Alexa

কাছেই মাদক, মুঠোয় অশ্লীলতা ও অকাল মৃত্যু

কাছেই মাদক, মুঠোয় অশ্লীলতা ও অকাল মৃত্যু

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম

গত বছর দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণ, প্রেমিকাকে বন্ধুসহ গণধর্ষণ, ঢাকায় মেসে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা- এসব নানা ঘটনার বর্ণনায় দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলো ছিল পূর্ণ। এ বছর শুরু থেকেই এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হয়েছে মাদকদ্রব্যের ব্যবহারজনিত নৈতিক স্খলন, সামাজিক অস্থিরতা থেকে মানসিক বিপর্যয়, সেগুলো থেকে হতাশা ও অকাল মৃত্যু।

সম্প্রতি আমাদের দেশের একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অর্থনীতি বিভাগের দু’জন মেধাবী শিক্ষার্থী সবার অগোচরে হঠাৎ ভেজাল চোলাই মদ খেয়ে এর বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। যা শুধু তাদের পরিবার বা অভিভাবকদের জন্যই নয়- জাতির জন্য চরম দু:সংবাদ ও ভয়ংকর কিছুর ইঙ্গিত বহন করে।

মাদকের যে কত মারাত্মক ও ভয়ংকর মৃত্যু থাবা আছে তা আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো থেকে সহজেই অনুমেয়। এর কারণ হলো আমাদের কাছেই মাদক, মুঠোয় অশ্লীলতা যা সবসময় সবার হাতে ইচ্ছা অনিচ্ছায় ভাইরাল হয়ে আসছে, কৌতূহল বাড়ছে, নৈতিক শিক্ষার অভাবে অভিভাবকের অগোচরে সেবন চর্চা হচ্ছে ও অকাল মৃত্যু ঘটছে।

মানুষের নৈতিকতা বোধ ভোতা হয়ে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এর ন্যক্কারজনক প্রভাব ছড়িয়ে গড়েছে। গণমাধ্যমে জানা চার্চের পুরোহিত, মাদরাসা-মন্দির-এতিমখানার পবিত্র কর্ণধাররাও এসব কালিমাযুক্ত কাজে জড়িয়ো পড়ছেন! মাদকের সাথে লোভনীয় কালো ব্যবসা জড়িত থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিতদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করা বেশ জটিল হয়ে পড়েছে।

চারদিকে নৈতিকতার অধঃপতন: ও ভয়ংকর নৈতিক স্খলন আমাদের চিরায়ত শক্ত ধর্মীয় মূল্যবোধকে আঘাত করছে। তাইতো, অনেকের মুখের কথা ও কাজের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল। এথেকে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। আজকাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত অস্থির মানুষ কোন কিছু করার আগে স্বাভাবিক চিন্তা ভাগাভাগি করার ধার ধারছে না। ফলে ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা।

কিছুদিন আগে জরুরি কাজে পরিবার নিয়ে হাইওয়ে ধরে যাচ্ছিলাম। ড্রাইভারকে বললাম ধীরে চালাতে। সে দ্রুতবেগে চালাচ্ছিল ও কাঁপছিল। আমি বললাম, আমাদের সময় আছে- ধীরে চালাও। সে উত্তরে বলল স্যার চা খাবেন? আমি বললাম কোথাও ভাল চায়ের দোকান দেখলে দাঁড়াও, সবাই চা খাব। আমরা চা খেলেও ড্রাইভার চা খেলনা! সে বড্ড দেরি করছে। আমি চায়ের দাম দিতে গিয়ে জানলাম সে এনার্জি ড্রিংকস পান করেছে। আমাকে জানালো এসব এনার্জি ড্রিকংস-এ মাদকদ্রব্য থাকে। তাই কিছুটা নেশা হয় ও তার গাড়ি চালাতে ফুর্তি লাগে। ভাবলাম এনার্জি ড্রিকংস- তো বিক্রি বন্ধ, তবুও পাওয়া যায় কেন? তার কথা শুনে আমি তো হতভম্ব। ইতোমধ্যে গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে। তাড়া থাকায় আমি তাকে গাড়ি থামাতে বলতেও পারছিলাম না। স্বাভাবিকভাবে আমার নিজের অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল।

কথা হলো- মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে কার্যক্রম থাকলেও চালকদের মধ্যে মাদকদ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কোনো মাপকাঠি নেই। মনে পড়ছে, বিদেশে পড়াশোনা করার সময়কার একটি চমকপ্রদ কথা। একদিন একাডেমিক কাজে দেরি হওয়ায় ইউনিভার্সিটি থেকে অনেক রাতে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। তখন জাপানে চেরি ফুলের মৌসুম। শনিবারের রাত। চেরিতলায় "হানামি"-অর্থাৎ ফুল দেখা উৎসব শেষে সবাই "সাকে"- (একধরণের মদ) খায়। এরা অনেকেই উল্টোপাল্টা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরে। তখন পুলিশ তাদের আটকিয়ে রাখে। হঠাৎ আমার সামনে দিয়ে উল্টোপাল্টা গাড়ি চালিয়ে একজন চলে যেতেই পুলিশ বলে উঠলো- থামো ! সাথে সাথে আমাকেও থামতে হলো। পুলিশ ওই গাড়ি চালকের মুখে একটি লম্বা ডিটেক্টর ঢুকিয়ে দিয়ে মাদকের নমুনা পেয়ে জরিমানা করলো। তারপর এগিয়ে এলো আমার দিকে। মুখে একটি ডিটেক্টর ঢুকিয়ে দিয়ে কিছুই পেল না। বললাম আমি "সাকে" বা মদ খাই না, মুসলিমদের জন্য মদ হারাম। পুলিশটি বেশ অবাক হলো। আইডেন্টিটি কার্ড দেখে আমাকে ইশারায় সামনে চলে যেতে বলল।

প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশে মদ নিয়ন্ত্রণে মরিচের গুঁড়ো কিনে টাকা খরচ করা হলেও মাতাল ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ মাদকের নমুনা মাপার ডিটেক্টর মেশিন কিনছেন না কেন? ছোট আকারের এই যন্ত্র কিনলে খুব দ্রুত মাদকের নমুনা টেস্ট করা যাবে এবং চালকের মাদকাসক্তির কারণে ঘটা সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে।

অধুনা শহর-গ্রামে ঘাটে, মাঠে, অলিতে গলিতে মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। মদ, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকের ব্যবহারকারীরা খুন, গুম, হাইজ্যাক, চুরি, ডাকাতি, ইভ-টিজিং ও ধর্ষণের সংগে নির্দ্বিধায় জড়িয়ে পড়ে। উন্নত প্রযুক্তির উক্ত যন্ত্রের যথার্থ ব্যবহার দিয়ে এসব অপরাধীদেরও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজের সকল স্তরের নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক প্রযুক্তির পাশাপাশি আধুনিক যান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে। কারণ মাদকাসক্ত অপরাধীদেরকে অনেক সময় সামাজিকভাবে সচেতন করা হলেও মাদকাসক্ত ব্যক্তি ও পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না । তারা সেটা শীঘ্র ভুলে যায় অথবা গ্রাহ্য করতে চায় না। সুতরাং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করে ধর্ষকের মত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মোদ্দাকথা হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কার? এজন্য যিনি দায়িত্বে আছেন তিনি যদি তার বসকে প্রটোকল দিতে সব সময় ব্যতিব্যস্ত থাকেন তাহলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাজ কে করবেন? তিনি যদি নেতিবাচকভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের কাজটি সম্পন্ন করতে থাকেন তাহলে সামাজিক শিথিলতা দেখা দেবে এ সামাজিক অনাচারগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আর এগুলো থেকেই মিথ্যা, ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদির জন্ম হবে ও মানুষের নৈতিক চরিত্র নষ্ট হবে এবং মানুষ ও অবলা পশুতে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। তাই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে তৎপর থাকতে হবে।

সম্প্রতি ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ষণ বিষয়টি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এর ব্যাপকতা ভাবিয়ে তুলেছে। বিজ্ঞানের নব-নব আবিষ্কারের সাথে প্রতিনিয়ত মানুষের যোগাযোগ ঘটছে। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে মানুষ পরিচিত হচ্ছে বিশ্ব বাজারের সাথে। বাজার অর্থনীতি এখন সমাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

আপত্তিকর ছবি ও নিষিদ্ধ ছবি নিয়ন্ত্রণে দেশে এখনও কার্যকর ইন্টারনেট ফায়ারওয়াল ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পর্নো ছবিতে পরিবার বা রাষ্ট্র কারো কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। শুধু সাইট মুছে ফেললেই তা দূর হয় না। বরং নতুনরুপে বিদেশ থেকে নতুন নামে আবার অ্যাকসেস পাওয়া যায়। কারণ এগুলোর নির্মাতারা অত্যাধুনিক হ্যাকিং কৌশল করে যা নিত্যনতুন ভাইরাস বহন করে আমাদের কোলন সঞ্জাত সব ইলেকট্রনিক ডিভাইসে অতি সহজে ঢুকে পড়ে। কৌতূহল বশত: মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটে টিপাটিপি করতে করতে নানা আপত্তিকর উলঙ্গ ছবি খুলে ফেলে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা এগুলো দেখে এক ভয়ংকর পথে পা বাড়ায়।

অনেক উন্নত দেশে বিয়ে না করেও সন্তানের মা-বাবা হওয়া যায়, এ দেশে সেটা অপরাধ। ভিনদেশে সব শিশুরাই স্কুলে যায়, এ দেশে সবাই এখনও যায় বলা হলেও নানা কারণে যেতে পারে না। সেসব দেশে শিশু-কিশোরদের যৌন শিক্ষা স্কুলের পাঠ্যভুক্ত, এদেশে নয়। দেশে দেশে কৃষ্টিগত ফারাক থাকলেও ইন্টারনেট-এ এই ফারাক নেই। এমনকি আমাদের দেশে এখনও ইন্টারনেটে বাচ্চাদের জন্য কার্যকর ফায়ারওয়াল তৈরি করা হচ্ছে না। কারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সিংহভাগ পরিবারের বাবা মায়েরা নিজেরা ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানেন না। তাঁরা বাচ্চাদেরকে চাহিদানুযায়ী টাচ মোবাইল সেট, বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে দিয়েছেন। বাচ্চারা সেটা দিয়ে কী কাজ করছে তা তদারকি করার জ্ঞান ও দক্ষতা বাবা মা অথবা অভিভাবকদের নেই।

রাষ্ট্রকেই তার সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলো কিভাবে কাজ করবে তার জন্য মনিটরিং ও ফলোআপ আউটলাইন তৈরি করতে হবে। এছাড়া সোশ্যাল মানচিত্র বানিয়ে সামাজিকভাবে দুর্যোগপূর্ণ এলাকাগুলোকে একটি এ্যাকশান প্লানের আওতায় আনতে হবে।

সমাজের সকল মানুষের চাহিদা ও অনুভূত প্রয়োজন পূরণের স্বার্থেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটেছে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বলতে কতগুলো শক্তি ও মূল্যবোধের সমষ্টিকে বোঝায়, যার দ্বারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও কলহের নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে যাতে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও কলহ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর শৃঙ্খলার পরিপন্থী হয়ে না ওঠে। রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম, পরিবার ছাড়াও শিক্ষা, সাহিত্য, জনমত, নেতৃত্ব, আদব-কায়দা, শাস্তি, পুরস্কার, প্রশংসা, ইত্যাদি হলো সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বাহন। এগুলোর মাধ্যমে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা তৈরি হয়।

টাকা ভর্তি সিন্ধুক খুলে দিয়ে ঘরের দরজা খুলে ঘুমালে যে অবস্থা হয়-আমাদের সমাজে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তাই হচ্ছে। বর্তমানে নবগঠিত অনু পরিবারগুলোতে পারিবারিক অনুশাসন নেই। বাবা-মা সবসময় ব্যস্ত থাকেন। সেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক অনুশাসন নাই তা বলাই বাহুল্য। বাচ্চাকে কম্পিউটার গেম খেলতে দিয়ে বাবা-মা খালাস। বাচ্চারা পেন ড্রাইভে বন্ধুদের থেকে ভয়ংকর কার্টুন, শিশু পর্নোগ্রাফি সংগ্রহ করে। শিশু পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে আমাদের যে আইনটির কথা বলা হয়েছে তার বাস্তবায়ন কে কিভাবে করবেন সেজন্য অদ্যাবধি কোনো সামাজিক বা প্রযুক্তিগত নীতিমালা তৈরি হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

তাই সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর আগে সামাজিক অনাচার ঘটার নোংরা ও জঘন্য পথগুলো বন্ধ করতে হবে। সামাজিকভাবে মোটিভেট করে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট পর্যায় ও সময় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আইনের নিয়ন্ত্রণকারীকে সজাগ থেকে ও সততার সাথে নিবেদিত প্রাণ থাকতে হয়, তা না হলে সেখানেই অকল্যাণ ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।ঠিক তেমনি সমাজের সব পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিকতার সাথে আমাদের সবাইকে বাঁচার চেষ্টা করে যতে হবে।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :