মিয়ানমারে আবারও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে– সহিংসতার অবসান কতদূর!



ব্রি. জে. হাসান মো. শামসুদ্দীন (অব.)
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে চলমান সংঘর্ষের ফলে সেনাবাহিনী সীমান্ত অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে তাদের আধিপত্য হারাচ্ছে। সেনাবাহিনীর মনোবল নিম্নমুখী এবং তারা জনবল সংকটে ভুগছে।

চলমান পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর প্রতি জনসমর্থন কমছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাবাহিনী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর বিদ্রোহী বাহিনীর (ইএও) কাছে আত্মসমর্পণ করছে।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রায় ৭০ বছর ধরে ই এ ও’র বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা নানা ধরনের কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে ই এ ও- গুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে কিংবা কারো কারো সঙ্গে কথিত ‘শান্তি চুক্তি’র মাধ্যমে অন্যদের ওপর দমন পীড়ন চালিয়ে আসছিল।

২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডি’র (ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি) প্রার্থী রাখাইনে বিজয়ী হতে ব্যর্থ হয় এবং রাখাইনে ইউনাইটেড লীগ অব আরাকানের (ইউএলএ) প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। এই দলের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) রাখাইন রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করে আসছে।

এনএলডি’র শাসনামলে আরাকান আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে আরাকান আর্মি মিয়ানমারের বিদ্রোহী বাহিনীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও সংগঠিত।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের মাধ্যমে রাখাইন ছাড়া করার আগেও দীর্ঘ সময় ধরে কট্টর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সংগঠন মা বা থা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক প্রোপাগান্ডা চালায়। এসব অপপ্রচার বামারদের পাশাপাশি রাখাইনরাও এক সময় বিশ্বাস করা শুরু করে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তাদের বৈরী সম্পর্কের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে তা ঘৃণায় রূপ নেয়।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্মম সহিংসতায় জান্তা বাহিনীর সঙ্গে রাখাইনরাও রোহিঙ্গা নিধনে অংশগ্রহণ করেন। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়নের পর কিছুদিন সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও আবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মি’র তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে আরাকান আর্মি মিয়ামারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাময়িক অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়। সেই বছর নির্বাচনের সময় আরাকানে আপাত শান্তি বিরাজ করছিল।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এই বিক্ষোভ দমনে নির্যাতনের আশ্রয় নিলে এর তীব্রতা না-কমে ক্রমেই তা বাড়তে থাকে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বামার জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে।

মিয়ানমারের প্রায় ২৪টিরও বেশি ই এ ও সামরিক অভ্যুত্থানের নিন্দা জানায় এবং কোনো কোনো দল অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতিও সমর্থন জানায়। তখন আরাকান আর্মি জান্তাবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করেনি এবং রাখাইন রাজ্যে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ হয়নি। জান্তার ক্ষমতা দখলের পর ২০২১ সালের ১১ মার্চ থেকে আরাকান আর্মিকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জান্তা বাহিনী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত চৌকিগুলোর প্রায় সবই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। রাখাইনে আরাকান আর্মির বিপুল সমর্থন রয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে তারা রাখাইনের স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করছে।

২০১৩ সালের নভেম্বরে রাখাইনে অভিযান শুরুর পর আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইনের পাঁচটি ও প্রতিবেশী চিন রাজ্যের একটি বড় শহর দখল করে ও সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিজয় অর্জন করে।

সম্প্রতি, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির আক্রমণের তীব্রতায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত চৌকি থেকে বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও অন্যান্য সংস্থার ৩৩০ জন সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

মাঝে মাঝেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন।

বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে ১৫ ফেব্রুয়ারি তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠায়।

রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির কাছে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর বামার-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয় শহরগুলোর রাস্তায় জাতিগত রাখাইনবিরোধী মনোভাব প্রচারকারী লিফলেট দেখা যাচ্ছে। লিফলেটগুলোতে বামার জনগণকে রাখাইনদের মালিকানাধীন দোকান ও রেস্তোরাঁ বয়কট এবং রাখাইন জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ রাজ্যে ফিরে যেতে আহ্বান জানানো হয়।

এছাড়া রাখাইন সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ ও দোকানগুলোর ল্যাম্পপোস্ট ও সাইনবোর্ডে রাখাইনবিরোধী মনোভাব প্রচারকারী লিফলেট লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সেখানে বলা হচ্ছে যে, সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি’র নিন্দা জানাতে রাখাইনের মালিকানাধীন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বর্জন করা হয়। এসব কারণে ইয়াঙ্গুনের জাতিগত রাখাইন বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। এই বিদ্বেষ ছড়ানোর পেছনে শাসকগোষ্ঠী সমর্থিত জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।

তবে এখন পর্যন্ত এই ঘৃণামূলক প্রচারণার দায় কেউ স্বীকার করেননি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে। কারণ, জনগণ এই কূটকৌশল বুঝতে পেরেছেন এবং তাদের বিভাজনের মাধ্যমে শাসনের কৌশল সম্পর্কে এবার তারা সচেতন রয়েছেন। চলমান প্রেক্ষাপটে জাতিগত বিভেদের বীজ বপন করার প্রচেষ্টা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, বামার জনগণের একটা অংশ সামরিক সরকারের সমর্থকদের সঙ্গে যোগ দেবেন না।

২০২৩ সালের আগস্টে মিয়ানমারে বামার ও কাচিন জনগণের মধ্যে ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা চলে। সে সময় কাচিন ইনডিপেন্ডেন্স আর্মির (কেআইএ) সরবরাহ করা অস্ত্র দিয়ে বামার ও কাচিনরা একে অপরকে হত্যা করছে বলে প্রচারণা চালানো হয়।

২০২৩ সালের শেষভাগে শান রাজ্যে ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর জাতিগত বিভেদকে উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শানদের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য প্রচার করা হয় যে, ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স জান্তা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা না-চালিয়ে জাতিগত শানদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি দখল করার জন্য আক্রমণ করছে। তবে এবার এসব প্রচারণা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে ব্যর্থ হয়।

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত গণতন্ত্রপন্থিদের দুর্বল করতে ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রে জান্তার সক্রিয় ভূমিকা আছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। বর্তমানে সেনাবাহিনীর জনবল সংকট কমাতে মিয়ানমার সরকার ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়েসি সব পুরুষ ও ১৮-২৭ বছর বয়েসি নারীদের অন্তত দুই বছরের জন্য সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে একটি আইন কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০ ফেব্রুয়ারি একটি আইন পাস করে জান্তা সরকার। এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের অনেক তরুণ প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা যায়। জনগণের দেশত্যাগের প্রবণতা বন্ধ করতে জান্তা সরকার ইতোমধ্যে নানান পদক্ষেপ নিয়েছে।

আরাকান আর্মি পুরো রাখাইন রাজ্য দখল করার ঘোষণা দিয়েছে এবং এরই মধ্যে উত্তর রাখাইনের প্রায় পুরোটাই দখল করে নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মংডুর রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর কমান্ডাররা বৈঠক করে তাদের জান্তা বাহিনীর হয়ে কাজ করার প্রস্তাব দিচ্ছে এবং এতে তারা সম্মত হলে তাদেরঅস্ত্র দেওয়া হবে বলে জানা যায়।

জান্তা প্রতিনিধি তাদের জানায় যে আরাকান আর্মির কারণে রোহিঙ্গারা দুর্ভোগে আছে। এজন্য তাদের আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মিয়ানমারের জান্তার পক্ষে যোগ দেয়া উচিত। তবে এই প্রস্তাবে বেশিরভাগ নেতাই রাজি হননি।

শতাব্দীর পর শতাব্দী আরাকানে রাখাইন ও রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছিল। হাজার বছরের ইতিহাসে তাদের মধ্যে কোনো ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি ও জাতিগত বিদ্বেষ ছিল না। পরস্পরের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই দুই সম্প্রদায় আরাকানের মাটিতে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। আরাকানের ইতিহাস মানেই রাখাইন ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের হাজার বছরের সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের ইতিহাস।

অন্যদিকে, বার্মিজদের সঙ্গে এ দুটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা ও নির্যাতনের।

মিয়ানমারে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে ও সহিংসতার মাধ্যমে মিয়ানমারের ভাঙনরোধের যে উদ্যোগ বিগত দশকগুলোতে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ফলশ্রুতিতে মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভেদ ও সহিংসতা দূর করা সম্ভব হয়নি। মিয়ানমারের ই এ ও-গুলির লক্ষ্য এবং আগ্রহ আলাদা বলে ঐক্যমত অর্জন করা কঠিন।

মিয়ানমারের জনগণকেই ভাবতে হবে, কীভাবে তারা তাদের দেশকে গড়তে চান। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয় বরং সম্প্রীতি, ধার্মিকতা, ন্যায়বিচার এবং সমান সুযোগের নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেই, তা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে বলে অনেকে মনে করেন।

রাখাইনদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে, কাচিন ও শানদের বিরুদ্ধে বামারদের মধ্যে বিভেদ ও ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং সবশেষে আরাকানের রোহিঙ্গাদেরকে রাখাইনদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্য উস্কানো এবং চাপ প্রয়োগ চলমান থাকলে মিয়ানমারের অশান্ত পরিস্থিতি আরো অস্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

শান্তির অন্বেষায় বহু দশক ধরে চলমান সংগ্রাম ও সহিংসতার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রীতি ও সহনশীলতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। একটা ফেডারেল কাঠামোর আওতায় শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ মিয়ানমারের স্বপ্নের বাস্তবায়ন আর কতদূর!

লেখক- ব্রি. জে. হাসান মো. শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অব.) ও মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক

 

   

সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ

  ‘এসো হে বৈশাখ’



সায়েম খান
সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ

সময়ের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ

  • Font increase
  • Font Decrease

সপ্তম শতাব্দীতে গৌড় সাম্রাজ্যের সার্বভৌম নৃপতি ও বাংলা অঞ্চলে একীভূত রাষ্ট্রের প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা ছিলেন রাজা শশাঙ্ক। রাজা শশাঙ্ক ছিলেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ভূবনেশ্বর পর্যন্ত একচ্ছত্র অধিপতি। তাকে অনেক ইতিহাসবিদ গৌড়াধিপতিও বলে থাকেন। আজ থেকে ১৪’শ বছর আগে রাজা শশাঙ্কের শাষণামলে তার রাজ্যাভিষেককে স্মরণীয় করে রাখতে সৌরপঞ্জিকার ভিত্তিতে তিনি বঙ্গাব্দের সূচনা করেন। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে এই রাজ্যাভিষেককে ঘিরে নানা উৎসব ও আয়োজনের মাধ্যমে প্রজাদের নিয়ে এই দিনটি উদযাপন করতেন বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্ক। এজন্য বাংলা নববর্ষের বারো মাসের নাম নক্ষত্রের নামানুসারে রাখা হয়। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হণ থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র, এমন করেই নক্ষত্রের নামে মাসের নামকরণ হয়।

কালের বিবর্তনে সেই বঙ্গাব্দ হয়ে যায় ইতিহাস। ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে শুরু হয় মোগলদের শাষনামল। মোগলদের শাষণামলে চন্দ্রপঞ্জিকার ভিত্তিতে আরবি মাস গণনার মাধ্যমে "তারিখ-এ-এলাহী" হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রচলন ঘটানো হয়। "তারিখ-এ-এলাহীর" বারো মাসের নাম ছিল কার্বাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোর্দাদ, তীর, আমার্দাদ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম ও ইস্কান্দার মিজ। মাসের এই শব্দগুলো আসলে আরবী ও ফার্সী শব্দ থেকে উদ্ভুত। কিন্তু মোগলদের ও প্রজাদের সমস্যা তৈরি হয় কর আদায়ের ক্ষেত্রে। মোগলদের শাষনব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তৎকালীন ভারতবর্ষের ভূমি ও কৃষি কর আদায়ের ক্ষেত্রে চন্দ্রবর্ষ বা হিজরী সালকে অনুসরণ করা হত। কৃষকরা চাষাবাদ করত সৌরবর্ষের ভিত্তিতে আর মোগলদের শাষন ব্যবস্থা ভূমি ও কৃষিকর আদায় করত চন্দ্রবর্ষের ভিত্তিতে। চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করলে কর আদায়ের সময় কৃষকদের কাছ থেকে কর আদায় করা যেত না কারণ হিজরী বর্ষের শুরুতে প্রজাসাধারণের কাছে অর্থের অভাব থাকত। কিন্তু কৃষকরা নবান্নে ফসল ঘরে তুলার পরে বঙ্গাব্দের শুরুতে তাদের কাছে অর্থের যোগান থাকে সেই ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য কর প্রদানে বাধাগ্রস্থ হয় না। এহেন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সম্রাট আকবরের দরবারে ডাক পড়ে মোগল সাম্রাজ্যের সেই সময়কার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি'র। সম্রাটের আদেশে তাকে এই সমস্যার সমাধান করতে বলা হয়। ফতেহউল্লাহ সিরাজি তখন সৌরবর্ষ (বঙ্গাব্দ) ও হিজরী বর্ষকে একিভূত করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। ফসল কাঁটা ও খাজনা আদায়ের জন্য এই বছরের নাম দেয়া হয়েছিল ফসলি সন। পরে তা বঙ্গাব্দ থেকে বাংলা সন করা হয়। বাংলা সনের শুরুর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের দিনে জনসাধারণ কর প্রদান করতে আসত রাজ দরবারে। সম্রাট আকবরের পক্ষ থেকে তাদের মিষ্টি বিতরণ করা হত ও প্রজাদের চিত্তবিনোদনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত।

মোগল সম্রাট আকবরের প্রজাকর আদায়ের এই দিবস সময়ের পরিক্রমায় বাংলা সনের প্রথম দিন "পহেলা বৈশাখ" হিসাবে রুপান্তরিত হয় বাঙালী সভ্যতার ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে। বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাগরিত হয় এই উৎসব। বাংলা বর্ষবরণের এই মহোৎসব পালিত হয় গোটা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। যদিও পহেলা বৈশাখ পালন নিয়ে এখনও কিছু বিভেদ আমরা লক্ষ্য করি। হিন্দু সম্প্রদায়ের তিথি পঞ্জিকা অনুসারে পহেলা বৈশাখ পশ্চিমবঙ্গে পালিত হয় ১৫ই এপ্রিল। আর বাংলাদেশে বাংলা একাডেমীর নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুসারে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় ১৪ই এপ্রিল।

পহেলা বৈশাখ মূল: প্রাচীন হিন্দু নববর্ষ উৎসবের সাথে সম্পর্কযুক্ত যা সনাতন ধর্মের বিক্রমী দিনপঞ্জির সাথে মিল আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৭ অব্দে রাজা বিক্রমাদিত্য বাংলা দিনপঞ্জির আবির্ভাব করেন বলে অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন। যদিও বিক্রমাদিত্যের বাংলা দিনপঞ্জির আবির্ভাব নিয়ে অনেক ইতিহাসবিদ দ্বিমত পোষণ করেন।

বহু প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মাঝে বাংলা নববর্ষ পালনের রীতি পরিলক্ষিত হয়। ভারতের আসাম রাজ্যে অসমীয়রা "রঙালি বিহু "উৎসবে মেতে উঠে বর্ষবরণের শুরুর এই দিনে। বিহু অসমীয়দের ফসল কাটে ঘরে তুলার পরে আনন্দে মেতে উঠার একটি উৎসব যা বাংলা নববর্ষেরই অনুরুপ। ঠিক তেমনই ভাবে ভারতের শিখ ধর্মের লোকেরাও "বৈশাখী" নামে পহেলা বৈশাখের দিনে উৎসব পালন করে। একইভাবে থাইল্যান্ডেও "ফ্যাসটিভাল অব ওয়াটার" বা পানি উৎসব নামে বর্ষবরণ পালিত হয়। যাকে থাই ভাষায় বলা হয়ে থাকে সংক্রান। পানি উৎসব দিয়ে বছর শুরুর দিনটি উদযাপনের চিত্র আমরা দেখতে পাই আমাদের দেশের কিছু প্রাচীন নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের মাঝে।

আধুনিক পহেলা বৈশাখ পালন শুরু হয় ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পূজা অর্চনার মাধ্যমে। একবিংশ শতাব্দীতে নববর্ষ উদযাপনে আমরা দেখতে পাই এক বাণিজ্যিক ধারার রূপ। বহু প্রাচীন এই উৎসবের ধারায় নেই আগের মত কোন স্বকীয়তা। কর্পোরেট কালচার ও পুঁজিবাদের চাপে জৌলুসময় পহেলা বৈশাখ যেন ব্যবসায়িক ফায়দার একটি পন্থা বৈ আর কিছুই নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে মিলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে নতুন দিনের ও নতুন বছরের সূচনা হোক এক সুখময় আবেশে।

সায়েম খান, লেখক ও কলামিস্ট

;

বারো মাসে তের পার্বণ

  ‘এসো হে বৈশাখ’



অঞ্জনা দত্ত
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারে আক্ষরিক অর্থেই মনে হইতেছে বারো মাসে তের পার্বণ পালন করিতে যাইতেছি। যদি আমরা ধারণ করিয়া থাকি ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তবে কাহারও কাহারও এই বিষয়ে আপত্তি রহিয়াছে। উহারা বলিয়া থাকে ধর্ম অনুসারে উৎসব। অর্থাৎ যাহার যে ধর্ম সে অনুসারে সে উৎসব পালন করিবে। যাহারা এইরকম ভাবে, তাহাদিগকে এই লেখা পড়িতে বারণ করিব। যদিও ইহাতে আপত্তিকর কিছুই নাই। তবে এলার্জির ভাব হইতে কতক্ষণ? নোয়াখালীর মতো সাম্প্রদায়িক জায়গায় বাড়িয়া উঠিয়াও এই প্রৌঢ়ত্বে আসিয়াও ঈদের আনন্দ হৃদয়কে স্পর্শ করিয়া যায় ... ইহা অনুভব করিবার ক্ষমতা ঈশ্বর সবাইকে দেন নাই।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর হইতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বুঝিতে পারিল মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠন করিবার নিমিত্তে তাহারা যে আশায় পূর্ববাংলাকে দেড় সহস্র মাইল দূরে রাখিয়াও ( দুই অংশ বিভক্ত ভারত দ্বারা) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করিল, মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করিবার জন্য, সেই আশায় ছাই পড়িল। পূর্বপাকিস্তানে যখন প্রথম টিভি স্টেশন চালু করিল ( ১৯৬৫ সাল) তখনকার সময়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়া গায়িকা, যিনি এক কিংবদন্তি শিল্পীর দুহিতা, তাঁহার উপর ফরমান জারি হইয়াছিল টিপ পরিয়া টিভিতে গান পরিবেশন চলিবে না। ফেরদৌসী রহমান সাথে সাথে উত্তর দিয়াছিলেন তাহা হইলে আমি গাহিব না।

বর্তমান সময়ে আমরা এমন তেজোময়ী নারী বা নাগরিকদের দেখিতে পাই না। ইহা যে একটি দেশের সংস্কৃতি হইতে পারে কেহ ভাবিয়া দেখিল না। না তাহারা,যাহারা বাঙালিদের মানুষের মর্যাদা দিতে নারাজ ছিল,না তাহাদের পাচাটা দালালেরা, বাঙালি হইয়াও যাহারা বাংলার কৃষ্টিকে বুকে ধারণ করিত না। আরব দেশে আনন্দ উৎসবে উলুধ্বনি দিয়া তাঁহাদের উল্লাস প্রকাশ করিয়া থাকে। উহাতে তাঁহাদের বেদাত বলিয়া ওয়াজ করিতে কোনো মাওলানাকে শুনি নাই। ধারণা করি উহাদের এইরূপ কথা বলিলে নানাধরণের সমস্যা সৃষ্টি হইতে পারে। অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও ইসলাম ধর্মের সর্বোচ্চ তীর্থস্থানে যাইতে অপারগ হওয়ার সম্ভাবনা রহিয়াছে। ইদানীং কোনো কোনো আরব দেশে মন্দির নির্মাণ করিবার অনুমতি দেওয়া হইতেছে। সেখানে কাহারও ধর্মে দাগ পড়িতেছে মর্মে শুনিতে পাই নাই। যত সমস্যা আমাদের দেশে।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর হইতে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকবর্গের টনক নড়িল। তাহারা বুঝিতে পারিল দুধ দিয়া কালসাপ পুষিবার ন্যায় ভুল করিয়া ফেলিয়াছে৷ তাহারা অন্য পথ ধরিল। ঠিক করিল বাঙালি সংস্কৃতি বলিয়া কিছু থাকিবে না। উহাকে বুলডোজার দিয়া ডলিয়া মাটির সাথে মিশাইয়া দিতে হইবে। ইহা মাথায় রাখিয়া পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একাংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং সমাজের কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে গভর্নর ভবনে ডাকিয়া আনিয়া জানিতে চাহিল তাঁহারা কেন রবীন্দ্রসঙ্গীত রচনা করিতে পারেন না? বেওকুফ গভর্নর হয়তো বা জানিতও না এই রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষাকে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকিয়া বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছিলেন।

সে দেখিয়াছে বাঙালিরা বড়ো বেশি তাঁহার ভক্ত। যখন তখন তাঁহার গান গাহিয়া উঠে। হিন্দুর লেখা গান কেন গাহিতে হইবে? রাখিলই বা সে লম্বা দাঁড়ি। আদতে লোকটা যে হিন্দু ( রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন। তবে জানিয়া রাখা ভালো যে ব্রাহ্ম সমাজকে সনাতন ধর্মের শাখা বলা যাইতে পারে। উহা প্রবর্তন করিতে ধরণীতে কোনো অবতারের আগমন ঘটে নাই)। হিন্দু শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে একাংশ সনাতন ধর্মকে যুগের সাথে তাল মিলাইয়া আধুনিক ধর্মে পরিণত করিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহারা নিরাকার ব্রহ্মে বিশ্বাস করিতেন। সনাতন ধর্মেও নিরাকার ও সাকার দুইভাবেই ঈশ্বরের আরাধনা করা যায়।

তবে সাকার বলিতে ঠাকুরের ছবি বা প্রতিমা গড়িয়া পূজা করিবার কারণ হিসাবে হিন্দু পন্ডিতগণ ঈশ্বরকে একাগ্র মনে ডাকিবার সময়ে নয়ন সন্মুখে কোনো একজন উপাস্যকে রাখিয়া আরাধনা করিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিয়া থাকেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন আমি অনুমতি দিয়াছি বলিয়াই উঁহারা তোমাদের পূজা গ্রহণ করেন। তবে মূল কথা হইল " সর্বপ্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া কেবল আমাতেই শরণাগত হও।আমি তোমাকে সমস্ত পাপ হইতে মুক্ত করিব " (কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিয়াছিলেন)। ইহার অর্থ হইল সনাতনধর্মেও একেশ্বরবাদীতে বিশ্বাসী। বাকি যাঁহাদের পূজা করা হইয়া থাকে তাঁহারা কেহই ঈশ্বর নহেন। তাঁহাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে সৃষ্টি করা হইয়াছে। আবার তেত্রিশ কোটি দেবদবী বলিয়া যাহা বলা হয় তাহা হইল তেত্রিশ প্রকারের দেবদেবী। সংস্কৃতে কোটি শব্দের অর্থ হইল সংখ্যা।

এতখানি পড়িয়া আপনারা গালে হাত দিয়া দয়া করিয়া ভাবিতে বসিবেন না যে সনাতন ধর্মের প্রচার করার নিমিত্তে ইহা লেখা হইতেছে । মোটেই তাহা নহে। ঐ যে বলিয়াছিলাম বারো মাসে তেরো পার্বণ অথবা ধর্ম যার যার উৎসব সবার... এই কথার প্রেক্ষিতে ইহাই বুঝাইতে চাহিয়াছি এই বৎসর ঈদের আনন্দ কাটিতে না কাটিতে বাংলা নববর্ষ আসিয়া হাজির হইল। অনেক বছর যাবত বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা লইয়া একশ্রেণির মানুষ (!) পানি ঘোলা করিয়া চলিতেছে।

২০০১ সালে রমনা বটমূলে এর আগের শতক হইতে চলিয়া আসা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সময়ে বোমা হামলা হইয়াছিল। ইহাতে অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য আগতদের মধ্যে কয়েকজন নিহত হইয়াছিলেন। কেহ বা পঙ্গুত্ব বরণ করিয়াছিলেন। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদযাপন কেহ বন্ধ করিতে সক্ষম হন নাই। যতদিন বাঙালি জাতি বাঁচিয়া থাকিবে, ততদিন ইহা চলিতে থাকিবে৷ ধর্ম এবং জাতিসত্তা যে ভিন্ন জিনিস তাহা বুঝিতে হইবে। ধর্মীয় উৎসব পালন করিতে কেহ বাধা প্রদান করিতেছে না। তাহা হইলে আমাদের জাতির যে বৈশিষ্ট্য উহা পালন করিতে সমস্যা কেন থাকিবে?

সমস্যা অবশ্য গুটিকতক মানুষকে লইয়া। গুটিকতক বলিয়া বিষয়টিকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো উপায় নাই। ইহাদের মধ্যে পাকিস্তানিদের প্রেতাত্মা, মোনায়েম খান, সবুর খান এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিরোধীদের প্রেতাত্মারাও রহিয়াছে। দিনে দিনে ইহাদের সংখ্যা বাড়িতেছে কোনো না কোনো মুখোশের আড়ালে। সময় হইয়াছে সমাজের বুদ্ধিজীবী দিকপালদের কেবলমাত্র বক্তৃতা বিবৃতিতে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখিয়া বাঙালির কৃষ্টি সংস্কৃতির ওপর ষড়যন্ত্র রুখিয়া দিবার জন্য তরুণ প্রজন্মকে তৈরি করার মহান কাজে নিজেদের নিয়োজিত করিবার। যেমন করিয়া সুফিয়া কামাল, সনজিদা খাতুন, কলিম শরাফি, কামাল লোহানি, মোখলেসুর রহমান ( সিধু ভাই) ওয়াহিদুল হক প্রমুখরা ষাটের দশকে মোনায়েম খানদের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করিয়া ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ১৯৬৪ সালে তাঁহারা রমনার বটমূলে প্রথমবারের মতো বাংলা নববর্ষ উদযাপন করিয়াছিলেন। ইহা অদ্যাবধি চলিতেছে।

বাংলা নববর্ষ উদযাপন করাকে কেন যে একশ্রেণির মনুষ্য আকারের প্রজাতি হিন্দুয়ানি বলিয়া প্রচার করিয়া থাকে উহা এতদিনেও বুঝিতে পারি নাই। এইদিন হিন্দুদের বিশেষ কোনো পূজার আয়োজন নাই। বাংলা সাল গণনা সম্রাট আকবরের সময় হইতে শুরু হয়। ইহার পিছনে অনেক বৃত্তান্ত রহিয়াছে।

বারোমাসে তের পার্বণে ঈদকে যুক্ত করিয়া গণনায় আনিয়াছি। সনাতন ধর্ম হইতে দুইটা পার্বণ বাদ দিয়া ঈদকে যুক্ত করায় আশা করি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মনোকষ্টে ভুগিবেন না। হিসাব করিয়া দেখিতে পারেন হিন্দুরা কী আদৌ বারোমাসে তেরটি উৎসব পালন করিয়া থাকে? হিন্দুদের অনেক ধরনের পূজা অঞ্চল ভিত্তিকও হইয়া থাকে। তবে পার্বণ অর্থ হইল উৎসব, পূজা নহে৷ অতএব ঈদকে তের পার্বণের দুইটি ধরিলে প্রিয় মুসলমান ভাইয়েরা ' ধর্ম গেল ধর্ম গেল' বলিয়া পঞ্চম সুরে তান ধরিবেন না। আসলে আমরা যদি নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় অন্তরে রাখিতে পারিতাম এবং মুখে ও আচরণে মানুষ বলিয়া ভাবিতে পারিতাম তাহা হইলে অনেক সমস্যার সমাধান হইয়া যাইত। কিন্তু উহা আদৌ হইবে কী?

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও পরিব্রাজক। 

;

উৎসব-আবেগ, উন্নয়নের সুফল ও আমাদের মনোবৃত্তি



আশরাফুল ইসলাম পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রচলিত একটি কথা আছে, সুখের দিনে আমরা পেছনের স্মৃতিকে দ্রুতই ভুলে যাই। আবার আমরা যত পেতে থাকি আমাদের প্রত্যাশাও ততই বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দশকে আমূল বদলে যাওয়া প্রযুক্তিগত ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করলে উপরের কথার সারমর্ম বোঝা কঠিন হবে না।

উৎসবপ্রিয় বাঙালির আবেগের ঘনঘটা দেখা যায় প্রধান উৎসবের সময়গুলোতে। জনসংখ্যাধিক্যের বিচারে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাতেই যে রাজধানী বা অন্য শহর থেকে জনস্রোত দেশের গ্রাম অভিমুখে দেখা যায় তাই নয়; বছরের কোন সময়ে লম্বা ছুটি পেলেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বাঙালিআবেগ লক্ষ্য করার মতো। যা বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যাবে কিনা তা অনুসন্ধানের বিষয়।

প্রায় দুই দশকের মতো রাজধানী থেকে উৎসবের সময়ে গ্রামে যাওয়ার এই স্রোতে শামিল হয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হয়েছে। যেটি বেশ প্রমাণিত সত্য-তা হচ্ছে, এখানকার বাঙালি আবেগ চরিতার্থ করতে উৎসবপ্রিয় মানুষেরা যে কোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এর প্রমাণ মিলবে অন্তত কয়েক দশক ধরে ঈদের কয়েক দিন আগে বা পরের ঈদযাত্রা নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে। সংবাদপত্রের আলোকচিত্রীদের মধ্যে ঈদে ঘরমুখো মানুষদের ছবি তোলার একরকম প্রতিযোগিতা চলে। কে সবচেয়ে বেশি ঝুলন্ত মানুষদের ছবিটি তুলে আনতে পারল!

এবারও যে ট্রেনে বা অন্য যানবাহনে ঝুলে কিছু মানুষ বাড়ি ফেরেনি তা নয়, কিন্তু ঈদে ঘরে ফেরা মানুষদের চিরায়ত যে চিত্র গত কয়েক দশক লক্ষ্য করে এসেছি-তা বোধহয় আর খোঁজে পাওয়া যাবে না। আমরা লক্ষ্য করেছি, গেল এক-দেড় দশকে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা প্রতিটি জনপদকে রাজধানীর সঙ্গে সহজ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ দেশের অনেকগুলো মহাসড়কই বেশ কয়েক বছর আগেই চার লেনে রূপান্তরিত হয়েছে। আলোচিত যোগাযোগ অবকাঠামো পদ্মাসেতুও দৃশ্যমান বাস্তবতা, ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকেই পুরো দক্ষিণবঙ্গকে এই সেতু সহজ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে। এছাড়া অগণিত বৃহৎ যোগাযোগ অবকাঠামো মানুষের যাতায়াতকে করেছে অনায়াসসাধ্য।

এবারের ঈদযাত্রার অভিজ্ঞতা ছিল অতীতের সবগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর্মস্থল রাজধানীর বাংলামটর থেকে আমার গ্রাম গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার শিমুলতলার দুরত্ব (গুগল ম্যাপ অনুযায়ী) ৭৪.৫ কিলোমিটার। রাজধানী সংলগ্ন শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত এই জনপদে যেতেও ঈদ মৌসুমে সময়ভেদে ৫-৬ ঘন্টা পথেই আটকে থাকা যেন অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের যানবাহনের মিলনস্থল আবদুল্লাহপুর আর গাজীপুর চৌরাস্তা হওয়ায় রাজধানী থেকে বেরুনোর এই দুই প্রবেশপথে ২-৩ ঘন্টা একই স্থানে আটকে থাকতে হতো।

এবার পরিস্থিতি কিছু স্থানে পাল্টেছে। বিশেষ করে রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও গাজীপুরপ্রান্তে বিআরটি প্রকল্পের সুফল এবারের ঈদে ব্যাপকভাবে পেয়েছে মানুষ। যার জন্য রাজধানীর প্রবেশপথের যানজট অনেকটাই এড়ানো গেছে এবার। সড়ক দুর্ঘটনার হারও কমেছে। যদিও ঈদের দিন দুপুরে শ্রীপুর থেকে মাত্র ১ ঘন্টায় গন্তব্যে পৌছে, জানতে পারলাম সদরঘাটে রশি ছিড়ে লঞ্চের ধাক্কায় একই পরিবারের ৩জনসহ মোট ৫ জনের মৃত্যুর খবর। আনন্দের ঈদ যাত্রার মাঝে বিষাদের ছায়া নিয়ে এল এই খবর।

তবে উন্নয়নের সুফল ভোগের সঙ্গে আমাদের নাগরিকদের একথাও মনে রাখা উচিত যে, আমাদের অতীতটা কেমন ছিল। প্রত্যাশা আমাদের থাকতেই হবে, এটি মানবমনের এক অনুষঙ্গ। স্বপ্ন না থাকলে যেমন আমরা এগিয়ে চলি না, বলা হয়ে থাকে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশের বিশাল সব উন্নয়নযজ্ঞ বাস্তব রূপ নেওয়ার সঙ্গে আমাদের নাগরিকদের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন আসা উচিত। মনের সংকীর্ণতাকে সরানো না গেলে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন হবে না।

অন্ততঃ গেল কয়েকটি বছর প্রবীণ অনেক নাগরিকদের কণ্ঠেই শুনতে পাই, জীবদ্দশায় এমন উন্নয়ন দেখে যেতে পারা তাদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর! তবে নাগরিকদের কেউ কেউ আবার এই উন্নয়নের সুফল ভোগ করলেও তা স্বীকার করতে কার্পণ্য করেন, সমালোচনায় মুখর হন। এই প্রবণতাও কম মানুষ পোষণ করেন না।

যে উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করে, দেশের অর্থনৈতিক গতি-প্রবাহ বাড়ে তা নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য সাফল্য। সকল সরকারেরই সমালোচনার ঢের বিষয় থাকবে। এই সরকারেরও আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু উন্নয়ন সাফল্য স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হওয়া উচিত নয়। ভারতবর্ষের মুঘল শাসক শাহ জাহান তাঁর প্রিয়তমাপত্নী মুমতাজ মহলের স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিসৌধ তাজমহল নির্মাণে রাজকোষ প্রায় খালি করে ফেলেছিলেন বলে ইতিহাসে লেখা আছে। সেই বিশাল নান্দনিক স্থাপনা বিশ্বের পর্যটকদের আকৃষ্ট করলেও সেই সময়ের জনগণের তা কি কাজে লেগেছিল সেই প্রশ্নও রয়েছে। প্রশ্ন আছে জনহিতের চেয়ে হিন্দুস্থানের শাহেনশাহ ব্যক্তিগত আকাঙ্খাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

সেই বিচারে আমরা সাম্প্রতিক দশকে বাংলাদেশের বৃহৎ সব যোগাযোগ অবকাঠামো জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে-এনিয়ে কোন সংশয় নেই। উন্নয়নের নানা মানদণ্ডে আলোচনা-সমালোচনা সমকালীন শাসকদের নিয়ে করাই যাবে। বলতে গেলে কেউই তা এড়াতে পারেন না এই সমালোচনা কিন্তু উন্নয়নে জনগণের স্বস্তির ইতিবাচক দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের আমূল বদলে যাওয়া তখনি পুরোপুরি সম্ভব হবে, যখন বস্তুগত উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের মনেরও উন্নয়ন ঘটবে। মনের উন্নয়নের এই আকাঙ্খায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়েই আছি বলা যায়।

কবি অতুল প্রসাদের ভাষায় বলতে হয়, ‘আছে তোর যাহা ভালো/ফুলের মতো দে সবারে/নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে’।

 

;

বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস, বাস্তবতা ও অর্থনীতি মূল্যায়ন



ড. মোঃ আইনুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আমদানি বিধি-নিষেধ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে (সরকারি লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশ)। সংস্থাটির মতে, গত জানুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে এলেও দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক ঝুঁকি রয়ে গেছে। এ ছাড়ামুদ্রা ও বিনিময় হার সংস্কারে অগ্রগতি পর্যাপ্ত না হওয়ায় রিজার্ভ আরও কমতে পারে, মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়তে পারে এবং তারল্য সংকট ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশেশের আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, সম্ভাব্য আর্থিক দায় ও ঘাটতি নগদীকরণ। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে বর্তমানে চার ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি বেসরকারি কেনাকাটায়ও প্রভাব এবং জ্বালানি ও আমদানি উপকরণের ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের এসব মূল্যায়ন উঠে এসেছে ২ এপ্রিল প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট বা বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন। এ জন্য বড় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা, খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি কাঠামো, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর করপোরেট সুশাসন বাড়ানো ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য দ্রুত সংশোধন কর্মসূচির মতো বিধানগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সরকারের বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নে সহায়তার প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মন খারাপ করা মূল্যায়ন করা হলেও সংস্থাটি আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছে, সঠিক আর্থিক নীতি, বিনিময় হার ও আর্থিক কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ক্রমশ বাড়তে পারে বলে। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আছে, যা কোভিড-১৯ মহামারি থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি তার শক্তিমত্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান, মজুরিও অনেকটা একই জায়গায় আটকে আছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধি নিয়ে এই পূর্বাভাস এবং অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করাকে মূলধারার বাইরের অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক অনেকটা শাপের দংশন ও ওঝার ঝাড়ফুকের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের মতে, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও নীতি পরিকল্পনা অনুসরণ করেই বাংলাদেশ অর্থনীতির অনেক কিছু প্রণীত হয়েছে, নির্ধারিত হয়েছে। বাংলাদেশ তাতে যত না বেশি উপকৃত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। বিশ্লেষকদের এই অভিমত নিয়ে আলোচনার আগে আইএমফ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা প্রয়োজন। গত বছরের ৯ অক্টোবর এক পূর্বাভাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনে,যা এর আগে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল।

তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের হালনাগাদ তথ্যে সংস্থাটির অক্টোবরে করা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলেনি। ২০২৫ সালের জন্যেও সংস্থাটি একই পূর্বাভাস দেয়। অন্যদিকে ১৭ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত মুদ্রানীতিতে অর্থনীতিতে চলমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য জিডিপি পূর্বাভাস ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমানোর ঘোষণা দেয়।

মূলধারার বাইরের অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিশ্বব্যাংক তার সর্বশেষ হালানাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে যেসব মূল্যায়ন করেছে, তার অনেক কিছুর সাথে সহমত পোষণ করার সুযোগ রয়েছে। খেলাপি ঋণ, ব্যাংক ব্যবস্থা, মুদ্রানীতি নিয়েও ভালো ভালো কথাবলা হয়েছে। এসবের অনেক কিছু সত্যি। কিন্তু এসব বাংলাদেশের অনেক পুরোনো সমস্যা। অনেক আগেই সরকারকে স্বপ্রণোদিত হয়ে এসব সমস্যা দূর করা উচিত ছিল।কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রকৃত অর্থেই নানামাত্রিক সংকটে রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক যেভাবে ‘হায় হায়’ অবস্থা তুলে ধরছে, অর্থনীতি সম্ভবত একেবারে তেমন অবস্থায় নেই। অযাচিত হস্তক্ষেপ না করলে বাংলাদেশ এই সমস্যা থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসবে।

কারণ, এসব সংকটের পেছনে সরকারের কিছু ভুল নীতি ও বাংলাদেশের সংখ্যাস্বল্প প্রচণ্ড পূজিলোভী মানুষের কার্যকলাপের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক-আইএমফের দীর্ঘদিনের নীতি-পরিকল্পনারও অনেক দায় আছে। যেমন মূল্যস্ফীতি বিষয়ে সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং এতে দরিদ্র মানুষ খুব চাপে থাকবে ইত্যাদি। প্রয়োজনের জায়গায় ক্রমাগত ভতুর্কি তুলে দেওয়ার চাপ দিয়ে, অপ্রয়োজনীয় ভতুর্কির বিষয়ে চুপ থাকলে এবং প্রয়োজনের জায়গায় সংস্কার করতে না বলে সরকারকে বেকাদায় ফেললে মূল্যস্ফীতি তো অবশ্যই বাড়বে। বিশ্বব্যাংক বলছে, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক করতে হবে, বারবার ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদরা একদশক আগে থেকেই উচ্চকণ্ঠে বলে আসছেন। এখন চারিদিক থেকে শোরগোল জোরদার হওয়ায় বিশ্বব্যাংকও এতে শামিল হয়েছে।

আসলে আইএমএফের কাছ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি এবং আরও কিছু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেওয়ার পর থেকে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীরা (বিশ্বব্যাংক-আইএমফের ভাষায় তারা দাতা সংস্থা) যেভাবে বাংলাদেশকে চেপে ধরেছে, দেদারছে সংস্কারের চাপ দিচ্ছে; তাতে প্রয়োজনীয় অনেক কাজই বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে সংকট আরও ঘণীভূত হতে পারে। বিশ্বব্যাংক এখন বাংলাদেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি আরও কঠোর করার পরামর্শ দিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিত্যপণ্যের শুল্ক আরও কমানোরও কথা বলছে। মুদ্রানীতিতে দুর্বলতা রয়েছে, এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এসব মুদ্রানীতির দুর্বলতা তো অতীতের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে অযাচিতভাবে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমফ ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত চাপের মাধ্যমেই প্রণীত হয়েছে। আমদানিতে কম শুল্কের পাশাপাশি ছাড় দিয়েও তো মুনাফাকামী ব্যবসায়ীদের বাগে আনা যাচ্ছে না। এদের বাগে আনার কৌশল নিয়ে বিশ্বব্যাংক কোনো কথা বলছে না।

এদিকে গত বছর আইএমএফ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে এক বৈঠকে জানতে চেয়েছিল, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বারবার নির্ধারণ করতে পারবে কি না। জবাবে বিইআরসি বলেছিল, আইন সংশোধন করা হয়েছে। ফলে কেউ আবেদন করলে তা করার সুযোগ আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) নিয়েও সংস্থাটি কথা বলেছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়,গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বারবার নির্ধারণের বিষয়টি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ অতীত ইতিহাস বলে, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক কোনো বিষয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য বা শক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বা চাপ সৃষ্টি এসব সংস্থা সন্তর্পণে এড়িয়ে চলে। এর মূল কারণ, উদার বাজারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষকতাকারী আন্তর্জাতিক এসব উন্নয়ন সংস্থার মতাদর্শ ও কর্মকা-ের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীই তো সমাজের গুটিকয় মানুষের স্বজনতোষী এসব শ্রেণি-ই, যাদের কারণে সরকারের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যে রয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চাপে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশে হু হু করে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। কিছুদিন আগেও বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয়ের নামে বাড়ানো হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। আসলে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ অনুরূপ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরামর্শকদের কথা শুনে নিও-লিবারেল প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করলে পরিণতি এমনটাই হয়। এমনটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতীতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন সংবিধানে বিধৃত নির্দেশনা অনুযায়ী বৈষম্য হ্রাসকারী দেশজ উন্নয়নদর্শন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। কিন্তু বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এই নীতির ঘোর বিরোধী। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ^ব্যাংক-আইএমএফের চাপ ও ব্যবসায়নির্ভর শাসন ব্যবস্থা পরোক্ষ কর বা ভ্যাট বেশি করাকেই পছন্দ করে। কারণ ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাইকেই একই দ্রব্যের ওপর একই হারে অন্যায় ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট এই কর দিতে হয়। এতে করের ভিত্তি প্রশস্ত হয়। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চলে; আরো ঋণ দেওয়া যায়, ফেরতও পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত এতে যে দেশ ও সমাজে বৈষম্য বাড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধনী ছাড়া সবাই; তাতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কোনো কিছু আসে-যায় না। আর এ জন্যেই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ অর্থনীতির নানা দিক তুলে ধরলেও কখনো বৈষম্য নিয়ে বিন্দুমাত্র শব্দ করে না।

এরা কখনো সরকারকে প্রশ্ন করে না যে বাংলাদেশে ধনী-অতিধনীরা কত আয় করে, আর কত আয়কর দেয়। কোনো দিন প্রশ্ন করে না যে বাংলাদেশে বছরে কত ঘুষ লেনদেন হয়, দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের বছরে কী পরিমাণ কর-শুল্ক দেওয়ার কথা আর কী পরিমাণ আদায়ই বা হয়। কোনো দিন সরকারকে এরা জিজ্ঞেস করে না, বাংলাদেশে বছরে কী পরিমাণ সম্পদ কর আহরিত হওয়ার কথা, আর কী পরিমাণ হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ৫২ বছরে কোনো দিন বিশ্বব্যাংক জিজ্ঞেস করেনি যে, বাংলাদেশে কালোটাকার পরিমাণ কত আর অর্থ পাচার হয় কত। কোনো দিন এরা বলবে না যে, ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রভুদের প্রায় ২০০ বছর শোষণ, পাকিস্তান উপনিবেশ প্রভুদের ২৪ বছর শোষণ এবং বিশ^বাজারে মুক্তবাজার বিশ^ায়নের অন্যায্যতার ফলে বিগত ৫০ বছরে আমরা যেভাবে ঠকেছি, তার প্রতিকার কী কিংবা কীভাবে বৈশ্বিক প্লাটফর্মে এসব বিষয় তুলে ধরে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ-ভূমিকা ও পূর্বাভাস সবকিছুই যে মন্দ, তা নয়। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের স্বদেশজাত উন্নয়ন দর্শন বাস্তবায়ন করতে না পারায় বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ঋণে আসলে তাদের তেমন কোনো উন্নতি হয় না, উপকার হয় না। তারা ঋণের দুষ্টচক্রেই আটকে থাকে। ফলে খবরদারী করা সহজ হয়। আর এর জন্য বিশ্বব্যাংকের নানা দ্বিচারী ভূমিকা ও কার্যকলাপই দায়ী। অথচ ৮০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক সৃষ্টির মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ দূর করা। কিন্তু বিশ্বে দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ আদৌ কমেছে? ফিলিস্তিনে মানব ইতিহাসে প্রথবারের মতো মনুষ্যসৃষ্ট মতো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। কিন্তু সংস্থাটি এ নিয়ে এখন পর্যন্ত একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি। শুধু বলেছে ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ ঋণ লাগবে। বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে সব দেশকে দেওয়া ঋণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলেও ইসরায়েল-সম্পর্কিত কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না।

এমনকি গত বছর ৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্টের পরামর্শে বিশ্বব্যাংক উগান্ডাকে সমকামিতাবিরোধী আইন পাস করায় প্রতিশ্রুত ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এ রকম নানা দ্বিচারী কার্যকলাপের ইতিহাস বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের আছে। অথচ বাংলাদেশেরও বিশ্বব্যাংকে মালিকানা রয়েছে, প্রতিবছর চাঁদা দিয়ে সংস্থাটির তহবিল বৃদ্ধি করে থাকে এবং সংস্থাটির কাছ ঋণ নিলেও আসলসহ বিপুল পরিমাণ সুদসহ পরিশোধ করে। আর সংকটের সময় ঋণ চাইলেই নানা তোড়জোড় শুরু করে, সংস্কার কর্মসূচি চাপিয়ে দেয়। এখানে উল্লেখ্য, মূলত মার্শাল পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর ইউরোপকে পুনর্বাসনের জন্য যে তহবিল জোগান দেওয়া হয় তার ধরন থেকেই পরে বিদেশি দাতা নামে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে এই বিদেশি সাহায্যকেই একটা লাভজনক বিনিয়োগ ও তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতিতে অতি প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবহার করতে থাকে। এখন বাংলাদেশও এর ভুক্তভোগী।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের মাত্র ৩৩ শতাংশ বা ১৮ দশমিক ১২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে। এই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশের অতিধনী কয়েকজন মানুষের নানা উপায়ে উপার্জিত অর্থের কিয়দংশের সমান। কিন্তু বাংলাদেশের বাজেট ঘোষণার আগে সাম্প্রতিক এই প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস সরকারের নীতিপরিকল্পনা প্রণয়নকে নিশ্চিতভাবে প্রভাবিত করবে। প্রবৃদ্ধির বাড়তি রূপ কিংবা নিচে নামার ধরণ বিষয়ে পূর্বাভাস-আভাস দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উপকার হবে না। উপকার হবে, সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে দিলে।

বাংলাদেশ সরকারকে মনে রাখতে হবে, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের পরামর্শ মেনে প্রবৃদ্ধির পেছনে ছুটে চলা আসলে কখনোই মানুষের উন্নতি নিশ্চিত করতে পারবে না। কারণ এই প্রবৃদ্ধি যদি সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর না করে, মানুষের সুস্থ-দীর্ঘায়ু নিশ্চিত না করে, যদি মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি না ঘটায় এবং যদি প্রবৃদ্ধি বলতে মনমতো বেসরকারীকরণ বোঝায়, নির্বিচার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বোঝায়, বেশি বেশি বিদেশি ঋণ বোঝায়, কৃষকের অন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি বোঝায়, বেকারত্ব বৃদ্ধি বোঝায়; তাহলে ওই প্রবৃদ্ধি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কোনো দিন দূর হবে না, বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রও হতে পারবে না।

ড. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশে অর্থনীতি সমিতি।

;