প্রাচীন বাংলার পাল শাসনের ইতিবৃত্ত



মো. তাহমিদ হাসান
মো. তাহমিদ হাসান, শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মো. তাহমিদ হাসান, শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

  • Font increase
  • Font Decrease

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় ১১৯ বছরের মৎস্যন্যায়ের যুগের পতন ঘটিয়ে ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আর্বিভূত হন পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল। পালদের উত্থানের গল্প অধিকাংশ মানুষের জানা হলেও পালবংশের ৪০০ বছর শাসনের মধ্যে প্রায় ৯৪ বছর পরেই তাদের অবনতি গল্প খুব কম সংখ্যক পাঠকেই জানেন।

পালবংশের শক্তিশালী রাজাদের নাম আসলেই গোপাল, ধর্মপাল, দেবপালের নাম চলে আসে। পালদের তাম্রশাসন থেকে তাঁদের কৃতিত্ব কথা জানা যায়। কিন্তু দেব পালের পরেই পালদের সাম্রাজ্যের ক্রমাগত অবনতি শুরু হতেই থাকে।

পালদের অবনতি

ধর্মপালের ছেলে দেবপালের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসা নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। বাদল স্তম্ভলিপিতে শূর পালের নাম ও নারায়ণপালের ভাগলপুর তাম্রশাসনে বিগ্রহপালের নাম পাওয়া যায়। বিগ্রহপাল ছিলেন জয়পালের পুত্র এবং ধর্মপালের ভ্রাতা বাকপালের পৌত্র। কিন্তু অধিকতর ঐতিহাসিক শূরপাল ও বিগ্রহপালকে অভিন্ন মনে করেন। আবার কিছু ঐতিহাসিক দেবপালের মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকার যুদ্ধের কথাও অনুমান করেন। ৮৬১ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিগ্রহ পাল সিংহাসনে বসার পর মাত্র ৪ অথবা ৫ বছর রাজ্য পরিচালনা করেন।

বিগ্রহপালের মৃত্যুর পর অত্যন্ত দুর্বল ও শান্তিপ্রিয় শাসক নারায়ণ পাল সিংহাসন আরোহন করেন। ভাগলপুরের তাম্রশাসনে নারায়ণ পালের পিতা প্র. বিগ্রহপালের শান্তিপ্রিয় ও সংসারবিরাগীর কথা উল্লেখ ছিল। ঠিক তেমনি নারায়ণপালের স্বাভাব তার পিতা প্রথম বিগ্রহপালের মতোই ছিল। বাদল স্তম্ভলিপি বা তাঁর নিজস্ব ভাগলপুরের তাম্রশাসনে তাঁর সময়ে সাফল্যের কথা উল্লেখ নাই। রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কৃষ্ণ পাল রাজ্যে আক্রমণ করেন কিন্তু রাষ্ট্রকূট রাজা বিজয়ের ফলেও কোনো অংশ রাষ্ট্রকূট রাজ্যের ভুক্ত হয়েছিল বলে মনে হয় না। তার সময়েই প্রতীহার রাজাদের আক্রমণের ফলে পাল সাম্রাজ্যের যথেষ্ট সংকোচন হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। নারায়ণপালের পাশাপাশি সময়ে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলায় স্বাধীন রাজবাংশের উত্থান ঘটে। নারায়ণপালের ১৭ বছর রাজত্ব পাল সাম্রাজ্য পশ্চিম বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

নারায়ণ পালের মৃত্যুর পর ৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তার পুত্র রাজ্যপাল সিংহাসন আরোহন করেন। তার রাজত্বকালে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তিনিও তাঁর অদূরদর্শিতার কারণে পাল সাম্রাজ্যের পতনরোধ করতে পারেনি।

নারায়ণ পালের মৃত্যুর পর ৯৪০ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় গোপাল সিংহাসনে বসেন। তার শাসনামলে বিজয়ের কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি কিন্তু তার সময়ে বৈদেশিক আক্রমণ ঘটে। জানা যায়, চান্দেল্লরাজ যশোবর্ম পরবর্তীতে তার পুত্র ধঙ্গা দ্বিতীয় গোপালের সময় পাল সাম্রাজ্যে আক্রমণ ও লুণ্ঠন চালান। একই সময়ে কুলচুরি রাজবংশ পাল রাজ্যের উপর আক্রমণ চালায়। দুর্বল পাল রাজারা এইসব বিদেশি আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি।

দ্বিতীয় গোপালের রাজত্বে শেষের দিকে ও দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বে প্রথমদিকে যখন পাল সাম্রাজ্য বৈদেশিক আক্রমণে জর্জরিত, সেই সময়ে পাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে, উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় কম্বোজ বংশের অভ্যুত্থান ঘটে। বাইরে থেকে এসে ক্ষমতা দখল করেছিল এমনটি নয়, কম্বোজদের অভ্যুত্থান পালরাজাদের মধ্য হতেই ঘটেছিল। কম্বোজদের ক্ষমতা দখলেই প্রমাণ করে পাল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার কথা।

কম্বোজ রাজবংশ

লুসাই পর্বতের নিকটবর্তী বঙ্গ ও ব্রহ্মদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কম্বোজ জাতির কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার তিব্বতীয়েরা কোনো কোনো গ্রন্থে কম্বোজ নামে অভিহিত হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন কোচ জাতিই প্রাচীন কম্বোজ জাতির বংশধর। কম্বোজরা যে বাইরে থেকে এসে পাল বংশে আধিপত্য বিরাজ করেনি তা প্রমানিত। ধারণা করা হয় কিছু কম্বোজ বংশের লোক পাল বংশের রাজকার্যে নিয়োজিত ছিল। যখন পালবংশ দুর্বল হতে শুরু করে ঠিক তখনই কম্বোজরা ক্ষমতা দখল করেন। দুইটি লিপি থেকে উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় কম্বোজদের রাজত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। দশম শতাব্দীর প্রথম দিক থেকেই তাদের এই উত্থানের শুরু এবং শতাব্দীর মাঝমাঝি সময় পর্যন্ত তাদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনজন রাজার নাম ছাড়া কম্বোজ রাজবংশের অন্যকারো শাসন সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

পুনরায় পাল বংশের উত্থান

দশম শতাব্দীতে পাল সাম্রাজ্য যখন ধংসের দিকে তখনি আবির্ভাব ঘটে দ্বিতীয় বিগ্রহ পালের পুত্র প্রথম মহীপালের। প্রথম মহীপাল পিতার মতো অযোগ্য শাসনকর্তা ছিলেন না। তিনি ধর্মপাল, দেবপালের মতো দ্বিগবিজয়ী ছিলেন। সিংহাসন আরোহন করার পর তিনি পূর্বপুরুষের হারানো যাওয়া রাজত্ব পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন।

প্রথম মহীপালের ৫ম রাজ্যাঙ্কের বেলওয়া তাম্রশাসন ও ৯ম রাজ্যাঙ্কের বানগড় তাম্রশাসনে পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধারের কথা উল্লেখ আছে।

তাম্রশাসনটিতে বলা হয়েছে, "মহীপাল রণক্ষেত্রে বাহুদর্প প্রকাশে সকল বিপক্ষ পক্ষ নিহত করে অনধিকারী কতৃক বিলুপ্ত পিতৃরাজ্যের উদ্ধার সাধন করে রাজাগণের মস্তকে চরণপদ্ম সংস্থাপিত করে অবনীপাল হয়েছিলেন।"

সেই সময়ে কম্বোজরা উত্তর পশ্চিমের আধিপত্যে ছিলেন। সেই সময় প্রথম মহীপাল কম্বোজদের যুদ্ধে পরাজিত করে পিতৃরাজ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হন। প্রথম মহীপালের বড় কৃতিত্ব তিনি পাল সাম্রাজ্যকে আসন্ন বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সেই সাথে ভারতের প্রবল দুই শক্তি চোল ও কলচুরিগণের হাত থেকে তিনি বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বোভৌমত্ব রক্ষা করেছিল।

ইতিহাস সাক্ষী কোনো রাজ্যের উত্থানের পর কোনো না কোনো মাধ্যমে পতন ঘটেছিল৷ পালদের দীর্ঘ ৪০০ বছরের ক্ষমতার মধ্যে সাময়িক পতনের দিকে পাল সাম্রাজ্য ঝুঁকে গিয়েছিল। প্রথম মহীপালের কর্তৃক সেই যাত্রায় পাল বংশ পুনরায় উত্থান বা সাম্রাজ্যে ফেরত এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পালদের প্রায় ৫০ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের ফলে পুণরায় পতনের দিকে ধাবিত হয়৷ দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলার প্রায় ৪০০ বছর ধরে চলা পাল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।

মো. তাহমিদ হাসান, শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বুড়োর বিলে পদ্ম ফুলের রঙ-রূপ!



সোহেল মিয়া, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজবাড়ী
বুড়োর বিলে পদ্ম ফুলের রঙ-রূপ!

বুড়োর বিলে পদ্ম ফুলের রঙ-রূপ!

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রিয়াকে দেওয়ার জন্য কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার কেউ কথা রাখেনি কবিতায় বিশ্ব সংসার তন্নতন্ন করে মাত্র ১০৮টি নীল পদ্ম খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি যদি আপনার প্রিয় মানুষকে পদ্ম ফুল দিতে চান তাহলে ১০৮টি নয়, অগণিত পদ্ম ফুল দিতে পারবেন অনায়াসে তার হাতে।

আর এ জন্য আপনাকে আসতে হবে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির “বুড়োর বিলে”। এই বুড়োর বিল এখন সৌন্দর্য্যরে প্রতীক। প্রকৃতির এই অপরুপ সৌন্দর্য আগত সকল দর্শনার্থীকেই মুগ্ধ করছে। অপরুপ সৌন্দর্য এই বুড়োর বিলটি বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম মঠবাড়িয়াতে অবস্থিত।


বিস্তৃর্ণ মাঠ জুড়ে থৈ-থৈ করছে পানির জলধারা। উপড়ে নীল আকাশ নিচে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। বিলের চারিপাশে সবুজের সমাহার আর ফুটে থাকা অজস্র পদ্ম ফুল আকৃষ্ট করছে দর্শনার্থীদের। প্রতিদিন পদ্ম ফুল দেখার জন্য বুড়োর বিলে ভিড় করছে সৌন্দর্যপিপাসু হাজারো মানুষ। স্নিগ্ধতার রঙ আর পূব আকাশের অস্তিম সূর্য মিলে একাকার এখানকার প্রকৃতি।

বিশুদ্ধতম এই পদ্ম ফুল দেখতে প্রতিদিন শতশত দর্শনার্থীরা ভিড় করছে বিলটির চারপাশে। হতাশার কথা হলো দর্শনার্থীদের চরম নিষ্ঠুরতায় নষ্ট হতে বসেছে বিলটির সৌন্দর্য। বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করে যাওয়ার সময় নিষ্ঠুর ভাবে ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছে পদ্ম ফুল। ফলে সৌন্দর্য হারাতে বসেছে বিলের প্রকৃত সৌন্দর্য।


তবে বিলটির সৌন্দর্য রক্ষার্থে উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পদ্ম ফুল যাতে কেউ ছিড়তে না পারে সে জন্য বিলটি পাহাড়া দিচ্ছে গ্রাম পুলিশ।

স্থানীয়রা জানান, বিলটিতে বর্ষাকালে দেখা যায় গোলাপি আভা। এখানে প্রচুর পরিমাণে পদ্ম ফুল ফোটে। কিন্তু এই জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানায় হওয়ায় নির্দিষ্ট একটি সময়ে বিলটিতে চাষাবাদ শুরু করা হয়। ফলে পদ্ম ফুল আর থাকে না। আমরা দাবি জানাই- প্রশাসন এই বিলটি সংরক্ষণ করে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলুক। তাহলে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।


পদ্ম ফুল দেখতে আসা একাধিক দর্শনার্থী বার্তা২৪.কমকে বলেন, এই পদ্ম ফুল সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও পবিত্রতার প্রতীক। সনাতন ধর্মাম্বলীদের পূজার সময় এই ফুলের প্রয়োজন হয়। এই বিলটিতে যে পরিমাণ পদ্ম ফুল ফুটেছে তাতে প্রশাসনের উচিত বিলটি সংরক্ষণ করা।

বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আম্বিয়া সুলতানা বার্তা২৪.কমকে বলেন, বিলটির সৌন্দর্য যাতে কেউ নষ্ট করতে না পারে এবং আগত দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ওখানে গ্রাম পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় কিনা সেটা আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।

;

উপমহাদেশ ভাগাভাগির ৭৫ বছর



ড. মাহফুজ পারভেজ
উপমহাদেশ ভাগাভাগির ৭৫ বছর

উপমহাদেশ ভাগাভাগির ৭৫ বছর

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৪৭ সালের বাটোয়ারা শুধু সিরিল র‌্যাডক্লিফের তৈরি সীমারেখা নয়, ছিন্নমূল মানুষের মনেরও দ্বিধাদীর্ণ বিভাজন, দেশভাগ এবং ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা। মধ্য আগস্টে এতোগুলো রাজনৈতিক ঘটনার রক্তাক্ত ধারায় সংগঠিত হয়েছিল 'পার্টিশান', 'দেশভাগ' কিংবা 'বাটোয়ারা, যা দক্ষিণ এশিয়ার হাজার বছরের সভ্যতা ও মানববসতি তছনছ  করে এনেছিল এমন এক স্বাধীনতা, যাকে বিতর্কিত লেখক সালমান রুশদির ভাষায় বলা যায় 'মিডনাইট'স চিলড্রেন' বা 'মধ্যরাতের সন্তান'।

আক্ষরিক অর্থেই দেশভাগের পটভূমিতে মধ্যরাতের স্বাধীনতা প্রাপ্তিকালে সমগ্র উপমহাদেশ  জুড়ে এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। হিন্দুদের জন্য ভারত আর মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান- এমন ধারণা ও সিদ্ধান্ত রক্তারক্তির উপসংহারে বদলে দিয়েছিল ভূমি ও মানুষের ভাগ্য। গান্ধী তখন আশাহত। নেহেরু ও জিন্নাহ যথাক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পুরো শক্তিতে দেশভাগ ও বাটোয়ারায় মত্ত। কংগ্রেসের হাইকমান্ডের মধ্যে দুইজন মাত্র দেশভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। একজন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং অন্যজন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল গাফফার খান। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার আবেগে উন্মত্ত বৃহত্তর নেতৃত্বের কাছে তাঁদের মত ছিল সংখ্যালঘু।

তারপরের ঘটনা সবারই জানা। কয়েক কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেন। দাঙ্গা ও হানাহানিতে নিহত হতে হয়েছিল হাজার হাজার অসহায় মানুষকে। নারী ও শিশুকে। যে কোনো যুদ্ধ ও দাঙ্গায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরা। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময়েও প্রচুর নারীকে নির্যাতিত হতে হয়েছিল প্রতিপক্ষের হাতে। শত শত বছর একই সাথে বসবাস করা মানুষগুলো রাতারাতি কীভাবে হিংস্র দানবে রূপান্তরিত হয়েছিল তা দেখে শুধু শান্তিপ্রিয় উপমহাদেশবাসী নয়, সদ্য ভারতত্যাগী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরাও দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

ভাগাভাগি ও বাটোয়ারার সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছে পাঞ্জাব, বাংলাকে। কারণ এ দুইটি প্রদেশও বিভক্ত অর্থাৎ ভাগ হয়ে পড়েছিল দুই দেশে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে এপার থেকে ওপারে, ওপার থেকে এপারে পাড়ি জমাতে হয়েছে লাখ লাখ মানুষকে। এদের অনেকেই হয়ে পড়েছিলেন ঠিকানাহীন। এক কোটিরও বেশি  মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়েছিল। লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে গিয়েছিল। অনেকে রাতারাতি রাজা থেকে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল মানবতা। সে মৃত্যু, দেশত্যাগ, লাঞ্ছনা, অত্যাচার আর ভয়াবহ নির্যাতনের ক্ষত উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে এখনো শুকায়নি। সেই অসভ্যতা, বন্যতা চিরস্থায়ী ক্ষত রেখেই ক্ষান্ত হয়নি, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে প্রায়শই দূষিত ও রক্তাক্ত করছে পুরো উপমহাদেশে এবং উপমহাদেশের বিভাজিত দুই জনপদ, ভারত ও পাকিস্তানকে।

১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার ফলে সৃষ্ট চরম নির্মমতা, নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিলেন উপমহাদেশের মানবিক ও মুক্তমনা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা। এসব ঘটনা নিয়ে রচিত হয় অনেক কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। সে ভয়াবহ দাঙ্গার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন উর্দু সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য লেখক কৃষণ চন্দর, খাজা আহমদ আব্বাস, সাদত হাসান মান্টো, রাজেন্দ্র সিং বেদী, আহমদ নাদিম কাসমী, ইসমত চুগতাই, রায়নাল কুদরউল্লাহ, অমৃতা প্রীতম প্রমুখ। বাংলা ভাষার পাঠকরা এই লেখকদের অধিকাংশের লেখার সঙ্গে পরিচিত।

১৯৪৭ সালের নির্মম,  নিষ্ঠুর পরিস্থিতি নিয়ে ভারতে কয়েকটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এরমধ্যে সম্প্রতি নির্মিত 'পার্টিশান ১৯৪৭' একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। ১৯৪৯ সালে মুম্বাইয়ে পরিচালক এম এন আনন্দ তৈরি করেন 'লাহোর' ছবিটি। এরপর বিজয় রায়ের পরিচালনায় মুক্তি পায় 'ক্যায়া দিল্লি ক্যায়া লাহোর'। এরপর সলিল সেনের 'নতুন ইহুদি' (১৯৫৩)  শান্তিপ্রিয় চট্টোপাধ্যায়ের 'রিফিউজি' (১৯৫৪)।  ঋত্বিক ঘটকই এই বিষয়টাকে তার তিন-তিনটি ছবিতে অত্যন্ত শিল্পসম্মত ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। ছবি তিনটি, 'কোমল গান্ধার', 'মেঘে ঢাকা তারা' এবং 'সুবর্ণরেখা'। 

ঋত্বিকের পরে বেশ কিছু ছবি তৈরি হয়েছে দেশভাগকে কেন্দ্র করে। 'বিপাশা', 'আলো আমার আলো' ইত্যাদি ছবিতে দেশভাগ প্রসঙ্গ এসেছে। রাজেন তরফদার তার 'পালঙ্ক' ছবিতে দেশভাগের প্রসঙ্গটিকে চমৎকারভাবে নিয়ে আসেন।

তবে ইদানিংকালে নতুন করে দেশভাগকে কেন্দ্র করে ছবি তৈরির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গৌতম ঘোষের 'শঙ্খচিল', বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কাঁটাতার', বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের 'তাহাদের কথা', সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'রাজকাহিনি' কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'বিসর্জন',  'বিজয়া' দেশভাগের ছবি।

১৯৪৭ সালের সেই অন্ধকার অধ্যায় ৭৫ বছর পেরিয়ে এলেও কিছুকাল আগে পর্যন্তও তথ্যনিষ্ঠ, লেখ্যাগার-নির্ভর/ আর্কাইভনির্ভর, তথাকথিত উচ্চমার্গীয় ইতিহাস দেশভাগজনিত ব্যথা, বেদনাবোধ এবং সর্বোপরি মানসিকতার ইতিহাস রচনার কলাকৌশল ঠিক আয়ত্ত করতে সমর্থ ছিল না। সুখের কথা, মহাফেজখানার দলিল-দস্তাবেজের বাইরে অন্য ধরনের তথ্যসূত্রের সাহায্যে এই মানবিক ট্র্যাজেডিকে ধরার প্রয়াসও শুরু হয়েছে ক্রমশ।

গবেষণার ধারায় ভাগাভাগি বা দেশভাগের গল্প বলতে গিয়ে কান্তি পাকড়াশির দ্য আপরুটেড (১৯৭১) উদ্বাস্তু মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়। ভারত ও পাকিস্তানে দুই পাঞ্জাবের উদ্বাস্তু মহিলাদের অভিজ্ঞতাকে উলটেপালটে দেখে সেই প্রয়াসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন উর্বশী বুটালিয়া, রিতু মেনন, কমলা ভাসিনরা, আর প্রায় একই সময়ে জ্ঞানেন্দ্র পান্ডেও তার লেখায় বলেন যে, "দেশভাগের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন এমন মানুষদের দৃষ্টিকোণ থেকেই খুঁজে পেতে হবে দেশভাগের অন্যতর মানবিক ইতিহাস।"

মৌলিক গবেষণার বাইরে স্মৃতিকথাকে ভিত্তি করে উদ্বাস্তুদের ইতিহাস লিখলেন নীলাঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, যশোধরা বাগচি, শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রফুল্ল চক্রবর্তী, দীপেশ চক্রবর্তী প্রমুখ। জয়া চ্যাটার্জি রচনা করেছেন দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার রাজনৈতিক ইতিবৃত্ত।

এভাবেই তৈরি হওয়া দেশভাগের বিভিন্ন প্রান্ত ও পর্বের ইতিহাসচর্চার সঙ্গে স্মৃতিকথনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রের ধারায় আনাম জাকারিয়া নামের এক তরুণী হারপার-কলিন্স থেকে প্রকাশ করেছেন একটি গবেষণাগ্রন্থ, যার নাম দ্য ফুটপ্রিন্ট অব পার্টিশান, যাতে ১৯৪৭ সালের পর চার প্রজন্মের স্মৃতি-সত্তা-অভিজ্ঞতায় বিভাজনের নানা দাগ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আন্তরিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

১৯৪৭ সালে বাটোয়ারা ও ভাগাভাগিতে প্রাপ্ত ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্তি অবশ্যই সেসব দেশে উদ্‌যাপন করার মুহূর্ত, কিন্তু একই সঙ্গে দু’দণ্ড থমকে দাঁড়িয়ে এটাও ভাবা প্রয়োজন যে, এতটা পথ পেরিয়ে আসতে গিয়ে কোন কাজগুলো ঠিক, আর কোনগুলো ভুল হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজ উপমহাদেশ একটা পথসন্ধিতে দাঁড়িয়ে— রাজনীতির মেরুকরণ সম্পূর্ণ, সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত।  সমাজে তার ছাপ প্রকট, অর্থব্যবস্থা গতি হারিয়েছে এবং একই সঙ্গে চড়া বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি চলছে।

উপমহাদেশের এই সর্বব্যাপী অস্থিরতা কি নতুন উচ্চতায় পৌঁছনোর জন্য যাত্রা শুরু করার প্রাক্‌মুহূর্ত, না কি এ এক পতনের সূচনালগ্ন? পঁচাত্তর বছরের অভিজ্ঞতার প্রান্তে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো নিয়ে স্ব স্ব দেশের নেতৃত্ব ও নীতিপ্রণেতারা  নিশ্চয় ভাববেন। স্বীয় ইতিহাস বিশ্লেষণ করে অতীতের সূত্র ধরে বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলোকেও বোঝার চেষ্টা করবেন। তাতে ভবিষ্যতের পথটি আবার কালো, রক্তাক্ত, বিভাজিত অন্ধ-গহ্বরের বদলে আলোর দিশা পেতে পারবে।

যখন নেতৃত্বের লালসা, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ক্ষমতার মোহ, ধর্মীয় মেরুকরণ, সাম্প্রাদায়িকতার রণহুংকার উপমহাদেশের উদার, বহুমাত্রিক, ধর্ম ও সমাজের মানবিক যাত্রাকে গতিরোধ করে দাঁড়াচ্ছে; বাক্‌স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে; সংখ্যালঘু-দলিত-ভিন্নমত প্রতিনিয়ত আক্রান্ত, কোণঠাসা ও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে; তখন গণতন্ত্র, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ সমুন্নত রাখা এবং জাত-পাত ও ধর্মীয় বিভাজন, জাতিভেদ প্রথা দূর করার আন্তরিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই অপরিহার্য। ১৯৪৭ সালের ভাগাভাগি, বাটোয়ারা ও সহিংস বিভাজনের প্রতিধ্বনি প্রগতি, মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের জন্য মোটেও সহায়ক ও কল্যাণকর হয় নি এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের কখনোই হতে পারে না, ৭৫ বছরের ইতিহাস এই সত্যেকেই সত্যায়িত করছে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম। 

;

নিউইয়র্কের দিনলিপি-৩



আমান-উদ-দৌলা
নিউইয়র্কের দিনলিপি-৩

নিউইয়র্কের দিনলিপি-৩

  • Font increase
  • Font Decrease

১. 'সাটেনিক ভার্সেস' গ্রন্থের প্রখ্যাত লেখক সালমান রুশদীকে (৭৫) গত শুক্রবার নিউইয়র্ক রাজ্যের বাফেলোতে এক সভায় বক্তৃতা করার সময় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তার একটি চোখ, হাত ও পেটে কিডনী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।

তাকে আঘাতকারী নিউজার্সির অধিবাসী হাদি মাতারকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্ত চলছে।

ঘটনার পর পরই হেলিকপটারে করে নিয়ে যাওয়া হয় পেনসিলভেনিয়ার একটি হাসপাতালে। তিনি শনিবার দুপুর পর্যন্ত অজ্ঞান অবস্থায় ভেন্টিলেশনে আছেন। তার অবস্থা খুব ভাল নয় বলে জানা গেছে।

এদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়ার সরকার প্রধানসহ অনেকেই এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে ও তার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

২. ১৩ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আগাম প্রাইমারী ইলেকশন নিউইয়র্ক স্টেটে। আগামী ২৩ আগস্ট ভোটের দিন। এর ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন আগামী ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। সমগ্র নিউইয়র্ক রাজ্য প্রায় বাংলাদেশের সমান। ৫৪ হাজার ৫৫৫ বর্গমাইল। এর মধ্যেই নিউইয়র্ক সিটি অবস্থিত।

বর্তমান ডেমোক্রেট গভর্নর ক্যাথী হকুলের সংগে রিপাবলিকান প্রার্থী এন্ড্রু জুলিয়ানীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। উল্লেখ্য এন্ড্রুর বাবা রুডি জুলিয়ানী একসময় নিউইয়র্ক সিটির মেয়র ছিলেন। পরে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন।

৩. কংগ্রেসের সিনেটে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হলো। ডেমোক্রেট সিনেটরদের ৫১ ভোটে পাশ হলো। ইকনোমিক বিল এর নাম। এতে জলবায়ু সমস্যার কার্বন অপসারনের ৪০ ভাগ সমাধান, সব পেট্রল চালিত গাড়ি ইলেক্ট্রিক গাড়িতে রুপান্তর, প্রত্যেক বাড়িতে সোলার প্য্যনেল দিয়ে গ্যাস-বিদ্যুত- পানির বিকল্প ব্যবস্থা। বড় লোকেরা ১৫ পার্সেন্ট ট্যাক্স দেয়ার ব্যবস্থা। আরও অনেক ব্যবস্থা চালু হবে। সব মিলে প্রায় ৩৬৯ বিলিয়ন ডলারের বিল পাশ হলো সোমবার ভোরে। সারারাত লবিং করে ভোরে ভোট করে পাশ করেছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইতিমধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাশ হওয়া এই বিলে সই করে আইনে পরিনত করেছেন।

৪. অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাত্রী হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে। এতো যাত্রী যে তার জন্য যত ফ্লাইট চালু করতে হবে। তার জন্য প্লেন নাই। প্লেন আছে তো পাইলট নাই এবং স্টুয়ার্ড নাই। পেন্ডামিকে সব কলেজ-ইউনিভার্সিটি বন্ধ ছিল। পাইলট ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে লোক আসেনি। স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। এখন এই সামারে যখন অনেকে প্লেনে বেড়াতে যেতে চাইছে। তখনই অজস্র ফ্লাইট বাতিলের খবর আসছে।

৫. শুধু কি ফ্লাইটে পাইলট সংকট? অনেক স্কুল ও কলেজে মাস্টার নাই। সবাই নতুন শিক্ষক হায়ার করতে চাচ্ছে। কিন্তু যত চাহিদা তত নেই। সর্বত্র এই ক্রাইসিস। ঠিক হতে কয়েক বছর লাগবে।

৬. ১৫ আগস্ট শোক দিবসে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশি অরাজনৈতিক সংগঠন জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসী। তারা ৫ হাজার লোকের মধ্যে তবারক বিতরণ করবে। এতে থাকবে সাদা ভাত, গরুর মাংসের তরকারি, পানি ও ড্রিংস। নিউইয়র্কের যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগও কর্মসূচি নিয়েছে। একটি পার্টি হলে দিনটি পালন করবে। এছাড়া বাংলাদেশ দূতাবাস ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্কের কন্সুলেট অফিস ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনেও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যার শোক দিবস পালন করবে।

৭. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্কে আসছেন। জাতিসংঘের ৭৭তম অধিবেশনে তিনি ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলায় ভাষণ দেবেন। তার আগে সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখে নিউইয়র্ক পৌঁছাবেন। সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের একটি সূত্র প্রধানমন্ত্রীর এ সফর কনফার্ম করেছেন।

৮. সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের ফ্লোরিডায় রাষ্ট্রের দেয়া বাড়ি অবস্থিত। মার-এ-লাগো নামের এই বাড়ি থেকে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই তল্লাশি চালিয়ে ১৫ বাক্স কাগজপত্র নিয়ে এসেছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় হোয়াইট হাউজের এই জিনিসপত্র আর্কাইভে রাখার নিয়ম। যদি তা প্রমাণ হয় তাহলে আগামি নির্বাচনে তিনি দাড়াতে পারবেন না। ট্রাম্প এক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এটা 'অসদাচরণ' তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঠেকাতে 'বিচার ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে'।

৯. ৪৯ জন কংগ্রেসমেন বিল উত্থাপন করেছে। এতে বাংলাদেশি সহ ৮০ লাখ কাগজপত্রহীন গ্রীনকার্ড পেতে যাচ্ছে। 'দ্য রিনিউইং ইমিগ্রেশন প্রভিশন অফ দ্য ইমিগ্রেশন এক্ট অফ ১৯২৯' নামের বিলটি পাশ হলে তারা গ্রীনকার্ড পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১৯২৯ সালের ৯৩ বছর পর ১৯৭০ সালে এবং ১৯৮৬ সালে লাখ লাখ লোককে গ্রীনকার্ড দেয়া হয়। বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলে এরপর কিছু কিছু করে দেয়া হলেও এবার ৮০ লাখ লোককে আবারও গ্রীন কার্ড দেয়ার প্রচেষ্টা চলছে। যারা কোনো অপরাধে দণ্ডিত হন নি। বিভিন্ন কাজে নিরলস কাজ করে আসছেন। তারাই পাবেন গ্রীনকার্ড।

(bbc, nytimes, cnn, ws,j apnews এইসব সহ প্রধান প্রধান অনলাইন পত্রিকা ও নিউজ এজেন্সি থেকে গত ৭ দিনের রিপোর্ট দেখে, তা সংক্ষিপ্ত আকারে 'নিউইয়র্কের দিনলিপি'তে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য পরিবেশন করা হচ্ছে।)

* আমান-উদ-দৌলা, সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক সম্পাদক-বাংলা বিভাগ, রেডিও ফ্রি এশিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি ( ২০১৪-১৬)। সাবেক কূটনৈতিক রিপোর্টার-দৈনিক জনকন্ঠ ( ১৯৯৪-২০০০) One of the founders and First GS of DCAB in 1998. ( Dilpomatic Correspondent Association, Bangladesh)

;

ভ্রমণক্লান্ত পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী শকুন



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, সিলেট
পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী। ছবি: সীমান্ত দীপু

পরিযায়ী হিমালয়ী গৃধিনী। ছবি: সীমান্ত দীপু

  • Font increase
  • Font Decrease

একপ্রাপ্ত থেকে আরেক প্রান্তে দীর্ঘ পরিযানের পথ। এর ফলেই অনেক শকুন অসুস্থ হয়ে হারায় উড়ার শক্তি। মাটিতে পড়া এই বিশাল আকৃতির পাখিটাকে দেখে ভয় পেয়ে যায় অনেকেই। ঠিক তখনই ভয়ে ভীত মানুষেরা বা অতি উৎসাহী এলাকাবাসীর আঘাতে এসব শকুনদের অসুস্থ হওয়াসহ প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটে ব্যাপক।

পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো থেকে নিরাপত্তা ও খাদ্যের লোভে যেসব পরিযায়ী পাখিরা পরিযান করে থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম ‘হিমালয়ী গৃধিনী’ (Himalayan Griffon Vulture)। প্রতি বছর শীতকালে এই শকুনগুলো মাইগ্রেট বা পরিযায়ন করে বাংলাদেশের সমতল ভূমিগুলোতে চলে আসে।

কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তিতে তারা আমাদের দেশে এসে অনেক সময় উড়তে পাড়ে না। মাটিতে পড়ে যায়। তখন গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা অনেক সময় অতি উৎসুক হয়ে অথবা ভয়ে সেই হিমালয় গৃধিনী শকুনদের মেরে ফেলে।

শকুন গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দীপু বলেন, আমরা কয়েক বছর আগে সিলেট অঞ্চলেও পেয়েছিলাম এমন অসুস্থ হিমালয়ী গৃধিনী শকুনদের। আমরা এগারোটা অসুস্থ শকুনদের সুস্থ করে প্রকৃতিতে ছেড়েছি। আমাদের ক্যাপভিট সেন্টারে গড়ে বিশ থেকে ত্রিশটা শকুন খাওয়াই-দাওয়াই, ট্রিটমেন্ট দিই, পরিচর্যা করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেই।

প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে আহত শকুনটিকে। ছবি: সীমান্ত দীপু

তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে আমরা প্রায় শতাধিক শুকুন সুস্থ করে ছেড়েছি। আগে যখন আমরা হিমালয়ী গৃধিনী শকুনদের নিয়ে কাজ করতাম না তখন কি পরিমাণ শকুন মারা পড়তো। প্রতি বছর শীত মৌসুমে গড়ে প্রায় ৫০টা শকুন বাংলাদেশের মাটিতে পড়ে।

তাদের খাবারের অভাব সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, এরা সুদূর হিমালয়ের এরিয়া থেকে আসে। এরা অনেক অনেক দূর জার্নি করে এসে খাবার পায় না। খাবারের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ইংরেজিতে একে বলে ‘সর্টেজ অফ ফুড’ অর্থাৎ খাদ্যের সংকট। অনেক দূর জার্নি করার ফলে তাদের খাবারের প্রয়োজন পড়ে; এই জিনিসটা সঙ্গে সঙ্গে ওরা পায় না। তখন খুব দুর্বল হয়ে যায় এবং উড়তে পারে না। গ্রামের উৎসুক মানুষ এমন অবস্থায় শকুনদের বেঁধে রাখে, আহত করে বা পিটিয়ে মেরে ফেলে। কারো কারো পালক ওঠে যায়, কারো কারো পাখা ভাঙে, কারো কারো আবার পা ভাঙে। তখন আমারা এসব অসুস্থ শকুনদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি।

শকুন গবেষণা প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, হিমালয়ী গৃধিনী পরিচর্যার জন্য দিনাজপুরের সিংড়াতে একটি রেসকিউ সেন্টার তৈরি করেছে বনবিভাগ ও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।

এ জাতের পাখি দেশের যেকোন জায়গায় আটকা পড়লে দ্রুত স্থানীয় বন বিভাগ বা আইইউসিএন দলকে জানান। এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করছি এবং সবার সহযোগিতায় পেলে এবছরও হিমালয়ী গৃধিনী শকুনগুলোকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান শকুন গবেষণা প্রকল্পের মুখ্য গবেষক সীমান্ত দীপু।

;