শর্টলিস্ট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, ৩ নভেম্বর ‘ম্যান বুকার‘ পুরস্কার ঘোষণা



সাঈদ চৌধুরী
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২১ সালের বুকার প্রাইজ় নিয়ে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। নোবেল পুরস্কারের পরই ’বুকার প্রাইজ ফর ফিকশন’ সবচেয়ে আলোচিত এবং সম্মানীত। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে যথার্থ যাচাই-বাছাই এবং অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।

বৃটেন সহ দুনিয়াব্যাপী লেখক-পাঠকরা কারো কারো নাম প্রস্তাব করে থাকেন। জনগুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমূহ থেকে প্রথমে লংলিস্ট এবং পরে শর্টলিস্ট হয়। সবশেষে নির্বাচকদের বিচারে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম ঘোষিত হয়। আগামী ৩ নভেম্বর জানা যাবে কে হলেন বুকারজয়ী সৌভাগ্যবান।

প্রতি বছরের মত এবারো কর্তৃপক্ষ অসংখ্য বই থেকে বাছাই করে একটি তালিকা তৈরী করেন। এবার ১৩টি বই নিয়ে ‘লংলিস্ট’ বা দীর্ঘ তালিকা হয়। তারা আরো অনেক যাচাই-বাছাই শেষে এখন শর্টলিস্ট বা সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছেন। ছ’টি উপন্যাস আছে এই শর্টলিস্টে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখে ঘোষিত লিস্ট মোতাবেক কাঙ্ক্ষিত প্রাইজের জন্য লড়াই হয় ১৩ জন লেখকের ১৩টি বই। এরমধ্যে ২০১৭ সালে সাহিত্য নোবেল এবং ১৯৮৯ সালে বুকার পুরস্কার বিজয়ী জাপানি লেখক স্যার কাজুও ইশিগুরো ছিলেন দীর্ঘ তালিকায়। তার ‘ক্লারা এন্ড দ্য সান’ বইটি ছিল বিশেষ বিবেচনায়। ২০১৯ সালে পুলিৎজার পুরস্কার জয়ী আমেরিকান লেখক রিচার্ড পাওয়ার্স-এর ‘বিউইল্ডারমেন্ট’ রয়েছে পুরস্কারের তালিকায়। তিনি ১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা বই পুরস্কার অর্জন করেন।

 ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক সঞ্জীব সাহোতার ‘চায়না রুম’ দীর্ঘ তালিকায় জায়গা করে নেয়। তার ‘দ্য ইয়ার অব দ্য রানআওয়েজ’ ২০১৫ সালের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। কানাডীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক র্যাচেল কাস্কের ‘সেকেন্ড প্লেস’ এবারের দীর্ঘ তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০০৫ সালে তার ‘ইন দ্য ফোল্ড’ এই তালিকায় ছিল।

শ্রীলংকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট তামিল ঔপন্যাসিক অনুক অরুদপরগসম-এর ‘আ প্যাসেজ নর্থ’ বইটি তালিকাভুক্ত হয়েছে। তিনি দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের ডিএসসি পুরস্কার জিতেছেন। ব্রিটিশ-সোমালি লেখক নাদিফা মোহামেদের ‘দ্য ফরচুনম্যান’, আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও কবি প্যাট্রিকা লকউডের ‘নো ওয়ান ইজ টকিং অ্যাবাউট দিস’, মার্কিন লেখক ম্যাগি শিপস্টিডের ‘গ্রেট সার্কেল’, দক্ষিণ আফ্রিকার ডেমন গ্যালগাট এর ‘দ্য প্রমিস’ তালিকায় আছে। ২০০৩ সালে তার ‘দ্য গুড ডক্টর’ এবং ২০১০ সালে ‘ইন এ স্ট্র্যাঞ্জ রুম’ সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল। 

কানাডীয় উপন্যাসিক ম্যারি লসনের ‘দ্য টাউন কল্ড সোলাস’ এবার দীর্ঘ তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০০৬ সালে তার ‘দ্য আদার সাইড অব দ্য ব্রিজ’ দীর্ঘ তালিকায় ছিল। এই তালিকায় আরো আছে মার্কিন লেখক নাথান হ্যারিসের ‘দ্য সুইটনেস অব ওয়াটার’, দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ক্যারেন জ্যানিংসের ‘অ্যান আইল্যান্ড’, এবং ব্রিটিশ লেখক ফ্রান্সিস স্পাফর্ডের ‘লাইট পার্পেচুয়াল’।

অবশেষে ছ’টি উপন্যাস শর্টলিস্ট হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার সাহিত্যিক ড্যামন গ্যালগাট-এর দ্য প্রমিস, আমেরিকান ঔপন্যাসিক ও কবি প্যাট্রিসিয়া লকউড-এর নো ওয়ান ইজ় টকিং আবাউট দিস, আমেরিকান ঔপন্যাসিক রিচার্ড পাওয়ার্স-এর বিউইল্ডারমেন্ট, শ্রীলঙ্কার অনুক অরূদপ্রগসম-এর আ প্যাসেজ নর্থ, ব্রিটিশ-সোমালি সাহিত্যিক নাদিফা মোহামেদ-এর দ্য ফরচুন মেন এবং আমেরিকান ঔপন্যাসিক ম্যাগি শিপস্টেড-এর গ্রেট সার্কেল।

এবছরের বিচারক কমিটির প্রধান হয়েছেন ইতিহাসবিদ মায়া জেসনফ। বুকার বিজয়ী পাবেন ৫০ হাজার পাউন্ড। বাংলাদেশী হিসেবে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা।

‘ম্যান বুকার‘ বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদা সম্পন্ন পুরস্কার। বিগত এক বছরে প্রকাশিত পূর্ণ-দৈর্ঘ্যের উপন্যাস থেকে বাছাই করা শ্রেষ্ঠটি এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। ১৯৬৯ সাল থেকে এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। এক সময় শুধুমাত্র কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশ এবং আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৫ সাল থেকে এই পুরস্কার আন্তর্জাতিক ভাবে বিশ্বময় সম্প্রসারিত হয়েছে। 

৫২তম বুকার পুরস্কার বিজয়ীর নাম ১৯ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ঘোষণা হল। সেরা হাসি হাসলেন স্কটিশ-আমেরিকান লেখক ডগলাস স্টুয়ার্ট। বিশ্ব সাহিত্যে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হল। তার ‘ শুগি বাইন‘ সেরা হিসেবে বেছে নিলেন বুকার পুরস্কার কমিটির বিচারক মন্ডলী। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি এই মর্যাদা সম্পন্ন পুরস্কার পেলেন। বিজয়ী ঘোষণার পর তার হাতে স্মারক তুলে দেন প্রধান বিচারক মার্গারেট বাসবি। প্রদান করা হয় ৫০ হাজার ইউরোর অর্থমূল্য। বারাক ওবামা, মার্গারেট অ্যাটউড সহ বিশ্ব বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা শুভেচ্ছা পাঠান স্টুয়ার্টের উদ্দেশ্যে।

২০২০ বুকার পুরস্কারের মনোনয়নের তালিকায় ছিল- দ্য নিউ ওয়াইল্ডারনেসের জন্যে ডায়ান কুক, এই মরনোয়ল বডির জন্যে সিৎসি ডাঙ্গারেমবাগা, বার্ন সুগার‘র জন্যে অবনী দোশি, হু দে ওয়াজ‘র জন্য গ্যাব্রিয়েল ক্রাউজে, মিরর এবং দ্য লাইট‘র জন্যে হিলারি মন্টেল, অ্যাপিরোগন‘র জন্য কলম ম্যাকক্যান, শ্যাডো কিং এর জন্যে মাজা মেনগিস্টের, সাচ আ ফান এজ‘র জন্যে কাইলি রেইড, রিয়েল লাইফ‘র জন্যে ব্র্যান্ডন টেইলার, রেডহেড বাই দ্য সাইড অফ দ্য রোড‘র জন্যে অ্যানি টেলার, শুগি বাইন‘র জন্যে ডগলাস স্টুয়ার্ট, লাভ অ্যান্ড আদার থট এক্সপেরিমেন্ট‘র জন্যে সোফি ওয়ার্ড, হাউ মাচ অফ দিজ হিলস ইস গোল্ড‘র জন্যে সি পাম জাং।

পুরস্কার জেতার পর স্টুয়ার্ট মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। নিজের মাকে প্রাণময় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, উপন্যাসের পরতে পরতে মা সম্পর্কে আমি পরিষ্কার করে বলেছি। তাকে ছাড়া এখানে আসতে পারতাম না। আমার কাজ কোন ভাবেই এখানে পৌঁছাত না। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মাতৃ বিচ্ছেদের যন্ত্রনাকে অনুভব করেছিলেন স্টুয়ার্ট। অকালে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়া মাকেই নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস উৎসর্গ করেছেন এই স্কটিশ লেখক। মা-ই ছিলেন তার সব থেকে কাছের মানুষ। মায়ের মাদকাসক্তি বেড়েই চলেছিল দিনের পর দিন। বার বার বুঝিয়েও লাভ হয়নি কোনো। ভেতর ভেতর অ্যালকোহল তাকে নিশ্চুপেই ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। ‘শুগি বাইন‘ উপন্যাসে ওঠে এসেছে তার বেড়ে ওঠা আর নিজের জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। মিশে আছে মায়ের মৃত্যু যন্ত্রণা, তার মূল্যবোধ, সামাজিক বেড়াজাল, উত্থান-পতনের কথা। রয়েছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক হৃদয়ভেদী আখ্যান। 

গ্লাসগোতে বেড়ে ওঠা স্টুয়ার্ট তার জন্মভূমি স্কটল্যান্ডবাসীকেও ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে গ্লাসগোর অধিবাসীদের। তিনি বলেন, গ্লাসগোবাসী মানুষের সহানুভূতি, রসবোধ, প্রেম ও সংগ্রাম এই বইয়ে মূল কেন্দ্রবিন্দু। গ্লাসগো স্কটল্যান্ডের বৃহত্তম এবং যুক্তরাজ্যের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এটি গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপের উত্তর দিকের এক তৃতীয়াংশে অবস্থিত। এর দক্ষিণ-পূর্বে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ৯৬ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত, উত্তর ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তর-পূর্বে উত্তর সাগর এবং দক্ষিণে আইরিশ সাগর অবস্থিত। মূল ভূখন্ড ছাড়াও দেশটির অনেক দ্বীপ রয়েছে। এক সময়কার বিশ্বের নেতৃস্থানীয় শিল্প শহর ছিল। স্কটিশ পানি সীমা উত্তর আটলান্টিক এবং উত্তর সাগর বেষ্টিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বৃহত্তম তেল মজুদ এরিয়া। এজন্যই গ্লাসগো ও অ্যাবরদিনকে স্কটল্যান্ড তৃতীয় বৃহত্তম শহর এবং ইউরোপের তেল রাজধানী বলা হয়।

ম্যান বুকার বিজয়ী ডগলাস স্টুয়ার্ট ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে এখন নিউইয়র্কে বসবাস করেন। গত দুই দশকে তিনি কাজ করেছেন কেলভিন ক্লেইন, বানানা রিপাবলিক, জ্যাক স্পেড প্রভৃতি বহুজাতিক সংস্থায়। রয়্যাল আর্ট কলেজ থেকে স্নাতক করার পরই তিনি পাড়ি দিয়ে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ২৪ বছর বয়স থেকেই থাকেন নিউইয়র্ক শহর। এ বছরেই তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘লক অ’ শেষ করেছেন, যার পটভূমি গ্লাসগো ঘিরেই গড়ে উঠেছে। 

এ পর্যন্ত ম্যান বুকার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত অনেক লেখক। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্যের পি. এইচ. নিউবি - সামথিং টু আনসার ফর উপন্যাস, ১৯৭০ সালে যুক্তরাজ্যের বার্নিস রুবেনস- দ্য ইলেক্টেড মেম্বার উপন্যাস, ১৯৭১ সালে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ভি এস নাইপল- ইন অ্যা ফ্রি স্টেট ছোটগল্প, ১৯৭২ সালে যুক্তরাজ্যের জন বার্গার- জি উপন্যাস, ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের জেমস গর্ডন ফারেল- দ্য সেইজ অফ কৃষ্ণপুর উপন্যাস, ১৯৭৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার নাডিন গর্ডিমার- দ্য কনজারভেশনিস্ট উপন্যাস ও যুক্তরাজ্যের স্ট্যানলি মিডলটন- হলিডে উপন্যাস, ১৯৭৫ সালে যুক্তরাজ্যের রুথ প্রয়ার ইয়াবভালা- হিট অ্যান্ড ডাস্ট  উপন্যাস , ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্যের  ডেভিড স্টোরি- স্যাভাইল উপন্যাস,  ১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের পল স্কট- স্টেয়িং অন উপন্যাস, ১৯৭৮ সালে যুক্তরাজ্যের আইরিশ মুরডক- দ্য সী, দ্য সী উপন্যাস।

১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যের পেনেলোপে ফিটজেরাল্ড- অফশোর দর্শনতাত্ত্বিক উপন্যাস, ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যের উইলিয়াম গোল্ডিং- রায়টস অফ পেসেজ উপন্যাস, ১৯৮১ সালে ভারতের সালমান রুশদি- মিডনাইট চিলড্রেন উপন্যাস, ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার  থমাস কেনিলি- শিন্ডলার্স আর্ক জীবনী উপন্যাস,  ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার  জন ম্যাক্সওয়েল কুতসি লাইফ অ্যান্ড টাইম অফ মাইকেল কে উপন্যাস, ১৯৮৪ সালে যুক্তরাজ্যের আনিতা ব্রুকনার- হোটেল ডু লাক উপন্যাস, ১৯৮৫ সালে নিউজিল্যান্ডের  কেরি হুম- দ্য বোন পিপল রহস্য উপন্যাস, ১৯৮৬  কিংস্লে অ্যামিস- দ্য ওল্ড ডেভিলস্ কমিক উপন্যাস, ১৯৮৭ সালে যুক্তরাজ্যের পেনেলোপে লাইভলি- মুন টাইগার উপন্যাস, ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার  পিটার কেরি- অস্কার অ্যান্ড লুসিন্ডা ঐতিহাসিক উপন্যাস।

১৯৮৯ সালে যুক্তরাজ্যের জাপানী কাজুও ইশিগুরো- দ্য রিমেইনস অফ দ্য ডে ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৯৯০ সালে যুক্তরাজ্যের এ. এস. বায়াত- পজেসন: অ্যা রোমান্স ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৯৯১ সালে নাইজেরিয়ান বেন ওকরি- দ্য ফ্যামিস্ড রোড উপন্যাস, ১৯৯২ সালে কানাডার মাইকেল ওন্ডাৎজি- দ্য ইংলিশ পেশেন্ট ও  যুক্তরাজ্যের        ব্যারি উন্সওর্থ- স্যাক্রেড হাঙ্গার ঐতিহাসিক উপন্যাস, ১৯৯৩ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের রডি ডয়েল- প্যাডি ক্লার্ক হা হা হা উপন্যাস,  ১৯৯৪ সালে যুক্তরাজ্যের জেমস কেলম্যান- হাউ লেট ইট ওয়াজ, হাউ লেট উপন্যাস, ১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যের প্যাট বার্কার- দ্য গোস্ট রোড যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের গ্রাহাম সুইফট লাস্ট অর্ডারস্ উপন্যাস, ১৯৯৭ সালে ভারতের অরুন্ধতী রায়- দ্য গড অফ স্মল থিংস উপন্যাস, ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যের ইয়ান ম্যাক্ইউয়ান- অ্যামস্টারডাম উপন্যাস।

১৯৯৯ সালে  দক্ষিণ আফ্রিকার জন ম্যাক্সওয়েল কুতসি- ডিসগ্রেস উপন্যাস, ২০০০ সালে কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড- দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের পিটার কেরি- ট্রু হিস্ট্রি অফ দ্য কেলি গ্যাং ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০০২ সালে কানাডার ইয়ান মার্টেল- লাইফ অফ পাই রোমাঞ্চকর উপন্যাস, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ডিবিসি পিঁয়ের- ভার্নন গড লিটল ব্ল্যাক কমেডি, ২০০৪ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যালান হলিংঘার্স্ট- দ্য লাইন অফ বিউটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের জন ব্যানভিল- দ্য সী উপন্যাস, ২০০৬ সালে ভারতের কিরণ দেশাই- দ্য ইনহেরিটেন্স অফ লস উপন্যাস, ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডের অ্যান এনরাইট- দ্য গেদারিং উপন্যাস, ২০০৮ সালে ভারতের অরবিন্দ আদিগা- দ্য হোয়াইট টাইগার উপন্যাস।

২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের হিলারি ম্যান্টেল- উলফ হল ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের হাওয়ার্ড জ্যাকবসন- দ্য ফিঙ্কলার কোশ্চেন উপন্যাস, ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের জুলিয়ান বার্নস- দ্য সেন্স অফ অ্যান এন্ডিং উপন্যাস, ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের হিলারি ম্যান্টেল- ব্রিং আপ দ্য বডিজ উপন্যাস, ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের এলিয়ানর ক্যাটন- দ্য লুমিনারিজ উপন্যাস, ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড ফ্লানাগান- দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ উপন্যাস, ২০১৫ সালে জ্যামাইকার মারলন জেমস- অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ সেভেন কিলিং উপন্যাস, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পল বিটি- দ্য সেলআউট ব্যঙ্গধর্মী উপন্যাস, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ সান্ডার্স- লিংকন ইন দ্য বার্ডো ঐতিহাসিক উপন্যাস, ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যানা বার্নস- মিল্কম্যান উপন্যাস, ২০১৯ সালে কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড- দ্য টেস্টামেন্টস উপন্যাস ও যুক্তরাজ্যের বার্নার্ডাইন এভারিস্টো- গার্ল, উইমেন, আদার উপন্যাস।

বাংলাদেশী পাঠকের কাছে ‘ম্যান বুকার‘ পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচিতদের মধ্যে রয়েছেন, ২০০১ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত লেখক স্যার ভিএস নাইপল। ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ এর জন্য তিনি ম্যান অব বুকার অর্জন করেন। পিস অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে ডেভিড গ্রুসম্যানকে সবাই চিনে। ব্যতিক্রমী একটি উপন্যাস লিখে ২০১৭ সালে বুকার প্রাইজ লাভ করেন তিনি।  ২০১০ সালে ফিলিস্তিনি এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান ও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। পুলিশের হাতে মারও খেয়েছেন ইসরায়েলের লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ডেভিড গ্রুসম্যান।

অরুন্ধতী রায় ভারতীয় ঔপন্যাসিক, বুদ্ধিজীবী এবং পিস অ্যাকটিভিস্ট। তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে আছেন তার উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ এর জন্য। ১৯৯৭ সালে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী হৈচৈ পড়ে যায়। ১৯৯৮ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেন উপন্যাসটির জন্য। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি পরিবেশগত সংশ্লিষ্টতা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও কাজ করেন। ভারতের আসাম রাজ্যের শিলংয়ে অরুন্ধতী জন্মগ্রহণ করেন।

সালমান রুশদি একজন ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। তার দ্বিতীয় উপন্যাস মিডনাইটস চিলড্রেন ১৯৮১ সালে বুকার প্রাইজ অর্জন করে। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তার লেখা জঘন্য বিতর্কিত বই স্যাটানিক ভার্সেস বিশ্বের অনেক দেশেই নিষিদ্ধ। বইটি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। এর প্রতিবাদ হয় বিশ্বের সকল মুসলিম দেশে। বাংলাদেশে সহ বিভিন্ন দেমে বইটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে।

আরব বিশ্বের প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে ২০১৯ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেছেন জোখা আলহারথি। মাতৃভূমি ওমানের রূপান্তর বিষয়ক উপন্যাস ‘সেলেস্টিয়াল বডিস’র জন্য এই পুরস্কার লাভ করেন তিনি। বৈচিত্র্যময় আরব সংস্কৃতির নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে এই উপন্যাসে। বিচারকরা আলহারথির ঐশ্বর্যময় কল্পনাশক্তি, লেখার চিত্তাকর্ষক শৈলি এবং কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টির প্রশংসা করেন। উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে আল-আওয়াফি গ্রামকে ঘিরে। একটি সনাতনী সমাজ থেকে ঔপনিবেশ-উত্তর যুগে যে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল ওমান, তিন বোনের মাধ্যমে সেই পরিবর্তন, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ওমানিরা কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে তা দেখাতে চেয়েছেন জোখা আলহারথি।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক।

   

মহাশূন্যে যাবে জাপানের তৈরি কাঠের স্যাটেলাইট



বিজ্ঞান ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মহাশূন্যে উৎক্ষেপণের জন্য কাঠের স্যাটেলাইট তৈরি করেছেন জাপানের বিজ্ঞানীরা। এটি স্পেসএক্স থেকে মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

বুধবার (২৯ মে) ইয়েমেনের বার্তাসংস্থা সাবা এ বিষয়ে একটি খবর প্রকাশ করেছে।

খবরে জানানো হয়, জাপানের কিয়েটো বিশ্ববিদ্যালয় ও সুমিটোমো ফরেস্ট্রি ফাউন্ডেশন বিশেষজ্ঞেরা ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার বছরের চেষ্টায় এই স্যাটেলাটটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

বুধবার কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিজ্ঞানীরা ৪ বছরের কঠোর পরিশ্রম করে কাঠের তৈরি স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছেন। এই স্যাটেলাইটের নামকরণ করা হয়েছে, ‘লিগনোস্যাট’ (LignoSat)। এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম কাঠের তৈরি স্যাটেলাইট। পরিবেশের কথা চিন্তা করে এই স্যাটেলাইটটি তৈরি করা হয়েছে। এটি যখন তার অভিযান শেষ করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তখন এটি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাবে।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ‘লিগনোস্যাট’ স্যাটেলাইটির আকৃতি ১০ সেন্টিমিটার। এটির পুরুত্ব ৪ থেকে ৫.৫ মিলিমিটার। তবে এটির ভেতরের স্তর হবে অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি এবং এর ভেতরে একটি সোলার প্যানেল থাকবে। সবমিলিয়ে এটার ওজন হবে মাত্র এক কেজি। এই স্যাটেলাইট সম্পূর্ণ সনাতনী জাপানি পদ্ধতিতে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এতে কোনো ধরনের ‘অ্যাডহেসিভ’ (আঠা) ব্যবহার করা হয়নি।

জাপানি বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ‘লিগনোস্যাট’ স্যাটেলাইটটি স্পেসএক্স থেকে এ বছরই উৎক্ষেপণ করা হবে। তারা আরো জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে এটি পৃথিবীর বাইরে পরীক্ষামূলকভাবে উড়াল সম্প্ন্ন করেছে। স্যাটেলাইটটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে, তা অবশ্য জানানো হয়নি।

;

১২৫তম জন্মবর্ষ

মুক্তির অন্বেষী নজরুল



ড. মাহফুজ পারভেজ
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নজরুল জীবনের ‘আর্তি ও বেদনা’র সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেকালের মুসলিম সমাজের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু আলোচনা আবশ্যক হয়ে পড়ে। নজরুলের আবির্ভাবকালে মুসলমানদের সামাজিক আবহাওয়া এমনই জীর্ণ ও গণ্ডিবদ্ধ ছিল যে, কোনো শিল্পীরই সেই আবহাওয়াতে আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রসার সম্ভব ছিল না। জীবনের প্রথমদিকে তাই কামাল পাশা প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত বীর মুসলিমেরা নজরুল-মানসকে আচ্ছন্ন করেছিল।

কিন্তু অচিরেই তিনি বাঙালির জাগরণের পথিকৃতে রূপান্তরিত হন। বাংলার জাগরণ গ্রন্থে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর অগ্রণীজন কাজী আবদুল ওদুদ জানাচ্ছেন, ‘নজরুলের অভ্যুদয়ের পরে ঢাকায় একটি সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়; তাঁদের মন্ত্র ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’ এবং যারা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধির মুক্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি মুসলমানের চেতনার জগতে নাড়া দিলে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’

চরম দারিদ্র্যের মাঝে থেকেও জীবনের জয়গান গেয়েছেন কবি নজরুল, ছবি- সংগৃহীত

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অধ্যাপক ও ছাত্রের মিলিত প্রয়াসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম হয়। সংগঠনটির সঙ্গে ‘সাহিত্য’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এটি গতানুগতিক ও মামুলি কোনো সাহিত্য সংগঠন ছিল না। ‘সাহিত্য’ শব্দটিকে বৃহত্তর পরিসর ও অর্থে গ্রহণ করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ফলে, তাঁদের কাছে সাহিত্যচর্চা ছিল জীবনচর্চার নামান্তর। এই সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা অভিহিত করেছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-প্রতিষ্ঠার পরের বছরেই (১৯২৭) সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র হিসেবে সাময়িকী ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যে কারণে এদের ‘শিখা গোষ্ঠী‘ নামেও অভিহিত করা হয়।

শিখা প্রকাশিত হয়েছিল পাঁচ বছর (১৯২৭-১৯৩১)। বাঙালি মুসলমানের বিভিন্ন সমস্যা তথা শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, দর্শন, চিন্তা ইত্যাদি নিয়ে জ্ঞানদীপ্ত আলোচনা করেছেন এই সমাজের লেখকগণ। ‘বুদ্ধির মুক্তি ও কবি নজরুলকে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বুদ্ধির মুক্তি, মানব মুক্তি, সমাজের মুক্তি তথা মানুষের শির উচ্চতর করার বাণী উৎকীর্ণ করেছিলেন নজরুল। গেয়েছিলেন মানবতার জয়গান। অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের গানে মুখরিত ছিল তাঁর জীবন ও কর্ম। মানুষের চেয়ে বড় কিছু ছিল না তাঁর কাছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে চির বিদ্রোহী ছিলেন তিনি। জগতের বঞ্চিত, ভাগ্য বিড়ম্বিত, স্বাধীনতাহীন বন্দিদের জাগ্রত করার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন নজরুল। মানবতার জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন-'গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্ …’।

মানুষ আর মানুষের হৃদয়কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। আবার তাঁর কলম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল বজ্রনির্ঘোষ আহ্বান- ‘জাগো অনশন-বন্দি, ওঠ রে যত জগতের বঞ্চিত ভাগ্যহত’।

শুধু যে কবিতাই লিখেছেন তা তো নয়। তিনি এমন অনেক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। নজরুলের দেশপ্রীতি, দেশের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আজও অনুপ্রাণিত করে। তিনি ছিলেন জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে।

সাম্য ও মানুষের কবি ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, ছবি- সংগৃহীত

‘সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাত–ধর্ম ছিল হৃদয়ের প্রেমধর্ম; যে প্রেম মানুষের কল্যাণে উৎসারিত হয়ে ওঠে। শুধু লেখনীর দ্বারা নয়, নিজের জীবনের সবরকম ঝুঁকি নিয়ে ঐক্যের আশায় আশাবাদী ছিলেন নজরুল।

তাঁর ব্যক্তিজীবনে এই ভাবনার প্রয়োগ করেছিলেন তাঁর বিবাহের ক্ষেত্রে, পুত্রদের ক্ষেত্রেও। তাঁর পরিবারের সব সদস্য এবং আপামর বাঙালি এই সত্য নিত্য উপলব্ধি করেন।

১২৫তম জন্মবর্ষে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চৈতন্য মুক্তির অন্বেষী। তাঁর গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক তথা সুবিশাল সাহিত্যকর্ম বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, নানা কারণে তাৎপর্যবাহী।

কেননা, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রখর প্রতাপে ত্রস্ত এবং যুদ্ধ ও আগ্রাসনে জর্জরিত পৃথিবীতে থেমে নেই অন্যায়, অবিচার, হামলা, নির্যাতন।

ইউক্রেন, ফিলিস্তিন থেকে মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত পৃথিবীময় শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, রক্তপাতে ক্ষত-বিক্ষত-রক্তাক্ত করোনা-বিপর্যস্ত পৃথিবী আর মানুষ এখন অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দুর্বিপাকে বিপন্ন।

এমতাবস্থায় অনাচারের বিরুদ্ধে চিরবিদ্রোহী নজরুলের মানব অধিকারের রণহুঙ্কার বড়ই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয়। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মহীরুহ-তুল্য কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, বিদ্রোহ, মুক্তি ও মানবতার মহান সাধক।

১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ অবিভক্ত বৃটিশ-বাংলার সর্বপশ্চিম প্রান্তের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম আর ১৩৮৩ বঙ্গাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।'

উল্লেখ্য, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানের স্থান নির্ধারণ নিয়ে নানাজন নানামত দিতে থাকেন। এ অবস্থায় স্থাননির্ধারণী সভায় রফিকুল ইসলাম প্রস্তাব করেন নজরুল তাঁর এক গনে লিখেছেন-

‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই/ যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’॥

সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর কবর হোক। তাঁর এ প্রস্তাব সভায় গৃহীত হলো। পরবর্তীকালে এ কবর পাকা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুলকে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন, ছবি- সংগৃহীত

‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা যুগে যুগে বাঙালির জীবনযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলির একটি 'বিদ্রোহী', যা স্পর্শ করেছে রচনার শতবর্ষের ঐতিহাসিক মাইলফলক।

কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায়। এরপর কবিতাটি মাসিক ‘প্রবাসী (মাঘ ১৩২৮), মাসিক ‘সাধনা (বৈশাখ ১৩২৯) ও ‘ধূমকেতু’তে (২২ আগস্ট, ১৯২২) ছাপা হয়।

বলা বাহুল্য, অসম্ভব পাঠকপ্রিয়তার কারণেই কবিতাটিকে বিভিন্ন পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে উপস্থাপিত করেছিল। ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়া মাত্রই ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করে। দৃপ্ত বিদ্রোহী মানসিকতা এবং অসাধারণ শব্দবিন্যাস ও ছন্দের জন্য আজও বাঙালি মানসে কবিতাটি ও রচয়িতা কবি নজরুল ‘চির উন্নত শির’ রূপে বিরাজমান।

পুরো বাংলা ভাষা বলয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শাণিত প্রতিবাদ তুলনাহীন। বিদ্রোহীর শতবর্ষকে ‘জাগরণের শতবর্ষ’ রূপে উদযাপন করা হয়, বাংলা ভাষাভাষী পরিমণ্ডলে আর ১২৫তম জন্মবর্ষে মুক্তির অন্বেষী নজরুলকে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করে সমগ্র বাঙালি জাতি!

 ড. মাহফুজ পারভেজ: অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

শ্রীপুরের কাওরাইদে নজরুল উৎসব শনিবার



ডেস্ক রিপোর্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ কালি নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘ভাগ হয়নিকো নজরুল’ শীর্ষক নজরুল উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে শনিবার। ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশনের ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে এবং নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর সহযোগিতায় এই উৎসবে সেমিনার, আবৃত্তি ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যকে তুলে ধরা হবে।

নেতাজী সুভাষ-কাজী নজরুল স্যোশাল অ্যান্ড কালচারাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট এর অন্যতম ট্রাস্টি আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক জানান, আয়োজনের শুরুতে শনিবার দুপুর ২টায় সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সুনীল কান্তি দে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক ড. সাইম রানা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ও ছায়ানট (কলকাতা)’র সভাপতি সোমঋতা মল্লিক।

তিনি আরও জানান, বিকেলে আয়োজনে নজরুলের জাগরণী কবিতা ও গান পরিবেশন করবেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা। আবৃত্তি করবেন-টিটো মুন্সী ও সীমা ইসলাম। নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করবেন শিল্পী ফেরদৌস আরা, সালাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে। সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি থাকবেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে থাকবেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার।

‘দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে নজরুল চর্চা বেগবান করতে এই উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এবছর কবি নজরুলের ১২৫তম জন্মবর্ষ। এই বছরটি নজরুলচর্চার জন্য খুবই সবিশেষ। উৎসবে দুই দেশের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষকদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে সাময়িকী। সাম্য, মানবতা ও জাগরণের যে বাণী কবি সৃষ্টি করে গেছেন, সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু সমাজের জন্য তা আলোকবর্তিকা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরুলের এই আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা’-বলেন আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক। 

;

শিশু নজরুল



এ এফ এম হায়াতুল্লাহ
কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবিটি বাংলা একাডেমি প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী থেকে সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারত। এটি বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনের দিক দিয়ে বহুগুণ বড় একটি দেশ। বহুজাতির বহু মানুষের বাস সে দেশে। ঐ দেশ অনেকগুলো প্রদেশে বিভক্ত। এই প্রদেশগুলোকে বাংলা ভাষায় রাজ্য বলে অভিহিত করা হয়। এই ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তদানীন্তন বাংলা প্রদেশের পূর্বাঞ্চল আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর পশ্চিমাঞ্চল ‘পশ্চিম বঙ্গ’ নামে ভারতের অন্তর্গত রয়ে গেছে।

এই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার অধীন আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত জামুরিয়া থানার অন্তর্ভুক্ত চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে এবং ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে জন্মলাভের পর একটি শিশুর কাজী নজরুল ইসলাম নাম রাখেন যে পিতা তার নাম কাজী ফকির আহমদ। আর যে মায়ের কোলে তিনি জন্মান তার নাম জাহেদা খাতুন। এই শিশুটির জন্মের আগে এই পিতামাতার আর-ও ৪ জন সন্তান জন্মের সময়ই মারা গিয়েছিল। শুধু তাদের প্রথম সন্তান কাজী সাহেবজানের বয়স তখন ১০ বছর। অর্থাৎ কাজী নজরুলের সর্বজ্যেষ্ঠ বড় ভাই শিশু কাজী নজরুলের চাইতে ১০ বছরের বড় ছিলেন। নজরুলের পর তার আর-ও একজন ভাই ও বোনের জন্ম হয়েছিল। ভাইটির নাম ছিল কাজী আলী হোসেন এবং বোনটির নাম ছিল উম্মে কুলসুম।

শিশু নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদ বই-পুস্তক পড়তে পারতেন। তিনি স্থানীয় মসজিদ ও মাজারের সেবা করতেন। রাজ্য শাসকগণ কর্তৃক বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ অর্থাৎ বিচারকগণ উন্নত চরিত্রের অধিকারী হতেন। মুসলমান সমাজ থেকে বিচারকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাজী বলা হত। মুসলমান সমাজে কাজীগণ অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন। নজরুল ইসলাম এইরূপ সম্মানিত পরিবারে জন্মপ্রাপ্ত এক শিশু। তাই জন্মের পর ক্রমশ বেড়ে উঠার পর্যায়ে তিনি পারিবারিকসূত্রেই ভাল-মন্দের পার্থক্য করার এবং হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত হয়ে সকলকে সমভাবে ভালবাসার গুণাবলি অর্জন করেন।

মানবজাতির ইতিহাসে যে-সমস্ত মহাপুরুষ বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের অধিকাংশই শৈশব থেকে নানারূপ দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়ে সেগুলো জয় করে মহত্ত্ব অর্জন করেছেন। তাদের কেউই একদিনে বড় হয়ে যাননি কিংবা বেড়ে-ও উঠেন নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মানোর আগেই পিতাকে হারিয়েছিলেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে হারিয়েছিলেন জন্মদাত্রী মাকেও। নজরুল তার পিতাকে হারান নয় বছর বয়সে ১৯০৮ সালে। পিতা তাকে গ্রামের মক্তবে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছিলেন। তখনকার দিনে পড়াশোনা করার জন্যে সরকারি ব্যবস্থা ছিলনা। বাংলাদেশের তখন জন্ম হয়নি।

বিশেষ ভঙ্গিমায় হাবিলদার নজরুল

নজরুলের জন্মভূমি বাংলা প্রদেশ ভারতবর্ষের একটি রাজ্য যা ছিল বিদেশী ব্রিটিশ শাসনাধীন তথা পরাধীন। ব্রিটিশ শাসকরা এদেশের সাধারণ মানুষ তথা প্রজাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ সচেতন হয়ে উঠে-তাদের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হয়-তারা পরাধীন থাকতে চায় না-স্বাধীনতার প্রত্যাশী হয়। বিদেশী শাসক ব্রিটিশরা সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা উন্মুক্ত না করায় জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করত। সেই প্রতিষ্ঠানে প্রধানত মাতৃভাষা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হত। এইসব প্রতিষ্ঠান মক্তব নামে পরিচিত হত। এগুলো পরিচালনার ব্যয় অর্থাৎ শিক্ষকদের বেতন মক্তব প্রতিষ্ঠারাই দান, সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করার মাধ্যমে নির্বাহ করতেন। গ্রামীণ একটি মক্তবে নজরুলের পাঠগ্রহণ শুরু। তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর।

একবার কিছু শোনে ও দেখেই তিনি তা মনে রাখতে পারতেন। কিন্তু শিশুসুলভ সকল প্রকার চঞ্চলতা-ও তাঁর ছিল। পিতৃবিয়োগের পর সেই চঞ্চলতার যেন ছেদ পড়ল। তার মেধাগুণে তিনি হয়ে উঠলেন শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে সেই মক্তবেরই শিক্ষক। একজন শিশু শিক্ষক। এক শিশু পড়াতে লাগলেন অন্য শিশুকে। উদ্দেশ্য নিজের অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া। কিছু দেয়ার মাধ্যমে আনন্দ লাভ-যে আনন্দ মহৎ।

তার ভেতরে ছিল এক ভবঘুরে মন। মক্তব ছেড়ে ভর্তি হলেন উচ্চ বিদ্যালয়ে-মাথরুন নবীন চন্দ্র ইনস্টিটিউশনে। স্থিত হলেন না সেখানে। গ্রামীণ নিসর্গ, প্রকৃতি, ঋতুচক্র যেমন তার মনকে প্রভাবিত করে, অজানাকে জানার এবং অচেনাকে চেনার নিরন্তর কৌতূহল-ও তাকে আন্দোলিত করে। ঘরছাড়া স্বভাবের এই শিশু অন্য সকল মানুষের জীবন ও সংগ্রামের রহস্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ঘর তাকে বাঁধতে পারে না। বিশাল আকাশকেই তার মনে হয় তার মাথার ওপরে খাঁচার মত উপুড় হয়ে তাকে আটকে রেখেছে। তাই তিনি মনে মনে ‘ভূলোক, গোলোক ও দ্যুলোক’ ছাড়াতে চাইতেন কেবলÑনিজেকে মুক্ত করতে চাইতেন। মনের আহ্বানে সাড়া দিতেন, গান শোনাতেন, শুনে শুনে গাইতেন।

তারই পরিক্রমায় গ্রামীণ লোক-নাট্য ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দিলেন। সেখানেও তার দলপতি উস্তাদ শেখ চকোর গোদা ও বাসুদেব তাকে সেরাদের ‘সেরা’ বলে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি শুধু লেটোর দলে গানই গাইলেন না। গানের পালা রচনা করলেন। ‘ মেঘনাদ বধ’, ‘হাতেম তাই’ ‘চাষার সঙ’, ‘আকবর বাদশা’ প্রভৃতি পালা রচনা করতে যেয়ে হিন্দু পুরাণ রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বেদ যেমন পড়লেন, তেমনি পড়লেন কোরান-হাদিস, ইতিহাস-কাব্য প্রভৃতি। মক্তব-বিদ্যালয় ছেড়ে হয়ে গেলেন প্রকৃতির ছাত্র।

কিন্তু আগুন যে ছাই চাপা থাকে না। প্রতিভার আগুনের শিখা দেখে ফেললেন পুলিশের এক দারোগা, যিনি নিজেও কাজী বংশের সন্তান, রফিজুল্লাহ। চাকরি করেন আসানসোলে। কিন্তু তার জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলা। নি:সন্তান রফিজুল্লাহ মায়ায় পড়ে গেলেন শিশু নজরুলের। নিয়ে এলেন জন্মস্থান ময়মনসিংহে। ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে ভর্তি করে দিলেন দরিরামপুর হাই স্কুলে। কেমন ছিলেন তিনি এখানে ? জন্মভিটা চুরুলিয়া থেকে কয়েকশত কিলোমিটার দূরে-মাতৃআঁচল ছিন্ন পিতৃহীন শিশু! সহপাঠীরা কেউ লিখে রাখেন নি।

১৯১১ সনে ময়মনসিংহে আনীত হয়ে থাকলে পেরিয়ে গেছে একশত তের বছর। সহপাঠীদের কেউ বেঁচেও নেই। কিন্তু বেঁচে আছে নানারূপ গল্প ও কল্পনা। বড় বড় মানুষদের নিয়ে এমনই হয়। তাদেরকে কেন্দ্র করে অনেক কাহিনী তৈরী করা হয়। মানুষ জীবনের গল্প শুনতে ভালবাসে। তাই জীবন নিয়ে গল্প তৈরী হয় কিন্তু তা জীবনের অংশ না-ও হতে পারে। কেউ বলেন নজরুল ময়মনসিংহের ত্রিশালে এক বছর ছিলেন, কেউ বলেন দেড় বছর, কেউবা দু’বছর। প্রথমে ছিলেন কাজী রফিজুল্লাহ’র বাড়ি। এরপরে ছিলেন ত্রিশালের নামাপাড়ায় বিচুতিয়া বেপারির বাড়ি। এই দু’বাড়িতে থাকা নিয়ে অবশ্য কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু তর্ক আছে তার প্রস্থান নিয়ে।

কেউ বলেন তিনি স্কুল-শিক্ষকের কাছে সুবিচার না পেয়ে, কেউ বলেন অভিমান করে চলে গিয়েছিলেন। তবে তিনি কাউকে না বলেই চলে গিয়েছিলেন এটাই প্রতিষ্ঠিত মত। কিন্তু গেলেন কোথায় ? সেই জন্মস্থানে। তবে এবার চুরুলিয়া থেকে বেশ দূরে রাণীগঞ্জের শিহাড়সোল সরকারি স্কুলে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ১৯১৫ সন। পড়াশোনা করলেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দশম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা। নজরুলের চঞ্চলমতি, ঘরছাড়া ও ভবঘুরে স্বভাবের জন্যে যেন বেমানান। প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হলেন।

মেধাবী বলেই নিয়মিত মাসিক ৭ টাকা বৃত্তি পেতেন। ঐ সময়ের হিসাবে মাসিক ৭ টাকা অনেক টাকা। মাসিক ৩ থেকে ৪ টাকায় সকল প্রকার থাকা-খাওয়ার ব্যয় মিটিয়ে অনায়সে চলা যেত। দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে এন্ট্রান্স বা মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসার কথা। সে প্রস্তুতি চলছে। নিচ্ছেন-ও। হঠাৎ ব্রিটিশ শাসকদল কর্তৃক যুদ্ধযাত্রার ডাক। কিন্তু প্রলোভন দেখানো হলো যে ব্রিটিশরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জিততে পারলে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে দিয়ে যাবে। জন্মাবধি স্বাধীনতা ও মুক্তি-প্রত্যাশীর হৃদয়ে নাড়া দিল। তিনি সাড়া দেবেন কিনা দোদুল্যমান। কিন্তু কপট ব্রিটিশ জাতি বাঙালিকে উত্তোজিত করার নিমিত্ত অপবাদ ছড়ালো যে বাঙালিরা ভীরু।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকার কবিভবনে নজরুল

তারা লড়তে, সংগ্রাম করতে, যুদ্ধে যেতে ভয় পায়। স্বল্পকাল পরের (১৯১৭ সালের মাত্র চার বছর পর লিখিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ১৯২১ সনে) বিদ্রোহী কবির রক্ত ক্ষোভে নেচে উঠলো। কে রুখে তার মুক্তির আকাক্সক্ষা! বাঙালি সেনাদের নিয়ে গঠিত ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে নাম লিখিয়ে বাস্তব যুদ্ধযাত্রা করলেন। গন্তব্য করাচি। ১৯১৭-১৯১৯ সাল অব্দি কঠোর সৈনিক জীবন। সুকঠিন নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যেই সাধারণ সৈনিক থেকে হাবিলদার পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি আরবি-ফার্সি সাহিত্যে অধ্যয়নসহ সঙ্গীতে ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য মহাকালের এক অবিস্মরণীয় কবি-শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে করাচির জীবনই ছিল এক সাজঘর। যুদ্ধযাত্রার পূর্ব পর্যন্ত নজরুল শিশু। কিন্তু যুদ্ধফেরত নজরুল এক পরিপূর্ণ তরুণ ও চিরকালীন শিল্পী-যার মন ও মানস শিশুর মত আজীবন নিষ্পাপ।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট 

;