দারিদ্র্যসূচক কমেছে ভিখারি কমেনি



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিসিএস)-এর এক জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছে দেশে দারিদ্র কমেছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, দেশের সার্বিক উন্নয়নসূচকের অনেকটা অগ্রগতি লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে।

গত ১৭ এপ্রিল ২০২৩ বিবিএস-এর বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল ষ্টাটিস্টিকস-২০২১ এর ফল প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছয়মাস কমেছে। পুরুষের গড় আয়ু ৭০.৬ এবং নারীর গড় আয়ু ৭৪.৪ বছর। এই প্রথম বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কমলো।

আরেক সংবাদে বলা হয়েছে, সরকারী চাকরী করেন মিরপুরের এমন একজন বাসিন্দা জীবনে প্রথমবার মেট্রোরেলে উঠে ‘উন্নয়ন অনুভব করা যাচ্ছে’ বলে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। বিষয়গুলো বিভিন্ন সংবাদে জেনে খুব খুশি লাগে।

কিন্তু একই টিভিতে আরেক সংবাদে যখন একজন ভিখারি আক্ষেপ করেন যে আগে রেল স্টেশনে ভিক্ষা করতাম, ট্রেনে চড়ে হাত পাতলেই ভিক্ষা পেতাম এখন সেই উপায় নেই। আগে ইন্টারসিটি ট্রেনে চড়ে ঈদের সময় ভিক্ষা করতে করতে বাড়ি চলে যেতাম। এখন সে উপায় নেই। লোকাল ট্রেনে এত মানুষ যে ভেতরে ঢোকা যায় না। কোনরকমে উঠতে পারলে ভিক্ষার জন্য এদিক সেদিক নড়াচড়া করার উপায় নেই। আগের মতো আমার আয়-রোজগার নাই। বাসা-বাড়িতে ভিক্ষার জন্য গেলে ভেতরে ঢোকার উপায় নাই। দারোয়ান তাড়িয়ে দেয় অথবা তালাচাবি দেখে ফিরে আসতে হয়। দোকানে ভিক্ষার জন্য হাত পাতলে একটা খুচরা পয়সা দেয়। সারাদিন যা পাই তা দিয়ে জীবন চালানো দায়।

আধুনিক যুগে যাদের স্থায়ী আয় আছে, সঞ্চয় আছে এবং ব্যাংক ঋণ পাবার যোগ্যতা আছে তারা বেশি বেশি উঁচু বাড়ি বানাচ্ছেন বা কিনছেন। সেগুলো ভাড়া দিচ্ছেন নতুবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। তাপর সেগুলোতে নিরাপত্তার জন্য সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ দিয়ে তাদের হাতে একবোঝা চাবিসহ নতুন মডেলের তালা কিনে দিয়ে স্বস্থি খুঁজে পাচ্ছেন। সুসজ্জিত গেইট, ডিজিটাল তালাচাবি, সিসি ক্যামেরা, কুকুর, দারোয়ান ইত্যাদি মিলে ভিখারি তাড়ানোর মহোৎসব গড়ে উঠেছে বহুতল ভবনের শহুরে মানুষদের জীবনে। এটাই এখন বিত্তশালীদের বৈভব পাহারা দেয়া সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ।

অর্থ্যাৎ, যাদের স্থায়ী আয় করার যোগ্যতা আছে তাদের নিকট উন্নয়ন অনুভবটা সুখকর। কিন্তু যারা ভাসমান, ভিখারি, বেকার অথবা উচ্চশিক্ষিত হয়েও বহুবছর ধরে একটি চাকুরীর জন্য পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাদের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে কোন ভাবনার অবকাশ নেই তাদের মধ্যে।

অথচ, এরা ধনাঢ্য পরিবার যাদের ৯৯% মুসলমান। যারা এতসব নিরাপত্তার আয়োজন সম্পন্ন করে আকাশচুম্বি অট্টালিকা, বাগানবাড়ি, সুইমিংপুল, হাল-ফ্যশনের বিলাসবহুল গাড়ি, দেশে বিদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ লগ্নি ও সঞ্চয় নিয়ে কালাতিপাত করেছেন তারা ঈমানদার দাবী করেন। তাদের অনেকে নিয়মিত নামায আদায় করেন রোজা রাখেন, আরো নানা ইবাদত করেন। কিন্তু মিসকিনকে দান-খয়রাত ও সঠিকভাবে সরকারী কর প্রদানের বেলায় দারুণ কিপ্টেমি করতে দ্বিধা করেন না। অথচ. তারা ‘সাচ্চা মুসলিম’ অভিধায় নিজেকে শুনতে বেশ ভালবাসেন।

এসব বিত্তশালীদের সীমাহীন আয় ও পথে ঘুর বেড়ানো ভিখারির আয় সম্মিলন করে গড় করে গোটা দেশের মাথাপিছু আয় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তাই অর্থনীতিবিদগণ অনেকেই কোন অসম আয়ের দেশের দেশের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধিকে শুভঙ্করের ফাঁকি ও এক ধরণের প্রতারণা বলে মনে করেন।

তাই এসব দেশের দামী মার্কেটের কেনাকাটা বা অভিজাত রেষ্টুরেন্টের আলো-আঁধারিতে বসে বঙ্গবাজরের টিনশেডের সামান্য জায়গায় হাজার হাজার ঘুপচি দোকানঘর পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাবার পর প্রকৃত দোকানদারদের সংখ্যার তালিকা ও দাবীর সংগে হিসেব মিলাতে হিমশিম খেতে হয়। কারণ, দরিদ্র, অতিদরিদ্র, হকার, টোকাই, দিনমজুর, উন্মাদ, ভাসমান পতিতা, পথশিশু, ভিখারি ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর সঠিক হিসেবে বড় গড়মিল লক্ষ্যণীয়।

আরেকটি বিশেষ বিষয় হলো মুসলমানদের জন্য যাকাত প্রদানের বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করা। অনেক মুসলিম যাকাত প্রদানের বেলায় বেশ উদাসীন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই ধনীদের সম্পদে দরিদ্রদের অধিকার রয়েছে।’

রাজা রেখে যেমন দেহ-মনকে পবিত্র করা হয়, যাকাত দিয়ে তেমনি সম্পদকে পবিত্র করা হয়। মহাগ্রন্থ পবিত্র আল-কোরআনে বলা হয়েছে-“ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র হয়েছে, যারা অনর্থক (অন্যায়) কাজ থেকে বিরত হয়েছে, আর যারা যাকাত দানে সক্রিয় হয়েছে”(সুরা মুমিনুন, ১-৪)। অন্যত্র বলা হয়েছে- “ আর যারা সোনা ও রূপা জমা করে রাখে এবং সেগুলো আল্লাহর পথে খরচ করে না, তাদেরকে মর্মন্তÍদ শাস্তির সংবাদ দিন”(সুরা তওবা ৩৪ আয়াতংশ)।

সূরা আদ্ব দোহায় বলা হয়েছে, ‘ওয়া আম্মাচ্ছায়েলা ফালা তানহার’অর্থ্যাৎ, ‘ভিখারিকে ধমক দিও না।’ (সূরা ৯৩: আয়াত ৯)। সূরা আল হুমাজাহ্-য় বলা হয়েছে- ‘আল্লাজি জামাআমালাওঁ ওয়াদ্দাদাহ্’ দুর্ভাগ্য এমন সেই ব্যক্তিদের জন্য, ‘যারা সম্পদ জমা করে ও বার বার গণনা করে। (সূরা ১০৪: আয়াত ২)।’

অনেকে দোজখের আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচার জন্য পবিত্র রমজানের রোজা রাখে। অথচ, অনেক মুসলমান ধনাঢ্য ব্যক্তিরাই ঘুস, দুর্নীতি ও সুদের মধ্যে বাঁচতে ভালবাসে। তাদের দুয়ারে তৃষ্ণার্ত ভূখা-নাঙ্গা ভিখারি বা সাহয্যপ্রার্থী দেখলেই রেগে উঠে, তাড়িয়ে দেয়। অচিরেই লেলিহান শিখাযুক্ত আগুনের করাল গ্রাসের কথা সেসব সম্পদ জমাকারীদের মধ্যে কোন বোধদয় জাগ্রত করে না।

একদিকে ধর্মীয় দিকে বিরাট ফাঁকি, অন্যদিকে তথ্যবিভ্রাট ও প্রকাশিত তথ্যের পরিসাংখ্যিক ও বৈজ্ঞানিক দুর্বলতা আমাদের দেশের গবেষণার জন্য একটি বড় লুপহোল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিসিএস)-এর জরিপের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সন্তুষ্ট নয় সরকারী-সেরকারী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান । তাদের অভিযোগ চাহিদামতো বিবিএস-এর তথ্য পাওয়া যায় না। তারপরও বিভিন্ন সূত্রে যা পাওয়া যায় সেসব প্রদত্ত তথ্যের উপর অস্তুষ্ট ৫৯% উত্তরদাতা।

পরিকল্পনা উপমন্ত্রী বলেছেন, “তাঁর প্রশ্ন, উত্তরদাতার সংখ্যা নির্বাচন নিয়ে। তিনি বলেন, ভুটানের মতো সাড়ে সাত লাখ জনগোষ্ঠীর দেশে এই ধরনের জরিপে উত্তরদাতার সংখ্যা ৯৬০। বাংলাদেশ সাড়ে ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর দেশ হয়েও উত্তরদাতা নেওয়া হয়েছে মাত্র ৬০৯ জন। এর ব্যাখ্যা আমরা কীভাবে দেব?”

তাঁর এই প্রশ্ন তোলার প্রেক্ষাপটে বিবিএসের মহাপরিচালক মহোদয় বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী ঠিকই বলেছেন। মূল প্রশ্ন হলো, এই স্যাম্পল সাইজ পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে কি না। যদি পেশাভিত্তিক সংখ্যা পাওয়া যেত, তাহলে অংশগ্রহণভিত্তিক স্যাম্পল পাওয়া যেত। ভবিষ্যতে এসব ঠিকঠাক করে জরিপ করা হবে। প্রথমবার বলে ভুলত্রুটি রয়ে গেছে।’

বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, ‘উত্তরদাতাদের সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট জাতীয় আয় শাখার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে। আলোচিত পাঁচটি অসন্তুষ্টির সব কটিতেই অর্ধেক উত্তরদাতা এই শাখার তথ্য–উপাত্তে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত পরিসংখ্যান তথা তথ্য–উপাত্ত নিয়ে অর্ধেক উত্তরদাতা সন্তুষ্ট নন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের তথ্য–উপাত্তেও একই অবস্থা।’

অর্থ্যাৎ, বিবিএস-এর এই জরিপের তথ্য নিয়ে গণমানুষের চুলচেরা বিশ্লেষণের পূবেই কর্তৃপক্ষ নিজেরাই দোদূল্যমানতা প্রকাশ করেছেন। সমসাময়িক দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হারানো, বেকারত্ম, ভিক্ষুকদের বিপুলসংখ্যায় দ্বারে দ্বারে ঘুরে হাত পাতা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যা বলা যায় বাস্তবতা ও বিবিএস প্রকাশিত সেমিনারে কর্তৃপক্ষের জরিপ ফলাফলের তথ্যের মধ্যে অনেক ফাঁরাক।

এছাড়া গবেষণার জন্য যাচিত হলে পর্যাপ্ত তথ্য-–উপাত্ত দেওয়া হয় না; তথ্য-–উপাত্ত পুরোনো; প্রয়োজনীয় তথ্য থাকে না; আরও তথ্যের প্রয়োজন, তথ্যের উপস্থাপনা ব্যবহারযোগ্য নয় ইত্যাদি নানা অভিযোগ তো আছেই।
জনগণ সেটাই দেখেন, যা সংবাদ হয়ে প্রতিদিন তাদের চোখের সামনে ভেসে আসে। তার সাথে দরজার সামনে, রাস্তায়, বাজারে বা বাস্তবে কি পরিমাণ মিল বা অমিল সেটার সাথে জনগন তুলনা করেন।

অন্যান্য যা কিছু অর্জন থাক না কেন, বাজার দরের ক্রমাগত উল্লম্ফন ও ক্রয়ক্ষমতা হারানোর হতাশা এবং দান, ভিক্ষা, সাহায্য ইত্যাদি প্রাপ্তির আশায় অগণিত দরিদ্র, অসহায় ভিখারিদের সারিবদ্ধ চলাফেরা, মলিন চেহারার দলবল নিয়ে দরজায় কড়া নাড়া ইত্যাদির মধ্যে বিস্তর শুভঙ্করের ফাঁকি বিদ্যমান। তাই দারিদ্রসূচক খাতা-কলমে কমে গেছে কিন্তু বাস্তবতায় কবে কমবে সেটা সেমিনারে আশ্বাস দিতে পারলে হয়তো সেগুলোও আজকের লেখায় ফুটে ওঠানো যেত। কিন্তু সেটা সুদূর পরাহত মনে হচ্ছে। উন্নয়ন হলে বৈষম্য বাড়ে-এটা ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, সুষম উন্নয়ন হলে মানুষে-মানুষে আয় ব্যয়ের বৈষম্য বাড়ে না। সামান্য যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাতে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে।

সুতরাং বাস্তবতার নিরীখে বলা যায়, দারিদ্র্যসূচক কমেছে কিন্তু ভিখারি কমেনি বরং বেড়েছে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

 

   

আগুনের কী দোষ!



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
আগুনের কী দোষ!

আগুনের কী দোষ!

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ জন। সারাদেশে ওঠেছিল শোকের মাতম। শোক হয়েছিল সর্বজনীন। কিন্তু সেই শোক স্তিমিত হয়ে এটা এখন সর্বজনীন থেকে হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত। প্রাণ হারানো স্বজনদের স্বজনেরাও এখন কেবল শোকাহত। বাকি সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাপনে। এটা বোধহয় স্বাভাবিক।

গ্রিন কোজি কটেজের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনার পরের দিনই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। আসামি অজ্ঞাত। এরইমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকজনকে আটক করেছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা সিদ্ধান্ত নেবে এদেরকে মামলার আসামি করা হবে কিনা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ সালমান ফার্সি মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেছেন, 'বেইলি রোডের আগুনের ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে আগুনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।' পুলিশ এরই মধ্যে যাদেরকে আটক করেছে তাদের মধ্যে আছেন ওই ভবনে ‘চুমুক’ নামের একটি খাবার দোকানের দুই অংশীদার আনোয়ারুল হক ও শফিকুর রহমান এবং ‘কাচ্চি ভাই’ নামের খাবারের দোকানের ম্যানেজার জয়নুদ্দিন জিসান।

আটকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত যারা, তাদের পরিচিতি দেখে তাৎক্ষণিক মনে হচ্ছে প্রথম দুজন ছোট একটা খাবারের দোকানের দুই অংশীদার, অন্যজন ‘কাচ্চি ভাই’ নামের বড় একটা খাবারের চেইনশপের মোটে ম্যানেজার। এখন পর্যন্ত বড় দোকানের মালিকপক্ষ এবং বহুতল ভবনের মালিকপক্ষ পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টা করেনি পুলিশ।

প্রাপ্ত খবরে জানা যাচ্ছে, বহুতল এই বাণিজ্যিক ভবনে অনুমোদিত নকশা মেনে চলা হয়নি। ভবনের স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ গণমাধ্যমকে বলেছেন, 'মূলত অফিস হবে জেনে সেই কাঠামোতে ওই ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। অথচ ভবনটি ব্যবহার করা হয়েছে রেস্তোরাঁ হিসেবে। রাজউক থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন ছিল না। যে কারণে রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ-সুবিধা ছিল না ভবনটিতে।' তিনি নিজের দায় এড়াতে এখন কথাগুলো বলছেন কিনা জানি না, তবে নির্মিত ভবনে যে ত্রুটি ছিল সেটা তার বক্তব্যে পরিস্কার।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেছেন, 'ভবনটিতে কোনো অগ্নি-নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।' রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নগর-পরিকল্পনাবিদ ও বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, 'বেইলি রোডের যে ভবনে আগুন লেগেছে, ওই ভবনের কেবল আটতলায় আবাসিকের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। বাকি এক থেকে সাততলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হলেও সেখানে কেবল অফিস কক্ষ ব্যবহারের জন্য অনুমোদন ছিল। কিন্তু রেস্টুরেন্ট শোরুম বা অন্য কিছু করার জন্য অনুমোদন নেওয়া হয়নি।' বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পর গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আরও বেশি সজাগ হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইলি রোডের ভবনে অগ্নিনির্গমন পথ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবস্থা করেছি, তবুও মানুষ এতটা সচেতন নয়। একটি বহুতল ভবনে আগুন দেখেছেন, যার কোনো অগ্নিনির্গমন পথ ব্যবস্থা নেই।’

৪৬ প্রাণহানি আর আরও অনেকের প্রাণ সঙ্কটে থাকার এই সময়ে এসে এখন শোনা যাচ্ছে ‘নাই-নাই’ ধ্বনি, ‘নিয়ম না মানার’ অভিযোগ। এই অভিযোগগুলো কোথায় ছিল আগে? কেন সময়মত ব্যবস্থা নেয়নি কোনো কর্তৃপক্ষ? এখন তাদের অভিযোগগুলো স্রেফ দায় এড়ানোর অজুহাত নয় কি? ফায়ার সার্ভিস, রাজউক, সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ যত বিভাগ/ দপ্তর/ মন্ত্রণালয়/ প্রতিষ্ঠান বিবিধ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে, তারা কীভাবে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে?

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম জানাচ্ছে, গ্রিন কোজি কটেজের নিচতলায় স্যামসাং ও গেজেট অ্যান্ড গিয়ার নামে দুটি মুঠোফোন ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রির দোকান এবং শেখলিক নামের একটি ফলের রস বিক্রির দোকান ও চুমুক নামের একটি চা-কফি বিক্রির দোকান; দ্বিতীয় তলায় কাচ্চি ভাই নামের রেস্তোরাঁ; তৃতীয় তলায় ইলিয়ন নামের পোশাকের ব্র্যান্ডের দোকান; চতুর্থ তলায় খানাস ও ফুকো নামের দুটি রেস্তোরাঁ; পঞ্চম তলায় পিৎজা ইন নামের রেস্তোরাঁ; ষষ্ঠ তলায় জেসটি ও স্ট্রিট ওভেন নামের দুটি রেস্তোরাঁ; ছাদের একাংশে অ্যামব্রোসিয়া নামের রেস্তোরাঁ এবং সপ্তম তলায় হাক্কাঢাকা নামের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। ভবনে লাইনের গ্যাস সংযোগ ছিল না, বলে সবাই গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার করত এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে কেবল দোতলা বাদে প্রতি তলার সিঁড়িসহ সর্বত্র গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা ছিল।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, আগুনে নয়, বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে ধোঁয়ায় শ্বাসনালী পুড়ে গিয়ে। তাদের বক্তব্যে জানা যাচ্ছে, আগুনের ধোঁয়া বেরুনোর পথ ছিল না কাঁচ ঘেরা এই ভবনে। ফলে যারা ছাদে উঠতে পারেনি তাদের বেশিরভাগ মারা গেছেন অক্সিজেনের অভাবে। রাজধানীসহ বড় বড় শহরের বহুতল ভবনগুলোর বর্তমান যে অবস্থা তার বেশিরভাগই কাঁচঘেরা। গ্রিন কোজি কটেজ ট্র্যাজেডি বলছে অন্য কোথায় এমন অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে একই পরিণতি অপেক্ষা করছে আমাদের।

বৃহস্পতিবার রাতের আগুনের এই ঘটনা নজিরবিহীন নয়। আগেও রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গায় বারবার আগুন লেগেছে, অগণন লোকের প্রাণ গেছে। বারবার লাশ ঠেলেছে দেশ, বারবার শোকে কাতর হয়েছে মানুষ। নিমতলীর রাসায়নিক বোঝাই গুদামঘর, তাজরীন গার্মেন্টস, সেজান জুস কারখানা, বিএম ডিপো থেকে সীমা অক্সিজেন কিংবা বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ; এর আগে-পরে-মধ্যে আরও অনেক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বেপরোয়া অবহেলায় অনেকের প্রাণ গেছে। তাদের কিছুই হয়নি। প্রতি ঘটনা শেষে তদন্ত কমিটি হয়েছে, তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ দিয়েছে, কিন্তু কোন সুপারিশ প্রতিপালন হয়েছে বলে জানা নেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো যারা সুপারিশ দিয়ে থাকে তারা আবার কোনো না কোনো ভাবে কোন কর্তৃপক্ষের, তারাও দায়িত্বশীল; প্রতিবেদনের পর আর কোথাও সেই সুপারিশ নিয়ে তাদেরকেও কথা বলতে দেখিনি আমরা।

আগুনের ধর্ম পুড়ানো। আগুনে মানুষ মরেছে, মরছে অগণন। কিন্তু এসব ঘটনাকে কেবল আগুনে মৃত্যু বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সামান্যই। পুরান ঢাকায় কেমিকেল, নয়া ঢাকায় গ্যাস সিলিন্ডার আর বায়ুরোধী কাঁচঘেরা ভবনগুলো প্রাণঘাতী হয়ে ওঠেছে। এই অবস্থা সৃষ্টি করেছে মানুষ। এই অবস্থার পথ দেখাচ্ছে মানুষের নেতৃত্বে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান/ বিভাগ/ দপ্তর। বেইলি রোডের আগুনে-ধোঁয়ায় মানুষ মারা গেছে বলছে সবাই; সত্যি কি তাই? এমন মৃত্যুর জন্যে দায়ী মূলত আগুন আর ধোঁয়া নয়, মানুষই! মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে মানুষকে, আর মানুষ-হত্যার অবাধ সুযোগ দিয়ে গেছে অপরাপর মানুষই!

;

জেগে ঘুমিয়ে থাকা আর কতদিন?



বিশেষ সম্পাদকীয়
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর পুরান ঢাকায় নিমতলীতে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষের হতাহতের পর এক পরিবারের বেঁচে যাওয়া দুই কন্যাকে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কন্যাসম স্নেহে আগলে নিয়ে তাদের বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছিলেন। অগ্নিকাণ্ড রোধে সেই সময়ে কড়া পদক্ষেপের কথা শুনেছি আমরা। পুরান ঢাকা থেকে সকল রাসায়নিক গুদাম-কারখানা ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে সরকারি নির্দেশনার বাস্তবায়ন না হওয়ার মাঝেই চুরিহাট্টায় ফের আগুনে বহু মানুষের প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়া দেখতে হয়েছে আমাদের। অসংখ্য অগ্নিকাণ্ডে বিপুল মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে এরই মাঝে বেইলে রোডের গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে ফের চিরচেনা দৃশ্যপটই আমরা দেখতে পাচ্ছি। একদিকে বহু পরিবারের স্বজনদের বুক ফাটা আর্তনাদ, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা! পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর লাশের উপর দাঁড়িয়েই আমরা দেখব তদন্ত কমিটি গঠন ও ভবিষ্যতের জন্য আরও কিছু আশ্বাস বাণী।

সহকর্মী কবির য়াহমদের ‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’ শীর্ষক মর্মস্পর্শী লেখাটি পড়ে সত্যিই মনে হচ্ছে এসব মৃত্যুর মিছিল কেবলই একটি ‘সংখ্যা’ মাত্র। নইলে বেইলি রোডে দুর্ঘটনা কবলিত ভবনটির সিড়ি ব্লক করে সেখানে সিলিন্ডার রাখার মতো মৃত্যুফাঁদ দেখার মতো কি কেউ ছিল না? প্রতিটি দুর্ঘটনার পর যেসব কারণ আমরা জানতে পারি, দূর্ঘটনার পূর্বে সেসবের প্রতিকার করার কি কোন কর্তৃপক্ষ নেই? এ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ করার জন্য সংশ্লিষ্টরা সব সময়েই কি ঘুমিয়ে থাকেন? তাদের সেই ‘জেগে ঘুমিয়ে থাকা’ ঘুম কবে ভাঙবে, তা আমরা জানি না। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার মত গতকালের মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ডের পর আবারও প্রবলভাবে একটি কথা ভেতর থেকে উচ্চারিত হচ্ছে-এই ভাবে আর চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত নয়।

সাম্প্রতিক দশকে অসংখ্য দুর্ঘটনার বেদনা আমরা সঞ্চয় করেছি। গাজীপুর চৌরাস্তায় গরিব অ্যান্ড গরিব কারখানা, সাভারের নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন গার্মেন্টস, পুরান ঢাকার নিমতলী, চুরিহাট্টা, চট্টগ্রামের কন্টেনেইনার ডিপোর অগ্নিকাণ্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেওয়া যাবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে সারাদেশে দেড় লাখ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একহাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু এবং ৬ হাজার ৯৪১ জন দগ্ধ হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ২২ হাজার ২৮৩টি অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ১৩৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানা যাচ্ছে। গেল ৫ বছরের অগ্নি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়।

এই অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরজুড়ে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা আমরা জানি না। কিন্তু কোন দুর্ঘটনা সংঘটিত হলেই প্রত্যেককে আমরা সরব হতে দেখি। তারা পরস্পর পরস্পরকে দায় চাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বছরজুড়ে তদারকি ও আইন অমান্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তৎপরতা দেখা যায় না। উল্টো কত রকমের ফন্দিফিকির করে ঘুষ দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নিতে হয়, সেই খবরই বেশি মাত্রায় সামনে আসে।

সংশ্লিষ্টদের কাছে মানুষের প্রাণের মূল্য কতটা কম, যে অগ্নি সুরক্ষার মতো গুরুতর বিষয়েও কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করা যায়! এটি যে কিছু সংখ্যক মানুষ, কিছু সময় ধরে এটি করে আসছেন তা নয়। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নিয়ম-নীতির শৈথিল্য দেখানোর এই চক্রে বড় সিন্ডিকেট রয়েছে। যাঁরা আইনকানুন মেনে চলতে চান, তাদের জন্যও এই সিন্ডিকেট বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবং সকলেই একপর্যায়ে অনিয়মকেই নিয়ম হিসেবে তা মেনে নেন। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে মাঝেমধ্যে কিছু মহড়ার আইওয়াশ আমরা দেখি যা নিতান্তই লোক দেখানো। বিপুল সংখ্যক ভবন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মধ্যে রেখে এই আইওয়াশে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই রয়ে যাই। তাই সংশ্লিষ্টদের ‘জেগে ঘুমিয়ে থাকা’র এই প্রবণতা যদি সমূলে উৎপাটন করা না যায় তবে আমরা আগামীতে আরও বড় অগ্নিকাণ্ড হয়ত দেখব। গণমাধ্যমকর্মী আর উদ্ধারকারীরা ব্যস্ত থাকবেন নিহতের সংখ্যা মেলাতে। এই অসহায়ত্ব কি ভাষায় বর্ণনা করা যায়, তা আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্র কি সেই সদুত্তর দেবে? 

;

‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’



কবির য়াহমদ অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’

‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা সকলে নিয়েছি মেনে’

  • Font increase
  • Font Decrease

আরও একবার আগুনে অনেকগুলো প্রাণের অপচয় হয়েছে। এবার রাজধানীর বেইলি রোডে এক রাতের কয়েক ঘণ্টার আগুন কেড়ে নিয়েছে অন্তত ৪৬ জনকে। আগুনের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতখানি যে সংখ্যা দিয়ে যা পরিমাপ অসম্ভব। তবু সংখ্যায় সমাপ্ত ও সংখ্যায় নির্ণীত হয় এধরনের ভয়াবহতার চিত্র।

বেইলি রোডের প্রাত্যহিক ব্যস্ততার সঙ্গে এবার ছিল বৃহস্পতিবার ও অধিবর্ষের রাতের যোগ। ব্যস্ততা তাই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ব্যস্ত রাতের আগুনে পুড়েছেন অগণন লোক, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিপুল সম্পদের। আলো ঝলমল কাঁচে ঘেরা বহুতল ভবন কয়েক ঘণ্টার আগুনে কঙ্কালসার হয়ে গেছে। অনেক প্রাণের অপচয়ের সঙ্গে থমকে গেছে অনেকের স্বপ্ন, প্রাণ ও সম্পদ হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব নিশ্চিত। দগ্ধ অনেকেই হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায়, স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হাসপাতালের পরিবেশ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন ঘটনার রাত ও পরের দিন সকালে একাধিকবার হাসপাতাল গেছেন। আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে খ্যাতি পাওয়া বিখ্যাত এই চিকিৎসক যা জানিয়েছেন তাতে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার শঙ্কা আছে। শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘ধোয়ার কারণে অনেকের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। যারা বের হতে পারে নাই তারা মারা গেছে। আর যারা বের হতে পেরেছে তারা এখনও বেঁচে আছে। তবে কেউই শঙ্কা মুক্ত নন।’

কী কারণে এ আগুন, ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা কেমন ছিল—এর বিস্তারিত ওঠে আসবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। তবে ঘটনার রাতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘দ্বিতীয় তলা ছাড়া ভবনটার প্রতিটি ফ্লোরের সিঁড়িতে ছিল সিলিন্ডার। যেটা খুবই বিপজ্জনক ব্যাপার। কারণ, আগুন লাগলে সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়, যা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক। ভবনটা মনে হয়েছে অনেকটা আগুনের চুল্লির মতো।’ তিনি আরও জানান, ‘ভবনটা অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ ভবনে মাত্র একটি সিঁড়ি। আগুনে দগ্ধ না হয়ে মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অর্থাৎ অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছেন বা অবচেতন হয়েছেন। প্রত্যেকটি অগ্নিদুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়। এক্ষেত্রেও তদন্ত হবে। চুলা থেকে অথবা গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।’

ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এই বক্তব্য ঘটনার রাতে, যখন উদ্ধার প্রক্রিয়া চলছিল, তখনকার। অর্থাৎ এটা ছিল তার প্রাথমিক ধারণা। তবে প্রাথমিক অবস্থাতেই তিনি যা বলছিলেন সেটাও ভয়াবহ। এই যে সিঁড়িতে সিলিন্ডার রাখা, একটিমাত্র সিঁড়ি, আগুনের চুল্লির অবস্থায় ভবন..., এগুলো আসলে ভয়াবহ তথ্য।

বেইলি রোড রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম স্থান। এই জায়গায় বহুতল ভবন এবং ‘কাচ্চি ভাই’ নামের একটা পরিচিত রেস্তোরাঁ থাকা সত্ত্বেও এখানে কি নিরাপত্তা বিষয়ক কোন তদারকি ব্যবস্থা ছিল না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের? কেন থাকবে না? আগুনে অগণন প্রাণ আর সম্পদের অপচয়ের পর কেন সামনে আসবে কত ঝুঁকিতে ছিল এই ভবন এবং এই ভবনে যাতায়াত করা হাজারো মানুষ? দায় এড়াতে পারে কি সিটি করপোরেশন এবং অথবা অন্য দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ?

সাধারণ মানুষের এখানে করার কিছু কি আছে? না, নাই! কারণ ভবন ও প্রতিষ্ঠানের বিবিধ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের, তদারকির দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। ভবনের সিঁড়িতে-সিঁড়িতে সিলিন্ডার রেখে এটাকে ‘আগুনের চুল্লি’ বানিয়ে রেখে মানুষের জীবনকে যারা মৃত্যুর মুখে ঠেলেছে, সঠিক তদারকির অবহেলায় যারা এই মৃত্যুকে নিশ্চিত করেছে তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো জরুরি, শাস্তি দেওয়া আবশ্যক। সাধারণের এখানে দায় নাই, কারণ এইধরনের ভবনগুলো ব্যবহারের মাধ্যম আজকাল লিফট। সাধারণের সুযোগ নাই কোন ভবনের সিঁড়িতে কী আছে তা পরখ করে দেখার। কেউ দেখলেও কিছু বলার সুযোগ নাই, আর বললেও কেউ পাত্তা দেবে না এসবে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে কোন অভিযোগ দিলে সেই অভিযোগের সুরাহা হয় না, ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সরকারি দপ্তরের দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন, কেউ কেউ বিব্রত হন। কাচ্চি ভাই কিংবা এইধরনের পরিচিত ও বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাধারণত কেউ কোন ব্যবস্থা নেয় না, ব্যবস্থা নেয় না অভিজাত বিপণিবিতানের বিরুদ্ধে। সরকারি দপ্তরের কারো কারো সঙ্গে তাদের যোগসাজশ, সম্পর্ক এবং অথবা প্রভাবে অনেকে তাই বেপরোয়া। ব্যবসা এবং ব্যবসাই মুখ্য হয়ে থাকে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর দেওয়ার চাইতে জোর দেওয়া হয় ব্যবসায়িক দিকেই। ফলে মানুষের প্রাণ আর সম্পদের অপচয়ের আগে এনিয়ে কেউ কথা বলতে, কোন পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ দেখায় না।

বেইলি রোডের এই আগুন আর অগণন প্রাণের অপচয়ের পর এনিয়ে কিছুদিন কিছু কথা হবে। এরপর একটা সময়ে এই আলোচনাও বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের কাছে, সকলের কাছে, সরকারি-বেসরকারি নথিতে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো স্রেফ সংখ্যা হিসেবেই ধরা দেবে।

রোমেন রায়হান ‘অঙ্গার হওয়া মানুষ জানো না’ শিরোনামের তার একটি লেখায় লিখেছেন—‘‘অঙ্গার হওয়া মানুষ জানো না/ আমরা যে কথা জানি/ এসেছে মন্ত্রী, এসেছে মেয়র/ এসেছে মহান বাণী।/ বসন্ত বলে পাতার আড়ালে/ কোকিলের কুহু কুহু/ এসেছে মিডিয়া খবরের খোঁজে/ সাথে কিছু আহা, উঁহু।/ মর্গে, স্বর্গে যেখানেই থাকো/ খুশি হবে তুমি জেনে/ তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা/ সকলে নিয়েছি মেনে।/ বেঁচে থাকাদের কপালে অল্প/ দুশ্চিন্তার রেখা/ কেউ কি কাউকে শেখাতে পারবে?/ সহজ না কিছু শেখা।/ কান খুলে শোনো অগ্নিগিরিতে/ যারা যারা বসে আছো/ তোমাকে বাঁচাতে আসবে না কেউ/ পারো যদি নিজে বাঁচো।’’

বেইলি রোডের আগুন, প্রাণহানি, আর বিপুল সম্পদের অপচয় শেষে রোমেন রায়হানের লেখাটাই প্রাসঙ্গিক ফের। হে মানুষ, হে মারা পড়া মানুষ...‘তোমার মৃত্যু নিছক সংখ্যা/ সকলে নিয়েছি মেনে।’ কাল রাত থেকে আমরা সংখ্যা গুনছি, সকাল-দুপুরেও সংখ্যা গুনছি; আমাদের এ গোনাগুনতি চলছে, চলবে বুঝি অনন্তকাল!

;

জানুয়ারিতে অযোগ্য, ফেব্রুয়ারিতে যোগ্য কীভাবে?



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন দলটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহম্মেদ। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তার মনোনয়ন বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরিশালের জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম কর্তৃক মনোনয়ন বাতিলের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। এরপর আইনি লড়াই শেষেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি আওয়ামী লীগের এই নেত্রী। নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হতে না পারলেও সংরক্ষিত আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। নিয়েছেন শপথও।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে অংশ নেওয়ার যোগ্য না হলেও সংরক্ষিত নারী আসনে বরিশাল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন শাম্মী আহম্মেদ। বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদের শপথকক্ষে সংরক্ষিত ৫০টি আসনের সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। প্রথমে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ৪৮ জনের শপথ পড়ানো হয়। এরপর শপথ পড়েন জাতীয় পার্টির দুইজন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়াদের মধ্যে ছিলেন আলোচিত প্রার্থী শাম্মী আহম্মেদও।

এখানে সংগত প্রশ্ন—কীভাবে সম্ভব? কারণ নির্বাচন পদ্ধতি ভিন্ন হলেও সাধারণ আসন আর সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা/অযোগ্যতা অভিন্ন। ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ এর ‘সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ অংশ বলছে—‘৮। (১) সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার জন্য সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোন মহিলা সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন। (২) সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ বা অন্য কোন আইনের অধীন সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার অযোগ্য কোন ব্যক্তি সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রার্থী হইবার যোগ্য হইবেন না।’

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যাপক আইনি লড়াই করেছিলেন এই আওয়ামী লীগ নেত্রী। রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন। ইসিতে করা এই আপিলে ব্যর্থ হন। ব্যর্থ হন হাইকোর্টে। এরপর হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে শাম্মী আহম্মেদের করা আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ‘নো অর্ডার’ আদেশ দেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া হয়নি তার। ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত পংকজ দেবনাথ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েই কেবল আলোচিত ছিলেন না শাম্মী আহমেদ। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী পংকজ দেবনাথ এনেছিলেন আরও অভিযোগ। তন্মধ্যে ছিল স্মার্টকার্ডের তথ্য গোপন করে পাসপোর্ট করা, অস্ট্রেলিয়ার ভোটার হওয়াও।

সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের যোগ্যতা/অযোগ্যতায় যখন ভিন্নতা নাই, তখন সত্যি কি আইনের ব্যত্যয় হয়েছে এখানে? এ প্রসঙ্গে অবশ্য ফিরে দেখা যেতে পারে আপিলে কী হয়েছিল তার। শাম্মী আহম্মেদের আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিকুল ইসলাম আপিল শুনানির সময়ে জানিয়েছিলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য ইতোমধ্যে শাম্মী আহম্মেদ চিঠি দিয়েছেন।’ তার সে বক্তব্য সেই সময় আমলে নেননি। সত্যি সত্যি তিনি যদি দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন তবে তার মনোনয়ন বৈধ হয়ে যেত। কারণ এখানে সংবিধানের ৬৬ নং অনুচ্ছেদ বলছে, ‘(২ক) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফা তে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোন বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি- (ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা (খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে- এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।’

বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগকে রাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখছে। নির্বাচনের আগে শাম্মী আহম্মেদ কেবলই বাংলাদেশের নাগরিক এটা প্রমাণ করতে পারেননি। এখন কি পেরেছেন? ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে তার স্বপক্ষে উচ্চ আদালত পর্যন্ত অনেক যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো গ্রাহ্য করেনি উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষ। এবার সেটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হলো? নাগরিকত্ব বিষয়ক হালনাগাদ কোন তথ্য না থাকলে, যে অভিযোগ ইসি মনোনয়ন বাতিল করেছিল সেই একই অভিযোগে এবারও কি তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায় না? এবার মনোনয়ন দাখিলের সময় শাম্মী আহম্মেদ বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্র যদি উপস্থাপন করে থাকেন, তবু এনিয়ে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থাকা উচিত। কারণ তার মনোনয়ন নিয়ে যখন এত আলোচনা হয়েছে আগে, তখন বিনা বাক্য ব্যয়ে অথবা চুপিসারে এবার মনোনয়নপত্র বৈধ হয়ে যাওয়ায় নাগরিক-প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কান পেতে সেই প্রশ্নই আমরা শুনছি, এবং অথবা সেই প্রশ্ন আমরা তুলছি। 

শাম্মী আহম্মেদ জাতীয় সংসদের সদস্য হলে আমাদের কারো আপত্তি থাকার কথা না। বরং খুশিই আমরা, কারণ তার মতো উচ্চশিক্ষিতরা সংসদ সদস্য হলে দেশের লাভ, তার এলাকার লাভ, নারীদের লাভ। তার পরিবার উচ্চশিক্ষিত। তার প্রয়াত বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ বড় নেতা হলেও আওয়ামী লীগের মতো বিশাল রাজনৈতিক দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদকের পদে আসা তার কেবল বাবার পরিচয়ের কারণে হয়নি, হয়েছে নিজের যোগ্যতায় অনেকটাই। চাকরি জীবনে তিনি ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। বলা যায় বর্তমান অবস্থানে আসা তার নিজের যোগ্যতায়। এবার সংরক্ষিত নারী আসনের যে ৫০ জন এসেছেন সংসদে তাদের অনেকের চাইতে শিক্ষায়-যোগ্যতায় এগিয়ে শাম্মী আহম্মেদ। কিন্তু তার সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে যখন একবার প্রশ্ন উঠেছে, তখন এটা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। 

শাম্মী আহম্মেদের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্নের অবতারণা মূলত প্রথা-প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যমান আইন বিষয়ক আলোচনা। যেখানে প্রশ্ন সেখানে উত্তর থাকা বাঞ্ছনীয়। এই প্রশ্নের সুরাহা না হলে সংসদই বিতর্কিত হবে। বিতর্ক এড়ানোর স্বার্থে বিষয়টির সঠিক ব্যাখ্যা আমরা আশা করি।

;