চেরনোবিলের কিছু নতুন বাসিন্দা



ভাষান্তর: তোফায়েল আহমেদ
ভাদিম মিনজুক তার কারখানায়/ছবি: বিবিসি

ভাদিম মিনজুক তার কারখানায়/ছবি: বিবিসি

  • Font increase
  • Font Decrease

চেরনোবিলে ১৯৮৬ সালের পারমাণবিক দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয়া বিষক্রিয়ার কারণে পালিয়ে যায় অনেক বাসিন্দা। ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে একগুচ্ছ ভুতের গ্রাম। কিন্তু এখন সংরক্ষিত এলাকার কিনারের দিকের ক্ষয়িষ্ণু বাড়িগুলোতে আবার কিছু নতুন বাসিন্দা বসবাস শুরু করেছেন।

এক উষ্ণ গ্রীষ্মের সন্ধ্যা, মেরিনা কোবলেডেকা তার দুই কিশোরী মেয়ের সাথে বাড়ির পেছনের উঠোনে খেলছেন। পারিবারিক কুকুর বলের সঙ্গে কুস্তি করে মুরগির বাচ্চাগুলোকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে, দেখে হাসছে ইরিনা ও ওলিনা। বাড়ির পেছনদিকের বেড়ার বাইরের দিকের সবকিছু নীরব এবং স্থির হয়ে আছে।

ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় স্টেসিচিনা গ্রামের অনেকগুলো বাড়ি, একটা দোকান এবং লাইব্রেরি খালি পড়ে আছে। শুধুমাত্র যুদ্ধে বিধ্বস্ত বন আবার তার পূর্বের রূপ ফিরে পাচ্ছে। লতানো গুল্মগুলো পরিত্যক্ত বাড়ির ভাঙা দেয়াল ভেদ করে বেড়ে উঠছে। এখানে তাদের কিছু প্রতিবেশীও রয়েছেন। কিন্তু প্রায় সবাই এখানে সত্তর এবং আশির দশকে এসে বসতি গেড়েছেন। সামাজিক অনুদান ও সুযোগ সুবিধার ঘাটতি সত্ত্বেও, চার বছর আগে মেরিনা ও তার দুই কিশোরী মেয়ে তাদের যা কিছু ছিল সব নিয়ে ইউক্রেনের কয়েকশত মাইল অতিক্রম করে চেরনোবিল সংরক্ষিত এলাকার ৩০ কিলোমিটার দূরে বসবাস করতে আসেন।

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল, চেরনোবিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিকার হয়। পাওয়ার সেন্টারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে, যা একটানা ১০ দিন তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়। মেঘ এসব রেডিওঅ্যাকটিভ কণাকে হাজার হাজার মাইল জুড়ে বিস্তৃত করে এবং পুরো ইউরোপ জুড়ে বিষাক্ত বৃষ্টি হতে থাকে। ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ, যারা চেরনোবিলে বসবাস করত সবাইকে তাৎক্ষণিক নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত রিঅ্যাক্টরের আশপাশে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয় যা পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাসমূহেও বর্ধিত হয়।

এর পরের কয়েকমাসে আরও ২ লাখ ৩৪ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে ফেলা হয়, যাদের প্রায় সবাইকে তড়িঘড়ি করে বাসস্থান ছাড়তে হয়েছিল। কিছু সংখ্যককে তাদের সবকিছু গোছাতে মাত্র কয়েকঘণ্টা সময় দেয়া হয়। অন্যদেরকে বলা হয়েছিল, তারা অল্প কিছুদিনের মধ্যে এ স্থান ছেড়ে চলে যেতে হবে এবং আর কখনও ফিরে আসতে পারবে না। এদের অনেকেই যারা প্রান্তিক চাষি ছিল, তাদেরকে অনেকগুলো পাকা টাওয়ার ব্লকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু এদের অনেকে কখনই চেরনোবিল ছেড়ে যায়নি।

আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত এলাকায় বসবাস করা অবৈধ। এসব নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ১৩০-১৫০ জন বাসিন্দা এখন পর্যন্ত এই এলাকায় বসবাস করছেন। এদের অনেকেই নারী যারা, তাদের ৭০-৮০ দশকে বসবাস করা পূর্বপুরুষদের জমিতে চাষাবাদ করছেন।


বাড়ির উঠোনে খেলছেন মেরিনা ও তার দুই মেয়ে

সংরক্ষিত এলাকার বাহিরে কিছু নতুন আগন্তুক এসেছেন। এদের একজন মেরিনা কোবলেডেকা। মেরিনার বাড়িটি মেরামত করা খুবই প্রয়োজনীয়। মেঝেগুলোতে পচন ধরেছে এবং ধাতব রেডিয়েটার গুলোতেও ফাটল দেখা যাচ্ছে। শীতকালে তাপমাত্রা -২০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে নেমে যাওয়া এসব এলাকায় পচন ধরা মেঝে কিংবা ফাটল পড়া রেডিয়েটরের উপস্থিতি একটি বড় সমস্যা।

তাদের মৌলিক কিছু রাষ্ট্রীয় অনুদান রয়েছে যেমন— গ্যাস, বিদ্যুৎ, মোবাইল সিগন্যাল ইত্যাদি। মোবাইল সিগনাল থাকার মানে হচ্ছে তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তাদের একটি মাত্র টয়লেট যা বাড়ির বাড়ির বাইরের দিকে। পানিও দূষিত। পানির জন্য তাদের একমাত্র অবলম্বন দূষিত নলকূপ যা পাইপের মাধ্যমে বাড়ির সাথে সংযুক্ত হয়েছে। দূষিত হওয়ার কারণে ব্যবহারের পূর্বে পানিকে আগে ফুটাতে হয়।

গ্রামে একটা ভালো বাড়ি থাকা মানে হচ্ছে ৩৫০০ ডলার ব্যয় করার সামর্থ্য থাকা। কিন্তু এমন সম্পত্তি খুবই কম। কাঠে নির্মিত এসব অধিকাংশ খালি বাড়িই বাড়ির মালিকেরা কয়েক শত ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে।

মেরিনা যখন এখানে আসেন, তখন এমন সস্তা বাড়ি ক্রয় করাও তার জন্য কষ্টকর ছিল। এর পরিবর্তে গভর্নিং কাউন্সিল তার পরিবারকে একটি বাড়িতে ভাগাভাগি করে থাকার এক অস্বাভাবিক প্রস্তাব দেয়। বাড়িতে থাকার বিনিময়ে তারা এক বৃদ্ধের সেবা শুশ্রূষা করবে, যিনি ডিমেনশিয়া নামক রোগের একদম শেষপর্যায়ে আছেন। দুই বছর পূর্বে ওই ব্যক্তি মারা যায় এবং মেরিনার পরিবার সেখানেই বসবাস করা শুরু করে।

উঠোনের বাইরে দাড়িয়ে ইরিনা এবং ওলিনা তাদের পরিবারের বাকিদের দেখাচ্ছে— কিছু মুরগি, খরগোশ, ছাগল এমনকি একজোড়া গিনিপিগও।তাদের স্কুল ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। স্কুলবিহীন দিনগুলোতে তাদের অধিকাংশ সময়ই বাগানে মাকে সাহায্য করা, সবজি ফলানো এবং তাদের পোষা প্রাণীগুলোকে দেখাশোনা করেই কাটায়। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস হচ্ছে ১৮৩ ডলারের রাষ্ট্রীয় অনুদান (৫২৩৫ ইউক্রেনিয়ান রিবনিয়া), নিজেদের খাদ্য সামগ্রী ফলানো এবং দুধ ও মাংসের জন্য পশু পালন করা তাদের বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয়।

বসবাসের জায়গা পাওয়া

মেরিনা এবং তার মেয়েরা পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের এক বিশাল শিল্পনগরী তোসকিভকা থেকে পালিয়ে আসেন। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ৪ বছরের এ সংঘাতে আনুমানিক প্রায় ১০০০০ মানুষ মারা যায় এবং বিশ লাখেরও অধিক মানুষ বাস্থচ্যুত হয়।

সংঘাত শুরু হয় ২০১৪ সালে, যখন রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজেদের ভূখণ্ডে যুক্ত করে। সশস্ত্র রুশভাষী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রাশিয়ার পক্ষভুক্ত হয়। যোদ্ধারা কয়লাশিল্পের কেন্দ্রস্থল ডনবাসে দোনস্ক ও লুহানস্ক শহরে দুটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিটমহল ঘোষণা করে। যেহেতু রাশিয়াপন্থি যোদ্ধারা একের পর এক গ্রাম দখলে নিয়ে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে শহর বিতাড়ন করছিল, মেরিনাদের বাড়ি তখন তীব্র শেলিংয়ের লক্ষবস্তু হয়।

প্রতিদিন সকালে কিছু সময় ছাড়া বোমাবর্ষণ অনবরত চলত। সাময়িক যুদ্ববিরতির সময় প্রত্যেকে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করত। এ সময়ে ইরিনা এবং ওলিনা স্কুলে যেত, তাদের মা মেরিনা বাজারে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দুপুরের আগেই যুদ্ধ শুরু হত। অধিকাংশ রাতই তাদের তীব্র গোলাবর্ষণের মধ্য কাটাতে হতো।

এমনি এক ফাঁকে ইরিনা এবং ওলিনা বাড়ি ফেরার পথে অপ্রত্যাশিত ভাবে তারা ক্রসফায়ারের মধ্যে পড়ে যায়। তারা এক দোকানির কাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়। দোকানি পরে তাদেরকে রাস্তা থেকে দূরে এক বাড়িতে নিয়ে রাখে। এ ঘটনার পরই মেরিনা তাদের বাড়ি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

ডনবাস অঞ্চলের এরকম দশটি পরিবার ছিল যারা একইরকম দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সংরক্ষিত অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করতে যায়। মেরিনার মতো তারাও পুরনো বন্ধু এবং প্রতিবেশীদের পরামর্শে এখানে আসে। এমনকি এক মহিলা জানান, ‘ইউক্রেনের মধ্য সবচেয়ে কম মূল্যে জীবনযাপন করা যায় এমন জায়গা’ লিখে তিনি গুগলে খোঁজ করেন। উত্তর আসে, ‘চেরনোবিলের কাছে’।

বিপর্যয়ের পর থেকে বিজ্ঞানীরা মাটি, গাছপালা এবং পশুপাখিদের ওপর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পরীক্ষা করছেন, এমনকি সংরক্ষিত এলাকার বাহিরেও। বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয়তা আর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নেই, বলছিলেন ভেলরি কাশপারভ, তিনি ইউক্রেনিয়ান ইনস্টিটিউট অব কালচারাল রেডিওলজির ডিরেক্টর। কিন্তু কিছু এলাকার মাটির দূষিত অবস্থা মানব স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হতে পারে। কাশপারভ এবং তার দল সংরক্ষিত এলাকার বাহিরের গরুর দুধে অতিরিক্ত পরিমাণ সিজিয়াম-১৩৭ এর উপস্থিতি পেয়েছেন। ঘাসের মাধ্যমে শোষিত সিজিয়াম কণা গবাদি পশুর মধ্য ছড়িয়েছে।

এর গ্রহণের মাত্রা বৃহৎ পরিমাণে হলে মানবকোষ সমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটা থাইরয়েড ক্যান্সারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কাশপারভ বলছিলেন এসব ঝুঁকি কিছু নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার দল এমন হটস্পট নির্ধারণে কাজ করছেন, যাতে সংরক্ষিত এলাকার বাহিরে যারা বসবাস করছেন তারা কী ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকিতে পড়তে পারেন তা নির্ধারণ করা যায়।

এক মানচিত্রে স্টাচিয়ান গ্রাম দেখাচ্ছিলেন কাশপারভ যেখানে মেরিনার পরিবার বসবাস করে। এই গ্রামেই নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর থেকে সিজিয়াম-১৩৭ ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলছিলেন উৎপাদিত শাকসবজি, ছাগলের দুধে এসবের ঝুঁকি খুবই কম। কিন্তু এই এলাকায় বন্য খাদ্য সামগ্রী যেমন— মাশরুম অথবা বন্য ব্যারিজ এসবের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি নির্ণয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।

মেরিনা বলেন, তেজস্ক্রিয়তার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তাকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, তার পরিবার এসবের থেকেও ভয়াবহ কিছু থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে, আর তা হল যুদ্ধ। তেজস্ক্রিয়তা হয়ত আমাদের ধীরে মেরে ফেলতে পারে, কিন্তু এখানে গুলি অথবা বোমা মেরে মারতে পারবে না।

এক উদ্যোক্তা

রাজধানী কিয়েভ থেকে গাড়িতে করে মাত্র দুই ঘণ্টারও কম রাস্তা। সংরক্ষিত এলাকা বরাবর এই ভুতুড়ে নগরে শুধু কিছু পরিবারই সুযোগের সন্ধানে আসেনি, আছেন কিছু উদ্যোক্তাও।

প্রতিদিন ভাদিম মিনজুক তার পালিত কুকুরকে নিয়ে সংরক্ষিত এলাকার শুরু নির্দেশকারী উঁচু কাটাতারের বেড়া বরবার হাটেন। পাখির কিচিরমিচির ও বনের নিস্তব্ধতা উপভোগের জন্য এটি তার প্রিয় একটি জায়গা।

এটা ফিনল্যান্ডের উত্তরে কিংবা আলাস্কাতে বসবাস করার মতো, বলছিলেন ভাদিম। এই এলাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব পুরো ইউক্রেনের মধ্যে সর্বনিম্ন, প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র দুই জন।

ভাদিম মিনজুক তার কারখানায়

পূর্ব ইউক্রেনের হরলিভকাতে তার আগের বাসস্থান, যেখানে প্রতি বছর মিলিয়ন ডলার ব্যবসা করা যেত। কিন্তু শহর যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হল, আর্টিলারির আনাগেনা বাড়ছিল, তখন তার এককালের বর্ধিষ্ণু কলকারখানা ও ওয়্যারহাউজগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ভাদিম এখনও স্মরণ করেন একদিনের ঘটনা। বাড়ির পেছনের দরজার দিকে তিনি দেখেন বিদ্রোহী সেনারা বাগানের বেড়ার ডানদিকে ব্যারিকেড তৈরি করছে। মাঝেমধ্যে সৈন্যরা ১০০ মিটারেরও কাছাকাছি চলে যাচ্ছিল।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তার পরিবারকে শহরের বিভিন্ন সেনা চেকপোস্টে পরিচয়পত্র দেখাতে হয়েছে। তারা রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছে। এমনকি তাদের সামনে থেকেই বিদ্রোহীরা এক ব্যক্তিকে কার থেকে তুলে নিয়ে যায়, তারপর তাদের সামনেই হত্যা করে।

প্রথমে ভাদিম তাদের ছেলেমেয়েদের নিরাপদে সরিয়ে রাখে। তারপর তারাও একদিন এই অঞ্চল ত্যাগ করে। হরলিভকাতে যা কিছু ছিল, সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যায় তারা। প্রথম কয়েক মাস সঞ্চয় থেকে খরচ করেছেন। ভাদিম পুরো ইউক্রেন চষে বেড়িয়েছেন যাতে পরিবারকে নিয়ে নতুন একটা জীবন শুরু করা যায়

এক আত্মীয় শুনেছিলেন চেরনোবিলে কিছু সম্পত্তি সস্তায় বিক্রি করা হবে। তিনি সরেজমিন দেখতে সেখানে যান, গিয়ে ডিডাককি নামক এক গ্রামে এক পরিত্যক্ত শস্যাগার দেখতে পান। সংরক্ষিত অঞ্চলের ঠিক ডানপাশে এবং রাজধানী কিয়েভ থেকে মাত্র ১১৫ কিলোমিটার দূরত্ব। সাথে সম্পত্তির মূল্যও সস্তা ছিল। সুতরাং এটা একটা বাস্তবসম্মত ব্যবসার সুযোগ ছিল। স্থানীয়রা এর লোহা ও কলকব্জা নিয়ে যাওয়ায় এর ছাদটা ফুটো হয়ে যাচ্ছিল। আমি মালিকের সাথে দেখা করে একটি চুক্তি করি।

১৪০০ ডলারে গুদাম ও আরও তিনটি বাড়ি মাত্র ২৪০ ডলারে কিনে ভাদিম সেগুলোকে বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং ধাতু গলানোর ব্যবসা শুরু করেন। আমার কৌশল ছিল বর্জ্য থেকে তৈরি পণ্য দিয়ে ব্যবসা শুরু করা, বলছিলেন ভাদিম। প্রথম বছর সবচেয়ে কঠিন ছিল, কিন্তু গত দুই বছর আমার ব্যবসা ভালো হয়েছে।

এমনকি ভাদিম ডনবাসের প্রাক্তন সাত কর্মীকে আবার নিয়োগ করেন এবং তার একটি বাড়িকে হোস্টেলে রূপান্তর করে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন। আমি আমার জীবিকা নির্বাহ করি এবং কর্মীরা যেন ভালো সঞ্চয় করতে পারে এজন্য তাদেরও সহযোগিতা করি। আমি এই গ্রামের সর্বোচ্চ করাদাতা। পরিশেষে আমি ইউক্রেনীয়, এবং আমার দেশকে সহায়তা করতে চাই।

ভাদিম বলেন, মাঝেমধ্যে আমি তেজস্ক্রিয়তার কথাও চিন্তা করি। এমনকি তিনি তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপের জন্য হাত দিয়ে নড়াচড়া করা যায় এমন গিগার কাউন্টারও ক্রয় করেন। কিন্তু তিনি ভীত ছিলেন না। তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে আছে। সর্বোপরি আপনি যুদ্ধে যে ভয়াবহতা দেখেছেন তার তুলনায় তেজস্ক্রিয়তা কিছুই না।

তিনি এখানে জীবনকে উপভোগ করছেন। এটা শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতিই না, বিশেষ একধরনের শান্তিও বটে। মেরিনা এবং ভাদিম উভয়ের পরিবারই বলছিলেন কিভাবে এই শান্তপ্রকৃতি এবং পরিবেশে দীর্ঘসময় ধরে হাঁটাকে তারা ভালবাসেন। জীবন হয়ত খুবই সাধারণ এখানে কিন্ত কোনো পরিবারই এখান থেকে আর বড় শহরে যেতে চায় না। এমনকি যদিও এটার অর্থ এই হয় যে সেখানে প্রচুর বন্ধু ও সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাবে। আমি তেজস্ক্রিয়তাকে ভয় পাই না বলছিলেন মেরিনা। আমার বাচ্চাদের মাথার ওপর দিয়ে আর গোলা উড়ছেনা, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। এই শান্ত পরিবেশে আমরা দুশ্চিন্তা ছাড়াই ঘুমোতে যাই এবং কোথাও আমাদের আর লুকিয়ে থাকতে হয় না। এভাবেই ইতি টানছিলেন মেরিনা।

ভাদিম বলেছিলেন, তার স্ত্রী ওলিনা কখনও কখনও অবরুদ্ধ অঞ্চলটির সাথে তাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত আদি শহর হরলিভাকার তুলনা করেন। তবে এখানে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে— এখানে সংরক্ষিত অঞ্চলের প্রান্তে তিনি বিশ্বাস করেন, তাদের পরিবারের একটি ভালো ভবিষ্যৎ রয়েছে। আমার মনে হয়েছিল— আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি, বলছিলেন ভাদিম।

অনুবাদক:তোফায়েল আহমেদ (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র: বিবিস

   

'রিমাল'-এর ধ্বংসযজ্ঞ সয়ে কেমন আছে সুন্দরবন!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
সুন্দরবনে মৃত হরিণ / ছবি: বার্তা২৪

সুন্দরবনে মৃত হরিণ / ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে ঘণ্টাপ্রতি ৮০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি বেগে ধেয়ে আসছিল ঘূর্ণিঝড় রিমাল। সাগরে ঢেউয়ের উত্তাল রূপ এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী বাতাসের ধাক্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েই উপকূলীয় এলাকার মানুষজন। শনিবার (২৫ মে) থেকেই পাওয়া পূর্বাভাসে মানুষ বেশ বুঝতে পারছিল, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বয়ে আনবে 'রিমাল'।

সৌভাগ্যবশত, বাংলাদেশকে বেষ্টিত করেছে আমাদের সুন্দরবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নোনাপানি উপকূলের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন অতিক্রম করে যাওয়ার সময় রিমালের বেগ অনেকটাই শিথিল হয়ে আসে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপের দণ্ড নিজ মাথায় পেতে নিয়েছে সুন্দরবন। এতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বনের অভ্যন্তরীণ চিত্র। পানিরে আধিক্যে ছেয়ে রয়েছে পুরো বন। ভাঙা-আধভাঙা গাছ লুটিয়ে পড়ে আছে। মিঠাপানির পুকুরে সমুদ্রের নোনাজল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন অফিসের অধিকাংশ টহল ফাঁড়ি ও বোট এবং সেইসঙ্গে যাতায়োতের পোল। ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে রয়েছে চালাঘরের টিন, দরজা, জানালা, সোলার প্যানেলসহ অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ।

এমনকী রিমালের ক্ষতির মূল্য দিতে হয়েছে বনে বসবাসকারী প্রাণীদেরও। ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল তাণ্ডবে কেবল মানুষ নয়, প্রাণ হারিয়েছে অনেক অবলা প্রাণী।সর্বশেষে তথ্যমতে, সুন্দরবন থেকে ২৮টি মৃত হরিণ এবং ১ টি বন্য শুকরের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 

রবি-সোমবার (২৬ ও ২৭মে) রিমাল-এর তাণ্ডব চলে টানা ২০ ঘণ্টা। ঝড় শান্ত হওয়ার পর বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ পশুদের আহত এবং নিহতের এই সর্বশেষ খবর মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছে। বনে বসবাসকারী অন্যান্য বহু পশু-পাখিরও মৃত্যু হয়েছে এই দুর্যোগে। এখনো অনেক আহত প্রাণী উদ্ধার কার্যে ব্যস্ত রয়েছেন বনরক্ষা কর্মীরা। এ পর্যন্ত ১৭ টি আহত হরিণ উদ্ধার করে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে বনরক্ষীরা। এরপর তাদের নিরাপদে বনে ফেরত পৌঁছে দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও পশু আহত হয়েছে কিনা খোঁজ করা অব্যাহত রয়েছে। 

ঝড়ে অনবরত ভারী বর্ষণে তলিয়ে যায় সুন্দরবনের ভূমি। তাছাড়া, ঝড়ো হাওয়ার দাপটে উপড়ে গেছে বহু গাছ। প্রকৃতির এরকম পরিবেশের কারণেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অবলা প্রাণীগুলো!

;

উপকূলে ঝড়ের বিপদ সংকেত, ঢাকায় চিত্রকরের নীল মেঘ!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

উপকূলে চলছে ৩ নম্বর বিপদ সংকেত। দমকা বাতাসের তোড়ে সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ। আকাশে হৈ হৈ রব তুলে দখল করেছে কালো মেঘ। ছড়িয়ে দিচ্ছে গুড়ুম গুড়ুম ডাক! কয়েক ঘণ্টা বাদেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আসার সম্ভাবনা। তবে কথায় বলে, বাজ পড়ার আগে আকাশ শান্ত হয়ে যায়!

ঠিক যেন প্রকৃতি তার সেই রূপটিই মেলে ধরলো। উপকূল অঞ্চলগুলোতে মানুষজনকে সতর্ক করা হচ্ছে। ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ অথচ রাজধানীর আকাশ স্নিগ্ধ-কোমল!

শুধু কী তাই! ছবি আঁকার পর শিল্পী তার রঙ মাখা তুলিগুলো এলোমেলো করে ফেলে রাখে যেমন, সেই ছবি যেন আকাশে সেঁটে দিয়েছে কেউ। লাল, গোলাপি, কমলা, নীল, বেগুনি রঙের মিশ্রণে অপূর্ব সুন্দর এক এলোমেলো চিত্র উঁকি দিচ্ছে আকাশে। তার মাঝে ধূসর মেঘ ঘোলা জলে মাছের মতো দুরন্তপনায় ছুটে যাচ্ছে বহুদূর।

শনিবার (২৫ মে) গোধুলি লগ্নে ঢাকার আকাশ ঠিক এভাবেই রঙিন হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ রংধনুর ছোঁয়া ছাড়াই রঙিন পটচিত্রের রূপ মেলে ধরে গগন, যেন আকাশ নয়, কোনো চঞ্চলা কিশোরীর উৎফুল্ল মন! প্রকৃতি এখন স্তব্ধ হয়ে আছে। গাছের একটি পাতাও যেন নড়ছে না। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরের অথৈ উম্মাদনা। স্থানীয়দের ভয়, জলোচ্ছ্বাসে যেন তাদের জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এমনি করেই প্রকৃতির বহুরূপী লীলাখেলা চলতে থাকে অবলীলায়।

;

বিখ্যাত মিমের ভাইরাল কুকুর কাবোসু আর বেঁচে নেই



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ভাইরাল কুকুর কাবোসু / ছবি: সংগৃহীত

ভাইরাল কুকুর কাবোসু / ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন মানুষ জুড়তে শুরু করলো ইন্টারনেটে নতুন অনেক নতুন উদ্ভাবনার দেখা মিললো। এমন এক ব্যাপার হলো মিম। বর্তমান সময়ে সেন্স অব হিউমারের (রসবোধ) এক অন্যতম মাধ্যম এই মিম। বিশেষত কোনো ছবি ব্যবহার করে তাতে হাস্যরসাত্মক কিছু জুড়ে দিয়ে এইসব মিমগুলো বানানো হয়।

২০১৩ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনই একটি ছবি ভাইরাল হয়। পরবর্তী সময়ে যা একটি বিখ্যাত ‘মিম ম্যাটেরিয়াল’-এ পরিণত হয়। কমলা-সোনালী এবং সাদা রঙের সম্বনয়ে বাহারি লোমের এই কুকুরটির নাম কাবোসু। কাবোসুর বয়স ১৯ বছর।

দুর্ভাগ্যবশত কুকুরটি আর বেঁচে নেই। ২৪ মে (শুক্রবার) দীর্ঘদিন ধরে রোগাক্রান্ত থাকার পর অবশেষে দেহ ত্যাগ করে কুকুরটি। কুকুরটির মালিক আতসুকো সাতো (৬২) জাপানের চিবা প্রিফেকচারের সাকুরা শহরের একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক।শুক্রবার তার প্রকাশিত ব্লগে একটি দুঃখের কবিতা আবৃত্তির পর তিনি এই খবরটি নিশ্চিত করেছেন।

ভাইরাল কুকুর কাবোসু / ছবি: সংগৃহীত

১৯ বছর বয়সেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ২৬ মে রবিবার কাবোসুর স্মরণে একটি স্মরণ সভার আয়োজনও করা হবে। কুকুরটির মারা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকলে দুঃখ প্রকাশ করছে।

২০২২ সালে ক্রোানক লিম্ফোমা লিউকুমিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। সেই থেকেই কাবোসুর চিকিৎসা চলছিল। তবে দুঃখের বিষয়, সে আর সুস্থ হয়ে ফিরতে পারলো না।

কাবোসুর ত্যাড়া চোখে দৃষ্টির একটি ছবি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। এটি ইন্টারনেটে সবচেয়ে আইকনিক এবং স্বীকৃত ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমনকি ক্রিপ্টো কারেন্সির দুনিয়াতেও তার নাম ছিল।

;

বুদ্ধ পূর্ণিমার তাৎপর্য



অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব বুদ্ধ পূর্ণিমা। বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এক মহান দিন এটি। এই দিনে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। একই দিনে মহাজ্ঞানী বুদ্ধত্ব এবং বুদ্ধ মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এই তিথিকে বলা হয় বৈশাখী পূর্ণিমা, যা আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ভেসাক ডে হিসেবে পালন করা হয়। বৈশাখ মাসের এই তিথিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধের জীবনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এ তিথির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে এই দিনে আড়াই হাজার বছর আগে মহামতি গৌতম বুদ্ধ ভারতবর্ষের তৎকালীন কপিলাবস্তু দেবদহ নগরের মধ্যবর্তী লুম্বিনী কাননে মাতা রানী মায়াদেবীর পিতৃগৃহে যাবার পথে শালবৃক্ষের নিচে জন্মগ্রহণ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৮ অব্দে ৩৫ বছর বয়সে বোধিবৃক্ষমূলে কঠোর সাধনা বলে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ অব্দে ৮০ বছর বয়সে একই দিনে ৪৫ বছর দুঃখ মুক্তির ধর্ম প্রচার করে কুশীনগরে যুগ্মশাল তরুণমূলে চিরনির্বাসিত হয়ে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন অর্থাৎ তিনি দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করেছেন। পৃথিবীতে আর জন্মলাভ করবেন না। গৌতম বুদ্ধের পিতার নাম ছিল রাজা শুদ্ধধন ও গৃহী নাম ছিল সিদ্ধার্থ। ২৫২৭ বছর আগে ভারতবর্ষে যখন ধর্মহীনতা মিথ্যা দৃষ্টি সম্পন্ন বিশ্বাস্বে ধর্মে সমাজের শ্রেণি বৈষম্যের চরম দুরবস্থা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত, প্রাণী হত্যায় চরম তুষ্টি ,তখন শান্তি মৈত্রী অহিংস সাম্য ও মানবতার বার্তা নিয়ে মহামতি বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটে।

গৌতম বুদ্ধ অহিংস ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছেন। এই জীবজগৎ অনিত্য দুঃখ অনাত্মাময় প্রাণমাত্রই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। অস্থায়ী বা অনিত্য কার্যতকারণের অধীন। তিনি জীবনের প্রগাঢ় খাটি চার আর্যসত্য আবিষ্কার করলেন। জগতে দুঃখ আছে, দুঃখের অবশ্যই কারণ আছে, দুঃখের নিবৃত্তি আছে, দুঃখ নিবৃত্তির উপায় আছে। দুঃখ নিবৃত্তির উপায় হলো নির্বান লাভ। এই নির্বান লাভের ৮টি মার্গ আছে। যেমন সম্যক বা সঠিক দৃষ্টি , সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি। এই পথ পরিক্রমায় শীল সমাধি প্রত্তোয় নির্বাণ লাভের একমাত্র উপায়। সব প্রাণী সুখী হোক, পৃথিবীর সবচেয়ে পরম, মহৎ বাণী তিনি প্রচার করেছেন। শুধু মানুষের নয়, সব প্রাণ ও প্রাণীর প্রতি, প্রেম, ভালোবাসা, অহিংসা, ক্ষমা, মৈত্রী, দয়া, সহনশীলতা, সহমোর্মিতা, সহানুভূতি, মমত্ববোধ, প্রীতি, সাম্য, সম্প্রীতির কথা তিনি বলেছেন।

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৫৪/১১৫ রেজুলেশন এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক ভেসাক ডে হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সেই থেকে এই দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ “ভেসাক ডে” হিসেবে পালন করে আসছে। বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র এই দিনকে বিভিন্ন নামে পালন করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, নেপালে বুদ্ধ পূর্ণিমা, লাওসে বিশাখ পূজা, ইন্দোনেশিয়া হারি ওয়াইসাক ডে, মালয়শিয়ায় ওয়েসাক ডে, মায়ানমারে ফুল ডে অব কাসন, সিঙ্গাপুরে হারি ভেসাক ডে নামে পালন করে থাকে আবার কেউ বুদ্ধ জয়ন্তী দিবস হিসেবেও পালন করে থাকে।

জাতিসংঘের মহাসচিব এস্তেনিও গুতেরেজ ভেসাক ডে উপলক্ষে বলেছেন, “On the day of Vesak, Let us celebrate Lord Buddha’s wisdom by taking action for others with compassion and solidarity and by renewing our commitment to build a peaceful world.”

ফিলিস্তিনে আজ চরমভাবে মানবতা বিপন্ন হচ্ছে। অশান্তিময় এই পৃথিবীতে বুদ্ধের মৈত্রী, সংহতি, সাম্য, মানবতা ও শান্তির বাণী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আজও প্রাসঙ্গিক এবং খুব প্রয়োজন। বিশ্ব আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। পরিবেশ দূষণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, জলাবদ্ধতা, বৃক্ষ নিধন, বন উজাড়, জীব বৈচিত্র্য হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তন এই সবুজ গ্রহের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গৌতম বুদ্ধই প্রথম বৃক্ষকে এক ইন্দ্রিয় বিশিষ্ট জীবরূপে আখ্যায়িত করেছেন। বুদ্ধ ছিলেন বিশুদ্ধ পরিবেশবাদী দার্শনিক। পরিবেশ রক্ষা ও সংরক্ষণে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তাই বুদ্ধের জন্ম বুদ্ধত্ব লাভ ও মহা পরিনির্বাণ বৃক্ষের পদমূলের বিশুদ্ধ পরিবেশ মন্ডিত পরিবেশে সংগঠিত হয়েছিল।

এই পবিত্র দিনে বৌদ্ধরা বিভিন্ন দেশে দেশে সব প্রাণীর সুখ শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করেন। অশান্ত পৃথিবীতে পরিবেশ সংরক্ষণে বুদ্ধের বাণী নীতি ও আদর্শ বিশ্ব মানবতার শিক্ষা, দর্শন, চিন্তা চেতনা ,ভাবনা সুন্দর, শান্ত, সাম্যময় পৃথিবী গড়ার বিকল্প নাই। সব প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক।

অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া
চিকিৎসক, লেখক, সংগঠক ও গবেষক

;