পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য

পার্বত্য চট্টগ্রামের কোটা সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের মতোই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো উচ্চশিক্ষা এবং চাকরি ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার সুবিধা পেয়ে জীবনমান ও আর্থ-সামাজিক সূচকে অভূতপূর্ব অগ্রগতি করেছে। তবে সব নৃগোষ্ঠী সমভাবে কোটার সুবিধা পেয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারছে না এবং কিছু সম্প্রদায়ের দ্বারা একচ্ছত্রভাবে কোটা সুবিধা ব্যবহার করার মতো পরিস্থিতি চলছে। এতে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে বঞ্চিত উপজাতি গোষ্ঠীগুলো ও পার্বত্য বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ, অসাম্য ও বঞ্চনা।

কয়েকটি গবেষণায় প্রাপ্ত্য তথ্যে জানা যায়, প্রধান কিছু উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হয়ে অপরাপর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ ও প্রান্তিক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে, যা সুষম উন্নয়ন ও সব নাগরিকের সম-অধিকারের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও বিভেদের অন্যতম মূল কারণ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯-এর ৩ (ক) অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলোকে অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে ১৯৮৫ সালে সরকারি চাকরিতে তাদের জন্য শতকরা পাঁচ ভাগ কোটা সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়। এ ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে উপজাতি কোটা রাখা হয়। ২০১৫ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বিধি-১ শাখা কর্তৃক সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত কোটার ক্ষেত্রে ‘উপজাতীয়’ শব্দ ব্যবহারের পরিবর্তে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। উপরন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা বিদ্যমান থাকার পাশাপাশি ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সদস্যগণ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়ে থাকেন।

কিন্তু তথ্য-পরিসংখ্যানগত বাস্তবতা এই যে, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য চাকরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত কোটা সুবিধার দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সব নৃগোষ্ঠী সমভাবে উপকৃত হচ্ছে না। কোটার সিংহভাগ সুবিধা এককভাবে চাকমা ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারমা ও ত্রিপুরা উপজাতিরা পেয়ে থাকে আর বাকি ১০-১১টি উপজাতি বলতে গেলে বঞ্চিত হচ্ছে। সবচেয়ে বৈষম্যমূলক চিত্র এটাই যে, একই পাহাড়ের দুর্গম ও বিরূপ পরিস্থিতিতে বসবাস করলেও পার্বত্য বাঙালি জনগোষ্ঠী কোটা সুবিধাবঞ্চিত হয়ে শিক্ষা, চাকরি, আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদায় চরমভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে জনসংখ্যার অর্ধেক হয়েও পরিসংখ্যানগত বাস্তবতায় তারাই অবহেলিত, প্রান্তিক ও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হচ্ছে বলে অভিযোগ করছে।

২০১৬ সালে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট কর্তৃক পরিচালিত গবেষক সুগত চাকমার গবেষণায় বলা হয়, খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী চাকমা জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা, শিক্ষার হার ও পেশাগত ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। কোনো কোনো চাকমা গ্রামের সর্বোচ্চ শতকরা ৮০ থেকে সর্বনিম্ন শতকরা ৪০ ভাগ লোক শিক্ষিত। শিক্ষিত চাকমাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি সংস্থা, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন। উদাহরণস্বরূপ, খাগড়াছড়ি জেলার ৯টি কলেজে চাকমা জনগোষ্ঠীর ৭০ জন শিক্ষকতায় নিয়োজিত। জেলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাকমা নৃগোষ্ঠীর ৩০ চিকিৎসক কর্মরত। ৯টি ব্যাংকের শাখায় ৬৮ চাকমা কর্মরত, যার মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ এবং ২২ জন নারী। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন আর্থিক সেক্টরেও চাকমারা নেতৃস্থানীয় অবস্থানের অধিকারী। চাকমাদের উল্লেখযোগ্য উন্নতি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় কোটাব্যবস্থার সুফল।

তবে শহরে বসবাসকারী চাকমারা এসব ক্ষেত্রে যত সুবিধা পাচ্ছে, গ্রামের চাকমা সম্প্রদায় তা পাচ্ছে না। অনুরূপভাবে চাকমাদের উন্নতির নিরিখে পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায় এবং বাকি ১২-১৩টি উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অনেক পেছনে। এ কারণে বাঙালিরা কোটা ও চাকরিসহ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সম-অধিকারের দাবি করছে। অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায়, যেমন, বম, খুমি, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, মং, চাক প্রভৃতি কোটা ও চাকরির সুবিধার ক্ষেত্রে একচ্ছত্র অগ্রাধিকার ও সুবিধার মাধ্যমে অতি অগ্রসর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা নৃগোষ্ঠীর সমপর্যায়ে আসার প্রয়োজনে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার ও তাদের অনুকূলে সমন্বয়সাধনের দাবি করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে বিগত ১০ বছরের (২০১১-২০২১) সময়কালে উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যানে চাকমাসহ কয়েকটি সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়, যা থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ‘অভ্যন্তরীণ বঞ্চনা ও আধিপত্য’র বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত মোট ৩১০৮টি আসনের অর্ধেকের চেয়ে বেশি (শতকরা ৫৬ ভাগ) এককভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা শিক্ষার্থীরা অধিকার করে। অথচ চাকমারা বাংলাদেশের মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার শতকরা ২৮ ভাগ। অনুরূপভাবে, মারমা সম্প্রদায় মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শতকরা ১৫ ভাগ এবং তারা মোট সংরক্ষিত কোটা আসনের শতকরা ১৪ ভাগ, ত্রিপুরা সম্প্রদায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার শতকরা ৮ ভাগ এবং কোটা আসনের শতকরা ৭ ভাগ আসনে ভর্তির সুযোগ গ্রহণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কোটা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ করা যায়। সাঁওতাল সম্প্রদায় মোট উপজাতি জনসংখ্যার শতকরা ৯ ভাগ হলেও শতকরা ৩ ভাগ এবং মনিপুরী সম্প্রদায় শতকরা ৭ ভাগ হয়েও কোটার শতকরা ২ ভাগ সুবিধা লাভ করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে আরও অর্ধশত নৃগোষ্ঠী মিলিতভাবে কোটার মাত্র শতকরা ১৮ ভাগ সুবিধা নিতে পেরেছে, যদিও তাদের মিলিত জনসংখ্যা মোট উপজাতি জনসংখ্যার শতকরা ৩৩ ভাগ।

মূলত রাজনৈতিক প্রভাব, যোগাযোগ, নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাত ও আঞ্চলিকতার মাধ্যমে চাকমা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা কোটার সিংহভাগ সুযোগ গ্রহণ করছে। তাদের মধ্যে শিক্ষার হার বেশি হওয়ায় উচ্চশিক্ষায় বা চাকরিতে চাকমা আবেদনকারীর সংখ্যাও অধিক হয়। দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই বহু চাকমা শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যারা চাকমা সম্প্রদায়ের ভর্তিচ্ছুদের দিকনির্দেশনা ছাড়াও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে। বিভিন্ন তথ্যও তারা দ্রুত নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে পাঠিয়ে দিতে পারে। কিন্তু অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা এমন সুযোগ না পেয়ে কোটার সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। অনেক সময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা উপজাতিসংক্রান্ত সনদ ও কাগজপত্র পেতে বিপত্তির সম্মুখীন হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন অফিসের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রাধান্য থাকায় তারা নিজ নিজ সম্প্রদায়কে সহযোগিতা ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে অসহযোগিতা করে। কখনো কখনো অন্য নৃগোষ্ঠীর সম্ভাবনাময় ভর্তিচ্ছুদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে ও ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে অন্য নৃগোষ্ঠী সদস্য পাওয়া যায় না। তখন তদবিরের মাধ্যমে শূন্য কোটা আসনে চাকমা শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভর্তি নিশ্চিত করে।

একটি-দুটি নৃগোষ্ঠীর অতিরিক্ত সুবিধাপ্রাপ্তির কারণে অন্য নৃগোষ্ঠীগুলো পিছিয়ে পড়ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলো শিক্ষা ও পেশার ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনার সুফল সবার জন্য সমভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলেও তারা মনে করেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গড় শিক্ষার হার শতকরা ৭২.৯ ভাগ হলেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ উত্থাপনকারী চাকমাদের শিক্ষার হার শতকরা ৭৩ ভাগ। এই অগ্রগতি বঞ্চনা ও পশ্চাৎপদতার পরিচায়ক নয়। শিক্ষার কারণে পেশা ও কর্মক্ষেত্রে একচ্ছত্রভাবে চাকমা নৃগোষ্ঠীর প্রাধান্য বিরাজমান।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য নৃগোষ্ঠীগুলোর শিক্ষার হার মাত্র শতকরা ৪৫ ভাগ, যা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সুযোগের তারতম্য, ভারসাম্যহীনতা ও অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের প্রমাণবহ। যার আরেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায়। কোটা সুবিধা ও অন্যান্য সাংবিধানিক সম-অধিকার না পাওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশি হওয়ার পরেও তাদের মধ্যে শিক্ষার হার মাত্র শতকরা ২৩ ভাগ।

এতে শুধু সম্প্রদায় ও জাতিগত বৈষম্যই হচ্ছে না, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিককে যোগ্য মানবসম্পদে পরিণত করে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে জাতির বিরাট ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে কোটাব্যবস্থার সামগ্রিক সুফল একতরফাভাবে নেতৃস্থানীয় গোষ্ঠীর কব্জা থেকে জনসংখ্যার অনুপাতে এবং সম্প্রদায়গত পশ্চাৎপদতার নিরিখে সুবিধাবঞ্চিত উপজাতি ও পার্বত্য বাঙালি সম্প্রদায়কে দেওয়ার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন হবে এবং সম্প্রদায়গত বৈষম্য ও অসন্তোষ দূর হবে।

উল্লেখ্য, শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩-১৪টি নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশই উচ্চশিক্ষা ও পেশা গ্রহণের সুযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজেদের দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির একতরফা সুযোগ নিচ্ছে চাকমা ও আরও দুই-একটি নৃগোষ্ঠী, যারা তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং নেত্বত্ব-কর্তৃত্বকে ‘সমগ্র নৃগোষ্ঠীর দাবি’র নামে চাপিয়ে দিচ্ছে। যদিও এসব রাজনৈতিক তৎপরতায় অপরাপর নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও বক্তব্যের কোনো সুযোগ ও স্বীকৃতি নেই। পার্বত্য উপজাতি দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্বের শতকরা ৯০-৯৫ ভাগই চাকমা নিয়ন্ত্রণাধীন।

ফলে ‘জুম্মু জাতীয়তাবাদ’কে প্রকারান্তরে ‘চাকমা জাতীয়তাবাদ’ বলা হয়। যেমনভাবে অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘জাতিগত সংঘাত’কে ‘চাকমাদের সশস্ত্র সংঘাত’ নামে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও নানা গবেষণায় নামকরণ করা হয়। বর্তমানেও উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নামে পরিচালিত নানা আন্দোলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও জনগণের ওপর ‘চাকমা প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা’ স্পষ্ট, যাকে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ‘চাকমা গোষ্ঠীগত আধিপত্যবাদ’ নামে চিহ্নিত করে, যার আশু অবসান হওয়া প্রয়োজন এবং পাহাড়ে সব শ্রেণি, পেশা, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সম-অধিকার ও সমসুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

গবেষকগণ মনে করেন, এ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা অনুপাতে এবং চাহিদা ও পশ্চাৎপদতার নিরিখে প্রকৃত অবহেলিত ও বঞ্চিতদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে এগিয়ে আনার প্রয়োজনে কোটা সুবিধার আইনগত পরিবর্তন করাও আবশ্যক।

একটি বা দুটি গোষ্ঠী কোটা সুবিধার সিংহভাগ পাবে আর অন্যরা বঞ্চিত হবে তা বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা, বৈষম্য নিরসন ও সুযোগের সমতা নিশ্চিতের মর্মার্থকে ব্যাহত করার মাধ্যমে বরং নতুন অসন্তোষ ও বৈষম্যের সৃষ্টি করে। ফলে উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ভালোমন্দ দিকগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা দরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে চরমভাবে অবহেলিত, পশ্চাৎপদ ও বঞ্চিত পার্বত্য-বাঙালিদেরও কোটার আওতায় আনা একান্ত প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গবেষণাকারী ড. মাহের ইসলাম বার্তা২৪.কম'কে বলেন, "সামগ্রিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব নাগরিকের জন্যই মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সুযোগসহ সাংবিধানিক সব অধিকার সমভাবে ও বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োগ করার আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করা পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি, সামাজিক সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে অতীব জরুরি।"

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গ্রন্থকার ও গবেষক প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, "বাংলাদেশের সব নাগরিকের অধিকার রক্ষা, বৈষম্য নিরসন ও সুযোগের সমতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নারীসমাজ, অনগ্রসর নাগরিক গোষ্ঠী, দুর্গম এলাকার জনগণের জন্য শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার মাপকাঠি কিছুটা শিথিল করে এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন সংরক্ষিত রেখে বিশেষ বিধান তথা কোটাব্যবস্থা চালু রয়েছে। ১৯৭২ সালে জাতির সূর্যসন্তান, বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম কোটাব্যবস্থা চালু করা হলেও ক্রমান্বয়ে দেশের অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে উন্নত ও অগ্রসর করার প্রয়োজনে কোটার পরিধি বৃদ্ধি করা হয়, যার আওতায় রয়েছে উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সদস্যরা। কোটাব্যবস্থার সুবিধা অবহেলিত ও পশ্চাৎপদ মানুষের প্রাপ্য, তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।"

রাতে উড়ন্ত পোকা ধরে ধরে খায় ল্যাঞ্জা রাতচরা



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ঝরাপাতার ওপর ঘুমায় ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’। ছবি: ইনাম আল হক

ঝরাপাতার ওপর ঘুমায় ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

নির্জন নিশাচর পাখি এসে সেই পথে বসে থাকে। তবে কলাহলতার কারণে সেদৃশ্যগুলো এখন অতীত। শহরতলীর নির্জনতাটুকুও মুছে গেছে সেই কবে। বনের নির্জনতাটুকু খুঁজে পাওয়া যায় না আর। নির্জনতায় বেঁচে থাকা পাখির নাম ল্যাঞ্জা-রাতচরা। তার অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।     

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা নিশাচর পাখি। বাংলাদেশে অন্য রাতচরা প্রজাতিগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি আছে। পৃথিবীতে ৯৭ প্রজাতি এবং আমাদের দেশে দেশে ৬ প্রজাতির রাতচরা পাখি বিচরণ। এর ইংরেজি নাম Large-tailed Nightjar. তবে বর্তমানে এরা আমাদের দেশে খুবই খারাপ অবস্থায়। পাহাড়ি এলাকা, নির্জন বাঁশঝার, গ্রামের কবরস্থান প্রভৃতি এলাকায় সন্ধ্যায় গেলেই ওদের ডাক এখন আর শোনা যায় না।’

এর বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাতচরা পাখিদের সবার একটি অদ্ভুত অভ্যাস হলো- এরা রাতে উড়ন্ত পোকা ধরে ধরে খায় এবং এরা দিনে মাটিতে থাকে। মাটিতেই ঘুমায়। গাছের ডালে না। মাটিতেই বসবে। মাটিতেই ডিম পাড়বে এবং মাটিতেই বাচ্চা তুলবে। পৃথিবীতে তো আগে এতো উৎপাত ছিল না। তখন থেকেই তাদের এ অভ্যাস হয়েছে যে, সারাদিন সে মাটিতে ঘুমায়। রাতে সে উড়ে উড়ে উড়ন্ত পোকা ধরে এবং গাছের ডালে বসে। নিজের খাবার জন্য রাতে উড়ে উড়ে ৪/৫টা উড়ন্ত পোকা ধরা তো সহজ কথা নয়। আর যদি ছানা হয় তবে তো আরো বেশি পোকা তাকে ধরতে হয়। ফলে সে সারারাত জেগে থাকে এবং দিনে তাকে ভালোভাবে ঘুমাতে হয়।


গায়ের রং এবং গন্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওর গায়ের রঙও কিন্তু ঝরাপাতার মতো। ঝরাপাতা পড়ে থাকলে যে রকম দেখায় সেরকম। ওর বেঁচে থাকার বড় উপায় হলো যে, ওর শরীরের রংটা ঝরাপাতার মতো এবং ওর শরীরে কোনো গন্ধ নেই। ডিমে ওর বাচ্চা শরীরে কারোই কোনো গন্ধ নেই। পাখির তুলনায় ওর চোখ অনেক বড়। ওই চোখটা বন্ধ করে দিনে সে ঘুমিয়ে থাকে। এদের পা এতো ছোট যে, ও ঠিকমতো মাটিতে বসতে পারে না।’

স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি বেশ কয়েকবার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ অন্যান্য স্থানে এই পাখিটাকে দেখেছি। কিন্তু গত ১০/১৫ বছরে এদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আগে সন্ধ্যার দিকে লাউয়াছড়া যাবার সময় এখন যেখানে গ্রেন্ড সুলতান নামক রিসোর্ট হয়েছে এর পাশের মোড়েই দেখতে পেতাম। সন্ধ্যার দিকে রাস্তায় এসে ওর বসে থাকতো। এছাড়াও লাউয়াছড়ার ভেতরে প্রবেশ করলেই ‘ট্রাক ট্রাক ট্রাক’ স্বরে ডাকতো।

‘এছাড়াও গ্রামেগঞ্জে আগে সব সময় বাঁশবন থেকে এই পাখির ডাক শুনতাম। এখন বহু গ্রামে গিয়ে আমরা একটি শব্দও শুনতে পাই না। এর একটি কারণ। আমরা সমস্ত পোকা মেরে ফেলেছি। ফলে এ পাখিটা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেল। আগামী ১০ বছরের মধ্যে হয়তো সারাদেশে ১টিও দেখতে পাবো না।’

অবস্থান সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, ‘ওর সংখ্যা অনেক কমে গেলেও সে হয়তো টিকে থাকবে আরো কিছুদিন। কারণ সে নিশাচর পাখি বলে মানুষের হাতে সরাসরি মারা পড়ছে না। তবে মানুষের কারণে ওর থাকার জায়গা এবং খাদ্য কমে যাচ্ছে। ওদের বিলুপ্তির অধগতিটা ধীরে হবে বলে আমরা আশা করি। তাই এই প্রজাতিটিকে বিপন্ন এর তালিকায় এখনো উঠেনি। তবে ওরা এখন বিরল প্রজাতি নিশাচর পাখি।’

‘ঝরাপাতার রঙে ডিম পাড়ে এরা। বাচ্চাগুলোও হয় ওই রঙের। ওরা যদি মাটিতে বসে থাকে তবে আপনি সহজে তাদের দেখতে পাবেন না। এভাবেই সে টিকে ছিল এতো কাল। এই সুন্দর পাখিটা বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সে যখন উড়ে উড়ে পোকা ধরে তখন ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয় যেন একটা ঘুড়ি যে বাতাসে উড়ছে’ বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

;

ব্রাজিলের বিস্ময়



ভূ-পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল
ব্রাজিলের বিস্ময়

ব্রাজিলের বিস্ময়

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রাজিলের নাম শোনেনি এমন লোক পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যাবে। সেই কবে কোন ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকের কল্যাণে পেলের নাম শুনে বড় হয়েছি। পৃথিবীতে ব্রাজিলই একমাত্র দেশ যার সঙ্গে সবচেয়ে বেশী দেশের স্থল যোগাযোগ রয়েছে। চিলি ও ইকুয়েডর ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশের সঙ্গে ব্রাজিলের বর্ডার রয়েছে। দেশগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, পেরু, কলম্বয়িা, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, ফ্রেঞ্চ গায়ানা। ব্রাজিলের আয়তন ৮৪৫৬৫১০ বর্গ কি.মি., যা বাংলাদেশের চেয়ে ১৫২ গুণ বড়। পৃথিবীতে ৫ম বৃহত্তম। শুধু দেশ হিসাবে তারা বড়ই নয়, আরোও অনেক কিছু রয়েছে যার কৃতিত্ব শুধু ব্রাজিলের।

UNWTO এর আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম দক্ষিণ আমেরিকার আজেন্টিনা, ব্রাজিল ও প্যারাগুয়েতে একটি কনফারেন্সে যোগদান করি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে। কনফারেন্স শেষে তিন মাসে ল্যাটিন আমেরিকার পাঁচটি দেশ আজেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও চিলি ঘুরে আসি। পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকবার দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। ভবিষৎতে আবারো সুযোগ পেলে ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার বাকী দেশগুলো ঘুরে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।


বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত রয়েছে ব্রাজিলে। নাম ক্যাসিনো বিচ যা ব্রাজিলের Rio Grand do Sul- এ অবস্থিত। এটি ২১২ কি.মি থেকে ২৫৪ কি.মি বিস্তৃত Longest Uninterrupted sandy seashore in the world এবং এটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখেছে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে। এটি দেখতে বছরে ১৫ লক্ষাধিক পর্যটক আসেন।

ক্যাসিনো বিচের পরেই দীর্ঘতম বিচ হিসেবে রয়েছে Padre Island, Texas, USA, যা ১৮২ কি.মি. এটাকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা Drivable Beach। নাইনটি মইল বিচ ১৫১ কি.মি. (৯৪ মাইল) লম্বা। তারপরেই রয়েছে আমাদের কক্সবাজার বিচ যা ১৫০ কি.মি. (৯৩ মাইল)। বিশ্বের দীর্ঘতম নদের নাম নীল নদ (মিশর) এবং তারপরই রয়েছে আমাজন। তবে নীল নদের চেয়ে আমাজনের পানির ধারণ ক্ষমতা বেশী। সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রজাতির গাছ ও প্রাণির দেখা পাওয়া যায় ব্রাজিলে। ব্রাজিল সম্পর্কে ছোট করে লিখা অসম্ভব কারন সৃষ্টিকর্তা ব্রাজিলকে দিয়েছেন দু’হাত ভরে অকৃপনভাবে। আর তাই হয়তো ব্রাজিলিয়ানরা বলে থাকেন, সৃষ্টি কর্তা হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান (Deus e brasileiro)।


ব্রাজিলে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে কার্নিভালের সময়। আবহাওয়া বিবেচনায় এপ্রিল-জুন আর আগষ্ট-অক্টোবরও সেরা সময়। তবে মনে রাখবেন, করোনার টিকার পাশাপাশি Yellow Fever টিকা আবশ্যক। যারা আমাজনে যাবার পরিকল্পনা করবেন তাদের জন্য হেপটাইসিস, টিটেনাসের টিকা ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ নিয়ে যাওয়া উচিত।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিলের (Foz do lguagu) ফজ দ ইগুয়াজুতে যাই যা ইগুয়াজু ফলস নামে পরিচিত। ফলসটি ২.৭ কি.মি এবং সেখানে ২৫টি একক ঝরনা রয়েছে যা এটিকে New Natural Seven Wonders of the World এ খেতাব এনে দিয়েছে। ল্যাটিন বা দক্ষিণ আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে এবং আমাদের বাংলাদেশি লোকজন ও খুব বেশী নেই। যদিও গত ১০ বছরে বেশ লোকজন ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির বিপর্যয়ে ও অর্থনৈতিক ধসে বেশীর ভাগ লোকজন অবৈধভাবে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০০-১৫০০ বাংলাদেশি রয়েছে ব্রাজিলে।


সাও পাওলো টু রিও

একটা শহর যে এত বড় হতে পারে সাও পাওলো না এলে বিশ্বাসই হতো না। ৪১ মিলিয়ন লোকের বসবাস। সারা বিশ্বের লোক সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম ১০টি শহরের একটি। সাও পাওলোতে কামরুলের বাসায় অবস্থান করছি। কামরুলের সাথে ঢাকায় পরিচয় হয়েছিল। কামরুলের বড় ভাই কামাল দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলে রয়েছে। বিয়ে করেছেন এক ব্রাজিলিয়ানকে। যে অল্প কয়েক জন বাংলাদেশি ব্রাজিলের পাসপোর্ট পেয়েছেন কামাল তার অন্যতম। ব্রাজিলের পাসপোর্টে পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে ভিসার ঝামেলা ছাড়াই যাওয়া যায়। বিশ্বের বিশতম শক্তিশালী পাসপোর্ট।

২০১৫ এর দিকে সাও পাওলোতে এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ছিলেন। যদিও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। কারণ কিছু লোক যেমন প্রতিদিন ব্রাজিলে আসছেন, ঠিক তেমনি কিছু লোক ব্রাজিল ত্যাগ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। সাও পাওলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এয়ারপোর্টের নাম Guarulhos যা শহর থেকে ৩০ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত। এতবড়  শহর আরও বড় মনে হতো ভাষাগত সমস্যার কারণে। ব্রাজিলের ভাষা পুর্তগীজ। ল্যাটিন আমেরিকার সব দেশেই স্প্যানিশ ভাষা চলে, শুধু ব্রাজিলে পর্তুগীজ।


এ দেশ আয়তনে যেমন বড়, তেমনি এর খাবার, পোশাক, আবহাওয়া, জীববৈচিত্যও অনন্য। টাইম জোন রয়েছে ৪টি। মজা করে অনেকে বলেন, যখন একজন ব্যক্তি চারটি ঘড়ি পড়ে কোথাও যান তখন বুঝতে হবে তিনি ব্রাজিলে যাচ্ছেন। এ যেনো একের ভেতরে অনেক দেশের মিলিত রূপ।

সাও পাওলোকে অনেকে ডাকেন সাম্পা। ব্রাজিলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইমিগ্র্যান্টদের বসবাস এই সাও পাওলো শহরে। সাও পাওলোর আয়তন ৭৯৪৩ বর্গ কি.মি.।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে অনিকের সাথে প্যারাগুয়েতে পরিচয় হয়েছিল এবং বর্তমানে সে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে রয়েছে (২০১৫)। অনিকের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সে স্প্যানিশ, পর্তুগীজ ভাষায় পারদর্শী। তার ওখানে খায়রুলের সঙ্গে পরিচিত হই। সেও ভালো পর্তুগীজ বলতে পারে। একসময় বাংলাদেশে ভালো ক্রিকেট খেলতো। খায়রুল আমাকে বেশ সময় নিয়ে সাও পাওলোর দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখালো।

সাও পাওলোর Liberdade এলাকাটি মূলত জাপানীজ, চাইনীজ ও কোরিয়ানদের দখলে। তবে শহরটির ভিতর ইতালীয়ন প্রভাব অনেক। ৬ মিলিয়ন লোকের রয়েছে ইতালীয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড। তবে সংখ্যায় অল্প কিন্তু প্রভাবশালী কমিউনিটির মধ্যে আরব ও ইহুদীদের প্রভাব রয়েছে। যদিও শহরের ৪০ শতাংশ লোক এসেছে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের। তাদের বলা হয় Paulistanos।


পরিশ্রমী হিসেবে সাও পাওলোর লোকদের সুনাম রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যখন সাও পাওলোর লোকেরা কাজ করে তখন বাকী ব্রাজিলিয়ানরা আরাম করে। আরও বলা হয়ে থাকে, দেশটির ৪৫ শতাংশ উৎপাদনের আয় আসে এই সাও পাওলো প্রদেশ থেকে। সাও পাওলোর অবশ্যই দর্শনীয় স্থান হচ্ছে Avenida Paulista সেখান থেকে হেটেই Ibirapuera এবং Park Centro যাওয়া যায়। Sao Paulo Stock Exchange হচ্ছে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম স্টক একচেঞ্জ। পিৎজার জন্যও সাও পাওলো বিখ্যাত। Sao Paulo is the second largest consumer of pizza in the world। ৩০৫ বিলিয়ন ডলারের স্টক একচেঞ্জ হয় প্রতিদিন সাও পাওলোতে। খাইরুলের সাথে পাউলিস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিশাল বড় রাস্তা পথচারীদের হাঁটার জন্য। দুপাশে নয়ন জুড়ানো সুউচ্চ অট্রালিকা আকাশ পানে চেয়ে আছে। কিছু জায়গায় দেখলাম সুভ্যেনির নিয়ে রাস্তায় বিক্রি করছেন কিছু লোক, পর্যটক সমাগম রয়েছে এই এলাকটিতে। ব্রাজিলিয়ান বিখ্যাত আর্কিটেক্ট অস্কার নেইমার একটি স্থাপত্য দেখলাম। অস্কার নেইমা একজন পৃথিবী বিখ্যাত আর্কিটেক্ট। সারা ব্রাজিল জুড়েই যার স্থাপত্য নির্মাণ শিল্পীর নিপুন কাজ রয়েছে। সাও পাওলোতেই তার ৮/১০টি কাজ রয়েছে এবং সম্প্রতি আরেকজন বিখ্যাত আর্টিস্ট Eduardo kobra যিনি Street Art এর জন্য বিখ্যাত, সাও পাওলোর সন্তান এবং ব্রাজিল ছাড়াও ৫টি মহাদেশে ৩০০০ মুরাল তৈরি করেছেন। পাউলিস্তার রাস্তায়ও কোবরার তৈরি করেছেন ওস্কার নেইমারের ম্যুরাল। খুবই আকর্ষণীয়। সারা ব্রাজিলের রাস্তায় প্রচুর Street Printing এবং গ্রাফিতি আর্ট।  Banksy নামের একজন ব্রিটিশ আর্টিস্ট এই গ্রাফিতি আর্টকে জনপ্রিয় করেন।


১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিল স্বাধীনতা লাভ করে পর্তুগাল থেকে। বর্তমানে রাজধানী ব্রাসিলিয়া, এর আগে রাজধানী ছিল রিও ডি জেনেরিও এবং সালভাদর। ব্রাজিলে যত আন্তজাতিক কোম্পানির অফিস রয়েছে তার ৬৩ শতাংশ সাও পাওলোতে। সাও পাওলো বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরগুলির একটি। অভিজাত শপিং বা উইনডো শপিংয়ের জন্য যেতে পারেন Jardins, JK শপিং মল ও Iguatemi তে।

ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল পাগল জাতি আর তাইতো সাও পাওলো শহরে রয়েছে ফুটবলের জাদুঘর। ফুটবল প্রেমীদের জন্য আবশ্যই দর্শনীয় স্থান। ১৯৫০ ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় এই শহরে। ফর্মুলা ওয়ান ব্রাজিলের অন্যতম জনপ্রিয় স্পোর্টস। তারা তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হয়েছে রেসে।

এত বড় যে, আনায়াসে হারিয়ে যাওয়া যায় Sao Paulo Tiete Bus টার্মিনালে। বিশ্বের ২য় বৃহত্তম বাস টার্মিনাল। খায়রুল আমাকে নিয়ে সেই বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে রিওর কাছাকাছি পারিবা দ্যা সল যাব। দুরত্ব ৪২৩ কি.মি. যেতে ৬/৭ ঘণ্টা লাগবে। পারিবা দ্যা সেল এ রাখাল বাবু নামে এক বাংলাদেশি থাকেন। তার কাছে যাব। রাখাল মালয়েশিয়া থেকে ব্রাজিলে এসেছে। একটি গ্লোভস তৈরির কারখানাতে চাকুরি করে। বেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে। রাখাল বলে দিয়েছিলো। রাতে কামরুল ও তার রুমমেট রুমান আমাকে মসজিদ পার্কের সামনে থেকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিলো।

;

বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা



লেখা ও ছবি: মনিরুল ইসলাম
বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা

বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রথম যেবার "আউটডোর বিডি" তাঁবুর মেলা আয়োজন করেছিলো সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। সে প্রায় দু’বছর আগের কথা আর এবার বসেছে রাস পূর্ণিমায়। যদিও রাস পূর্ণিমা দিন তিনেক আগে গত হয়েছে তবুও তার রেশ এখনো বিদ্যমান। আগেরবার এই তাঁবুর মেলা বসেছিল পাদ্মহেম ধামে আর এবার গাজীপুরের মাওনার অদূরের ক্যাম্পসাইট ও রিসোর্ট বৃন্দাবনে। তবে মজার ব্যাপার হল এখানেও একটি সাধুসঙ্গ আছে যার নাম “সত্য নিকেতন”।

হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে বৃন্দাবন একটি তীর্থস্থান। বৃন্দাবন আর রাস পূর্ণিমা একে অপরের পরিপূরক। রাস পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনেশ্বরী রাধা ও বৃন্দাবনেশ্বর কৃষ্ণা গোপীদের নিয়ে মত্ত হয়ে উঠতেন লীলা খেলায়। আমাদের তাঁবুবাসের উদ্দেশ্য সেরকম কিছু না হলেও, ভ্রামণিকদের সাথে প্রকৃতির কোলে আনন্দময় আড্ডার  সাথে নিভৃতে রাত্রিযাপনই ছিল মুল উদ্দেশ্য।   

বিগত দুবছর ক্যাম্পিং-এর মৌসুম শুরু করেছিলাম আউটডোর বিডি আয়োজিত তাঁবুবাসের মাধ্যমে, এবছরও তার ব্যাতিক্রম হচ্ছেনা। আউটডোর বিডির স্বত্বাধিকারী জুয়েল রানা আগেই ক্যাম্পিং এর দিনক্ষণ জানিয়ে রেখেছিল যাতে করে মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকতে পারি। প্রথমবার একা অংশগ্রহণ করলেও দ্বিতীয়বার নিয়েছিলাম প্রিয়তয়া স্ত্রী কানিজকে। আর এবার নতুন সদস্য হিসেবে যোগ হয়েছে আমার ছোট মেয়ে "প্রকৃতি"। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আমার মেয়ে প্রক্ক্রিতির এতাই প্রথম ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতা, হ্যামক, তাঁবু , স্লিপিং ব্যাগ এইসব নিয়ে সে খুব উত্তেজিত হয়ে ছিল। তিনজনের সরঞ্জামের লটবহর নিয়ে যাত্রা শুরু হল  ১১ নভেম্বর সকাল ৮ টায়।  ঢাকা ছেড়ে কোথাও যেতে গেলে পথের ভোগান্তির চিন্তায় রাস্তার মত আঁকাবাঁকা ভাঁজ কপালেও ফুটে উঠে , পরিবহন ও রাস্তার কথা চিন্তা করে । তার উপরে যেতে হবে গাজীপুর জেলার  শ্রীপুর উপজেলায়! অনেকগুলো বিকল্প পথ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেও শেষমেষ উত্তরা , টঙ্গী হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা ধরেই যাত্রা স্থীর করলাম। শ্লথগতির উন্নয়নের তোড়জোড়ে রাস্তা ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ। অনেক শংকা নিয়ে রওনা হলেও সৌভাগ্যের এলবাট্রস উড়ে এস বসেছিল আমাদের গাড়ির উপর। তাই হবে হয়তো, কেননা অনুমিত সময়ের আগেই মাওনা চৌরাস্তা পৌঁছে গেলাম। তারপর এমসি বাজার থেকে ইউটার্ন নিয়ে অতঃপর বামের রাস্তা ধরে টেঁপির বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম । “টেঁপির বাড়ী” নামটার মধ্যে একটা আদর আদর ভাব আছে! এই টেঁপির বাড়ীর এলাকায় অবস্থিত আমাদের ক্যাম্প সাইট “বৃন্দাবন”। কয়েক কিমি এগিয়ে সেই রাস্তা ছেড়ে হাতের ডানের খানিকটা অপ্রসস্থ কিছুটা আঁকাবাঁকা একটা রাস্তা ধরলাম। অসম্ভভ নির্জন, স্নিগ্ধ এবং সবুজে ঘেরা সেই রাস্তা।  রাস্তার দুধারের গাছেরা যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আচ্ছা গাছেরাও কি মানুষের মত সর্বক্ষণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার! নাকি বেঁচে থাকার জন্য যটুকু আলো, বাতাস বা পানির দরকার ততটুকুর জন্যই শুধু প্রতিযোগিতা করে। কি জানি বাপু , ওদের মনস্তত্ত্ব বোঝা আমার কম্ম নয়। যাইহোক দার্শনিক ভাব ছেড়ে গল্পে ফেরা যাক। 

বৃন্দাবনে ঢোকার পথ

রিসোর্টের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডান দিকটায় সবুজ ঘাসে মোড়ানো এক প্রস্থ মাঠ। এই মাঠকে ঘিরেই রিসোর্টের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। বাদিকটায় পরিকল্পিত বন, আর বনের ভিতরে ক্যাম্প সাইট। ইতিমধ্যে অনেকই হাজির হয়েছেন মোটর বাইক, গাড়ী , বাইসাইকেল সওয়ারি হয়ে। রঙ বেরঙের তাঁবু আর হ্যামকে রংধুনুর রঙে সেজেছে পুরো বন। আমর' সময় নষ্ট না করে তাঁবু খাটানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমার মেয়ে প্রকৃতি অস্থির হয়ে আছে হ্যামকে গা এলানোর জন্য তাই হ্যামক টানাতে ব্যাতিব্যস্ত হতে হলো। হ্যামক টানাতে গিয়ে রোপ-৪ এর মাহি ভাইয়ের দেখা পেলাম, তিনি সদ্য ইয়েলা পিক আরোহণ করে দেশে ফিরেছেন । ঊনার থেকে সাহায্য চাইলাম হ্যামক টানাতে। তিনি সহজেই শিখিয়ে দিলেন কিভাবে হ্যামক বাধতে হয়। আগে যে পারতাম না তা নয়, সে ছিল দড়ি পেঁচিয়ে কিছু একটা করা। বোনাস হিসেবে শিখলাম হ্যামকে উঠার সবচেয়ে নিরপাদ পদ্ধতি। আমার মত ঘরকুনোদের ক্যাম্পে আসার ফায়দা হল সবসময় নতুন কিছু জ্ঞান অর্জন।

আমার মেয়ের হ্যামক বিলাস

লাঞ্চ সেরে বড়রা দলপাকিয়ে আড্ডা দিচ্ছি আর ছোটরাও দল বানিয়ে নানাও খেলার ব্যস্ত হইয়ে পরলো। বেলা পরে এলে চারদিকটা একটু ঘুরে দেখবো বলে রওনা হলাম, কিন্ত মাঠের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম প্রকৃতি ব্যথা পেয়ে ফুটবল খেলা ক্ষান্ত দিয়ে মাঠের পাশে বসে আছে। আমাকে দেখে তার ব্যথার অনিভুতি গেলো বেড়ে, জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। ক্ষুদে ফুটবলারদের নেতৃত্বে ছিলেন শাহিন ভাই, ঔষধ পত্র নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরলেন। আমার মেয়ে এর আগে এত বড় ব্যথা কখনো পায়নি। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা খানিকটা ফুলে উঠেছে, তবে আমি অন্য সময়ের মত বিচলিত হলাম না। কানিজ বরাবরই আমার চেয়ে শক্ত মনের অধিকারী। খেলতে গেলে এরকম একটু আধটু ব্যথা পেতেই হয়। ছোট বেলায় খেলতে গিয়ে আমারা কত ব্যথা পেয়েছি বলে সে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলো সব।

সন্ধ্যা নেমে এলে বরাবরের মত কবির আর সুজন চায়ের আয়োজনে নেমে পড়লো। ক্যাম্পের জন্য বিশেষায়িত চুলা নিয়ে যাওয়াতে সুবিধা হয়েছে, চাইলেই চা বানিয়ে ফেলা যাচ্ছে। ওদিকে আউটডোর বিডি'র বার্ষিকী সেল শুরু হয়েছে ততক্ষনে। ক্রেতাদের ভিড়ে হট্টগোল লেগে গিয়েছে কিন্তু বিক্রি-বাট্টা আশানুরূপ নয়। অনেকটা আলী হুসেনের মত করে বলতে হয় “ আইয়া খালি হাতায় বাজান, দাম হুইন্না আর কিনে না”।

এর মধ্যেই শাহিন ভাই হাত ধরে নিয়ে গেলেন সত্য নিকেতনের গানের আসরে। সেখানে গদিতে আসীন এই রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা মৃধা। এদিকে গান গেয়ে চলেছেন নুরু পাগলের এক ভক্ত। শুধু ভক্ত নয় সে একজন নুরু পাগলের দর্শনের প্রচারক । আমীর হামজা নিজেও গান লিখেন এবং সুর দেন। একসময় আমীর হামজার মৌলিক কয়েকটা গানও শোনা হলো।  শুভ্র চুল ও শশ্রুশোভিত সফেদ পাঞ্জাবি পরিহিত এক রহস্যময় পুরুষ এই মৃধা সাহেব । জীবন সম্পর্কে তার কিছু নিজস্ব চিন্তা ভাবনা আছে যেগুলো ব্যানার ও ফেস্টুনে লিখে ঝুলিয়ে দিয়েছেন রিসোর্টের বিভিন্ন স্থানে । এমনকি নিজের কবরের স্থানটিও ঠিক করে রেখেছেন আগেভাগেই আধ্যাত্মিক এই লোকটি ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা মৃধা

ততক্ষণে সন্ধ্যায় গড়িয়ে রাতের আকাশের দখল চলে গিয়েছে  চাঁদ আর তারাদের হাতে। কিন্তু আমাদের ঘোরা নেশা তখনো মিটে যায়নি, মাহি ভাইকে অনুসরণ করে পিঁপড়ের লাইনের মত করে বনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা কয়েকজন।  খানিক বাদে  কিছুটা দূরে একটা পুকুর পারে খোলা আকাশের নীচে এসে হাজির হলাম । উদ্দেশ্য মাহি ভাই আমদেরকে তারাদের সাথে পরিচিত করাবেন। পকেট থেকে লেজার পয়েন্টার দিয়ে দেখালেন দ্রুবতারা কিভাবে খুঁজে বের করতে হয়! সপ্তর্ষী মন্ডল এর প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতু-কে সরলরেখায় বাড়ালে ধ্রুবতারাকে নির্দেশ করে। দিক নির্ণয়ে এই ধ্রুবতারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন কালে দিক নির্ণয় যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমূদ্রে জাহাজ চালাবার সময় নাবিকরা এই তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করতো। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এক অঞ্চল হতে বছরের যে কোন সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। এরপর দেখালেন কালপুরুষ তারামন্ডলী যা দেখতে অনেকটা শিকারীর মত মনে হয়। তার এক হাতে ঢাল আর আরেক হাতে মুগুর, কটিতে রয়েছে খাপ খোলা তলোয়ার। এ সব কিছুই ছিল আমার কাছে নতুন। মাহি ভাই এতো সুন্দর করে দেখালেন একদম অভিভূত হয়ে গেলাম। যদিও জানি কিছুক্ষণ পরেই যদি আমকে এই তারা গুলো আবার খুঁজে বের করতে বলা হয়, আমি পারবো না।

তারা সম্পর্কে বেশ খানিকট আজ্ঞান অর্জন করে ক্যাম্প সাইটে ফিরলাম। খাওয়া দাওয়ার পর শুরু হল ক্যাম্প ফায়ার এবং আড্ডা। শত অনুরোধেও আমাদের মধ্যে লুকায়িত প্রকৃত শিল্পীরা গলা ছাড়লেন না। অগত্যা সুযোগ বুঝে সবুজ ভাই গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করলেন । তার গলা যতই বেসুরো হোক, প্রচেষ্টা যখন হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় তখন তা হয়ে উঠে মধুর ও স্বপ্নময়- তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সবুজ ভাই। যাইহোক তার গান নিয়ে বেশী কিছু বলা যাবে না। এদিকে তিনি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছে যে তার সংগীত প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে তাকে আং ফ্রেং (মানে ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করে দিবে, সান্দাকফু ট্রেকে তিব্বতি ও ভুটিয়া ভাষা রপ্ত  করে এসেছে সে) করে দিবে । পরিশেষে পরিত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এলেন বেশ কয়েকজন সত্যিকারের শিল্পী। তাদের সংগীতের মাঝে মাঝেই শিয়াল পণ্ডিতেরা দোহারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে , যা ছিল আমার মেয়ের কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা। নানান অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে শুরু হলো আমদের তাঁবুবাস।

ক্যাম্প ফায়ার ও রাতের আড্ডা

সকাল হতেই মাহি ভাই স্বরূপে আবির্ভূত হলেন। কিছু রশি ও পেরেক দিয়ে একটা খেলার বোর্ড বানিয়ে ফেললেন। আমার মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে বলল তিনি বললেন এটা টিক-ট্যাক-টো খেলা, তবে আমার একটু অন্যভাবে মজা করে খেলবো।  উনার কোন কার্যকলাপ কায়িক পরিশ্রম ছাড়া শেষ হবে, উনার সম্পর্কে পূর্বধারণা রাখে এমন কেউ সাধারণত বিশ্বাস করে না।  তাই আমিও উনার এই সহজ সরল কথায় ভুললাম না, সিধান্ত নিয়ে ফেললাম যে যাই বলুক এই খেলার ভিতরে আমি ঢুকছি না। যখন নিয়মকানুন বুঝিয়ে দেওয়া হলে তখন আমি যে সঠিক ছিলাম তা বিলক্ষণ বুঝতে পারলাম। যাতে কেউ জয়ী হতে চালাকির আশ্রয় না নেয় সেই বিবেচনায় আমার দায়িত্ব পড়লো বিচারকের।  খেলা শুরু হতেই বিচার বিবেচনা শিকেই তুলে খেলা দেখায় মত্ত হয়ে গেলাম।

খেলা শেষ হতেই তাঁবুর এই মিলন মেলা ভাঙ্গার বিউগলের সুর বেজে উঠলো। নাস্তা সেরে রওনা হতেই হলো সেই চিরচেনা ঢাকা শহরের জীবনে। শত সমস্যায় জর্জরিত এই শহরে, ফিরে আসি, আসতে হয়, ভালোবেসেই আসি, স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্তের  মত।

;

বিপন্ন তালিকায় সবুজ-ধুমকল



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
সবুজ-ধুমকল জোড়া বেঁধে চলে। ছবি: ইনাম আল হক

সবুজ-ধুমকল জোড়া বেঁধে চলে। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

পাহাড়ি বনের অদেখা পাখি ‘সবুজ-ধুমকল’ (Green Imperial Pigeon)। পাহাড়ি বনকে প্রসারিত হতে না দেয়া এবং বনের খাদ্যসংকটের ফলে অনেক প্রাণীর মতো এ পাখিটির অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, আমাদের দেশে মাত্র ২ প্রজাতির ‘Imperial Pigeon’ অর্থাৎ ‘ধুমকল পায়রা’ রয়েছে। পৃথিবীতে রয়েছে ৪২ প্রজাতির। কিন্তু আমাদের থেকে পশ্চিমের দেশগুলোতে ওরা নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের সবুজ পাহাড়ি বনগুলোতে ওরা আছে।

পাখিটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে আমরা হাকালুকি হাওরে পাখিশুমারির কাজ সেরে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল ফিরছি; হঠাৎ গাড়ি জানালা দিয়ে দেখি এক জোড়া Green Imperial Pigeon। সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে আমরা তাদের ছবি তুললাম। চা বাগানের ফাঁকা গাছে ওরা খুবই কম আসে। কিন্ত ওখানে ওরা নিমের ফল খেতে এসেছিল। এদের আকৃতি ৪৩-৪৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।

“শরীর সবুজ বলে সহজে লোকের চোখে পাড়েনা; ডানাটা একটু বেশি ঘনসবুজ। ও ঘুঘুর মতো ডাকে; কিন্তু অনেক গম্ভির গলা। বনে ঢুলকেই ডাক শুনে বুঝতে পারি ইমপেরিয়াল পিজন আছে আশেপাশে। এরা হলো ফল খাওয়া পাখি। শুধুমাত্র বুনো ফলই খায়। ওরা ঝাক বেঁধে আসে না। আমি একজোড়া গ্রিন ইমপেরিয়াল পিজন দেখতে পেলেই মহাখুশি।”

সাতছড়ি উদ্যানের পাশে সবুজ-ধুমকল। ছবি: ইনাম আল হক

ইনাম বলেন, ‘সবুজ-ধুমকল’ বিরল পাখি; তবুও টিকে আছে। ওর বড় ভাগ্য, লোকে ওকে খুঁজে পায় না। হরিয়াল (Green Pigeon) যেমন বটগাছে আসে বলে লোকজন তাকে সহজে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু ধুমকলকে মারা ততটা সহজ নয়। একমাত্র চট্টগ্রামে ক’বছর আগে আমি নৃ-গোষ্ঠী মুরংদের এই পাখিটিকে বন্দুক দিয়ে মারতে দেখেছিলাম। কিন্তু সিলেটে লোকের হাতে খুব কমই মারা পড়ে। কারণ লোকে ওকে দেখতে পায় না।

পাখির প্রজনন এবং বন সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, ‘এরা ঘুঘু পাখির মতো বছরে দুটো ডিম পাড়ে। অসুবিধা হলো- একটি ডিম ফুটলো না; বা বড় হওয়ার আগেও কোনো শিকারী পাখি/প্রাণী খেয়ে ফেললো। ফলে অনেক সময় ৫/১০ বছরেরও সে বয়স্ক বাচ্চা রেখে যেতে না পারলে ওদের বংশবিস্তার প্রাকৃতিকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হয়। এছাড়াও এ পাখিটি যে ফল খায়; সেই ফলগাছগুলোও কমে গেছে। বন ছোট হয়ে গেছে। এরাই ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে বন প্রসারিত করে। কিন্তু আমরা তো এখন বন প্রসারিত হতে দিই না। বনকে তো আমরা আটকে রেখেছি একটা ছোট্ট জায়গার মধ্যে।’

রাজকীয় অপূর্ব সুন্দর এক পাখি গ্রিন ইমপেরিয়াল পিজন; আমাদের জালালি পায়রা থেকেও সে আকারে বড়। এই পাখিটি আমাদের বনে টিকে থাকুক -এটাই আমরা চাই। এই ৪২ প্রজাতির প্রত্যেকটি পাখিই কিন্তু অপূর্ব। তবে ওদের অনেকগুলোই কিন্তু পৃথিবীতে বিপন্ন। ভাগ্যক্রমে আমাদের সবুজ ধুমকলটা রয়েছে; এখনো আমরা ‘বিপন্ন’ ঘোষণা করিনি। তবে মনে হয়- খুব শিগগির এ প্রজাতিটিও বিপন্ন তালিকায় যাবে বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

;