তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প বাস্তবায়নে দোদুল্যমানতা নয়



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প বাস্তবায়নে দোদুল্যমানতা নয়

তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প বাস্তবায়নে দোদুল্যমানতা নয়

  • Font increase
  • Font Decrease

তিস্তা সমস্যা নিয়ে বহুযুগ ধরে বার বার শুধু কথা চলে আসছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বাংলাদেশের তিস্তা তীরবর্তী কয়েক কোটি মানুষের জীবনধারণের সাথে সম্পর্কিত বহুবিধ আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। প্রতি বছর খরা যায়, বর্ষা আসে। তাপে পুড়ে যায়, অকাল বন্যায় ভেসে যায় জমির ফসল। থমকে যায় সেসব সমস্যা প্রতিকারের সব প্রচেষ্টা।

গত ১৯৯৩ সাল থেকে তিস্তা নদী সম্পর্কিত সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বাংলাদেশ আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু এর সমস্যাগুলোর বড় অংশ অভিন্ন, আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক হওয়ায় বাংলাদেশের একার পক্ষে সমাধান করা দুরূহ ব্যাপার। তাই প্রতিবেশী ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ভিত্তিতে চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমাধানের জন্য বার বার বৈঠক করে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। গত তিন দশকের অধিক সময় ধরে শতাধিক বৈঠকে নানাবিধ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে অনেকগুলো চুক্তি সই করা হয়েছে। কিন্তু নানা কারণে ও অজুহাতে সেগুলো ফলপ্রসূ হয়নি।

উজান দেশের অসহযোগিতা ও একঘেয়েমি মনোভাবের কারণে তিস্তা সমস্যা দীর্ঘদিন ফাইলে আটকে রাখা হলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সাল থেকে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সমস্যার জট খুলতে শুরু করে এবং কিছুটা হলেও আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে মতের অমিল থাকায় সেসব প্রচেষ্টা বার বার হোঁচট খেয়ে ভেস্তে যায়।

বিশেষ করে খরার সময় তিস্তা নদীর পানি সংকট সমস্যা কেন্দ্র ও রাজ্যের পারস্পরিক দোষারোপ ও মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি মধ্যে চরম বৈপরীত্য পরিস্ফুট হয়ে উঠে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর গুনে হতাশ হয়ে পড়ে সরকার ও তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগীরাসহ গোটা বাংলাদেশের মানুষ। অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের নিকট থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে বাংলাদেশ বিকল্প উপায় খুঁজতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে তৃতীয় কোনো পক্ষকে তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানানো হলে এগিয়ে আসে চীন। তারা চীনের দু:খ বা হোয়াংহো নদীর পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিস্তা সমস্যা সমাধানে হাত বাড়ায়।

তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চীনের ‘পাওয়ার কন্সট্রাকশন কর্পোরেশন অব চায়না’- কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের এক সমঝোতা স্মারক সাক্ষরিত হয়ে। সেটিও দীর্ঘদিন যাবত দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল। পাঁচ বছর পূর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে তাগাদা দিলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আশাবাদ শুরু হয়। চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তিস্তা ক্যাচমেন্ট এলাকায় ১১৫ কি.মি. অংশে জরিপ সম্পন্ন করে প্রকল্পের খসড়া তৈরি করে। চীন ভারতের তিস্তা অংশে সিকিম তিস্তা খাড়ি ও শিলিগুড়ির অদূরে ‘চিকেন নেক’এলাকায় সুগভীর জরিপ চালাতে আগ্রহ প্রকাশ করলে সেটা নিয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার অভাবের কারণে অনাগ্রহ লক্ষণীয় হয়ে উঠে।

তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ ও চৈনিক ইঞ্জিনিয়ার ও বিশেষজ্ঞদের ভারতের মাটিতে অবস্থান ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে ভারত নিজেদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে মনে করে। তবুও গত ৭ জানুয়ারি ২০২৪ জাতীয় নির্বাচনের পর পরই চীন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন কাজ শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর পাঁচ মাস গত হলেও প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু করা হয়নি।

এরই মাঝে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০২৩ সালের ২ আগস্ট রংপুরে এক নির্বাচনী জনসভায় তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য শুরুর দিনক্ষণ শোনার জন্য এবছর মে মাসের নিদারুণ খরার দিনগুলি পর্যন্ত অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগী অধিবাসীরা।

তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চীনের পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না বা পাওয়ার চায়নার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেই পরিকল্পনায় পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তা নদীর দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর, নদী খনন ও শাসন, ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি সেচ ব্যবস্থা, মাছ চাষ প্রকল্প ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীনা কোম্পানিটি ইতোমধ্যে তিস্তা পাড়ে নির্মিতব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে। তিস্তা নদী পাড়ের জেলাগুলো নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধায় চীনের তিনটি প্রতিনিধি দল কাজ করে চলছে। এরমধ্যে গত ১০ মে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তার বুকে ড্রেজিং এবং ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাবিত বহুমুখী প্রকল্পটিতে অর্থ বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঢাকায় এক বৈঠকে এই প্রস্তাব করেছেন।

এ প্রেক্ষিতে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য হলো, ‘আমরা তিস্তায় একটা বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছি। ভারত সেখানে অর্থায়ন করতে চায়। আমি বলেছি, তিস্তায় যে প্রকল্পটি হবে, সেটি আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী হবে। আমাদের প্রয়োজন যেন পূরণ হয়।’ আমাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য এটা একটি বড় উদ্যোগ হতে পারে। তবে বহু দশক গড়িমসি করে হঠাৎ তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প নিয়ে ভারতের মনোযোগ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে আমাদের নীতি নির্ধারকদেরকে। এর পিছনে ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন ছাড়াও আরো কোনো রহস্য লুক্কায়িত আছে কি-না তা ভেবে দেখতে বলা হয়েছে।

কলকাতার বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজার বলেছে, ‘চিন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকাকে। জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নতুন সরকার শপথ নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নতুন বিদেশমন্ত্রী মাহমুদের সঙ্গে দেখা করে তিস্তা নিয়ে তাদের প্রকল্পে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত তিস্তা নদীর জলপ্রবাহ নিয়ে তৃতীয় একটি দেশের ইঞ্জিনিয়ার ও কারিগরদের কাজ করা নিয়ে বাংলাদেশের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছিল দিল্লি।

‘মূলতঃ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তার বুকে ড্রেজিং এবং ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাবিত বহুমুখী প্রকল্পটিতে অর্থ বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে তারা। অন্তত ১২ বছর ধরেই বাংলাদেশ এই প্রকল্প নিয়ে বেজিংয়ের কাছে দরবার করছিল। হাসিনার চিঠির পরে চিন বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে তিস্তার ১১৫ কিলোমিটার গতিপথে সমীক্ষা চালিয়ে একটি প্রকল্পের খসড়া তৈরি করে জমা দেয়। সেই প্রকল্পে তিস্তার বুকে ড্রেজিং করে ১০ মিটার গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুপাশের জমি উদ্ধার করে সেখানে চার লেনের রাস্তা তৈরি এবং কয়েকটি ব্যারাজ ও সেচ-খালের মাধ্যমে জলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তার পরে প্রকল্পটি ছাড়পত্র পায়নি। এখন ভারত সেই প্রকল্পটি রূপায়ণের প্রস্তাব দিল।’

তবে চীনের সাথে আগে চুক্তি হওয়া এবং তার উপর ভারতের জাতীয় নির্বাচন চলাকালীন হঠাৎ ভারতের এই প্রস্তাব কিছুটা রহস্যজনক। বাংলাদেশের সকল নীতিনির্ধারক এবং জনগণ এতদিন পরে হঠাৎ ভারতের এই বিনিয়োগের আগ্রহকে কীভাবে গ্রহণ করবে তা চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশ কতটুকু বিশ্বস্ততার সাথে ভারতের এই অর্থায়ন আগ্রহ বিবেচনা করবে তা সময় হলে বুঝা যাবে।

তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প নিয়ে চীনের কাজ শুরু করার সময় ঘনিয়ে আসার পর শুধু তাদের পররাষ্ট্র সচিবের প্রস্তাবে তিস্তা পানিবণ্টন নিয়ে এতদিনের ঘুমন্ত ভারতকে আস্থায় রাখা সহজ হবে না। একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার অভ্যাস যে ভারতের তৈরি হয়েছে এবং তার ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার প্রবাহের আইনগত ও ন্যায্য হিস্যা প্রদানের ব্যাপারে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা খুব বেদনাদায়ক। সেখানে তৃতীয় কোনো দেশের সাথে তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প চুক্তি সই হওয়ার পর ভারতের অর্থায়নের আগ্রহ দেখানোর বিষয়টি চীনের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ ঠেকানোর জন্য ভারতের নতুন দোদুল্যমানতা তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকগণ মনে করছেন।

এছাড়া তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের ‘নিড’বা প্রত্যাশাগুলো কি তা এখনও ভারতকে জানানো হয়নি। ভারত ও চীনের মধ্যে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে যে টানাপড়েন চলছে তা আরো বেশি উসকে দেবে যদি বাংলাদেশ চীনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি ভঙ্গ করে ভারতের দিকে হাত বাড়ায়। এছাড়া চীন বাংলাদেশের প্রতি আস্থা হারিয়ে আমাদের চলমান অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পে তাদের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা হ্রাস বা বন্ধ করে দিতে পারে।

তাই ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের অর্থায়নের আগ্রহের প্রস্তাব চীনের তিস্তা পুনরুজ্জীবন প্রকল্পকে আরো দীর্ঘায়িত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সাথে চীনের সুসম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। ভারতের অর্থায়ন প্রস্তাবের পর ইতোমধ্যে চীন বাড়তি ত্রিশ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের চাহিদা শুনিয়েছে। কাজ শুরু না হতেই এমন বাগড়ায় বাংলাদেশের ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’-র মতো দোটানা অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

কিন্তু কোনোরূপ জনমত যাচাই না করে হঠাৎ আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এমন ভাবনার উদয় হলো কেন?

তিস্তা পানি সমস্যা সমাধানের জন্য ভারত বার বার প্রতিশ্রুতি দেবার পরও কাজ হয়নি। এজন্য বিকল্প উপায় খুঁজে বের করেছি আমরা। সেটাতে নিবিষ্ট থাকতে সমস্যা কোথায়? এই দোদুল্যমানতা পরিহারে গভীরভাবে চিন্তা করতেই হবে। আর এজন্য আরো গভীরভাবে ভেবে ভারতের অর্থায়নের প্রস্তাবে সাড়া দেয়া উচিত। আগাম বড় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলা আরেকটি হঠকারিতা হতে পারে। তাই বিষয়টি অতি দ্রুত আরো গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত বলে বিশ্লেষকগণ মনে করছেন।

লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।

   

গণহত্যায় ইসরায়েলের সঙ্গে উচ্চারিত হোক পাকিস্তানেরও নাম



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
গণহত্যায় ইসরায়েলের সঙ্গে উচ্চারিত হোক পাকিস্তানেরও নাম

গণহত্যায় ইসরায়েলের সঙ্গে উচ্চারিত হোক পাকিস্তানেরও নাম

  • Font increase
  • Font Decrease

গণহত্যা নিকৃষ্টতম। দেশে-দেশে তারা ধিকৃত, ঘৃণিত হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তেমনভাবে হয় না। কারণ গণহত্যাকে বিশ্বজন নিকৃষ্টতম বললেও এর সংজ্ঞায় ফেলে না সবগুলোকে। এই যেমন ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনকে গণহত্যা বলতে রাজি নয় পশ্চিমাবিশ্বের বেশিরভাগই। এর প্রতিবাদে আওয়াজ ওঠলেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া যেভাবে হওয়ার কথা, সেভাবে হয়নি, হচ্ছে না। ফলে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া ছাড়া মোটাদাগে এটা নিয়ে অনেকটাই প্রতিক্রিয়াহীন সবাই। ফলে ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছেই।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ‘যুদ্ধ’ বলা হচ্ছে এটাকে। কিন্তু যুদ্ধ বলতে দ্বিপাক্ষিক যে বিষয় থাকার কথা সেটা এখানে নেই। ফিলিস্তিনের বিচ্ছিন্ন সংগঠন হামাসের আক্রমণের পর ফিলিস্তিন কেবল একপাক্ষিক আগ্রাসন চালিয়েছে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ; নারী-শিশু। নারী-শিশুরাও সাধারণ মানুষের কাতারে পড়েন, কিন্তু তাদের নিয়ে আলাদা কথা বলতে হয়, আলাদাভাবে কথা বলা হয়, পৃথক আইন-নীতি-রীতি রয়েছে বিশ্বজুড়ে। সংগঠনও রয়েছে। এতকিছু পরেও তবু আগ্রাসন বন্ধ হয়নি। বন্ধ করা যায়নি। বন্ধের যে দাবি, তার মাঝে আওয়াজ আছে, তবে আছে আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন।

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলার আট মাস চলছে। গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে চলমান এই আগ্রাসনে অন্তত ৩৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। দাপ্তরিক এ তথ্যের বাইরের বাস্তবতা সাধারণত এরচেয়েও কঠিন। প্রাণ হারানো মানুষদের সংখ্যা দিয়ে বিবেচনার বাইরেও থাকে অগণন মানুষের আহত হওয়ার খবর, থাকে বিপুল সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, যা অনেকটাই অপূরণীয়। এছাড়া ইসরায়েলি এই আগ্রাসন যখন বছরের পর বছর ধরে যখন নির্বিঘ্নে চলছে, তখন সহসা এটা বন্ধ হবে বলেও মনে করাও কঠিন।

‘মৃত্যুকূপ’ গাজা অনেকটাই। অবরুদ্ধ গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের কথা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে জানাচ্ছে, গাজায় চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৬৯৪ শিশু নিহত হয়েছে। ১৭ হাজারেরও বেশি শিশু তাদের বা-মাকে হারিয়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্য এবং অপুষ্টিতে ভুগছে পাঁচ বছরের কম বয়সী আরও ৮ হাজারের বেশি শিশু। ওখানে বিপর্যয়কর ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষাবস্থা চলছে বলে জানাচ্ছে সংস্থাটি। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের এবারের এই আগ্রাসনে অন্তত ৩৭ হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন অন্তত আরও ৮৫ হাজার ফিলিস্তিনি নাগরিক। অন্যদিকে হামাসের হামলায় ইসরায়েলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৩৯ জনে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুকে বলা হচ্ছে ‘যুদ্ধ’, কিন্তু এটা যুদ্ধের সংজ্ঞায় পড়ে কিনা, এনিয়ে জোর আলোচনা নেই। যুদ্ধ আখ্যায় ইসরায়েলকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা বিদ্যমান বলেই কিনা এভাবে সংজ্ঞায়িত বিষয়টা। অথচ যুদ্ধ বলতে দুই পক্ষের একের বিরুদ্ধে অন্যের লড়াইকে বুঝানো হয়ে থাকলেও ফিলিস্তিনে হচ্ছে একপাক্ষিক আগ্রাসন, এবং এখানে ফিলিস্তিনিদের জয়ের সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। এখানে ইসরায়েলিরা একপাক্ষিক আগ্রাসন চালাচ্ছে, এবং ফিলিস্তিনিরা প্রাণে বাঁচতে লড়ছে কেবল। তাই এটাকে যুদ্ধ বলা না গেলেও বিশ্বমোড়লদের চালাকি এবং ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অনুরাগ কাজ করছে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালাচ্ছে। তবু এখানে এসে পালটে যায় গণহত্যার সংজ্ঞা।

বাংলাদেশ ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সবসময় সরব কণ্ঠ। স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময় থেকেই। এই সময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন এই সমর্থনের অন্যথা হয়নি। নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের প্রতি বাংলাদেশের এই সমর্থন অনেকটাই আত্মিক। এখানে আছে মানবাধিকারের প্রশ্ন, আছে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা।

এবার ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ যথাসম্ভব ভূমিকা রাখছে। প্রতিবাদ জানিয়েছে, জাতিসংঘেও সামর্থ্য অনুযায়ী ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগই ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই ভূমিকা সাহসী এবং উল্লেখের মতো। বিগত নির্বাচনের সময়ে দেশি-বিদেশি বিবিধ চাপ সত্ত্বেও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সরকার। নিজেদের অবস্থানকে অনিশ্চয়তা রেখেও আওয়ামী লীগ সরকারের এই ভূমিকাকে স্মরণ করতেই হবে। অথচ সরকারই ছিল তখন বহুবিধ চাপে। ওই সময়ে আমরা দেখেছি, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছু বললে কেবল ‘আমেরিকা রুষ্ট হয়ে যাবে এই ভয়ে’ ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা রাজনৈতিক দলগুলো, এমনকি বিএনপিও কিছু বলেনি। অথচ ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য দাবি ও অধিকারের প্রশ্নে আমরা ঐতিহাসিকভাবেই একাত্ম।

ইসরায়েল ফিলিস্তিনে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। বিশ্ববিবেক প্রভাব রাখার মতো অবস্থানে না গিয়ে অনেকটা নম্য থাকলেও বাংলাদেশ চুপ নয়। সামর্থ্যের যতটুকু তার সব করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে, জনতার আছে এখানে সমর্থন। রাষ্ট্রীয় ভূমিকার বাইরে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ সবটাই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। এখানে প্রভাবক অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা। অথচ মানবিক আহবানে ধর্মের বিরোধ নেই, রাজনৈতিক যোগ নেই; সম্পর্কটা কেবল আত্মিক।

যেভাবেই হোক মানুষ ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুখর, মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি কঠোর—এখানে এভাবে কি বিশ্লেষণ সম্ভব, এখানেই কি সন্তুষ্ট থাকা উচিত? উত্তর হোক আমাদের— ‘না’! কারণ যতক্ষণ না মানবতাবিরোধী অপরাধকে মানবতার বিরুদ্ধে আগ্রাসন না ভাবা হচ্ছে, ততক্ষণ ধর্মে-ধর্মে, জাতিতে-জাতিতে, শ্রেণি-বর্ণসহ বিবিধ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হবে; ক্রমেই সংকুচিত হবে সাম্যের পথ। কিছু অবিবেচনাবোধ এখানে মূর্ত যদিও, তবে এটাকে বিভক্তিমূলক সংবেদনশীলতার প্রশ্নকে উহ্য রেখে সামনে আনা উচিত মানবিক দিক।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসনকে তাই ধর্মীয় দিক দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। এভাবে বিবেচনার পথগুলোকে উন্মুক্ত না করে এখানে মানবিক দিকটিকে সামনে আনতে হবে। গণহত্যাকারীকে গণহত্যাকারীই বলতে হবে। কেবল ফিলিস্তিনেই নয়, বিশ্বের যেখানে যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহত্যা হয় সেখানেও প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। একই সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাথায় রাখতে হবে আমরাও ছিলাম গণহত্যার শিকার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছিল।

ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিনে গণহত্যা অব্যাহত রেখে ধিকৃত হয়, একইভাবে আমাদের ওপর গণহত্যা চালানো পাকিস্তানিরাও ধিকৃত। ইসরায়েলের গণহত্যায় যেন আড়ালে না পড়ে পাকিস্তানিদের গণহত্যা!

;

জাতিসংঘের ব্ল্যাকলিস্ট: ইসরায়েলের অমোচনীয় কালিমা



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ ব্যাপার নয়। নানা পরাশক্তি, লবি, ইন্টারেস্ট, প্রেশার গ্রুপ সামাল দিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সত্যিই কঠিন কাজ। এহেন জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে প্রণীত কালো তালিকায় খুব বেশি দেশের নাম নেই। মহা হম্বিতম্বি আর পশ্চিমা মুরুব্বিদের নেকনজর থাকার পরেও জাতিসংঘের ‘কালো’ তালিকায় ইসরায়েল নাম লেখা হয়েছে। যে অমোচনীয় কালিমা ইসরায়েল নামক গণহত্যার দোষে দুষ্ট দেশটির ললাট থেকে কোনো দিনই মুছে ফেলা সম্ভব হবে না।

জাতিসংঘের কালো তালিকা বা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এর তালিকায় ইসরায়েলের নাম যুক্ত হয়েছে মূলত শিশুদের হত্যা ও তাদের উপরে ‘অকল্পনীয়’ অত্যাচার চালানোর অভিযোগে। ইসরায়েলকে কালো-তালিকাভূক্ত করার বিষয়ে প্রদত্ত জাতিসংঘের রিপোর্ট এমনটিই বলা হয়েছে।

ইসরায়েলি গণহত্যা ও বর্বরোচিত হামলার পটভূমিতে আতঙ্কিত বিশ্ববিবেক ভীত ও ত্রস্ত হয়ে বার বার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। এমনকি, আল-বালার আল-আকসা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন এক চিকিৎসক: 'এটা হাসপাতাল না কসাইখানা?’ সাংবাদিকদের তিনি দেখাচ্ছিলেন, চারিদিকে পড়ে থাকা রক্তাক্ত মৃতদেহ। যাদের অধিকাংশই শিশু। এরই মধ্যে 'হয়ত কোথাও হয়তো কেউ বেঁচে' এই নিষ্ফল আশায় খোঁজ চালাচ্ছেন প্রিয়জনেরা।

হামাসের সঙ্গে লিপ্ত সংঘাতে ইসরায়েলের তরফে হাসপাতালে সশস্ত্র হামলা চালানোর কোনো যুক্তিই ছিল না। বৃদ্ধ, শিশু ও রোগী ছাড়া সক্ষম মানুষও সেখানে ছিল। হামাস যোদ্ধা থাকার বিষয় ছিল অকল্পনীয়। তবু রেহাই পায়নি হাসপাতাল, অসুস্থ মানুষ, অগণিত শিশু। আসলে ইসরায়েলের আক্রমণগুলোকে বলা যায় গণহত্যার ছুতানাতায় গণহত্যা।

অসংখ্য ইসরায়েলি হামলার আরেক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত নুসেরাত ও দের আল-বালার শিবিরে ‘অভিযান’। সেখানে হামলা চালিয়ে হামাসের হাতে থাকা চার ইসরায়েলি বন্দিকে যখন মুক্ত করতে সফল ইসরায়েল, সংবাদমাধ্যম সূত্রে তখন খবর প্রকাশিত হয়- ঐ দুই জায়গায় ইসরায়েলি হানায় নিহত অন্তত ২১০। গুরুতর আহত ৪শ’র ও বেশি। চারজনকে উদ্ধার করতে ২১০ মানুষ হত্যা ও চার শতাধিক লোককে জখম করা আসলে গণহত্যার নামান্তর। যে কারণে, প্রতিদিন তো বটেই ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে মৃতদেহ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গাজ়ায় নিহত হয়েছেন অন্তত সাড়ে ৩৮ হাজার মানুষ। নানা মহলের যদিও আশঙ্কা, হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

এরই মাঝে, জাতিসংঘের ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এর তালিকায় উঠল ইসরায়েলের নাম। মূলত শিশুদের হত্যা ও তাদের উপরে ‘অকল্পনীয়’ অত্যাচার চালানোর অভিযোগে ইসরায়েলকে কালো-তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারও ইসরায়েলের নৃশংসতার বিষয়গুলো উন্মোচিত করেছে।

জাতিসংঘের প্রতিনিধি, গিলাদ এরদান জানিয়েছেন, যে দেশ, সেনা বা গোষ্ঠী শিশুদের হত্যা, গুরুতর জখম, যৌন নির্যাতন, অপহরণ করে বা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা- হাসপাতাল, স্কুল কিংবা কোনো মানবিক সহায়তা থেকে তাদের বঞ্চিত করে, তাদেরকেই এই কালো-তালিকাভুক্ত করা হয়। সশস্ত্র সংঘর্ষ-পীড়িত শিশুদের নিয়ে জাতিসংঘের তদন্তকারী ভার্জিনিয়া গাম্বার একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত আট মাসে গাজায় যে সাড়ে ৩৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্তত ১৩ হাজার শিশু রয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, আগামী সপ্তাহে আরও একটি রিপোর্ট দেওয়া হবে নিরাপত্তা পরিষদে। তাতে, ঠিক কোন কোন ‘অপরাধ’ গাজায় শিশুদের প্রতি ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) করেছে, তা সবিস্তারে প্রকাশ পাবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলি জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে। স্বাগত জানিয়েছেন প্যালেস্টাইনের কর্তৃপক্ষও। তীব্র কটাক্ষ করেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েলি সরকার। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নৈতিকতার নিরিখে ইসরায়েল সেনা বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’।

যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি কেউই বিশ্বাস করছে না এবং প্রকৃত সত্যের নিরিখে তা নিতান্ত হাস্যকর বলে মনে করছেন। তথাপি ইসরায়েল এমন মিথ্যাচার করেই চলেছে এবং গাজায় গণহত্যা চালিয়েই যাচ্ছে। বিশ্বের কতিপয় শক্তিশালী রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে ইসরাইলকে গণহত্যার নেশা থেকে দমনও করা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায়, জাতিসংঘের ‘কালো’ তালিকায় ইসরায়েল নাম লেখা হওয়ার বিষয়টি দেশটির জন্য বিরাট বড় নৈতিক পরাজয়। তাদের অপরাধের পুরো শাস্তি না হলেও প্রতীকরূপে কাজ করবে কালো তালিকাভুক্তকরণের এই কলঙ্ক। যে কালিমা অমোচনীয়। যত বাহাদুরি ও বাগাড়ম্বরই করুক, ইসরায়েলের তার ললাটলিখন থেকে শিশুহত্যার কালিমা কখনোই মুছে ফেলতে পারবে না।

ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম; প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

;

এ যেন পথভ্রষ্ট কোকাকোলা বাংলাদেশ!



মাজেদুল নয়ন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সাউথ-ইস্ট এশিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বজুড়ে সমাদৃত কোমল বা কার্বনেট পানীয় কোকাকোলা কোন দেশের প্রতিষ্ঠান, এ লেখার আলোচ্য এটা নয়। বরং গত কয়েক মাসে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোকাকোলা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার পর থেকে কোকাকোলা, পেপসি, ইউনিলিভার, ম্যাকডোনাল্ড, স্টারবাকসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং গণহত্যাবিরোধী মানুষেরা। এর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কোকাকোলা নিয়ে, অন্তত গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-চিত্র সেটাই বলে।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে যে কটি দেশ শক্ত অবস্থান নেয়, তার মধ্যে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থায় রয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের গণহত্যাবিরোধী র‍্যালির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই দেশটিতে স্টারবাকস এবং ম্যাকডোনাল্ডের মতো আউটলেট বন্ধ হওয়াতে খুব অবাক হয়নি কেউ।

চলতি বছরের শুরুতে মালয়েশিয়ায় স্টারবাকস ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। তবে বিভিন্ন সময় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছাড়া এই বয়কট স্রোতে নিজেদের শান্ত রাখে তারা। এমনকি মার্চের মাঝামাঝি সময় এসে স্টারবাকস জানায়, বছর শেষে এই অঞ্চলে তাদের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে।

বহুজাতিক এত পণ্য থাকতে বাংলাদেশে কোকাকোলার কেন সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়িক ক্ষতি বা কোকাকোলাই কেন খাদে পড়ল—সেটা তারাই কেবল বলতে পারেন। তবে একজন সাবেক কমিউনিকেশন প্রফেশনাল এবং সাংবাদিক হিসেবে বলতে পারি, কোকাকোলার কমিউনিকেশন এবং ব্র্যান্ডিং বিভাগের দুর্বলতা স্পষ্ট।

সম্প্রতি প্রচারিত কোকাকোলার তিনটি ক্যাম্পেইন বা বিজ্ঞাপন এবং কন্টেন্ট এখানে বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।

মে মাসের ৩ তারিখে নিজেদের দেশীয় ইমেজ প্রতিষ্ঠায় দেশের প্রথম সারির পত্রিকায় মলাট বেধে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে কোকাকোলা বাংলাদেশ। তবে বয়কট আন্দোলনের শ্রেণিবৈচিত্র্য নিয়ে তাদের কোন ধারণা আছে বা স্টাডি করেছে কিনা সেটা বোঝার উপায় ছিল না। 'আমরা মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যের পক্ষে' বা ‘৬ দশকের বিশ্বাসে ভালবাসায় আছি পাশে,’ এ ধরনের বাক্য যে সকল বাঙালির কাছে এক দেখাতেই বোধগম্য হয় না, সেটা কোকাকোলা বাংলাদেশের মতো একটি কোম্পানির কমিউনিকেশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের চোখ এড়াল কীভাবে! বোধগম্য নয়। এরকম বাক্য দিয়ে যে মানুষের কাছে যাওয়া যায় না, এটাই হয়তো তাদের অজানা!

মে মাসের মাঝামাঝি সময় আবারো কিছু দুর্বল বাক্য নিয়ে বিজ্ঞাপনে আসলো কোকাকোলা। বিশেষ করে নিজেদের বাঙালি প্রমাণের জন্য যে উঠেপড়ে লাগল, সেটা কোম্পানির জন্য উদ্বেগজনক। কোকের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয়তার তো কোন দ্বন্দ্ব নেই।

এই বিজ্ঞাপনগুলোতে স্পষ্ট হয়েছে, কন্টেন্ট তৈরি করা ব্যক্তিদের গবেষণার অভাব এবং সংস্কৃতির সঙ্গে দূরত্ব। একটা ৫ লাইনের কন্টেন্টে ২ বার 'ই' প্রত্যয়ের ব্যবহার যে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব ফুটিয়ে তোলে সেটা কোকাকোলার কন্টেন্ট বা ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করা কারো মাথায় আসেনি! বাক্যে ‘আমরা’ এর বদলে ‘আমরাই’, ‘কর্মী’র বদলে ‘কর্মীই’ বলাটা দৃষ্টিকটু ছিল।

আর বাক্য গঠন যেন ফেসবুকের রিলস বা টিকটকের জন্য তৈরি! 'এইতো আমার কোক', বাক্যে 'এইতো' বলায় মনে হচ্ছিল, কারো বোতলটা হারিয়ে গিয়েছিল, আবার খুঁজে পেয়েছে!

সবশেষে সম্প্রতি যে টিভিসি’ বানানো হলো তাতো মনে হচ্ছে বাংলাদেশে কোকাকোলার কফিনের শেষ পেরেক!

বাংলাদেশিরা ক্রিকেট পাগল। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে আছে এখন। বাংলাদেশে কোকাকোলার বয়কটের চেয়ে গ্রাম-গঞ্জের হাটে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এখন আলোচনা সৌম্য সরকার এবং নাজমুল হোসেন শান্ত। সেখানে কেমন জানি নিজেদের জোর করে মনে করিয়ে দিলো কোকাকোলা বাংলাদেশ। দুর্বল স্ক্রিপ্ট এবং সমালোচিত অভিনেতাদের দিয়ে যে বিজ্ঞাপন তৈরি করা হলো, সেটি শুধু কোকাকোলা বয়কটকেই আবারো উসকে দেয়নি, কোকাকোলা বিক্রির দোকানকেও বয়কট করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

ভবিষ্যতে ব্র্যান্ডিং বা কমিউনিকেশনের বাজে উদাহরণ হিসেবে হয়তো কোকাকোলা বাংলাদেশের এই পদক্ষেপগুলো নিয়ে কাঁটাছেড়া করা হবে।

উপরে দেওয়া তিনটি উদাহরণে একটিতেও স্পষ্ট হয়নি আসলে কোকাকোলা বাংলাদেশ কী বলতে চায়, কেন বলতে চায়, গ্রাহকের কাছ থেকে কী চায় তারা?

;

উন্নতির অন্তহীন কান্না



সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: বার্তা২৪.কম

-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাত্তর সালটা বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য ছিল চরম দুর্দশার। পাকিস্তানি হানাদারেরা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের লেলিয়ে দিয়েছিল। ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছিল যা ইচ্ছা তাই করবার। তারা সেটা করেছেও। রাষ্ট্রীয় সমর্থনে ক্ষমতাবান হয়ে হত্যা, অস্থাবর সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং ধর্ষণ সমানে চালিয়েছে। এখন তো পাকিস্তান নেই, এখন তো আমরা স্বাধীন, বাঙালিই শাসন করছে বাঙালিকে। তাহলে এখন কেন মেয়েরা এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে?

পাচার হচ্ছে ভারতে, জীবিকার অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে যেখানে সেখানে, আত্মহত্যা করছে যখন তখন, আটকা পড়ছে বাল্যবিবাহের ফাঁদে? কারণটি আমাদের অজানা নয়। কারণ হচ্ছে পাকিস্তান বিদায় হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওই রাষ্ট্রের আদর্শ বিদায় হয়নি। আদর্শটা ছিল পুঁজিবাদী। সে-আদর্শের এখন জয়জয়কার। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দুর্বল লাঞ্ছিত হচ্ছে, হতে থাকবে, কেননা আমরা উন্নতি করতেই থাকবো, এবং অত্যন্ত অল্প কিছু মানুষের উন্নতি কাল হয়ে দাঁড়াবে বাদবাকিদের জন্য। এটাই ঘটছে।

পাকিস্তানের প্রেতাত্মা এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি, এমন কথা যাঁরা বলেন তাঁরা মোটেই মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই প্রেতাত্মাটাকে চিহ্নিত করেন না। প্রেতাত্মাটা অন্যকিছু নয়, প্রেতাত্মাটা পুঁজিবাদ। আর প্রেতাত্মাই বলি কি করে, সে তো ভীষণ ভাবে জীবন্ত। সে তো ব্যস্ত জীবিতদের জীবন কেড়ে নেবার কাজে। ধর্মকে সে ব্যবহার করে উপায় ও আচ্ছাদন হিসেবে। না-মেনে উপায় নেই যে, আমাদের জাতীয়তাবাদীরা সকলেই পুঁজিবাদী : পাকিস্তানিদের সঙ্গে তাদের নামে মস্ত পার্থক্য, চরিত্রে মৌলিক পার্থক্য নেই।

তাহলে উপায় কি? প্রতিবাদ? অবশ্যই। প্রতিবাদটা চলছে। বাল্যবিবাহে অসম্মত মেয়েরা কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করছে, এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েরা বিয়ের আসর থেকে সহপাঠিনীকে উদ্ধার করছে, আমরা জানতে পাচ্ছি। মে’ মাসের খবরের কাগজেই বের হয়েছে এমন খবর যে মাগুরাতে এক মা তাঁর মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছেন। কিন্তু তাতে তো ব্যবস্থাটা বদলায় না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমেরিকাতে বিক্ষোভ চলেছিল। আমেরিকার অরেগান-এ মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে দু’জন আমেরিকান নিহত হয়েছিলেন তাঁদের একজনের মা বলেছিলেন তাঁর ছেলে বীর ছিল, মৃত্যুর পরেও বীর থাকবে। মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেবার চেষ্টা চলছে, সে-চেষ্টা চলবে; কিন্তু মনুষ্যত্ব নষ্ট হবার নয়, হবেও না। তবে একলা একলা প্রতিবাদ করে যে কাজ হবে না সেটা তো প্রমাণিত সত্য।

তাহলে কি পালাতে হবে? কিন্তু পালাবেন কোথায়? একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে মানুষকে পালাতে হয়েছিল, ফিরে এসে তারা দেখেছে এ কী পাকিস্তান তো রয়েই গেছে! বদলটা শুধু নামেই। মানুষ এখনও পালাচ্ছে। ধনীরা ইতিমধ্যে বিদেশে বাড়ীঘর তৈরী করেছেন, সময় মতো চলে যাবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলীয় সংঘর্ষ থামানোর লক্ষ্যে দলীয় লোকদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে দল যদি ক্ষমতায় না থাকে তাহলে টাকাপয়সা নিয়ে পালাবার পথ পাওয়া যাবে না। এই সতর্কবাণীর দরকার ছিল কি? যারা পেরেছে তারা তো ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা করেছে, অন্যরাও তৎপর আছে। আর যাদের টাকাপয়সার অভাব, দলের লোক নয়, সাধারণ মানুষ, তাদেরও একটা অংশ কিন্তু পালাচ্ছে।

রিপোর্টে বলছে নৌপথে ইউরোপে যারা পাড়ি দেবার চেষ্টা করে তাদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষস্থানে। হতভাগা এই মানুষেরা অবশ্য টাকা পাচারের জন্য যায় না, টাকা উপার্জনের জন্যই যায়। কিন্তু যাচ্ছে তো। জীবন বাজি রেখে যাচ্ছে। ঝাঁপ দিচ্ছে সমুদ্রে। যুদ্ধে-বিধ্বস্ত সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া থেকে মানুষ পালাবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী এবং উন্নতিতে পুলকিত বাংলাদেশ থেকে অত মানুষ পালাচ্ছে কেন? পালাচ্ছে এখানে জীবিকার নিরাপত্তা নেই বলে; এবং মেয়েদের দুরবস্থা বলছে এখানে নিরাপত্তা নেই জীবনেরও।

সিদ্ধান্তটা তো তাই অপরিহার্য। করণীয় হচ্ছে পুঁজিবাদকে বিদায় করা। কিন্তু সে কাজতো একা কেউ করতে পারবে না, করতে গেলে কেবল হতাশাই নয়, বিপদ বাড়বে। বিদায় করার জন্য দরকার হবে আন্দোলন, এবং আন্দোলনের জন্য চাই রাজনৈতিক দল। শুধু দলেও কুলাবে না, শত্রুকে যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না হয়, এবং সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করা না যায়। বাংলাদেশে, এবং বিশ্বের অনেক দেশেই, জাতীয়তাবাদী যুদ্ধটা শেষ হয়েছে, বাকি রয়েছে সমাজতন্ত্রের জনযুদ্ধ।

এই যুদ্ধটা যে সহজ হবে না সেটা তো স্পষ্ট। জবরদস্ত পুঁজিবাদের দখলে অনেক অস্ত্র রয়েছে; খুবই শক্তিশালী একটি অস্ত্র হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়া পুঁজিবাদের নৃশংসতার খবর ছিটেফোঁটা দেয়, কিন্তু আসল খবর দেয় না; ঢেকে রাখে, বিভ্রান্ত করে, এবং নানাকিসিমের রূপকথা তৈরির কারখানা চালু রাখে। বাংলাদেশের সব খবরের কাগজের প্রথম পাতাতে মস্ত করে ছাপা হয়েছিল একটি রূপকথার খবর। ক্রিকেটে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছে। রূপকথাই বলা হয়েছে খবটিকে; কেননা এ বিজয় ছিল অপ্রত্যাশিত, প্রায় অসম্ভব।

মিডিয়া রূপকথাকে খুব পছন্দ করে, কিন্তু রূপকথা তো নারকীয় বাস্তবতাকে অবলুপ্ত করতে পারবে না, যার একটি খবর পত্রিকাতেই আছে, এবং প্রথম পাতাতেই। সেটি হলো তিন শিশুসহ এক মায়ের লাশ উদ্ধার। এই রাজধানীতেই। ধারণা করা হচ্ছে মা নিজেই খুন করেছে নিজের সন্তানদের, একের পর এক; তারপরে খুন করেছে সে নিজেকে। মৃত মায়ের ভাই অবশ্য বলছে অসম্ভব, তার বোন এ কাণ্ড করতে পারে না, অন্যরাই ঘটিয়েছে; এটি একটি হত্যাকাণ্ড। যেভাবেই ঘটুক, হত্যা তো বটেই। এবং তিনটি সন্তান নিয়ে মা’টি যে চরম হতাশায় ভুগছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তার স্বামীর এক সময়ে ভালো আয় ছিল, প্রতারক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডেসটিনিতে ৫০ লাখ বিনিয়োগ করেছিল, মার খেয়েছে; নিজে ব্যবসা করার চেষ্টা করেছে সফল হয়নি, সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারে না, তাদের এমন কি ভালোমতো আহারও জোটে না; পারিবারিক বিরোধ আছে সম্পত্তি নিয়ে। কোথাও কোনো আলো ছিল না আশার। আর সমস্তটা বোঝা গিয়ে চেপে বসেছিল বিপন্ন মেয়েটির ঘাড়ের ওপর। মেধাবী ছাত্রী ছিল সে; এমএ পাস করেছে, চাকরি খুঁজেছে, পায়নি। স্বামীর তবু বাইরে একটা জীবন ছিল, স্ত্রীর জীবন তিন কামরার। জীবন তার জন্য দুঃসহ এক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

উন্নতির রূপকথার খবর চীৎকার করে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা এখন এমনই বিকট যে তাকে ঢেকে রাখার উপায় নেই। পত্রিকাতে বাংলাদেশের মানুষের নরকবাসের আরও খবর আছে। ১. সাতক্ষীরায় দ্বিতীয় মেয়ে হওয়ায় বাবার হাতে নবজাতক খুন। ২. বরগুণায় যৌতুক না পেয়ে অন্তঃসত্তা গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা। ৩. রৌমারিতে ক্লাস রুমে ঢুকে ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা। ৪. আড়াইহাজারে বিয়ের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণ। ৫. গাজীপুরে তিন সন্তানসহ নিখোঁজ প্রবাসীর স্ত্রী। ৬. ঢাকায় মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মায়ের সংবাদ সম্মেলন। আরও খবর: ১. রাজধানীতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুইজন গ্রেফতার। ২. শায়েস্তাগঞ্জে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে বিধবাকে পিটিয়ে হত্যা। ৩. কালিয়াকৈরে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ। ৪. হবিগঞ্জে প্রকাশ্য সড়কে ধর্ষণের পর পিটিয়ে হত্যা। প্রতিটি ঘটনাই ভয়াবহ। ‘উন্নতি’ অব্যাহত রয়েছে।

এই উন্নতির অন্তর্গত কান্না বলছে ব্যবস্থার বদল চাই। হতাশা কাটবে না পরিবর্তনের আন্দোলন যদি জোরদার না হয়।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

;