকলেও ২১ থেকে ২৯ রমজান পর্যন্ত বেজোড় রাতগুলোর ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মহিমান্বিত রাতটি বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে আবর্তিত হয়। আর বিভিন্ন ধরনের সুস্থ-অসুস্থ, বৃদ্ধ ইত্যাদি ধরনের মানুষ নবীজীকে (সা.) ওই রাতের বিষয়ে বিভিন্ন বছরে এবং বিভিন্ন তারিখে ও সময়ে প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নিয়েছেন বলে এতগুলো বর্ণনার অবতারণা হয়েছে।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণের জন্য শেষ দশকের রাতসমূহ, দুর্বল, বৃদ্ধদের জন্য শেষ বোজোড় অথবা ৭ রাত এবং অসুস্থের জন্য শুধু ২৭ রাত উল্লেখ করেছেন বলে হাদিসগুলো নিয়ে চিন্তা করলে মনে হয়। তবে তিনি নিজে শেষ দশক কঠিনভাবে পালন করেছেন, তা পাওয়ার জন্য ইতেকাফ করেছেন। আসলে এই নমনীয়তা হলো- ইসলামের সৌন্দর্য। অবশ্য আল্লাহতায়ালা নবীজীকে এই রাতের সুনির্দিষ্ট সময় জানিয়ে তা আবার ভুলিয়ে দিয়েছেন। এই ভুলিয়ে দেওয়াটাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের জন্য কল্যাণকর বলেছেন।

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের সব বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য, আত্মিক উৎকর্ষ সাধন। কাজেই সুনির্দিষ্ট সময়ের পরিবর্তে ৭ থেকে ১০ দিনের একটা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বান্দার পরম আত্মিক উন্নতি ও আল্লাহর সঙ্গে তৃপ্তিমূলক সম্পর্ক সৃষ্টির সুযোগ রাখা হয়েছে। আর এই উদযাপনকারী সময়টা সূর্যাস্ত থেকে ফজরের উদয় পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।

কদরের রাত সম্মানিত এ জন্য যে, এই রাতে পৃথিবীর ইতিহাসের এবং ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে বিশ্বজনীন নবী, কিতাব এবং অহির অভিষেক হওয়ার মাধ্যমে। আবার কদর অর্থ ভাগ্য বা আদেশ এ জন্য যে, এই রাতে পৃথিবীতে আগামী এক বছরে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা, জন্ম, মৃত্যু, রোগ, অর্জন ইত্যাদির কার্যাদেশ সংশ্লিষ্ট কার্য সম্পাদনকারী ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। কাজেই মহাসম্মানিত এই রাত পালন করার লক্ষ্যে ঈমানদারগণের জন্য রয়েছে বিশেষ প্রণোদনা। সেটা হলো- এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

আরবরা তখন মিলিয়ন বা বিলিয়নের হিসাব জানত না, তাই হাজারই ছিল তাদের সর্বোচ্চ সংখ্যা বা অসংখ্য হিসাব। কাজেই এই রাতের ইবাদত শুধু এক হাজার নয় বরং অসংখ্য মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। এই রাতে হজরত জিবরাইল (আ.)-এর নেতৃত্বে ফেরেশতারা অবতরণ করে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল বান্দাদের জন্য দোয়া করেন এবং সালাম পৌঁছে দেন।

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘লাইলাতুল কদরে যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় কিয়াম (নামাজ) করবে, তার পূর্বের সব পাপমোচন করা হবে।’ -সহিহ বোখারি : ১৮০২

আম্মাজান হজরত আয়শা (রা.) লাইলাতুল কদর রাতের দোয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) পড়তে বলেন- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন, তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা তুমি পছন্দ করো, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দাও।’

 

   

জেনে নিন শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
জেনে নিন শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত

জেনে নিন শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত

  • Font increase
  • Font Decrease

 

আল্লাহতায়ালা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তারই ইবাদতের জন্য। এ মর্মে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ -সুরা যারিয়াত : ৫৬

ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হতে পারে। প্রতিটি নেক কাজেই রয়েছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদানপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা। সুরা আনআমের ১৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার ১০ গুণ সওয়াব পাবে।’ নেক ইবাদতের প্রতিদান প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যেকোনো নেক আমলই করবে, আমার কাছে তার ১০ গুণ সওয়াব প্রস্তুত আছে।’ -হাদিসে কুদসি

১০ গুণ সওয়াব দেওয়ার এই ওয়াদা দুনিয়ার কোনো মানুষের নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই করা হয়েছে। আর এটিকে কোনো বিশেষ নেকির সঙ্গেও সীমাবদ্ধ করা হয়নি; বরং বলা হয়েছে যেকোনো ধরনের নেকি, হোক তা ফরজ কিংবা নফল। হোক একবার সুবহানাল্লাহ বলা কিংবা আলহামদুলিল্লাহ বলা। তার সওয়াব ১০ গুণ বৃদ্ধি পাবে।

মহান আল্লাহর একান্ত ইচ্ছা তার প্রত্যেক বান্দা তারই ইবাদত সম্পন্ন করার মাধ্যমে ইহ ও পরকালীন জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে। ইবাদত মূলত দুই প্রকার। ফরজ ইবাদত, যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। নফল ইবাদত, যেমন- নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, দান-খয়রাত, নফল রোজা রাখা ইত্যাদি।

মানব জাতি মূলত তখনই মহান আল্লাহর কাছে প্রকৃত সম্মানিত ও প্রিয় হবে, যখন তার প্রতিটি কাজ হবে একমাত্র তার উদ্দেশ্যে। সুখে-দুঃখে একমাত্র তার ইবাদত করবে, তাকেই ভালোবাসবে। তারই নৈকট্য লাভের চেষ্টায় সর্বদা ব্যস্ত থাকবে। ফরজ ইবাদত সম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গে নফল ইবাদতে অধিক মনযোগী হবে। নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে নফল রোজা বান্দাকে অতি সহজেই মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। কারণ রোজা এমন একটি ইবাদত যা জাহান্নাম থেকে রক্ষার জন্য ঢালস্বরূপ এবং এর প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ দিয়ে থাকেন।

নবী কারিম (সা.)-এর বাণী: কল্যাণকামী মুসলমানরা যেন শুধু রমজানের রোজা রেখেই থেমে না যায়, বরং অল্প কিছু রোজা রেখে পুরো বছরের রোজা রাখার মর্যাদা লাভ করতে পারে তার এক মহাসুযোগ করে দিয়ে নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে ফরজ রোজা পালন করল, অতঃপর শাওয়াল মাসে আরও ছয়দিন রোজা পালন করল, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।’ -সহিহ মুসলিম

অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যখন রমজান মাসের রোজা রেখে তার সঙ্গে সঙ্গে শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখল, সে এই রোজার কারণে মহান আল্লাহর দরবারে পূর্ণ একটি বছর রোজা রাখার সওয়াব পেয়ে গেল। অপর এক হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা শেষ করে শাওয়াল মাসে ছয়দিন রোজা রাখবে, সেটা তার জন্য পুরো বছর রোজা রাখার সমতুল্য।’ -মুসনাদে আহমদ

বিশ্লেষণ: যদি কোনো ব্যক্তি রমজান মাসের ৩০টি রোজা রাখে, তাহলে তার ১০ গুণ ৩০০ রাত হবে। আর শাওয়ালের ছয় রোজার ১০ গুণ ৬০ হবে। এমনিভাবে সব রোজার সওয়াব মিলে ৩৬০ দিন হয়ে গেল। আর আরবি দিনপঞ্জির হিসাবে ৩৬০ দিনেই তো বছর পূর্ণ হয়।

শিক্ষা: হাদিসদ্বয় থেকে আমরা যে শিক্ষা পেয়ে থাকি তা হলো- শাওয়ালের ছয়টি রোজার গুরুত্ব ও ফজিলত অবগত হওয়া গেল। ক্ষুদ্র আমল কিন্তু অর্জন বিশাল। বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর সীমাহীন দয়ার বহিঃপ্রকাশ। অল্প আমলেই অধিক প্রতিদান প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতাস্বরূপ এই ছয় রোজার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা মোস্তাহাব, যাতে রোজাগুলো ছুটে না যায়। কোনো ব্যস্ততাই যেন পুণ্য আহরণের এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। নফলসমূহ ফরজের ত্রুটিগুলোর ক্ষতিপূরণ করে। অর্থাৎ জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে রোজাদার কর্র্তৃক যে ভুলত্রুটি হয়, নফল রোজা তা দূর করতে সহায়তা করে।

ছয় রোজার উপকারিতা: এ রোজা ফরজ নামাজের পর সুন্নতে মোয়াক্কাদার মতো। যা ফরজ নামাজের অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করে। অনুরূপভাবে শাওয়ালের ছয় রোজা রমজানের ফরজ রোজার অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করে এবং তাতে কোনো ত্রুটি থাকলে তা দূর করে।

কখন এবং কীভাবে: শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখা যাবে মাসের শুরু-শেষ-মাঝামাঝি সব সময়। ধারাবাহিকভাবে কিংবা বিরতি দিয়ে যেভাবেই করা হোক, রোজাদার অবশ্যই এর সওয়াবের অধিকারী হবেন। এ কথা স্মরণ রাখতে হবে, শাওয়ালের ছয় রোজার সঙ্গে রমজানের কাজা রোজা আদায় হবে না। উভয় রোজাই আলাদা আলাদা রাখতে হবে। প্রথমে রমজানের কাজা রোজা রাখতে হবে, তারপর ছয় রোজা রাখবে। যদি পুরো মাসই কাজা রোজায় শেষ হয়ে যায় এবং নফল রোজা রাখার সুযোগ না পাওয়া যায়, তবুও মহান আল্লাহ বান্দার মনের আকাক্সক্ষার কারণে তাকে ওই ছয় রোজার সওয়াব দেবেন বলে আমরা আশা করি। মা-বোনদের এ দিকটি খেয়াল রাখা উচিত যে, প্রাকৃতিক কারণে প্রতি রমজানে তাদের যে রোজাগুলো কাজা হয়ে যায়, উচিত হবে প্রথমে সেই কাজা রোজাগুলো আদায় করা। এরপর শরীর সুস্থ ও সুযোগ থাকলে পূর্ববর্তী বছরের কাজা রোজা আদায় করা। যদি কোনো কাজা রোজা না থাকে, তাহলে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখাই হবে উত্তম। কারণ নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যে রমজানের রোজা রাখবে সে যেন পুরোপুরি রাখে। যার ওপর কাজা রয়ে গেছে, তার রোজাগুলো পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য করা হবে না, কেননা সে তার কাজা আদায় করেনি।’ -মুগনি

উল্লেখ্য, শাওয়ালের রোজা হচ্ছে নফল আর রমজানের রোজা হচ্ছে ফরজ। আর রমজানের কাজা রোজা আদায় করাও ফরজ।

শেষ কথা: প্রত্যেক সুস্থ-সবল ব্যক্তির উচিত শাওয়াল মাসের ফজিলতপূর্ণ ছয়টি রোজা রেখে পূর্ণ এক বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব হাসিল করে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভে ধন্য হওয়া। কোনো মুমিন নারী-পুরুষ যদি তার অপর কোনো ভাই-বোনকে এই রোজা রাখতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সে যদি তার পরামর্শে রোজা রাখেন, তবে উদ্বুদ্ধকারীও সওয়াব পাবেন। উল্লেখ্য, কেউ নফল রোজা রেখে ভেঙে ফেললে তার কাজা আদায় করা ওয়াজিব।

;

স্বর্গীয় আবহ সৃষ্টির দিন



মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত, অতিথি লেখক, ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ইসলাম মানবতার ধর্ম। তাই মুসলমানদের সমস্ত আনন্দ উৎসব মানবিক ও সর্বজনীন। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের দিনটির সর্বজনীনতা ও ব্যাপকতা এতই বিস্তর যে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মুসলমানরা এ দিনটি মহা ধুমধামের সঙ্গে উদযাপন করেন। সারা বছর অধীর আগ্রহে বিশ্ব মুসলিম অপেক্ষা করে মহিমান্বিত এ দিনটির জন্য। মুসলিম জাতি তথা অন্যান্য জাতির কাছেও ঈদুল ফিতরের মতো এত ব্যাপক ও আকাঙ্ক্ষিত দিন বা অনুষ্ঠান আর নেই। ঈদুল ফিতর নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং এর রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূর প্রসারী ভূমিকা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক সাম্যতা গঠনে ঈদুল ফিতর এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেব অনাদি কাল থেকে চলে আসছে।

ঈদের নির্মল আনন্দে ভেসে যায় মানুষের মনের সমস্ত হিংসা বিদ্বেষ, পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে অন্তরাত্মা। ঈদুল ফিতর সমাজের নিরন্ন অসহায় মানুষগুলোর আর্থিক দৈন্যতা গুচিয়ে ঈদের আনন্দে যাতে শামিল হতে পারে সে ব্যবস্থা করে সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যতাকে কিছুটা হলেও লাগব করে। ঈদুল ফিতরের সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম ও অনবদ্য। মানুষ হিসেবে আমরা প্রত্যেকে সমাজ বা রাষ্ট্রে বসবাস করলেও প্রত্যেকের মতামতের বা চিন্তার ভিন্নতা রয়েছে। ভিন্নতা রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে ভাষার ভিন্নতা যা প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের একে অন্যের প্রতি অনেক সময় বিষিয়ে তুলে এবং পরস্পরকে দূরে ঠেলে দেয় সৃষ্টি হয় সামাজিক সংঘাত। কিন্তু ঈদুল ফিতর আমাদের সারাজীবনের এ সব কলুষতাকে দূর করে, সব ভেদাভেদ ভুলে একত্র করে দেয়।

ঈদের নামাজে ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, মালিক-শ্রমিক, শিক্ষক-ছাত্র, সাদা-কালো, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব শ্রেণির-পেশার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায় এবং পরস্পর পরস্পরের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে; তখন এক স্বর্গীয় আবহ সৃষ্টি হয় এবং ঈদগাহ ময়দান হয়ে ওঠে এক অনন্য সামাজিক মিলনমেলা। নামাজ শেষে সবাই মিলে একে অপরের সঙ্গে যখন কোলাকুলি করে জড়িয়ে ধরে তখন সারা বছরের মলিনতা, বৈষম্যতা যেন নিমিষেই ধুয়ে মুছে যায়, যা পৃথিবীতে আর কোনো দিন বা অনুষ্ঠানে বিরল।

পেশাগত কারণে আত্মীয়-স্বজন যারা দেশের বিভিন্নস্থানে থাকেন তারাও ঈদের দিনের একত্র হয় এবং একে অপরের বাড়িতে গিয়ে ভাব বিনিময় করে। এমনও দেখা যায়, কোনো কারণে সারা বছর হয়তো প্রতিবেশির বাড়িতে যাওয়া হয় না বা কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ ছিল অথচ ঈদের দিনে নির্দ্বিধায় পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করে নিমিষেই বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে দিল। এ যে সাম্যের জয়গান তা একমাত্র সম্ভব মহাসাম্যের এই ঈদে। ঈদুল ফিতর মানুষকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে, শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করে, আত্মীয়ের বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং সামাজিক সাম্যকে পরিপক্ব ও ব্যাপকতা দান করে।

তাই আসুন, ঈদকে ধর্মীয় ও সামাজিক চেতনার বাহন হিসেবে এর মর্ম উপলব্ধি পূর্বক সারা মাসের সিয়াম সাধনায় অর্জিত সৎ গুণাবলি এবং ঈদের দিনের পবিত্র, নিষ্কলুষ আনন্দ সবার মধ্যে বিলিয়ে দিই। তাহলে নানা জটিলতায় ভরে থাকা এই সমাজ সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ হিসেবে গড়ে উঠবে, পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুত হবে।

;

ঈদের নামাজ ছুটে গেলে করণীয়



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদের নামাজের পর খুতবা দেওয়া সুন্নত। আর উপস্থিত মুসল্লিদের জন্য তা শ্রবণ করা ওয়াজিব। মুসল্লিরা মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনবেন। -কিতাবুল আসল : ১/৩১৮

জুমার নামাজের ন্যায় ঈদের নামাজেও দুই খুতবা। দুই খুতবার মাঝে বসাও সুন্নত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- সুন্নত হচ্ছে, ইমাম ঈদে দুটি খুতবা দেবে। দুই খুতবার মাঝখানে বসার দ্বারা একটিকে আরেকটি থেকে আলাদা করবে। -সুনানে কুবরা : ৬২১৩

ঈদের খুতবার আগে আজানের কোনো বিধান নেই। খুতবার সময় ইমাম তাকবির বললে মুসল্লিরা চুপ থেকে খুতবা শুনবেন। নিজেরা তাকবির বলবেন না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- চারটি স্থানে চুপ থাকা ওয়াজিব। জুমা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং ইসতিসকার খুতবার সময়। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক : ৫৬৪২

ঈদের নামাজ ছুটে গেলে করণীয়

ঈদের নামাজে কাজার বিধান নেই। তাই কারও ঈদের নামাজ ছুটে গেলে সে আশপাশের অন্যকোনো ঈদের জামাতে শরিক হওয়ার চেষ্টা করবে। এমনটি সম্ভব না হলে তওবা-ইস্তেগফার করবে। -শরহু মুখতাসারিত তাহাবি : ২/১৬১

ঈদের নামাজের আগে-পরে নফল পড়া

হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন- হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন দুই রাকাত ঈদের নামাজ পড়ছেন। ঈদের নামাজের আগে বা পরে কোনো নামাজ পড়েননি। -সহিহ বোখারি : ৯৬৪

এ জাতীয় হাদিসের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, ঈদের নামাজের আগে বাড়িতে বা ঈদগাহে/মসজিদে পুরুষ মহিলা সকলের জন্যই নফল নামাজ পড়া মাকরূহ। তাই এসময় কেউ ইশরাক বা অন্য কোনো নফল নামাজ পড়বে না। -কিতাবুল আসল : ১/৩২৮

;

ঈদের নামাজের নিয়ম



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদের নামাজ দুই রাকাত। নিয়ত করে তাকবিরে তাহরিমা বলে নামাজ শুরু করে সানা পড়বে। সানা পড়ার পর ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’ বলে আরও তিনটি তাকবির বলবে। প্রথম দুই তাকবির বলার সময় উভয় হাত কানের লতি পর্যন্ত উঠিয়ে হাত না বেঁধে ছেড়ে দেবে। তৃতীয় তাকবির বলার সময় কানের লতি পর্যন্ত হাত উঠিয়ে বেঁধে নেবে। অতঃপর সুরা-কেরাত পড়ে রুকুতে যাবে। দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে সূরা-কেরাত পড়ে রুকুতে যাওয়ার পূর্বে আগের নিয়মে তিনটি তাকবির বলবে। তবে দ্বিতীয় রাকাতে তৃতীয় তাকবির বলার সময়ও হাত না বেঁধে ছেড়ে দেবে। অতঃপর চতুর্থ তাকবির বলে রুকু করবে। এরপর অন্যান্য নামাজের ন্যায় যথারীতি নামাজ শেষ করবে। -কিতাবুল আসল : ১/৩১৯

ঈদের অতিরিক্ত তাকবিরে ভুল হলে

ইমাম যদি প্রথম রাকাতে ভুলে অতিরিক্ত তাকবির না বলে কেরাত শুরু করে দেয় তাহলে কেরাত অবস্থায় তাকবিরের কথা স্মরণ হলে কেরাত ছেড়ে অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বলে নেবে। অতঃপর পুনরায় কেরাত পড়ে নেবে। কেরাত শেষ হওয়ার পর তাকবিরের কথা স্মরণ হলে তাকবির বলে রুকুতে চলে যাবে। -শরহুল মুনইয়া : পৃ. ৫৭২

ইমাম ঈদের অতিরিক্ত তাকবির ভুলে রুকুতে চলে গেলে (চাই প্রথম রাকাতের তাকবির হোক বা দ্বিতীয় রাকাতের) তাকবির বলার জন্য আর রুকু থেকে ফিরে আসবে না। এবং বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী রুকুতেও তাকবির বলবে না। এক্ষেত্রে নামাজ শেষে সিজদায়ে সাহু করে নেবে। (যদি জামাত ছোট হয়) -আল বাহরুর রায়েক : ২/১৬১

ঈদের অতিরিক্ত তাকবির ভুলে রুকুতে চলে যাওয়ার পর তাকবির আদায়ের জন্য রুকু থেকে ফিরে আসলে যদিও কোনো কোনো ফকিহ নামাজ ফাসেদ হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তবুও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী কাজটি ভুল হলেও এ কারণে নামাজ নষ্ট হবে না। -রদ্দুল মুহতার : ২/১৭৪

ঈদের নামাজে মাসবুক হলে করণীয়

কেউ প্রথম রাকাতে ঈদের অতিরিক্ত তাকবির বলার পর ইমামের সঙ্গে শরিক হলে সে তাকবিরে তাহরিমা বলে নামাজে শরিক হওয়ার পর নিজে নিজে অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বলে নেবে; চাই এক্ষেত্রে ইমাম কেরাত পড়া অবস্থায় থাকুন না কেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে নামাজে শরিক হওয়ার পর দাঁড়ানো অবস্থায় (রুকুর আগে আগে) তাকবির আদায়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি আদায় না করে তাহলে পরে আর রুকুতে তাকবির বলবে না। -আল বাহরুর রায়েক : ২/১৬১

ইমামকে রুকুতে পেলে সেক্ষেত্রে যদি প্রবল ধারণা হয়, দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বললেও ইমামের সঙ্গে রুকুতে শরিক হতে পারবে তাহলে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বলে ইমামের সঙ্গে রুকুতে শরিক হবে।

আর যদি প্রবল ধারণা হয়, দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত তাকবির বলতে গেলে ইমামকে রুকুতে পাওয়া যাবে না, তাহলে তাকবিরে তাহরিমা বলে রুকুতে চলে যাবে। রুকুতে গিয়ে ছুটে যাওয়া অতিরিক্ত তাকবিরগুলো হাত উঠানো ছাড়া বলে নেবে। এরপর যদি সময় থাকে তাহলে রুকুর তাসবিহ আদায় করবে। -আল মুহিতুল বুরহানি : ২/৪৮৮

ইমামের সঙ্গে রুকুতে শরিক হওয়ার পর অতিরিক্ত তাকবির বলার মত সময় না পেলে আর তাকবির বলতে হবে না। ইমামের সঙ্গে রুকু পাওয়ার কারণে সে ওই রাকাত পেয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকবিরও পেয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। -ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ২/৬১৮

কেউ দ্বিতীয় রাকাতে ইমামের সঙ্গে শরিক হলে ইমামের সালাম ফেরানোর পর ছুটে যাওয়া রাকাত আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে প্রথমে সূরা-কেরাত পড়ে তারপর রুকুর আগে অতিরিক্ত তাকবির বলবে। অর্থাৎ ছুটে যাওয়া রাকাতেও দ্বিতীয় রাকাতের ন্যায় রুকুর আগে অতিরিক্ত তাকবির বলবে। অবশ্য যদি কেউ এক্ষেত্রে সূরা-কেরাতের আগে অতিরিক্ত তাকবির বলে নেয় তাহলেও তার নামাজ আদায় হয়ে যাবে। -কিতাবুল আসল : ১/৩২২

দ্বিতীয় রাকাতের রুকুর পর এমনকি শেষ বৈঠকের তাশাহহুদের পরও কেউ জামাতে শরিক হলে সে ঈদের জামাত পেয়েছে বলে ধর্তব্য হবে। এক্ষেত্রে ইমামের সালাম ফেরানোর পর দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই উভয় রাকাত আদায় করবে। অর্থাৎ প্রথম রাকাতের পর দাঁড়িয়ে কেরাতের পূর্বে অতিরিক্ত তাকবিরগুলো বলবে। আর দ্বিতীয় রাকাতে কেরাতের পর অতিরিক্ত তাকবির বলবে। -কিতাবুল আসল : ১/৩২২

ঈদের নামাজে সাহু সিজদা

অন্যান্য নামাজের ন্যায় ঈদের নামাজেও জামাত ছোট হলে এবং বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা না থাকলে ওয়াজিব ছুটে গেলে সিজদায়ে সাহু দিতে হয়। তবে যেহেতু ঈদের জামাতে সাধারণত অনেক বড় জমায়েত হয়ে থাকে, অনেক মানুষ সিজদায়ে সাহুর নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে না, তাই সিজদায়ে সাহু আদায় করতে গেলে অনেক সময় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। এ জন্য কোনো কোনো ফকিহের মতে ঈদ, জুমা বা এরকম বড় কোনো জামাতের ক্ষেত্রে ইমাম সাহেব সিজদায়ে সাহু করতে গেলে যদি মুসল্লিদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা হয় তাহলে সেক্ষেত্রে সিজদায়ে সাহু মাফ হয়ে যাবে। ইমাম স্বাভাবিক নিয়মে নামাজ শেষ করবে। -কিতাবুল আসল : ১/৩২৪

ঈদের নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক

ঈদুল আজহার নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক বলা যেতে পারে। তবে ফরজ নামাজের মত ঈদের নামাযের পর তাকবির বলা ওয়াজিব নয়। -আল বাহরুর রায়েক : ২/১৬৫

;