রাখাইনে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল-মানবিক করিডোর স্থাপন দরকার



ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মিয়ামারের আভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাখাইনে আরাকান আর্মির (এ এ) সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের তীব্রতা চলমান রয়েছে। সীমান্তের ওপারে রাখাইনের কয়েকটি টাউনশিপে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে এ এ ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের বেশ কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সংঘর্ষের তীব্রতায় টিকতে না পেরে রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে পালিয়ে আসছে। অনেকে মনে করছে যে, এ এ সেসব এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে তাদেরকে ঘরবাড়ি ছাড়া করে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন যাবত চলমান যুদ্ধে একদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং অন্যদিকে এ এ রোহিঙ্গাদেরকে মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা নিধন চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা যায়। চলমান সংঘর্ষে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে এ এ’র কাছে অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এ এ’র সঙ্গে সংঘর্ষের সময় রোহিঙ্গাদেরকে জোরপূর্বক ধরে তাদেরকে এ এ’র সঙ্গে লড়াই করার নির্দেশ দিচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তারা রোহিঙ্গাদেরকে তাদের এলাকায় এ এ’র আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষার নামে এ এ’র সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে বাধ্য করে আন্তসাম্প্রদায়িক সহিংসতা উস্কে দিচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুসারে, ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও এ এ দুই পক্ষই তাদের হয়ে লড়াই করতে চাপ দিচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদেরকে যুদ্ধক্ষেত্রে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাখাইনে রাজ্যে এখনো প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। বিদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সক্রিয় সংগঠন অভিযোগ করেছে যে, এ এ রাখাইনের বুথিডং শহরে রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু হতে বাধ্য করছে। তাদের বাড়িঘর লুটপাট ও আগুন লাগানো হয়েছে এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। বুথিডং ও মংডুতে এ এ ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষে ১০ হাজার নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতির বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে বেসামরিক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিবাদমান সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ এ জানিয়েছে যে তারা রোহিঙ্গাদেরকে নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে সহায়তা করেছে তবে সেখানে মিয়ানমার জান্তাবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করার অভিযোগ ও সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে চলমান পরিস্থিতিতে বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া ও সেখানে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ দিতে মিয়ানমারের জান্তা ও এ এ’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক রাখাইন রাজ্যের বুথিডং শহর থেকে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সেখানে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও এ এ’কে অনুরোধ জানায়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে বুথিডং শহরে নতুন করে সহিংসতা ও সহায় সম্পত্তি ধ্বংসের ফলে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা, অবিলম্বে নিরবচ্ছিন্নভাবে মানবিক সহায়তার অনুমতি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বিধান নিঃশর্তভাবে মেনে চলার জন্য জাতিসংঘ মিয়ানমার সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। ফলকার তুর্ক বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশকে নিপীড়নের স্বীকার রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘ রাইটস অফিসের মিয়ানমার টিমের প্রধান জেমস রোডেহেভার চলমান পরিস্থিতিকে ভয়ানক বলে বর্ণনা করেছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে যে, রোহিঙ্গা ও রাখাইন একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে আন্তসাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা জাতিসংঘের। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকেরাও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন অন্তত আটটি গ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের জোর করে একটি গ্রামে স্থানান্তরের কথা নিশ্চিত করেছে।

মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার থমাস অ্যান্ডুস, রাখাইনের চলমান সংকটের প্রেক্ষিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে ‘বন্ধ সীমান্ত’ নীতি থেকে সরে আসতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ, দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কাজ করে যাওয়া স্বত্বেও বাংলাদেশের উদারতা রোহিঙ্গাদের একমাত্র ভরসা বলে তার মত প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার বাংলাদেশের ভেতরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিস্থিতি উন্নয়নে জরুরি তহবিল নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য বিশ্বের সব রাষ্ট্রের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে। থমাস অ্যান্ডুস রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এ এ’র ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ ঘটনার অবসানের আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘের রাইটস অফিসের মুখপাত্র এলিজাবেথ থ্রোসেল জানিয়েছে যে, সংঘাত-বিধ্বস্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মধ্যে আরাকানের বুথিডাং ও মংডু শহরের কয়েক হাজার বেসামরিক লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। রাখাইন রাজ্য থেকে সম্প্রতি প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদীর তীরে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অপেক্ষা করছে। এলিজাবেথ থ্রোসেল আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য মিয়ানমার সরকার ও এ এ’কে আহ্বান জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সমর্থন ছাড়া এই সঙ্কট মোকাবেলা সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। ত্রান সহায়তা হ্রাসের ফলে রেশন কর্তন, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সহিংসতা এবং রোহিঙ্গা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জীবন হুমকির মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশ সীমন্ত জুড়ে থাকা মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিগুলো বর্তমানে এ এ’র দখলে। এ এ পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে ভবিষ্যতে আরাকান রাজ্য গড়ে তুলতে চায়। এ এ’র মূল শক্তি হলো রাখাইনবাসীদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ধর্মীয় সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অঙ্গীকার। সংকটময় এই পরিস্থিতিতে এ এ’র দূরদর্শিতা তাদেরকে সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ভুমিকা রাখবে।

সীমান্তের এপারে কক্সবাজার এলাকায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য সাহায্য সংস্থাগুলো গত সাত বছর ধরে তাদের পেশাগত দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাজ করছে। তারা রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত রয়েছে। চলমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ, ইউ এন এইচ সি আর, আই ও এম এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এ এ’র সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে রাখাইনে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল ও একটা মানবিক করিডোর স্থাপন করে নির্যাতনের শিকার পালিয়ে আসা মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে উদ্যোগ নিতে পারে। কক্সবাজারের শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থেকে অতি সহজে এই কার্যক্রম তারা পরিচালনা করতে পারবে। এ এও এই কাজে তাদেরকে সহযোগিতা করবে কারণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার সঙ্গে মিলে এ এ এই সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শুধুমাত্র রাখাইনের জাতিগত সশস্ত্রগুষ্টি হিসেবে তাদের পরিচয়ের বাহিরে নিজেদেরকে রাখাইনের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে প্রমান করতে পারবে। এর পাশাপাশি এ এ’র কাছে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রকাশ পেলে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সামনের দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তা পেতে কাজে লাগবে।

বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের সহায়তা প্রদানে দাতাসংস্থাগুলো চাপে রয়েছে, তাই নতুন করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ নাই। বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে সতর্কতামুলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সীমান্ত দিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় বান্দরবান সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বান্দরবান ও কক্সবাজার সীমান্ত এলাকায় সীমান্ত চৌকি ও স্থাপনাগুলোতে বিজিবির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় বসানো সিসি ক্যামেরায় সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং বিজিবির পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান মানবিক বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুততার সঙ্গে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০১৭ সালের নৃশংস ঘটনা তাদেরকে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আগে সতর্ক হতে শিখিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশ নানা সীমাবদ্ধতার থাকার পর ও মানবিক দিক বিবেচনায় কতটুকু উদার ছিল তা বুঝতে পেরেছে। তারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উদারতার অনুপস্থিতি অনুভব করছে। চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নিরাপদ অঞ্চল ও একটা মানবিক করিডোর স্থাপন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। রাখাইনের চলমান মানবিক সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দ্রুত সিধান্ত গ্রহনের মধ্যে দিয়ে এই সংকট মোকাবেলা করতে পারবে। রাখাইনের অভ্যন্তরে কাজের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরও জোরালো ভুমিকা রাখতে সহায়ক হবে। রাখাইন রাজ্যের এ এ’র নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো এগিয়ে আসবে এটাই প্রত্যাশা।

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক

   

জাতিসংঘের ব্ল্যাকলিস্ট: ইসরায়েলের অমোচনীয় কালিমা



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ ব্যাপার নয়। নানা পরাশক্তি, লবি, ইন্টারেস্ট, প্রেশার গ্রুপ সামাল দিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সত্যিই কঠিন কাজ। এহেন জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে প্রণীত কালো তালিকায় খুব বেশি দেশের নাম নেই। মহা হম্বিতম্বি আর পশ্চিমা মুরুব্বিদের নেকনজর থাকার পরেও জাতিসংঘের ‘কালো’ তালিকায় ইসরায়েল নাম লেখা হয়েছে। যে অমোচনীয় কালিমা ইসরায়েল নামক গণহত্যার দোষে দুষ্ট দেশটির ললাট থেকে কোনো দিনই মুছে ফেলা সম্ভব হবে না।

জাতিসংঘের কালো তালিকা বা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এর তালিকায় ইসরায়েলের নাম যুক্ত হয়েছে মূলত শিশুদের হত্যা ও তাদের উপরে ‘অকল্পনীয়’ অত্যাচার চালানোর অভিযোগে। ইসরায়েলকে কালো-তালিকাভূক্ত করার বিষয়ে প্রদত্ত জাতিসংঘের রিপোর্ট এমনটিই বলা হয়েছে।

ইসরায়েলি গণহত্যা ও বর্বরোচিত হামলার পটভূমিতে আতঙ্কিত বিশ্ববিবেক ভীত ও ত্রস্ত হয়ে বার বার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। এমনকি, আল-বালার আল-আকসা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন এক চিকিৎসক: 'এটা হাসপাতাল না কসাইখানা?’ সাংবাদিকদের তিনি দেখাচ্ছিলেন, চারিদিকে পড়ে থাকা রক্তাক্ত মৃতদেহ। যাদের অধিকাংশই শিশু। এরই মধ্যে 'হয়ত কোথাও হয়তো কেউ বেঁচে' এই নিষ্ফল আশায় খোঁজ চালাচ্ছেন প্রিয়জনেরা।

হামাসের সঙ্গে লিপ্ত সংঘাতে ইসরায়েলের তরফে হাসপাতালে সশস্ত্র হামলা চালানোর কোনো যুক্তিই ছিল না। বৃদ্ধ, শিশু ও রোগী ছাড়া সক্ষম মানুষও সেখানে ছিল। হামাস যোদ্ধা থাকার বিষয় ছিল অকল্পনীয়। তবু রেহাই পায়নি হাসপাতাল, অসুস্থ মানুষ, অগণিত শিশু। আসলে ইসরায়েলের আক্রমণগুলোকে বলা যায় গণহত্যার ছুতানাতায় গণহত্যা।

অসংখ্য ইসরায়েলি হামলার আরেক ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত নুসেরাত ও দের আল-বালার শিবিরে ‘অভিযান’। সেখানে হামলা চালিয়ে হামাসের হাতে থাকা চার ইসরায়েলি বন্দিকে যখন মুক্ত করতে সফল ইসরায়েল, সংবাদমাধ্যম সূত্রে তখন খবর প্রকাশিত হয়- ঐ দুই জায়গায় ইসরায়েলি হানায় নিহত অন্তত ২১০। গুরুতর আহত ৪শ’র ও বেশি। চারজনকে উদ্ধার করতে ২১০ মানুষ হত্যা ও চার শতাধিক লোককে জখম করা আসলে গণহত্যার নামান্তর। যে কারণে, প্রতিদিন তো বটেই ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে মৃতদেহ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গাজ়ায় নিহত হয়েছেন অন্তত সাড়ে ৩৮ হাজার মানুষ। নানা মহলের যদিও আশঙ্কা, হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

এরই মাঝে, জাতিসংঘের ‘ব্ল্যাকলিস্ট’-এর তালিকায় উঠল ইসরায়েলের নাম। মূলত শিশুদের হত্যা ও তাদের উপরে ‘অকল্পনীয়’ অত্যাচার চালানোর অভিযোগে ইসরায়েলকে কালো-তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারও ইসরায়েলের নৃশংসতার বিষয়গুলো উন্মোচিত করেছে।

জাতিসংঘের প্রতিনিধি, গিলাদ এরদান জানিয়েছেন, যে দেশ, সেনা বা গোষ্ঠী শিশুদের হত্যা, গুরুতর জখম, যৌন নির্যাতন, অপহরণ করে বা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা- হাসপাতাল, স্কুল কিংবা কোনো মানবিক সহায়তা থেকে তাদের বঞ্চিত করে, তাদেরকেই এই কালো-তালিকাভুক্ত করা হয়। সশস্ত্র সংঘর্ষ-পীড়িত শিশুদের নিয়ে জাতিসংঘের তদন্তকারী ভার্জিনিয়া গাম্বার একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, গত আট মাসে গাজায় যে সাড়ে ৩৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্তত ১৩ হাজার শিশু রয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, আগামী সপ্তাহে আরও একটি রিপোর্ট দেওয়া হবে নিরাপত্তা পরিষদে। তাতে, ঠিক কোন কোন ‘অপরাধ’ গাজায় শিশুদের প্রতি ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) করেছে, তা সবিস্তারে প্রকাশ পাবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলি জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে। স্বাগত জানিয়েছেন প্যালেস্টাইনের কর্তৃপক্ষও। তীব্র কটাক্ষ করেছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েলি সরকার। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নৈতিকতার নিরিখে ইসরায়েল সেনা বিশ্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’।

যদিও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি কেউই বিশ্বাস করছে না এবং প্রকৃত সত্যের নিরিখে তা নিতান্ত হাস্যকর বলে মনে করছেন। তথাপি ইসরায়েল এমন মিথ্যাচার করেই চলেছে এবং গাজায় গণহত্যা চালিয়েই যাচ্ছে। বিশ্বের কতিপয় শক্তিশালী রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে ইসরাইলকে গণহত্যার নেশা থেকে দমনও করা সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায়, জাতিসংঘের ‘কালো’ তালিকায় ইসরায়েল নাম লেখা হওয়ার বিষয়টি দেশটির জন্য বিরাট বড় নৈতিক পরাজয়। তাদের অপরাধের পুরো শাস্তি না হলেও প্রতীকরূপে কাজ করবে কালো তালিকাভুক্তকরণের এই কলঙ্ক। যে কালিমা অমোচনীয়। যত বাহাদুরি ও বাগাড়ম্বরই করুক, ইসরায়েলের তার ললাটলিখন থেকে শিশুহত্যার কালিমা কখনোই মুছে ফেলতে পারবে না।

ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম; প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

;

এ যেন পথভ্রষ্ট কোকাকোলা বাংলাদেশ!



মাজেদুল নয়ন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সাউথ-ইস্ট এশিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বজুড়ে সমাদৃত কোমল বা কার্বনেট পানীয় কোকাকোলা কোন দেশের প্রতিষ্ঠান, এ লেখার আলোচ্য এটা নয়। বরং গত কয়েক মাসে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোকাকোলা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার পর থেকে কোকাকোলা, পেপসি, ইউনিলিভার, ম্যাকডোনাল্ড, স্টারবাকসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং গণহত্যাবিরোধী মানুষেরা। এর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কোকাকোলা নিয়ে, অন্তত গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-চিত্র সেটাই বলে।

ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে যে কটি দেশ শক্ত অবস্থান নেয়, তার মধ্যে নেতৃত্বস্থানীয় অবস্থায় রয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের গণহত্যাবিরোধী র‍্যালির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই দেশটিতে স্টারবাকস এবং ম্যাকডোনাল্ডের মতো আউটলেট বন্ধ হওয়াতে খুব অবাক হয়নি কেউ।

চলতি বছরের শুরুতে মালয়েশিয়ায় স্টারবাকস ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। তবে বিভিন্ন সময় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছাড়া এই বয়কট স্রোতে নিজেদের শান্ত রাখে তারা। এমনকি মার্চের মাঝামাঝি সময় এসে স্টারবাকস জানায়, বছর শেষে এই অঞ্চলে তাদের ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াবে।

বহুজাতিক এত পণ্য থাকতে বাংলাদেশে কোকাকোলার কেন সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়িক ক্ষতি বা কোকাকোলাই কেন খাদে পড়ল—সেটা তারাই কেবল বলতে পারেন। তবে একজন সাবেক কমিউনিকেশন প্রফেশনাল এবং সাংবাদিক হিসেবে বলতে পারি, কোকাকোলার কমিউনিকেশন এবং ব্র্যান্ডিং বিভাগের দুর্বলতা স্পষ্ট।

সম্প্রতি প্রচারিত কোকাকোলার তিনটি ক্যাম্পেইন বা বিজ্ঞাপন এবং কন্টেন্ট এখানে বিশ্লেষণের চেষ্টা করব।

মে মাসের ৩ তারিখে নিজেদের দেশীয় ইমেজ প্রতিষ্ঠায় দেশের প্রথম সারির পত্রিকায় মলাট বেধে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে কোকাকোলা বাংলাদেশ। তবে বয়কট আন্দোলনের শ্রেণিবৈচিত্র্য নিয়ে তাদের কোন ধারণা আছে বা স্টাডি করেছে কিনা সেটা বোঝার উপায় ছিল না। 'আমরা মানুষে মানুষে সৌহার্দ্যের পক্ষে' বা ‘৬ দশকের বিশ্বাসে ভালবাসায় আছি পাশে,’ এ ধরনের বাক্য যে সকল বাঙালির কাছে এক দেখাতেই বোধগম্য হয় না, সেটা কোকাকোলা বাংলাদেশের মতো একটি কোম্পানির কমিউনিকেশনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের চোখ এড়াল কীভাবে! বোধগম্য নয়। এরকম বাক্য দিয়ে যে মানুষের কাছে যাওয়া যায় না, এটাই হয়তো তাদের অজানা!

মে মাসের মাঝামাঝি সময় আবারো কিছু দুর্বল বাক্য নিয়ে বিজ্ঞাপনে আসলো কোকাকোলা। বিশেষ করে নিজেদের বাঙালি প্রমাণের জন্য যে উঠেপড়ে লাগল, সেটা কোম্পানির জন্য উদ্বেগজনক। কোকের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয়তার তো কোন দ্বন্দ্ব নেই।

এই বিজ্ঞাপনগুলোতে স্পষ্ট হয়েছে, কন্টেন্ট তৈরি করা ব্যক্তিদের গবেষণার অভাব এবং সংস্কৃতির সঙ্গে দূরত্ব। একটা ৫ লাইনের কন্টেন্টে ২ বার 'ই' প্রত্যয়ের ব্যবহার যে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব ফুটিয়ে তোলে সেটা কোকাকোলার কন্টেন্ট বা ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করা কারো মাথায় আসেনি! বাক্যে ‘আমরা’ এর বদলে ‘আমরাই’, ‘কর্মী’র বদলে ‘কর্মীই’ বলাটা দৃষ্টিকটু ছিল।

আর বাক্য গঠন যেন ফেসবুকের রিলস বা টিকটকের জন্য তৈরি! 'এইতো আমার কোক', বাক্যে 'এইতো' বলায় মনে হচ্ছিল, কারো বোতলটা হারিয়ে গিয়েছিল, আবার খুঁজে পেয়েছে!

সবশেষে সম্প্রতি যে টিভিসি’ বানানো হলো তাতো মনে হচ্ছে বাংলাদেশে কোকাকোলার কফিনের শেষ পেরেক!

বাংলাদেশিরা ক্রিকেট পাগল। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বুঁদ হয়ে আছে এখন। বাংলাদেশে কোকাকোলার বয়কটের চেয়ে গ্রাম-গঞ্জের হাটে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এখন আলোচনা সৌম্য সরকার এবং নাজমুল হোসেন শান্ত। সেখানে কেমন জানি নিজেদের জোর করে মনে করিয়ে দিলো কোকাকোলা বাংলাদেশ। দুর্বল স্ক্রিপ্ট এবং সমালোচিত অভিনেতাদের দিয়ে যে বিজ্ঞাপন তৈরি করা হলো, সেটি শুধু কোকাকোলা বয়কটকেই আবারো উসকে দেয়নি, কোকাকোলা বিক্রির দোকানকেও বয়কট করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

ভবিষ্যতে ব্র্যান্ডিং বা কমিউনিকেশনের বাজে উদাহরণ হিসেবে হয়তো কোকাকোলা বাংলাদেশের এই পদক্ষেপগুলো নিয়ে কাঁটাছেড়া করা হবে।

উপরে দেওয়া তিনটি উদাহরণে একটিতেও স্পষ্ট হয়নি আসলে কোকাকোলা বাংলাদেশ কী বলতে চায়, কেন বলতে চায়, গ্রাহকের কাছ থেকে কী চায় তারা?

;

উন্নতির অন্তহীন কান্না



সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: বার্তা২৪.কম

-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

একাত্তর সালটা বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য ছিল চরম দুর্দশার। পাকিস্তানি হানাদারেরা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের লেলিয়ে দিয়েছিল। ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছিল যা ইচ্ছা তাই করবার। তারা সেটা করেছেও। রাষ্ট্রীয় সমর্থনে ক্ষমতাবান হয়ে হত্যা, অস্থাবর সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং ধর্ষণ সমানে চালিয়েছে। এখন তো পাকিস্তান নেই, এখন তো আমরা স্বাধীন, বাঙালিই শাসন করছে বাঙালিকে। তাহলে এখন কেন মেয়েরা এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে?

পাচার হচ্ছে ভারতে, জীবিকার অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে যেখানে সেখানে, আত্মহত্যা করছে যখন তখন, আটকা পড়ছে বাল্যবিবাহের ফাঁদে? কারণটি আমাদের অজানা নয়। কারণ হচ্ছে পাকিস্তান বিদায় হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওই রাষ্ট্রের আদর্শ বিদায় হয়নি। আদর্শটা ছিল পুঁজিবাদী। সে-আদর্শের এখন জয়জয়কার। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দুর্বল লাঞ্ছিত হচ্ছে, হতে থাকবে, কেননা আমরা উন্নতি করতেই থাকবো, এবং অত্যন্ত অল্প কিছু মানুষের উন্নতি কাল হয়ে দাঁড়াবে বাদবাকিদের জন্য। এটাই ঘটছে।

পাকিস্তানের প্রেতাত্মা এখনও আমাদের পিছু ছাড়েনি, এমন কথা যাঁরা বলেন তাঁরা মোটেই মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই প্রেতাত্মাটাকে চিহ্নিত করেন না। প্রেতাত্মাটা অন্যকিছু নয়, প্রেতাত্মাটা পুঁজিবাদ। আর প্রেতাত্মাই বলি কি করে, সে তো ভীষণ ভাবে জীবন্ত। সে তো ব্যস্ত জীবিতদের জীবন কেড়ে নেবার কাজে। ধর্মকে সে ব্যবহার করে উপায় ও আচ্ছাদন হিসেবে। না-মেনে উপায় নেই যে, আমাদের জাতীয়তাবাদীরা সকলেই পুঁজিবাদী : পাকিস্তানিদের সঙ্গে তাদের নামে মস্ত পার্থক্য, চরিত্রে মৌলিক পার্থক্য নেই।

তাহলে উপায় কি? প্রতিবাদ? অবশ্যই। প্রতিবাদটা চলছে। বাল্যবিবাহে অসম্মত মেয়েরা কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করছে, এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েরা বিয়ের আসর থেকে সহপাঠিনীকে উদ্ধার করছে, আমরা জানতে পাচ্ছি। মে’ মাসের খবরের কাগজেই বের হয়েছে এমন খবর যে মাগুরাতে এক মা তাঁর মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছেন। কিন্তু তাতে তো ব্যবস্থাটা বদলায় না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমেরিকাতে বিক্ষোভ চলেছিল। আমেরিকার অরেগান-এ মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যে দু’জন আমেরিকান নিহত হয়েছিলেন তাঁদের একজনের মা বলেছিলেন তাঁর ছেলে বীর ছিল, মৃত্যুর পরেও বীর থাকবে। মানুষের মনুষ্যত্ব কেড়ে নেবার চেষ্টা চলছে, সে-চেষ্টা চলবে; কিন্তু মনুষ্যত্ব নষ্ট হবার নয়, হবেও না। তবে একলা একলা প্রতিবাদ করে যে কাজ হবে না সেটা তো প্রমাণিত সত্য।

তাহলে কি পালাতে হবে? কিন্তু পালাবেন কোথায়? একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে মানুষকে পালাতে হয়েছিল, ফিরে এসে তারা দেখেছে এ কী পাকিস্তান তো রয়েই গেছে! বদলটা শুধু নামেই। মানুষ এখনও পালাচ্ছে। ধনীরা ইতিমধ্যে বিদেশে বাড়ীঘর তৈরী করেছেন, সময় মতো চলে যাবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলীয় সংঘর্ষ থামানোর লক্ষ্যে দলীয় লোকদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে দল যদি ক্ষমতায় না থাকে তাহলে টাকাপয়সা নিয়ে পালাবার পথ পাওয়া যাবে না। এই সতর্কবাণীর দরকার ছিল কি? যারা পেরেছে তারা তো ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা করেছে, অন্যরাও তৎপর আছে। আর যাদের টাকাপয়সার অভাব, দলের লোক নয়, সাধারণ মানুষ, তাদেরও একটা অংশ কিন্তু পালাচ্ছে।

রিপোর্টে বলছে নৌপথে ইউরোপে যারা পাড়ি দেবার চেষ্টা করে তাদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষস্থানে। হতভাগা এই মানুষেরা অবশ্য টাকা পাচারের জন্য যায় না, টাকা উপার্জনের জন্যই যায়। কিন্তু যাচ্ছে তো। জীবন বাজি রেখে যাচ্ছে। ঝাঁপ দিচ্ছে সমুদ্রে। যুদ্ধে-বিধ্বস্ত সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া থেকে মানুষ পালাবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী এবং উন্নতিতে পুলকিত বাংলাদেশ থেকে অত মানুষ পালাচ্ছে কেন? পালাচ্ছে এখানে জীবিকার নিরাপত্তা নেই বলে; এবং মেয়েদের দুরবস্থা বলছে এখানে নিরাপত্তা নেই জীবনেরও।

সিদ্ধান্তটা তো তাই অপরিহার্য। করণীয় হচ্ছে পুঁজিবাদকে বিদায় করা। কিন্তু সে কাজতো একা কেউ করতে পারবে না, করতে গেলে কেবল হতাশাই নয়, বিপদ বাড়বে। বিদায় করার জন্য দরকার হবে আন্দোলন, এবং আন্দোলনের জন্য চাই রাজনৈতিক দল। শুধু দলেও কুলাবে না, শত্রুকে যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না হয়, এবং সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করা না যায়। বাংলাদেশে, এবং বিশ্বের অনেক দেশেই, জাতীয়তাবাদী যুদ্ধটা শেষ হয়েছে, বাকি রয়েছে সমাজতন্ত্রের জনযুদ্ধ।

এই যুদ্ধটা যে সহজ হবে না সেটা তো স্পষ্ট। জবরদস্ত পুঁজিবাদের দখলে অনেক অস্ত্র রয়েছে; খুবই শক্তিশালী একটি অস্ত্র হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়া পুঁজিবাদের নৃশংসতার খবর ছিটেফোঁটা দেয়, কিন্তু আসল খবর দেয় না; ঢেকে রাখে, বিভ্রান্ত করে, এবং নানাকিসিমের রূপকথা তৈরির কারখানা চালু রাখে। বাংলাদেশের সব খবরের কাগজের প্রথম পাতাতে মস্ত করে ছাপা হয়েছিল একটি রূপকথার খবর। ক্রিকেটে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছে। রূপকথাই বলা হয়েছে খবটিকে; কেননা এ বিজয় ছিল অপ্রত্যাশিত, প্রায় অসম্ভব।

মিডিয়া রূপকথাকে খুব পছন্দ করে, কিন্তু রূপকথা তো নারকীয় বাস্তবতাকে অবলুপ্ত করতে পারবে না, যার একটি খবর পত্রিকাতেই আছে, এবং প্রথম পাতাতেই। সেটি হলো তিন শিশুসহ এক মায়ের লাশ উদ্ধার। এই রাজধানীতেই। ধারণা করা হচ্ছে মা নিজেই খুন করেছে নিজের সন্তানদের, একের পর এক; তারপরে খুন করেছে সে নিজেকে। মৃত মায়ের ভাই অবশ্য বলছে অসম্ভব, তার বোন এ কাণ্ড করতে পারে না, অন্যরাই ঘটিয়েছে; এটি একটি হত্যাকাণ্ড। যেভাবেই ঘটুক, হত্যা তো বটেই। এবং তিনটি সন্তান নিয়ে মা’টি যে চরম হতাশায় ভুগছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তার স্বামীর এক সময়ে ভালো আয় ছিল, প্রতারক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডেসটিনিতে ৫০ লাখ বিনিয়োগ করেছিল, মার খেয়েছে; নিজে ব্যবসা করার চেষ্টা করেছে সফল হয়নি, সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারে না, তাদের এমন কি ভালোমতো আহারও জোটে না; পারিবারিক বিরোধ আছে সম্পত্তি নিয়ে। কোথাও কোনো আলো ছিল না আশার। আর সমস্তটা বোঝা গিয়ে চেপে বসেছিল বিপন্ন মেয়েটির ঘাড়ের ওপর। মেধাবী ছাত্রী ছিল সে; এমএ পাস করেছে, চাকরি খুঁজেছে, পায়নি। স্বামীর তবু বাইরে একটা জীবন ছিল, স্ত্রীর জীবন তিন কামরার। জীবন তার জন্য দুঃসহ এক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

উন্নতির রূপকথার খবর চীৎকার করে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা এখন এমনই বিকট যে তাকে ঢেকে রাখার উপায় নেই। পত্রিকাতে বাংলাদেশের মানুষের নরকবাসের আরও খবর আছে। ১. সাতক্ষীরায় দ্বিতীয় মেয়ে হওয়ায় বাবার হাতে নবজাতক খুন। ২. বরগুণায় যৌতুক না পেয়ে অন্তঃসত্তা গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা। ৩. রৌমারিতে ক্লাস রুমে ঢুকে ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা। ৪. আড়াইহাজারে বিয়ের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণ। ৫. গাজীপুরে তিন সন্তানসহ নিখোঁজ প্রবাসীর স্ত্রী। ৬. ঢাকায় মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মায়ের সংবাদ সম্মেলন। আরও খবর: ১. রাজধানীতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুইজন গ্রেফতার। ২. শায়েস্তাগঞ্জে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে বিধবাকে পিটিয়ে হত্যা। ৩. কালিয়াকৈরে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ। ৪. হবিগঞ্জে প্রকাশ্য সড়কে ধর্ষণের পর পিটিয়ে হত্যা। প্রতিটি ঘটনাই ভয়াবহ। ‘উন্নতি’ অব্যাহত রয়েছে।

এই উন্নতির অন্তর্গত কান্না বলছে ব্যবস্থার বদল চাই। হতাশা কাটবে না পরিবর্তনের আন্দোলন যদি জোরদার না হয়।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

;

রোহিঙ্গা সংকট: প্রয়োজন সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়ন



ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে চলছে। নতুন নতুন সংকট মোকাবিলায় দাতাদের ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসছে এবং ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দাতারা তাদের সহযোগিতা কমালে কিংবা বন্ধ করে দিলে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সরবরাহে জটিল সংকটের সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করছে এবং তারা এ বিষয়ে তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, বাংলাদেশের একার পক্ষে সে সমস্যা মোকাবিলা অসম্ভব। তাই এই সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা চলমান থাকতে হবে।

৭ মে আইওএম মহাপরিচালক কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা কালে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য নতুন উৎস থেকে আরও তহবিল সংগ্রহ এবং ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করতে আইওএমকে সহায়তা করার জন্য আহ্বান জানান। ক্যাম্পের জনঘনত্বের কারণে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের পক্ষে সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানসহ সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করেছে, সেখানে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আইওএম রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য কোনোভাবেই যাতে বন্ধ না হয়ে যায় সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

দাতা সংস্থা নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়া ইয়োহেই এপ্রিল মাসে ভাসানচর পরিদর্শনের সময় রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নে মাছ চাষ ও রোহিঙ্গা যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নে ওপর গুরুত্বারোপ করে। নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও ব্র্যাক বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জেলেদের দক্ষতা বাড়াতে কাজ করবে। সরকারের সহায়তায় এবং ইউএসএ’র আর্থিক পৃষ্টপোষকতায়, ইউনিসেফ ও ব্র্যাক, ভাসানচরে ৩৮টি ক্লাস্টারে ১৮টি স্কুলের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীর পাঠদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন, ৭ শত ৯৮টি পরিবারকে বাণিজ্যিকভাবে সবজি উৎপাদন এবং ৪ হাজার ২ শত পরিবারকে সবজি চাষে সহযোগিতা দিচ্ছে। এসব কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার ৯ শত ৫০ জনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাসিক আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার সার্বিক উন্নয়ন ঘটেছে। ভাসান চরে বর্তমানে ৮ হাজার ২২২টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৩৫ হাজার ২৬ জন সদস্য বসবাস করছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় কর্মরত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি অ্যাম্বাসেডর জেফরি প্রেসকট রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর রোহিঙ্গাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে ৩০.৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দেয়। ৯ মে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এই বরাদ্দের বিষয়ে জানায়। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা এবং এ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশিদের জন্য সমর্থন অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ সরকার এবং তাদের অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জেফরি প্রেসকট রোহিঙ্গা ও তাদের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে এবং সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার উপায় খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ২২ মে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সে সময় ক্যাম্পের চলমান সেবা কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পানীয় জলের সংকট, নারী-শিশুদের দুর্ভোগ, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত-লড়াই এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নানা দিক সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা হয়। পেনি ওং রোহিঙ্গাদেরকে টেকসই ও নিরাপদ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের পাশে থাকবে ও রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবা কার্যক্রমে অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতাও অব্যাহত রাখা হবে বলে জানায়।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রেসিডেন্ট কেট ফোর্বস ৪ জুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ফিল্ড হাসপাতাল এবং কক্সবাজারে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চলমান মানবিক কার্যক্রম পরিদর্শন করে। ৬ জুন কারিতাস ইন্টারন্যাশনালিজের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যালিস্টার ডাটন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের জন্য শক্তিশালী মানবিক অবস্থান এবং চলমান সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ এবং বিশ্ববাসীকে তাদের জন্য আরও সহায়তার আহবান জানায়। ২০২৪ সালে কারিতাস রোহিঙ্গাদের জন্য ৭ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা করছে।

ডব্লিউএফপি কার্যক্রমের বাংলাদেশ প্রধান ডমেনিকো স্কালপেলি রোহিঙ্গাদের মৌলিক প্রয়োজন ও জীবনব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করার কথা জানায় যাতে তারা অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়। ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণে আন্তর্জাতিক অর্থ সহায়তা কমছে, চাহিদা অনুযায়ী অর্থ সহায়তা পাওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো চাপে রয়েছে। পর্যাপ্ত সাহায্য না পাওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। রোহিঙ্গারা তাদের প্রয়োজন মেটাতে কাজের সন্ধানে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এর ফলে স্থানীয় জনগণের ওপর ঋণাত্বক প্রভাব তৈরি করেছে যা মোকাবিলা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ, দাতাদেশ ও সংস্থাগুলো সাহায্য সংগ্রহে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তবে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা ক্যাম্প পরিদর্শন করে এর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারনা পাচ্ছে। বাংলাদেশ সফলতার সাথে আন্তর্জাতিক মহলকে রোহিঙ্গা সংকটের অগ্রগতি অবহিত করে যাচ্ছে। দাতা দেশ ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন থেকে যেসব বিষয় আমাদের সামনে এসেছে সেগুলো থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ জরুরী। রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সাহায্য বন্ধ করে দিলে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে তা কি করে সামলাতে হবে তার কোন রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়নি। এই বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা ও কার্যকরী প্রস্তুতি নিতে হবে।

কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর জনঘনত্ব বেশি হওয়ার কারণে এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কষ্টসাধ্য। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা গেলে এই সংকট কিছুটা কমবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এটা বহন করা সম্ভব না। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভাসানচরে স্থানান্তরের ব্যয় বহনের জন্যও দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর থেকে কোন আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।মিয়ানমার সেনাবাহিনী দখলকৃত এলাকাগুলোতে আক্রমণের তীব্রতা বাড়ালে সংকট আরও বাড়তে পারে। চলমান সংকটের রাজনৈতিক সমাধান এখনও দেখা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট ও জাতিগত সংঘাত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির (এ এ) মধ্যে যুদ্ধ, রোহিঙ্গাদের মানবঢাল হিসেবে উভয়পক্ষের ব্যবহার এবং খাদ্য সংকটের কারণে রাখাইনের পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। খাদ্যের অভাবে সৃষ্ট মানবিক সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রোহিঙ্গাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ।

এ এ রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে আন্তরিক হলে তারা রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখাইন জনগণের মধ্যে প্রচার করতে পারে। রাখাইন সমাজের ওপর তাদের প্রভাব থাকায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে রাখাইন সমাজে জনসচেতনতা তৈরিতে এ এ’র প্রচারণাই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হবে। এ এ’র সাথে যোগাযোগ ও রোহিঙ্গাদের রাখাইনে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবং চলমান সংকটে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সকলকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআর ভারত ও চীনকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে সংকটের সমাধানে উদ্যোগী হতে পারে। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা মামলায় দ্রুত একটি ইতিবাচক ফলাফল আসবে এবং এর ফলে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি হবে, একইসাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের দুই প্রতিবেশি দেশ ভারত এবং চীনকে যুক্ত করলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব বলে বাংলাদেশ মনে করে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কার্যক্রম চলমান রেখেছে এবং কূটনৈতিক ও আইনি দুই প্রক্রিয়াতেই এগোচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করছে এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক আদালতের আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশ আশ্রিত প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য, রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত নিরসন ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং অন্যান্য অংশীদারদের সুসংহতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিক্ষার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বাড়াতে ছোট ছোট দল গঠন করে তাদের বিভিন্ন ট্রেড প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়। এই প্রশিক্ষণ তাদেরকে মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে তাদের পেশাগত ক্যারিয়ার গড়তে সহায়তা করবে। রোহিঙ্গাদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতাদেরকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়া ইয়োহেই রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও এ এ’র মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিধ্বস্ত রাখাইনে মানবিক সহায়তা প্রদানে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিলেন। নিপ্পন ফাউন্ডেশনের রাখাইনে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের সাথে সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট দেশ ও সংস্থাগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাখাইনে প্রত্যাবাসন উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি ও পরবর্তীতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ভুমিকা রাখতে পারে।

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক

;