Barta24

বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৯ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

অবশেষে নতুন ‘পোয়েট লরিয়েট’!

অবশেষে নতুন ‘পোয়েট লরিয়েট’!
ব্রিটেনের রাজকীয় 'পোয়েট লরিয়েট' হলেন আর্মিটেজ (বামে), অসম্মতি জানালেন ইমতিয়াজ (ডানে)/ ছবি: সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

তার কবিতা ব্রিটেনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্য। লাহোরে জন্ম হলেও আশৈশব বসবাস বিলাতে। তিনি একজন নেতৃস্থানীয় কবি তবু পদমোহহীন। পোস্টট্রুথ, পোস্ট-মর্ডান লম্বিত পরিস্থিতিতে প্রকৃতই কবি তিনি। বলেছেন, ‘‘I had to weigh the privacy I need to write poems against the demands of a public role.’ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া কবির নাম ইমতিয়াজ ধরকর।

পদটি গ্রহণ করলে অবলীলায় তিনি তৈরি করতে পারতেন একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড। হতে পারতেন প্রথম এশীয় হিসেবে ব্রিটেনের রাজকবি বা ‘পোয়েট লরিয়েট’। হলেন না। তাতে কী! পদ, পদবী, পদক না নেওয়াই যে এখন সম্মানের, আলতো করে এই সত্যটি বুঝিয়ে দিলেন লোভেমত্ত মানুষদের।

রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ সহজ বিষয় নয়। ব্রিটেনের ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজতন্ত্রের মতোই অভিজাত ও বনেদি পদটির সৃষ্টি হয়েছিল ১৬৬৮ সালে। ব্রিটিশ সম্রাট দ্বিতীয় চালর্স কর্তৃক প্রথম ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন জন ড্রাইডেন, পুরো ইংরেজি সাহিত্যের ভাণ্ডারে যিনি অনন্য কাব্যশৈলী, সুষমা ও নান্দনিক প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

সপ্তদশ শতকে সৃষ্ট রাজকীয় পদটি তারপর থেকে এখনো সক্রিয়। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের সুদীর্ঘ সময়কালে এ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন ব্রিটেনের বহু নামীদামী কবি, যারা বিশ্বসাহিত্যেরও একেকটি অমূল্য রত্ন। তালিকায় ছিলেন রবার্ট সার্ডি, ওয়াডর্সওয়ার্থ, টেনিসন, রবার্ট ব্রিজেস, সেলিল ডে লুইস, টেড হিউজ, অ্যান্ডু মোশন প্রমুখ।

ব্রিটেনের সর্বশেষ রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফি। ২০০৯ সালে দায়িত্ব পেয়ে এই ২০১৭ সালের মে মাসে তিনি মেয়াদ শেষ করেন। তখনই পরবর্তী রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য অনুসন্ধান শুরু হয়। সাধারণত এ পদের জন্য সমকালীন কবিদের মধ্যে যথাযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

তবে এবারই প্রথম আলোচনার সবচেয়ে শীর্ষে অ্যাংলো-পাকিস্তানি কবি ইমতিয়াজ ধরকরের নাম চলে আসে ব্রিটেনের রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের জন্য। তাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয় এবং সম্মতি চাওয়া হয়। কিন্তু খোদ কবি জানিয়ে দেন নিজের অসম্মতি। পরিস্কার ভাষায় অপারগতা প্রকাশ করেন রাজকীয় কবি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ গ্রহণের ব্যাপারে।

রাষ্ট্রাচার বা প্রটোকল মেনে গ্রেট ব্রিটেনে ‘পোয়েট লরিয়েট’ কাউকে না কাউকে করতে হবে, এটাই শতবর্ষের দস্তুর। ইমতিয়াজ ধরকরের অসম্মতির পর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে একজনকে খুঁজে বের করেছেন এ পদের জন্য এবং তিনিও যথারীতি গ্রহণ করেছেন ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ। যদিও কয়েক সপ্তাহ অনিশ্চিত ছিল ক্যারল অ্যান ডাফি-র পর কে হবেন ইউনাইটেড কিংডমের পরবর্তী ‘পোয়েট লরিয়েট’। সেই অনিশ্চয়তারও অবসান হয়ে গ্রেট ব্রিটেনে অবশেষে পাওয়া গেলো ‘পোয়েট লরিয়েট’।

সমকালীন ব্রিটিশ কবি সাইমন আর্মিটেজ নির্বাচিত হয়েছেন সম্মানীয় রাজকীয় কবি বা ‘পোয়েট লরিয়েট’ হিসেবে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে নিজেই ফোন করে আর্মিটেজের সঙ্গে আলাপ করে পুরো প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করেন। আর্মিটেজ নিজেও কবি হিসেবে সে দেশে যথেষ্ট প্রভাবশালী ও সম্মানীত। বহু পুরস্কারে ভূষিত এই কবি পেয়েছেন ‘কুইন্স গোল্ড মেডাল ফর পোয়েট্রি’র মতো রাজকীয় খেতাব। ২০১০ সালে তাকে দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত সম্মানজনক সিবিই (কমান্ডার অব দ্যা অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) উপাধি।

ইমতিয়াজ ধরকর যেমন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানিত হয়েছিলেন, আর্মিটেজকে ২০১৫ সালে আরেক বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ‘প্রফেসর অব পোয়েট্রি’ পদে গ্রহণ করেছিল। ফলে কেউ কারো চেয়ে কম যান না। পার্থক্য একটাই, নীতিগত প্রশ্নে ইমতিয়াজ যেখানে ‘না’ বলেছেন, আর্মিটেজ সেখানে বলেছেন সম্মতিসূচক বাক্য। এতে কারোই কবিকৃতির হ্রাস-বৃদ্ধি না হলেও বিষয়টি কাব্য-সাহিত্যের ইতিহাসে তো বটেই, গ্রেট ব্রিটেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘পোয়েট লরিয়েট’ প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে থাকবে।

গ্রেট ব্রিটেনে ‘পোয়েট লরিয়েট’ আসলে একটি ‘রাজসম্মান’। সদ্য-বিগত ‘পোয়েট লরিয়েট’ ক্যারল অ্যান ডাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি রাজপরিবারের বন্দনা করে এবং রাজকীয় ঘটনাবলীকে মর্যাদা জানিয়ে তেমন কিছুই তার কবিতায় আনেননি। যদিও ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদের শর্তে এমন কিছু নেই যে, মনোনীত কবিকে ‘রয়্যাল ইভেন্ট’ নিয়ে লিখতেই হবে। রাজ-বন্দনার অফিসিয়েল বাধ্যবাধকতার কথাও কাগজে-পত্রে উল্লেখ নেই। কিন্তু ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদাধিকারীকে ঐতিহ্য মেনে কিছু ভালো কথা ও প্রশংসা-বাক্য রাজা, রানি ও রাজপরিবার সম্পর্কে বলার ও লেখার রেওয়াজকেও অস্বীকার করা যায় না।

ইমতিয়াজ ধরকর কবিতাচর্চার ক্ষেত্রে ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদ না নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকির দিকগুলোকে সরাসরি এগিয়ে গেলেন। সাইমন আর্মিটেজ বিষয়টিকে সহজভাবেই নিয়েছেন। বলেছেন: ‘‘It is still a royal appointment…but I think it’s become a much more every day, commonplace, domestic activity now in the workplace of poetry and not just something that’s seen as it was in the old days as a duty or a requirement or an invitation to write about royal occasions.’’

ইতিহাসই বলতে পারবে, কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন: সাইমন আর্মিটেজ নাকি ইমতিয়াজ ধরকর?

আপনার মতামত লিখুন :

পদাবলি পঞ্চক

পদাবলি পঞ্চক
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

লালবাগের কেল্লার শিথানে

বাসের টিকিট কাটার মুরাদ ছিল না আমাদের
হেঁটে আসি শিয়া মসজিদ থেকে হাইকোর্টের মাজার অবধি,
জমেনি মজমা—মৃদু স্বরে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে তুমি বললে
ফিরবে না মোহন মৌতাত—সমুখে না থাকলে বুড়িগঙ্গা নদী।
ফের পয়দলে কার্জন হলের লাগোয়া ফুটপাত ধরে পথচলা
দেখি—মিডফোর্ডের বয়োবৃদ্ধ বৃক্ষটি ঝড়ে হয়েছে উন্মূল
এত রাতে যাবই বা কোথায়—শহীদ মিনারের বেদিতে বসি,
পোড়া চন্দনে মেশে চামেলি—আমাদের গন্তব্য চান খাঁর পুল।

কিভাবে যে পা থেকে নিখোঁজ হলো জোড়া পাদুকা
হেঁটে আসি—নাঙা পায়ে ইমাম বাড়ায়,
নগরীতে তিরোহিত হয়েছে বিজুলি—উড়ছে বাদুড়
একটি মুমূর্ষু মোম টিমটিমিয়ে জ্বলে ঝরোকায়।

নিরিখ করে বলা মুশকিল—কিভাবে যেন উঠে পড়ি
পরীবিবির মাজারের কাছে এক পুরাতাত্ত্বিক সাম্পানে,
দূরে—কামরাঙির চরে ফুটেছে চন্দনে চামেলি
উজালা হয়েছে জোছানার অনন্ত বিধুর অনুদানে।

আমাদের চেতনায় দোল তোলে মূর্ত হয়
সুরা ও সংগীতের বিমূর্ত ছলনা,
অই রাতে ওপারে গেলে তুমি—আর এপারে
বসত করেও আমার কোনো গতি কিছু হলো না।

অসুরবানিপালের কিতাবখানা

অঘটনের প্রতীক্ষায় বসে আছি
বনানী আমার পুড়ছে
লোহিতে নীলাভ শিখা ছড়ানো অনলে
এ বিরাণভূমি ছেড়ে..ভাবি—চলে যাব একদিন
ভিন্নগ্রহে কোনো না কোনো কৌশলে।
হাঁটব ক্রিস্টালের চূর্ণে দ্যুতিময় সৈকতে
যেখানে মারমেইডরা ম্লান হেসে রোদ পোহায়
দিবস ও নিশিরাতের ফারাক নেই কোনো
নিহত নক্ষত্ররা অবলীলায় ঝরবে তাম্র পরিখায়।

আমাকেও আর তৈরি করতে হবে না পাণ্ডুলিপি
থাকবে না কামের কালোয়াতি
যশের জগতঘনিষ্ঠ প্রলোভন
থাকবে না আতঙ্ক
কখন কে বা করে এ হৃৎপিণ্ড হরণ।

আমার নিজস্ব নিশিথে তিনটি স্বর্ণবিধুর চন্দ্র
ক্রিমসনের জারকে ধোয়া নীলিমায়
তৈরি করবে কসমিক এক ত্রিভুজ
তোমরা যারা তালাশ করছো অনেক আকাশে
এভাবে পাবে না কিছু
কালপুরুষের শিকারি—চুম্বক তুফানে হবে নিখোঁজ।

স্ফটিকের একটি অশ্ব—যার জন্ম হয়নি
ঠুকবে নাল আমার নিভৃত ব্যাবিলনে
কথা ছিল তুন্দ্রার তুষার মাখা হরিণ হব
কেন এ মানব জন্ম—কেন বা খুঁজছি
অসুরবানিপালের কেতাব খানা
ভিন্নগ্রহের মন্দির প্রাঙ্গণে।

ঋষিবৃক্ষের রূপালি ছায়ায়

ভালো হয়েছে, এসেছো আজ গল্ফ ক্লাবে
বসেছো কার্ড টেবিলে পরদেশি তিন যুবকের সাথে
বলছো কথা মৃদু স্বরে শোভন সদভাবে;

কালকেও দেখেছি তোমাকে
মামবা পয়েন্টে পানশালায়
বসে ছিলে ফ্রেঞ্চ উইন্ডোর পাশে একা,
ঘুরে ফিরে ফ্রিটাউনের হরেক চবুতরায়
নানা মাইফেলে বারবার
আমাদের হয়ে যাচ্ছে দেখা;

মোমের আলোয় অদৃষ্ট ছুঁয়ে কাল বেজায় বিষণ্ণ ছিলে
বার কাউন্টার থেকে যখন ড্রিংকস নিলে
মৃদু হেঁটে মৎসকন্যার লাস্যে
কটিতটে দোলনচাপার ছন্দ মাধুরী রটে
চোখে চোখে অভাজনের ধারাভাষ্যে;

আজকে সাবলীল ক্লাবখানায়
নৃত্যের মেহগিনি পাটাতনে
দেহে তোমার বক্ররেখা নিসর্গের খেয়ালে,
আঙিনায় ঋষিবৃক্ষের পাতা কাঁপে আনমনে
বাটিকের চিত্রিত বনে আদিম গুহার দেয়ালে
আঁকা গুল্মময় ত্রিভুজ
সারাসিনের স্থাপথ্য বিশেষ
বুকে ধরে রাখো কম্পমান জোড়া গুম্ভুজ;

এসো, কথা বলি
কিনে দেই কাটগ্লাসে টলটলে ককটেল,
এভাবে হয় জেনো, মাছের ছায়া দেখে
সৈকতে শুভ্র সিগাল উদ্বেল;

কাছে এসো, বাইরে যাই
সিগ্ধ আঙিনাতে ঋষিবৃক্ষের রুপালি ছায়ায়
একটু দাঁড়াই,
দ্যাখো—ঘাসের সবুজ ধনেখলিতে
পপকর্নের মতো ঝরছে জেসমিন,
তুমি ভালোবাসো ধ্বনি
পাঁজরের আইপডে মৃদুস্বরে শোনো
হৃদয়ের তাধিন;

রূপজীবা নও তুমি
না-আঁকা চিত্রপটের বিমূর্ত ভাবনায় বিভোর ভার্জিন,
ওভাবে চাইনি তো তোমাকে
শুধু পরশের পাপড়িতে বিভোর হয়েছি
অচল মুদ্রার মতো বহু ব্যবহারে আমি অর্বাচীন;

ঠোঁটে ধরে আছো যে সিক্ততা
তিতমধুর সুরভীতে ভরা ভারমুথ,
গ্রীবার আকাশনীলে কিভাবে যেন
আঁকা হয়ে যায়
মহুয়ার মোহরের ছাপ নিখুঁত;

কালকে আবার এসো
সমুদ্রপাড়ে ক্যাফে সাফরানে বসি আমি
দুপুরবেলা প্রতিনিয়ত,
সৈকতসূর্যের নিরিবিলিতে পান করো
এক পেয়ালা মাকিয়াতো,
জানা যাবে আগ্রহ তোমার প্রণয় না পারফিউমে,
আমি আছি প্রাচীন মুদ্রা মানচিত্র
আর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির ভলিয়ুমে;

আসবে কিন্তু
জানো তো ফ্রিটাউনে উড়ছে আজকাল অজস্র বাঁদুড়
তাদের কালো ডানায় ছড়াচ্ছে কলংকিনী ইবোলা,
বলা তো যায় না কখন কিভাবে রদ হয়ে যায়
আমাদের পথচলা।

কাঠের বাড়ি

খোয়াবে কদাচিৎ যেমন দেখা দেন প্রয়াত কুটুমখেশ
তেম্নি কাঠের বাড়িটি উঁকি দেয় অবচেতনের সায়রে
যেন বা ঠারেঠুরে নিরিখ করে দেখে নিতে চায়
তাকে মানে আছে কিনা
ঘরখানি খালি কেন—গিরথাইন গিয়েছেন বুঝি নাইওরে
ফেরেশতার লেবাসের মতো সফেদ চুনখাপ সবুজ হয়েছে শ্যাওলায়
সব্জিখেতে এখনো ফলে কী ধনেপাতা, পেঁয়াজকলি—সুগন্ধ ছড়ায় পুদিনা।

ভাঙা পাল্কির রন্ধ্রে রন্ধ্রে নীড় বেঁধেছে ডানাহীন উঁইপোকা
তলায় ঘন অন্ধকারে বসে আছে জোড় ব্যাঙ
গজিয়েছে ঝালর শোভিত একগুচ্ছ ভুঁইফোড় ছত্রাক
পিঁপড়ার ব্যস্ত চলাচলে গড়ে উঠছে ঘরবাড়ি সাঁকো ও পরিখা
বিজুলি চমকের বাজপড়া হাঁকে পুকুর থেকে উজিয়ে আসে কৈ মাছের ঝাঁক।

জানালার রঙিন কাচে জমেছে কুয়াশা—বসে নেই কেউ মজা দিঘির ঘাটে

বাতায়নে দৈত্যচক্ষু নক্ষত্রের মতো বিস্ফোরিত হয় লাল ও নীল বর্ণের তজল্লা
ঘরে থাকতে চায় না মন—বাইরে যাবই বা কোথায় কোন তিমিরের তল্লাটে
খড়ের গাদার তলায় লুকিয়ে ডিম গলার পালক ফুলিয়ে তিতির দুটি ছড়ায় হল্লা।

কাঠের বাড়িখানি ভালোবাসে গ্রীষ্মের দাবদাহ
আঙিনায় হরেক কিসিমের আমের বৌল ফুটিয়ে মাতায় আঘ্রাণে
চুনসুরকির এ পড়ো দালানে তাইয়ার হয় মেজবানীর দিলখোলা আবহ
নিদাগ দুপুরে আমকুড়ালির অর্কিড ফুটিয়ে পাহাড়ি ময়নার ঝাঁক ডেকে আনে।

নদীজলে কটনউড বৃক্ষের সোনালি ছায়া

সারাদিন—যেখানেই যাই না কেন
যে পাহাড়ে করি সাহসী হাইক
অজানা হ্রদে খুঁজি চক্রবাক
যে ট্রেইলে হাঁকাই না কেন মাউন্টেন বাইক
ফিরে আসি অপরাহ্ণে রিও গ্র্যান্ড নদীটির তীরে
পাড়ে এক সারি কটনউডের গাছ
অটামের সোনালি পত্রালির ছায়া ভাসে
তার বহতা নীরে।

ফিরে আসি নদী ও বৃক্ষের নিরালায়
নীলিমা মুখরিত হয় চক্রাকারে উড়া চিলে
কটনউডের সরণিতে হাঁটি আনমনা
দেখি—ঝরাপাতা ভেসে যায় স্বচ্ছ সলিলে।

ভাটিতে সাংগ্রে ডে খিস্ত পাহাড়ের
শিলাপাথরে গড়া নাজারাতের গির্জার ইমারত
অপরাহ্ণের আলো পড়ে দীর্ঘ ছায়ায় উদ্ভাসিত হয়
ক্রুশ কাঁধে যিশুর অন্তিম যাত্রাপথ।

রিও গ্র্যান্ডের পাড়ে বসে আমি আজ
রুপার চামচে করি
ক্যকটাস নিঙড়ানো পেওটি সেবন
নদী ও পাহাড়ের পুরাতাত্ত্বিক অবয়বে
আঁকা হয় বিবলিক্যাল ফ্রেস্কোরাজি
আমার করোটিতে তৈরি হয় মন্সটারি—দিব্য তপোবন।

ক্যাকটাসের মায়াবী নির্যাস ছড়িয়ে যায় শরীরে
স্নায়ুতন্ত্রে হয় তা ক্রিয়াশীল
বেলা যায়—বুকের পাঁজরে নেমে আসে আকাশ
গোধূলি ছড়ায় লোহিতে থোকা থোকা নীল।

নদীটি সাঁজের বর্ণিল আভায় সেরে নেয় প্রসাধন
পরে সে বিয়ের কনের জলজ রুপালি গাউন
পাশে কটনউডের বৃক্ষগুলো
ব্রাইড মেইড সেজে ছড়ায় সোনালি আগুন
তারা উঠে যায় কল্পিত নাজারথের গির্জায়—
ফুলের সাঁজি হাতে দাঁড়ায় বেদির সিঁড়িতে
বিয়ের মহড়া চলে—তৈরি হয় প্রতিশ্রুতির খসড়া
দিব্য বরের প্রতীক্ষায় ইঞ্জিল শরীফ হাতে
আমি বসে থাকি মেহগিনির পিঁড়িতে।

সবিনয়ে গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি

সবিনয়ে  গাছ নুয়ে আসার স্মৃতি
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

যে বাতাস চেনে তোমার কার্বনশ্বাস

তোমার অমর্জিতে নামা সন্ধ্যারে পাশ কাটায়ে
আলিসার কোনায় গিয়া বসো
—ভর করা বাতাসে হেলান দিয়া।
করুণার মতো কইরা তাকাও
তবু যে পাখি ঘরে ফিরতাছে না ঠিক সময়ে—তার দিকে,
যেন কোনো নিদান নাই,
কোনো সময় তৈয়ার হয় নাই তখনও
অসময়ের ভেতর-বাহিরে,
এমন তো হরহামেশাই ঘটে বইলা চোখ ফিরাও নাই অ-দৃশ্যের থিকা,
যেন তারা থাকে এইসব দৃশ্যাবলিরে জড়ায়ে।
তুমি তবু অহেতুক পাখির মন ভাবো নিজেরে নিদারুণ নির্জনে।

কেমন কষ্ট!

এমন অনেক কিছু নিয়াই চলি প্রতিদিন, চলতে হয় তাই।
চাবি, মোবাইল, মানিব্যাগ, খুচরা কয়েন, গত মাসে ব্যাংকে ১০ ডলার জমা দেয়ার রসিদ,
ব্যবহৃত ডাকটিকেট, দেশলাই, সিগারেট, মেট্রোকার্ড,
চুইংগামের খোসা, বাজারের-ফর্দসহ বিবিধ আপঝাপ জিনিস থাকে হাতে পকেটে।
তার মাঝে যেইটা নিয়া চলতে সবচেয়ে কষ্ট হয় “তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট”
ওগো মা আমার—মাতৃভূমি—
তোমারে ছাইড়া আসার কষ্ট
এক পৃথিবীতে যত মানুষ থাকে তত পৃথিবী সমান।

অসুখ

এইসব নিয়া বইসা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হইলে
নদীটা ডুবতে থাকে,
যেন—অনেক উঁচা থাইকা পালক খইসা পড়ে হেইলা দুইলা,
—যেন আলগোছে কেউ রাখল ঢেউ সিথানে, তেমন একটা পাতা
গন্ধকের মতো রটে
আলোকে সালোকে সংশ্লেষণে—
অথচ একটা সুর মরতে গেলে
পাখির দায় নিয়া ঘুমাইতে চায় সহজ উদ্ভিদ,
পাখনার পাশে মেলে ধরে—
পিঠে পিঠ বেয়ে উঠা জরাক্লান্ত স্বেদ, বাতাসের কনিকা,
একটা সবুজ অ্যাম্বুলেন্স ভর্তি চারা গাছের কংকাল,
আমাদের হীমবাহিত জলজ অসুখেরা
এবং
সবিনয়ে
গাছ নুয়ে
আসার স্মৃতি।

ঘনঘোর

মিল্কিওয়ে যখন তার একান্ত সূর্যদের নিয়া পৃথিবী সমেত পার হইতাছিল ছায়াপথ—
আমি তখন আরো ট্রিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের ভিন্ন পৃথিবী হইতে
পৃথক কোনো উপগ্রহের ছায়ায় নিজেরে আরো একটু সরায়ে নিয়া তাকাইলাম—
দেখি দূর আরো দূর কোনো মহাকাশ স্টেশন,
যেখানে আমার যাইতে হবে,
যেন সেই স্টেশন ওত পাইতা থাকবে পৃথিবী—মিল্কিওয়ে যাওয়ার পথে।
সেই স্টেশনে থামলে পরে আমি উঠব পৃথিবীতে,
যেন ভ্রমণ করার ছলে দেইখা যাব আমার বিগত পৃথিবী,
যেখানে আমি ছিলাম, নাকি ছিলাম না?
কোনো কালে কি সেখানে থাকতে যাব আমি?
যাই হোক, এমন ভাবনা আমি ভাবতেই পারি কী ছিলাম কী ছিলাম না,
তাতে সেই পৃথিবীতে সত্যিকারভাবে থাইকা যাওয়ার বাসনা ঘোরে রূপ নিতে থাকলে—
আমি নাইমা আসব, স্টেশনে, যেন আমি স্টেশনের, যেন আমিই স্টেশন।
যেন একটা স্টেশন অপেক্ষা করে স্টেশনে অন্য একটা স্টেশনের।
আসলে আমরা সবাই এক একটা স্টেশনের অপেক্ষায় আছি।
পৃথিবী হইল সেই সব স্টেশনে যাইবার এক্সপ্রেস ট্রেইন,
বাসনার ঘোরে নাইমা গেলে অপেক্ষা অনন্তের।

আবাল প্রজা

এখন দেখো ভীষণ রৌদ্র, জ্বলো
এখন আষাঢ় ভাদ্র কিংবা ফাগুন
তোমার বুকে জ্বলছে করুণ আগুন
বাতাসে কি দারুণ ঘূর্ণি ধুলো।

এখন প্রজার নেইকো কিছু বলার
এখন প্রজা মুখ বুজে সব সয়
রাজ্যে এখন কম্পিউটিক শান্তি
বললে রাজা হাসতে সবার হয়।

রাজা বললে দিনটি হবে রাত
বললে সে তো তালগাছটিও তোমার
কিন্তু বেটার বুদ্ধি ভর্তি জামার
সেলাই করে প্রজার কঠিন হাত।

সেই হাতে নেই শাবল গাইতি কোনো
সেই হাত আজ করছে মালিশ তেল
আমরা সবাই মাতাল রকম ন্যাড়া
মাথার উপর ঝুলছে পাকা বেল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র