বাবা নাই, কষ্ট এটাই!



কবির য়াহমদ
বাবা নাই, কষ্ট এটাই!

বাবা নাই, কষ্ট এটাই!

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এবারের বাবা দিবসের এক সপ্তাহ আগে ছিল আমার বাবার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিক। বাবা নামের যে আকাশ সমান ছায়া তার অনুপস্থিতি টের পাচ্ছি গত তিন বছর ধরে। ২০১৯ সালের জুন। ক্যালেন্ডারের হিসাবে দিনটা ছিল শুক্রবার, ১৪ তারিখ। বিকালে আমার বাবা যাকে আমরা ‘আব্বা’ বলে ডাকতাম তিনি শেষ ঘুমে মগ্ন হয়েছিলেন। শেষ ঘুমের আগে প্রকৃতির নিয়মে জাগতিক অনেক ঘুমে যেতেন তিনি। আমরা কেউ জানতাম না সেদিনের সেই ঘুম ছিল তাঁর শেষ ঘুম। আগের দিন থেকেই তীব্র জ্বর ছিল তাঁর। খানিক বিরতি দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন, জেগেও ওঠছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের দুপুরের পর থেকে যে ঘুমে মেতেছিলেন তার পর থেকে আর জাগেননি। এই ঘুমের সময়েই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছিলেন। বারবার তাঁর শরীরের তাপমাত্রা মাপতে এসে একটা সময়ে টের পেলাম সারা শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তাঁর। জাগাতে চেয়েও পারিনি। শেষমেশ যখন তীব্র ঠান্ডা জমেছিল তাঁর শরীরে তখন পায়ের তলার মাটিগুলো সরে গিয়েছিল আমার, আমাদের।

বাবাহীন হতে পারি আমরাও—এমন ভাবনা তাঁর অসুস্থ হওয়ার ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়লেও বিপদ ভেবে সেটা দূরে সরিয়ে রাখছিলাম। কেন আমরা বাবা-হারা হবো; আমাদের কী বাবার আশ্রয়ের দরকার নেই—এমন ভাবনায় তাঁর কাছাকাছি থেকেছিলাম শেষ কবছর। এর মধ্যিখানে কোথাও জরুরি প্রয়োজনে গেলেও তিনি ফোন দিয়ে ‘কখন ঘরে ফিরছি’ এমনটা জানতে চাইতেন বারবার। সন্ধ্যা হলেই এমন হতো নিয়মিত। ফিরে এসে খোঁজ করার কারণ জানতে চাইলে প্রতিবারই বলতেন—‘ঘরে থাকলে ভরসা পাই, মনে শক্তি পাই’। প্রথম প্রথম একথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে না পারলেও একটা সময়ে বুঝতে পারি কতটা ভরসা আর ভালোবাসা থাকলে এমন প্রশ্ন, কাছে রাখার এমন আকুতি ঝরত তাঁর। স্বজনদের কাছ থেকে শুনেছি এবং ছেলেবেলার যতটুকু মনে পড়ে আব্বা আমাকে ‘অন্ধের যষ্টি’ বলে ডাকতেন। এ কারণেই বুঝি সেই ছোটকালের যে স্বপ্ন বড়কালেও এসে সেটার ছাপ রয়ে গিয়েছিল পুরোটাই, যদিও জানি অন্ধের যষ্টি হওয়ার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি আমি।

আব্বার একাধিকবার স্ট্রোক করেছিলেন, হাই ব্লাড প্রেসার ছিল, কোলেস্টেরল সমস্যা ছিল, হার্টে রিঙ পরানো ছিল তাঁর। শেষ সময়ে এসে মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে থেকে কিডনিজনিত রোগ ছিল। ওটাই ভুগিয়েছে তাঁকে। ঢাকায়-সিলেটে একাধিকবার তাঁর কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হয়েছিল। শেষবার যখন হাসপাতালে ছিলেন তখন ১০ দিনের বেশি সময় ছিলেন আইসিইউতে। আইসিইউতে থাকাকালে ওই ইউনিটে সবসময় ঢোকা যেত না, বাইরে পায়চারি করতাম। রাতের পর রাত ঘুমহীন থেকে থেকে তাঁর সামান্য চোখ মেলার অপেক্ষা করতাম। সামান্য নড়লে-চড়লে মনে হতো প্রাণ ফিরেছে আমারও দেহে। আইসিইউ থেকে কেবিনে নেওয়ার পর সামনাসামনি থাকার সুযোগ হয়েছিল। অসুস্থ তবু মনে শান্তি ফিরত, সামনে ত আছেনই। এরপর বাড়িতে নিয়ে আসার সময়ে মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধজয় করে ফিরছি। তাঁর চিকিৎসাকালে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের করার কিছু ছিল না, কিন্তু ফিরিয়ে নিয়ে আসার সময়ে সত্যি সত্যি যুদ্ধজয়ের সেনাপতি ভাবছিলাম। এভাবে কয়েকবার, বেশ কয়েকবার। প্রতিবারই একই অনুভূতি হতো।

আব্বাকে প্রতিদিন একগাদা ওষুধ খেতে হতো। ডা. ফয়সল আহমদ, ডা. নাজমুস সাকিব, ডা. আবদুল লতিফ রেণুসহ অনেক চিকিৎসক আব্বাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর যখনই দরকার পড়েছে চিকিৎসকবন্ধু ডা. এনামুল হক এনাম, ডা. আলিম আল রাজি, ডা. সুমন দে, ডা. জোবায়ের আহমেদদের কাছে নানা পরামর্শ পেয়েছি। তাদের কারণে মনে হতো আমার আব্বা পুরোটা সময়ই আছেন চিকিৎসকের পরামর্শাধীন। তাদের সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নাই।

আমার আব্বার সঙ্গে আমার ছেলে রাইআনের দুরন্ত সম্পর্ক ছিল। কিডনি রোগ তাই টক জাতীয় কিছু খেতে ডাক্তারের বারণ ছিল। তবু মাঝে মাঝে দেখতাম আব্বা আর রাইআন দুজনে মিলে আমের আচার, বরইয়ের আচারসহ বিবিধ আচার খাচ্ছেন। দাদা-নাতির এই আচার খাওয়ার সময়টাতে অনেকবার বাধা দিয়েছি মূলত চিকিৎসকের পরামর্শের কারণে। আব্বা রাইআনকে ‘দাদা’ সম্বোধনে ডাকতেন। রাইআন যখন খুব ছোট ছিল তখন তার সামান্য কান্নাতে আব্বা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন। রাইআনের খাবারদাবারের সমস্যা হচ্ছে কি-না এনিয়ে সতর্ক দৃষ্টি ছিল তাঁর। রাইআনের দুধসহ খাবারদাবারের টাকাগুলো আব্বাই দিতেন। সময়ে সময়ে জিজ্ঞেস করতেন তার কিছুর দরকার কি না, আবার সামান্য অথচ বাচ্চাদের স্বাভাবিক কান্নাকাটিতেও ভাবতেন তার বুঝি খাবারদাবারের সঙ্কট! স্কুলে ভর্তির টাকা তিনিই দিয়েছিলেন। রাইআন-আয়ানের মাসে-মাসে স্কুলের বেতনের টাকা তিনিই দিতেন। এত বেশি কেয়ারিং ছিলেন তাদের প্রতি।

আব্বা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন, ছিলেন সাবেক জনপ্রতিনিধি। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তাঁর। ছিলেন সালিশ ব্যক্তিত্ব। নিজেদের উপজেলাসহ আশপাশের এলাকার মাঝেও পরিচিত ছিলেন তিনি। যেকোনো প্রয়োজনে এলাকায় কিংবা দূরে কোথাও গেলেও মুরুব্বিদের কারও সঙ্গে দেখা হলে এলাকার নাম বললে স্বাভাবিক প্রশ্ন ছিল—‘আজিজ উদ্দিন চৌধুরী ভাইস চেয়ারম্যান সাহেবের কিছু হই কি-না?’ পরিচয় দেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকার মানুষদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটা ভুলার মত নয়। এগুলো আদতে অর্জন। আব্বা নেই আজ তিন বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে, অথচ সেই একই পরিচিতি, একই ভালোবাসা আমরা পেয়ে যাচ্ছি। এগুলো দেখে মনে হয় আব্বা দৈহিকভাবে হয়ত নেই কিন্তু তাঁর পরিচিতি এখনও রয়ে গেছে। এগুলো দেখে একদিকে গর্ব হয়, আবার অন্যদিকে নিজেকে পিতৃহীন ভেবে বুকটা হাহাকার করে ওঠে! এই হাহাকারের যন্ত্রণা যে কতটা ভারী সেটা ঠিক ঠিক টের পাই; আমি নিশ্চিত জগতের অধিকাংশ পিতৃহীনেরাই টের পায়।

আব্বা খেলাধুলা-ভক্ত ছিলেন। দেশে যখন ক্রিকেট এত বেশি জনপ্রিয় ছিল না, তখন টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখালে সেগুলো দেখতেন। আমরাও তাঁর সঙ্গী হতাম। ফুটবলের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। রাত জেগে বিশ্বকাপের খেলাও দেখতেন। টেলিভিশনে খেলার আওয়াজ শুনলে যোগ দিতেন আমাদের সঙ্গে। পত্র-পত্রিকা পড়তেন, বইপত্র পড়তেন। সে কারণে ছোটবেলা থেকে বইয়ের প্রতি আমাদের অনুরাগও জন্মেছিল। আব্বা মারা যাওয়ার পর এবার প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল আসছে। এবার খেলাগুলো দেখা হবে না তাঁর। ব্রাজিল যদি বিশ্বকাপ জেতে সে সংবাদও জানা হবে না তাঁর!

সিলেট ভাসছে বানের জলে। আব্বার জীবদ্দশায় একাধিকবার আমরা বন্যা আক্রান্ত হয়েছিলাম। ১৯৯১ সালের বন্যায় আমাদের ঘরে পানিও উঠেছিল। তিন-রুমের পুরনো সেই ঘর এখন নেই। সে ঘরের কেবল একটি রুম ছাড়া বাকি দুই রুমে পানি উঠে পড়েছিল। সেই বন্যায় গাদাগাদি করে আমরা থেকেছিলাম সবাই একটা মাত্র ঘরে। চারদিকে পানি, উঠানে পানি; আব্বা খাবারদাবার নিয়ে আসতেন নৌকায় করে। সেই স্মৃতি এখনও ভাসে। ভাসে পরম মমতার এক পিতৃছবি যেখানে সন্তান এবং সন্তানের হাসিই মুখ্য। দেশের নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে আব্বা এলাকার মানুষদের সহায়তা দিতে আমাদের ভাইবোনদের উদ্বুব্ধ করতেন। দেশের বাইরে থাকা তাঁর সন্তানদের বলতেন কিছু করতে। তারা কখনই তাঁকে হতাশ করেনি। টাকা হাতে এলে ডেকে এনে দিতেন, অথবা আমাদের কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখনও মানুষ সে স্মৃতি রোমন্থন করে। আব্বার মৃত্যুর পর আমাদের ভাইবোন ও বোনদের স্বামীরা মিলে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা রাখে। বেশ কিছু টাকা একত্র হলে সেগুলো দেশে পাঠায় মানুষের জন্যে। মানুষকে ভালোবাসার-সহায়তা করার আব্বার যে চেষ্টা সেটাই ধরে রাখা উদ্দেশ্য আমাদের।

আমরা বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলের মানুষ বলে ঝড়বৃষ্টি নিয়মিত ঘটনাই। টিনের চালে ঝড়ের ধাক্কা লাগত নিয়মিত। ঝড় শুরু হলেই আব্বা আমাদের সাত ভাইবোনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। আমরা সবাই তাঁর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। ঝড়ে তাঁর ছিল প্রচণ্ড ভয়, তাই ওই সময়টা সবাইকে একত্র করতেন; ঘুম থেকে তোলে হলেও! এখনও ঝড় হয়, কিন্তু আগের মতো সেভাবে টের পাই না, আগের মতো কেউ আর ঝড়ে অভয় দিতে ডেকে তোলে না!

আজ বাবা দিবস। দেশে দেশে আছে এর দিবসী আয়োজনও। দিবসী এসব আয়োজন নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যত মত-প্রতিমতই থাকুক না কেন ‘বাবা’ শব্দটাই স্বতন্ত্র আবেগের, নির্ভরতা আর আশ্রয়ের। ২০১৯ সালের ১৪ জুন আমার বাবা, আমার আব্বাকে হারিয়ে আমি এবং আমরা যে নির্ভরতা আর আশ্রয় হারিয়েছি সেটা অব্যাখ্যেয়। বাবাকে হারানোর সোয়া দুইবছরের মাথায় আম্মাকেও হারিয়েছি ২০২১ সালের ২ নভেম্বর; অনেক কিছু থাকা আমাদের ঘরে মা নেই, বাবা নেই—এরচেয়ে কষ্টের আর কিছু থাকতে পারে না!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক, ইমেইল: [email protected]

ভ্রমণক্লান্ত পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী শকুন



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী। ছবি: সীমান্ত দীপু

পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী। ছবি: সীমান্ত দীপু

  • Font increase
  • Font Decrease

একপ্রাপ্ত থেকে আরেক প্রান্তে দীর্ঘ পরিযানের পথ। এর ফলেই অনেক শকুন অসুস্থ হয়ে হারায় উড়ার শক্তি। মাটিতে পড়া এই বিশাল আকৃতির পাখিটাকে দেখে ভয় পেয়ে যায় অনেকেই। ঠিক তখনই ভয়ে ভীত মানুষেরা বা অতি উৎসাহী এলাকাবাসীর আঘাতে এসব শকুনদের অসুস্থ হওয়াসহ প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে ব্যাপক।

পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো থেকে নিরাপত্তা ও খাদ্যের লোভে যেসব পরিযায়ী পাখিরা পরিযান করে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম ‘হিমালয়ী গৃধিনী’ (Himalayan Griffon Vulture)। প্রতি বছর শীতকালে এই শকুনগুলো মাইগ্রেট বা পরিযায়ন করে বাংলাদেশের সমতল ভূমিগুলোতে চলে আসে।

কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তিতে তারা আমাদের দেশে এসে অনেক সময় উড়তে পাড়ে না। মাটিতে পড়ে যায়। তখন গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা অনেক সময় অতি উৎসুক হয়ে অথবা ভয়ে সেই হিমালয় গৃধিনী শকুনদের মেরে ফেলে।

শকুন গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দীপু বলেন, আমরা কয়েক বছর আগে সিলেট অঞ্চলেও পেয়েছিলাম এমন অসুস্থ হিমালয়ী গৃধিনী শকুনদের। আমরা এগারোটা অসুস্থ শকুনদের সুস্থ করে প্রকৃতিতে ছেড়েছি। আমাদের ক্যাপভিট সেন্টারে গড়ে বিশ থেকে ত্রিশটা শকুন খাওয়াই-দাওয়াই, ট্রিটমেন্ট দিই, পরিচর্যা করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেই।

প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে আহত শকুনটিকে। ছবি: সীমান্ত দীপু

তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে আমরা প্রায় শতাধিক শুকুন সুস্থ করে ছেড়েছি। আগে যখন আমরা হিমালয়ী গৃধিনী শকুনদের নিয়ে কাজ করতাম না তখন কি পরিমাণ শকুন মারা পড়তো। প্রতি বছর শীত মৌসুমে গড়ে প্রায় ৫০টা শকুন বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে।

তাদের খাবারের অভাব সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, এরা সুদূর হিমালয়ের এরিয়া থেকে আসে। এরা অনেক অনেক দূর জার্নি করে এসে খাবার পায় না। খাবারের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ইংরেজিতে একে বলে ‘সর্টেজ অফ ফুড’ অর্থাৎ খাদ্যের সংকট। অনেক দূর জার্নি করার ফলে তাদের খাবারের প্রয়োজন পড়ে; এই জিনিসটা সঙ্গে সঙ্গে ওরা পায় না। তখন খুব দুর্বল হয়ে যায় এবং উড়তে পারে না। গ্রামের উৎসুক মানুষ এমন অবস্থায় শকুনদের বেঁধে রাখে, আহত করে বা পিটিয়ে মেরে ফেলে। কারো কারো পালক ওঠে যায়, কারো কারো পাখা ভাঙে, কারো কারো আবার পা ভাঙে। তখন আমারা এসব অসুস্থ শকুনদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি।

শকুন গবেষণা প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, হিমালয়ী গৃধিনী পরিচর্যার জন্য দিনাজপুরের সিংড়াতে একটি রেসকিউ সেন্টার তৈরি করেছে বনবিভাগ ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।

এ জাতের পাখি দেশের যেকোন জায়গায় আটকা পড়লে দ্রুত স্থানীয় বন বিভাগ বা আইইউসিএন দলকে জানান। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করছি এবং সবার সহযোগিতায় পেলে এবছরও হিমালয়ী গৃধিনী শকুনগুলোকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান শকুন গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দীপু।

;

পদ্ম বিলে সৌন্দর্যের হাতছানি



ছাইদুর রহমান নাঈম, উপজেলা করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম, কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চারদিকে ছড়িয়ে আছে পদ্ম। মৃদু হাওয়াতে দুলছে ফুলগুলো। ভোরে যেন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে রয়েছে বিলে ৷ নৌকা দিয়ে ঘুরে এমন দৃশ্য দেখার আনন্দটাই অন্য রকম। হাতের কাছে, চোখের সামনে ফুটে আছে অসংখ্য ফুল। কাছ থেকে তাকিয়ে দেখলে স্বপ্নের দেশে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়াও বিলে সাদা বক, পাতি হাঁসের সাঁতার কাটা, বিভিন্ন পাখির শব্দ মনকে উদ্বেলিত করে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের নওভাগা, খামা বিলসহ কয়েকটি স্থানে রয়েছে পদ্ম ফুল। এসব বিলে প্রায় আট থেকে ১০ মাস থাকে পানি। বিলে সৌন্দর্যের আভা ছড়াচ্ছে ফুটে থাকা রাশি রাশি গোলাপি পদ্মফুল। প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন কাছে-দূরের দর্শনার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক যুগ আগে থেকে বর্ষাকালে এ বিলের অধিকাংশ জমিতেই প্রাকৃতিকভাবে জন্মে পদ্ম ফুল। আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত এই বিলে পদ্ম থাকে। এসময় পুরো বিল গোলাপি রঙের পদ্মে ভরে ওঠে, যা দেখলে যে কারও মন জুড়িয়ে যায়।

শীত মৌসুমে বিলটি প্রায় শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়। তখন সেখানে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। আর বাকি সময় থইথই পানিতে ভরা থাকে বিলটি। সেইসঙ্গে দেশি মাছের ছড়াছড়ি এ বিলে। ফলে বছরজুড়ে এ বিল থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে গোলাপি রঙের পদ্মফুল ফুটে আছে। বিলের পানিতে শাপলা-শালুক আর পদ্মফুলের ছড়াছড়ি। বিশাল এ বিল জুড়ে এখন শুধুই গোলাপি-লাল-সাদার সংমিশ্রণে ফোটা রাশি রাশি পদ্ম ফুল। ফুলগুলো যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে। শরতের ফুল হলেও বিলে বর্ষাতেই তার সৌন্দর্য ও শুভ্রতার প্রতীক নিয়ে হাজির হয় ‘পদ্ম’। প্রকৃতিতে নিজের রূপ বিলিয়ে দিচ্ছে ফুটে থাকা এ জলজ ফুলের রাণী।

জেলা-উপজেলা ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে সৌন্দর্য পিপাসুরা বিলটিতে আসছেন। ছোট ছোট নৌকায় চড়ে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। পাশাপাশি তুলছেন ছবি-সেলফি, করছে ভিডিও।

সারা বছর পানি থাকে এমন জায়গায় পদ্ম ভালো জন্মে। তবে খাল-বিল, হাওর-বাওড়ে এ উদ্ভিদ জন্মে। এর বংশবিস্তার ঘটে কন্দের মাধ্যমে। পাতা পানির ওপরে ভাসলেও এর কন্দ পানির নিচে মাটিতে থাকে। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে গাছ বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাতা বেশ বড়, পুরু, গোলাকার ও রং সবুজ। পাতার বোঁটা বেশ লম্বা, ভেতর অংশ অনেকটাই ফাঁপা। ফুলের ডাঁটার ভেতর অংশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ছিদ্র থাকে। ফুল আকারে বড় এবং অসংখ্য নরম কোমল পাপড়ির সমন্বয়ে সৃষ্টি পদ্মফুলের। ফুল ঊর্ধ্বমুখী, মাঝে পরাগ অবস্থিত। ফুটন্ত তাজা ফুলে মিষ্টি সুগন্ধ থাকে। ফুল ফোটে রাত্রিবেলা এবং সকাল থেকে রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির পূর্ব পর্যন্ত প্রস্ফুটিত থাকে। রৌদ্রের প্রখরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফুল সংকুচিত হয়ে যায় ও পরবর্তী সময়ে প্রস্ফুটিত হয়। ফুটন্ত ফুল এভাবে অনেক দিন ধরে সৌন্দর্য বিলিয়ে যায়।

এর পাতা বড় এবং গোলাকৃতি। কোনো কোনো পাতা পানিতে লেপ্টে থাকে, কোনোটা উঁচানো। বর্ষাকালে ফুল ফোটে। হাওর-ঝিল-বিল বা পুকুরে বিভিন্ন ফুলের মতো শুভ্রতার প্রতীক সাদা পদ্মফুল ফোটে। ফুল বৃহৎ এবং বহু পাপড়িযুক্ত। সাধারণত বোঁটার ওপর খাড়া, ৮-১৫ সেমি চওড়া। ফুলের রং লাল, গোলাপি, সাদা ও সুগন্ধিযুক্ত। হিন্দুদের দুর্গাপূজার প্রিয় এ ফুল। ফুল ও ফলের ভেষজ গুণ আছে। পদ্মের মূল, কাণ্ড, ফুলের বৃন্ত ও বীজ খাওয়া যায়। পুরোনো গাছের কন্দ এবং বীজের সাহায্যে এদের বংশবিস্তার হয়। তিন ধরনের পদ্মফুল রয়েছে যেমন- শ্বেতপদ্ম, লালপদ্ম, নীলপদ্ম।

আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের জন্য খুবই উপকারী। ঔষধি গুণ ছাড়াও পদ্মচাক, বীজ ও বোঁটা সুস্বাদু খাবার। উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পুকুর-জলাশয়, লেক ও হাওর-বিলে গোলাপি পদ্ম বেশি চোখে পড়ে। সে তুলনায় সাদা পদ্ম বা পদ্মকমল অনেকটাই অপ্রতুল। আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেলেও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে সাদা পদ্ম বিলুপ্তির পথে। সাদা পদ্মের উৎসস্থল জাপান ও নর্থ অস্ট্রেলিয়া।

এর ফলের বীজ হূৎপিণ্ড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের উপকরণ হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং ডায়রিয়া রোগ সারাতে এর বোঁটা কাঁচা খেলে উপকারে আসে। পদ্মফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি লোটাস চা গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়া ও হার্টের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। হাইব্লাড সুগারও নিয়ন্ত্রণ করে। পদ্মের শুকনো মূল গুঁড়া করে খেলে ফুসফস, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্র ভালো থাকে।

;

নিউইয়র্কের দিনলিপি-২



আমান-উদ-দৌলা
নিউইয়র্কের দিনলিপি-২

নিউইয়র্কের দিনলিপি-২

  • Font increase
  • Font Decrease

১. এ সপ্তাহে অনেকগুলি সুখবর আছে নিউইয়র্কবাসীর জন্য।

ব্রডব্যান্ড ইনটারনেট ব্যবহারের জন্য স্বল্প আয়ের লোকেদের মাসে ৩০ ডলার করে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে যারা সরকারি সুবিধা পেয়ে আসছেন। ইন্টারনেট পেতে চান। তারা এপ্লাই করেন। 917-589-3923 নাম্বারে ফোন করেন অথবা [email protected] এ ইমেইল করেন।

২. স্টুডেন্ট লোন মওকুফের সবকিছু রেডি হচ্ছে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই মওকুফ করা হবে। প্রায় ৫০ হাজার ডলার করে ঋণী অনেক ছাত্র-ছাত্রী। মওকুফ হলে ওরা খুব খুশি হবে। ২৫ আগস্টের আগে লোন নিয়েছে যারা তাদের অর্থ দিচ্ছে ফেড়ারেল সরকার। তা লোন নেয়া বিভিন্ন সংস্থা বা রাজ্য সরকারকেই দেয়া হবে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত লোন যারা নিয়েছেন, তাদের কথাও ভাবা হচ্ছে।

৩. সাবওয়ের টানেলেও সবাই পেতে যাচ্ছে সেলফোন নেটওয়ার্ক। এতো দিন সাবওয়েতে মাটির নীচে স্টেশনগুলিতে চালু ছিল। নদীর নীচের টানেলে ছিল না। শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে। টানেলে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতো কয়েক মিনিট।

৪. ইলেকট্রিক ডাবল ডেকার বাস নেমেছে বেশ কিছু সিটির বিভিন্ন এলাকায়। সেখানে প্লেনের মতো চার্জার কানেকশন পয়েন্ট আছে। ধীরে ধীরে অত্যাধুনিক হয়ে উঠছে এ শহর।

৫. নিউইয়র্কের কাগজপত্র বিহীন ইমিগ্রান্টদের কার্ড আগে থেকেই চালু আছে । এবার ফেডারেল ইমিগ্রান্ট এন্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট সব রাজ্যের কাগজবিহীন ইমিগ্রান্টরা উপকৃত হবেন। তারাও আইডি কার্ড নিয়ে নির্ভয়ে চলাচল করতে পারবেন। তবে নিউইয়র্ক রাজ্য এগিয়ে আছে। তারা লোকাল ইলেকশনে ভোটও দিতে পারবেন। সেই আইন গত বছর থেকে চালু আছে।

৬. আকস্মিক খবর, প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজেই ইংগিত দিয়েছেন। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ২য় বার দাঁড়াবেন না। তাহলে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন। সামনের নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি ডেমোক্র‍্যাটরা খারাপ করেন। তাহলে আর তিনি দাঁড়াবেন না। নিউ নেশন পরিচালিত সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ২২ ভাগ আমেরিকান ভোটার ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট বাইডেন আবার দাঁড়াক। কমলা হ্যারিসেরও অবস্থা খুব ভাল না। মাত্র ১৬ ভাগ আমেরিকান তাকে ভোট দেবেন।

৭. হঠাৎ আমেরিকার সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী মিশেল সেসন ঢাকা যাচ্ছেন। আগামী ৬ আগস্ট তার যাবার কথা। বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার টানাপোড়েন চলছে। আগামী ৮ আগস্ট চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ঢাকায় যাবেন। চীনের সংগে আমেরিকার তুমুল কাণ্ড চলছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে আমেরিকা ও চীনের 'ব্যাটল গ্রাউন্ড' হয়ে আছে।

৮. বৃহত অংকের অর্থে জলবায়ু পরিবর্তনের বিল কংগ্রেস পাশ করতে যাচ্ছে। দুই দলের সিনেটরবৃন্দ মিলে পাশ করাবেন প্রধান মিডিয়ায় আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে ৪০ ভাগ ঘন কার্বন থেকে রক্ষা পাবে পৃথিবী।

*বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ থেকে নেয়া।

* আমান-উদ-দৌলা, সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক সম্পাদক-বাংলা বিভাগ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি ( ২০১৪-১৬)। সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার-দৈনিক জনকন্ঠ ( ১৯৯৪-২০০০) One of the founders and First GS of DCAB in 1998. ( Dilpomatic Correspondent Association, Bangladesh)

;

চা- শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা



সেলিম মাসুদ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট এর একটি জনপ্রিয় স্লোগান হলো 'কেউ পিছনে পড়ে থাকবে না '। সকলকে নিয়েই সবার জন্য টেকসই উন্নয়ন। চা বাগানের অধিকাংশ শ্রমিকই নারী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে তারা এখনো সমাজের মূল ধারা থেকে অনেক পিছিয়ে, এখানে দারিদ্র্যের হারও অনেক বেশি। চা শ্রমিকরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গর্ভবতী নারীর সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তাসহ প্রায় সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। এ খাতে কর্মরত শ্রমিক কম-বেশি পনে তিন লাখ। এ সব শ্রমিকের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। এসব নারী চা শ্রমিকরা বংশ পরম্পরায় এ খাতে কাজ করে থাকে।

চা উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে নবম, প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন এবং ভারত। বাংলাদেশে নিবন্ধিত চা বাগান ও টি স্টেট রয়েছে ১৬৭টি, এর মধ্যে সিলেট বিভাগে রয়েছে ১২৯টি। চা বাগান করতে গেলে ন্যূনতম ২৫ একর জমি লাগে। সে হিসেবে ৪ হাজার একরেরও বেশি নিবন্ধিত জমিতে চা চাষ হচ্ছে। তবে অনিবন্ধিত ক্ষুদ্র পরিসরের বাগানের দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২১ সালে দেশে মোট চা উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৬৫ লাখ কেজি। চা এর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চা এর চাহিদা প্রায় ১০ কোটি কেজি। আমাদের দেশিও উৎপাদন থেকে চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ হয় না, কিছুটা ঘাটতি থাকে, তা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। দুই দশক আগেও বাংলাদেশ থেকে কম বেশি এক কোটি ৩০ লাখ কেজি চা রফতানি হতো। আর এখন সেখানে খুবই সীমিত আকারে ৬ লাখ থেকে ২০ লাখ কেজি রফতানি করা হয়। কারণ আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি রয়েছে। তাই ২০২৫ সাল নাগাদ সরকার চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৪ কোটি কেজি। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার ইতিমধ্যে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের চা চাষিদের ' ক্যমেলিয়া খোলা আবাশ স্কুলের ' মাধ্যমে চা আবাদ বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিতকরণ ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে। এর ফলে সমতলে চা বাগান ও ক্ষুদ্র চা চাষিদের চা উৎপাদন ২০২০ এর থেকে ২০২১ সালে ৪১ শতাংশ বেশি হয়েছে, যা এ খাতের জন্য আশাব্যাঞ্জক। সত্তর দশকে প্রতি হেক্টর জমিতে ৭৫০ কেজির মতো চা উৎপাদন হতো। আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে চা উৎপাদনের ফলে এখন জমি ভেদে প্রতি একরে কম বেশি ১ হাজার ৫ শত থেকে ৩ হাজার ৫ শত কেজি চা উৎপাদন হচ্ছে। চা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো প্রচুর বৃষ্টিপাত ও উঁচু জমি। যেন প্রচুর বৃষ্টি হলেও দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয়ে যায়।

নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এ ছয় মাস হলো শুষ্ক মৌসুম, এসময় চা এর ফলন ঠিক রাখতে খরা সহিষ্ণু চা এর দুইটি জাত উদ্ভাবন করছে আমাদের চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিরা। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর একটি হলো চা। চা পান সর্বপ্রথম শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ২০০ চীনে। পৃথিবীতে যত ধরনের চা উৎপাদন হয় তার সবই তৈরি হয় ক্যামেলিয়া সিনেসিস থেকে। এই চির হরিৎ গুল্ম বা ছোট গাছ থেকে পাতা এবং এর কুঁড়ি সংগ্রহ করে তা চা উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের চা এর মধ্যে উদ্ভিদের ধরনের এবং উৎপাদনের প্রক্রিয়াতে ভিন্নতা রয়েছে।

আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষের আসাম ও তৎসংলগ্ন এলাকায় প্রথম চা চাষ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে চা আবাদের জন্য ১৮২৮ সালে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেখানে চা চাষ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম শহরের বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় একটি চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা কুন্ডদের বাগান নামে পরিচিত। তারপর ১৮৫৪ সালে মতান্তরে ১৮৪৭ সালে বর্তমান সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোড়ের কাছে মালিনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠা হয়। মূলত মালিনীছড়া চা-বাগানই বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান। দেশ স্বাধীনের পূর্বে বাংলাদেশে মূলত দুইটি জেলায় চা বাগান ছিলো। এর একটি সিলেট জেলায়, যা সুরমা ভ্যালি এবং অপরটি চট্টগ্রাম জেলায় যা হালদা ভ্যালি নামে পরিচিত ছিল।

বাংলাদেশ বিশ্বের একটা বড়ো চা উৎপাদনকারী দেশ। চা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের বড়ো দশটি চা বাগান আছে আমাদের দেশে। চা শিল্পের সাথে জড়িত অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন এবং হচ্ছেন। পাশাপাশি একশ্রেণির দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু চা বাগানের দরিদ্র শ্রমিকদের বছরের পর বছর তাদের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না। নারী প্রধান চা শ্রমিক পরিবারের দারিদ্র্যের হার খুব বেশি। চা শ্রমিকদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার খুব বেশি। যদিও সরকারি, বেসরকারি এবং এনজিও চা শ্রমিকদের বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করতে নানা রকম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্যবিবাহের হার কিছুটা কমেছে। তবে তা কোনোভাবেই যথেষ্ট না।

চা বাগানের শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। একজন চা শ্রমিক দৈনিক ১২০ টাকা হারে মজুরি পান, এর সাথে রেশন পান। বাগানে সাধারণত একটি পরিবারের দুই তিনজন আয় করে। কিছু সীমিত চিকিৎসা সুবিধা, শিশুদের জন্য লেখাপড়াসহ আরও কিছু সুযোগ সুবিধা আছে। তবে বাগান ভেদে এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক চা বাগানের মালিকরা স্থায়ী চা শ্রমিকদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করেছে। ৬০ বছর বয়সে অবসরে যাওয়ার সময় তারা একটা এককালীন আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন এবং ১৫০-২০০ টাকা মতো সাপ্তাহিক ভাতা পেয়ে থাকেন। যিনি অবসরে যান তার শূন্য পদে পরিবারের সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থাও করা হয়। চা শ্রমিকদের কম বেশি ৬০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশের প্রায় শতভাগ শিশু প্রাথমিকে ভর্তি হয়। চা বাগানগুলোতে ১৭০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এছাড়াও আছে এনজিওদের নানা রকম শিক্ষা কর্মসূচি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক শিক্ষাভাতা চালু আছে, কিন্তু এনজিও স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য কোন ভাতার ব্যবস্থা নেই। তবে চা বাগানের দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ইতিমধ্যে শতভাগ শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করতে নানা রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এটি একটি চলমান কার্যক্রম।

চা বাগানে ১৯৩৯ সাল থেকে মাতৃত্ব আইন চালু আছে। একজন গর্ভবতী নারী ৮ থেকে ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন সুবিধা পান। তাদের জন্য প্রশিক্ষিত মিডওয়াইভস, নার্স ও চিকিৎসক রয়েছে। তবে এ সুবিধা শুধু মাত্র নিবন্ধিত শ্রমিকদের জন্য। চা বাগানের অবস্থান প্রান্তিক অঞ্চলে হওয়ায় এ বাগানগুলোর আশেপাশের তেমন কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠে নি। চা বাগানে বিশ্রামের জন্য কোন বিশ্রামাগার নেই, পানির ব্যবস্হা নেই। দূষণের কারণে সাধারণত কোন ফসলের পাশে শৌচাগার থাকে না। এজন্য চা বাগানের থেকে শৌচাগার দূরে রাখা হয়। এতে চা বাগানের নারী শ্রমিকদের জন্য সমস্যা হয়ে থাকে। চা শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সরকার ২০১৬ সালে চা শিল্পের জন্য একটি রোড়ম্যাপ করে যা ২০১৭ সালে অনুমোদন পায়। এখানে চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ৫০ হাজার চা শ্রমিককে সরকার প্রতিবছর এককালীন পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করে থাকে। এছাড়াও সারা দেশের ন্যায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী, শিক্ষা উপবৃত্তি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী জীবনমান উন্নয়ন ভাতাসহ সকল সরকারি সুবিধা চা বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলো পেয়ে থাকে।

বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ এর মধ্যে এসডিজি এবং ২০৪১ এ উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মানে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ। এরই ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে চা শিল্পের উন্নয়ন এবং এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন অংশীজনের কল্যাণে চাহিদার ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গর্ভবতী নারীদের সেবাসহ চা বাগানের দরিদ্র শ্রমিকদের জাতীয় গড় উন্নয়নের মূল ধারায় সংযুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে। এসকল কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি দারিদ্র্যমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে বসবাস করবে,এটাই প্রত্যাশা।

;