২০২১ সালে সেরা দশ আবিষ্কার

  সালতামামি



দেবদুলাল মুন্না
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ‘ডিপ মাইন্ড

২০৩০ সালের মধ্যে ২ কোটি চাকরি চলে যাবে রোবটের দখলে। শুধু  চীনেই রোবটকর্মীর সংখ্যা হবে প্রায় দেড় কোটি। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস এর একটি গবেষকদল এ তথ্য জানান ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। আমাদের দেশের  কিশোর-তরুণ রোবট গবেষকেরা ও পিছিয়ে নেই।

এ ডিসেম্বরই আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে ৪টি স্বর্ণসহ মোট ১৫টি পদক জিতেছে দেশের স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি দল।হয়তো চুড়ান্ত ফলাফল আরও পরে আসবে কিন্তু কাজ শুরু হয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মানুষের জন্য যেমন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, তেমনি হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর হুমকি। মানুষ হারাতে পারে চাকরি।   গুগলের সাবেক চেয়ারম্যান এরিক স্মিড ও এমনটি মনে করেন। গুগলের মূল প্রতিষ্ঠানের নাম এখন অ্যালফাবেট। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানটি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উন্নত গবেষণা করে বলেছে এবছর বলেছে ২০২২ সাল থেকেই শুরু করবে মহড়া ভিত্তিক কাজ।

গুগলের ডিপ মাইন্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রকল্পকে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্ত্বা নিয়ে যদিও আরও আগে থেকেই কাজ হচ্ছে তবে সাফল্যের ৭০ ভাগ কাজ হয়েছে চলতি বছর। ‘ডিপ মাইন্ড’ এর কাজ হচ্ছে শুধু রোবোটিক কাজই করা না, অন্য কে কি ভাবছে সেটিও শনাক্ত করা। মানে মনকে পড়ে ফেলা।

যুক্তরাষ্ট্রের এনভিডিয়া তৈরি করছে উন্নত চিপসেট। দ্রুত বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাজার। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউবিএস জানাচ্ছে, রোবট ২০৫০ সালের মধ্যে সমস্ত মানবিক কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম হবে। তবে ডিপফেক নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ছে। ডিপফেক হচ্ছে, ছবি বা ভিডিওকে বিকৃত ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নিখুঁতভাবে তৈরি করে হুবহু আসলের মতো বলে প্রচার করা হচ্ছে।  এতে যে কোনো প্রভাবশালী মহল অন্য মহলকে বা ব্যাক্তিকে বিপদে ফেলতে পারবে। সত্য ও মিথ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

বর্তমানে ড্রোনের মতো আধা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার অনেক রাষ্ট্রেরই মাথাব্যথার কারণ।

মহাকাশে হচ্ছে পর্যটনস্থল

জেফ বেজোস ও রিচার্ড ব্র্যানসন এরিমেধ্য মহাকাশ ঘুরে এসেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো পর্যটক হিসেবে মহাকাশের প্রান্ত ঘুরে এসে ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন বলেন, শিগগিরই নিয়মিত মহাকাশ ভ্রমনের ব্যবস্থা করা হবে। এ কাজটি করবে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ভার্জিন গ্রুপের গ্যালাকটিকের নভোযান।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ভার্জিন গ্যালাকটিকের কাছে যাত্রী হিসেবে ৬০০ ব্যক্তি অগ্রিম টিকিটের ফরমাশ দিয়ে রেখেছেন। এক ঘণ্টার এই অভিজ্ঞতা নিতে খরচ হবে আড়াই লাখ মার্কিন ডলার বা ২ কোটি ১১ লাখ টাকার বেশি। এ যাত্রায় পাঁচ মিনিটের মতো ওজনহীনতার অভিজ্ঞতা ও পৃথিবীর দিগন্ত দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে।২০২২ সাল থেকে আগ্রহী যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করবেন। নাসার এ তথ্যের বরাতে খবর প্রকাশ করেছে হাফিংটনপোস্ট। 

জেফ বেজোস ও মহাকাশ খ্রমণ শেষ করেছেন। তার প্রতিষ্ঠান আমাজনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডল ও মহাকাশের কাল্পনিক সীমা কারমান লাইন নামে যেটি পরিচিত সেখানে বেজোস গিয়েছিলেন।বেজোসের মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিন ও মহাকাশে যাত্রী আনা নেওয়ার কথা ভাবছে। 

মহাকাশ পর্যটন শুরু করতে তোড়জোড় করে বানানো হচ্ছে বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন। এতে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা।

নাসা এর জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতারও আয়োজন করছে। একটি আয়োজনের নাম, স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ। এ প্রতিযোগিতাতেও একাধিকবার অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। এ বছর ‘বেস্ট মিশন কনসেপ্ট’ ক্যাটাগরিতে এসেছে চ্যাম্পিয়নের স্বীকৃতি। ও হ্যাঁ, মে মাসেও এসেছিল সুখবর। মার্স সোসাইটি সাউথ এশিয়া আয়োজিত আইপিএএস চ্যালেঞ্জে উদ্ভাবনে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ‘টিম ইন্টারপ্ল্যানেটার’। ফলে বাংলাদেশও মহাকাশ নিয়ে পিছিয়ে নেই। সঙ্গে রয়েছে।

ফোনে আড়ি পাতার জন্য নতুন সফটওয়্যার

ফোনে আড়িপাতার প্রযুক্তি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ চলতি বছর বেশ কয়েকবার আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ নিয়ে বহুল আলোচিত আলজাজিরার একটি রিপোর্টেও ফোনে আড়ি পাতার প্রসঙ্গ এসেছে।

এনএসও গ্রুপের পেগাসাস সফটওয়্যার নিয়ে বিতর্ক কয়েক বছর ধরে চলছে। গত নভেম্বর নাগাদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। এনএসওকে কালো তালিকাভুক্ত করে মার্কিন সরকার। কারণ এটি যে কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থবিরোধী।

এরপরও থেমে নেই এনএসও গ্রুপ। গত ডিসেম্বরে আড়িপাতার প্রযুক্তি বিষয়ক আরেকটি সফটওয়ার বানানো হয়েছে। এনএসও গ্রুপ নিয়ে চলতি সপ্তাহে আরেকটি তথ্য সামনে আসে। ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, কানাডার টরন্টোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিটিজেনল্যাবের ফরেনসিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, খাসোগিকে হত্যার মাত্র এক মাস আগে তাঁর এক ঘনিষ্ঠজনের মুঠোফোন হ্যাক করা হয়েছিল। এরকম  নতুন সফটওয়্যার ‘ পিংকস’ দিয়ে যে কারো ফোন হ্যাক করা যাবে ও অডিও ভিডিও ডামি বানানো যাবে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে পেগাসাস সফটওয়্যার (স্পাইওয়্যারের) ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তায় উদ্ভূত হুমকি অনুসন্ধানে নিষ্ক্রিয়তা কেন সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সাকারা নেক্রোপলিসের মমি উদ্ধারে ‘ট্রিমো ব্যবহার

মিশরীয় সভ্যতার অনেক নিদর্শনই এখনো চাপা পড়ে আছে মরুভূমির বালির নিচে। ২০২০ সালে  প্রত্নতাত্ত্বিকরা কায়রোর দক্ষিণে সাকারা যেটি মূলত একটি নেক্রোপলিস যেখানে যান ও গবেষণা শুরু করেন। সেসময়  ১০০টি প্রাচীন কফিন উদ্ধার করেছেন মিশরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকর্তারা। কফিনগুলোর কয়েকটির মধ্যে সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় কিছু মমিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া, ৪০টি সোনার ভাস্কর্য-মূর্তি এবং প্রতিমা আবিষ্কৃত হয়েছে। কাঠের কফিন এবং অন্যান্য জিনিসপত্র সমাহিত করা হয়েছিল টলেমাইক পিরিয়ডে, যা ৬৬৪ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪ শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ২০২১  সালে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ‘ট্রিমো’ নামের একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে নতুন মমি উদ্ধার করেছেন ১২১টি। ট্রিমো যন্ত্রটি তৈরি করেছেন জোসেফ গল। ট্রিমো মাটিতে স্পর্শ করলেই বোঝা যায় মাটির নিচে মমি রয়েছে কি না।

টাইমমেশিনে মহাবিশ্বের প্রাণের মুহূর্ত দেখা

এটি দেখা যাবে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে। এই টাইম মেশিনে আমাদের মহাবিশ্বের প্রাণের মুহূর্তটি দেখতে পাওয়া যাবে। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ হল কিংবদন্তি হাবল স্পেস টেলিস্কোপের উত্তরসূরি।

এই টেলিস্কোপের পরিচালক যখন উৎক্ষেপণের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করেছিলেন, তখন সারা বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাকিয়ে ছিলেন আরিয়ান-৫ রকেটের যাত্রার দিকে।মহাকাশে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ নিক্ষেপ করতে রকেট উৎক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকাশে একটি টেলিস্কোপ পাঠানোর ২৫ বছরের দীর্ঘ স্বপ্নপূরণ হল, যা আমাদের প্রাণের উৎসের উত্তর খুঁজে এনে দিতে পারে।

ইউরোপের ফ্রেঞ্চ গায়ানা স্পেসপোর্ট থেকে শক্তিশালী আরিয়ান-৫ রকেটে তার নিজ গ্রহ থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে একটি গন্তব্যে যাত্রা করা হয়েছিল। সূর্য থেকে দূরে পৃথিবীর অন্ধকার দিকে মুখ করে টেলিস্কোপটি মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করবে।

গত ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের দিনে উৎক্ষেপণ হয় আরিয়ান রকেটে করে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের। উচ্চ বাতাসের কারণে লিফট-অফ এক দিন আগে স্থগিত রাখা হয়েছিল। যাইহোক একদিন পরে হলেও আরিয়ান টেলিস্কোপটিকে দ্বিতীয় ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্টে যাওয়ার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যেখানে এটি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পৌঁছবে। টেলিস্কোপটি মহাবিশ্বের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায় অধ্যয়ন করবে- বিগ ব্যাং-এর পরে প্রথম আলোকিত দীপ্তি থেকে শুরু করে পৃথিবীর মতো গ্রহগুলিতে প্রাণের মুহূর্ত দর্শন, সৌরজগতের গঠন, মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহসমূহ।

ভারতে মাটির মধ্যে চিত্রকর্ম

একটি বিশাল জিওগ্লিফ, সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম, ভারতের থর মরুভূমিতে পাওয়া গেছে, যা পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্তের কাছে প্রায় ৫১ একর এলাকা জুড়ে রয়েছে। জিওগ্লিফ হচ্ছে মাটির মধ্যে  বেশ কয়েকটি সর্পিল এবং একটি স্নেকিং লাইন নিয়ে গঠিত যা সামনে পিছনে যায়। এরকম জিওগ্লিফ এর আগে পেরু ও মঙ্গোলিয়ায় আবিস্কৃত হয়েছিল। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই জিওগ্লিফের সন্ধান চলতিবছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বিশ্ব প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থা (ডবিলউএএ) কে জানালে সংস্থাটি ডিসেম্বরে এটির চুড়ান্ত অনুমোদন দেয়।

জিওগ্লিফের লাইন ধরে একটি হাইক ৩০ মাইল ভ্রমণের জন্য তৈরি করবে। জিওগ্লিফটি প্রায় ১৫০ বছর আগের অনুমান করা হয়, তবে এর উদ্দেশ্য অস্পষ্ট। জিওগ্লিফটি মাটি থেকে দেখা কঠিন, এবং এটি প্রথম গবেষকদেরএকটি দল যারা সনাক্ত করা করেছিল তারা গুগল আর্থ ব্যবহার করে ল্যান্ডস্কেপ বিশ্লেষণ করছিলেন।

হারানো সোনার শহর

প্রত্নতাত্ত্বিকরা মিশরের লুক্সর (প্রাচীন থিবস) কাছে একটি হারানো সোনার শহর আবিষ্কার করেছেন। শহরটি "দ্য রাইজ অফ আটেন" নামে পরিচিত ছিল এবং ফারাও আমেনহোটেপ তৃতীয় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যিনি ১৩৯১ এবং ১৩৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে শাসন করেছিলেন। শহরটিতে রয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, প্রশাসনিক ভবন, একটি বড় বেকারি, মাটির ইট তৈরির ক্ষেত্র এবং বেশ কিছু কবরস্থান। ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় যে আমেনহোটেপ III-এর শহরে তিনটি রাজকীয় প্রাসাদ ছিল ও বেশির ভাগ এলাকার মাটির নিচেই সোনা রয়েছে।  এখন শহরটিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ চলছে।

ঐতিহাসিক নথি থেকে শহরের অস্তিত্ব জানা ছিল কিন্তু এ বছরের আগে পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। এর আগে অনেক বিদেশী দল এ হারানো শহরটির সন্ধান করলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানান দেশটির প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জাহি হাওয়াস।

নতুনরূপে সামুদ্রিক দানব

চলতিবছর নেভাদায় ৫৫ ফুট লম্বা ট্রায়াসিক সামুদ্রিক দানব আবিষ্কৃত হয়েছে।

প্রারম্ভিক ডাইনোসর যুগে বসবাসকারী একটি সামুদ্রিক দানব এতটাই অপ্রত্যাশিতভাবে বিশাল, এটি প্রকাশ করে যে এটির ধরণটি খুব দ্রুত বিশাল আকারে বেড়েছে, অন্তত বিবর্তনীয়ভাবে বলতে গেলে। আবিষ্কারটি পরামর্শ দেয় যে এই ধরনের ichthyosours - মাছের আকৃতির সামুদ্রিক সরীসৃপদের একটি দল যা ডাইনোসর-যুগের সমুদ্রে বাস করে- মাত্র ২.৫ মিলিয়ন বছরের ব্যবধানে বিশাল আকারে বেড়েছে, নতুন গবেষণায় দেখা গেছে। এই প্রসঙ্গে বলতে গেলে, তিমিদের তাদের ৫৫ মিলিয়ন বছরের ইতিহাসের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ সময় লেগেছে বিশাল আকারে পৌঁছতে যা ইচথিওসররা তাদের ১৫০ মিলিয়ন বছরের ইতিহাসের প্রথম শতকরা ১ ভাগ  বিবর্তিত হয়েছিল। গবেষকরা বলছেন, "আমরা আবিষ্কার করেছি যে ichthyosours তিমিদের তুলনায় অনেক দ্রুত বিকশিত হয়েছে, এমন এক সময়ে যেখানে পৃথিবী ধ্বংসাত্মক বিলুপ্তি থেকে পুনরুদ্ধার করছিল পারমিয়ান যুগের শেষের দিকে। "  সিনিয়র গবেষক লার্স স্মিটজ, স্ক্রিপস কলেজের জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক। ক্লারমন্ট, ক্যালিফোর্নিয়া, একটি ইমেলে লাইভ সায়েন্সকে জানান, "এটি আশার একটি সুন্দর ঝলক এবং জীবনের স্থিতিস্থাপকতার একটি চিহ্ন - যদি পরিবেশগত পরিস্থিতি সঠিক হয়, তবে বিবর্তন খুব দ্রুত ঘটতে পারে এবং জীবন ফিরে আসতে পারে।"  গবেষকরা প্রথম ১৯৯৮ সালে প্রাচীন ইচথায়োসরের জীবাশ্মগুলি লক্ষ্য করেছিলেন।

প্রথম 'কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলড' প্রাণী

টার্ডিগ্রেডস।এদের বলা হচ্ছে  কোয়ান্টাম প্রাণী। তারণ এ প্রাণী সব পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এ প্রাণীর আবিষ্কার করা হয়েছে চলতি বছরের নভেম্বরে। এদের "মস পিগলেট" বলা হচ্ছে।  আশ্চর্যজনকভাবে টেকসই প্রাণীগুলিকে বন্দুক থেকে গুলি করা হয়েছে, ফুটন্ত-গরম পানিতে অনেকক্ষণ রাখা হয়েছে, তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণের সংস্পর্শে এসেছে এবং এমনকি (দুর্ঘটনাক্রমে) চাঁদে অবতরণ করা হয়েছে, সবই তাদের চরিত্র বোঝার জন্য যে কোন অবস্থায় তারা কিরকম থাকে সেটির জন্যে। কিন্তু এই কোয়ান্টাম প্রাণীগুলি সবচেয়ে ঠান্ডা তাপমাত্রা এবং সর্বোচ্চ চাপে স্বাভাবিক আচরণ করেছে।

রোমুলাসের সমাধিতে দুইভাইকে দেখা গেল

৭৫৩ সালে, অর্থাৎ ৮ম শতকে রোমুলাসের হাতেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল রোম শহর।কিন্তু অভাবের তাড়নায় রোমুলাস এবং রেমুস- দুই ভাইকে শিশু অবস্থায় নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখন দুই শিশু একটি এক মায়া নেকড়ের কাছে বড়ো হয় বলে লোকপুরাণে চালু রয়েছে।কিন্তু বড়ো হবার পর কে হবে ওই অঞ্চলের রাজা কিংবা কতোটুকু হবে সীমানা এ নিয়ে বিতর্কে দুই ভাই জড়িয়ে পড়লে এক রাতে রোমুলাস হত্যা করেন নিজের ভাই রেমুসকে এবং নিজেকে রোমের সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। মূলত, রোমুলাস থেকেই রোম শব্দের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একদল প্রত্নতাত্ত্বিক ঘোষণা দেন, তারা রোমান ফোরামের সিনেট হাউজের নিচে কিংবদন্তি রোমুলাসের সমাধির সন্ধান পেয়েছেন। সিএনএন এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার, ওই সমাধিস্থলে এবার ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের আগের রাতে দুটি গাছ দেখতে পান কিউরেটর। গাছ দুটির বয়স দুইদিনের হলেও একটি গাছ উচ্চতায় একটু লম্বা অন্যটি একটু বেটে। শুধু তাই নয়, বড়ো গাছটির মগপাতায় রোমুলাসের মুখায়ব ভাসছে আর অন্যটিতে রেমুসের। এরপর অনেক বিশ্বাসীরা প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন। তবে গাছে রোমুলাস বা রেমুসের মুখায়বের কোনো অস্তিত্ব নেই বলেই জানিয়েছেসায়েন্স জার্নাল এসোসিয়শন। তবে গবেষকদলের প্রধান টিটল বোলস নেচার ম্যাগাজিনকে বলেন, তিনি শুনেছেন এবং সত্যই মনে হচ্ছে। কারণ তাদের জীবন বেশ রহস্যাবৃত, নাহলে মায়া নেকড়ের কাছে বড়ো হবে কেন আর আমরাই বা এতোবছর পর সমাধি খুঁজে পাবো কেন আর গাছ দুটিই  ‘শুভ বড়দিন’ এর আগে হঠাৎ জন্ম নিবে কেন?

  সালতামামি

রাতে উড়ন্ত পোকা ধরে ধরে খায় ল্যাঞ্জা রাতচরা



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ঝরাপাতার ওপর ঘুমায় ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’। ছবি: ইনাম আল হক

ঝরাপাতার ওপর ঘুমায় ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা’। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

নির্জন নিশাচর পাখি এসে সেই পথে বসে থাকে। তবে কলাহলতার কারণে সেদৃশ্যগুলো এখন অতীত। শহরতলীর নির্জনতাটুকুও মুছে গেছে সেই কবে। বনের নির্জনতাটুকু খুঁজে পাওয়া যায় না আর। নির্জনতায় বেঁচে থাকা পাখির নাম ল্যাঞ্জা-রাতচরা। তার অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।     

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ‘ল্যাঞ্জা-রাতচরা নিশাচর পাখি। বাংলাদেশে অন্য রাতচরা প্রজাতিগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বেশি আছে। পৃথিবীতে ৯৭ প্রজাতি এবং আমাদের দেশে দেশে ৬ প্রজাতির রাতচরা পাখি বিচরণ। এর ইংরেজি নাম Large-tailed Nightjar. তবে বর্তমানে এরা আমাদের দেশে খুবই খারাপ অবস্থায়। পাহাড়ি এলাকা, নির্জন বাঁশঝার, গ্রামের কবরস্থান প্রভৃতি এলাকায় সন্ধ্যায় গেলেই ওদের ডাক এখন আর শোনা যায় না।’

এর বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, ‘রাতচরা পাখিদের সবার একটি অদ্ভুত অভ্যাস হলো- এরা রাতে উড়ন্ত পোকা ধরে ধরে খায় এবং এরা দিনে মাটিতে থাকে। মাটিতেই ঘুমায়। গাছের ডালে না। মাটিতেই বসবে। মাটিতেই ডিম পাড়বে এবং মাটিতেই বাচ্চা তুলবে। পৃথিবীতে তো আগে এতো উৎপাত ছিল না। তখন থেকেই তাদের এ অভ্যাস হয়েছে যে, সারাদিন সে মাটিতে ঘুমায়। রাতে সে উড়ে উড়ে উড়ন্ত পোকা ধরে এবং গাছের ডালে বসে। নিজের খাবার জন্য রাতে উড়ে উড়ে ৪/৫টা উড়ন্ত পোকা ধরা তো সহজ কথা নয়। আর যদি ছানা হয় তবে তো আরো বেশি পোকা তাকে ধরতে হয়। ফলে সে সারারাত জেগে থাকে এবং দিনে তাকে ভালোভাবে ঘুমাতে হয়।


গায়ের রং এবং গন্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওর গায়ের রঙও কিন্তু ঝরাপাতার মতো। ঝরাপাতা পড়ে থাকলে যে রকম দেখায় সেরকম। ওর বেঁচে থাকার বড় উপায় হলো যে, ওর শরীরের রংটা ঝরাপাতার মতো এবং ওর শরীরে কোনো গন্ধ নেই। ডিমে ওর বাচ্চা শরীরে কারোই কোনো গন্ধ নেই। পাখির তুলনায় ওর চোখ অনেক বড়। ওই চোখটা বন্ধ করে দিনে সে ঘুমিয়ে থাকে। এদের পা এতো ছোট যে, ও ঠিকমতো মাটিতে বসতে পারে না।’

স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি বেশ কয়েকবার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ অন্যান্য স্থানে এই পাখিটাকে দেখেছি। কিন্তু গত ১০/১৫ বছরে এদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আগে সন্ধ্যার দিকে লাউয়াছড়া যাবার সময় এখন যেখানে গ্রেন্ড সুলতান নামক রিসোর্ট হয়েছে এর পাশের মোড়েই দেখতে পেতাম। সন্ধ্যার দিকে রাস্তায় এসে ওর বসে থাকতো। এছাড়াও লাউয়াছড়ার ভেতরে প্রবেশ করলেই ‘ট্রাক ট্রাক ট্রাক’ স্বরে ডাকতো।

‘এছাড়াও গ্রামেগঞ্জে আগে সব সময় বাঁশবন থেকে এই পাখির ডাক শুনতাম। এখন বহু গ্রামে গিয়ে আমরা একটি শব্দও শুনতে পাই না। এর একটি কারণ। আমরা সমস্ত পোকা মেরে ফেলেছি। ফলে এ পাখিটা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেল। আগামী ১০ বছরের মধ্যে হয়তো সারাদেশে ১টিও দেখতে পাবো না।’

অবস্থান সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, ‘ওর সংখ্যা অনেক কমে গেলেও সে হয়তো টিকে থাকবে আরো কিছুদিন। কারণ সে নিশাচর পাখি বলে মানুষের হাতে সরাসরি মারা পড়ছে না। তবে মানুষের কারণে ওর থাকার জায়গা এবং খাদ্য কমে যাচ্ছে। ওদের বিলুপ্তির অধগতিটা ধীরে হবে বলে আমরা আশা করি। তাই এই প্রজাতিটিকে বিপন্ন এর তালিকায় এখনো উঠেনি। তবে ওরা এখন বিরল প্রজাতি নিশাচর পাখি।’

‘ঝরাপাতার রঙে ডিম পাড়ে এরা। বাচ্চাগুলোও হয় ওই রঙের। ওরা যদি মাটিতে বসে থাকে তবে আপনি সহজে তাদের দেখতে পাবেন না। এভাবেই সে টিকে ছিল এতো কাল। এই সুন্দর পাখিটা বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সে যখন উড়ে উড়ে পোকা ধরে তখন ভীষণ ভালো লাগে। মনে হয় যেন একটা ঘুড়ি যে বাতাসে উড়ছে’ বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

  সালতামামি

;

ব্রাজিলের বিস্ময়



ভূ-পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল
ব্রাজিলের বিস্ময়

ব্রাজিলের বিস্ময়

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্রাজিলের নাম শোনেনি এমন লোক পৃথিবীতে খুব কমই পাওয়া যাবে। সেই কবে কোন ছেলেবেলায় পাঠ্যপুস্তকের কল্যাণে পেলের নাম শুনে বড় হয়েছি। পৃথিবীতে ব্রাজিলই একমাত্র দেশ যার সঙ্গে সবচেয়ে বেশী দেশের স্থল যোগাযোগ রয়েছে। চিলি ও ইকুয়েডর ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার সব দেশের সঙ্গে ব্রাজিলের বর্ডার রয়েছে। দেশগুলো হলো- আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, পেরু, কলম্বয়িা, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম, ফ্রেঞ্চ গায়ানা। ব্রাজিলের আয়তন ৮৪৫৬৫১০ বর্গ কি.মি., যা বাংলাদেশের চেয়ে ১৫২ গুণ বড়। পৃথিবীতে ৫ম বৃহত্তম। শুধু দেশ হিসাবে তারা বড়ই নয়, আরোও অনেক কিছু রয়েছে যার কৃতিত্ব শুধু ব্রাজিলের।

UNWTO এর আমন্ত্রণে সর্বপ্রথম দক্ষিণ আমেরিকার আজেন্টিনা, ব্রাজিল ও প্যারাগুয়েতে একটি কনফারেন্সে যোগদান করি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে। কনফারেন্স শেষে তিন মাসে ল্যাটিন আমেরিকার পাঁচটি দেশ আজেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া ও চিলি ঘুরে আসি। পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকবার দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। ভবিষৎতে আবারো সুযোগ পেলে ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার বাকী দেশগুলো ঘুরে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।


বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত রয়েছে ব্রাজিলে। নাম ক্যাসিনো বিচ যা ব্রাজিলের Rio Grand do Sul- এ অবস্থিত। এটি ২১২ কি.মি থেকে ২৫৪ কি.মি বিস্তৃত Longest Uninterrupted sandy seashore in the world এবং এটি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখেছে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে। এটি দেখতে বছরে ১৫ লক্ষাধিক পর্যটক আসেন।

ক্যাসিনো বিচের পরেই দীর্ঘতম বিচ হিসেবে রয়েছে Padre Island, Texas, USA, যা ১৮২ কি.মি. এটাকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা Drivable Beach। নাইনটি মইল বিচ ১৫১ কি.মি. (৯৪ মাইল) লম্বা। তারপরেই রয়েছে আমাদের কক্সবাজার বিচ যা ১৫০ কি.মি. (৯৩ মাইল)। বিশ্বের দীর্ঘতম নদের নাম নীল নদ (মিশর) এবং তারপরই রয়েছে আমাজন। তবে নীল নদের চেয়ে আমাজনের পানির ধারণ ক্ষমতা বেশী। সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রজাতির গাছ ও প্রাণির দেখা পাওয়া যায় ব্রাজিলে। ব্রাজিল সম্পর্কে ছোট করে লিখা অসম্ভব কারন সৃষ্টিকর্তা ব্রাজিলকে দিয়েছেন দু’হাত ভরে অকৃপনভাবে। আর তাই হয়তো ব্রাজিলিয়ানরা বলে থাকেন, সৃষ্টি কর্তা হচ্ছে ব্রাজিলিয়ান (Deus e brasileiro)।


ব্রাজিলে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে কার্নিভালের সময়। আবহাওয়া বিবেচনায় এপ্রিল-জুন আর আগষ্ট-অক্টোবরও সেরা সময়। তবে মনে রাখবেন, করোনার টিকার পাশাপাশি Yellow Fever টিকা আবশ্যক। যারা আমাজনে যাবার পরিকল্পনা করবেন তাদের জন্য হেপটাইসিস, টিটেনাসের টিকা ও ম্যালেরিয়ার ওষুধ নিয়ে যাওয়া উচিত।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিলের (Foz do lguagu) ফজ দ ইগুয়াজুতে যাই যা ইগুয়াজু ফলস নামে পরিচিত। ফলসটি ২.৭ কি.মি এবং সেখানে ২৫টি একক ঝরনা রয়েছে যা এটিকে New Natural Seven Wonders of the World এ খেতাব এনে দিয়েছে। ল্যাটিন বা দক্ষিণ আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে এবং আমাদের বাংলাদেশি লোকজন ও খুব বেশী নেই। যদিও গত ১০ বছরে বেশ লোকজন ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির বিপর্যয়ে ও অর্থনৈতিক ধসে বেশীর ভাগ লোকজন অবৈধভাবে মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। বর্তমানে আনুমানিক ১০০০-১৫০০ বাংলাদেশি রয়েছে ব্রাজিলে।


সাও পাওলো টু রিও

একটা শহর যে এত বড় হতে পারে সাও পাওলো না এলে বিশ্বাসই হতো না। ৪১ মিলিয়ন লোকের বসবাস। সারা বিশ্বের লোক সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের প্রথম ১০টি শহরের একটি। সাও পাওলোতে কামরুলের বাসায় অবস্থান করছি। কামরুলের সাথে ঢাকায় পরিচয় হয়েছিল। কামরুলের বড় ভাই কামাল দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলে রয়েছে। বিয়ে করেছেন এক ব্রাজিলিয়ানকে। যে অল্প কয়েক জন বাংলাদেশি ব্রাজিলের পাসপোর্ট পেয়েছেন কামাল তার অন্যতম। ব্রাজিলের পাসপোর্টে পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে ভিসার ঝামেলা ছাড়াই যাওয়া যায়। বিশ্বের বিশতম শক্তিশালী পাসপোর্ট।

২০১৫ এর দিকে সাও পাওলোতে এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি ছিলেন। যদিও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। কারণ কিছু লোক যেমন প্রতিদিন ব্রাজিলে আসছেন, ঠিক তেমনি কিছু লোক ব্রাজিল ত্যাগ করছেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। সাও পাওলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এয়ারপোর্টের নাম Guarulhos যা শহর থেকে ৩০ কি.মি. পূর্বে অবস্থিত। এতবড়  শহর আরও বড় মনে হতো ভাষাগত সমস্যার কারণে। ব্রাজিলের ভাষা পুর্তগীজ। ল্যাটিন আমেরিকার সব দেশেই স্প্যানিশ ভাষা চলে, শুধু ব্রাজিলে পর্তুগীজ।


এ দেশ আয়তনে যেমন বড়, তেমনি এর খাবার, পোশাক, আবহাওয়া, জীববৈচিত্যও অনন্য। টাইম জোন রয়েছে ৪টি। মজা করে অনেকে বলেন, যখন একজন ব্যক্তি চারটি ঘড়ি পড়ে কোথাও যান তখন বুঝতে হবে তিনি ব্রাজিলে যাচ্ছেন। এ যেনো একের ভেতরে অনেক দেশের মিলিত রূপ।

সাও পাওলোকে অনেকে ডাকেন সাম্পা। ব্রাজিলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইমিগ্র্যান্টদের বসবাস এই সাও পাওলো শহরে। সাও পাওলোর আয়তন ৭৯৪৩ বর্গ কি.মি.।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে অনিকের সাথে প্যারাগুয়েতে পরিচয় হয়েছিল এবং বর্তমানে সে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে রয়েছে (২০১৫)। অনিকের সঙ্গে দেখা করতে যাই। সে স্প্যানিশ, পর্তুগীজ ভাষায় পারদর্শী। তার ওখানে খায়রুলের সঙ্গে পরিচিত হই। সেও ভালো পর্তুগীজ বলতে পারে। একসময় বাংলাদেশে ভালো ক্রিকেট খেলতো। খায়রুল আমাকে বেশ সময় নিয়ে সাও পাওলোর দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখালো।

সাও পাওলোর Liberdade এলাকাটি মূলত জাপানীজ, চাইনীজ ও কোরিয়ানদের দখলে। তবে শহরটির ভিতর ইতালীয়ন প্রভাব অনেক। ৬ মিলিয়ন লোকের রয়েছে ইতালীয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড। তবে সংখ্যায় অল্প কিন্তু প্রভাবশালী কমিউনিটির মধ্যে আরব ও ইহুদীদের প্রভাব রয়েছে। যদিও শহরের ৪০ শতাংশ লোক এসেছে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের। তাদের বলা হয় Paulistanos।


পরিশ্রমী হিসেবে সাও পাওলোর লোকদের সুনাম রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, যখন সাও পাওলোর লোকেরা কাজ করে তখন বাকী ব্রাজিলিয়ানরা আরাম করে। আরও বলা হয়ে থাকে, দেশটির ৪৫ শতাংশ উৎপাদনের আয় আসে এই সাও পাওলো প্রদেশ থেকে। সাও পাওলোর অবশ্যই দর্শনীয় স্থান হচ্ছে Avenida Paulista সেখান থেকে হেটেই Ibirapuera এবং Park Centro যাওয়া যায়। Sao Paulo Stock Exchange হচ্ছে বিশ্বের ২য় বৃহত্তম স্টক একচেঞ্জ। পিৎজার জন্যও সাও পাওলো বিখ্যাত। Sao Paulo is the second largest consumer of pizza in the world। ৩০৫ বিলিয়ন ডলারের স্টক একচেঞ্জ হয় প্রতিদিন সাও পাওলোতে। খাইরুলের সাথে পাউলিস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। বিশাল বড় রাস্তা পথচারীদের হাঁটার জন্য। দুপাশে নয়ন জুড়ানো সুউচ্চ অট্রালিকা আকাশ পানে চেয়ে আছে। কিছু জায়গায় দেখলাম সুভ্যেনির নিয়ে রাস্তায় বিক্রি করছেন কিছু লোক, পর্যটক সমাগম রয়েছে এই এলাকটিতে। ব্রাজিলিয়ান বিখ্যাত আর্কিটেক্ট অস্কার নেইমার একটি স্থাপত্য দেখলাম। অস্কার নেইমা একজন পৃথিবী বিখ্যাত আর্কিটেক্ট। সারা ব্রাজিল জুড়েই যার স্থাপত্য নির্মাণ শিল্পীর নিপুন কাজ রয়েছে। সাও পাওলোতেই তার ৮/১০টি কাজ রয়েছে এবং সম্প্রতি আরেকজন বিখ্যাত আর্টিস্ট Eduardo kobra যিনি Street Art এর জন্য বিখ্যাত, সাও পাওলোর সন্তান এবং ব্রাজিল ছাড়াও ৫টি মহাদেশে ৩০০০ মুরাল তৈরি করেছেন। পাউলিস্তার রাস্তায়ও কোবরার তৈরি করেছেন ওস্কার নেইমারের ম্যুরাল। খুবই আকর্ষণীয়। সারা ব্রাজিলের রাস্তায় প্রচুর Street Printing এবং গ্রাফিতি আর্ট।  Banksy নামের একজন ব্রিটিশ আর্টিস্ট এই গ্রাফিতি আর্টকে জনপ্রিয় করেন।


১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রাজিল স্বাধীনতা লাভ করে পর্তুগাল থেকে। বর্তমানে রাজধানী ব্রাসিলিয়া, এর আগে রাজধানী ছিল রিও ডি জেনেরিও এবং সালভাদর। ব্রাজিলে যত আন্তজাতিক কোম্পানির অফিস রয়েছে তার ৬৩ শতাংশ সাও পাওলোতে। সাও পাওলো বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরগুলির একটি। অভিজাত শপিং বা উইনডো শপিংয়ের জন্য যেতে পারেন Jardins, JK শপিং মল ও Iguatemi তে।

ব্রাজিলিয়ানরা ফুটবল পাগল জাতি আর তাইতো সাও পাওলো শহরে রয়েছে ফুটবলের জাদুঘর। ফুটবল প্রেমীদের জন্য আবশ্যই দর্শনীয় স্থান। ১৯৫০ ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় এই শহরে। ফর্মুলা ওয়ান ব্রাজিলের অন্যতম জনপ্রিয় স্পোর্টস। তারা তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হয়েছে রেসে।

এত বড় যে, আনায়াসে হারিয়ে যাওয়া যায় Sao Paulo Tiete Bus টার্মিনালে। বিশ্বের ২য় বৃহত্তম বাস টার্মিনাল। খায়রুল আমাকে নিয়ে সেই বাস টার্মিনালে। সেখান থেকে রিওর কাছাকাছি পারিবা দ্যা সল যাব। দুরত্ব ৪২৩ কি.মি. যেতে ৬/৭ ঘণ্টা লাগবে। পারিবা দ্যা সেল এ রাখাল বাবু নামে এক বাংলাদেশি থাকেন। তার কাছে যাব। রাখাল মালয়েশিয়া থেকে ব্রাজিলে এসেছে। একটি গ্লোভস তৈরির কারখানাতে চাকুরি করে। বেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে। রাখাল বলে দিয়েছিলো। রাতে কামরুল ও তার রুমমেট রুমান আমাকে মসজিদ পার্কের সামনে থেকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিলো।

  সালতামামি

;

বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা



লেখা ও ছবি: মনিরুল ইসলাম
বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা

বৃন্দাবনে তাঁবুর মেলা

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রথম যেবার "আউটডোর বিডি" তাঁবুর মেলা আয়োজন করেছিলো সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। সে প্রায় দু’বছর আগের কথা আর এবার বসেছে রাস পূর্ণিমায়। যদিও রাস পূর্ণিমা দিন তিনেক আগে গত হয়েছে তবুও তার রেশ এখনো বিদ্যমান। আগেরবার এই তাঁবুর মেলা বসেছিল পাদ্মহেম ধামে আর এবার গাজীপুরের মাওনার অদূরের ক্যাম্পসাইট ও রিসোর্ট বৃন্দাবনে। তবে মজার ব্যাপার হল এখানেও একটি সাধুসঙ্গ আছে যার নাম “সত্য নিকেতন”।

হিন্দুধর্মের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে বৃন্দাবন একটি তীর্থস্থান। বৃন্দাবন আর রাস পূর্ণিমা একে অপরের পরিপূরক। রাস পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনেশ্বরী রাধা ও বৃন্দাবনেশ্বর কৃষ্ণা গোপীদের নিয়ে মত্ত হয়ে উঠতেন লীলা খেলায়। আমাদের তাঁবুবাসের উদ্দেশ্য সেরকম কিছু না হলেও, ভ্রামণিকদের সাথে প্রকৃতির কোলে আনন্দময় আড্ডার  সাথে নিভৃতে রাত্রিযাপনই ছিল মুল উদ্দেশ্য।   

বিগত দুবছর ক্যাম্পিং-এর মৌসুম শুরু করেছিলাম আউটডোর বিডি আয়োজিত তাঁবুবাসের মাধ্যমে, এবছরও তার ব্যাতিক্রম হচ্ছেনা। আউটডোর বিডির স্বত্বাধিকারী জুয়েল রানা আগেই ক্যাম্পিং এর দিনক্ষণ জানিয়ে রেখেছিল যাতে করে মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত থাকতে পারি। প্রথমবার একা অংশগ্রহণ করলেও দ্বিতীয়বার নিয়েছিলাম প্রিয়তয়া স্ত্রী কানিজকে। আর এবার নতুন সদস্য হিসেবে যোগ হয়েছে আমার ছোট মেয়ে "প্রকৃতি"। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আমার মেয়ে প্রক্ক্রিতির এতাই প্রথম ক্যাম্পিং অভিজ্ঞতা, হ্যামক, তাঁবু , স্লিপিং ব্যাগ এইসব নিয়ে সে খুব উত্তেজিত হয়ে ছিল। তিনজনের সরঞ্জামের লটবহর নিয়ে যাত্রা শুরু হল  ১১ নভেম্বর সকাল ৮ টায়।  ঢাকা ছেড়ে কোথাও যেতে গেলে পথের ভোগান্তির চিন্তায় রাস্তার মত আঁকাবাঁকা ভাঁজ কপালেও ফুটে উঠে , পরিবহন ও রাস্তার কথা চিন্তা করে । তার উপরে যেতে হবে গাজীপুর জেলার  শ্রীপুর উপজেলায়! অনেকগুলো বিকল্প পথ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেও শেষমেষ উত্তরা , টঙ্গী হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তা ধরেই যাত্রা স্থীর করলাম। শ্লথগতির উন্নয়নের তোড়জোড়ে রাস্তা ঘাটের অবস্থা ভয়াবহ। অনেক শংকা নিয়ে রওনা হলেও সৌভাগ্যের এলবাট্রস উড়ে এস বসেছিল আমাদের গাড়ির উপর। তাই হবে হয়তো, কেননা অনুমিত সময়ের আগেই মাওনা চৌরাস্তা পৌঁছে গেলাম। তারপর এমসি বাজার থেকে ইউটার্ন নিয়ে অতঃপর বামের রাস্তা ধরে টেঁপির বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম । “টেঁপির বাড়ী” নামটার মধ্যে একটা আদর আদর ভাব আছে! এই টেঁপির বাড়ীর এলাকায় অবস্থিত আমাদের ক্যাম্প সাইট “বৃন্দাবন”। কয়েক কিমি এগিয়ে সেই রাস্তা ছেড়ে হাতের ডানের খানিকটা অপ্রসস্থ কিছুটা আঁকাবাঁকা একটা রাস্তা ধরলাম। অসম্ভভ নির্জন, স্নিগ্ধ এবং সবুজে ঘেরা সেই রাস্তা।  রাস্তার দুধারের গাছেরা যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আচ্ছা গাছেরাও কি মানুষের মত সর্বক্ষণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে, সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়ার! নাকি বেঁচে থাকার জন্য যটুকু আলো, বাতাস বা পানির দরকার ততটুকুর জন্যই শুধু প্রতিযোগিতা করে। কি জানি বাপু , ওদের মনস্তত্ত্ব বোঝা আমার কম্ম নয়। যাইহোক দার্শনিক ভাব ছেড়ে গল্পে ফেরা যাক। 

বৃন্দাবনে ঢোকার পথ

রিসোর্টের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই ডান দিকটায় সবুজ ঘাসে মোড়ানো এক প্রস্থ মাঠ। এই মাঠকে ঘিরেই রিসোর্টের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। বাদিকটায় পরিকল্পিত বন, আর বনের ভিতরে ক্যাম্প সাইট। ইতিমধ্যে অনেকই হাজির হয়েছেন মোটর বাইক, গাড়ী , বাইসাইকেল সওয়ারি হয়ে। রঙ বেরঙের তাঁবু আর হ্যামকে রংধুনুর রঙে সেজেছে পুরো বন। আমর' সময় নষ্ট না করে তাঁবু খাটানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমার মেয়ে প্রকৃতি অস্থির হয়ে আছে হ্যামকে গা এলানোর জন্য তাই হ্যামক টানাতে ব্যাতিব্যস্ত হতে হলো। হ্যামক টানাতে গিয়ে রোপ-৪ এর মাহি ভাইয়ের দেখা পেলাম, তিনি সদ্য ইয়েলা পিক আরোহণ করে দেশে ফিরেছেন । ঊনার থেকে সাহায্য চাইলাম হ্যামক টানাতে। তিনি সহজেই শিখিয়ে দিলেন কিভাবে হ্যামক বাধতে হয়। আগে যে পারতাম না তা নয়, সে ছিল দড়ি পেঁচিয়ে কিছু একটা করা। বোনাস হিসেবে শিখলাম হ্যামকে উঠার সবচেয়ে নিরপাদ পদ্ধতি। আমার মত ঘরকুনোদের ক্যাম্পে আসার ফায়দা হল সবসময় নতুন কিছু জ্ঞান অর্জন।

আমার মেয়ের হ্যামক বিলাস

লাঞ্চ সেরে বড়রা দলপাকিয়ে আড্ডা দিচ্ছি আর ছোটরাও দল বানিয়ে নানাও খেলার ব্যস্ত হইয়ে পরলো। বেলা পরে এলে চারদিকটা একটু ঘুরে দেখবো বলে রওনা হলাম, কিন্ত মাঠের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম প্রকৃতি ব্যথা পেয়ে ফুটবল খেলা ক্ষান্ত দিয়ে মাঠের পাশে বসে আছে। আমাকে দেখে তার ব্যথার অনিভুতি গেলো বেড়ে, জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। ক্ষুদে ফুটবলারদের নেতৃত্বে ছিলেন শাহিন ভাই, ঔষধ পত্র নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরলেন। আমার মেয়ে এর আগে এত বড় ব্যথা কখনো পায়নি। পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা খানিকটা ফুলে উঠেছে, তবে আমি অন্য সময়ের মত বিচলিত হলাম না। কানিজ বরাবরই আমার চেয়ে শক্ত মনের অধিকারী। খেলতে গেলে এরকম একটু আধটু ব্যথা পেতেই হয়। ছোট বেলায় খেলতে গিয়ে আমারা কত ব্যথা পেয়েছি বলে সে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলো সব।

সন্ধ্যা নেমে এলে বরাবরের মত কবির আর সুজন চায়ের আয়োজনে নেমে পড়লো। ক্যাম্পের জন্য বিশেষায়িত চুলা নিয়ে যাওয়াতে সুবিধা হয়েছে, চাইলেই চা বানিয়ে ফেলা যাচ্ছে। ওদিকে আউটডোর বিডি'র বার্ষিকী সেল শুরু হয়েছে ততক্ষনে। ক্রেতাদের ভিড়ে হট্টগোল লেগে গিয়েছে কিন্তু বিক্রি-বাট্টা আশানুরূপ নয়। অনেকটা আলী হুসেনের মত করে বলতে হয় “ আইয়া খালি হাতায় বাজান, দাম হুইন্না আর কিনে না”।

এর মধ্যেই শাহিন ভাই হাত ধরে নিয়ে গেলেন সত্য নিকেতনের গানের আসরে। সেখানে গদিতে আসীন এই রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা মৃধা। এদিকে গান গেয়ে চলেছেন নুরু পাগলের এক ভক্ত। শুধু ভক্ত নয় সে একজন নুরু পাগলের দর্শনের প্রচারক । আমীর হামজা নিজেও গান লিখেন এবং সুর দেন। একসময় আমীর হামজার মৌলিক কয়েকটা গানও শোনা হলো।  শুভ্র চুল ও শশ্রুশোভিত সফেদ পাঞ্জাবি পরিহিত এক রহস্যময় পুরুষ এই মৃধা সাহেব । জীবন সম্পর্কে তার কিছু নিজস্ব চিন্তা ভাবনা আছে যেগুলো ব্যানার ও ফেস্টুনে লিখে ঝুলিয়ে দিয়েছেন রিসোর্টের বিভিন্ন স্থানে । এমনকি নিজের কবরের স্থানটিও ঠিক করে রেখেছেন আগেভাগেই আধ্যাত্মিক এই লোকটি ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা মৃধা

ততক্ষণে সন্ধ্যায় গড়িয়ে রাতের আকাশের দখল চলে গিয়েছে  চাঁদ আর তারাদের হাতে। কিন্তু আমাদের ঘোরা নেশা তখনো মিটে যায়নি, মাহি ভাইকে অনুসরণ করে পিঁপড়ের লাইনের মত করে বনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা কয়েকজন।  খানিক বাদে  কিছুটা দূরে একটা পুকুর পারে খোলা আকাশের নীচে এসে হাজির হলাম । উদ্দেশ্য মাহি ভাই আমদেরকে তারাদের সাথে পরিচিত করাবেন। পকেট থেকে লেজার পয়েন্টার দিয়ে দেখালেন দ্রুবতারা কিভাবে খুঁজে বের করতে হয়! সপ্তর্ষী মন্ডল এর প্রথম দুটি তারা, পুলহ এবং ক্রতু-কে সরলরেখায় বাড়ালে ধ্রুবতারাকে নির্দেশ করে। দিক নির্ণয়ে এই ধ্রুবতারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন কালে দিক নির্ণয় যন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে সমূদ্রে জাহাজ চালাবার সময় নাবিকরা এই তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ণয় করতো। এটি আকাশের একমাত্র তারা, যেটিকে এক অঞ্চল হতে বছরের যে কোন সময়েই ঠিক এক জায়গায় দেখা যায়। এরপর দেখালেন কালপুরুষ তারামন্ডলী যা দেখতে অনেকটা শিকারীর মত মনে হয়। তার এক হাতে ঢাল আর আরেক হাতে মুগুর, কটিতে রয়েছে খাপ খোলা তলোয়ার। এ সব কিছুই ছিল আমার কাছে নতুন। মাহি ভাই এতো সুন্দর করে দেখালেন একদম অভিভূত হয়ে গেলাম। যদিও জানি কিছুক্ষণ পরেই যদি আমকে এই তারা গুলো আবার খুঁজে বের করতে বলা হয়, আমি পারবো না।

তারা সম্পর্কে বেশ খানিকট আজ্ঞান অর্জন করে ক্যাম্প সাইটে ফিরলাম। খাওয়া দাওয়ার পর শুরু হল ক্যাম্প ফায়ার এবং আড্ডা। শত অনুরোধেও আমাদের মধ্যে লুকায়িত প্রকৃত শিল্পীরা গলা ছাড়লেন না। অগত্যা সুযোগ বুঝে সবুজ ভাই গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করলেন । তার গলা যতই বেসুরো হোক, প্রচেষ্টা যখন হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় তখন তা হয়ে উঠে মধুর ও স্বপ্নময়- তার জলজ্যান্ত প্রমাণ সবুজ ভাই। যাইহোক তার গান নিয়ে বেশী কিছু বলা যাবে না। এদিকে তিনি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছে যে তার সংগীত প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে তাকে আং ফ্রেং (মানে ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করে দিবে, সান্দাকফু ট্রেকে তিব্বতি ও ভুটিয়া ভাষা রপ্ত  করে এসেছে সে) করে দিবে । পরিশেষে পরিত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এলেন বেশ কয়েকজন সত্যিকারের শিল্পী। তাদের সংগীতের মাঝে মাঝেই শিয়াল পণ্ডিতেরা দোহারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে , যা ছিল আমার মেয়ের কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা। নানান অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে শুরু হলো আমদের তাঁবুবাস।

ক্যাম্প ফায়ার ও রাতের আড্ডা

সকাল হতেই মাহি ভাই স্বরূপে আবির্ভূত হলেন। কিছু রশি ও পেরেক দিয়ে একটা খেলার বোর্ড বানিয়ে ফেললেন। আমার মেয়ের প্রশ্নের উত্তরে বলল তিনি বললেন এটা টিক-ট্যাক-টো খেলা, তবে আমার একটু অন্যভাবে মজা করে খেলবো।  উনার কোন কার্যকলাপ কায়িক পরিশ্রম ছাড়া শেষ হবে, উনার সম্পর্কে পূর্বধারণা রাখে এমন কেউ সাধারণত বিশ্বাস করে না।  তাই আমিও উনার এই সহজ সরল কথায় ভুললাম না, সিধান্ত নিয়ে ফেললাম যে যাই বলুক এই খেলার ভিতরে আমি ঢুকছি না। যখন নিয়মকানুন বুঝিয়ে দেওয়া হলে তখন আমি যে সঠিক ছিলাম তা বিলক্ষণ বুঝতে পারলাম। যাতে কেউ জয়ী হতে চালাকির আশ্রয় না নেয় সেই বিবেচনায় আমার দায়িত্ব পড়লো বিচারকের।  খেলা শুরু হতেই বিচার বিবেচনা শিকেই তুলে খেলা দেখায় মত্ত হয়ে গেলাম।

খেলা শেষ হতেই তাঁবুর এই মিলন মেলা ভাঙ্গার বিউগলের সুর বেজে উঠলো। নাস্তা সেরে রওনা হতেই হলো সেই চিরচেনা ঢাকা শহরের জীবনে। শত সমস্যায় জর্জরিত এই শহরে, ফিরে আসি, আসতে হয়, ভালোবেসেই আসি, স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্তের  মত।

  সালতামামি

;

বিপন্ন তালিকায় সবুজ-ধুমকল



বিভোর বিশ্বাস, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
সবুজ-ধুমকল জোড়া বেঁধে চলে। ছবি: ইনাম আল হক

সবুজ-ধুমকল জোড়া বেঁধে চলে। ছবি: ইনাম আল হক

  • Font increase
  • Font Decrease

পাহাড়ি বনের অদেখা পাখি ‘সবুজ-ধুমকল’ (Green Imperial Pigeon)। পাহাড়ি বনকে প্রসারিত হতে না দেয়া এবং বনের খাদ্যসংকটের ফলে অনেক প্রাণীর মতো এ পাখিটির অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, আমাদের দেশে মাত্র ২ প্রজাতির ‘Imperial Pigeon’ অর্থাৎ ‘ধুমকল পায়রা’ রয়েছে। পৃথিবীতে রয়েছে ৪২ প্রজাতির। কিন্তু আমাদের থেকে পশ্চিমের দেশগুলোতে ওরা নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের সবুজ পাহাড়ি বনগুলোতে ওরা আছে।

পাখিটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে আমরা হাকালুকি হাওরে পাখিশুমারির কাজ সেরে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল ফিরছি; হঠাৎ গাড়ি জানালা দিয়ে দেখি এক জোড়া Green Imperial Pigeon। সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে আমরা তাদের ছবি তুললাম। চা বাগানের ফাঁকা গাছে ওরা খুবই কম আসে। কিন্ত ওখানে ওরা নিমের ফল খেতে এসেছিল। এদের আকৃতি ৪৩-৪৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।

“শরীর সবুজ বলে সহজে লোকের চোখে পাড়েনা; ডানাটা একটু বেশি ঘনসবুজ। ও ঘুঘুর মতো ডাকে; কিন্তু অনেক গম্ভির গলা। বনে ঢুলকেই ডাক শুনে বুঝতে পারি ইমপেরিয়াল পিজন আছে আশেপাশে। এরা হলো ফল খাওয়া পাখি। শুধুমাত্র বুনো ফলই খায়। ওরা ঝাক বেঁধে আসে না। আমি একজোড়া গ্রিন ইমপেরিয়াল পিজন দেখতে পেলেই মহাখুশি।”

সাতছড়ি উদ্যানের পাশে সবুজ-ধুমকল। ছবি: ইনাম আল হক

ইনাম বলেন, ‘সবুজ-ধুমকল’ বিরল পাখি; তবুও টিকে আছে। ওর বড় ভাগ্য, লোকে ওকে খুঁজে পায় না। হরিয়াল (Green Pigeon) যেমন বটগাছে আসে বলে লোকজন তাকে সহজে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু ধুমকলকে মারা ততটা সহজ নয়। একমাত্র চট্টগ্রামে ক’বছর আগে আমি নৃ-গোষ্ঠী মুরংদের এই পাখিটিকে বন্দুক দিয়ে মারতে দেখেছিলাম। কিন্তু সিলেটে লোকের হাতে খুব কমই মারা পড়ে। কারণ লোকে ওকে দেখতে পায় না।

পাখির প্রজনন এবং বন সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, ‘এরা ঘুঘু পাখির মতো বছরে দুটো ডিম পাড়ে। অসুবিধা হলো- একটি ডিম ফুটলো না; বা বড় হওয়ার আগেও কোনো শিকারী পাখি/প্রাণী খেয়ে ফেললো। ফলে অনেক সময় ৫/১০ বছরেরও সে বয়স্ক বাচ্চা রেখে যেতে না পারলে ওদের বংশবিস্তার প্রাকৃতিকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হয়। এছাড়াও এ পাখিটি যে ফল খায়; সেই ফলগাছগুলোও কমে গেছে। বন ছোট হয়ে গেছে। এরাই ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে বন প্রসারিত করে। কিন্তু আমরা তো এখন বন প্রসারিত হতে দিই না। বনকে তো আমরা আটকে রেখেছি একটা ছোট্ট জায়গার মধ্যে।’

রাজকীয় অপূর্ব সুন্দর এক পাখি গ্রিন ইমপেরিয়াল পিজন; আমাদের জালালি পায়রা থেকেও সে আকারে বড়। এই পাখিটি আমাদের বনে টিকে থাকুক -এটাই আমরা চাই। এই ৪২ প্রজাতির প্রত্যেকটি পাখিই কিন্তু অপূর্ব। তবে ওদের অনেকগুলোই কিন্তু পৃথিবীতে বিপন্ন। ভাগ্যক্রমে আমাদের সবুজ ধুমকলটা রয়েছে; এখনো আমরা ‘বিপন্ন’ ঘোষণা করিনি। তবে মনে হয়- খুব শিগগির এ প্রজাতিটিও বিপন্ন তালিকায় যাবে বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

  সালতামামি

;