উত্তর-উপনিবেশবাদ ও বাংলাদেশের সাহিত্য : একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা



মাসুদুজ্জামান
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

১. উত্তর-উপনিবেশবাদ ও বাংলাদেশ
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের মতো দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়ার পর একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে এর। ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে অন্যান্য অনেককিছুর মতো সাহিত্য যে বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, স্বাধীনতার পর তা অনেকটাই বদলে যায়। একটি সদ্যস্বাধীন দেশের সাহিত্য উপনিবেশের চিহ্ন যেমন তার শরীরে ধারণ করতে বাধ্য হয়, তেমনি উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিবেশ পরিস্থিতির দ্বারাও প্রভাবিত হয়। সেজন্যেই দেখা যায়, আধুনিক কালের উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির সাহিত্যে তার নিজস্ব এমন কিছু লক্ষণ ফুটে ওঠে, যেসব লক্ষণ অন্যান্য রাষ্ট্রের সাহিত্য থেকে আলাদা। বাংলাদেশের সাহিত্যের ওই সব বৈশিষ্ট্য কমবেশি লক্ষ করা যাবে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের সাহিত্য বলে আমরা যে সাহিত্যের উল্লেখ করে থাকি, তা অনেকটাই রাজনীতিস্পৃষ্ট। তবে সরলরেখায় নয়, উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশের রাজনীতি যেমন আঁকাবাকা পথে অগ্রসর হয়েছে, বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিও তেমনি বিসর্পিল। উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্যের এই লক্ষণগুলি সনাক্ত করতে হলে বাংলাদেশের রাজনীতির একটা রূপরেখা তুলে ধরা জরুরি বলে মনে করি।

একথা আমাদের আজ আর অজানা নেই যে দু-দুটো উপনিবেশের অধীন ছিল বাংলাদেশ; প্রথমে ব্রিটিশদের, পরে পাকিস্তানিদের। দীর্ঘদিন ধরে উপনিবেশের অধীনে থাকলে যেমন হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে। স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক এবং জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে যেমন নৈরাজ্য ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে, তেমনি এসব নৈরাজ্য কাটিয়ে এ-দেশকে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। লড়তে হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক আত্মস্বাতন্ত্র্য এবং উন্নত জীবনমান অর্জনের জন্যে। এ সংগ্রাম যে খুব সহজে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে, তা বলা যাবে না। কোনো কোনো সময়ে বিরোধের মাত্রাটি বেশ জটিল ও সংঘাতময় ছিল। তবে এতসব জটিলতার মধ্যেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অর্জন করেছে অভূতপূর্ব সাফল্য। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের ভবিষ্যতবাণী হিসেবে ‘মধ্য-আয়ে’র দেশে পরিণত হবে আর তার পরের ধাপেই পৌঁছে যাবে উন্নত দশেরে সারিতে।

তবে এখন বিশ্বব্যাপী কোভিদ-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত সমস্ত পৃথিবী। বাংলাদেশেও এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে জীবনযাত্রা যেমন থমকে গেছে, তেমনি এর প্রভাবও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। এ থেকে মুক্তি কিভাবে ঘটবে, সাম্প্রতিক দুর্যোগ কেটে গেলেই কেবল সেটা বোঝা যাবে। তবে আমাদের জীবনযাপন যে বদলে যাবে, অর্থনীতি যে নতুন রূপ পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তো, এটা তো ভবিষ্যতের ব্যাপার। আমি না হয়, স্বাধীনতার পর আমাদের সাহিত্য কীরকম চেহারা পেয়েছে তাই নিয়ে কথা বলি।

২. উত্তর-উপনিবেশবাদী বাংলাদেশ ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব
আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন, উপনিবেশের অধীনে থাকার সময়ই কখনো কখনো রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সংঘাতের বীজ প্রোথিত হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে সংগ্রাম করবার সময় সেই শাসকদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করলেও স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক চরিত্র কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম করবার সময় যদি সেই শাসকগোষ্ঠীকে কেউ মিত্র মনে করে সমর্থন করে থাকে, তাহলে স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তস্বাধীন ওই জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হতে বাধ্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ব্যাপারটিই লক্ষ করেছি আমরা।

স্বাধীনতার সময় যারা ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকদের সমর্থন করেছে, বা যারা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তারা স্বাধীনতার পর মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নৈরাজ্য তৈরি করে। এটা অবশ্য একদিনে করা হয়নি, ধীরে ধীরে করা হয়েছে। এই গোষ্ঠী মতাদর্শিকভাবে পূর্বের অবস্থানে স্থির থেকে একদিকে যেমন রাজনৈতিকভাবে নিজেদের সুসংহত করেছে, অন্যদিকে তেমনি সমভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের প্রভাববলয় বাড়িয়ে নিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যে-দল (বা দলগুলি) নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের নানা ভুলের সুযোগও তারা নিয়েছে। অবস্থা তখন এমন দাঁড়িয়েছিল যে, স্বাধীনতা-বিরোধী ওই গোষ্ঠী অনেক দিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছে, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের জাল বিস্তার করে তারা তরুণ-সমাজকে ভুল পথে চালিত করতে পেরেছে।

ফলে স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসনকাঠামো কী হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার সাংস্কৃতিক চারিত্র্য কী হওয়া জরুরি—এসব প্রশ্নে দেখা দিয়েছে দ্বিধাবিভক্তি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাহিত্য যে একধরনের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে জটিল হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। বাস্তবে হয়েছেও তাই। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের লেখকেরা এই ধরনের বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের চোরাবালিতে পা দেননি। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, বেশিরভাগ লেখকই—তাঁরা যে-দেশেরই হোন না কেন, যে-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসুন না কেন—সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকেন। নিঃসন্দেহে দেশ, সমাজ ও মানুষের প্রতি তাদের একধরনের কমিটমেন্ট থাকে।

৩. বৈদেশিক নির্ভরতা, আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও বাংলাদেশ
আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমকালীন বাংলাদেশ নানা জটিল ও বিচিত্র পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিল। আর্থসামাজিকভাবে সবাই একমত যে, দেশটি একশ্রেণীর লুটেরা পেশাজীবীর স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিল। আমলাতন্ত্র, সামরিকতন্ত্রের কবলে পড়ে দেশটির অর্থনীতি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিভিন্ন ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানি এবং যেসব ধনী দেশ তাদের মুনাফার সবচেয়ে বড় অংশ ভোগ করে, বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলি ছিল তাদের আগ্রাসী থাবার নিচে। আমাদের সনাতন চাষাবাদ পদ্ধতি, স্বাস্থ্য ইত্যাদিকে তারা তাদের পেস্টিসাইড বা জন্ময়িন্ত্রণের নানা উপকরণ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছে। সংস্কারের নামে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা সার্বক্ষণিকভাবে চাপের মধ্যে রেখেছে এই দেশটিকে। আমাদের নিজস্ব গণমাধ্যমের দুর্বলতার সুযোগে বিদেশি স্যাটেলাইট টিভির চোরাস্রোতের টানে বিপন্ন হয়ে পড়েছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এভাবে একদিকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ, অন্যদিকে দেশীয় ক্ষমতাবান লুটেরা শ্রেণির শাসনশোষণ বাংলাদেশকে সবদিক থেকে বিপর্যস্ত করে ফেলে।

সামাজিক অস্থিরতা, সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থার পাশপাশি রাজনীতিতেও দেখা গেছে চরম নৈরাজ্য। উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলির শাসনব্যবস্থায় একধরনের প্রহসনের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। এরকম পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে তারা মুক্তি পেয়ে হঠাৎ করেই প্রবেশ করে আধুনিক ইউরোপীয় উদারনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, যার মূলমন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্র। কিন্তু এই গণতন্ত্রকে হজম করার বা জারিত করে নেওয়ার প্রস্তুতি ও শক্তি তার থাকে না। ফলে গণতন্ত্র পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। পাকিস্তানি শাসনের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্র, সামাজিক সাম্য, মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতার উদার ক্ষেত্রে প্রবেশ করবে এটাই ছিল প্রত্যাশিত। আমাদের পূর্বসূরিরা সেই পথেই এগোচ্ছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম অসংশোধিত সংবিধানে তার প্রমাণ মিলবে। কিন্তু তারপর? সামরিকতন্ত্রের কবলে পড়ে ছিন্নভিন্ন হলো গণতন্ত্র। পুনরুত্থান ঘটলো ধর্মের, স্বৈরতন্ত্রের, সাম্প্রদায়িকতার। জনরোষের ফুৎকারে সামরিক শাসকগোষ্ঠী বিতাড়িত হলেও অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক সাম্যের প্রতিষ্ঠা ঘটতে বিলম্ব হলো। সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র এলেও মানবিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপিত হলো না। তবে সাংবিধানিকভাবে ধর্মকে এখন প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহার করা হয় না। ফলে, বাংলাদেশের আধুনিক উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এখনও মসৃণ নয়। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী—যারা আমাদের ঋণ দেয়—তারা বিরূপ হবে বলে এ-পথে অগ্রসর হওয়াটাকে নিরাপদ মনে করা হয় না। আশার কথা, বাংলাদেশ এই বিদেশ-নির্ভরতা ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠছে। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনকাঠামোর প্রায় প্রতিটি স্তরে ধর্মের যে প্রচ্ছন্ন ব্যবহার ঘটেছে, সেটা অস্বীকার করবার উপায় নেই। বিপুল জনসংখ্যার কারণে বাঙালিরা আবার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এখনো দারিদ্রসীমার নিচে। যদিও গত দেড় দশকে দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ফলে, জনজীবনেও স্বস্তি নেই। সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ জর্জরিত। সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে বাংলাদেশের মানুষকে মুক্তি দিতে হলে জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ, সেই পথেই এগুচ্ছে। উন্নয়নের দৃশ্যমান ছোঁয়া লেগেছে। উন্নয়নের অনেকগুলি মেগাপ্রজেক্ট নিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আরো গতি পেয়েছে। বর্তমান সরকার যে উন্নয়নের সরকার, সেকথা বলাই যায়। সার্বিকভাবে এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাহিত্য যে নানা দিক থেকে বহুবর্ণিল হয়ে উঠবে তা বলাই বাহুল্য।

৪. স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য
স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশের সাহিত্য অনেকটা সরলরেখার অগ্রসর হচ্ছিল। নিরুদ্বিগ্ন নাগরিক জীবন কিংবা নিস্তরঙ্গ সরল গ্রামীণ জীবনই তাতে উপজীব্য হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাহিত্য হয়ে উঠেছে জটিল, বহুমাত্রিক, সর্বোপরি বৈশ্বিক নানা অনুষঙ্গে বিজড়িত। কী প্রসঙ্গ, কী প্রকরণ—সবদিক থেকেই স্বাধীনতাপূর্ব সাহিত্যের সঙ্গে ঘটে গেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী সাহিত্যের পার্থক্য। উল্লিখিত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের প্রায় সবটাই উঠে এসেছে আমাদের কথাসাহিত্যে, কবিতায় কিংবা নাটকে। বাংলাদেশের সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করলেই এর মূল প্রবণতাগুলি সনাক্ত করা যাবে। এই লেখাটি সেই লক্ষ্যেই, অর্থাৎ স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি কী দাঁড়িয়েছে তারই সংক্ষিপ্ত রূপরেখা বলা যেতে পারে।

স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জায়মান হয়ে ওঠে একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সংগ্রামের মূল ঘটনাটি যে সাহিত্যে প্রাধান্য পাবে, সেকথা বুঝতে কোনো অসুবিধে হয় না। মুক্তিযুদ্ধের বীজ অবশ্য স্বাধীনতার ঠিক পরে নয় অনেক আগেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশের সাহিত্যে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। আইয়ুবি আমলে তা বাংলাদেশের সাহিত্যে অনুসূক্ষ্মভাবে অন্তঃশীল ছিল। ঊনসত্তরে এসে এই প্রবণতাটি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে গেলে প্রায় সব লেখকেরই—অবশ্য যারা তখন লেখালেখি করতে পেরেছেন—মুক্তিযুদ্ধ তাদের রচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরে মুক্ত স্বদেশে তাই অনেককেই দেখা গেল এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গল্প, উপন্যাস বা কবিতা রচনা করতে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কালজয়ী উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’তে উপজীব্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার উজ্জ্বল পটভূমি—উন্মাতাল ঊনসত্তর। বন্দী সময়ের তমসাচ্ছন্ন পরিবেশে মানুষ যে কিভাবে মুক্তির প্রত্যাশী হয়ে উঠতে পারে, ইলিয়াস তারই এপিক রূপায়ণ ঘটালেন এই উপন্যাসে। আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাতে’ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী যে-নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, পাওয়া গেল তারই আত্মজৈবনিক রূপ। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি সফল উপন্যাস লিখলেন শওকত ওসমান—‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘দুই সৈনিক’, ‘নেকড়ে অরণ্য’ এবং ‘জলাঙ্গী’। এই ধরনের উপন্যাস রচনায় সৈয়দ শামসুল হকের সাফল্যও কম নয়। তার ‘নীল দংশন’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’ ইত্যাদি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে উপজীব্য করা হয়েছে। উপনিবেশ-উত্তর বাংলাদেশে জাতিরাষ্ট্রের রূপরেখাটি সৈয়দ হকের উপন্যাসে সাফল্যের সঙ্গেই উৎকীর্ণ হয়েছে বলতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গত দু-তিন দশকে আরো যেসব উপন্যাস লেখা হয়েছে সেগুলি হচ্ছে রশীদ করীমের ‘আমার যত গ্লানি’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারী সূর্য’, আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’, রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ ও ‘অন্ধ কথামালা’, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘জীবনভর’, শওকত আলীর ‘যাত্রা’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’, মিরজা আবদুল হাইয়ের ‘ফিরে চলো’, হুমায়ুন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, হারুন হাবীবের ‘প্রিয়যোদ্ধা, প্রিয়তম’, রিজিয়া রহমানের ‘একটি ফুলের জন্য’, শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ও ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ ইত্যাদি।

ছোটগল্প বাংলাদেশের সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ শাখা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা হয়েছে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প। শওকত ওসমানের ‘বারুদের গন্ধ লোবানের ধোঁয়া’, ‘দুই ব্রিগেডিয়ার’, শহীদ আখন্দের ‘ভিতরের মানুষ’, বশীর আল হেলালের ‘সেবিকা’, রশীদ হায়দারের ‘এ কোন ঠিকানা’, হাসান আজিজুল হকের ‘ঘরগেরস্থি ও ফেরা’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোঁয়ারি’, সেলিনা হোসেনের ‘ঘৃণা’ ইত্যাদি গল্পেও মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ও সংগ্রামমুখর বাংলাদেশের ছবি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় ও ভঙ্গিতে উপস্থিাপিত হয়েছে।

বাংলাদেশের কবিতাতেও লক্ষ করা যাবে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক বিস্ময়কর প্রকাশ। বাঙালি জাতির সত্তাতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ইতিবৃত্তটি কবিতাতেই সবচেয়ে সফলভাবে ধরা পড়েছে। আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সিকান্দার আবু জাফর, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো কবিরা তো বটেই, স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে ষাটের দশকের শেষ দিকে যেসব কবির আবির্ভাব ঘটলো—হুমায়ুন কবির, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান, মাহবুব সাদিক, সাযযাদ কাদির প্রমুখের কবিতা মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত হতে থাকল। তবে স্বাধীনতার পর সত্তর দশকে যেসব কবির আবির্ভাব ঘটল, সব কবির কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ যেন পেল বহুমাত্রকি রূপ। যেসব কবির রচনায় মুক্তিযুদ্ধ নানাভাবে উপজীব্য হয়েছে তাদের কয়েকজন হচ্ছেন মাশুক চৌধুরী, আবিদ আজাদ, দাউদ হায়দার, মাসুদুজ্জামান, শিহাব সরকার, মাহবুব হাসান, মুজিবুল হক কবির, ফারুক মাহমুদ, জাহিদ হায়দার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লা, কামাল চৌধুরী। তবে গতশতকের আশির দশক থেকে শুরু করে এই শতকের দ্বিতীয় দশকে পৌঁছে দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের কবিতা পূর্বতন কবিদের হাতে তো বটেই তরুণতরদের হাতে আরো নানামাত্রায় নানা অনুষঙ্গে উদ্ভাসিত। এই সময়ে যেসব তরুণ কবি বাংলাদেশের কবিতাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে চলেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন : ফরিদ কবির, খালেদ হোসাইন, আবু হাসান শাহরিয়ার, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, মাসুদ খান, খন্দকার আশরাফ হোসেন, মুজিব ইরম, সাজ্জাদ শরিফ, তসলিমা নাসরিন, সৈয়দ তারিক, টোকন ঠাকুর, মজনু শাহ, কামরুজ্জামান কামু, বায়তুল্লাহ কাদেরী, সরকার আমিন, মুজিব ইরম, ইমতিয়াজ মাহমুদ, জাহানার পারভীন, নওশাদ জামিল, পিয়াস মজিদ, বিজয় আহমেদ, মোস্তাক আহমাদ দীন, শামীম রেজা, ওবায়েদ আকাশ, আলতাফ শাহনেওয়াজ, রুহুল মাহফুজ জয়, তানিম কবির, হাসান রোবায়েত, মোস্তফা হামেদী, অরবিন্দ চক্রবর্তী, হিজল জোবায়ের, সৌম্য সালেক, তিথি আফরোজ, অনুপমা অপরাজিতা, রিমঝিম আহমেদ, রোজেন হাসান, নাহিদ ধ্রুব, সালেহীন শিপ্রা, নুসরাত নুসিন প্রমুখ।

তবে উপন্যাস ও কবিতার তুলনায়, অনেকের ধারণা, নাটকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। আসলে আজ বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটারের যে ব্যাপক চর্চা দেখা যাচ্ছে, কলকাতা থেকে প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধারাই আমাদের নাট্যান্দোলনে সেই ধারণারই বাস্তব রূপায়ন ঘটিয়েছেন বলা যায়। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাট্যকার ও নাট্যকর্মী মামুনুর রশিদ বলেছেন, ‘যুদ্ধকালীন অবস্থায় অনেক নাট্যকর্মীর সুযোগ ঘটে কোলকাতার নাটক, নাট্যসংগঠন, নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও কুশলীদের সাথে পরিচিত হবার।... বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত যেসব ছাত্র-ছাত্রীরা যুদ্ধে গিয়েছিল তারাও ফিরে এসে দ্রুত সংগঠিত করতে লাগল নাটককে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলিতে, ডাকসুতে, সর্বত্র একটা সাড়া পড়ে গেল।’ লক্ষ করলে দেখা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের নাটকগুলির বেশিরভাগই আবেগনির্ভর, মননঋদ্ধ নয়। তবু এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে বেশকিছু কালোত্তীর্ণ নাটক। এসব নাটকের মধ্যে মমতাজউদ্দীন আহমদের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারে সংগ্রাম’ ও ‘বিবাহ ও কি চাহ শঙ্খচিল’, জিয়া হায়দারের ‘সাদা গোলাপে আগুন ও পঙ্কজ বিভাস’, সাঈদ আহমদের ‘প্রতিদিন একদিন’, রণেশ দাশগুপ্তের ‘ফেরী আসছে’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ উল্লেখযোগ্য। সেলিম আল দীন, মামুনুর রশিদ, আবদুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ নাট্যকারও মুক্তিযুদ্ধকে তাদের নাটকে উপজীব্য করেছেন বিভিন্ন সময়ে। বাংলাদেশের গ্রুপথিয়েটার আন্দোলনকে তাই বলা যায় মুক্তিযুদ্ধেরই প্রত্যক্ষ অবদান।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যের আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা লক্ষ করা যায় মধ্যবিত্তের জীবনযাপনের নানামাত্রিক উপস্থাপনে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া স্বাধীন দেশে মধ্যবিত্তের বিকাশ নানা কারণে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় তার প্রকাশ হয়ে উঠেছে বহুমুখী ও জটিল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমানসের আত্মযন্ত্রণা, আত্মরতি, রিরংসা, হতাশা ও ভোগবাদের চূড়ান্ত প্রতিফলন লক্ষ করা যাবে এই সময়ের বাংলাদেশের সাহিত্যে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের সংবেদনশীল অভিব্যক্তি হিসেবে এই বিষয়টি কথাসাহিত্যিকদেরতো বটেই কবিদেরও আন্দোলিত করেছে।

হুমায়ূন আহমদের ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’, সুকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘একজন’, রশীদ করীমের ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ ও ‘সাধারণ লোকের কাহিনী’, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’, শওকত আলীর ‘অপেক্ষা’, বশীর আল হেলালের ‘কালো ইলিশ’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘আমার আততায়ী’, সেলিনা হোসেনের ‘মগ্নচৈতন্যে শিস’ ও ‘পদশব্দ’, রাজিয়া খানের ‘চিত্রকাব্য’, শামসুর রাহমানের ‘অক্টোপাস’ ও ‘নিয়ত মন্তাজ’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘স্তব্ধতার অনুবাদ’ ইত্যাদি উপন্যাসে রিরংসায় আক্রান্ত আত্মকেন্দ্রিক ভঙ্গুর জীবন, বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, বিনষ্টি, লুণ্ঠন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটের সামগ্রিক চিত্র উপজীব্য হয়েছে। সিরাজুল ইসলামের উপন্যাসগুলি কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।

ঝর্না রহমান, আহমাদ মোস্তফা কামাল, প্রশান্ত মৃধা, শাহীন আখতার, মোহিত কামাল, জাকির তালুকদার, স্বকৃত নোমান, মাহবুব আজীজ, খালিদ মারুফ, রাসেল রায়হান, মোস্তফা কামাল, মাসরুর আরেফিন, মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, অদিতি ফাল্গুনী, পাপড়ি রহমান, হাবিব আনিসুর রহমান, আবুল কাসেম, তাশরিক-ই-হাবিব, হামিম কামাল, ইশরাত তানিয়া, নাসিমা আনিস, বর্ণালী সাহা, মোজাফ্ফর হোসেন, নিলুফা আক্তার, রিমঝিম আহমেদ এঁরাও সাম্প্রতিক কালে এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক হিসেবে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। ভিন্নধারার ঔপন্যাসিক হিসেবে সাদাত হোসাইন, আবদুল্লাহ আল ইমরান, কিঙ্কর আহসানও পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

এই সময়ের ছোটগল্পেও বিচিত্রভাবে সমকালীন জীবনের উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। বাংলাদেশের ছোটগল্পেও মূর্ত হয়েছে মধ্যবিত্তের জটিল ভঙ্গুর, আত্মকেন্দ্রিক কুণ্ডলায়িত জীবন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, কায়েস আহমেদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রাহাত খান, রশীদ হায়দার, সিরাজুল ইসলাম, মঈনুল আহসান সাবের, সৈয়দ ইকবাল, নাসরীন জাহান, আবু সাঈদ জুবেরী, ইমতিয়ার শামীম, সেলিম মোরশেদ, পারভেজ হোসেন, আকিমুন রহমান, শাহনাজ মুন্নী, মামুন হুসাইন, শাহাদুজ্জামান, মোস্তফা কামাল, তাপস রায়, আশান উজ জামান, কিযী তাহ্নীন, আনিফ রুবেদ, প্রমুখের গল্পে এই জীবনের বহুমাত্রিক রূপ খুঁজে পাওয়া যাবে সহজেই।

অবশ্য শুধু কথাসাহিত্য নয়, এই সময়ের কবিতাতেও লক্ষ করা যাবে মধ্যবিত্তের জীবনযাপন ও মানসিকতার সার্বিক প্রতিচ্ছবি। শামসুর রাহমান এজন্যেই লিখতে পেরেছেন ‘আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি’, ‘শূন্যতায় তুমি শোকসভা’, ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে’, ‘মাতাল ঋত্বিক’, ‘নায়কের ছায়া’, ‘এক ফোঁটা কেমন অনল’, হাসান হাফিজুর রহমান ‘শোকার্ত তরবারি’, ‘ভবিতব্যের বাণিজ্যতরী’, সৈয়দ শামসুল হক ‘অপর পুরুষ’, ‘রজ্জুপথে চলেছি’, ‘এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি’, শহীদ কাদরী ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ‘তৃতীয় তরঙ্গে’, ‘কোলাহলের পর’, ফজল শাহাবুদ্দীন ‘আততায়ী সূর্যাস্ত’, ‘অন্তরীক্ষে অরণ্য’, ‘আলোহীন অন্ধকারহীন’, নির্মলেন্দু গুণ ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ ও ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’, আবুল হাসান ‘যে তুমি হরণ করো’ ও ‘পৃথক পালঙ্ক’, মহাদেব সাহা ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’, ‘কী সুন্দর অন্ধ’, ‘একা হয়ে যাও’, সিকদার আমিনুল হক ‘বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকারে’, ‘এক রাত্রি এক ঋতু’, ‘কাফকার জামা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রস্থ।

বাংলাদেশের সাহিত্যের আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এইসময়ে যে গ্রামজীবন ও আঞ্চলিক জীবনের ছবি আমাদের সাহিত্যে পাওয়া যায় পূর্বের তুলনায় তা অনেকটাই আলাদা। আগে লেখকেরা গ্রামকেন্দ্রিক প্রবহমান জীবনকে দেখেছেন অনেকটাই অনড় অচল নিস্তরঙ্গ হিসেবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই গ্রামজীবনে যে চাঞ্চল্য দেখা গেল—স্বার্থান্বেষীদের হানাহানি, দ্বন্দ্ব আর রাজনৈতিক অস্থিরতার স্পর্শ লাগে, বাংলাদেশের লেখকেরা, বিশেষ করে কথাসাহিত্যিকেরা সেই ছবি চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন তাদের লেখায়। সেইসঙ্গে ভুলে যাননি সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের চিত্রটি আঁকতে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে যে-বিষয়টি তা হলো নিম্নবর্গের মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা। গ্রামীণ কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ফতোয়াবাজি, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদিকে তারা উপজীব্য করছেনে তাদের লেখায়। সাধারণ ব্রাত্যজীবনকে পরম মমতার সঙ্গে উপন্যাসের বিষয় করে তুলেছেন। এ সংক্রান্ত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘দূরত্ব’, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’, ‘আয়না বিবির পালা’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘তিমি’, সেলিনা হোসেনের ‘জলোচ্ছ্বাস’, ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’, আবুবকর সিদ্দিকের ‘জলরাক্ষস’, ‘খরাদাহ’, হরিপদ দত্তর ‘ঈশানে অগ্নিদাহ’, ‘অন্ধকূপে জন্মোৎসব’, বশীর আল-হেলালের ‘শেষ পানপাত্র’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘জন্মজাতি’ ও ‘মৈনপাহাড়’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘ভূমিপুত্র’, ‘নূরজাহান’, ইমতিয়ার শামীদের ‘অন্ধ মেয়েটি জ্যোৎস্না দেখার পর’ ইত্যাদি। বাংলাদেশে ছোটগল্পেও গ্রামীণ জীবনের নানা টানাপোড়েনের ছবি পাওয়া যায়। হাসান আজিজুল হক (‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’), শওকত আলী (‘লেলিহান সাধ’, ‘শুন হে লখিন্দর’), আবদুস শাকুর (‘ক্রাইসিস’, ‘সরস গল্প’), সেলিনা হোসেন (‘খোল করতাল’) এবং সাম্প্রতিককলের একঝাঁক তরুণ গল্পকার গ্রামজীবনকেই প্রধানত তাদের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছেন।

স্বাধীনতার পরে নতুন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে আমাদের উপন্যাসে আরো বেশ কিছু অভিনব অথচ অনিবার্য বিষয় যুক্ত হয়। এর একটি হচ্ছে বেসরকারি সংস্থাগুলির (এনজিও) কর্মতৎপরতা গ্রামগুলিকে আন্দোলিত করার সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়টি আমাদের কথাসাহিত্যেও প্রতিফলিত হতে থাকে। প্রধানত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই এজিওকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডকে উপন্যাসে তুলে এনেছেন আমাদের লেখকেরা। এ প্রসঙ্গে ইমতিয়ার শামীমের ‘ডানা কাটা হিমের ভেতর’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করা যায় বিশেষভাবে। শুধু এনজিও নয়, বিশ্বায়নের প্রভাবে আমাদের জনপদ ও জনজীবন যে আমূল বদলে যাচ্ছে, তাও তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। এ বিষয়টি উপজীব্য হয়েছে ইমতিয়ার শামীমের ‘গ্রামায়নের ইতিকথা’ উপন্যাসে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পটভূমিতে ‘দ্যা নর্থ এন্ড’ নামে চমৎকার একটি উপন্যাস লিখেছেন বর্ণালী সাহা।

তবে এসব বিষয়কে ছাপিয়ে সাম্প্রতিকালে অন্য যে বিষয়টি কথাসাহিত্যিকদের, বিশেষ করে নারী লেখকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে নারী। নারীর জীবনযাপন, স্বপ্নকল্পনা, আশাআকাঙ্ক্ষা, পুরুষের আধিপত্য, নির্যাতন, নিপীড়নকেই নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের লেখায় উপজীব্য করেছেন। সেলিনা হোসেনের ‘দ্বিপান্বিতা’, ‘মোহিনীর বিয়ে’, রাজিয়া খানের ‘হে মহাজীবন’, নাসরীন জাহানের ‘উরুক্কু’, ঝর্ণা রহমানের ‘অন্য এক অন্ধকার’, ‘ঘুম-মাছ ও একটুকরো নারী’, শাহীন আখতারের ‘পালাবার পথ নেই’, ‘বোনের সঙ্গে অমরলোকে’ শীর্ষক উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থে পাওয়া যাবে এই বহুমাত্রিক বিচিত্র জীবনের ছবি। তবে সেলিনা হোসেনের আগ্রহ যেখানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নারীর অধস্তন অবস্থাকে নিরীক্ষণ করা, নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনের জটিলতার মধ্যদিয়ে আবার চলতে থাকে শাহীন আখতারের উপন্যাস ও গল্পের চরিত্রগুলি। উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামো ও সামাজিক পরিস্থিতিতে নারীর জীবন যে কিভাবে বদলে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে তার জীবনদৃষ্টি, উল্লিখিত নারী লেখকদের রচনা সেই দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে পুরুষ লেখকেরাও যে নারীবিষয়ের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠতে পারেন, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে শক্তিশালী গল্পকার হাসান আজিজুল হকের ‘মা মেয়ের সংসার’-এ টুকরো টুকরো মর্মভেদী কাহিনী আর ‘আগুনপাখি’, ‘সাবিত্রী উপখ্যানে’র আখ্যানে।

মুক্তিযুদ্ধ, মধ্যবিত্তের জীবনযাপন বা নারীর অধস্তন অবস্থা আমাদের সাহিত্যের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকলেও রাজনীতিই হচ্ছে বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রধান প্রবণতা। এই বিষয়টির প্রতি আমাদের লেখকদের ঝোঁক যে দুর্মর, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে উপনিবেশের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিশ্বায়নের খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই লেখকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এই ঝোঁক। বৈশ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রটিও নানা মতাদর্শিক বিভ্রান্তি, সংঘাত ও হানাহানিতে পূর্ণ। একাত্তরে যেসব প্রসঙ্গের প্রায় মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তানের প্রতি সহমর্মী রাজনীতিবিদ ও ভ্রান্ত বুদ্ধিজীবীরা আবার সেইসব প্রসঙ্গকেই রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। ফলে, এদেশে সামরিক শাসনের আবির্ভাব ঘটেছে, পুনর্বাসিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। কিন্তু লেখকেরা, আগেই যেমন বলেছি, সত্যনিষ্ঠ হওয়ার ফলে ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এরই প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও নাটক। সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ প্রতিরোধকে তারা তাদের লেখার বিষয়বস্তু করে তুলেছেন।

স্বাধীনতা পূর্বকাল ও পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কাহিনী যেসব উপন্যাসে নানা আঙ্গিকে ধরা পড়েছে সেগুলি হচ্ছে শওকত ওসমানের ‘পতঙ্গ পিঞ্জর’, ‘আর্তনাদ’, সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’, ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’, শওকত আলীর ত্রয়ী উপন্যাস ‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’, ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’, ‘ওয়ারিশ’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’, ‘খোয়াবনামা’, প্রশান্ত মৃধার ‘মৃত্যুর আগে মাটি’ শীর্ষক উপন্যাস। এসব উপন্যাসের বিষয়বস্তু দেশভাগ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্বাধীকার আন্দোলন, মতাদর্শিক ঘাতপ্রতিঘাত থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মধ্যদিয়ে এই সময় কেউ কেউ বাংলাদেশের মর্মমূলকে ছুঁতে চেয়েছেন। শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে পাওয়া যাবে তারই চমৎকার ভাষ্য।

বাংলাদেশের নাটকে প্রধানত সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপজীব্য হয়েছে এই রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। এসব নাটকে প্রাধান্য পেয়েছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেতনা। রাজনৈতিক ও সামাজিক অসঙ্গতি, শোষক ও শোষিতের শ্রেণিদ্বন্দ্ব নাট্যকারদের আকৃষ্ট করেছে। এসব নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মামুনুর রশীদের ‘ওরা কদম আলী’, ‘ওরা আছে বলেই’, ‘ইবলিশ’, ‘এখানে নোঙর’, ‘গিনিপিগ’, আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘শপথ’, ‘সেনাপতি’, ‘এখনো ক্রীতদাস’, ‘সুবচন নির্বাসনে’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘চারিদিকে যুদ্ধ’ ইত্যাদি। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারের মধ্যদিয়েও আমাদের নাট্যকারগণ সমকালীন রাজনৈতিক চেতনাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। ব্রতী হয়েছেন বাঙালি জাতিসত্তার উৎস ও অস্তিত্ব সন্ধানে। এই ধারায় রচিত উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, সাঈদ আহমদের ‘শেষ নবাব’, সেলিম আল দীনের ‘শকুন্তলা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’ প্রভৃতি। প্রতিবাদী নাটকের ধারাতেই বাংলাদেশে বেশকিছু নাট্যাঙ্গিকের সূত্রপাত ঘটে। এই আঙ্গিকগুলি হচ্ছে পথনাটক, গ্রামথিয়েটার, মুক্তনাটক ইত্যাদি।

তবে কথাসাহিত্য ও নাটকের তুলনায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ সবচেয়ে প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের কবিতায়। শামসুর রাহমানের উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ থেকে শুরু করে রফিক আজাদের ভাত দে হারামজাদা পর্যন্ত কবিতাগুলি পাঠকের একান্ত অভিনিবেশের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। পঁচাত্তরের পটভূমিতে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ লেখেন, ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন’। এছাড়া হাসান হাফিজুর রহমানের ‘আমার ভেতরের বাঘ’, শামসুর রাহমানের ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’, ‘অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই’, ‘ধুলায় গড়ায় শিরস্ত্রাণ’, ‘দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে’, ‘বুকে তার বাংলাদেশের হৃদয়’, আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’, নির্মলেন্দু গুণের ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’, ‘পৃথিবীজোড়া গান’, ‘দূর হ দুঃশাসন’, ‘ইসক্রা’, রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’, ‘অঙ্গীকারের কবিতা’, মহাদেব সাহার ‘ফুল কই শুধু অস্ত্রের উল্লাস’, ‘কোথা সে বিদ্রোহ’, ‘যদুবংশ ধ্বংসের আগে’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘আমরা তামাটে জাতি’, ‘জাতিসত্তার কবিতা’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যক্তিক শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে নানা মাত্রায়।

৫. দীর্ঘ সময়, বহুমুখী প্রকাশ
১৯৭২ থেকে ২০২০ সাল—এক দীর্ঘ সময়। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ এইসময় নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে অগ্রসর হয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রটি হয়ে উঠেছে জটিল ও সংক্ষুব্ধ, বাঁক নিয়েছে কয়েকবার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা ও মতাদর্শিক সংঘাত; বাদ-প্রতিবাদ। পুনরুত্থান ঘটেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির; তাদের সহযোগিতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে অতিডানপন্থী শক্তি। সামাজিক সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকৃত চর্চার জায়গা থেকে সরে আসবার ফলে বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ চিহ্নিত হয়েছে মৌলবাদী দেশ হিসেবে। এখন আবার অবশ্য বাংলাদেশ ফিরে যাচ্ছে তার রাষ্ট্রিক উৎসে, মুক্তিযুদ্ধের মতাদর্শিক জায়গায়। এই লেখার সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমাদের সাহিত্যে উল্লিখিত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়টি কিভাবে রূপায়িত হয়েছে, তুলে ধরা সহজ হয়নি। তবু চেষ্টা করেছি এই সময়ে রচিত বাংলাদেশের সাহিত্যের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরার। কিন্তু এর মাধ্যমে যে বাংলাদেশের সাহিত্যের সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরা যায়নি, লেখাটির উপসংহারে পৌঁছে তা বিলক্ষণ মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশের সাহিত্যের মনোযোগী পাঠকমাত্রেই লক্ষ করবেন, এদেশের সাহিত্য নানা সময়ে নানা বাঁক নিয়েছে। স্বাধীনতার পর যে ধরনের উদ্দীপনামূলক লেখা আমরা কবি ও কথাসাহিত্যিকদের কাছ থেকে পেয়েছি, শাহবাগের গণজাগরণের পর তা আবার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের রূপ নেয়। কবিতার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি আত্মস্বীকারোক্তিমূলক এবং রাজনৈতিকভাবে ঝাঁঝালো কবিতার পরিবর্তে এখন লেখা হচ্ছে ‘অন্তর্মুখী ব্যক্তিক’ কবিতা, অন্তর্লীনতার হার্দ্র কারুণ্যে যে কবিতা স্নাত। এখন আবার দেখা যাচ্ছে আশির দশকের বিমূর্ত কবিতার পরিবর্তে সহজ কবিতার প্রতি কবিদের ঝোঁক। আবার শাহবাগের গণজাগরণে প্রভাবে লেখা হয়েছে প্রতিবাদমূলক ঝাঁঝালো কবিতা, ছড়া, গল্প ও উপন্যাস। তরুণ কবিদের মধ্যে দেখা গেছে রূপকল্প নির্মাণে, প্রতীক ব্যবহারে, ভাষাভঙ্গিকে অভিনব করে তুলবার প্রবণতা। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তরুণ লেখকেরা। জাদুবাস্তবতা তাদের অনেকটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গত দুই দশকে নগরজীবন ও গ্রামকে কেন্দ্র করে কখনো আত্মজৈবনিক, কখনো যাদুবাস্তবতা, কখনো নিরীক্ষাধর্মী গদ্যে তারা গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। নাটকেও পাওয়া যাবে নানা বৈচিত্র্যের সন্ধান।

সবমিলিয়ে বলা যায়, এই সময়ের সাহিত্য সরাসরি বক্তব্য প্রকাশের স্তর থেকে সরে এসে হয়ে উঠছে অস্তিত্ব-নিরস্তিত্বের ব্যক্তিক গাথা। লেখকেরা প্রথাগত ভাষা ও ভঙ্গিতে সরাসরি ঘটনার বর্ণনায় আর আগের মতো আগ্রহী নন, তারা ব্যক্তিঅস্তিত্বের গভীরে কিংবা অন্তর্লোকে নিমজ্জিত হয়ে উপলব্ধি করতে চান তার যাপনের প্রকৃত স্বরূপ। বাংলাদেশের সাহিত্য এভাবেই হয়ে উঠেছে মানবীয় অন্তর্লোকের উদ্ভাষণ, মনোবাস্তবতার যাপিত দলিল। সহজ ছন্দোবদ্ধ কবিতার দিকে যেন আবার ফিরছেন কবিরা। কেউ কেউ একে হাল আমলের ফ্যাশনদুরস্ত শব্দ উত্তর-আধুনিক বলে চিহ্নিত করতে চাইছেন। কিন্তু উত্তর-আধুনিকতার স্বরূপ যে কী তা এখনো সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, হবেও না হয়তো। কারণ, উত্তর-আধুনিকতা নিজেই নির্দিষ্ট কোনো ছকে নিজেকে আটকে রাখতে চায় না, সেটাই তার বৈশিষ্ট্য। তাহলে কিভাবে ব্যাখ্যা করব একে? আসলে সাহিত্যকে বোধহয় এখন আর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নয়, উপলব্ধি করে জারিত করার সময় এসে গেছে। নির্দিষ্ট দেশকালের মধ্যে তার শিকড় চাড়িয়ে দিয়েও যে বাংলাদেশের সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছে, বুঝে নিতে হবে সেটাই। তবে মতাদর্শিকভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করে যারা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচ্যুত করে ভুল পথে চালিত করতে চেয়েছিল, তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ফলে, সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখক সর্বমানবিক অসাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটেই তাদের সাহিত্য রচনা করছেন। সবধরনের বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক, ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্নের কথাই কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও লেখকেরা বলে চলেছেন।

ঢাকা, ২৪ মার্চ ২০২০

   

মহাশূন্যে যাবে জাপানের তৈরি কাঠের স্যাটেলাইট



বিজ্ঞান ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মহাশূন্যে উৎক্ষেপণের জন্য কাঠের স্যাটেলাইট তৈরি করেছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। এটি স্পেসএক্স থেকে মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

বুধবার (২৯ মে) ইয়েমেনের বার্তাসংস্থা সাবা এ বিষয়ে একটি খবর প্রকাশ করেছে।

খবরে জানানো হয়, জাপানের কিয়েটো বিশ্ববিদ্যালয় ও সুমিটোমো ফরেস্ট্রি ফাউন্ডেশন বিশেষজ্ঞেরা ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরের চেষ্টায় এই স্যাটেলাটটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

বুধবার কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা ৪ বছরের কঠোর পরিশ্রম করে কাঠের তৈরি স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছেন। এই স্যাটেলাইটের নামকরণ করা হয়েছে, ‘লিগনোস্যাট’ (LignoSat)। এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম কাঠের তৈরি স্যাটেলাইট। পরিবেশের কথা চিন্তা করে এই স্যাটেলাইটটি তৈরি করা হয়েছে। এটি যখন তার অভিযান শেষ করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তখন এটি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাবে।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘লিগনোস্যাট’ স্যাটেলাইটির আকৃতি ১০ সেন্টিমিটার। এটির পুরুত্ব ৪ থেকে ৫.৫ মিলিমিটার। তবে এটির ভেতরের স্তর হবে অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি এবং এর ভেতরে একটি সোলার প্যানেল থাকবে। সবমিলিয়ে এটার ওজন হবে মাত্র এক কেজি। এই স্যাটেলাইট সম্পূর্ণ সনাতনী জাপানি পদ্ধতিতে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের ‘অ্যাডহেসিভ’ (আঠা) ব্যবহার করা হয়নি।

জাপানি বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ‘লিগনোস্যাট’ স্যাটেলাইটটি স্পেসএক্স থেকে এ বছরই উৎক্ষেপণ করা হবে। তারা আরো জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে এটি পৃথিবীর বাইরে পরীক্ষামূলকভাবে উড়াল সম্প্ন্ন করেছে। স্যাটেলাইটটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে, তা অবশ্য জানানো হয়নি।

;

১২৫তম জন্মবর্ষ

মুক্তির অন্বেষী নজরুল



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নজরুল জীবনের ‘আর্তি ও বেদনা’র সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেকালের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নজরুলের আবির্ভাবকালে মুসলমানদের সামাজিক আবহাওয়া এমনই জীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ ছিল যে, কোনো শিল্পীরই সেই আবহাওয়াতে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসার সম্ভব ছিল না। জীবনের প্রথমদিকে তাই কামাল পাশা প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত বীর মুসলিমেরা নজরুল-মানসকে আচ্ছন্ন করেছিল।

কিন্তু অচিরেই তিনি বাঙালির জাগরণের পথিকৃতে রূপান্তরিত হন। বাংলার জাগরণ গ্রন্থে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রণীজন কাজী আবদুল ওদুদ জানাচ্ছেন, ‘নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং যারা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দিলে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’

চরম দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও জীবনের জয়গান গেয়েছেন কবি নজরুল, ছবি- সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে বৃহত্তর পরিসর ও অর্থে গ্রহণ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই (১৯২৭) সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে সাময়িকী ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যে কারণে এদের ‘শিখা গোষ্ঠী‘ নামেও অভিহিত করা হয়।

শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা তথা শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ। ‘বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুলকে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বুদ্ধির মুক্তি, মানব মুক্তি, সমাজের মুক্তি তথা মানুষের শির উচ্চতর করার বাণী উৎকীর্ণ করেছিলেন নজরুল। গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের গানে মুখরিত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম। মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না তাঁর কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। জগতের বঞ্চিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত, স্বাধীনতাহীন বন্দিদের জাগ্রত করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন নজরুল। মানবতার জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন-'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্ …’।

মানুষ আর মানুষের হৃদয়কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। আবার তাঁর কলম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান- ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত জগতের বঞ্চিত ভাগ্যহত’।

শুধু যে কবিতাই লিখেছেন তা তো নয়। তিনি এমন অনেক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। নজরুলের দেশপ্রীতি, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে।

সাম্য ও মানুষের কবি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, ছবি- সংগৃহীত

‘সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাত–ধর্ম ছিল হৃদয়ের প্রেমধর্ম; যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। শুধু লেখনীর দ্বারা নয়, নিজের জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে ঐক্যের আশায় আশাবাদী ছিলেন নজরুল।

তাঁর ব্যক্তিজীবনে এই ভাবনার প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর বিবাহের ক্ষেত্রে, পুত্রদের ক্ষেত্রেও। তাঁর পরিবারের সব সদস্য এবং আপামর বাঙালি এই সত্য নিত্য উপলব্ধি করেন।

১২৫তম জন্মবর্ষে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্য মুক্তির অন্বেষী। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক তথা সুবিশাল সাহিত্যকর্ম বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, নানা কারণে তাৎপর্যবাহী।

কেননা, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনে জর্জরিত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার, হামলা, নির্যাতন।

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ এখন অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন।

এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ-তুল্য কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, বিদ্রোহ, মুক্তি ও মানবতার মহান সাধক।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বৃটিশ-বাংলার সর্বপশ্চিম প্রান্তের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম আর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।'

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানাজন নানামত দিতে থাকেন। এ অবস্থায় স্থাননির্ধারণী সভায় রফিকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন নজরুল তাঁর এক গনে লিখেছেন-

‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’॥

সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর কবর হোক। তাঁর এ প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো। পরবর্তীকালে এ কবর পাকা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ছবি- সংগৃহীত

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবনযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির একটি 'বিদ্রোহী', যা স্পর্শ করেছে রচনার শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক ‘প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক ‘সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ‘ধূমকেতু’তে (২২ আগস্ট, ১৯২২) ছাপা হয়।

বলা বাহুল্য, অসম্ভব পাঠকপ্রিয়তার কারণেই কবিতাটিকে বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ও রচয়িতা কবি নজরুল ‘চির উন্নত শির’ রূপে বিরাজমান।

পুরো বাংলা ভাষা বলয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শাণিত প্রতিবাদ তুলনাহীন। বিদ্রোহীর শতবর্ষকে ‘জাগরণের শতবর্ষ’ রূপে উদযাপন করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী পরিমণ্ডলে আর ১২৫তম জন্মবর্ষে মুক্তির অন্বেষী নজরুলকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি!

 ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

শ্রীপুরের কাওরাইদে নজরুল উৎসব শনিবার



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ কালি নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘ভাগ হয়নিকো নজরুল’ শীর্ষক নজরুল উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে শনিবার। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে এবং নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর সহযোগিতায় এই উৎসবে সেমিনার, আবৃত্তি ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকে তুলে ধরা হবে।

নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর অন্যতম ট্রাস্টি আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক জানান, আয়োজনের শুরুতে শনিবার দুপুর ২টায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সুনীল কান্তি দে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. সাইম রানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ও ছায়ানট (কলকাতা)’র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক।

তিনি আরও জানান, বিকেলে আয়োজনে নজরুলের জাগরণী কবিতা ও গান পরিবেশন করবেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা। আবৃত্তি করবেন-টিটো মুন্সী ও সীমা ইসলাম। নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করবেন শিল্পী ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি থাকবেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার।

‘দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নজরুল চর্চা বেগবান করতে এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এবছর কবি নজরুলের ১২৫তম জন্মবর্ষ। এই বছরটি নজরুলচর্চার জন্য খুবই সবিশেষ। উৎসবে দুই দেশের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে সাময়িকী। সাম্য, মানবতা ও জাগরণের যে বাণী কবি সৃষ্টি করে গেছেন, সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের জন্য তা আলোকবর্তিকা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরুলের এই আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা’-বলেন আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক। 

;

শিশু নজরুল



এ এফ এম হায়াতুল্লাহ
কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত। এটি বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনের দিক দিয়ে বহুগুণ বড় একটি দেশ। বহুজাতির বহু মানুষের বাস সে দেশে। ঐ দেশ অনেকগুলো প্রদেশে বিভক্ত। এই প্রদেশগুলোকে বাংলা ভাষায় রাজ্য বলে অভিহিত করা হয়। এই ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের পূর্বাঞ্চল আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর পশ্চিমাঞ্চল ‘পশ্চিম বঙ্গ’ নামে ভারতের অন্তর্গত রয়ে গেছে।

এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার অধীন আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে এবং ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে জন্মলাভের পর একটি শিশুর কাজী নজরুল ইসলাম নাম রাখেন যে পিতা তার নাম কাজী ফকির আহমদ। আর যে মায়ের কোলে তিনি জন্মান তার নাম জাহেদা খাতুন। এই শিশুটির জন্মের আগে এই পিতামাতার আর-ও ৪ জন সন্তান জন্মের সময়ই মারা গিয়েছিল। শুধু তাদের প্রথম সন্তান কাজী সাহেবজানের বয়স তখন ১০ বছর। অর্থাৎ কাজী নজরুলের সর্বজ্যেষ্ঠ বড় ভাই শিশু কাজী নজরুলের চাইতে ১০ বছরের বড় ছিলেন। নজরুলের পর তার আর-ও একজন ভাই ও বোনের জন্ম হয়েছিল। ভাইটির নাম ছিল কাজী আলী হোসেন এবং বোনটির নাম ছিল উম্মে কুলসুম।

শিশু নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ বই-পুস্তক পড়তে পারতেন। তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাজারের সেবা করতেন। রাজ্য শাসকগণ কর্তৃক বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ অর্থাৎ বিচারকগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতেন। মুসলমান সমাজ থেকে বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজী বলা হত। মুসলমান সমাজে কাজীগণ অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন। নজরুল ইসলাম এইরূপ সম্মানিত পরিবারে জন্মপ্রাপ্ত এক শিশু। তাই জন্মের পর ক্রমশ বেড়ে উঠার পর্যায়ে তিনি পারিবারিকসূত্রেই ভাল-মন্দের পার্থক্য করার এবং হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হয়ে সকলকে সমভাবে ভালবাসার গুণাবলি অর্জন করেন।

মানবজাতির ইতিহাসে যে-সমস্ত মহাপুরুষ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের অধিকাংশই শৈশব থেকে নানারূপ দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়ে সেগুলো জয় করে মহত্ত্ব অর্জন করেছেন। তাদের কেউই একদিনে বড় হয়ে যাননি কিংবা বেড়ে-ও উঠেন নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মানোর আগেই পিতাকে হারিয়েছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে হারিয়েছিলেন জন্মদাত্রী মাকেও। নজরুল তার পিতাকে হারান নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে। পিতা তাকে গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। তখনকার দিনে পড়াশোনা করার জন্যে সরকারি ব্যবস্থা ছিলনা। বাংলাদেশের তখন জন্ম হয়নি।

বিশেষ ভঙ্গিমায় হাবিলদার নজরুল

নজরুলের জন্মভূমি বাংলা প্রদেশ ভারতবর্ষের একটি রাজ্য যা ছিল বিদেশী ব্রিটিশ শাসনাধীন তথা পরাধীন। ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের সাধারণ মানুষ তথা প্রজাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সচেতন হয়ে উঠে-তাদের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়-তারা পরাধীন থাকতে চায় না-স্বাধীনতার প্রত্যাশী হয়। বিদেশী শাসক ব্রিটিশরা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত না করায় জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করত। সেই প্রতিষ্ঠানে প্রধানত মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হত। এইসব প্রতিষ্ঠান মক্তব নামে পরিচিত হত। এগুলো পরিচালনার ব্যয় অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন মক্তব প্রতিষ্ঠারাই দান, সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করার মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। গ্রামীণ একটি মক্তবে নজরুলের পাঠগ্রহণ শুরু। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর।

একবার কিছু শোনে ও দেখেই তিনি তা মনে রাখতে পারতেন। কিন্তু শিশুসুলভ সকল প্রকার চঞ্চলতা-ও তাঁর ছিল। পিতৃবিয়োগের পর সেই চঞ্চলতার যেন ছেদ পড়ল। তার মেধাগুণে তিনি হয়ে উঠলেন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সেই মক্তবেরই শিক্ষক। একজন শিশু শিক্ষক। এক শিশু পড়াতে লাগলেন অন্য শিশুকে। উদ্দেশ্য নিজের অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া। কিছু দেয়ার মাধ্যমে আনন্দ লাভ-যে আনন্দ মহৎ।

তার ভেতরে ছিল এক ভবঘুরে মন। মক্তব ছেড়ে ভর্তি হলেন উচ্চ বিদ্যালয়ে-মাথরুন নবীন চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে। স্থিত হলেন না সেখানে। গ্রামীণ নিসর্গ, প্রকৃতি, ঋতুচক্র যেমন তার মনকে প্রভাবিত করে, অজানাকে জানার এবং অচেনাকে চেনার নিরন্তর কৌতূহল-ও তাকে আন্দোলিত করে। ঘরছাড়া স্বভাবের এই শিশু অন্য সকল মানুষের জীবন ও সংগ্রামের রহস্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ঘর তাকে বাঁধতে পারে না। বিশাল আকাশকেই তার মনে হয় তার মাথার ওপরে খাঁচার মত উপুড় হয়ে তাকে আটকে রেখেছে। তাই তিনি মনে মনে ‘ভূলোক, গোলোক ও দ্যুলোক’ ছাড়াতে চাইতেন কেবলÑনিজেকে মুক্ত করতে চাইতেন। মনের আহ্বানে সাড়া দিতেন, গান শোনাতেন, শুনে শুনে গাইতেন।

তারই পরিক্রমায় গ্রামীণ লোক-নাট্য ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দিলেন। সেখানেও তার দলপতি উস্তাদ শেখ চকোর গোদা ও বাসুদেব তাকে সেরাদের ‘সেরা’ বলে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি শুধু লেটোর দলে গানই গাইলেন না। গানের পালা রচনা করলেন। ‘ মেঘনাদ বধ’, ‘হাতেম তাই’ ‘চাষার সঙ’, ‘আকবর বাদশা’ প্রভৃতি পালা রচনা করতে যেয়ে হিন্দু পুরাণ রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বেদ যেমন পড়লেন, তেমনি পড়লেন কোরান-হাদিস, ইতিহাস-কাব্য প্রভৃতি। মক্তব-বিদ্যালয় ছেড়ে হয়ে গেলেন প্রকৃতির ছাত্র।

কিন্তু আগুন যে ছাই চাপা থাকে না। প্রতিভার আগুনের শিখা দেখে ফেললেন পুলিশের এক দারোগা, যিনি নিজেও কাজী বংশের সন্তান, রফিজুল্লাহ। চাকরি করেন আসানসোলে। কিন্তু তার জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলা। নি:সন্তান রফিজুল্লাহ মায়ায় পড়ে গেলেন শিশু নজরুলের। নিয়ে এলেন জন্মস্থান ময়মনসিংহে। ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে ভর্তি করে দিলেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। কেমন ছিলেন তিনি এখানে ? জন্মভিটা চুরুলিয়া থেকে কয়েকশত কিলোমিটার দূরে-মাতৃআঁচল ছিন্ন পিতৃহীন শিশু! সহপাঠীরা কেউ লিখে রাখেন নি।

১৯১১ সনে ময়মনসিংহে আনীত হয়ে থাকলে পেরিয়ে গেছে একশত তের বছর। সহপাঠীদের কেউ বেঁচেও নেই। কিন্তু বেঁচে আছে নানারূপ গল্প ও কল্পনা। বড় বড় মানুষদের নিয়ে এমনই হয়। তাদেরকে কেন্দ্র করে অনেক কাহিনী তৈরী করা হয়। মানুষ জীবনের গল্প শুনতে ভালবাসে। তাই জীবন নিয়ে গল্প তৈরী হয় কিন্তু তা জীবনের অংশ না-ও হতে পারে। কেউ বলেন নজরুল ময়মনসিংহের ত্রিশালে এক বছর ছিলেন, কেউ বলেন দেড় বছর, কেউবা দু’বছর। প্রথমে ছিলেন কাজী রফিজুল্লাহ’র বাড়ি। এরপরে ছিলেন ত্রিশালের নামাপাড়ায় বিচুতিয়া বেপারির বাড়ি। এই দু’বাড়িতে থাকা নিয়ে অবশ্য কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু তর্ক আছে তার প্রস্থান নিয়ে।

কেউ বলেন তিনি স্কুল-শিক্ষকের কাছে সুবিচার না পেয়ে, কেউ বলেন অভিমান করে চলে গিয়েছিলেন। তবে তিনি কাউকে না বলেই চলে গিয়েছিলেন এটাই প্রতিষ্ঠিত মত। কিন্তু গেলেন কোথায় ? সেই জন্মস্থানে। তবে এবার চুরুলিয়া থেকে বেশ দূরে রাণীগঞ্জের শিহাড়সোল সরকারি স্কুলে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ১৯১৫ সন। পড়াশোনা করলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা। নজরুলের চঞ্চলমতি, ঘরছাড়া ও ভবঘুরে স্বভাবের জন্যে যেন বেমানান। প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হলেন।

মেধাবী বলেই নিয়মিত মাসিক ৭ টাকা বৃত্তি পেতেন। ঐ সময়ের হিসাবে মাসিক ৭ টাকা অনেক টাকা। মাসিক ৩ থেকে ৪ টাকায় সকল প্রকার থাকা-খাওয়ার ব্যয় মিটিয়ে অনায়সে চলা যেত। দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে এন্ট্রান্স বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা। সে প্রস্তুতি চলছে। নিচ্ছেন-ও। হঠাৎ ব্রিটিশ শাসকদল কর্তৃক যুদ্ধযাত্রার ডাক। কিন্তু প্রলোভন দেখানো হলো যে ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জিততে পারলে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে দিয়ে যাবে। জন্মাবধি স্বাধীনতা ও মুক্তি-প্রত্যাশীর হৃদয়ে নাড়া দিল। তিনি সাড়া দেবেন কিনা দোদুল্যমান। কিন্তু কপট ব্রিটিশ জাতি বাঙালিকে উত্তোজিত করার নিমিত্ত অপবাদ ছড়ালো যে বাঙালিরা ভীরু।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার কবিভবনে নজরুল

তারা লড়তে, সংগ্রাম করতে, যুদ্ধে যেতে ভয় পায়। স্বল্পকাল পরের (১৯১৭ সালের মাত্র চার বছর পর লিখিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৯২১ সনে) বিদ্রোহী কবির রক্ত ক্ষোভে নেচে উঠলো। কে রুখে তার মুক্তির আকাক্সক্ষা! বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে নাম লিখিয়ে বাস্তব যুদ্ধযাত্রা করলেন। গন্তব্য করাচি। ১৯১৭-১৯১৯ সাল অব্দি কঠোর সৈনিক জীবন। সুকঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই সাধারণ সৈনিক থেকে হাবিলদার পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি আরবি-ফার্সি সাহিত্যে অধ্যয়নসহ সঙ্গীতে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য মহাকালের এক অবিস্মরণীয় কবি-শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে করাচির জীবনই ছিল এক সাজঘর। যুদ্ধযাত্রার পূর্ব পর্যন্ত নজরুল শিশু। কিন্তু যুদ্ধফেরত নজরুল এক পরিপূর্ণ তরুণ ও চিরকালীন শিল্পী-যার মন ও মানস শিশুর মত আজীবন নিষ্পাপ।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট 

;