রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: আমেরিকার আগ্রাসী পরিকল্পনার অনিবার্য পরিণতি



নাজমুল হাসান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অন্যান্য সকল যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এমনকি ব্যক্তি পর্যায়ের সমস্ত মারামারি, রেষারেষি ও বিবাদের মীমাংসা শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমেই হয়। যদিও ততদিনে ঝরে যায় অসংখ্য তাজা প্রাণ, ক্ষতিসাধন হয় ব্যাপক সম্পদের, মানবতা হয় বিপর্যস্ত। আলোচনার মাধ্যমে যে বিবাদের সমাধান সম্ভব নয়, যুদ্ধ করেও সে বিবাদের সমাধান অসম্ভব।

ইউক্রেনকে বলির পাঁঠা বানিয়ে আমেরিকা, ন্যাটো ও পশ্চিমা বিশ্ব তাদের বৈশ্বিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ করছে। যদিও এখন আর এটিকে ছায়াযুদ্ধ বললে পুরোপুরি ঠিক হবে না, কারণ এই পুঁজিবাদী দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে অনেকটা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। যদিও যুদ্ধটি চলছে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে কিন্তু এই যুদ্ধে জিতলে জিতবে ন্যাটো ও পশ্চিমা বিশ্ব, হারবে রাশিয়া; অথবা জিতবে রাশিয়া, হারবে ন্যাটো ও পশ্চিমা বিশ্ব। এখানে ইউক্রেনের জয়-পরাজয় বলে কিছু নাই, তাদের কপালে আছে শুধুই ধ্বংস, শুধুই পরাজয়।

রাশিয়া যদি হেরে যায় তবে ইউক্রেন বড় জোর তার হারানো চারটি প্রদেশের ভূখণ্ডগত মালিকানা ও অখণ্ডতা ফিরে পাবে কিন্তু যে ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন দেশটি হয়েছে সেখান থেকে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। রাশিয়া হেরে গেলে আমেরিকা, ন্যাটো ও পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনকে যে গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করবে সেটা হবে তাদের এই যুদ্ধে পরাজয়ের থেকেও বড় পরাজয়।

ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলো অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা বাদে প্রায় সবকিছুর জন্য রাশিয়া ও এশিয়ার দেশগুলোর উপরে নির্ভরশীল। অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা বাদে ইউরোপ মহাদেশের এ দেশগুলো আমেরিকার কাছ থেকে অন্য কোনো সহায়তা পায় না। তারপরেও কেন ইউরোপের এই দেশগুলো প্রতিবেশী রাশিয়া ও এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না রেখে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখে এবং তাদের কথায় ওঠে বসে সেটা জানা দরকার। এর কারণ হলো, ইউরোপের এই দেশগুলো স্বাধীনভাবে মতামত রাখার মতো স্বাধীন দেশ নয়, এরা পরাধীন, আমেরিকার কাছে বন্দি।

পর্যাপ্ত তথ্য না জানা থাকার কারণে ইউরোপের এ স্বাধীন ও উন্নত দেশগুলো সম্পর্কে আমার এ মন্তব্য হঠাৎ বেমানান মনে হতে পারে, অর্থাৎ তারা যে আমেরিকার কাছে পরাধীন ও বন্দি সে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। ফলে আমার মন্তব্যের কারণ আমি ব্যাখ্যা করছি যাতে এ বিষয়ে বাস্তব সত্য উপলব্ধি করা যায়। 

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত আমেরিকা বিশ্বব্যাপী তার ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য অক্ষশক্তির তিনটি দেশ জার্মানিতে ১৭২টি, ইতালিতে ১১৩টি এবং জাপানে ৮৪টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে তাদের নিজের অধীন করে দাবিয়ে রেখেছে। এ দেশগুলোর পক্ষে আমেরিকার মতামতের বাইরে কোনো প্রকার স্বাধীন মতামত দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

৬৭ বছর আগে কোরিয় উপদ্বীপের যুদ্ধ শেষ হলেও আজ‌ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আমেরিকার ৮৩টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, বুলগেরিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, সৌদি আরব, কাতার ও কেনিয়াসহ বিশ্বের ৮০টি দেশে আমেরিকার ৮০০ জ্ঞাত সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে তাদের অনেক অজ্ঞাত সামরিক ঘাঁটি, যার খবর কেউ জানে না। বিশ্বের পাঁচটি দেশে রয়েছে আমেরিকার তৈরি পারমাণবিক অস্ত্রের সামরিক ঘাঁটি।

আমেরিকার স্বার্থে আঘাত লাগলে সে যেকোনো দেশকে ধ্বংস করে দিতে সে একবার‌ও ভাববে না। আমেরিকা কখনো কারো বন্ধু নয়, সবসময়েই ধান্দাবাজ ও স্বার্থবাজ। আমেরিকার বন্ধু হওয়ার চেয়ে তার শত্রু হওয়া অনেক উৎকৃষ্ট। আমেরিকার বন্ধু হ‌ওয়া মানে সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে অবিবাহিত থাকা।

১৯৬০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে হত্যা ও কিউবার ক্ষমতা দখল করার জন্য সেখানে 'বে অব বিগস' নামে একটা সশস্ত্র দল পাঠায়, যদিও তারা সফল হতে পারেনি। ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে হত্যা ও কিউবার পতন ঘটাতে আমেরিকা অনেকবার চেষ্টা করেছে। আমেরিকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিউবা তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে তাদের দেশে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুরোধ জানায়। ১৯৬২ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রশ্চেভ কিউবার অনুরোধে সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ার ঘোষণা দেন। রাশিয়ার এ সিদ্ধান্ত শুনে মার্কিন শাসক কেনেডি বলেছিলেন সেটা করা হলে, তিনি কিউবাতে মিসাইল হামলা করে গুড়িয়ে দেবেন। যুদ্ধ এড়ানোর জন্য রাশিয়া তখন কিউবায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে। একটা শক্তিশালী দেশ কখনোই চাইবে না তার পাশের দেশ এমন কোনো শক্তিশালী দেশের ইন্ধন পাক যা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

এটা কে না জানে যে, ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গঠনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব তথা সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করা। এর বিপরীতে ন্যাটো গঠনের ৬ বছর পরে ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পোল্যান্ডের রাজধানীতে ওয়ারস জোট গঠন করে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ওয়ারস জোট বিলুপ্ত হয়ে যায়। ন্যাটো জোট যদি ভালোই হতো তবে এরপরে তারা ন্যাটোকেও বিলুপ্ত করে দিতো। তারা তা করেনি বরং শুরুর সদস্য সংখ্যা ১২টি দেশ থেকে তা তারা ৩০টি দেশে উন্নীত করেছে। যে পোল্যান্ডে বসে ওয়ারস জোট তৈরি হয়েছিল সেই পোল্যান্ডকেও তারা ন্যাটোর সদস্য করেছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যে ১৫টি দেশ হয়েছিল তাদেরকে নিয়ে রাশিয়ার নেতৃত্বে সিআইএস বা কনফেডারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট এস্টেট গঠন করা হয়েছিল। সিআইএস এর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এর কোনো সদস্য ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না। ন্যাটো এই সিআইএসভুক্ত ৩টি দেশ লিথুনিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়াকে তাদের সদস্য করে রাশিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখায় এবং রাশিয়াকে ধ্বংসের জন্য রাশিয়ার সাথে যেসব দেশের সীমান্ত আছে সেসব দেশকে ন্যাটোর সদস্য বানাতে পিছে লেগে তাকে। এটা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ১৯৯১ সালে রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পর দুর্বল ছিলো বলে কিছু করতে পারেনি। কিন্তু তখনকার রাশিয়া আর এখনকার রাশিয়া এক নয়। এখন কেনো সে তা সহ্য করবে?

তেল লুট করার জন্য ২০০৩ সালে আমেরিকা মিথ্যা অভিযোগ তুলে ইরাকের উপরে আক্রমণ করে দেশটাকে তামা তামা করে ফেলে। এক সময়ে বাদশাহ হারুনুর রশীদ ও তার স্ত্রী যোবেদা খাতুনের বিপুল সম্পদ ও ঐশ্বর্য দিয়ে সাজানো বাগদাদকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শ্মশানে পরিণত করে। আমেরিকার সাথে সেই যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া, পোল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল ও ডেনমার্ক যোগ দেয় এবং সরাসরি সৈন্য পাঠায়। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ২০০৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬০টি দেশে ৩০ মিলিয়ন মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভ করে। ইরাক যুদ্ধে নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। একেক সূত্র একেক রকম তথ্য-উপাত্ত দেয়। বৈজ্ঞানিক উপাত্ত সংগ্রহ পদ্ধতিতে জানা যায়, প্রথম তিন বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ছিলো ৬ লক্ষ ৫৫ হাজার যা পরে হয় ১০ লক্ষ। ইরাক সরকারের কম্প্রিহেনসিভ তথ্যানুসারে এই যুদ্ধে ২০ লাখ ইরাকি বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে আছে।

পানামা খালের দখল নেওয়ার জন্য আমেরিকা পানামা আক্রমণ করে এবং সে দেশের শাসক ডেনিয়েল নরিয়েগাকে ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি পানামা থেকে বন্দি করে আমেরিকায় নিয়ে আসে এবং নিজেদের দেশেই তার বিচার করে। সারা বিশ্ব তখন নিশ্চুপ ছিলো। কোনো মানবতার প্রশ্ন তখন কেউ করেনি। এখন রাশিয়া জেলেনস্কিকে সেভাবে ধরে নিজের দেশে নিয়ে বিচার করলে নিশ্চয়ই বিশ্ব মানবতায় আঘাত লাগবে।

১৮৪৬-১৮৪৮ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস কে পোলক মেক্সিকো আক্রমণ করে এবং টেক্সাস দখল করে সেটাকে আমেরিকার ভূখণ্ড করে নেয়। এ সময়ে মেক্সিকোর ভূখণ্ডের ৩ ভাগের ১ ভাগ আমেরিকার দখলে চলে যায়। তখন‌ও বিশ্ব চুপ করে ছিলো, কেউ কিছু বলেনি। কারণ, কাজটা করেছে আমেরিকা। আমেরিকা করলে তাতে কিছু হয় না।

নিজেকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করানোর জন্য আমেরিকা ১৮৯৮ সালে স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবং ১৬,০০০ স্প্যানিশ সৈন্যকে হত্যা করে। তখন কে কী বলেছে আমেরিকার বিরুদ্ধে?

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে জাপানিদের বোমা বর্ষণের পরদিনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রজোটে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানি ও ইতালি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার তিন দিন পরই যুক্তরাষ্ট্রও দেশ দু’টির বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান কোনো কারণ ছাড়া জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার নির্দেশ দেয়। ধ্বংস করা হয় জাপানের মানব সভ্যতা। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পিছনে সঙ্গত কারণ আছে। ইউক্রেন রাশিয়াকে ধ্বংস করার জন্য আমেরিকার সহায়তায় গোপনে মারিওপোলে জীবাণু অস্ত্রের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেছে। বার বার নিষেধ সত্ত্বেও সে ন্যাটোতে যোগদানের ব্যাপারে পিছপা হয়নি। রাশিয়ার মতো সুপার পাওয়ার তার নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দেবে।

১৯৫০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমান উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ থেকে উৎখাত করতে কোরিয়ার সাথে যুদ্ধ করে এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

১৯৫৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ বছর ধরে চলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ। এটি ছিল উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যেকার লড়াই। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট মিত্রদেশ উত্তর ভিয়েতনামকে সমর্থন করেছিল; অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট-বিরোধী মিত্রদেশ দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন করেছিল। আমেরিকা ভিয়েতনামের মাটিকে তামা করে রেখে গেছে।

২০০১ সালে শুরু হয় আফগান যুদ্ধ যা মূলত এখনো চলছে। ২০০১ সালে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল-কায়েদা আমেরিকায় হামলা চালিয়েছে এমন অভিযোগে আফগান সরকারের কাছে লাদেনকে হস্তান্তর করার আহ্বান জানায় আমেরিকা। তালেবানরা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এ সংঘাতে ৩২ হাজারেরও বেশি বেসামরিক লোক মারা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে।

লিবিয়া পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। তাদের প্রতি ব্যারেলে উৎপাদন খরচও সবচেয়ে কম। আমেরিকা এই তেলের জন্য ২০১১ সালে লিবিয়ার উপরে আক্রমণ করে তাকে পরাজিত করে সেই থেকে তার তেল সম্পদ লুটে খাচ্ছে। সিরিয়ার তেল লুট করার জন্য আমেরিকা সেখানে আইএস তৈরি করেছে এবং হাফিজ আল আসাদ সরকারকে পতনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটাকে ধ্বংস করে ফেলছে। রাশিয়া সিরিয়ার সরকারকে সহযোগিতা করছে বলে এখনও সিরিয়া টিকে আছে ন‌ইলে এতো দিনে আমেরিকার পেটে চলে যেতো।

পৃথিবীতে ইজরাইল নামে কোনো দেশ ছিলো না। ওখানের দেশটি ছিলো প্যালেস্টাইন। ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য আমেরিকা প্যালেস্টাইনিদেরকে তাদের নিজ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করে এবং তাদের ভূখণ্ড দখল করে সেখানে ইহুদিদেরকে এনে জড়ো করে, দখলকৃত ভূখণ্ডের নাম দেয় ইজরাইল। আজ ইজরাইল একটি দেশ কিন্তু প্যালেস্টাইন কোনো দেশ না। কী অদ্ভুত। আমেরিকার সমর্থনে ইজরাইল ইচ্ছেমতো প্যালেস্টাইনিদেরকে হত্যা করছে। নিজের দেশেই তারা পরবাসী। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো মুসলিম দেশও প্যালেস্টাইনিদেরকে সরাসরি কোনো সহায়তা দিতে পারেনি। এই প্রথম রাশিয়া সরাসরি প্যালেস্টাইনিদেরকে সাহায্য করার ঘোষণা দিয়েছে।

আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। কেন? সে শক্তিশালী হতে চায়, ইজরাইলের বিরোধিতা করে, আমেরিকার কথা শোনে না এবং আমেরিকাকে ইচ্ছে মতো তাকে তেল দেয় না বলে?

ইরানকে বাগে আনার জন্য মধ্য-এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো মিলে মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা অন্তত ২৫টি। গ্লোবাল রিসার্চে প্রকাশিত তথ্যমতে বিশ্বের ১৫৬টি দেশে আমেরিকা ৩,৫০,০০০ সেনা মোতায়েন করে রেখেছে। এসব সেনা প্রয়োজন হলে যে-কোনো জায়গায়, যে-কোনো সময় সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এজন্য বিশ্বে খুব কম দেশ আছে যারা মার্কিন সরকারের আজ্ঞাবহ হতে বাধ্য নয়, আমেরিকার কাছ থেকে তারা নিরাপদ এবং স্বাধীন।

রাশিয়ার নর্ডস্ট্রিম-২ পাইপ লাইনের মাধ্যমে মূলত জার্মানিতে গ্যাস যাওয়ার কথা এবং সেখান থেকে ইউরোপের অন্যান্য দেশে তা সরবরাহ হবে। এই পাইপ লাইনে আমেরিকা সাবমেরিন দিয়ে গোপনে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তাকে ধ্বংস করে জার্মান-সহ ইউরোপকে চরম বিপদে ফেলতে চেয়েছে তবু জার্মান বা ইউরোপের দেশগুলো আমেরিকার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারছে না। আমেরিকা বলছে এটা রাশিয়া করেছে এবং ইউরোপের দেশগুলো তাতে সমর্থন দিচ্ছে। যে পাইপ লাইনের ৫৫% শেয়ার রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্যাজপর্মের সেটাতে যে রাশিয়া হামলা চালাবে না, একথা পাগলেও বোঝে। রাশিয়া ইচ্ছে করলে গ্যাস বন্ধ রাখবে, নিজের পাইপ লাইনে সে কেন হামলা করে নষ্ট করতে যাবে? সব বুঝেও ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের মহা-বিপদ এড়ানোর জন্য আমেরিকার কথায় সায় দিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

ইউক্রেনে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি ছিল না। রাশিয়াকে বাগে আনার জন্য সেখানে তার সামরিক ঘাঁটি করার প্রয়োজন ছিল আর সে কারণেই আমেরিকা কৌশলে ইউক্রেনকে ফুঁসলিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ বাঁধিয়েছে। ইউক্রেনের কৌতুক অভিনেতা প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সেটা বোঝার ক্ষমতা ও বিচক্ষণতা কোনোটাই নাই।‌ এদিকে আমেরিকার ভয়ে স্বাধীন মতামত প্রদানে ব্যর্থ ইউরোপের দেশগুলো অনন্যোপায় হয়ে নিজেদের ক্ষতি বুঝেশুনেই আমেরিকার পক্ষে দালালি করতে বাধ্য হচ্ছে। ইউরোপের দেশে দেশে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং রাশিয়ার পক্ষে মিছিল, আন্দোলন হওয়ার পরেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর কিছু করার থাকছে না।‌ সব বুঝেও তাদের মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হচ্ছে নতুবা আমেরিকার শেখানো বুলি আওড়াতে হচ্ছে। আসন্ন শীতে নিজেদের জনগণের স্বার্থে তেল-গ্যাসের সমস্যা সমাধানের জন্য রাশিয়ার সাথে স্বাধীনভাবে আলাপ পর্যন্ত করতে পারছে না।

বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র রাশিয়া স্বাধীনভাবে চলে এবং আমেরিকার কথায় কর্ণপাত করে না। এটা আমেরিকার পছন্দ নয়, সে চায় পৃথিবীর সমস্ত দেশ তার কথায় চলবে এবং তার কাছে মাথা নত করবে। আর এ কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার এমন ক্ষোভ। এজন্য রাশিয়াকে শায়েস্তা করার জন্য রাশিয়া-সহ রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে থাকা রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক পদক্ষেপ এবং নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ। আমেরিকার পদলেহি জাতিসংঘ নামক একপেশে সংস্থার দ্বারা এসব দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে নানা অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা ও বহুবিধ নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ। অথচ হাজারো অপকর্ম করার পরেও জাতিসংঘ কর্তৃক আমেরিকার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।

আমেরিকা যেমন অন্যদেশকে বাগে রাখার জন্য কলোনিয়াল বা উপনিবেশ কৌশল প্রয়োগ করে, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে, অস্ত্র-সৈন্য রেখে তাদেরকে নিজের পক্ষে রাখতে বাধ্য করে, তাদের সম্পদ লুট করে- রাশিয়া তা করে না। রাশিয়া শুধু নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চলতে চায়। অন্যদেশকে বাগে রেখে তাদের সম্পদ আহরণ করা রাশিয়ার নীতিগত উদ্দেশ্য নয়। বরং শক্তিশালী কোনো দেশ যাতে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্য কোনো দেশের উপর প্রভুত্ব করে তাদের ধন-সম্পদ লুট করতে না পারে রাশিয়া সে কাজ করে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব হলো লুটেরা। রাশিয়া এদের লুটপাটে বাধা দেয়, সে জন্য এরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে এককাট্টা। 

এই চলমান যুদ্ধে রাশিয়া যদি হেরে যায় তাহলে সারা বিশ্বকে আমেরিকার পদানত হয়ে থাকতে হবে। ফলে আমেরিকা তার স্বার্থে ইচ্ছেমতো পৃথিবীর যে-কোনো দেশের উপর যতো অন্যায়, নির্যাতনই করুক না কেন তার বিরুদ্ধে কথা বলার মতো পৃথিবীতে আর কোনো দেশ থাকবে না। পৃথিবীতে শক্তির ভারসাম্য বলতে কিছুই থাকবে না। সারাবিশ্ব শাসন করবে এক মোড়ল, আমেরিকা। সে যা বলবে তাই করতে হবে, কোনো দেশের কোনো স্বাধীনতা থাকবে না। তখন সব রাষ্ট্রের অবস্থা হবে এখনকার প্যালেস্টাইনের মতো।

বিশ্বের এই শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই যুদ্ধটা একটা সুযোগ। স্বাধীন মতামত রাখতে চায় এমন দেশগুলো যদি এখন রাশিয়ার পক্ষে চলে আসে তাহলে বিশ্ব শক্তির এই ভারসাম্য রক্ষা হবে। ওপেকভুক্ত দেশগুলো ইতোমধ্যে তেল উৎপাদন সংক্রান্ত যে মতামত দিয়েছে তা রাশিয়ার পক্ষে গেছে। এটা একটা শুভ লক্ষণ। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্রের থেকেও বেশি। তেল না পেলে আমেরিকা সোজা হতে বাধ্য। এতে প্যালেস্টাইন সমস্যার‌ও সমাধান হবে।

ইউক্রেন দেশটি ইরাকের মতো শেষ হয়ে গেছে, এর কিছু নাই, সব ধ্বংসস্তূপ। এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের নামে যুদ্ধ করছে ন্যাটো। যদিও পশ্চিমা মিডিয়া ইউক্রেনের দ্বারা রাশিয়ার অধিকৃত দুচারটে গ্রাম, কয়েকশো বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করেছে মর্মে ইউক্রেনের পক্ষে বিজয় প্রচার করছে কিন্তু এটা সঠিক চিত্র নয়। প্রায় সমগ্র ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে রীতিমতো মানবিক বিপর্যয় চলছে। অথচ আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব সেসব চেপে রেখে ইউক্রেনের ক্ষমতা দেখানোর জন্য ইউক্রেনের ভিতরে থাকা ন্যাটোর সামরিক বাহিনীর দ্বারা রাশিয়ার ভিতরে হুটহাট করে আক্রমণ চালাচ্ছে। এসব আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেন রাশিয়ার দ্বারা মহা-ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হচ্ছে। ইউক্রেনকে এভাবে ধ্বংস করাই আমেরিকার উদ্দেশ্য। রাশিয়া ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে চায় না, চায় আমেরিকা। রাশিয়া ইউক্রেনকে ধ্বংস করতে চায় না বলেই সে এই অভিযানকে বলছে বিশেষ সামরিক অভিযান। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষ থেকে এটাকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে না।‌ ইউক্রেন প্রথম থেকে রাশিয়ার কথা শুনলে রাশিয়া ফিরে যেতো, এ যুদ্ধ হতো না। এখন আমেরিকা সেটাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করাকে অসম্ভব করে তুলেছে।

এখন ইউক্রেন স্বাধীন মতামত দেওয়ার অবস্থায় নাই, সে আমেরিকার কথায় চলছে। ইচ্ছে করলেও এখন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের কথা বলতে পারবে না। যদি ইউক্রেন সন্ত্রাসী হামলা না করে তবে রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযান চালাবে না বলে ঘোষণা দিয়ে পুতিন যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে কিন্তু আমেরিকা তা চাইছে না। এজন্য ন্যাটো বাহিনী দিয়ে ইউক্রেনের ভিতর থেকে সরাসরি রাশিয়ার ভূখণ্ডে আক্রমণ চালিয়ে যুদ্ধ জিইয়ে রাখছে।

এখন বিশ্বের অনেক দেশ যদি রাশিয়ার পক্ষে আসে যাতে আমেরিকার স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় শুধুমাত্র তখন‌ই আমেরিকা ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে বসে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলবে, নতুবা নয়। এখন আমেরিকাকে বাগে এনে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে আলোচনায় বসানোই যুদ্ধ বন্ধের শেষ ভরসা। যুদ্ধ বন্ধের নিয়ামক রাশিয়ার হাতে নয়, আমেরিকার হাতে। রাশিয়া তার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এ যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। আমেরিকা ইউক্রেনকে দিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন করেছিল এবং সেটা রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে বার বার বলার পরেও ইউক্রেন তাতে কর্ণপাত না করায় রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এই বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করতে‌ বাধ্য হয়েছে।

রাশিয়া শুধু ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ করছে না সে যুদ্ধ করছে সমগ্র দখলদার ন্যাটো ও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে, ৪০টি দেশের বিরুদ্ধে একাই লড়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে যদি রাশিয়া হেরে যায় তবে ন্যাটোভুক্ত দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রতিটি দেশের অবস্থাই হবে প্যালেস্টাইনের মতো। এই ন্যাটোও তখন আর ন্যাটো থাকবে না। রাশিয়া ভেঙে গেলে শিয়াল আমেরিকা সবাইকে মুরগির মতো ছিঁড়ে খাবে।

এখন যদি পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয় তবে পুরো পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যাবে- তাতে না থাকবে আমেরিকা, না থাকবে রাশিয়া, না থাকবে মানুষ। রাশিয়াকে যুদ্ধে হারানোর চিন্তা একটা কাল্পনিক বিষয়। পৃথিবীর অর্ধেক পারমাণবিক অস্ত্র যার হাতে তাকে হারানো যাবে না, প্রয়োজনে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। রাশিয়ার এমন সিস্টেম করা আছে যাতে অন্য দেশের পারমাণবিক হামলায় যদি রাশিয়ান ভূপৃষ্ঠের ভূখণ্ডে একজন মানুষও জীবিত না থাকে তবে তার পারমাণবিক অস্ত্র সক্রিয় হয়ে পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেবে। সুতরাং রাশিয়াকে পরাজিত করার চিন্তা একটা অলীক স্বপ্ন। ফলে আলোচনাই এ যুদ্ধ বন্ধ ও পৃথিবীকে রক্ষা করার একমাত্র পথ। আমেরিকাকে বাধ্য করতে হবে সে যেন ইউক্রেনকে আলোচনায় বসায়। যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। শক্তি নির্মূল করা সম্ভব নয় ফলে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে শক্তির ভারসাম্য দরকার। একমাত্র রাশিয়ার বিজয়‌ই সে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।

নাজমুল হাসান: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, লেখক, কলামিস্ট ও গবেষক

   

মিয়ানমার সংকট

বাংলাদেশকে নিজস্ব স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে



ব্রি. জে. হাসান মো. শামসুদ্দীন (অব.)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রোহিঙ্গা সংকট প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন ও চিন রাজ্যে চলমান সংকটে দেশটি সম্পর্কে আমরা অনেক তথ্য জানতে পারছি। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি চিন সমস্যা নিয়ে বেশ লেখালিখি হচ্ছে। সেজন্য ভারতের মিজোরাম সম্পর্কেও অনেক নতুন তথ্য আমাদের পাঠক জানতে পারছে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ও রাজ্যগুলো সম্পর্কে পাঠকদের ধারণা আরও স্পষ্ট ও তথ্য সমৃদ্ধ হওয়ার অবকাশ আছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে অশান্ত প্রতিবেশী সৃষ্ট সংকটের কারণে আমাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। মিয়ানমার বাংলাদেশের মধ্যেকার সীমান্তের নিরাপত্তা বর্তমানে মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে হুমকির মুখে রয়েছে ও পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এর পাশাপাশি মিয়ানমার সৃষ্ট রোহিঙ্গা সমস্যার বোঝা বাংলাদেশ গত সাত বছর ধরে টেনে চলছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান গোলাগুলির ঘটনায় বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো লাইনে মর্টারশেলের আঘাতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের জনপদে গোলাগুলির কারণে বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় সেখানকার জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। সে সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দ্বারা স্থলসীমান্ত ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, বাংলাদেশের আকাশসীমায় বিমানবাহিনীর অনুপ্রবেশ এবং বাংলাদেশে গুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। এ ধরনের আচরণ দ্রুত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের অন্তরায় এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি স্বরূপ। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ও সীমান্তে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চারবার তলব করে প্রতিবাদ জানানো হয়। বাংলাদেশ সে সময় কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে সহিষ্ণু মনোভাব দেখিয়েছিল।

বর্তমানে এই ঘটনার আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির চলমান যুদ্ধে একের পর এক মর্টার শেলের শব্দে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছে। সীমান্তের ওপারে সংঘর্ষের কারণে এপারের সেন্টমার্টিনসহ টেকনাফের সীমান্ত এলাকার মানুষ আতঙ্কে দিন পার করছে। বাংলাদেশ সীমান্তে গুলি ও মর্টারশেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দুজনের মৃত্যু ও নয়জন আহত হয়। এপ্রিল মাসে নাফ নদীতে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর গুলিতে দুই বাংলাদেশি জেলে আহত হয়, বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ ধরে ফেরার পথে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ঘাটে এই গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেখানে অবস্থানরত মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজকে বাংলাদেশের পতাকা দেখিয়ে গুলি না করার সংকেত দেওয়ার পরেও তারা তা উপেক্ষা করে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীর (বিজিপি) কাছে প্রতিবাদপত্র পাঠায়। ঘটনার ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তার কারণে পরবর্তীতে প্রায় ৩০০ জেলে তাদের নৌকা নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেনি। এছাড়াও বিজিপি সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফে ফেরার পথে একটি যাত্রীবাহী ট্রলার আটক করে প্রায় দুই ঘণ্টা তাদেরকে আটকে রাখে। গুলিতে বাংলাদেশি জেলেদের আহত হওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এসব ঘটনা প্রতিবেশী দেশের মধ্যেকার শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি নষ্ট করছে।

ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর আরাকান আর্মির সাথে বিজিপি’র সংঘর্ষের তীব্রতায় বিভিন্ন সময়ে কয়েক দফায় মিয়ানমারের ৩৩০ জন বিজিপি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটি জাহাজে বিজিপি, সেনাবাহিনী ও শুল্ক কর্মকর্তাসহ ৩৩০ জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিজিবির তত্ত্বাবধানে তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করা হয়। এদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত বিজিপি সদস্যদেরকে বিজিবির তত্ত্বাবধানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

আরাকান আর্মির সাথে চলমান সংঘর্ষে মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ আরও ২৮৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার দ্বিতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল রাখাইন রাজ্যের সিটওয়ে বন্দর থেকে একটি নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠায়। ২৪ এপ্রিল জাহাজটি বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় এসে গভীর সাগরে অবস্থান নেয়। সেই জাহাজে ১৭৩ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয় যারা বিভিন্ন মেয়াদে মিয়ানমারের জেলে বন্দী ছিল। মিয়ানমারের বাংলাদেশ দূতাবাস দেশটির সরকারের সাথে কয়েক দফায় বৈঠক করে তাদেরকে ফেরত পাঠায়। ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী বিজিপি সদস্য, চারজন সেনা সদস্য, ইমিগ্রেশন সদস্যসহ মোট ২৮৮ জনকে বিজিপির কাছে হস্তান্তর করে ও তারা সেই জাহাজে মিয়ানমারে ফিরে যায়। বিজিবি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার বিজিপি, সেনা সদস্য ও অন্যান্যদের মানবিক সহায়তা দিয়েছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগে তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ম নীতি মেনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে যা প্রশংসার দাবি রাখে।

রাখাইনে চলমান সংঘর্ষে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরাকান আর্মির পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপরও আক্রমণ চালাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যের থান্ডওয়ে টাউনশিপে আরাকান আর্মি এবং জান্তা বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। সংঘর্ষের সময় কাছাকাছি থাকা জান্তা নৌবাহিনী ও আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সেনাবাহিনী এই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে থান্ডওয়ে টাউনের সমস্ত প্রবেশপথে আরও সামরিক চেকপয়েন্ট স্থাপন করেছে। সামরিক চেকপয়েন্টগুলো বাসিন্দাদের চাল ও জ্বালানি বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিটওয়ে এবং চকপিউ টাউনশিপ ঘিরে রেখেছে, তারা অ্যান শহরে জান্তার ওয়েস্টার্ন কমান্ড এলাকার কাছেও আক্রমণ চালাচ্ছে। এর প্রতিশোধ নিতে সেনাবাহিনী স্কুল, হাসপাতাল এবং ধর্মীয় স্থানসহ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ করছে এবং পরিবহন, ইন্টারনেট এবং ফোন সংযোগ বন্ধ রেখেছে।

১১ মার্চ আরাকান আর্মি রাখাইনের দক্ষিণে রামরি শহর দখল করেছে। বর্তমানে সংঘর্ষ চলমান অঞ্চলের জনগণ খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধার অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের রাজধানী দখলের জন্য অগ্রসর হচ্ছে এবং সংঘর্ষ বিস্তৃতি লাভ করায় বর্তমানে জান্তা রাখাইন জনগণকে ইয়াঙ্গুন ত্যাগ করতে বাধা দিচ্ছে। রাখাইন মিয়ানমারের দ্বিতীয় দরিদ্রতম রাজ্য এবং এখানে পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ না থাকায় প্রায় ৬০ হাজার রাখাইনের অভিবাসী বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনে কাজ করে। সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ জারির পরপরই, সরকার রাখাইন থেকে ইয়াঙ্গুনে আসা বিমান যাত্রীদের ওপরও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আরাকান আর্মি এখন পর্যন্ত ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিসহ ১৮০টির বেশি জান্তা ঘাঁটি এবং ফাঁড়ি দখল করেছে। তবে সমগ্র রাখাইনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে, সেইসাথে আরও অনেক রক্তক্ষয় হবে।

মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ বিরোধ, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সশস্ত্র লড়াইয়ের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ বাংলাদেশেকে সীমান্ত সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে চাপ দিচ্ছে। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা ২০১৭ সালে জান্তা বাহিনীর নৃশংস দমনপীড়নের শিকার হয়ে রাখাইন থেকে পালিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা এবং আশ্রিত রোহিঙ্গারাও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশকে সব সময়ই মিয়ানমারের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকার সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উত্তর রাখাইনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা মূলত এই এলাকা থেকেই এসেছে এবং প্রত্যাবাসন শুরু হলে তারা এখানেই ফিরে যাবে। ভবিষ্যতে যাই হউক না কেন এই এলাকা আরাকান আর্মির প্রভাব বলয়ে থাকবে। মিয়ানমারের সংকট ও সংঘাত প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, ভারত, চীন, থাইল্যান্ডের জন্যেও বিপদের কারণ হচ্ছে। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সংঘাত-সহিংসতা সীমান্তসংলগ্ন দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলছে। রাখাইনে চীন, ভারত, জাপান ও অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও অন্যান্য স্বার্থ রয়েছে। তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় দেশগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। চীন জানুয়ারি মাসে আরাকান আর্মি ও সামরিক সরকারের মধ্যে সমঝোতার জন্য বৈঠক করেছে।

ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় প্রতিনিধি আরাকান আর্মির সাথে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করছে। থাইল্যান্ডও সীমান্ত বাণিজ্য চলমান রাখতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ চলমান রোহিঙ্গা সংকট সত্ত্বেও মিয়ানমারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এবং আন্তর্জাতিক আইন কানুন মেনে সুআচরণ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সীমন্ত অঞ্চলে মিয়ানমারের চলমান সংকটের কারণে স্থানীয় জনগণ আতঙ্কে আছে এবং আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের আচরণে আমাদের জলসীমায় এখনও বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। মিয়ানমারের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য সরকার ও বিদ্রোহী উভয়ের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। রাখাইন রাজ্যের স্থিতিশীলতা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আর্থিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা সমস্যা মোকাবিলায় এই সংকটের সমাধান জরুরি। চলমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যুগ যুগ ধরে চলা রাখাইনে ও রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের ইতিহাস তুলে ধরে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি এন ইউ জি ও আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের মত বাংলাদেশকেও নিজস্ব স্বার্থ নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে।

ব্রি. জে. হাসান মো. শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অব.) মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক

;

রাজনৈতিক দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ ও হাস্যকর বাস্তবতা



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণমূলক কোনো কর্মসূচি সেই অর্থে নেই বললেই চলে। তবু দেশে সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। এর প্রমাণ মেলে গ্রামাঞ্চলে পাড়া-মহল্লার মোড়ে কিংবা বাজারের চায়ের দোকানে। গেল রোজার ঈদের পূর্বে গ্রামের এক বাজারে গিয়ে দেখা গেল চায়ের দোকানের জমজমাট আড্ডা। কোনো আসন খালি না থাকায় পেছনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যা বোঝা গেল-তাতে সারাদিন মাঠে-ঘাটে কৃষি কাজ করা মানুষগুলো দেশের খবরাখবর শহুরে মানুষদের চেয়ে কম রাখেন না!

কোন দলের কোন নেতা কবে কী বলেছেন, কোন নায়িকার সংসার ভেঙে গেছে, ক্রিকেট খেলায় কোন দেশ কাকে হারিয়েছে ইত্যাদি বিতর্ক ছাপিয়ে পুতিন-বাইডেন কি বলেছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধসহ গোটা বিশ্ব পরিস্থিতিই যেন তাদের মুখস্থ! এসব চায়ের স্টলেরও আবার দলীয় পরিচয় আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের জন্য পৃথক স্টল। আর অন্য দলগুলোর সমর্থকরা সবগুলোতে মিলেমিশে থাকেন। আড়াই দশক পূর্বে গ্রাম ছেড়ে আসার যে স্মৃতি তাতে গ্রামের মানুষের এমন রাজনৈতিক সচেতনতা আগে কখনও দেখিনি। গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মূলত ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রসারে মানুষের মাঝে এই সচেতনতা এসেছে। চা-স্টলের এসব আড্ডা আবার অনেক সময় সহিংসতাতেও গড়ায়।

এতে করে প্রতীয়মান হচ্ছে-দেশে রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয় কর্মসূচি না থাকলেও সাধারণ মানুষের মাঝে রাজনীতিমনস্কতা বিলীন হয়নি। বরং মিডিয়ার কল্যাণে দেশে-বিদেশে ঘটে যাওয়া সব খবরা-খবরই তারা রাখেন এবং নিজেদের চা-আড্ডায় স্ব-স্ব ভাবনা-চিন্তা উগড়েও দেন। সেখানে দলের সমর্থক হলেও অনেক সময় নিজ দলের কেন্দ্রীয় কোনো নেতার অসংযত বক্তব্য নিয়েও সমালোচনায় ছাড়েন না অনেকে। ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ বলে বহুল শ্রুত যে টার্মটি ব্যবহার করা হয় তা বোধহয় গ্রামের এই চা-স্টলগুলির প্রতিচ্ছবি।

রাজনৈতিক দলগুলিতে রাজনীতিহীনতার মাঝেই আবারও এসেছে এক নির্বাচনী উপলক্ষ্য। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকারের সক্রিয় প্রতিষ্ঠান হতে না পারলেও উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে দলগুলির স্থানীয় নেতাকর্মীদের উৎসাহের কমতি নেই। নির্বাচিত পদ-পদবি হলেই কিছু সুযোগ-সুবিধার অংশীদার হওয়া যায়, সেইসঙ্গে কর্মী-অনুসারীদের প্রতিপালনও করা যায়-যা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। এমন বাস্তবতার দৌড়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের অনেক নেতাও শামিল হয়েছেন উপজেলা নির্বাচনে। এমপি হওয়ার দৌড়ে যারা ছিটকে পড়েছিলেন, লজ্জাশরম ভেঙে আকাঙ্ক্ষার অবনমন ঘটিয়ে অনেকেই উপজেলা নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছেন।

ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরে থাকা দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র ‘হাইকমান্ড’ এর কিছু বক্তৃতা-বিবৃতি এই নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি কয়েকবার সংবাদ সম্মেলন ডেকে উপজেলা নির্বাচনে দলের কিছু অনুশাসন মেনে চলার ‘কড়া’ নির্দেশনা শুনিয়েছেন। এই কড়া বার্তাটি হচ্ছে, এমপি-মন্ত্রীর স্বজনদের এই উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়া।

গেল কয়েক সপ্তাহ ধরে ক্ষমতাসীন দলের অন্দরে তো বটেই, গোটা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেই এ নিয়ে নানা শোরগোল চলছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও এমপিদের সঙ্গে হাইকমান্ডের অনানুষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত দেনদরবার ব্যাপকভাবেই চলছে। দলের ‘কঠোর অবস্থান’ এর সঙ্গে দ্বিমত ও স্বজনদের স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কায় কোনো কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনাও নাকি ঘটেছে!

রাজনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, দলের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাকি এও বলেছেন যে, তার ছেলে চেয়ারম্যান না হলে এলাকার উন্নয়নই নাকি হবে না!

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ জেলাতেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করে এমপি ও মন্ত্রীদের স্বজনরা প্রার্থী হয়েছেন এবং তাদের প্রার্থিতা বৈধ বলেও ঘোষিত হয়েছে। আমরা বিগত জাতীয় নির্বাচন ও তারও পূর্বে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন, এমনকি উপ-নির্বাচনগুলিতেও বহু নেতাকেই দলের সিদ্ধান্ত অমান্যের কারণে নোটিশ-বহিষ্কার, স্থায়ী বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে দেখেছি। আবার পরবর্তীতে দলের পক্ষ থেকে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফেরাতেও দেখেছি। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে বহিষ্কৃত গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমকে ফের দলে ফেরানোর সিদ্ধান্তে নেতাকর্মীদের মাঝে বিস্ময়ও পরিলক্ষিত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের হাই কমান্ড থেকে এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনদের প্রার্থী না হওয়ার ‘কড়া নির্দেশনা’ সাধারণ মানুষ, এমনকি মাঠের কর্মী-সমর্থকদের কাছে ‘হাস্যকর’ প্রতিপন্ন হচ্ছে কিনা তাও বোধহয় ভেবে দেখা দরকার।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মসূচিহীন অবস্থায় কিছু সংবাদ সম্মেলন আর বিদেশি কুটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে সীমাবদ্ধ বিএনপি’র দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দলের ৭৩ জনকে বহিষ্কার করেছে। তাদের মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী ২৮ জন, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ২৪ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছেন ২১ জন। দলের হাই কমান্ডের অদূরদর্শী ও হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরে মাশুল গুণতে থাকা বিএনপি’র নেতা ও কর্মীরা যে অধৈর্য হয়েই দলীয় সিদ্ধান্তের থোরাই কেয়ার করছেন এও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না পেলে নেতা বা কর্মীদের মাঝে যে এক ধরনের রাজনীতিহীনতা ভর করেছে তা দলটির তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে কথা বললে টের পাওয়া যায়।

স্বৈরতন্ত্রের আশ্রয়ে দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করা এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতারা স্ট্যান্ডবাজি আর অন্যদলের লেজুড় হতে গিয়ে বর্তমানে এসে এমন গুরুত্বহীন অবস্থায় পর্যবেশিত হয়েছে যে এই দলের নেতাদের কথা মানুষ কতটা গুরুত্ব দেন তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া দলটির অন্তর্কোন্দল এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে দলের বর্তমান প্রধান নিজেই হতাশ। তাহলে সেই দলের কর্মী ও সমর্থকরা কতটা দিশাহীন তা সহজেই বুঝে নেওয়া যায়। সুতরাং উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের প্রবক্তা জেনারেল এরশাদের দলের কোনো ঠিকানাই পাওয়া যাচ্ছে না আসন্ন প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে।

এই অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলির হাই কমান্ডের ‘বিচার-বিবেচনা’ নিয়ে জনমানসে যে ‘হাস্যকর’ অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে তা মোটেও শুভ ইঙ্গিত বহন করে না। যারা দলগুলির সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের এই আত্ম-উপলব্ধি অত্যন্ত জরুরি যে, দেশের সাধারণ মানুষ এখন অনেক কিছুই বুঝতে শিখে গেছেন। গ্রামের সেই ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’-গুলোতে প্রতিটি দলের ছোট-বড় সব নেতারই আমলনামার পোর্স্টমর্টেম হয়। ভালো ও সৎ কাজের প্রশংসার সঙ্গে বিতর্কিত ও জনস্বার্থের পরিপন্থি কার্যকলাপের কারণে সংশ্লিষ্টদের পিণ্ডি চটকাতেও তারা দ্বিধা করেন না। সাধারণ মানুষের এসব উপলব্ধি ও মতকে যারা গুরুত্বহীন মনে করে তাদের আত্মচিন্তার প্রসার ঘটাতে তৎপর সেইসব ‘রাজনীতিকদের’ ভবিষ্যৎ যে মোটেও শুভ নয়, ইতিহাস তা বার বার প্রমাণ করেছে। তাই জনগণের কাছে হাস্যাস্পদ হওয়ার কর্ম থেকে দূরদর্শী ও স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চা রাজনীতিতে খুবই জরুরি।

;

এক জায়গায় সবাই একাকার!



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ছেলেবেলার এক বন্ধু এসেছিল আমাদের বাসায় বেড়াতে। বহুদিন আগে সে এই রাজধানীতে এসেছিল। তখন রাস্তাঘাট এত উঁচুনিচু ছিল না। তাই, বাসা চিনতে তার কষ্ট হতো না।

এবার দুপুর বেলা কমলাপুরে ট্রেন থেকে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসার কাছাকাছি এসেও বাসা খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই, মোবাইল ফোনে বার বার কল দিচ্ছিল। অটোরকিশাওয়ালা বন্ধুটির অসহায়ত্ব বুঝে ফেলে বোধহয় মওকা খুঁজছিল কীভাবে তার যাত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করা যায়।

আড়াইশ’ টাকার ভাড়া মেটাতে গিয়ে খুচরা টাকা না থাকায় একটি এক হাজার টাকার নোট এগিয়ে দেয়। সে আবার আমাকে কল দেওয়ার সময় অটোরকিশাওয়ালা একহাজার টাকার নোটটি নিয়ে বাকি টাকা ফেরত না দিয়ে দ্রুত অটো চালিয়ে পালিয়ে যায়!

এই, থামো, থামো বলে বাকি টাকা আর ফেরত পাওয়া যায়নি।

এরকম চুরি, ছ্যাঁচড়ামি, হাইজ্যাকিং, প্রতারণা, জালিয়াতি, দুর্নীতি আমাদের সমাজের নিত্যদিনের ঘটনা। এসব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশেষ বাহিনীরা তদারকিতে দিনরাত ব্যস্ত রয়েছেন। এজন্য বিভিন্ন প্রকারের দুর্নীতিদমনকারী সংস্থার কার্যক্রম প্রচলিত রয়েছে। তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে আরো অনেক গোয়েন্দা উইং।

সব ধরনের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিদর্শন বিভাগ নামক শাখা রয়েছে। কিন্তু দমনকারীরাই যখন দুর্নীতিবাজ হয়ে যায়, তখন সমস্যা আরো জটিলতর রূপ ধারণ করে ফেলে।

সেগুলো পরিদর্শনের জন্য নিয়োজিত রয়েছেন শত শত পরিদর্শক। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে নিজস্ব পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রয়েছে স্কুল, কলেজ পরিদর্শন শাখা-উপশাখা। সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকগণ মাঠ পর্যায়ে শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচি তদারকি করে থাকেন। এজন্য তাদের ট্যুর প্রোগাম নির্ধারণ করা হয়।

সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, এই ট্যুর প্রোগাম ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপার ঘটছে। এসব ট্যুর প্রোগাম করতে যাওয়া বেশ লাভজনক বিবেচিত হওয়ায় এটা বিক্রয় করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

কারণ, এখানে ‘নাই’কে ‘হ্যাঁ’ বা মন্দটাকে ভালো বলে রিপোর্ট প্রদান করলেই আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। ফলে, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও চাকরি করা যায় অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি, ভবন, খেলার মাঠ, ল্যাবসুবিধা না থাকলেও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমতি মেলে। এসব অনুমতি মেলার পেছনের শক্তিকে অবৈধ অর্থের বিনিময়ে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করে দেন দুর্নীতিবাজ দায়িত্বশীলরা।

দেশে ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে বহুলাংশে পরিচালিত হচ্ছে, বড় বড় নির্মাণকাজগুলো। অনেক ঠিকাদারের ঠিকাদারি সনদ নেই। অনেকের সনদ আছে কিন্তু ভেজাল অথবা ধার করা। এখানে কাজ প্রাপ্তির আগে টাকা ভাগ-বাটোয়ার বিনিময়ে কাজ বাগানো হয়। অভিজ্ঞ একজনের নাম ভাঙিয়ে অনভিজ্ঞ আরেকজন বা বহুজন সেসব কাজের অংশীদার সেজে কাজ করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে তোলেন এবং নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সমাপ্ত করতে না পেরে সরকারী অর্থের অপচয় ঘটিয়ে বাজে বাড়িয়ে দেবার আন্দোলনের নামে কাজ বন্ধ করে রাখেন।

এটা আমাদের দেশের নির্মাণ সরকারি কাজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। এজন্য জাপান বা মালয়েশিয়ার চেয়ে আমাদের দেশে নির্মাণ কাজের খরচ বেশি গুণতে হচ্ছে।

এখনও নতুন পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে কালক্ষেপণ সমস্যা টাকা ছাড়া সমাধান হবার নজির নেই। সরকারি চাকরি পেতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হেনস্তা হবার ঘটনা আমাদের দেশে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। এজন্য একজন বিসিএস ক্যাডারকেও প্রমোশনের জন্য ভেরিফিকেশন রিপোর্ট পেতে অবৈধ অর্থ খরচ করার নজির রয়েছে।

কিছুদিন আগে একজন এমপি ঘোষণা দিলেন, তার ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা নির্বাচনি খরচের কথা! যেটা নির্বাচন কমিশনের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবার কথা। কিন্তু নির্বাচনক কমিশন সেটাকে পাশ কাটিয়ে গেছে!

এসব লেখা নিয়ে যখন ভাবছিলাম তখন হঠাৎ মাথায় বজ্রাঘাতের মতো একটি জাতীয় বাংলা দৈনিকের প্রথম পাতায় সংবাদ শিরোনাম এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিলো। তা হলো- র‌্যাবের সাবেক এক মহাপরিচালকের অর্থিক নিয়মের বিষয়টি।

পত্রিকাটিতে নানান অনিয়মসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, ফ্ল্যাট, স্থাপনা ক্রয় এবং একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট তৈরির জন্য ছবিসহ নানা তথ্য।

পত্রিকাটি আবাদি জমিতে রিসোর্ট তৈরির জন্য লিখেছে, ‘কেনা জমির কয়েকজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্রমাগত চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেন। ভয়ভীতিতে কাজ না হলে ভেকু দিয়ে জমির মাটি নিয়ে যেতেন। গভীর গর্ত করে শেষ পর্যন্ত জমি বিক্রি করতে বাধ্য করতেন। পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে থাকায় তাঁর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি জমির মালিকরা।’

পত্রিকাটিতে আরো বলা হয়েছে, ‘শুধু তাই নয়, রিসোর্টটির নিরাপত্তায় পাশেই বসানো হয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি না হলেও এই রিসোর্টে প্রবেশ স্বাচ্ছন্দ্য করতে সাত কিলোমিটার সড়ক পাকা করা হয়েছে সরকারি খরচে।’

এছাড়া ওয়াসার সাবেক এমডি, কতিপয় সাবেক ভিসি, মহাপরিচালক ইত্যাদির দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির খবর বেশ চাউর হলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়াতে খুবই ধীরগতি লক্ষণীয়।

এদেশে ছাত্র সংসদের নেতা হওয়া বেশ লাভজনক। তাই ছাত্রনেতা হবার দৌড়ে লবিং, তোয়াজ-তোষণ, তোড়জোর, নির্বাচনি প্রচার খরচের বাহুল্য পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে কি না তা জানা যায়নি। দেশের টেকনিক্যাল ও গবেষণাধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির বাইরে রাখার আহ্বান কেউ কর্ণপাত করছেন না।

দেশের সিংহভাগ আমলা ও রাজনীতিবিদরা সন্তানদেরকে বিদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠান। স্কলারশিপ ছাড়া বিদেশে পড়ার এত টাকা একজন সরকারি চাকুরে কীভাবে জোগাড় করেন!

একসময় রেলে ‘কালো বিড়াল’ ছিল বলে তৎকালীন মন্ত্রী সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সেই কালো বিড়ালের অস্তিত্ব ডিজিটাল টিকিটসহ গোটা রেল পরিবহন ব্যবস্থাপনায় এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, ‘কালো বিড়াল বনের মধ্যে বসতি গেড়েছে’!

কিন্তু আমার তো মনে হয়, ‘কালো বিড়াল’ দেশের সব জায়গায় ওঁৎ পেতে থেকে গোঁফে তা দিচ্ছে। তাদের গায়ে ঢিল ছোড়ার কেউ নেই। কারণ, এই পৃথিবীতে যে যত বড় অপরাধী, তার নেটওয়ার্ক তত বেশি শক্তিশালী। এর সঙ্গে থাকে সমকালীন রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ভাগ-বাটোয়ারা অর্থনীতির যোগসাজশ।

পদবিধারী ‘হোয়াইট কলার ক্রিমিনালরা’ চটকদার কথা বলে নানান কায়দায় জাল বিস্তার করে ভয়ভীতি দেখিয়ে অসহায় মানুষের সম্পদ কুক্ষিগত করে নিজেদের ভোগবিলাসের পথ প্রশস্ত করছেন। বিপদ আঁচ করে এসব মাফিয়া স্মার্টরা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আরো বেশি প্রচারে অর্থ খরচ করে ও মেগাদুর্নীতি শুরু করে দিয়েছেন।

দুর্নীতির বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদের সাবেক সচিব বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। কেউ যদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন, দুদক তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’… আইনে প্রভাবশালী নিয়ে কিছু বলা নেই। সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীরও দুর্নীতির বিচার হয়েছে। সুতরাং যে কারো দুর্নীতির বিষয়ে দুদক চাইলে অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘… কারো বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির তথ্য উঠে এলে অবশ্যই সরকারকে গুরুত্বসহকারে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের এ বিষয়ে বিশদভাবে অনুসন্ধানে নামা উচিত।

তিনি আরো বলেন, সরকারের যেকোনো পর্যায়েই চাকরি করুন না কেন, বৈধ উপায়ে কোনোভাবেই এত সম্পদ অর্জন করা সম্ভব নয়।...যদি সত্যিই এত সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন, সেটি বিস্ময়কর। ...তার দুর্নীতির পুরো চিত্র উন্মোচন করা উচিত। কারণ আইন সবার জন্য সমান।’

অন্য এক পত্রিকায় বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে ...অনেকে ষড়যন্ত্র বা সন্দেহও প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু তাতে কারো দুর্নীতি কিংবা রাজকীয় আবাসস্থল, রিসোর্ট, বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার এসবকে তো আর বায়বীয় বলা যাবে না। একজন সরকারি চাকরিজীবী, যার মাসিক বেতন এক লাখ টাকাও নয়, তিনি কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা মূল্যের এত সম্পদের মালিক হলেন! এমন প্রশ্নের জবাব তো দেশের মানুষ চাইতেই পারে’।

সেদিন এক ভিক্ষুক প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দড়িতে পা বেঁধে রাজপথে বস্তা গায়ে গড়াগড়ি দিয়ে শুয়ে থালা পেতে ভিক্ষা করছেন… নিকটস্থ এক দোকানি দীর্ঘসময় সেটা পর্যবেক্ষণ করে তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বললে তিনি রাজী হননি। কিন্তু একটি লাঠি হাতে নিয়ে তাড়া করতেই সেই ভিক্ষুক উঠে দৌড়ে পালিয়ে গেল!

এদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ ও মেগা-অপরাধীদের অমিল কোথায়! মিল একজায়গায় অবশ্যই আছে। তা হলো ভিক্ষুকেরা ভিক্ষার পয়সা দিয়ে চাঁদা দেয় মাস্তানদের। আর বড় অপরাধীরা বড় অংকের ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেশের নীতি-নির্ধারকদের।

আসলে ছোট-বড়, ভদ্র, স্মার্ট, সব দুর্নীতিবাজরাই এক জায়গায় সবাই একাকার হয়ে গেছেন! তা হলো, অবৈধ উপায়ে অর্থ অর্জন।

স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, চাঁদাবজি, পরিদর্শন, জালিয়াতি, চুরি, ভেজালকরণ ইত্যাদি যেন সবার মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলবাজ অপরাধীরা সবসময় দলের কৃপা ও দয়া পেয়ে ছাড় পাবার নিয়ম আমাদের কৃষ্টিতে নতুন করে বিকশিত হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে হেডলাইন সংবাদ বের হলেও তাদের বিরুদ্ধে তদন্তেও দুদকের ধীরগতির কথা সংবাদে প্রচরিত হচ্ছে। ‘হোয়াইট কলার ক্রিমিনালদের’ পক্ষে রাজনৈতিকভাবে একচোখা ও দলকানা নীতিও সাড়ম্বরে চালু হয়ে গেছে। তাই, এখন শুধু অপেক্ষা এসব মেগা-অপরাধমূলক ঘটনার প্রেক্ষিতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা দেখার।

*লেখক- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিনE-mail: [email protected]

;

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কী করা হচ্ছে



ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন (অবঃ)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ সাতবছর ধরে মিয়ানমার সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বহন করে চলছে। বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি (এ এ) এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যেকার সংঘর্ষে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং এর পাশাপাশি এ এ’র তীব্র আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী (বিজিপি) এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর এদেশে পালিয়ে আসা একটা নতুন ধারার সৃষ্টি করেছে এবং এর ধারাবাহিকতায় তাদেরকে ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম ও অন্যান্য প্রাশাসনিক কাজ বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ২৮৫ জন সদস্যকে মিয়ানমারের জাহাজে নৌপথে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। প্রায় সাড়ে বার লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বহনের পাশাপাশি বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কে এন এফ) সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষের ফলে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোন থেকে এই ধরনের ঘটনা আদৌ কাম্য নয়। বাংলাদেশের এই অঞ্চল বিভিন্ন কারণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, পার্বত্য চত্তগ্রামে কয়েক দশক ধরে চলমান সংঘাত পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে নিরসন করায় বেশ কয়েক দশক ধরে সেখানে শান্তি বিরাজ করছিল এর ফলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন বেগবান হয়েছিল।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুনরায় এই এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে একত্রে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো এবং কক্সবাজার জেলার সাথে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত রয়েছে। কক্সবাজার ও এই অঞ্চল পর্যটনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে এই অঞ্চলের বিশেষ ভুমিকা আছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ পূর্বক শান্তি ফিরিয়ে আনা জরুরি।

কক্সবাজারে গত সাত বছর ধরে আশ্রয় নেয়া বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাবার কার্যক্রম ও উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফিরে যেতে হলে ও সেখানে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের জন্য একটা সহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি জরুরি। বহু বছর ধরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে সেই পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নির্মম সেনাঅভিযানের আগে তাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকের মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল এবং এর পেছনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত ছিল বলে জাতিসংঘের তদন্তে উৎঘাটিত হয়েছে। ফেসবুক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ২০২১ সালে রোহিঙ্গারা ফেসবুকের বিরুদ্ধে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মামলা করে। এখন জাতিসংঘের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমারের (আইআইএমএম) তথ্য থেকে প্রমানিত হয়েছে যে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গোপনে ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রচারণা চালিয়েছিল।

তদন্তকারীদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সেনাবাহিনী 'নিয়মতান্ত্রিক ও সমন্বিতভাবে' সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় ও ঘৃণা ছড়ানোর জন্য পরিকল্পিত উপাদান ছড়িয়েছিল। এসব বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিষয়বস্তু প্রায়ই রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে প্রচলিত বৈষম্যমূলক ও অবমাননাকর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে চালানো হয়। রোহিঙ্গারা সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ বা 'ইসলামীকরণের' মাধ্যমে মিয়ানমারের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সেখানে জানানো হয় এবং তারা বার্মিজ জাতিগত বিশুদ্ধতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব প্রচারণার কারণে রাখাইনের সাধারণ জনগণও রোহিঙ্গা নিধনে অংশ নিয়েছিল। সেনাবাহিনীর বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচারণার কারণে সময় হাজার হাজার রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশুকে মারধর, যৌন নিপীড়ন এবং হত্যা করা হয় ও তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এখনও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রতি এই মনোভাব দূর করতে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বা হয়েছে বলে জানা যায় নাই।

রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের আচরণ এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। চলমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রাখাইনে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ব্যবহার করে বুথিডং শহর জ্বালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা অ্যাক্টিভিস্টদরা জানায় যে, রাখাইন রাজ্যে জাতিগত বিভাজনের বীজ বপন করতে জান্তা রোহিঙ্গা রিক্রুটদেরকে রাখাইনদের বাড়িঘর ও গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে বাধ্য করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদানের বাধ্যবাধকতার আইন ঘোষণার পর রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের আটক করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হচ্ছে ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে রোহিঙ্গাদের ফ্রন্টলাইনে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনী। রাখাইন রাজ্যে গত বছরের নভেম্বরে এ এ’র অভিযান শুরুর পর থেকে বেশ কিছু শহর এবং অনেক সেনা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী মার্চ মাসে বুথিডং, মংডু ও সিতওয়েতে এ এ’র বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা বিক্ষোভের আয়োজন করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভোলকার টার্ক সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে লড়াই ও উত্তেজনা বেসামরিক জনগণের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ফলে অতীতের নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

গ্রুপ অব সেভেন (জি-সেভেন) দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ১৯ এপ্রিল ইতালির ক্যাপ্রিতে অনুষ্ঠিত জি-সেভেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তা এবং রোহিঙ্গা ও অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছে। তারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে সহিংসতা বন্ধ, নির্বিচারে আটক সব বন্দির মুক্তি এবং একটি অর্থবহ ও টেকসই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে সব অংশীজনের সঙ্গে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের আহ্বান জানায়। এটা একটা গঠনমূলক উদ্যোগ কিন্তু এর বাস্তবায়ন কবে হবে এবং রোহিঙ্গাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে এর ভুমিকা তেমন স্পষ্ট নয়। আসিয়ান নেতৃবৃন্দ থাই সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র মায়াওয়াদ্দি অঞ্চলে তীব্র সংঘর্ষের পর সাম্প্রতিক সংঘাত বৃদ্ধিতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং সংঘাতময় মিয়ানমারে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আসিয়ান মিয়ানমারের চলমান সঙ্কট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত সাড়ে বার লাখ রোহিঙ্গা গত সাত বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত এবং তাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া থমকে আছে। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় আরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে চায় এবং তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো হয়েছে। সীমান্ত এলাকা ঘেঁষে আরাকান আর্মির তৎপরতার পাশাপাশি নতুন করে কেএনএফ বেপরোয়া হয়ে ওঠায় সীমান্ত এলাকা অস্থির হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতার সুযোগে কেএনএফ বেপরোয়া আচরণ করছে ও হামলা চালানোর সাহস পাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্যাঞ্চলের আশপাশের সীমান্ত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার কাজ করছে। অনেকের মতে এ এ’র সাথে কেএনএফের ভালো যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ভারতের মণিপুরের কুকিদের সঙ্গেও কেএনএফের যোগাযোগ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেএনএফসহ তিন দেশীয় সন্ত্রাসীদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠার বিষয়টি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সীমান্তে অস্থিরতার সুযোগ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও নিতে পারে। এর ফলে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং কক্সবাজার এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অস্ত্রের লেনদেন এবং পরস্পরকে সহায়তা করার বিষয়টিও ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। কেএনএফ পার্বত্য তিন জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকায় তৎপর, তারা ‘কুকিল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কুকি সম্প্রদায়ের লোকজন ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারে রয়েছে। ওই দুই দেশেও তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে। কেএনএফ ভারতের মণিপুর, মিজোরাম এবং মিয়ানমারে সক্রিয়। ওই সব এলাকায় চলমান অস্থিরতার প্রভাবে কেএনএফ ফের তৎপর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলমান প্রেক্ষাপটে সীমান্ত এলাকায় আমাদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

রাখাইনে জাতিগত বিদ্বেষ সহনীয় অবস্থায় আনার জন্য পদক্ষেপ নেয়া জরুরি এবং গত সাত বছরে ও রোহিঙ্গাদের প্রতি সামরিক জান্তার মনভাব পরিবর্তন না হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাখাইনের পরিস্থিতি যে রকমই হোক না কেন স্থানীয় জনগণের সাথে রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ সহবস্থান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং প্রত্যাবাসনের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য সকল পক্ষকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। রাখাইনের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু ও তা অব্যাহত রাখতে হবে যাতে দারিদ্র পীড়িত জনগণের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয় । অর্থনৈতিক মুক্তি দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার তিক্ত সম্পর্কের সুন্দর সমাধান হতে পারে। মিয়ানমার ও রাখাইনের রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সবাইকে পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন একটা সহনশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি ও কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের এই সীমান্ত অঞ্চলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে শক্তহাতে এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। স্থায়ীভাবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান করতে হলে সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে তাই এ বিষয়ে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক

;