সাভানায় শরণার্থীদের করোনাক্রান্ত ঈদ



মঈনুস সুলতান
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদ উপলক্ষে পারিবারিক পরিসরে আমি রান্নাবান্না করছি প্রায় দুই যুগের মতো, কিন্তু এ শিল্পে আমার কামিয়াবি হাসিল হয়েছে স্বল্প, খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে বিব্রত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে প্রচুর। হাল ছাড়িনি, কিন্তু আজ ভোরবিহানে সেমাই রান্না করতে গিয়ে যে হালত হয়েছে, তাকে সফলতা বলার কোনো কায়দা নেই। আজকের এ করোনাক্রান্ত ঈদে আমি সাভানা শহরের আরো দুয়েকজন সমমনা মানুষের সঙ্গে মিলেঝুলে—পৃথিবীর হরেক দেশ থেকে নানাবিধ যুদ্ধ কিংবা সামাজিক সংঘাতে বাস্তুচ্যুত হয়ে এখানে এসে রিসেটেল্ড হওয়া কয়েকটি রেফিউজি পরিবারকে খাবার পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। আমার স্পেসিফিক দায়িত্ব হচ্ছে ফিস কাবাব ও সেমাই প্রস্তুত করা। টুনা মাছের কাবাবগুলো আকৃতিতে বটবৃক্ষের ঝরা-পাতার মতো দেখালেও তা স্বাদে হয়েছে উমদা। এ নিয়ে হীনমন্যতার কোনো কারণ নেই, তবে বিপত্তি ঘটেছে সেমাইকে জর্দায় রূপান্তরিত করতে গিয়ে। তা চটকে হান্ডির তলায় এমন চেরা-চ্যাপ্টা লেগে সেঁটে আছে যে, চিমটা দিয়ে টেনেও তা বর্তনে উপস্থাপন করার কোনো কুদরত থাকেনি। বিপদগ্রস্ত হয়ে টেলিফোনে কন্যা কাজরিকে মুশকিল আসান করতে এত্তেলা দিই। পরিস্থিতি যে কতটা খতরনাক—তা বোঝানোর জন্য টেক্সট্ ম্যাসেজের সাথে যুক্ত করি, হান্ডির তলদেশের ফটোগ্রাফ। মেয়ে আমোদ পেয়ে জবাবে জানায়—জকড়িমকড়ি লাগা সেমাইগুলোকে দেখাচ্ছে আরবি হরফে ক্যালিওগ্রাফি করে লেখা ঈদ মোবারকের মতো। আমি বিলা হয়ে সেলফোন সরিয়ে রাখি।

যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর হার লাখের দিকে আগাচ্ছে। বিষয়টিকে আমলে না এনে মূলত রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সক্রিয় উৎসাহে হরেক রাজ্যের গভর্নররা লকডাউন তুলে নিয়েছেন। আমাদের রাজ্য জর্জিয়ার গভর্নর আরেক কাঠি সরস, তিনি মৃত্যুর হারকে ডেটা মেনিপুলেশনের মারপ্যাঁচে কম করে দেখিয়ে চেষ্টা করছেন—মুভি থিয়েটার, স্টেডিয়াম, সমুদ্রসৈকত ও স্কুলগুলো খুলে দিতে। দোকানপাট বেশ কিছু খুলে গেছে বটে, তবে আমার মতো যে সব নাগরিক—হয় বয়সের ভারে পরিশ্রান্ত অথবা নানাবিধ রোগেশোকে আক্রান্ত, স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে তাদের গ্রোসারি শপ ইত্যাদিতে যেতে জোরেশোরে নিষেধ করা হচ্ছে। তো এ পরিস্থিতিতে চাইলেই আমি কোনো দোকানে গিয়ে সেমাইয়ের বিকল্প অন্য কোনো মিষ্টান্ন কিনে আনতে পারি না। কাজরি পরবর্তী টেক্সটে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। আমি অপেক্ষা করি, দেখা যাক কী হয়...।

ড্রাইভওয়েতে এসে থামে ফেডএক্স-এর মালামাল সরবরাহ করা গাড়ি। মাস্ক পরা ড্রাইভার একটি গিফট প্যাকেট সিঁড়িতে রেখে ফিরে যান। বুঝতে পারি, কাজরির কাছ থেকে এসেছে ঈদের উপহার। অ্যালকোহল রাব দিয়ে ঘঁষামাজা করে সাবধানে বাক্সটি খুলি। বেরিয়ে আসে গোলাপজলের সুন্দর একটি শিশি। চটজলদি তা সাবানজলে চুবিয়ে গামছা দিয়ে মুছে-টুছে অপেন করি। পুরো আঙিনা ভরে ওঠে পুষ্পের চনমনে খোশবুতে। কাজরির কাছ থেকে টেক্সট্ আসে ফের। জানতে পারি, সে জখমি সেমাইয়ের বিকল্প রাইস পুডিং নিয়ে আসছে। আমি জলদি করে খাবারের কৌটা ও তার ঈদোপহারের প্যাকেট ড্রাইভওয়েতে এনে রাখি। আমাদের মেয়ে কাছেই বসবাস করছে, তার কোনো কোনো বান্ধবী করোনার ব্যাপক বিস্তারে এক্সপোজড্ হয়েছে, তাই আমরা আজকাল সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের হাটবাজার করতে সে সহায়তা যোগাচ্ছে, তবে দৈহিকভাবে কাছে আসছে না, আমরা বাতচিত করছি কেতাবি কায়দায় ছয় ফুট দূরত্ব বহাল রেখে।

সড়কের পাশে গাড়ি পার্ক করে কাজরি ড্রাইভওয়েতে এনে রাখে রাইস পুডিংয়ের সওদা। ঈদোপহারের প্যাকেট খুলে সাবানজলে ভিজে নেতানো ফ্লোরাল হেয়ার ক্লিপের দিকে নজর দিয়ে সে চোখ কুঁচকে তাকায়। আমি উপহারটি বিশদভাবে ধোয়াপাকলা করে জীবাণুমুক্ত করার জন্য ‘স্যারি’ বলি। ‘নো প্রবলেম, বাপি, ইটস্ আ কুল ঈদ গিফট... ইট উইল ড্রাই সুন..।’ সে খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, ‘ঈদ মোবারক।’ আমি মনে মনে হিসাব কষি, আর কতদিন আমাদের পারিবারিক পরিসরে জারি থাকবে সামাজিক দূরত্ব?

বেলা পনে-এগারটা হতে চলল, মিসেস নিয়ামা ইবরিম এখনো এসে পৌঁছেননি, তাঁর দশটা পনেরতে এসে পৌঁছার কথা, তাই বিরক্ত লাগে। ওয়েস্ট আফ্রিকার ঘানা থেকে অনেক বছর আগে অভিবাসী হয়ে এসে এদেশে সেটেল্ড হওয়া মিসেস ইবরিম হাইস্কুলের ক্যাফেটেরিয়াতে কুক হিসাবে কাজ করেন। পার্টি-পর্বে তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে প্রস্তুত করে দেন আফ্রিকান ডিশ। রান্নার হাতটি তাঁর চমৎকার, তবে সময় মতো কোথাও এসে পৌঁছানোর স্বভাবটি এখনো আয়ত্ত করে উঠতে পারেননি। আজকের ঈদ-খাবারের আয়োজনে তিনি ওয়েস্ট আফ্রিকান কেতার জলোপ রাইস রান্না করে নিয়ে আসছেন। তিনি এসে না পৌঁছানো অব্দি কিছু করা যাবে না।

আমি ড্রাইভওয়েতে আগুপিছু পায়চারি করতে করতে মিসেস নিয়ামা ইবরিমের বিষয়টা নিয়ে ভাবি। সাভানা শহরকে বিষয়বস্তু করে কিছু একটা লেখার প্রয়াশে আমি মাস কয়েক আগে তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ইন্টারভিউ করি। তাঁর জীবনের কিছু ঘটনা নোটবুকে ইন ডিটেইলস্ টুকে রেখেছিলাম। আমার স্টাডিতে খুঁজলে হয়তো খাতাটি পাওয়া যাবে। বাগিচার বড়সড় গাছটিতে ফুটেছে গোলাপি বর্ণের অজস্র পাউডার পাফ ফুল। একটি মকিং বার্ড পাতায় ডানা ঘষে সুরেলা কণ্ঠে ছড়াচ্ছে সুইট টিউন। নোটবুকে টুকে রাখা কিছু কিছু তথ্য ফিরে আসে আমার করোটিতে। সেপ্টেম্বর এলেভেনের ঘটনাটি ঘটার মাস খানেক আগে নববধূ হিসাবে সাভানা শহরে এসেছিলেন মিসেস ইবরিম। তাঁর স্বামী ডক্টর আবদু ইবরিম জর্জিয়া সাদার্ন ইউনিভারসিটিতে পোস্ট ডক্টরেল ফেলো হিসাবে কাজ করছিলেন। বিয়ের পর ভিসার প্রতীক্ষায় প্রায় তিন বছর নিয়ামা ইবরিম বাস করেছিলেন ঘানার রাজধানী আক্রায় তাঁর পিতা-মাতার বসতবাড়িতে। এখানে এসেই হাল ধরেছিলেন সংসারের। ঈদের পর দিন ছিল তাঁদের বিবাহবার্ষিকী।

ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে গেছে সেপ্টেম্বর এলেভেনের ট্র্যাজিডি। এর প্রতিক্রিয়ায় কোনো কোনো জায়গায় ভিন্ন গাত্রবর্ণের আমেরিকান মুসলমানদের হেরাস করার বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যাপার ঘটতে শুরু হয়েছে। ঈদের আগে চানরাতে সাভানার শহরের ইসলামিক সেন্টার নামক ছোট্ট মসজিদটিকে কে বা কারা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তো স্ত্রী নিয়ামাকে ঘরে একা রেখে ডক্টর ইবরিম মসজিদ প্রাঙ্গণে গিয়ে অন্যান্য মুসলমানদের সাথে হাত লাগান জ্বলাপোড়া ছাই ইত্যাদি পয়পরিষ্কারের কাজে। ড্রাইভওয়েতে খাটানো হয় চাঁদোয়া, তার তলায় বিছানার চাদর বিছিয়ে অন্যান্যদের সঙ্গে ডক্টর ইবরিম পুলিশ প্রহরায় আদায় করেন ঈদের নামাজ। তারপর তিনি ঘরে না ফিরে ঈদের বাহারে ধড়াচূড়া ও টুপি পরে চলে যান শৌখিন শপিং সেন্টারে। ওখানে বিবাহবার্ষিকীর রাতে নববধূর জন্য একটি ব্যক্তিগত উপহার কিনে নিয়ে হেঁটে হেঁটে চেষ্টা করছিলেন ট্যাক্সি পাওয়ার। ছুটন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে ফায়ার করা গুলির আঘাতে তিনি নিহত হন।

মিসেস নিয়ামা ইবরিমের গাড়ি ঠিক এগারটা বাইশে এসে ড্রাইভওয়েতে থামে। ফুলের মোটিফ আঁকা বাহারে হেজাব পরে এসেছেন তিনি। নিজেই টেনে নামান কার্ডবোর্ডের ভারী বাক্সটি। আমাকে ঈদ মোবারক বলে হাতের ইশারায় ব্যাকসিটে রাখা গান ভায়োলেন্স বিরোধী প্লেকার্ডটি দেখিয়ে ড্রাইভিং সিটে ফিরে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেন। আমি তাঁর অপস্রিয়মাণ টেইল লাইটের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। তাঁর দিনযাপন সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না। এক যুগের নববধূটি হালফিল প্রৌঢ়ত্ব অতিক্রম করে পড়েছেন বয়সের ভাটিতে। ঘানায় আর ফিরে যাননি নিয়ামা, সাভানাতেই থিতু হয়েছেন। কোনো পুরুষ পার্টনার জুটেছে কী—না জেনে বলা মুশকিল। তবে বিদেশ বিভূঁইয়ে নিহত ডক্টর ইবরিমের স্মৃতিকে তিনি জিইয়ে রেখেছেন। প্রতি ঈদে মৃত স্বামীর প্রিয় খাবার—টমেটো সচে সব্জি মেশানো জলোফ রাইস প্রচুর পরিমাণে রান্না করে মসজিদে এনে বিতরণ করেন মুসল্লিদের মধ্যে। তারপর ডক্টর ইবরিমের গুলিবিদ্ধ ফটোগ্রাফ সাঁটা একটি প্লেকার্ড নিয়ে গিয়ে দাঁড়ান বন্দুকের দোকানের সামনে, নীরবে প্রতিবাদ করেন, নিরপরাধ মানুষকে অস্ত্রাঘাতে হত্যা করার বিরুদ্ধে। সাভানা শহরে সয়ংক্রিয় অস্ত্র বিক্রি হয় প্রচুর। গান ভায়োলেন্সে প্রতিবছর মৃত্যু হয় অনেক মানুষের। মাঝেসাজে এখানে আয়োজিত হয় বন্দুক সংক্রান্ত ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এ সব অ্যাক্টিভিটির পয়লা কাতারে প্লেকার্ড হাতে দেখা যায় বিধবা নিয়ামা ইবরিমকে।

সাভানা শহরটি সরকারি উদ্যোগে খুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে, কিন্তু মুসল্লিদের ব্যাপক অংশ বয়স্ক বিধায় মসজিদে এবার ঈদের জামাত হয়নি। তাই ডক্টর ইবরিমের ইয়াদগারিতে প্রস্তুত জলোফ রাইস নাইমা রেফিউজিদের সেবার জন্য ডোনেট করে দিলেন। ক্যাটারিং সার্ভিসে কাজ করা মহিলা ইনি, স্টাইরোফোমের বক্সে জলোপ রাইস এর সঙ্গে প্লাস্টিকের চামচ, কাঁটা ও ন্যাপকিন দিয়ে সমস্ত কিছু পেশাদারি যত্নে পুরে দিয়েছেন পলিথিনের আলাদা আলাদা ব্যাগে। আমি গ্লাভস্ পরে তাতে ফিস কাবাব ও রাইস পুডিং রাখতে যাই। খাবার বিতরণে দেরি হয়ে যাচ্ছে, বড্ড অস্থির লাগে। জোসেফ মরগ্যানকে রিং করবো কিনা—ভাবি। সুহৃদ মরগ্যান আমাকে লিফট দিয়ে খাবার বিতরণে সহায়তা করার কথা দিয়েছেন। তিনি এখনো এসে পৌঁছাননি কেন? বেজায় টেনশন লাগে। আমার কব্জিতে ইনজুরির জন্য আমি ড্রাইভ করতে পারছি না। নিয়মিত পেইন কিলার নিতে হচ্ছে। প্বার্শ-প্রতিক্রিয়ায় আমার মধ্যে ধৈর্যটা কমে গেছে, সাথে সাথে বেড়েছে টেলিফোনে বেফজুল কথাবার্তা বলার প্রবণতা।

সারোকিন সেকেজির কাছ থেকে টেক্সট্ আসে। ইরানের নারী সারোকিন মরগ্যান সাহেবের সংসার করছেন অনেক দিন ধরে। বছর তিনেক হলো এ বয়স্ক নারী মারাত্মক রকমের বাত ও অন্যান্য ব্যাধিতে পঙ্গু প্রায়। চলাফেরা করেন চাকাওয়ালা ওয়াকার ঠেলে ঠেলে, তবে এখনো প্রতি ঈদে খরিদ করেন কয়েক জোড়া হাইহিল স্যান্ডেল। তাঁদের ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়ির একটি স্বতন্ত্র কামরা জুড়ে রাখা আছে শতাধিক হাইহিলের কালেকশন। টেক্সটে সারোকিন আমাকে টেলিফোন করার পার্মিশন চেয়েছেন। এ মহিলার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে ইনি অনুমতি ছাড়াই আমার ডান হাতে চুমো খেয়ে খোশআমদেদ জানান। তো এ মুহূর্তে রিং করার জন্য এত আদব-কায়দা করছেন কেন? তাঁর অনুরাগ-ঋদ্ধ স্বামী মরগ্যান সাহেবের তো আমার বাড়িতে এসে পৌঁছানোর কথা? তিনি আসেননি কেন? মেজাজ খাট্টা হয়ে ওঠে।

রোদের তাপ বাড়ছে, আমি বাগানের ছাতাটি খুলে দিয়ে তার নিচে গিয়ে বসি। মরগ্যান সাহেবের প্রচুর বয়স হলেও তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম আছেন। আমাদের ত্রাণ তৎপরতায় তিনি সাহায্য করছেন বিগতভাবে। পেশায় মানুষটি প্রকৌশলী, আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কয়েক বছর কন্সট্রাকশন ওয়ার্কের কন্টাকটারিও করেছেন। রেজা শাহ পাহলবির রাজত্বের শেষ দিকে ইনি ইরানে যান নগর নির্মাণে সহায়তা করতে। তখন বিবাহিত হয়েছিলেন সারোকিনের সঙ্গে। ফার্সি বলেন ভালোই। ধর্মে মুসলমান নন, তবে কলেমা জানেন, হাফিজ ও শেখ সাদির কিছু গজল ও কসিদা মুখস্থ করে রেখেছেন। মরগ্যান সাহেবের বিত্ত প্রচুর, পার্সিয়ান গালিচা সংগ্রহ করে চিত্ত বিনোদন করে থাকেন। তাঁর বসতবাড়ির ড্রয়িংরুমটিকে কার্পেটের দোকানের মতো দেখায়।

আমার বিরক্তি বাড়ে। টেক্সটের জবাব না দিয়ে সারোকিনকে সরাসরি রিং করি। তিনি প্রচুর সময় নিয়ে আমাকে ঈদ মোবারক জানিয়ে বলেন, কাজরির জন্য নিজ হাতে তৈরি করেছেন পার্সিয়ান রাইস ও শিসকাবাব প্রভৃতি। মহিলা কেবলই কথা বলছেন, থামেন না, ঠিক বুঝতে পারি না, তাঁর স্বামী মরগ্যান কোথায় গুম হলেন? গরমের মৌসুমে ঈদ হলে কী ধরনের আতর ইস্তেমাল করতে হয়—তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে অতঃপর সারোকিন জানান, স্বামীকে তিনি একটু আগে পাঠিয়েছেন শপিং মলে খেলনা কিনতে। গেল রাতে মরগ্যান টেলিফোনে জানতে চেয়েছিলেন রেফিউজিদের নির্দ্দিষ্ট কোনো চাহিদা আছে কিনা। আমি জবাব দিয়েছিলাম, পাঁচটি পরিবারে আছে ছোট ছোট শিশু। আমরা সপ্তাহ খানেক আগে তাদের অ্যাপার্টমেন্টে ফুড ব্যাংক থেকে জোগাড় করা খাবার-দাবার পৌঁছে দিয়েছি বটে, কিন্তু ঈদে শিশুদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। মরগ্যানের সেলফোনে চার্জ ছিল না, তাই তাঁর হয়ে সারোকিন অ্যাপোলজি চান। বুঝতে পারি শিশুদের জন্য কিছু কেনা যায়নি—এ তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় সারোকিন মরগ্যানকে শপিংমলে পাঠিয়েছেন খেলনা কিনতে। বয়সের নিরিখে মরগ্যান সাহেব আমার মতো হাই-রিস্ক ক্যাটাগরিতে পড়েন। খোদা-না-খাস্তা তাঁর কিছু হলে জগত-সংসারে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব সবচেয়ে বেশি।

আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। ড্রাইভওয়েতে এসে থামে মরগ্যানের গাড়ি। কাচের হেড-শিল্ডের সাথে পলিথিনের স্বচ্ছ সুরক্ষা গাউন পরে এসেছেন। সাথে করে খেলনা ছাড়াও তিনি নিয়ে এসেছেন প্রতিটি রেফিউজি পরিবারদের জন্য দুই রকমের কাবাব ও ফলমূলে পূর্ণ আলাদা আলাদা শপিংব্যাগ। কাজরির জন্য পার্সিয়ান রাইসের ডিশের ওপর সেলোফোনে মোড়া ফুলের তোড়াসহ আস্ত একটি বাস্কেট নামিয়ে দিয়ে আমাকে গাড়িতে উঠতে ইশারা দেন। আমরা কথাবার্তা তেমন বলি না, তবে মরগ্যানের অনুরোধে আমি টেলিফোন স্ক্রিনে তাঁর লেখা একটি ফেসবুক পোস্টিং পড়ি।

পোস্টিংয়ে তিনি নগরীর চেনা মুখ—রাজ্যসভার এক আইনপ্রণেতা সম্পর্কে নাম উল্লেখ না করে আলোচনা করেছেন। রিপাবলিকান এ রাজনীতিবিদ করোনা সংক্রমণের প্রথম থেকে তার মিডিয়া চ্যানেলে প্রচার করে আসছেন যে, ভাইরাসের বিস্তৃতি হচ্ছে আদতে বিদেশ থেকে আগত অভিবাসী—বিশেষ করে চীনাদের আমেরিকার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র বিশেষ। তিনি সামাজিক দূরত্ব যে ভ্রান্ত একটি আইডিয়া—তা নিয়ে তৈরি করেছেন প্রচার ভিডিও। সামাজিক দূরত্বের নীতিমালাকে অগ্রাহ্য করে নিজ মালিকানাধীন কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে শ্রমিকদের মাস্ক ও ডিসইনফেকশন লোশন ইত্যাদি সরবরাহ না করে কাজে বাধ্য করেছেন। আইনসভায় ইনি কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান-আমেরিকানদের শহরতলীতে ভাইরাস টেস্টিং সেন্টার স্থাপন করার বিরোধিতা করেন। দরিদ্র কর্মচারীদের বেকার ভাতা বাতিলের প্রস্তাবও উত্থাপন করেছেন। আইনপ্রণেতা মরগ্যান সাহেবের প্রতিবেশি হিসাবে একই পাড়ায় বাস করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সামাজিক দূরত্ব বহাল রেখে তার পরিবারকে আইসোলেশনে নিয়ে রক্ষা করছেন। এক দিকে ভাইরাস টেস্টিংয়ের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিরোধিতা করছেন, অন্য দিকে ইনি তার নিরাপত্তারক্ষী ও ব্যক্তিগত স্টাফদের প্রতি সপ্তাহে টেস্ট করাচ্ছেন। আমি পোস্টিং পড়া শেষ করে চোখ তুলে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাই। ড্রাইভ করতে করতে তিনি মুখোশটি সামান্য নামিয়ে এ আইনপ্রণেতা সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘ফার্সিতে এ ধরনের আচরণকে বলা হয় মুনাফিকি।’ লবজটির সঙ্গে আমি পরিচিত, ফেসবুকে আইনপ্রণেতার নাম উল্লেখ না করে আলোচনা করে ফায়দা কী—ঠিক বুঝতে পারি না। পাশাপাশি বসেও আমরা দুজনে কমবেশি মুখে মাস্ক বজায় রাখছি। এ হালতে গুছিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা মুশকিল। ভাবি পরে একসময় টেলিফোন করে এ ব্যাপারে ফলোআপ করতে হবে।

যাত্রাপথে ট্র্যাফিক নেই একেবারে, তবে আমরা কথাবার্তা বলছি না, তাই দীর্ঘ মনে হয়। আমরা এ মুহূর্তে রওয়ানা হয়েছি সাভানা শহর থেকে খানিকটা দূরে আইল অব হোপ নামে ব্রিজে সংযুক্ত একটি আইল্যান্ডের দিকে। ওখানকার বিশাল একটি ম্যানসনে একাকী বাস করছেন ইরাকের অভিবাসী চিত্রকর আহাদ কালাব। ছবি আঁকার হাত তাঁর দুর্দান্ত। এ দেশে সেটেল্ড হয়ে চিত্রকলা বিক্রি করে দিন গোজরান করছিলেন। সংক্রমণের সংবাদ চাউর হওয়ার সপ্তাহ দিন আগে ইনি অত্যন্ত বিত্তশালী একজন মানুষের বিরাট একটি ম্যানসনের বলরুমে দেয়াল-জোড়া ফ্রেস্কো আঁকার কমিশন পান। বিত্তবান বাস করেন লস এঞ্জেলসে। বছরে একবার ক্রিসমাসের সময় ফিরে এসে বলরুমে আয়োজন করেন নিউইয়ার্স পার্টি। তারপর পুরো বছর ম্যানসনটি খালি পড়ে থাকে। আহাদ কালাবের গাড়ি-টাড়ি নেই। প্রতিদিন সাভানা থেকে আইল অব হোপে গিয়ে ছবি আঁকার কাজ করাটা মুশকিল। তাই তাকে ম্যানসনের বাগিচায় এক কামরায় গেস্ট-কটেজে থাকতে দেওয়া হয়। মাত্র কয়েকদিন কাজ করার পর কালাবের শরীরে ফুটে ওঠে করোনার আলামত। জ্বর, কাশি ও মাথা ধরা। তাঁর হেল্থ ইনস্যুরেন্স নেই, সিম্পটনও মাইল্ড, তাই তিনি গেস্ট-কটেজে নিজেকে আইসোলেটেড করে রাখছেন।

নগরীর এখানে ওখানে আহাদ কালাবের প্রদর্শনী হয়েছে কয়েকবার। তাঁর সঙ্গে একবার অন্তরঙ্গভাবে বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তাও বলেছি। কথা দিয়েছিলাম, তাঁকে নিয়ে লিখব, লিখতেও বসেছিলাম, কিন্তু শেষ করতে পারিনি। ধর্ম বিশ্বাসে কালাব ইয়াজিদি। যতটা জেনেছি, ইয়াজিদি হচ্ছে দজলা-ফোরাত অঞ্চলের অতি প্রাচীন একটি একেশ্বরবাদী ধর্মমত। এদের সাথে কারবালায় নবী (দঃ)-এর দৌহিত্রের সঙ্গে নির্মম আচরণ করা মোয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদের কোনো সম্পর্ক নেই। এদের উপাসনা পদ্ধতির সঙ্গে সুফি তরিকার রীতি-রিচ্যুয়েলের মিল আছে। এরা কথা বলেন কারমানজি ভাষায়, অনেকেই দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে আরবি জবানটাও জানেন। পালন করেন ঈদ ও শবেবরাত।

আহাদ কালাব ইরাকের নিনেভ অঞ্চলের শেখান শহরের মানুষ। সম্প্রতি ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা অত্র এলাকা দখল করে নিলে প্রায় চল্লিশ হাজার ইয়াজিদি হয়ে পড়ে বাস্তুহারা। এদের ‘কুফফার’ ফতোয়া দিয়ে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা হত্যা করে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। একই সাথে তাদের হাতে মালে গনিমত হিসাবে বন্দী হন প্রায় ৭০০০ জন নারী। এদের কাউকে কাউকে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হয়। অনুগতদের নিকাহ প্রথার মাধ্যমে উপপত্নি হিসাবে যোদ্ধা পুরুষদের সংসার করার অনুমতি দেওয়া হয়। যারা ধর্মান্তরিত হতে আপত্তি জানায়, তাদের কাউকে কাউকে সেক্স-স্লেভ হিসাবে বিক্রি করে দেওয়া হয় সিরিয়ার হিউম্যান ট্র্যাফিকারদের কাছে।

আহাদ কালাব ও তাঁর স্ত্রী জাবিলা কালাব আরো হাজার খানেক ইয়াজিদির সঙ্গে বন্দী হয়েছিলেন ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের হাতে। তাদের মাউন্ট শিনজারের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কুর্দি গেরিলাদের আক্রমণে কিছু বন্দীকে পেছনে ফেলে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা উঠে যায় পর্বতের দুর্গম হাইড আউটে। আহাদ কালাব কুর্দি গেরিলাদের সহায়তায় লেবাননে পালিয়ে এসে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অতঃপর রেফিউজি কেটাগরিতে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার সুযোগ পান।

ইসলামি স্টেটের সঙ্গে কুর্দিদের যুদ্ধজনিত গোলযোগে আহাদ কালাব বিচ্ছিন্ন হন তাঁর স্ত্রী জাবিলা কালাবের সঙ্গে। অনেক চেষ্টা করেও জাবিলার অদৃষ্টে কী ঘটেছে—কোনো খোঁজ পাননি তিনি। কিছু দিন আগে সাভানা শহরে হয়ে গেছে তাঁর একটি একক প্রদর্শনী। তাঁর আঁকা অনেকগুলো চিত্রে আবছাভাবে ফুটে উঠেছে জাবিলার মুখচ্ছবি। পত্রিকায় ভালো রিভিউ হয়েছে, কিছু চিত্রকলা বিক্রিও হয়েছে। অন্তরঙ্গ আলাপে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর প্রতিক্রিয়া। চোখের জল মুছে বলেছিলেন, ‘আই আর্নড সাম মানি বাই সেলিং দ্য পেইনটিংস্, বাট...ইউ নো...ডিডন্ট গেট ব্যাক মাই লাভ।’

যে ম্যানসনের গেস্ট-কটেজে এ মুহূর্তে আইসোলেশনে আছেন কালাব, ওখানে স্থলপথে যেতে পড়ে একটি ট্রেইলার পার্ক, যেখানে ক্যারিবিয়ান ক্রুজে গিয়ে যে কয়েকজন মানুষ সংক্রমিত হয়েছিলেন কোভিড-১৯-এ, তাঁরা আইসোলেশনে বাস করছেন। অন্য উপায় হচ্ছে, নোনা জলবাহী লেগুনে নৌকা বেয়ে গিয়ে ওঠা ম্যানসনের পেছন দিকে জেটিতে। মরগ্যান আইল অব হোপের বোট ডক করার জেটির দিকে ড্রাইভ করতে করতে কালাবের সঙ্গে সেলফোনে কথা বলে নেন। গাড়িটি পার্ক করে খাবারের ব্যাগ হাতে আমরা জেটিতে আসি। ওখানে বাঁধা নানা আকারের অনেকগুলো বোট। খানিক খুঁজে আমরা চারজন বসার উপযোগী একটি ছোট্ট নৌকা লকেট করি। মরগ্যান কালাবের দেওয়া কোড ব্যবহার করে খুলে ফেলেন লক। লেগুনের জলে ভাসছে ম্যালার্ড জাতীয় হাঁস। চতুর্দিক এমন সুনশান হয়ে আছে যে, ইঞ্জিন স্টার্ট করতে ইচ্ছা হয় না। মরগ্যান ঢিমেতালে বৈঠা ফেলেন। যেতে যেতে দেখি দুপাশে নলখাগড়ার মতো দীর্ঘ ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে শ্বেতশুভ্র সারস।

জেটিতে বোট ভিড়িয়ে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠি। বাগান পেরিয়ে ম্যানসনটির চকমিলান আকার-আয়তন দেখে আমার চোখ দুটি ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। জেটির লাগোয়া বোট-হাউসে নোঙর করে রাখা একটি শৌখিন ত্রিমারান বোট, পাশেই ঢেউয়ে মৃদু মৃদু দুলছে বর্ণাঢ্য সিপ্লেন। দেখতে পাই, সেলফোন কানে লাগিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন কালাব। আমরা বোট-হাউসের বারান্দায় খাবারের ব্যাগটি রাখি। বেশ দূরে দাঁড়িয়ে তিনি হাত নেড়ে সেলফোনে ঈদ মোবারক বলেন। মরগ্যান লাউড স্পিকার অন করেন। জানতে পারি, তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন, চলাফেরা করতে পারেন, তবে সারাক্ষণ বড় দুর্বল লাগে। যে বলরুমের দেয়ালে তিনি ফ্রেস্কো আঁকতে শুরু করেছিলেন—তা আকারে এত বড় যে, পার্টি-পর্বে ওখানে শত খানেক গেস্ট এন্টারটেন করা যায়। বিশাল পরিসরের ফ্রেস্কোটি শেষ করতে সময় লাগবে। অসুবিধা কিছু নেই। ম্যানসনের কেয়ার টেকার তাঁকে প্রায়োজনে আরো মাস-দেড়মাস গেস্ট-কটেজে থাকার অনুমতি দিয়েছেন। ডিপ ফ্রিজে খাবার-দাবারও আছে যথেষ্ট। আমাদের দেখতে পেয়ে কালাব এত খুশি হয়েছেন যে, ইশারায় আলিঙ্গনের ভঙ্গি করে গেয়ে ওঠেন ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের পালা-পার্বণে গীত একটি জনপ্রিয় গানের দুটি কলি।

আইল অব হোপ থেকে সাভানা শহরে ফিরে ডাউন টাউনের দিকে ড্রাইভ করতে গিয়ে কী ভেবে মরগ্যান ঢুকে পড়েন একটি গলিতে। দুটি ব্লক পেরিয়ে আমরা চলে আসি ছোট্ট একটি শপিং কমপ্লেক্সের কাছে। মারণাস্ত্র বিক্রির দোকান ‘গান স্মিত’র সামনের পেভমেন্ট তিনি গাড়িটি দাঁড় করান। বন্দুকের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনে একসাথে মাত্র দুজন ক্রেতাকে দোকানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। বাকিরা সারি দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছেন তাদের পালা আসার। খানিক দূরে পার্কিংলটে মারণাস্ত্র ব্যবহার বিরোধী প্লেকার্ড হাতে একাকী দাঁড়িয়ে মাস্কে মুখ ঢাকা হেজাব পরা মিসেস নিয়ামা ইবরিম। আমরা তাঁর সমর্থনে নিরাপদ দূরে দাঁড়িয়ে রুমাল নাড়ি। কয়েকজন বন্দুক খরিদ করনেওয়ালা যুবক ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের দিকে তাকান। দুজন আঙুল নিচু করে অশ্লীলভাবে ইশারা করেন। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে ভাবি অত্র এলাকায় যেভাবে মারণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে—আমার জীবদ্দশায় কি এ প্রবণতার অবসান ঘটবে?

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হয় জর্জিয়া সাদার্ন ইউনিভারসিটির পেছন দিককার দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুসিত পল্লীতে। ওখানে বাস করছেন কেম্বোডিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে আগত বয়োবৃদ্ধ চাম দম্পতি। সপ্তাখানেক আগে মিসেস লেবু-কে চাম তাঁর পক্ষাঘাতে স্থবির স্বামী মি. ফাটেল সান চামকে ঘরে একা রেখে উবার চড়ে গ্রোসারি শপিংয়ে গিয়েছিলেন। বাজার সওদা নিয়ে দোকান থেকে বেরোতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ছবি আঁকা টিশার্ট পরা এক শ্বেতাঙ্গ মুণ্ডিত মস্তক যুবক ‘এক্সকিউজ মি...’ বলে তাঁকে থামায়। তারপর কেশে তাঁর শরীরে থুতু ফেলে চিৎকার করে বলে, ‘ইউ ফাকেন চায়নিজ, ইউ ব্রট করোনা ভাইরাস হিয়ার...গো ব্যাক টু ইয়োর আগলি হোম।’ আমি নিরীহ এ বৃদ্ধার হেরাসমেন্টের কাহিনী বর্ণনা করে স্থানীয় পত্রিকায় চিঠি লিখেছিলাম, পত্রটি ছাপেনি। মরগ্যান সাহেব পত্রিকার অ্যাডভাইজারি বোর্ডে আছেন, আমি তাঁকে গতকাল বিষয়টি অবহিত করি। তিনি ড্রাইভ করতে করতে ঘটনাটি ফের ব্যাখ্যা করতে বলেন। বিরক্ত হয়ে আমি বলি, মহিলা প্রথমত চায়নিজ নন। আর চায়নিজরা যে আমেরিকাতে ভাইরাস পাঠিয়েছে, তারও কোনো প্রমাণ নেই। গবেষকরা নিউইয়র্কে আক্রান্তদের শরীর থেকে নেওয়া জীবাণু পরীক্ষা করে বলছেন এগুলো এসেছে ইউরোপ থেকে। তো ভাইরাসের বিষয়-আশয় যাই হোক চাম পরিবার অভিবাসী হয়ে এদেশে এসেছে মূলত আমেরিকার যুদ্ধনীতির কারণে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের জামানায় যুক্তরাষ্ট্রের কার্পেট বম্বিংয়ে কেম্বেডিয়ার কমপঙচনঙ এলাকায় অবস্থিত তাঁদের পুরো গ্রামটি জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে বাস্তুহারা হয়ে পুরো এগারো বছর চাম পরিবার কাটান থাইল্যান্ডের শরণার্থী ক্যাম্পে। তারপর কপালগুণে রেফিউজি ক্যাটাগরিতে অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকেন।

মরগ্যান এবার জানতে চান, ‘ডু ইউ নো এনিথিং আবাউট দিস কাপোলস্ কালচারেল ব্যাকগ্রাউন্ড? সম্পাদক ঠিক বুঝতে পারেননি চাম শব্দটি, কেম্বোডিয়ার মানুষজনকে খেমার বলে না? আমি জবাব দিই, কেম্বোডিয়ার মূলধারার মানুষজনের নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি হচ্ছে খেমার। এরা বৌদ্ধ, অনুশীলন করে তারাবাদা সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস। চামরা মুসলমান, সংখ্যালঘু, এরা খেমার মুসলিম বলেও পরিচিত।’

মরগ্যানের পরবর্তী প্রশ্ন হয়, ‘দেশে এসে অভিবাসী হওয়ার আগে এঁনারা কী ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া?’ কেন জানি আমার বিরক্তি আরেক দফা বাড়ে, তবে জবাব দেই, ‘মিসেস লেবু-কে চাম তারুণ্যে ছিলেন নৃত্যশিল্পী। নমপেনের রাজদরবারে তিনি একবার নৃত্য উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর স্বামী মি. ফাটেল সান চাম ছিলেন হাইস্কুলের শিক্ষক। এঁরা খেমার ভাষায় কথা বলেন বটে, তবে এঁদের নিজস্ব ভাষার নাম হচ্ছে খা-খা। এ ভাষার লিখনশৈলী আজকাল আর কেউ ব্যবহার করে না, ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ফাটেল সান চাম হচ্ছেন খা-খা ভাষার একজন বিশেষজ্ঞ।’ মরগ্যান এবার আসল কথায় এসে বলেন, ‘আমাদের ছোট্ট শহরের নাগরিক বৈচিত্রে এরা যুক্ত করছেন নতুন একটি এলিমেন্ট। সম্পাদক এদের সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে চান। চিঠি নয়, তুমি এঁদের নিয়ে একটি ফিচার-স্টোরি করতে পারবে কি? ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড...দু-তিনটি ছবি লাগবে কিন্তু।’ গাড়ি এসে থামে চাম দম্পতির ঘরের সামনে। ইঞ্জিন অফ করে দিয়ে মরগ্যান প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকান, আমি জবাব দিই, ‘আই উইল থিংক আবাউট দিস...আজ থাক, এ নিয়ে পরে কথা বলব। ও-কে।’

ঘরের বারান্দায় চুপচাপ বসে আছেন মিসেস লেবু-কে চাম। আমি হাত নাড়ি, তিনি চোখ তুলে তাকান, কিন্তু কিছু বলেন না। আঙিনায় ঘাস ও আগাছা বেড়ে জংলা হয়ে ওঠছে। ট্র্যাশ বিনের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা বর্জ বোঝাই আবর্জনার একাধিক ব্যাগ। মিসেস লেবু-কে চাম উঠে দাঁড়ান, তিনি কোমর সিধে করতে প্রচুর সময় নেন, টিপয় থেকে তুলে চশমাটিও চোখে লাগান। আমি কুঁজো ভঙ্গিতে এক-পা, দু-পা করে এগিয়ে আসা বৃদ্ধার দিকে তাকাই। মাস তিনকে আগে আমি একবার তাঁদের খোঁজ নিতে এ বাড়িতে এসেছিলাম। তখন মিসেস লেবু-কে চাম আমাকে তাঁদের ফ্যামিলি অ্যালবামটি দেখিয়ে ছিলেন, ওখানে আমি সটিন-রেশম ও ব্রোকেডে ঝলমলে নৃত্যের ট্র্যাডিশন্যাল পোশাক পরা যে তরুণীর ফটোগ্রাফ দেখেছি, তার সঙ্গে আমার দিকে এগিয়ে আসা কুঁচকানো ত্বক কুঁজো বৃদ্ধার কোনো মিল দেখতে পাই না।

মিসেস লেবু-কে চাম আমার কাছে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দেন। সচেতন হই যে, এ মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব বহাল রাখা সম্ভব হবে না। দ্বিধা ঝেড়ে আমি তাঁর হাত স্পর্শ করি। মৃদু হেসে জানতে চান, কী ধরনের খাবার নিয়ে এসেছি? কাবাবে হাড়গোড় কিছু নেই জানতে পেরে খুশি হন, বলেন, ‘মাই হাজবেন্ড লাভ মিট, কিন্তু চামরা মৎস্যজীবী, অনেকে বাস করে নদী বা দারিয়ার কিনারায়, ঈদে আমরা নারকেলের দুধ দিয়ে চিংড়ি মাছ রান্না করি।’ মরগ্যান এগিয়ে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে বাঁও করে পরিচিত হন। তিনি আবর্জনার ব্যাগগুলো তুলে ট্র্যাশ বিনে রাখার অনুমতি চান। মিসেস লেবু-কে মাথা হেলিয়ে সম্মতি দিয়ে তাঁর কোমরের দিকে ইঙ্গিত করেন। বুঝতে পারি, এ বৃদ্ধাও বাত-ব্যাধির আরেক ভিকটিম। আমি খাবারের ব্যাগটি নিয়ে সিঁড়ির উপর রাখি। মিসেস লেবু-কে আফসোস করে বলেন, ‘গ্রোসারিতে চিংড়ি মাছ ছিল প্রচুর, কিন্তু যে ব্যাগের দাম মাস খানেক আগে ছিল নয় ডলার, তা বেড়ে হয়েছে সাতাইশ ডলার, এত দাম দিয়ে কিছু কেনা যায় নাকি?’ অতঃপর তিনি জানান যে, তাঁরা অপেক্ষা করে আছেন সরকারের পাঠানো স্টিমুলাস চেকটি পাওয়ার। করোনা সংক্রমণজনিত মন্দায় অর্থনীতিকে জিইয়ে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নাগরিকদের জন-প্রতি ১,২০০ ডলারের চেক পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের অব্যবস্থাপনায় অনেকে চেক পেয়েছেন, অনেকে পাননি। অনেক বছরের পুরানো অভিবাসী চাম দম্পতি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। চেক পাওয়ার হক তাঁদের আছে। চেক আমি নিজেও পাইনি, আমার জানাশোনা আরো অনেকেও পাননি। পরিস্থিতি যেভাবে চূড়ান্ত অব্যবস্থাপনার দিকে আগাচ্ছে, কী বলব, বৃদ্ধাকে কোনো ভরসা দিতে পারি না। খিন্ন মনে বিদায় নিয়ে ফিরে আসি গাড়িতে।

মরগ্যান ডিসইনফেকশনের শিশিটি বাড়িয়ে দেন। আমি লোশন দিয়ে হাত পরিষ্কার করে গাড়িতে উঠি। তিনি স্টার্ট দিতে দিতে বলেন, ‘লেটস্ কাম ব্যাক টু দিস হাউস টুমরো। আমি পর্টেবল লনমোয়ার নিয়ে আসব। তুমি বৃদ্ধাকে রিং করে পার্মিশন নিয়ে রাখো। আমি তাঁর অঙিনার আগাছাময় ঘাসগুলো কেটে দিতে চাই।’

মাথায় একটি আইডিয়া খেলে যায়। চাম দম্পতির ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখা আছে খা-খা ভাষায় লেখা তালপাতার কয়েকটি পুঁথিপত্র। মিসেস লেবু-কের নৃত্যের পোশাক পরা যুবতী বয়সের একটি ছবির কপির সাথে তালপাতার পুঁথিপত্রের দুটি ছবি তুলে নিতে পারলে—স্থানীয় পত্রিকার জন্য অনায়াসে একটি ফিচার দাঁড় করানো যায়। আমি সম্ভাবনা নিয়ে ভাবি, কিন্তু ভেতর থেকে সায় পাই না। ত্রাণকাজের হিল্লা ধরে আমার একটি লেখার প্রয়োজনে এ দম্পতির ব্যক্তিগত সম্পদকে ব্যবহার করব, কাজটা কি নৈতিকভাবে সঠিক হবে?

আমরা যে রেফিউজি পরিবারদের খাবার দিতে যাচ্ছি, তাঁরা বাস করছেন শহর থেকে সামান্য দূরে—সস্তা হাউজিং ফেসিলিটিতে। মরগ্যান অই দিকে টার্ন নেন। সিগনালের লাল বাতিতে থামতেই মি. ইদ্রিসা বেনী ইসামের কাছ থেকে টেলিফোন আসে। তাঁরা অপেক্ষা করছেন। মরোক্ক থেকে অনেক বছর আগে অভিবাসী হয়ে এদেশে আসা মি. ইদ্রিসার ছেলে আবদেল বেনী ইসামের মৃত্যু হয়েছে সম্প্রতি কারাগারে, সম্ভবত করোনাক্রান্ত হয়ে। মরগ্যান ড্রাইভ করতে করতে মি. ইদ্রিসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান। মরোক্কর তানজিয়ার্স অঞ্চলের মানুষ ইনি। রাজবন্দী হয়ে সাত বছর কাটিয়েছেন ওই দেশের একটি কুখ্যাত কারাগারে। তারপর রাজা পঞ্চম মোহাম্মদের সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে কিভাবে যেন ইমিগ্রেশন নিয়ে এদেশে আসেন। এক সময়ে ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে সাভানা নগরীতে আগত পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতেন—মরোক্কর কুটিরশিল্পজাত পণ্য। বয়সের কারণে আজকাল আর দোকানটি ম্যানেজ করতে পারেন না। গেল ঈদেও মসজিদ-ভিত্তিক পার্টিতে তিনি নিয়ে এসেছিলেন সবচেয়ে মজাদার কুসকুস। এবারকার দুর্বিপাকে খাবারের অনটনে ভুগছেন মি. ইদ্রিসার পরিবার। তাঁরা স্টিমুলাস চেকও পাননি। তাঁর ছেলে আবদেল বেনী ইসাম কাজ করত একটি শপিংমলে। ওখানকার একটি দোকানের কিছু সৌখিন পণ্য খোয়া গেলে সিসি টিভির সূত্র ধরে গ্রেফতার হয় আবদেলসহ আরো দুটি শ্বেতাঙ্গ তরুণ। মামলায় লইয়ারের আইনি মারপ্যাঁচে শ্বেতাঙ্গ ছেলে দুটি ছাড়া পায়। কিন্তু লইয়ার জোগাড় করার মতো আর্থিক সঙ্গতি মি. ইদ্রিসার ছিল না। তাই, সম্ভবত মিথ্যা মামলায় তাঁর সন্তান আবদেল চার বছর মেয়াদের সাজা পায়। কারাগার থেকে টেলিফোন করে সে জ্বর-কফ-কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগার সংবাদ তাঁর পিতাকে জানায়। কারাগারে এ সময় আরো অনেক কয়েদির শরীরে ফুটে উঠেছিল এ ধরনের রোগলক্ষণ। বেশ কয়েক জন কয়েদির মৃত্যু হয় অবশেষে। টেস্টিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তাই নিশ্চিত করে বলার কোনো উপায় নেই যে, এরা মারা গেছেন করোনা সংক্রমণে। আবদেলের মৃত্যুর আগে মি. ইদ্রিসা সন্তানের সঙ্গে দেখা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কারাগারের ভিজিট আওয়ার বাতিল করা হয়েছিল। অতঃপর মি. ইদ্রিসা কারা-কতৃপক্ষের অনুমতি চেয়েছিলেন, যাতে ছেলেকে টেলিফোনে তওবা পড়াতে পারেন। তাঁকে এ ধর্মীয় অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয়।

আমরা এসে পৌঁছি সস্তা হাউজিং ফেসিলিটিতে। পেভমেন্টের পাশে একটি বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছেন মি. ইদ্রিসা। আমাদের সালামের আলেক দেন তিনি, হাসেন, হাত নাড়েন, কিন্তু কিছু বলেন না। লাঠি হাতে অন্যমনস্ক হালতে বসা মরোক্কান কেতার অজানুলম্বিত সফেদ পোশাকপরা মানুষটিকে চিন্তামগ্ন সুফি-দরবেশের মতো দেখায়। আমরা খাবারের প্যাকেটগুলো পাশের আরেকটি বেঞ্চে রাখি। তিনি হাত তুলে আমাদের আশ্বস্ত করে বলেন, রেফিউজিদের অ্যাপার্টমেন্টগুলোর দোরগোড়ায় খাবার পৌঁছে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সোমালিয়ার শরণার্থী আহমদ গুদ একটু পর এসে অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে খাবার ক্যারি করে পৌঁছে দেবে।

একটু দোনামোনা করে অবশেষে বলেই ফেলি, ‘মি. ইদ্রিসা, আই অ্যাম সো স্যারি...সিনসিয়ার কনডোলেন্সসেস্ ফর ইয়োর সন’স ডেথ।’ বোবাদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি আমাকে তাঁর ছেলের মাগফেরাতের জন্য মোনাজাত করতে বলেন। আমি তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিই—ঘরে ফিরে প্রার্থনা করব। মরগ্যান এগিয়ে এসে বিনীতভাবে বলেন, ‘আমি ধর্মে মুসলমান নই, তবে ইসলাম ধর্মের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আপনি যদি অনুমতি দেন, আমি আপনার ছেলের জন্য প্রার্থনা করতে চাই।’ ঘাড় হেলিয়ে মি. ইদ্রিসা সম্মতি দেন। মি. মরগ্যান দুহাত তুলে প্রার্থনা করেন, আমি ও ইদ্রিসা আমিন বলে দোয়ায় শরিক হই।

সোমালিয়া থেকে আগত দীর্ঘদেহী নওজোয়ান আহমদ গুদ এসে আমাদের ঈদ মোবারক বলে। ছেলেটি শহরের একটি বারবার সেলুনে চুল কাটার কাজ করত। প্রায় দুইমাস লকডাউনের পর শহরের সেলুন ইত্যাদি খুলেছে। জানতে চাই, ‘হাউ ইজ ইয়োর জব গোয়িং? কাজে গিয়েছিলে কি?’ নেতিবাচকভাবে হাত উল্টিয়ে আহমদ জানায়, গেল কয়েকদিন ধরে সেলুন খুলেছে, তবে এখনো কাস্টমাররা সেলুনে আসতে সাহস পাচ্ছে না। সে প্রতিদিন একবার করে সেলুনে হাজিরা দিচ্ছে, কিন্তু চুল কাটার লোকজন না আসলে মাথাওয়ারি পারিশ্রমিক পাওয়ার কোনো উপায় নেই। আমি দূরত্ব বজায় রেখে খেলনাগুলো খাবারের সাথে কোন কোন অ্যাপর্টমেন্টে পৌঁছে দিতে হবে তা বুঝিয়ে বলি। আহমদ একটি ঝুড়িতে প্যাকেটগুলো তুলছে। আমি এক পা সামনে গিয়ে জানতে চাই, ‘হাউ ইজ ইয়োর ফাদার মি. মোহাম্মদ গুদ?’ সে ‘আই উইল আনসার ইউ ইন আ মিনিট,’ বলে ইশারায় জানায় প্যাকেটগুলো গুছিয়ে নিয়ে সে আমাকে জবাব দিচ্ছে। আমি এ সুযোগে সংক্ষিপ্তভাবে মরগ্যানকে তার বাবা মোহাম্মদ গুদের করোনাক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠার ঘটনাটি জানাই। ডাক্তাররা প্রায় আশি বছরের এ বৃদ্ধের রিকভার করার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পুরো চার সপ্তাহ যুঁজে যেন জাদুবলে তিনি রিকভার করেন। হাসপাতাল থেকে তাঁর রিলিজের দিন নার্স ও ডাক্তাররা জড়ো হয়ে হাততালি দিয়ে তাঁর সুস্থ হওয়ার বিষয়টি সেলিব্রেট করে। ঘটনাটি আমিও প্রত্যক্ষ করি স্যোশাল মিডিয়ায়। ঝুড়িতে প্যাকেটগুলো গুছিয়ে আহমদ গুদ বলে, ‘মাই ফাদার সেন্ড ইউ আ ম্যাসেজ মি. সুলতান। তুমি যে খাবার দিয়ে গিয়েছিলে, শুকনা বিস্কিটগুলো বাবার পছন্দ হয়নি। তিনি খেতে চাচ্ছেন এক পেয়ালা দুধ।’ আমি দুধ পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিই। আহমদ গুদ আতরের ছোট্ট একটি শিশি বের করে তাতে তুলা গুঁজতে গুঁজতে বলে, ‘বাবা তোমাদের জন্য সামান্য আতর পাঠিয়েছেন।’ সচেতন হয়ে উঠি যে, আহমদ গুদের হাত থেকে আতর নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামাজিক দূরত্বের নীতিমালা, আমি ও মরগ্যান পরস্পরের দিকে তাকাই, কিছু বলি না, অতঃপর খোশবুদার তুলা নাকে দিতে দিতে ভাবি—ঈদের দিন না হয় সামাজিক দূরত্বের সামান্য ব্যতিক্রমই হলো।

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন



রাহাত রাব্বানী
আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

আসছে ভাওয়াল বীরের ‘জীবনালেখ্য’, লিখলেন ইজাজ মিলন

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তী হয়ে উঠে ছিলেন আহসান উল্লাহ মাস্টার। গ্রাম থেকে উঠে আসা লড়াকু এই স্কুল শিক্ষক মানুষকে ভালোবাসা দিতে এসেছিলেন,মানুষের ভালোবাসা পেতে এসেছিলেন। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা বিলিয়ে মানুষের পরিপূর্ণ ভালোবাসা পেয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। সুফী সাধক বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টারের চলার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কাঁটা বিছানো সেই পথে হেঁটে হেঁটে সফলতার চূড়ান্ত বিন্দু স্পর্শ করেছিলেন।

শিক্ষকতা পেশার নিয়োজিত ভাওয়াল বীর খ্যাত আহসান উল্লাহ মাস্টার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে মানুষের ভালোবাসাকে পূঁজি করে দুই বার সংসদ সদস্য হয়েছেন। সংসদ সদস্য থাকাকালেই ঘাতকরা তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ৬৬ এর ৬ দফা , ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ নির্বাচনে ভূমিকা রাখা, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণসহ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি আন্দোলনেই সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়। বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ পাওয়া আহসান উল্লাহ মাস্টার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আজীবন আন্দোলন করেছেন, তাদের পক্ষে কথা বলেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেই ৯০ এর দশকের গোড়ার দিকেই। তুমুল জনপ্রিয় এক নেতৃত্বে পরিণত হন তিনি। জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু ঘাতকরা সেটা সহ্য করতে পারেনি। মাটি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন সারা জীবন। টঙ্গীর হায়দারাবাদ গ্রামে জন্ম নেওয় আহসান উল্লাহ মাস্টারের জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে দাঁড়ায়। আহসান উল্লাহ মাস্টারের দেখা স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন তারই পুত্র যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। টানা ৪ বারের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল বাবার মতোই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথেই হেঁটে চলছেন।

রাজনীতির মাঠে আহসান উল্লাহ পাথর ঘঁষে আগুন জ্বলানো এক রাজনীতিক। তার আলোয় আলোকিত হয়েছিল গাজীপুর। কিন্তু কেমন ছিল আপদমস্তক এ রাজনীতিকের জীবন, গ্রাম থেকে উঠে এসে কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিলেন, তার জন্ম শৈশব কৈশোর, যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা- এমন নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক ইজাজ আহমেদ মিলন লিখেছেন ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার: জীবনালেখ্য’। গ্রন্থের পা-ুলিপি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার মনে হয়েছে এ যেন বাংলাদেশেরই জীবনালেখ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে আহসান উল্লাহ মাস্টার এক আদর্শের নাম। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের এই বইটা পড়া উচিৎ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আগ্রহী করে তুলবে বইটি।

দীর্ঘদিন গবেষণা করে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহমেদ মিলন রচনা করেছেন ‘জীবনালেখ্য’। অন্যপ্রকাশ থেকে বইটি বেরোচ্ছে খুব শিগগিরই। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন চারু পিন্টু।

;

ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-৩



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

[তৃতীয় কিস্তি]

ম্যারির গোপন কষ্ট অনুভব করলেও আবেগাক্রান্ত হন না মিসেস অ্যানি। তার মতামত ও মনোভাব অন্যরকম এবং বহুলাংশে বাস্তবসম্মত। বহু মায়ের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, আবার নতুন সংসার শুরু করলে ম্যারির একাকীত্বের কষ্ট ও অন্যান্য সমস্যার সুরাহা হয়ে যাবে। সে লক্ষ্যে তিনি তার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অন্যদিকে, তাকে ঘিরে মায়ের এসব তৎপরতার কারণে ম্যারি সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন। অবশেষে মায়ের আতিশয্য ও উৎসাহী প্রেমিকবৃন্দের উপদ্রব থেকে বাঁচতে তিনি বাড়িতে কম সময় কাটানোর পথ খুঁজতে থাকেন। টমাস দিনে দিনে বড় হচ্ছে। একা একাই সে তার কাজকর্ম করতে পারে। এদিকে তার স্কুলিং শুরু হয়ে গেছে। ম্যারি ভাবলেন, যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। বাড়িতে মায়ের একতরফা কথা শোনা আর উৎসাহী প্রেমিকদের আনুষ্ঠানিক ও আতঙ্কজনক আগমনের জন্য ক্লান্তিকর অপেক্ষায় দিন কাটানোর কোনো মানে হয় না। তার যতটুকু পড়াশোনা, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোটখাট চাকরি জুটে যাওয়ার কথা। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রাক্তনী এবং তার সাবেক স্বামী এখানে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের পরিবারের মতোই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। ফলে অল্প-বিস্তর খোঁজ-খবর করতেই বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে অনায়াসে চাকরি হয়ে গেলো ম্যারির। ম্যারি আপাতত হাফ ছেড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার ফুসরত পেলেন।

দিনের বেশির ভাগ অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির কাজে কাটিয়ে পড়ন্ত বিকেলে ক্লান্ত ম্যারি বাড়ি ফিরলে মিসেস অ্যানি ম্যার্গারেট কথাবার্তা বলার সাহস পান না। তার পরিশ্রান্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে কথাবার্তা বলার ভাবনায় ইতি টানেন। এদিকে, লাইব্রেরির কাজে যোগ দিয়ে এক অতলান্ত জগতের দেখা পেয়েছেন ম্যারি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ছেন অসাধারণ নানা বই। বাস্তব জগতের কষ্ট-বেদনা থেকে তিনি যেন মুক্তির স্বাদ পান বইয়ের প্রশান্ত পাতায়। লাইব্রেরিয়ান মিসেস ন্যান্সি অনেক আগে থেকেই ম্যারিকে চেনেন। তার ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙাগড়াও মিসেস ন্যান্সির অজানা নয়। তিনি নিজে আগ্রহী হয়ে ম্যারিকে চমৎকার সব বই পড়ার জন্য বেছে দেন। কিছু অর্ধ-পঠিত বই ম্যারি সঙ্গে করে বাসায় নিয়ে আসেন। বিশ্রাম ও নিজের কিছু কাজকর্ম করার পর সেগুলো নিয়ে বিছানায় যান তিনি। ক্রমশ তার যাপনের আটপৌরে রুটিনে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটে। তিনি আর বই একাকার হতে থাকে দিনে দিনে। ম্যারির এমন রুটিন ভেদ করে মা কথা বলার সুযোগ পান খুবই কম। এমন পরিস্থিতি ম্যারির জন্য কম স্বস্তির বিষয় নয়।

ফলে আজকাল মিসেস অ্যানি মার্গারেট ডিনারের সময়টাতেই শুধু ম্যারির সঙ্গে আলাপের সুযোগ নিতে পারেন। তারও কাজ কম নয়। দৌড়াদৌড়িতে তার দিন শুরু হয় মেয়ে লাইব্রেরি ও নাতীর স্কুলে যাবার তাড়ার মধ্যে। তখন দম ফেলার মতো অবস্থায় থাকে না কেউই। বাকী দিন সবাই থাকে সবার কাজে ব্যস্ত। অতএব রাতের খাবারের সময়ই কিছুটা আলাপের অবসর মেলে। তখন টুকটাক কথার বেশি কিছু বলাও সম্ভব হয় না। দিনে দিনে মিসেস অ্যানি মার্গারেটের বকবকানি অনেকটাই হ্রাস পেতে থাকে। পরিস্থিতির পরিবর্তনে মনে মনে খুশি হন ম্যারি।    

কিন্তু রাত নামতেই ম্যারির নিজের মধ্যে দ্বিধা এসে ভর করে। তার মন-প্রাণ চলে যায় অন্ধকারের কালো চাদরে আচ্ছাদিত বাগানে। তিনি নিশ্চিত হতে পারেন না যে, বাগানের পাইন গাছটি তাকে টানে, নাকি তিনি নিজেই কাছে টেনে নেন পাইনকে? নাকি ক্যাভিনের স্মৃতি, যা আচ্ছন্ন হয়ে আছে পাইনের চারপাশে, তা গাছটির সঙ্গে মিলেমিশে তাকে অলক্ষ্যে ডাকে মধ্যরাতের নিশুতি প্রহরে? ম্যারি এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারেন না। তার দ্বিধা ও সংশয় বাড়তে থাকে। তথাপি তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো রাতের কালচে অন্ধকারে, বেগুনী, নীলাভ ফুলকির মাঝ দিয়ে তিনি প্রতিরাতে চলে আসেন বাগানে, পাইনের নৈকট্যে। 

পাইনের কাছে এলে তার শরীর ও মনে অবাক কাণ্ড ঘটে। তিনি নিবিড়ভাবে টের পান স্মৃতির অমোচনীয় স্পর্শ। আগুন দেখে পতঙ্গের ছুটে যাওয়ার মতো তিনি যেন অজানা টানে অন্ধকার বাগানে পাইন গাছের তলে চলে আসেন নিজেরই স্মৃতিকুণ্ডলীতে। তখন নিজের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিনি অতীতের লেলিহান শিখায় অনুভব করেন স্মৃতির দুর্দমনীয় দাপট। তার মনে পড়তে থাকে পাইনের তলে ক্যাভিনের সঙ্গে অতিক্রান্ত অসংখ্য দিবস ও রজনীর টুকরো টুকরো কথা ও অভিজ্ঞান। 

ক্যাভিনের সঙ্গে ম্যারি যখন প্রথম এই বাড়িতে আসেন, তখন প্রায়-জংলার মতো আগাছায় ভরা ছিল পুরো বাগান। অবহেলায় বাড়ন্ত শিশু পাইন গাছটি ছিল ঝোপের আড়ালে। বেশ কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে ক্যাভিন বাগানের চেহারা পাল্টে দেন। আগাছার কবল থেকে উদ্ধার করেন পাইন গাছটিকে। গাছের চারপাশটা সুন্দর করে গুছিয়ে বসার চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে ফেলেন ক্যাভিন। বইপড়া, চা-খাওয়া, ম্যারির সঙ্গের গল্পের সময়গুলো তিনি কাটাতে থাকেন পাইনের তলে। সবসময় ক্যাভিনের একটি সতর্ক নজর থাকে পাইন গাছটির দিকে। গাছটির কখন কি প্রয়োজন, তা নিয়ে ক্যাভিনের আগ্রহের অন্ত নেই।

ম্যারি খেয়াল করেন পাইন নিয়ে ক্যালিনের ব্যস্ততা ও আগ্রহের বিষয়টি। একদিন তিনি সরাসরি জানতে চান,

‘পাইন গাছটিকে এতো ভালোবাসো তুমি? পাইন কি তোমার প্রিয় বৃক্ষ?’

‘না। আমার প্রিয় বৃক্ষ ঝাঁকড়া মাথার জলপাই। আমার পূর্বপুরুষ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছিল। জলপাই তাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এই পাইনকে ভালোবাসি অন্য কারণে।’

‘কি সেই কারণ?’

‘কারণ, এই পাইন আমাদের প্রথম সন্তানের মতো। তোমার, আমার নতুন জীবনে, এই নতুন বাসগৃহে প্রথম আমরা যাকে পেয়েছি, তা এই পাইন গাছ।’

ক্যাভিনের উত্তরে দারুণ চমকে উঠেন ম্যারি। তার ভেতর মাতৃত্বের প্রবল ঢেউ আলোড়ন জাগায়। তিনি গভীর মমতায় শিশু থেকে তারুণ্যের পথে বর্ধিষ্ণু পাইনের দিকে মগ্ন চোখে তাকিয়ে থাকেন। বেশ অনেকক্ষণ পর ক্যাভিনের কথায় ম্যারির ধ্যান ভাঙে।

‘জানো তো, মা-বাবার নিবিড় সান্নিধ্যে থাকলে সন্তানের বিকাশ ভালো হয়। তাদের শৈশব, কৈশোর, বেড়ে ওঠা, সবকিছু চাপমুক্ত হয়। আমরাও যত বেশি পাইনের কাছে থাকবো, ততদ্রুত গাছটিও সাহসী মানুষের মতো সুস্থ ও সবলভাবে বড় হবে।’

এইসব স্মৃতি ও কথোপকথন প্রবলভাবে মনে পড়ে পাইনের কাছে এলে। ম্যারির কষ্টগুলোও বুনো বাতাসের  মতো হু হু করে বাড়তে থাকে। পাইনের সমান্তরালে নিজের সন্তান টমাসের অবয়ব ভাসে চোখে। পিছনের দৃশ্যপটে ক্যাভিনের উপস্থিতি। ম্যারি ভীষণ অবাক হন। যে পিতা একটি অনাথ ও অবহেলিত পাইন গাছকে পিতৃত্ব-মাতৃত্ব দিয়ে লালন করার স্বপ্ন দেখতো, দিন-রাতের অধিকাংশ সময় পাইনের আশেপাশে থাকতো, সে কি করে ঔরসজাত সন্তানের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় দূরে চলে গেলো! এই প্রশ্নের উত্তর তিনি অনেক ভেবেও খুঁজে পান না।

ম্যারি নানাভাবে বুঝতে চেষ্টা করেন, 'আকর্ষণ' কত দূর অবধি গেলে শুধুই 'আকর্ষণ' থাকে, আবার কত দূর চলে গেলে 'অবসেশনে' পরিণত হয়? 'অবসেশন’ ও 'আকর্ষণ'-এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ঠিক ঠিক জানতে না পারলেও মানুষ আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন নিয়েই বেঁচে থাকে। কখনো কোনো মানুষের কাছে আসে, কখনো দূরে যায়। মানুষের একা কিংবা যৌথ জীবনে এক রহস্যময় ত্রিভুজের মতো আকর্ষণ, বিকর্ষণ, অবসেশন ঘিরে থাকে।

এক সময় বাগান থেকে ঘরে ফিরে আসেন ম্যারি। বিছানায় শুয়ে টের পান তার মাথায় আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো বইছে প্রশ্নের স্রোত। তার আর ঘুম আসে না। সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখেন সকাল হতে অনেক বাকী। তিনি ফোনের মিউজিক অপশনে গিয়ে একটি গান বেছে নেন। তাদের ক্যাম্পাসে পড়তে আসা পল্লবী নামের এক দক্ষিণ এশীয় তরুণী গানটি তাকে প্রেজেন্ট করেছে। গানের কথাগুলো বাংলায় হলেও সুর তাকে আচ্ছন্ন করে প্রবলভাবে। কখনো সুযোগ হলে গানটি তিনি ইংরেজিতে তর্জমা করার ইচ্ছা রাখেন। তিনি গানটি চালু করে চোখ বন্ধ করেন। কিন্তু তার হৃদয় যেন গানের কথাগুলোর সঙ্গে যৌথতায় গাইছে:

'যদি আর কারে ভালবাসো

যদি আর ফিরে নাহি আসো

তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও

আমি যত দুঃখ পাই গো।'

[পরবর্তী কিস্তি আগামী শুক্রবার]

আরও পড়ুন: ধারাবাহিক উপন্যাস ‘রংধনু’-২

ধারাবাহিক উপন্যাস 'রংধনু'-১

;

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;