চুমকির ঘরে ফেরা



এম এল গনি
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মেয়েটির নাম চুমকি। মধুময় কণ্ঠ, আকর্ষণীয় দেহবল্লবী, স্বতঃস্ফূর্ত হাসি, সাহসী, দৃপ্ত চাহনি, অমৃতধারায় বহমান চোখজোড়া। বয়সের তুলনায় বড়োবেশি বিচক্ষণ, বুদ্ধিদীপ্ত আর প্রত্যয়ী। দৈহিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পড়াশোনাও আছে বেশ। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় তার বিজয় পরিবারটির নজর কাড়ে। এমন দ্যূতিছড়ানো মেয়েই খুঁজছিলেন শিমুলের মা-বাবা তাঁদের একমাত্র পুত্রের জন্য।

শিমুলও কম কিসে? সুদর্শন, ব্যাক্তিত্বময়, প্রতিভাবান,সুগঠিত পেশির বাঁধন, চোখ যেন হৃদয়ের জানালা। অসাধারন মেধাবী শৈশব হতেই। শিমুল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সের ছাত্র তখন সহপাঠিনী রিমির মনে ধরে তাঁকে। রিমির আগ্রহেই শিমুল তাঁর স্টাডি পার্টনার হন। পড়াশোনার নামে সময়ে অসময়ে শিমুলের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে আড্ডা দিতেন রিমি। মাঝে মাঝে মায়ের রান্না ভুনা খিচুড়ি নিয়ে এসে শিমুলের সাথে ভাগাভাগি করে খেতেন। সুযোগমতো পড়াশোনার বাইরের ব্যক্তিগত বিষয়ও আলোচনায় আনতেন। নিজের পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি পরিবারের খুঁটিনাটিও শিমুলের সাথে সহভাগ করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন রিমি। শিমুল যেন তাঁর সাক্ষাৎ স্বজন, একান্ত কাছের মানুষ।

মাসের পর মাস এভাবে পেরুলেও শিমুলের দিক হতে ভালোবাসার ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে রিমির। এমনি অবস্থায় একদিন শিমুলকে সরাসরি বলে ফেলেন তাঁর জন্য পরিবারের পক্ষ হতে পাত্র দেখার কথা।

- শিমুল, তোমার সাথে একটা ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করতে চাইছি; বলবো?

- বন্ধুদের সাথে কথা বলতে অনুমতি লাগে নাকি? তাড়াতাড়ি বলো।

- বাবা-মা কিন্তু আমার বিয়ের কথা সিরিয়াসলি ভাবছে।

- কিন্তু, তোমার তো অনার্স শেষ হতে আরো এক বছর বাকি। এখনই কেন তাঁরা বিয়ে দিতে চাইছেন?

- আমার ছোট খালা রুনু আমেরিকা প্রবাসী এক পাত্রের প্রস্তাব এনেছে। গ্রীনকার্ড নয়, একেবারে আমেরিকার পাসপোর্টধারী। বিয়ের পর স্পনসর করে আমেরিকা নিয়ে যেতে যে সময়টা লাগবে সে সময়ে আমার অনার্স শেষ হয়ে যাবে। মানে, পড়ার ক্ষতি হচ্ছে না মোটেও।

- তাই নাকি? তাহলে তোমাকে তো আর খুব বেশিদিন দেখছি না মনে হয়, সহসাই স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় উড়াল দিচ্ছো।

- কিন্তু ..., আমি তো কোথাও যেতে চাইনা শিমুল, দেশেই থাকতে চাই।

- তবে তা তোমার পরিবারকে জানাও না কেন?

- কোন ভরসায় জানাবো?

- মানে?

- মানে, কার ভরসায় জানাবো?

- বুঝলাম না রিমি, একটু খুলে বলো।

- খুলে আর কি বলবো? এটুকুতে না বুঝলে আমার আর বলার কি আছে? তুমি তো দেখছি ক্লাস ফাইভের খোকাকেও হার মানালে হে।

- সরি রিমি, আমি আপাতত পড়াশোনার বাইরে কিছু ভাবছি না। সহপাঠী আর বন্ধু হিসেবে তুমি অদ্বিতীয়, এটা আমি মানি, তবে, এর বেশিকিছু ভাবার সুযোগ যে আমার আপাততঃ নেই।

রিমির উচ্ছাস, ব্যাকুলতা শিমুলের মনে ঢেউ জাগাতে পারেনি দেখে তিনি নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে থাকতে থাকেন। অথচ, হৃদয়ের গভীরে এই শিমুলকে নিয়ে তিনি কতো স্বপ্নের জালই না বুনেছেন। সেই থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে শিমুলের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে লাগলেন রিমি। - -

বরাবরের মতো পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করায় শিমুল তার বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে চাকুরী পেলেন। তিন বছরের শিক্ষকতাকালে সঞ্চিতা নামের এক জুনিয়র সহকর্মীও তাঁর দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছিলেন। শিমুল সে প্রস্তাবও এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবে।

অবশেষে সুযোগ এলো বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কানাডা যাবার। শিমুল তা কাজে লাগলেন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় বৃত্তিসহ মাস্টার্স লিডিং-টু-পিএইচডি প্রোগ্রামে স্টুডেন্ট ভিসা বাগিয়ে নিলেন তিনি। পাড়ি জমালেন হাজারো কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডায়। জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো তাঁর।

পড়াশোনায় প্রতিভার স্বাক্ষর কানাডায়ও রেখে চলেন শিমুল। এক টানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে টরোন্টোর এক নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

লেখাপড়ার পাশাপাশি কানাডার বর্ণিল জীবনধারা তাঁর মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্রও প্রশস্থ করে। সময়ের পরিক্রমায় তিনি আরো প্রবলভাবে অনুভব করতে শুরু করেন সমাজের আর দশটা পুরুষের মতো গতানুগতিক চিন্তা বা অনুভবের মানুষ তিনি নন। মানে, নারীর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ঠিক অন্য দশ পুরুষের মতো নয়। নারীদের শ্রদ্ধাসম্মান করেন তিনি, ভালোবাসেনও, কিন্তু কোন নারীকে জীবনসঙ্গিনী করে দুই জীবন এক ফ্রেমে বন্দি করবেন এমন চিন্তা ঘুনাক্ষরেও তাঁর মাথায় আসে না।

এরই মাঝে সপ্তাহান্তের এক সকালে মায়ের ফোন বেজে উঠে।

- বাবা, তোকে আজ খুব মিষ্টি একটা খবর দেব। তুই কিন্তু না বলবি না, কথা দেয়।

- বলই না মা, না শুনে কেমনে হাঁ বলি?

- তোর জন্য অসম্ভব গুণী, লক্ষী একটা মেয়ে পেয়েছি, দেখতে পুতুলের মতো সুন্দর; বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী সে।

- বলো কি মা? মেয়েটা কে?

- এই যে, মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় সেদিন প্রথম স্থান পেলো। টিভিতে দেখালো তাকে। তোকে ঝুমা (শিমুলের ছোটবোন) ছবি পাঠাবে কাল। তার আগে তোকে বলে রাখছি, মেয়েটা আমাদের সবার, এমনকি তোর বাবারও পছন্দের। মেয়েপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে আমরা প্রাথমিক সম্মতিও পেয়েছি। নাম চুমকি। যেমন নাম, তেমনই দেখতে। বিবিএ শেষ করেছে। এমবিএ পড়ার পাশাপাশি কাজও করে। শত গুনে গুণী সে।

শিমুলের বাবা অসুস্থ, পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে শয্যাশায়ী আজ প্রায় তিনবছর। মা স্কুলে শিক্ষকতা করে সংসার চালান। ঝুমা আর সীমা, দুই ছোটবোন পড়ে কলেজে। শিমুলই এখন পরিবারের চালিকাশক্তি। তিনি কিছুতেই মায়ের, তথা, পরিবারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বাবার কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিতে পারেন না। অন্তত বাবাকে খুশি করতে হলেও শিমুলকে এ বিবাহে রাজি হতে হবে, যদিও নারীদের ব্যাপারে শিমুলের তেমন আগ্রহ নেই। - -

যেই কথা সেই কাজ। চুমকি এখন শিমুলের বিবাহিতা স্ত্রী। বিবাহের উদ্দেশ্যে চাকুরী হতে দুসপ্তাহের ছুটি নিয়ে তড়িঘড়ি শিমুল দেশে এসেছিলেন। বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা আর দুপক্ষের আত্মীয়স্বজনের দাওয়াতে হাজিরা দিতে দিতেই দুসপ্তাহ যেন দুদিনেই কেটে গেলো। চুমকি বনেদি পরিবারের মেয়ে। তাদের আত্মীয়স্বজনের পরিধি অনেক বড়ো। তাছাড়া, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী চুমকি কেবল সৌন্দর্যের চর্চাই করেননি, জড়িত থেকেছেন নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও। একটা সুইডিশ এনজিও'র কোঅর্ডিনেটর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র একুশ বছর বয়সেই। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সামাজিক উন্নয়নে তিনি কয়েকবছর কাজ করেছেন এরই মাঝে।

মাত্র দুসপ্তাহের এতো স্বল্প সময়ে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ খুব একটা হয়ে উঠেনি শিমুল-চুমকি দম্পতির। অতঃপর দুই পরিবারের চাপাচাপিতে দ্রুতই শিমুল তাঁর স্ত্রী চুমকিকে কানাডায় নিয়ে এলেন। শুরুর কিছুদিন টরোন্টো শহরের কয়েক দর্শনীয় স্থানে ঘোরাফেরায় কেটে গেলো এ দম্পতির। পাশাপাশি পুরোনো বন্ধু অশেষ, জাবেদসহ পরিচিত বাঙালিদের বাসায়ও বেড়ানো হলো কয়েকদিন। সময়টা কাটছিলো ভালোই; তবে, দুজনের একান্ত মুহূর্তগুলোতে শিমুলের অস্বাভাবিক আচরণে চুমকি বেশ অবাকই হলেন।

মাস তিনেক এভাবে পার হবার পর তার এক বিবাহিত বন্ধু সাথী সেনগুপ্তার সাথে এ নিয়ে কথা বলেন চুমকি। সাথীর সাথে শৈশব হতেই তাঁর বন্ধুতা। দুজনই দুজনার অনেক ব্যক্তিগত বিষয় জানেন। ইন্টারমিডিয়েটে পড়া অবস্থায় সাথীর বিবাহ হয়েছিল। সঙ্গতকারণেই, সংসার ধর্মে তাঁর রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

- সাথী, তোকে একটা কথা বলবো, কারো সাথে শেয়ার করবি না বলে প্রমিজ কর।

- কেন, অতীতে তোর কোন কথা কাউকে বলে দিয়ে তোকে বিপদে ফেলেছি নাকি? প্রমিজ করতে হবে কেন, যা বলার খুলে বল।

- ওই যে, ডঃ শিমুল, মানে, তোর দুলাভাইয়ের কথা বলছিলাম।

- কেন, কি হলো রে? তুই তো খুব লাকি, শিমুল ভাই যেমন ব্রিলিয়ান্ট দেখতেও তেমন হ্যান্ডসাম। দেশে যেমন সফল মানুষ ছিলেন, বিদেশেও তেমনই সাকসেসফুল। কি, তাঁর উপর আর কারো নজর পড়েছে নাকি?

- না, তেমন কিছু না, ওরকম সমস্যা নেই।

- তবে কি? চটজলদি বলে ফেল।

- ও না একটু কেমন।

- কেমন মানে?

- মানে ..., ঘনিষ্ঠ হতে চায়না।

- আরে, ওটা কোন ব্যাপার না, আমাদেরও তো ঘনিষ্ঠ হতে টানা একমাস লেগে গেছে। তোর দুলাভাই তো আমার ঠোঁটে ঠোঁট মেলাতেই তিনদিন ফেলেছে। আমি তো জোর করে তাঁকে দিয়ে প্রথম আমার বুক স্পর্শ করিয়েছি। ... শিমুল ভাই বেশি পড়াশোনা জানা আঁতেল মানুষ তো, মাথায় হয়তো নানাপদের বুদ্ধি কিলবিল করে। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। খামাখাই দুশ্চিন্তা করছিস।

- কিন্তু, আমাদের যে সময়টা একটু বেশিই লাগছে। কানাডা এসেছি চারমাসে পড়লো তো।

- বলিস কি? চারমাসেও ...!

- না, একবারও না।

- যা, কি বলছিস?

- সত্যি।

- তুই কি নিজে থেকে চেষ্টা করেছিস? পুরুষদের জাগাতে হয়, সবাই একরকম না, অনেকে খুব ইন্ট্রোভার্ট। তেমন হলে তোকে কিন্তু এগ্রেসিভলি চেষ্টা চালাতে হবে।

- দেখি।

- তাতেও কাজ না হলে ডাক্তারের সাথে কথা বল। আর দেরি করা ঠিক হবে না। চারমাস তো মেলা সময়রে !

আরো সপ্তাহ দুয়েক অপেক্ষা করে চুমকি এক রাতে নিজে থেকেই শিমুলের কাছে নিজেকে মেলে ধরেন।

চুমকি আজ নির্লজ্জ্ব, বেহায়া, তাঁর যা কিছু আছে সব বিলিয়ে দিয়ে শিমুলকে জাগিয়ে তোলাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তিনি চান, শিমুল আজ তাঁকে দুমড়ে-মোচড়ে একাকার, আর, বুকে চেপে চূর্ণবিচূর্ণ করুক। নিজের ব্লাউজ নিজেই খোলেন চুমকি, বক্ষবন্ধনী খুলে বাথরুমের দরোজার দিকে ছুঁড়ে মারেন, দুধে আলতা স্তন্যচূড়ায় ঘষতে থাকেন শিমুলের মুখ-বুক, ভেজা চুমুতে ভাসিয়ে দেন শিমুলের লোমশ প্রশস্থ বুক।

প্রথমটায় শিমুল অনাঘ্রাতা রমণীর মতো গুটিসুটি মেরে থাকলেও একসময় চুমকিকে বুকে টেনে নেন। অর্ধ উলঙ্গ চুমকির শাড়ির বাকি অংশ খুলে তাঁর খাঁজকাটা তুলতুলে দেহ বাহুডোরে বন্দী করেন শিমুল। জানালায় ঝুলানো ভেলভেটের পুরু পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইর হতে ছুটে আসা নিয়ন লাইটের আলোয় তখন বিজলি চমকাচ্ছিল চুমকির দেহে। তখন চুমকিকে আক্ষরিক অর্থেই চুমকির মতো লাগছিলো। মিলনের আকাঙ্খায় থরথর কাঁপছিলেন তিনি। শিমুলও এগিয়ে এলেন। তবে, শিমুল যে পন্থায় সম্পর্ক গড়তে চাইছেন তা স্বাভাবিক নয়। চরম মুহূর্তে অনিচ্ছাসত্ত্বেও চুমকি তাতে রাজি হন। এভাবে মেলামেশা ভীষণ কষ্টের ঠেকে চুমকির কাছে। তিনি আহত, রক্তাক্ত হন। তারপরও স্বামীর পছন্দ মেনে নিজেকে মানিয়ে নিতে প্রানপন চেষ্টা চালান চুমকি।

এভাবেই চলতে থাকে দুজনের ঘনিষ্ঠ সময়গুলো। বারবার অনুরোধ করেও চুমকি কোনভাবেই শিমুলকে নারীপুরুষের স্বাভাবিক মেলামেশায় রাজি করাতে পারেননি। ফলে, শারীরিক-মানসিক অতৃপ্তি, লোকলজ্জার ভয়, সামাজিক চাপ, ইত্যাদি নানা ভাবনা ক্রমশ চুমকিকে গ্রাস করতে থাকে। একইসাথে, এ দাম্পত্য সম্পর্কের গন্তব্য কোথায় তা ভেবেও তিনি অস্থির হন। এভাবেই পার হতে থাকে অনিশ্চিত যুগল জীবন।

টরন্টো শহরের যে বহুতল ভবনে এ দম্পতি বসবাস করেন সেটি ভিকটোরিয়া পার্ক সাবওয়ে স্টেশনের অনতিদূরে। ভবনের চৌদ্দ তলা হতে নিচে হেটে চলা মানুষগুলো খানিক খর্বাকৃতি দেখালেও তাদের মুখমন্ডল পরিষ্কার দেখা যায়। সাতসকালে কর্মব্যস্ত মানুষের আনাগোনায় প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠে এ এলাকা। এক প্রত্যুষে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারজোড়ার একটিতে বসে ভবনের নিচে সরু রাস্তায় কর্মব্যস্ত মানুষের আনাগোনা দেখছিলেন চুমকি। চোখ পড়ে পাশের ভবনের সপ্তম তলার বাসিন্দা তৃষ্ণা ভাবীর দিকে।

তৃষ্ণাদের দুই সন্তান। এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেটি অটিজমে আক্রান্ত; বয়স দশ কি এগারো। তাকে প্রতিদিন স্পেশাল নীড স্কুলে নিতে হয়। দুই সন্তানকে নিয়ে সেই তৃষ্ণাও সাবওয়ে স্টেশনের দিকে দৌঁড়াচ্ছেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় জেতার আগে চুমকি অটিস্টিক বাচ্চাদের স্কুলে পড়াতেন বাংলাদেশে। তাই তাঁর বেশ জানা অটিজমে আক্রান্ত বাচ্চাদের দেখভাল কি করে করতে হয়। তৃষ্ণাদের দিকে চোখ থাকলেও ক্ষনিকের জন্য চুমকি নিজেকে তাঁর স্কুলের বাচ্চাদের মিষ্টিমধুর স্মৃতিতে হারিয়ে ফেলেন। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠে অটিজমে আক্রান্ত অনেকগুলো নিষ্পাপ শিশুমুখ।

এরই মাঝে দুকাপ চা নিয়ে কাঁপো হাতে শিমুল এসে হাজির।

- কী, একা বসে আছো যে?

- ঘুম ভেঙে গেলো খুব ভোরে; আর ঘুম আসছিলো না। তাই তোমাকে ডিস্টার্ব না করে এখানে চলে এলাম। তুমি কখন বিছানা ছেড়েছো?

- আমি তো তুমি উঠার খানিক পরই উঠে পড়ি। আমারও ঘুম আসছিলো না।

- ঠিক আছে, বসো।

দুজনই নিচে তাকিয়ে কর্মব্যস্ত মানুষের আনাগোনা দেখছেন। এরই মাঝে চুমকি প্রশ্ন ছুড়ে দেন শিমুলের উদ্দেশ্যে।

- আচ্ছা শিমুল, আমাদের বিয়ের আগে তোমার কি কোন মেয়েকে ভালো লেগেছে কখনো?

- হঠাৎ এ প্রশ্ন?

- না, জানতে চাইছি, তোমার কি বলতে আপত্তি আছে?

- আপত্তি থাকবে কেন? সত্যি বলতে কি, দুটো মেয়ে আমাকে কাছে পেতে চেয়েছিলো, কিন্তু ...

- থামলে কেন? ভালো ছাত্র, তাই তুমি পাত্তা দাওনি, তাইতো?

- তা না, পাত্তা না দেবার কি আছে? ওরা খুব ভালো মেয়ে।

- আমার চেয়েও?

- আরে পাগল, তুলনা করছো কেন? প্রতিটি মেয়েই তো যারযার মতো সুন্দর।

- তাহলে তুমি জড়ালে না কেন?

- আমি আসলে ...

- বলে ফেল, থামলে কেন?

- অনেস্টলি, আমি তাদের প্রতি বন্ধুতার বাইরে অন্যরকম কোন আকর্ষণবোধ করিনি কখনো। বলতে পারো, সম্পর্কে জড়ানোর চিন্তা মাথায় আসে নি।

- তার মানে মেয়েদের প্রতি কি তুমি কোন আকর্ষণ বোধ করো না?

- না না, তা বুঝাইনি। তেমন হলে তোমার সাথে এতগুলো দিন একসাথে কাটালাম কি করে?

- শিমুল, আমার সাথে তোমার প্রায় ছয়মাস হতে চলেছে। তুমি যেভাবে আমার সাথে দিন কাটাচ্ছো তাকে কি আসলে দিন কাটানো বলা চলে? বিবাহিত দম্পতির জীবন কি এভাবে কাটে? চলো, তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো।

- ডাক্তার কেন? আমি অসুস্থ নাকি?

- আগে যাই, পরে বুঝবে কেন নিয়ে গেলাম?

- বলো না, কেন ডাক্তারের কাছে নিতে চাইছো? ডাক্তারের এখানে করার কি আছে?

- ডাক্তার কি করবে মানে? ডাক্তার তোমাকে তোমার স্ত্রীর সাথে কিভাবে ঘনিষ্ঠ হতে হয় তা শিখিয়ে দেবে, প্রয়োজনে ওষুধও দেবে। ছ মাসেও তুমি আমার সাথে ঠিকমতো মেলামেশা করতে পারলে না, এটা কি এড়িয়ে যাবার বিষয়?

- কেন? করলাম তো; গতরাতেও তো আমাদের ইয়ে হলো।

- আমাদের নয়, বলো, তোমার মেলামেশা হয়েছে। এভাবে আমি আর পারছি না। তুমি যেভাবে মেলামেশা করছো তা স্বাভাবিক নয়। না না, এভাবে হয়না, আমি ভীষণ কষ্ট পাই। তোমাকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে হবে শিমুল। আমি আর এসব সহ্য করতে পারছি না। ডাক্তার নিশ্চয়ই একটা উপায় বাতলে দেবেন। - -

চুমকির পীড়াপীড়িতে অবশেষে ডাক্তারের কাছে যেতে রাজি হলেন শিমুল। বিস্তারিত শুনে ডাক্তার মুখ গম্ভীর করলেন। তিনি পরিষ্কার বুঝলেন, শিমুলের সেক্সচুয়াল ওরিয়েন্টেশন অন্যসব পুরুষের মতো নয়; তিনি একজন পায়ুকামী, বা সডোমিস্ট, যা কোন ওষুধে সংশোধিত হবার নয়। প্রকৃতিগতভাবেই তিনি তেমন; ডাক্তারের খুব কিছু করার নেই এ অবস্থায়। তারপরও, বিদায় জানাবার আগে পায়ুকামের বিশেষ ঝুঁকি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কিছু মেডিক্যাল পরামর্শ দিলেন ডাক্তার।

চিকিৎসকের পরামর্শ শুনে চুমকি চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলেন। অতৃপ্তি, অক্ষমতা, লোকলজ্জা, জগদ্দল পাথর হয়ে দাঁড়ালো চুমকির সামনে। মা-বাবা বা পরিবারের কারো সাথে এমন বিব্রতকর গোপন বিষয়ে আলাপও অসম্ভব। তবে কি বান্ধবী সাথীকে তিনি সব খুলে বলবেন? তাঁর কাছে চাইবেন সমাধান? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেন চুমকি।

আবার ভাবলেন, ডাক্তার যেখানে না করে দিয়েছেন সেখানে সাথী আর কি করবে? তবে কি শিমুলকে বুঝিয়ে সুজিয়ে স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাতেই থাকবেন, একদিন যদি কিছু হয়? বুঝানোর চেষ্টা হয়তো করা যায়, কিন্তু তাতে কাজ হবার সম্ভাবনা যে তেমন নেই। জোর করে তো মানুষের সেক্সচ্যুয়াল ওরিয়েন্টেশন পরিবর্তন করা যায় না। তেমন কিছু সম্ভব হলে ডাক্তার নিশ্চয়ই একটা পথ দেখিয়ে দিতেন।

যৌন জীবনে স্বামীর এ অস্বাভাবিক আচরণ চুমকির কাছে কানাডার চাকচিক্য, রংচঙা জীবন, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সবই ম্লান করে দিয়েছে। এই কানাডা জীবনের চেয়ে বনজঙ্গলে সন্ন্যাসিনীর জীবন অনেক ভালো, এমনই চিন্তাই তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আজকাল। পাশাপাশি, পুরুষজাতির প্রতি কেমন এক ঘেন্নাবোধও পুঞ্জীভূত হলো তাঁর মনে।

অবশেষে চুমকি একদিন হঠাৎই ফিরে এলেন দেশে। তার আকস্মিক কানাডা ত্যাগে সাথীসহ অন্য বন্ধুরাও বিস্মিত হলেন; পরিবারের কৌতূহলী প্রশ্নেরও মুখোমুখি হলেন তিনি। তাঁর হৃদয়ের একান্ত গভীরে লুকিয়ে থাকা নির্জলা সত্য, ধর্মীয় সংস্কার, লজ্জাবোধ আর সামাজিকতার বেড়াজালে আলোর মুখ দেখেনি কোনদিন।

সুন্দরী প্রতিযোগিতার জয়লাভের পরপরই চুমকি বাংলাদেশে নামিদামি মডেল হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র দুবছরেই তাঁর পরিচিতি হয় আকাশচুম্বী। নাটক সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাবও পেতে থাকেন সমানে। বিজ্ঞাপনের আয় তো ছিলই, তাছাড়া ব্র্যান্ড এম্বেসেডারও হয়েছিলেন এক কোম্পানির। নিজদেশের এমন ফকফকা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পেছনে ফেলে মেধাবী কানাডা প্রবাসীর জীবনসঙ্গিনী হতে পাড়ি জমিয়েছিলেন স্বপ্নের দেশে। অথচ, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর স্বপ্নগুলো চুরমার করে দেয় দ্রুতই। কারো কারো কাছে জীবন এমনই নিস্পন্দ, নিষ্ঠুর।

এমন অনাকাঙ্খিত অভিজ্ঞতার পরও দমে যাবার পাত্রী নন চুমকি। তবে, পুরুষ মানুষ সম্পর্কে তাঁর যে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়েছে তা তাঁকে পুরোদমে পুরুষবিমুখ করে তুলেছে। শিমুলকে তিনি ডিভোর্স দেননি কোনদিন, শিমুলও তা আগ বাড়িয়ে চাননি। তবে, কেবল নামেই তাঁরা আজও স্বামী-স্ত্রী। শিমুল মাঝে মাঝে দেশে এলে চুমকির সাথে কিছু সময় কাটিয়ে যান, তবে চুমকি কখনো তাঁর সাথে শারীরিক মেলামেশায় আগ্রহ দেখাননা। শিমুলও তা এড়িয়ে যান বোধগোম্যকারণেই। কানাডায় ফিরে না যাবার চুমকির যে সিদ্ধান্ত তাও শিমুল মেনে নেন।

দেশে ফেরার পর আর মিডিয়ার মুখোমুখিও হননি চুমকি। বলা চলে, মিডিয়ার লোকজনকে এড়িয়েই চলেছেন পাছে তাঁর কানাডা জীবন, বিবাহ, স্বামী-সংসার ইত্যাদি অপ্রিয় প্রসঙ্গ আলোচনায় চলে আসে সে ভয়ে, সে লজ্জায়। কিছুদিন এভাবে কাটিয়ে ধাতস্থ হয়ে আগের সেই স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন চুমকি। স্পেশাল নীড বা, বিশেষ চাহিদার শিশু কিশোরদের দেখভালেই সময় কাটে তাঁর। ওরাই তাঁর পরমাত্মীয়, পরিবার বা স্বজন। আর, কানাডার কথা মনে হতেই তাঁর চোখে ভেসে উঠে তৃষ্ণা ভাবীর সেই অটিস্টিক ছেলেটিকে, যার হাত ধরে তিনি ভোরের আলো-আঁধারিতে দ্রুতলয়ে টরোন্টোর ভিকটোরিয়া পার্ক সাবওয়ে স্টেশন অভিমুখে হাঁটছিলেন।

লেখক: এম এল গনি
পেশা: কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট (RCIC-IRB)
ইমেইল: [email protected]

অসুস্থ ‘তিলোত্তমা’র কাছে কী সেবা চান আপনি!



প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত, প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

ছবি: সংগৃহীত, প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

  • Font increase
  • Font Decrease

জুলাই ১৩, ২০২৪ সালের ভোর পাঁচটায় শুরু হয়েছিল এক তুমুল বৃষ্টি। রাজধানী ঢাকার বেশিরভাগ মানুষ তখনও গভীর ঘুমে।

এ সময়টা ঘোর বর্ষাকাল। সে কারণে ভারী বৃষ্টিপাত হতেই পারে। তাই, অ্যালার্ম শুনেও আরেকটু ঘুমিয়ে নিই বলে যারা কিছুটা দেরিতে উঠে অফিসে যাবেন বলে আটটার দিকে পথে নেমেছেন, তাদের চক্ষু সেদিন চড়কগাছ‍!

সকাল ৯টা পর্যন্ত বৃষ্টি থামেনি। একটানা চার ঘণ্টার মুষলধারার পতনে ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার ২৬ থেকে ৩০টি বড় রাস্তা একসঙ্গে ডুবে গেছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই ‘ডোবা’ সেই ডোবা নয়! রাস্তায় ১-২ ঘণ্টা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকার পর অনেক গাড়ির ইঞ্জিনে পানি ঢুকে পড়ায় অচল হয়ে যানজট অসহনীয় করে তুলেছিল সেদিন। সংবাদে টেলিভিশনের ভিডিওচিত্র দেখেও তাই-ই মনে হচ্ছিল।

সে এক অতি ভয়ঙ্কর অবস্থা সারাদিন জুড়ে। যেখানে চোখ যায়, সেখানেই মনে হয়, প্লাবন বয়ে যাচ্ছে। নটরডেম কলেজের পাশের রাস্তায় পার্কিং করা কারের শুধু ছাদটা দেখা যাচ্ছে। মালিক গাড়িতে উঠতে গিয়ে হতবাক হয়ে পড়েছেন।

নিউমার্কেটের প্রধান গলিতে বুকসমান পানি। দোকানকার মালিকেরা যারা বাসা থেকে ডুবন্ত নিউমার্কেটের ছবি দেখে দৌড়ে এস মাল সরানোর চেষ্টা করেছিলেন, তারা অনেকে এসে দেখেন দোকানের তালা ঘোলা-ময়লা পানিতে ডুবে অচেনা হয়ে গেছে। মালপত্র ভিজে গছে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত সেই মালামাল সরাতে পারেননি।

কোথায় নেবেন! বেরুনোর সব রাস্তায় থৈ থৈ পানি! ভ্যান, যানবাহন কিছুই ঢোকানো যাবে না! এখানে জলের যানবাহন নেই। কলের গাড়ি জমানো বৃষ্টির বুকসমান জলে চলার পথ খুঁজে পায়নি কোথাও।

গ্রীন রোডে অনেকগুলো প্রাইভেট হাসপাতাল। সেখানে আগত রোগীদের অবস্থা খুবই করুণভাবে চিত্রিত হয়ে সংবাদে ঠাঁই নিয়েছে সেদিন। ডুবন্ত রিকশাভ্যানে নারী রোগীকে শুইয়ে নিয়ে ঠেলে চলছেন রোগীর আত্মীয়-স্বজনেরা। পাশের ভবনের কৌতূহলী মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে ‘আহারে’ বলে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। ভাগ্যিস! শুক্রবার হওয়ায় সেদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ছিল না।

এদিন পথে যারই নেমেছেন, তারাই দুর্ভোগে পড়ে গিয়েছেন। বাইকারদের অনেকের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেছে। পেটের ধান্ধায় যারা ব্যাটারিরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের বাহন অচল হয়ে যাওয়ায় সেগুলো ঠেলে অন্যখানে সরিয়ে নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না।

চিৎকার করে কেউ কেউ বলছিলেন- ‘আমাদের ট্যাক্স, ভ্যাট আদায়ের সময় যারা নিয়ম দেখায়, যারা জরিমানা আদায় করে তারা এখন ঘরে বসে টিভিতে আমাদের কষ্ট দেখে তামাশা করছে! এই তিলোত্তমা নগরে নাগরিক সুবিধা কি সামান্য বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকবে’!

কথা হলো- এই ‘তিলোত্তমা’ কী দেবে তোমায় আমায়! তার কি-বা দেবার আছে! রাজধানী ঢাকাকে বিশেষণ দিয়ে রূপসীর টোলপড়া গালের তিলের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর সৌন্দর্যের মোহে কবি-সাহিত্যকরা কত শত ছড়া-কবিতা লিখেন দিনরাত।

কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর কত মূল্যবান প্রসাধনী কিনে সাজানোর চেষ্টা করেন এর দেহকে। এর একই অঙ্গে উত্তর-দক্ষিণে কত বাহারি আলো শোভা পায়‍ কিন্তু দিনশেষে এত মেকাপ ‘রিমুভ’ করে ঘুমুতে যাওয়া উপায় নেই তার। এজন্য সে নিজেই নিজের সহ্যগুণ হারিয়ে ‘ভালনেরাবল’ বা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেদিকে কারো কোনো নজর নেই।

তবুও প্রতিদিন নতুন নতুন ফেসপাউডার, কাজল, ভারী ভারী গহনা পরানো হচ্ছে। তিলোত্তমার বুক চিরে এত ভারী গহনা পরানোর ফলে এর বুক দুরু দুরু করছে। কানের গহনা কখন কান ছিঁড়ে পড়বে, তার নিরাপত্তা নেই। এর প্রাকৃতিক পঞ্চন্দ্রিয় এখন বন্ধ হয়ে গেছে! এসব কথা আক্ষেপ করে বলছিলন এক প্রবীণ ঢাকাবাসী। তাঁর কাছে ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার প্রাকৃতিক পঞ্চন্দ্রিয় বন্ধ হওয়ার কথা হঠাৎ আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করলাম- সেটা কেমন!

মানুষের প্রাকৃতিক পঞ্চন্দ্রিয় বন্ধ হয়ে গেলে যদি দ্রুত চিকিৎসা করানো না যায়, তাহলে তার মৃত্যু অনিবার্য! তবে ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার পঞ্চন্দ্রিয় বন্ধ হলো কীভাবে! তিনি জানালেন, ধরুন, এর বাতাসের মান বছরের ১০ মাসই অস্বাস্থ্যকর থাকে। পথে হাঁটতে গেলে নাক, চোখ দিয়ে গরম পানি ঝরে। এখন বর্ষাকাল তাই বায়ুতে একটা স্বস্তি। এর মুখ খোলা। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, যা দিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ, ছাত্র, বেকার, ভাসমান মানুষ ঢুকছে। কেউ একবার ঢুকলে আর বের হতে চায় না।

তবে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো- এর নিচের ইন্দ্রিয় দুটো বর্ষাকালে হঠাৎ করে অকেজো হয়ে পড়ে। যেমন- ধরুন, ভূগর্ভস্থ সুয়্যারেজ লাইন ও নর্দমাগুলোর কথা। এই দুটি ‘তিলোত্তমা’র অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়। জুলাই ১৩, ২০২৪ তারিখ চার ঘণ্টার বৃষ্টির পানি যদি বাধাহীনভাবে সব নর্দমা দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়তো, তাহলে কি এই ভয়ঙ্কর জলজট হতো!

কিন্তু ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয় সদৃশ নর্দমাগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এর নর্দমাগুলোর ভেতরে পাইপ বসিয়ে এর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার উন্নয়ন কাজে এত বেশি প্রতিষ্ঠান জড়িত, তা গুনে শেষ করা যাবে না। তাদের মধ্যে কাজের সমন্বয় নেই। কে কখন কাটলো, কে ঢেকে রাখলো, আর কে নর্দমাগুলোর ভেতরে পাইপ বসিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিলো, তা ঠিকমতো হিসাব রাখার মতো সময় সুযোগ নেই কর্পোরেশনগুলোর।

সুতরাং একটু বৃষ্টি হলেই প্লাষ্টিক, মাটি, কাপড়ের টুকরো, কিচেন গার্বেজ ইত্যাদি দিয়ে এর নিচের ইন্দ্রিয় বা ময়লা নিষ্কাশনের নর্দমা বর্ষাকালে হঠাৎ করে অকেজো হয়ে পড়ে; যার নেতিবাচক প্রভাব এসে পড়ে রাজপথে, অলিতে-গলিতে, বাড়িতে, মার্কেটে। নগরের সব জায়গার সব কার্যক্রম হঠাৎ থৈ থৈ পানিতে সয়লাব হয়ে যায়।

এজন্য কর্পোরেশনগুলোর সার্বক্ষণিক ওয়াচটিম ও মটিভেশন কর্মসূচি থাকা দরকার। একেকটি সার্বক্ষণিক ওয়াচটিমের এক-দুইজন সদস্য একেকটি এলাকার ১০টি করে নর্দমার প্রবাহ পরিষ্কার আছে কিনা তা নজরদারিতে রাখলে এই জলাবদ্ধতা সহজেই নিরাময় করা যাবে!

জাপানের ট্রাফিক যেমন অফিসে বসেই রাস্তার চলন্ত গাড়ি ওয়াচ করে মাসিক বেতন বিলের সঙ্গে জরিমানার বিল কেটে ধরিয়ে দেয় তদ্রুপ আমাদের সিটি কর্পোরেশনের নর্দমা ওয়াচ টিমের দৈনন্দিন কার্যকলাপ সিসি ক্যামেরা ও ড্রোন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করে জরিমানার বিধান করা যেতে পারে।

‘তিলোত্তমা’ ঢাকার নির্মাণ কাজ সারাবছর জুড়ে চলে। কখনো শেষ হয় না। নির্মাতারা রাস্তার পার্শ্বে বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী, নুড়িপাথর বর্জ্য ফেলে স্তূপ করে রাখে। একটু বৃষ্টি হলে সেগুলো গড়িয়ে কাছাকাছির ড্রেন বন্ধ করে দেয়। বিভিন্ন পার্ক, পথঘাটের খোলা রেস্টুরেন্টে হরদম পলিথিন প্যাকেটে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। ফুটপাতের দোকান, দর্জিপাড়া ইত্যাদি থেকে প্লাষ্টিক ব্যাগ ও বেশি শক্ত বর্জ্য নর্দমার মধ্যে ফেলা হয়ে থাকে। ওয়াচটিমের মাধ্যমে সেগুলো নিয়মিত সরিয়ে ড্রেনের ময়লা পানির গতিপ্রবাহ দেখে প্রতিদিন রিপোর্ট নেওয়ার নিয়ম থাকা উচিত।
হয়ত অনেক নিয়ম-কানুন হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘তিলোত্তমা’র রাস্তায় যেখানে-সেখানে কাগজ, পলিথিন, ইটের টুকরা, আবর্জনার ছড়াছড়ি দেখে এসব কাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাইতো মনে হয়, মাত্র একবেলা বৃষ্টির পানিতে কেন এই বন্যা! গেল অর্থবছরে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সাতশ পঞ্চাশ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলে একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হয়েছে। তবু কেন নগর জুড়ে ভয়াবহ জলাব্ধতার দুর্ভোগ কিছুদিন পর পর ঘাড়ে চাপে! এর দায়ভার কার!

‘তিলোত্তমা’ ঢাকা যানজট, জলজট ইত্যাদিতে নিজেই পঙ্গু হয়ে অসাড় হয়ে পড়েছে। বুয়েটের আবাসিকের মতো জায়গায় নগর পরিকল্পনাবিদদের কোয়ার্টারের নিচতলাবাসী এবার জলজটকে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। তারা কেউ কেউ পাম্প দিয়ে ঘরের পানি সেচে বাইরে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কেউ সারারাত ঘুমাতে পারেননি। তাদের জন্যও উন্নত নাগরিক সেবা সে রাতে শূন্যের কোটায় নেমে গিয়েছিল।

‘তিলোত্তমা’ ঢাকায় প্রায় প্রতিবছর এই জায়গায় বার বার কাটাছেঁড়া করায় অতি উন্নয়নের ভারে সে ন্যুজ্ব হয়ে পড়েছে। যেমনটি ঘটেছিল পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের বেলায়। তাঁর দেহের বিভিন্ন অঙ্গে এত বেশি প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছিল যে, তিনি একসময় চরম হতাশ হয়ে ওষুধ গ্রহণ ছেড়ে দিয়ে একা একা বাঁচার জন্য নিঃসঙ্গ থাকতে চেয়েছেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি তার। এখন থেকে আমাদের ‘তিলোত্তমা’ ঢাকার অঙ্গে আর কাটাছেঁড়া না করাটাই উত্তম।

অসুস্থ ‘তিলোত্তমা’র ওপর একসঙ্গে অনেক ব্যাধি ভর করেছে। এ অবস্থায় তার কাছে আর কী নতুন সেবা চাওয়ার আছে আমাদের! তাই, ‘তিলোত্তমা’র ওপর আর শল্য চিকিৎসা না চাপিয়ে উল্লিখিত টোটকা দাওয়াই দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর আছে বলে মনে হয় না!

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন। E-mail: [email protected]

;

সাহিত্য পত্রিকা 'কথার কাগজ'র আত্মপ্রকাশ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সাহিত্য পত্রিকা 'কথার কাগজ'র আত্মপ্রকাশ

ছবি: সাহিত্য পত্রিকা 'কথার কাগজ'র আত্মপ্রকাশ

  • Font increase
  • Font Decrease

শ্রাবণ সংখ্যা আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে শিল্প ও সাহিত্যের ছোট পত্রিকা 'কথার কাগজ'-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।

শুক্রবার (১২ জুলাই) বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনে 'কথার কাগজ' শ্রাবণ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শাহানারা স্বপ্না, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্ঝর, স্টুডেন্ট ওয়েজ প্রকাশনীর প্রকাশক মাশফিক তন্ময়, কথার কাগজের প্রধান সম্পাদক কেতন শেখ, নির্বাহী সম্পাদক অয়ন আব্দুল্লাহ প্রমুখ। পত্রিকাটির বার্ষিক শ্রাবণ, কার্তিক ও ফাল্গুন তিনটি সংখ্যায় প্রকাশ হবে।

মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কথার কাগজের প্রধান সম্পাদক কেতন শেখ বলেন, 'করোনাকালীন ২০২০ সালে কথার কাগজের জন্ম। সে সময় কয়েকজন প্রবাসী আর দেশি লেখক অনলাইনে ব্লগের মাধ্যমে কথার কাগজের লেখালেখি শুরু করি। তরুণ সাহি- ত্যিকদের সঙ্গে প্রবীণ সাহিত্যিকদের লেখালেখির একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়ায় কথার কাগজ।

প্রকাশক মাশফিক তন্ময় বলেন, 'এক সময় সাহিত্য আন্দোলনের প্রধান বাহন ছিল ছোট পত্রিকা বা লিটলম্যাগ। কিন্তু নানা সংকটে লিটলম্যাগের কলেবর ছোট হয়ে গেছে। প্রকাশকরা অনেকেই অর্থসংকটে তাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে অনলাইনের এই যুগে ছাপা কাগজে কথার কাগজের যাত্রা তরুণ লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।'

শাহানারা স্বপ্না বলেন, 'আশা করি, পত্রিকাটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। শ্রাবণ সংখ্যার প্রথম দর্শনে মনে হচ্ছে এটি পাঠকদের সাহিত্যের খোরাক জোগাবে।'

ফরিদুল ইসলাম নির্ঝর বলেন, 'মানুষের ভাষার প্রতি টান থাকলে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে কাজ করা যায়, এর উদাহরণ কথার কাগজ। সম্পাদকম- গুলীর তিনজনই দেশের বাইরে থেকে এর যাত্রা শুরু করেন। আজকে দেশে এসেই তারা পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন করলেন।'

সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক আবু সাঈদ খান বলেন, 'আমাদের তরুণরা বিদেশ চলে যাচ্ছে, আর ফিরছে না। তবে কথার কাগজের সঙ্গে জড়িতরা বিদেশ থেকে সাহিত্য আর দেশের টানে ফিরে এসেছেন। অনলাইনের যুগে যখন অনেক পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এ অবস্থায় তারা কথার কাগজের প্রিন্ট ভার্সন নিয়ে এসেছেন। এটি অনেক ভালো লাগার।' নতুন পত্রিকাটি টিকিয়ে রাখতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

;

লেখক শেখ হাসিনা কোটিপতি হওয়ার পথে!



আবদুল হামিদ মাহবুব
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখালেখির হাত খুব ভালো। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হননি তখনই তার একাধিক বই প্রকাশ হয়েছে। সম্ভবত তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ‘ওরা টোকাই কেন’। ঢাকার আগামী প্রকাশনী থেকে বইখানা বের হয়েছিল। ওই প্রকাশনী থেকে আমারও দু’খানা ছড়ার বই প্রকাশ হয়। ১৯৯১ সালে আমার ‘ডিমের ভিতর হাতি’ যখন প্রকাশ হচ্ছিলো তখন আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি ভাই শেখ হাসিনার ‘ওরা টোকাই কেন’ এককপি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন।

বইখানা প্রথম না দ্বিতীয় সংস্করণের ছিলো সেটা মনে নেই। ওই বই কয়েকটি নিবন্ধের সংকলন। অধিকাংশ নিবন্ধেই শেখ হাসিনা তাঁর ভিতরের যন্ত্রণার কথা লিখেছিলেন। লিখেছিলেন দেশ ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর পরিকল্পনার কিছু কিছু ইঙ্গিত। পড়েছিলাম তো অনেক আগে। তারপরও লেখাগুলোর অনেক বিষয় মনে রয়ে গেছে। প্রতিটি নিবন্ধ পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার পারিবারিক ছোট লাইব্রেরিতে বইখানা গোছিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু আজ যখন ওই বই খোঁজতে লাগলাম, পেলাম না। অনুমান হচ্ছে আমার বইচোর কোন বন্ধু হয়তো এই বইখানা মেরে দিয়েছেন। অথবা বন্যা অতঙ্কে কয়েকেবার বাসার বইগুলো টানাটানি করার কারণে কোথাও হয়ত খুইয়ে ফেলেছি। তবে আমার ধারণা এই বইয়ের ক্ষেত্রে প্রথমটি ঘটেছে।

প্রধানমন্ত্রীর অনেক বইয়ের মতো ‘ওরা টোকাই কেন’ নিশ্চয়ই বহুল প্রচারিত হয়েছিল, বেরিয়েছিল অনেক অনেক সংস্করণ। আর বই সমূহের রয়্যারিটিও তিনি হাজার হাজার টাকা পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন প্রাপ্তি ঘটে থাকলে, আমি একজন লেখক হিসাবে অবশ্যই পুলকিত হই। আমি দেখেছি সেই ১৯৯১ সালের পর থেকে আগামী প্রকাশনীর প্রকাশনা ব্যবসারও অনেক উন্নতি হয়েছে। ব্যবসার উন্নতি ঘটার অর্থ প্রকাশকের উন্নতি ঘটা। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনি ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা অনেক অনেক ভালো হয়েছে।

পূর্বে দেখতাম একুশের বইমেলায় আগামী প্রকাশনী ছোট্ট স্টল নিত। এখন প্যাভিলিয়ন নেয়। লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্যাভিলিয়নের অঙ্গসজ্জা করা হয়। নিশ্চয় বইয়ের ব্যবসা ভালো হয়। সেকারণেই বইমেলার প্যাভিলিয়ন তৈরিতে বিনিয়োগও বেশি করেন। প্রতিবছরই আগামী প্রকাশনীর কোন না কোন বই কেনার জন্য পাঠকের লাইন পড়ে। পাঠক যখন যে কোন লেখকের বই কেনে, সেটা দেখে আমি একজন লেখক হিসাবে আনন্দিত হই। বইয়ের ব্যবসার উন্নতি হোক। প্রকাশকরা ভালো লাভ করুন, আমি মনে প্রাণে সেটা চাই।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, প্রকাশকের লাভ হলে আমার মতো মফস্বলের লেখকরা কি লাভমান হই? অবশ্যই যৌক্তিক প্রশ্ন। এর জবাব খুব সংক্ষিপ্ত। প্রকাশকরা যখন বই প্রকাশ করে লাভের মুখ দেখবেন, তখন তারা নতুন নতুন বই প্রকাশে আগ্রহী হবেন। নতুবা আমাদের মতো লেখকদের প্রকাশককে উল্টো টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করিয়ে নিতে হবে। এবং আমরা অনেকেই সেটা করছিও।

অনেকে আবার এও বলেন ডিজিটালের এই যুগে এখন আর কেউ বই কিনে পড়ে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে টুকটাক পড়েই তাদের পড়া শেষ করেন। সেই কারণে লেখকরা গাঁটের টাকা খরচ করে বই প্রকাশ করলেও সেগুলো বিক্রি হয় না। আমি এই অপবাদটা মানতে নারাজ। কারণ আমি দেখেছি কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই বইমেলা চলাকালে শত শত কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। আর যারা পড়ুয়া, তারা সারা বছরই খোঁজে খোঁজে রকমারি, প্রথমা, আগামী, শ্রাবণ, ইউপিএলসহ বিভিন্ন আনলাইন বই বিক্রয় প্রতিষ্ঠান থেকে বই আনান।

আমি মফস্বলের একটি শহরে থাকি। আমাদেরে শহরে বইয়ের দোকান আছে অনেক। সেগুলোতে স্কুল কলেজের পাঠ্য ও গাইড বই ছাড়া অন্য বই খুব কমই দেখা যায়। সৃজনশীল বলুন আর মননশীল বলুন, সেইরকম বইয়ের দোকান খুব একটা নাই। আমাদের শহরে প্রকাশনা ব্যবসার সাথে ‘কোরাস’ নামে একটি দোকান চালান বই পাগল এক যুবক মুজাহিদ আহমদ। তাঁর কোরাসেই আমাদের মত পাঠকের উপযোগী কিছু কিছু বই আসে। কিন্তু সবসময় কোরাসও আমাদের মতো পাঠকদের চাহিদার যোগান দিতে পারে না। তারপরও মন্দের ভালো হিসাবে দোকানটি টিকে আছে, টিকে থাক্।

আমাকে প্রায়ই অর্ডার করে ‘রকমারি’ থেকে বই আনাতে হয়। আমার আনানো বই ছাড়িয়ে আনার জন্য আমি নিজে প্রায়ই কুরিয়ার অফিসে যাই। আমি যেদিনই কুরিয়ার অফিসে গিয়েছি, দেখেছি কেবল আমার বই নয়, আমার মতো আরও অন্তত বিশ থেকে পঁচিশ জনের বইয়ের প্যাকেট এসেছে। কুরিয়ার অফিসের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, প্রতিদিনই এভাবে কিছু না কিছু বই নানাজনের নামে আসে। আর আমার নিজের চোখে দেখাটাকেওতো বিশ্বাস করতে হবে। মানুষ যদি বই নাই পড়বে তবে কেনো রকমারি কিংবা অনলাইনের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এতো এতো বইয়ের প্যাকেট আসবে? আমি বলবো বইয়ের পাঠক মোটেই কমেনি বরংচ বেড়েছে।

শুরু করেছিলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বইয়ের প্রসঙ্গ দিয়ে। বই প্রসঙ্গেই বলতে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গও এসে গেল। আমাদের শহরের সেই যে ‘কোরাসে’র কথা বলেছি; ক’দিন আগে এক দুপুরবেলা কোরাসে গিয়ে বই দেখছি। এসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুইজন প্রধান শিক্ষক কোরাসে এসে ঢুকলেন। তাদের দু’জনের হাতেই বেশ বড় সাইজের চারখানা করে বই। ওই দুই প্রধান শিক্ষক আমার পূর্ব পরিচিত। তাদের হাতে বই দেখে আমি উৎফুল্ল হলাম। কি বই? কোথা থেকে আনলেন? এমন প্রশ্ন করে বইগুলো দেখতে চাইলাম। দু’জনই ক্ষোভ প্রকাশ করে আমার সামনে টেবিলের উপর ধাম্ ধাম্ করে বইগুলো রাখলেন। একজন বললেন, ‘‘আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পড়ার জন্য এই বইগুলো নগদ চব্বিশ’ টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। বলুন ছাত্ররা এই বই পড়তে পারবে? তারা কি কিছু বুঝবে?’’ অন্য প্রধান শিক্ষকের চেহারায় তখনও বিরক্তি রয়ে গেছে। তিনি বললেন, ‘বইগুলো দেখুন, আপনি লেখক মানুষ, আপনিও কিছু বলুন।’

আমি তাদের আনা বইয়ের দিকে মনোযোগ দিলাম। দেখি চার চার আটখানা বই, দুটি বিষয় নিয়ে করা হয়েছে। প্রচ্ছদে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ছবি। বইগুলোর লেখক আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি বইয়ের নাম ‘সকলের তরে সকলে আমরা’। এই বইয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ ও ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত যে ভাষণগুলো দিয়েছেন সেগুলোর বাংলা ও ইংরেজি সংকলন। অপর বইয়ের নাম ‘আহ্বান’। এই বই করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত জাতির উদ্দেশে যেসব ভাষণ দিয়েছেন সেগুলো সংকলিত করে।

দু’খানা বইয়ের-ই কাগজ, ছাপা, বাঁধাই খুবই উন্নত মানের। প্রতি কপি বইয়ের মূল্য ছয়শত টাকা। প্রত্যেকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য প্রতিটি বইয়ের দুই কপি করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বিক্রি করেছে। প্রধান শিক্ষকরা এই বইগুলো কিনে নিতে বাধ্য। চারখানা বইয়ের জন্য প্রধান শিক্ষকদের দুই হাজার চারশত টাকা করে অফিসের সংশ্লিষ্ট ক্লার্কের কাছে পরিশোধ করতে হয়েছে। বুঝতে পারি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলেই এই দুই প্রধান শিক্ষক ক্ষুব্ধ। আমি শিক্ষকদের অনুমতি নিয়েই একটি বিদ্যালয়ের জন্য আনা চারখানা বইয়ের ছবি উঠিয়ে নিলাম। এই সময় কোরাসের কর্ণধার মুজাহিদ আহমদ বললো, ‘ভাই, আমি এমন একখান বই প্রকাশের অনুমতি পেলে কোটিপতি হয়ে যেতাম।’

আমি ওই দুই প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে বললাম; ‘প্রধানমন্ত্রীর বই প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, এটাতো আনন্দের বিষয়। কিন্তু আমারও প্রশ্ন হচ্ছে বইগুলো কি প্রাথমিকের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপযোগি? আর প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রিয় এইসব ভাষণ বই আকারে করাটা তো সরকারি খরচেই হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে দিতে হলে বিনামূল্যে দেওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সংকলন টাকার বিনিময়ে কিনতে হবে কেনো?’

তখন একজন বললেন; ‘ভাই, এই বই রাষ্ট্রিয় ভাবে হয়নি। ব্যবসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর আশপাশের এক দু’জন প্রকাশনীর মাধ্যমে প্রকাশ করে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা কামাই করে নিচ্ছেন।’ উনার কথায় আমি বইয়ের প্রথম দিকের পাতা উল্টালাম। ঠিকইতো প্রকাশক ‘জিনিয়াস পাবলিকেশন্স’-এর মো. হাবিবুর রহমান। দু’খানা বইয়েরই গ্রন্থনা ও সম্পাদনা মো. নজরুল ইসলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার (সচিব)। খেয়াল করে দেখলাম বই দু’খানার কপিরাইট শেখ হাসিনা। বুঝতে পারি যে এই বইগুলোর যে রয়্যালিটি আসবে সেটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীই পাবেন।

এখন একটা হিসাব করে দেখি। বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৬শ ২০টি। এই বই যখন প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বাধ্যতামূলক কিনতেই হবে, তা হলে ৪ কপি করে বই বিক্রি হবে উল্লেখিত বিদ্যালয়গুলোতে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪শ ৮০ কপি। এই বইয়ের মূল্য থেকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের হাতে টাকা আসবে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৮হাজার। বইয়ের কপিরাইট অনুযায়ী শতকরা ১৫ ভাগ রয়্যালিটি নিলেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী পাবেন ২ কোটি ৩৬ লাখ ২৩ হাজার ২শ টাকা। হিসাবে কিন্তু আমার মাথা ঘুরে গেছে। বই থেকে এমন অঙ্কের রয়্যারিটি এদেশে আগে কেউ পেয়েছেন কি না আমি জানি না।

আর এটাতো আমি কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিক্রির হিসাব দিলাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্য যখন বাধ্যতামুলক করা হয়েছে, তবে তো উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও এই বইগুলো এভাবেই বিক্রি হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত করলে আরো কতো কতো হাজার বেড়ে যাবে। আমি হিসাব বাড়ালে অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারি।

আমার ঘরেও একজন প্রধান শিক্ষক আছেন। লেখাটার পূর্ণতার জন্য তার কাছে কিছু তথ্য জানতে চেয়েছিলাম। তিনি খ্যাক্ করে উঠে বললেন, ‘স্কুল আমি চালাই। আমার স্কুলের জন্য কখন কি ভাবে কি কিনবো না কিনবো সেটা তোমাকে বলবো কেনো?’ দেখলাম ঘাটাতে গেলে আবার কি থেকে কি হয়ে যায়। তাই কথা না বাড়িয়ে লেখা শেষ করার দিকেই মনোযোগ রাখলাম।

আমরা যারা লেখক আমাদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, প্রকাশকরা লেখকদের ঠকান। তারা ঠিক মতো লেখকের পাওনা রয়্যালিটি পরিশোধ করেন না। তাই বলে কি প্রধানমন্ত্রীকে ‘জিনিয়াস পাবলিকেশন্স’-এর মো. হাবিবুর রহমান ঠকানোর সাহস করবেন? নিশ্চয় না। এই ভরসাতেই বলতেই পারি বই বিক্রির অর্থে আমাদের লেখক শেখ হাসিনা কোটিপতি হবার পথে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ছড়াকার

ইমেইল: [email protected]

;

দশ টাকার শোক



মনি হায়দার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে মানিব্যাগটা উল্টেপাল্টে দ্যাখে রজব আলী।

মানিব্যাগটা খুব পছন্দ হয়েছে তার। বিশেষ করে মানিব্যাগটার বাদামি রংটা। ব্যাগটা চামড়ার তৈরি। রজব আলী নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোকে। বোঝা যায় না কোন্ পশুর চামড়ায় মানিব্যাগটা তৈরি হয়েছে। মানিব্যাগটার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট কুঠরি। রজব আলী কল্পনায় দেখতে পায়- মানিব্যাগটার ভিতরে রাখা টাকায় ভেতরের কুঠুরিগুলো ভরে উঠেছে।

ব্যাগটা প্যান্টের পকেটে নিয়ে যখন হাঁটবে পিছটা ফুলে যাবে, মুহূর্তেই শরীরের কোষে কোষে একটা অন্যরকম অহমিকা অনুভব করে সে।

ভাই, মানিব্যাগটার দাম কতো ? রজব আলী মানিব্যাগঅলাকে জিজ্ঞেস করে।

ব্যাগঅলা রজব আলীর উপর মনে মনে চটে উঠেছে। সেই কতোক্ষণ থেকে ব্যাগটা উল্পেপাল্টে দেখছে। কেনার কথা বলছে না। অথচ রজব আলীর দেখার মধ্যে দুটো ব্যাগ সে বিক্রি করেছে। ফুটপাতের জিনিস এতক্ষণ নাড়াচাড়া কেউ করে না। ব্যাগঅলা রাগ করে কিছু বলতেও পারে না। যদি কেনে ?

আপনি নেবেন ? রজব আলীর দাম জিজ্ঞাসায় ব্যাগঅলা পাল্ট প্রশ্ন ছোড়ে। কারণ রজব আলীকে দেখে তার মনে হয় না এই লোক মানিব্যাগ কিনবে।

রজব আলী একটি বহুজাতিক কোম্পানির অফিসের পিওন। পরনের পোশাকে ঐ বহুজাতিক কোম্পানির পরিচয় আছে। ব্যাগঅলার ধারণা এইসব লোকজন সাধারণত মানিব্যাগ-ট্যাগ কেনে না। তাদের সামান্য টাকা আয়, কোনোভাবে সেই পয়সায় মানিব্যাগ কেনার মানসিকতা বা প্রয়োজনীয়তাও থাকে না।
নেবো।

ইতোমধ্যে ব্যাগঅলার সামনে দামি প্যান্টশার্ট পরা একজন ভদ্রলোক এসেছে। সঙ্গে তন্বী তরুণী। তাদের আসায় চারপাশের আবহাওয়ায় বিদেশী সেন্টের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। ভদ্রলোকের কাছে রজব আলী অযাচিতভাবে হেরে যায়। বাস্তবতার কারণে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে হয় তাকে।

তন্বী তরুণী ও ভদ্রলোক মিলে কয়েকটা মানিব্যাগ দেখে। বাছাই করে। অবশেষে তন্বীয় কথানুযায়ী ভদ্রলোক তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ নিয়ে চলে গেলো। মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে তারা মানিব্যাগ দেখলো, দাম করলো, কিনলো এবং চলেও গেলো। অথচ রজব আলী বিশ-পঁচিশ মিনিচের মধ্যে মধ্যে দামটাও জানতে পারলো না ! তারা চলে যাওয়ার পর রজব আলী ব্যাগঅলার কাছে যায়।

বললেন না কতো দাম ?

রজব আলীর দিকে আড়চোখে তাকায়, মানিব্যাগ আপনার পছন্দ হয়েছে?

পছন্দ না হলে দাম জিজ্ঞেস করবো কেনো ?

একশো আশি টাকা।

একশো আশি টাকা। রজব আলী মুখ থেকে বিপন্ন শব্দগুলো বের হয়।

বিরক্তি প্রকাশ করে ব্যাগঅলা, অবাক হওয়ার কি আছে? আপনার সামনেই তো দেখলেন তিনশো পঁচিশ টাকায় একটা মানিব্যাগ বিক্রি করেছি। ঠিক আছে আপনি ঐ সোয়াশ টাকাই দেন।
সোয়াশ টাকা একটা মানিব্যাগের দাম ! রজব আলীর বিস্ময় কোনো বাঁধা মানে না।

ব্যাগঅলা বুঝতে পারে রজব আলী এতো টাকায় ব্যাগ কিনবে না। সবাইতো ঐ টাকাঅলা ভদ্রলোক নয়, বেশি দাম-দর না করেই তাদের হাকানো দামেই কিনবে। রজব আলীরা তো মানিব্যাগই কেনে না। সেখানে রজব আলী যে কিনতে এসেছে সেটাই অনেক। ব্যাগঅলা মানিব্যাগ বিক্রি করলেও তার পকেটে মানিব্যাগ থাকে না। নিজের সঙ্গে রজব আলীর সাদৃশ্য দেখতে পায় ব্যাগঅলা। একই কাতারের ঠেলা-গুতা খাওয়া মানুষ তারা। লোকটাকে ঠকিয়ে লাভ নেই। হয়তো অনেক আশা করে সারা জীবনে একবার একটা মানিব্যাগ কিনতে এসেছে।

আপনি সত্যিই কি মানিব্যাগটা কিনবেন ? নরম কণ্ঠে ব্যাগঅলা জানতে চায়।

কিনবো বলেই তো পছন্দ করেছি। দাম জানতে চাইছি।

তাহলে শোনেন ভাই, অনেক্ষণ ধরে আপনি মানিব্যাগটা দেখছেন, ফাইনাল কথা বলে দিচ্ছি, মানিব্যাগটা আপনি আশি টাকায় নিতে পারবেন। আশি টাকার এক টাকা কমেও বিক্রি করবো না।
রজব আলীর এই মুহূর্তে ব্যাগঅলাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়। কোথায় একশো আশি টাকা, সেখান থেকে একশত পঁচিশ এবং সবশেষে পুরো শতকই নেই; কেবল আশি টাকা। সে পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে মানিব্যাগটা পকেটে রাখে। মানিব্যাগটা পকেটে রাখার সঙ্গে সঙ্গে রজব আলী নিজেকে একজন দামি মানুষ ভাবে। তার পকেটেও অনেকের মতো মানিব্যাগ আছে।

দীর্ঘদিনের একটা আকাক্ষা, একটা স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলো রজব আলীর। মানিব্যাগ কেনার একটা সিগারেট কেনে। সাধারণত সে সিগারেট টানে না। কিন্তু এই মুহূর্তে একটা সিগারেট টানার ইচ্ছে হলো তার। না, কেবল সিগারেটই নয়, একটা ঝাল দেওয়া পানও কিনলো এবং মুখে দিয়ে পরম আয়াসে চিবুতে লাগলো। সিগারেটটা ধরিয়ে পান চিবুতে চিবুতে রজব আলী একটা রিকশায় উঠলো। পর পর তিনটি কাজ সে করলো-যা সে খুবই কম করে। সিগারেট টানা, পান খাওয়া এবং রিকশায় করে বাসায় ফেরা। তার জীবনেএকটুকুই শ্রেষ্ঠ বিলাসিতা। রিকশা ছুটে চলেছে।

রজব আলীর মাথার কোষে, যেখানে স্বপ্ন বিলাসী বা ইচ্ছের রক্তকণিকা থাকে- সেখানে মানিব্যাগ কেনার শখ জাগলো প্রায় মাস তিনেক আগে। সে, অফিসের বড় সাহেবের ব্যক্তিগত পিওন। চা, চিনি, সিগারেট থেকে শুরু করে যা কিছু দরকার সবই আনে রজব আলী। দীর্ঘদিনের চাকরির কারণে সে বড় সাহেবের খুব বিশ্বস্ত ও অনুরাগী। অফিসে প্রতিদিন অনেক মেহমান আসে।

নানান কিসিমের মানুষের আনাগোনা বড় সাহেবের কাছে। এইসব মেহমান আসলেই বড় সাহেব বেল টিপে রুমের বাইরে হাতলবিহীন চেয়ারে অপেক্ষায় থাকা রজব আলীকে ডাকেন। রজব আলী ত্রস্ত খরগোশের মতো ভেতরে ঢোকে। কিন্তু ঢুকেই খরগোশের মতো মাথা উঁচু রাখতে পারে না। কোথাকার কোন এক অদৃশ্য অপরিমেয় শক্তি এসে তার মাথাটাকে নিচু করে দেয়।

তার দাঁড়ানো পর বড় সাহেব বড় অবহেলায়, নিপুণ নৈপুণ্যে, গাম্ভীর্যের কৌশলী পারম্পর্যে অবলীলায় প্যান্টের ডান দিক থেকে মোগল সম্রাটদের ক্ষমতায় মানিব্যাগটা বের করে টেবিলে রাখেন। মেহমানবৃন্দ গভীর অভিনিবেশে বড় সাহেবের কর্মকান্ড দেখতে থাকেন। মানিব্যাগটা টেবিলে রেখেই বড় সাহেব টেবিলের অন্যপ্রান্তে রাখা দামি সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে পরম আদরে রাখেন এবং তৎক্ষণাৎ লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট টানেন আয়েসের সঙ্গে।

সিগারেটে দু’-দিনটি টান দিয়ে দুই ঠোঁটের মাঝখানে আটকে রেখে মানিব্যাগটা তোলেন ডান হাতে। মানিব্যাগটা টাকার কারণে সবসময় পোয়াতি নারীর মতো ফুলে থাকে। বড় সাহেবের মানিব্যাগে টাকাগুলো অধস্তন, পরাধীনভাবে নিবিড় শুয়ে থাকতে পছন্দ করে। একহাজার, পাঁচশ, একশ, পঞ্চাশ টাকার অসংখ্য নোট সাজানো পাশাপাশি। দেখতে কতো ভালো লাগে ! রজব আলী দেখে। দেখেই তার আনন্দ।

বাম হাতে মানিব্যাগটা ধরে ডান হাতের দুই আঙ্গুলে বড় সাহেব বেশ কয়েকটা নোট বের করেন। একটা নোট রজব আলীর দিকে বাড়িয়ে দেন, শীগগির নাস্তা নিয়ে আয়।

রজব আলী বিনয়ের সঙ্গে টাকাটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। এবং নাস্তার আয়োজনে নিদারুণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এইভাবেই রুটিন চলছিলো। হঠাৎ মাস তিনেক আগে রজব আলীর মাথায় এই প্রশ্নটা উঁকি দেয়- বড় সাহেবের গাড়ি বাড়ি টাকা মান-সম্মান ক্ষমতা আছে। রজব আলীর কিছুই নেই। কিন্তু একটা মানিব্যাগতো থাকতে পারে। আর যাই হোক বড় সাহেবের মতো মানিব্যাগ থেকে সেও টাকা বের করে বাস কন্ডাকটর, চালের দোকানদার, মাছঅলা, ডালঅলাদের দিতে পারবে।

এই ভাবনা, স্বপ্ন এবং কল্পনার পথ ধরে কয়েকমাস যাবৎ রজব আলী চেষ্টা করে আসছে একটা মানিব্যাগ কেনার। নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। বৌয়ের শরীর খারাপ- ডাক্তারের টাকা দেওয়া, ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, বই খাতা কেনা- যাবতীয় সাংসারিক কাজের চাপে মানিব্যাগ কেনা সম্ভব হয়নি। আজকে সে বেতন পেয়েছে। এবং সমস্ত চাপ উপেক্ষা করে রজব আলী মানিব্যাগটা কিনেই ফেললো। আসলে কখনো কখনো একটু-আধটু রিস্ক নিতেই হয়। নইলে ছোটখাট স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ হবার নয়।

রিকশায় বসেই সে জামার বুক পকেট থেকে বেতনের বাকি টাকাগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে মানিব্যাগে। মানিব্যাগটার পেট ফুলে যায়। হাতে নিয়ে তার দারুণ ভালো লাগে। কিছুক্ষণ হাতে রাখার পর রজব আলী মানিব্যাগটাকে পিছনে প্যান্টের পকেটে রাখে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে প্যান্টের পিছন দিকটা ফিরে ফিরে দ্যাখে- কতোটা ফুলে উঠলো ? তেমন না। যেভাবে বড় সাহেবের পিছন দিকটা ফুলে থাকে, সে রকম নয়। রজব আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

রিকশা বাসার কাছে আসলে সে ভাড়া মিটিয়ে নেমে যায়। তার মনের মধ্যে ছোট সুখের একটা ছোট পাখি ডানা মেলেছে। গানের সুর ভাজতে ভাজতে রজব আলী দেড় কামরার স্যাঁতস্যাঁতে বাসায় ঢোকে। সে ঢুকলো সংসারে, তাতে সংসারের কিছু যায় আসে না। সংসারটা তার কাছে সীমাহীন অন্ধগলির মোড়। যেখানে অভাব দারিদ্র ক্ষুধার চাহিদা কুমিরের হা মেলে থাকে, সেখানে তার মতো একজন রজব আলীর আসা না আসায় কিছুই যায় আসে না। রজব আলী স্ত্রী মকবুলা বেগম চতুর্থ সন্তান, যার বয়স মাত্র তিনমাস তাকে মাই খাওয়াচ্ছে।

অন্যান্যরা মেঝেতে জটলা পাকাচ্ছে একটা পুরোনো ক্যারামের গুটি নিয়ে। মকুবলা বেগম ঘাড় ফিরিয়ে রজব আলীকে একবার দেখে আবার মাই দিতে থাকে। রজব আলী কি করবে ভেবে পায় না। সাধারণত বেতন নিয়ে বাসায় ফিরলে তরিতরকারি, চাল, ডাল, লবণ, তেল, সাবান, দুই এক প্যাকেট সস্তা বিস্কুট সঙ্গে নিয়ে আসে রজব আলী। আজকে একবারে অন্যরকম একটা জিনিস এসেছে- যার প্রতি তার নিজের মমতা অনেক। সংসারে অন্যদের প্রতিক্রিয়া কি হবে বুঝতে পারছে না।

শুনছো ? রজব আলী স্ত্রীকে ডাকছে।

কনিষ্ঠতম সন্তানের মুখ থেকে মাই সরাতে সরাতে সাড়া দেয় মকবুলা বেগম, কি ?

একটা জিনিস এনেছি।

মকবুলা বেগম সরাসরি তাকায় রজব আলীর দিকে, কি এনেছো ?

অদ্ভুত একটা হাসি রজব আলীল ঠোঁটে, একটা মানিব্যাগ।

দ্রুত ব্যাগটা বের করে মকবুলা বেগমের হাতে দেয় রজব আলী। ব্যাগটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্থানুর মতো বসে থাকে মকবুলা বেগম। একবার কোটরের চোখ দিয়ে তাকায় রজব আলীর দিকে। দৃষ্টি ফিরিয়েই ব্যাগটা অবহেলায় রেখে দেয় সে, মানিব্যাগ ফুটাতে কে বলেছে তোমাকে! বেতন পেয়েছো আজ না ?

বেতন পেলে আর মাথা ঠিক থাকে না। মকবুলা বেগমের লং প্লে রেকর্ড বাজা আরম্ভ হলো, বাসায় কিছু নাই। অফিসে যাবার সময় বললাম, ফিরে আসার সময় ছোট বাচ্চাটার জন্য এক কৌটা দুধ এনো। বড় ছেলেটার খাতা পেন্সিল নেই- নিয়ে এসো। তার কোনো খবর নেই। উনি নিয়ে এলেন মানিব্যাগ। ছেলেমেয়ে বৌয়ের মুখে তিন বেলা ভাত জোটাতে পারে না, উনি মানিব্যাগ কিনে ভদ্দরলোক হয়েছেন! কানার আবার স্বপ্ন দেখার শখ!

রজব আলীর মন শরীর স্বপ্ন আকাক্ষাগুলো শাঁখের করাতে কাটছে এখন। হায়, সংসারের জন্য ব্যক্তিগত দুই-একটা স্বপ্নও কি পূরণ করা যাবে না ! সকাল থেকে রাত পর্যন্ততো সংসারের সুখের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। সামান্য একটা মানিব্যাগের জন্য স্ত্রী এমনভাবে শ্লেষের কথা বলে-একেক সময় মনে হয় রজব আলী আত্মহত্যা করে। পারে না।

স্ত্রীর শান দেওয়া কথার বান থেকে আপাতত রক্ষা পাবার জন্য না খেয়ে বাইরে চলে আসে রজব আলী। এভাবেই সে অক্ষমতার জ্বালা, বেদনা ও ক্ষরণকে তাড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে। রাস্তায় দোকানে এখানে সেখানে ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে আবার মকবুলা বেগমের সংসারেই ফিরে আসে। পরের দিন রজব আলী যথারীতি অফিসে।

অফিসের লোকজনের কাছে মানিব্যাগটা দেখায়। কেউ দেখে, কেউ আগ্রহবোধ করে না।

বল তো বারেক, অফিসের আরেকজন পিওনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে রজব আলী- মানিব্যাগটা কেমন হয়েছে ?

বারেক মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে- ভালো। খুব ভালো হয়েছে। কতো টাকায় কিনেছো ?
প্রচ্ছন্ন গর্ব রজব আলীর, তুই বল।

আমি কেমনে বলবো ?
অনুমানে।
বারেক কয়েক মুহূর্ত ভেবে বলে, ত্রিশ-চল্লিশ টাকা।

তোর বাপের মাথা! ধমকে ওঠে রজব আলী। এ রকম একটা মানিব্যাগ জীবনে চোখে দেখেছিস ? কেমন রং এটার ! ভেতরে কতোগুলো ঘর আছে জানিস ! একহাজার, পাঁচশ, একশো, পঞ্চাশ টাকার নোট রাখার আলাদা আলাদা জায়গা আছে। তাছাড়া এই ব্যাগটা বিদেশী। দেশী না।

তোমার মানিব্যাগের যতো দামই থাক, তুমি বাপ তুলে কথা বলবে ? বারেকের আত্মসম্মানে সামান্য ঘা লাগে।

বলবো না, হাজার বার বলবো। এতো শখ করে একশ টাকা দিয়ে একটা মানিব্যাগ কিনলাম। আর তুই কিনা বলিস মাত্র ত্রিশ-চল্লিশ টাকায় কিনেছি ! জানিস, এই রকম মানিব্যাগ আছে আমাদের বড় সাহেবের।

হতেই পারে। আমার তো মানিব্যাগ নেই। কখনো ছিলোও না। তাই দাম জানি না। কিন্ত তুমি একটা একশো টাকা মানিব্যাগে জন্য বাবা তুলে কথা বলতে পারো না-

বারেক যখন মানিব্যাগ সংক্রান্ত তর্কে হেরে যাচ্ছিলো, তখনই বড় সাহেব অফিসে ঢোকেন সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু মেহমান নিয়ে। বারেক চট্ করে সরে যায়। রজব আলী দ্রুত দরজা খুলে দাঁড়ায়। বড় সাহেব সঙ্গীদের নিয়ে রুমে ঢোকেন। রজব আলীকে চা আনতে বলেন বড় সাহেব। শুরু হয় রজব আলীর দৌড়।

কয়েকদিন পর বড় সাহেব অফিসে কয়েকজন ক্লায়েন্টের সামনে বসে রজব আলীকে ডাকেন, রজব আলী?

জ্বী স্যার ?
তোমার হয়েছে কি ?

রজব আলী ভেবে পায় না তার কোথায় কখন কি হয়েছে ? ডানে বামে উপরে নিচে তাকায় সে, কই স্যার-কিছু হয় নাইতো।
তোমার হাতে মানিব্যাগ কেনো ?

এই কথার কি জবাব দেবে রজব আলী? হঠাৎ মগজের কোষ কোনো কাজ করে না। সে বুঝে উঠতে পারে না- তার হাতে মানিব্যাগ থাকলে বড় সাহেবের অসুবিধা কি ? কক্ষের সবাই রজব আলীর দিকে চেয়ে আছে। এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। হঠাৎ রজব আলী উপলব্ধি করতে পারে- মানিব্যাগটা থাকার কথা প্যান্টের পকেটে। হাতে নয়। এবং তার আরো মনে পড়লো মানিব্যাগটা কেনার পর থেকে, বিশেষ করে অফিস করার সময় মানিব্যাগটা কারণে-অকারণে তার হাতেই থাকে। কেন থাকে ?

সে কি সবাইকে তার সদ্য কেনা মানিব্যাগটি দেখিয়ে তৃপ্তি পেতে চায় ? যা প্রকারান্তরে অক্ষম অথর্ব মানুষের করুণ মনোবিকৃতি ? নিশ্চয়ই তার অবস্থা দেখে বড় সাহেব, তার পরিষদবর্গ, অফিসের লোকজন হাসছে। রজব আলী নিমিষে নিজেকে বায়ুশূন্য ফাটা একটা পরিত্যাক্ত বেলুন হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করে। লজ্জায় বালুর সঙ্গে সে মিশে যেতে চাইছে। কিন্তু মানুষের পক্ষে মুশকিল হচ্ছে- সে ইচ্ছে করলেই বালু বা বায়ুর সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। মানুষ হিসাবে তাকে অনড় ও অবিচল থাকতে হয়।

বড় সাহেবের মুখে অদ্ভুত হাসি- রজব ?

জ্বী স্যার ?
মানিব্যাগটা কবে কিনেছো ?

রজব আলী জবাব দেয় না। দিতে পারে না। ভেতরের কে একজন যেন রজব আলীকে থামিয়ে দিয়েছে। যে রজব আলীর ওষ্ঠ জিহ্বা কণ্ঠ ভেতরের ক্ষুধিত শক্তিকে পাথর বানিয়ে জমাট করে রেখেছে। প্রাণপণে চেষ্টা করছে কথা বলতে। পারছে না। সে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে। কথা বলছো না কেন ? বড় সাহেবের কণ্ঠে এখন কর্তৃত্ব ও অপমানের সুর।

ঢোক গিলে জবাব দেয় রজব আলী- কয়েক দিন আগে।

কতো টাকায় ?

একশ টাকা।

তাই নাকি ! দেখি, বড় সাহেব হাত বাড়ান।

রজব আলী সারা জীবনের সমস্ত অভিশাপ নিজের মাথায় ঢালে-কেন সে মানিব্যাগ কিনতে গেলো ? কিনলোই যদি তাহলে পকেটে না রেখে হাতে রাখার প্রয়োজন হলো কেন ? দেখাতে চেয়েছিলো বড় সাহেবকে ? বড় সাহেবের মানিব্যাগ থাকলে পারলে তার থাকবে না কেন ? প্রতিযোগিতা ? কি অসম প্রতিযোগিতা ? কি ভয়ংকর গ্লানিকর পরাজয় !

কই দাও, বড় সাহেবের হাতটা তখনো বাড়ানো। নিন।

রজব আলী ব্যাগটা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়।

কোথায় যাও? তোমার মানিব্যাগ নিয়ে যাও-

আর যেতে পারে না সে কক্ষের বাইরে। কক্ষের ভিতরে রজব আলীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বড় সাহেব মানিব্যাগটাকে উল্টেপাল্টে দেখেন। কক্ষের অন্যান্য সবাই বড় সাহেবের হাতের ব্যাগটাকে তীর্যক চোখে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে। সে হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে তীক্ষ্ন কাঁটা। কাঁটায় বিষ। যা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করছে রজব আলী। এছাড়া তার উপায়ও নেই।

রজব আলী !

বড় সাহেবের ডাকে চোখ তুলে তাকায় সে, স্যার!

নাও তোমার মানিব্যাগ। ব্যাগটা ভালোই কিনেছো।

হাত বাড়িয়ে ব্যাগটি নিয়ে রজব আলী দরজা খুলে নিমিষে বাইরে চলে আসে। দরজা দ্বিতীয়বার বন্ধ করতে পারে না, তার আগেই বড় সাহেব এবং অন্যান্যদের হাসির ছুরি তীব্র অপমানে রজব আলীর কান এবং মর্মের মূলে আঘাত হানে। মনে হচ্ছে তাদের হাসির হলকা তাকে শান দেয়া ছুরির মতো কাটছে। আর রজব আলী নিজের রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

রজব আলী মানিব্যাগ আর হাতে রাখে না। প্যান্টের পকেটেই রাখে। মাস শেষে মানিব্যাগের ছোট্ট খোপে খুচরো কয়েকটা মাত্র টাকা দেখতে পায় রজব আলী। মানিব্যাগে টাকা নেই, একটা পরিত্যাক্ত রুমালের মতো মনে হয় মানিব্যাগটাকে। এবং রজব আলী বুঝতে পারে- বড় সাহেবের মতো মানুষদের সঙ্গে রজব আলীরা কোনদিন, কোনোকালে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারবে না।

মাস শেষ, রজব আলীর মানিব্যাগের টাকাও শেষ। অথচ বড় সাহেবের মানিব্যাগে মাসের প্রথম দিকে যতো টাকা ছিলো বা থাকে, এখনো সে রকমই আছে। কমে না। বরং বাড়ে। তাহাদের টাকা বাড়তেই থাকে। বাড়বে আমৃতকাল।

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে রজব আলী।

দীর্ঘনিঃশ্বাস এবং পুঞ্জিভূত ক্ষোভ নিয়ে নিত্যদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছে রজব আলী। প্রতিদিনের জীবনাচারের সঙ্গে রজব আলী বেশ মানিয়ে নিয়েছে। মানিব্যাগটা তার সঙ্গে থাকছে প্রতিদিনকার মতো- যেমন তার পকেটে থাকছে একটি রুমাল, একটি চিরুনি।

মাসের প্রথম দিকে মানিব্যাগটা ভরা থাকে, মাঝখানের দিকে কমতে কমতে টাকা অর্ধেকেরও কমে এসে পৌঁছে এবং এই কমার গতিটা বলবৎ থাকে গাণিতিক হারে।

মাসের শেষের দিকে রজব আলী মানিব্যাগ বহন করার আর কোন যুক্তি খুঁজে পায় না। কারণ ব্যাগের তলায় পাঁচ-দশটা টাকা পড়ে থাকে বড় অযত্নে, বড় অবহেলায়। কখনো কখনো রজব আলীর মনে হয়- মানিব্যাগটা বোধহয় তাকেই উপহাস করছে। মাস খানেক পরে একদিন।

রজব আলী অফিস থেকে ফিরছে। মাস শেষের দিকে। বাসে প্রচুর ভিড়। বাসে ওঠা মানে জন্তুর খাঁচায় ওঠা। জীবন যে কতো অবাঞ্ছিত, বাসে উঠেই সেটা বুঝতে পারে রজব আলী।

বাস থেকে নেমেই হাত দেয় প্যান্টের পকেটে। পকেটটা খালি, বুকটা ধড়াস ধড়াস করে, মানিব্যাগটা নেই ! এতো সাবধানে থাকার পরও মানিব্যাগটা নিয়ে গেলো?

রজব আলী কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মানিব্যাগটা পকেটমার নিয়ে গ্যাছে। রজব আলী মানিব্যাগটার জন্য ভাবছে না। ভাবছে মানিব্যাগের সর্বশেষ পুরোনো ময়লা দশটি টাকা...। ওই দশ টাকা থাকলে আরো দুই দিন বাস ভাড়া দিয়ে অফিসে আসা-যাওয়া করতে পারতাম।

;