এদেশে বিপন্ন রাম কুত্তা



অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
মালয়েশিয়ার তাইপেং চিড়িয়াখানায় বিশ্রামরত রাম কুত্তার দল। ছবি: লেখক

মালয়েশিয়ার তাইপেং চিড়িয়াখানায় বিশ্রামরত রাম কুত্তার দল। ছবি: লেখক

  • Font increase
  • Font Decrease

কোনো এককালে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের মিশ্র চিরসবুজ বনে অবাধে ঘুরে বেড়াত প্রাণীগুলো। দল বেঁধে ওরা শিকার করত হরিণ, বুনো শুয়োর, বন ছাগল, এমনকি গরু-মহিষও। ওদের কবল থেকে বাঘ-চিতাবাঘও রক্ষা পেত না বলে প্রচলিত আছে। অন্তত ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এভাবেই চলছিল।

কিন্তু এরপরই ওদের উপর নেমে আসে বিপর্যয়। কৃষি জমি ও মানুষের বাসস্থানের জন্য বন কেটে জমি উদ্ধার, কাঠের জন্য বন উজাড় এবং প্রাণীগুলো ও ওদের খাদ্য অর্থাৎ তৃণভোজী প্রাণীদের অবাধ শিকারের কারণে দিনে দিনে সংখ্যা কমে এক সময়ের সচরাচর দৃশ্যমান (Common) প্রাণীগুলো বর্তমানে একেবারেই বিরল (Rare) ও বিপন্ন (Endangered) হয়ে পড়েছে।

মালয়েশিয়ার তাইপেং চিড়িয়াখানায় একটি রাম কুত্তা। ছবি: লেখক

যদিও ২০০০ সাল পর্যন্ত ওদেরকে হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যেও দেখা যেত বলে শুনেছি, কিন্তু বর্তমানে ওদের আবাসস্থল মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য জেলাগুলোর অল্পকিছু এলাকা; রাঙামাটির কাসালং ও রাইখং সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পাবলাখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, বান্দরবানের সাঙ্গু বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবে, কয়েক বছর আগে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ওদের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। সেকারণে আমার ধারণা ওরা এখনও রোম-কালেঙ্গা এবং সিলেটের আরও কিছু বনেও থাকতে পারে।

মেট্রো টরেন্ট চিড়িয়াখানায় একটি রাম কুত্তা। ছবি: লেখক

আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে পাল্প উড বিভাগ, কাপ্তাইয়ে চাকুরিরত খালাত ভাই ফরেস্টার শফিকুর রহমানের ওখানে কাছে বেড়াতে গিয়ে ওর কাছেই ওদের সম্পর্কে প্রথম শুনেছিলাম। এরপর ১৯৯৮ সালে কানাডার গুয়েল্প বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এস্টেট অ্যানিম্যাল হসপিটালে পোষা প্রাণীর চিকিৎসায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেয়ার সময় মেট্টো টরন্টো চিড়িয়াখানায় গিয়ে প্রথম ওদের দেখি। ওখানে কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে ওদের রাখা হয়েছিল।

প্রাণীগুলোর চেহারা, আচরণ ও চলাফেরা শফিক ভাইয়ের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। টরন্টো চিড়িয়াখানায় ওদের দেখে আমি এতটাই বিমোহিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, মনে হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন অরণ্যেই যেন ওদের দেখছি। কতক্ষণ যে সেই কৃত্রিম বনে হারিয়ে গিয়েছিলাম জানি না, কানাডা প্রবাসী সুমন সাইয়েদ ভাইয়ের ধাক্কায় বাস্তবে ফিরে এলাম। এরপর পটাপট কয়েকটা ছবি তুললাম। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে মালয়েশিয়ার প্রথম চিড়িয়াখানা তাইপেং জু ও নাইট সাফারিতে দিনে-রাতে ওদেরকে আবারও দেখি।

মালয়েশিয়ার তাইপেং চিড়িয়াখানায় কৃত্রিমভাবে বানানো গুহার সামনে একটি রাম কুত্তা। ছবি: লেখক

কয়েক বছর আগে সিলেটের টিলাগড় ইকো পার্কে গিয়ে শফিক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে তিনি বললেন, এখনও ওরা টিকে আছে। তিনি ওদেরকে স্বচক্ষে দেখা ছাড়াও বেশ ক’টি অঞ্চলে ওদের পদচিহ্নও দেখেছেন। বন্যপ্রাণী গবেষক ‘ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স’-এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার সিজার রহমানের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বেশ ক’বছর আগে তারা বান্দনবানের সাঙ্গু-মাতামুহুরী উপত্যকায় ওদের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন। সাঙ্গু-মাতামুহুরী উপত্যকার স্থানীয় ম্রোদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সেখানকার বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাস সংরক্ষণে কাজ করতে গিয়ে ম্রোদের ভাষায় ‘শুই’ নামে পরিচিত প্রাণীগুলোর সঙ্গে অন্তত দু’বার তার দেখা হয়েছে। উপত্যকার গহীনে ওদের পায়ের চিহ্নও দেখছেন তিনি। সর্বোপরি ‘ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স’-এর কর্মীদের পাতা ক্যামেরা ফাঁদে বেশ ক’বার প্রাণীগুলোর চলাফেরার চিত্রও ধরা পড়েছে।

কানাডার মেট্রো টরেন্ট চিড়িয়াখানায় বিশেষ ভঙ্গিমায় রাম কুত্তা। ছবি: লেখক

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের পাখি-প্রাণী পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ২০১৯ সালে ওখানকার গাইডদের কাছে আজব এক প্রাণীর কথা শুনি। প্রাণীগুলোকে ওরা চোখে না দেখলেও সেগুলোর দ্বারা গত্যাকৃত গরু ও শুকরের দেহাবশেষ তারা দেখেছেন এবং আমাকেও দেখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে একটি গবেষক দলের পাতা ক্যামেরা ফাঁদে প্রাণীগুলোর চলাফেরার চিত্রও ধরা পড়ে এবং প্রাণীগুলোর পরিচয় জানা যায়।

যাহোক, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটের এই বিরল ও বিপন্ন শিকারি প্রাণীগুলোর নাম রাম কুত্তা। লাল কুত্তা, বন কুত্তা বা ডোল নামেও পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ওরা জংলি কুকুর, চ্যু, সোনহা, সোন বা ডোল নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম এশিয়াটিক ওয়াইল্ড ডগ, রেড ডগ বা ডোল (Asiatic Wild Dog, Red Dog or Dhole)| ক্যানিডি (Canidae) গোত্রভুক্ত প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Cuon alpinus (কুয়ন অ্যালপিনাস) অর্থাৎ পাহাড়ি কুকুর। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান, নেপাল, চীন ও রাশিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশেই ওদের দেখা মেলে। আগেই বলেছি, একসময় এদেশে ওদেরকে সচরাচর দেখা গেলেও বর্তমানে একেবারেই বিরল ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

বান্দরবানের সাঙ্গুতে উপজাতীয়দের হাতে মৃত রাম কুত্তা। ছবি: ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স

রাম কুত্তা শিয়াল, কুকুর ও নেকড়ের জাতভাই। তবে চেহারায় শিয়ালের সঙ্গেই মিল বেশি। আকারে নেকড়ে ও শিয়ালের মাঝামাঝি। নাগের আগা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত লম্বায় ৪৫ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার; লেজ ২০ থেকে ২৭ সেন্টিমিটার। ওজন ১০ থোকে ২০ কেজি। পা খাটো, লেজ ঝোঁপালো ও নাকের উপরের অংশ খানিকটা উঁচু। মাথা ও দেহের উপরের অংশের লোম বাদামি-লাল। ঋতুভেদে রঙ হালকা থেকে গাঢ় হতে পারে। কানের ভেতরটা, মুখের নিচ, গলা ও দেহের নিচের অংশ সাদা। ঝোঁপালো লেজের আগা কালো।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রাম কুত্তার দ্বারা মৃত ও ভক্ষণকৃত বুনো শুকরের হাড়সহ দেহাবশেষ। ছবি: লেখক

রাম কুত্তা সামাজিক প্রাণী। দলবদ্ধভাবে থাকে; দিনের বেলা শিকার করে। দলে ২ থেকে ৩০টি পর্যন্ত কুকুর থাকতে পারে। ওরা সচরাচর মাঝারি আকারের প্রাণী, যেমন- হরিণ, শূকর, ছাগল ইত্যাদিকে আক্রমণ করে। প্রয়োজনে বনগরু বা মহিষের মতো বড় পশুকেও আক্রমণ করতে পারে। বন কুকুরের দল কোনো প্রাণীকে সামনে ও পিছনে উভয় দিক থেকেই আক্রমণ করে ও তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তাড়াতে তাড়াতে ক্লান্ত করে ফেলে। ওরা যে প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু হিসাব ঠিক করে তাকে না মারা পর্যন্ত ছাড়ে না। তাড়ানো অবস্থাতেই জীবিত প্রাণীটিকে খাবলে খেতে থাকে। আর এভাবে ১০ থেকে ১৫টি কুকুর মিলে অল্প সময়ের মধ্যেই যে কোন প্রাণীকে সাবাড় করে ফেলতে পারে। খাদ্য স্বল্পতার সময় ফল ও সরীসৃপও খায়। কুকুরের মতো ঘেঁউ ঘেঁউ করে না। বরং শিস দেয়ার মতো শব্দ করে ডাকে।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রাম কুত্তা কর্তৃক মৃত গরুর দেহাবশেষ। ছবি: লেখক

ওরা সচরাচর ভালুক, চিতাবাঘ বা বাঘকে এড়িয়ে চলে; তবে আক্রান্ত হলে তাদেরও রেহাই নেই। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ভারতের জীবজন্তু নামক পুস্তকে লেখক শ্রীরাম শর্মা রাম কুত্তা কীভাবে বাঘকে আক্রমণ সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করেছেন যা সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরছি।

আগেই বলেছি ওরা বাঘকে বেশ সমীহ করে, আর বাঘও ওদেরকে এড়িয়েই চলে। কিন্তু ঘটনাচক্রে যদি ওরা কখনো বাঘের মারা শিকারের কাছে পৌঁছে যায়, আর বাঘ থাবা মেরে যদি দু’একটা কুকুরকে মেরে ফেলে তখন কিন্তু বাঘ মামার আর রক্ষা নেই। তবে তখনই ওরা বাঘকে আক্রমণ করে না। কারণ ওরা জানে বাঘের একেকটা থাবায় একেকটা কুকুরের তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে, এমন কি মারাও যেতে পারে। কাজেই ওরা বাঘকে আক্রমণ না করে খানিকটা দূর থেকে চারিদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে এবং বিরক্ত করতে থাকে; শান্তিতে থাকতে দেয় না। বাঘ যখন তার শিকার বা মড়ি খেতে বসে তখন বাঘের পিছন দিকে ওরা কামড়ে দেয়। বাঘ যখন রেগে গিয়ে ওখান থেকে উঠে হাঁটা শুরু করে, তখন ওরাও নিরাপদ দূরত্বে থেকে চারদিক দিয়ে ঘিরে বাঘকে অনুসরণ করতে থাকে। বাঘ যখন ক্ষেপে গিয়ে জোড়ে হাঁটতে থাকে তখন রাম কুত্তারাও বাঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোড়ে হাঁটা শুরু করে। বাঘ যখন পিপাসা মেটাতে পানিতে নামে, তখন ওরা বাঘের লেজ ও পিছন দিকে কামড়ে দেয়। বাঘ রেগে গিয়ে পিছন দিকে লাফ দিলে ওরা নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। আবার যখন বাঘ পানি পান করতে যায়, তখন ওরা আবারও বাঘকে জ্বালাতে শুরু করে। কোনোভাবেই বাঘকে পানি পান করতে দেয় না। তবে বাঘকে পানি পান না করতে দিলেও নিজেরা পালাক্রমে পানি পান করে আসে।

যাক, এবার কিন্তু বাঘ ভয় পেয়ে যায় এবং পানি ছেড়ে দূরে গিয়ে একটু আরাম করার জন্য বসে পড়ে। তবে কুকুরগুলো কোনোভাবেই বাঘকে আরামে থাকতে দেয় না। আরাম করতে করতে বাঘ যখন খানিকটা ঝিমুতে শুরু করে, তখন কুকুরগুলো বাঘের মুখে থাবা দেয়। কয়েকটিতে মিলে বাঘের লেজ টানাটানি করতে থাকে। এতে বাঘ খুব অপমান বোধ করে। আর তাই রাগে-দুঃখে বাঘ দৌড়–তে শুরু করে। দৌড়–তে দৌড়–তে বাঘের পায়ের নিচের চর্বি গলে যায় ও বাঘ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় ও ক্লান্তিতে বাঘ যখন প্রায় আধমরা হয়ে যায়, তখনই যমদূতের মতো কুকুরগুলো বাঘের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও দেহের বিভিন্ন স্থানে কামড়াতে থাকে। ধস্তাধস্তিতে দু’একটা কুকুর মারা গেলেও নাছোড়বান্দা কুকুরগুলো রনে ভঙ্গ দেয় না। বরং ওরা আরও উদ্যমে বাঘের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও শেষ পর্যন্ত বাঘকে হত্যা করে ছাড়ে।

যাক, এবার রাম কুত্তার প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি সম্পর্কে জানা যাক। ওরা মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বা পাহাড়ের গুহায় বাস করে। সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ওদের প্রজননকাল। স্ত্রী ৬০ থেকে ৬৫ দিন গর্ভধারণের পর মাটির গর্ত বা পাহাড়ের গুহায় ৪ থেকে ৬টি বাচ্চা প্রসব করে। শুধু মা-বাবাই যে বাচ্চা লালনপালন করে তা নয়, বরং একাজে দলের অন্যান্য সদস্যরাও সাহায্য করে। প্রায় এক বছর বয়সে বাচ্চারা পূর্ণবয়স্ক হয়ে যায়। ওদের আয়ুষ্কাল প্রায় দশ বছর।

প্রবন্ধটির লেখক ও আলোকচিত্রী ড. আ ন ম আমিনুর রহমান একজন বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, প্রাণী চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

E-mail:[email protected], [email protected]

   

বরিশালের শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক শীতলপাটি



এস এল টি তুহিন, করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, বরিশাল
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের পাটিকররা তাদের নিপুণ হাতের তৈরি শীতলপাটির জন্য বিখ্যাত।

উপজেলার দাড়িয়াল ইউনিয়নের কাজলাকাঠী গ্রাম, রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঠালিয়া, রাজাপুর গ্রাম ও গারুড়িয়া ইউনিয়নের সুখী নীলগঞ্জ ও হেলেঞ্চা গ্রামে এখনো তৈরি হয়, ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক দেশ বিখ্যাত শীতলপাটি।

এই উপজেলায় এখন এক হাজারের বেশি পরিবার শীতলপাটি তৈরি করে সংসার চালাচ্ছে।

উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামে প্রবেশ করে যতদূর দু’চোখ যায়, দেখা মেলে পাইত্রাগাছের বাগান। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে দেখা মেলে বড় বড় পাইত্রা বা মোর্তাগাছের ঝোপ। বাড়ির আঙিনা, পরিত্যক্ত ফসলি জমি, পুকুর পাড়, সব জায়গাতেই বর্ষজীবী উদ্ভিদ তরতাজা পাইত্রাগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গ্রামীণ জনপদের আভিজাত্যের স্মারক শীতলপাটি তৈরি হয়, এই পাইত্রাগাছের বেতি দিয়ে।

জানা গেছে, এসব গ্রামে পাইত্রাগাছের আবাদ হয়ে আসছে শত শত বছর ধরে। পাটিকরদের পূর্বপুরুষেরা যে পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, আজও সেই পেশা ধরে রেখেছেন বাকেরগঞ্জের পাটিকররা।

এখনো এই সব গ্রামে ‘পাটিকর’ পেশায় টিকে আছে প্রায় এক হাজার পরিবার। আর তাদের সবার পেশাই শীতলপাটি বুনন। ফলে, উপজেলার এসব গ্রাম এখন ‘পাটিকর গ্রাম’ নামে পরিচিত।

সরেজমিন দেখা যায়, কাঁঠালিয়া, রাজাপুর ও গারুড়িয়া ইউনিয়নের সুখী নীলগঞ্জ ও হেলেঞ্চা গ্রামে এখনো গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই ছোট ছোট টিনশেড ও আধাপাকা ঘরগুলোর বারান্দায় নারী-পুরুষ ও শিশুরা মিলে নানান রঙের শীতলপাটি বুনতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কাঁঠালিয়া গ্রামের সবিতা রানীর পরিবারের সবাই মিলে দিনরাত ব্যস্ত সময় কাটান শীতলপাটি তৈরি করতে। একটু সামনে এগুতেই কথা হয়, প্রিয়লাল পাটিকরের সঙ্গে।

তিনি বলেন, পরিবারের পাঁচ সদস্য মিলে একটি পাটি তৈরি করতে কয়েকদিন চলে যায়। প্রতিজনের দৈনিক মজুরি ১০০ টাকা করেও আসে না। তারপরেও কিছু করার নেই। বাপ-দাদার পেশা হিসেবে এখনো শীতল পাটি বুনে যাচ্ছি। একদিকে, এখন গরম বেড়েছে, অপরদিকে, বৈশাখ মাস চলছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বৈশাখী মেলায় শীতলপাটির চাহিদা থাকে। তাই, পাইকাররা এসে আমাদের এলাকা থেকে পাটি কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করেন।

স্থানীয় পাটিকররা জানান, এখানকার তৈরি শীতলপাটি আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু প্লাস্টিক পাটির কারণে বাজারে শীতলপাটির চাহিদা কমে গেছে। সে কারণে সরকারিভাবে বিদেশে শীতলপাটি রফতানির কোনো ব্যবস্থা করা হলে পাটিকরদের জীবন-জীবিকা ভালো চলতো।

পাশাপাশি শীতলপাটি টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তারা। নয়ত এই পেশায় টিকে থাকা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।

এ বিষয়ে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসন, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাসহ জাইকা সংস্থার মাধ্যমে উপজেলার পাটিকরদের মধ্যে বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ফলে, নতুন নতুন ডিজাইনের শীতলপাটি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা তাদের সরকারি বিভিন্ন রকম সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

;

মস্তিস্কেও ঢুকে যাচ্ছে প্লাস্টিক



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
মস্তিস্কেও ঢুকে যাচ্ছে প্লাস্টিক

মস্তিস্কেও ঢুকে যাচ্ছে প্লাস্টিক

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমান পৃথিবী প্লাস্টিকময়। ছোট বড় থকে প্রায় সবরকম কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহারের আধিক্য। তবে এই প্লাস্টিক অজৈব পদার্থে তৈরি হওয়ার কারণে সহজে পচনশীল নয়। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকার কারণে এসব পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।  শুধু পরিবেশ নয়, হার্ট, মগজ, সব জায়গাতেই নাকি ঢুকে রয়েছে প্লাস্টিক। সম্প্রতি এক গবেষণায় এমনটাই জানা গিয়েছে। শুধু তাই নয়, হার্টের নানা রোগ, মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার পিছনেও এই প্লাস্টিকগুলির অবদান রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

সময়ের বিবর্তনে প্লাস্টিক বিভিন্ন আঘাতের কারণে ক্ষয় হয়ে ক্ষুদ্র আকার ধারণ করে। ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিককে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে। দিন দিন পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। ইতোমধ্যে সমুদ্রে বিপুল পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ সৃষ্টি করেছে। পরিবেশের বিভিন্ন প্রাণী তাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে দিন দিন এই মাইক্রোপ্লাস্টিকের আধিপত্য বেড়েই চলেছে। এমনকি মানব শরীরেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। এক গবেষণায় মস্তিস্কে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে নিউ ম্যাক্সিকোর এনভয়রনমেন্টাল হেলথ পারসপেক্টিভ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয় খাদ্য, পানি এমনকি বায়ুর মাধ্যমেও শরীরে প্রবেশ করে। এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা আমাদের স্নায়ুবিক নানান অনুভূতির উপরেও মাইক্রো প্লাস্টিক প্রভাব ফেলে।

রক্ত প্রবাহের কারণে তা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে বেড়ায়। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে তা জমা থেকে স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা প্রদান করে। বৃক্ক, লিভার, হৃদপিণ্ডের রক্তনালি ছাড়াও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক। মাইক্রোপ্লাস্টিক এসব অঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। 

ডাক্তার ইয়াতিন সাগভেকার বলেন দৈনন্দিন নানা কাজের মধ্যেই শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে। তবে পারে তা ত্বক, প্রশ্বাসের বায়ু বা ইনজেশনের মাধ্যমে।     

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ২০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারার কথা। এছাড়া ১০ মাইক্রোমিটার আকারের গুলো মস্তিষ্কের সুক্ষ্ম কোষের ঝিল্লির অতিক্রম করতে সক্ষম হওয়া উচিত।

প্লাস্টিক পরিবেশ্ম প্রানি এমনকি মানুষের জন্যও অনেক ক্ষতিকর। তাই সকলের উচিত যতটা সম্ভব প্লাস্টিক বর্জন করা। পাশাপাশি প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি জিনিসের ব্যবহার বাড়ানো।

;

খাবারের পর প্লেট ধোয়া কষ্ট? তাহলে এই কৌশল আপনার জন্য!



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

খাওয়ার বিষয়ে সবাই পটু। কিন্তু খাওয়ার পর থালা বাসন ধোয়াকে অনেকেই কষ্টকর কাজ মনে করেন। তাই দেখা যায় খাওয়ার পর অপরিষ্কার অবস্থায়ই থেকে যায় থালা বাসনগুলো। এবার এই কষ্ট কমাতে এক অভিনব কৌশল বেছে নিয়েছেন এক ব্যক্তি।

সম্প্রতি এমন এক ভিডিও নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি। 

হর্ষ গোয়েনকা নামে ভারতের এক শিল্পপতি তাঁর এক্স হ্যন্ডেলে (সাবেক টুইটার) ভিডিওটি শেয়ার করেন। এতে দেখা যায়, থালাবাসন পরিষ্কারের কাজ এড়াতে এক ব্যক্তি মজার এক কৌশল নিয়েছেন। এতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি খাবার রান্না করছেন। খাবার আগে তিনি প্লাস্টিক দিয়ে প্লেট, চামচ ও পানির গ্লাস মুড়িয়ে নিচ্ছেন।

শেয়ার করে তিনি মজাচ্ছলে লিখেছেন, "যখন আপনার থালা-বাসন ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকে না..."।

ভিডিওটি শেয়ার করার পর মুহূর্তেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওটি অনেক বিনোদনের জন্ম দিয়েছে। যদিও কেউ কেউ প্লাস্টিকের মোড়ককে হাস্যকর মনে করেন এবং এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এক্স ব্যবহারকারী একজন লিখেছেন, 'পানি সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার করা হল মন্ত্র হল এমন কৌশল! তবে প্লাস্টিকের ব্যবহার নতুন করে ভাবাচ্ছে।'

অন্য একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'আমি আমার হোস্টেলের দিনগুলিতে এটি করেছি। আমাদের পানি সরবরাহ ছিল না এবং বারবার ধোয়ার কষ্টে এমন কৌশল নিয়েছি।'

আরেক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘মনে হচ্ছে বেঙ্গালুরুতে পানি–সংকটের সমাধান হয়ে যাচ্ছে।’

;

জলদানব ‘লক নেস’কে খুঁজে পেতে নাসার প্রতি আহ্বান



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

রহস্যময় জলদানব জলদানব ‘লক নেস’কে খুঁজে পেতে নাসার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে লক নেস সেন্টার। ২০২৩ সালের এই রহস্যময় প্রাণীর শব্দের উৎস ও একে খুঁজে পেতে হাইড্রোফোন ব্যবহার করা হয়েছিল।

স্যার এডওয়ার্ড মাউন্টেনের ৯০তম অভিযানের অংশ হিসেবে আগামী ৩০ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত এই ‘লক নেস মনস্টার’কে খুঁজে পেতে অনুসন্ধান চালানো হবে।

রহস্যময় এই ‘লক নেস মনস্টার’কে ১৯৩৪ সালে প্রথম দেখা যায়। এ পর্যন্ত ১ হাজার ১শ ৫৬ বার দেখা গেছে বলে লক নেস সেন্টার সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে লক নেস সেন্টারের এমি টোড বলেছেন, আমরা আশা করছি, এই রহস্যময় জলদানবকে খুঁজে পেতে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার গবেষকেরা আমাদের সহযোগিতা করবেন। তারা আমাদের জলদানবকে খুঁজে পেতে যথাযথ নির্দেশনা দেবেন এবং এ বিষয়ে সব কিছু জানাতে সাহায্য করবেন।

তিনি বলেন, আমাদের অভিযানের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। আমরা আশা করছি, নাসার উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা জলদানব বিষয়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাবো।

রহস্যময় জলদানব খুঁজে পেতে স্বেচ্ছাসেবকের ভূপৃষ্ঠ থেকে যেমন নজর রাখবেন, তেমনি পানির ভেতরে অভিযান চালানোর বিষয়ে তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। রহস্যময় জলদানবকে খুঁজে পেতে ১৯৭০ দশক ও ১৯৮০ দশকের যে সব তথ্যচিত্র লক নেসের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, সেগুলো যাচাই করে দেখা হবে।

তারপর জলদানব সম্পর্কে স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন লক নেসের পরিচালক জন ম্যাকলেভারটি।

এ নিয়ে গবেষকদের নিয়ে একটি অনলাইন বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। যারা রহস্যময় এই জলদানবকে সচক্ষে দেখেছেন, তারাও এ লাইভ বিতর্কে অংশ নেবেন।

নেস হৃদ

যে হ্রদে জলদানব অবস্থান করছে বলে জানা গেছে, অভিযানের অভিযাত্রী দল নৌকায় করে সেখানে যাবেন। এসময় তাদের সঙ্গে থাকবেন গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানকারী দলের ক্যাপ্টেন অ্যালিস্টার মাথিসন। তিনি লক নেস প্রজেক্টে একজন স্কিপার হিসেবে কাজ করছেন। তার সঙ্গে থাকবেন ম্যাকেন্না।

অনুসন্ধান কাজে ১৮ মিটার (৬০ ফুট) হাইড্রোফোন ব্যবহার করা হবে। এটি দিয়ে রহস্যময় শব্দের প্রতিধ্বনি রেকর্ড করা হবে।

দ্য লক নেস সেন্টার ড্রামনাড্রোচিট হোটেলে অবস্থিত। ৯০ বছর আগে অ্যালডি ম্যাককে প্রথম রিপোর্ট করেছিলেন যে তিনি একটি জলদানব দেখেছেন।

লক নেস সেন্টারের জেনারেল ম্যানেজার পল নিক্সন বলেছেন, ২০২৩ সালে নেসিকে খুঁজে পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, জাপানসহ আরো অনেক দেশ অনুসন্ধান কাজে অংশ নিয়েছিল। এটি ছিল বড় ধরনের একটি অভিযান।

তিনি বলেন, অনুসন্ধানের সময় যে অদ্ভুত শব্দ শোনা গিয়েছিল, সে শব্দের কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়নি। তবে আমরা এবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, জলদানব লক নেসের রহস্য উন্মোচন করতে পারবো।

এ বিষয়ে আমরা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করবো। এ রহস্যময় জলদানব লক নেস সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তাদের সহযোগিতা নেওয়া হবে। পল নিক্সন আরো বলেন, এবার আমরা খুবই উচ্ছ্বসিত যে, জলদানবকে খুঁজে পেতে নতুন ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবো।

স্কটল্যান্ডের ইনভার্নেসের কাছে এক বিশাল হ্রদের নাম ‘নেস’। স্কটিশ গেলিক ভাষায় হ্রদকে লক (Loch) বলা হয়। আর উচ্চারণ করা হয় ‘লক’। গ্রেট ব্রিটেনের স্বাদুপানির সবচেয়ে একক বৃহত্তম উৎস এ হ্রদটির আয়তন ২২ বর্গ কিলোমিটার, গভীরতা ৮০০ ফুটেরও বেশি। এই হ্রদেই দেখা মিলেছিল সত্যিকারের জলদানব ‘লক নেসের’।

;