ঈদের বদলে যাওয়া



মযহারুল ইসলাম বাবলা
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

কালের বিবর্তনে কেবল ঈদই বদলে যায় নি। বদলেছে সমাজ, পরিবার, ব্যক্তি, পরিবেশ-প্রকৃতি, সামষ্টিক জীবনাচার হতে সমস্তই। একমাত্র ব্যতিক্রম রাষ্ট্র, শাসন ব্যবস্থা, শাসক চরিত্র। সেটি উপনিবেশিক আমলের ধারাবাহিকতায় আজও অনড় অবস্থানে। আমাদের সমাজজীবনে ঈদের এই বদলে যাওয়ার পেছনে সঙ্গত কারণ অবশ্যই রয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার চরম প্রভাবে সামষ্টিক চেতনা-দৃষ্টিভঙ্গি বিলুপ্তির পথ ধরেই ঈদের এই বদলে যাওয়া। আমাদের সমাজ-জীবনে ধর্মীয় এবং জাতিগত উৎসব-পার্বণসমূহও আর পূর্বের ন্যায় নেই। কালের পরিক্রমায় সেগুলোর আচার-আনুষ্ঠানিকতাও বদলে গেছে। অতীতে দেখা ঈদের সঙ্গে এখনকার ঈদের বিস্তর ব্যবধান। একশত আশি ডিগ্রি বৈপরীত্য বললেও ভুল হবে না। ঈদের সামাজিকতার যে চিরচেনা ছবিটি আমাদের মনোজগতে স্থায়ীরূপে ছিল, বর্তমানের ঈদের সঙ্গে তা মেলানো যায় না। অতীতের ঈদের স্মৃতিকাতরতায় সংক্ষিপ্তভাবে তার চিত্র তুলে ধরবো। অনেকের কাছে এখনকার বাস্তবতায় সেটা রূপকথার ন্যায় মনে হতে পারে।

ঈদ উৎসবের প্রধান উপাদানটি সামাজিকতা। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যরে নির্মল প্রতীক। ঈদকে কেন্দ্র করে নজরকাড়া বৈষম্য আমরা এখন প্রবলভাবে প্রত্যক্ষ করি। অতিমাত্রায় ভোগ-বিলাসে মত্ত হবার প্রবণতাও দেখে থাকি; অতীতেও ছিল, তবে এরূপ মাত্রাতিরিক্ত ছিল না। ঈদের আনন্দ সবাই মিলে ভাগ-বাঁটোয়ারায় পালনের সংস্কৃতি ছিল। সেটি কালের গর্ভে এখন বিলীন হয়েছে। একটি শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রেণিগত ব্যবধান-বৈষম্য অতীতেও ছিল। কিন্তু এত অধিক মাত্রায় প্রকটভাবে ছিল না। আমরা ক্রমেই যে ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়েছি, সেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এখানে পুঁজিই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রকের চালিকা শক্তিরূপে রাষ্ট্রে-সমাজে, এমন কি পরিবারের অভ্যন্তরে পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। মানুষে মানুষে যে সহজাত সম্প্রীতির বন্ধনগুলো ছিল সেগুলো ছিন্ন এবং লুপ্ত হবার পথ ধরেছে। অথচ ঈদ উৎসবের প্রধান উপাদানটি সম্প্রীতির নির্মল সামাজিকতা। অতীত আর বর্তমানের ঈদের প্রধান পার্থক্য এখানেই। অতীতে সমষ্টিগতভাবে উৎসব পালনের রীতি-রেওয়াজ ছিল।

পারিবারিক এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতাও এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতো। এখন সেসবের বালাই নেই। এখন প্রত্যেকে যার-যার, তার-তার। অর্থাৎ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার অদৃশ্য জালে সামাজিক চেতনা আটকে পড়েছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় সেই জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার উপায়-সম্ভাবনা নেই। এই জাল অর্থাৎ মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের মৌলিক দর্শনের অন্তর্গত। ব্যবস্থা না পাল্টানো অবধি ঐ জালে আমরা আরো বেশি জড়িয়ে পড়বো। পরষ্পর পরষ্পর থেকে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো। তাই সর্বাগ্রে জরুরি ব্যবস্থার পরিবর্তন। সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের জীবনে সমষ্টিগত বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটবে না। বরং উত্তরোত্তর সেটা বৃদ্ধি পাবে।

পূর্বেকার ঈদ কেমন ছিল? সেকালের ঈদের প্রধান উপাদানটিই ছিল সামষ্টিক সামাজিকতা। ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ঈদে ধর্মীয় আচার বলতে দুই রাকাত ওয়াজেব নামাজ আদায় ব্যতীত আর কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নেই। ওয়াজেব নামাজ ফরজ নয়। ফরজ আদায়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা থাকে। ওয়াজেব-এর ক্ষেত্রে সেটি নেই। সকল সম্প্রদায়েরই ধর্মীয় উৎসব-পার্বণ রয়েছে। সে সকল উৎসবসমূহে ধর্মীয় আচারের তুলনায় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতাই সর্বাধিক। উৎসবসমূহকে সম্প্রদায়গত সীমা অনায়াসে অতিক্রম করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। আমাদের ভূখ-ে এক সময়ে ধর্মীয় উৎসবে অন্য সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের অজস্র নজির ছিল। ঈদ, পূজা, বড়দিনে বন্ধু, প্রতিবেশী হতে সামাজিক সম্পর্ক-সম্প্রীতিতে একে-অন্যের ধর্মীয় উৎসবে আমন্ত্রিত হত। যাওয়া-আসা, শুভেচ্ছা বিনিময় করতো। সম্প্রদায়গত ভিন্নতার পরও পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সামাজিকতার সংস্কৃতি ছিল। রক্তাক্ত দেশভাগে সেই সম্পর্কের বিনাশ ঘটে। আজাদ পাকিস্তানে ধর্মীয় জাতীয়তার চরম মাশুলের মুখে আবার জাগরণ ঘটে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার। সেই সুবাধে জাতিগত ঐক্য-সংহতির দুয়ার উন্মুক্ত হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর এই বাংলাদেশে আবার সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দেবে; সেটা ছিল কল্পনার অতীত। সামরিক শাসকদের বদৌলতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দুয়ার উন্মোচনের পথ ধরে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড়-বাড়ন্ত বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভবিতব্য এই যে, বেসামরিক তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনামলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান ঘটেনি। ভোটের রাজনীতির নিয়ামক শক্তিরূপে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সুরক্ষা ও বিকাশে যুক্ত দেশের এযাবৎ কালের প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার। তুলনা বিচারে কম-বেশি হতে পারে কিন্তু ঐ ঘৃণিত পথটি কেউ পরিহার করে নি। উন্মুক্ত রেখেছে স্বীয় স্বার্থে।

কৈশোরে দেখেছি মাসব্যাপী রোজার শেষে ঈদের চাঁদ দেখতে মানুষ বাড়ির ছাদে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ভীড় করতো। চাঁদ দেখামাত্র শুরু হয়ে যেত আনন্দের উল্লাস প্রকাশ। পটকা, বাজি ফুটিয়ে আগত ঈদের আনন্দ প্রকাশ করা ছিল গতানুগতিক। মসজিদে-মসজিদে সাইরেন বাজিয়ে আগামীকালের ঈদের সংবাদ প্রচার করত। মসজিদ সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি অলিতে-গলিতে ঢুকে ঈদের নামাজের সময়সূচী চিৎকার করে বলে যেত। রেডিও-তে বেজে উঠতো কাজী নজরুল ইসলামের গান-রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদসহ বিভিন্ন ঈদকেন্দ্রিক গান। আজকে যেটা পুরান ঢাকা নামে খ্যাত। ঢাকা বলতে তখন ছিল এই পুরান ঢাকা’ই। নতুন ঢাকার গোড়াপত্তন শুরু হয়েছে। তবে তেমন জনবহুল হয়ে ওঠেনি। এই পুরান ঢাকার ঈদের সামাজিকতা একমাত্র গ্রামের সামাজিকতার সঙ্গেই তুলনা চলে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের দুঃখে-সুখে নিকট আত্মীয়ের ন্যায় সংলগ্ন হবার সামাজিক সংস্কৃতি ছিল। যেটি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় নি। তবে স্বীকার করতে হবে কমেছে।

ঈদের আগের দিনকে চাঁনরাত বলার রেওয়াজ ছিল। চাঁনরাতে পুরান ঢাকার যুবকেরা মাসব্যাপী রোজার সংযমের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে মদ্যপানে মাতলামিতে মত্ত হত। তাদের মাতলামিতে রাস্তা-সড়কে, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী সিঁড়ি ঘাটের পরিবেশ ভয়ঙ্কর হত। রাতে তারা এদিক-সেদিক পড়ে থাকতো। কাকভোরে বাড়ি ফিরে গা-গোসল করে নতুন জামা-কাপড় গায়ে চড়িয়ে ঈদের নামাজে শামিল হত। মেয়েরা মেহেদী লাগাতো গভীর রাত অবধি। কম-বেশি প্রায় সকলের বাড়িতে মেহেদী গাছ ছিল। বাজার থেকে মেহেদী কিনে পাটায় বেঁটে মেহেদী লাগানোর সংখ্যা ছিল খুবই স্বল্প। ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যেতো ঈদের বিশেষ রান্নার আয়োজন। এখনকার ন্যায় তিন-চার দফায় ঈদের জামাতের নজির ছিল না। মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার আধিক্য তখন ঘটেনি। একবারই ঈদের নামাজ হত মসজিদে।

নামাজ শেষে গণকোলাকুলি-শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে বাড়ি ফিরতে দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হত। সবার সঙ্গে সবার আত্যন্তিক যোগসূত্রতা ছিল। ঈদের দিনে সেটা রক্ষা না করা ছিল অপরাধতুল্য। আমরা যারা কিশোর বয়সী ছিলাম। আমরাও পাড়া-মহল্লার সহপাঠিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে অনেক সময় পরে বাড়ি ফিরতাম। গুরুজনদের সালাম করে সেলামি না পাওয়া পর্যন্ত নড়তাম না। বাড়ির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ছুটতাম আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশীদের বাড়ির অভিমুখে। সালাম করা এবং সেলামি আদায়ই ছিল মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি ছিল সামাজিকতার দায়ভার। কারো বাড়িতে ঈদের দিন না গেলে তীব্র কটু কথা শুনতে হত। সবার বাড়িতে সবার যাওয়ার সামাজিক রেওয়াজ পালন করা ছিল বাধ্যবাধকতার অন্তর্গত।

সড়কের পাশে হরেক খাবারের দোকানে নানা পদের আকর্ষণীয় খাবার কিনে খাওয়ার প্রবণতা কিশোরদের মধ্যে দেখা যেত। সেলামির কাঁচা পয়সা ঝনঝন করতো সবার পকেটে। চারআনা-আটআনায় তখন প্রচুর চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। সহপাঠি বন্ধুরা এমন কি হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধুরা পর্যন্ত দল বেঁধে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে চকবাজারের ঈদের মেলা দেখা, মেলার সামগ্রী কেনা, দূরে বসবাসরত আত্মীয়-পরিজনদের বাড়িতে যাওয়া-সেলামি সংগ্রহ এসব ছিল ঈদের দিনের গতানুগতিক বিষয়। দলভুক্তদের যে-কোন একজনের আত্মীয় বাড়িতে গেলে সবাই সমান সমাদর-সেলামি পেতাম। খাবারের জন্য জোর তাগিদ উপেক্ষা করতাম সময় ক্ষেপণের ভয়ে। দিনটি গত হলে তো সব সুযোগই হাতছাড়া হয়ে যাবে।

সব আত্মীয়দের বাড়িতে যাবার আনুষ্ঠানিকতায় বহুক্ষণ পেরিয়ে যাবে, সেই শঙ্কায় সালাম শেষে সেলামি নিয়েই এক প্রকার ছুটে অপেক্ষমান ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়তাম। বিকেলের দিকে বর্তমানের সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ঢাকার চিড়িয়াখানায় যেতাম। বর্তমানে যেখানে জাতীয় ঈদগা সেখানে ছিল ঢাকার চিড়িয়াখানা। সন্ধ্যে নাগাদ বাড়ি ফিরে আসতাম। পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হবার পর স্থানীয় অনেকের বাড়িতে টিভি ছিল, তাদের বাড়িতে টিভি দেখতে যেত সবাই। উঠানে টেবিলে এনে টিভি বসিয়ে সবার জন্য টিভি দেখার ব্যবস্থা করত। ছোটরা মাদুরে এবং বড়রা চেয়ারে বসে অনেক রাত অবধি একত্রে টিভির অনুষ্ঠান দেখতো সবাই।

স্কুল-কলেজে পড়ুয়া মেয়েরা দল বেঁধে পাড়ার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করত। বান্ধবীদের সবার বাড়িতে সবাই যাওয়া-আসা করতো। অতিথি আপ্যায়নের জন্য সেমাই-পায়েস ইত্যাদি মিষ্টি জাতীয় খাবার ঘরে-ঘরে তৈরি করা থাকতো। কেনা সেমাইর প্রচলন ছিল না। হাতে ঘুরানো কলে ঈদের আগে বাড়িতে-বাড়িতে সেমাই তৈরি করতো। রোদে শুকিয়ে হালকা আঁচে ভেজে তুলে রাখতো ঈদের অপেক্ষায়। সবার বাড়িতে অভিন্ন প্রচলন। মহিলারাও বিকেলে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের বাড়িতে শুভেচ্ছা বিনিময়ে যাওয়া-আসা করত। প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়িতে ঈদের দিন যাওয়া ছিল ঈদের অনিবার্য সামাজিকতা।

ঈদে কে কত দামি জামা কিনেছে সেসব নিয়ে তেমন কারো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল না। নতুন জামা-জুতা হলেই বর্তে যেতাম। বাহারি চটকদার পোশাকেরও তেমন প্রচলন ছিল না। ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা নয়। তবে সংখ্যায় অতি নগণ্য। স্থানীয় যুবকদের ঈদের আনন্দ ছিল ভিন্নতর। সড়কে-বুড়িগঙ্গার পাকা সিঁড়ি ঘাটে মাইক বাজিয়ে আনন্দ করতো। সিঁড়ি ঘাটে যত্রতত্র তাস খেলতো। দল বেঁধে রূপমহল, তাজমহল, মুকুল (আজাদ), মানসী (নিশাত), শাবিস্তান, লায়ন, স্টার, মুন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ছুটতো ঈদে মুক্তি পাওয়া লাহোরে নির্মিত উর্দু ছবি দেখতে। স্থানীয় যুবকদের নিকট সাবিহা-সন্তোষ, মোহাম্মদ আলী-জেবা,ওয়াহিদ মুরাদ-রানী প্রমুখ পাকিস্তানি তারকারা ছিল জনপ্রিয়। এসবের বাইরেও তাদের পরস্পরের ঈদের সামাজিকতা ছিল। দূর-দূরান্তের বন্ধুরা ছুটে আসতো। আবার এখান থেকেও অনেকে দলবদ্ধভাবে যেত বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে।

ঈদের দিন উৎসব মুখর আনন্দ সর্বত্র বিরাজ করতো। হরেক প্রকারের আনন্দে মেতে থাকতো সবাই। ছাদে কিংবা বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঘুড়ি উড়ানোও ছিল ঈদের আনন্দের অংশ। বিভিন্ন রঙের ঘুড়িতে আকাশ ছেয়ে যেত। সম্প্রদায়গত ভিন্নতা এদিনে ম্লান হয়ে যেত। অনেক হিন্দু বন্ধুরাও আমাদের দলভুক্ত হয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতো। ঈদে ধর্মীয় আবেদনের চেয়ে সামাজিক আবেদন অধিক। পাকিস্তানি রাষ্ট্রে তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ক্রমেই বিকশিত হচ্ছিল। সে কারণে ধর্মীয় জাতীয়তা বাঙালিরা প্রায় পরিত্যাগে দ্বিধাহীন হয়ে উঠেছিল। এসকল কারণে ঈদ উৎসবে অসাম্প্রদায়িকতা বিকাশ লাভ করছিল। স্থানীয় যুবকদের নিকট যেমন লাহোরের ছবি জনপ্রিয় ছিল। পাশাপাশি তরুণ ও মাঝ বয়সী নারী-পুরুষদের নিকট ঢাকায় নির্মিত বাংলা ছবি অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে পরিবারসহ বাংলা ছবি দেখার প্রবণতায় বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখার মধ্যেও এক ধরনের সামষ্টিক সামাজিকতা ছিল। যেটি এখন আর পাওয়া সম্ভব নয়।

একালের ঈদ মানেই বিলাস এবং ভোগবাদিতায় পূর্ণ। কে-কত মূল্যের কতটা এবং কোন বিখ্যাত শপিং মল থেকে ঈদের পোশাক কিনেছে, এনিয়ে গর্বে মশগুল থাকা। আর ঈদে সামষ্টিক সামাজিকতা বলে এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই। সময়টা এখন যার-যার, তার-তার বলেই সঙ্গত কারণে সবাই ঘরে ঘরে অনেকটা বন্দীদশায় ঈদ পালন করে। একের পর এক পোশাক বদল করে, নিজের পোশাক নিজেই দেখে। অন্য কেউ দেখে প্রশংসা করলে নিশ্চয় গর্বিত ও খুশির সুযোগ হত। কিন্তু কার পোশাক কে দেখে। যার যারটা নিয়ে সবাই ব্যস্ত। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ে আত্মীয়-পরিজনদের বাড়িতে এখন আর কেউ যাওয়া-আসা করে না। বড় জোর মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠিয়ে সেই দায় থেকে পরিত্রাণ নেয়। মোবাইল-ফেইসবুক নামক প্রযুক্তির আগমনে দৈহিক যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। অপর দিকে প্রযুক্তিগত বার্তা বিনিময়কে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম রূপে প্রচারণা করা হয়ে থাকে। বিষয়টি হাস্যকর রূপেই বিবেচনা করা যায়।

ঈদের নামাজ এখন মসজিদে-ঈদগাগুলোতে তিন-চার দফায় আদায় হয়ে থাকে। সকল টিভি মিডিয়াতে দেশব্যাপী ঈদের কয়েক দফা নামাজের সময়সূচী ও স্থানসমূহের নাম ঘন ঘন সম্প্রচারিত হয়। ঈদের দিন বেশিরভাগ মানুষই ঘরে বসে-টিভি দেখে ঈদ পালন করে। নিকট আত্মীয়দের বাড়িতে পর্যন্ত অনেকের যাওয়া-আসা নেই। একান্ত পারিবারিক সীমায় প্রায় প্রত্যেকে সীমাবদ্ধ। একই ভবনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস অথচ কারো সাথে কারো সম্পর্ক-যোগাযোগ কিছুই নেই। অপরিচিতমাত্রই অবাঞ্ছিত বলে জ্ঞান করে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার এই যুগে সামষ্টিক সামাজিকতার দৃশ্যমান কিছু নেই। ঈদকে কেন্দ্র করে সুপার মলগুলোতে যেরূপ রমরমা বেচা-বিক্রি, জনসমাগম ঘটে, ঈদের দিন তার প্রতিফলন আমরা দেখি না। বোকা বাক্স নামক টিভি মানুষকে গৃহে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে; মানুষ স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্নতাকে বরণ করার কারণেই।

ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষের পরিমাণ কিন্তু কম নয়। বাস, ট্রেন, লঞ্চে চেপে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রচুর মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটে যায়। সেটা ঐ সামষ্টিক সামাজিকতার টানে। গ্রামে এখনও সামাজিকতা বিলীন হয়ে যায়নি। ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষের সিংহভাগই হচ্ছে স্বল্প আয়ের নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশও ঈদে গ্রামে যায়। আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনে। তবে সংখ্যায় স্বল্পই বলা যাবে। বিত্তবান শ্রেণি আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে এমন কি দেশত্যাগে বিদেশে পর্যন্ত ঈদ উদ্যাপন করে। আমাদের বিত্তবান শ্রেণির মধ্যে এধরনের প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। অনেকে ঈদের কেনাকাটার জন্য ছুটে যায় বিদেশে।

লাগেজ বোঝাই করে ঈদের বাজার নিয়ে দেশে ফিরে আসে এবং গর্বে-গৌরবে সে কথা প্রচার করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। ঈদে বৈষম্য পূর্বেও ছিল। আজও আছে। তবে মাত্রাটা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একে অপরের বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে যাওয়া আসায় প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়ির খাবারের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পেতো। এখন সেটা তিরোহিত। সবার বাড়ির রান্না করা ঈদের খাবারও এক নয়, ভিন্নতর। এটা নির্ভর করে ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থানের ওপর। শ্রেণি পার্থক্যে বর্তমান সময়ে সমশ্রেণির বাইরে কেউ কারো নয়। শ্রেণি সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক টিকে থাকা-না থাকা নির্ভর করে। এখনকার ঈদে শহরে উৎসব-আনন্দ চোখে পড়ে না।

স্বল্প আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাবার কারণে ঈদের পূর্ব হতে পরবর্তী চার-পাঁচ দিন শহর ফাঁকা হয়ে যায়। গ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা শহরের আশিভাগ মানুষের অথচ বিত্তবান শ্রেণি গ্রামচ্যুত। পরিজন-সমাজ এবং সামষ্টিক সামাজিকতা বিচ্যুত। তারা যে গ্রাম থেকে এসেছে সে কথাও তাদের বোধকরি স্মরণে নেই। শ্রেণি উত্তোরণে অতীতের আত্মীয়-পরিজন, সামাজিকতা কেবল ভুলেই যায় নি। সচেতনভাবে পরিত্যাগ করে সমশ্রেণির মধ্যে বিলীন হয়ে পড়েছে। এই সকল বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করার ক্ষেত্রে ঈদ একটি সম্ভাবনাময় উপলক্ষ। যেটা নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষেত্রে আমরা দেখে থাকি। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে সেটা অবান্তররূপেই গণ্য করা যায়।

ঈদ নিশ্চয়ই আনন্দের উৎসব। কিন্তু বর্তমানে ঈদে আমরা কিন্তু সমাজ জীবনে সর্বাধিক বৈষম্য দেখে থাকি। সমাজের সুবিধাভোগী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এক কাতারে নামাজ আদায় করলেও সকলের পরিধেয় বস্ত্র এক তো নয়-ই, ভয়ানক মাত্রায় বৈষম্যপূর্ণ। কতিপয়ের বিত্ত-বৈভবে ভোগ-বিলাসিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের পোশাকে-আচরণে, খাওয়া-খাদ্যে ইত্যাদিতে।

আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য আকাশপাতাল ব্যবধানসম। রোজার মাসে ধর্মীয় অনুশাসনে যাকাত প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। অবশ্য যাকাত প্রদানের বিষয়টি সমাজে বৈষম্যকেই স্থায়ী করেছে। ধনীরা যাকাত দেবে আর দরিদ্ররা হাত পেতে নেবে। যাকাত আদান-প্রদানের ব্যবস্থাটি সমাজের শ্রেণি বৈষম্যকেই সু-নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন বস্ত্রের দোকানে ব্যানার টাঙিয়ে যাকাতের কাপড় (শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদি) বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। যাকাতের কাপড় মাত্রই অত্যন্ত নিম্নমানের এবং স্বল্পমূল্যের। সকল দোকানি ঐ স্বল্প মূল্যের এবং অতি নিম্নমানের যাকাতের বস্ত্র বিক্রি করে না। যে সমস্ত দোকানে তা বিক্রি হয়, সে সকল দোকানে বিজ্ঞাপন প্রচারের আবশ্যিকতার প্রয়োজন হয়।

সমাজের বিত্তশালী অংশ যাকাতের বস্ত্র বিলি বণ্টনে নিজেদের দাতারূপে জাহির করতে যে পন্থাটি অবলম্বন করে থাকে; এতে অসহায় মানুষের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর প্রচুর ঘটনাও ঘটে থাকে। ঈদ নিশ্চয় আনন্দ-উৎসব। তবে সবার জন্য নয়। ঈদে নজরকাড়া বৈষম্য অত্যন্ত তীব্ররূপে দেখা যায়। রোজা-ঈদ যেন বিত্তবানদের আহার-ভোজন এবং সীমাহীন ভোগ বিলাসিতা মেটাতেই আসে। খাদ্য-দ্রব্য পণ্যের বাজার অধিক মাত্রায় চড়া হবার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠদের নাকাল হতে হয়। ঈদের আনন্দের বার্তা সকলের জন্য সমানভাবে আসে না। আসা সম্ভবও নয়। বিদ্যমান বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সেটা আশা করাও মূর্খতা।

সকল উৎসব-পার্বণে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক, উৎসবকে অসাম্প্রদায়িক রূপে গড়ে তোলা। দুই, সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন করা। এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সমাধান সম্ভব হলেই ঈদসহ সকল উৎসব-পার্বণ সর্বজনীন হবে এবং পরিপূর্ণরূপে সকলের জন্য উৎসবের আনন্দ নিশ্চিত করতে পারবে। নয়তো ঈদ আসবে-যাবে, কেউ কেউ ভোগবাদিতায় ভাসবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠরা চেয়ে চেয়ে কেবল দেখবে। উপভোগে বঞ্চিত হবে। সেক্ষেত্রে ঈদ-পার্বণের আবেদনও পূর্ণতা পাবে না।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

তকমা, ক্ষোভ অভিমান ও নিষ্ঠুরতার হোলি



-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
তকমা, ক্ষোবাভিমান ও নিষ্ঠুরতার হোলি

তকমা, ক্ষোবাভিমান ও নিষ্ঠুরতার হোলি

  • Font increase
  • Font Decrease

কোটা সংস্কার নিয়ে ১ জুলাই ২০২৪ ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়ে প্রথম শুরু হয় প্রতিবাদ। এটা কোন দলীয় বা রাজনৈতিক কর্মসুচি ছিল না, এখনও নয়। দলমত নির্বিশেষে এটা সকল শিক্ষার্থীর আন্দোলন। তাই এ সপ্তাহ না পেরুতেই এর সমর্থন ও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে গেছে। কিন্তু একে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক তকমা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ তকমা এসেছে উচ্চ পর্যায় থেকে রাজাকারের ‘নাতিপুতি’ নামক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে। এটাকে কোমলমাতি শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারেনি। তারা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতিপুতি অথবা মুত্তিযোদ্ধা পরিবারের হওয়ায় তাদের অন্তরকে ক্ষোভের আগুনে উদ্দীপ্ত করে তুলেছে। তারা এই তকমাকে মিথ্যা অপবাদ ও চরম অপমানজনক হিসেবে ধরে নেয়ায় এটা তাদের আন্দেলনে ভস্মে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে চারদিকে।

এটাকে মনের অভিমানে তারা নিজেদেরেকে রাজাকার বলে যখন ব্যঙ্গ করে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ মুরু করেছে তখনও তাদের অভিমানকে কেউ পাত্তা দেয়নি। বরং উল্টো তাদেরকে আরো বেশী করে রাজাকারের ‘নাতিপুতি’ অপবাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টায় মেতে উঠে এক শ্রেণির সুবিদাবাদী নেতা। কারো যৌক্তিক প্রশ্ন বা কোনকিছুর উপর সঠিক যুক্তি দিতে অপারগ হলে বিভিন্ন অপবাদ দেয় অথবা কথার ফাঁকে রাজাকার হিসেবে গালি দিয়ে দেয়। অনেকে কথায় কথায় একজন শিশু-কিশোরকেও এমন টিজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হিন্দু ছাত্রকেও স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, শিবির হিসেবে ট্যাগ দিয়ে চাঁদা আদায় করতে দেখা গেছে। এমন ঘটনা বেশ কবছর ধরে পত্রিকায় লক্ষ্যণীয় হচ্ছিল।

এসব ভুঁইফোড় নেতাদের দম্ভ, উন্নসিকতা, হম্বিতম্বি তখন দেখার মতো ছিল। তাদের কথাগুলো সাড়ম্বরে প্রচারিত হয়ে আন্দোলনকারীদের অন্তরকে আরো বেশী বিষিয়ে তোলে। ফলে এসব মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে না পেরে তারা সরকারী ছাত্ররাজনীতি থেকে পদত্যাগ করে ফেসবুকে স্টাটাস দিয়ে দলে দলে আরো বেশী কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠে।

তাদের এই দু:খ, কষ্ট, অভিমানকে সরকারী মহলের কেউই পাত্তা দেননি। বরং বিভিন্ন উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে সরকারী ছাত্রসংগঠন থেকে আরো দূরে ঠেলে দিয়েছেন। এ থেকে ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। তাদেরকে লুফে নিয়ে এটাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের ব্যানারে ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে, সারা পৃথিবীতে। তাদের সমর্থক বেড়ে লক্ষ কোটি জনতায় পরিণত হয়ে পড়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী এসকল নিরীহ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় সাফল্য হলো- খুব দ্রুতগতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন লাভ করা। তারা দেশের অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলের সমর্থন লাভ করতে থাকে এবং এর সাথে অভিভাবক, সাধারণ মানুষ তাদের জন্য দরদী হয়ে উঠে। ফলে তারা অসীম সাহসী ও জেদী হয়ে উঠে এবং তাদের দাবী আদায়ে অনড় থাকে।

দেশের কর্ণধারগণ তাদেরকে অনেকটা দূরে ঠেলে দেয়ায় তারা মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট স্মারকলিপি দিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা শুরু করে। সেখানে কিছুটা আশ্বাস পেলেও তা তৎক্ষণিকভাবে কোন সুফল বয়ে আনেনি। ফলে আন্দোলন আরো গতিপ্রাপ্ত হয়ে নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করে।

অপরদিকে কোটা আন্দোলনকারীদেরকে দমন করার জন্য ‘শুধু ছাত্রলীগ’বা একটি ছাত্রসংগঠনই যথেষ্ট এমন মন্তব্য আরো বেশী উস্কে দিয়েছে তাদের এই অভিমানকে। কর্তৃপক্ষকে উন্নাসিকতার সুরে বলতে শোনা গেছে- ‘আন্দোলন করে করে ওরা ক্লান্ত হোক তখন দেখা যাবে।’এভাবে সরকারের তরফ থেকে দীর্ঘদিন এই আন্দোলনকে গুরুত্ব না দেয়ায় যে বিভ্রান্তি ও ভুল বুঝাবুঝি পারস্পরিক আলাপ আলোচনায় না গিয়ে শুধু হম্বিতম্বি ও দৈহিক শক্তি প্রদর্শণ করাটা সবার জন্যই চরম ক্ষতিকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। চারদিকে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে।

এর পরবর্তী ঘটনাগুলোর সময় দেশে ইন্টারনেট সচল থাকায় হয়তো সবাই মোটামুটিভাবে অবগত হয়েছেন। কিন্তু ১৮ জুলাই থেকে হঠাৎ করে দেশের ইন্টারনেট সেবা ও মোবাইল ফোর জি সেবা বন্ধ করে দেয়ায় এই আন্দোলনের সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে জনগণের নিকট পৌঁছাতে পারেনি। দেশের মানুষ যা ভাবেনি বা জানে না কিন্তু এসময় কোন কোন নেতা আগ বাড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন- ‘শেখ হাসিনা মারা গেলেও দেশ ছেড়ে পালাবে না’। এসব হঠকারী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা সন্দেহ দানা বাঁধতে দেখা গেছে। কিন্তু দেশে ইন্টারনেট না থাকলেও বিদেশী গণমাধ্যমের মাধ্যমে কোন না কোনভাবে সেগুলো মানুষের নিকট পৌঁছাতে থাকে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গুলিতে প্রাণ হারায় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু দেশের গণমাধ্যমগুলো সে রাত ১০টা পর্যন্ত মাত্র ১১ জন নিহত হবার কথা প্রকাশ করেছে।

এতে সাধারণ জনগণ আরো বেশী কৌতুহলী ও হতাশ হয়ে উঠে।  জায়গায় তারা রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সারা দেশে আন্দোলনের গতি ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার সাথে দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুলিশের সাথে র‌্যাব, বিজিবি-কে মাঠে নামানো হয়। গত ১৮ জুলাই এসকল বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় অজানা সংখ্যক মানুষ।

কেন এমন হলো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের হলগুলো ভ্যাকেট করে দেয়ায় তারা বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যায়। তারা নিকটস্থ বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হল বা মেসে অবস্থান নেয়। সেখানে তাদের বন্ধু, আত্মীয় বা পরিচিতজনদের আশ্রয়ে থেকে আন্দোলনকে আরো বেশী শাণিত করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো হঠাৎ ভ্যাকেট  ‘শাঁখের করাত’হিসেবে মনে করা হচ্ছে। রাজধানীর উত্তরা, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, সাভার ইত্যাদিতে তারা ছড়িয়ে থেকে ১৮ জুলাই আরো সক্রিয় হয়ে উঠে। পুলিশও সেখানে মারমুখি হয়ে উঠে গুলি, গ্যাস ছোঁড়ায় যুদ্ধ বেঁধে যায়। পুলিশের সাঁজোয়া যান ছাত্রদের মিছিলে উঠে যায়। সেদিন রয়টার, সিএনএন, এনএইচকে, এপি, সিনহুয়া, নিউইয়র্ক টাইমস্ ইত্যাদি থেকে প্রচারিত সংবাদে ৮৩ জনের মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হলেও দেশের গণমাধ্যমগুলো কারো ভয়ে মাত্র কয়েকজনের মৃত্যুর কথা বলেছে! হাসপাতাল সূত্রে মৃত্যুসংখ্যা শত শত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে তেমন কোন সংখ্যা প্রচার করেনি। এটাই কি তাদের বৃহত্তর গণতন্ত্রের নমুনা?

কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে সাঁজোয়া যান দিয়ে আঘাত করার এই নিষ্ঠুর কান্ড ঘটানো দেখে পুরো পৃথিবী নির্বাক, স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। তার পরেও দেশের কর্ণধাররা এতদিন নির্বিকার হয়ে আরো বেশী হার্ডলাইনে যাবার ঘোষণা দিয়ে জাতিকে মর্মাহত করেছে।

সাধারণত: সামরিক সরকারকে জনগণের পালস্ বুঝতে দয়ে না তার আশেপাশের চাটুকাররা। কিন্তু এমন বিষাদময় পরিস্থিতিতেও একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দাবীদারকে সেই পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কেন? যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করে সুবিধা নিয়ে আসছেন এক্ষেত্রে তাদের চাটুকারিতা ও দাপট বেশী। তারা প্রধানমন্ত্রীকে বাইরের আন্দোলনের আবহাওয়া বুঝতে না দিয়ে ঘেরাটোপের মধ্যে রেখে দেন। এভাবে একটি জনগণের পালস্ বুঝেও সেটা বুঝেও না বোঝার চেষ্টা করা বা শক্তি দেখানো বিপজ্জনক-সেটা সম্প্রতি অতি নেতিবাচকভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

অন্যদিকে এই আধুনিক যুগে আন্দোলন দমনের নামে সারাদেশে ইন্টারনেট ও ফোরজি মোবাইল সেবা বন্ধ করে দিয়ে আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফুডের ই-সেবা সবকিছু স্তব্ধ করে দেয়া হয়েছে। এটা ডিজিটাল স্বৈারচারের নতুন দিক। এ দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক মানুষের কর্মগতি রুদ্ধ করা যায় না। যারা শুধু শুধু মানুষের হতাশা বাড়ানোর জন্য এসব কুবুদ্ধি দেন তারা প্রাচীন যুগের মনমানসিকতা নিয়ে আধুনিকতার বড়াই করেন মাত্র।

কর্তৃপক্ষ বলছেন, আন্দোলনকারীরা নেটওয়ার্ক অফিসে আগুন দিয়েছে বলে নেটসেবা নেই। কিন্তু মাত্র একটি অফিসে আগুন লাগলে যদি কয়েকদিন ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায় ও তড়িৎ কোন বিকল্প ব্যবস্থায় নেট চালু করা সম্ভব না হয় তাহলে এই সেক্টর নিরাপত্তাহীনতার চাদর গায়ে এতদিন কি ঘুমিয়ে ছিল? যে কোন দুর্ঘটনায় উন্নত বিশ্বের মানুষ বিকল্প উপায়ে এসব সেবা দ্রুত পেয়ে যান।

ইন্টারনেট আজকাল একটি জরুরী সেবা, এদিয়ে মানুষ খাদ্য-পথ্য কেনে, ওষুধ কেনে, এ্যম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে যায়।। এটাকে বন্ধ করে দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়। এই জরুরী সেবা বন্ধ রেখে মানুষকে কষ্ট-হতাশায় ফেলে যারা বাহাদুরী করেছেন তাদের মুখে ডিজিটাল বাংলাদেশ মানায় না। যদি আন্দোলনকারীরা অথবা কোন শত্রুতাবশত কেউ ইন্টারনেট নষ্ট করে দিয়ে থাকে তাহলে বিকল্প বা প্যারালাল চ্যানেলে দ্রুত রিকভার করার ব্যবস্থা না থাকাটা বোকামি। যে কোন কারনেই হোক দীর্ঘদিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের সবার জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

অন্যায়ভাবে কোন ভাল ইনোসেন্ট মানুষকে গালি দেয়া, খারাপ কিছুর তকমা দেয়া একধরণের বুলিং, ইভটিজিং। এগুলোও বিভিন্ন দেশে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। আমাদের সমাজে খোটা দেয়া, গাজ্বলা তকমা ছুঁড়ে দিয়ে মানুষের মনে কষ্ট, ক্ষোভ, অভিমান, পারস্পরিক বৈরীতা সৃষ্টি করা একটি অন্যায় কালচার ও সামাজিক অপরাধ। এর জন্য সৃষ্ট ক্ষোভ ও অভিমান সংগে সংগে নিরসনের জন্য ব্যবস্থা নিতে বড্ড দেরী করায় বাংলাদেশে ‘কারফিউ’জারি রাখতে হচ্ছে। তবে এখনও যে ক্ষতির ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তার দায় কেউ নিতে এলেও সেই ক্ষত দ্রুত সেরে উঠবে কি? সেই ক্ষতি কি খুব সহজে পোষানো সম্ভব হবে ?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

;

বিভাজিত দেশ, লাল রক্ত কতটা লাল



কবির য়াহমদ
ছবি- বার্তা২৪.কম

ছবি- বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease
রক্তের রঙ সতত লাল। তবে বিভাজিত দেশে রক্তের রঙ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিহতের পরিচয় কী? সে বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ নাকি অন্য কোন দল এনিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয়। এরপর সে রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরে চলে জায়েজিকরণ প্রক্রিয়া।
শিক্ষার্থী আন্দোলনে ঠিক কত ‘প্রাণের অপচয়’ হয়েছে, সঠিক পরিসংখ্যান-তথ্য নেই কারো কাছে। তবে আলোচনা মূলত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে ঘিরে। আবু সাঈদ পুলিশের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল। দাবির স্বপক্ষে জীবন বাজি রেখে তার পেতে দেওয়া বুক সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তাকে গুলি করার দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি করেছে। প্রথম গুলিতেও দমে যাননি সাঈদ, পুনর্বার গুলির আমন্ত্রণে তারুণ্যের স্পর্ধা দেখিয়েছেন। মুকুন্দ দাসের গানের মতো ‘ভয় কী মরণে...’ উচ্চারিত হয়েছে তার দুর্বার সাহসে।
বিভাজিত দেশে তার দুর্বার সাহসকে ছাপিয়ে কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা তার রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে এনেছেন। আবু সাঈদ আন্দোলনকারী নয়, জামায়াত-শিবিরের কর্মী, এমন একটা প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসেইন সাঈদীর মৃত্যুতে ‘বিদায় রাহবার’ লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন আবু সাঈদ, সেই পোস্ট ফেসবুকে অনেকেই সেয়ার করেছিলেন। সাঈদ নানা সময়ে জামায়াত-শিবিরপন্থী নানা অনলাইন অ্যাক্টিভিজমে জড়িত ছিলেন এমন প্রচারণা চলছিল সমান তালে। কেউ জামায়াত-শিবির করলেও তাকে প্রাণে মেরে ফেলার যুক্তি থাকতে পারে না, এমন বোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
আবু সাঈদের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে  বিএনপি-জামায়াতপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদেরও ছিল সমান প্রচারণা। ছাত্রলীগের নেতাদের ছাদ ফেলে দেওয়ার তথ্য প্রচার করে, ছাত্রলীগ নেতা ও পুলিশের মৃত্যুর খবরের নিচে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ লিখে অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করে। তাদের কাছে পুলিশ ও আওয়ামীপন্থী কারো মৃত্যু আনন্দপ্রদায়ক সংবাদ।
মানুষের মধ্যকার এই পরিবর্তন বিভাজনের রাজনীতির ফল। পক্ষের লোকজন এবং স্বীয় মতাদর্শের কেউ ছাড়া বাকি সবাই অচ্ছুৎ এবং পরিত্যাজ্য এমন প্রচারণার অংশ। এই বিভাজন একদিকে যেমন হিংসার উদ্রেক করছে, অন্যদিকে মানুষদের মানবিক গুণাবলী এবং মানবিক চরিত্রে পরিবর্তনে রাখছে ভূমিকা।
শিক্ষার্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার বিলোপ। কোটা ব্যবস্থা মেধাবীদের চাকরির সুযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, এমনই অভিযোগ। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে আপত্তি ছিল আন্দোলনকারীদের। এই কোটার বাইরে আরও ছিল জেলা কোটা, নারী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী কোটা; অর্থাৎ ২০১৮ সালের আগে ৫৬ শতাংশ ছিল কোটার অধীন। যদিও সাম্প্রতিক কয়েকটি সরকারি নিয়োগে কোটার চাইতে মেধার মূল্যায়ন বেশি হয়েছিল। এটা অনুল্লেখ্য ছিল আন্দোলনের পুরোটা সময়ে।
কোটা ব্যবস্থার অবসান চাইতে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতা করতে গিয়ে অতি-ক্ষোভে এক শ্রেণির লোক মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল। অনেকের বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কটূক্তি ঝরছিল, ক্ষোভ উপচে পড়ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকেই রাষ্ট্র সব দিয়ে দিচ্ছে এমন একটা প্রচারণার জন্ম দিয়েছিল। বিভাজনের কবলে তখন পড়েছিল দেশ। অথচ মুক্তিযোদ্ধারা যৌবনের সোনালী সময়কে বিসর্জন দিয়েছিলেন দেশের জন্যেই, এই বোধের অভাব পরিলক্ষিত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়াই যেখানে প্রাধিকার, সেখানে স্রেফ এই কোটা ব্যবস্থার কারণে মুক্তিযোদ্ধারাই হয়ে পড়েছিলেন অপমানের লক্ষ্যবস্তু।
এই সুযোগে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলো এর সুযোগ গ্রহণ করে। অগ্রণী ভূমিকায় নামে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাকে তুলনার মুখে এনে ‘রাজাকার’ শব্দটিকে মহিমান্বিত করার চেষ্টাও দেখা যায়। রাজাকার শব্দের বিরোধিতাকারীদের ফের ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দেওয়ার সুযোগ ছাড়ে না তারা। আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থক সবাইকে ভারতের দালাল আখ্যা দিয়ে থাকেন বিএনপিপন্থীরা। তাদের অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধও ভারতের প্ররোচনায় একটা যুদ্ধ, যেখানে তাদের ভাষায় ভারত চেয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙন। অথচ এই দলটির প্রতিষ্ঠানা মেজর জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার অন্যতম পাঠক ছিলেন। যদিও তার আগে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর, এরপর আরও কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পাঠ করেন।
একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান ‘বীর উত্তম’ খেতাব পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার তার এই খেতাব বাতিল করে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের নাম থাকলেও তার দ্বারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন হয়। তিনি রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করেন। যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলিমকে মন্ত্রিসভার সদস্য করেন। কুখ্যাত স্বাধীনতাবিরোধী শর্ষিনার পির আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শিক্ষায় অবদানের জন্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পান। স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় জিয়াউর রহমানের পথ ধরে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পায়। তিনি যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলি আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রিত্ব দেন; যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে রাজনৈতিক উপদেষ্টা করেন; এরবাইরে আরও অনেক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে উচ্চ স্থানে আসীন করেন।
একাত্তর-পরবর্তী বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির জন্ম বলে মুক্তিযুদ্ধে দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধুর সময়ে তাকে দেওয়া ‘বীর উত্তম’ খেতাব বলছে মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকার কথা। বঙ্গবন্ধু হত্যায় তার বিতর্কিত ও অপ্রমাণিত ভূমিকায় আওয়ামী লীগ যতই তাকে অস্বীকার করুক না কেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে তাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আখ্যা দেওয়ার বিভাজনের যে প্রচেষ্টা সেটা বঙ্গবন্ধু-সরকারের সিদ্ধান্তকেই আদতে প্রশ্নবিদ্ধ করে। খেতাব বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক করেছে। যদি কখনো বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তবে তারা যে বীর উত্তম খেতাব ফিরিয়ে নেবে না, তা কে বলবে!
এই সময়ে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কথা বলে না, তাদেরকে বিএনপি-জামায়াত আখ্যা দেওয়া হয়, ষড়যন্ত্র খোঁজা হয়। সরকারের বিরুদ্ধে বললে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়ারও একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সরকার ও রাষ্ট্র যে এক নয়, সূক্ষ্ম এই পার্থক্য মানতে নারাজ অনেকেই। আবার বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে না বললে, তাদেরকেও একইভাবে বিভাজনের ভেদ রেখায় ফেলে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালাল আখ্যা দেওয়া হয়। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে বিভাজনের মধ্যে ফেলে সীমিত করার চেষ্টা করা হয়। এই বিভাজন এত শক্তিশালী যে স্বতন্ত্র চিন্তার ক্ষেত্র ক্রমে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।  
বিভাজনের এই রাজনীতি জুলাইয়ের শিক্ষার্থী আন্দোলনেও আমরা দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরোধিতা করার কারণে অনেককে স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবি যারা করেছেন তাদেরকে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালাল আখ্যা পেতেও দেখেছি। ফলে আবু সাঈদ কিংবা জীবনের মতো তরুণপ্রাণের মৃত্যুতে আমরা ভেদরেখা টেনে দেখতে চেয়েছি কে আওয়ামী লীগ, আর কে জামায়াত? এখানে রক্তের যে লাল রঙ, প্রাণের অপচয়ের যে অপূরণীয় ক্ষতি, সে সব ছাপিয়ে ব্যস্ততা দেখেছি রক্তের লাল রঙে আর কী রঙের অস্তিত্ব!
;

জনজিজ্ঞাসার জবাব কি রাজনীতিবিদরা দেবেন?



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গেল কয়েক দিন অন্ধকারে ডুবে থাকা সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ, যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, তাদের বহু জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। অবস্থার পাকে পড়ে কম্পিত ও দ্বিধান্বিত এসব মানুষেরা দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে অসংখ্য জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিয়েছেন। সাতেপাঁচে না যাওয়া মানুষেরা অনেক কিছু না বুঝেও যা বুঝেছেন তার মর্মার্থ হচ্ছে, ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা আকড়ে থাকতে চান আর বিরোধীরা চান ক্ষমতার গদিতে আসীন হতে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের পথ ধরে ধ্বংসলীলার শুরুর পর সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে যা বলা যায় তা হচ্ছে, ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করাই সবচেয়ে জরুরি ছিল এবং সরকার তা-ই করেছে। কয়েক দিন ধরে চলা নজিরবিহীন এই ধ্বংসলীলার ঘটনাবলী ও সংবাদমাধ্যমের কাছে থাকা ছবি-ভিডিও বিশ্লেষণ করলে যা দেখা যাচ্ছে তাতে কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করা কঠিন হবে না।

সরকারের নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা বার বারই দাবি করেছেন, জামায়াত-শিবির এবং বিএনপি ও দলটির সহযোগি সংগঠনের প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরাই এই ধ্বংসলীলা চালিয়েছে। তারা এও দাবি করেছেন যে, ‘বিদেশে পালিয়ে’ থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই এই অরাজকতা সৃষ্টির মাস্টারমাইন্ড। এই অপচেষ্টার পেছনে সরকারকে হটানোই ছিল মূল লক্ষ্য। সংহিসতা শুরুর পূর্ব পর্যন্ত সকলেই পথে পথে ছাত্র-জনতার উপস্থিতিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনই মনে করেছিল। শুরুর দিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটি কিভাবে নজিরবিহীন তাণ্ডবলীলার হাতিয়ার হলো তা সাধারণের বোধগম্য নয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যানার ‘ছিনতাই’ হওয়া এবং তাতে বহু আমজনতার না বুঝেই জড়িয়ে পড়ার দাবিও কেউ কেউ করছেন। পথে বের হওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষের সকলেই ধ্বংসলীলা চালায়নি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি ও ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করলেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে ‘কিছু সংখ্যক’ সন্ত্রাসী কয়েক দিন ধরে তাণ্ডবলীলা চালাল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনের চেষ্টা করে হতাহত হল’; তারপরও ধ্বংসের স্রোত থামাতে টানা কয়েক দিন লাগলো! এই সময়ে দেশের বাদবাকী মানুষদের ভূমিকা তাহলে কেমন ছিল? সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, হয়ত সাধারণের একটি অংশের সহানুভূতি বা মৌন সমর্থন ছিল এই ‘কিছু সংখ্যক’দের প্রতি। আর সাধারণ মানুষের আরও একটি অংশ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে কোন একটি পক্ষকে সমর্থন, বর্জন কিংবা প্রতিরোধের অবস্থা ছিল না; কারণ প্রকৃত সত্য তারা জানতেনই না।

যদি দৃষ্টি ফেরাই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের দিকে, সেখানেও দেখব দ্বিধাবিভক্তির এক চরম অবস্থা। টানা দেড় দশক শাসন ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ঐতিহাসিকভাবে দেশের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেছে। বর্তমানে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা প্রায় সব দলই স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত। সাংবিধানিক ভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামো স্বীকৃত হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধরে কিংবা বাহিরে কোথাও গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই-এই অভিযোগ সর্বত্রই উচ্চারিত হয়।

ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দর্শনকে অবলম্বন করে তাদের রাজনীতি ও শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করেন বলে দাবি করে থাকেন। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরুর দিকে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বিরোধে জড়ায় মূলতঃ সরকারি চাকুরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। অবস্থাদৃষ্টে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বর্তমান সমাজের দ্বিধাবিভক্তি আরও প্রশস্ত হয়েছে। নিঃসন্দেহে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তার সুমহান চেতনার প্রতি সমান্যতম অবজ্ঞা বা শ্লেষোক্তি অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু দেশের প্রজন্ম যদি সত্যিকারের ইতিহাস জানার সুযোগই না পায় তাহলে নতুন প্রজন্মকে আপনি কিভাবে দায়ী করবেন? রাজনীতির অন্ধরে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে সর্বজনীনন অভিন্ন অবস্থান কেন স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দি পেরিয়েও আমরা অর্জন করতে পারলাম না, সেই জনজিজ্ঞাসার জবাব রাজনীতিবিদদেরই দিতে হবে।

কেবল আওয়ামীলীগই নয়, অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ উঠতেই মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিপালনে তাদের সামান্য মনযোগ দেখা যায় না। একথাগুলো এজন্য বলা জরুরি যে, বিগত জাতীয় নির্বাচনের সময়কার স্মৃতি উলটে যদি আমরা দেখি তবে শুধুমাত্র মনোনয়ন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন দলের কি পরিমাণ তথাকথিত নেতা রাজধানীতে ভিড় করেছিলেন তা আমরা সহজেই মনে করতে পারব। তখন গণমাধ্যমের কাছে তারা প্রত্যেকেই দেশ ও জনগণের সেবায় নিজেদের পুরোপুরি উৎসর্গ করার পণ করে ফেলেছিলেন। জিজ্ঞাসা এখানেই, রাজধানীসহ সারাদেশে যে নজিরবিহীন তাণ্ডবলীলা চললো, জনগণের-রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ পুড়ে ছাই হলো, লুট করা হলো-তারা তখন কোথায় ছিলেন?

এই নজিরবিহীন সময়ে প্রায় প্রতিদিনই দুই প্রধান দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপির শীর্ষনেতারা সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন। এতে নেতাদের উপচেপড়া ভিড়। দলের সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব বক্তব্য দিচ্ছেন আর সবাই মাথা নেড়ে, কেউবা উচ্চস্বরে ‘ঠিক..ঠিক’ বলে রব করেছেন। খুব স্বাভাবিক জ্ঞানে রাজনীতির ওই মুখগুলোকে কপট ছাড়া কিছুই মনে হয় না। কেননা দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তাদের স্ব-স্ব এলাকায় দিয়ে নিজদের সমর্থক, অনুগত এবং সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাণ্ডবলীলা প্রতিরোধ করতে যাওয়ার কথা। দলবেঁধে সংবাদ সম্মেলনে নিজের চেহারা দেখানোর প্রতিযোগিতায় থাকার কথা নয়। ঔপনিবেশিক কিংবা সামন্তবাদী সময়কাল পেরিয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির উন্মেষের পরবর্তী সময়ে আমরা এদেশেই রাজনীতিবিদদের নিষ্ঠা দেখেছি। কিভাবে নিজের সবকিছু নিঃশেষ করে জনগণের পাশে দাঁড়াতেন তাঁরা! 

বর্তমানে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যসহ দেশের ৩৫০জন সংসদ সদস্য আছেন। আছেন সিটি মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধি। জনগণের প্রতি সত্যিকারের দায়বদ্ধতা থাকলে এই জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র ও জনগণের জানমাল রক্ষায় সচেষ্ট থাকতেন। জনগণ সম্পৃক্ত জনপ্রতিনিধিরা উসকানি না দিয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মাঠে থাকলে আমরা হয়ত এই ধ্বংসলীলা নাও দেখতে পারতাম। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বাস্তবে এর কিছুই আমরা দেখিনি। তার অর্থ কি জনগণের হিত সাধনের জন্য আমাদের রাজনীতিবিদদের ‘রাজনীতি’ নিবেদিত নয়? কিন্তু আমরা তো দেখি, একই দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমাতে মাঠে ময়দানে তাদের প্রাণপণ চেষ্টা! এই নিষ্ঠার সামান্যও যদি তারা জনগণের কল্যাণ ও সমাজের শান্তি বিধানে প্রয়োগ করতেন, তবে দেশে এমন ক্রান্তিকাল উপস্থিত হতো না।

আমরা যদি সাম্প্রতিক বছরের সংবাদপত্রে প্রকাশিত আঞ্চলিক রাজনীতির খবরাখবরের দিকে দৃষ্টি দিই তবে দেখতে পাবো-ক্ষমতাসীন দলের অন্দরেই কি পরিমাণ বিবাদ! তৃণমূলের একনিষ্ঠ কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটির নেতারা স্ব-স্ব অবস্থানে নিজেদের এতটাই ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করেন যে কর্মীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সামান্যই। এর ফলে সংকটকালে জনগণের পাশে থাকার যে কর্তব্য ছিল আওয়ামীলীগের তৃণমূলের, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাইকমাণ্ড নির্দেশ সত্ত্বেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে বলেই সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ। ফলে বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়ে আওয়ামীলীগ যতটা সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ছিল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও তাদের সাংগঠনিক অবস্থাকে ভঙ্গুর না বললেও খুব সুসংগঠিত বলা যায় না। এই প্রসঙ্গটি এজন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন, কারণ দেশবিরোধী স্বার্থান্বেষী চক্রের উত্থানে ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক দুর্বলতাও ভূমিকা রাখে। 

রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের কিছু কিছু স্থানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে দেখেছি নাশকতাকারীদের। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামীলীগ বাদে দেশের নিবন্ধিত বাকী ৪৩টি রাজনৈতিক দল তাহলে কি করেছিল এ কয়দিন? পরস্পরকে দোষারোপ করে সংবাদ সম্মেলন কিংবা গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েই তারা দায় সেরেছেন। কেউ কেউ হয়ত তাও করেনি, নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে। এই ‘রাজনীতিবিদদের’ জনবিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও প্রতি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট চাইতে তারা কোন মুখে আসেন?

সমাজ, রাজনীতি ও সরকার বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অবশ্য এ নিয়ে মত হচ্ছে, জনগণের অসচেতনতা ও হুজুগে প্রবৃত্তি কপট রাজনীতির পথকে অনেকটা প্রশস্ত করে তুলেছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অপ্রতুল বিনিয়োগে মননশীলতা ও মূল্যবোধ বিকাশের পথ আজ সংকুচিত। এই অনুদারতায় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক শিক্ষা অর্জন মুখ থুবড়ে পড়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে এগিয়ে গেলেও সমাজে মানুষের মূল্যবোধ যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে তা ভেবে দেখার কথা হয়ত রাজনীতিবিদরা ভুলেই গেছেন! নইলে প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকা জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দ কিভাবে ৭৭৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা হয়?

এই অনুদারতায় দেশের প্রান্তিক জনপদে কুসংস্কার আরও কূপমণ্ডুকতার বিস্তার ভয়াবহভাবে ঘটেছে। সাধারণ মানুষের মাঝে বোধগম্যতার এই যে সংকট তা লাঘবের চেষ্টা নেই বলেই হয়ত মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক ও মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মগৌরবের ইতিহাস নিয়ে কটাক্ষের সুযোগ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশেই সৃষ্টি হয়। এর জন্য জনসেবা ভুলে গিয়ে আদর্শচ্যুত রাজনীতিবিদদের সম্পদ অর্জনে বল্গাহীন দুর্নীতিই অনেকাংশে দায়ী বলে মনে কনে বিশ্লেষকরা। সচেতন জনগণের অগণিত প্রশ্নবাণে জর্জরিত এই সময়ের রাজনীতিবিদরা কি এ দায়মোচনে আদৌ কোন চেষ্টা করবেন?

;

মিয়ানমারে ‘অপারেশন ১০২৭’ দ্বিতীয় পর্যায়: সংঘাতে নতুন মাত্রা



ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)
ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)

  • Font increase
  • Font Decrease

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে ২০২৩ সালের অক্টোবরে থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্সের অপারেশন ১০২৭ শুরু হওয়ার পর থেকে উভয় পক্ষের মধ্যেকার সংঘর্ষের তীব্রতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সংঘর্ষের ফলে হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং মিয়ানমারের পুরো সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের সীমান্ত বাণিজ্য রুটগুলো বিভিন্ন সময় হাতবদল হওয়ার কারনে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সংঘর্ষের ফলে অনেক জায়গায় পিছু হটলেও তারা বিমান বাহিনী ও ড্রোনের সাহায্যে বিদ্রোহীদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেকে উদ্বাস্তু হিসেবে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০০০ মানুষ নিহত হয়েছে এবং ৬ মিলিয়ন মানুষ উদ্বাস্তু হিসেবে জীবনযাপন করছে। মিয়ানমারের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।

‘অপারেশন ১০২৭’ শুরু হওয়ার পর চীনের মধ্যস্থতায় সহিংসতা বন্ধে জানুয়ারিতে শান রাজ্যে ব্রাদারহুড এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর ১০ জানুয়ারি থেকে উত্তর-পূর্ব শান রাজ্যে সাময়িকভাবে সংঘর্ষ বন্ধ থাকে। মিয়ানমার জান্তা এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বোমা বর্ষণ করার পর ব্রাদারহুড জোটের সদস্য তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) ২৫ জুন থেকে পুনরায় অভিযান শুরু করে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিরোধ বাহিনী বড় শহরগুলো দখল করে নেওয়ায় মিয়ানমারের সামরিক সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিম উপকূলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। আরকান আর্মি (এ এ) বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বন্দর ও পর্যটন শহর থান্ডওয়ে দখল অভিযানে প্রায় চার শ’র বেশি জান্তা সেনাকে হত্যা করেছে বলে জানায়। এর পাশাপাশি রাখাইনে এ এ একটি বিমানবন্দর দখল করেছে। চলমান এই সংঘর্ষের পর তারা দখলকৃত সেনাক্যাম্পের অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তগত করেছে।

৫ জুন টিএনএলএ অভিযান শুরু করার পরে এমএনডিএএ লাশিওর বিরুদ্ধে পুনরায় আক্রমণ শুরু করে। জান্তা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বারবার বোমাবর্ষণ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করার কারণে তারা এই আক্রমণ শুরু করেছে বলে জানায়। টিএনএলএ এই আক্রমণকে ‘অপারেশন ১০২৭: ফেজ ২’ বলে অভিহিত করেছে এবং বেসামরিক জাতীয় ঐক্য সরকারের পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পি ডি এফ) সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যের চারটি টাউনশিপ এবং মান্দালয় অঞ্চলের মোগোক টাউনশিপে জান্তা সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অপারেশন ১০২৭ এর দ্বিতীয় অংশ চলাকালীন দখল করা প্রথম শহর নওংকিও, শহরটি মান্দালয় অঞ্চলের পাইন ও লুইনের উত্তরের একটি জান্তা গ্যারিসন শহর। টিএনএলএ ও তাদের মিত্ররা উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যের তিনটি শহর কিয়াউকমে, মংমিত ও নাওংকিও এবং মান্দালয় অঞ্চলের মোগোকে শহরের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় চলমান সংঘর্ষে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের অর্থনৈতিক ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ২০২২ সালে থাইল্যান্ড মিয়ানমারে ৪৪০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে এবং মিয়ানমার থাইল্যান্ডে প্রায় ৪৪৩ কোটি ডলারের রফতানি করেছে। ২০২৪ সালে, থাই-মিয়ানমার সীমান্তের মায়াওয়াদি শহরের সংক্ষিপ্ত দখল মায়ে সোট-মায়াওয়াদ্দিতে থাই-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। এই এলাকা দিয়ে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য চলে। ২০২৩ সালে থাইল্যান্ড ছিল মিয়ানমারে তৃতীয় বৃহত্তম বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। ২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের পিটিটি মিয়ানমারের ইয়াদানা প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পের বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার হয়ে ওঠে।

মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আরও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের বিষয়ে মিয়ানমারের অর্থ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সহযোগিতা, ভারতের ঋণ ও কারিগরি সহায়তা এবং মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের আরও প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে রাষ্ট্রদূত ১৫ জুলাই মিয়ানমারের পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ডলার সংকট গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য কিয়াত এবং রুপিতে সরাসরি অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করেছে। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে রুপি - কিয়াত সরাসরি অর্থ প্রদান এবং কার্ড ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অর্থ প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করেছে। ভারত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি পরিবহন ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে অব্যাহত সহযোগিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে এএ সংঘর্ষের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। ৪ জুনের পর থেকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে কোনো পণ্যবোঝাই কার্গো ট্রলার বা জাহাজ আসছে না। ২০২৪ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ থেকে কোনো রফতানি পণ্য মিয়ানমারে যাচ্ছে না। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকার দিনে তিন-চার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে। সীমান্তে চোরাচালান নিরুৎসাহিত করতে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের টেকনাফ ও মিয়ানমারের মংডুর মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল।

টিএনএলএ যোদ্ধারা আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের সদর লাশিও শহর ঘিরে ফেলেছে। মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রধান মহাসড়কের পাশে লাশিও’র অবস্থান। মিয়ানমার চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পে মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। শান রাজ্যটি চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে পাইপলাইন বসাচ্ছে চীন। সীমান্ত বাণিজ্য গেট বন্ধ করে দিয়ে এবং টিএনএলএ ও এমএনডিএএ'র নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে চীন ব্রাদারহুড জোটকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। টিএনএলএ শান রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ১৪ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে চীনকে সহযোগিতা করেছে। তবে এই চুক্তিতে মান্দালয় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সেখানে জোটের সদস্যরা জান্তা সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

সামরিক বাহিনী ও জাতিগত সংখ্যালঘু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান সোয়ে উইনের নেতৃত্বে ৭ জুলাই একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। তারা সীমান্তের স্থিতিশীলতা, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগের নিরাপত্তা, অনলাইন স্ক্যাম অপারেশন নির্মূল, বাণিজ্য প্রচার এবং প্রস্তাবিত নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করে। জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং আগামী বছর নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং চীন এই প্রক্রিয়ায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। মিয়ানমারের সাবেক প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন জুন মাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি মূলনীতি গ্রহণ উপলক্ষে বেইজিং সফর করে। সে সময় থেইন সেইন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে, সোয়ে উইন উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যে চলমান লড়াই নিয়ে আলোচনা করেছে, যা জান্তার জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে প্রাধান্য পাবে।

মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতিতে লক্ষণীয় যে বিদ্রোহী গুষ্ঠিগুলো সমন্বিতভাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে নিজ নিজ এলাকায় আক্রমণ পরিচালনা করছে। দশকের পর দশক ধরে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত থেকেও এবারের মত অর্জন কখনো পায়নি। এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কিছু কিছু দলের সঙ্গে শান্তি ও সমঝোতা করে বাকীদের ওপর আক্রমত চালাত। এবার তাদের সেই কৌশল ব্যর্থ করে দিয়ে বিদ্রোহী গুষ্ঠিগুলো একতাবদ্ধ হয়ে আক্রমণ পরিচালনা করায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী সব ফ্রন্টে পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছে।

এবারের সংঘর্ষে লক্ষণীয় যে বিদ্রোহীরা মিয়ানমারে সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং মিয়ানমার সরকারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মিয়ানমারের এই সংঘাত বন্ধ করা জরুরি কারণ এর ফলে মিয়ানমারের সাধারন জনগণের পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপরও চাপ পড়ছে। এর ফলে সাধারন মানুষের জীবন যাত্রা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বিদ্রোহী ও মিয়ানমার সরকার উভয় পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে এবং একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। জান্তা সরকার নির্বাচনের কথা ভাবছে এবং চীন নির্বাচনে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে যা উৎসাহব্যঞ্জক।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী আপাত দৃষ্টিতে কিছুটা কোণঠাসা হলে ও তাদের সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অনেক শক্তিধর দেশ তাদের সমর্থন করে। বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আক্রমনের তীব্রতা বাড়াতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নিজস্ব অবকাঠামো ধ্বংস হবে ও হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাবে যা কখনো কাম্য নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহীরা এবং সাধারন মানুষ বুঝতে পেরেছে যে একতাবদ্ধ হলে তারা অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে ও তাদের অধিকার আদায়ে এগিয়ে যেতে পারে। এর বাস্তবতায় মিয়ানমারে একটা রাজনৈতিক সমাধান জরুরি। মিয়ানমারে শান্তি ফিরে আসলে মিয়ানমারের আপামর জনগণের পাশাপাশি প্রতিবেশি দেশগুলো এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক

;