Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

বঙ্গবন্ধু চিরকালের, সব মানুষের অনন্ত অনুপ্রেরণা

বঙ্গবন্ধু চিরকালের, সব মানুষের অনন্ত অনুপ্রেরণা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কাশ্মীর স্বাধীনই ছিল। কিন্তু পাকিস্তানীরা কাশ্মীর দখল করতে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য চান। ভারত কাশ্মীরকে পাকিস্তানীদের হাত থেকে রক্ষা করে এবং বিশেষ মর্যাদা নিয়ে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয়। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংরক্ষিত ছিল। ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাশ্মীরের আলাদা সংবিধান ছিল, আলাদা জাতীয় সংগীত ছিল। পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ছাড়া আর সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল কাশ্মীর সরকারের। ভারতের জরুরি অবস্থাও প্রযোজ্য ছিল না কাশ্মীরে। ৩৫এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাশ্মীররের স্বাতন্ত্র্যের সুরক্ষা দেয়া ছিল। কাশ্মীরে বাইরের কেউ জমি কিনতে পারতেন না। ব্যবসা বা চাকরি করতে পারতেন না। এমনকি কাশ্মীরের মেয়েরা বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনি পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। তারমানে ভারতের অন্তুর্ভূক্ত হলেও ৭২ বছর ধরে কাশ্মীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই চলছিল।

কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে তিন ধরনের মনোভাব ছিল। এক দল চাইতো ভারতের সাথে থাকতে, আরেক দল চাইতো পাকিস্তানের সাথে যেতে। আরেক দলের চাওয়া ছিল স্বাধীনতা। ভারতকে জ্বালানোর এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করবে কেন পাকিস্তান। বছরের পর বছর তারা কাশ্মীরে জঙ্গীবাদকে জিইয়ে রেখেছিল। পাল্টা ব্যবস্থা ছিল ভারতেরও। বরাবরই ভারত আর পাকিস্তানের সামরিক ব্যয়ের একটা বড় অংশ দখল করে রাখে এই কাশ্মীর। তাই সাংবিধানিকভাবে স্বাতন্ত্র্য থাকলেও দিনের পর দিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিষ্পেষণের শিকার হয়েছে কাশ্মিরীরা। কাশ্মীরের ৬০ ভাগ আছে ভারতে, আজাদ কাশ্মীর বা অধিকৃত কাশ্মীর নামে ৩০ ভাগ আছে পাকিস্তানের দখলে। আর পাহাড় ঘেরা ১০ ভাগ আছে চীনের দখলে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনোপক্ষই একচুলও ছাড়া দেবে না কাউকে। তারচেয়ে বড় কথা হলো, কাশ্মীর হলো সবার প্রেস্টিজ ইস্যু। গত ৫ আগস্ট ভারতের বিজেপি সরকার যখন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে জম্মু-কাশ্মীরকে দুই ভাগ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করলো, তখন অনেকের মধ্যে আফসোস দেখলাম, কাশ্মীরের একজন বঙ্গবন্ধু নাই। থাকলে অনেক আগেই কাশ্মীর স্বাধীন হয়ে যেতে পারতো। ৪৭ সালে দেশভাগের সময় বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল। ২৩ বছরের সংগ্রাম আর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আর যে কাশ্মীরের ৪৭ সালেই স্বাধীন হওয়ার কথা, সেই কাশ্মীর এখন তিন পক্ষের টানাটানিতে ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ধুঁকছে।

কাশ্মীরে একজন বঙ্গবন্ধু থাকলে কী হতো বা আদৌ কাশ্মীরের একজন বঙ্গবন্ধু থাকা সম্ভব ছিল কিনা জানি না। কারণ বঙ্গবন্ধুর মত নেতা আসলে ক্ষণজন্মা। বাংলাদেশ ভাগ্যবান, বঙ্গবন্ধুর মত একজন নেতা পেয়েছে। কাশ্মীর কেন, বিশ্বের যে কোনো দেশের জন্যই বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া কঠিন। কাশ্মীরের সংকটে যখন সবাই বঙ্গবন্ধুর মত একজন নেতার অভাবের কথা বলেন, তখন একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্বে বুক ভরে যায়। বঙ্গবন্ধু আসলে চিরকালীন, বৈশ্বিক। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নন, শুধু বাংলাদেশের নন; তিনি সারা বিশ্বের। যেখানেই নিপীড়ন নির্যাতন, সেখানেই অনুপ্রেরণার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভারতের আধিপত্যের প্রসঙ্গে কাশ্মীরের আগে আগে সিকিম প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধু না থাকলে বাংলাদেশের পরিণতিও তেমন হতে পারত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের সর্বাত্মক সহায়তা করেছিল। ২ কোটি শরণার্থী ভারতের মাটিতে ছিল নয় মাস।

প্রবাসী সরকার পরিচালিত হয়েছে কলকাতা থেকে। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন ভারতের মাটিতে থেকে, তাদের প্রশিক্ষণে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ভারত সরাসরি যুদ্ধে নামে। ভারত নিশ্চয়ই এতটা উদার নয় যে কোনো স্বার্থ ছাড়াই বাংলাদেশকে স্বাধীন হতে সাহায্য করবে। তাদের প্রথম স্বার্থ ছিল, তাদের চির বৈরী পাকিস্তানকে দুই ভাগ করে দেয়া। আর স্বাধীন বাংলাদেশে আস্তানা গেঁড়ে বসার গোপন আকাঙ্ক্ষাও হয়ত ছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধুর কারণে। ৭২এর ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য ও ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। দেশে ফেরার পথে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই বঙ্গবন্ধু জানতে চান, ভারতের সেনারা কবে নাগাদ বাংলাদেশ ছাড়বে। কিছুটা চমকে গেলেও ইন্দিরা গান্ধী ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনেই ভারতের সেনা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছিলেন এবং তিনি কথা রেখেছিলেন। ৭২এর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনেই ভারতের শেষ সৈন্যটি বাংলাদেশের মাটি ত্যাগ করেছিল। যারা ভেবেছিলেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ ভারতের খপ্পড়ে পড়বে; তাদের ভুল প্রমাণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর দিনটি আমাদের বিজয় দিবস। কিন্তু ৭২এর ১৭ মার্চ দিনটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এসেছে, আর ১৭ মার্চ তা সংহত হয়েছে। মাত্র তিন মাসের মধ্যে এভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের উদাহরণ গোটা বিশ্বেই বিরল। সত্যিই বঙ্গবন্ধু আমাদের ইতিহাসের মহানায়ক। শুধু বাংলাদেশ নয়, বঙ্গবন্ধু সব কালের, সব মানুষের, সব দেশের নিপীড়িত মানুষের নেতা, অনন্ত অনুপ্রেরণা।

আমরা সৌভাগ্যবান আমরা বঙ্গবন্ধুর মত একজন নেতা পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই আমরাই আবার নিষ্ঠুরতায়ও সবার চেয়ে এগিয়ে। পাকিস্তান বারবার চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সাহস করেনি। আর স্বাধীন বাংলাদেশের বিপথগামী সেনারা কিনা তার বুকে গুলি চালিয়ে দিল। আসলে তারা বিদীর্ণ করলো বাংলাদেশেরই হৃদয়। ৪৪ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু নিষ্ঠুরতা, নির্মমতাটুকু এখনও যেন টাটকা।  অনেকবার আমি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটিতে গেছি। বাড়িটির কোণে কোণে নিষ্ঠুরতার চিহ্ন, শোকের আবহ। যতবার গেছি, শোকের পরিমাণ একটুও কমেনি।

এখন বাংলাদেশে লাখ লাখ বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক। কিন্তু ৭৫’র ১৫ আগস্টের পর অবস্থাটা ভিন্ন ছিল। ২১ বছর বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হয়, তখন দেশজুড়ে দারুণ এক আবেগের ঢেউ খেলে গিয়েছিল। সময়ের কারণে সেই আবেগ অনেকটাই থিতিয়ে এসেছে। আওয়ামী লীগের অতি ব্যবহার আর দলীয়করণই বঙ্গবন্ধুর প্রতি সেই উত্তাল আবেগ থিতিয়ে আসার জন্য কিছুটা দায়ী। তবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা কমেনি। বঙ্গবন্ধুর দুটি বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশের পরও আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের আবেগ কতটা শুদ্ধ। দুটি বইই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত। তবে কতটা পঠিত সে নিয়ে সন্দেহ আছে। পড়লেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর বই দুটি কতটা আত্মস্থ করতে পেরেছে বা করতে চাইছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অন্তত এখনকার অনেক নেতাকর্মীর কার্যকলাপ দেখলে মনে হয় তারা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী কিনেছেন কিন্তু পড়েননি বা পড়েছেন কিন্তু আত্মস্থ করতে পারেননি। সুযোগ থাকলে আমি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক কর্মীকে বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' পাঠ বাধ্যতামূলক করতাম। অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে একটি মানুষ কীভাবে একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারে, এ বইটি পাঠ করলে সবাই তা জানতে পারবে।

আচরণ দলীয় কর্মীর মতো হলেও অনেক সাংবাদিক নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করেন। আমি কখনোই নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করি না। নিরপেক্ষতার ব্যাপারে আমার অবস্থান পরিষ্কার। আমি দলনিরপেক্ষ, তবে আদর্শ নিরপেক্ষ নই। আমি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের প্রশ্নে আমি নিরপেক্ষ নই। আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ চাই। আর এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন যিনি দেখিয়েছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রশ্নেও আমার কট্টর পক্ষপাত। আমি নিরপেক্ষতার ভান না ধরে সব সময় বঙ্গবন্ধুর কথা বলি। আমি চাই বাংলাদেশে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি বলে কিছু থাকবে না, থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি করার অধিকার থাকবে না। সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই হবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। আমি চাই, জাতির পিতা প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দলের অভিন্ন অবস্থান থাকবে।

আমি জানি, একদিন না একদিন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী সর্বজনীনভাবে পালিত হবেই। তবে এখন সর্বজনীনভাবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালনের সবচেয়ে বড় বাধা আওয়ামী লীগই। দলটি বঙ্গবন্ধুকে এমনভাবে কুক্ষিগত করে রেখেছে যে, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে ফেলেন। আওয়ামী লীগার হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে বঙ্গবন্ধুর ন্যায্য প্রশংসাটাও করেন না। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় 'জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রণ স্লোগান। এ দুটি শব্দবন্ধ একসঙ্গে, এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হতো। কিন্তু আজ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেও 'জয়বাংলা' বলেন, কিন্তু আওয়ামী লীগের সিল লেগে যাওয়ার ভয়ে 'জয় বঙ্গবন্ধু' উচ্চারণ করেন না। এ আসলে আমাদের হীনমন্যতা। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের একার সম্পদ নয়, তিনি জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আদিখ্যেতা বেশি হলো, চামড়া বাঁচাতে বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা নব্য আওয়ামী লীগার, হাইব্রিড আওয়ামী লীগার আর সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে আসা রাজনীতিবিদদের মধ্যে। কিন্তু আমি নিশ্চিত তারা যত জোরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজিয়ে মানুষকে বিরক্ত করেন, হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্য ততটা মমতা পোষণ করেন না। পোস্টারজুড়ে নিজের ছবি দিয়ে কোনায় বঙ্গবন্ধুকে স্ট্যাম্প সাইজ করা আওয়ামী লীগাররা বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করেন নিজেদের প্রচারের জন্য। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে এই হাইব্রিড মৌসুমি বঙ্গবন্ধু প্রেমিকদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ একজনে। কিন্তু জাতির পিতা হওয়ার পরও ছিলেন অতি সাধারণই। তিনি গণভবনে থাকেননি, বঙ্গভবনে থাকেননি, থেকেছেন ধানমন্ডির অতি সাধারণ বাড়িতে। শেষ পর্যন্ত সে বাড়ি ছিল সবার জন্য খোলা। এখনও সেই বাড়ি সবার জন্য খোলা। তবে এখন সেটা বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। তবে সেখানে গেলে যে কেউ চমকে যাবেন দেশের রাষ্ট্রপতি কি সাধারণ জীবন-যাপন করতেন। প্লিজ সাধারণের বঙ্গবন্ধুকে সাধারণেরই থাকতে দিন। তাকে বিচ্ছিন্ন করবেন না। ঘাতকরা অনেক চেষ্টা করেও বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস মুছতে পারেনি। পারবে যে না, সেটা অনেক আগেই জানতেন অন্নদাশঙ্কর রায়-

যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মজিবুর রহমান...

প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

আপনার মতামত লিখুন :

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

নীতির রাজার বিদায়

নীতির রাজার বিদায়
প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ

আমার গ্রামের বাড়ি দাউদকান্দি। দেবীদ্বার আমার পাশের উপজেলা, যেটি ছিল অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নির্বাচনী এলাকা। তাই ন্যাপ, মোজাফফর, কুঁড়েঘর শব্দগুলোর ঢেউ দেবীদ্বার থেকে দাউদকান্দিতে আমাদের কানে পৌছে যেতো অনায়াসে। ৭৩এর নির্বাচনের স্মৃতি তেমন নেই। শুধু মনে আছে জাসদের বেশ দাপট ছিল। পরে জেনেছি, দাউদকান্দিতে জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারকে হারিয়ে খন্দকার মোশতাককে জেতাতে হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিতে হয়েছিল। যা বলছিলাম, আমাদের স্মৃতির প্রথম নির্বাচন ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন। ১০ বছর বয়সে অতকিছু বুঝিনি, খালি বুঝেছি, নির্বাচন মানেই স্লোগান, মিছিল, আনন্দ। তো সেই নির্বাচনে নিজের এলাকা ছাপিয়ে পাশের এলাকার কিছু স্লোগান এখনও কানে গেঁথে আছে। হয়তো ছন্দময়তার জন্য, তবে ভুলিনি এখনো- আমার নাম মোজাফফর, মার্কা আমার কুঁড়েঘর; আমার নাম মোজাফফর আহমেদ নুরী, আমি পথে পথে ঘুরি; মোজাফফরের কুঁড়েঘর, ভাইঙ্গা-চুইড়া নৌকাত ভর। এরকম মোজাফফরের পক্ষে-বিপক্ষের নানা স্লোগান কানে আসতো, আসতো নানা গল্পও। ৭৫'র আগ পর্যন্ত আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে বড় জাতীয় নেতা ছিল খন্দকার মোশতাক। এই কুলাঙ্গারের পতনের পর সবচেয়ে কাছের জাতীয় নেতা হলেন মোজাফফর আহমেদ। তখনও দেখিনি, কিন্তু নানান অবিশ্বাস্য গল্প কানে আসে। বিশাল বড় নেতা, কিন্তু একদম মাটির মানুষ। মার্কা যেমন কুঁড়েঘর, মানুষও তেমনি কুঁড়েঘরেরই। মানুষের সাথে মিশে যাচ্ছেন, তাদের মত করে। তাদের ভাষায় কথা বলছেন। লুঙ্গি পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ১৯৭৯ সালের সাজানো একতরফা নির্বাচনে ধানের শীষের জোয়ারও মোজাফফরের কুঁড়েঘরকে ভাসিয়ে নিতে পারেনি। ১৯৮১ সালে ন্যাপ-সিপিবির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন কুঁড়েঘরের মোজাফফর। জিয়াউর রহমানকে জেতাতে আয়োজিত সে নির্বাচনে অন্য কারো জেতার সুযোগই ছিল না।

আমাদের পাশের বাড়ির নেতা হলেও পরে বুঝেছি তিনি দেবীদ্বার বা কুমিল্লা বা বাংলাদেশের নেতা নন; বিশ্বের বাম আন্দোলনেও তার নাম লেখা আছে। ছেলেবেলা থেকে নাম, স্লোগান, নানান গল্প শুনলেও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে। তখন আমরা প্রিয় প্রজন্ম নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। ফজলুল বারী সম্পাদিত সে পত্রিকার অফিস ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষিণ পাশে। আর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের বাসা ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উত্তর পাশে কাকরাইলে। তিনি প্রায়শই সকালে লুঙ্গি পড়ে আমাদের অফিসে চলে আসতেন, একসাথে অনেক পত্রিকা পড়ার আকাঙ্খায়। তিনি পত্রিকা পড়তেন, আর আমরা তাঁর গল্প শুনতাম। ছেলেবেলায় তাঁর সম্পর্কে যা যা শুনেছি, তার একবিন্দুও মিথ্যা নয়। সেই কুঁড়েঘরের মাটির মানুষ। কুমিল্লার আঞ্চলিক টানে কথা বলছেন, বকা দিচ্ছেন। আমরা জানতাম রোদ চড়লে তাঁর মেজাজও চড়ে যায়।

আমাদের কাছে মনে হয় অতি কাছের জন, কিন্তু তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ; ইতিহাসের সাক্ষি নন, তিনি নিজেই ইতিহাস। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই উপমহাদেশের বাম আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, মুজিবনগর সরকারের ৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের একজন, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীর সংগঠক, একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন দেশ, প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতিসংঘে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন, ভিন্ন দলের হলেও বঙ্গবন্ধু যাকে মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন; সেই অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ পত্রিকা পড়তে আমাদের অফিসে আসেন! নিজেদের ভাগ্যকে ঈর্ষা করার মত ম্যাচুরিটি তখনও হয়তো হয়নি আমাদের।

১৯৩৭ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে চান্দিনায় মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় যোগ দিতে গিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তারপর মৃত্যু পর্যন্ত রাজনীতির লাঠি আর ছাড়েননি। বরং রাজনীতি করবেন বলে ছেড়েছেন অনেককিছু, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মত নিশ্চিন্তের চাকরিও। বরং বেছে নিয়েছেন মামলা, হুলিয়া, আত্মগোপন আর কারাবরণের ঝুঁকি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রামেও ছিলেন মোজাফফর।

৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ৩২ বছরের টগবগে তরুণ মোজাফফর তখনকার মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রী মফিজুল ইসলামকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাওলানা ভাসানীর অনুসারী। কিন্তু ৬৭ সালে আদর্শের প্রশ্নে দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে বেকে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে রয়ে যায় চীনপন্থি বামরা। আর মস্কোপন্থিদের নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ন্যাপ'এর সভাপতি। আপনি তার অনেক কাজের সমালোচনা করতে পারবেন। কেন তিনি ৫২ বছর ধরে একটি দলের সভাপতি, ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তি, সমাজতন্ত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাতে পারেননি কেন? স্বাধীনতার পর ন্যাপ-সিপিবি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেই উগ্র জাসদ আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেই জায়গাটা  পূরণ করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এই সব প্রশ্ন-অভিযোগ আপনি তুলতেই পারেন। সাংগঠনিক ভাবে অনেক প্রশ্ন থাকলেও ব্যক্তি অধ্যাপক মোজাফফরের বিরুদ্ধে কেউ কখনো কোনো অভিযোগের আঙ্গুল তুলতে পারেনি। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি একাগ্রতার কোনো তুলনা নেই। তিনি আদর্শের সাথে একচুলও আপস করেননি। বিশ্বাস থেকে নড়েননি এক ইঞ্চিও। তার অনেক কমরেড যখন নামের আগে আলহাজ্ব বসিয়ে নেন, তখনও তিনি বামপন্থায় অবিচল। আপস না করে, লোভের উর্ধ্বে থেকেও যে এই বাংলাদেশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি করা যায়, তার উদাহরণ হয়ে থাকবেন মোজাফফর আহমেদ। এখনকার রাজনীতিবিদদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি মানে রাজা হওয়ার নীতি। আর অধ্যাপক মোজাফফরদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি আসলে নীতির রাজা। মন্ত্রিত্ব যার সম্মতির অপেক্ষায় ফিরে যায়, সেই তিনি শেষ বয়সে স্বাধীনতা পদকও ফিরিয়ে দেন, কারণ পদকের জন্য বা কিছু পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেয়া, পদক ফিরিয়ে এমন সন্তপুরুষ রাজনীতি আর কখনো পাবে?

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা যুগের অবসান ঘটলো। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া সর্বশেষ জাতীয় নেতা ছিলেন তিনি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমাদের এখনকার রাজনীতিবিদরা যদি অধ্যাপক মোজাফফরের জীবন থেকে কিছু শেখেন, জাতির বড্ড উপকার হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র