যাদের লক্ষ্য বিসিএস ক্যাডার!



প্রফেসর ড. মু. আলী আসগর
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে বিভিন্ন ক্যাডারের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হয় বিসিএস প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে। বিসিএসের সাধারণ ক্যাডার হিসেবে পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কর, শুল্ক, নিরীক্ষা ও হিসাব ইত্যাদিকে গণ্য করা হয় এবং কারিগরি ক্যাডারগুলো মূলত বিশেষায়িত (Specialized) চাকরি। এর মধ্যে প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক সহ সরকারি কলেজের সব বিষয়ের শিক্ষক অন্তর্ভূক্ত।

বিসিএস সিলেবাসে সবার জন্য ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা রয়েছে। ৪১তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার জন, যা রেকর্ড। এবং উক্ত প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় করোনা সংকটের মধ্যে প্রায় ৭৫% প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাধারণত ৫ শতাংশের কম টেকেন লিখিত পরীক্ষার জন্য। দুই ঘণ্টার ২০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ২০০টি প্রশ্ন থাকবে। প্রার্থী প্রতিটি শুদ্ধ উত্তরের জন্য ১ নম্বর পাবেন। তবে ভুল উত্তর দিলে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য প্রাপ্ত মোট নম্বর থেকে শূন্য দশমিক ৫০ (শূন্য দশমিক পাঁচ শূন্য) নম্বর কাটা যাবে।

লিখিত পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে পাস মার্ক হচ্ছে-  শতকরা ৫০। এক বা একাধিক বিষয়ে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলেও সব বিষয়ে গড়ে ৫০ শতাংশ নম্বর পেলেই পাস। অর্থাৎ মোট ৯০০ নম্বরের মধ্যে অন্তত ৪৫০ পেতে হবে। তবে কোনো বিষয়ে শতকরা ৩০ ভাগের কম নম্বর পেলে তা মোট নম্বরের সঙ্গে যোগ হবে না।

লিখিত পরীক্ষায় ৪৫০-৫০০ নম্বর পেয়ে ভাইভা বোর্ড পর্যন্ত গেলেও বিসিএস ক্যাডার পদে সুপারিশ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ক্যাডার পদে সুপারিশ পেতে হলে অত্যাবশ্যক- সুনির্দিষ্ট টার্গেট ও সঠিক পথে কঠোর পরিশ্রম।

লিখিত পরীক্ষায় যত ভালো করতে পারবেন, ক্যাডার পাওয়ার দৌড়ে তত এগিয়ে থাকবেন। অগোছালোভাবে সারা দিন পড়াশোনা করে লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব নয়। জেনে-বুঝে পরিকল্পিতভাবে পড়তে হবে।

বাংলা-২০০ নম্বরের মধ্যে ব্যাকরণভিত্তিক প্রশ্ন, ভাবসম্প্রসারণ, সারাংশ বা সারমর্ম ও সাহিত্য বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থাকে। বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য, শুদ্ধিকরণসহ ব্যাকরণভিত্তিক প্রশ্নগুলো নির্ভুল উত্তর করতে পারলে এই অংশে ৭৫ থেকে ৯০ নম্বর পাওয়া যায়। বাংলায় বড় রচনা ধরণের লেখাগুলো সঠিক তথ্যবহুল ও উপস্থাপনা সুন্দর হলে ৭০-৭৫ নম্বর পাওয়া যায়। বানান ও বাক্য শুদ্ধ হওয়া আবশ্যক।

ইংরেজিতে কমবেশি সকলেরই দুর্বলতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রামার, ট্রান্সলেশন, লেটার রাইটিং অংশগুলো ভালো করতে পারলে প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র মিলে ১১০-১২০ নম্বর পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ বিষয়াবলি ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি সহ অন্যান্ন বিষয়ে ভালো নম্বর পেতে করণীয় সম্পর্কে নিম্নে আলোকপাত করছি।

ক. বিসিএস প্রস্তুতিতে যা করণীয়-

১) যারা অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে, তাদের উচিত নিজ একাডেমিক বিষয়কে অবহেলা না করে ও অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট না করে প্রস্তুতি শুরু করা। তবে যারা অন্যান্ন বর্ষে পড়ছে, তাদের অবশ্যই অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে। প্রবাদ আছে, ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়”। প্রথমেই বিসিএসের প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসটা খুব ভালো করে পড়ে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।

২) গাইডকে কম গুরুত্ব দিয়ে বিসিএস সিলেবাস সংশ্লিস্ট বেসিক বইগুলো বিভাগের একাডেমিক পড়ার পাশাপাশি পড়াটা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন নির্বাচন করে ক্লাস সিক্স টু ক্লাস টেন এর বোর্ডের বই সহ এইচএসসি এর পৌরনীতি এবং  তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বই মনোযোগ সহকারে পড়াটা আবশ্যক।

Note: গত কয়েক বছরের বিসিএস এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো, আমি জেএসসি এর বাংলা ব্যকরণ, ইংরেজি গ্রামার, গণিত, বিজ্ঞান ও এসএসসি এর বাংলা ব্যকরণ, ইংরেজি গ্রামার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং এইচএসসি এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পৌরনীতি প্রশ্নের সাথে যথেষ্ট মিল খুঁজে পেয়েছি।

৩) কোচিং সেন্টারে বা টিউশনে ইংরেজি, গণিত বা বিজ্ঞান পড়ালে তা বিসিএস প্রস্তুতিতে  নিজেরও কাজে লাগবে এবং একই সাথে বিসিএস ভাইভায় কথা বলার আড়ষ্টতা কাটবে।

৪) স্নাতক অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির শুরু থেকে বা স্নাতক অনার্স ভর্তির যত শীঘ্র সম্ভব ভালো মানের বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিয়মিত মনোযোগ সহকারে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খাতায় নোট রাখলে বাংলাদেশ বিষয়াবলী ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী প্রস্তুতিতে ভিত (Base) তৈরি করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি বিবিসি বাংলা খবর ও বিবিসির বিশ্লেষণধর্মী আন্তর্জাতিক নিউজ এই প্রস্তুতিতে কাজে লাগবে।

৫) বিসিএস সিলেবাস অনুযায়ী ইংরেজি গ্রামার ও লিটারেচার প্র্যাকটিসের পাশাপাশি ইংরেজি vocabulary (শব্দভাণ্ডার) নিয়মিত বৃদ্ধি করাটা জরুরী। ইংরেজি পত্রিকা থেকে  প্রতিদিন অন্তত ৫টি Words (প্রত্যেকটির Synonyms and Antonyms সহ) মেমোরাইজ করে নোট খাতায় লিখে রাখতে হবে এবং শেখা Words পরে পুনরায় প্র্যাকটিস করতে হবে।

৬ ) বাংলা সাহিত্য ও ইংরেজি লিটারেচারের কবি ও সাহিত্যিকদের পরিচিতি ও বইগুলোর নাম ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করে নোট খাতায় লিখে বারবার চর্চা করতে হবে।

খ. বিসিএস প্রস্তুতিতে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো-

বিসিএস প্রস্তুতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই আছে। যেমন- ১।  অসমাপ্ত আত্মজীবনী (শেখ মুজিবুর রহমান) ২।  কারাগারের রোজনামচা (শেখ মুজিবুর রহমান)  ৩। লাল নীল দীপাবলি (ড. হুমায়ুন আজাদ) ৪। বিদ্যাকোষ; বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি (ড আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ) ৫। Applied English Grammar and Composition (P. C. Das; ভুল এড়ানোর জন্য ভারতের অরিজিন্যাল বইটি বেশী উপকারী) ৬। A Passage to the English Language (S. M. Zakir Hussain) ৭। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস (মুনতাসীর মামুন ও মো. মাহবুবুর রহমান) ৮। বাংলাদেশের ইতিহাস (১৯০৫-১৯৭১) লেখক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন ৯। নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি (ড. তারেক শামসুর রেহমান ১০।  বিশ্বরাজনীতির ১০০ বছর (ড. তারেক শামসুর রেহমান) ১১। জীবনের বালুকাবেলায় (ফারুক চৌধুরী) ১২। আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি (আকবর আলি খান) ইত্যাদি।

গ. বিসিএস প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ-

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, খসড়া রূপ, উপস্থাপন ও গৃহীত হওয়ার তারিখ,  সংবিধানে কারা স্বাক্ষর করেছেন ও করেন নাই, সংবিধানের কমিটি গঠনের নেপথ্য, অধ্যাদেশ জারি, মহিলা জড়িত ছিলেন কি না, কে হাতে লিখল, অঙ্গসজ্জাকারী কে, অন্য কোন দেশের সংবিধান অনুসরণ করা হয়েছে কিনা ইত্যাদি ভালোভাবে মনে রাখতে হবে। সংবিধানের সাতটি তফসিলের মধ্যে তৃতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ সংবিধান এ পর্যন্ত কত বার সংশোধিত হয়েছে তা জানাটা আবশ্যক। এই সংশোধনীর কোনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু বিষয় সংশোধন অযোগ্য কেন। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ, চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ সংশোধনীর সাল ও মূল বিষয়বস্তু ভালো করে মনে রাখবেন।

সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদের মধ্যে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদগুলো বিসিএসের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ-

২ (ক), ৩, ৪, ৪ (ক), ৫, ৬, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭,১৮, ১৮ (ক) ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৩ (ক), ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৩, ৪৯, ৫২, ৫৫, ৫৭, ৫৯, ৬০, ৬৪, ৬৫, ৬৬, ৬৭, ৭০, ৭৬, ৭৭, ৮১, ৮৭, ৯১, ৯৩, ৯৪, ১০২, ১০৬, ১০৮, ১১৭, ১১৮, ১২১, ১২২, ১২৩, ১২৭, ১৩৭, ১৩৮, ১৩৯, ১৪০, ১৪১, ১৪১ (ক), ১৪১ (খ), ১৪১ (গ), ১৪২, ১৪৮ ও ১৫৩।

সংবিধানের অধিক প্রচারিত বিষয়গুলো মনে রাখবেন । উদাহরণস্বরূপ ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োজনীয় কিনা, রাষ্ট্রধর্ম সম্পর্কে আপনার অভিমত ইত্যাদি। কিছুক্ষেত্রে উচ্চ আদালত সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ বা সংশোধনী নিয়ে মন্তব্য বা রায় দেন, তা জানা আবশ্যক।

ঘ) বিসিএস ভাইভা প্রস্তুতি-

২৭তম বিসিএস থেকে থেকে সিলেকশন বোর্ডের সামনে  লিখিত পরীক্ষার নম্বর থাকে না। অর্থাৎ, লিখিত পরীক্ষায় কী করেছেন বোর্ড তা দেখেন না। ভাইভাতে আপনাকে মূল্যায়ন করা হবে শুধু ২০০ নম্বরের ওপর। আপনি বোর্ড থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোর্ডের চেয়ারম্যান সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নম্বর দিয়ে দেন। এটিই আপনার ভাইভার চুড়ান্ত নম্বর।

বিসিএস ভাইভায় সচরাচর দুই ধরনের উপাদান সম্পর্কিত প্রশ্ন হয়ে থাকে। প্রথমটি হলো সুনির্দিষ্ট উপাদান, যেমন আপনার নাম, পিতামাতার নাম, পেশা, একাডেমিক রেজাল্ট ইত্যাদি। উদাহরণস্বরূপ, আপনার নাম যদি হয় ‘শামসুর রহমান’, তবে  বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে।

দ্বিতীয়টি হলো অনির্দিষ্ট উপাদান, যেগুলো আপনি একটি ভালো প্রস্তুতি নিয়ে ভালো নম্বর পেতে পারেন। যেমন আপনার একাডেমিক জ্ঞান, নিজ জেলার তথ্য, কমনসেন্স, সাধারণ জ্ঞান, অধ্যয়নের মাধ্যমে আপনার অর্জিত বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি। যেহেতু এই অংশের পরিধি অনেক বড়, ভালো করতে অনেক কিছু পড়তে হয়। In fact, ভাইভায় কোন ধরনের প্রশ্ন হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো সিলেবাস নেই। এটি সম্পূর্ণরূপে সিলেকশন বোর্ডের ওপর নির্ভর করে। তবে যারা খুব ভালো প্রস্তুতি নেয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা সফল হয়।

বিসিএস ভাইভা প্রস্তুতিতে যা গুরুত্বপূর্ণ-

১) ভাইভায় সাধারণত পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যথা ক) নিজ জেলা, খ) নিজ পঠিত বিষয়, গ) মুক্তিযুদ্ধ ঘ) সংবিধান, ঙ) সাম্প্রতিক বিষয়াবলি। এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়বেন।

২) যদিও সিলেকশন বোর্ড কিছু প্রশ্ন বাংলায় করতে পারে, তবে অধিকাংশ প্রশ্ন ইংরেজিতে করার সম্ভাবনাই বেশি। ইংরেজি বলার জন্য এখন থেকেই অনুশীলন করতে হবে। ইংরেজি vocabulary (শব্দভাণ্ডার) নিয়মিত বৃদ্ধি করাটা জরুরী। ইংরেজি পত্রিকা থেকে প্রতিদিন অন্তত ৫টি Words (প্রত্যেকটির Synonyms and Antonyms সহ) মেমোরাইজ করে নোট খাতায় লিখে রাখতে হবে এবং শেখা Words পরে পুনরায় প্র্যাকটিস করতে হবে। ভুল হলেও ক্যারিয়ার সচেতন বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার  চর্চা করতে হবে। যে কোন পেশায় প্রবেশে ও সফল হতে ইংরেজিতে দক্ষতা অপরিহার্য।

৩) ১০০% প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সাধারণ বিষয়াবলী অর্থাৎ যা জানা উচিৎ, তা না পারলে ভাইভা বোর্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উত্তর জানা না থাকলে বিনীতভাবে সরি বা দুঃখিত বলবেন। নার্ভাস হয়ে চুপ করে থাকবেন না ও ভুল উত্তর দিবেন না।

৪) কিছু কমন প্রশ্ন নিজের মতো করে মনে ইংরেজিতে সাজিয়ে নেবেন। উদাহরণস্বরূপ, নিজ details পরিচয়, পরিবার, এলাকা/শহর, জেলা, বিসিএস দেওয়ার উদ্দ্যেশ্য, ১ম ও ২য় ক্যাডার পছন্দের কারণ, নিজ পঠিত বিষয় ও ১ম/২য় পছন্দের সম্পর্ক, বর্তমান অবস্থা বা পেশা, স্মৃতিবহুল ঘটনা, শখ (হবি) , শৈশব-কৈশোর,কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ইত্যাদি। আপনি যে সাবজেক্টে অনার্স ও মাস্টার্স করছেন, তার সঙ্গে আপনার পছন্দের ক্যাডারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না বা কীভাবে আপনার একাডেমিক জ্ঞান পেশাগত কাজে লাগাবেন, তার একটা উত্তর সাজিয়ে নেবেন। ভাইভা বোর্ডে এগুলো বলার সময় মুখস্থের মত বলবেন না।

৫) নিজ জেলা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। যেমন, জেলার নামকরণের কারণ, আয়তন, প্রতিষ্ঠার তারিখ সহ সাল, উপজেলা ও থানার সংখ্যা, খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্ত, প্রধান কৃষিপণ্য, শিল্পকারখানা (যদি থাকে), নামকরা নদ-নদী ইত্যাদি।

৬) ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগার দফা, বঙ্গবন্ধ, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন।

৭) সর্বশেষ বাজেট সম্পর্কে একটা ধারণা রাখতে হবে; যেমন, মোট বাজেটের আকার, কোন খাতে কত বরাদ্দ, কত ঘাটতি, দেশের কততম বাজেট ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২০ বা সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকে বাছাই করে বেশ কিছু তথ্য জেনে নেবেন। জিডিপিতে বিভিন্ন খাতের অবদান সহ বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবেশ, অবকাঠামোগত তথ্যাবলী ইত্যাদি।

৮ ) বাংলাদেশ সংবিধান সম্পর্কে এ লেখায় পূর্বে আলোচিত বিষয়গুলো বিসিএস ভাইভায় বেশি জিজ্ঞাসা করা হয়।

৯) ফরমাল রুচিশীল পোশাক পরে ভাইভা বোর্ডে যাবেন। পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে চুল আদর্শ মান পর্যন্ত ছেঁটে রাখা উচিত। মেয়েদের ক্ষেত্রেও আদর্শ মান বজায় রাখা উচিত। সকলের জন্য পরিচ্ছন্নতা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

১০) ভাইভা কক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় যথেষ্ট সচেতন থাকবেন। সাধারণ ভদ্রতাগুলো মেনে চলবেন। যেমন, অনুমতি নেওয়া, সালাম দেওয়া, বিনয়ী থাকা, ইত্যাদি। তবে অতিবিনয়ী হয়ে কাঁচুমাচু করবেন না। কক্ষে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সালাম সকলকে দেবেন না। শুধুমাত্র বোর্ডের সভাপতিকে লক্ষ্য করে একবার দেবেন। গলার স্বর অধিক উচ্চ বা অধিক নিম্ন না করে স্টান্ডার্ড মান বজায় রেখে প্রশ্নের উত্তর দিবেন। মাথা প্রয়োজন অনুযায়ী মুভ করে প্রশ্নের উত্তর দিবেন। কথোপকথনের সময় হাত নাড়াবেন না এবং পা ঝাঁকাবেন না। চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসতে যাবেন না ও  লেখা ছাড়া টেবিলে হাত হেলান দিয়ে বসবেন না।

বি.দ্র. ভাইভায় ফেল বা কম নম্বর পাওয়ার মুখ্য কারণগুলো হলো- বেয়াদবি করা, নার্ভাস থাকা, অস্বাভাবিক আচরণ করা, বেশি জানার ভাব করা, উচ্চারণে আঞ্চলিকতা থাকা, ব্যর্থতা স্বীকার না করে একগুয়ে থাকা, না পারলেও উত্তর দেওয়া, সঠিক উত্তর কম দেওয়া ইত্যাদি।

ড. মু. আলী আসগর: প্রফেসর, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

   

সৌদি বিমানের মুম্বাই ‘অবতরণ’ বিতর্কের নেপথ্যে আসলে কি?



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

গেল মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪) সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানকে বিশ্বের ব্যস্ততম মুম্বাই বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের অনুমতি দেওয়া না দেওয়া নিয়ে গত ৩ দিন নানা খবর প্রকাশিত হচ্ছে দেশে ও বিদেশে। প্রকাশিত এসব খবর নিয়ে বাংলাদেশের স্যোশাল মিডিয়ায় তুমুল চর্চা ও চরমভাবে ‘ভারত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা’ খবরটি সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী করে তুললো। বিশেষ করে বাংলাদেশের তথাকথিত এক শ্রেণির অ্যাক্টিভিস্ট (যাদের বিভিন্ন সময়ে নানা অপতথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে দেখা যায়) যখন এই বিতর্কে অংশ নিয়ে অবতরণের ‘অনুমতি দেওয়া’পাকিস্তানকে ‘অতি মানবিক’হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় সক্রিয় হয় তখন সন্দেহ বাড়ে।

‘দ্য নিউজ’-সহ পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন সংবাদপত্রের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে খবর বেরিয়েছে তাতে দাবি করা হয়, ওই সৌদি বিমানের পাইলট প্রথমে ভারতের মুম্বাইয়ের বিমানবন্দরে মানবিক অবতরণ চেয়ে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারের কাছ থেকে অনুমতি চায়। কিন্তু যাত্রীর জাতীয়তা ও অন্য তথ্য জানার পর প্লেনটিকে তাৎক্ষণিকভাবে মুম্বাইয়ে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

খবরে আরও উল্লেখ, আবু তাহির নামে ৪৪ বছর বয়সী ওই বাংলাদেশি যাত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় মুম্বাইয়ে অবতরণের অনুমতি না পেয়ে পাকিস্তানের করাচির এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলারের কাছে অনুমতি চান। ঢাকা থেকে উড্ডয়ন করা রিয়াদগামী সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটিকে করাচিতে জরুরি অবতরণের সুযোগ দেওয়া হয়। অনুমতি পাওয়ার পর বুধবার সকাল ৭টা ২৮ মিনিটে বিমানটি করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে ও পাকিস্তানের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মেডিকেল টিম ওই যাত্রীর চিকিৎসা দেন এবং পরে প্লেনটি আবার করাচি থেকে রিয়াদের উদ্দেশে যাত্রা করে।

পাকিস্তানের গণম্যাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা খবরটিতে কোন তথ্যসূত্র কিংবা সংশ্লিষ্টদের কোন বক্তব্য নেওয়া হয়নি। তথ্যসূত্রহীন একটি খবরকে প্রভূত গুরুত্ব দিয়ে যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যম এবং স্যোশাল মিডিয়া মরিয়া হয়ে প্রচার করলো তাতে কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমতঃ বাংলাদেশের জনসাধারণের মাঝে ভারতবিদ্বেষ উসকে দেওয়া। অন্যদিকে পাকিস্তানকে ‘মানবিক’দেশ হিসেবে প্রচার করা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করা।

বিষয়টি সত্যাসত্য জানতে ভারতের কুটনৈতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে যা জানা যাচ্ছে তা হচ্ছে, সৌদি এয়ারলাইন্সের ওই উড়োজাহাজটিকে অবতরণের অনুমতি দিয়েছিল মুম্বাই বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। ওজন কমাতে বিমানটি জ্বালানি ডাম্পিংও শুরু করে। কিন্তু পরে সেটি আবার ঘুরে যায় এবং ঘোষণা করে যে কোম্পানির নিজস্ব নীতির কারণেই বিমানটি মুম্বাইয়ে অবতরণ করবে না। কুটনৈতিক সূত্র এও জানায় যে, ফ্লাইটটিতে বাংলাদেশি অসুস্থ যাত্রী আবু তাহিরের জন্য মেডিকেল টিম সহ সমস্ত সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য প্রস্তুত ছিল মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

ফিরে তাকাব সাম্প্রতিকতম কিছু ঘটনাবলির উপর। আমরা লক্ষ্য করেছি, ক্রিকেট খেলা নিয়ে গেল কয়েক মাস আগে কি ভয়ঙ্কর রকমের উন্মাদনা! স্যোশাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে ‘ভারতের পরাজয়ে বাংলাদেশি তরুণদের উন্মাদনা’ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। এবং এমন ভাবে তা করা হয়েছে যা রীতিমতো ‘ধর্মীয় ও পবিত্র নাগরিক দায়িত্ব’ হিসেবে বলার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। এতে করে ভারতেও বাংলাদেশ বিদ্বেষী প্রচারণায় সরব হয়ে উঠে একটা শ্রেণি। এবং বোঝা যায়-বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবক্তারা সফল হয়েছেন! যদিও কয়েক দিন উন্মাদনা চালিয়ে এক পর্যায়ে শান্ত হয় তারা। কিন্তু আসলেই কি ওরা থামে? ওরা থামে না। বিরোধিতার ইস্যু সৃষ্টির অপেক্ষায় থাকে তারা। এবং বেশ সংঘবদ্ধভাবেই বিদ্যুৎ গতিতে এই সব অপতথ্য ছড়ানোর কাজটি করে যায় তারা।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভারতের সার্বিক সহযোগিতা এবং দেশটির অগণিত সেনাদের প্রাণদান ও তাদের জনগণের সীমাহীন দুঃখভোগের ইতিহাস রয়েছে। অভিন্ন নদী, সীমান্তে হত্যাসহ কিছু ইস্যুতে দেশটির সঙ্গে আমাদের সমস্যা আছে। কাঙ্খিত না হলেও বিশ্বজুড়েই তা প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে এটি থাকে এবং এর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট অনেক পরিপ্রেক্ষিতও জড়িত রয়েছে। কিন্তু বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশি হওয়ার কারণে নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই যে ভাবে উপকৃত হয়েছে এবং হচ্ছে, তা বিশ্বে কমই দেখা যাবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক দীর্ঘ মেয়াদে কতোটা খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে তা মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর দৃষ্টান্ত টানা যেতে পারে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব-কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত আমাদের বৈদেশিক নীতির এই মূলমন্ত্রে পাকিস্তানের সঙ্গেও আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সেখানে আমাদের দূতাবাসও রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যে মূল্যবোধকে ধারণ করে তার সঙ্গে বাংলাদেশের ফাঁরাক বিস্তর। পাকিস্তান বাংলাদেশের বিষয়ে ‘মানবিক’ চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হবে তার কোন লক্ষণ নিকট অতীতে কিংবা ভবিষ্যতেও প্রত্যাশা করা কতটা দুরাশা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে বিমান অবতরণে বাংলাদেশি যাত্রীর পরিচয়ে ভারতের কোন বিমানবন্দর ফিরিয়ে দেওয়ার মতো প্রচারণা শেষ পর্যন্ত ধোঁপে টিকে না। কেননা বাংলাদেশের যে পরিমাণ নাগিরক প্রতিদিন ভারতে যান, অনেক দেশে পুরো মাসে; এমনকি সারাবছরেও সেই পরিমাণ নাগিরিক যান না। নাগরিক যোগাযোগে বন্ধুপ্রতীম এই দুই দেশে আগামীতে জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে ‘ভিসা’উঠিয়ে দেওয়ার আলাপ আলোচনাও আমরা বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে হতে দেখছি। সেখানে একজন মুমূর্ষ যাত্রীর জাতীয়তা ‘বাংলাদেশি’জানার পর তাকে বহন করা ফ্লাইট অবতরণের অনুমতি না দেওয়ার মতো হাস্যকর দাবি আর কি হতে পারে?

তবে সুনির্দিষ্ট কোন ঘটনা বা প্রেক্ষিত যদি থাকে নিশ্চয়ই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত করবে। আর যৌক্তিক কোন কারণ থাকলে বাংলাদেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও কোন ফ্লাইটকে অবতরণের অনুমতি নাও দিতে পারেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন ঘটনার পুরোটা না জেনে এভাবে বিতর্ক উসকে দেওয়া যে বন্ধুত্বপূর্ণ কুটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরানোর এক অপচেষ্টা তা বেশ ভালোই অনুমেয়।

;

স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত



কবির য়াহমদ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত

স্বীকৃতির উদযাপনে যেন আড়ালে না পড়ে রক্ত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের শহিদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। আমাদের জন্যে দিবসটি আনন্দের নয়। আমাদের জন্যে দিবসটি উৎসব আর হৈচৈ-এর নয়। আমাদের জন্যে এ তারিখ শহিদদের স্মরণের মাধ্যমে অর্জনের পথনির্দেশকের। ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসও। আমরা যা রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছিলাম, বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের বাংলা ভাষার প্রতি, তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি ভালোবাসার এক নিদর্শন। আমরা এ তারিখকে ঘিরে উৎসব করতে পারি না, কিন্তু বাংলাদেশের বাংলাভাষী ছাড়া অন্যেরা সেটা হয়ত পারে, কারণ এর মাধ্যমে মায়ের ভাষার স্বীকৃতি বিশ্বজনীন হয়েছে। তারা স্মরণের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতে পারলেও আমাদের এ প্রকাশে সীমাবদ্ধতা আছে।

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) স্বীকৃতিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে সারাবিশ্বে উদযাপনের প্রপঞ্চ, কিন্তু আমাদের কাছে এটা পরিপূর্ণভাবে উদযাপনের নয়। ধারাবাহিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ভাষার অধিকার আদায়ের দিন এটা। বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়ে আমরা কি তবে ভুলে যাব রক্তের কথা? রক্ত ভুলে স্রেফ বৈশ্বিক স্বীকৃতিতে চোখ কেন থাকবে আমাদের? সালাম, বরকতের রক্ত শুকিয়ে কি তবে মিলিয়ে গেল হাওয়ায়? না, এটা হওয়ার কথা নয়!

এদিকে, বৈশ্বিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গও পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত হবে না আমাদের। রক্তে অর্জিত বিশ্ববাসীর মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের স্বীকৃতি-স্মারক এই একুশে ফেব্রুয়ারি—এই ভেবে আমরা গৌরবের অংশীদার হতে পারি কিন্তু ভুলে যেতে পারি না রক্তের কথা, আত্মত্যাগের ইতিহাস। অন্য ভাষাভাষীদের কাছে উদযাপনের হলেও, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে উৎসবের নয়। অন্যেরা উৎসব করতে পারে এখানে, কারণ তাদের মায়ের ভাষার অধিকারের স্বীকৃতি মিলেছে; তবে আমাদের কাছে স্মরণের, বিনত শ্রদ্ধার। আমরা রক্তের মাধ্যমে নিজেদের জন্যে অর্জন করেছি ভাষার অধিকার, মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার; নিজের জন্যে, অন্য সকল ভাষাভাষীর জন্যে।

আমাদের বাংলা ভাষা পৃথিবীর অন্তত পাঁচ হাজারের বেশি মাতৃভাষার স্মারকমূল্য পেয়েছে। ভাষা ও অধিকার এই দুয়ের সম্মিলনে বাংলা হয়েছে নেতৃত্বস্থানীয়। প্রচলন আর অনুশীলনে বাংলা ভাষা পৃথিবীর নেতৃত্বস্থানীয় ভাষা না হলেও মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে বাংলা ভাষা হয়েছে অগ্রগণ্য, এটা অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে। বাংলা ভাষার সম্মানের এই স্বীকৃতি কেবলই বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে থাকেনি, এর বিস্তৃতি ঘটেছে সকল ভাষাভাষী মানুষদের মাঝেও।

বৈশ্বিক উপযোগিতা কিংবা ব্যবহারের প্রসঙ্গ এখানে না থাকলেও অনাগত দিনে পৃথিবীর একজন মানুষও কোনো একটা ভাষায় কথা বলতে চাইলে বাংলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি তার জন্যে বর্ম হয়ে আছে। দুনিয়ার সকল দেশের সকল শাসক অন্তত একজন মানুষের হলেও স্বতন্ত্র সে মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইলে একুশের এই রক্ত, মাতৃভাষা দিবসের এই স্বীকৃতি জোরপূর্বক ভাষা-হরণের যেকোনো অপচেষ্টাকে রুখে দেবে।

ইউনেস্কোর মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির দিনটি এই সংস্থাভুক্ত সকল দেশ পালন করে থাকে। যে পাকিস্তানের কাছ থেকে রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায় করেছি সেই পাকিস্তানকেও বাঙালির একুশে ফেব্রুয়ারির অমর দিনটিকে পালন করতে হয়। পাকিস্তান তাদের মত করে দিনটি পালন করলেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপট, আন্দোলন, রক্ত আর আত্মদানের ইতিহাসকে অস্বীকারের উপায় নাই তাদেরও। এটা আমাদের অনন্য অর্জন।

ভাষাশহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—এ দুইকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়েও আমরা শহিদদের রক্ত, তাদের আত্মত্যাগ আর ভাষাসংগ্রামীদের স্মরণ করতে পারি। একুশের অমর গানেও আছে সে বার্তা; ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’।

বাঙালির কাছে একুশ অধিকার আদায়ের রক্তস্নাত দিন, বিশ্ববাসীর কাছে একুশ নিজের ভাষায় কথা বলতে পারার স্বীকৃতির দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি, ভাষার স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি সে শিক্ষাই দেয় আমাদের।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। স্বীকৃতির উদযাপনে এখানে যেন রক্ত আড়ালে না পড়ে!

;

আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার স্তম্ভ হিসেবে বহুভাষিক শিক্ষার গুরুত্ব



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাষা মানুষের পরিচয়ের একটি মৌলিক দিক, যা যোগাযোগ, অভিব্যক্তি এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণের বাহন হিসেবে কাজ করে। ভাষাগত বৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং মাতৃভাষা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি দিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের জন্য একত্রিত হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সূচনা বাংলাদেশের দূরদর্শী উদ্যোগ থেকে উদ্ভূত, যা ভাষাগত বৈচিত্র্যের বৈশ্বিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো’র সাধারণ সম্মেলনে এই দিবসটি উদযাপনের অনুমোদন পায় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, প্রাথমিকভাবে ইউনেস্কো দ্বারা ঘোষিত এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত, অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অগ্রসর করার ক্ষেত্রে ভাষার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেয়। জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এ বছর (২০২৪) দিবসটির প্রতিপাদ্য বা থিম হলো, ‘বহুভাষিক শিক্ষা - শেখার এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি স্তম্ভ’ ("Multilingual education – a pillar of learning and intergenerational learning"), যা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অনুশীলনের প্রচার এবং আদিবাসী ভাষা রক্ষায় বহুভাষিক শিক্ষা নীতির সমালোচনামূলক গুরুত্বের ওপর জোর দেয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শিকড় নিহিত একটি মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে যা ঘটেছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে, বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)। সেদিন ছাত্ররা উর্দুকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, বাংলাকে তাদের মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলে। বিক্ষোভ মারাত্মক রূপ নেয় যখন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, যার ফলে প্রাণহানি ঘটে। এই ঘটনাটি, যা এখন ভাষা আন্দোলনের শহীদ দিবস নামে পরিচিত, ভাষাগত অধিকার এবং সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি তীব্র আন্দোলনের জন্ম দেয়।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রাম বেগবান হয়, অবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে অবদান রাখে। ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে, ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে এবং বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা দেয়।

জাতিসংঘের মতে, বহুভাষিক এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজগুলো ঐতিহ্যগত জ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক অনুশীলনগুলো প্রচার এবং সংরক্ষণে তাদের প্রাণবন্ততা এবং স্থিতিস্থাপকতার জন্য ভাষার মুখ্য ভূমিকার নিকট ঋণী। যাইহোক, ভাষাগত বৈচিত্র্যের জন্য অনেক ভাষায় এখন ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন। উদ্বেগজনক হারে অনেক ভাষায় এখন বিলুপ্তির পথে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৪ উদযাপনের থিমটি আজীবন শিক্ষা ও সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে বহুভাষিক শিক্ষার মুখ্য ভূমিকার ওপর জোর দেয়। বহুভাষিক শিক্ষা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে একাধিক ভাষার ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করে। এই পদ্ধতিটি একটি সম্প্রদায় বা অঞ্চলের মধ্যে ভাষার সমৃদ্ধ বর্ণালী স্বীকার করে এবং প্রতিটি ভাষার অন্তর্নিহিত মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়। একটি ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে, ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন করা, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখার এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য।

বহুভাষিক শিক্ষা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ঐতিহ্য, গল্প এবং মূল্যবোধ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রেরণের একটি বাহক হিসেবে কাজ করে। শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা কেবল একাডেমিক ধারণাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে উপলব্ধি করে না বরং ভাষার মধ্যে অন্তর্নিহিত সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতাগুলিকেও আপ্ত করে। এটি নিশ্চিত করে যে জটিলভাবে ভাষাগত জালে বোনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অক্ষতভাবে প্রেরণ করা হয়।

গবেষণা পরামর্শ দেয় যে, বহুভাষিকতা জ্ঞানীয় বিকাশে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে। বিশেষ করে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীলতার মতো ক্ষেত্রে। যখন ব্যক্তিরা একাধিক ভাষার সঙ্গে জড়িত, তখন তারা তাদের মস্তিষ্ককে অনন্য উপায়ে অনুশীলন করে, যার ফলে জ্ঞানীয় নমনীয়তা উন্নত হয়। এই জ্ঞানীয় তৎপরতা শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাধনায় উপকৃত করে না বরং তাদের এমন দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করে যা একটি চির-পরিবর্তনশীল বিশ্বের জটিলতাগুলি পরিচালনা করার জন্য অমূল্য।

বহুভাষিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী অনুঘটক, এটি নিশ্চিত করে যে বিভিন্ন ভাষাগত পটভূমির ব্যক্তিদের শেখার সুযোগের সমান প্রবেশাধিকার রয়েছে। অনেক অঞ্চলে, ভাষাগত বৈচিত্র্য আর্থ-সামাজিক কারণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ এবং একাধিক ভাষায় শিক্ষা প্রদান করা শিক্ষাকে সবার জন্য প্রাপ্তিযোগ্য করে ব্যবধান পূরণ করতে সহায়তা করে। এই অন্তর্ভুক্তি আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার জন্য একটি উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে, আত্মীয়তা এবং সমতার বোধকে উৎসাহিত করে।

বহুভাষিক শিক্ষার একটি প্রাথমিক সুবিধা হল সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধান পূরণ করার ক্ষমতা। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বয়স্ক এবং তরুণ উভয় প্রজন্মের দ্বারা কথ্য ভাষাগুলিকে আলিঙ্গন করে এবং অন্তর্ভুক্ত করে, তখন তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে জ্ঞান নিরবিচ্ছিন্নভাবে বয়সের মধ্যে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এই সেতুটি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার সুবিধা দেয়, এমন বাধাগুলি ভেঙে দেয় যা জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার বিনিময়ে বাধা হতে পারে।

বহুভাষিক শিক্ষা শ্রেণিকক্ষের বাইরে এর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে, পরিবারের মধ্যে যোগাযোগকে প্রভাবিত করে। শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা কেবল তাদের সমবয়সীদের সাথে নয়, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সাথেও কার্যকর যোগাযোগকারী হয়ে ওঠে। এই ভাষাগত সংযোগ পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে, একটি আন্তঃপ্রজন্মীয় কথোপকথন তৈরি করে যেখানে গল্প, ঐতিহ্য এবং জীবনের পাঠগুলি জৈবিকভাবে ভাগ করা হয়।

বিশ্বায়ন এবং আন্তঃসংযোগ দ্বারা চিহ্নিত বিশ্বে, বহুভাষিক শিক্ষা ব্যক্তিদেরকে সাংস্কৃতিকভাবে অভিযোজিত এবং বিশ্ব নাগরিক হতে প্রস্তুত করে। একাধিক ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি পরিচালনা করার ক্ষমতা দিয়ে সজ্জিত করে, অন্যদের প্রতি সহানুভূতি এবং বোঝার বোধ তৈরি করে। এই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রজন্মের মধ্যে সেতু নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত সীমানা জুড়ে ধারণা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়কে উৎসাহিত করে।

বহুভাষিক শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার্থীর মাতৃভাষায় শিক্ষামূলক নির্দেশনা শুরু করা এবং ধীরে ধীরে অতিরিক্ত ভাষা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে ছাত্রদের বাড়ির পরিবেশ এবং স্কুলের পরিবেশের মধ্যে ব্যবধান পূরণ করে, যার ফলে আরও দক্ষ এবং অর্থপূর্ণ শেখার অভিজ্ঞতা সহজতর হয়।

অধিকন্তু, বহুভাষিক শিক্ষা অপ্রধান, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী ভাষা সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই ভাষাগুলিকে শিক্ষামূলক পাঠ্যক্রমের সঙ্গে একীভূত করার মাধ্যমে, সমাজগুলো ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারে এবং তাদের ভাষাগত পটভূমি নির্বিশেষে সকল ব্যক্তির জন্য শিক্ষার সুযোগের সমান প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে।

বহুভাষিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য লালন করার জন্য একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষাগত সমৃদ্ধিকে স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন করার মাধ্যমে, শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক সংহতিকে উন্নীত করতে পারে, প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন করতে পারে এবং সবার জন্য আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার জন্য বহুভাষিক শিক্ষার সুবিধাগুলো স্পষ্ট হলেও, সম্পদের সীমাবদ্ধতা, মানসম্মত পরীক্ষার অভাব এবং পরিবর্তনের প্রতি সামাজিক প্রতিরোধসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। যাইহোক, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে এবং বহুভাষিক শিক্ষাকে আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার একটি টেকসই স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মূল উপাদান।

বহুভাষিক শিক্ষা আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য একটি শক্তিশালী এবং রূপান্তরকারী শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ভাষাগত বৈচিত্র্য উদযাপন করে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে, জ্ঞানীয় বিকাশ বৃদ্ধি করে এবং প্রজন্মগত ব্যবধান পূরণ করে, এটি একটি সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে যা ব্যক্তি এবং সম্প্রদায়ের জন্য সমানভাবে উপকৃত হয়। ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বহুভাষিক শিক্ষা গ্রহণ ও প্রচারের মাধ্যমেই আমরা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় শিক্ষার ভিত্তি নিশ্চিত করতে পারি।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

;

একুশে ফেব্রুয়ারি আত্মপরিচয়ের দিন



তোফায়েল আহমেদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ প্রতি বছর অমর একুশের শহীদ দিবসে মহান ভাষা আন্দোলনের সূর্যসন্তানদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তস্রোতের সাথে মিশে আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গৌরবগাঁথা। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলার ছাত্রসমাজ আত্মদান করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল।

রক্তরাঙা অমর একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তের প্লাবনের মধ্য দিয়ে আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় আসনে আসীন। শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও মানুষের মতো বাঁচার দাবীর সংগ্রামের দুর্জয় অনুপ্রেরণা সৃষ্টির চির অনির্বাণ শিখার দীপ্তিতে দিগন্ত উদ্ভাসিত করেছে একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি এদেশের মানুষকে শিখিয়েছে আত্মত্যাগের মন্ত্র, বাঙালিকে করেছে মহীয়ান। জাতি হিসেবে আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সমন্বয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করেছি। মহান ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে এসেছে মহত্তর স্বাধীনতার চেতনা। এবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সগৌরবে পালিত হচ্ছে মহান ভাষা আন্দোলনের ৭২তম বার্ষিকী।

প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৪৮-এর ১১ মার্চ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল।

সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম।” (পৃষ্ঠা-৯১, ৯২)। ’৪৮-এর ১১ মার্চ অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বাংলার ছাত্রসমাজ প্রথম প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। সেদিন যারা মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে সংগ্রাম করে কারাবরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জনাব শামসুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। মার্চের ১১ থেকে ১৫-এই পাঁচদিন কারারুদ্ধ ছিলেন নেতৃবৃন্দ। পাঁচদিনের কারাজীবনের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “দেওয়ালের বাইরেই মুসলিম গার্লস স্কুল। যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটু ক্লান্তও হত না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই,’ ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’-নানা ধরনের স্লোগান। এই সময় শামসুল হক সাহেবকে আমি বললাম, হক সাহেব ঐ দেখুন, আমাদের বোনেরা বেরিয়ে এসেছে। আর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে পারবে না। হক সাহেব আমাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, মুজিব’।” (পৃষ্ঠা-৯৩, ৯৪)। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিশ্বাস্য আত্মপ্রত্যয় ছিল! তখন কে জানতো যে, ’৪৮-এর এই ১১ মার্চের পথ ধরেই ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনায় স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে! কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতেন! কারণ তিনি দূরদর্শী নেতা ছিলেন, লক্ষ্য স্থির করে কর্মসূচি নির্ধারণ করতেন। যেদিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়, সেদিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি; একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। আর তাই ধাপে ধাপে সমগ্র জাতিকে প্রস্তুত করেছেন চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য।

’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন সংলগ্ন আমতলায় ছাত্রসভা। নুরুল আমীন সরকার আরোপিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রস্তুতি। ছাত্রসভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১০ জন মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙবে। ছাত্রসমাজ প্রতিবাদ মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙলো। সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী গুলি ছুঁড়লে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু তখন কারারুদ্ধ। কারাগারেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করে অনশন করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে তিনি আরো লিখেছেন, ‘মাতৃভাষার অপমান কোন জাতি সহ্য করতে পারে না। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ছাপ্পান্ন জন বাংলা ভাষাভাষী হয়েও শুধুমাত্র বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বাঙালীরা করতে চায় নাই। তারা চেয়েছে বাংলার সাথে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক, তাতে আপত্তি নাই। কিন্তু বাঙালির এই উদারতাটাই অনেকে দুর্বলতা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।’ (পৃষ্ঠা-১৯৮)। ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন দেশের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামে গ্রামে মিছিল হতো। সেই মিছিলে স্কুলের ছাত্রদের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মনে আছে তখনকার স্লোগান, ‘শহীদ স্মৃতি অমর হউক,’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই,’ ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা, বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা’।

’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের সর্বব্যাপী গণবিস্ফোরণ ঘটে একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সেদিনও খুলনায় পুলিশের গুলিতে ১০ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে যে আন্দোলন আমরা শুরু করেছিলাম একুশে ফেব্রুয়ারি তা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যুতে বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করি। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের চেতনা ’৬৯-এর গণআন্দোলনের বাঁধভাঙা জোয়ারে পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমাদের আহ্বানে বিগত ১৭ বছরের সমস্ত দৃষ্টান্ত ভঙ্গ করে ঢাকা নগরের অধিবাসীগণ অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যের মাধ্যমে মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি প্রাণঢালা শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং প্রশাসনের সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উত্থাপন করে। একটি সুন্দর, নিষ্কলুষ, নির্যাতন-নিপীড়নহীন শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে ১১ দফার ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে এক মোহনায় শামিল করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। দিনটি ছিল শুক্রবার।

’৬৯-এর গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে প্রথম সরকারি ছুটি আদায় করেছিলাম। সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো পতাকা উত্তোলন, আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, প্রভাত ফেরি, শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের কর্মসূচি শুরু হয়। শহীদ দিবস উপলক্ষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শহীদ মিনারের পাদদেশে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। ’৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারিকে মহান ভাষা আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য ধারা হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম আজ একনায়কত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে। ছাত্র-জনতা শ্রমিক কৃষকের জনপ্রিয় ১১ দফার সংগ্রাম আজ তাই মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য অনুসরণ করছে। ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির সংগ্রাম কেবলমাত্র বাংলা ভাষার সংগ্রাম ছিল না।

এ সংগ্রাম ছিল সারা দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ও বাংলা ভাষীদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস।’ শহীদ আসাদ, মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীর, আনোয়ারা, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ ১১ দফা আন্দোলনের ৩৯ জন বীর শহীদ ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের সার্থক উত্তরসূরী। বিকাল ৩টায় পল্টন ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভা তো নয়, যেন জনসমুদ্র। জনসমাবেশের তুলনায় সেদিনের পল্টন ময়দানের আয়তন কম মনে হয়েছে। চতুর্দিক থেকে মানুষের ঢল নেমেছিল। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সমাবেশ থেকে সরকারের উদ্দেশে চরমপত্র ঘোষণা করে সমস্বরে বলেছিলেন, ‘আগামী ৩রা মার্চের পূর্বে দেশবাসীর সার্বিক অধিকার কায়েম, আইয়ুব সরকারের পদত্যাগ, রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলা প্রত্যাহার, ১১ দফা দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি, সংবাদপত্র ও বাক-স্বাধীনতার উপর হতে সর্বপ্রকার বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করতে হবে।’ সেদিনের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় সভাপতির ভাষণে যা বলেছিলাম দৈনিক ইত্তেফাকের পাতা থেকে পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে দিচ্ছি- ‘একুশে ফেব্রুয়ারি এই দিনটি আত্মপ্রত্যয়ের দিন, আত্মপরিচয় দেওয়া ও নেওয়ার দিন। ১৭ বৎসর পূর্বে এই দিনটি ছিল শুধু মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের দিন।

আজ ১৯৬৯ সালে এই দিনটি জনগণের সার্বিক মুক্তি সংগ্রামের দিন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্র সঙ্গীত ইত্যাদি নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল হতে নূতনতর যেসব বিতর্কের অবতারণা করা হয়েছে সেসব বিতর্ক ও এদের উত্থাপকদের সতর্ক করে বলছি, বাংলাদেশে জন্মজন্মান্তর বাস করেও যারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে শিখে নাই, তাদের স্বরূপ আজ উদঘাটিত। এই শ্রেণির লোকেরা বেঈমান। বাংলায় বেঈমানের কোনো স্থান হবে না এবং স্বাধিকারের সর্বাত্মক সংগ্রাম নিয়ে যদি তারা চিরন্তন পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ঘুঁটি চালানোর প্রয়াস পান তবে আত্মরক্ষার পুরাতন প্রথা পরিত্যাগ করে প্রতি আক্রমণের পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলার অন্যতম বন্দী শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছি, এই মামলায় বন্দী আর কারো গায়ে যদি একটি আঁচড়ও লাগে তবে দেশব্যাপী দাবানল জ্বলে উঠবে। আর নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বলছি, শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তাকে কেউ যেন নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার না করেন।’ স্বৈরশাসকের প্রতি চরমপত্র ঘোষণার পর সন্ধ্যায় দেশবাসীর উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে আইয়ুব খান নতি স্বীকার করে ঘোষণা করেন, তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ২৩ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে ১০ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ চিত্তে প্রিয় নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এরপর ’৫২ ও ’৬৯-এর রক্ত স্রোত পথ বেয়ে আসে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে আমরা বিজয়ী হয়েছি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সে-সব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর (আমার হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক) বলেছিলেন, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না। চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। জননী জন্মভূমির বীর শহীদদের স্মরণে শপথ নিয়ে বলছি যে, রক্ত দিয়ে হলেও বাংলার স্বাধিকার আদায় করবো। যে ষড়যন্ত্রকারী দুশমনের দল ১৯৫২ সাল হতে শুরু করে বারবার বাংলার ছাত্র-যুবক-কৃষক-শ্রমিককে হত্যা করেছে। যারা ২৩ বছর ধরে বাঙালির রক্ত-মাংস শুষে খেয়েছে, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন বানচালের জন্য, বাঙালিদের চিরতরে গোলাম করে রাখার জন্য তারা আজও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। শহীদের আত্মা আজ বাংলার ঘরে ঘরে ফরিয়াদ করে ফিরছে, বলছে, বাঙালি তুমি কাপুরুষ হইও না। স্বাধিকার আদায় করো। আমিও আজ এই শহীদ বেদী হতে বাংলার জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, প্রস্তুত হও, দরকার হয় রক্ত দিবো। কিন্তু স্বাধিকারের দাবির প্রশ্নে কোন আপোষ নাই।’ অমর একুশে পালনে শহীদ মিনারে ব্যক্ত করা জাতির জনকের এই অঙ্গীকার আমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি।

একুশে ফেব্রুয়ারি যুগে যুগে আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। বিশেষ করে ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় আসীন।একুশের চেতনার পতাকা হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সুন্দরভাবে সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে একের পর এক লক্ষ্যপূরণ করছে। সবধরণের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সমগ্র বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জনহিতকর এসব সাফল্য বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। মহান একুশের চেতনায় জাগ্রত বাংলার মানুষ অতীতের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের আর্থসামাজিক বিকাশ আরও বেগবান করবে-এই হোক এবারের একুশের অঙ্গীকার।

লেখক: সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সংসদ সদস্য; বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।

;