Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

ধুসাইলা

ধুসাইলা
অলঙ্করণ কাব্য কারিম
দেবদুলাল মুন্না


  • Font increase
  • Font Decrease

এক.
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে আলিসারকুল গ্রামে যেতে লোকাল বাসে সময় লাগে মাত্র বিশ-পচিশ মিনিট। বশিরকে শহর চৌমোহনা থেকে তার স্কুল-শিক্ষক স্ত্রী আলতাবানু বাসে তুলে দেন সন্ধ্যা সাতটা দশে। শহর চৌমোহনা থেকে তার বাসায় ফেরার দূরত্ব মাত্র পাঁচ মিনিটের। বাসা কলেজ রোডে, থানার পাশেই। বাসায় ফিরে আলতাবানু পরীক্ষার খাতা দেখার জন্যে মেঝেতে সব বিছিয়ে নিয়ে বসে টিভি ছাড়েন সারেগামা গানের অনুষ্ঠান দেখার জন্য। নোবেল গাইবে। তো, ওই ভারতীয় চ্যানেল খুঁজতে গিয়ে একটি চ্যানেলে গিয়ে দৃষ্টি আটকে গেল। ‘আল্লাগো’ বলে হাহাকার করে উঠলেন। এই চিৎকারকে হাহাকার বলা যায় না। হাহাকার সেটি যেখানে হারানোর ব্যথা থাকে। এই চিৎকারকে নিরুপায় বিলাপ হয়তো বলা যায়। কারণ ‘আল্লাগো’ বলার মধ্যেও ভরসা যেন নেই। যেন সব শেষ। যেন আর কোনো অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। কিন্তু আলতাবানু ঘুম থেকে জেগে ওঠেন যখন কালিঘাট রোডের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাদা চাদর বিছানো বিছানায় তখন রাত্রি অনেক। বর্ষাকাল। হাসপাতালের পাশেই ধানি পরিত্যক্ত ডোবা মতন জায়গা। ব্যাঙের কান্না। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে বোঝেন তার হাতের কোথাও স্যালাইনের সিরিঞ্জ ঢোকানো। টান পড়ে। তাই ধীরে ধীরে চোখ বুজে খোলেন। কেউ নেই আশপাশে। করিডরে। দোতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তিনি রুম থেকে বেরিয়ে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ান। আলিসারকুল ইউনিয়ন অফিসের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটি ধলামন্দিরের দিকে গেছে ওই পথ ভেসে ওঠে আলতাবানুর সামনে। ঠিক এভাবে বলা মনে হয় ঠিক না। আলিসারকুল, পুরো গ্রামটিই যেন দুলছিল। ছোপ ছোপ সবুজ ঘাসের দলার মতো। এ গ্রামটিতে অদ্ভুত এক রহস্যময়তা বিরাজ করে। কারণ ওই একটাই গ্রামের মানুষদের মধ্যে রয়েছে আত্মহত্যা করার চরম প্রবণতা। প্রায় ১৫ দিন পরপর না হলেও একমাসের মধ্যে তো অন্তত একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটবেই এই আলিসারকুলে। কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটে? এজন্য দেশি ও বিদেশি দুটো এনজিও কাজ করছে। আলিসারকুল গ্রামটি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। উপজেলা সদর দফতর থেকে ২৮ কিলোমিটার এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর দফতরের ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গ্রামের মোট ভৌগোলিক এলাকা ৫৭৩.৫ হেক্টর। ২০০৯ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রামটিতে ১,৫২২টি পরিবার বাস করত, আর তখন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১২,৬৪৪ জন। বর্তমানে গ্রামটিতে ৩২০টি পরিবারের বাস এবং মোট লোকসংখ্যার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৫০০।

আত্মহত্যাকারী গ্রাম হিসেবে এর একটা বদনাম আছে। গত বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায়, ১১০ দিনে প্রায় ১২০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে এই গ্রামে। সাম্প্রতিক অতীতে এত বড় আত্মহত্যার ঘটনা খুব একটা শোনা যায়নি। কিন্তু গ্রামবাসীদের এক অন্ধ ধারণা হচ্ছে কোনো দুষ্ট আত্মাই এর জন্য দায়ী। সেই দুষ্ট আত্মাই নাকি একের পর এক গ্রামবাসীকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করছে। চলতি বছরের গত জুন পর্যন্ত ১৯টির মতো আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এমন তথ্য দিয়েছে দেশি এনজিও ‘মানুষের পাশে আমরা’ (মাপাআ)। মাপাআ’র কো-অডিনেটর সুশান্ত ভৌমিক বিষণ্ণতার কারণ হিসেবে মারাত্মক পরিমাণে কীটনাশক দেওয়া ছাড়াও কৃষকদের মধ্যকার আর্থিক দৈন্যতার কথা বলেন। দেখা যায় চাষাবাদের জন্য বা মেয়ের বিয়ের জন্য লোন করেছেন, কিন্তু সময়মতো সে অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় তাদের মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করে এবং পরবর্তীতে যা বিষণ্ণতায় রূপ নেয়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি চীনের কথা উল্লেখ বলেন, একসময় চীনের একটি গ্রামেও এধরনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। পরে বিভিন্ন গবেষণার মধ্য দিয়ে জানা যায়, একটি বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে যেটি বিষণ্ণতার কারণ। চীনের বড় একটি গ্রাম যার নাম—‘ঝেঝাং’, সেটি দুভাগে বিভক্ত ছিল ‘সিয়ান’ নদীর কারণে। যাতায়াতে ঝামেলা ছিল। ফলে ঝেঝাং গ্রামে সরকার-সরবরাহকৃত ভালো মানের কীটনাশক পৌঁছাতে দেরি হতো বলে ঝেঝাংবাসীরা নিম্নমানের কীটনাশক ‘খিটাসান’ বানাত এবং এটি ব্যবহারে ফসলের ফলন ভালো হলেও এরমধ্যে থাকা একধরণের সীসা বাতাসে মিশে থাকত যেটি মানবমনের ওপর বিষণ্ণতার ছাপ ফেলত। পরে এ থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পেতে একটা সেতু নির্মাণ করা হয় এবং সেই সেতু নির্মাণের আগে কাজ শুরুর দিন সাতজন মানুষের কাটামুণ্ডু দেওয়ার কথা চালু থাকলেও সেটি সত্য নয় বলে জানান সুশান্ত ভৌমিক।

দুই.
আলতাবানু জানেন না কতক্ষণ স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্যাঙের কান্না শুনছিলেন! তবে এটুকু মনে আছে তিনি বারান্দার মেঝেতে পড়ে যাওয়ার সময় পাশের কেবিনের রোগীর দুজন স্বজন তাকে ধরেন। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে বেশ দেরিতে। ততক্ষণে দেখেন তার কেবিনের সামনে বেশ ভিড়। বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এক ডাক্তার তার পালস, রক্তচাপ এসব মাপার পর এক সাংবাদিক ঢোকেন। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে। তাকে ঘিরে বেশ কিছু মানুষ পেছনে। সাংবাদিক আলতাবানুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার স্বামী বশিরের খবর জানেন তো?’ আলতাবানু কী ভাবেন সেটি আমাদের জানার কথা নয়। আমরা শুধু এখন পর্যন্ত জানি যে তিনি গতরাতে পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য মেঝেতে বসে টিভি অন করেছিলেন। আলতাবানু বলেন, ‘অয়, জানি। কাইল রাইত আমার জামাই ধুসাইলাতে(গণপিটুনি) মরছইন আলিসারকুলের ইউনিয়ন অফিসোর রাস্তাত।’ সাংবাদিক জানতে চান, ‘তার ব্যাগে একটা শিশুর গলা কাটা লাশ পাওয়া গেছে। শিশুটি ওই গ্রামের নেজামত মাস্টারের সাত বছরের নাতির। নেজামত মাস্টারের সাথে কি আপনার স্বামীর বিরোধ ছিল?’ ডাক্তার এগিয়ে এসে তখন বলেন, ‘রোগিনী অসুস্থ।’ সাংবাদিক কী ভাবেন কে জানে এরপর আর কোনো প্রশ্ন না করে বেরিয়ে যান কেবিন থেকে। এর একটু পরই পুলিশ আসে একদল। দুপুরে নার্স খাবার দেওয়ার আগে। আলতাবানু তখন গোসল করছিলেন। বেরুতেই নার্স বলেন, ‘ভয় পাইহৈন না। পুলিশ আইছে। আগে খাবার খাইলান। মরল জামাই আফনার, দিগদারিও শুরু হৈল আফনার।’

আলতাবানু কারো সাথে কিছু না বলে খাবার খেলেন। ওষুধ খেলেন। ঘুমিয়ে পড়লেন। ‘ইলাকান অয় না আলতা, ইলাকান মরাত গেছলায় কেরলাগি’—কেউ যেন ফিসফিসিয়ে আলতাবানুর কানে বলে। আলিসারকুলের ধলামন্দিরের পুবদিকে নিকুঞ্জ গ্রামের সীমানা ঘেঁষে যে রাণীদিঘি, সেই দিঘির সিঁড়ির ওপরই তো পড়ে ছিল আলতাবানু সেই বিকালে। আশ্বিনের শেষ বিকাল। ‘ওরাসন’ নামের কীটনাশক খেয়েছিল। ওরাসন ধানের ক্ষেতে দেওয়া হয় যাতে কীটপতঙ্গের উৎপাত না হয়। বাপজান কিনে রেখেছিল। লাল গুড়ের মতন। খেতে তিতা। বুক জ্বলছিল ঢোক গেলার পর। তখন আলতাবানু সিঁড়ির ওপর পড়ে গিয়েছিল। তার তখন বড় সাধ ছিল দিঘির পানিতে পড়ে মরবে। মরার পর তার লাশ ভেসে থাকবে। সবাই তার লাশ দেখার জন্য ভিড় করবে দিঘির পাড় ঘেঁষে। কিন্তু দিঘির পানিতে সেদিন ঠাঁই পায়নি আলতাবানু। ঠাঁই পেয়েছিল নকুলের কোলে। নকুল দ্বিজদাস। কীর্তন করে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে বেড়ায়। শীতকালে দুর্গাপুজার সময় বিভিন্ন এলাকায় যাত্রাপালা শুরু হলে যাত্রাদলে ‘বিবেক’-এর ভূমিকায় অভিনয় করতে গিয়ে গ্রামছাড়া হয়। নকুলের সত্যিকার অর্থেই কেউ নেই। ধলামন্দিরে ঘুমায়।

বাবা-মা দুজনই একরাতে নিরুদ্দেশ হন যখন নকুলের বয়স মাত্র বছর আটেক। নকুলের বাবা-মায়ের নিরুদ্দেশের কারণ গ্রামবাসীর অজানা। এরপর কিছুদিন সতীশ মণ্ডলের বাড়িতে থাকে। সেখান থেকে কোনো অজানা কারণে তার ঠাঁই হয় ধলা মন্দিরে। সেই প্রথম আলতাবানু নকুলকে দেখে। কত নাম শুনেছে তার। সীতার বনবাস, গলি থেকে রাজপথ, আনারকলি, বাঁদী থেকে বেগম—নামের কত কত যাত্রাপালায় সে অভিনয় করে বেড়ায় এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে। কত নামডাক তার। সেই নকুলদার কোলে তার মাথা! নকুল তার হাতের দুটো আঙুল কায়দা করে কিঞ্চিত আলতার মুখে ঢুকিয়ে বমি করায়। দিঘির পানি নিয়ে চোখে মুখে কপালে ঝাপটা দেয় সেই বেঁচে ওঠে আলতাবানু, দিঘির পাড় বেয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে যেন চারিদিকে সুনশান নীরবতা। সেই প্রেম শুরু হয় নকুলের সাথে আলতাবানুর। খুব ভোরে মন্দিরের জন্যে নকুল ফুলের সন্ধানে গেলে আলতাবানু ফজরের নামাজ পড়ে অপেক্ষায় থাকত জানালা ফাঁক করে, কখন নকুল এসে দাঁড়াবে। শুরুটা এভাবে। শেষও তো থাকে। নকুল মনে হয় এভাবে শেষ হবে জানত না। শেষ হলো এক শুক্কুরবার। নেজামত মাস্টারের উঠান বাড়িতে। মৌলভী ডেকে নকুলকে মুসলমান বানানো হলো। কলেমা পড়ল। নতুন নাম হলো বশির। এরপর বিয়ে হলো আলতাবানুর সাথে। তখন আলতাবানু শ্রীমঙ্গলে একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। নকুল অষ্টম শ্রেণী-পাস বেকার। এরপর থেকে তাদের বসবাস শ্রীমঙ্গলের কলেজ রোডে থানা সংলগ্ন ভাড়া বাড়িতেই। এসব পুরনো কথা মনে পড়ে না কখনোই আলতাবানুর। স্বপ্নেও না। কিন্তু বশির খুন করতে পারে নেয়ামত মাস্টারের নাতিকে এটি ভাবতেও পারছেন না। ঘুম অনেক আগেই ভেঙেছিল। কিন্তু নিরুপায় মানুষের জীবনে এ সময়টাও মূল্যবান যে সে যখন চোখ বুজে অনেক কিছু তার স্মৃতিপটে ভাসায়। এই স্মৃতিপটে নিরুপায় মানুষ ঘটনাসমূহ ভাসিয়ে থাকে দুটো কারণে হয়তো-বা। যখন তার করার কিছু থাকে না। যখন সে আশপাশ থেকে পালাতে চায়।

তিন.
নির্বিরোধী মানুষের বিপদ কম হয় সেটিই সবাই জানেন। কিন্তু আমরা যারা আলিসারকুল গ্রামের ঘটনাবলির দিকে নজর রাখছিলাম, তারা অনেক অনেক কাল পর জানতে পারি বশির ‘ধুসাইলা’তে (গণপিটুনি) মারা গিয়েছিলেন। তার কাছে একটা বড়ো চটের ব্যাগে যদিও নেজামত মাস্টারের নাতির গলা কাটা মুণ্ডু পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু এর রহস্য আমরা আজও জানি না। কারণ বশির নির্বিরোধী মানুষ ছিলেন এবং তিনি মারা যাওয়ায় তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শিশুর গলা কাটা মুণ্ডুর বিষয়ে কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। তখন আমরা ভাবি, শিশুটিকে কে খুন করতে পারে! কেউ কেউ ভাবি নিছক নেজামত মাস্টারের কোনো শক্রপক্ষের কাজ এটি। এটি করে কোনো চটের ব্যাগে কাটা মুণ্ডু ঢুকিয়ে দিয়ে নির্বিরোধী বশিরকে ‘ছেলেধরা-ছেলেধরা’ বলে মারতে থাকলে আরো জনতা এসে যোগ দেয় এবং তারাও মারতে শুরু করে বশিরকে, হয়তো সে সুযোগে নেজামত মাস্টারের প্রকৃত খুনী ও সহযোগীরা পালিয়ে যায়। কেউ কেউ ভাবেন, পদ্মাসেতু হচ্ছে। একলাখ শিশুর গলাকাটা মুণ্ডু লাগবে। সে কারণে বশির এমন করতে পারে। যদিও সরকার পক্ষ বারবার বলেছে এসব নিছক গুজব। আবার অনেকের ধারণা, নকুল ‘বশির’ হলেও নওমুসলিম হিসেবে তাকে ওই গ্রামের অনেক ধর্মান্ধ মানুষই সুযোগ খুঁজছিল শায়েস্তা করার। কিন্তু এ যুক্তি মেনে নেওয়া যায় না, কারণ অল্প শায়েস্তা করার জন্য গলা কাটা মুণ্ডু লাগবে কেন? মাপাআ’র কো-অডিনেটর সুশান্ত ভৌমিক কথাপ্রসঙ্গে আমাদের বলেন, ‘ধুসাইলা একটি মাস-সুইসাইডাল সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার। আলিসারকুলের মানুষকে কাউন্সিলিংয়ের পাশাপাশি পলিটিক্যালি কনসাসও হতে হবে। নাহলে এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’

সন্ধ্যা নামে। আমরা মাঝে মাঝে আলিসারকুলের ইউনিয়ন অফিসের সড়কের নিমগাছটার নিচে যেখানে ক্যারাম খেলা হয় সেখানে যাই, রাস্তার ধারের শালগাছগুলির বড় বড় পাতা হাতির কানের মতো দোলে। বিধবা সুন্দরীর মায়ের চা দোকানের কাঠের বেঞ্চিতে বসি, চা খেতে গেলে মুতের গন্ধ। কিরে মাইনকা, মুতের গন্ধ কেরলাগি? কোনো জবাব নাই, দেখি নিমগাছের একটু দূরে পাকুড়গাছের নিচে বস্তা বিছিয়ে আলতাবানু বসে থাকে। বসে থাকে নাকি আমরাই গল্প বানাই কে জানে? আলতাবানু বসে বসে মুতে। বস্তা ভিজে। নিউজপেপার ভিজে। সে মুত বহে আসে আমাদের দিকে। আমরা যাতে না ভাসি সেই ভয়ে আলগা আলগা থাকি।

আপনার মতামত লিখুন :

কালোত্তীর্ণ ল্যাতিন সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস

কালোত্তীর্ণ ল্যাতিন সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস
শুভ জন্মদিন, হোর্হে লুইস বোর্হেস

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় আর্জেন্টাইন লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে। ছিলেন তিনি বহুমাত্রিক একজন লেখক। রচিত ছোটগল্পের জন্য তিনি বেশি বিখ্যাত হলেও, সাহিত্যজীবনে একাধারে কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সাহিত্য সমালোচনাও লিখেছেন তিনি। অনুবাদক হিসেবেও দেখিয়েছেন অসাধারণ সব কাজ। তাঁর অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গিয়েছে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মারিও বার্গাস ইয়োসা, মিশেল ফুকোর মতো তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকদের। ২৪ আগস্ট এই বহুপ্রজ প্রতিভার ১২০তম জন্মবার্ষিকী।

স্প্যানিশ ভাষার লেখক ছিলেন তিনি। ‘তিনি শুধু স্পেনের লেখক হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁর অসাধারণ কাজের জন্য পরিচিত পেয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী। স্প্যানিশ সাহিত্যকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর অন্যতম সেরা দুটো কাজ ‘ফিকশনস’ ও ‘এল আলেফ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। নাটকীয়তা, রহস্য, দর্শন, কাল্পনিক বিষয়বস্তু ও মিথলজির সম্মিলনে লেখা তাঁর বিভিন্ন ছোটগল্পের সঙ্কলন এই বই দুটো। ‘দার্শনিক সাহিত্য’ ও ‘ফ্যান্টাসি’ ঘরানায় বেশ কিছু চমৎকার কাজ উপহার দিয়েছেন তিনি। অনেকেই মনে করেন, ২০ শতকে ল্যাটিন আমেরিকার ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ বা ‘জাদু-বাস্তবতা’র শুরুটা হয়েছিল হোর্হে লুইস বোর্হেসের কাজ দিয়েই। সাহিত্যজীবনের শেষদিকে তাঁর রচিত কবিতাগুলোকে তুলনা করা হয় স্পিনোজা, ক্যামোস ও ভার্জিলের কাজের সাথে।

বোর্হেসের জন্ম ১৮৯৯ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আয়ার্সের এক শহরতলীতে। পরে তিনি তাঁর পরিবারের সাথে চলে আসেন সুইজারল্যান্ডে। ১৯২১ সালে আবার আর্জেন্টিনাতে ফিরে আসার পর তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হতে থাকে সেখানকার বিভিন্ন পরাবাস্তব সাহিত্যভিত্তিক জার্নালে। এরপরে গ্রন্থাগারিক ও পাবলিক লেকচারার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৫৫ সালে ‘জাতীয় পাবলিক লাইব্রেরি’র পরিচালক ও বুয়েনোস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। তবে, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৫৫ বছর বয়সে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যান তিনি। তবে, অনেক সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, তাঁর এই ক্রমবর্ধমান অন্ধত্ব কল্পনাশক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবনী সাহিত্য প্রতীক তৈরিতে সাহায্য করেছিল। সারাজীবন ধরে কবিতা লিখলেও অন্ধত্বকে বরণ করে নেওয়ার পর তাঁর কবিতা লেখার স্পৃহা যেন বেড়ে যায়। তখন পুরো সাহিত্যকর্মটিই মনে ধরে রাখতে পারতেন তিনি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634890778.jpg

বোর্হেসের বিখ্যাত ছোটগল্পের সঙ্কলন ‘এল আলেফ’ ◢ 


বিভিন্ন সময়ে লেখা তাঁর ছোটগল্পগুলো তাঁর জীবদ্দশায় সংলিত হয়েছে বিভিন্ন গল্পগ্রন্থে। তাঁর ছোটগল্পের সঙ্কলনের মধ্যে রয়েছে ‘দ্য গার্ডেন অব দ্য ফার্কিং পাথস’ (১৯৪১), আর্টিফিসেস (১৯৪৪), দ্য আলেফ (১৯৪৯), দ্য মেকার (১৯৬০), ল্যাবিরিন্থ (১৯৬২) ‘ব্রডি’স রিপোর্ট’ (১৯৭০), ‘দ্য বুক অব স্যান্ড’ (১৯৭৫) এবং শেক্সপিয়ার’স মেমরি (১৯৮৫)।

বিশ্বব্যাপী বোর্হেসের প্রধান পরিচয় মূলত গল্পকার হিসেবে হলেও গল্পকার বোর্হেসের আত্মপ্রকাশ কিন্তু তিনটি কবিতার বই ‘বুয়েনোস আইরেসের জন্য আকুলতা’ (১৯২১) , ‘সামনের চাঁদ’ (১৯২৫), ‘সান মার্তিন নোটবুক’ (১৯২৯) এবং পাঁচটি প্রবন্ধের বই দিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634957228.jpg

বোর্হেসের নির্বাচিত কবিতাগ্রন্থের প্রচ্ছদ। নিজের অন্যান্য সাহিত্য সত্তার চেয়ে কবি সত্তাকেই বেশি ভালোবাসতেন তিনি ◢ 


মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত তাঁর সর্বশেষ বইটিও কবিতার বই: ষড়যন্ত্রকারী । অসাধারণ সব গল্প, প্যারাবোল আর প্রবন্ধ লেখা সত্ত্বেও বোর্হেস নিজেকে প্রথমত এবং প্রধানত কবি হিসেবেই বিবেচনা করেছেন সবসময়। তাঁর গল্পগুলো গল্পের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ করার পরেও তা সবসময় কবি মনের গভীরতম বোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত।

বোর্হেস হয়তো এই কারণে তাঁর অন্য সব সত্তার চেয়ে কবি সত্তাকে বেশি গুরুত্বের সাথে দেখতেন। ১৯৭১ সালে বোর্হেস তাই কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই বলছেন যে, “ভবিষ্যতে হয়তো কবিতার জন্যই মানুষ আমাকে মনে রাখবে বা ছুড়ে ফেলে দেবে।” তাঁর এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন তাঁর কবিতাকে বা কবিসত্তাকে।

একজন উল্লেখযোগ্য অনুবাদকও ছিলেন বোর্হেস। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, পুরাতন ইংরেজি ও পুরাতন নর্স ভাষা থেকে তিনি বই অনুবাদ করতেন স্প্যানিশ ভাষায়। বুয়েনোস আয়ার্সের স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর অনুবাদ করা অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য হ্যাপি প্রিন্স’ গল্পটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা। তখন তাঁর বয়স ছিল কেবল নয় বছর। এরপর প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর ধীরে ধীরে অনুবাদের কাজে আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে যান। উইলিয়াম ফকনার, হারম্যান হেস, এমব্রোস বিয়ার্সে, ফ্রাঞ্জ কাফকা, রুডইয়ার্ড কিপলিং, এডগার অ্যালান পো, ওয়াল্ট হুইটম্যান, ভার্জিনিয়া উলফের মতো নামকরা লেখকের সাহিত্যকর্ম স্প্যানিশে অনুদিত হয়েছে তাঁর হাত ধরেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634986840.jpg

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থেরও অনুবাদ স্প্যানিশ ভাষায় করেছিলেন বোর্হেস ◢ 


জার্মান এবং রুশ ভাষা থেকে তিনি অনুবাদ করেছেন গ্যেটে ও দস্তভয়স্কি। মূল আরবি থেকে অনুবাদ করেছেন সহস্র এক আরব্য রজনী এবং কোরান শরীফ। পাঠকেরা জেনে আনন্দিত হবেন যে রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থেরও অনুবাদ করেছেন তিনি। তবে বাংলা থেকে নয়, ইংরেজি অনুবাদ থেকে।

বোর্হেসের সাহিত্যকর্মগুলো আধুনিক সাহিত্যেরই অংশ যা প্রভাবিত হয়েছে প্রতীকীবাদের মাধ্যমে। ভ্লাদিমির নবোকভ ও জেমস জয়েসের মতো তিনিও স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে ব্যাপকতর প্রেক্ষাপটের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। যেখানে নবোকভ আর জেমস জয়েসের সাহিত্যকর্মগুলো হতো আকারে বিশাল, বোর্হেসের কাজগুলো হতো আকারে বেশ ছোট। আবেগচালিত শিল্পের সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রচারমাধ্যমের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিনিধিত্ব করতেন বোর্হেস। যদি শিল্প কোনো হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে বোর্হেসের আগ্রহ ছিল এই হাতিয়ারকে মানুষের সাথে যুক্ত করে ব্যবহার করার দিকে।

বোর্হেস ছিলেন তাঁর পরের প্রজন্মের অনেক কবি-সাহিত্যকিকদের অনুপ্রেরণার উৎস। সেই লেখকেরা পরে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন বোর্হেসের প্রতি তাদের অনুরাগের কথা। কিংবদন্তি লেখক গার্সিয়া মার্কেস উচ্ছ্বাসের সাথে বলেছেন, “তাঁর ব্যাপারে আমার কোনো সমস্যা নেই। বোর্হেসের প্রতি আমার প্রবল অনুরাগ, প্রতি রাতে তাঁর লেখা পড়ি। বুয়েনোস আইরেস থেকে একটিমাত্র জিনিসই কিনেছি আমি আর তা হলো বোর্হেসের রচনা সমগ্র। আমি যেখানেই যাই আমার স্যুটকেসের ভেতর খণ্ডগুলি থাকে, প্রতিদিন পড়ি। তাঁর গল্পগুলি ফাঁদতে গিয়ে তিনি যে সুর ও স্বর বাঁধেন, সেটা ভীষণ পছন্দ আমার।”

লাতিন আমেরিকার আরেক বামপন্থী মহান ঔপন্যাসিক আউগুস্ত রোয়া বাস্তোসও বোর্হেসের সাহিত্যিক গুরুত্বকে সম্ভ্রমের সাথেই স্বীকার করে নিয়ে বলেন, “আমার ধারণা বোর্হেসের যা টিকে থাকবে তা হলো সাহিত্যের বৈপ্লবিক রূপান্তরের সম্পর্কিত তাঁর কাজগুলো। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে বোর্হেস ছিলেন বিপ্লবী; লাতিন আমেরিকায় তার সাহিত্যিক অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

সাহিত্যে অবদানের জন্য ‘প্রিক্স ইন্টারন্যাশনাল’-এর মতো পুরষ্কার তিনি লাভ করেন ১৯৬১ সালে। ১৯৭১ সালে লাভ করেন ‘জেরুজালেম পুরস্কার’। ১৯৮৬ সালে মৃত্যবরণ করেন তিনি। তবে, প্রস্থানের পর পৃথিবীব্যাপী তাঁর সাহিত্যকর্ম ও তাঁকে নিয়ে আগ্রহ ক্রমে বাড়ছে। হচ্ছে তাঁকে নিয়ে অনেক গবেষণা। যা একজন কালজয়ী ও প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর গুরুত্বের ব্যাপারটাকেই প্রতিনিয়ত তুলছে নতুন উচ্চতায়।

মোহন, কয়েকটি রাত, অশ্বথগাছ ইত্যাদি

মোহন, কয়েকটি রাত, অশ্বথগাছ ইত্যাদি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

রাত.
এত রাতে কারো সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নাই। তবু হাটবার বলে মোহনের মনে হয় নিশ্চয়ই দলছুট কেউ একজনের দেখা পাওয়া যাবে। সে সিগারেটটা হাতে ধরে (যেহেতু সে ভুল করে আগুন আনে নাই) খানিকটা আশার আলো জাগিয়ে রাখে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে কিছুক্ষণের মধ্যে একজন হাজির হয়ে মোহনের আশার সলতেটা জ্বালিয়ে দেয়। লোকটাকে দেখে মোহন খুশি হয়ে ওঠে। সে প্রথম দেখতে পায়, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটা আলো হেঁটে হেঁটে আসছে। এ আসার গতিটা এমনই নিশ্চিত যে, এ কোনো জোনাকি পোকার নয়, মানুষের। ফলে আলোটা তার কাছাকাছি হলে সে বিড়বিড় করে বলে, আগুনটা দেওয়া যাবে?
মোহনের কথাগুলো লোকটার কানে পৌঁছাল বলে মনে হয় না। লোকটা মোহনকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে থাকে।
মোহন পুনরায় বলে, আগুনটা দেওয়া যাবে?
এবার মনে হয় শুনতে পেল। লোকটা পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে মোহনের দিকে সিগারেটটা বাড়িয়ে বলে, নিশ্চয়ই।
সিগারেটটা নিতে গিয়ে মোহন টের পায়, লোকটার হাত কাঁপছে। কাঁপছে যে তা নিশ্চিত। আর না হয়, হাতে ধরে রাখা সিগারেটটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে নিচে পড়ে যাবে কেন? মোহন অবশ্য উঠিয়ে নেয়, নিজেরটায় ধরিয়ে ফেরত দেয়। তারপর খুব মৃদু স্বরে ধন্যবাদ জানিয়ে অশ্বথগাছের দিকে এগুতে থাকে।
ধন্যবাদের উত্তরে লোকটা কথা বাড়ায় না। ঘুরে সোজা হাঁটা দেয়। কয়েক সেকেন্ডের দেখায় লোকটাকে মোহনের মনে হয় কেমন চটপটে, অস্থিরচিত্তের। পোশাক-আশাকে অবশ্য শহর থেকে আসা লোক বলেই মনে হয়।

অনেকক্ষণ ধরে সিগারেট টানে। একটার আগুন থেকে আরেকটা। মাথার উপরে থাকা অশ্বথপাতায় বাতাস এসে মৃদু কলকাকলির জন্ম দেয়। সঙ্গে যোগ হয় জেগে ওঠা দু-একটা পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনে সে গাছের এদিক-সেদিক চোখ ঘুরিয়ে উৎস খোঁজার চেষ্টা করে। অন্ধকারের কারণে জায়গাটা ঠিক ঠাওর করতে না পেরে সামনে কী আছে দেখার চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ এভাবে কাটিয়ে মোহন সড়ক থেকে নেমে পড়ে। ধানক্ষেতের আইল ধরে গ্রামের দিকে হাঁটা দেয়। গ্রামের পথটায় পৌঁছামাত্র একটা টর্চের আলো এসে মুখে পড়ে। তারপর আরেকটা টর্চের আলো। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। এতে লাইট দুটা নিভে গিয়ে একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। শেষবার জ্বলে ওঠার সঙ্গে লাইট দুটা একটু এগিয়ে এসেছে বলেও মনে হয়। এগিয়ে এসে নিভে যায়। নিভে গিয়ে আর জ্বলে না। মোহন দাঁড়িয়ে আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো নিভে যাওয়ার পরও সে দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করে। কিছু ঘটছে না দেখে মোহন আলোর উৎসের দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে।

বাড়িটার চারদিক নানান গাছ ঘিরে রেখেছে। দেখে মনে হয় গাছগুলো গৃহপালিত। গাছের ছোট, বড়, লম্বা, চিকন এরকম নানা পাতা অন্ধকারের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে। দেউরি জড়িয়ে ধরে রাখা সন্ধ্যামালতির গাছটা একটা প্যাঁচানো রহস্যের জন্ম দিয়ে পড়ে আছে। এভাবে যথার্থ অনুগতের মতো রাত জেগে কর্তার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। মোহন খুব মৃদু পায়ে বাড়ির বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। সামনের ঘরে আলো জ্বলছে। অবশ্য ঠিক স্পষ্ট বোঝাও যাচ্ছে না। সে হেঁটে হেঁটে ঘরটার আরো কাছাকাছি এসে চুপচাপ দাঁড়ায়।

কোনো শব্দ নেই। এমনিতে শিয়ালের হুক্কাহুয়া চিৎকার নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তছনছ করে দেয়। কিন্তু আজ সব সুনশান। এরকম অস্বস্তিকর নীরবতার ভেতর মোহন কান পেতে রাখে। কোথাও একটা শব্দ—পাতাটির নড়ে ওঠা, পাখির ডানা ঝাপটানো, সামনের পুকুরে একটা মাছের ঘাঁই অথবা, অথবা...। কোন একটা শব্দের জন্য মোহন অস্থির হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য মোহনের আশা পূরণ হয়। শেষ পর্যন্ত একটা নারীর মিহি হাসি মোহনের কানে এসে আছড়ে পড়ে। এতে মনে হয় নিশুতিরাত একটা হাসির সূত্র ধরে প্রাণ ফিরে পেল। এরপর, কাছের কোথাও থেকে পাখির ডানা ঝাপটানো, শিয়ালের হুক্কাহুয়া, বাতাসে পাতার বাড়ি খাওয়া—এমন বিচিত্র আওয়াজ মোহনের কানে আসে। সে এসব শব্দের উৎস (যেসব শব্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত একটি মিহি হাসি) নিয়ে গাছপালাঘেরা বাড়ির বাইরের উঠোন ত্যাগ করে। তার মনে হয় এমন রহস্যের ভেতর আরো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা কোনোমতেই আর সম্ভব নয়।

যে আইল দিয়ে মোহন সড়ক থেকে গ্রামে প্রবেশ করেছিল, সে আইল পর্যন্ত হেঁটে এসে একটু থামে। তারপর সড়কের দিকে হাঁটতে শুরু করে। গ্রামে যাওয়ার পথে যেখানে ওর ওপর টর্চের আলো এসে পড়েছিল, সেখানে পৌঁছামাত্র শিকারী চিতার মতো আলোটা আবারও শরীরে ঝাপিয়ে পড়ে। ‘ক্যালা’, মোহনের গলাটা একটু চড়া বলেই মনে হয়। অথবা রাত গভীর বলে শব্দটা একটু রগড়ে গেছে। যাই হোক, ‘ক্যালা’ বলার পর আলোটা নিভে যায়। ফলে মোহন সেদিকে আর ভ্রুক্ষেপ না করে দ্রুতপায়ে বটগাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে অশ্বথগাছটাকে ইনিয়ে বিনিয়ে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু অন্ধকারে মোহনের এই দেখার চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তারপর কী জানি হয়। অন্ধকার হাতড়ে একটা ঢিল খুঁজে বের করে। তারপর ঢিলটা বটগাছের দিকে ছুড়ে মেরে বলে, ক্যালা। ঢিল ছোড়ায় অশ্বথগাছে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এতে মনে হলো মোহনের উৎসাহ বাড়ে। সে আবার হাতড়ায়। কিন্তু এবার আর কিছু পায় না। ফলে বটগাছের নিচে এসে আঙুলে চেপে রাখা সিগারেটটা বটগাছের দিকে ছুড়ে মারে, তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে এনে তাও বটগাছের দিকে ছুড়ে মেরে বলে, ক্যালা। বিড়বিড় কর বলে, ক্যালা, ক্যালা...

দিন.
হৈ-চৈ হচ্ছে, খানিকটা চোটপাটও। পাশের ঘর থেকে তিন-চারটা কণ্ঠ ঘুরেফিরে উঠে আসছে। চোটপাটের এমন আওয়াজে মোহন ঠিকে থাকতে না পেরে বিছানায় উঠে বসে। চোটপাটের মধ্যেও বেশ অনেকক্ষণ ঘাপটি মেরে পড়েছিল। কিন্তু এমন চিৎকার-চেঁচামেচি কাহাতক সহ্য করা যায়। এর মধ্যে যার কণ্ঠ বেশি শোনা যাচ্ছে, তিনি হলেন কাওসারের বড় ভাই মহিউদ্দিন।
‘দ্যাউখাইন জমি আমার, খায় হে, তা ম্যালাদিন, ১৫ বছর অইবই। হের বাপের আমল থাইক্যা। এখন ফেরত চাই, দিত না, কেরে? কউহ্যাইন, দিত না কেরে?
কথা শেষ করে বোধহয় কিছু সময়ের জন্য উত্তরের অপেক্ষা করে। কিন্তু কোনো হা বা না শোনা যায় না। আবার মহিউদ্দিন, ‘আপনে যদি আমার লগে থাকুইন, তাইলে হের জমি আমি নিয়ামই। লাঙ্গল লইয়া জমিতে নামলে ঠেংডি ভাইঙ্গা দিতাম না।’
এবার মোহনের বড় ভাই সুলতানের গলা, মামু-ভাইগনার ব্যাফার, মারতে তো ফারবেন না।
‘মারার কাম নাই, একটু ডর দেখাইলেই ও আইগ্যা দিব।’

এরপর গলাটা নিচে নেমে যায়। ফিসফিস করে কিছু একটা বলে। এতে মোহন স্বস্তি পায়। আর যাই হোক চোটপাট তো শুনতে হবে না। তবে দুপুর প্রায় হয়ে গেছে বলেই মনে হয়। ঘরের বেড়ায় সূর্যের যে আলো পড়েছে, তাতে অনেক তেজ।

মোহন বিছানা থেকে উঠে পড়ে। টিউবওয়েলের সামনে রাখা বদনায় পানি ভরে বাড়ির পেছন দিকে হাঁটা দেয়।

রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায়, আম্বিয়া বেগম ঘরের এককোণে বসে রান্না তদারকি করছে। মোহনকে দেখে আম্বিয়া বেগম বলে, কিতা?
মোহন কোন উত্তর দেয় না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এতে আম্বিয়া বেগমের গলায় ঝাঁঝ উঠে আসে, তোর তো খাওন লাগে না। বাতাস খাইলেই অয়।
মোহন চুপচাপ দাঁড়িয়েই থাকে। মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয় না।
‘বহ।’
আম্বিয়া বেগম মোহনের দিকে একটা ছোট চকি এগিয়ে দেয়।
মোহন চকিটা সামনে পেয়ে তাতে বসে পড়ে।
‘কাজল চ্যারাডাটারে ভাত দে।’
আম্বিয়া বেগমের নির্দেশ পেয়ে কাজের মহিলা এক প্লেট গরম ভাত মোহনের সামনে বাড়িয়ে দেয়।
প্লেট থেকে ধোঁয়া উড়ছে। মোহন প্লেট সামনে রেখে বসে থাকে। কাজের মেয়েটা ভাতের মধ্যে একবাটি তরকারি ঢেলে দেয়।
আম্বিয়া বেগম পাখা হাতে ছেলের প্লেটে বাতাস করে।
‘নে ঠান্ডা অইছে, খাইয়া নে।’
মোহন কোনো কথা না বলে মনোযোগ দিয়ে খেতে শুরু করে।
‘তুই কি পড়ালেহা ছাইড়া দিসছ?’

মায়ের কথায় সামান্য সময়ের জন্য মোহন প্লেট থেকে মাথা তোলে। ওর মাথা ওঠানো দেখে মনে হয় কিছু একটা খুঁজছে। পরক্ষণেই অবশ্য মাথা নিচু করে আবার খেতে শুরু করে।

মোহনের কোনো উত্তর না পেয়ে আম্বিয়া বেগম চুপচাপ বসে থাকে। কিছুক্ষণ নীরবতার পর আম্বিয়া বেগমের কথা আবার শুরু হয়, তোর জীবন কি এইবাবেই যাইব?
মোহনের খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সে মাথা তুলে বলে, পানি দিতে কও।
আম্বিয়া বেগম বলে, কাজল হানি দে।
‘কিছু একটা ক?’
‘কিতা কইতাম?’
‘তুই করবিটা কী?’
মোহন মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সামনে রাখা গ্লাস থেকে প্লেটে পানি ঢেলে হাত ধোওয়ায় মন দেয়।
‘পড়ালেহা আর করবি না।’
‘ভালালাগে না।’
‘কয়দিন আগেও তো এমনডা আছিলি না।’
‘তুমার পুলাডিরে কও ভালা অইয়া যাইতে।’
‘তুরে কী কইতাছি, হের উত্তর দে।’
‘খালি মানুষের জমি দখল করে, মারে, আটকায়। তুমি কিছু কইতে পারো না?’ আম্বিয়া বেগম চুপ।
মোহন কাজের মেয়ের দিকে হাতের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, পানি দে।
কাজল নামের মেয়েটা নিঃশব্দে মোহনের গ্লাস টেনে নিয়ে তাতে পানি ভরে মোহনের দিকে ঠেলে দেয়।

রাত.
প্রতিদিন সন্ধ্যা হতেই মোহন দক্ষিণপাড়ার দিকে হাঁটা দেয়। গ্রামে থাকলে এটা তার নিত্যদিনের কাজ। ওখানে পাড়ার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে, কার্ড খেলে বাড়ি ফেরে। কোনোদিন ফেরেও না। কিন্তু আজ ভর সন্ধ্যায় বিছানায় শুয়ে আছে, চোখের সামনে বই ধরা। চোখের সামনে বই ধরা থাকলেও খুব পড়ছে, তা নয়। অনেকটা অস্থির, বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছে অনেক পর পর। এভাবে বহুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকে উঠে বসে। পাশে রাখা ঘড়িটা হাতে পরে নেয়। টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে পকেটে গুঁজে বেরিয়ে পড়ে।

বেরিয়ে আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোয়। ভীষণ গরম। এই রাতের বেলায়ও ধরধর করে ঘাম পড়ছে। মোহন হেঁটে হেঁটে তাল গাছটার নিচে এসে দাঁড়ায়। কোথাও ধপাস করে কিছু একটা পড়ার শব্দ হয়। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ফুকতে থাকে।
‘কেলা?’
হঠাৎ লাইটের আলো মোহনের মুখের ওপর এসে পড়ে।
মোহন অনেকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সিগারেটটা পেছন দিকে সরিয়ে নেয়। পরমুহূর্তে অবশ্য ধাতস্থ হয়ে সে আগের মতো সিগারেট টানায় মনোযোগ দেয়।
এতে লাইটটা মোহনের মুখের ওপর থেকে সরে যায়।
সুলতান জিজ্ঞেস করে, এইহানে কী করছ।
মোহনের কানে কোন কিছু ঢুকল বলে মনে হয় না। সে সিগারেটে টান দিতে থাকে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে আলোটা সামনের দিকে চলতে শুরু করে। এর সঙ্গে একটা রগড়ানি শোনা যায়। যা অস্পষ্ট, কিন্তু রগড়ানি বলেই মনে হয়। মোহন আরো কিছুক্ষণ সিগারেট ফোকে। খুব গরম। আবার একদঙ্গল বাতাস গরমটা একটু থামিয়ে যায়। একটু বাতাস বাড়লেই মাথার উপর তালগাছের পাতা ঝনঝন আওয়াজ করে।

তালগাছের নিচ থেকে বেরিয়ে সে সড়কের দিকে এগোয়। যেখানে ঝোপ থেকে হাটবারে টর্চের আলো বেরিয়ে আসে, আজ সেখানে জোনাকিপোকার দল হাট বসিয়েছে। মোহন সড়কে উঠে এসে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে মোটে নয়টা। আজকে তো আর হাটবার না। এ কারণে নয়টা বা বারোটার মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। মোহন অবশ্য এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ায় না। সে সড়ক দিয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করে। অশ্বথগাছটা পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকে।

সড়কটার একপাশে গ্রাম। গ্রামের বাড়িগুলোর মুখ সড়কের দিকে ফেরানো। বাড়িগুলো শেষ হয়ে গেলে ফসলের ক্ষেত, এরপর সড়ক। সড়কের অন্যপাশে ধানক্ষেত, বিল, একাকার হয়ে আছে। অবশ্য এই রাতের বেলায় কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়। মোহন তার ডানপাশে ছাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকা বহু বছরের পুরনো জামগাছটা পেরিয়ে যায়, কারো সঙ্গে দেখা হয় না। তারপর সড়ক ঘেঁষে যে পুকুরটা পাড় হয়ে যায়, তাতেও কারো দেখা মেলে না। এভাবে অনেক পথ হেঁটে মোহন ফাইজুলদের বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। একটা হারিকেন জ্বালিয়ে ফাইজুল আর কাওসার খেলছে, পাশে দাঁড়িয়ে তারেক ওদের খেলা দেখছে।

মোহনকে দেখে ওরা হৈহৈ করে ওঠে, আয় আয়। তোর লাইগ্যা খেলাডা হইতাছে না।
মোহন ক্যারামের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘ল তাইলে শুরু করি, তারেক তাগিদ দেয়।’
মোহন কোনো কথা বলে না।
মোহন আর তারেক একদলে ভাগ হয়ে যায়, কাওসার আর ফাইজুল আরেক দলে।
‘৫০ ট্যাহা।’
বলে ফাইজুল পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। এর উত্তরে কেউ কিছু বলে না। বোর্ডে গুটি সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
খেলা শুরু হয়ে যায়।
মোহনরা প্রথম গেইম হেরে যায়, আরেকটায় হারলে টাকাটা কাওসার ও ফাইজুল জিতে নেবে।
মোহন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে ১০টা।
‘আর খেলতাম না।’ বলে মোহন বোর্ডের গুটি এলোমেলো করে দেয়।
হঠাৎ করে মোহনের এমন গোয়ার্তুমিতে কাওসার ক্ষেপে যায়, খেলতি না কেরে, হাইরা যাইতাসছ বইল্যা গুটিগুলা এইবাবে আওলাইয়্যা দিবি।
মোহন কোনো কথা না বলে পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে বোর্ডের ওপর ছুড়ে মারে। তারপর নিঃশব্দে সড়কের দিকে হাঁটা দেয়। মোহনের হঠাৎ এমন চলে যাওয়া দেখে পেছন থেকে কাওসার ডাকতে থাকে, ল, ল ট্যাহা লাগব না।
মোহন অবশ্য তাতে কান দেয় না, সে সড়কে উঠে উত্তরমুখী হয়ে হাঁটতে শুরু করে।

মোহন আজ বাড়িটার বাইরের উঠোনে না দাঁড়িয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে যায়। গতকালের থেকে আজকে রাত অনেক কম। তবে আজ কোনো ঘরে আলো নেই। বোধহয় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মোহন নিঃশব্দে পূর্ব দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা আধাপাকা ঘরটার দক্ষিণ কোনে এসে কয়েক মিনিট জিরিয়ে নেয়। তারপর পাশের দরজায় দুবার টোকা দিয়ে একটু সরে আসে। টোকা দিতে না দিতেই দরজা খুলে যায়। মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে কেউ কান পেতে ছিল। মোহনের মন হঠাৎ ভালো হয়ে যায়। এমনকি দরজা খুলে যাওয়ার পরমুহূর্তে জুঁই বেরিয়ে আসবে—এমনটাই আশা করে ছিল। কিন্তু দরজা দ্রুততার সঙ্গে খুলে গেলেও ঘর থেকে কেউ বেরিয়ে আসে না। বেশ কিছুক্ষণ এরকম নীরবতা চলে। খুব বেশি সময় না হলেও মোহন এই সামান্য সময়ের ভেতর একটা বিরাট গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। সে বুঝে উঠতে পারে না, এখন তার কী করা উচিত। এমন একটা ভাবনা মোহনকে যখন এপাশ-ওপাশ টানছে, তখন ভেতর থেকে জুঁইয়ের কণ্ঠ শোনা গেল, ভেতরে এসো।

জুঁইয়ের এমন আহ্বানে মোহন খুব অবাক। সে কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে ওখানেই স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ইচ্ছা করলেও কোনোমতেই পা নাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হবে না। মনে হয় বহুদিনের অনভ্যস্ততা তাকে একটা স্থির বিন্দুতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

জুঁই বেরিয়ে এলে মোহন স্থির তাকিয়ে থাকে। জুঁই বেরিয়ে এসে মোহনকে দেখে দাঁড়ায়। মনে হয় চিনে নিতে একটু সময় নিচ্ছে। তারপর হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়।

মোহন দেখে সবকিছু সেই আগের মতোই আছে। অবশ্য এমন কী সময় পেরিয়েছে, মাত্র তো ছয়টি মাস। তাতে আর কী বদলাবে? বদলায়নি। ঘরটায় এককোনে রাখা জুঁইয়ের পছন্দের গাছটা সেরকমই আছে। প্লাস্টিকের, কিন্তু মোহনের এখানে এলে সব সময় মনে হতো, এ জুঁইয়ের মতোই জীবন্ত।
‘কী ভাবছো?’
মোহন স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।
‘না, কতদিন পর তোমার কাছে এলাম।’
জুঁই শব্দ করে হাসতে গিয়ে থেমে যায়। মোহনের মনে হয়, গতকাল রাতে যে হাসিটা শুনেছিল, তার সঙ্গে এ হাসির মিল খুব। তারপরই সে অবশ্য সন্দিহান হয়ে ওঠে, জুঁই যে হাসল এ হাসি কতদিন ধরে মোহন শুনে আসছে। এই হাসির সঙ্গে গতকাল রাতের হাসির মিল কোথায়? এসব ভাবনা রেখে মোহন সোজা পথ হাঁটে—
‘জুঁই, তুমি গত ৬ মাস কই ছিলা?’
মোহনের কথায় জুঁই বিরক্ত বলেই মনে হয়।
‘নেত্রকোনা।’
‘নেত্রকোনা মানে?’
‘মুর্শেদা আপার বাসায়।’
‘গ্রামের লোক কিন্তু এই কথা বলে না।’
‘আমার কথা শুনার জন্য তুমি কি গ্রামের লোকদের জিজ্ঞেস করো?’
‘তা কেন?’
‘তাহলে আমারে খুঁজে দেখছিলা?’
‘তোমারে খোঁজে মুর্শেদা আপার বাসায় গেছিলাম।’
‘কবে?’
‘বেশ কয়বার।’
‘কই আমার সাথে তো দেখা হইল না।’
‘ভেতরে যাই নাই। বাসার সামনে থাইকা কয়েকদিন ঘুইরা আইছি।’
‘মোহন, সবাই বলে তুমি তুখোড় ছাত্র, আমি বলি, তুমি তুখোড় গাধা।’
এই কথার পর মোহন হঠাৎ চুপসে যায়। হারিকেনের আবছা আলোয় ঠিক বোঝা যায় না মোহনের মুখ লাল হয়ে উঠল কিনা।
‘তুমি নাকি পড়াশোনা বন্ধ করে দিছো?’
মোহন চুপ করেই থাকে।
‘তুমি আমাকে বিয়ে করবে বলছিলা, ওই ইচ্ছা কি এখনো আছে?’
কথা কটা বলে জুঁই হাসতে থাকে।
এমন প্রশ্নে মোহন আগের মতোই চুপ করে থাকে।
‘এটা হচ্ছে তোমার আরেক সমস্যা। তোমার ভাইগুলার ঠিক উল্টা হইছো তুমি।’
‘আমার ভাইরা এইখানে আসলো কিভাবে।’ মোহন কথা বলে।
‘ভাইরা আসে নাই। কিন্তু ভাইদের ভাই তো আসছে।’
মোহন আবারও আগের মতো চুপ হয়ে যায়। দুজন বেশ কিছুক্ষণ একটা নীরবতার ভেতর ডুবে থাকে। তারপর জুঁই বলে, তুমি এখন যাও।

রাত (দ্বিতীয় ভাগ)
মোহন সড়কে এসে দাঁড়ায়। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ১১টা পেরিয়ে গেছে। এখন কোনো দিকে যাওয়ার নাই। ফাইজুল, তারেক সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই। নিজেকে মোহনের বেশ অসহায় মনে হয়। ফলে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সে বাড়ির দিকে রওনা করে। কিন্তু বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পায় চোখের সামনে সড়ক এসে হাজির। কখনো কখনো মোহনের এরকম হয়।

হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে শোনে জুঁই নাই। নাই মানে ওই বাড়ির রুস্তমের বউ জানাল, জুঁই নাই। পালাইয়া গেছে। রাতে উঠেছিল রুস্তমের বউ, জঙ্গলে গিয়ে কাজ সারতে। তখন সে দেখতে পায়, একটা লোকের সঙ্গে জুঁই সড়কের দিকে উঠছে।

অশ্বথগাছের পাতার ভেতর থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসছে। মোহন ঘড়ির দিকে তাকায়। পাখিরা তাদের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায় না। তারা প্রতিদিন খুব সকালে বেরিয়ে যায়। সারাদিন খাদ্য অন্বেষণ করে। নানা জায়গা ঘুরে সন্ধ্যায় সারাদিনের স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসে, রাতে ঘুমানোর চেষ্টা করে বা সঙ্গম করে, ডানা ঝাপটায় ইত্যাদি। এরকম অনন্তকাল ধরে চলে আসছে। আসুক, তাতে মোহনের কী। সে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে, কীরে পাখি বিশেষজ্ঞ হয়ে যাাচ্ছিস নাকি।

অনেকক্ষণ পর মনে হলো সড়ক দিয়ে কেউ আসছে। কেউ আসছে তা টের পেয়ে মোহন ওর হাতে থাকা সিগারেটটা ফেলে দেয়। সঙ্গে একটু যেন সতর্ক হয়ে ওঠে। মিনিটখানেক অপেক্ষার পর লোকটা মোহনের কাছে পৌঁছালে মোহন লোকটার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।
‘আগুন হইব?’ বলে অনেকটা পথরোধ করে দাঁড়ায় মোহন।
‘জ্বি।’
লোকটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পকেট থেকে ম্যাচ বের করতে উদ্যত হয়।
তখন মোহনের খেয়াল হয়, তার হাতে সিগারেট নাই। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে দেখে প্যাকেটেও নাই। এতে মোহন নয়, মনে হলো লোকটাই খানিক বিব্রত। সে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে মোহনের দিকে এগিয়ে দেয়। মোহন একটা সিগারেট টেনে নিয়ে জ্বালায়।
‘থ্যাঙ্কস...স।’ ধন্যবাদটা দীর্ঘ হয়েই বের হয় মোহনের মুখ থেকে।
তারপর ম্যাচটা লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে মোহন সামনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। লোকটা অবশ্য কথা বাড়ায় না। সে হাঁটতে শুরু করে।

লোকটার চলে যাওয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগোয়, তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ওদিক থেকে ঘুরে সে আবার অশ্বথগাছের নিচে চলে আসে। হাতে থাকা ফাঁকা সিগারেটের প্যাকেটটা গাছের দিকে ছুড়ে মেরে বিড়বিড় করে। তারপর হাতে সিগারেটটা অশ্বথ গাছের দিকে ছুড়ে মারে। এই ব্যাপারগুলো এতো নিস্তরঙ্গ যে, এতে গাছের ভেতর থেকে পাতা বা পাখিদের কোনো গুঞ্জরনও বেরিয়ে আসতে শোনা যায় না।

দিন.
মোহন ঘুম থেকে উঠে দেখে বিকাল হয়ে গেছে। এটা অবধারিত, না জাগা পর্যন্ত কেউ ডাকবে না। ঘুমের মধ্যে যদি মরে পড়ে থাকে, তাহলে? কিচ্ছু যায় আসে না। এসব ব্যাপার নিয়ে সে অবশ্য ভাবতেও চায় না। পেট ক্ষুধায় চোচো করছে। সে প্রথমে বালিশ টেনে নেয়। কিন্তু তাতে কাজ হয় না। ক্ষুধাটা অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। উঠে পড়ে। কোনোমতে হাতমুখ ধুয়ে মোহন রান্নাঘরের দিকে ছোটে। ওর জন্য কিছু খাবার রাখা থাকে সবসময়। সে আশায় পুরো রান্নাঘর তন্নতন্ন করে খোঁজে। দুয়েকটা পাতিলের তলানীতে কিছু তরকারি পড়ে থাকলেও ভাতের পাতিল ফাঁকা। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে আসে। একবার মনে হয় মার কাছে গিয়ে বলবে। কিন্তু এ কোনোদিনই ওর হয়ে ওঠেনি। আজকেও না। ঘড়িটা হাতে পরে নেয়। ক্ষুধা সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সারা পেট ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ক্ষুধাটাকে কোনোমতেই পাত্তা দিতে চায় না। তার মাথাজুড়ে গতরাতের সড়ক, বটগাছ, একটা মানুষ স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট রেখায় একটা দাড়িয়াবান্দার ঘর তৈরি কর যাচ্ছে।

মোহন দক্ষিণ দিকের জঙলাটা পার হয়ে জুঁইদের বাড়ির উঠোনে উঠে আসে। জুঁইদের উঠোনে কয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে হৈহৈ করে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। মোহন বাচ্চাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ভেতরের উঠোনে চলে আসে। ভেবেছিল ওকে দেখে কেউ না কেউ বেরিয়ে আসবে। কিন্তু সেরকম কারো মুখোমুখি হতে হলো না। এমনকি কালাচান মিয়া, ওই কাল্লুটা, যে সারাদিন বাইরের ঘরের বারান্দায় বসে থাকে দুটা লাল চোখ নিয়ে—সেও নাই। বস একসঙ্গে হাগতে গেছে, বিড়বিড় করে বলে মোহন হেসে ওঠে। বাড়ি ফাঁকা থাকলেও জুঁই সচরাচর ঘর থেকে বের হয় না; মোহন এটা ভালো করেই জানে। সে সোজা এসে দরজায় দাঁড়ায়। জুঁই আয়নার সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে।
‘জুঁই।’ মোহন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘এই সময় তুমি কেন এসেছো?’
মোহন কথা না বলে ভেতরে এসে বিছানায় বসে পড়ে।
‘তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।’
জুঁই চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ, তারপর বলে, কী বলবে বলো।
‘তুমি কী চাও?’
‘কার কাছে?’
‘কারো কাছে না, আমার কাছে তো নয়ই? তুমি আসলে চাওটা কী?’
জুঁইকে একটু গম্ভীর দেখায়। এই গম্ভীরতা অবশ্য মুহূর্তের মধ্যে পথ ঘুরে বিরক্তিতে রূপ নেয়।
‘মা যে কোনো সময় চলে আসবে। তুমি এখন যাও।’
‘যাব না।’
‘মানে? তুমি এখন যাও।’
‘যাব, কিন্তু শিয়ালদের তাড়াবে কে?’
এবার জুঁইয়ের কপালে মিছিলের মতো কয়েকটা ভাঁজ জড়ো হয়। সে মোহনকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে বলে, তুমি এখন যাও।
মোহনও কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দরজায় এসে কী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ে। কণ্ঠে অনেকটা মিনতির সুর। বলে, আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে, সামান্য একটু ভাত হবে?
‘কি আবোল-তাবোল বলছো মোহন। তুমি এখনই বেরোও।’
মোহন বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে যাওয়ার আগে ওর কণ্ঠ জড়িয়ে আসে, তুমি জগদ্বমাতা। তোমার কাছে একটু খাবার হলো না! বলে অনেকটা যাত্রার নায়কের মতো মাথা দুলিয়ে মোহন উঠোন থেকে বেরিয়ে যায়।

রাত (প্রথম ভাগ)
মোহন ফায়জুলদের বাড়িতে এসে দেখে বাইরের ঘরের বারান্দায় তারেক বসে আছে।
‘তুর এইখানেই যাইতাম। তারেক মুখটা খুশিতে জ্বলে ওঠে।’
‘আমার এইখানে কেরে?’
তারেক কোনো কথা না বলে মিটিমিটি হাসে। মোহন বেঞ্চিতে বসতে গিয়েছিল। কিন্তু ফায়জুল চলে আসায় তারেক উঠে পড়ে। বলে, ল।
কই? মোহন জানতে চায়।
ওরা মোহনের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। পিছু পিছু মোহন। তার তখন পেটের ভেতর একটা বিরাট শূন্যতা দোল খাচ্ছে। একবার মনে হয় ওদের দাঁড় করিয়ে ফায়জুলকে বলবে, আমারে ভাত দে, আমার পেট ভরা ক্ষুধা। বিরাট ক্ষুধা।
কিন্তু বলতে পারে না?
দক্ষিণ দিকে কিছুদূর হাঁটার পর পশ্চিম দিকে আরেকটা অপেক্ষাকৃত ছোট সড়ক নেমে গেছে। তারেক, ফায়জুল নতুন সড়ক নেমে গেলে মোহন ওদের অনুসরণ করে।
ছোট সড়কটায় নেমে গেছে দেখে মোহন নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলে, ও তোরা তাইলে দরগায় যাবি?
‘দরগা!’ দুজন একসঙ্গে হেসে ওঠে।
ওদের এমন হাসি মোহনকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। ওর ভেতর একটা অবিশ্বাসও উঁকি দিয়ে যায়। ফলে মোহন ওদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। ওদের হাঁটা, চলার গতি সব পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করে। তাতেও বিষয়টা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।

কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে সকালের কথা মাথায় আসে। সকালে চোটপাটের দাপটে তার ঘুম ভেঙে যায়। শেষে কী জানি ফিসফিসানি। ওদের এই রহস্য করার সঙ্গে সেই ঘটনার কি কোনো যোগসূত্র আছে? মোহন দাঁড়িয়ে পড়ে, টের পেয়ে ওরাও।
‘কী, কী অইলো?’
‘না কিছু না।’ মোহন এমন ভাব করে যেন পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে গিয়েছিল।
ওরা আবার হাঁটতে শুরু করে। খুব বেশিক্ষণ না, আধাঘণ্টা হবে। গ্রামের পথ আধাঘণ্টা কিছুই না। ওরা হেঁটে হেঁটে একটা ছোট নদীর পাড়ে এসে পৌঁছায়। মোহন এর আগে বহুবার এখানে এসেছে। নিজেদের গ্রাম থেকে দুইটা গ্রাম, তারপর একটা ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে এখানে আসতে হয়।
‘ওই আচস?’ তারেক হাঁক দেয়।
‘হ তারেক ভাই।’ একটা স্বর নদীর ওপার থেকে ভেসে আসে।
পরমুহূর্তে বলে, খাড়ান আইতাছি।
‘কই যাস তোরা।’ মোহনের কণ্ঠে উদ্বিগ্নতা।
ফায়জুল বলে, এত অস্থির কেরে, যেখানে যাইতাছি তোর বালাই লাগব।

মোহন আর কথা বাড়ায় না। নদীর ওপার থেকে একটা নৌকা এসে এপাড়ে ভিড়ে। ওরা দুজন উঠে মোহনকে তাগিদ দেয়। মোহনও উঠে পড়ে। নৌকাটা দুলুনি দিয়ে ছেড়ে দেয়। নদীটা এমনিতেই ছোট। এই ভাদ্র মাসে তা পেরুতে মিনিট দশেকের বেশি সময় নেয় না। নদীর এপাড়ে এসে দেখে কাওসার দাঁড়ানো। ওদের পেয়ে খুশিতে ওর দাঁত বেরিয়ে আসে, আইছস।

কাওসারকে দেখে বিষয়টা ওর কাছে আরো রহস্যময় মনে হয়। একবার ভাবে সে যে করেই হোক এখান থেকে বেরিয়ে যাবে। পরক্ষণেই মনে হয়, ভয় পাওয়ার তো কোনো মানে নেই। সবাই ছোটকালের বন্ধু, নিজে নিজে আশ্বাস খোঁজে।
‘মোহনরেও লইয়া আইছস?’ কাওসারের হাসি কান পর্যন্ত লম্বা হয়।
কাওসারের এই কথায় মোহন নিশ্চিতভাবে আশ্বাস পেয়ে যায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১১টা বাজে বাজে করছে। রহস্যের কূলকিনারা করতে ওদের সঙ্গে থাকতে ইচ্ছা হয়, আবার অশ্বথগাছটাও অনবরত টানছে।

নদীর পাড় থেকে দক্ষিণের দিকে হাঁটতে থাকে। নৌকা বয়ে নিয়ে আসা ছেলেটা সবার সামনে; আর মোহন সবার পেছন পেছন হাঁটছে। মোহনের মনটা ঘুরে যায়। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, আমি যাই।
‘কী কস?’ তারেক ঘুরে মোহনকে আটকায়।
‘আমার যাইতে ইচ্ছা করতাছে না।’
সামনে থেকে ফায়জুল আর কাওসার একসঙ্গে কাই কাই করে ওঠে, আইয়া পড়ছি, আইয়া পড়ছি রে।
মোহন আবার ওদের পিছু পিছু হাঁটে।
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ছোট জঙ্গল পেরিয়ে খালের কাছে চলে আসে।
‘এটা তো শশ্মান?’ মোহন বলে কিন্তু তা অস্ফূট থেকে যায়।

শশ্মান পেরিয়ে আরো একটু পথ। ওরা একটা ছোট কুঁড়েঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়িটার ছোট্ট একটা উঠোন এই রাতের বেলাতেও সাদা চাদরের মতো আলো ছড়াচ্ছে। উঠোনের এপাশ থেকে ওপাশ দড়ি টাঙানো। ঘর ঘেঁষে একটা পেঁপেগাছ অনেকগুলো কাঁচাপাকা পেঁপে ধরে বড্ড কষ্টে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গের ছেলেটা বলে, মুর্শেদা দরজা খোল।
এতক্ষণে মোহনের কাছে বিষয়টা স্পষ্ট হয়। একটা মেয়ে দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে একটা কুপি। কুপির আলোতে মেয়েটাকে দেখে মোহনের মায়া লাগে। ওর উঁকি দেওয়ার ভেতর কেমন একটা আড়ষ্টতা। এ আড়ষ্টতা, না অসহায়ত্ব মোহন তা বুঝে উঠতে পারে না।
তারেক, কাওসার, ফায়জুল হা হা করে মেয়েটাকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে ভেতর ঢুকে যায়। মোহন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘কই, ভিতরে আয়।’ ভেতর থেকে কাওসার আমুদে গলায় মোহনকে ডাকতে থাকে। এর মধ্যে ওদের পথ দেখিয়ে আনা ছেলেটা বাইরে এসে বলে, বাই, আওহাইন, ভিতরে আওহাইন।
তারেক, কাওসার, ফায়জুল চকির ওপর বসে পড়ে।
যে মেয়েটাকে একঝলক দেখেছিল, সে নাই। ঘরের ভেতর একটা ছাচের বেড়ার উল্টাদিকে কুপির আলোটা জ্বলছে।

এখানে সে কী করবে! তার খুব জুঁইয়ের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে। আজও গতকালের মতো টোকা দেওয়ামাত্র যদি দরজা খুলে আহ্বানের স্বরে ডেকে ওঠে। কিন্তু না বড্ড বিরক্ত লাগে মোহনের। পৃথিবীটা অনেক বড়, পৃথিবী না হোক নিদেনপক্ষে বাংলাদেশ। এখানের কোটি কোটি মানুষের ভেতর থেকে দুটা চোখ নিয়ে অপেক্ষায় থাকা একটা মানুষ নিশ্চয়ই আছে। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
একটা আঁচলের স্পর্শে মোহন ফিরে আসে। দেখে মেয়েটা সামনে দাঁড়ানো।
বাহ, কী লাবণ্যতা ঘিরে আছে মেয়েটাকে। কপালে একটা টিপ, ঠোঁটও লাল করেছে। সবার ভেতর একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
‘নাম কী?’ ফায়জুল জিজ্ঞেস করে।
‘মুর্শেদা।’ মেয়েটা ফ্যাশফ্যাশে গলায় উত্তর দেয়। এই ফ্যাশফ্যাশে গলাটা শুনে মোহনের মুগ্ধতা মিলিয়ে যায় একদম।
এরপর মোহনের কাছে দৃশ্যটা খুব বিশ্রি ঠেকে। সবাই চকিতে বসা, শুধু মেয়েটা দাঁড়ানো। কেন? কিছুই নয়, অথচ মোহনের কাছে দৃশ্যটা অনেক বাজে মনে হয়।
‘পয়লা ক্যাডা।’ তারেকের মুখ দিয়ে কথা কয়টা যে গতিতে বেরোয়, তার থেকে বেশি গতিতে বেরোয় হাসি।
কিন্তু বিষয়টা প্রকৃতই অনেক সিরিয়াস, তা এই কথার পর সবার নীরবতা দেখে বোঝা যায়। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে কাওসার বলে, মোহন?
‘হ, হ মোহন।’ অন্য দুজন সায় দেয়।
ওরা যে ছোটকালের বন্ধু, ওরা যে অনেক ভালো বন্ধু, মোহন তা টের পেতে থাকে। আরো টের পায়, একটা অস্বস্তি ওর ভেতরে বিরাট জায়গা দখল করে নিয়েছে। মোহন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ১২টা। সে বলে, আমি যাই?
‘কিতা কছ?’ তারেক অনেকটা চিৎকার দিয়ে ওঠে।
ফায়জুল ওকে বেড়ার উল্টোদিকে প্রায় ঠেলে দিয়ে আসে। পেছন পেছন মেয়েটা এসে হাজির।
‘আওহাইন।’ মেয়েটার আহ্বান শুনে মোহন চমকে ওঠে। এমন একটা আহ্বানের জন্য কি সে এতদিন অপেক্ষা করে ছিল! বিরাট একটা ঘোরের ভেতর সে ব্যাপারটা ভাবে। এই ভাবনার ঘোরে মেয়েটার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় মোহন। পরক্ষণে কী ঘটবে এমনটা আন্দাজ করা সহজ। কিন্তু মোহন সহজ পথে যায় না। সে যায় অন্য পথে। অসহায়ের মতো বলে, বাড়িতে ভাত আছে?
মোহনের এমন কথায় মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। মোহন অবশ্য আর কোনো কথা না বাড়িয়ে এ ঘরে চলে আসে।

‘কী অইছে?’ সবাই জানতে চায়।
‘আমি যাই।’ মোহন এই কথা বলে বন্ধুদের অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।
‘যেডার এইখান যাইবি, হেইডাও তো একই।’ তারেক খ্যাক করে ওঠে।
মোহন কোন কথা বলে না। এতে বোধহয় ওদের উৎসাহ বেড়ে যায়।
ফায়জুল বলে, বড্ডারে আগে, হেরপরে ছোডডার ওইহান যাইস।
বড়টা মানে এই মেয়েটার নাম তো মুর্শেদা। মোহন ক্ষেপে যায়।
‘চুপ। কুত্তার বাচ্চা।’ মোহন চিৎকার দিয়ে ওঠে।
‘কী, কী কইছস?’ ফায়জুল মোহনের দিকে তেড়ে আসে।
তিনজনের মাঝখানে তখন কাওসার এসে দাঁড়ায়।
আর এগোয় না। সবাই চুপ হয়ে যায়।
এরপর মোহন সোজা নদীর দিকে হাঁটা দেয়।

রাত (দ্বিতীয় ভাগ)
বটগাছের নিচে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটা ১টা পেরিয়ে যায়। কই, রাতগুলোর মধ্যে বিশেষ কোনো পরিবর্তন নেই! একই। কিন্তু মোহনের শরীর আজ কোনোমতেই চলছে না। সিগারেট ধরিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে বলে ভাবে। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে আর সময় ব্যয় করে না। সোজা জুঁইদের বাড়ির বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে একটু ভাবে। শরীর বড্ড টলায়মান। যে কোনো সময় যে কোনো দিকে হেলে যেতে পারে। তারপরও মোহন গুটিগুটি পায়ে ভেতরের উঠোনে এসে পড়ে। উত্তরপাশের ঘরটার কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে আলোর সামান্য রেখা বেরিয়ে বাইরে পড়েছে। মোহনের কাছে এই আলোকে একটা দ্যোদুল্যমান রঙধনু বলে মনে হয়। সে এই আলোর ঝিলিক মাথায় নিয়ে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর ঘর থেকে একটা হাসি ছিটকে বেরিয়ে আসামাত্র মোহন দরজায় এসে ধাক্কা দেয়।
দরজায় শব্দ হতেই ভেতরের আলোটা নিভে যায়।

মোহন বোধহয় আরেকটু টলায়মান হলো। এবার তার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। সে অনেক কিছু খুঁজে বেড়ায়, মনে করার চেষ্টা করে, এই আলো নিভে যাওয়ার ইতিহাসের সঙ্গে তার কি কোনোদিন দেখা হয়েছিল? এই আলো নিভে যাওয়ার পর কী ধরনের দৃশ্যের অবতারণা হয়। এসব ভাবার চেষ্টা করলেও পেটটা ঠিকমতো সহযোগিতা না করায় সে আবার দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে।
না কোনো সাড়া নেই। ফলে আবার ধাক্কা।
‘কে?’ জুঁই বড্ড কড়া গলায় আওড়ায়। মনে হয় ফ্যাসফ্যাসে।
‘দরজা খোল।’ মোহনের কথাগুলো কাঁপা কাঁপা হয়ে বেরয়।
‘তুমি এত রাতে কী চাও?’
‘দরজা খোল।’ মোহনের গলায়ও চড়া ভাব।
আর দেরি হয় না। দরজা খুলে যায়। জুঁই মোহনের মুখোমুখি হয়ে বলে, কী চাও?
মোহন জুঁইকে পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতর চলে আসে। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে একটা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে এর আলোয় কিছু একটা খুঁজে নেয়। সে দেখতে পায় ঘরের এক কোণে একটা লোক গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক ঝলকে চিনতে পারে। চিনে সে চমকে ওঠে। এ যে তার বড় ভাই, সুলতান।
আর দেরি করে না। মোহন ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে দরজায় জুঁইয়ের সঙ্গে ধাক্কা খায়। ধাক্কা খেয়েই বোধহয় জেগে ওঠে। জুঁইয়ের হাতটা চেপে ধরে।
‘ছাড়। জুঁই ধমক দিয়ে ওঠে।’
মোহন বাধ্যগতের মতো ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র