নিউইয়র্কের ঈদ স্মৃতি, শিক্ষণীয় নানাদিক



ফয়সল আহমদ জালালী, অতিথি লেখক, ইসলাম
নিউইয়র্কে খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, পুরোনো ছবি

নিউইয়র্কে খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, পুরোনো ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

নিউইয়র্ককে বলা হয় বিশ্বের রাজধানী। দুনিয়ার সব জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এখানে। ভাষার বৈচিত্র্যময় শহর ও এটি। নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এই শহরে জীবনযাপন করেন। যার যার ধর্ম পালন করেন অবাধে। ধর্মীয় আচার-আচরণ পালনে নেই কোনো বিধি-নিষেধ। দিন হোক আর রাত হোক চলাচলে নেই কোনো ভয়-আশংকা। লিঙ্গ বৈষম্যমহীনের দেশ আমেরিকা। নারীরা ও চলছে নিজ নিজ গন্তব্যে একা একা। কেউ কাউকে বিরক্ত করছে না।

আমার প্রথম সফর
২০১৮ সালের কথা। আমার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল রমজান মাসের শেষ দশকে। নিশ্চিত করে বললে ঈদুল ফিতরের ২দিন আগে। নিউইয়র্ক ঈদগাহের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফরের দুয়ার খুলে। এই ঈদগাহের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম কাজী কাইয়ুম। এই নামেই তিনি খ্যাত। আমেরিকাজুড়ে মুসলিম কমিউনিটিতে তার বেশ প্রভাব ও খ্যাতি রয়েছে। তীক্ষ্ম প্রতিভার অধিকারী বন্ধুবর মাওলানা আবদুল কাইয়ূম খান। শুধু ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেননি তিনি মুহাম্মাদী সেন্টার নামে জ্যাকসন হাইটসে গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক একটি প্রতিষ্ঠান। নিউইয়র্কে ইন্টারফেইথ, এন্টি টেরোরিজম এওয়ারনেসেও তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমান বন্দরে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে ফুলেল অভ্যর্থনা জানান। পরে নিজে গাড়ি চালিয়ে তার অফিসে নিয়ে যান। সে স্মৃতি কোনোদিন ভুলবার মতো নয়। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ লেখব- ইনশাআল্লাহ।

অতিথি ইমাম হিসেবে লেখককে সম্মাননা জানাচ্ছেন স্থানীয় কাউন্সিলম্যান, ছবি: সংগৃহীত

‘চাঁদ রাত’ সংস্কৃতি
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসকে বলা হয় মিনি বাংলাদেশ। এখানে প্রচুর বাংলাদেশি বসবাস করেন। ঈদের চাঁদ ওঠার রাতকে ওখানকার মুসলিম সমাজ ‘চাঁদ রাত’ হিসেবে পালন করেন। আমি এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। এশার নামাজের পর বের হয়ে দেখি রাস্তায় প্রচুর নারী ও শিশু। ভিড়ের কারলে ফুটপাতে হাঁটা যাচ্ছে না। এক বাংলাদেশিকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তায় এত ভিড়ের কারণ কী। তার পাল্টা প্রশ্ন, আপনি এ এলাকায় নতুন এসেছেন? আমি বললাম, শুধু এলাকায় নতুন নয়, আমেরিকাতেই আমি নতুন। মাত্র দু'দিন পূর্বে এসেছি। বলল, আজ চাঁদ রাত। মহিলা ও শিশুরা ঈদের আগের রাতে এখানে রাস্তায় বেরিয়ে এসে আনন্দ করে। হাতে মেহেদী লাগায়। পরিচিতদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে। অনেক রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। এটিকে ঈদ উপলক্ষ্যে মেহেদী উৎসবও বলা চলে।

একই সুতোয় বেঁধে ফেলা ঈদ
নিউইয়র্কে রয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম সমাজ। এশিয়ান, আমেরিকান, ইউরোপিয়ান ও আফ্রিকান মহাদেশীয় সংস্কৃতির মাঝে তো ভিন্নতা আছেই। এছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, মিসর, মরক্কো, গায়ানা, সুদান, সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের আচার-আচরণেও রয়েছে ভিন্নতা। রয়েছে ভাষা ও বর্ণের বহু সমীকরণ। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পালনে গড়ে ওঠা বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের মানুষ রয়েছে এখানে। যাকে আমরা মাজহাব বলি। আর পশ্চিমা লেখকরা যাকে school of thought বলে আখ্যায়িত করেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাইরের কেউ মনে করতে পারেন- মাজহাব নিয়ে বিভক্তি ইসলামের মাঝে উপদলীয় কোন্দল। যা অন্যান্য ধর্মে তীব্রভাবে লক্ষ্য করা হয়। তা মোটেই সত্য নয়। মাজহাব হলো, ইসলামের বিধান পালনে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। একই ইমামের পেছনে সব মাজহাবের মানুষের নামাজ আদায়ই এর বড় প্রমাণ। ঈদের মাঠে ঈদের নামাজে সবাই এক ও অভিন্ন। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করছে। করছে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। নেই তাদের মাঝে কোনো বর্ণ বৈষম্য। দেশ-মহাদেশের নেই কোনো ভেদাভেদ। নিউইয়র্কের ঈদ মনে হয় গোটা বিশ্বকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলে। নিউইয়র্ক যেন এক আদমের সন্তানের মিলন ভূমি।

মুসলিম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো কোরবানির অর্ডার গ্রহণ করে, ছবি: সংগৃহীত

মাঠে-ময়দানে ঈদের জামাত
নিউইয়র্কে ঈদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- মাঠে-ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বাদল দিন হলে ভিন্ন কথা। তখন বাধ্য হয়েই মসজিদে ঈদের আয়োজন করা হয়। স্কুল-কলেজের মাঠ ঈদের জামাতের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পার্কগুলোও ব্যবহার করা যায়। এমনকি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায়ও ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। আমেরিকা নিয়ম-কানুন মেনে চলা দেশ। আইন-কানুনকে অবজ্ঞা করে যাচ্ছে-তাই করা যাবে না সেখানে। ওখানকার মানুষ আইনের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। ধর্ম-কর্ম পালনে কোনো বাধা-বিপত্তি নেই। আমার দেখামতে ধর্মাচারীকে আমেরিকার সমাজে শ্রদ্ধা করা হয়। সে যেকোনো ধর্মের মানুষ হোক।

কোভিড-১৯ এর কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব ধরনের উপাসনালয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক মৌখিক নির্দেশে সব খুলে দেওয়া হয়েছে। ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল না হলে এই অজুহাত আরও দীর্ঘ হতো। বন্ধ থাকত মসজিদ, মন্দির, চার্চ ও প্যাগোডা ইত্যাদি।

জনপ্রতিনিধিদের শুভেচ্ছা
নামাজ শেষে ঈদগাহে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য উপস্থিত হন নিউইয়র্কের জনপ্রতিনিধিরা। এমনকি অন্য ধর্মের গুরুরাও আসেন শুভেচ্ছা জানাতে। অবশ্য সেটি নির্ভর করে আয়োজকদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। নিউইয়র্ক ঈদগাহের প্রতিষ্ঠাতা কাজী কাইয়ুম আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তার প্রতিষ্ঠিত ঈদগাহে যেকোনো জনপ্রতিনিধিকে স্বাগত জানানো হয়। এমনকি ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রদর্শনের জন্য আন্তধর্মীয় নেতাদেরকেও গ্রহণ করা হয়। ২০১৮ সালে আমি প্রথম আমেরিকা যাই। নিউইয়র্ক ঈদগাহ আমাকে ইমাম হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। ঈদের জামাত শেষে জ্যাকসন হাইটস এলাকার নির্বাচিত কাউন্সিলম্যান নিজে উপস্থিত হয়ে শুভেচ্ছা জানান। এমনকি অতিথি ইমাম হিসেবে নিউইয়র্ক সিটির মনোগ্রাম সম্বলিত প্যাডে তার স্বাক্ষরিত একটি সাইটেশন প্রদান করেন। আমাকে নিয়ে ছবি তুলেন। সেখানকার গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।

অন্যরাও ঈদের দৃশ্য উপভোগ করে
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এ জন্য দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে এর কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছেন প্রচুর। ওপরে বর্ণিত ঈদের জামাতের সমাগম থেকে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। তবে মাঠে-ঘাটে ও পার্কে ঈদের জামাত আয়োজনের দৃশ্য অন্য ধর্মাবলম্বীরা উপভোগ করেন। সুশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে অনেকেই পুলকিত হন। অনেকে এগিয়ে এসে অভিনন্দন জানান। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুৎবা শুনেন। জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় নিউইয়র্ক ঈদগাহের কার্যক্রম পালিত হয়। আমার খুৎবা প্রদান শেষে অনেক অমুসলিম এগিয়ে এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

কোরবানি নির্দিষ্ট স্থানে আদায়
কোরবানি যত্রতত্র আদায় করার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি আদায় করতে হয়। সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজ হাতে সেখানে কোরবানি করার ব্যবস্থা রয়েছে। চামড়া পৃথক করা ও গোশত কাটাকুটি প্রশিক্ষিত মানুষ দিয়ে করতে হয়। মুসলিম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোও কোরবানির অর্ডার গ্রহণ করে। কোরবানির ঈদ আসন্ন হলে বড় বড় সাইনবোর্ড টাঙানো হয় দোকানের সম্মুখে। ভাগে যারা কোরবানি করেন তারা বেশিরভাগ তাদের হাতেই কোরবানির দায়িত্ব অর্পণ করেন। এ জন্য বিশ্বস্ত দোকান মালিক বেছে নিতে হয়। খাসি, ভেড়া বা দুম্বা কোরবানি যারা করেন তারা নির্দিষ্ট স্লটারিং স্থলে হাজির হন।

নিয়মানুবর্তিতা
সবক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে আমেরিকানরা অত্যন্ত সচেতন। আগে আসলে আগে পাবেন, উঁচু-নীচু সবাই এই নিয়ম মেনে চলেন। মুদির দোকানেও সুশৃংখলভাবে এই নিয়ম মানা হয়। মূল্য পরিশোধের সময় লাইন বেঁধে ক্রেতারা দাঁড়িয়ে থাকেন। কোরবানির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম ভঙ্গ করার প্রশ্নই আসে না। যারা কসাইখানায় পরে যাবেন তাদের পরেই ফিরতে হয়। অনেকের সিরিয়াল পরের দিনও আসতে দেখা যায়, কিচ্ছু করার নেই। ওখানকার মানুষগুলোর স্বভাব হয়ে গেছে নিয়ম মেনে চলার। সিরিয়াল ভঙ্গ করার মানসিকতা কারো হয় না। একান্ত কেউ এর ব্যত্যয় ঘটানোর চেষ্টা করলে তার কাজ করে দেওয়া হয় না। আমেরিকা শ্রেণি বৈষম্যহীনতার এক মনোরম ভূখণ্ড।

ফয়সল আহমদ জালালী: ভিজিটিং ইমাম, নিউইয়র্ক ঈদগাহ, যুক্তরাষ্ট্র

কারবালার আত্মত্যাগের শিক্ষা সত্য ন্যায়ের পথ দেখাবে



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কারাবালার আত্মত্যাগের শিক্ষা সত্য ন্যায়ের পথ দেখাবে

কারাবালার আত্মত্যাগের শিক্ষা সত্য ন্যায়ের পথ দেখাবে

  • Font increase
  • Font Decrease

কুতুববাগ দরবার শরিফের পীর ও মোরশেদ হযরত খাজাবাবা কুতুববাগী  কেবলাজান বলেছেন, কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নিমমভাবে শহীদ হওয়ার আগেই ইমাম হোসেন (রা.) এলমে লাদুন্নার (অলৌকিক জ্ঞান) শক্তিতেই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে সঙ্গী-সাথীসহ শাহাদাত বরণ করতে হবে। তাই নিজ পুত্র হজরত জয়নাল আবেদীনকে ঘুম বা তন্দ্রা থেকে ডেকে তুলে নিজের সিনার সঙ্গে সিনায় সজোরে চাপ দিয়ে কিছু সময় ধরে রাখেন।

হজরত ইমাম হোসেন (রা.) তাঁর নানাজান হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) এর কাছ থেকে প্রাপ্ত জাহের বাতেন এলেম এভাবেই হজরত জয়নাল আবেদীনের কাছে গচ্ছিত রাখেন, যা আউলিয়া কেরামগণের সিনা হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। রাসুল (সা.) এর আহলে বয়াতকে ভালোবাসা এবং সত্য-ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকার শিক্ষাই পবিত্র আশুরার মধ্যে দিয়ে আমরা গ্রহণ করতে পারি।

মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) রাজধানীর ফার্মগেটস্থ (৩৪ ইন্দিরা রোড) কুতুববাগ দরবার শরিফের সদর দপ্তরে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল ধর্মীয় জলসায় সারাদেশ থেকে আগত হাজার হাজার জাকের মুরিদ-আশেকানদের উদ্দেশে তিনি এ সব কথা বলেন।

খাজাবাবা হজরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দি কুতুববাগী কেবলাজান আরো বলেন, কারবালায় আহলে বয়াতের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের পথ চিহ্নিত হয়েছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম কিন্তু দুরাচার ইয়াজিদ মুসলমান হয়েও ছিলেন অনৈতিকতা আর অশান্তির ধারক বাহক। তাই নির্মমভাবে আহলে বয়াতদের হত্যা করেছিলেন। পরে বাংলাদেশ ও সারাবিশ্বেও শান্তি কামনায় খাজাবাবা কুতুববাগী মোনাজাত পরিচালনা করেন।

;

রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালন

রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালন

  • Font increase
  • Font Decrease

যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে রাজশাহীতে পবিত্র আশুরা পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে নগরীর শিরইল কলোনী থেকে একটি শোক র‌্যালি কের করা হয়।

পবিত্র মহররম আশুরা উদযাপন কমিটি এই র‌্যালি বের করে। র‌্যালিটি নগরীর রেলগেট শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান চত্ত্বর হয়ে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

কয়েকটি সংগঠন নগরীতে অটোরিকশা নিয়ে র‌্যালি বের করে। এছাড়াও বিশ্ববাংলা ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ আহলে বাইত ফাউন্ডেশনের ব্যানারে শোক মিছিল, পথসভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে দুপুরের পর খাবার বিতরণ করা হয়। এরপর মুসলিম উম্মাহর সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

;

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’

  • Font increase
  • Font Decrease

পবিত্র আশুরা আজ। মহররম মাসের ১০ তারিখ। বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ কাছে ঐতিহাসিক তাৎপর্যমণ্ডিত এক গভীর শোকাবহ দিন। এই দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে চক্রান্তকারী স্বৈরতন্ত্রী ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে কারবালা প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শাহাদতবরণ করেন। দিনটি একদিকে শোকের ও বেদনার, অন্যদিকে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের চেতনায় সমুজ্জ্বল।

ইসলামের ইতিহাসে মহররমের ১০ তারিখে কারবালা প্রান্তরে পরিবার-পরিজন, সঙ্গী-সাথিসহ হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতবরণের মর্মান্তিক ঘটনার আগেও এই তারিখে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে বিশ্ব ইতিহাসে। আদি মানব হজরত আদম (আ.) এই দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন, তাঁর তওবা কবুল হয় এই দিনেই। এই দিনে হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা পায়।

এসব ঐতিহাসিক ঘটনার তালিকায় মর্মান্তিক বেদনার আবহ সঞ্চারিত করে কারবালার নৃশংসতা। আমির মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ইয়াজিদ অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং এ জন্য ষড়যন্ত্র ও বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেন। খেলাফত বা শাসনের আরেক বৈধ উত্তরাধিকারী, মহানবী (সা.)-এর আরেক দৌহিত্র হজরত ইমাম হাসান (রা.)-কে আগেই বিষপানে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার-পরিজন ও ৭২ জন সঙ্গীসহ শাহাদতবরণ করেন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। এই হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত নির্মম। অসহায় নারী ও শিশুদের পানি পর্যন্ত পান করতে দেয়নি পাষণ্ড ইয়াজিদ বাহিনী।

কারবালার ঘটনার পর থেকে নানা আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বব্যাপী আশুরা পালিত হয় মহররমের ১০ তারিখ। ধর্মীয় ভাবাবেগ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে স্মরণ করা হয় নবীবংশের সম্মানিত সদস্যগণে আত্মত্যাগের গৌরবময় ঘটনাক্রম, যার মূল বক্তব্য সত্যের পথ অনুসরণ করার ও ন্যায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করার অনুপ্রেরণায় দীপ্ত।

ফলে আশুরার মূল চেতনা হলো, অসত্য, স্বৈরতন্ত্র, অবৈধ কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে সাময়িক আঘাত এলেও চূড়ান্ত বিজয় অবধারিত। এজন্যই দার্শনিক কবি বলেছেন, "কাতলে হোসাইন আসল মে মারগে ইয়াজিদ হ্যায়,/ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কে বাদ।’" অর্থাৎ, হোসাইনের নিহত হওয়ার ঘটনা আসলে ইয়াজিদেরই মৃত্যু, ইসলাম প্রতিটি কারবালার পর পুনরুজ্জীবিত হয়।

ইমাম জাফর সাদেক (আ.) বলেছেন, “মুসলমানের জন্য প্রতিটি ভূমিই কারবালা আর প্রতিটি দিন হচ্ছে আশুরা।”

ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যে আশুরা ও কারবালার ঘটনা বিরাট জায়গা জুড়ে উপস্থিত। বাংলা ভাষায় কাজী নজরুলের কবিতা এবং মীর মোশাররফ হোসেনের কালজয়ী 'বিষাদ সিন্ধু' যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অন্যান্য ধ্রুপদী ভাষা, যেমন আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজিতে কারবালার আখ্যান বার বার লিপিবদ্ধ করেছেন বরেণ্য কবি ও সাহিত্যিকগণ। যাদের মধ্যে আধুনিককালের
মাওলানা মোহাম্মাদ আলী জাওহার এবং আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল ছাড়াও রয়েছেন ইতিহাসখ্যাত কবি জালালুদ্দিন বলখি রুমি, ফরিদ উদ্দিন আত্তার, আবদুর রহমান জামি প্রমুখ। বিশেষত, ইকবালের কবিতাগুলো পড়ে মনে হয়, নবীবংশ তথা আহলে বাইতের প্রতি, ইমাম হোসেইনের আত্মত্যাগের প্রতি তাঁর প্রেম, ভালোবাসা ও ভক্তি অম্লান।

মহররমের শিক্ষা নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের উচ্চারণ ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। অর্থাৎ, মহররম মাসে আশুরার চেতনায় অন্যায়-অবিচার ও ষড়যন্ত্র থেকে পৃথিবীকে মুক্ত রাখতে কান্নাকাটি বা বিলাপ নয়, ত্যাগের মহিমা উজ্জীবিত হওয়াই কর্তব্য, কবির এই বক্তব্য এক শাশ্বত সত্যের প্রতিধ্বনি স্বরূপ। আশুরা মূলত ন্যায়, সত্য, কল্যাণের পক্ষে এবং অন্যায়, অসত্য ও স্বৈরতার বিপক্ষে সুদৃঢ় চিত্তে অবস্থান গ্রহণের অনিঃশেষ প্রেরণা প্রতিটি মুসলমানের মধ্যে জাগ্রত করে।

;

মহররম মাসে বরকতময় আশুরার রোজা



আবুল খায়ের মোহাম্মদ, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
মুহররম মাসের বরকতময় আশুরা। সংগৃহীত

মুহররম মাসের বরকতময় আশুরা। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

 

শুরু হয়ে গেছে মহিমান্বিত মহররম মাস। যে মাসে ১০ তারিখ আশুরা দিবসের রোজা অত্যন্ত বরকতময়।

সকল মুসলমানই জানেন যে, হিজরি সনের প্রথম মাসের নাম মহররম। ইসলামের দৃষ্টিতে মহররম একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাস। অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রহস্যময় তাৎপর্য নিহিত আছে এ মাস ঘিরে।

মহররম মাসের ১০ তারিখ পৃথিবীর ইতিহাসে এবং মুসলিম সভ্যতায় বহু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার মধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোড়িত ও আলোচিত বিষয় হলো কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাস। এছাড়াও আশুরার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয় ঘটনার শীর্ষে স্থান পায় মুসা (আ.)-এর একটি ঘটনা। এই দিনে তিনি অত্যাচারী শাসক ফিরাউনের কবল থেকে তাঁর জনগোষ্ঠীকে আল্লাহর অশেষ রহমতে রক্ষা করেছিলেন।

ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থে সাহাবি হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, 'মহানবী (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় পৌঁছে সেখানে ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা পালন করতে দেখেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করেন, এই দিনে কী ঘটেছে যে তোমরা এতে রোজা পালন করো?

তারা বলে, এই দিনটি অনেক বড় দিন, এই দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের ফিরাউন থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা নবী রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি।

ইহুদিদের জবাব শুনে রাসুলে করিম (সা.) বলেন, মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী। অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদের তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।' (বুখারি, হাদিস : ৩৩৯৭, মুসলিম, হাদিস : ১১৩৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রোজা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে রাখার প্রতি নির্দেশ করেছেন, তাই তাঁর অনুসরণ করা আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া অসংখ্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। কয়েকটি হাদিস নিম্নে উপস্থান করা হলো:

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা মহররম মাসে আশুরার রোজা।' (সুনানে কুবরা, হাদিস : ৮৪২১০)

আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)

মুসলিম শরিফে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, বিধর্মীরা তো এই দিনটিকে বড় দিন মনে করে। এই দিনে তারাও রোজা পালন করে। আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি তাহলে তো এদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে। তাদের প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন (তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে), আগত বছর ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব, ইনশাআল্লাহ। (মুসলিম, হাদিস : ১১৩৪)

অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, 'তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরো একটি রোজা রেখে নিয়ো।' (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১৫৪)

সহিহ হাদিসগুলোর আলোকে প্রমাণিত হয় যে আশুরার রোজা হবে দুটি—মহররমের ১০ তারিখ একটি, আর ৯ তারিখ অথবা ১১ তারিখ আরো একটি।

প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর কর্তব্য হলো মুহররম মাসে আশুরার দুটি রোজা পালন করা, আল্লাহতায়ার ইবাদত, বন্দেগি, জিকিরে সবিশেষ মনোযোগী ও মশগুল হওয়া এবং পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন, আহলে বাইত, সাহাবিদের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করা।

;