সরকারের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফল জলবায়ু তহবিল



শরিফুল হাসান সুমন
সরকারের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফল জলবায়ু তহবিল

সরকারের দীর্ঘ পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফল জলবায়ু তহবিল

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এশিয়ায় প্রথমবারের মতো উন্নয়ন সহযোগীরা একত্রিত হয়ে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন ও মানিয়ে নিতে সাহায্য করার জন্য ৮ বিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘোষণা করেছে। আর এই সম্মিলিত তহবিল প্রদান করা হবে আইএমএফের নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানে।

আইএমএফের এমডি ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এক বিবৃতিতে বলেছেন, "অরক্ষিত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চতর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করার পাশাপাশি প্রয়োজনে তাদের সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছিল বাংলাদেশ।" দেশটি জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, অভিযোজন, প্রস্তুতি এবং সংরক্ষণকে শক্তিশালী করার জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, তিনি দুবাইতে অনুষ্ঠিত কপ২৮ এর সাইডলাইনে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে বলেছেন, "আমরা বাংলাদেশের জলবায়ু এজেন্ডার দৃঢ় বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রচারে অক্লান্ত প্রচেষ্টার প্রশংসা করি।"

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, "জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধি বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। দেশটি দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং অভিযোজনে নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছে। আজকের ঘোষণা আবারও জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেখায়। এর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি, এবং আমাদের সকলকে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার জন্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলিকে অর্থায়ন প্রদানের জন্য একসাথে কাজ করতে হবে।"

এডিবি প্রেসিডেন্ট মাসাতসুগু আসাকাওয়া বলেছেন, "জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছে এবং এটি মোকাবেলায় প্রগতিশীল পদক্ষেপ এবং শক্তিশালী অংশীদারত্ব প্রয়োজন। প্রতিশ্রুতি এবং নেতৃত্বের সাথে বাংলাদেশ তার জলবায়ু এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এনসিইসিসি জলবায়ু এজেন্ডাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সম্পূর্ণ-সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে এবং বাংলাদেশ জলবায়ু ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব বাংলাদেশকে বর্ধিত ও সমন্বিত সহায়তার সুবিধা দেবে। এডিবি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে সকল উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে কাজ করতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

জলবায়ু খাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীরা

বাংলাদেশ জলবায়ু ও উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মের (বিসিডিপি) জন্য যে উন্নয়ন সহযোগীরা একত্রিত হয়েছে তারা হলো— এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি); বিশ্বব্যাংক; ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি); বহুপাক্ষিক বিনিয়োগ গ্যারান্টি এজেন্সি (এমআইজিএ); এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি); এজেন্স ফ্রান্স ডি ডেভেলপমেন্ট (এএফডি); ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি), টিম ইউরোপের অংশ হিসাবে; সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ), দক্ষিণ কোরিয়া সরকার; জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এবং ইউ.কে।

জলবায়ু খাতে বাংলাদেশের হুমকিসমূহ

সাম্প্রতিক দশকগুলিতে বাংলাদেশে চরম জলবায়ু প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনাগুলো ঘন ঘন ঘটছে এবং তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গড় তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০-২০২১ বছরে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের ১৫৩ মিমি বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, এবং পরবর্তী গবেষণায় শীতকাল বাদে তিনটি ঋতুতে ক্রমবর্ধমান প্রবণতা পাওয়া গেছে, যা শীতল এবং শুষ্ক হয়ে উঠছে, যখন বছরের বাকি সময় উষ্ণ এবং আর্দ্র হচ্ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় এবং নদী উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলো তাদের কম অভিযোজিত ক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সরাসরি সংস্পর্শে আসার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নদীতীর ক্ষয় এবং অন্যান্য জলবায়ুগত বিপত্তি এই সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করেছে।  এই বিপদের কারণে অনেক লোক তাদের পরিবারকে পুনর্বাসিত করেছে, এবং জলবায়ু-প্ররোচিত অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত বেশিরভাগ লোককে চর জমিতে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে- মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এবং পার্শ্ববর্তী নদী দ্বারা বেষ্টিত। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, চরের জমিতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকি প্রদর্শন করে। চরের জমিতে বসবাসকারী লোকেরা একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আর্থ-সামাজিক দুর্বলতার সম্মুখীন হয় যা তাদের এক চর থেকে অন্য চরে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য করে।

সমুদ্র স্তর বৃদ্ধি

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মতান্ত্রিক বৃষ্টিপাত, নদীর নাব্যতা সব কিছু পরেও জলবায়ুগত যে প্রভাবটা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে হুমকি হয়ে দেখা দেবে সেটা হচ্ছে সমুদের স্তর বৃদ্ধি।  স্যাটেলাইট ব্যবহার করে এসএলআর প্রক্ষেপণের উপর পরিবেশ অধিদপ্তর দ্বারা পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অলটাইমেট্রি ডেটা দেখায় যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গত ৩০ বছরে ৩.৮-৫.৮ মিমি/বছর করে বেড়েছে। সমীক্ষাটি আরও দেখায় যে আগামী ১ শতাব্দীতে প্রায় ১২.৩৪%-১৭.৯৫% উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্র স্তর বৃদ্ধি (এসএলআর)-র কারণে তলিয়ে যাবে। অনুসন্ধানগুলি আরও দেখায় যে ৫.৮%-৯.১% ধান উৎপাদন হ্রাসের জন্য এসএলআর দায়ী হবে।

জলবায়ু খাতে বাংলাদেশের গৃহীত জাতীয় নীতিসমূহ হচ্ছে — Bangladesh Climate Change Strategy and Action Plan (BCCSAP), 2009; National Adaptation Programme of Action, 2005, updated in 2009; Bangladesh Climate Change Trust Act, 2010; Nationally Determined Contributions (NDC), 2015, Enhanced & Updated in 2021; NDC Implementation Road Map, 2018; Bangladesh Delta Plan, 2100; Mujib Climate Prosperity Plan 2030 (Draft); National Disaster Management Policy, 2015; Standing Orders on Disaster 2019; Plan of Action to Implement Sendai Framework for Disaster Risk Reduction 2015-2030; National Strategy on Internal Displacement Management 2021; National Plan for Disaster Management 2021-2025; Bangladesh Energy Efficiency and Conservation Master Plan up to 2030; Renewable Energy Policy of Bangladesh, 2008; Bangladesh National Action Plan for Reducing SLCPs, 2012, Updated in 2018

 বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

বাংলাদেশ সরকার ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো নিজস্ব তহবিল থেকে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ফান্ড গঠন করে। এটা ছিল অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম কোন দেশ যারা জলবায়ু খাতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ফান্ড ৮০০’র মতো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, যা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষাকল্পে গৃহীত হয়েছে। এই ১৪ বছরে বাংলাদেশ ৪৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার এই খাতে খরচ করে যার মধ্যে রয়েছে অভিযোজন, প্রশমন এবং জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণা।

জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীলতার লক্ষ্যে অভিযোজন প্রকল্প সমূহ

৩৫২.১২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ; ৫৯০.৬০ কিমি খাল খনন/পুনঃখনন; ৮২টি পানি নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামো/বাঁধ স্লুইসগেট নির্মাণ; ১৪টি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ; ১৪ হাজার ২৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং উপকূলীয় জেলেকে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি প্রশিক্ষণ; ১৯ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন চাপ সহনশীল বীজ উৎপাদন এবং বিতরণ; ৮ হাজার ৫২৯টি জলবায়ু সহনশীল ঘর নির্মাণ; ২ হাজার ৪৫১টি পানি পরিশোধন সৌর প্ল্যান্ট স্থাপন; ২১০ গ্রামে ১২ হাজার ৯০০টি ভাসমান সবজির বিছানা; ৩টি রাবার ড্যাম নির্মিত এবং ২টি স্পার পুনর্গঠিত; ৯০ কিমি নদী-তীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ সম্পন্ন; ১৮টি নিয়ন্ত্রক, ১৬টি আউটলেট এবং ১২টি খাঁড়ি নির্মাণ; ২০০.৬৪ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ; ১২৮.৭ কিমি নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি; ৪ হাজার ১৮৪টি গভীর নলকূপ স্থাপন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমন প্রকল্পসমূহ

৭১.১৪৬ মিলিয়ন গাছ লাগানো হয়েছে; ৬ হাজার ৯২১.৭ হেক্টর বনভূমি বনায়নের আওতায় আনা হয়েছে; ৬ হাজার উদ্যোক্তার মাঝে ৯ লক্ষ  উন্নত রান্নার চুলা বিতরণ; ১০ হাজার ৯০৮ সোলার হোম সিস্টেম বিতরণ করা হয়েছে; অফ-গ্রিড এলাকায় ২টি সোলার মিনি-গ্রিড প্ল্যান্ট রিমোটে ইন্সটল করা হয়েছে; ১ হাজার ৭৫১টি সোলার স্ট্রিটলাইট স্থাপন করা হয়েছে; ২ হাজার ৪৫১টি সোলার ওয়াটার পিউরিফায়ার স্থাপন করা হয়েছে; ১৩টি সৌর সেচ পাম্প বসানো হয়েছে; ৭ হাজার ৯০১টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট গৃহস্থালিতে স্থাপন করা হয়েছে, এবং ১৩টি কমিউনিটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গবেষণাসমূহ হচ্ছে—১২ ধরনের চাপ এবং তাপ সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে বন ব্যবস্থাপনা, হার্ডওয়্যার এবং অন্যান্য সরঞ্জাম স্থাপন সম্পন্ন

জলবায়ু পরিবর্তন খাতে এই পর্যন্ত প্রাপ্ত সহায়তাসমূহ

২০০৯-১০ সাল থেকে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন খাতে নীতি প্রণয়ন সহ গবেষণা ও প্রকল্প উন্নয়ন লক্ষ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে আসছে। এই খাতে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে অনুদান যেমন পেয়েছে, তেমনি ঋণও নিয়েছে বাংলাদেশ।

গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে ৫টি প্রকল্পে ১০১.১৪ মিলিয়ন দলা অনুদান এবং ২৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ; স্বল্পোন্নত দেশ তহবিল (এলডিসিএফ) থেকে ৭টি প্রকল্পে ৩৪.৪১ মিলিয়ন ডলারের অনুদান; অভিযোজন তহবিল (এএফ) থেকে ১টি প্রকল্পে ৯.৯৯ মিলিয়ন ডলারের অনুদান; গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) থেকে ৮টি প্রকল্পে ২৪.৬৬ মিলিয়ন ডলার অনুদান; এবং ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ড থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান। মোট ২০০.২০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান এবং ২৫০ মিলিয়ন ডলারের ঋণের সাথে এইসকল আন্তর্জাতিক সংস্থা ৭৪৭.২২ মিলিয়ন ডলারের সহ-অর্থায়ন করেছে।

দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ সামিটে বাংলাদেশ হঠাৎ করেই জলবায়ু খাতে এই ৮ বিলিয়ন ডলার পায়নি, গত জানুয়ারিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও সহনশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যে প্রকল্পসমূহ এডিবিতে জমা দেওয়া হয়েছে সেটারই ফল প্রকাশিত হলো ৩ ডিসেম্বর এই তহবিল ঘোষণার মাধ্যমে। শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছে। এই লক্ষ্যে বিজ্ঞ পরিবেশবিদদের সাথে দিয়ে দিনের পর দিন সেমিনার, সভা, কনফারেন্স করার পর সেই পরামর্শ মোতাবেক নীতি প্রণয়ন, সেই নীতির অধীনে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, সেই লক্ষ্যে অর্থের সংস্থান এই সবই হয়েছে পরিকল্পিত উপায়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে।

দীর্ঘদিনের লাগাতার পরিশ্রমের ফসল হচ্ছে এডিবির এই জলবায়ু তহবিল, এবং একইসঙ্গে এটি নতুন এক চ্যালেঞ্জও। আগামীদিনের উপকুল সংশ্লিষ্ট এবং কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো হয়তো এই তহবিলের কল্যাণে বিশাল সফলতা দেখাতে যাচ্ছে।

   

জেগে ঘুমিয়ে থাকা আর কতদিন?



বিশেষ সম্পাদকীয়
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর পুরান ঢাকায় নিমতলীতে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষের হতাহতের পর এক পরিবারের বেঁচে যাওয়া দুই কন্যাকে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কন্যাসম স্নেহে আগলে নিয়ে তাদের বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিলেন। অগ্নিকাণ্ড রোধে সেই সময়ে কড়া পদক্ষেপের কথা শুনেছি আমরা। পুরান ঢাকা থেকে সকল রাসায়নিক গুদাম-কারখানা ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে সরকারি নির্দেশনার বাস্তবায়ন না হওয়ার মাঝেই চুরিহাট্টায় ফের আগুনে বহু মানুষের প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়া দেখতে হয়েছে আমাদের। অসংখ্য অগ্নিকাণ্ডে বিপুল মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে এরই মাঝে বেইলে রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে ফের চিরচেনা দৃশ্যপটই আমরা দেখতে পাচ্ছি। একদিকে বহু পরিবারের স্বজনদের বুক ফাটা আর্তনাদ, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা! পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর লাশের উপর দাঁড়িয়েই আমরা দেখব তদন্ত কমিটি গঠন ও ভবিষ্যতের জন্য আরও কিছু আশ্বাস বাণী।

সহকর্মী কবির য়াহমদের ‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’ শীর্ষক মর্মস্পর্শী লেখাটি পড়ে সত্যিই মনে হচ্ছে এসব মৃত্যুর মিছিল কেবলই একটি ‘সংখ্যা’ মাত্র। নইলে বেইলি রোডে দুর্ঘটনা কবলিত ভবনটির সিড়ি ব্লক করে সেখানে সিলিন্ডার রাখার মতো মৃত্যুফাঁদ দেখার মতো কি কেউ ছিল না? প্রতিটি দুর্ঘটনার পর যেসব কারণ আমরা জানতে পারি, দূর্ঘটনার পূর্বে সেসবের প্রতিকার করার কি কোন কর্তৃপক্ষ নেই? এ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ করার জন্য সংশ্লিষ্টরা সব সময়েই কি ঘুমিয়ে থাকেন? তাদের সেই ‘জেগে ঘুমিয়ে থাকা’ ঘুম কবে ভাঙবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মত গতকালের মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ডের পর আবারও প্রবলভাবে একটি কথা ভেতর থেকে উচ্চারিত হচ্ছে-এই ভাবে আর চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত নয়।

সাম্প্রতিক দশকে অসংখ্য দুর্ঘটনার বেদনা আমরা সঞ্চয় করেছি। গাজীপুর চৌরাস্তায় গরিব অ্যান্ড গরিব কারখানা, সাভারের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্টস, পুরান ঢাকার নিমতলী, চুরিহাট্টা, চট্টগ্রামের কন্টেনেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেওয়া যাবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারাদেশে দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একহাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু এবং ৬ হাজার ৯৪১ জন দগ্ধ হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ২২ হাজার ২৮৩টি অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ১৩৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা যাচ্ছে। গেল ৫ বছরের অগ্নি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়।

এই অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরজুড়ে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোন দুর্ঘটনা সংঘটিত হলেই প্রত্যেককে আমরা সরব হতে দেখি। তারা পরস্পর পরস্পরকে দায় চাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বছরজুড়ে তদারকি ও আইন অমান্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তৎপরতা দেখা যায় না। উল্টো কত রকমের ফন্দিফিকির করে ঘুষ দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নিতে হয়, সেই খবরই বেশি মাত্রায় সামনে আসে।

সংশ্লিষ্টদের কাছে মানুষের প্রাণের মূল্য কতটা কম, যে অগ্নি সুরক্ষার মতো গুরুতর বিষয়েও কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করা যায়! এটি যে কিছু সংখ্যক মানুষ, কিছু সময় ধরে এটি করে আসছেন তা নয়। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নিয়ম-নীতির শৈথিল্য দেখানোর এই চক্রে বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। যাঁরা আইনকানুন মেনে চলতে চান, তাদের জন্যও এই সিন্ডিকেট বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবং সকলেই একপর্যায়ে অনিয়মকেই নিয়ম হিসেবে তা মেনে নেন। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে মাঝেমধ্যে কিছু মহড়ার আইওয়াশ আমরা দেখি যা নিতান্তই লোক দেখানো। বিপুল সংখ্যক ভবন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মধ্যে রেখে এই আইওয়াশে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে যাই। তাই সংশ্লিষ্টদের ‘জেগে ঘুমিয়ে থাকা’র এই প্রবণতা যদি সমূলে উৎপাটন করা না যায় তবে আমরা আগামীতে আরও বড় অগ্নিকাণ্ড হয়ত দেখব। গণমাধ্যমকর্মী আর উদ্ধারকারীরা ব্যস্ত থাকবেন নিহতের সংখ্যা মেলাতে। এই অসহায়ত্ব কি ভাষায় বর্ণনা করা যায়, তা আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্র কি সেই সদুত্তর দেবে? 

;

‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’



কবির য়াহমদ অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’

‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’

  • Font increase
  • Font Decrease

আরও একবার আগুনে অনেকগুলো প্রাণের অপচয় হয়েছে। এবার রাজধানীর বেইলি রোডে এক রাতের কয়েক ঘণ্টার আগুন কেড়ে নিয়েছে অন্তত ৪৬ জনকে। আগুনের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতখানি যে সংখ্যা দিয়ে যা পরিমাপ অসম্ভব। তবু সংখ্যায় সমাপ্ত ও সংখ্যায় নির্ণীত হয় এধরনের ভয়াবহতার চিত্র।

বেইলি রোডের প্রাত্যহিক ব্যস্ততার সঙ্গে এবার ছিল বৃহস্পতিবার ও অধিবর্ষের রাতের যোগ। ব্যস্ততা তাই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ব্যস্ত রাতের আগুনে পুড়েছেন অগণন লোক, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিপুল সম্পদের। আলো ঝলমল কাঁচে ঘেরা বহুতল ভবন কয়েক ঘণ্টার আগুনে কঙ্কালসার হয়ে গেছে। অনেক প্রাণের অপচয়ের সঙ্গে থমকে গেছে অনেকের স্বপ্ন, প্রাণ ও সম্পদ হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব নিশ্চিত। দগ্ধ অনেকেই হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হাসপাতালের পরিবেশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন ঘটনার রাত ও পরের দিন সকালে একাধিকবার হাসপাতাল গেছেন। আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে খ্যাতি পাওয়া বিখ্যাত এই চিকিৎসক যা জানিয়েছেন তাতে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার শঙ্কা আছে। শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘ধোয়ার কারণে অনেকের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। যারা বের হতে পারে নাই তারা মারা গেছে। আর যারা বের হতে পেরেছে তারা এখনও বেঁচে আছে। তবে কেউই শঙ্কা মুক্ত নন।’

কী কারণে এ আগুন, ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কেমন ছিল—এর বিস্তারিত ওঠে আসবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। তবে ঘটনার রাতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘দ্বিতীয় তলা ছাড়া ভবনটার প্রতিটি ফ্লোরের সিঁড়িতে ছিল সিলিন্ডার। যেটা খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার। কারণ, আগুন লাগলে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়, যা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। ভবনটা মনে হয়েছে অনেকটা আগুনের চুল্লির মতো।’ তিনি আরও জানান, ‘ভবনটা অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ ভবনে মাত্র একটি সিঁড়ি। আগুনে দগ্ধ না হয়ে মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অর্থাৎ অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন বা অবচেতন হয়েছেন। প্রত্যেকটি অগ্নিদুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়। এক্ষেত্রেও তদন্ত হবে। চুলা থেকে অথবা গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।’

ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এই বক্তব্য ঘটনার রাতে, যখন উদ্ধার প্রক্রিয়া চলছিল, তখনকার। অর্থাৎ এটা ছিল তার প্রাথমিক ধারণা। তবে প্রাথমিক অবস্থাতেই তিনি যা বলছিলেন সেটাও ভয়াবহ। এই যে সিঁড়িতে সিলিন্ডার রাখা, একটিমাত্র সিঁড়ি, আগুনের চুল্লির অবস্থায় ভবন..., এগুলো আসলে ভয়াবহ তথ্য।

বেইলি রোড রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম স্থান। এই জায়গায় বহুতল ভবন এবং ‘কাচ্চি ভাই’ নামের একটা পরিচিত রেস্তোরাঁ থাকা সত্ত্বেও এখানে কি নিরাপত্তা বিষয়ক কোন তদারকি ব্যবস্থা ছিল না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের? কেন থাকবে না? আগুনে অগণন প্রাণ আর সম্পদের অপচয়ের পর কেন সামনে আসবে কত ঝুঁকিতে ছিল এই ভবন এবং এই ভবনে যাতায়াত করা হাজারো মানুষ? দায় এড়াতে পারে কি সিটি করপোরেশন এবং অথবা অন্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ?

সাধারণ মানুষের এখানে করার কিছু কি আছে? না, নাই! কারণ ভবন ও প্রতিষ্ঠানের বিবিধ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের, তদারকির দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। ভবনের সিঁড়িতে-সিঁড়িতে সিলিন্ডার রেখে এটাকে ‘আগুনের চুল্লি’ বানিয়ে রেখে মানুষের জীবনকে যারা মৃত্যুর মুখে ঠেলেছে, সঠিক তদারকির অবহেলায় যারা এই মৃত্যুকে নিশ্চিত করেছে তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো জরুরি, শাস্তি দেওয়া আবশ্যক। সাধারণের এখানে দায় নাই, কারণ এইধরনের ভবনগুলো ব্যবহারের মাধ্যম আজকাল লিফট। সাধারণের সুযোগ নাই কোন ভবনের সিঁড়িতে কী আছে তা পরখ করে দেখার। কেউ দেখলেও কিছু বলার সুযোগ নাই, আর বললেও কেউ পাত্তা দেবে না এসবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে কোন অভিযোগ দিলে সেই অভিযোগের সুরাহা হয় না, ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন, কেউ কেউ বিব্রত হন। কাচ্চি ভাই কিংবা এইধরনের পরিচিত ও বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাধারণত কেউ কোন ব্যবস্থা নেয় না, ব্যবস্থা নেয় না অভিজাত বিপণিবিতানের বিরুদ্ধে। সরকারি দপ্তরের কারো কারো সঙ্গে তাদের যোগসাজশ, সম্পর্ক এবং অথবা প্রভাবে অনেকে তাই বেপরোয়া। ব্যবসা এবং ব্যবসাই মুখ্য হয়ে থাকে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর দেওয়ার চাইতে জোর দেওয়া হয় ব্যবসায়িক দিকেই। ফলে মানুষের প্রাণ আর সম্পদের অপচয়ের আগে এনিয়ে কেউ কথা বলতে, কোন পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ দেখায় না।

বেইলি রোডের এই আগুন আর অগণন প্রাণের অপচয়ের পর এনিয়ে কিছুদিন কিছু কথা হবে। এরপর একটা সময়ে এই আলোচনাও বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের কাছে, সকলের কাছে, সরকারি-বেসরকারি নথিতে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো স্রেফ সংখ্যা হিসেবেই ধরা দেবে।

রোমেন রায়হান ‘অঙ্গার হওয়া মানুষ জানো না’ শিরোনামের তার একটি লেখায় লিখেছেন—‘‘অঙ্গার হওয়া মানুষ জানো না/ আমরা যে কথা জানি/ এসেছে মন্ত্রী, এসেছে মেয়র/ এসেছে মহান বাণী।/ বসন্ত বলে পাতার আড়ালে/ কোকিলের কুহু কুহু/ এসেছে মিডিয়া খবরের খোঁজে/ সাথে কিছু আহা, উঁহু।/ মর্গে, স্বর্গে যেখানেই থাকো/ খুশি হবে তুমি জেনে/ তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা/ সকলে নিয়েছি মেনে।/ বেঁচে থাকাদের কপালে অল্প/ দুশ্চিন্তার রেখা/ কেউ কি কাউকে শেখাতে পারবে?/ সহজ না কিছু শেখা।/ কান খুলে শোনো অগ্নিগিরিতে/ যারা যারা বসে আছো/ তোমাকে বাঁচাতে আসবে না কেউ/ পারো যদি নিজে বাঁচো।’’

বেইলি রোডের আগুন, প্রাণহানি, আর বিপুল সম্পদের অপচয় শেষে রোমেন রায়হানের লেখাটাই প্রাসঙ্গিক ফের। হে মানুষ, হে মারা পড়া মানুষ...‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা/ সকলে নিয়েছি মেনে।’ কাল রাত থেকে আমরা সংখ্যা গুনছি, সকাল-দুপুরেও সংখ্যা গুনছি; আমাদের এ গোনাগুনতি চলছে, চলবে বুঝি অনন্তকাল!

;

জানুয়ারিতে অযোগ্য, ফেব্রুয়ারিতে যোগ্য কীভাবে?



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদ। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তার মনোনয়ন বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরিশালের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম কর্তৃক মনোনয়ন বাতিলের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। এরপর আইনি লড়াই শেষেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি আওয়ামী লীগের এই নেত্রী। নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হতে না পারলেও সংরক্ষিত আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। নিয়েছেন শপথও।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে অংশ নেওয়ার যোগ্য না হলেও সংরক্ষিত নারী আসনে বরিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন শাম্মী আহম্মেদ। বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রথমে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ৪৮ জনের শপথ পড়ানো হয়। এরপর শপথ পড়েন জাতীয় পার্টির দুইজন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়াদের মধ্যে ছিলেন আলোচিত প্রার্থী শাম্মী আহম্মেদও।

এখানে সংগত প্রশ্ন—কীভাবে সম্ভব? কারণ নির্বাচন পদ্ধতি ভিন্ন হলেও সাধারণ আসন আর সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা/অযোগ্যতা অভিন্ন। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ এর ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ অংশ বলছে—‘৮। (১) সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার জন্য সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোন মহিলা সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন। (২) সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ বা অন্য কোন আইনের অধীন সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার অযোগ্য কোন ব্যক্তি সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন না।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যাপক আইনি লড়াই করেছিলেন এই আওয়ামী লীগ নেত্রী। রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন। ইসিতে করা এই আপিলে ব্যর্থ হন। ব্যর্থ হন হাইকোর্টে। এরপর হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে শাম্মী আহম্মেদের করা আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ‘নো অর্ডার’ আদেশ দেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া হয়নি তার। ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত পংকজ দেবনাথ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েই কেবল আলোচিত ছিলেন না শাম্মী আহমেদ। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী পংকজ দেবনাথ এনেছিলেন আরও অভিযোগ। তন্মধ্যে ছিল স্মার্টকার্ডের তথ্য গোপন করে পাসপোর্ট করা, অস্ট্রেলিয়ার ভোটার হওয়াও।

সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের যোগ্যতা/অযোগ্যতায় যখন ভিন্নতা নাই, তখন সত্যি কি আইনের ব্যত্যয় হয়েছে এখানে? এ প্রসঙ্গে অবশ্য ফিরে দেখা যেতে পারে আপিলে কী হয়েছিল তার। শাম্মী আহম্মেদের আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিকুল ইসলাম আপিল শুনানির সময়ে জানিয়েছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য ইতোমধ্যে শাম্মী আহম্মেদ চিঠি দিয়েছেন।’ তার সে বক্তব্য সেই সময় আমলে নেননি। সত্যি সত্যি তিনি যদি দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন তবে তার মনোনয়ন বৈধ হয়ে যেত। কারণ এখানে সংবিধানের ৬৬ নং অনুচ্ছেদ বলছে, ‘(২ক) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফা তে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি- (ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা (খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে- এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।’

বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগকে রাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখছে। নির্বাচনের আগে শাম্মী আহম্মেদ কেবলই বাংলাদেশের নাগরিক এটা প্রমাণ করতে পারেননি। এখন কি পেরেছেন? ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তার স্বপক্ষে উচ্চ আদালত পর্যন্ত অনেক যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো গ্রাহ্য করেনি উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ। এবার সেটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হলো? নাগরিকত্ব বিষয়ক হালনাগাদ কোন তথ্য না থাকলে, যে অভিযোগ ইসি মনোনয়ন বাতিল করেছিল সেই একই অভিযোগে এবারও কি তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায় না? এবার মনোনয়ন দাখিলের সময় শাম্মী আহম্মেদ বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্র যদি উপস্থাপন করে থাকেন, তবু এনিয়ে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থাকা উচিত। কারণ তার মনোনয়ন নিয়ে যখন এত আলোচনা হয়েছে আগে, তখন বিনা বাক্য ব্যয়ে অথবা চুপিসারে এবার মনোনয়নপত্র বৈধ হয়ে যাওয়ায় নাগরিক-প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কান পেতে সেই প্রশ্নই আমরা শুনছি, এবং অথবা সেই প্রশ্ন আমরা তুলছি। 

শাম্মী আহম্মেদ জাতীয় সংসদের সদস্য হলে আমাদের কারো আপত্তি থাকার কথা না। বরং খুশিই আমরা, কারণ তার মতো উচ্চশিক্ষিতরা সংসদ সদস্য হলে দেশের লাভ, তার এলাকার লাভ, নারীদের লাভ। তার পরিবার উচ্চশিক্ষিত। তার প্রয়াত বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ বড় নেতা হলেও আওয়ামী লীগের মতো বিশাল রাজনৈতিক দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদে আসা তার কেবল বাবার পরিচয়ের কারণে হয়নি, হয়েছে নিজের যোগ্যতায় অনেকটাই। চাকরি জীবনে তিনি ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। বলা যায় বর্তমান অবস্থানে আসা তার নিজের যোগ্যতায়। এবার সংরক্ষিত নারী আসনের যে ৫০ জন এসেছেন সংসদে তাদের অনেকের চাইতে শিক্ষায়-যোগ্যতায় এগিয়ে শাম্মী আহম্মেদ। কিন্তু তার সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে যখন একবার প্রশ্ন উঠেছে, তখন এটা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। 

শাম্মী আহম্মেদের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্নের অবতারণা মূলত প্রথা-প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যমান আইন বিষয়ক আলোচনা। যেখানে প্রশ্ন সেখানে উত্তর থাকা বাঞ্ছনীয়। এই প্রশ্নের সুরাহা না হলে সংসদই বিতর্কিত হবে। বিতর্ক এড়ানোর স্বার্থে বিষয়টির সঠিক ব্যাখ্যা আমরা আশা করি।

;

মিয়ানমার কেন গৃহযুদ্ধের দেশ হয়ে উঠেছে! 



সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মিয়ানমার বহু ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর একটি দেশ। আবার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা ও অন্যান্য দিকগুলির ভিন্নতা। এই ভিন্নতার কারণে দেশটিতে প্রায়শ জাতিগত দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতের দিকে নিয়ে যায়। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকারের জাতিভিত্তিক নীতিই গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ।

মিয়ানমারের আয়তন আনুমানিক ৬ লাখ ৭৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ৫৪ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন (প্রায়)। দেশটিতে মোট ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এবং যারা ১০০টিরও বেশি ভাষায় কথা বলেন। আয়তনে বড় হলেও এটি একটি কেন্দ্রশাসিত দেশ। এখানে বার্মিজ জাতীয়তাবাদ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়।

উত্তর মিয়ানমারে মূলত কাচিন, কারেন এবং রাখাইনের মতো জাতিগত সংখ্যালঘুদের বসবাস। এই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলো ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরে বিভক্ত ছিল এবং তাদের নিজস্ব অনন্য সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে।

রাষ্ট্র জাতিগত গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সমান আচরণ করতে ব্যর্থ। দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সামরিক সরকারের হাতে, যা সামরিক সরকার এবং স্থানীয় জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে অসংখ্য দ্বন্দ্বের কারণগুলোর একটি। মিয়ানমারে এক ডজনের মতো সশস্ত্র শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে। দেশটির সরকার প্রকৃতপক্ষে ৭টি প্রদেশ এবং ২টি শহর নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ৭টি রাজ্য, যেখানে জাতিগত সংখ্যালঘুরা রয়েছে, সেখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ঠিক এই কারণেই মিয়ানমার বিভক্ত হওয়ার পরিস্থিতির দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছিল। এগুলোর প্রতিটির নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু সামরিক জান্তার 'বার্মিজ জাতীয়তাবাদ' নীতি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

[তৎকালীন 'বার্মা' ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬২ সাল থেকে দেশটিতে সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে জান্তা সরকার দেশটির নাম 'বার্মা' থেকে মিয়ানমার করে। এখানে বলে রাখা ভালো, এখানে সত্যিকারের নাম পরিবর্তন করা হয়নি। কেবল নামের বানানটিকে স্থানীয় ভাষার আধুনিক উচ্চারণ ও বানারীতির মতো করে নেওয়া হয়েছে। 'বার্মা' এবং 'মিয়ানমার' দুটি শব্দর উৎস মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী– “ম্রন-মা” (မြန်မာ) থেকে। বর্তমানে অধিকাংশ বর্মির উচ্চারণে 'র' 'ইয়-তে পরিণত হয়েছে। সে কারণে 'ম্রন-মা' উচ্চারিত হয়, 'মিয়ান-মা'। ইংরেজি (মূলত রোমান) বানানে Myanmar. 'রেঙ্গুন' থেকে 'ইয়াঙ্গন'ও সেই একইভাবে এসেছে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে এর নাম আবার পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘The Republic of the Union of Myanmar]

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর মিয়ানমার সরকার জাতিগত কিছু নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলি সমাধান করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই নীতিগুলি কখনোই সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে, জাতিগত সংঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। জাতিগত এই নীতিগুলির মধ্যে একটি হলো- ‘বৃহত্তর বার্মা নীতি’। এই নীতির মূল ধারণাটি হলো, মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে বৃহত্তর বার্মার সাংস্কৃতিক বৃত্তে একীভূত করা। আর এইভাবে দেশের ঐক্য ও স্থিতিশীলতা অর্জন করা। কিন্তু এই নীতি জোর করে আত্তীকরণ (Assimilation) এবং সাংস্কৃতিক গণহত্যার মতো উপায়ে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দমন ও বৈষম্যের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হয়। ফলে এই নীতি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ ও প্রতিরোধের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। এতে করে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়।

এছাড়াও মিয়ানমার সরকার আরো কিছু জাতিগত নীতি বাস্তবায়ন করে, যেমন ‘ফেডারেলিজম’ এবং ‘বহুদলীয় ব্যবস্থা’। এই নীতিগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো- প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার অনুমতি দেওয়া৷ তবে বাস্তবে এই নীতির বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব থেকেছে। এর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে গুণগত পার্থক্য অনেক বেশি। এই কারণে প্রকৃত সাম্য ও স্বাধীনতা অর্জন করা কঠিন হয়ে যায়। এ সব কারণে জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে তীব্রতর করেছে।

মিয়ানমার সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, 'কারেন' জনগোষ্ঠীকে জোর করে আত্তীকরণ নীতি। কারেন জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের এই আত্তীকরণ নীতি অনেক দিক থেকেই প্রকাশ পায়।

প্রথমত, সরকার কারেন জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব ভাষা এবং হরফ ব্যবহার করার ওপর বাধানিষেধ আরোপ করে বার্মায় আত্মীকরণ করার চেষ্টা করে।

দ্বিতীয়ত, কারেনদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। একইসঙ্গে কারেন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এছাড়া তাদের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হতে বঞ্চিত বাধ্য করা হয়। অথচ কারেন মিয়ানমারের বৃহত্তম জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটি। এদের জনসংখ্যা ১ মিলিয়নেরও বেশি। এই জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির ওপর সরকারের বিধিনিষেধের ফলে কারেনদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং তাদের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।

কারেন জনগোষ্ঠী ছাড়াও মিয়ানমারের শান, কাচিন, আরাকান, রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। তারা তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়াসে অনেক প্রতিবাদ ও সশস্ত্র প্রতিরোধের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

মিয়ানমারে জাতিগত ইস্যু শুধু রাজনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমস্যা। সরকারের উচিত প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান করা এবং তাদের সমান অধিকার ও সুযোগ দেওয়া। তাহলেই মিয়ানমারে শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব!

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী- লেখক ও গবেষক, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম 

;