লালসবুজ রঙের পাখি ‘সেকরা-বসন্ত’



বিভোর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
আপন মনে গাছের ডালে বসে আছে সেকরা-বসন্ত। ছবি: এবি সিদ্দিক

আপন মনে গাছের ডালে বসে আছে সেকরা-বসন্ত। ছবি: এবি সিদ্দিক

  • Font increase
  • Font Decrease

ছোট আকারের লাল-সবুজ রঙের বর্ণিল পাখি ‘সেকরা-বসন্ত’। এ পাখিটির ইংরেজি নাম Coppersmith Barbet এবং বৈজ্ঞানিক নাম Psilopogon haemacephala. এরা কাপিটোনিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত মেগালাইমা গণের এক প্রজাতির সুলভ পাখি। এরা বাংলাদেশের স্থানীয় পাখি।

এদের দেশের সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। IUCN এই প্রজাতিটিকে Least Concern বা শঙ্কাহীন বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে এরা Least Concern বা শঙ্কাহীন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, সেকরা-বসন্ত আকারে ছোট হয়। মাত্র ১৭ সেন্টিমিটার। দেহ মূলত সবুব। তবে এদের কপাল লাল রঙের। চোখের চারপাশে হলুদ দাগ দেখা যায়। গলার নিচে রঙিন দাগ দেখা যায়। দেহের উপরের অংশ সবুজ। ঠোঁট কালো এবং পা লাল বর্ণের হয়ে থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ই দেখতে একই। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির গায়ের রঙ মলিন এবং এদের দেহে কোন লাল দাগ দেখতে পাওয়া যায় না।

তিনি আরও বলেন, সেকরা বসন্ত সাধারণত একা, জোড়ায় বা ছোট দলে চলাফেরা করে। এদেরকে বাগানে, বনে বাদাড়ে দেখতে পাওয়া যায়। এরা বড় গাছের মগডালে রোদ পোহায়। গাছের গর্তে বাসা বানায় এবং সেখানে বিশ্রাম নেয়। শুষ্ক মরুভুমি ও জলাখভূমির বনে এদের সহজে দেখা যায় না।

পাখিটির খাবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই প্রজাতির পাখিরা সাধারণত ফলাহারী। তবে এরা মাঝে মধ্যে পোকা বিশেষ করে উইপোকা খেয়ে থাকে। এদের খাদ্য তালিকায় থাকে বট গাছের ফল, জংলি গাছের ফল, জলপাই জাতীয় ফল এবং বেরি জাতীয় ফল। এরা ফুলে পাপড়িও খেয়ে থাকে।

সেকরা বসন্তের প্রজনন মৌসুম ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এরা গাছের সরু ডালের নিচে গর্ত করে বাসা বানায়। স্ত্রী পাখি একসাথে ৩ থেকে ৪ টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলিতে তা বাবা পাখি ও মা পাখি উভয়ই দিয়ে থাকে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে প্রায় ২ সপ্তাহ সময় লাগে বলে জানান এ পাখি বিশেষজ্ঞ।

   

সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম

সরেজমিন কৌশল্যা: বদলে যাচ্ছে গ্রাম

  • Font increase
  • Font Decrease

কৌশল্যা, দাগনভূঁইয়া, ফেনী থেকে: "অবারিত মাঠ গগন ললাট, চুমে তব পদধূলি; ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়, ছোট ছোট গ্রামগুলি", রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার গ্রাম এখন বইয়ের পাতায় আছে, বাস্তবে নেই। ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রামগুলো এখন পরিবর্তমান। আধুনিক জীবনের ছোঁয়ায় বদলে গেছে চিরায়ত গ্রামের চিরচেনা দৃশ্যপট।

"গ্রামের ফসলের মাঠ কমছে। টিনের বাড়িঘর হারিয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র পাকা সড়ক। যান্ত্রিক যান চলে আসে ঘরের দুয়ারে। বিদ্যুৎ সহজলভ্য। জোনাকির আলোজ্বলা নিঝুম গ্রাম খুঁজে পাই না আমরা", বললেন জামাল স্যার। তার সাথে কথা হচ্ছিল কৌশল্যা গ্রামের কাজী বাড়ির দহলিজে।

কৌশল্যা গ্রামটি বেশ চমৎকার। ভৌগোলিক দিক থেকেও কৌশলপূর্ণ। ফেনী জেলা সর্বউত্তরের গ্রাম এটি। তার পশ্চিমে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও নাঙলকোট উপজেলার সীমান্ত। দক্ষিণে লাগোয়া নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি ও সেনবাগ উপজেলা।


বুধবার (১৯ জুলাই) ভোরে চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি অতিদ্রুতই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-মহিপাল পয়েন্টে চলে এসেছে। মহিপাল থেকে ডানের রাস্তা গিয়েছে ফেনী শহরে। বামে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর। এ পথে কিছুদূর এগিয়ে দাগনভূঁইয়া। তারপর উপসড়ক ধরে কৌশল্যা গ্রাম। পথেঘাটে ঈদের আমেজ থাকায় যানজটের বালাই নেই। আমরা খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছেছি ছুটির ঢিলেঢালা ট্রাফিক পেরিয়ে।

গ্রামে এসেও অবাক হতে হলো। গ্রাম কোথায়? পাকা সড়ক, পাকা বাড়ি, মাঝেমাঝে কিছু সবুজ ধানখেত। কিছুক্ষণ পর পর দামী গাড়ি ছুটে যাচ্ছে গ্রামে ভেতর দিয়ে।

"এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে প্রবাসী আছেন। চাকরিজীবীও কম নন। ঈদের ছুটিতে তারা সপরিবারে বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। সবারই নিজের কিংবা রেন্টাল কার আছে। সোজা হাজির হচ্ছেন বাড়ির উঠানে", বললেন 'ফেনী রিডার্স ফোরাম'-এর এক সদস্য।

Caption

'ফেনী রিডার্স ফোরাম' নিয়মিত স্টাডি সার্কেল করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে। সদস্যরা সকলেই স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর। চাকরি ও ব্যবসায় জড়িত। অবসরে পড়াশোনার অভ্যাস চালিয়ে রেখেছেন।

গ্রামে আরো কয়েকজন শিক্ষিত যুবকের সঙ্গে কথা হলো। অধিকাংশই চাকরিজীবী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনীতে চাকরি করেন না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়ি আসেন। তাীা জানালেন, "মানুষের আয়-রোজগার বেড়েছে। জমিজমার দামও বাড়ছে। অনেকেই পাকা বাড়ি করায় ফসলী জমি কমছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না বাড়ায় শিক্ষার হার বাড়ছে না"।

কৌশল্যা গ্রামের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সবুজায়ন। নানা পরিবর্তনের পরেও পুরো গ্রাম সবুজে ছাওয়া। প্রায়-প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও খোলা জায়গা শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। হাঁস-মুরগী পালিত হচ্ছে প্রত্যেক বাড়িতে।


গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন পুরোপুরিভাবে গ্রাস করেছে টিভি চ্যানেলগুলো। পথে বের হলেও টিভির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। "খেলার মাঠ নেই গ্রামে। ফসল কাটা হলে ক্ষেতগুলোতে ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে। বাকি সময় টিভি বা মোবাইলে ব্যস্ত থাকে তার", বললেন জামাল স্যার।

মেঘলা আকাশে টিপটিপ বৃষ্টিতে গ্রাম ঘুরে ফিরে আসার সময় একটি ট্রানজিশনাল পিকচার নিয়ে এলাম। গতানুগতিক গ্রাম ক্রমশ আধুনিকায়নের পথে পাড়ি দিচ্ছে এক তুমুল সন্ধিক্ষণ। সমাজ বদলের ধারায় হয়ত অচিরেই আদি গ্রামের জায়গা দখল করবে আধুনিক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা। যুক্ত হবে নতুন অনেক কিছু। আবার হারিয়েও যাবে ঐতিহ্যবাহী অনেক বিষয়ও। এই বদলের সবটাই ভালো হবে, এমন নয়। ভালোগুলোকে ধরে রাখার মাধ্যমে পালাবদলকে গ্রহণ করতে পারলেই হবে প্রকৃত উন্নয়ন। নইলে বদল হবে, উন্নয়ন হবে না।

;

দিল্লি: মৃত্যুহীন এক মহানগরী



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
দিল্লি: মৃত্যুহীন এক মহানগরী

দিল্লি: মৃত্যুহীন এক মহানগরী

  • Font increase
  • Font Decrease

দিল্লির অস্তিত্ব ও আত্মা বেঁচে আছে পুরনো শহরে। নতুন দিল্লি, গুরগাঁও, নয়ডা মিলিয়ে ভারতের জাতীয় রাজধানী দিল্লির বিশাল চৌহদ্দীর মধ্যে নতুনত্ব থাকলেও ঐতিহ্য সামান্যই। ইতিহাস ও ঐতিহ্য মিশে আছে পুরনো দিল্লির ইমারতে, হর্ম্যে, অট্টালিকায়. দুর্গে, পথেঘাটে, ধ্বংসস্তূপে, বাতাসে।

পুরনো দিল্লির ইতিহাস লিখতে গিয়ে আশির দশকের গোড়ার দিকে নারায়ণী গুপ্ত মন্তব্য করেছিলেন, ‘দিল্লির যে কত বার মৃত্যু হয়েছে!’ বিশিষ্ট ইতিহাসবিদের এই উক্তি স্মরণ করে কল্যাণী দেবকী মেনন মেকিং প্লেস ফর মুসলিমস ইন কন্টেম্পোরারি ইন্ডিয়া গ্রন্থে লিখেছেন, ‘প্রতিটি মৃত্যু এক একটি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তর সাধন করেছে। মুঘল শাহজাহানাবাদ হয়েছে ব্রিটিশ-শাসিত দিল্লি। ব্রিটিশরা তাদের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সরিয়ে নিয়ে গেলে আদি শহর হয়ে গেছে পুরানা দিল্লি। ঔপনিবেশিক জমানার সংঘাতময় অবসানের পরেও দিল্লি বার বার ভেতর থেকে আক্রান্ত হয়েছে। মরেছে। এবং পুনর্জন্ম লাভ করেছে।’

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, পরবর্তীতে নানা কারণে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক হিংসা, বিশেষত আশির দশকে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে শিখ নিধন আর করোনার আগে আগে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দিল্লির অস্তিত্বে রক্ত ও কলঙ্কের ছাপ রেখেছে। কর্পোরেট আগ্রাসনের প্রতিবাদে দীর্ঘমেয়াদী কৃষক আন্দোলন অনতি-অতীতে দিল্লির প্রতিবাদী চেহারা সামনে নিয়ে আসে। দিল্লি হালআমলে আলোচিত বায়ু দুষণের কারণে শীর্ষস্থান লাভকারী শহর হিসাবে। এমনকি, দিল্লির ইতিহাসে সর্বোচ্চ উষ্ণতার রেকর্ডও হয়েছে ২০২৪ সালে। চরম উত্থান ও পতনে, সঙ্কটে ও সন্ধিক্ষণে দিল্লি যেন মৃত্যুহীন এক মহানগরী: স্ফিনিক্স পাখির মতো ছাইভষ্মের ভেতর থেকে বার বার পুনর্জন্ম পেয়েছে দিলওয়ালাদের এই শহর দিল্লি। সংখ্যাতীত রাজা-বাদশাহের পাশাপাশি যে শহরের দ্যুতিময় চরিত্র হয়ে আছেন আমীর খসরু, তানসেন, মীর্জা গালিব থেকে শুরু করে দিল্লিওয়ালা শাহরুখ খান। দিল্লির বাসিন্দাদের বলা হয় দেহলভি, যে টাইটেল গ্রহণ করে বহু খ্যাতনামা দিল্লিবাসী স্থান পেয়েছেন ইতিহাসের অলিন্দে।       

অক্টাভিও পাজ (লোজানো) নোবেল বিজয়ী (১৯৯০) লাতিন কবি ও কূটনীতিবিদ দিল্লিতে বাস করেন মেক্সিকান রাষ্ট্রদূত হিসাবে। তার কাছে দিল্লির স্থাপত্য ছিল শব্দ ও কবিতার একটি সংমিশ্রণ। পুরনো দিল্লিতে তিনি দেখেছিলেন ‘প্রাচীন স্থাপনার চিত্ররূপ‘সমাবেশ an assemblage of images more than buildings. তিনি নতুন দিল্লিকে চিহ্নিত করেন অবাস্তব (unreal)। আর পুরনো দিল্লিতে খুঁজে পান উনিশ শতকের গথিক স্থাপত্যের লন্ডন ও প্রাচীন ব্যাবিলন শহরের ছাপ। যে শহরের নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সুরম্য দালানের ছায়া পেরিয়ে শত শত গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস বইয়ের পাতায় মিশে আছে অক্টোভিও পাস ছাড়াও ভিক্টর হুগো, ওয়াল্টার স্কট, আলেকজান্ডার দ্যুমা প্রমুখের লেখনির মাধ্যমে। ভারতের অভিজ্ঞতায় ওক্টাভিও পাজ আস্ত একটি গ্রন্থ রচনা করেন In Light of India শিরোনামে।

দিল্লি জনপদের প্রথম উল্লেখ করে প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত, যেখানে যুদ্ধরত চাচাত ভাইদের দুটি দল, পা-ব এবং কৌরবদের সম্পর্কে রোমাঞ্চকর-মহাকাব্যিক বর্ণনা রয়েছে। পা-ব এবং কৌরব, উভয়েই ভরতের বংশধর ছিলেন। আখ্যান অনুসারে, পা-বদের রাজধানী ছিল দেবতা ইন্দ্রের শহর ইন্দ্রপ্রস্থ। যদিও ইন্দ্রপ্রস্থ নামে কিছুই অবশিষ্ট নেই তথাপি কিংবদন্তি অনুসারে এটি ছিল একটি সমৃদ্ধ শহর, যা দিল্লির পূর্বনাম। তবে দিল্লি নামক স্থানের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকে, যখন রাজা ধিলু দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লিতে বর্তমান কুতুব মিনার টাওয়ারের স্থানে একটি শহর তৈরি করেছিলেন এবং নিজের নাম ধিলু থেকে দিল্লি নামকরণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে বর্তমান দিল্লি টায়াঙ্গেল নামে পরিচিত এলাকার অনঙ্গপুর বা আনন্দপুরে নামক স্থানে তোমারা রাজবংশের কথা জানা যায়, যারা আরো পশ্চিম দিকে ‘লালকোট’ নামের প্রাচীর ঘেরা দুর্গে চলে আসেন। ১১৬৪ সালে পৃথ্বীরাজ সেখানে আরো বিশাল প্রাচীর নির্মাণ করে জায়গাটির ‘কিলা রাই পিথোরা‘ নাম দেন। ১২ শতকের শেষের দিকে মুসলিম বিজয়ী মুহাম্মদ ঘোরী রাজা পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করে দিল্লিসহ সমগ্র উত্তর ভারত অধিকার করেন। তিনিই প্রথম দিল্লির পরিকল্পিত বিকাশের সূচনা করেন। দিল্লিকে রাজধানী করে তিনি তার সেনাপতি কুতুবুদ্দীন আইবেককে শাসনকার্যের দায়িত্ব দিয়ে নিজ স্বদেশ আফগানিস্তান-ইরান সংলগ্ন ঘোর প্রদেশে ফিরে যান। ইতিহাসকারগণ মুহাম্মদ ঘোরীকে রাজধানী দিল্লির প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন।

১৩ শতকের শেষের দিকে খিলজি বংশ দিল্লির ক্ষমতায় আসে। খিলজিদের রাজত্বকালে মোঙ্গল লুণ্ঠনকারীরা দিল্লি শহরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। মোঙ্গলদের পরবর্তী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসাবে দিল্লির শাসক আলাউদ্দিন খিলজি কুতুব মিনার থেকে অল্প দূরে উত্তর-পূর্ব দিকে ‘সিরি’ নামক স্থানে একটি নতুন বৃত্তাকার সুরক্ষিত শহর তৈরি করেছিলেন, যাকে খিলজি রাজধানী রূপে মনোনীত করা হয়। দিল্লির ভেতরে ‘সিরি‘ছিল প্রথম নতুন ও পরিকল্পিত শহর। আর আলাউদ্দির খিলজি ছিলেন বাইরের শত্রুর আক্রমণ থেকে দিল্লিকে রক্ষাকারী প্রথম সফল শাসক।

খিলজিদের পর দিল্লি ১৩২১ সালে তুঘলক রাজবংশের অধীনস্থ হয়। গিয়াসউদ্দিন তুঘলক ‘তুঘলকাবাদ‘ নামে একটি নতুন রাজধানী নির্মাণ করেন। কিন্তু কুতুব মিনারের কাছাকাছি স্থানটিকে পানির অভাবের কারণে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করতে হয়। আরেক শাসক মুহাম্মদ ইবনে তুঘলক শহরটিকে আরো উত্তর-পূর্ব দিকে প্রসারিত করেন। তিনি চারপাশে শক্ত প্রাচীর বেষ্টিত একটি দুর্গও নির্মাণ করেন। তিনিই আবার রাজধানীকে দক্ষিণ দিকে প্রসারিত করে দেওগিরি মালভূমির প্রান্তে দৌলতাবাদ নামের আবাস গড়েন। পরবর্তী শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলক দৌলতাবাদ পরিত্যাগ করে ১৩৫৪ সালে উত্তর দিকের ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাচীন স্থানের পাশে ফিরোজাবাদ নামে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন, বর্তমানে যা ‘ফিরোজ শাহ কোটলা‘ নামে প্রসিদ্ধ।  

দিল্লির শান-শওকত বাড়াতে মুহাম্মদ ঘোরির পদাঙ্ক অনুসরণ করে খিলজি, তুঘলক, তৈমুর, সাইয়িদ, লোদি রাজবংশ পুরনো রাজধানী ফিরোজাবাদের আশেপাশে নানা নির্মাণ ও স্থাপনায় ভরিয়ে দেন, যা আরো সমৃদ্ধি লাভ করে মুঘল শাসনামলে। মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লির সন্নিকটের পানিপথ প্রান্তরের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আগ্রায় তার ঘাঁটি স্থাপন করেন। বাবরের পুত্র নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন দিল্লির যমুনা তীরে একটি নতুন আবাসস্থল গড়েন। শেরশাহের কাছে হুমায়ুন পরাজিত হলে তার আবাসও গুরুত্ব হারায়। শেরশাহ দিল্লির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শেরশাহী কিল্লাহ স্থাপন করেন, যা বর্তমানে পুরনো কিল্লাহ দুর্গ নামে পরিচিত।

শেরশাহের মৃত্যুর পর দিল্লি তথা ভারতের শাসন পুনরায় মুঘলদের হস্তগত হয়। হুমায়ুন-পুত্র আকবর এবং পরবর্তী শাসকগণ দিল্লির উন্নতিতে কাজ করেন। যদিও তাদের রাজধানী ছিল আগ্রা, ফতেহপুর সিক্রি, লাহোর তথাপি সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অক্ষুন্ন থাকে। মুঘল স¤্রাট শাহজাহানের নাম দিল্লির ইতিহাসে একজন অন্যতম প্রধান নির্মাতা রূপে উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি তার প্রকৌশলী, স্থপতি ও জ্যোতিষীদের রাজধানী আগ্রা ও লাহোরের মধ্যবর্তী কোথাও হালকা জলবাযু ও কৌশলগত অবস্থানের একটি জায়গায় নতুন রাজধানী স্থাপনের নির্দেশ দেন। সর্বসম্মতভাবে শেরশাহ নির্মিত দিল্লির পুরনো কিল্লাহর ঠিক উত্তরে যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে স্থান নির্বাচিত হয়। স¤্রাট শাহজাহান তার দুর্গ ‘উর্দু-ই-মুয়াল্লা‘কে কেন্দ্র করে নতুন রাজধানী ‘শাহজহাানাবাদ‘ নির্মাণ শুরু করেন, যা বর্তমানে লাল কিল্লাহ নামে পরিচিত। লাল কিল্লাহ নির্মাণে সময় লাগে আট বছর। সঙ্গে জামা মসজিদসহ আরো অনেক নান্দনিক স্থাপনা তৈরি করেন শাহজাহান। যেগুলোর অধিকাংশই ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ওয়াল্ড হেরিটেজ বা বিশ^ঐতিহ্যের অংশ। শাহজাহান তার নতুন রাজধানীকে অনেকগুলো প্রাচীর ও গেট দিয়ে সুশোভিত করেন। যার মধ্যে কাশ্মীরি গেট, দিল্লি গেট, আজমেরি গেট, তুর্কমান গেট বর্তমানেও দাঁড়িয়ে আছে। বস্তুতপক্ষে, পুরনো দিল্লির বৃহত্তর অংশ শাহজাহান কর্তৃক নিমিত। এ কারণে, পুরনো দিল্লির আরেক নাম শাহজাহানাবাদ।

১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকালে দিল্লি নানা শক্তির দ্বারা লুণ্ঠিত ও আক্রান্ত হয়। যেহেতু শেষ দিকের দিল্লির শাসকগণ যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলেন না, ছিলেন দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু, সেহেতু শিখ, মারাঠা, পারসিক সেনাদল দিল্লি আক্রমণ ও লুটপাট করে। সবচেয়ে জঘন্য হামলা চালিয়ে দিল্লি দখল করে ইংরেজরা। সিপাহী বিদ্রোহের সময় দিল্লির শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়ে ইংরেজদের হাতে পরাজিত হওয়ায় চরম লাঞ্ছনা, প্রতিহিংসা ও বর্বরতার সম্মুখীন হন। মুঘল রাজপুরুষ ও নারীদের ধরে ধরে হত্যা করা হয়। নগরে চালানো হয় গণহত্যা। মুঘল ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন তথা বই, পুস্তক, অলঙ্কার, চিত্রশিল্প লুট করা হয়। অনেক কিছুই জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। হাজার বছরের দিল্লি ইংরেজের আগমনে মÍব্ধ কবরগাহের চেহারা লাভ করে।

১৯১১ সালে কলকাতা থেকে ব্রিটিশ শাসনের রাজধানী দিল্লি স্থানান্তরিত হলে ঐতিহ্যবাহী নগরের মর্যাদা ও সমৃদ্ধি আবার ফিরে আসে। নতুন ব্রিটিশ প্রশাসনিক কেন্দ্র রূপে দিল্লিকে গড়ে তুলতে স্যার এডউইন লুটিয়েন্স-এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। তিনি যে শহরের রূপ দেন তা বর্তমানের নতুন দিল্লি। ১৯৩১ সালে পরিকল্পিত নতুন দিল্লির নির্মাণ সমাপ্ত হয়, যাকে বলা হয় ‘লুটিয়েন্সের দিল্লি‘।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হলে দিল্লিকে রাজধানী করা হয়। ক্রমেই শাহজাহানাবাদ ও লুটিয়েন্সের দিল্লি একটি আধুনিক মেট্রোপলিটনের অবয়ব লাভ করে যমুনা নদী বরাবর উত্তর ও দক্ষিণ দিক ছাড়িয়ে পূর্ব ও পশ্চিমেও প্রসারিত হয়। জাতীয় রাজধানীর মর্যাদা পেয়ে বৃহত্তর দিল্লির পাশের উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানা রাজ্যের কিছু অংশকেও নিজের অন্তর্ভূক্ত করে। প্রাথমিকভাবে দেশভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত শিখ শরণার্থীদের চাপ বৃদ্ধি পায় দিল্লিতে। পরে সিন্ধিসহ আরো অনেক জনগোষ্ঠী নতুন দিল্লির নানা স্থানে বসতি স্থাপন করে। দিল্লিতে উর্দুভাষী মুসলিমরা প্রাচীনকাল থেকেই বসবাস করছেন। তদুপরি ভারতের নানা প্রান্তের মানুষের আগমনে দিল্লি একটি বৈচিত্র্যময় ম্যাগাসিটিতে পরিণত হয়েছে, যা এখন বাযু দূষণ ও তাপবৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষতম বিপদজনক শহর। রাজনৈতিক কারণেও দিল্লি সর্বদা উতপ্ত থাকে। নানামুখী আন্দোলন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা দিল্লির ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। যাবতীয় সমস্যা ও অসঙ্গতি নিয়েও দিল্লি এক মৃত্যুহীন এক মহানগরী হয়ে বেঁচে  থেকে ইতিহাসের স্পন্দন জাগাচ্ছে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম; চেয়ারম্যান ও প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

;

আবেদনে লেখা ছিল, ‘চাকরিটি না হলে শৈশবের প্রেমিকাকে বিয়ে করতে পারবো না’



ফিচার ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাধারণত যেকোনো চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রেই প্রার্থী তার পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, অন্যান্য দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু এবার ভিন্নধর্মী এক আবেদনপত্রের ঘটনা শুনলে অবাক না হয়ে পারবেন না! সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন চাকরি প্রার্থীর একটি আবেদনপত্র ভাইরাল হয়েছে। যা দেখে রীতিমতো অবাক নেট দুনিয়ার মানুষ।

ওই আবেদনপত্রে লেখা ছিল, ‘আমি যদি এই চাকরি না পাই তাহলে আমি আমার শৈশবের প্রেমিকাকে হারাবো’। এখানে বলে রাখা ভালো- এমন অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশি দেশ ভারত। 

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এমন বিস্ময়কর তথ্যের খোঁজ দিয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ওই আবেদনপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ শেয়ার করেছেন দেশটির আরভা হেলথের প্রতিষ্ঠাতা এবং চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার দিপালী বাজাজ।

দিপালী বাজাজ জানান, ইঞ্জিনিয়ার পোস্টের জন্য একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। ওই বিজ্ঞপ্তির আলোকে একটি আবেদন পড়েছিল যেটিতে লেখা ছিল 'আমি যদি এই চাকরি না পাই তাহলে আমি আমার শৈশবের প্রেমিকাকে হারাবো। কারণ তার বাবা জানিয়ে দিয়েছেন চাকরি না পেলে তার মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিবেন না।'

বাজাজ তার কাছে জানতে চেয়েছিল "কেন আপনি এই চাকরির জন্য উপযুক্ত?" এর প্রত্যুত্তরে তিনি লিখেন, ‘আমি যদি এই চাকরি না পাই তবে আমি আমার প্রেমিকাকে কখনোই বিয়ে করতে পারব না। কারণ তাঁর বাবা বলেছেন, চাকরি পেলেই তুমি তাঁকে বিয়ে করতে পারবে।’

এর একটি স্ক্রিনশট মিসেস বাজাজ এক্স-এ শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছেন, "নিয়োগ করাও মজার হতে পারে।" পোস্টটি ইতোমধ্যেই ২ দশমিক ২ লাখের বেশি মানুষ দেখেছেন এবং ৪ হাজার লাইক দিয়েছেন।

অনেকেই পোস্টটির নিচে কমেন্টে নিজেদের অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন।

একজন লিখেছেন, "সততার জন্য তাকে নিয়োগ করুন"

আরেকজন লিখেছেন, "লোকটি সৎ। আসল কথা হবে যদি এইচআর তাকে পরবর্তী ধাপের জন্য বিবেচনা করেন।"

তবে এমন কাণ্ডের পর আবেদনকারী চাকরিটা পেয়েছেন কি না সেটা নিশ্চিত না হওয়া গেলেও তিনি যে তার ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে অটুট তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। 

;

গ্রামীণ শিল্প মৃৎশিল্প

নওগাঁয় হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প: দইয়ের ভাঁড়ই একমাত্র ভরসা!



শহিদুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, নওগাঁ
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

নওগাঁ জেলার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মৃৎশিল্পীদের আবাস। এসব গ্রামে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মৃৎশিল্পী মাটির জিনিসপত্র তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

এসব এলাকা থেকে তৈরি মৃৎশিল্পের মনকাড়া পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে জায়গা করে নিয়েছিল একসময়। কিন্তু প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বাজারের অভাবে এ শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। এক সময় হয়ত এর স্থান হবে জাদুঘরে। সে সময় আর বেশি দূরে নয়!

পূর্বপুরুষদের এ পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত চলছে মৃৎশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম। দইয়ের ভাঁড় তৈরি করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন গ্রামীণ নারীরা কিন্তু মৃৎশিল্পকে ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে কারিগরদের। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে স্বল্প কিংবা বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত মৃৎশিল্পীরা।

এক সময় বেশ কদর ছিল মাটির তৈরি জিনিসপত্রের কিন্তু বর্তমানে দস্তা, অ্যালুমিনিয়াম এবং প্লাস্টিক থেকে তৈরি জিনিসপত্রের সঙ্গে টিকে থাকতে পারছে না মৃৎশিল্প। সে কারণে এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের জীবন-যাপন হয়ে পড়েছে কষ্টসাধ্য।

নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলার গ্রামগুলোতে মাটির হাড়ি তেমন একটা চোখে পড়ে না। এছাড়া মৃৎশিল্প তৈরির উপকরণ মাটির সংকট, জ্বালানির দাম বেশি হওয়ায় এর দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদাও কমে গেছে।

সরেজমিন নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার পালপাড়া গ্রামে দেখা যায়, প্রায় শতাধিক নারী ও পুরুষ মাটির দইয়ের হাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ মাটিকে নরম করছেন, কেউ ভাঁড়ের আকার দিচ্ছেন আবার কেউ আগুনে পোড়াচ্ছেন। এভাবেই বিশাল এক কর্মযজ্ঞ চলছে সেখানে।

পালপাড়া গ্রামের চন্দনা রানী বার্তা২৪.কমকে বলেন, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমেছে বলে গ্রামের নারীরা এখন দইয়ের হাড়ি তৈরি করে রোজগার করছেন। দইয়ের হাড়ি ছাড়া আমাদের আর কোনো কাজ নেই তেমন একটা।

তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থান থেকে আঁঠালো মাটি কিনে আমরা এ কাজগুলো করি তবে আমাদের যদি সরকারিভাবে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে এ ব্যবসাটাকে আরো বড় করা যেতো।

গৃহবধূ দীপালী মহন্ত বলেন, এ কাজের মাধ্যমে আমাদের সংসার চলে। দইয়ের হাড়ি বানানোর মাধ্যমে যা রোজগার হয়, সেটা দিয়ে স্বামীকে সহযোগিতা করি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই। ব্যবসাকে বড় করতে চাই। এজন্য যদি সহযোগিতা পাওয়া যেতো, তাহলে আরো বড় পরিসরে কাজগুলো করা যেতো।

নওগাঁয় হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প: দইয়ের ভাঁড়ই কেবল ভরসা, ছবি- বার্তা২৪.কম

ব্যবসায়ী তপন কুমার পাল বলেন, কাঁচা অবস্থায় আমরা প্রতিটি দইয়ের হাড়ি ৫ থেকে ৬ টাকা করে কিনি। পরে সেটা পুড়িয়ে ৯ থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকি। এক সময় সব ধরনের মাটির জিনিসপত্র তৈরি হতো কিন্তু এখন দইয়ের হাড়িই একমাত্র ভরসা!

তপন কুমার বলেন, মৃৎশিল্পের জন্য নদীর আঁঠালো মাটির দরকার হয়। সারাবছরই এ কাজ করা হয় তবে বর্ষা মৌসুমে এ মাটি সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। সারাবছর কাজ করার জন্য চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মাটি কিনে সংগ্রহ করতে হয়। সুনিপুণভাবে হাড়ি, ঢাকনা, কাঁসা, পেয়ালা, মাইসা, সাতখোলা, ব্যাংক, কলস, ডাবর, পানি রাখার পাত্রসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরি করা হয় এখানে। এগুলোর তেমন একটা চাহিদা না থাকলেও দইয়ের হাড়ির বেশ চাহিদা রয়েছে।

এ বিষয়ে বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমরা সব সময় উদ্যোক্তাদের পাশে আছি। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য শতকরা ৫ শতাংশ এবং পুরুষ উদ্যোক্তাদের জন্য শতকরা ৬ শতাংশ বিনা সুদে খুব সহজ পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তারা চাইলে আমাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারেন।

;