নোয়াহ হারারির কল্পিত বাস্তবতা ও সমকালীন সমাজ



মিজানুর রহমান
অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

অলঙ্করণ: কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেম-এর ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর ইয়োভাল নোয়াহ হারারি আমার অন্যতম প্রিয় ব্যাক্তিত্ব। তিনি তিনটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের লেখক, যেগুলো হলো, ‘সেপিয়েন্স: এ ব্রিফ হিস্টোরি অব ম্যানকাইন্ড’, ‘হোমো ডিউস’ এবং ‘টুয়েন্টি ওয়ান লেসন ফর দি টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরী’। আমার এই লেখার আলোচনা এগিয়েছে তার প্রথম বই ‘সেপিয়েন্স’-এর সূত্র ধরে। হারারি তার ‘সেপিয়েন্স: এ ব্রিফ হিস্টোরি অব মেনকাইন্ড’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন কিভাবে ৭০,০০০ বছর পূর্বে যে হোমো সেপিয়েন্স তথা মানব প্রজাতির প্রভাব পৃথিবীতে একটা জেলিফিশের প্রভাবের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না, সেই প্রজাতি কিভাবে সময় পরিক্রমায় এই ধরণীতে তার একক শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করতে সক্ষম হলো?

এর কারণ হিসেবে তিনি যা বলেছেন সংক্ষেপে তাহলো, মানব প্রজাতির বিশাল সংখ্যায় নমনীয় হয়ে একে অন্যর সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারার ক্ষমতা যা অন্য কোনো প্রজাতির বেলায় দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, আপনি পনের থেকে বিশটা শিম্পাঞ্জীর দল দেখতে পাবেন কিন্তু এক হাজার শিম্পাঞ্জীর কোনো দল দেখতে পাবেন না। আপনি চল্লিশ হাজার মানুষকে একসাথে বসে মিরপুর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ বনাম ভারতের মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ উপভোগ করতে দেখতে পারেন, কিন্তু চল্লিশ হাজার শিম্পাঞ্জী মিরপুর স্টেডিয়ামে একসাথে ছেড়ে দেওয়া হলে যা দেখতে পাবেন তাহলো চরম বিশৃংঙ্খলা, একেবারে পাগলামীর চূড়ান্ত।

প্রশ্ন হলো মানুষ নিজেদের মধ্যে কিভাবে বিশাল সংখ্যায় এইরকম সহযোগী সম্পর্কের নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পেরেছে? হারারির মতে, মানুষের বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সক্ষমতা অর্জনের পেছনে যে কারণ তাহলো—তারা গল্প তৈরি করতে পারে এবং সে গল্প যখন সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করে তখন তারা সবাই একই রকমের আচার, মূল্যবোধ ধারণ করে, ফলত: তাদের সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয়। হারারির কাছে এই গল্পগুলোর উদাহরণ হলো ধর্ম, জাতি, রাষ্ট্র, করপোরেশন, অর্থ ইত্যাদি, এগুলো হলো ফিকশনাল রিয়েলিটি বা কল্পিত বাস্তবতা। অর্থাৎ, মানুষ বসবাস করে দ্বৈত বাস্তবতায়। একটা হলো অবজেক্টিভ রিয়েলিটি, যেমন, পাহাড়, নদী, গাছ, মানুষের নিজের শরীর ইত্যাদি ইত্যাদি। আরেকটা হলো ফিকশনাল রিয়েলিটি যা মানুষ তার কনশাসনেস বা চিন্তা শক্তির মাধ্যমে তৈরি করে। তাহলে আপনি নিরেট বাস্তবতা থেকে কল্পিত বাস্তবতা আলাদা করবেন কিভাবে?

হারারির পদ্ধতি খুবই চমকপ্রদ আবার খুব সরল। তার মতে যা কিছু যন্ত্রণা ভোগ করতে পারে না তাই ফিকশনাল রিয়েলিটি। যেমন, জাতি বা রাষ্ট্র। আমরা প্রায়শই বলি অমুক রাষ্ট্র তমুক রাষ্ট্রের কাছে বা অমুক জাতি তমুক জাতির কাছে পরাজিত হয়েছে কিংবা নতি স্বীকার করেছে। কিন্তু জাতি কি আসলে কোনো যন্ত্রণা ভোগ করছে? রাষ্ট্র কি কোনো যন্ত্রণা ভোগ করছে? উত্তর হলো, না। কারণ এগুলো কোনো নিরেট বাস্তবতা নয়, এগুলো আমাদের কল্পিত বাস্তবতা। কিন্তু যন্ত্রণা বা দুর্দশা ভোগ করে আসলে মানুষ, অমুক কল্পিত জাতির অন্তর্ভুক্ত রক্ত-মাংসের শরীরের মানুষ। সুতরাং নিরেট বাস্তবতা যদি কিছু থেকে থাকে তাহলো মানুষ, তার শরীর। জাতি বা রাষ্ট্র নয়।

হারারি তার বিভিন্ন লেকচারে বা পাবলিক আলোচনায় এটা অকপটে বলেছেন যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পেছনে এমনসব কল্পিত বাস্তবতা বা গল্পগুলোর ভূমিকা হচ্ছে প্রধান নিয়ামক। আপনি বেবুনদের কোনো দলের কাছে গিযে বেবুন সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বক্তৃতা দিয়ে সুবিধা করতে পারবেন না। কিংবা কোনো বেবুনকে দশ টাকার নোট দিয়ে দুইটা কলা দিতে বললে কোন সাড়া পাবেন না। কারণ দশ টাকার নোট তার কাছে অর্থহীন, তাকে বরং আপনি একটা নারিকেল দিলে সে আপনাকে একটা কলা দিতে পারে। কারণ সে শুধুমাত্রই অবজেক্টিভ রিয়েলিটিতে বাস করে, কিন্তু মানুষ অন্যএকটা সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে দশটাকা দিয়ে আরামসে দুইটা কলা কিনে নিয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে খেয়ে চলে আসতে পারে, কারণ অর্থ নামক গল্পে সমগ্র মানব জাতি বিশ্বাস করে। হারারির মতে, টাকা হলো মানুষ উদ্ভাবিত পৃথিবীর সবচেয়ে সফল গল্প। সবাই এক ধর্মে, এক খোদায়, এক জাতিতে কিংবা এক রাষ্ট্রে বিশ্বাস না করলেও টাকার গল্পে সবাই বিশ্বাস করে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, লাদেন আমেরিকান জাতি বা ধর্মে বিশ্বাস না করলেও আমেরিকান ডলার নিতে বা ব্যবহার করতে কোনোদিন আপত্তি করেননি। অর্থাৎ, মানুষের সফল হবার পেছনে তাদের গল্প উদ্ভাবন এবং সেসব গল্পে বিশ্বাস স্থাপন করার ক্ষমতাই প্রধান।

কিন্তু হারারির আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো কিভাবে এই গল্পগুলোই বা ফিকশনাল রিয়েলিটিগুলোই আবার মানব প্রজাতির ইতিহাসের পরিক্রমায় মানুষের কষ্ট, দুর্দশা, যন্ত্রণা এবং ধ্বংসের মূল কারণ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই হলোকাস্টের ঘটনাটাই যদি দেখি তবে দেখব যে, হিটলার বা নাৎসি বাহিনীর বিপুল হত্যাযজ্ঞের পেছনে মূল কারণ ছিল জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের গল্প। কিন্তু প্রকৃতিতে বা অবজেক্টিভ রিয়েলিটিতে এমন কোনো পরিমাপক নেই বা মানদণ্ড নেই যেখানে আপনি মাপতে পারবেন কোনো জাতি থেকে কোনো জাতি শ্রেষ্ঠ অথবা কোনো ধর্ম থেকে কোনো ধর্ম শ্রেষ্ঠ। ভিন্ন ভিন্ন গল্পের ভোক্তারা তাদের গল্পকেই শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণে ব্যাতিব্যস্ত থাকে, প্রয়োজনে খুন করে, গণহত্যা সংঘটিত করে, জাতিগত নিধনে লিপ্ত হয় কিংবা ধর্মযুদ্ধে যায়। সবকিছুই এই গল্পগুলোর জন্য আদতে যেগুলোর কোনো জৈবিক সত্তা নেই, এগুলোর অস্তিত্ব কেবল মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাপ্রণালীর মধ্যেই গ্রথিত।

হারারির সেপিয়েন্স পড়ে এবং তার আলোচনাগুলো শুনে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, এই যে ফিকশনগুলো সেগুলো আমাদের সমাজকে কিভাবে বেঁধে রেখেছে আবার কিভাবে আমাদের সমাজে অন্যায়, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, অবিচারকে টিকিয়ে রাখছে? সত্যিকার অর্থে আমি যা দেখি তাহলো ফিকশন এবং মিথগুলোর জন্য নিরেট বাস্তব রক্ত-মাংসের মানুষরা একে অন্যর ক্ষতি করতে ব্যস্ত। জাতি, জাতীয়তা, ধর্ম, সরকার, রাষ্ট্র, অর্থ নামের কল্পিত গল্পগুলো হয়ে উঠেছে মানুষের নিজের চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী—এগুলোর দোহাই দিয়ে এক ঝটকায় কাউকে রক্তাক্ত করা, খুন করা, গুম করা, জেলে পুরে দেওয়া যায়। যারা এই গল্পগুলো থেকে বাস্তবতা আলাদা করতে পারেন না (সিংহভাগ মানুষ) তারা এই গল্পগুলো অক্ষত রাখতে ইচ্ছুক, আরো শক্তিশালী করতে ইচ্ছুক, সেজন্য যাই করা লাগুক না কেনো। যারা এই গল্পগুলো চ্যালেঞ্জ করেন তাদের সাথে এই সিংহভাগের তৈরি হয় দুর্দান্ত অপছন্দের সম্পর্ক। আর এভাবেই চলতে থাকে অন্যায্যতা।

হারারি এই সমস্যাগুলোর পেছনে কল্পিত বাস্তবতাগুলোর ভূমিকা দুর্দান্তভাবে ব্যাখ্যা করলেও এ থেকে উত্তরণের পথ কী হতে পারে তা নিয়ে তেমন কিছু বলেন না। প্রশ্ন আসে তাহলে মানুষের হাতে সম্ভাব্য বিকল্প কী হতে পারে? তবে কি সময় এসেছে নতুন গল্প তৈরির, এমন কোনো গল্প যে গল্প একক কোনো গল্পের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে মাথা ঘামাবে না? যে গল্প নিজেই খোদ বহুবিধ গল্পের সমাহার, যে গল্পের কোনো শেষ নেই বরং নতুন নতুন সংযুক্তি আছে। হয়তো এভাবেই আমাদের সুযোগ আছে বহুধা এবং বহুবিধ গল্পের শেষ না হওয়া একটা সংকলন হিসেবে টিকে থাকার, নতুবা যখন যে গল্প শক্তিশালী হবে সে গল্প গিলে ফেলতে চাইবে অন্য সকল গল্পগুলোকে। তবে হারারি ঠিক এভাবে না বললেও আমার মতে, বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে জরুরি হলো, মিথ/ কল্পগাথা/ কিংবদন্তী/ গল্পগুলো থেকে বাস্তবতাকে আলাদা করতে শেখা। সেটা করতে পারলেই সম্ভবত মানুষ মিথ বা ফিকশনের জন্য নিরেট বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারবে না কিংবা তাকে ধ্বংস করতে উন্মুখ হয়ে উঠবে না, তা সে হোক প্রকৃতি কিংবা মানুষসহ প্রকৃতিতে থাকা অপরাপর প্রাণ।


মিজানুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

   

'রিমাল'-এর ধ্বংসযজ্ঞ সয়ে কেমন আছে সুন্দরবন!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
সুন্দরবনে মৃত হরিণ / ছবি: বার্তা২৪

সুন্দরবনে মৃত হরিণ / ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে ঘণ্টাপ্রতি ৮০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি বেগে ধেয়ে আসছিল ঘূর্ণিঝড় রিমাল। সাগরে ঢেউয়ের উত্তাল রূপ এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী বাতাসের ধাক্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েই উপকূলীয় এলাকার মানুষজন। শনিবার (২৫ মে) থেকেই পাওয়া পূর্বাভাসে মানুষ বেশ বুঝতে পারছিল, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বয়ে আনবে 'রিমাল'।

সৌভাগ্যবশত, বাংলাদেশকে বেষ্টিত করেছে আমাদের সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নোনাপানি উপকূলের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন অতিক্রম করে যাওয়ার সময় রিমালের বেগ অনেকটাই শিথিল হয়ে আসে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপের দণ্ড নিজ মাথায় পেতে নিয়েছে সুন্দরবন। এতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বনের অভ্যন্তরীণ চিত্র। পানিরে আধিক্যে ছেয়ে রয়েছে পুরো বন। ভাঙা-আধভাঙা গাছ লুটিয়ে পড়ে আছে। মিঠাপানির পুকুরে সমুদ্রের নোনাজল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন অফিসের অধিকাংশ টহল ফাঁড়ি ও বোট এবং সেইসঙ্গে যাতায়োতের পোল। ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে চালাঘরের টিন, দরজা, জানালা, সোলার প্যানেলসহ অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ।

এমনকী রিমালের ক্ষতির মূল্য দিতে হয়েছে বনে বসবাসকারী প্রাণীদেরও। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল তাণ্ডবে কেবল মানুষ নয়, প্রাণ হারিয়েছে অনেক অবলা প্রাণী।সর্বশেষে তথ্যমতে, সুন্দরবন থেকে ২৮টি মৃত হরিণ এবং ১ টি বন্য শুকরের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 

রবি-সোমবার (২৬ ও ২৭মে) রিমাল-এর তাণ্ডব চলে টানা ২০ ঘণ্টা। ঝড় শান্ত হওয়ার পর বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ পশুদের আহত এবং নিহতের এই সর্বশেষ খবর মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছে। বনে বসবাসকারী অন্যান্য বহু পশু-পাখিরও মৃত্যু হয়েছে এই দুর্যোগে। এখনো অনেক আহত প্রাণী উদ্ধার কার্যে ব্যস্ত রয়েছেন বনরক্ষা কর্মীরা। এ পর্যন্ত ১৭ টি আহত হরিণ উদ্ধার করে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে বনরক্ষীরা। এরপর তাদের নিরাপদে বনে ফেরত পৌঁছে দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও পশু আহত হয়েছে কিনা খোঁজ করা অব্যাহত রয়েছে। 

ঝড়ে অনবরত ভারী বর্ষণে তলিয়ে যায় সুন্দরবনের ভূমি। তাছাড়া, ঝড়ো হাওয়ার দাপটে উপড়ে গেছে বহু গাছ। প্রকৃতির এরকম পরিবেশের কারণেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অবলা প্রাণীগুলো!

;

উপকূলে ঝড়ের বিপদ সংকেত, ঢাকায় চিত্রকরের নীল মেঘ!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

উপকূলে চলছে ৩ নম্বর বিপদ সংকেত। দমকা বাতাসের তোড়ে সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ। আকাশে হৈ হৈ রব তুলে দখল করেছে কালো মেঘ। ছড়িয়ে দিচ্ছে গুড়ুম গুড়ুম ডাক! কয়েক ঘণ্টা বাদেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আসার সম্ভাবনা। তবে কথায় বলে, বাজ পড়ার আগে আকাশ শান্ত হয়ে যায়!

ঠিক যেন প্রকৃতি তার সেই রূপটিই মেলে ধরলো। উপকূল অঞ্চলগুলোতে মানুষজনকে সতর্ক করা হচ্ছে। ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ অথচ রাজধানীর আকাশ স্নিগ্ধ-কোমল!

শুধু কী তাই! ছবি আঁকার পর শিল্পী তার রঙ মাখা তুলিগুলো এলোমেলো করে ফেলে রাখে যেমন, সেই ছবি যেন আকাশে সেঁটে দিয়েছে কেউ। লাল, গোলাপি, কমলা, নীল, বেগুনি রঙের মিশ্রণে অপূর্ব সুন্দর এক এলোমেলো চিত্র উঁকি দিচ্ছে আকাশে। তার মাঝে ধূসর মেঘ ঘোলা জলে মাছের মতো দুরন্তপনায় ছুটে যাচ্ছে বহুদূর।

শনিবার (২৫ মে) গোধুলি লগ্নে ঢাকার আকাশ ঠিক এভাবেই রঙিন হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ রংধনুর ছোঁয়া ছাড়াই রঙিন পটচিত্রের রূপ মেলে ধরে গগন, যেন আকাশ নয়, কোনো চঞ্চলা কিশোরীর উৎফুল্ল মন! প্রকৃতি এখন স্তব্ধ হয়ে আছে। গাছের একটি পাতাও যেন নড়ছে না। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরের অথৈ উম্মাদনা। স্থানীয়দের ভয়, জলোচ্ছ্বাসে যেন তাদের জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এমনি করেই প্রকৃতির বহুরূপী লীলাখেলা চলতে থাকে অবলীলায়।

;

বিখ্যাত মিমের ভাইরাল কুকুর কাবোসু আর বেঁচে নেই



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ভাইরাল কুকুর কাবোসু / ছবি: সংগৃহীত

ভাইরাল কুকুর কাবোসু / ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন মানুষ জুড়তে শুরু করলো ইন্টারনেটে নতুন অনেক নতুন উদ্ভাবনার দেখা মিললো। এমন এক ব্যাপার হলো মিম। বর্তমান সময়ে সেন্স অব হিউমারের (রসবোধ) এক অন্যতম মাধ্যম এই মিম। বিশেষত কোনো ছবি ব্যবহার করে তাতে হাস্যরসাত্মক কিছু জুড়ে দিয়ে এইসব মিমগুলো বানানো হয়।

২০১৩ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনই একটি ছবি ভাইরাল হয়। পরবর্তী সময়ে যা একটি বিখ্যাত ‘মিম ম্যাটেরিয়াল’-এ পরিণত হয়। কমলা-সোনালী এবং সাদা রঙের সম্বনয়ে বাহারি লোমের এই কুকুরটির নাম কাবোসু। কাবোসুর বয়স ১৯ বছর।

দুর্ভাগ্যবশত কুকুরটি আর বেঁচে নেই। ২৪ মে (শুক্রবার) দীর্ঘদিন ধরে রোগাক্রান্ত থাকার পর অবশেষে দেহ ত্যাগ করে কুকুরটি। কুকুরটির মালিক আতসুকো সাতো (৬২) জাপানের চিবা প্রিফেকচারের সাকুরা শহরের একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক।শুক্রবার তার প্রকাশিত ব্লগে একটি দুঃখের কবিতা আবৃত্তির পর তিনি এই খবরটি নিশ্চিত করেছেন।

ভাইরাল কুকুর কাবোসু / ছবি: সংগৃহীত

১৯ বছর বয়সেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ২৬ মে রবিবার কাবোসুর স্মরণে একটি স্মরণ সভার আয়োজনও করা হবে। কুকুরটির মারা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকলে দুঃখ প্রকাশ করছে।

২০২২ সালে ক্রোানক লিম্ফোমা লিউকুমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। সেই থেকেই কাবোসুর চিকিৎসা চলছিল। তবে দুঃখের বিষয়, সে আর সুস্থ হয়ে ফিরতে পারলো না।

কাবোসুর ত্যাড়া চোখে দৃষ্টির একটি ছবি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। এটি ইন্টারনেটে সবচেয়ে আইকনিক এবং স্বীকৃত ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমনকি ক্রিপ্টো কারেন্সির দুনিয়াতেও তার নাম ছিল।

;

বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য



অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এক মহান দিন এটি। এই দিনে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। একই দিনে মহাজ্ঞানী বুদ্ধত্ব এবং বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এই তিথিকে বলা হয় বৈশাখী পূর্ণিমা, যা আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ভেসাক ডে হিসেবে পালন করা হয়। বৈশাখ মাসের এই তিথিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এ তিথির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে এই দিনে আড়াই হাজার বছর আগে মহামতি গৌতম বুদ্ধ ভারতবর্ষের তৎকালীন কপিলাবস্তু দেবদহ নগরের মধ্যবর্তী লুম্বিনী কাননে মাতা রানী মায়াদেবীর পিতৃগৃহে যাবার পথে শালবৃক্ষের নিচে জন্মগ্রহণ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে ৩৫ বছর বয়সে বোধিবৃক্ষমূলে কঠোর সাধনা বলে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে ৮০ বছর বয়সে একই দিনে ৪৫ বছর দুঃখ মুক্তির ধর্ম প্রচার করে কুশীনগরে যুগ্মশাল তরুণমূলে চিরনির্বাসিত হয়ে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন অর্থাৎ তিনি দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। পৃথিবীতে আর জন্মলাভ করবেন না। গৌতম বুদ্ধের পিতার নাম ছিল রাজা শুদ্ধধন ও গৃহী নাম ছিল সিদ্ধার্থ। ২৫২৭ বছর আগে ভারতবর্ষে যখন ধর্মহীনতা মিথ্যা দৃষ্টি সম্পন্ন বিশ্বাস্বে ধর্মে সমাজের শ্রেণি বৈষম্যের চরম দুরবস্থা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত, প্রাণী হত্যায় চরম তুষ্টি ,তখন শান্তি মৈত্রী অহিংস সাম্য ও মানবতার বার্তা নিয়ে মহামতি বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে।

গৌতম বুদ্ধ অহিংস ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছেন। এই জীবজগৎ অনিত্য দুঃখ অনাত্মাময় প্রাণমাত্রই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। অস্থায়ী বা অনিত্য কার্যতকারণের অধীন। তিনি জীবনের প্রগাঢ় খাটি চার আর্যসত্য আবিষ্কার করলেন। জগতে দুঃখ আছে, দুঃখের অবশ্যই কারণ আছে, দুঃখের নিবৃত্তি আছে, দুঃখ নিবৃত্তির উপায় আছে। দুঃখ নিবৃত্তির উপায় হলো নির্বান লাভ। এই নির্বান লাভের ৮টি মার্গ আছে। যেমন সম্যক বা সঠিক দৃষ্টি , সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি। এই পথ পরিক্রমায় শীল সমাধি প্রত্তোয় নির্বাণ লাভের একমাত্র উপায়। সব প্রাণী সুখী হোক, পৃথিবীর সবচেয়ে পরম, মহৎ বাণী তিনি প্রচার করেছেন। শুধু মানুষের নয়, সব প্রাণ ও প্রাণীর প্রতি, প্রেম, ভালোবাসা, অহিংসা, ক্ষমা, মৈত্রী, দয়া, সহনশীলতা, সহমোর্মিতা, সহানুভূতি, মমত্ববোধ, প্রীতি, সাম্য, সম্প্রীতির কথা তিনি বলেছেন।

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৫৪/১১৫ রেজুলেশন এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক ভেসাক ডে হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সেই থেকে এই দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ “ভেসাক ডে” হিসেবে পালন করে আসছে। বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র এই দিনকে বিভিন্ন নামে পালন করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, নেপালে বুদ্ধ পূর্ণিমা, লাওসে বিশাখ পূজা, ইন্দোনেশিয়া হারি ওয়াইসাক ডে, মালয়শিয়ায় ওয়েসাক ডে, মায়ানমারে ফুল ডে অব কাসন, সিঙ্গাপুরে হারি ভেসাক ডে নামে পালন করে থাকে আবার কেউ বুদ্ধ জয়ন্তী দিবস হিসেবেও পালন করে থাকে।

জাতিসংঘের মহাসচিব এস্তেনিও গুতেরেজ ভেসাক ডে উপলক্ষে বলেছেন, “On the day of Vesak, Let us celebrate Lord Buddha’s wisdom by taking action for others with compassion and solidarity and by renewing our commitment to build a peaceful world.”

ফিলিস্তিনে আজ চরমভাবে মানবতা বিপন্ন হচ্ছে। অশান্তিময় এই পৃথিবীতে বুদ্ধের মৈত্রী, সংহতি, সাম্য, মানবতা ও শান্তির বাণী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আজও প্রাসঙ্গিক এবং খুব প্রয়োজন। বিশ্ব আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। পরিবেশ দূষণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, জলাবদ্ধতা, বৃক্ষ নিধন, বন উজাড়, জীব বৈচিত্র্য হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তন এই সবুজ গ্রহের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গৌতম বুদ্ধই প্রথম বৃক্ষকে এক ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট জীবরূপে আখ্যায়িত করেছেন। বুদ্ধ ছিলেন বিশুদ্ধ পরিবেশবাদী দার্শনিক। পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তাই বুদ্ধের জন্ম বুদ্ধত্ব লাভ ও মহা পরিনির্বাণ বৃক্ষের পদমূলের বিশুদ্ধ পরিবেশ মন্ডিত পরিবেশে সংগঠিত হয়েছিল।

এই পবিত্র দিনে বৌদ্ধরা বিভিন্ন দেশে দেশে সব প্রাণীর সুখ শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করেন। অশান্ত পৃথিবীতে পরিবেশ সংরক্ষণে বুদ্ধের বাণী নীতি ও আদর্শ বিশ্ব মানবতার শিক্ষা, দর্শন, চিন্তা চেতনা ,ভাবনা সুন্দর, শান্ত, সাম্যময় পৃথিবী গড়ার বিকল্প নাই। সব প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক।

অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া
চিকিৎসক, লেখক, সংগঠক ও গবেষক

;