মুক্তিযুদ্ধের গল্প

রাহুর আরোহী



রাশিদা সুলতানা
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

১.
সকাল থেকে হেনা কেঁদেছে। ঘরের কোনায় বাসি হাঁড়ি ডেকচি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিছানা ছেড়ে কলপাড়ে যায় হাঁড়িপাতিলসহ। তার পড়শি হাসনা কলপাড়ে ডেকছি মাজছে। “অগো নিজেগো ভাতারেরা কী করে হেইডার ঠিক নাই, আমার জামাই আমার লগে কানল না হাসল এই খবরের লাইগা পাগল হয়া যায়।” হাসনা কার উদ্দেশে এই বাক্যবাণ ছুঁড়ছে হেনার জানতে আগ্রহ হয় না। আকাশে কালো মেঘ ঘন হয়ে উঠেছে। ঝড় আসবে। হেনা ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। পাশের রান্নাঘর থেকে আসা চ্যাঁপা-শুঁটকির গন্ধে বাতাস আচ্ছন্ন হয়ে আছে।

নর্দমা, ডাস্টবিন, ঘুপচিগলি, আর কুচকুচে কালো পানির পুকুরের পাশ দিয়ে তার বড় ভাই এসে অন্ধকার ঘরে ঢোকে। রামপুরা থেকে এসেছে। বিছানায় তার পায়ের কাছে বসে বলে, “বাচ্চাডা যখন উল্টাপাল্টা পোলাপানের লগে মিশতে শুরু করছে তখনই এই সর্বনাশ হইছে। একটা মাত্র বাচ্চা তোর, কার লগে মিশে, কই যায়, কোনো খোঁজ তুই রাখতে পারস নাই।”

“মাস্টরি ছাইড়া তার পিছে ঘুরলে আমার পেটের ভাত কে জোগাইত?”

ঝড়ের প্রবল তোড়ে টিনের চাল উড়ে যাবার উপক্রম। বাতাসের সাথে উড়ে-আসা শুকনা পাতা, ধুলা আর কাঁকর ঘরের অন্ধকারের সাথে মিশে একটা পরাজাগতিক আবহ তৈরি করেছে। টিমটিমে সাত-ওয়াটের বাল্বটা নিভে যায়। ভাই বোন কেউই উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করে না।

“কিন্তু আমার পোলা তো খুন করে নাই, দাদা। যেই লোকের মার্ডার কেসে ঢুকাইছে, সেই বেটা মরার সময় আরিফ আমার লগে কুমিল্লায় ছিল। ভাবিও তো গেছিল আমাদের সাথে। তোমরাও তো জানো আমার পোলা খুনি না। ফুঁপিয়ে কাঁদে হেনা। “আরিফের বন্ধুরা কইছে, এমপি সাহেবই আরিফরে মার্ডার কেসে ঢুকাইছে। এমপির খাতিরের এক লোকেরে আরিফ দুই বছর আগে সবার সামনে চড় মারছিল। আবার কেউ কয় যে এমপি সাহেব এলাকার ডাইলের ব্যবসা কন্ট্রোল করে। মুক্তিযোদ্ধা এমপি। যেন মুক্তিযুদ্ধ সব আকাম জায়েজ করনের লাইসেন্স।”

“কিন্তু তোর পোলা তো শুনছি ফেনসিডিলও ধরছিল।”

“হঁ, ধরছে তো। এমপি কুত্তার বাচ্চার লগে যহন মিশছে তহনই ধরছে। সে তো এলাকার হিরোইন, ফেনসিডিল সব ব্যবসা কন্ট্রোল করে।” তারপর ক্লান্ত গলায় বলে, “দাদা, আমার সব শেষ হয়ে গেল। যুদ্ধের সময় থিকা সব হারাইতে শুরু করলাম। শেষ ছিল আমার বাচ্চাটা, সেইটাও গেল এখন।” চোখ গড়িয়ে পানি কানের দুপাশ দিয়ে চুলের ভিতর ঢোকে। গভীর অবসাদে পেয়েছে তাকে। গায়ের কাঁথা দু গালের মেচেতা-পড়া মুখ-অবধি টেনে নেয়। ভাইকে পাশে বসা রেখেই হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে, কিংবা ঘুমের ওপর হাওয়ায় ভাসে। আধো-ঘুম-আধো-জাগরণে মন জুড়ে উঁকিঝুঁকি দেয় কত হারানো সুখ, হারানো মুখ...

২.
সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি। ঘুম ভেঙে হেনা সকালের নাস্তা তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রী বারান্দার টেবিলে বসে। উঠানের দেয়ালের পাশেই পাহাড়ে সুবিশাল পত্রপল্লব নিয়ে শালগাছ মৌনী দাঁড়িয়ে আছে। উঠানের কোনায় মরিচগাছ। মরিচ পেকে লাল হয়ে আছে। শ্যাওলা-ঢাকা বাউন্ডারি ওয়ালে রশি বেয়ে পুঁইশাক শাখাপ্রশাখা নিয়ে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে যতদূরসম্ভব। হেনার স্বামী হামিদ কর্ণফুলী রেয়ন মিলের হিসাবরক্ষক। রেয়ন মিলের স্টাফ কলোনিতে তাদের একতলা বাসার সামনেই উঁচু পাহাড়ের চূড়া বৃষ্টিতে ধূসর হয়ে আছে। চার বছরের ছেলে আরিফ তার ছোট ফুটবলটি দেয়ালে, উঠানে, জানালায় ছুঁড়ে মারছে।

আরিফকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করে হেনা। তার গলায় ‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল’ গানটি খানিক পর-পর আপনি-আপনিই থেমে যাচ্ছে। হেনার স্বামী ফিসফিসিয়ে বলে, “গান বন্ধ করো। বিহারী-পাকিস্তানিগো সাথে তোমার যা পিরিতি, তোমারে আইসা হয়তো দুইতিনদিনের মধ্যে খুন কইরা যাইব।” স্বামীর আশঙ্কা ও আতঙ্ক হেনার মাঝেও সঞ্চারিত হয়। বাইরে যে কোনো পদশব্দে হেনা চমকে ওঠে। হামিদ আবারও বলে, “কয়দিন আগে শুনলাম ঢাকায় মিলিটারি নাইমা সব মানুষ মাইরা ফালাইতেছে। তারপর শুনি এইখানকার, মানে চন্দ্রঘোণার বাঙালিরা বিহারিগোরে মাইরা ফালাইতেছে, তোমারে তো কালকেই কইছি আমাগো অফিসের ফিরোজ খান আর তার বউয়ের লাশ পাওয়া গেছে কর্ণফুলী নদীতে। এখানকার বাঙালিরা দুইজনরেই জবাই কইরা পানিতে ভাসায়া দিছে।”

ফিরোজ খান রাস্তায় হেনাকে দেখলেই বলত, “আসসালামু আলাইকুম, ভাবিসাহাব। ক্যায়সি হ্যাঁয় আপ?” লোকটার বিনয়ী সম্ভাষণ হেনার মাথায় ঘুরেফিরে বারবার আসে। গতকাল সারারাত একবিন্দু ঘুম হয় নাই তার।

বৃষ্টির পানি দেয়াল বেয়ে ওঠা পুঁইয়ের পাতায় পড়ছে। পানির ফোঁটার চাপে পুঁইপাতা নুয়ে পড়ছে একটু পর-পর। হামিদ বাজারে যেতে চাইলে হেনা বাধা দেয়। “বৃষ্টি থামলে বিকালে গলির সামনের দোকানের থিকা চাইল, ডাইল, ডিম, পিঁয়াজ কিনা নিয়া আইসো, বাজারে যাওয়ার দরকার নাই।” দরজায় মৃদু টোকার শব্দে দুজনেই চমকে ওঠে। হামিদ বলে, দরজা খুইলো না। আগে ফুটা দিয়া দ্যাখো কে আসছে।” হামিদ গজগজ করে, “পাকিস্তানিগো লগে তোমার পিতলা-খাতিরের কারণে কপালে কী আছে খোদা জানে।”

হেনা কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে, “কে দরজায়? কে?”

“বাজি, বাজি, দরওয়াজা খুলো না।” দরজা খুলতেই শাহজাদি তার দশ বছরের ছেলে ওসমানসহ তটস্থ ঘরে ঢুকে যায়। “বাজি, হাম আপকো ঘরমে পানা চাইয়ে, হামারা বাচ্চেকে আপলোগ বাঁচাইয়ে।” অনুময় করে তার দশ বছরের ছেলে ওসমানকে তাদের ঘরে আশ্রয় দিলে সে আজীবন তাদের গোলাম হয়ে থাকবে। হেনারা দুজনেই নীরব। আকাশী রঙের সালওয়ার-কামিজ-পরা শাহাজাদি ওড়নার কোনা দিয়ে নাক মুছছে। হেনার দু হাত চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শাহজাদি আবারও বাংলা উর্দু মিশিয়ে বলে, বাচ্চাটাকে জীবন ভিক্ষা দাও শুধু, কোথাও লুকিয়ে রাখো।

হেনা স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। হামিদের চেহারা কঠোর এবং নিস্পৃহ। সে বলে, “আমাদের বিপদ ডেকে আনতে চাই না, প্লিজ, আপনারা চলে যান এখান থেকে।”

বিস্ময় ও কৌতূহল-ভরা দু চোখে সবাইকে দেখে ওসমান। ফর্সা গোলগাল মুখ, আল্লাদি একজোড়া চোখ, পায়ে কালো চামড়ার স্যান্ডেল, গায়ে খয়েরি সালওয়ার, কুর্তা, মাথাভর্তি রেশমি-কালো চুল, হাতে কালো রঙের কাঠের ঘোড়া। ঘোড়াটা হাত ফসকে মাটিতে পড়ে হেনার খাটের নিচে ঢুকে যায়। খাটের নিচে মাথা ঢুকিয়ে ঘোড়া আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ওসমান। ঘোড়ার কাছেই ধুলামাখা বল। হাত ছিন্ন, মুণ্ডু ছিন্ন প্লাস্টিকের পুতুল।

হামিদ নিজেই দরজা খুলে দেয়, “প্লিজ, আপনারা চলে যান এখান থেকে।”

ওরা চলে গেলে হেনা ডুকরে ওঠে, “আল্লাহ তোমারে এত বড় সীমার বানাইয়া পাঠাইছে!” হামিদ চোখ রাঙিয়ে বলে, “নিজের জান বাচাঁও আগে।” এরপর আর সারাদুপুর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো বাক্যবিনিময় হয় না। বাতাসে উড়ে-উড়ে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নামছে পাহাড়ে। বৃষ্টির পানি পেয়ে দেয়ালের গায়ে শ্যাওলা আভিজাত্যে, গরিমায় ফুলে উঠেছে। বিকালে হামিদ বিছানা ছেড়ে উঠে যায়। হেনা ঘুমাতে চেষ্টা করে। দরজায় করাঘাত, হামিদের কণ্ঠস্বরে দরজা খুলে দেয় হেনা। বাজারের ব্যাগটা হাতে তুলে দিতে-দিতে হামিদ বলে, “ওসমানের বাপ, মা আর ওসমানরে মাইরা কর্ণফুলিতে ভাসায়া দিছে। ওসমানরে জায়গা দিলে ওরে খুঁইজা না পাইয়া হয়তো আমাগোরেও মাইরা ফেলত।”

হেনা চিৎকার করে ওঠে, “তোমার জন্য বাচ্চাডা মরছে। আমরা তো দুইতিনদিনের মধ্যে দেশের বাড়ি বা ইন্ডিয়া কোনোখানে যামু গিয়া, ওরে আমাগো সাথে নিয়া যাইতে পারতাম না? স্বার্থপর, ভিতু!”

হামিদ হিসহিসিয়ে ওঠে, “আস্তে কথা বলো, তোমার বাপেরা তোমারে আইসা খুন করবে। ওরা যদি জানে যে উর্দুতে কথা কয় এমন বাচ্চা তোমার ঘরে আছে তোমার লাশও পইড়া থাকত ওসমানের মায়ের লাশের সাথে। তোমার পাড়াপড়শিরাই জানাইয়া দিত। বরং যদি বাঁইচা থাকো, মনে রাইখো আমার লাইগাই বাঁইচা আছো। আর মরছে তো পাকিস্তানি। ঢাকায় যে হাজার-হাজার বাঙালি মারতাছে হেরা। পাকিস্তানিগো লাইগা কান্দো, ওরা তোমারে কয়দিন বাঁচাইয়া রাখে দেইখো।”

হেনা আর তার পড়শি জাহেদা মাথায় ঘোমটা দিয়ে মুখে কাপড় চেপে কর্ণফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখে, নদীতে পেপার মিলের কাঁচামাল হিসাবে ভেসে আসা বাঁশের স্তূপের গায়ে আটকে আছে ওসমানের লাশ। ঢেউয়ে দুলছে। মাথাভর্তি ঘনকালো চুল। নদীর ওপারে রাবার বন। পিছনে ঘনসবুজ পাহাড় মেঘ ছুঁয়েছে। আকাশের পানে মুখ তুলে ঘুমন্ত শিশু। আর নদীতীরে তার বাবার লাশ, শরীরের ঊর্ধ্বাংশ ডাঙায়, নিম্নাংশ জলে। পাশেই একটা খালি নৌকা দুলছে। মায়ের মৃতদেহ বাঁশের স্তূপের ওপাশে। আকাশী সালওয়ার-কামিজ আর মাথার চুল শুধু দেখা যায়।

পাহাড়, জঙ্গল, শ্যাওলা, মাছ, কচুরিপানা আর মৃতদেহেভরা নদী, ভারতে শরণার্থী ক্যাম্প, লাশের-দুর্গন্ধে-ভারি জনপদ পার হয়ে নিজ গ্রামে পৌঁছায় হেনা। দীর্ঘ পথে শত শত জীবিত বা অর্ধমৃত মানুষ পিঁপড়ার মতো সার বেঁধে অথবা কখনো সিলমাছের মতো হাঁচড়েপাছড়ে ভারী শরীর টেনে প্রাণভয়ে ছুটছে। ঝকঝকে সোনালি সূর্যের নিচে তাদের সাথে হেনা তার স্বামী-পুত্র-সহ ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটে চলেছে। এক হিন্দু গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তারা। পথে চোখে পড়ল মুণ্ডুহীন এক শিশুর পাশে এক তরুণীর দেহ। লোকজন বলাবলি করছিল, তাদের গ্রামে রজব আলী নামে এক রাজাকার তার দলবল নিয়ে ঘরে ঘরে ঢুকে সবাইকে রামদা দিয়ে জবাই করেছে। মেয়েকে বাড়িতে ঘুম পাড়িয়ে রেখে পুকুরে গিয়েছিল মরিয়ম। রজব আলী বাড়ি-বাড়ি হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, পুকুর ঘাটের এই খবরে তার ঘুমন্ত মেয়েকে নিয়ে এক নিশ্বাসে দৌড়ে বড় রাস্তায় ওঠে সে। লোকজন যখন বলে, ‘আহা রে, বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইছে,’ তখন তার চোখে পড়ে কোলের শিশুটি মুণ্ডুবিহীন। সে বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই রজব আলী তার বাচ্চাকে দ্বিখণ্ড করে যায়। সন্তানের ধড় হাতে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় মরিয়ম।

৩.
উঠানের কাঁদাপানিতে ছপছপ শব্দ করে বিশ্ব আসে। খানিক আগে ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে। ফুলশার্টের দু হাতের বোতাম খোলা। রঙ-উঠে-যাওয়া খয়েরি ফুলশার্ট আর লুঙি পরা বিশ্বর মাথার চুল তখনও ভেজা। হেনা জিজ্ঞাসা করে, “কী রে, আম টোকাইতে বাইরইছিলি? কতগুলা আম টোকাইছস?”

“মাত্র দুই বালতি হইছে, মাসি। মায়ও আমার সাথে টোকাইছে। ঠান্ডা যখন বেশি বেশি পড়তেছিল মায়ও ভিতরে গেছে, আমারেও টাইন্যা লইয়া গেছে।”

বিশ্বর চাচারা কেরোসিনের ব্যবসা করে। তার বাবা মারা গেছে তার শৈশবে, রক্তবমি করে। সকালে পুকুরঘাটে বিশ্বর মা, সন্ধ্যার সাথে দেখা হলে বাড়িতে কেরোসিন পাঠিয়ে দিতে বলেছিল। চোঙা দিয়ে বিশ্ব কেরোসিন ঢালে গভীর অভিনিবেশে। যেন একটুও কম না হয়, অথবা একবিন্দুও উপচে না পড়ে। বাঁ হাতের কনিষ্ঠার নখটি অপর সব নখের চেয়ে বড়। শীর্ণ, শ্যামলা মুখে বড়-বড় পাপড়ির উজ্জ্বল দুই চোখ।

কেরোসিন ঢালা শেষে দিগ্বিজয়ীর হাসি। হেনা বলে, “তুই তো বেটা বড় হয়া গেছোস। কেরোসিন ঢালা শিখা গেছোস।”

লাজুক হেসে বিশ্ব বলে, “মাসি, বাজার থিকা এহন আমিই কেরোসিন কিনা আনি।”

“তোর মায়ের কমু এহন একটা বিয়া করায়া দিতে।”

হেনার চাচাত বোন নাসিমা পাশের ঘরে হেনার ভাবির সাথে গল্প করছে। কালচে-নীল রঙের ঢাকাই বিটি শাড়ি পরা, চপচপে তেলে-ভেজানো চুলে নাসিমা একাই কথা বলে যাচ্ছে, তার স্বামীর কথা, সন্তানের গল্প। যে-মেয়ে সারাজীবন খুব কম কথা বলত, এখন সে বলতে শুরু করলে আর থামে না। একই গল্প, একই কথা বহুবার পুনরাবৃত্তি করে।

হেনার মতোই মৃত ও অর্ধমৃতের জনপদ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নিজ গ্রামে ফেরে হেনার চাচাত বোন নাসিমা। স্বামী-সন্তানহীন, একা। চট্টগ্রামে তাদের বিহারী পড়শিরা তাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা আর তাদের নিজ বাসায় ফিরতে দেয় নাই। সন্ধ্যায় শাহিদা নামের এক মহিলা জানায়, পুরুষেরা অন্য বাসায় থাকবে, এমনকি তার কিশোর পুত্রও। সেই সন্ধ্যায় চুমু খেয়ে ছেলেকে বিদায় দেওয়ার পর নাসিমা আর কোনোদিন তাকে দেখে নাই। একদিন সকালে এক বিহারী ভদ্রলোক তার স্বামীকে নিয়ে আসে। ক্লান্ত, দুর্বল, বিমর্ষ তার স্বামী মিজান জানায়, “মনে হয় আমাগোরে মাইরা টাইরা ফালাইব। তোমার ছেলেরে নিয়া আসতে চাইলাম, দিল না। বাচ্চাডা প্রত্যেক রাতে কাঁদে তোমার লাইগা।” তার পরের কথাগুলো নাসিমার বোধশক্তির উপর দিয়ে যাচ্ছিল। যাওয়ার আগে তার স্বামী তার হাতে কয়েকটা ব্লেড দিয়ে যায়। “অরা হয়তো তোমারেও ধর্ষণ কইরা মাইরা ফালাইব। তোমারে কেউ নষ্ট করতে আইলে তার আগেই আত্মহত্যা কইরো।” নাসিমা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত, তার স্বামী-সন্তান মারা যাবে না। তারা ফিরে আসবে। সে জানে সে জীবনে কোনো অন্যায় করে নাই। রাস্তার ভিক্ষুককেও কখনো আঘাত করে কথা বলে নাই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে বারো-তেরো বছর থেকে। নিশ্চিত ছিল সে, আল্লাহ তার ওপর এত নিষ্ঠুর হবে না। সাতআটদিন পর পাকিস্তানি মেয়ে শাহিদা নিশ্চিত করে তার স্বামী-সন্তান মারা গেছে। সে তাকে পালাতেও সাহায্য করে। সেও আশঙ্কা করত নাসিমা না-পালালে হয়তো তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করবে।

ধর্মভীরু পাকিস্তানি শাহিদার কাছে, নাসিমার স্বামী-সন্তান হত্যার চেয়েও সবাই মিলে মেয়েটাকে ধর্ষণ করবে তা হয়তো আরো বেশি পাপ-কাজ মনে হয়েছে। অথবা হয়তো তার স্বামী-সন্তান হত্যার অপরাধবোধ থেকেই তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে সে।

হেনার বড়ভাইয়ের ছেলে রাজীব বিশ্বর চেয়ে বছর-তিনেকের ছোট। যুদ্ধের কারণে বাবা-মায়ের সাথে ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছে। সুন্দর জামা, পায়ে সারাক্ষণ জুতা বা স্যান্ডেল পরিহিত রাজীবের পিছু-পিছু ছুটে বেড়ায় গোটা পাড়ার শিশুকিশোর। এমনকি রাজীবের চেয়ে পাঁচ-ছয় বছরের বড় কিশোরেরাও। শহুরে চাকচিক্য আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে একদল ছেলের নেতৃত্ব দিয়ে বেড়ায় রাজীব। তার নানাবয়সী শিষ্যেরা রঙবেরঙের ঘুড়ি, নাটাই, হাতে-বানানো নানা খেলনা নিয়ে রাজীবের সামনে হাজির হয়, তাকে চমৎকৃত করার আশায়। ভক্তকুল ছেড়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে রাজীবের মা চটাস-চটাস পুত্রের দু গালে চড় মারে।

“গ্রামের ফকিরনির জিকিরনির পোলাপান সবাই তোর বন্ধু হইয়া গেছে ক্যান? ফকিন্নিগো সাথে মাঠে-গোপাটে ঘুইরা হাত-পা-চেহারার নমুনা তো পুরা ফকিন্নিগো মতো বানাইয়া ফালাইছোস। যুদ্ধের মধ্যে ঘর থিকা বাইরাবি না, এমনকি উঠানেও নামবি না।”

বিকালে বিশ্ব এসে রাজীবকে ডাকে, “রাজীবমণি, রাজীবমণি, খেলাইতে আসো।” ঘর থেকে রাজীবের মা বের হয়ে বলে, “রাজীবরে নিয়া বাইরে যাইয়ো না। উঠানে বা পাকঘরের সামনে খ্যালো।”

বিশ্ব মাথা নেড়ে সায় দিয়ে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে ভেজা মাটি খোঁচায়। লুঙির ওপর বের হয়ে আছে কোমরে-বাঁধা কালো সুতা। তার পায়ের কাছে মাটি থেকে একটা কেঁচো মাথা তুলেছে। বাড়ির বাঁধা কাজের মানুষ হালিম ঘর থেকে একটা জলচৌকি টেনে এনে দেয় পরিচ্ছন্ন জামা প্যান্ট, দুপায়ে জুতা-পরা রাজীবকে বসার জন্য। মলিন শার্ট-লুঙি গায়ে, খালিপায়ের বিশ্বকে ডেকে নেয় তার কাজে সাহায্য করার জন্য। রাজীব জলচৌকিতে বসে দ্যাখে বিশ্ব একটা টুকরা কাঠ দিয়ে আরেকটা কাঠের ফালির ওপর একেকটা শামুক ভাঙছে। শামুকের খোলসের ভিতর থেকে নরম অংশটুকু বের করে রান্নাঘরের পাশে জড়ো হওয়া হাঁসকে খাওয়াচ্ছে। রাজীব দ্যাখে নরম হলুদ তুলার মতো হাঁসের বাচ্চাদের খাওয়ানোতে নিমগ্ন হয়ে আছে বিশ্ব। রান্নাঘরের পাটকাঠির বেড়ায় ফাঁক দিয়ে উৎসারিত ধোঁয়ায় সন্ধ্যা রহস্যময় হয়ে ওঠে। হাঁসগুলোকে খাওয়ানোতে ব্যস্ত বিশ্ব রাজীবের সাথে খেলতে আসার কথা বিস্মৃত হয়ে যায়।

গ্রামের পাশেই থানাশহরে পাকিস্তানি সৈন্য নেমেছে বলে সারা গ্রামে আতঙ্ক ছড়ায়। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালাবে কিনা ভেবে পেন্ডুলামের মতো দোদুল দুলছে। গ্রামে গ্রামে শান্তি কমিটি তৈরি হয়েছে। দিনে রাতে সন্ধ্যায় মানুষের ফিসফিস শোনা যায়। মাঝে মাঝে কিছু লোকজন পোটলা-বোঁচকা নিয়ে প্রায় নিঃশব্দে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। গ্রামে ফিরে আসার পর থেকে হেনা প্রায় প্রতি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে, এমনকি দিনের বেলা ঘুমালেও দুঃস্বপ্নে, ভয়ে জেগে ওঠে।

প্রতি ভোরে আলো ফুটবার খানিক আগে যখন চট্টগ্রামগ্রামী ট্রেনটি তার বাড়ির কাছের স্টেশনে হুইসেল বাজায়, হেনা ঘুম ভেঙে ধড়মড় বিছানায় উঠে বসে। ফুঁপিয়ে কাঁদে। পাশে ঘুমিয়ে থাকা স্বামীকে প্রায়দিনই জাগিয়ে তোলে, “মনে হয় এক-ট্রেন পাকিস্তানি মিলিটারি স্টেশনে নামছে। হয়তো আধঘণ্টার মধ্যে আমরার বাড়িঘর জ্বালায়া পুড়ায়া দিব। ঘুমাইলেই আমি স্বপ্নে দেখি আমি।”

স্বামীও সায় দেয়, “তোমরার বাড়ির সবারে আগে জ্বালাইব, তোমার চাচাত ভাইয়েরা তো সব মুক্তিবাহিনীতে গেছে।”

বাতাসে নানা খবর আসে আশপাশের গ্রাম থেকে। আর গ্রামের মানুষগুলি অনুচ্চ স্বরে কথা বলে ফিসফিসিয়ে। ঘরের চালের ওপর দিয়ে বয়ে যায় নদীর বাতাস। সে-হাওয়া ঘুলঘুলির ফাঁক গলে মানুষের কানে-কানে ফুঁ দিয়ে যায়। তাকে নতুন কোনো ফিসফিসানি ভেবে মানুষজন আরো চমকে ওঠে। মায়েরা শক্ত করে বুকে আঁকড়ে ধরে সন্তানকে।

সন্ধ্যারানি হেনার মাকে একদিন এসে বলে, “মাসি, বাপছাড়া বিশ্বরে কত সংগ্রাম কইরা বড় করতেছি আপনেরা তো জানেন। পাকিস্তানি আর্মি যদি গেরামে ঢুকে, বিশ্বরে খালি আপনেগো ঘরে লুকাইয়া রাইখেন। আমার পোলাটারে খালি বাঁচায়েন। আমরা বাঁচি-মরি, কপালে যা আছে হইব।

“তোগো লগে আমাগো ভালো খাতির, এইডা গ্রামের হগলতে জানে। তোগোরে না পাইলে সবার আগে আমাগো বাড়িই আইব হেরা।” হেনার মায়ের জবাবে সন্ধারানির মুখে সন্ধ্যা ঘনায়।

দিনের বেলা বাবা-মায়েরা প্রাণান্ত চেষ্টা করে সন্তানকে ঘরে বেঁধে রাখতে। এর মাঝেও শিশু কিশোরেরা বাবা-মায়ের গেরস্থালি ব্যস্ততার ফাঁক গলে বেরিয়ে পড়ে দুরন্তপনায়। দিনের আলো ফুটতেই বাতাসের সবুজ ধানক্ষেতে ঢেউয়ের হাতছানি উজ্জ্বল ঝকঝকে দিনের আলোর উদ্ভাস তাদের মনের যাবতীয় শঙ্কা দূর করে দেয়। বাইরের নরম বাতাস তাদের উতলা করে। বৃষ্টিতে ভেজে। পুকুরে বা নদীতে সাঁতরায়। মাঠে গুলতি আর সাতচাড়া খেলে। সবার ফিসফিসানি থেকে সংক্রমিত আতঙ্কের মেয়াদ রাত্রির অন্ধকার পর্যন্তই। হেনাদের গ্রামে যুদ্ধকালীন প্রথম হত্যার সংবাদটি আনে খালেকউদ্দিন। আমগাছে ঝুলানো লাশটি সে প্রথম দেখেছিল জোহর নামাজ থেকে ফেরার পথে।

বন্ধুদের সাথে শামুক কুড়াতে গিয়েছিল বিশ্ব গ্রামের পশ্চিম পাড়ার শেষমাথায়। শামুক, ঝিনুক, ঢ্যাপ সবকিছু মিলিয়ে বেতের ডুলি ভরে হৈচৈ করতে বাড়ি ফিরছিল। হানিফ মিয়ার ছাড়াবাড়ির আমবাগান পার হচ্ছে যখন, মাঠে বসেছিল শান্তি কমিটির সচিব মিনহাজউদ্দিন ও তার দুই সাকরেদ আজগর আলি আর কামরুজ্জামান। গ্রামে কয়টা হিন্দু ঘর আছে, কবে-নাগাদ পাক আর্মি পৌঁছাতে পারে, পাক আর্মি আসবার আগে শান্তি কমিটির পূর্বপ্রস্তুতি কী হওয়া দরকার—এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হচ্ছিল। আজগর আলিই প্রথম বলে, “ঐ মালুর বাচ্চারে ডাকি। বিশ্ব, এদিকে আয়!” তার সঙ্গী অন্য শিশুদের আজগর বাড়ি চলে যেতে বলে।

বিশ্ব এগিয়ে এলে তাদের একজন বলে, “ডাব পাইড়া খাওয়া আমাগোরে।” ডাব পাড়ার জন্য একজন দৌড়ে গিয়ে তার বাড়ি থেকে দা নিয়া আসে। এ গ্রামের লোকজন জানে এ কিশোর দুহাতে গাছ জড়িয়ে ধরে দুপায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে যেতে পারে নারকেল গাছের মাথায়।

গাছের মাথায় উঠে বিশ্ব বলে, “কাকা, নারকেল পারমু নাকি খালি ডাবই?”

“খালি ডাবই পাইড়া আন।”

বিশ্বকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে ডাবের পানি খায় তারা। তারপর তাকে পাশে বসতে বলে। বিশ্ব ভাবে হয়তো ডাব কেটে তাকে খাওয়াবে এখন। ডাবের পানির চেয়ে ভিতরের শাঁসটুকু বেশি পছন্দ তার।

নারকেল গাছের নিচে বকুল ফুলের মতো নারকেল ফুল ছড়ানো। গাছের গোড়ার কালো এক গহ্বর হা করে আছে। কালো পিঁপড়া, নানারকমের পোকা আসা-যাওয়া করছে। বিশ্ব একবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল “গাছের গোড়ায় এত বড় গাত্থা ক্যান?” মা বলেছিল যে গাছকে নুন খাওয়াতে হয়।

সে যেন চিৎকার দিতে না পারে, সেজন্য মিনহাজ পিছন থেকে তার মুখ বেঁধে ফেলে। বিহ্বল বড়-বড় দু চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বিশ্ব তাদের দিকে তাকায়। ডাব কাটার দা দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। মৃত কিশোরের দু চোখ বিস্ময়ে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে আসে কোটর থেকে। মৃতদেহের লুঙ্গি তুলে আজগর বলে, “লন, মালুর বাচ্চারে মোসলমানি করাইয়া দেই।” আজগর নিজেই মৃতের শিশ্নটিকে আড়াআড়ি চারভাগ করে কাটে ফুলের মতো করে। লাশটি একটা আমগাছে ঝুলিয়ে দেয়। এ-সংবাদে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সবার ধারণা হয় পাকিস্তানি বাহিনী হয়তো গ্রামে চলে এসেছে। ঘর থেকে কেউ বের হয় না।

বাতাসে ঢেউয়ে ধানক্ষেত দোলে, পুকুরে কচুরিপানার আড়ালে ভাসে টুকরো-টুকরো মেঘ। বেলা পড়ে এসেছে। ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। মসজিদের পাশে কোনো গাছে ঘুঘু ডেকে যাচ্ছে ক্রমাগত। মৃতদেহের কাছেও ভিড় নাই। সন্ধারানি নিজেই পুত্রের মৃতদেহ নামায় গাছ থেকে। আঁচল দিয়ে যত্ন করে রক্ত মুছে দেয়। ঢেউখেলানো সবুজ ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে পুত্রের রক্তাক্ত মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে আমবাগান, কাঁঠালগাছ, লেবুঝোপের পাশ দিয়ে, বাঁশবাগানের মধ্যে দিয়ে ধীর পদক্ষেপে সন্ধ্যারানি বাড়ি ফেরে। শ্যামলা, মিষ্টি, রক্তাক্ত মুখটি মায়ের কাঁধে পড়ে আছে। মুখ থেকে রক্তমাখা লালা বের হচ্ছে। দীর্ঘ পাপড়িময় দু চোখের পাতা তখনও খোলা।

বাকি যতদিন বিশ্বর মা বেঁচেছিল, কারো সাথে একটা কথাও সে বলে নাই।

৪.
হেনাদের বাড়ির লেবুঝোপের পাশের সরু রাস্তার মাথায় মসজিদ। মিনারে চাঁদ-তারার সিরামিকের নকশা। মসজিদের পিছনেই কবরস্তান। হেনার বাবা, দাদা-দাদি শায়িত এখানে। কবরস্তান আর রাস্তার মাঝামাঝি একটা চওড়া খাল। খালপাড়ের উঁচু সড়ক ধরে যুদ্ধ শুরুর তিন মাসের মাথায় গ্রামে ফেরে ঝর্না। হেনার ছোট বোন। জেলাশহরে খালার বাড়িতে থেকে কলেজ পড়ত সে। কলেজে যেতে শুরু করার অল্পকিছুদিনের মধে শহরে গুঞ্জন ওঠে, শহরে এসেছে “ধারালো তলোয়ার।” হলুদ রঙের দক্ষিণমুখী দোতলা বাড়ি। গেটে মাধবীলতার ঝাড়, বাড়ির সামনে দিয়ে ছেলেরা গান গেয়ে যায়, “তোমারে লেগেছে এত যে ভালো...।” সারা শহরের যুবকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হলুদ রঙের মাধবীলতার বাড়ি।

কোমর ছাপানো দিঘল কালো চুল। ছন্দোময় হাঁটার ভঙ্গি। ছোট-বড় সবার চোখে চোখ রেখে সরাসরি কথা বলা এমন আত্মবিশ্বাসী মেয়ে এই শহরে কেউ কোনোদিন দেখে নাই। তরুণরা আড্ডায় ঝর্নাকে নিয়ে শ্লীল-অশ্লীল নানা কথা বলে। হাসিতে ভেঙে পড়ে। ঝর্নার হাসিমুখের কয়েকশত গজের মধ্যে যে-বিদ্যুৎ বিচ্ছুরিত হয় তাতে আত্মাহুতি দিতে পাড়ার যুবকেরা হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার দিকে ধাবমান শিশুদের মতো ধেয়ে যায়।

কলেজে সদ্য-যোগদানকারী অর্থনীতির শিক্ষক তার নোটবইয়ের ফাঁকে চিরকুট গুঁজে দেয়।

‘There is sparkling glow in your eyes. To be honest, I can’t maintain eye contact with you for more than a few seconds.’

চিরকুট পেয়ে ক্লাস-শেষে শিক্ষককে একা পেয়ে সে বলে, “স্যর, আমার সামনে আপনি যেভাবে নার্ভাস হয়ে যান, ক্লাস কিভাবে নিবেন?”

কোনো জবাব না দিয়েই শিক্ষক প্রেমাতুর দু চোখের নিচে করুণ হাসি ঝুলিয়ে রাখে। ছাদে খোলা-চুল মেলে যখন আপন মনে সে গাইত “মধুমালতী ডাকে, আয়, ফুল ফাগুনের এ-মেলায়,” অথবা তার প্রিয় অন্য কোনো গান, পাড়ার তরুণদের কেউ-কেউ গোলাপ বা গন্ধরাজ ছুঁড়ে মারত তার দিকে, বা শিস বাজাত। প্রাণ ভরে সে উপভোগ করত আক্রান্ত-বিভ্রান্ত প্রণয়প্রার্থীদের উন্মাদনা। কিন্তু নিজে কারো প্রেমে পড়ত না। আর তাকে নিয়ে প্রণয়প্রার্থীদের উল্লাস-উচ্ছ্বাসে দিনকেদিন তার তিল-তিল আত্মবিশ্বাস মহাসমুদ্র হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের মাঝে ঝর্না গ্রামে ফিরে এলে এটা একটা খবর হয়ে যায়। কেউ-কেউ ফিসফিসিয়ে বলে, “এহন যখন পাক আর্মি গেরামে ঢুকতাছে, এইসময় এই মাইয়া ফিরা আইলো ক্যান।” গ্রামের হাইস্কুলে ক্লাস টেন-এ পড়ার সময় গ্রামের বখাটে ছেলে আরজু ওড়না ধরে টান দেওয়ায় ঝর্না তাকে চড় মেরেছিল। তার পর-পরই দৌড়ে গিয়ে সে তার বান্ধবীদের সাথে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। স্কুলের হেডমাস্টার ঝর্নাকে পুরাপুরি সমর্থন করায় সে-যাত্রা তার পরিবারের সম্মান বাঁচে। বরং আরজুকেই সবার সামনে ক্ষমা চাইতে হয়।

শঙ্কা বা সামাজিক অনুশাসন, কোনোকিছুই ঝর্নার আত্মবিশ্বাস আর জীবনের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বদলাতে পারেনি। চারিদিকে ফিসফিস, মা-ভাই-বোনের আতঙ্ক, আহাজারি, সবই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে সে। তারপর এক রাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরে ফেরার সময় মাঝ-উঠান থেকে আরজু ও তার সঙ্গীরা ঝর্নাকে তুলে নিয়ে যায়। মাত্র কিছুদিন আগে আরজু শান্তি কমিটিতে যোগ দিয়েছিল। অন্ধকারে কুপির আলোয় আরজুকে চোখে পড়া-মাত্র ঝর্না একদলা থুথু মারে তার মুখের ওপর। একটু আগে তার মুখের বাধঁন খুলে দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত সবাই মিলে চড়, লাথি, ঘুষি মারে তাকে। তারপর গণধর্ষণ। ঘুষিতে রক্তাক্ত ঠোট ফুলে ফেটে ঢোল হয়ে যায়। তার নাক আর গোপন স্থান থেকে রক্ত ঝরছিল।

গ্রামে কয়েকদিন গণধর্ষণের পর তাকে রাতের অন্ধকারে জেলাশহরে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানি আর্মির জন্য। একটা পুরানো লাল দালান। রেলওয়ের বাড়ি ছিল হয়তো। বাড়ির সামনে উঁচু ঘাস। ঘাসের নিচে খেলা করছে বাদামি কেন্নো। পাশে উঁচু অশ্বত্থ গাছে ডানা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে কাক, শকুন। অদূরেই কলা গাছের ঝোপ, কয়েকটা গাছে মোচা ঝুলছে। ছাদের একটু নিচে ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে সোনালি আলোর রেখা ঘরে ঢোকে। সেখান থেকে বাঁদুড় বের হয় সন্ধ্যার পর। সব জানালা তালাবদ্ধ। ঘরে পেশাব-পায়খানার ঝাঁঝালো গন্ধ।

বিশাল মাকড়শার জাল দেয়ালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। মেঝেতে ইট বালি সুড়কি আর বাদুড়ের বিষ্ঠা। দেয়ালে টিকটিকি, মাকড়শা, বাঁদুড় আর মেঝেয় পশুর মতো পড়ে ঘুমাচ্ছে অর্ধনগ্ন নানাবয়সী বাঙালি নারী। এদের মাঝে অন্তঃসত্ত্বা বেশ কয়জন। মাঝে মাঝে দুয়েকজন উঠে গিয়ে ঘরের এক কোণে মেঝের গর্তে বসে সবার সামনেই কাপড় তুলে মলমুত্র ত্যাগ করছে। ঝর্নাকে ভিতরে রেখে তালা দিয়ে চলে গেলে একদুইজন তাকে চোখ তুলে দেখে আবার ঝিমাতে থাকে। বেশিরভাগ মানুষই এমনকি চেয়েও দেখে না কে এলো। দু চারদিনের মধ্যে তাকে সরিয়ে নেওয়া হয় এক গেস্ট হাউসে। পরিচ্ছন্ন বেডরুম, গোসলখানা। পাক ক্যাপ্টেন সাহেব তার সাথে দুর্ব্যবহার করে না। হাসিমুখে চেষ্টা করে সম্পর্ক তৈরি করতে। সে কাছে এলে, ঝর্না কোমর-ছাপানো দিঘল চুলের মাঝে প্রস্ফুটিত ফুলের মতো মুখ থেকে একদলা থুথু ছুঁড়ে মারে তার মুখে। বেসিন থেকে মুখ ধুয়ে এসে ক্যাপ্টেন তার দু গালে চড় মারে। চলে যাবার সময় মনঃস্থ করে তাদের এখানকার সবচেয়ে বদমেজাজি মেজরের হাতে তাকে তুলে দেবে।

মেজর ওয়াসিম ইউনিফর্ম ও বুট পরে ঘরে ঢোকে। ডিউটি থেকে সে ফিরেছে। মুখে থুথু খেয়ে শুরুতে সে থতমত খেয়ে যায়। তারপর বুটসহ বিছানায় উঠে দাঁড়ায়। ঝর্নার চুল টেনে ধরে বসায়। খাট থেকে লাথি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আবার চুল টেনে তোলে খাটে। এভাবে কয়েকবার ফুটবলের মতো লাথি দিয়ে ফেলার সময় ঝর্নার গলা থেকে জান্ত্যব শব্দ বের হয়ে আসে। রক্ত বেরিয়ে আসে নাক, ঠোঁট দিয়ে। চেয়ারের কোনায় লেগে চোখের নিচে অনেকখানি কেটে যায়। তারপর ঝর্না নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মেজর ওয়াসিম অপেক্ষা করে ভোর হবার জন্য। সকালবেলা মোটর বাইকের পিছনে ঝর্নাকে বেঁধে নেয় তার সৈনিকদের সহায়তায়। শহরবাসী দেখছে হোন্ডার সাথে হাত-বাঁধা দিঘল চুলের এক নারীদেহ পিচের রাস্তায় ছেঁচড়ে যাচ্ছে। মোটর বাইকটা বারবার চক্কর দিচ্ছে শহরময়। রাস্তায় চুল, টুকরা টুকরা থেতলানো মাংস। চৌরাস্তায় নিচের ঠোঁটটা পুরোটাই খুলে পড়ে আছে। যে-হাসিতে শহরের তরুণদের হৃৎস্পন্দন দ্রিমিক দ্রিমিক শব্দে ড্রামের মতো বেজে উঠত, সেই হাসির ঠোঁট। রক্তাক্ত ছোট একটা মাংসপিণ্ড। যে-চুলে মুখ ডোবানোর স্বপ্নে বিভোর থাকত তরুণ কলেজ-শিক্ষক, সে-চুল শহরের পথে-পথে দিগ্ভ্রান্ত উড়ে বেড়াচ্ছে। যে-পিঠ, গ্রীবার আলো শুষে মদির হওয়ার স্বপ্ন দেখত শহরের বহু তরুণ, সেখানকার থ্যাঁতলানো মাংসখণ্ড শহরের রাস্তা জুড়ে। কতগুলো কাক এসে রাস্তার মাংসপিণ্ড, রক্তে ঠোকর দেয়। দীর্ঘ দিন শহরের মানুষের এ-বিস্ময় কাটে নাই, মেয়েটা মারা যাওয়ার পরও সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংস খুলে খুলে না-পড়া পর্যন্ত কেন লোকটা থামে নাই।

যেসময় শহরে ঝর্না মারা যাচ্ছে, সেসময়ই তাদের গ্রামে পাক আর্মি ঢুকছে।

গ্রামের তরুণ আহমেদ আলি যখন বাড়ি-বাড়ি চিৎকার করে বলে, “আর্মি আইছে, গেরামে মিলিটারি ঢুকছে।” হেনার ছোট চাচি ফাতেমা দৌড়ে পুকুরে ঝাঁপ দেয়। কচুরিপানার ভেতর থেকে শুধু মাথা ভাসিয়ে রাখে। কচুরিপানার ওপর একটা মাছরাঙা বসে দ্যাখে ফাতেমার মাথা, কচুরিপানার ভিতর। পুকুরপাড়ে তেঁতুলগাছের নিচে প্রাচীন এক পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে নাসিমা নির্বিকার বসে থাকে। তার ভয়শূন্য দৃষ্টি দেখে পাক সেনারা তাকে পাগল কিংবা সন্ন্যাসী ভেবে কিছু বলে না।

হেনা, হেনার ছেলে, মা, ভাবি, ভাইয়ের ছেলে, ঘরের সবাইকে হামিদ ঘরের মাচাঙে তুলে দেয়। দরজা বন্ধ করতে গেলে চোখে পড়ে উঠানে পাকবাহিনী, একেবারে চোখের সামনেই। “ঘরকো সবলোগ কাঁহা? মুক্তি কাঁহা?” বুট দিয়ে কেউ একজন তার নিম্নাঙ্গে লাথি মারে। কোনো প্রশ্নেরই জবাব তার মুখ থেকে বের হয় না। আবারও লাথি। সে মেঝেয় পড়ে যায়। একটা শব্দ মুখ দিয়ে বার করে না তবু। চার বছরের ছেলে আরিফ মাচাঙের উপর থেকে দেখে বাবাকে গুলি করে, পুরো ঘর লণ্ডভণ্ড করে পাকিস্তানিদের চলে যেতে। মৃতদেহ মেঝেয় পড়ে থাকে। ছেলের মুখ থেকে যাতে কোনো আওয়াজ না বেরয়, মা পুরোসময় তার মুখ চেপে রেখেছিল।

যুদ্ধের অনেক বছর পরও, প্রায় ভোর-রাতেই হেনার মাথায় ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠত। একট্রেনভর্তি পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে ট্রেন থামে তার মগজের ভিতরে। স-বুট প্যারেড করে। ঘুম ভেঙে যায় নিজের তীব্র হৃৎস্পন্দনে।

৫.
যুদ্ধের পর বড়ভাই-ভাবির সাথে হেনা পুত্রসহ ঢাকায় চলে আসে। ভাই সরকারি কর্মকর্তা। তারই তদবিরে ঢাকায় স্কুলে চাকরি নেয়। বড়ভাবি আকারে ঈঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়, তার ভাই চাকরি জোগাড় করে দিয়েছেই যখন, সে যেন এখন আলাদা বাসায় উঠে যায়। উত্তর গোড়ানের টিনশেড একতলা দেড়-রুমের বাসায় সাবলেট ওঠে হেনা। বাসা ভাড়া দিয়ে মা-ছেলের খাবারের পয়সাও আর প্রায় থাকে না। কোনোরকম দু বেলা খেয়ে ছেলের হাত ধরে সে মাথা নিচু করে স্কুলে যায়। মামার বাড়ি বা অন্য কোথাও দাওয়াত থাকলে ছেলেটা সেদিন পেট পুরে খায়। হামেশাই এত বেশি খায় যে খেয়েই প্রকৃতির ডাকে দৌড়ায়। ভাইয়ের বউ বা অন্যান্য আত্মীস্বজনের সামনে মা খানিক সংকুচিত হয়ে পড়ে এ-জন্য। সাবলেটের বাসার পাশের রুমে দাম্পত্য কলহে কথ্য-অকথ্য নানা খিস্তিখেউড়ের ফুলঝুড়ি বইতে থাকে। প্রাণপণ চেষ্টা করে গল্প, ছড়া শুনিয়ে ছেলের মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে। কিন্তু ছয় বছর বয়সের মধ্যেই বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রায় যাবতীয় গালি আরিফের ঠোঁটস্থ হয়ে যায়।

যুদ্ধের কয়েক বছর পর বৈশ্বিক ক্ষমতা-দ্বন্দ্ব আর নব্য সুবিধাবাদীদের অবার লুটপাটে দেশে যখন চরম খাদ্যাভাব তৈরি হয়, হেনার জোড়াতালির জীবনও শতখণ্ড হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বড়ভাবি সেসময় ত্রাতা হয়ে আসে জীবনে। মাঝেমধ্যেই দুই তিন সের চাল, ডাল, আনাজ, সবজি পাঠিয়ে দেয়। সেসময় গ্রাম থেকে সংবাদ আসে শ্বশুর মুমূর্ষু। হেনার স্বামী হামিদ অবিকল তার বাবার চেহারা পেয়েছিল। স্কুলের বাচ্চাদের খাতা দেখতে-দেখতে হেনার এসব কথা মনে পড়ে। হামিদের মুখটা মনে করতে চেষ্টা করে সে। শাশুড়িও মারা গেছে বছরখানের আগে। তার অসুস্থতার খবর পেয়েও দেখতে যাওয়া হয় নাই।

ভাবির কাছে থেকে ধার করে শ্বশুরকে দেখতে গ্রামে যায় হেনা। ট্রেন-বাসের ধকলের পর গ্রামের উদার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায় আরিফ। মায়ের হাত গলে দৌড়ে যায় সর্ষেক্ষেতে প্রজাপতি, ফড়িং ধরতে। কোমল হাওয়ার ঢেউয়ে দোদুল ধানক্ষেত, তার ওপর উড়ন্ত আরিফের রেশমি চুল। গ্রামের পুরো পথটা আরিফ লাফিয়ে-লাফিয়ে যায়। একটা বড় দিঘির পাড়ে পরিত্যক্ত প্রাচীন এক মন্দির, শ্যাওলায় কালচে রঙ ধরেছে। মন্দিরের গোড়ায় ঘন উঁচু ঘাস। আরিফ ভিতরে উঁকি দেয়। মানুষ আর পশুর শুকনো বিষ্ঠা। মা তাকে টেনে নিয়ে আসে, “সাপ আছে ভিতরে।” দিঘির একপাশে বসতবাড়িঘর, ঘাট, অন্যপাশগুলিতে বাঁশঝাড়, আমগাছের সারি, কালচে-সবুজ জলে শুকনো বাঁশপাতা-আমপাতার মাঝে কতগুলি হাঁস সার বেঁধে প্যারেডের ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছে। দিঘির কাছেই গোয়ালঘরের পাশে বেড়ার ছোট একচালা ঘরে মেঝেয় পাতা পাটিতে শ্বশুর শুয়ে আছে। বেড়ার গায়ে ঝোলানো রশিতে নোংরা, মলিন কিছু কাপড়চোপড় ঝুলছে। শ্বশুরের চেহারার সাথে হামিদের আর কোনো সাদৃশ্য নাই। শীর্ণ হতে হতে পশুর মতো হয়ে গেছে তার মুখ। বুকের চামড়া হাড়ের ভিতর ঢুকে গেছে। হেনা বৃদ্ধের শিরাওঠা জীর্ণ হাত ধরে।

“আমি হেনা।”

বৃদ্ধ চোখ তুলে দেখতে চেষ্টা করে। দু চোখের কোটর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে।

“এই যে আপনার নাতি।”

আরিফকে দেখিয়ে দেয় হেনা। বৃদ্ধ কামরানউদ্দিন নাতিকে দু হাতে স্পর্শ করে। মাথার চুলে, চোখে, কানে, গলায়, হাতের আঙুলে, সর্বত্র। বৃদ্ধ বলে, “তোমার শাশুড়ি বাঁইচা থাকতে আইলা না। তুমার পুতের লাইগা যে কত কান্দা কানছে গো।”

“শরীর কেমন এহন? খাওয়া-দাওয়া করতারেন নি?”

“খাইতে পারি গো, মা। কিন্তু খাওন তো পাই না। তোমারে দেওরে তো বালবাচ্চারেই খাওয়াইতে পারে না, আমারে খাওয়াইব কই থিকা। এমন অভাব জীবনে দেখি নাই। মা গো, আমারে ২০-৩০টা টাকা দিয়া যাও।”

হেনা ধার করে মা-ছেলের আসা-যাওয়ার টাকা এনেছে। এই টাকা মাস-শেষে ভাবিকে ফেরত দিতে হবে। শ্বশুরকে কাঁদতে দেখে সেও কাঁদে, আর বলে, “আব্বা, বাচ্চাডারে খাওয়ানের পয়সাও আমার কাছে নাই।”

হঠাৎ লোকটা উপুড় হয়ে হেনার দু পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। “মা গো, পায়ে ধরি, তুই আমারে টাকা দিয়া যা।”

সারাজীবন গম্ভীর, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন যে-শ্বশুরকে সে চিনত তার জায়গায় ক্ষুধার্ত পশুর মতো একটা জীর্ণশীর্ণ একজন মানুষকে তার পায়ে পড়তে দেখে সে অবাক। “আব্বা, আমার ট্রেনের ভাড়া হইব না।” বলে হেনা কাঁদে।

গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে এসে রাতে আরিফ স্বপ্নে দেখে, চেয়ারে বসে খোলাচুল মা আকাশে উড়ে যাচ্ছে। আদুড়-গায়ে কুঁজো দাদা তার মায়ের পা ধরে ঝুলে আছে।

৬.
হেনা মন্ত্রীর রুমের সামনে ওয়েটিংরুমে অপেক্ষমাণ সকাল ১১টা থেকে। সচিবালয়ের গেটের পাশে ওয়েটিংরুমে সকাল নয়টা থেকে এগারোটা টানা দুইঘণ্টা বসে ছিল। তার সাথে আছে ভাইয়ের ছেলে রাজীব। গেটে অপেক্ষার সময়টা রাজীবের কেটে যায় এসএমএস লেনদেনে। হেনার ভাবির খালাত ভাই ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। তিনিই পাস পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। হেনার বড় ভাই পরামর্শ দেয় মন্ত্রী আব্দুস সালিমের কাছে যেতে। তিনি যদিও মুক্তিযুদ্ধে তাদের এলাকায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, কিন্তু যুদ্ধের চৌত্রিশ বছর পর মন্ত্রী হয়ে এলাকার লোকজনের তদবির-টদবির শোনেন। মিথ্যা খুনের মামলায়ে ছেলে জেল খাটছে, ছেলের ফাঁসি হয়ে যেতে পারে, এ-ভাবনা মন্ত্রীর কাছে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে তাকে। সচিবালয়ে যায় ভাইয়ের ছেলেকে নিয়ে।

হেনার বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ছেলে আরিফকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। সরকারি দলের এক ছাত্রনেতা খুনের মামলায় দুই নম্বর আসামি করা হয়েছে তাকে। থানার অফিসারকে হেনা কত যে বোঝাতে চেষ্টা করল, “শোনেন, এই লোক যখন খুন হয়, আমার ছেলে তখন কুমিল্লায় আমার সাথে আমার ফুপাত বোনের বাসায়। আমি আপনাদের ঐখানকার অ্যাড্রেস দিয়া দেই, আপনারা খোঁজ করেন।”

হেনার এসব অনুরোধে পুলিশ জবাব দেয়, এমপি সাহেব ব্যক্তিগতভাবে চান আসামিরা ধরা পড়ুক। আসামি ছেড়ে দিলে উনি তাদের সাসপেন্ড করাবেন। পরে পুলিশরাই আকারে-ইঙ্গিতে জানায় মার্ডারকেসে এক থেকে সাত নম্বর পর্যন্ত কে কে আসামি হবে, সব স্থানীয় এমপি সাহেব ঠিক করে দিয়েছেন।

হেনা বলে, “এতবড় মুক্তিযোদ্ধা!”

অফিসার হেসে বলেন, “আপা, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা সবাই একই আচরণ করে।”

আশৈশব শান্ত, এত কম-কথা-বলা আরিফ কিভাবে ফেন্সিডিল ধরল, রাজনীতি, এমপি, কার সাথে কখন মিশেছে, হেনা বুঝে উঠতে পারে নাই। আরিফ ক্লাস টেন-এ পড়ার সময় তার শিক্ষক হেনাকে ডেকে বলেছিল আরিফ প্রায়ই স্কুলে যায় না, এবং তার কাছে খবর এসেছে যে সে আজেবাজে ছেলেদের সাথে মেশে। হেনা উন্মত্তের মতো মারধর করে আরিফকে, আর সারাদিন কান্নাকাটি করে। মার খেয়েও নীরব থাকে আরিফ, মায়ের কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেয় না। তিন দিন মা ছেলে বাসা থেকে বের হয় না। তিন দিন তারা কেউ পানি ছাড়া তেমনকিছুই খায়ও নি। মায়ের শত অনুনয়েও আরিফ মুখে কিছু দেয় না। হেনা আরিফের বন্ধুদের ডেকে তাদের টাকা দিয়ে বলে ওকে বাইরে কিছু খাইয়ে আনতে। এর পর, ছেলে দেরি করে ফিরলে বা পড়াশোনা না-করলে কান্নাকাটি করেছে, অনুনয়-বিনয় করেছে, কিন্তু গায়ে হাত তোলেনি আর। আরিফ পড়ালেখায় একসময় মনোযোগী হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স ক্লাসে ভর্তি হয়। কিন্তু রাজনীতি, এমপি, আর ক্ষমতার কাছের লোকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে না।

মন্ত্রীর রুমে একজন একজন মানুষ ঢোকে আর হেনার হৃৎস্পন্দন বাড়তে থাকে। এখনই হয়তো তাদের ডাক পড়বে। স্যুট-টাই-পরা বড় অফিসার ঢুকেছে। সে বেরিয়ে এলেই হেনার মুখ সাদা হয়ে যায়। শক্ত করে রাজীবের হাতটা ধরে রাখে। রাজীব বলে, “ফুম্মা, কাঁপতেছেন ক্যান? ভয় লাগে?”

“না,” হেনা জবাব দেয়।

ফুপুর হাত ধরে রাখা রাজীব তার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে তার দু চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। অফিসাররা সবাই একে-একে বেরিয়ে যায়। রাজীব গিয়ে পিএস-এর কাছে খোঁজ নিয়ে জানে, মন্ত্রী এখন একটা মিটিংয়ে বেরিয়ে যাবেন। ফিরবেন ঘণ্টা-দুই পরে। তারপরে দেখা হবে। মন্ত্রীর পিএস-এর রুমে তারা উঠে গিয়ে বসে। কিছু পুরানো ম্যাগাজিন। বেশিরভাগই সরকারি প্রকাশনা। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত রাজীব এক গ্লাস পানি চেয়ে খায়। তার পাশে তার ফুপু পাথরের মতো নিথর বসে আছে। রাজীব এসএমএস লেনদেনে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ব্যক্তিগত সচিবের খোলা দরজা দিয়ে তারা দ্যাখে মন্ত্রী ঘরে ঢুকছে। একাত্তরের শান্তি কমিটির লোকটা ২০০৩-এ মন্ত্রী। হেনার মাথার ভিতর একট্রেন মিলিটারি নামে “বল, মুক্তি কাঁহা?”

ছেলে আরিফ জেলখানার দুর্গন্ধে শুয়ে কাতরাচ্ছে, “মা গো, বাইর কইরা নাও আমারে!” প্রতিরাতে ঘুমানোর সময় কুকুরগুলি কাঁদে। হেনার মনে হয় তার ছেলেটাই কাঁদছে যেন।

হঠাৎ মন্ত্রীর পিএস-এর রুমে বিস্ফোরণ ঘটে, “আল্লার দুনিয়ায় আর-কারো কাছে যামু না রে, আর কারো কাছে না!” রাজীব দ্যাখে তার ফুপু ঘামতে ঘামতে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। মন্ত্রীর পিএস অপ্রস্তুত দাঁড়িয়ে পড়ে, “এই সব অসুস্থ, পাগল, মরা-ধরা মানুষ নিয়া মিনিস্ট্রিতে আসো ক্যান?” গজ গজ করে একাই, “যতসব ফালতু ঝামেলা!” বিহ্বল, ভীত, সন্ত্রস্ত রাজীব বলে, “ফুফু আম্মা মনে হয় মারা যায় নাই। আপনার ফোন থিকা আব্বারে একটু ফোন করি, স্যর?”

   

চতুর ঘুঘু



শরীফুল আলম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নেশাখোরের মত কখনো কখনো খিলখিল করে হাসি
প্রথমত দহন উষ্ণতায় ,
তারপর সুবিশাল শূন্যতায় ,
কখনো কখনো ছুঁয়ে ফেলি সাজানো প্রতিমা
জীবনের দাবী ,
তবে আপাতত গন্তব্য বলে কিছু নেই আমার
কবিতার অবয়ব এখনো যেটুকু আছে
তাকে আমি রঙ্গের উৎসবই বলি
কিম্বা যেটুকু আছে তা জীবনের দাবী ।

ক্রমাগত অন্তর্গত দ্বন্দে
অবাধ্য ভাষা এখন প্রাচীর তোলে
প্রসারিত মৃত্যুর কথা বলে ,
আমি তার গল্পের শেষটা জানার চেষ্টা করি
রাতের গহ্বর থেকে তোলে আনি মৃত্যুর পরোয়ানা ,
কিন্তু অস্পষ্টতা কিছু থেকেই যায়
আবার নিজে নিজেই বলি
আমার জলভূমিতে আবার কিসের নিঃসঙ্গতা ?

স্বপ্নবাসর ? সে এক চতুর ঘুঘু
আমি তার ক্ষণিকের হটকারীতা বুঝতে পারি
এমনকি চোখ বুজে
আমি ভুলে যাই তার সন্ধ্যার ঘায়েল
যেন দেখেও দেখিনা
বিনা মোহে সারারাত অহেতুক তার অহংকার
নিরর্থক বাজি ধরে সে
অর্কিড নিরালায় আমিও একা থাকি
ভাঙ্গা চোরা রাত জেগে থাকে আমার পাশে
মনে হয় চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখি তার ঢাকাঢাকি
ফিরতি নজরে সেও আমায় দেখে
আমার মিষ্টি কবিতার মতই
আমিও থমকে যাই পাখীর ডাকে
দূর দরিয়ায় তখন উলুধ্বনি শংখ বাজে ,
ইচ্ছে হয় নাগরদোলায় আবার গিয়ে দুলি
আর জানই তো কবিরাই প্রেমে পড়ে
কবিরাও চুমু খায়
সুন্দরী পেলে তাঁরাও শুয়ে পরে।

*************************
শরীফুল আলম ।
২১এপ্রিল । ২০২৪ইং
নিউইয়র্ক । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ।

;

শিশু সুভাষচন্দ্রের চেতনায় স্বদেশপ্রেমের উন্মেষ যেভাবে



উৎপল আইচ
-নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। ছবি: সংগৃহীত

-নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে আমরা প্রায় সকলেই বৃহত্তর ভারতবর্ষের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক বলে মানি এবং শ্রদ্ধা করি। তাঁর তুলনাহীন দেশপ্রেমের সামগ্রিক পর্যালোচনা শুধু একটা নাতিদীর্ঘ রচনার পরিসরে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই বালক-কিশোর সুভাষচন্দ্রের জীবনে দেশাত্মবোধের অঙ্কুরোদয় আর তার উন্মেষই এই রচনার উপজীব্য থাকলো।

১৯০২ সালের জানুয়ারি মাসে ৫ বছর বয়স থেকে ১৯০৮ সালের ডিসেম্বর মাস অবধি, অর্থাৎ প্রায় ১২ বছর বয়স অবধি, দীর্ঘ ৭ বছর, সুভাষচন্দ্র ব্যাপ্টিস্ট মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত কটকের প্রটেস্ট্যান্ট ইউরোপিয়ান স্কুলে পড়াশুনা করেন। বিলিতি আদর্শে নিয়ন্ত্রিত এই স্কুলের বেশির ভাগ ছাত্রই ছিল ইউরোপীয় কিংবা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। যদিও এই স্কুলে খুব ভালো ইংরেজি শেখানো হতো, আসল প্রচেষ্টা ছিল ছাত্রদের মনেপ্রাণে ইংরেজ করে গড়ে তোলার। তাই বাইবেলের উপর খুব জোর দেওয়া হত। তাছাড়া গ্রেটবৃটেনের ইতিহাস ও ভূগোল, ল্যাটিন ইত্যাদি শেখানো হতো। সেই স্কুলে সংস্কৃত বা অন্য কোন ভারতীয় ভাষা শেখাবার প্রশ্নই উঠে না। তবে পড়াশুনার সাথে সাথে স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিয়মানুবর্তিতা এবং ভদ্র-ব্যবহারকে শিক্ষার বড় অঙ্গ বলে মনে করতেন।

এই স্কুলে প্রবেশের কয়েক বছর পরই বালক সুভাষচন্দ্র বঙ্গভঙ্গ-জনিত দেশের রাজনৈতিক নবজাগরণের ব্যাপারটা বুঝতে শিখেছিলেন। প্রথম দিকে না বুঝতে পারলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটাও অনুভব করতে পারলেন যে তাঁদের বাড়ির বা তাঁদের সমাজের জীবন আর স্কুলের জীবন একদম ভিন্ন ধরণের। সুভাষচন্দ্র এও জানলেন যে ভারতীয়রা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থানাধিকারী হলেও শুধুমাত্র ভারতীয় বলে স্কলারশিপ-পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাছাড়া, ইউরোপীয় এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছেলেরাই ভলান্টিয়ার কোর-এ যোগ দিতে পারে, বন্দুক ব্যবহার করা শিখতে পারে যা ভারতীয় ছাত্রদের জন্য নিষিদ্ধ।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ‘অ্যান ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এইসব ছোটোখাটো ব্যাপার থেকেই আমাদের চোখ খুলতে শুরু হল, বুঝলাম যে এক বিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় হিসাবে আমরা কতটা আলাদা’ (“Small incidents like these began to open our eyes to the fact that as Indians we were a class apart, though we belonged to the same institution.”) । সুভাষচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীর শুরুতেই লিখেছেন যে তাঁর মন স্পর্শকাতর এবং তিনি একজন অন্তর্মুখী ব্যক্তি। (“I was and still remain an introvert.”) সুভাষচন্দ্র সেই আত্মজীবনী অসুস্থ অবস্থায় ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে দশদিনে অস্ট্রিয়ার ব্যাডগাসটেন-এ অবস্থানকালে লিখেছিলেন। তিনি সেখানে স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য গিয়েছিলেন।

আত্মজীবনীতে তিনি আরও লিখেছেন, “সব কিছু বিচার করে আমি এখন একজন ভারতীয় বালক বা বালিকাকে এরকম স্কুলে পাঠাবো না। সে নিশ্চিত সুসমন্বয়ের অভাবে এবং তজ্জনিত অশান্তিতে ভুগবে, বিশেষতঃ সে যদি স্পর্শকাতর স্বভাবের হয়। (“Considering everything, I should not send an Indian boy or girl to such a school now. The child will certainly suffer from a sense of mal-adaptation and from consequent unhappiness, especially if he or she is of a sensitive nature.”)

১৯০৯ সালের জানুয়ারি মাসে সুভাষচন্দ্র কটকের র‍্যাভেন্-শ কলেজিয়েট স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে (এখনকার হিসাবে সপ্তম শ্রেণিতে) ভর্তি হন। এই স্কুলে তিনি চার বছর পড়াশুনা করে ১৯১৩ সালের মার্চ মাসে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। সুভাষচন্দ্র বসু যখন র‍্যাভেন্শ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন তখন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্রী বেণীমাধব দাস। সুভাষচন্দ্রের বয়স তখন ১২ বছর। কিশোর সুভাষ তার আগে এক বর্ণও বাঙলা পড়েননি। এদিকে তাঁর সহপাঠীরা সবাই বাঙলায় পারদর্শী ছিল। কিন্তু চরম অধ্যবসায়ী সুভাষ এক বছরের মধ্যেই বাঙলাটা রপ্ত করে ফেলেন। সংস্কৃতের ব্যাপারও একই কথা বলা যায়। এই নতুন স্কুলে তাঁর বন্ধুও জুটে যায় যেটা প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপিয়ান স্কুলে হয়নি।

সুভাষচন্দ্র ছিলেন নিরহংকারী এবং প্রচারবিমুখ মহাপুরুষ, তাই অনেক কথা বিস্তারিতভাবে আত্মজীবনীতে লেখেননি বা হয়তো আত্মপ্রশংসা হবে মনে করে এড়িয়ে গেছেন। র‍্যাভেন্শ কলেজিয়েট স্কুলে তাঁর বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী ছিলেন শ্রী চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি সুভাষচন্দ্রদের প্রতিবেশীও ছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে চারুচন্দ্র তাঁর স্মৃতি রোমন্থন করে শ্রী সুবোধচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে দিয়ে “সুভাষচন্দ্রের ছাত্রজীবন” নামে একটা বই লিখে গেছেন। তাঁর কাছ থেকে আরো অনেক তথ্য জানা যায়। এছাড়া অন্যান্য সূত্র থেকেও কিছু নতুন তথ্য জানা যায় এবং কিছু তথ্যের সমর্থন মেলে।

প্রথম ভর্তি হবার দিন সুভাষচন্দ্র কোট-প্যান্ট পরে র‍্যাভেন্শ কলেজিয়েট স্কুলে গিয়ে দেখতে পান যে সমস্ত শিক্ষক এবং অন্যান্য সব ছাত্ররা দেশীয় পোশাক পরে আছেন। তার পরদিন থেকে তিনিও ধুতি-পাজ্ঞাবি পরে স্কুলে যেতে শুরু করেন। সুভাষচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীতে ক্ষুদিরাম বসুর নাম উল্লেখ না করে লিখেছেন যে ১৯০৮ সালে যখন প্রথম বোমা নিক্ষেপ করা হয় তখন চারদিকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যেও সাময়িক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সুভাষচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীতে এও লিখেছেন যে সেসময় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে, স্বদেশি জিনিস ব্যবহারের পক্ষে মিছিল ও আন্দোলন চলছিল এবং তাঁরা কিছুটা সেদিকে ঝুঁকেছিলেন, কিন্তু বাড়ির নিষেধ থাকায় রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তবে তাঁরা বিপ্লবীদের ছবি কেটে কেটে পড়ার ঘরে টাঙিয়ে রাখতেন। এক আত্মীয় পুলিশ অফিসার দেখে ফেলায় সেগুলোও পরে অপসৃত হয়েছিল এবং এতে তাঁদের মন খারাপ হয়েছিল।

আমরা “সুভাষচন্দ্রের ছাত্রজীবন” গ্রন্থ থেকে জানতে পারি যে, ১৯১১ সালের ১১ আগস্ট তারিখে র‍্যাভেন্শ কলেজিয়েট স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র (বর্তমান নবম শ্রেণি) সুভাষচন্দ্র নিজ উদ্যোগে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির তৃতীয় বাৎসরিক স্মরণ দিবস উপযুক্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করেছিলেন স্কুলে এবং র‍্যাভেন্শ কলেজ ও স্কুল হোস্টেলে। সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাব মত সব ছাত্ররা উপবাস করে এই পূণ্য দিনটি অতিবাহিত করেছিল সেদিন। অবশ্য এর পরিণতি ভালো হলোনা; ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে খবর পৌঁছে যায় আর ফলস্বরূপ ম্যাজিষ্ট্রেট এই বিষয়ে তদন্ত করে প্রধান শিক্ষক শ্রীবেণীমাধব দাসকে কটক থেকে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে বদলি করে দেয়।

র‍্যাভেন্শ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সুভাষচন্দ্র শিক্ষক শ্রীবেণীমাধব দাসের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্বের জন্য। তিনি প্রধান শিক্ষককে মনেপ্রাণে শ্রদ্ধা করতে শুরু করেন। যেহেতু বেণীমাধববাবু দ্বিতীয় শ্রেণির নীচে কোন ক্লাস নিতেন না তাই অধীর আগ্রহে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠার জন্য অপেক্ষায় থেকে যখন সেই সুযোগ সুভাষচন্দ্র পেলেন তখন তাঁর সে ভাগ্যও দীর্ঘস্থায়ী হলো না। তবে এই কয়েক মাসের মধ্যেই শ্রী বেণীমাধব দাস ছাত্র সুভাষের মধ্যে একটা নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে দিয়ে গেলেন।

এই বিচ্ছেদ সুভাষের জন্য খুব বেদনার হয়েছিল কিন্তু তাঁর সাথে বেণী মাধবাবুর চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ রইল। সুভাষচন্দ্র আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, প্রকৃতিকে কিভাবে ভালবাসতে হয়, প্রকৃতির প্রভাবকে জীবনে কিভাবে গ্রহণ করতে হয় তা মাস্টারমশাই শ্রী বেণীমাধব দাসই তাঁকে শিখিয়েছিলেন। প্রকৃতি তো দেশমাতৃকারই অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ। কিন্তু মাস্টারমশাই যে তাঁকে স্বদেশপ্রেম শিখিয়েছেন তা অবশ্য স্পষ্ট করে সুভাষচন্দ্র তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেননি। হয়ত ১৯৩৮ সালে ছাপা বইতে তেমন কিছু কথা লিখে বেণীমাধব বাবুকে ইংরেজ-পুলিশের কুনজরে পড়তে দিতে চাননি।

বেণী মাধববাবুর বদলির কিছুদিন পর থেকেই সুভাষচন্দ্র বয়ঃসন্ধিজনিত কিছু মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন। সৌভাগ্যবশতঃ ঠিক এই সময়ই তিনি কটক শহরে নবাগত এক আত্মীয়ের বাসায় অপ্রত্যাশিতভাবে স্বামী বিবেকানন্দের রচনাবলী পেয়ে যান এবং তা অতি উৎসাহে পড়ে ফেলেন। সুভাষচন্দ্র বুঝতে পারেন যে এই জিনিষই তিনি এতদিন ধরে খুঁজছিলেন এবং এগুলোর মধ্যেই তিনি তাঁর মানসিক অশান্তির সমাধান খুঁজে পেলেন। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের আদর্শই সুভাষচন্দ্র হৃদয়ঙ্গম করে নিলেন, যার মূল কথাটা হল, “আত্মনঃ মোক্ষার্থম জগৎহিতায় চ” অর্থাৎ ‘মানবজাতির সেবা এবং আত্মার মুক্তি’।

মানবজাতির সেবা বলতে স্বামী বিবেকানন্দ স্বদেশের সেবাও বুঝিয়েছেন। স্বামীজীর প্রধান শিষ্যা এবং জীবনীকার ভগিনী নিবেদিতা আমাদের জানিয়েছেন যে, মাতৃভূমিই ছিল স্বামী বিবেকানন্দের আরাধ্যা দেবী। আত্মজীবনীতে সুভাষচন্দ্র আরও লিখেছেনঃ ‘একটি বক্তৃতায় স্বামীজী বলেছেন, “সদর্পে বল মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী, আমার ভাই।”

নেতাজী সুভাষচন্দ্র লিখেছেন যে তাঁর বয়স যখন ১৫ ছুঁই ছুঁই, ঠিক তখন বিবেকানন্দ তাঁর জীবনে প্রবেশ করলেন; বিবেকানন্দের প্রভাব তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিল এবং তিনি স্বামী বিবেকানন্দের পথই বেছে নিলেন। বিবেকানন্দের সাথে সাথে তাঁর গুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রতিও সুভাষচন্দ্র আকৃষ্ট হলেন এবং কটকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভক্তবৃন্দের একটা সংগঠন গড়ে তুললেন। সেই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল অধ্যাত্মচর্চা করা আর দুঃস্থের সেবা করা। স্কুল ছাড়ার সময় যত এগিয়ে আসছিল, সুভাষের মধ্যে ধর্মভাব আর মানবসেবা করার প্রবণতা ততই বেড়ে যাচ্ছিল। লেখাপড়ায় আর মন বসছিল না।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশু সুভাষ (দণ্ডায়মান, ডান থেকে প্রথম)

এরপর ১৯১২ সালের অক্টোবর মাসে মহাসপ্তমীর দিন কৃষ্ণনগর থেকে মাস্টারমশাই শ্রী বেণীমাধব দাসের পরিচয়পত্র নিয়ে হাজির হলেন সুভাষেরই সমবয়সী একই (ফার্স্ট) ক্লাসের ছাত্র শ্রী হেমন্তকুমার সরকার। হেমন্ত কলকাতার একটা রাজনৈতিক দলের সভ্য ছিলেন যাদেরও আদর্শ ছিল আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং দেশসেবা। সেই প্রথম সুভাষ ও তাঁর কটকের বন্ধুরা প্রথমবারের মত কলকাতার রাজনৈতিক প্রেরণার আস্বাদন পেলেন। হেমন্তের কাছে তাদের দলের নানাবিধ কাজের বর্ণনা শুনে সুভাষচন্দ্র মুগ্ধ হলেন।

হেমন্ত একদিন সুভাষের দলের ছেলেদের দেশের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্বন্ধে অনুপ্রাণিত করে একটা আবেগময় বক্তৃতাও দিলেন। এইসঙ্গে সুভাষচন্দ্রের সাথে তাঁর নিবিড় সখ্যতাও গড়ে উঠল। চারদিন কটকে থেকে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় হেমন্তকুমার পুরী চলে গেলেন এবং কলকাতায় ফিরে গিয়ে তাঁর দলের প্রধানকে সব জানালেন। সেই দলনেতা চিঠির মাধ্যমে কটকের এই দলটার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন এবং কয়েক বছর এই যোগাযোগ ছিল।

হেমন্তকুমার পরে তাঁকে লেখা সুভাষের বেশ কিছু চিঠি প্রকাশ করেন যার থেকে সুভাষচন্দ্র বসুর কৈশোরের এবং যৌবনের অনেক কথা জানা যায়। তিনি তাঁর বিখ্যাত “সুভাষের সঙ্গে বারো বছর (১৯১২ – ১৯২৪)” বইতে জানান যে, সুভাষের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সময়ই তাঁদের মধ্যে স্থির হয়েছিল যে পাশ করে তাঁরা চাকরি করবেন না এবং সুভাষ আই-সি-এস আর হেমন্ত আই-ই-এস-এ ঢুকে সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে চাকরি-মোহগ্রস্ত বাঙালীর সামনে আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

১৯১৩ সালের ১ মার্চ সুভাষচন্দ্র আর হেমন্তদের ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হয়। দুজনেই তাঁদের এই নূতন বন্ধুত্বের আর নতুন জীবনের আলোড়নে পড়াশুনায় তেমন মন দিতে পারেন নি। সুভাষচন্দ্র তো তারও আগে থেকেই পড়াশুনায় অমনোযোগী হয়ে গিয়েছিলেন। তৎসত্ত্বেও সুভাষ ৭০০-র মধ্যে ৬০৯ নম্বর পেয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরীক্ষার পর আগের পরিকল্পনা মত সুভাষচন্দ্র কিছুদিনের জন্য হেমন্তের কাছে কৃষ্ণনগরে যান।

কলকাতার দলের কয়েকজন সদস্যও সেখানে আসেন এবং তাঁরা সদলবলে পলাশী, মুর্শিদাবাদ ইত্যাদি ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখতে বের হন। পলাশীতে তাঁরা দেখতে পান যে সেই আম্রকানন আর নেই আর লর্ড কার্জনের আদেশে বিজয় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে। হেমন্ত নবীনচন্দ্র সেনের “পলাশীর যুদ্ধ” আবৃত্তি করতে করতে যখন নবাব সিরাজদৌল্লার সেনাপতি মোহনলালের মুখনিঃসৃত অংশে আসেন তখন সুভাষচন্দ্র আর চোখের জল চেপে রাখতে পারেন না। তাঁর দলের সেই ভ্রমণ সাতদিনে সমাপ্ত হয়েছিল।

এরপর সুভাষচন্দ্র কলকাতায় এসে তাঁর বড় দাদাদের মত প্রেসিডেন্সি কলেজে আই এ ক্লাসে ভর্তি হলেন ১৯১৩ সালের জুলাই মাসে। তখন তাঁর বয়স সাড়ে ষোল। ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই তিন মাসের গ্রীষ্মের বন্ধ হয়ে যায়। সেই তিন মাসে তিনি কলকাতার সেই দলটাকে খুঁজে বার করলেন আর পছন্দমত কিছু নতুন বন্ধুও জুটিয়ে ফেললেন। কটকের পরিবেশ আর কলকাতার পরিবেশে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।

অবশ্য এর প্রায় বছর দেড়েক আগে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার সমাপ্ত হয়েছে। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছে তবে তার জন্য বঙ্গ প্রদেশকে (বাংলা প্রেসিডেন্সিকে) অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। হিন্দী-উড়িয়া-অসমীয়া-ভাষী অঞ্চলগুলোকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে আর ব্রিটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তবে এই স্বদেশী আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল এবং এজন্য সশস্ত্র বিপ্লব আন্দোলনের তৎপরতাও বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সুভাষের আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে এসময় সুভাষচন্দ্র শ্রীঅরবিন্দের লেখা ও চিঠিপত্র পড়ে তাঁর প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের কিছু ছাত্রদের মধ্যেও এই বিপ্লবী চিন্তাধারা সক্রিয় ছিল। কিন্তু সুভাষচন্দ্র কলকাতায় এসেছিলেন মানবসেবা আর আধ্যাত্মিক উন্নতির সঙ্কল্প নিয়ে, যদিও তাঁর মধ্যে বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতি ছিল এবং স্বদেশচিন্তা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করত। আত্মজীবনীতে সুভাষচন্দ্র লিখে গেছেন, ‘কলেজ-জীবনে প্রবেশ করবার সময় জীবন সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা জন্মে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম যে জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে এবং এই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য নিয়মিত শরীর ও মনের অনুশীলনের প্রয়োজন।’

এসময় তাঁর সাথে কয়েক মাস আগে প্রয়াত বিখ্যাত কবি, নাট্যকার, গীতিকার, স্বদেশী-সংগীতস্রষ্টা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপ কুমার রায়ের বন্ধুত্ব হয়। দিলীপ কুমার রায় সুভাষচন্দ্রের সমবয়সী ছিলেন এবং সেবছরই প্রেসিডেন্সি কলেজে আই-এস-সি ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁরা কাছাকাছিই থাকতেন। সুভাষ একদিন দিলীপকুমারের বাড়ীতে এসে দিলীপকুমারকে তাঁর উদ্যোগে কলেজে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বিতর্কসভায় যোগ দেবার জন্য আমন্ত্রণ জানান। সেই প্রথম পরিচয়ের বর্ণনা খুবই সুন্দর।

সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন যে, আমাদের দেশে তর্ক-বিতর্কের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে কারণ স্বাধীনতার জন্য বড় বড় বক্তার, বাক-যোদ্ধার খুব প্রয়োজন। শ্রী দিলীপকুমার রায় তাঁর “আমার বন্ধু সুভাষ” বইতে লিখেছেন যে তিনি বলেছিলেন, রামকৃষ্ণ তো বলে গেছেন তর্ক দিয়ে সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় না। সুভাষচন্দ্র উত্তরে বলেছিলেন, “তিনি কি বলেছিলেন তাতে আমাদের দরকার কি? ... আমাদের গড়ে তুলতে হবে ভবিষ্যৎকে। কেন, আপনার বাবা কি বলেননিঃ ‘চোখের সামনে ধরিয়া রাখিয়া অতীতের সেই মহা আদর্শ, জাগিব নূতন ভাবের রাজ্যে রচিব প্রেমের ভারতবর্ষ?” দিলীপকুমার আশ্চর্য হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তাঁর কবিতা আপনার মনে আছে?’ উত্তরে সুভাষের দৃষ্টি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেছিলেন, “অন্তরে গাঁথা আছে।”

সুভাষের দলের সকলেই ব্রহ্মচর্যের ব্রত নিয়েছিলেন। দলের প্রধান লক্ষ্য ছিল ধর্ম আর জাতীয়তাবাদের সমন্বয় ঘটানো – শুধু চিন্তায় নয় কাজের মাধ্যমে। তাঁর দলের ছেলেরা নতুন নতুন ভাবধারার সন্ধানে দর্শন, ইতিহাস, জাতীয়তাবাদের উপর বই খুঁজে খুঁজে পড়তেন এবং নিজেদের মধ্যে তা আলোচনা করতেন। তাছাড়া নতুন সদস্য সংগ্রহ করতেন এবং নামকরা লোকদের সাথে আলাপ পরিচয় করতেন। এছাড়া সাধু-সন্তদের সন্ধানে থাকা এবং ছুটির সময় তীর্থস্থানে তাঁদের সন্ধান করাও একটা কাজ ছিল। ১৯১৩ সালে বড়দিনের ছুটিতে তাঁরা দলবেঁধে গিয়ে কলকাতা থেকে ৫০ মাইল দূরে শান্তিপুরে কিছুদিন গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী হয়ে বাস করেছিলেন। ১৯১৪ সালে তাঁরা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাথেও দেখা করতে গিয়েছিলেন। বেলুড় রামকৃষ্ণ মঠ ও অন্যান্য জায়গায় প্রায়ই যেতেন। দক্ষিণ কলকাতার অনাথ ভাণ্ডার দরিদ্র সেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য রবিবার বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ ও চালডালও সংগ্রহ করেছেন।

সেসময় কলেজে অধ্যাপকদের পড়ানো সুভাষচন্দ্রের একঘেয়ে লাগতো। এই একঘেয়েমি কাটানোর জন্য জনহিতকর কাজে মেতে থাকতেন। বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা, বন্যা বা দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্য টাকা তোলা, সহপাঠীদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়া–এই ধরণের কাজ তাঁর ভালো লাগত। প্রথম বছরের কলেজের ছুটিতে কটক গিয়ে কাছের একটা গ্রামে কলেরা হওয়ায় সে গ্রামে রোগীর শুশ্রূষা করতেও যান। সেই এক সপ্তাহে তিনি দেশের দারিদ্র্য, মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা আর নিরক্ষরতার অভিশাপ প্রত্যক্ষ করেন। কলকাতায় ফিরে এসে ষাট মাইল দূরে কৃষ্ণনগরে এক উদাসী পাঞ্জাবী শিখ তরুণ সাধুর সন্ধান পেয়ে হেমন্তকে নিয়ে পায়ই তাঁর কাছে যেতে শুরু করেন। সেই সন্ন্যাসীকে দেখে সুভাষের মনে দীক্ষা নেবার ইচ্ছা জাগে।

১৯১৪ সালের গরমের ছুটির সময় সুভাষচন্দ্র প্রায় দুমাস গুরু খুঁজতে উত্তর ভারতের প্রায় সবকটা তীর্থস্থান ঘুরে বেড়ান। বাড়িতে শুধু একটা পোস্টকার্ড পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন মাত্র। এই তীর্থভ্রমণের সময় হিন্দু সমাজব্যবস্থার মূল গলদগুলি তাঁর কাছে ধরা পড়ে। অবশ্য অনেক প্রকৃত ধার্মিক সন্ন্যাসীরও দর্শন পান। সেখান থেকে ফিরে এসে কিছুদিনের মধ্যেই সুভাষচন্দ্র টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হন। সেবার তাঁর ৬৩ দিন জ্বর ছিল। জ্বর সেরে গেলে সুভাষচন্দ্র স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে কার্সিয়াং গিয়ে এক মাস থেকে আসেন। এরপর ১৯১৪ সালের নভেম্বর মাসে হেমন্ত ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হন এবং সুভাষ কৃষ্ণনগরে গিয়ে বন্ধুর সেবা করেন। এসব গোলযোগে পড়াশুনার ব্যাঘাত হওয়ায় ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল ভাল হলনা। তবুও ১৯১৫ সালে তিনি ফার্স্ট ডিভিশনে আই এ পাশ করেছিলেন এবং দর্শনে অনার্স নিয়ে একই কলেজে বি এ ভর্তি হলেন।

কৈশোরে সুভাষচন্দ্র বসু

১৯১৬ সালের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাস সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনে একটা তাৎপর্যপূর্ণ সময়। তখন তাঁর বয়স ১৯ বছর। ঘটনাটা সবার জানা। অনেকেই এই সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখেছেন। তাই খুব সংক্ষেপে সেই ঘটনাটার বিবরণ দিয়ে এই লেখাটা শেষ করব। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন এডওয়ার্ড ফারলে ওটেন। এই ইংরাজ অধ্যাপক ছিলেন I.E.S. (ইন্ডিয়ান এডুকেশান সার্ভিসের সদস্য) এবং বর্ণবিদ্বেষী। তিনি ১৯১৫ সালে ইডেন হিন্দু হোস্টেলে আমন্ত্রিত হয়ে ভাষণ দেন এবং সেই বক্তৃতায় ভারতীয়দের সম্বন্ধে খারাপ মন্তব্য করেন। অসন্তুষ্ট হলেও তাঁকে সভাপতি করে ডেকে আনা হয়েছে বলে ছাত্রেরা সেদিন কোন গোলযোগ করেনি। কিন্তু ১০ জানুয়ারি ১৯১৬ তারিখে তিনি কয়েকজন ছাত্রকে কলেজের বারান্দায় ধাক্কা দেন।

ছেলেরা যেহেতু থার্ড ইয়ার অর্থাৎ বি এ ফার্স্ট ইয়ারের ছিল এবং সুভাষচন্দ্র সেই ক্লাসের প্রতিনিধি ছিলেন, তিনি অধ্যক্ষ মিঃ এইচ আর জেমসের কাছে গিয়ে প্রতিবাদ জানান। অধ্যক্ষ মিঃ জেমস জানান, যেহেতু অধ্যাপক ওটেন ইন্ডিয়ান এডুকেশান সার্ভিসের সদস্য তাই তিনি অধ্যাপক ওটেনকে শাসন করতে পারবেন না। পরদিন ছাত্ররা ধর্মঘট শুরু করে এবং ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন কর্তৃপক্ষ ওটেনকে চাপ দিলে ওটেন ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলেন। কিন্তু প্রায় একমাস পর ওটেন একই কাজ করে ফেলেন।

যদিও সেবারের ছাত্রটি আই এ ফার্স্ট ইয়ারের ছিল, সুভাষচন্দ্র ছাত্র-প্রতিনিধিদের মিটিংয়ে জানান, এই অধ্যাপককে এভাবে শোধরানো যাবে না এবং তাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। ছাত্র-প্রতিনিধিদের সভায় তাঁর এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং পরদিন, ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৬, মিঃ ওটেন কলেজের করিডোরে প্রহৃত হন। এই ঘটনার জন্য সুভাষচন্দ্র এবং শ্রী অনঙ্গ মোহন দাম কলেজ ও ইউনিভারসিটি থেকে বহিষ্কৃত হন। যদিও সুভাষচন্দ্র নিজে মিঃ ওটেনকে প্রহার করেননি, তিনি নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে চুপ করে থাকেন। সত্যি বলে দায়িত্ব এড়িয়ে বহিষ্কার এড়াতে রাজি হন না।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ছোটবেলায় প্রথমে তিনি ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেছেন এবং ইংরেজদের সঙ্গে মিশেছেন। তারপর তিনি নিজের দেশের সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হন। যখন তিনি স্কুলে পড়েন তখন বিভিন্ন প্রদেশের ছেলেদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। মুসলমানদের সম্বন্ধে উদারতার জন্য তাঁর ছেলেবেলার অভিজ্ঞতাই বহুল পরিমাণে দায়ী। তাঁদের কটকের বাড়ী ছিল মুসলমান এলাকায় এবং প্রতিবেশীরা বেশীরভাগই ছিল মুসলমান। তাঁর বাবাকে সবাই খুব শ্রদ্ধা করতেন।

তাঁরাও মুসলমানদের উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। তাঁদের বাড়ীর কাজের লোকেরা অনেকেই মুসলমান ছিলেন এবং তাঁরাও সুভাষচন্দ্রদের খুব অনুরক্ত ছিলেন। স্কুলে মুসলমান শিক্ষক আর ছাত্রদের সাথেও তাঁদের খুব সৌহার্দ্য ছিল। মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করা ছাড়া কোন ব্যাপারেই তিনি কোন প্রভেদ দেখতেন না। এই জন্যই আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান-সব ধর্মাবলম্বীরা এক হয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পেরেছিল।

বাল্যকাল আর কৈশোর ছিল সুভাষচন্দ্রের প্রস্তুতির সময়। যে দেশপ্রেম তাঁর পরবর্তী জীবনে প্রস্ফুটিত হয়েছে, তার ব্যাপকতা, গভীরতা, বিস্তীর্ণটা ইত্যাদি বুঝতে হলে তাঁর বাল্যকাল আর কৈশোরকে ভাল করে জানতেই হবে। যারাই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনী অধ্যয়ন করেছেন তাঁরাই একমত হবেন যে তিনি এই উপমহাদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক।

পূর্বেই বলেছি, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যে কোন প্রাদেশিক, ধার্মিক বা জাতপাতের সঙ্কীর্ণতা ছিল না। তিনি মনে করতেন, ধর্ম যার যার নিজস্ব ব্যাপার। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দেশের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন এবং তাঁর এই দেশপ্রেম কৈশোরেই অঙ্কুরিত হয়েছিল। এমনকি তিনি যে আই.সি.এস পাস করে তা থেকে পদত্যাগ করবেন তাও সেই কৈশোরেই স্থির করে ফেলেছিলেন। বালক-কিশোর সুভাষচন্দ্রই পরে নেতাজী হয়ে আমাদের দেশকে ইংরেজের হাত থেকে স্বাধীন করেছিলেন।

সেসময়কার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এ্যাটলি নিজমুখে একথা স্বীকার করে গেছেন। শুধু দুঃখের কথা এই যে কিছু স্বার্থান্বেষী নেতার জন্য যে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন নেতাজী দেখেছিলেন, তা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আজ এত বছর পর নেতাজীর আকাঙ্ক্ষিত বৃহত্তর ভারতের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা হলেও আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। নেতাজীর জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা, কার্যকলাপ সব একটি মাত্র আবেগ দ্বারাই সঞ্চালিত হয়েছে এবং তা হচ্ছে দেশপ্রেম।

অহিংসার পূজারি গান্ধীজী পর্যন্ত তাঁকে “Patriot of Patriots” আখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছেন। নেতাজীর দেশপ্রেম নেলসন ম্যান্ডেলা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও অনেককে অনুপ্রাণিত করেছে। আজও ভারতবাসী এবং বাঙালী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর তুলনাহীন দেশপ্রেম থেকে অনুপ্রাণিত হন। যতদিন মানবজাতি থাকবে এবং দেশপ্রেম আলোচিত হবে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জনক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নাম পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। জয়তু নেতাজী।।

লেখক: সাবেক কুটনীতিক ও ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু, নয়াদিল্লি; ভারত। ইমেল: [email protected]

;

গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ধ্রুব এষ



বার্তা২৪ ডেস্ক
শিল্পী ধ্রুব এষ

শিল্পী ধ্রুব এষ

  • Font increase
  • Font Decrease

নান্দনিক প্রচ্ছদ ও অলংকরণশিল্পী হিসেবে দেশে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন ধ্রুব এষ। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ঢাকার পান্থপথের হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এই শিল্পী।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেন, “তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।”

জ্বর সঙ্গে তীব্র কাশি নিয়ে বুধবার এ হাসপাতালে আসেন ধ্রুব এষ। পরিস্থিতি দেখে তাকে এইচডিইউতে ভর্তি করে নেওয়া হয়।

লেলিন চৌধুরী বলেন, "শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণে উনার অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে গিয়েছিল। সে কারণে অবস্থা কিছুটা অবনতির দিকে গিয়েছিল। পরে অক্সিজেন সরবারাহ করা হয়, এখন তিনি স্টেবল আছেন। আমরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছি।"

সুনামগঞ্জের সন্তান ধ্রুব এষের বয়স ৫৭ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার ছাত্র থাকার সময় বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা শুরু করেন। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদ ধ্রুব এষেরই আঁকা। তার আঁকা প্রচ্ছদে প্রকাশিত হয়েছে ২৫ হাজারের বেশি বই।

দেশে প্রচ্ছদশিল্পে আধুনিকতা আনার কৃতিত্ব কেউ কেউ ধ্রুব এষকে দেন। আঁকাআঁকির সঙ্গে তিনি লেখালেখিও করেন। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান ধ্রুব এষ।

;

তৃতীয় পক্ষ



ওমর শরিফ
অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

 

এ শহরে বাড়ি আর বাড়ি। ছায়া, শান্তি দেবে এমন গাছ কোথায়? গত বারের তুলনায় এবার গরমটা একটু বেশী পড়েছে। দুপুরবেলা তাই খাঁ খাঁ করছে রাস্তাঘাট। প্রায় জনমানব শূন্য চারিদিক। মাঝে মাঝে কিছু রিক্সা, ট্যাক্সি চলছে এদিক সেদিক। ভাগ্যিস দুই রাস্তার মাঝের ডিভাইডারে সারি সারি গাছ আছে। তবু একটু সবুজ দেখা যায়, তা-না হলে কিযে হতো? কথাগুলো ভাবলো মিতু। কলেজ পড়ুয়া তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মিতু। কলেজে কোন ভাবেই মন বসছিলোনা মিতুর। একটা ঘটনা অস্থির করে রেখেছে তাকে কাল থেকে। তাই মাত্র তিনটা ক্লাস করে বেরিয়েছে ধানমন্ডি লেক যাবে বলে। ধানমন্ডি লেকে অনেক গাছ, অনেক শান্তি। সায়েলা, রবি দু’একবার জিজ্ঞেস করেছে কোথায় যাচ্ছে জানার জন্য। সায়েলা, রবি মিতুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মিতু ওদের মিথ্যে বলেছে।

-বলেছে ‘বড় চাচার বাড়ি যাচ্ছি, চাচা একটু অসুস্থ তাই দেখা করে ওখান থেকেই বাসা চলে যাবো’।     

‘ক্লাস শেষে বন্ধুদের আড্ডা জমে উঠেছিলো খুব তবু ছাড়তে হয়েছে। এই খাঁ খাঁ রোদে কার দায় পড়েছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসার? কল দিলে কল ধরো না, কেটে দাও আবার ব্যাকও করনা! এটা কি ধরনের কথা’? রিক্সার ভাড়া দিতে দিতে বলল মিতু। মিতুর রাগ দেখে সামনে দাঁড়ানো স্বপন মিটমিট হাসছে। ছয় ফিটের মতো লম্বা, ট্রিম করা দাড়ি, মাথার চুল এলোমেলো, একটা হাওয়াই শার্ট সঙ্গে জিন্স পড়া। পায়ে স্যান্ডেলের বদলে স্নিকার পড়েছে আজ। একটু আগোছাল যাকে বলে ‘স্বযত্নে অবহেলা’। স্বপনের এই ব্যাপারটাই দারুণ টানে মিতুকে। ওর মধ্যে কোথায় একটা ব্যাপার আছে। কি নেই, আবার আছে। ঠিক পূর্ণ নয় আবার খালিও নয়। স্বপন মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে। দেশের নামকরা একটা পত্রিকা অফিসে কাজ করে। কথা কম বলে। যা কথা বলে তা ওর গিটার বলে। খুব ভালো গিটার বাজায় স্বপন।      

রিক্সা থেকে নেমে তেড়ে এলো মিতু। ‘কি কানে শোন না। হাসছো আবার, লজ্জা নেই’? রাগে বলল মিতু।

‘আচ্ছা বাবা রাগ পরে হবে। আগে চলো লেকের ভেতরটায় যাই, এখানে অনেক রোদ’। বলল স্বপন। লেকের পার ধরে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাশে থাকা রেস্টুরেন্ট ‘জলসিরি’তে গিয়ে বসলো। রেস্টুরেন্টে লোকজন কম। দাঁড়িয়ে থাকা ওয়েটারকে এসিটা অন করে দিতে বলল স্বপন। মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো কি হয়েছে, এতো জরুরি তলব কেন?’

মিতু প্রতিত্তরে বলল, ‘আগে বলো এতক্ষণ ধরে তুমি আমার ফোন ধরছিলে না কেন’? কতোবার ট্রাই করার পর তোমাকে পেয়েছি, তোমার হিসাব আছে? এতো কথার পরও স্বপনকে শান্ত দেখে মিতু আরও খানিকটা রেগে গেলো। বলল, ‘তুমি কি অনুভূতিহীন, তোমার কি জানতে ইচ্ছে করেনা, আমি কেন এতবার ফোন দিয়েছি’?

স্বপন একটু সিরিয়াস হয়ে গলা খাকিয়ে বলল, ‘আসার পর থেকে আমাকে বলার সুযোগ দিয়েছ তুমি? শুধু নিজেই বলে যাচ্ছ’।

এতক্ষণে নিজেকে যেন খুঁজে পেলো মিতু, একটু লজ্জাও পেলো। কিছুটা নমনীয় হয়ে বলল, ‘আচ্ছা বলো কেন ফোন ধরতে এত সময় নিলে’?

স্বপনের সরল উত্তর, ‘খুব জরুরি মিটিং এ ছিলাম তাই তোমার ফোন আসার সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরতে পারেনি। মিটিং শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছি। তারপর সব কাজ ফেলে এইতো তোমার সামনে আমি’।

মুখের এক্সপ্রেশন দেখে বোঝা গেলো উত্তরে মিতু সন্তুষ্ট হয়েছে। কিন্তু কিসের যেন উদ্বেগ স্পষ্ট। ব্যাপারটা দৃষ্টি এড়ায়নি স্বপনের।  সে বলল, ‘কি হয়েছে? কোন সমস্যা? আমাকে খুলে বলো’।

মিতু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘স্বপন আমার বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে বাসা থেকে। পাত্র পক্ষ জানিয়েছে আমাকে খুব পছন্দ হয়েছে তাদের। আগামীকাল আসবে ডেট ফাইনাল করতে। আমি এখন কি করবো স্বপন? আমাকে বলে দাও’।

স্বপন বলল, ‘বিয়ে করে ফেল। বাবা মা যা চাই তাই করো এতে সবার মঙ্গল’।

মিতু অবাক হয়ে স্বপনের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। বলল, ‘মানে কি? তাহলে এতদিন আমারা কি করলাম। তুমি একটা প্রতারক। তুমি একটা হিপোক্রেট। এখন দায়িত্ব নেয়ার সময় পালাচ্ছো। কাপুরুষ কোথাকার’। তখনও স্বপনের ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখে অবাক হয়ে গেলো মিতু।

স্বপন মিতুর দুহাত টেনে কাছে নিয়ে বলল, ‘এতো দিনেও চিনতে পারলেনা আমাকে। তুমি যা ভাবো আমি তার থেকে অনেক অনেক বেশী ভালোবাসি তোমাকে’। বলে উঠে দাঁড়িয়ে স্বপন বলল,‘চলো’। মিতু বললো,

- ‘চলো’। মিতু বললো,
- ‘কোথায়’?
- চলোই না।
- আগে বলো কোথায়?
- কাজী অফিসে।
- মানে?!
- আমরা আজই এক্ষুনি বিয়ে করছি।
- কি বলো এসব?
- যা বলছি ঠিক বলছি। এছাড়া আমাদের হাতে আর কোন পথ নেই।
- তোমার বাসা?
- আমি ম্যানেজ করবো।
- আমার বাসা?
- ওটা পরে ম্যানেজ হয়ে যাবে।

 

দরজা খুলতেই নাসরিন স্বপনের সঙ্গে একটি মেয়েকে দেখতে পেলো। দুজনেই পা ছুঁয়ে সালাম করতেই নাসরিন অবাক হয়ে পা সরিয়ে নিলো। কিছুটা সংকোচেও। নাসরিন স্বপনের মা। নাসরিন কিছুটা হতভম্ব হয়ে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন। সোফায় বসতে দিলেন। সোফাতে বসে মাকে উদ্দেশ্য করে স্বপন বলল, ‘মা আমরা বিয়ে করে ফেলেছি। তোমাকে  পরিচয় করিয়ে দিই। এ হচ্ছে মিতু। মিতু, ‘ইনি তোমার শাশুড়ি’।

নাসরিন ছেলের দিকে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, ‘এসব কি বলছিস স্বপন, কাউকে না জানিয়ে এতবড় কাজ তুই কিভাবে করলি? তোর বাবাকে আমি কি উত্তর দিবো। আর চিনি না জানি না একটা মেয়েকে এনে ঘরে তুললি?

স্বপন পাত্তা না দিয়ে উত্তর দিলো, ‘মিতু ভালো ঘরের মেয়ে। বাবা মা শিক্ষিত। সে নিজেও শিক্ষিত অনার্স করছে। দেখতে ভালো, স্বভাব চরিত্রেও ভালো। তোমার সামনেই আছে দেখে নাও’। বলে হাসতে লাগলো।

নাসরিন আর বেশী কথা না বাড়িয়ে মিতুর দিকে তাকালেন। প্রথমিক কিছু কথা বার্তা জিজ্ঞেস করলেন।

বললেন, ‘বিয়েটা কি কোন ভাবে থামানো যাচ্ছিল না বা বাবা মা কে বুঝিয়ে শুনিয়ে অনার্স শেষ করে তারপর বিয়েটা হলে বোধহয় ভালো ছিল’। মিতু মাথা নিচু করে শুধু শুনে যাচ্ছে।

শুধু বলল, ‘আন্টি আমি বাবাকে খুব ভয় পাই আর বাবা সরকারি চাকরি ছাড়া বিয়ে দিবেন না। বললে আরও ঝামেলা বাড়বে’। 

নাসরিন মিতুকে থামিয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে যেতে বললো।

স্বপন দু’জনের উদ্দেশ্যে বললো, ‘অফিসে বিশেষ কাজ আছে, আমাকে একবার এক্ষুনি অফিস যেতে হবে। এর মধ্যে আশা করি তোমাদের চেনা জানা হয়ে যাবে’।

স্বপনের কথা শুনে মা ও মিতু দুজনেই বেশ অবাক হয়ে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

নিজের রুমে বসে বসে মিতু ল্যাপটপে হানিমুনের ছবি দেখছিল। কাশ্মীর যে কি সুন্দর ভাবাই যায় না। পাহেলগাম, সোনমার্গ, গুলমার্গ জায়গাগুলো ভোলার মতো না। সেবারই জীবনের প্রথম বরফ পড়া দেখেছিলো মিতু। কিছু ছবি দেখেতো মিতু রীতিমত না হেসে পারল না। সে সময় ওরা দুজনেই কেমন বাচ্চা বাচ্চা ছিল। ‘দেখতে দেখতে বিয়ের প্রায় চার বছর হতে চললো’ ভাবল মিতু। একটু কি দীর্ঘশ্বাসের মতো বয়ে গেলো বুকের ভিতরটায়? হানিমুনের ছবি দেখা শেষে পুরনো কিছু ছবিতে চোখ গেলো মিতুর। বাবা মা’র ছবি। বাবা মা পাশাপাশি বসা। বাবার কোলে মিতু। মিতুর বয়স তখন ছয় কি সাত হবে। কি দারুন একটা ছবি। মনের অগোচরেই চোখটা ভিজে এলো মিতুর। এখনও বাবার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক হয়নি।

মিতুর বাবা মিতুর বিয়ের কথা শুনে বলেছিলেন, ‘মিতু নামে আমার মেয়ে ছিল আমি ভুলে গেছি। বাবার অপমান করতে যে মেয়ের বিন্দুমাত্র বাঁধে না; সে আমার মেয়ে হতে পারে না। মিতুর মুখ আমি দেখতে চায়না’।

মাস্টার্স পাস করে মিতু চাকরির কথা ভাবেনি, যদিও স্বপন ওকে বার বার বলেছে বাসায় একা একা বোর লাগবে, তবুও। মিতুর শাশুড়িও একই কথা বলেছে, কিন্তু মন থেকে সায় দেয়নি মিতু। বাচ্চা পালন করবে আর সংসার সামলাবে এটিই ছিল তার চিন্তা।

মিতুর বাচ্চার খুব শখ কিন্তু স্বপন এখন বাচ্চা নিতে নারাজ। বললেই বলে, ‘আরে বাচ্চার জন্য এতো তাড়া কিসের, অঢেল সময় পড়ে আছে, আগে নিজেদের মতো করে সময় পার করি’।

স্বপন সকাল সকাল বেরিয়ে যায় ফেরার কোন সময় নির্দিষ্ট নেই। কখনও আটটা কখনও দশটা পেরিয়ে যায়। আবার কখনও কাজের এতো চাপ থাকে যে কোন কোন রাতে বাসা ফেরা হয়না। কাজ নিয়ে খুব সিরিয়াস স্বপন। খুব তাড়াতাড়ি কয়েকটা প্রমশনও পেয়েছে সে। এই বছর প্রমোশন নিয়ে গাড়ি কিনেছে ওরা। মিতুর পছন্দতেই কেনা। লাল রঙের গাড়ি। লাল রঙের গাড়ি মিতুর খুব পছন্দ। স্বপনের উন্নতিতে মিতুর গর্বের শেষ ছিলনা। মিতুর কেবলই মনে হতো স্বপনের যত সাফল্য সবই তার নিজের। সে নিজে অনুভব করতো আর আনন্দ নিয়ে সেলেব্রেট করতো। মিতুর বন্ধু বান্ধবী পাড়া পরশি যার সঙ্গেই কথা হোক না কেন, ইনিয়ে বিনিয়ে স্বপনের সাফল্যের কথা বলবেই। সে কথায় কথায় স্বপন যে তার ক্যারিয়ারে খুব ভালো করছে, সে হাসবান্ড হিসেবে খুব কেয়ারিং, পরিবারের ব্যাপারে যত্নবান সেগুলো অন্যকে বলে আত্মতৃপ্তি পায়। সেদিন পাশের বাসার ভাবি বললেন, ‘মিতু ভাবি কি যে করি বলেন তো? আমার হাসবান্ড তো আমার হাতের রান্না একেবারেই খেতে পারেনা। আপনি কিভাবে যে ম্যানেজ করেন’?

মিতু হাসতে হাসতে বলন, ‘আপনার ভাইতো আমার হাতের রান্না ছাড়া খেতেই পারেনা। আসলে এ হচ্ছে ভালোবাসা, বুঝেছেন ভাবি ভালবাসা থাকলে বিষও মধু মনে হয়’।

মিতুর সেদিনের সেই আত্মতৃপ্তি ভোলার মতো না। কথা যখন বলছিলো তখন দু চোখ চকচক করে উঠছিল যেন। 

কিছুক্ষণ ধরে মোবাইলটা বেজে চলেছে। মিতু রান্না করছিলো তাই ধরতে দেরি হলো।

হাত মুছে ফোনটা ধরে বলল, ‘হ্যালো স্লামালেকুন। কে বলছেন’?  

মোবাইল ওপাশ থেকে ভেসে এলো, ‘ভাবি আমাকে চিনতে পারছেন আমি ফারুক বলছি। ঐযে নিউ মার্কেটে দেখা। আপানারা প্লাস্টিকের কিছু জিনিস কিনছিলেন। মনে আছে’?  

মনে পড়ে গেলো মিতুর। সে বলল, ‘ও হ্যাঁ ফারুক ভাই! কেমন আছেন? বাসায় সবায় কেমন আছে? বাচ্চারা কেমন আছে’? সরি ফারুক ভাই আপনার নম্বারটা আমার মোবাইল সেভ ছিল না’।  

ফারুক উত্তরে বলল, ব্যাপার না ভাবি, হতেই পারে। আপনাদের দোয়ায় সবাই ভালো আছে। আলহামদুলিল্লাহ। ভাবি একটা কাজে একটু ফোন করেছিলাম’।

মিতু বলল, কি ব্যাপার বলুন তো?

স্বপন ভাইকে একটু দরকার ছিল। উনি কি বাসায় আছে না কোন কাজে বাইরে গেছেন?

কেন আপনি জানেন না? আপনার স্বপন ভাইতো আপনাদেরই অফিসের ট্যুরে চট্টগ্রাম গেছে।

ফারুক একটু অবাক হয়ে বলল, ‘কি বলেন ভাবি? আমার জানা মতে স্বপন ভাইতো অফিসের ট্যুরে কোথাও যাননি। বরং উনি তো বাসার কাজের কথা বলে দু’দিন ছুটি নিয়েছেন।!

মিতু আর কথা বাড়ায় না। কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, অনুমানে সে তা বুঝেছে। সে কথাটা ঘুরিয়ে ফারুককে বলল, ‘হ্যাঁ স্বপন বলছিলো বাসার কাজের সঙ্গে অফিসের কাজও সেরে আসবে। তাইতো সেদিন আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলো। আমি হয়তো বুঝতে ভুল করেছি’।

ফারুক ওপাশ থেকে বলল, ‘ও আচ্ছা ঠিক আছে ভাবি, স্বপন ভাইয়ের অন্য কোন নম্বার থাকলে দিলে ভালো হয়। জরুরি আলাপ আছে’।

ফারুক ভাই স্বপনের তো একটাই নম্বার। ও তো আর অন্য কোন নম্বার ব্যবহার করেনা। ও কল দিলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলবো’।

কথা বলার সময় যতদূর সম্ভব মাথাটাকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করলো মিতু। কথা শেষ করে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়লো সে। সে কিছু একটা গড়বড় আছে অনুমান করছে। কিন্তু আবার এও চিন্তা করছে অনুমান নির্ভর কিছু ভেবে বসা ঠিক না। সে মনে মনে চিন্তা করলো, ‘স্বপন এলে কথা বলবে’।

স্বপন দুই দিন পর অফিসের কাজ করে বাসায় ফিরে এলো। এসেই মিতুকে জরিয়ে ধরে চুমু খেল। গভীর আদরে বুকের মধ্যে নিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘আহা কি শান্তি। তোমাকে বুকে নিলে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। এই কি আছে তোমার মধ্যে? তোমাকে বুকে নিলেই আমার কেন এতো শান্তি শান্তি লাগে?

মিতু শুধু হুম হলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। বেশী কথা বাড়ালো না। স্বপন মিতুর এই ব্যবহারে কিছুটা অবাক হল। বলল, কি ব্যাপার শরীর খারাপ নাকি? কিছু হয়েছে? মন খারাপ?

মিতু উত্তরে বলল, ‘রান্না করতে করতে একটু টায়ার্ড হয়ে গেছি মনে হয়। ঠিক হয়ে যাবে। তুমি তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি’। বলে মিতু রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। স্বপনও ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকে পড়লো।

মিতুর স্বপনের এরকম ব্যবহার দেখে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলো। মন থেকে কালো মেঘ যা এতক্ষণ খেলা করছিলো তা কেটে গেলো। নিজেকে খুব হাল্কা হাল্কা বোধ করছে এখন। দুজনে একসঙ্গে বসে খেল। ডাইনিং টেবিলে স্বপন অনেক গল্প করলো মিতুর সঙ্গে। মনে হল এই দুইদিনে অনেক গল্প জমা ছিল। মিতুকে পেয়ে সব বাধা সরে গিয়ে একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে লাগলো সব।

এতো কিছুর পরও মিতু লক্ষ্য করলো, ‘আগে কথায় কথায় স্বপন মিতুর গায়ে হাত দিত। ট্যুর থেকে এলে বেডে অনেক আদর করতো। কিন্তু এবার টায়ার্ড বলে পাশ ফিরে শুয়ে গেলো। মিতুর শরীরটাকে কাছে টেনে পর্যন্ত নিলো না। স্বপনের ব্যবহার মিতুর কাছে কিছুটা আলাদা মনে হল। শুয়ে শুয়ে মিতুর কেবলই মনে হতে লাগলো অফিস থেকে দেরিতে ফেরা, হুটহাট ট্যুরের নামে বাইরে যাওয়া। মোবাইল চ্যাট করা আর মোবাইল বেজে উঠলে খুব সন্তর্পণে অন্য রুমে গিয়ে কথা বলা, কেমন যেন আলগা একটা অনুভূতির সৃষ্টি করলো মিতুর কাছে। মিতু ঠিক বুঝতে পারছে কিছু তো একটা আছে যা মোটেও স্বাভাবিক নয়। কোথায় যেন কি নেই। মিতু মনে মনে ছটপট করে উঠলো। এতদিন তাহলে কেন বুঝতে পারেনি সে? নাকি এ সবই তার ভুল, দুর্বল মনের বিকার মাত্র।

শুক্রবার ছুটির দিন। এই দিনটিতে স্বপন কিছুটা বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। মিতু সকালের রান্না করতে ব্যাস্ত সময় পার করছে। আজ পরোটা, ডিমভাজা আর আলুর দম রান্না হচ্ছে। স্বপনের ফেভারিট। নাস্তা প্রায় রেডি। স্বপনকে উঠাতে ঘরে ঢোকা মাত্র স্বপনের মোবাইল মেসাজের শব্দ কানে ভেসে এলো মিতুর। স্বপন তখনও ঘুমে অচেতন। ‘কোন জরুরি মেসেজ নাকি’? ভাবলো মিতু। মিতু কাছে গিয়ে মোবাইল তুলতেই আরেকটি মেসেজ ভেসে উঠলো। রিয়া নামে কেউ লিখেছে, ‘তোমাকে খুব মিস করছি’। মেসেজ দেখে মিতুর কেমন যেন বাজে অনুভূতি হল। সে সম্পূর্ণ মেসেজ পড়ার জন্য মোবাইল আনলক করতেই একগাদা হার্ট ইমজি ভেসে উঠলো। মিতুর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে স্ক্রল করতে শুরু করলো। সে যতই পড়ছে ততই অবাক হচ্ছে। স্বপন লিখেছে চট্টগ্রামের ট্যুরটা অতুলনীয় ছিল। রিয়ার উত্তর, ‘না মোটেও না। আমার মতে গুলশান হোটেলে আমাদের সময়টা ছিল বেস্ট। তবে কক্সবাজার ট্যুরটাও বেশ উপভোগ্য ছিল। বেডে যে তুমি কি পাগলের মতো করো না। তোমাকে সামলানোই যায় না। ইউ আর আ রিয়েল ওয়াইল্ড টাইগার। আই লাভ ইউ’।

উত্তরে স্বপন লিখেছে, ‘তোমার কোন তুলনা হয় না। তুমি বেস্ট। আই লাভ ইউ ঠু’।

সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপছে যেন। নিজেকে দিশেহারা মনে হচ্ছে। পাগল পাগল লাগছে সব। পড়ছে আর মিতুর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ওদের দুজনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি দেখা যাচ্ছে। এসব দেখে মিতুর কেবলই মনে হচ্ছে কেউ যেন ওর হৃৎপিণ্ডটাকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে দিচ্ছে। বুকের ভেতর প্রচণ্ড চাপ অনুভব করছে সে। কষ্টে কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যেন। 

হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে মিতুকে তার মোবাইল হাতে কি যেন করছে দেখতে পেলো স্বপন। এমন সময় উঠে এসে পেছন থেকে মিতুর কাছ থকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বললো, ‘হাউ ডেয়াড় ইউ। তুমি আমার মোবাইলে হাত দিয়েছো কেন? মেসাজ কেন পড়ছো? মানুষের প্রাইভেসি বলে একটা কথা আছে। আনশিভিলাইসড কোথাকার’।

মিতু কিছুই বললোনা শুধু ফ্যালফ্যাল করে স্বপনের দিকে চেয়ে থাকলো। স্বপনের উদ্ধতপূর্ণ কথাবার্তা  নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না সে। এ ধরনের অন্যায় করার পর কোন মানুষ যে এতো নির্বিকার হতে পারে মিতুর চিন্তার বাইরে ছিল। শান্ত থাকতে থাকতে হঠাৎ মিতু চিৎকার করে উঠলো। বলল, চরিত্রহীন, লম্পট কোথাকার? অফিসের ট্যুরের নাম করে বান্ধবী কে নিয়ে ঘুরে বেড়াও। ছি ছি তোমার লজ্জা করেনা?

স্বপন মিতুকে থামাতে এগিয়ে আসতেই মিতু একরকম পাগলের মতো চড়, থাপ্পড় দিতে শুরু করে দিলো। আক্রোশে স্বপনের রাতে পড়া জামাটা একটানে ছিঁড়ে ফেললো মিতু। মুখে বলল কুত্তার বাচ্চা তুই আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে আমার জীবন নিয়ে খেলেছিস। বাস্টার্ড।

স্বপন মিতুকে থামাতে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। মুখে বলল, ‘আর একটা কথা বললে তোকে এখানেই মেরে ফেলবো। কি প্রমাণ আছে তোর কাছে যে আমি লম্পট। ... উল্টাপাল্টা কথা বললে তোকে আমি খুন করে ফেলবো’।

মিতু তখনও স্বপনের জামার কলার ধরে আছে। বলল, ‘ফারুক ভাই কল করেছিলো উনি বলেছেন তুমি অফিসের ট্যুরে যাওনি। তুমি তোমার লাভারের সঙ্গে হানিমুনে গিয়েছ চট্টগ্রামে। তারও আগে কক্সবাজারে আর গুলশানে একসঙ্গে রাত কাটিয়েছ। সবই পড়েছই আমি। তোমাদের একসঙ্গে ইন্টিমেট সব ছবিও দেখেছি। ছি তোমার ঘেন্না করেনা। চরিত্রহীন, লম্পট কোথাকার?

সব শুনে স্বপন একটা ধাক্কা খেল যেন। একটু বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। সে আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে বসলো। কোন উপায় না পেয়ে মিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ভুল হয়েছে মিতু, আমাকে তুমি ক্ষমা করো। এবারের মতো মাফ করে দাও, প্লিজ’।

অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছিলো স্বপনের। ক্ষণিকের আনন্দের জন্য এ কোন ভুল করে বসলো স্বপন। সে চাইলেও নিজেকে আর ক্ষমা করতে পারবেনা।  

এতক্ষণে মিতুও কিছুটা ধাতস্ত হয়ে এসেছে। স্বপনের দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করলো, ‘স্বপন আমার কি দোষ ছিল? আমিতো তোমাকে নিজেকে উজাড় করে চেয়েছি। এতো বড় কষ্ট তুমি আমাকে দিতে পারলে? তুমি আমার পৃথিবী ধ্বংস করে দিয়েছ। আমাকে শেষ করে দিয়েছ। কিভাবে পারলে? এসব জানার আগে আমার মৃত্যু হলনা কেন? স্বপন আমি যে তোমাকে খুব খুব ভালোবেসে ছিলাম। এত বড় প্রতারণা তুমি কেন করলে? আমাকে বললে আমিই তোমার জীবন থেকে চলে যেতাম। তাই বলে এতবড় আঘাত তুমি আমাকে দিতে পারলে’?

 

সময় যেন থেমে গেলো। মিতু আর আগের মতো উচ্ছ্বসিত হয়না। স্বপন বিরাট ভুল করেছে এবং তা সে বারবার স্বীকার করেছে। মিতু স্বপনকে মন থেকে ক্ষমাও করেছে। কিন্তু দিন শেষে যখন মুখোমুখি হয় তখন নিজের মূল্য নিয়ে সংশয় দেখা দেয় মিতুর। বড্ড সস্তা লাগে নিজেকে। পরিপূর্ণভাবে কিছু দিতে না পারার বেদনা নিজেকে কুড়ে কুড়ে খায়। মিতু বুঝতে চেষ্টা করে তাদের মাঝে কি ছিলনা যে স্বপনকে অন্য মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। সম্মানবোধ? মিতুর মতে, ‘স্বপন মিতুকে ভালোবাসতো ঠিক কিন্তু তার মধ্যে গভীরতা ছিলনা, সম্মান ছিলনা। যা ছিল তা প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যেস। মাপ করে চুমু দেয়া, বাহির থেকে এসে জড়িয়ে ধরা, সাংসারিক কথা বলা, রুটিন করে মিলিত হওয়া। এর মধ্যে নতুনত্ব কি আছে? যা আছে তা সবই অভ্যেস। মিতু স্বপনকে রিয়ার কাছে কেন যাচ্ছে না জানতে চাইলে বলে, ‘রিয়াকে আমি সেভাবে কখনই দেখিনি। এটা একটা মোহ’।

মিতু বুঝতে পারে রিয়া স্বপনের পাঞ্চ লাইন। অনেকটা সারাদিনের ক্লান্তির পর এক পেগ মদ যেমন তেমন। স্বপনের কাছে ঘরটা থাকলো ঠিকই, মাঝে মাঝে একটু বাম্পার রাইডিং ও থাকলো, যা জীবনে স্পাইস যুক্ত করবে। এই সমীকরণ যা বোঝায় তা হচ্ছে। স্বপনের লয়াল থাকা প্রায় অসম্ভব, মিতুও সেটি বোঝে।

আগে দুজনার অনেক কথা হতো এখন সত্তুর শতাংশ কথা কমে গেছে দুজনার মধ্যে। প্রয়োজন ছাড়া কথা হয় না। একে ওপরের দিকে ঠিক ভাবে তাকাতে পর্যন্ত পারে না। অনুশোচনায় আর অপমানে দুজনেই শুধু হারিয়ে থাকে। দুজনেই অনুভব করে, কোন কিছুই আর আগের মতো নেই। ঘটনা প্রবাহে সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। স্বপন মিতুকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট সাহায্য চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মিতু নিজের সামনে নিজেই দাঁড়াতে পারছেনা। দুপুরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিতু ভাবছে সে আর কি করলে এমন ঘটনা ঘটতো না? কি করলে স্বপনকে আগলে রাখতে পারতো? বার বার একই উত্তর পেলো। অভ্যেস! টানটা আর আগের মতো নেই।

পরের দিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে মিতু বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের আকাশ দেখছে। আনমনে কি যেন ভাবছে। স্বপন মিতুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, ‘অফিসে যাচ্ছি’ বলে বের হয়ে গেলো। মিতু একবার সকালের নাস্তার কথা জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না। বারান্দায় বসে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে  কাঁদতে শুরু করলো।

রাতে স্বপন অফিস থেকে ফিরে এসে কলিং বেল দিলো। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না দেখে একটু ভয় পেয়ে গেলো সে। ব্যাগে রাখা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল স্বপন। রাতে লাইট জ্বালায়নি মিতু। পুরো বাসা চুপচাপ। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো স্বপনের। হঠাৎ ভয় পেয়ে মিতু মিতু বলে ডাকতে শুরু করে দিলো স্বপন। বেডরুমে ঢুকে দেখল মিতু সেখানে নেই। লাইটের সুইচ অন করলো স্বপন। বাথরুম, পাশের রুম, বেলকণি ঘুরে ঘুরে দেখল, কয়েকবার ডাকলো মিতু নাম ধরে কিন্তু কোন সাড়া নেই। বেড রুমে ফিরে এসে বিছানায় বসে পড়লো স্বপন। দুই হাতের তালুতে মুখ লুকাল সে। ভয়ে টেনশনে ঘেমে নেয়ে গেছে একেবারে। হাত থেকে মুখ তুলতেই লক্ষ্য করলো এস্ট্রের নিচে চিঠির মতো কি যেন চাপা দেয়া আছে টেবিলের উপর। স্বপন উঠে এসে দেখল হ্যাঁ মিতুর লেখা চিঠি একটা।

চিঠিতে লেখা,

স্বপন, আমরা পছন্দ করে পরিবারের মতের বাইরে গিয়ে সংসার পেতে ছিলাম। সুখে দুখে আমরা সব সময় এক ছিলাম। পাশাপাশি ছিলাম। ভেবেছিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সঙ্গে পাড়ি দিবো। তা আর হলনা। এই ৮ বছরের সম্পর্কে কোনদিন বুঝিনি তুমি আমার কেউ নও। আজকের পর থেকে শুধুই মনে হচ্ছে তুমি আমার কেউ নও, তুমি আর পাঁচটা মানুষের মতো। তুমি নিশ্চয় জানো একটা সম্পর্ক টিকে থাকে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর সম্মান বোধ থেকে। একটা সম্পর্কের আয়ু বেড়ে যায় একে অপরকে বোঝা পড়ার মাধ্যমে। জানিনা কি পাপ করেছিলাম যে আল্লাহ আমাকে এতো বড় শাস্তি দিলেন। হ্যাঁ, শাস্তিই বটে। সম্পর্কে প্রতারণার কোন জায়গা থাকতে পারে না। আমি জানি আমাকে তুমি ঠিক ভালোবাসতে পারোনি। যা তুমি ভালবাসা বলছো তা আমার প্রতি নিছক ইনফাচুয়েসন। পুরনো অভ্যেস। কেন? সেটির উত্তর তুমিই ভালো দিতে পারবে। তুমি আজ আমাকে যে অসম্মান করেছ তার কোন তুলনা হয় না। আয়নার সামনে কোনদিন দাঁড়াতে পারবো এ বিশ্বাস আমার মরে গেছে। তোমার প্রতি রাগ বা ঘৃণা কোনটিই নেই আমার। তুমি আমার কাছে এখন যে কোন পুরুষ। তবু আমি তোমার ভালো চাইবো। তুমি ভালো থেকো। অনেক ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিয়ো। শুধু জেন মিতু নামের একটি মেয়ে তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবেসেছিল। তোমাকে খুব খুব চেয়েছিলো। তার দাম সে পায়নি বলে চলে যাচ্ছে। আমাকে খুঁজনা।-মিতু

চিঠিটা পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বুকের মাঝে ধরে, ‘মিতু আমাকে মাফ করে দাও, আমাকে ক্ষমা করে দাও’ বলে বিলাপ করতে লাগলো স্বপন। কেমন পাগলের মতো মিতু মিতু বলে ডাকতে লাগলো সে। কিছুক্ষণ পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনটাকে অসম্ভব ভারি বলে মনে হতে লাগলো স্বপনের। বিস্তীর্ণ আকাশে জীবনের অসীম অনিশ্চয়তার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু।      

;