একচোখা সমাজে অনিশ্চয়তায় যে শিশু



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শাকিব খান ও শবনম বুবলি নিয়ে ব্যস্ত গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম। নানা রকমের ইঙ্গিতবহ সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আলোচনায় আসছে আরও অনেকের নাম। এসবের যতটা না সংবাদ, তার চেয়ে বেশি গল্প। সামাজিক মাধ্যমে যেহেতু ব্যবহারকারীরা নিজেই সর্বেসর্বা; সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই নেই নিয়ন্ত্রণ। গণমাধ্যমে প্রতিবেদক, সম্পাদকের আলাদা জায়গা রয়েছে, রয়েছে পৃথক সম্পাদনা নীতি, দায়বদ্ধতা; কিন্তু সেখানেও প্রকাশিত নিয়ন্ত্রণহীনতা। জোয়ারে ভেসে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা, কে কার আগে কীভাবে পাঠক ধরতে পারে সে প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। এর ফাঁকে যে শিশু নিপীড়ন হচ্ছে সে কথা কে বলবে তাদের, সে কথা কে শোনাবে তাদের!

নিপীড়ন মানে দৈহিক ও মানসিক নির্যাতন; এখানে সীমিত থাকতে চলবে না। ছোট্ট অবুঝ একটা শিশু সন্তানের ছবি প্রকাশ করে একটা ভবিষ্যৎ যে আমরা অনিশ্চিত করে দিচ্ছি সে চিন্তার সময় বোধহয় আমাদের কারো নেই। তাই শিশুর ছবি প্রকাশে বেপরোয়া বেশিরভাগই। সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে যখনই শাকিব খান ও শবনম বুবলির আড়াই বছরের শিশু সন্তানের মুখ ভাসছে তখন একটা করুণ ভবিষ্যতের ছবি সামনে আসছে। একটা মায়াবি মুখের ভবিষ্যৎ কীভাবে অনিশ্চিত হতে যাচ্ছে সে চিন্তাই করছি এখন।

শেহজাদ খান বীর, শাকিব-বুবলির সন্তান। আড়াই বছর পর দুজন সামাজিক মাধ্যমে পৃথক পোস্ট দিয়ে সে তথ্য জানিয়েছেন। এরআগে বুবলি তার বেবি বাম্পের ছবি প্রকাশের পর সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছিল এই সন্তানের বাবা শাকিব খান।

এরআগে, অপু বিশ্বাসের একটা পুত্র সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে অনেক জল ঘোলা করে স্বীকার করেছিলেন শাকিব। অপু কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাইভে এসে তার সন্তানের কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় সন্তানের বয়স ছিল ছয় বছর। বুবলিকে অবশ্য কেঁদে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হয়নি, জায়গায়-জায়গায় ধর্না দিতে হয়নি; তার আগেই মিলেছে পুত্রের স্বীকৃতি। এখানে শাকিব খান পুত্রের স্বীকৃতি দিতে গড়িমসি না করলেও তিনি যে সৎ বাবা, সৎ স্বামী, সর্বোপরি সৎ মানুষ নন সেটা বলাই বাহুল্য।

আব্রাহাম খান ও শেহজাদ খান পিতৃপরিচয় পেয়েছে। তবে তারা অন্যদের মতো কি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠার পরিবেশ পাবে? এ সমাজ কি এটা মেনে নিতে প্রস্তুত? মনে হয় না। তারা যখন বড় হতে থাকবে, যখন তারা বুঝতে শুরু করবে তখন সমাজের অঙুলিগুলো তাদের দিকেই আসতে থাকবে। মায়ের চরিত্রহনন থেকে শুরু করে তাদের নিজেদের চরিত্র নিয়ে নানা কথা ভাসতে থাকবে সমাজে, এমনকি তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। অথচ এমন পরিস্থিতির জন্যে তারা মোটেও দায়ী নয়। অন্য সবার মতো পৃথিবীতে তারা নিজেদের ইচ্ছায় আসেনি। তবু তাদেরকে সইতে হবে সামাজিক এই একচোখা নীতির চাপ!

আমাদের দেশে ভিকটিম নারী ও শিশুর ছবি প্রকাশে আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। এটা যদিও সীমিত আকারে, আইনি প্রতিবিধানের পর্যায়ে। তবে সামগ্রিকভাবে শিশুর নিরাপত্তায় আইন ও আইনের প্রকাশ নাই দেশে। আজকের এই আব্রাহাম কিংবা শেহজাদ বুঝতে শেখার পর তাদেরকে নিয়ে বিগত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যে ইঙ্গিতবহ সংবাদ ও কথাবার্তা তার প্রতিবিধান কীভাবে চাইবে আইনের কাছে? এই বয়সে তারা মানহানি বিষয়ে জানে না, কিন্তু যখন এটা জানবে-বুঝতে পারবে তখন এই মানহানির জন্যে, তাদের ছবি বিনা-অনুমতিতে প্রকাশের কারণে কি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। অবশ্য শিশুরা যতক্ষণ শিশু ততক্ষণ তাদের নিজেদের নিয়েও সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নাই, তাই অদ্যকার এই পরিস্থিতির প্রতিবিধান কীভাবে হবে?

আমাদের দেশে এ সংক্রান্ত আইন নেই। দ্য টেলিগ্রাফের একটা প্রতিবেদনে ফ্রান্সে এ সংক্রান্ত একটা আইন থাকার কথা জেনেছিলাম। ওই আইনের অধীনে শিশুর প্রাইভেসি লঙ্ঘনের দায়ে পিতা-মাতার এক বছর পর্যন্ত জেল এবং ৪৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কয়েক বছরের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করা শিশুকালের তাদের ছবি প্রকাশের কারণে পিতামাতার বিরুদ্ধে মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবিও করতে পারে। দেশটিতে এই আইন থাকার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এসব শিশুর ছবি নানা অপরাধীদের কাছে চলে যেতে পারে, এবং অপরাধের কাজে সেগুলো ব্যবহৃত হতেও পারে।

পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন আইন আছে কি-না এখনই বলতে পারছি না। এটা মনে পড়েছে কেবল ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে গিয়ে চোখে পড়ায় এবং চলমান বাস্তবতার কারণে। কারণ ওই একই, শাকিব-বুবলির সন্তান শেহজাদ খান বীর, যা ছবি ভাইরাল সামাজিক মাধ্যমে। এই ছবি তার মা-বাবাও প্রকাশ করেছেন। তারা প্রকাশ করেছেন সন্তানের পিতৃত্বের দাবি ও স্বীকৃতি প্রসঙ্গে। তবে আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের কারণে এখানে পোডোফাইলের যে বিপদ সংকেত সেটা কীভাবে আগ্রাহ্য করি, যেখানে সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই আসে নানা খবর। বলতে দ্বিধা নেই, এটা অনলাইনে যেমন আছে, তেমনি আছে অফলাইনেও। এছাড়া এই বিপদের সঙ্গে আছে শিশুর প্রাইভেসি, যা এখনই হয়তো সে অনুধাবন করতে পারছে না, কিন্তু যখন পারবে তখন কী মানসিক অবস্থা হবে তার; ভাবা যায়!

আমাদের সমাজ ভিকটিমকে দায় দিতে আগ্রহী। নিপীড়নের ওপর আরেকদফা নিপীড়ন। এই মানসিকতা সর্বক্ষেত্রে। সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের অনেকেই আবার এসবে যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেখান তাতে অনেকের আবার লুঙ্গি খোলার অবস্থা! আক্রমণাত্মক সেই সব ব্যবহারকারীদের কারণে অনেক সময় নৈতিকতার পরাজয় দেখি আমরা। দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনোদন জগতের বাসিন্দাদের পারিবারিক সমস্যার এই প্রসঙ্গ আমাদেরকে অনলাইনে শিশু-নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে গভীর ভাবনার দাবি রাখে।

এখানে কে দোষী, কে নির্দোষ সে তর্ক-বিতর্কে জড়ানোর উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য একটাই শিশুর প্রাইভেসি-নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা। এ সংক্রান্ত কোনো আইন থাকলে সে আইনের বহুল প্রচারের দাবি করি, আর আইন না থাকলে এনিয়ে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথাই বলি! এই একচোখা সমাজে আমরা শিশুর অনিশ্চিত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নয়, সার্বিক নিরাপত্তার দাবি করি।

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

বাংলায় রায়: এখনও ‘প্রতীকী’ কেন হবে?



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে বাংলা ভাষায় রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাষার মাসের শুরুর দিনে এই রায় ঘোষণা করেছেন বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায় ঘোষণার সময়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি নাইমা হায়দার বলেছেন, ‘আজ ১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস আজ থেকে শুরু। ভাষা শহিদদের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজকের প্রথম রায়টি বাংলায় ঘোষণা করছি।’

দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে রায় ও আদেশ অধিকাংশ বাংলায় দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতে প্রাধান্য পায় ইংরেজিই। আইনি প্রতিশব্দের বেশিরভাগই বাংলায় না থাকা এর অন্যতম কারণের পাশাপাশি আছে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ব্যাপারও। তাই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ আদালতে রায়ের প্রধান ভাষা বাংলা হতে পারেনি। কিংবা এই দিকটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই বাংলায় দেওয়া যেকোনো রায়কে এখনও প্রতীকী হিসেবে দেখতে হচ্ছে। আজকের এই রায়ও তাই। তবে উচ্চ আদালতে এটাই প্রথম বাংলায় দেওয়া রায় নয়, এরআগে অতিব গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো মামলার রায় বাংলায় দিয়েছেন বেশ ক’জন বিচারপতিরা।

ভাষার প্রচলন নিয়ে আইনও আছে দেশে। কিন্তু এই আইন সকল জায়গায় সমানভাবে কার্যকর কিনা এনিয়ে প্রশ্ন আছে। বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ‘প্রবর্তন ও কার্যকরী’ অংশের ৩(১) বলছে, “এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে.” এবং (২) “৩(১) উপ-ধারায় উল্লেখিত কোন কর্ম স্থলে যদি কোন ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।”

আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে একটি রিটও হয়েছিল হাইকোর্টে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দের সেই রিটের প্রেক্ষিতে রুল জারি করা হলেও এখনও ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। ফলে এনিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি উচ্চ আদালত থেকে। এদিকে, সংবিধান যখন বলছে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা, যখন বাংলা ভাষা প্রচলন নিয়ে একটা আইন আছে দেশে তখন কি উচ্চ আদালত এটাকে এড়িয়ে যেতে পারেন? এখানে বাংলায় আইনের প্রতিশব্দের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা আসতে পারে, কথা আসতে পারে সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতিরা স্বাধীন এই কথাও তবে উচ্চ আদালত নিশ্চয়ই সংবিধান ও দেশের আইনের বাইরে নয়।

বিচারপতিরা স্বাধীন, এই যুক্তিতে তারা সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রভাষার বাইরে থাকতে পারেন? এখানে রাষ্ট্রভাষা, সরকারের ভাষা বা নির্বাহী ভাষা, আদালতের ভাষা হিসেবে ভাষার প্রকারভেদ নিয়ে যে কথা সামনে আসে সেটা কতখানি যৌক্তিক? প্রশ্ন আমাদের।

বাংলাবান্ধব বিচারব্যবস্থা গড়তে সমস্যা কোথায়? রাষ্ট্রভাষা বাংলার দেশে ইংরেজিতে দেওয়া রায় কতজনইবা বুঝতে পারেন, ক’জন বিচারপ্রার্থী বুঝতে পারেন? অথচ আদালতের এই রায় বিচারপ্রার্থীদের জন্যেই। মানুষ আদালতে আসেন আইনি প্রতিকার পেতে। যারা আসছেন তাদের কাছে অবোধগম্য ভাষায় রায়-আদেশ দেওয়া হলে সেখান থেকে বিনাভোগান্তিতে কীভাবে তারা উপকৃত হবেন?

ইংরেজি ভাষার আন্তর্জাতিক উপযোগিতা রয়েছে। উচ্চ আদালতের অনেক রায় অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত ছাড়িয়ে দেশে-দেশে উদাহরণ হয়, এটাও স্বীকৃত। তবে বিচারপ্রার্থীদের কাছে কতখানি বোধগম্য এবং সেখান থেকে কতখানি উপকৃত হলো তারা সেটাও নিশ্চয়ই কম জরুরি নয়। বাংলাকে অগ্রাহ্য করে কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে এখানে ভিন ভাষায় দেওয়া রায়গুলো বিচারপ্রার্থীর কাছে বোধগম্য হচ্ছে কিনা সেটাও দেখা কি জরুরি নয়?

ইংরেজিতে দেওয়া রায় দীর্ঘদিনের অনুশীলন। এটা যতখানি আন্তর্জাতিক রূপের তারচেয়ে বেশি ঔপনিবেশিক আমলের ধারা বলেই ধারণা। বেশিরভাগ আইন ও আইনের প্রতিশব্দ বাংলায় নেই এটা একটা কারণ হতে পারে, তবে এই ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। এনিয়ে যে কাজ হয়নি তাও না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের সকল রায় বাংলায় রূপান্তরের জন্যে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু হয়েছে। এরআগে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন কমিশন বাংলা ভাষা প্রচলন আইন ১৯৮৭ বাস্তবায়নে কতিপয় সুপারিশমালা পেশ করেছে। কমিশন উচ্চ আদালতসহ সব আদালতের বিচারকার্যে বাংলাভাষা চালু করার সুবিধার্থে ইংরেজিতে রচিত বিদ্যমান আইনগুলো বাংলায় অনুবাদের সুপারিশ করে। এটা সম্ভবত বিবিধ কার্যাবলী শেষে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে।

আজ ভাষা শহিদদের সম্মানের হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বাংলায় যে রায় দিয়েছেন সেটাকে প্রতীকী হিসেবে এখনও দেখতে হচ্ছে আমাদের। অথচ এমনটা হওয়া উচিত হবে না। বাংলায়ই হোক সকল রায়। যে সকল বিচারপতি ইতোমধ্যে কিছু রায় বাংলায় দিয়েছেন তারা এ ক্ষেত্রে হতে পারেন অনুকরণীয়। বিবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলা ভাষাতেই রায় দেওয়া সম্ভব বলে তারা প্রমাণ করেছেন।

সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন কেবল সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন এবং গৎবাঁধা বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সত্যিকার অর্থে এর যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হইবে বাংলা” যখন সংবিধান দিচ্ছে এ ঘোষণা তখন দেশের সকল আদালতও এর আওতায় আসতে হবে। আদালতকে এর বাইরে রাখা কিংবা রাখতে চেষ্টা করা সমীচীন হবে না!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপিকে কী বার্তা আওয়ামী লীগের?



কবির য়াহমদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় অনেক কিছুর জন্ম দিয়ে গণমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে এই জেলার নাম। এবারও এসেছে এই নাম, তবে ঘটনা রাজনৈতিক। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপি সাবেক এক নেতার সৌজন্যে ঐক্য ফিরেছে যেন আওয়ামী লীগে। বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যের হয়ে একাট্টা হয়ে নেমেছে প্রচারণায়। আওয়ামী লীগও নিজেদের দলের প্রার্থী না দিয়ে বিএনপি থেকে পদত্যাগী ও বহিষ্কৃত সাবেক সংসদ সদস্য উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার বিজয়ের পথ প্রায় পরিষ্কার করে দিয়েছে।

আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচন। এই উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থী নেই। বিএনপিরও দলীয় প্রার্থী নেই। প্রার্থী আছে কেবল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ জাতীয় পার্টির। যদিও প্রচার-প্রচারণায় নেই সে প্রার্থী। আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা চেয়ে না পাওয়া কয়েকজন উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন কাগজেকলমে কিন্তু নেই তাদের প্রচারণা। উপরন্তু দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সকল নেতা, জেলা পর্যায়ের নেতা, এমনকি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য উম্মে ফাতেমা ওরফে নাজমা বেগমও প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যের পক্ষে।

দীর্ঘ ২৮ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে তিনি যেমন নির্বাচিত হয়েছেন, তেমনি নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে সবশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রথমবার বিজয়ী হয়েছেন জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে। এরপর একে একে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন এবং ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন বিএনপিকে কেন্দ্র করেই, এবং ৮৪ বছর বয়স্ক এই নেতা বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির এক অপরিহার্য অংশ হয়েই ছিলেন।

১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগে গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির যে নেতারা জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন তাদের মধ্যে ছিলেন উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াও। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেননি তিনি। এরপর ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর তিনি দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদসহ বিএনপির সবধরনের পদ থেকে ইস্তফা দেন। বিএনপি ছাড়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক করার পর ওই দিন রাতেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দফতর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার মতো বিএনপির পরীক্ষিত নেতার দল থেকে পদত্যাগ, দল থেকে বহিষ্কার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ— বিষয়টি যদি এখানেই থাকত তাহলে কথা ছিল না। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলে বহিষ্কৃত হন অনেকেই, বহিষ্কারের আগে দল থেকে পদত্যাগও নতুন কিছু নয়; কিন্তু আলোচনা মূলত বিএনপির (সাবেক) নেতার সমর্থনে আওয়ামী লীগের একজোট হয়ে যাওয়া, দলীয় প্রার্থী না দেওয়া, বহুধাবিভক্ত আওয়ামী লীগে বিএনপির সাবেক নেতাকে কেন্দ্র করে ঐক্যের সুর এবং দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ, যা আগে এভাবে কোথাও দেখা যায়নি। উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে কেন্দ্র করে তবে কি কোন বার্তা দিতে চাইছে আওয়ামী লীগ? কী সেই বার্তা?

সাত্তার ভূঁইয়া ভালো লোক, যোগ্য লোক, প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ার মতো লোক— নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে এই যে বিশেষণগুলো দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এর পুরোটাই রাজনৈতিক এবং বিএনপিকে বার্তা দেওয়া। এই বার্তা আসছে নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলে আওয়ামী লীগ কোন কৌশল অবলম্বন করতে পারে তার ইঙ্গিত। বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাসহ নিবেদিত বর্ষীয়ান নেতারাও যে আওয়ামী লীগের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে, এটা তার সুস্পষ্ট বার্তা। এখানে আওয়ামী লীগ লোক দেখানো প্রার্থী দিতেও পারত, কিন্তু সেটা করেনি। আওয়ামী লীগ পারত স্থানীয় নেতাদের দিয়েই কেবল দলছুট বিএনপির নেতার পক্ষে প্রচারণা চালাতে, সেটাও করেনি দলটি। স্থানীয় পর্যায়ের সকল নেতাসহ জেলার একাধিক সংসদ সদস্য, এমনকি কেন্দ্রীয় নেতাকে নির্বাচনী প্রচারণায় পাঠিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে দেখাল তাদের রাজনৈতিক কৌশলের কিয়দংশ!

দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এই লক্ষ্যে আন্দোলনও করছে তারা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। এই আন্দোলন চলাকালে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টাইল কি বিব্রত করবে না বিএনপিকে?

বিএনপির দলীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতি অনুগত উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া গত মাসেই দলের সিদ্ধান্তে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আবার সেই দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তিনি ফের সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হয়েছেন। বয়সের ভারে ন্যূজ্ব তিনি, অসুস্থও; তবু ফের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে চান। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন, দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, কিন্তু দলবদল করে আওয়ামী লীগে যাননি। অথবা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের সহায়তা করলেও তাকে দলে ভেড়ায়নি আওয়ামী লীগ। এটাই হয়তো হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনের কৌশল। আওয়ামী লীগের এই কৌশলে কাবু হয়ে কি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে বিএনপি?

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের এক বছরের কম সময় বাকি। এরইমধ্যে বিএনপিকে দিয়ে বিএনপিকে মোকাবিলা করার যে কৌশল আওয়ামী লীগের, সেটা কীভাবে পার করবে এক যুগের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি, সেটাই দেখার!

কবির য়াহমদ: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

;

রোহিঙ্গা ক্যাম্প: সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না



ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নতুন বছরের শুরু থেকেই রাখাইনে আপাত শান্তি বিরাজ করছে। এর আগের কয়েকমাস রাখাইন ও চীন রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষ চলায় সেখানে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। নিপ্পন ফাউন্ডেশনের মধ্যস্থতায় আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধ বিরতির ফলে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কিছুদিন পর রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে আসছে মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা। ঠিক এই সময়ে গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে শূন্যরেখার ওপারে রোহিঙ্গা শিবিরে দুটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা স্যালভেশন অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মধ্যে সংঘর্ষের পর শূন্যরেখার ওপারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শিবির জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে এলাকাটা আরএসওর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রাখাইনের পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে এবং প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হলেই সাধারণত মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে ও ক্যাম্পগুলোতে এ ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, মাদক চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে।রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের ভূমিকা ও আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এপিবিএনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা শিবিরে নির্যাতন, হয়রানিসহ নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার ও শক্তি প্রদর্শনের জন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে, আশ্রয় শিবিরে আত্মগোপনকারী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে যা আশঙ্কাজনক। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালাতে পারে। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকার থাকার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। সীমান্তের ওপারে এসব অস্ত্র থাকায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে অভিযান চালিয়ে এগুলো উদ্ধার করতে পারছে না।প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে মাদক ও মানবপাচারের জন্য পরিচিত মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে এসব অস্ত্রের চালান আসে। আরাকান আর্মিও থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়িদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনে, তাদের কাছে চীনের তৈরি অস্ত্র এবং গোলাবারুদও আছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরেনবী হোসেনের দল প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদল। বলা হয়ে থাকে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে এবং তাদের সহযোগিতায় সে এই সন্ত্রাসীদল গঠন করেছে। মাদক চোরাচালানের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে নবী হোসেন। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মাদকের চালান আসে নবী হোসেনের দলের মাধ্যমে, তারা মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে গড়ে ওঠা অনেক ইয়াবা ও আইসের কারখানাও নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৯৬ শতাংশ ইয়াবা টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে আসে এবং বহু রোহিঙ্গা এই কাজে জড়িত। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মাদকপাচারের পাশাপাশি নিরাপত্তাঝুঁকি ও নানা ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরসা ও আল-ইয়াকিন বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করছে। এইসব সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর নেতারা ক্যাম্পগুলোতে বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্তহয়ে উঠেছে। এই দলগুলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিরোধী এবং তাদের নেতারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না। এজন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করা সংগঠনগুলোর সাথে তাদের বিরোধ চলমান এবং সুযোগ পেলেই তাদের নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। নানা ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে আরসা ও আল-ইয়াকিন রোহিঙ্গাদের স্বার্থ রক্ষাকারী পক্ষের শক্তি নয় বরং তারা মিয়ানমারের চলমান পরিকল্পনার পক্ষে। বাংলাদেশের ভেতরে এধরনের সশস্ত্র সংগঠনের অপতৎপরতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তারা মিয়ানমারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকিয়ে রাখতে চায়।মিয়ানমার একদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা বলছে অন্যদিকে সন্ত্রাসী দলগুলোকে মদদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পগুলোকে অশান্ত করে রাখছে এবং এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গাদেরকে সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সন্ত্রাসী দলগুলো যে কোন সময় গোলাগুলি, খুন, চাঁদাবাজি, মাদক পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত পাঁচ বছরের বেশি সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৩৫টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, অপহরণ, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, সোনা চোরাচালানসহ ১৪ ধরনের অপরাধের অভিযোগে৫ হাজার ২২৯টি মামলা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই বিভিন্ন ব্লকের মাঝি ও জিম্মাদার, এ খুনগুলোর জন্য মিয়ানমারভিত্তিক সংগঠন আরসাকে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছোটবড় শতাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপসক্রিয় রয়েছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রাও নিরাপত্তা হুমকিতে রয়েছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলগুলোর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবাধ যাতায়াত ও সেখানে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা দেশের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে ও এই সমস্যা সমাধান করা বেশ কষ্টসাধ্য। ক্যাম্প এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা শনাক্ত এড়াতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ওয়াকিটকি এবং মিয়ানমার পোস্ট অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনসের (এমপিটি) সিম ব্যবহার করে। এমপিটি ২০১৯ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে ১২টি টাওয়ার স্থাপন করেছে। এর ফলে ক্যাম্পের যেকোনো ঘটনা মিয়ানমার সাথে সাথে জেনে যায় যা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার জন্য উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে ক্যাম্প ও সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে ক্যাম্পে নজরদারি বাড়াতে হবে সেইসাথে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় শরণার্থীদের মানবিক সেবায় নিয়োজিত দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আতঙ্কে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে এবং তা কাটিয়ে উঠতে প্রশাসন কাজ করছে। ক্যাম্প পরিচালনা ও শরণার্থীদের তদারকির জন্য মাঝিদের নেতৃত্বে ‘ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠিত হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে ৪০ থেকে ১২০ জন হেড মাঝি ও সাব-মাঝি নিয়ে এই ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ ক্যাম্পে প্রায় আড়াই হাজার হেড মাঝি ও সাব-মাঝি রয়েছে। উখিয়ার ১১টি ক্যাম্প৮ এপিবিএনের অধীনে এবং ১৪ এপিবিএনের অধীনে রয়েছে ১৫টি। প্রায় সোয়া ৯ লাখরোহিঙ্গা এই ২৬ টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। আরও সাড়ে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা টেকনাফের সাতটি ক্যাম্পে থাকে। ক্যাম্পগুলোতে একাধিক রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রাতের বেলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টসাধ্য হলে ও সামনের দিনগুলোতে ক্যাম্পেসার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আরসা ও আল-ইয়াকিনের সাথে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা মিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ জরুরী। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পের চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি চেকপোস্ট ও টহল জোরদার করা হয়েছে। অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পৃক্তদের গ্রেফতারের আওতায় আনা হচ্ছে।রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও হতাহত হচ্ছে।ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসীদের দমন ও শান্তিশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে যৌথ অভিযান চলার পরও সংঘর্ষ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তের নিরাপত্তাহীনতা শুধু বাংলাদেশ নয়—গোটা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বহু প্রতীক্ষিত মিয়ানমারবিষয়ক একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার পরও মিয়ানমারের পরিস্থিতির তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যেকোনো ধরনের আলোচনার জন্য প্রস্তুত এবং টেকসই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ইস্যুকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার প্রতিবছর ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করছে। ২০২১ সালে এই খরচের পরিমান ছিল ১.২ বিলিয়ন ডলার। রেহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমার এবং এর সমাধানও সেখানেই রয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চায়।বাংলাদেশ সরকার এরপরও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করে যাচ্ছে। মানবতার ক্ষেত্রে উদারতা দেখালেও নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো ছাড় দেবে না বাংলাদেশ। আরসা ও আরএসওর পারস্পরিক সংঘাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পাচ্ছে এবং দিন দিন তা আরো জটিলতার দিকে যাচ্ছে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।রোহিঙ্গাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগঠিত বৃহত্তর জোট আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (এআরএনএ) আরসা, আরএসও ও অন্যান্য দলগুলোকে সাথে নিয়ে দ্রুত এ ধরনের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে এনে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ তথা আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গাদের যে কোনো অপরাধমূলক কার্যক্রম শক্ত হাতে দমন করতে হবে এবং কোনভাবেই ক্যাম্পগুলো সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেয়া হবে না।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।

 

;

গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর

গ্রামীণ চট্টগ্রামে শীতের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য ও রূপান্তর

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যায়। এ পরিবর্তন শুধু পোশাক-পরিচ্ছদে নয় খাবার, খেলাধূলা আর উৎসবেও থাকে। তাই প্রত্যেক ঋতুতেই প্রকৃতির খেয়ালের প্রতি খেয়াল রেখে প্রস্তুতি নিতে হয় ঋতু বরণের, যা গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের জনসমাজের চিরায়ত ঐতিহ্যে পরম্পরায় এবং সমাজ প্রগতির রূপান্তরের ধারাবাহিকতায়।

পৌষ আর মাঘ মাস নিয়েই শীতকাল। কিন্তু আমার নানী বলতেন ‘শীতের জন্মের মাস হচ্ছে ভাদ্র মাস’। ভাদ্র মাসের শেষের দিকেই শীত অনুভূত হতে থাকে। বাঙালির সংস্কৃতিতে শীত একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। শীতকে কেন্দ্র করে পুরো জাতি মেতে উঠে নানা রকম উৎসবে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই শুরু হয় পিঠা উৎসব। হরেক রকমের পিঠা দিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর অতিথি আপ্যায়নের চল রয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের দাওয়াত করে পিঠা খাওয়ানো হয় আবার ক্ষেত্রবিশেষে আত্মীয়ের বাড়িতেও পাঠানো হয়।
কয়েক দশক ধরে দেখা যাচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে শীতকালে পিঠা মেলার আয়োজনও হচ্ছে। রসনাবিলাসী হিসেবে বাঙালির তো সুনামই রয়েছে। বিচিত্র রকমের পিঠা মনে যেমন আনন্দের সূচনা করে ঠিক তেমনি রসনার পূর্ণতাও দেয়। শুধু তাই নয়, পিঠা এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ারও একটি উপকরণে পরিণত হয়েছে। তাই বাণিজ্যিকভাবে এখন পিঠা বানানো হয়। হাতের সাহায্যে যেমন পিঠা বানানো হয় তেমনি মেশিনের মাধ্যমেও এখন পিঠা বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন রঙ আর নকশায় খচিত পিঠা দৃষ্টিনন্দন আর রুচির পরিচায়ক, যা বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির নান্দনিক উপমা।

শীতের সকালে গাঁছি কাঁধে করে খেঁজুরের রস বিক্রি করে। সামর্থ্যানুযায়ী যে যতটুকু পারে সংগ্রহ করে রসনা তৃপ্ত করে। শুধু তাই নয় আঁখের গুড় দিয়েও শীতকালে বিভিন্ন রকমের পিঠা বানানো হয়। খেঁজুরের রস দিয়ে রাফ বানানো হয় আর সেই রাফে ভাপা পিঠা ও চিতল পিঠা চুবিয়ে খেতে দারুণ লাগে।

শীতকালে চট্টগ্রামের গ্রামীণ জনপদের সংস্কৃতি বড়ই বৈচিত্র্যময়। বাচ্চারা আমপারা বুকে জড়িয়ে মক্তবে ছুটে আর রাখাল গরু-ছাগলের পাল নিয়ে মাঠে যায়। কাঠুরিয়া কাঠ কাটতে যায় বনে। বিভিন্ন ধাচের পেশাজীবিরা পেশানুযায়ী কাজে বেরিয়ে পড়ে। সন্ধ্যার আগে-ভাগেই বাড়ি ফেরার চেষ্টা থাকে শীতের কামড় থেকে নিজেকে রক্ষার্থে। পাহাড় ও সমুদ্রের রাখিবন্ধনে চটগ্রামে দৃশ্যমান হয় বহুবিচিত্র এক সাংস্কৃতিক প্রভা, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনন্য এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়ার প্রোজ্জ্বল।

কুয়াশামাখা ভোরেই চিড়া আর মুড়ির মোয়া কাঁধে বেপারি পাড়ায় পাড়ায় ডাক হাঁকে। গুড়ের জিলাপী মাটির হাঁড়িতে করে গ্রামের আনাচে-কানাচে ছুটে বেপারি। কনকনে শীতে তাজা মচমচে মোয়া আর গরম জিলাপীতে রসনা তৃপ্ত হয়।

টাকা অথবা ধান-চালের বিনিময়ে নগদ কিংবা বাকিতে বিকিকিনি হয়। বয়স্করা কাঁথা-কম্বল, শাল জড়িয়ে আর জাম্পার ও সোয়েটার গায়ে কম বয়স্করা রাস্তার দিকে খেয়াল রাখে কখন বেপারি আসে।

শীতকালীন পিঠার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফুলপিঠা, পাটিসাপটা, চিতলপিঠা, পাকনপিঠা, গুরাপিঠা, ভাপাপিঠা (ধুঁইপিঠা) বেশ জনপ্রিয়। দিন পরিবর্তনের পালায় এখন আরও বহু রকমের পিঠা বানানো হয়। এখন অবশ্য নানামাত্রিক ব্যস্ততার কারণে আগের সেই উৎসবমুখরতা নেই গ্রামীণ জীবনে।

গ্রামীণ জনপদে শীতের সকালে আগুন পোহানোর সংস্কৃতি বেশ পুরনো। উঠানের এককোণে লতাপাতা আর লাকড়ি দিয়ে আগুনের উত্তাপ নিতে সবাই গোল হয়ে বসে পড়ে। আগুন পোহানোর কালে নানা রকমের গল্প চলে আর লাল টুকটুকে কয়লায় ভাপাপিঠা পুঁড়ে খাওয়ার ধুম চলে। সত্যি বলতে কি এ সংস্কৃতি এখন অনেকাংশে সচরাচর গোচরীভূত হয় না। নগরায়নের আছরে গ্রামীণ সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন আর বিদায় নিয়েছে ইতোমধ্যে অনেক কিছু। পালাবদলের প্রহরে গ্রামীণ সংস্কৃতিও নানা রূপান্তরের সম্মুখীন।

ছোটবেলায় দেখেছি পাশ্ববর্তী কুমোরপাড়া থেকে মাটির তৈরি নানা রকমের তৈজসপত্র কাঁধে করে কুমোর ফেরি করতো প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদে। নানা রঙের নকশা করা মাটির ব্যাংক আর ছোট আকারের হাড়ি যেগুলোকে আমরা কুয়াশা বলতাম তা কিনে খুশিতে আত্মহারা হতাম। মাটির ব্যাংকে পয়সা জমানোর রীতিমতো প্রতিযোগিতা ছিল। এখন কুমোর পাড়া আছে কিন্তু কুমোরের পেশা নেই। তাঁরা পূর্ব-পুরুষের পেশা ছেড়ে বিভিন্ন রকমের কর্মে যোগ দিয়েছে।

স্কুল ও মক্তব বন্ধের দিন শীতের সকালে গ্রামের ছেলেমেয়েরা বিলে সদ্য ধানকাটা সারা হওয়ার পর ইদুরের গর্তে ধান কুড়োতে যেত। আইলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে কিংবা কোদাল দিয়ে ইদুরের গর্ত খুঁড়ে ধান সংগ্রহ করতো আর সেই ধান দিয়ে নিজের পছন্দ মতো কিছু কেনাকাটা করতো কিংবা মোয়া ও জিলাপী খেত। এখনও প্রত্যন্ত গ্রামে এ সংস্কৃতি রয়েছে।

শীতকালে গ্রামে বিয়ের ধুমধামও বেশি হয়। আগে গ্রামের বাড়ির উঠানে বড় তাঁবু দিয়ে পাটি ও ছফ (বিশেষ ধরনের পাটি) বিছিয়ে আপ্যায়ন করা হতো এখন যেটা অতি নগন্য পরিমাণে হয় আর এখন সেটা কমিউনিটি ক্লাবে সম্পন্ন হয়।

মাঘ মাসে শীতের বেশ তীব্রতার কারণে মাঘের শীত নিয়ে বচনও রয়েছে যা আমি আমার নানীর মুখ শুনেছিলাম আর আঞ্চলিক প্রবচনে তা হচ্ছে ‘মাঘের শীতে বাঘ গুজুরে (কাঁদে)’। তাই মাঘ মাসের শীতে থাকে কামড়যন্ত্রনা। মাঘ মাসে পুকুরের পানিও কমতে থাকে আর এ সময় পুকুরের মাছ দিয়ে নানা পদের রেসিপি তৈরি করা হয়। শীতকালীন সবজি দিয়েও নানা প্রকার ভর্তা বানানো হয়।

শীতের সন্ধ্যায় আমরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে শিয়ালের ডাক শুনতাম। শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকের সাথে সাথে আমাদের কুকুর টাইগার আর রাজুইল্যাও ঘেউ ঘেউ ডাকে কানফাটা আওয়াজ তুলতো। দুই বিরোধী শিবিরের চিৎকার চেচাঁমেচিতে ছাগল আর মুরগীর ঘরে খিল দিতো আমাদের রাখাল মন্তাজ মিয়া। হালে চারপাশের অসভ্য মানুষের কুৎসিত চিৎকারের কাছে হার মেনেছে পশুদের প্রাকৃতিক কোলাহল!

জলবায়ু পরিবর্তনের এবং সামাজিক বিন্যাসের অধঃপতনের কারণে শীতের সেই আমেজ, অনুষঙ্গ ও তাৎপর্য হারিয়ে যাচ্ছে বহুলাংশে। ইতোমধ্যে ঋতুচক্রে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা যারা প্রত্যন্ত গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছি তাদের কাছে শীতের যে অমোঘ স্মৃতি তা ভবিষ্যতে 'রূপকথার গল্পে' রূপ নেবে। শীতের রাতে উঠোনে ব্যাডমিন্টন খেলা, খড়ের গাদায় লাফালাফি, প্রতিবেশির বাড়িতে ওয়াজ মাহফিলে যাওয়া, কিচ্ছা-কাহিনী শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাওয়া, মুয়াজ্জিনের আজানের পর আস-সালাতু খায়রুম মিনান নাউম বলে নামাজের দিকে আহ্বান জানিয়ে মসজিদে যেতাম।

আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন পাল্টে গেছে। বৈশ্বিক প্রভাবে গ্রাম এখন আর শাশ্বত-গ্রাম নেই। শীতের রাতে এখন আগের মতো প্রাকৃতিক কোলাহলও নেই। শীত মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে শীতের আগমনের আগে-ভাগেই কাঁথা সেলাইয়ের ধূম পড়ে যেত। এখন এসব আর চোখে পড়ে না।

ঘন গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ গ্রাম এখন বিরান ভূমি। বন উজাড় করে ইটের ভাটায় লাকড়ি জ্বালানোর কারণে বাড়ির ফলদবৃক্ষও রক্ষা পাচ্ছে না। গ্রামীণ খেলাধূলায়ও ব্যাঘাত হচ্ছে মাঠ সঙ্কট ও রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে। শীতকালে রোদের তেজ কম থাকার কারণে দুপুরের পরেই বিলে ডাংগুলি, ফুটবল হা ডু ডু আর ভলিবল খেলার আয়োজন হতো। রাস্তার সরুপথে চলতো মার্বেল খেলা। এসব ক্রমশ চলে যাচ্ছে স্মৃতির অতল গর্ভে।

শীতকাল চট্টগ্রামবাসীর, বিশেষত লোকায়ত গ্রামীণ সমাজের কাছে শুধু একটি ঋতুর নাম নয়- সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, যা নানা পরিবর্তন ও রূপান্তরের আঘাতে ক্রমেই অপসৃত।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

;