Barta24

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

জাকাত আদায়ের জন্য যা জানা জরুরি

জাকাত আদায়ের জন্য যা জানা জরুরি
জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি, ছবি: সংগৃহীত
মুফতি এহতেশামুল হক কাসিমী
অতিথি লেখক
ইসলাম
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

জাকাত ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ভিত্তি। জাকাতের মাধ্যমে ইসলাম সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে চায়। কোরআনে কারিমের সূরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, ‘জাকাত পাবে ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী, যাদের ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করা দরকার, ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত, নিঃস্ব পথিক। আল্লাহর পথে সাধারণ জনকল্যাণমূলক কাজেও এ অর্থ খরচ করা যাবে।’

ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক জাকাত প্রদান ফরজ যা বাধ্যতামূলক এবং অবশ্য পালনীয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজের কোনো স্থানে যেন ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত না হয়ে ওঠে। যারা প্রয়োজনাতিরিক্ত যথেষ্ট পরিমাণ ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে তারা যেনো তা জমা না করে রাখে, ব্যয় করা বন্ধ না করে দেয়। বরং তা এমনভাবে ব্যয় করে যার ফলে সমাজের আবর্তিত সম্পদ থেকে যেন বঞ্চিতরা জীবিকা অর্জন করতে পারে। এ লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ লোকদের কাছ থেকে নেওয়াই হচ্ছে জাকাত।

জাকাত কোনো প্রকার কর বা শুল্ক নয়। কর রাষ্ট্রের সাধারণ ব্যয় নির্বাহের জন্য আরোপ করা হয়। কাজেই জাকাতকে কর বলা যায় না। এটাকে বড়জোড় বাধ্যতামূলক সামাজিক কর হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে এবং এই কর প্রযোজ্য হবে উদ্ধৃত্ত বিবেচিত সম্পদের ওপর। একজন ব্যক্তি তার হালাল আয় ও সম্পদ হতে সামাজিক জীবনযাত্রার মান রক্ষার জন্য ন্যায্য চাহিদা মেটানোর পর তার উদ্বৃত্ত সম্পদের ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে।

কারা জাকাত দেবেন
প্রত্যেক মুসলিম যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাকে জাকাত দিতে হবে। নেসাব হচ্ছে ওই সঞ্চিত সম্পদ, যা মানসিকভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষের নিজের মালিকানায় পূর্ণ এক চন্দ্র বছর ছিলো- তাহলে তাকে জাকাত দিতে হবে। অবশ্য ক্ষেতের ফসল, খনিজ সম্পদ, সমুদ্র থেকে পাওয়া সম্পদ ও মাছের ক্ষেত্রে সারা বছর এ সম্পদ হাতে থাকার শর্ত নেই। ফসল আহরণের পরপরই এসবের জাকাত দিতে হয়।

জাকাতের বছর কিভাবে হিসাব করবেন
এ বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মতামত হচ্ছে, শুধু বছরের দিনের হিসাবটা ধরতে হবে। অর্থাৎ যদি কারও জাকাত দেওয়ার বছর হয় ১ রমজান থেকে শাবানের শেষ দিন, তাহলে বছরের শেষের দিনের সম্পদের হিসাব করতে হবে এবং সেদিন নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে জাকাত দিতে হবে।

অবশ্য অন্য অনেক ইসলামি স্কলারদের অভিমত হচ্ছে, জাকাত নির্ধারণ করতে হবে বছরের শুরু ও শেষের দিনের হিসাব ধরে। অর্থাৎ ওপরে উল্লেখিত বছরে যদি কারও ১ রমজান ও শাবানের শেষ দিন নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে শাবানের শেষের দিনের সম্পদের হিসাবের ভিত্তিতে জাকাত দিতে হবে।

জাকাতের তাগাদা দেওয়া হয়েছে কোরআন-হাদিসে
জাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রোকন। যেকোনো মুসলিম পুরুষ অথবা নারী যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন এবং সম্পদের ওপর বছর অতিক্রান্ত হয়, তবে ওই ব্যক্তির ওপর এই সম্পদের জাকাত আদায় করা ফরয। জাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ তা আদায় না করে, তবে সে কঠোর শাস্তির যোগ্য হবেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জাকাত আদায় না করার ফলে ইহকালীন ও পরকালীন বিভিন্ন শাস্তির কথা সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত রয়েছে।

যে ব্যক্তি জাকাত আদায় করে না সে একজন মহাপাপী, ফাসিক ও ফাজির। আর কেউ যদি জাকাতকে অস্বীকার করে এবং মনে করে বা বলে যে, জাকাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই; কে বলে জাকাত ফরয? এতে কোনো ফায়দা নেই অথবা যে বলে, জাকাত ফরজ করে আমাদের উপার্জিত ধনদৌলত কেড়ে নেওয়ার একটা কৌশল করা হয়েছে ইত্যাদি। মোটকথা যেসব কথা দ্বারা বুঝা যায় যে, জাকাত ফরজ হওয়াকে অস্বীকার করে কিংবা এর ওপর খুব অসন্তুষ্ট ভাব বুঝায়, তবে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।

যে সব সম্পদের জাকাত দিতে হবে
জাকাত নির্ণয়ের প্রক্রিয়া
১. নগদ বা ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ, শেয়ার সার্টিফিকেট, বন্ড বা ওই শ্রেণির ঋণপত্র (আপাতত মূল্য Face value জাকাত বছরের মধ্যে প্রাপ্ত জীবন বীমার অর্থ (পরিপক্কতা Maturity বা জীবিতকালীন সুবিধা Servival benefit বা স্বত্বত্যাগ Surrender করার কারণে), জাকাত বছরের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি Final settlment বা অফেরতযোগ্য উত্তোলনের non-refundable withdrawal), কারণে প্রাপ্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্য ২.৫%
২. স্বর্ণ, রৌপ্য, মূল্যবান পাথর, স্বর্ণ বা রৌপ্যের অলংকার স্বর্ণের ক্ষেত্রে ৭.৫ তোলা, রৌপ্যের ক্ষেত্রে ৫২.৫ তোলা এবং স্বর্ণ-রৌপ্য একত্রে থাকলে ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্য বাজার দামের (Market Value) ২.৫ %
৩. শিল্প বা ব্যবসা-বানিজ্যের মজুদ (তৈরি পণ্য, আধা তৈরি পণ্য ও কাঁচামাল) ৫২.৫ তোলা রৌপ্যের মূল্য লিখিত মূল্য (Book Value) বা বাজার মূল্যের (Market Value) ২.৫%

যার ওপর জাকাত ফরজ
প্রতিটি সম্পদশালী মুসলিম, বালেগ, সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন নর-নারীর ওপর জাকাত ফরজ

নেসাব
নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্যবসায়ী পণ্যের ওপর জাকাত ফরজ। কোন জিনিসের নেসাব কি? তা উত্তমরূপে জেনে রাখা সবার জন্য একান্ত প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ-
শুধু স্বর্ণের নেসাব: সাড়ে সাত ভরি (তোলা)।
শুধু রৌপ্যের নেসাব: সাড়ে বায়ান্ন ভরি (তোলা)।
স্বর্ণ-রূপার একত্রে নেসাব: স্বর্ণ ও রূপা উভয় জিনিসই যদি কারও নিকট থাকে এবং এর কোনোটাই নেসাব পরিমাণ নাও হয়; তবে উভয়টির মূল্য হিসাব করে দেখতে হবে। মূল্য যদি একত্রে রূপার নেসাব পরিমাণ হয়ে যায়, অর্থাৎ ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের সমান হয়ে যায়, তবেই জাকাত আদায় করতে হবে।

নগদ টাকা পয়সার নেসাব
বাজার দর হিসাবে অন্তত ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের পরিমাণ টাকা এক বছরকাল জমা থাকলে এর জাকাত আদায় করতে হবে।

ব্যবসায়ী পণ্যের নেসাব
কোনো জিনিস বিক্রি করার উদ্দেশ্যে রাখা হলেই তাকে ব্যবসার পণ্য মনে করা হবে। ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের সমান মূল্যমান সম্পন্ন ব্যবসার পণ্যের জাকাত দিতে হবে। বছরান্তে তখনকার বাজারদর হিসেবে মূল্য ধরতে হবে। খরিদ মূল্য ধরলে চলবে না।

জাকাত আদায় ফরয হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত
স্বর্ণ, রূপা, টাকা-পয়সা বা ব্যবসার পণ্য নেসাব পরিমাণ হওয়ার পর তৎক্ষনাৎ জাকাত আদায় করা ফরয হয় না; বরং এক বছরকাল নিজের মালিকানাধীন থাকলেই জাকাত আদায় করা ফরয হয়। অতএব নেসাব পরিমাণ হওয়ার সাথে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

বছরের শুরুতে যদি নেসাব পরিমাণ মাল বা টাকা-পয়সা থাকে আর বছরের মধ্যবর্তী সময় নেসাবের চেয়ে কম হয়, আবার বছরের শেষাংশে নেসাবের পরিমাণ হয়ে যায় অথবা বছরের মধ্যবর্তী সময় আরও বৃদ্ধি পায় উভয় অবস্থাতেই বছরান্তে যে পরিমাণ মাল বা টাকা থাকবে তার জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, বছরের শেষে কি পরিমাণ থাকে তাই ধর্তব্য। মধ্য বছরের হ্রাস-বৃদ্ধি ধর্তব্য নয়।

জাকাতের পরিমাণ
সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ জাকাত আদায় করতে হয়। জাকাত ফরজ হওয়া মালের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে সঠিক মূল্য নির্ধারণ করে এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা জাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে। সামান্য কম হলেও জাকাত আদায় হবে না।

বিশেষ কথা
১. অনেক লোককে দেখা যায়, নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ না থাকার কারণে জাকাত দেওয়ার বিষয়ে চুপ থাকেন। কিন্তু তার কাছে সামান্য রূপা রয়েছে, যার ফলে স্বর্ণ ও রূপার সমষ্টিগত মূল্য রূপার নিসাবের পরিমাণ হয়ে জাকাত ফরজ হয়ে রয়েছে- এদিকে খেয়ালই করছেন না। কাজেই বিষয়টির প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করছি। স্বর্ণ ও রূপা একত্রে রাখবেন না, যদি রাখেন তবে জাকাতের ব্যাপারে সজাগ থাকবেন।

২. স্বর্ণ-রূপা, তা যে অবস্থাতেই থাকুক অর্থাৎ টুকরা আকারে অর্থবা অলংকার, বাসনপত্র, ঘড়ি, কলম, চশমার ফ্রেম, কাপড়ের আঁচলে জড়ানো আকারে এবং তা ব্যবহারে আসুক বা না আসুক সর্বাবস্থায় জাকাত আদায় করতে হবে।

৩. অনেকে মনে করেন, নিত্য ব্যবহার্য অলংকারের জাকাত দিতে হবে না, কেবল তুলে রাখা অলংকারের জাকাত দিতে হবে। এ ধারণা সম্পুর্ণ ভুল। এরূপ যারা করেছেন তাদেরকে বিগত বছরগুলোর অনাদায়ী জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে। অন্যথায় গোনাহগার হতে হবে।

ভাড়ায় প্রদত্ত জিনিস
ভাড়ায় খাটানো ঘর- বাড়ি, দোকান-গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও মেশিনারি বা অন্যকোনো জিনিসের ক্ষেত্রে বিধান হলো- মূল জিসিনটির জাকাত দিতে হবে না; বরং ভাড়ায় উপার্জিত টাকা বা মেশিন থেকে উৎপাদিত বস্তুর মূল্য নেসাব পরিমাণ হলে তবে বছরান্তে জাকাত আদায় করতে হবে।

কর্জ প্রদত্ত টাকা
কাউকে টাকা কর্জ দিয়ে রাখলে সে টাকা ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত তার জাকাত দিতে হবে না। যখনই ফিরে পাওয়া যাবে, তখন বিগত বছরগুলোর জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে, অন্যথায় নয়।

প্রভিডেন্ট ফান্ড
প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা যাখন হাতে আসবে, তখন থেকে বছরান্তে জাকাত দিতে হবে। হাতে আসার পূর্ববর্তী বছরসমূহের জাকাত আদায় করা জরুরি নয়।

বিগত বেতন
চাকরির বেতন, যা কয়েক বছর যাবৎ বাকি রয়ে গিয়েছিল, তা উসূল হওয়ার পূর্ববর্তী বছরসমূহের জাকাত আদায় করা ফরজ হবে না।

বিমা কোম্পানিতে জমাকৃত টাকা
প্রিমিয়াম হিসেবে যে টাকা বিমা কোম্পানিতে জমা করা হয়েছে, প্রতি বছর হিসাব করে তার জাকাত দিতে হবে। ব্যাংকে জমাকৃত টাকারও অনুরূপ জাকাত দিতে হবে।

শরিকানা কারবার
শরিকানা কারবারে লাগানো টাকার জাকাত দিতে হবে। শরিকের অন্যরা যদি জাকাত নাও আদায় করে তবুও নিজের অংশের জাকাত হিসাব করে আদায় করতে হবে।

জরুরি পরামর্শ
প্রত্যেক সম্পদশালী লোকের কর্তব্য হলো- চান্দ্রমাস হিসেবে কোনো একটা মাসকে বছরের শুরু বলে ধার্য করে নেওয়া এবং এই শুরু থেকে বার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার হিসাব রেখে নিজের জাকাত দেওয়ার উপযোগী মালের পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করে জাকাত আদায় করা। এ কাজের সুবিধার জন্য প্রতি রমজান মাসকে বছর শুরু ধার্য করাই উত্তম। রমজান মাস থেকে পরবর্তী শাবান মাসে এক বছর পূর্ণ হবে। এতে জাকাত আদায় করার কাজটা পবিত্র মাহে রমজানে সমাধা করা যায়। ফলে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়ার সুযোগ হয়।

একটি ভুল ধারণার অপনোদন
অনেকেই মনে করেন, প্রয়োজনাতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন টাকা হাতে থাকলেই জাকাত বা ফিতরা দিতে হবে; তা ঠিক নয়। আসল কথা হলো- সাড়ে বায়ান্ন (ভরি) রূপা বর্তমান বাজার দর অনুসারে মূল্যের সমান টাকা হাতে থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমান বাজারে রূপার দর হলো ২০০ টাকা ভরি। এ হিসেবে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপার মূল্য ১০,৫০০ টাকা। অতএব, অন্ততপক্ষে এই পরিমাণ টাকা অথবা এই মূল্যের প্রয়োজনাতিরিক্ত কোনো সম্পদ হাতে থাকলে নেসাবের মালিক বলে ধরা হবে, অন্যথায় নয়।

জাকাত আদায়ে অবহেলা নয়
আমাদের দেশে দেখা যায়, ব্যবসায়ীদের অনেকে মনোযোগসহকারে যথাযথভাবে হিসাব করে জাকাত আদায় করেন না। সাধারণত দেখা যায়, রমজানের ২৭ তারিখে বেশ কিছু টাকা অথবা শাড়ি-কাপড় গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেন, কিন্তু মালের পরিমাণের সঙ্গে মিলিয়ে জাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করেন না। এতে কিন্তু জাকাত আদায় হয় না। অতএব একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ আদায় করার মনোভাব নিয়ে যথাযথ হিসাব নিকাশ করে সঠিক পরিমাণ জাকাত সহিশুদ্ধ নিয়তে আদায় করার প্রতি বিশেষ তৎপর হওয়ার জন্য সকলকে অনুরোধ করছি।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া দারুল কোরআন, উত্তর দেওয়ানপুর, মেজরটিলা, সিলেট।

আপনার মতামত লিখুন :

বিমানের প্রথম হজ ফ্লাইট ৪ জুলাই

বিমানের প্রথম হজ ফ্লাইট ৪ জুলাই
হজযাত্রীদের ফাইল ছবি

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চলতি মৌসুমের প্রথম হজ ফ্লাইট আগামী ৪ জুলাই। ওই দিন সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে বিজি-৩০০১ ফ্লাইটটি জেদ্দার উদ্দেশে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যাবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী মাহবুব আলী এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে উদ্বোধনী ফ্লাইটের হজযাত্রীদের বিদায় জানাবেন।

প্রথম দিনে হজ ফ্লাইট বিজি-৩১০১ সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে, বিজি-৩২০১ বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে, বিজি-৩৩০১ সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে এবং শিডিউল ফ্লাইট বিজি-০০৩৫ রাত ৮টা ১৫ মিনিটে জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বে।

নির্ধারিত সময়ে, নির্বিঘ্নে হজ ফ্লাইট পরিচালনার সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চট্টগ্রাম এবং সিলেট থেকেও চলতি বছর যথাক্রমে ১৯টি ও ৩টি হজ ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।

বাংলাদেশ থেকে এ বছর প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন ধর্মপ্রাণ মানুষ পবিত্র হজব্রত পালনে সৌদি আরব যাবেন। চলতি বছর হজ ফ্লাইট ও শিডিউল ফ্লাইটে বিমানে যাবেন মোট ৬৩,৫৯৯ জন হজযাত্রী। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাবেন ৭,১৯৮ ব্যালটি, অবশিষ্ট ৫৬,৪০১ নন-ব্যালটি হজযাত্রী যাবেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়।

এ বছর হজযাত্রীদের ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা রুটে পরিবহনের জন্য বিমানের ৪টি নিজস্ব বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা রুটে চলাচলকারী বিমানের নিয়মিত শিডিউল ফ্লাইটেও হজযাত্রীরা পবিত্র ভূমি জেদ্দায় যাবেন। ঢাকা থেকে জেদ্দা প্রতি ফ্লাইটের উড্ডয়নকাল হবে আনুমানিক ৭ ঘণ্টা।

দুই মাসব্যাপী হজ ফ্লাইট পরিচালনায় শিডিউল ফ্লাইটসহ মোট ৩৬৫টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, যার মধ্যে ৩০৪ ‘ডেডিকেটেড’ এবং ৬১টি শিডিউল ফ্লাইট। ০৪ জুলাই থেকে ০৫ আগস্ট পর্যন্ত ‘প্রি-হজ্জ’-এ মোট ১৮৯ টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে (ডেডিকেটেড-১৫৭ এবং শিডিউল ৩২)। ‘পোস্ট-হজ্জ’-এ ১৪৭টি ফ্লাইট চলবে ১৭ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (ডেডিকেটেড-১৪৭ এবং শিডিউল ২৯) এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে মদিনা ১৮টি ও মদিনা থেকে বাংলাদেশে ১৫টি সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। হজ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ঢাকা-জেদ্দা উভয় স্থানেই বিশেষ ব্যবস্থার আয়োজন করেছে।

প্রথমবারের মতো এ বছর কিছু ফ্লাইটের জেদ্দা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ঢাকা থেকেই সম্পন্ন করা হবে। এ উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের একটি ইমেগ্রেশন টিম ঢাকায় অবস্থান করবে। এ বছর বিমান হজযাত্রীদের উড়োজাহাজের সামনের অপেক্ষাকৃত বড় ও আরামদায়ক নিশ্চিত আসন নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়ানওয়ে-তে ১০০ ডলার বা সমপরিমাণ টাকা এবং রির্টান যাত্রা (যাওয়া-আসা) ২০০ ডলার বা সমপরিমাণ টাকার বিধান রেখেছে।

এছাড়া হজযাত্রীদের টিকিট ক্রয় করার পর যাত্রার তারিখ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যাত্রার ২৪ ঘণ্টা পূর্বে ২০০ মার্কিন ডলার এবং যাত্রার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রা পরিবর্তনের জন্য ৩০০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বাড়তি মাশুল আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে।

এছাড়া নির্ধারিত ফ্লাইটে না গেলে ওই টিকিটের অর্থ ফেরতযোগ্য হবে না। বিমান কর্তৃক পরিচালিত ডেডিকেটেড হজ ফ্লাইটসমূহের চেক-ইন, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা প্রতিবারের মতো এবারও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন আশকোনা হজ ক্যাম্পেই সম্পন্ন করা হবে।

চলতি বছর সৌদি সরকার নির্ধারিত বরাদ্দকৃত স্লটের বাইরে অতিরিক্ত কোন ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেবে না বলে জানিয়েছে।

প্রত্যেক হজযাত্রী বিনামূল্যে সর্বাধিক ২টি ব্যাগেজে ৪৬ কেজি মালামাল বিমানে এবং কেবিন ব্যাগেজে ৭ কেজি মালামাল সঙ্গে নিতে পারবেন। কোন অবস্থাতেই প্রতি ব্যাগেজের ওজন ২৩ কেজির বেশি হবে না। প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য ৫ লিটার জমজমের পানি ঢাকা/চট্টগ্রাম/সিলেট নিয়ে আসা হবে এবং প্রত্যেক হাজিকে ঢাকা/চট্টগ্রাম/সিলেট ফেরৎ আসার পর তা’ দেওয়া হবে। কোন অবস্থাতেই হাজিরা সঙ্গে করে বিমানে পানি বহন করতে পারবেন না।

যেকোন ধারালো বস্তু যেমন-ছুরি, কাঁচি, নেইল কাটার, ধাতব নির্মিত দাঁত খিলন, কান পরিষ্কারক, তাবিজ ও গ্যাস জাতীয় বস্তু যেমন- অ্যারোসল এবং ১০০ মিলির বেশি তরল পদার্থ হ্যান্ড ব্যাগেজে বহন করা যাবে না এবং কোন প্রকার খাদ্য সামগ্রী সঙ্গে নেওয়া যাবে না। ব্যাগেজ স্যুটকেস অথবা ট্রলিব্যাগ হতে হবে। যে কোন অবস্থায় গোলাকৃত, দড়িবাঁধা ব্যাগ ইত্যাদি বিভিন্ন আকৃতির ব্যাগেজ গ্রহণযোগ্য হবে না।

১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১০ লাখ ৬০ হাজার ৪৪৪ জন হাজি হজপালনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেবা নিয়েছেন।

একটি প্রামাণ্য হজ গাইড ‘জীবন্ত হজ্জ’

একটি প্রামাণ্য হজ গাইড ‘জীবন্ত হজ্জ’
একটি প্রামাণ্য হজ গাইড ‘জীবন্ত হজ্জ’, ছবি: সংগৃহীত

হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হজপালনের মাধ্যমে মানুষ সদ্যভূমিষ্ঠ নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। হজপালনকারী নিজে জান্নাতে যাবেন এবং অন্যদের ব্যাপারে সুপারিশ করার ক্ষমতা পাবেন। এমন মর্যাদাসম্পন্ন ইবাদতটি সহিহ-শুদ্ধভাবে পালন করা জরুরি। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক হজপালনকারী এ বিষয়ে গুরুত্ব দেন না।

হজ পালন করা যেমন ফরজ, হজের মাসয়ালাসমূহ জানাও তেমনিভাবে ফরজ। পাশাপাশি আল্লাহতায়ালার ভালোবাসা, কাবা শরিফের মহব্বত, মক্কা শরিফের প্রতি সম্মান, মদিনা শরিফের প্রতি আকর্ষণ এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সর্বোচ্চ ইশ্ক নিয়ে হজ পালন করা দরকার।

হজপালনকারী হজপালনের উদ্দেশে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে হজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে হজের প্রস্তুতিসহ মক্কা-মদিনায় যেসব সুবিধা-অসুবিধা, নতুন নতুন সংকট ও তার সমাধান কী সেগুলো বোঝার জন্য সহজবোধ্য করে বর্ণনা করা হয়েছে ‘জীবন্ত হজ্জ’ বইটিতে।
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে লেখক সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীদের হজ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিজেও হজপালন করে আসছেন। অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বইটি রচনা করেছেন।
জীবনে প্রথমবার যে হজপালন করবেন বইটি পড়লে হজের আমল পরিপালনের স্থানগুলো অনেকটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠবে। এমন কিছু খুঁটিনাটি বিষয় এ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সাধারণত হজ গাইডে উল্লেখ করা হয় না।

এক কথায়, ঘর থেকে বের হয়ে পুনরায় ফিরে আসা পর্যন্ত প্রতিটি স্থানের করণীয় ও দলিলনির্ভর মাসয়ালাসহ হজের পূর্ণাঙ্গ দিক-নির্দেশনা সম্বলিত বই ‘জীবন্ত হজ্জ’।

বইটির লেখক মুফতি অহিদুল আলম দীর্ঘদিন ধরে উত্তরার মসজিদ আল-মাগফিরাহ-তে খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে জামিয়া ইমাম বুখারী ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল।

বইটিতে শুধু হজ-উমরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হয়নি। ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- মসজিদুল হারামে নামাজের ফজিলত, হজের প্রস্তুতির নানাদিক, হজের সফরে যে সামগ্রীগুলো প্রয়োজন, ইহরাম বাঁধার আগে করণীয়, ইহরাম বাঁধার নিয়ম-পদ্ধতি, বিমানবন্দরে উপস্থিতি ও করণীয়, মক্কা শরিফ পৌঁছে কী কী করবেন, কিভাবে উমরার তাওয়াফ করবেন, তাওয়াফ করা অবস্থায় কোন কোন কাজ বেয়াদবি, হজের মূল পাঁচদিনের আমলসমূহ, মিনা-আরাফা ও মুজদালিফার আমলসমূহ, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের বিধান, কোরবানি প্রসঙ্গ, ফরজ তাওয়াফসহ হজের বিধানগুলো বর্ণনা করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে লেখক উল্লেখ করেছেন, হজের সফরে কষ্ট হয় কেন? কোন স্থানে ঝগড়া হয়, অজ্ঞতাবশত ও আবেগতাড়িত হয়ে যে ভুলগুলো হাজিরা করে থাকেন, নারীদের হজের মাসয়ালা, বদলি হজের বিধান ও ফজিলত, যেসব কারণে হজের কাজা ওয়াজিব হয়, মক্কা-মিনা-আরাফা ও মুজদালিফায় নামাজের বিধান, মক্কায় দোয়া কবুলের স্থানসমূহ, মক্কার ঐতিহাসিক জায়গার বিবরণ, মদিনা শরিফের মর্যাদা, মসজিদে নববীর পরিচিতি ও জিয়ারতে মদিনার বিধান, মদিনায় করণীয়, মসজিদে নববীতে প্রবেশের নিয়ম, রওজাতুল জান্নাহতে প্রবেশের বিধান, রওজা শরিফে সালাম পেশ করার তরিকা, অন্যের সালাম কিভাবে দেবেন, মসজিদে নববীতে নামাজের ফজিলত, হজের পরিভাষা ও হজ থেকে ফিরে এসে কিভাবে চলবেন সেসব বিষয় অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বইটিতে।

এক কথায় বইটি হজযাত্রীদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বইটি নির্ভরযোগ্য ও প্রাণবন্ত। আমরা এর বহুল প্রচার কামনা করি।

বই: জীবন্ত হজ্জ
লেখক: মুফতি অহিদুল আলম
প্রথম প্রকাশ: জুলাই ২০১৭
প্রকাশনায়: ইমাম বুখারী রহ. ট্রাস্ট, বাড়ী- ৯, রোড-৯৯/বি, সেক্টর-৫, উত্তরা, ঢাকা
মূল্য: ২০০ (দুইশত) টাকা মাত্র।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র