আবুল হাসনাত : প্রতিষ্ঠান ছিল যার সাধনা



ড. কাজল রশীদ শাহীন
আবুল হাসনাত

আবুল হাসনাত

  • Font increase
  • Font Decrease

আবুল হাসনাত সম্পাদিত পত্রিকা কালি ও কলমের তরফে তরুণ লিখিয়েদের জন্য প্রবর্তন করা হয় কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার। ২০০৮ সালে প্রবর্তিত পুরস্কার শুরুর দিকে বহুজাতিক একটা কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে দেয়া হলেও পরবর্তীতে একক উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। আবুল হাসনাত বেঁচে থাকতে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে একটা বিষয় প্রায়শ উচ্চারিত হত। পুরস্কার প্রাপ্ত তরুণ কবি নিজের অনুভূতি প্রকাশে হাজির করতেন কমন একটা অভিযোগ। কালি ও কলম পুরস্কার পাওয়াটা উনার জন্য ভীষণ আনন্দের হলেও বেদনার বিষয় হল কালি ও কলম পত্রিকা কখনো উনার লেখা প্রকাশ করেননি। বেদনার এই অভিজ্ঞতা বিনিময় করার শানে নযুল হল সম্পাদক আবুল হাসনাতের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছোঁড়া।

তরুণ কবি বুঝতে অপারগ যে, কবিতা প্রকাশ আর কাব্যগ্রন্থের জন্য পুরস্কার পাওয়া দুটো আসলে দুই বিষয়। পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রে সম্পাদকের কোন প্রকার ভূমিকা নেই, যদি থাকে সেটাও খুবই গৌন, ধর্তব্যের মধ্যে না রাখায় যুক্তিযুক্ত ও শ্রেয়। পুরস্কার প্রদান করা হয় বিচারকদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক। উনাদের সিদ্ধান্তেই চূড়ান্ত হয় কে বা কারা পাচ্ছেন ওই বছরের পুরস্কার। কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পাদক হিসেবে উনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কবিতা দিয়েই বিচারের ক্ষমতা রাখেন কোন কবিতা প্রকাশিত হবে আর কোন কবিতা প্রত্যাখ্যাত হবে। এক্ষেত্রে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত কোনো লেখক-কবি-সাহিত্যিকের বিপক্ষে যেতেই পারে। সেটাই সত্য, সম্পাদকীয়তার বাস্তবতা ও প্রসাদ গুণ। সম্পাদকের বিবেচনায় লেখক নয়, লেখা মুখ্য ভূমিকা পালন করে যে, আদৌ সেটা আলোর মুখ দেখবে, নাকি অমনোনীত হবে। লেখক বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃতি সাহিত্য সম্পাদক কখনোই সম্পাকীয়তার বাছ-বিচার নিয়ে করেন না।

আবুল হাসনাত ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া একজন সম্পাদক। ফি-বছরের ওই সব অভিযোগ যে উনি ধর্তব্য জ্ঞান করেননি, তার প্রমাণ মেলে একই অভিযোগ একাধিকবার উচ্চারিত হওয়ায়। আবুল হাসনাতের সম্পাদকীয়তার সৌন্দর্য এখানেই। গল্প কবিতা প্রবন্ধ সেটা যাই-ই হোক না কেন নির্বাচনের ক্ষেত্রে কখনোই দ্বিধান্বিত কিংবা সংশয়িত ছিলেন না। বরং যারা এসব অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং মান্যতা দেন, উভয়ই বিষয়টা গুলিয়ে ফেলেন এবং আবেগবশত একটা অভিযোগ হাজির করেন।

আবুল হাসনাত সাহিত্য পাতা ও সাহিত্য ম্যাগাজিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে নিজেকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। উনার অবর্তমানে এসময়ে এসে ওরকম তুলনীয় দ্বিতীয়জন কোথায়? সংবাদ এর সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন আড়াশ দশক। কালি ও কলমের দায়িত্বে ছিলেন দেড় যুগ। এসবেরও আগে যুক্ত ছিলেন গণসাহিত্য সম্পাদনার সঙ্গে। সাংবাদিকতা-সম্পাদকীয়তায় আবুল হাসনাত নানা কারণে বিশেষভাবে স্মরণীয় ও বরণীয়। আমাদের সংবাদপত্র জগতে এরকম কীর্তিমানের সংখ্যা অপ্রতুল, কিন্তু অনুপস্থিত নয়। তিনি যে কারণে ব্যতিক্রম ও বিরলপ্রজদের অন্তর্ভুক্ত, তার দৃশ্যমান উপস্থিতি মিলেছে খুব কম প্রতিভাধরদের মধ্যেই।

আবুল হাসনাত প্রতিষ্ঠানপ্রেমী ছিলেন। এই প্রেম ছিল তার সাধনার মন্ত্রতুল্য। তিনি প্রতিষ্ঠানকে বড় করতে চেয়েছেন। সারা জীবন বুঁদ হয়ে ছিলেন প্রতিষ্ঠানকে বড় করার সাধনায়। মনে প্রাণে চাইতেন প্রতিষ্ঠান বড় হোক। এবং এই প্রত্যয় বাস্তবায়নে নিজের নিবেদন যতটা দেওয়া সম্ভব, তার পুরোটা পূরণে তিনি সচেষ্ট ছিলেন। নিজের কাজ দিয়ে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হেঁটেছেন নিরলস এক যোদ্ধার ভূমিকা। নিজেকে ছাড়িয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় করার গুণ আবুল হাসনাতকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র সত্তায় দাঁড় করিয়েছে।

বাঙালির প্রতিষ্ঠান ভাবনায় একটা সংকটের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। এ কারণে আমাদের শতায়ু প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। অথচ প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে ব্যক্তির বিকাশ দুরূহ হয়। প্রতিষ্ঠানের বাইরে যখন কারও বিকাশ ও নির্মিতি সম্ভব হয় তখন সেটা সন্দেহাতীতভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বিশেষ। একারণে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ন্যায্যতার সঙ্গে পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিষ্ঠান যদি দাঁড়িয়ে যায় এবং নিয়ম কানুনে, নৈতিকতার পরিচয় দেয়, তাহলে ব্যক্তির বিকাশ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায় এবং সেটা নিশ্চিতও হয়। আমেরিকায় ট্রাম্পের বিদায়ের আগে নানামুখী সংকট হাজির হলেও শেষাবধি যে গণতন্ত্রের বিজয় সুনিশ্চিত হল, তার পেছনে মুখ্য কারণ দেশটিতে প্রবলভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতার চর্চা জারি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের শক্তিই তার গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি কেবল গণতন্ত্রকে সংহত করে না, ব্যক্তি-সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করে। মানুষের মৌলিক অধিকার পুরণের পাশাপাশি জীবনমানেও স্বস্তি ও স্বাধীনতা এনে দেয়। বেদনা ও পরিহাসের বিষয় হল, আমাদের এখানে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভ্যাস নেই। আঙুলের কড়ে গুণে এক প্রজন্মের কাছাকাছি কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি বয়সী কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে আশা জাগানিয়া সেসব প্রতিষ্ঠানেও প্রাতিষ্ঠানিকতার চর্চা প্রত্যাশিত মাত্রার নয়। ভক্তিবাদও সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা। আবুল হাসনাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সাধনাকে আমরা যদি গভীরভাবে অবলোকন করি, তাহলে স্পষ্টরূপে ধরা দেয় প্রতিষ্ঠানের শক্তির ওপর তার আস্থা ও প্রতীতী। খুব বড় পরিসরে বিকশিত করার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উনার যোগসূত্রতা ছিল না। এই সত্যকে মান্যতা দিয়েই বলতে হয়, প্রতিষ্ঠান ছোট কিংবা বড়’র চেয়ে উনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাজ। সেই কাজকে তিনি এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন যার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতার্থে প্রতিষ্ঠানই বিকশিত হয়েছে। সময় পরিক্রমায় হয়েছে দিবালোকের মতো সত্য। প্রতিষ্ঠান বড়ো হয়েছে, আবুল হাসনাতও কীর্তিমান হয়েছেন।

সংবাদ দৈনিক পত্রিকা হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে পালন করেছে উজ্জ্বল ভূমিকা, যা সর্বজনকর্তৃক স্বীকৃত ও প্রশংসিত। কিন্তু একথা তো সত্যি, সংবাদ এর ‘সাহিত্য সাময়িকী’ মূল পত্রিকার চেয়েও গুন-মান ও জনপ্রিয়তা বিচারে এগিয়ে ছিল। সংবাদ ‘সাহিত্য সাময়িকী’র এই যে অর্জন এর পেছনে মালিক পক্ষ, সম্পাদক-প্রকাশক ও সাংবাদিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ সকলেরই ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। যা আমলে নেয়ার পরও এই সত্য সর্বজনবিদিত যে, এই অর্জন সম্ভব হয়েছে আবুল হাসনাতের সাহিত্য সম্পাদকীয়তার বিরল নিষ্ঠা- প্রেম ও প্রতিভার মিশেলে। উনার সাধনার শক্তি এতটাই উচ্চকিত ছিল যে, নির্দিষ্ট একটা কক্ষের দায়িত্বে থেকেও পুরো স্থাপনাকেই করেছেন আলোকিত। সাহিত্য সাময়িকীর কারণেই সংবাদ এর গ্রহণযোগ্যতা ও পাঠকপ্রিয়তা ক্রম বর্ধিষ্ণু হয়েছে।

ড. কাজল রশীদ শাহীন 

সাহিত্য সাময়িকীর মতো করে একই অভিমত কালি ও কলম পত্রিকার ক্ষেত্রেও উচ্চারণ করা যায়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন নানা কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষণা করে আসছে। কালি ও কলম উনাদের অনেকগুলো কার্যক্রমের একটি। আবুল হাসনাতের সম্পাদকীয়তার প্রসাদ গুণে কালি ও কলম হয়ে উঠেছিল বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম। দেশে শুধু নয় পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় এবং বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষি মানুষের মাঝেও পত্রিকাটি বিশেষ সমীহ ও প্রশংসার জায়গা করে নিয়েছিল।

আবুল হাসনাতের অভিভাবকত্বে উপর্যুক্ত অর্জন সম্ভব হওয়ার এষণায় প্রধানত একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি প্রতিষ্ঠানকে কখনোই নিজের কিংবা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে কাজে লাগাননি। প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত লাভালাভের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেননি। উনি যখন সংবাদ এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে খ্যাতির মধ্যগগণে তখন দেশে পত্রিকার সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে কম। সংবাদ ‘সাহিত্য সাময়িকী’ অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক প্লাটফর্ম। বিভিন্ন ক্ষেত্রের পেশাজীবীরা উন্মুখ হয়ে থাকতেন লেখা প্রকাশের জন্য। চাহিবামাত্রতো বটেই, উপঢৌকন দিয়েও সুযোগ খোঁজা ব্যক্তির অভাব ছিল না। কিন্তু তিনি সেসবের পথে হাঁটেননি। লেখা নির্বাচনে পালন করেছেন সত্যপুত্র যুধিষ্ঠিরের ভূমিকা। প্রকৃত লেখকদের সঙ্গে উনার ছিল হার্দিক সম্পর্ক। প্রয়োজনীয় লেখাটি যোগ্য লেখক দিয়ে লিখিয়ে নিতে উনার জুড়ি ছিল না। পাশাপাশি এটাও জানতেন এবং সর্বদায় মেনে চলতেন লেখক-সম্পাদক সম্পর্ক আদৌ কতটুকু হওয়ার আর কতোটা হওয়ার নয়। লেখক-সম্পাদক সম্পর্কে সেতুবন্ধ থাকা জরুরি আবার দূরত্ব থাকাটাও অপরিহার্য। আবুল হাসনাত এই জায়গাটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। লেখক, তা তিনি যতই জনপ্রিয় কিংবা ক্ষমতাধরই হন না কেন, উনি যেন সাহিত্য সম্পাদককে পরিচালিত করার ধৃষ্টতা কিংবা বাঞ্ছা প্রকাশ না করেন, সেই সাহস- যোগ্যতা- নৈতিকতা ও অপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকে নেয়ার ক্ষমতায় পারঙ্গম ছিলেন তিনি।

এ কারণে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে সিকান্দার আবু জাফর, আহসান হাবীবের সমতুল্য ও কিংবদন্তি খ্যাতি অর্জন করলেও উনার ওপর গোস্বা করার লেখক-কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যাও কম ছিল না। নন্দিত হলেও নিন্দিতও ছিলেন, যা জ্যেষ্ঠ দুই কিংবদন্তির ক্ষেত্রে তেমন নেই।

আবুল হাসনাতের সাধনা, প্রতিষ্ঠান প্রেম, ও সম্পাদকীয়তার সাহস ও সৌন্দর্যকে আবিষ্কার ও অন্বেষণ করতে হলে ‘গোস্বা’ ও ‘নিন্দিত’ হওয়ার কার্যকারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। ওরকম ‘গোস্বা’ ও ‘নিন্দিত’ হওয়াকে উপেক্ষা করতে পেরেছেন বলেই আবুল হাসনাত স্বাধীন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সাময়িকী, সাহিত্য ম্যাগাজিনের একজন সার্থক সম্পাদক হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

আবুল হাসনাত কবিতা লিখতেন। কবি নাম ছিল মাহমুদ আল জামান। ‘জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক’, ‘কোনো একদিন ভুবনডাঙায়’, ‘ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বিড়াল’ উনার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন, ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’, ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’, ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে’, ‘রানুর দুঃখ-ভালোবাসা’ প্রভৃতি গ্রন্থ। ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’র জন্য ১৯৮২ সালে পান অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। শিল্প সমালোচনা ও প্রবন্ধ সাহিত্যে অর্জন করেছিলেন নিজস্ব এক শৈলী। ‘সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য’ এবং জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য’ গ্রন্থ যার উজ্জ্বল প্রতিভূ।

আবুল হাসনাতের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ১৯৪৫ সালের ১৭ জুলাই এই শহরেই জন্মগ্রহণ করেন। আয়ুষ্কাল ছিল ৭৫ বছর। ২০২০ সালের ১ নভেম্বর মারা যান। বামপন্থা ও প্রগতির প্রতি নিবেদিত ছিলেন আমৃত্যু। সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ এর সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

শেষ পর্যন্ত উচ্চকিত ছিল উনার কবি ও সম্পাদক জীবন। এ ক্ষেত্রেও এগিয়ে রেখেছিলেন সম্পাদকীয় সত্তাকে, যার মধ্যে দিয়ে তিনি মূলত বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। বিশ্বাস করতেন যে জাতির বড় বড় প্রতিষ্ঠান নেই সেই জাতি- সেই দেশ বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়াতেও পারেন না।

আবুল হাসনাত ওরফে মাহমুদ আল জামান কবি ও লেখক জীবনকে সম্পাদকের জীবনের সঙ্গে জড়াননি কখনোই। দুটোকে আলাদা রেখেই মিটিয়েছেন যার যার প্রেম ও প্রত্যাশা। সাধন করেছেন ব্যক্তির দায়িত্ব ও কর্তব্য। পূরণ করেছেন জীবনের লক্ষ্য। পূর্ণতা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের চাওয়া পাওয়া। যার মধ্যে দিয়ে দেশ ও জাতি পেয়েছে দিশা। প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে নতুন প্রজন্ম।

ড. কাজল রশীদ শাহীন: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও গবেষক।
[email protected]

   

বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন: পূর্ণ স্বীকৃতি কতদূর?



প্রদীপ কুমার দত্ত
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমরা বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন বলতেই বুঝি বৃটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে ১৯৪৮-এ শুরু হওয়া এবং বায়ান্নর অমর ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে। একুশে ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি দিক নির্দেশক দিন। সেই আন্দোলনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে দানা বাঁধে স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলন। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অবর্ণনীয় কষ্ট আর সমুদ্রসম আত্মত্যাগ এবং অসীম বীরত্বের ফলশ্রুতিতে আমরা পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

এর বহু পরে, বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, বাংলাদেশী কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম এর নেতৃত্বে পৃথবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের নিয়ে মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অফ দি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয় কানাডার ভ্যাংকুভারে। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় দিনটি বিশ্বসভায় আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনের জাতিসংঘ ঘোষিত অঙ্গিকার বিশ্বের প্রতিটি ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিদ্যমান প্রায় ৭০০০ ভাষার একটিকে ও আর হারিয়ে যেতে না দেয়া। ইতিমধ্যে আধিপত্যবাদের কারণে ও সচেতন মহলের সচেতনতার অভাবে বহু ভাষা, সাথে সাথে তাদের সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে।

কাজেই আমাদের বুঝতে হবে, ভাষা আন্দোলনের স্বর্ণখচিত ইতিহাস ও সাফল্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেবলমাত্র বাংলাদেশের ((তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) বাঙ্গালীরাই ভাষার জন্য সংগ্রাম করা ও প্রাণ দেয়া একমাত্র জাতিগোষ্ঠী নই। অর্ধ সহস্রাব্দের আগে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দক্ষিণ আমেরিকার মায়া,আজটেক,ইনকা নামের তৎকালীন উন্নত সভ্যতার জাতিসমূহকে জেনোসাইডের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে।প্রতি মায়া লোকালয়ে একটি করে পাঠাগার ছিল। এইরকম দশ হাজার লোকালয়ের পাঠাগারের সব বই তারা ধ্বংস করে দেয়। আজকের দিনে মাত্র আদি মায়া ভাষার তিনখানা বই (মেক্সিকো সিটি,মাদ্রিদ ও ড্রেসডেনে) সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধ করেও মায়ানরা পাঠাগারগুলো বাঁচাতে পারেন নি। সাথ সাথে ক্রমে ধ্বংস হয়ে যায় তাঁদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা।

বাংলাভাষী জনগণের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় উল্লেখ্যোগ্য অবদান রয়েছে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাঁওতাল পরগণার অন্তর্গত মানভূমের বাঙ্গালীদের। বহু বছর সংগ্রাম,রক্ত ও জীবনের মূল্যে তাঁরা তাঁদের দাবি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনের সূচনা আসামের কাছাড়ে।বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া প্রথম মহিলা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ এগার তরুন প্রাণ ঝড়ে পড়েছে এই আন্দোলনে।

১৯৬১-তে আসামের বরাক উপত্যকার বাঙালি জনগণ তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে শামিল হয়। যদিও বরাকের সিংহভাগ জনগণ বাংলা ভাষায় কথা বলেন,তবুও ১৯৬১-তে অহমিয়াকে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ফুসে ওঠেন বরাকের বাঙ্গালীরা।বাংলাভাষা বরাক উপত্যকার অন্যতম সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। সাঁওতাল পরগণার মানভূম জেলা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও তা দীর্ঘকাল বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের স্বাধীনতার পর সেখানে হিন্দি প্রচলনের কড়াকড়িতে বাংলা ভাষাভাষীরা চাপের মুখে পড়েন। মাতৃভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। ১৯৪৮ থেকে দীর্ঘ আট বছর চলা এই আন্দোলনের সাফল্যে ১৯৫৬ এর ১ নভেম্বর মানভূমের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পুরুলিয়া জেলা। বিহার থেকে নিয়ে পুরুলিয়াকে যুক্ত করা হয় পশ্চিমবঙ্গের সাথে। তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দ্বার উন্মুক্ত হয় তাঁদের সামনে।

এবারে আবার ফিরি ১৯ মে'র ইতিহাসে। আসামের বরাক উপত্যকা আদিকাল থেকেই বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। একসময় এই এলাকার অধিকাংশ ডিমাসা জনগোষ্ঠীর কাছাড় রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডিমাসা রাজন্যবর্গ ও বাংলাভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কালক্রমে ব্রিটিশরা ভারত বিভাগ করে চলে গেলে আসাম প্রদেশের একাংশ সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। সিলেটের একাংশ ও ডিমাসা পার্বত্য ও সমতল অঞ্চল নিয়ে কাছাড় জেলা গঠিত হয়। এই জেলা বর্তমানে বিভক্ত হয়ে কাছাড়,হাইলাকান্দি,করিমগঞ্জ ও উত্তর কাছাড় পার্বত্য জেলা (ডিমা হাসাও)এই চার নতুন জেলায় রূপ নিয়েছে।

১৯৪৭ এ দেশবিভাগের পর থেকেই বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার অধিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকেন। আসাম অহমিয়াদের জন্য এবং বাঙ্গালীরা সেখানে বহিরাগত এমন বক্তব্য ও ওঠে। এখনও সেই প্রবণতা বিদ্যমান। জাতীয়তাবাদের জোয়ারে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদরাও গা ভাসান। বঙ্গাল খেদা আন্দোলনও গড়ে ওঠে একসময়ে। সরকারিভাবে সেসব আন্দোলন ও সহিংসতা দমন হলেও পরবর্তী কালে সময়ে সময়ে এই জাতীয় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে।

আসাম রাজ্য বিধান সভায় ভারতের স্বাধীনতার পর পর সদস্যরা বাংলা, হিন্দি বা ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে পারতেন।প্রথম আঘাত এলো ভাষার উপর। অহমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা ঘোষণা, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর চেষ্টা এবং বিধানসভায় বাংলায় বক্তব্য রাখার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে আইন চালুর বিরুদ্ধে আসামের বাঙ্গালী জনগণ দল-মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আসাম রাজ্য সরকার কোনও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে গেলেন না। তাঁরা অহমিয়া জাতীয়তাবাদ এর সংকীর্ণ মানসিকতার নেতাদের প্রাধান্য দেয়ার নীতি গ্রহণ করেন। বাঙ্গালীরাও সংগঠিত হতে থাকেন।

অনুমান করা যায় আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বাহান্নর ঢাকার ভাষা আন্দোলন ও মানভূমের ভাষা আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।১৯৬০ সালের শেষে আসাম বিধান সভায় ভাষা বিল পাশ হয়। কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেলো। বাঙ্গালীরা ফুঁসে উঠলেন। লাগাতার আন্দোলন চলতে থাকলো।সত্যাগ্রহ,অসহযোগ, হরতাল, রেল রোখো,সংকল্প দিবস, ইত্যাকার অহিংস আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল বরাক উপত্যকা। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালের ১৯মে তারিখে বরাকের কেন্দ্রবিন্দু শিলচরের রেলস্টেশনে ভোর থেকে আন্দোলনকারী সত্যাগ্রহীরা জড়ো হয়। হাজার হাজার ছাত্র যুবা জনতা রেলস্টেশন প্রাঙ্গন ও রেললাইনের উপর অবস্থান নেয়। তাঁদের সরাতে না পেরে সরকার নির্মম দমননীতির আশ্রয় নেয়। পুলিশ বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। নিহত হন পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ মোট ১১ জন ছাত্র যুবা। তাঁরাই একাদশ ভাষা শহীদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা দ্বিতীয় রাজ্যভাষার মর্যাদা পায়। শিলচর রেলস্টেশনের সামনে স্থাপিত হয় শহীদদের প্রতিকৃতি সম্বলিত শহীদ মিনার। যার পথ ধরে পরবর্তী কালে ছড়িয়ে পড়ে একই আকৃতির শহীদ মিনার সমগ্র বরাক উপত্যকায়। শিলচর রেলস্টেশনের নাম পাল্টে জনতা ভাষা শহীদ রেল স্টশন নাম রেখেছেন। যদিও পূর্ণ সরকারি স্বীকৃতি এখনও তার মেলেনি।

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় একাদশ শহীদ সহ আন্দোলনকারীদের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু সব এলাকার বাঙ্গালিরা কি এই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন? উত্তরটি ‘না’ সূচক। আমাদের কর্তব্য তাঁদের আত্মত্যাগের কাহিনী সকলকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম তাঁদের সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হতে শেখে। বরাক উপত্যকার একাদশ ভাষা শহীদ অমর রহে। বাংলা সহ সকল মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকুক।

এখনও সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এমন অনেকেই বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন নেতৃত্ব দেয়াদের মধ্যে অনেকে। সাথে সাথে প্রত্যক্ষদর্শীদের ও সন্ধান পাওয়া এখনও কষ্টকর নয়। তবে সামনের সিকি শতাব্দীর মধ্যে প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা আর আমাদের মাঝে থাকবেন না। এখনই প্রকৃষ্ট সময় তাঁদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখার। পর্যাপ্ত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন সেই আন্দোলন,তার কুশীলব এবং শহীদ পরিবার সমূহের বিষয়ে। বীরের সন্মান উপযুক্ত ভাবে হওয়া প্রয়োজন। বাংলা ভাষার এবং বাংলা ভাষাভাষী জনগণের মর্যাদা বিশ্বব্যাপী সমুন্নত রাখার জন্য আমাদের এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আরও অনেক বীরের আমাদের প্রয়োজন। যে মাটিতে বীরের যথাযোগ্য সন্মান নেই, সে মাটিতে বীর জন্মায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও পরিব্রাজক

;

রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার পাচ্ছেন ১৫ কবি-সাহিত্যিক



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার’ ২০২২ ও ২০২৩ ঘোষণা করা হয়েছে। পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১৫ জন কবি ও সাহিত্যিককে এই পুরস্কার দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১৬ মে) এক অনুষ্ঠানে পুরস্কার মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাবের জ্যৈষ্ঠ সদস্য কবি আসাদ মান্নান।

তিনি জানান, ২০২২ সালে কবিতায় পুরস্কার পেয়েছেন- শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক ও রিশাদ হুদা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে মালিক মো. রাজ্জাক। এছাড়া প্রবন্ধে বিলু কবীর, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, অনুবাদে ইউসুফ রেজা এবং কথাসাহিত্য জুলফিয়া ইসলাম।

আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে, কবি খুরশীদ আনোয়ারকে।

কবি আসাদ মান্নান জানান, ২০২৩ সালে কবিতায় মিনার মনসুর ও মারুফুল ইসলাম পুরস্কার পাচ্ছেন। প্রবন্ধে আসাদুল্লাহ, কথাসাহিত্যে জয়শ্রী দাশ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে নাজমা বেগম নাজু, শিশুসাহিত্য আমীরুল ইসলাম এবং অনুবাদে মেক্সিকো প্রবাসী আনিসুজ্জামান।

আগামী ১৯ মে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি-সাহিত্যিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেওয়া হবে। পুরস্কার ঘোষণা কমিটির প্রধান ছিলেন কবি শ্যামসুন্দর শিকদার। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা।

;

ঢাকার মিলনায়তনেই আটকে ফেলা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে! 



আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক বার্তা২৪.কম
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে তাদের জন্মজয়ন্তীর জাতীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রথা কি তবে লুপ্ত হতে চলেছে? দীর্ঘসময় ধরে মহাসমারোহে কয়েকদিন ধরে এসব জন্মজয়ন্তী আয়োজনের রেওয়াজ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা কারণ দেখিয়ে সেই মাত্রায় আর হচ্ছে না রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর মহাআয়োজন। ঢাকার বাইরে উন্মূক্ত স্থানের বদলে রাজধানীতেই সীমিত পরিসরে মিলনায়তনে আটকে ফেলা হচ্ছে এসব আয়োজনের পরিধিকে। 

বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই দুই পুরোধা পুরুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন ঘিরে বিশাল আয়োজনে তাদের পরিধিবহুল সৃষ্টিকর্ম ও যাপিত জীবনের আখ্যান তুলে ধরা হতো। রাজধানীর বাইরে জেলা পর্যায়ে কবিদের স্মৃতিধন্য স্থানসমূহে এই আয়োজনকে ঘিরে দীর্ঘসময় ধরে চলতো সাজ সাজ রব। যোগ দিতেন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু নানা অজুহাতে পর্যায়ক্রমে রাজধানী ঢাকাতেই যেমন আটকে যাচ্ছে রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় আয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণও কমে এসেছে। 

জাতীয় কবির ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে এবারও কোন ভিন্নতা থাকছে না জানিয়ে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তীর জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনগুলো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক পালিত হয়। আর মৃত্যুবার্ষিকীগুলো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে থাকে। যেমন কবি নজরুল ইনস্টিটিউট যেহেতু কবির নামে প্রতিষ্ঠিত, তাই নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি ইনস্টিটিউটই আয়োজন করে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছর যেভাবে উদযাপিত হয় এবারও সেভাবেই আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ২৫ মে (২০২৪) বেলা ৪টায় জাতীয় জাদুঘরে শুরু হবে। রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানগুলো কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে অনুষ্ঠিত হত। এই বারও হবে, তবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানগুলো ঢাকার বাইরে হবে না।’

‘ঢাকার বাইরে যেসব জেলাগুলো নজরুলের স্মৃতিসংশ্লিষ্ট; যেমন-ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা-এসব জেলাগুলোতে নজরুল গিয়েছেন, থেকেছেন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সূত্রে। এবার জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানও ঢাকায় হয়েছে, নজরুলের জন্মজয়ন্তীও ঢাকায় হবে। ঢাকার বাইরে এবার নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান না হওয়ার পেছনে সরকারের কাছে যে যুক্তি তা হচ্ছে-এই সময়ে দেশের উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে। বিশেষত জেলা প্রশাসন এইগুলো আয়োজনে মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে থাকে। জেলা প্রশাসনগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকবে। নজরুল জয়ন্তী আয়োজনে মনযোগ হয়ত কম দেবে। যে উদ্দেশ্যে জনমানুষের কাছে পৌছানোর জন্য এই অনুষ্ঠান, তা পরিপূর্ণ সফল হবে না বিধায় এবার এই আয়োজনগুলো ঢাকায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে’-বলেন সরকারের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র ও নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপনে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আছে। এতে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রয়েছেন। গত ২ এপ্রিল (২০২৪) কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, রবীন্দ্র জয়ন্তী হবে শিল্পকলা একাডেমিতে এবং নজরুল জয়ন্তী হবে বাংলা একাডেমিতে।

জানা গেছে, বাংলা একাডেমিতে কিছু রেনুভশন ওয়ার্ক চলমান থাকায় বিদ্যুতের সমস্যা হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় মুক্তমঞ্চেও এই আয়োজন না করে জাতীয় জাদুঘরে প্রধান মিলনায়তনে নজরুল জয়ন্তীর তিন দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২৫ মে বেলা ৪টায় উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামীলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। স্মারক বক্তা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নাহিদ ইজহার খান, এমপি। আলোচনা অনুষ্ঠানের পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবেশনা।

২৬মে আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের প্রধান অতিথি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাজ্জাদুল হাসান, এমপি। বিশেষ অতিথি থাকবেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক মোঃ কামরুজ্জামান। ২৭ মে তৃতীয় দিনের আয়োজনের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক। শেষ দিনের স্মারক বক্তা কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী উদযাপনে জাতীয় কমিটির একজন সদস্যের কাছে জয়ন্তী আয়োজনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহ্যিক ধারা বজায় না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রবীন্দ্র ও নজরুল অনুরাগীরা বলেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য-জীবনদর্শন আমাদের পাথেয়। তাদের জন্ম ও মৃত্যুদিনে মহাসমারোহে ঢাকার বাইরে কবিদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহে আয়োজনের যে ধারাবাহিকতা ছিল তা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে বেগবান করতো। কিন্তু এই আয়োজনকে সীমিত করে রাজধানীর মিলনায়তনে আটকে ফেলা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির বিকাশকে রূদ্ধ করারই অংশ। এর পেছনে সুক্ষ্ণভাবে কারা কাজ করছে তাদের চিহ্নিত করা জরুরি বলেও মনে করেন তারা।

;

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

অলঙ্করণ: মামুনুর রশীদ

  • Font increase
  • Font Decrease

পিপাসার্ত ঘোরে

প্রান্তরের মাঝে আছে নিঃস্বতার ডাক
আত্ম অনুসন্ধানের
ফিরতি ঢেউ
আছড়ে পড়ে
আশ্লেষের বালুকাবেলায়
মুমূর্ষু যেমন তীব্র পিপাসায়
জীবনের আলিঙ্গন চায়-
আর্ত রাত্রি হিমেল কামের ঘোর
নীরবে দংশায়
ঘর পোড়ে, আকাক্ষার
বাতি নিভে যায়
কোথায় প্রান্তর, শূন্যতা কোথায়
আছে সে নিকটে জানি
সুদূরের এলানো চিন্তায়
যেখানে গোধূলিদগ্ধ
সন্ধ্যা কী মায়ায়
গুটায় স্বপ্নের ডানা
দেবদারু বনে বীথিকায়
তার দিকে সতৃষ্ণ সমুদ্রঘোর
ছটফট করছি পিপাসায়।

না, পারে না

লখিন্দর জেগে উঠবে একদিন
বেহুলার স্বপ্ন ও সাধনা
বৃথা যেতে পারে না, পারে না।

কলার মান্দাস, নদীস্রোত
সূর্যকিরণের মতো সত্য ও উত্থিত
সুপ্ত লখিন্দর শুয়ে, রোমকূপে তার
জাগৃতির বাসনা অপার
এই প্রেম ব্যর্থ হতে পারে না পারে না

মনসার হিংসা একদিন
পুড়ে টুড়ে ছাই হবে
এমন প্রতীতি নিয়ে স্বপ্নকুঁড়ি নিয়ে
প্রতীক্ষা-পিদিম জ্বেলে টিকে থাকা
এমন গভীর সৌম্য অপেক্ষা কখনো
ম্লান হয়ে নিভে যেতে পারে না পারে না

রেণু রেণু সংবেদবর্ণালি-৮

ক.
আমার না পাওয়াগুলি অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসগুলি
মুক্তি চায়, বেরোতে পারে না
কার্বনের নিঃসরণ
নতুন মাত্রিক আর বিপজ্জনক
সেও তো দূষণ বটে
বলতে পারো প্রণয়দূষণ!

খ.
আদিপ্রাণ বৃক্ষতলে
ছায়াশান্তি মাঙনের সুপ্তি বর্তমান
এসো লই বৃক্ষের শরণ
পরিবেশ প্রশান্তির সেও এক
স্বস্তিমন্ত্র, অনিন্দ্য ধরন।

গ.
নদীকে বইতে দাও নিজস্ব নিয়মে
গলা টিপে ধোরো না ধোরো না,
নদী হচ্ছে মাতৃরূপ বাৎসল্যদায়িনী
দখলে দূষণে তাকে লাঞ্ছিত পীড়িত
হে মানুষ এই ভুল কোরো না কোরো না

ঘ.
উচ্চকিত শব্দ নয় বধিরতা নয়
মৃদু শব্দ প্রকৃতির সঙ্গে কথা কও
শব্দ যদি কুঠারের ঘাতকপ্রতিম
তবে হে মানুষ তোমরা অমৃতের পুত্রকন্যা নও

ঙ.
মৃত্তিকার কাছ থেকে সহনশীলতা শিখি
মৃত্তিকাই আদি অন্ত
জীবনের অন্তিম ঠিকানা
মৃত্তিকাই দেয় শান্তি সুনিবিড়
ক্ষমা সে পরমা
শরীর মূলত মাটি
গন্তব্য যে সরল বিছানা।

ছিন্ন কথন

আমি ভুখা পিপীলিকা
চেয়েছি আলোর দেখা।
পুড়ে যদি মরি তাও
ওগো অগ্নি শান্তি দাও।
অঙ্গার হওয়ার সাধ
এসো মৃত্যু পরমাদ।
চলো ডুবি মনোযমুনায়
এসো এসো বেলা নিভে যায়!

ধ্রুব সত্য

না-পাওয়াই সত্য হয়ে ফুটে থাকে।
পুষ্পিত সে প্রতারণা, চেনা মুশকিল।
বৃতি কুঁড়ি পাপড়িতে মায়াভ্রম লেপটানো
দেখলেই ছুঁতে ইচ্ছা হয়। ছুঁলেই বিপদ।
সেই ফুলে সম্মোহন জড়িয়েমড়িয়ে আছে
কোমলতা লাবণ্যও পুঁজি তার, এমত বিভ্রমে
লোভী ভ্রমরের মতো প্রেমিকারা ছোটে তার কাছে
গিয়ে মোক্ষ পাওয়া দূর, অনুতাপে আহত পাথর
মাথা কুটে মরলেও স্রোতধারা জন্ম নেয় না
যা কিছু হয়েছে পাওয়া, তাও এক দম্ভ সবিশেষ
মর্মে অভ্যন্তরে পশে গতস্য শোচনা নাস্তি
এই বিষ গলাধঃকরণ করে কী যে পাওয়া হলো
হিসাবে নিকাশে মন থিতু নয় সম্মতও নয়
না-পাওয়াই ধ্রুব সত্য চিরন্তন মানুষ-জীবনে!

;