স্বাগত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী



আদম তমিজী হক
আদম তমিজী হক

আদম তমিজী হক

  • Font increase
  • Font Decrease

দীর্ঘ ১৮দিন পর বাংলাদেশ ফিরে পাচ্ছে প্রাণপ্রিয় অভিভাবক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। মঙ্গলবার রাত করে যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরছেন বিশ্বনেত্রী । দেশের মানুষ তাদের প্রিয়নেত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ।

যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে ফের ঢাকা। বেশ লম্বা সফর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ১৮ দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর কাছে বেশ কিছু আহ্বান জানান দিয়ে এসেছেন। তার মূল মর্মবাণী হলো বিশ্বকে হতে হবে হানাহানিমুক্ত, বঞ্চনাহীন, বিশ্বকে হতে হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত। সবমিলিয়ে একটি মানবিক বিশ্ব ও সমান্তরালে মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বানই ছিল তার কণ্ঠজুড়ে। শেখ হাসিনার আহ্বান ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়কে এক সূত্রে গাঁথা যায়।

এদিকে পুরো সফরজুড়ে বিশ্ববাসীর কাছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ ও স্যাংশন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞার মতো বৈরীপন্থা কখনও কোনো জাতির মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন তিনি।

বাংলাদেশ যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে বিশ্বাসী বাংলাদেশ সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া। তাই বিশ্ব দরবারে তার অবস্থান ছিল ‘আমরা ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের অবসান চাই।’

গত আড়ই বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারির ধকল সামলে উঠতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বকে নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে নারী, শিশুসহ গোটা মানবজাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়। এর প্রভাব কেবল একটি দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সকল মানুষের জীবন-জীবিকা মহাসংকটে পতিত হয়।

বিশ্ব বিবেকের কাছে তাই শেখ হাসিনার উদাত্ত আহ্বান অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, স্যাংশন বন্ধ করুন। শিশুকে খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দিন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন। সেই সঙ্গে তিনি উচ্চারণ করেছেন পারস্পরিক আলাপ-আলোচনাই সংকট ও বিরোধ নিষ্পত্তির সর্বোত্তম উপায়।

প্রসঙ্গত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিকারক বাংলাদেশ মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের শতকরা ৬৫ ভাগের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেল ও তরলীকৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে দশগুণের বেশি। বন্ধ হয়ে গেছে তরলীকৃত জ্বালানি এলএনজি এর ফলে বাংলাদেশর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে চলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। জ্বালানির দাম বাড়ায় অবধারিতভাবে বেড়েছে বাংলাদেশের পরিবহন খরচ ও প্রায় সকল নিত্যপণ্যের দাম।

ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম হলেও দেশের বার্ষিক ৮০ লাখ মেট্রিকটন গমের চাহিদার প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিকটনই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়, যা মূলত মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আসে। কিন্তু গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর দেশগুলো থেকে গম আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে গম ও আটার সংকট শুরু হয়। এরইমধ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় গম কেনা শুরু হয়েছে। অচিরেই দেশে পৌঁছাবে গমের বিশাল চালান।

বৈশ্বিক সমস্যার পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমারে নির্যাতনে শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেবার পাঁচ বছর পার হলেও প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো যায়নি। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ মেয়াদের উপস্থিতি অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এমনকি এ পরিস্থিতি উগ্রবাদকেও ইন্ধন দিতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রলম্বিত হতে থাকলে উপমহাদেশসহ বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ মনবিকতায় বিশ্বাসী বলেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্য-সংহতির বাণী উচ্চারণ করেছেন। এ যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে যেন বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন শান্তি ও ন্যায়ের প্রতীক যিনি সারা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখেছেন- বিশ্ব শান্তিই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম মূলনীতি। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত বিশ্বের মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি মোটেই কুণ্ঠিত ছিলেন না, সে সংগ্রাম হোক আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা কিংবাএশিয়ার যে কোনো প্রান্ত। অস্ত্র দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম বন্ধ করা যায় না এ কথাতিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে শান্তির প্রতি জোরদেওয়া, যে কোনো ধরনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজা- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি। এই নীতির মাধ্যমেই সংঘাত এড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবিক বিশ্ব, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবিক বাংলাদেশ।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ১৯ সেপ্টেম্বর যোগ দেন প্রয়াত রানির  অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে আয়োজিত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোসহ অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

যুক্তরাজ্য সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান শেখ হাসিনা। নিউ ইয়র্কে যোগ দেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭তম অধিবেশনে। ২৩ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেন জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

জাতিসংঘে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নানাকারণে আলোচিত হয়েছে। বরাবরের মতো বাংলায় দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা করোনা মহামারী আর ইউক্রেইন আর রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়ে আলোকপাত করেন। পারমানবিক অস্ত্র বিস্তাররোধসহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের তাগিদে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল বিশ্বনেতাদের সামনে সোচ্চার। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহবান জানাতেও ভোলেননি।

বহুদিন ধরেই ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বিদেশীদের কাছে অপপ্রচার চালাচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের ধোঁয়া তুলে । ওয়াশিংটনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে মতবিনিময়কালে এই বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, দেশের মাটিতে বর্তমান সরকারের প্রকৃত উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও বর্বরতার কথা তুলে ধরতে হবে।

এটা শুধু প্রবাসীদের দায়িত্ব না। দায়িত্ব সকল সচেতন বাংলাদেশি নাগরিকের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি নিশ্চিত থাকুন। আপনার অভিভাবকত্বে এই দেশে কোন অপশক্তিকে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়া হবে না। ব্যহত করতে দেয়া হবে না এই দেশের উন্নয়নের জোয়ারের ধারাবাহিকতাকে। আমাদের প্রয়োজন শুধু আলোকবর্তিকা হয়ে আপনার দিক-নির্দেশনা। আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।

লেখকঃ রাজনীতিক , সমাজকর্মী।

ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব: একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই



নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

  • Font increase
  • Font Decrease

এর আগের জি-২০-এর সভাপতিত্ব ও অন্যান্য অর্জনের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থা, কিছু দেশের ওপর করের বোঝা কমানো—এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে, যা থেকে নিঃসন্দেহে আমরা লাভবান হবো এবং এগুলোর ওপর ভর করেই আরও মজবুত ভিত্তি তৈরি করব।

আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছি—এখন জি-২০-এর আর কী অগ্রগতি হতে পারে? সামগ্রিকভাবে মানবসভ্যতার উপকারের জন্য একটি মৌলিক মানসিকতার পরিবর্তনকে কি আমরা অনুঘটক বানাতে পারি?

আমার বিশ্বাস—আমরা পারি। পরিস্থিতিই তো আমাদের মানসিকতা তৈরি করে। ইতিহাসজুড়ে মানবসভ্যতার বাস ছিল অভাবের মধ্যে। সীমিত সংস্থানের জন্যই আমরা লড়াই করেছিলাম। আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করত অন্য কেউ সেই সংস্থানের ওপর অধিকার ছাড়ছে কিনা তার ওপর। তখন ভাবনা, আদর্শ এবং ব্যক্তি পরিচয়ের মধ্যে সংঘাত ও প্রতিযোগিতাই ছিল আদর্শ।

দুর্ভাগ্যবশত আজও আমরা সেই একই শূন্য মানসিকতার ফাঁদে আটকে আছি। যখন দেশগুলো ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়ে লড়াই করে, আমরা তখন এর নজির দেখি। এটা লক্ষ করি যে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ত্র। এটাও দেখি, যখন কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত, তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিষেধক মজুত রাখছে।

কেউ কেউ বিরোধিতা করতে পারেন এই বলে যে, সংঘাত ও লোভ মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। আমি একমত নই। মানুষ যদি সহজাতভাবেই স্বার্থপর হতো, তাহলে আমাদের মৌলিক এককত্ব প্রচার করে চলেছে যে বিপুলসংখ্যক পারলৌকিক ঐতিহ্য এবং সেটার যে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন, সেটার ব্যাখ্যা কী?

পঞ্চতত্ত্ব—ভারতে জনপ্রিয় এমন এক মতবাদ, যা বিশ্বাস করে—সব জীবিত সত্তা এমনকি সব নির্জীব পদার্থও মাটি, পানি, আগুন, বাতাস ও স্থান (স্পেস)—এই পাঁচ মৌলিক উপাদানে নির্মিত। শারীরিক, সামাজিক ও পরিবেশগত মঙ্গলের জন্য আমাদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরে ও সবার মধ্যে এ উপাদানগুলোর সমন্বয় অপরিহার্য। ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব এই বিশ্বে একতার ভাবনা প্রচারে কাজ করবে। এ কারণেই আমাদের মূল ভাবনা—‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ।’

এটি শুধু বুলি বা স্লোগান নয়। এটি মানব পরিস্থিতির সাম্প্রতিক যে পরিবর্তন তাতে একটি বিবেচ্য বিষয়, যা আমরা সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।

আজ আমাদের কাছে পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর যথেষ্ট উৎপাদন করার সংস্থান রয়েছে। আমাদের টিকে থাকার জন্য এখন লড়াইয়ের দরকার নেই। আমাদের এ যুগে আর একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই। আজ আমরা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি তা হলো—জলবায়ুর পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও অতিমারি, যার সমাধান যুদ্ধ করে সম্ভব নয়। বরং সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্ভব। সৌভাগ্যবশত, আজকের প্রযুক্তি আমাদের বড় পরিসরে মানবজাতির সমস্যাগুলো মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে।

মানবজাতির ছয় ভাগের এক ভাগ ভারতে। এখানে বসতি, ভাষা, ধর্মগত, প্রথা ও বিশ্বাসগতভাবে প্রচুর বৈচিত্র্য আছে। ভারত হলো বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাচীনতম প্রথাসহ গণতন্ত্রের ডিএনএ প্রদানে ভারতের অবদান রয়েছে। গণতন্ত্রের জননী হিসেবে ভারতের জাতীয় সচেতনতা কঠোর নির্দেশ দিয়ে নয়; বরং লাখো স্বাধীন কণ্ঠের সমন্বয়ে চালিত।

বর্তমানে ভারত একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতির দেশ। আমাদের নাগরিককেন্দ্রিক শাসনের রূপকল্প, আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্যের সৃজনশীল প্রতিভাকে লালন করার পাশাপাশি একেবারে প্রান্তিক নাগরিকদেরও খেয়াল রাখে।

আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের জাতীয় বিকাশের মধ্যে একটি আপাদমস্তক শাসন পরিচালনার অনুশীলন না করে; বরং নাগরিক নেতৃত্বাধীন ‘গণআন্দোলন’ গড়ে তুলতে।

ডিজিটাল পণ্য তৈরির জন্য আমাদের শক্তিশালী প্রযুক্তি রয়েছে, যেগুলো উন্মুক্ত, ব্যাপক। সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্টের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি দিয়েছে এগুলো। যে কারণে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে একটা অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে ভারতের অভিজ্ঞতা।

আমাদের জি-২০ প্রেসিডেন্সি চলাকালে, আমরা ভারতের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও মডেলগুলোকে অন্যদের জন্য, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সম্ভাব্য টেমপ্লেট হিসেবে উপস্থাপন করব। আমাদের জি-২০ অগ্রাধিকারগুলো শুধু শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই গঠিত হবে তা নয়, দক্ষিণের সহযাত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। যাদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই অশ্রুত থাকে। আমাদের অগ্রাধিকারগুলোর নজর কেন্দ্রীভূত থাকবে ‘এক পৃথিবী’র নিরাময় সাধন, ‘এক পরিবার’-এর মধ্যে সম্প্রীতি আনয়ন ও ‘এক ভবিষ্যৎ’-এর প্রতি আশা দেওয়ার দিকে।

আমাদের এই গ্রহটির নিরাময়ের জন্যই আমরা ভারতের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে স্থিতিশীল এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় উৎসাহ জোগাব। মানব পরিবারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রচারের জন্য আমরা খাদ্য, সার ও ওষুধের বৈশ্বিক সরবরাহকে রাজনীতিমুক্ত করব। যাতে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ মানবিক সংকটে পরিণত না হয়। যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা অবশ্যই আমাদের চিন্তাভাবনায় প্রথম সারিতে থাকবে, ঠিক একটা পরিবারের মতোই।

আগামী প্রজন্মের আশাকে অনুপ্রাণিত করতে আমরা ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে একটি সৎ আলোচনা; গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি প্রশমিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তি বৃদ্ধিতেও উৎসাহ জোগাব। ভারতের জি-২০ এজেন্ডা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কর্মভিত্তিক ও সিদ্ধান্তমূলক। আসুন আমরা ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বকে একযোগে নিরাময়, সমন্বয় এবং আশার সভাপতিত্ব হিসেবে তৈরি করি। মানবকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে আসুন আমরা একযোগে কাজ করি।

;

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চলমান কার্যক্রম



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রোহিঙ্গা সমস্যা একটি আঞ্চলিক ইস্যু এবং সময়মত রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিশ্চিত করা না গেলে এই সমস্যা আঞ্চলিক নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলবে বলে চীন আশঙ্কা করছে। চীন এই সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা পালন করছে যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে অনেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন চায় না এবংবিভিন্ন কারণে তারা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছে যে, চীনের মূললক্ষ্য হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা এবং এজন্য চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। চীন দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আগ্রহী এবং দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনই চীনের লক্ষ্য।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৬ নভেম্বর, প্রথমবারের মতো 'মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি' শীর্ষক রেজুলেশনটি সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। জাতিসংঘ সদর দফতরে ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ই ইউ) যৌথভাবে এই রেজুলেশনটি চালু করেছে।এই বছরের রেজুলিউশনটি ১০৯টি দেশ স্পন্সর করেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। রেজুলিউশনটি রোহিঙ্গাসহ ও মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করে। এতে রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতসহ জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই রেজুলেশনে মিয়ানমারে নবনিযুক্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতকে স্বাগত জানিয়ে মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করে তার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে মিয়ানমার, ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপির মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারকটির পুনঃনবায়ন পূর্বক সেটার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্যবলা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সৃষ্টি করেছে যা কখনোই কাম্য ছিল না। ওআইসি ও ই ইউ এই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যুতে সর্বাত্মক সহযোগিতার পাশাপাশি নেতৃস্থানীয় ভুমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে বিধায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দ্রুত কার্যকর করা যাচ্ছে না। এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করতে প্রস্তাবটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থনের জন্য স্পেনকে অনুরোধ করেছে। স্পেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের নেয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করে এই সংকট মোকাবেলায় সম্মিলিত আন্তর্জাতিক প্রয়াসের গুরুত্বের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে এ সংক্রান্ত তথ্য বিস্তারিতভাবে যাচাই করে এই মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানায়।

জাপানের রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গাদেরকে সহায়তা দানে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক পদক্ষেপের প্রশংসা করে। রোহিঙ্গা সমস্যাসহ যেকোনো দুর্যোগে জাপান সরকার বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেয়।মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাপান বাংলাদেশকে সমর্থন করে বলে জানিয়েছেন জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তাকেই শুনসুকে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে এবং প্রতিবছর ক্যাম্পে নতুন শিশুর জন্মের ফলে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক ও অস্ত্রপাচারের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রমিয়ানমারের ভেতরে ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দানকারী গোষ্ঠীর জন্য ১৭০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মানবিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে চলমান কর্মসূচিগুলোর জন্য প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলার দেয়া হবে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে মিয়ানমারে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে বেঁচে যাওয়া ৯ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গার জীবনরক্ষামূলক উদ্যোগ এবং বাংলাদেশে তাদেরকে আশ্রয়দানকারী ৫ লাখ ৪০ হাজার সদস্যের জন্য সহায়তাদেয়া হবে। এই নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট সহায়তার পরিমান প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই সহায়তার মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ৯৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি এবং ইউএসএআইডির মাধ্যমে ৭৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ করেছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রএই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকার, রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরের জনগণের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

ই ইউ ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য ৩ মিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ই ইউ রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে যা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ ই ইউ’র কাছে এই মানবিক সাহায্য কার্যক্রম চালানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের সব ধরনের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে সহিংসতা ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডস মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও কক্সবাজার জেলায় তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে আইওএম রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী গোষ্ঠীগুলোর জন্য জীবন রক্ষাকারী সহায়তা দেবে যা উভয় সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ও দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে চলমান মামলা পরিচালনায় ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আইসিজেতে মামলা পরিচালনার জন্য স্বেচ্ছাসেবী তহবিলে এরই মধ্যে পাঁচ লাখ ডলার দিয়েছেএবং আরও দুই লাখ ডলার দিচ্ছে। এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশে অবস্থানরত ১২ লাখ রোহিঙ্গার সহায়তার পাশাপাশি নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদেরএকাংশকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গাম্বিয়ার দায়ের করা এ মামলার প্রতি সবার পূর্ণ সংহতি, সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন।বাংলাদেশ, রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার জন্য আইনি সহায়তা প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার এবং মানবতার উন্নতির জন্য দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায়।

রোহিঙ্গাইস্যুতেফিনল্যান্ডবাংলাদেশেরপাশেথাকবেবলেজানিয়েছে। ফিনল্যান্ডরোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেছে। যুক্তরাজ্য রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তারঅঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে সৌদি আরবের অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেছে বাংলাদেশ।বর্তমানে এই এই সংকটের কারনে সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সৌদি আরবকে অবহিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়াসহ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবগুলো হলোঃ রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান, আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এবং মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে আইসিজেতে গাম্বিয়াকে সমর্থন ও আদালতের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সহায়তা করা।জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত দমন-পীড়ন বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। আসিয়ানের পাঁচ-দফা ঐক্যমত মেনে চলার অঙ্গীকার পূরণে মিয়ানমারকে দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানানো। মিয়ানমার যাতে বাধাহীন মানবিক প্রবেশাধিকারে রাজি হয় সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শক্তিশালী মানবিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এই চলমান সংকট নিরসন হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সংহতির আহ্বান জানায়।

গত ২৩ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় বিজিপি ও বিজিবি মহাপরিচালক পর্যায়ের অষ্টম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।সম্মেলন ও সম্মেলনের বাইরে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বিজিবি।দুই বাহিনী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার বিষয়েও একমত হয় এবং বাংলাদেশ এই প্রেক্ষিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বিষয়টিতে গুরুত্ব আরোপ করে। সীমান্তের দুই পাশের অপরাধী চক্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবস্থান চিহ্নিত হলে তাদের অপতৎপরতা রোধে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানসহ একে অপরকে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে।দুই দেশের মধ্যে খেলাধুলা, প্রশিক্ষণ কর্মকাণ্ড বিনিময় এবং বিজিবি ও বিজিপির মধ্যে শুভেচ্ছা সফরসহ আস্থা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণে সম্মত হয়েছে উভয়পক্ষ, যা আশাব্যঞ্জক।

চলমান এই সমস্যা মোকাবেলায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র, ই ইউ এবং নেদারল্যান্ডসের অর্থায়ন এ ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর পাঁচটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চুক্তি ও বহুমুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দু’দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক উভয়ের মধ্যেকার মতপার্থক্য দূর করে শান্তিপূর্ণ সহবস্থান ও আস্থার জায়গা তৈরি করবে। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করে এর ফলপ্রসূ সমাধানের জন্য তাদের সহযোগিতার চলমান রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।বাংলাদেশ এই সংকট সমাধানে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরও আন্তরিক ও সক্রিয় হলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান আলোর মুখ দেখবে।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

;

ভূমিকা চাপ ও উত্তরণের উপায়



মো. বজলুর রশিদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

 

একজন ব্যক্তির মধ্যে ভূমিকা চাপ (Role Strain) অনুভূত হয় তখনই যখন সে প্রত্যাশিত সামাজিক ভূমিকা পালনে সমস্যার সম্মুখীন হন। একজন ব্যক্তি ভূমিকার চাপ ও দ্বন্দ্ব উভয়ই অনুভব করতে পারে যখন একাধিক ভূমিকা পালনে তার প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি থাকে। ভূমিকার চাপকে আধুনিক সমাজে একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা বলে মনে করা হয়, এবং ব্যক্তি ভূমিকার চাপের সাথে মানিয়ে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে।

কেউ যখন সামাজিক ভূমিকার বাধ্যবাধকতাগুলি পালনে চাপ অনুভব করেন তখন সমাজবিজ্ঞানীরা এটিকে ভূমিকা চাপ বা Role Strain বলে অভিহিত করেন। ভূমিকার চাপ আসলে খুব সাধারণ। কারণ আমরা প্রায়শই পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করতে গিয়ে একাধিক ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রও এটি প্রত্যাশা করে। ফলে একই সাথে আমাদের আচরণের ভিন্নতাও দেখা দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নানা ধরনের ভূমিকার চাপ রয়েছে, পাশাপাশি তা মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার একটি উপাদান হিসাবে ভূমিকা চাপকে দেখা হয়। যদিও গবেষকরা ব্যক্তির ভূমিকাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তথাপি ভূমিকা সম্পর্কে চিন্তা করার একটি উপায় হল একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্যক্তি কীভাবে আচরণ করে। আমাদের প্রত্যেকেরই অসংখ্য ভূমিকা রয়েছে যা আমরা পালন করি (যেমন মা- বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়, ছাত্র-ছাত্রী, বন্ধু, নেতা, কর্মকর্তা, কর্মচারী, ইত্যাদি)। এবং এইসকল ভূমিকা পালনে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ তার উপর নির্ভর করে আমরা ভিন্নভাবে আচরণ করি। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে তার বন্ধুদের ক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করেন তার চেয়ে ভিন্নভাবে আচরণ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ প্রতিটি ভূমিকা (কর্মচারী বনাম বন্ধু) আচরণের একটি ভিন্ন ধরন নির্দেশ করে। এবং ব্যক্তি সে অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম গুডের মতে, এই ভূমিকাগুলি পূরণ করার চেষ্টা করার ফলে ভূমিকা চাপ বা স্ট্রেন হতে পারে, যাকে তিনি "ভুমিকা পালনের দায়বদ্ধতা পূরণে অনুভূত অসুবিধা" হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন। যেহেতু আমরা প্রায়শই বিভিন্ন সামাজিক ভূমিকায় নিজেকে খুঁজে পাই, গুড পরামর্শ দিয়েছেন যে ভূমিকার চাপ অনুভব করা আসলে স্বাভাবিক এবং সাধারণ।

গুড পরামর্শ দিয়েছেন এই ভূমিকার চাহিদা পূরণের জন্য লোকেরা বিভিন্ন ধরনের ট্রেড-অফ এবং দর কষাকষির প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে, যেখানে তারা তাদের ভূমিকাগুলি সর্বোত্তম উপায়ে পূরণ করার চেষ্টা করে। এই ট্রেড-অফগুলি বিভিন্ন কারণের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়, যেমন ভূমিকায় আমাদের জন্য সমাজের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়ে আমরা কতটা যত্নশীল (সমাজের "আদর্শ প্রতিশ্রুতি"র স্তর), কীভাবে আমরা মনে করি যদি আমরা আদর্শ প্রতিশ্রুতি পূরণ না করি তাহলে অন্য ব্যক্তি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।  নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের জন্য সাধারণ সামাজিক চাপে কিভাবে তৈরি হয় সেটাও আমাদের দেখতে হয়।

অপরপক্ষে, ভূমিকা চাপের সাথে সম্পর্কিত ভূমিকার সংঘাত ঘটে যখন, ব্যক্তির সামাজিক ভূমিকার কারণে, ব্যক্তি একের অধিক ভূমিকা পালনের মুখোমুখি হয় যা পারস্পরিক একচেটিয়াভাবে একই সময়ে সম্পাদন করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।  উদাহরণ স্বরূপ, যদি একজন ঘুম-বঞ্চিত নতুন অভিভাবক সন্তান ধারণের চ্যালেঞ্জগুলো নেভিগেট করার সময় মানসিক চাপ অনুভব করেন তাহলে ভূমিকার চাপ হতে পারে। ভূমিকার সংঘাত ঘটতে পারে যদি একজন কর্মজীবী ​​পিতামাতাকে একই সময়ে নির্ধারিত একটি শিক্ষক-অভিভাবক মিটিং এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মিটিং এর মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়।

ভূমিকা চাপের আরও উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যেমন একজন ছাত্র পরীক্ষার জন্য অধ্যয়ন করার চেষ্টা করছে (একজন ছাত্রের ভূমিকা), ক্যাম্পাসের চাকরিতে কাজ করছে (একজন কর্মচারীর ভূমিকা), একটি ছাত্র সংগঠনের জন্য মিটিং পরিকল্পনা করছে (একটি গ্রুপ লিডারের ভূমিকা), এবং একটি ক্রিকেট বা ফুটবল দলের খেলায় অংশগ্রহণ করছে (একটি ক্রীড়া দলের সদস্যের ভূমিকা), ইত্যাদি।

গুডের মতে, বিভিন্ন উপায়ে ব্যক্তি একাধিক সামাজিক ভূমিকা নেভিগেট করার মাধ্যমে চাপ কমানোর চেষ্টা করতে পারে:

কম্পার্টমেন্টালাইজিং: ব্যক্তি দুটি ভিন্ন ভূমিকার মধ্যে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে চিন্তা না করার চেষ্টা করতে পারে।

অন্যদের অর্পণ করা: ব্যক্তি হয়তো অন্য কাউকে খুঁজে পেতে পারে যে তার কিছু দায়িত্বে সাহায্য করতে পারে; উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যস্ত পিতামাতা তাদের সহায়তা করার জন্য একজন গৃহকর্মী বা শিশু যত্ন প্রদানকারীকে নিয়োগ করতে পারেন।

একটি ভূমিকা ছেড়ে দেওয়া: কেউ সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে একটি বিশেষভাবে কঠিন ভূমিকা অপরিহার্য নয় এবং ভূমিকাটি ছেড়ে দিতে পারে বা কম চাহিদা সম্পন্ন একটিতে স্যুইচ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাউকে যদি দীর্ঘসময় ধরে কোন কাজ করতে হয় তাহলে সে ওই কাজটি ছেড়ে দিয়ে অন্য একটি কাজ নিতে পারে যা তার পারিবারিক ও কর্ম-জীবনের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।

একটি নতুন ভূমিকা গ্রহণ: কখনও কখনও, একটি নতুন বা ভিন্ন ভূমিকা নেওয়া ভূমিকার চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রে একটি পদোন্নতি নতুন দায়িত্ব তৈরি করতে পারে এবং সেইসাথে নিচের স্তরের দায়িত্বের জবাবদিহিতা কমাতে পারে।

একটি ভূমিকায় কাজ করার সময় অপ্রয়োজনীয় বাধা এড়ানো: একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় ব্যক্তি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারে এবং অন্যদেরকে সেসময় তার কাজে বিঘ্ন যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে অন্যদেরকে অবহিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোন ব্যক্তি একটি বড় প্রকল্পে কাজ করেন তখন সে বিষয়েই বেশি ফোকাস করবেন এবং অন্যদের বলতে পারে যে সে এই সময় পর্যন্ত ব্যস্ত থাকবেন।

যদিও ব্যক্তি ভূমিকা চাপ ও ভূমিকা দ্বন্দ্ব এড়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন তথাপি আধুনিক নগর জীবনে এখন অনেকেই ভূমিকা চাপের স্বীকার হচ্ছেন। কেউ কেউ হয়ত সফলভাবে সেগুলো ম্যানেজ করতে পারছেন। আবার অনেকেই পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে ভূমিকা চাপ কমানোর জন্য ব্যক্তি পর্যায়ে কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা রাখা দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সমাজ সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন ক্রমান্বয়ে জটিল হচ্ছে। আর এই জটিলতায় তৈরি হচ্ছে ভূমিকা চাপ ও ভূমিকা দ্বন্দ্ব। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এখন যে কথাবার্তা হচ্ছে তা ভূমিকা চাপ ও ভূমিকা দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতি বলে অনেকের ধারণা। সুতরাং এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন।

মো. বজলুর রশিদ: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

;

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর “আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস” হিসাবে পালন করা হয়। নারীর প্রতি যে কোনো ধরনের সহিংসতার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে সর্বস্তরের মানুষকে উৎসাহিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি পালন করা হয়। ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯ তারিখে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ নভেম্বরকে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে ঘোষণা করে।

২৫ নভেম্বর, ১৯৬০-এ, ল্যাটিন আমেরিকার ডোমিনিকান রিপাবলিকের স্বৈরশাসক রাফায়েল ক্রুজিলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সময় তিন বোন, প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা এবং মিনার্ভা মিরাকল শাসকদের দ্বারা নিহত হন। এই হত্যার প্রতিবাদে, ১৯৮১ সালে, লাতিন আমেরিকার একটি মহিলা সম্মেলনে ২৫ নভেম্বরকে নারী সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৩ সালে, ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকার সম্মেলনে ২৫ নভেম্বরকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

কিন্তু জাতিসংঘ দিবসটিকে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। অবশেষে, ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৯ তারিখে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৫ নভেম্বরকে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী এবং সমাজের উন্নয়নে তাদের অবস্থান অনস্বীকার্য। কিন্তু তারপরও নারীরা শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকারের দিক থেকে পুরুষের সমান নয়। পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে, সভ্যতা গড়ে উঠছে। বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনধারা। কিন্তু বাস্তবতা হলো নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি তিন জনের একজন নারী তার জীবনের কোনো না কোনো সময় শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে দুজন তাদের স্বামী বা বন্ধু বা বিপরীত লিঙ্গের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। নির্যাতনের শিকার নারীদের অধিকাংশই নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রকাশ্য লজ্জার ভয়ে মুখ খোলে না।

নারীর প্রতি সহিংসতা সমতা, উন্নয়ন, শান্তি অর্জনের পাশাপাশি নারী ও কন্যাদের মানবাধিকার বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) প্রতিশ্রুতি -কাউকে পিছিয়ে না রাখার - নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ না করে পূরণ করা যাবে না। এ দিন থেকেই শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষেরও। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত পৃথিবীর দেশে দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ পক্ষ পালিত হবে।

বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যেগে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করবে। এ বছর দিবসটির থিম বা প্রতিপাদ্য হল “একত্রিত হও! নারী ও কন্যাদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে সক্রিয়তা!” (UNITE! Activism to End Violence against Women & Girls).

নারীর প্রতি সহিংসতা একটি প্রধান সামাজিক সমস্যা। বিভিন্ন উপায়ে ও আকারে প্রতিনিয়তই এটি বাড়ছে। এটি একটি দুঃখজনক সত্য যে এই ধরনের সহিংসতার কারণে প্রতি বছর অসংখ্য নারী নিহত হচ্ছেন। কারণ তারা খোলাখুলি কথা বলতে পারে না, বা তাদেরকে কথা বলতে দেওয়া হয় না। নির্যাতনের পরও তাদের চাপের মধ্যে থাকতে হয়।

দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অশিক্ষাসহ নানা কারণে নারীরা নির্যাতিত হয়। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে অনেক নারীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয়ে বিদ্যমান আইনগুলি পর্যাপ্তভাবে প্রয়োগ করা হয় না। তাছাড়া সাধারণ মানুষ এসব আইন সম্পর্কে অবগত নয়।

নারীর প্রতি সহিংসতার আরেকটি কারণ তাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব। নারীরা নিজ পরিবারেও নির্যাতিত হচ্ছেন এবং পরিবারের বাইরেও নির্যাতিত হতে হচ্ছে। অনেক নারী চাইলেও তাদের পরিবারের কাছে সহিংসতার কথা বলতে পারে না। দেখা যায়, অনেক সময় নির্যাতিত নারীকে দায়ী করে পরিবার। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় সহিংসতার শিকার অনেক নারী চাইলেও আইনি আশ্রয় নিতে পারে না। পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে এসব নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন অনেক নারী।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সদ্য প্রকাশিত এক জরিপ দেখায় যে ২০২১ সালে ৮১০ টি ধর্ষণ, ২২৫টি সংগঠিত ধর্ষণ, ১৯২টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৯৬টি শ্লীলতাহানি ও যৌন হয়রানির ঘটনা এবং ১১৪টি যৌতুক সংক্রান্ত ঘটনা ও মামলা সংঘটিত হয়েছে। বিগত বছরের মতো এ বছরও ধর্ষণের শিকার নারী (১৮ বছরের ওপরে) এবং কন্যাশিশু (১৮ বছরের নিচে) সংখ্যা বেশি এবং নারীদের তুলনায় কন্যাশিশুরা বেশি ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

অন্যদিকে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী ১৮, ১১ এবং ৩১ শতাংশ কন্যাশিশু যথাক্রমে ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা এবং গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সী ২২ শতাংশ কন্যা শিশুরা শ্লীলতাহানি এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সী মহিলারা সাধারণত যৌতুকের ক্ষেত্রে বেশি সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং এই হার ২২ শতাংশ। মেয়েদের মধ্যে ষষ্ঠ-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই হার ধর্ষণের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ, গণধর্ষণের জন্য ৫২ শতাংশ এবং শ্লীলতাহানির জন্য ৬৭ শতাংশ।

কর্মজীবী নারীদের তুলনায় গৃহিণীরাই বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যৌতুকের জন্য ৮৩ শতাংশ,ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, উত্ত্যক্তকরণ, ধর্ষণের চেষ্টায় যথাক্রমে ৩৬ শতাংশ, ৩৭ শতাংশ, ১৭ শতাংশ এবং ৪৬ শতাংশ গৃহিণী নির্যাতনের শিকার হন। এই গবেষণায় ১৮ বছরের কম বয়স্কদের কন্যা এবং ১৮ বছরের বেশি বয়স্কদের নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও উক্ত প্রতিবেদনে নারী নির্যাতনের বিভিন্ন ধরন ও সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, অক্টোবরে দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ৩৬৮টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ধর্ষণের ৬১টি ঘটনা রয়েছে। চলতি মাসে ৪ শিশু, ২২ কিশোরী ও ৪৫ জন নারীসহ ৭১ জন আত্মহত্যা করেছেন। অপহরণ করা হয়েছে চার শিশু-কিশোর ও এক নারীকে। অন্যদিকে নিখোঁজ রয়েছে ১ শিশু, ৭ কিশোরী ও ৩ নারী। এছাড়াও, ১৪ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুসহ ৮৯ শিশু, কিশোরী ও মহিলা নিহত
হয়েছে।

উপরোক্ত তথ্যগুলো বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সম্ভব। প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত সভা, সেমিনার এবং কর্মশালার আয়োজন করে জনমত গড়ে তোলা সম্ভব । তাছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা বিশেষ করে শিশুদের ওপর প্রভাব সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার পদক্ষেপ নিতে হবে। সুশীল সমাজ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য সচেতন ব্যক্তিদের উচিত নারীর প্রতি সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এনজিওগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে পথনাটক, বিকল্প মাধ্যম এবং গণশিক্ষা প্রচার/প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করতে পারে।

সরকারি, বেসরকারি এবং অন্যান্য সুশীল সমাজ সংস্থার উচিত নারীর মানবাধিকার ও শিক্ষার উপর জোর দেওয়া। সহিংসতার শিকারদের যথাযথভাবে আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং অতিরিক্ত সহায়তা পেতে সহায়তা করা। নারীদের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে পুরুষদের জন্য কাউন্সেলিং ও শিক্ষা সেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। টেলিভিশন মিডিয়ার মাধ্যমে স্টিরিওটাইপ সম্পর্কের পরিবর্তে নারী-পুরুষের মধ্যে

ভারসাম্যপূর্ণ ও সুস্থ সম্পর্ক সম্প্রচার করতে হবে। যৌতুক নিরোধ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েদেরকে জীবন দক্ষতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে তারা দাম্পত্য জীবনে নিজেদের বাঁচাতে পারে।

নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পরিবারে ও সমাজে পুরুষ সদস্যদের মানসিকতা ও আচরণ পরিবর্তনের জন্য যথাযথ কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং পরিষেবা প্রদানকারীদের ভিকটিমের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া উচিত।

সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের মানসিকতা এবং আচরণ পরিবর্তনের জন্য একটি ব্যাপক অ্যাডভোকেসি প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের ঘোষণাপত্র এবং নির্বাচনী ইশতিহারে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারি, বেসরকারি ও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জোট গঠন করা।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী `সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা' গড়ে তোলা অপরিহার্য। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে যৌন হয়রানি এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অবহিত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে অনলাইন হয়রানির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অনলাইন হয়রানির বিষয়ে অভিযোগ দায়ের সহজ এবং আরও বেশি নারী-বান্ধব করা অপরিহার্য। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশুদের প্রতি অনলাইন সহিংসতা প্রতিরোধে একাধিক প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে একটি প্ল্যাটফর্ম নির্দিষ্ট করা উচিত। অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা এড়াতে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন।

এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে উপরোক্ত উদ্যোগগুলো নিতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পারে। এর মাধ্যমে নারীরা সহিংসতার প্রতিকার পাবে। হিংসামুক্ত সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে। তাই নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ও নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;