কবে থামবে এ মৃত্যুর মিছিল?



ড. মতিউর রহমান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নদীকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করে। এ ছাড়াও দেশের অধিকাংশ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌপথ। তুলনামূলকভাবে কম খরচ এবং আরামের কারণে দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যাতায়াতের জন্য নদী পথ বেছে নেয়। কিন্তু যাতায়াতের সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক এই পথটি এখন সড়ক পথে যাতায়াতের মতোই অনিরাপদ হয়ে ওঠেছে। একের পর এক ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা । এসব দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছে।

সম্প্রতি ঘটে গেল আরো একটি হৃদয়বিদারক নৌ দুর্ঘটনা। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ডুবে মারা গেলেন প্রায় ৪১ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। গত রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মহালয়া উপলক্ষে পাঁচপীর,বোদা, মাড়েয়া, ব্যাঙহারি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নৌকায় করে বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন পূজা দিতে। এ সময় নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী ছিল। এ কারণে মাঝ নদীতে পৌঁছানোর পর যাত্রীর চাপে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় কিছু মানুষ সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও বেশির ভাগ যাত্রীই এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এর তথ্য মতে, দেশে গত সাত বছরে ৪,৭৯১টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪,২৩৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ২,৭১৪ জন। নৌপথে দুর্ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৪ শতাংশই অন্য নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাক্কা লেগে হয়েছে। বাকি দুর্ঘটনার কারণ বৈরী আবহাওয়া, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লঞ্চের তলা ফেটে যাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি, আগুন লাগা ও বিস্ফোরণ। সবচেয়ে বেশি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৌ দুর্ঘটনা রোধে নৌপরিহনের চালক ও যাত্রী সবাইকেই সচেতন হতে হবে। চালকরা সাবধানে নৌযান চালালে অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। নৌযান দুর্ঘটনার বিশেষ করে লঞ্চ দুর্ঘটনার যে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে তার মধ্যে অন্য নৌযানের সঙ্গে ধাক্কা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, বৈরী আবহাওয়ায় লঞ্চ চালনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এছাড়া আগুন ও বিস্ফোরণ, মানবসৃষ্ট ভুল, নৌরুট ও বন্দরের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও রয়েছে৷।

এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চে সার্ভে সনদ ও রুট পারমিট প্রদান, অতিরিক্ত যাত্রী ও অদক্ষ চালকসহ নানা কারণে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটে। বাসের মতো লঞ্চেও মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন বা বডি নিয়ে অসংখ্য যাত্রীর জীবন নিয়ে খেলছেন নৌযান মালিক ও চালকরা।

দেশে একেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। তদন্ত কমিটি হয়। প্রতিটি তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধের উপায় বা প্রতিকার এবং কিছু সুপারিশ করলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখে না।

জানা যায় ‘অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন, ২০২১’ নামে একটি খসড়া আইন প্রণয়নের মধ্যেই তা আটকে রয়েছে। এই খসড়া আইনটির ৭৩ ধারায় অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ৮০ ধারায় কোম্পানির পরিচালকদেরও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়ী করে শাস্তি দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি আইনটি।

নৌ দুর্ঘটনাসহ সবধরনের দুর্ঘটনা বন্ধে বিশেষজ্ঞরা যেসব সুপারিশমালা বিভিন্ন সময়ে প্রদান করেছেন সেসবের যথাযথ বাস্তবায়ন করে মানুষের জীবন রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা নাহলে এ মৃত্যুর মিছিল থামবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। সুতরাং যথাযথ কর্তৃপক্ষ এদিকে আশু নজর দিবেন বলে মনে করি।

ড. মতিউর রহমান: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

 

মেট্রোরেল: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত



হাসান মোঃ শামসুদ্দীন
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দেশের প্রথম মেট্রোরেল বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান বিজয়ের মাসে এই মেগা প্রকল্পটি উদ্বোধন করবেন। এই মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানী শহর ঢাকায় যানজট কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা যায়। সে সাথে বর্তমান গণপরিবহন ব্যবস্থায় ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।বিশ্বের অনেক বড় বড় শহরে মেট্রোরেল গণপরিবহণের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। মেট্রোরেল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদ ও মানুষ নিশ্চিতে সময়মত এটা ব্যবহার করতে পারে। এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে জাপান ১৯২৭ সালে প্রথম পাতাল রেলব্যবস্থা তৈরি করে। ভারত ১৯৭২ সালে কলকাতায় মেট্রো সিস্টেম নির্মাণ শুরু করে এবং পরে ভারতের আরও কয়েকটা শহরে মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু হয়। বর্তমানে, বিশ্বের ৫৬টি দেশের ১৭৮টি শহরে ১৮০টি পাতাল রেলব্যবস্থা চালু রয়েছে।

২০১২ সালে বাংলাদেশ মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সে বছর ডিসেম্বর মাসে, ‘ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ বা ‘মেট্রোরেল’ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) দ্বারা অনুমোদিত হয়।প্রকল্পের জন্য মোট ৫টি রুট প্রস্তাব করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে এমআরটি লাইন ১, ২, ৪, ৫, এবং ৬। ঢাকা মেট্রো রেল, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় গণপরিবহণের জন্য জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)এর অর্থায়নে চলমান একটি সরকারি প্রকল্প। প্রকল্পটি পরিচালনা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুন ২০১৬ সালে মেট্রোরেল নির্মাণ কাজের সূচনা করেন। প্রাথমিক ভাবে এমআরটি লাইন-৬ দিয়ে মেট্রোরেল চলবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন ৬-এর দৈর্ঘ্য ছিল ২০.১ কিলোমিটার, পরে তা কমলাপুর পর্যন্ত বাড়ানো হয়, ফলে রুটটির দৈর্ঘ্য আরও ১.১৬ কিলোমিটার বেড়ে এর মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ২১.২৬ কিমি. এবং এই রুটে মোট ১৭টি স্টেশন থাকবে ও ২৪টি ট্রেন সেট চলবে। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাসে যেতে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে সময় লাগবে ৪০ মিনিট। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে শুরুতে দিনে ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে এবং আশা করা যায় ২০৩৫ সাল নাগাদ যাত্রীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ লাখের বেশি।

এমআরটি লাইন ১ মেট্রো রেল প্রকল্পের অধীনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। এমআরটি লাইন ১, দুটি ভিন্ন রুটে নির্মিত হবে। ‘এয়ারপোর্ট রেল লিংক’ লাইনটি কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে গাজীপুর পর্যন্ত যাবে, এ রুটটিতে ভূগর্ভস্থ স্টেশনও থাকবে। এই লাইনের দ্বিতীয় রুটটি বারিধারা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত যাবে যা পূর্বাচল রুট নামে পরিচিত হবে। এমআরটি লাইন ১-এর দুটি রুটই ২০২৬ সালে নির্মাণ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এমআরটি লাইন ৪, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যাবে এবং এর নির্মাণ কাজ ২০৩০ সালে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এমআরটি লাইন ২ গাবতলী থেকে চিটাগং রোড পর্যন্ত চলবে এবং ২০৩০ সালে নির্মাণ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৮ সালেবুয়েট পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে ঢাকায় যানবাহনের গতিবেগ গড়ে ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার যা হাঁটার গতির সমান। এই গতি যানজট সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকার ফলে যাত্রীরা মানসিক চাপের শিকার হয় যা পরোক্ষ ভাবে বিভিন্ন রোগের উৎস হিসেবে কাজ করে। যানজটের কারণে ঢাকা শহরে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষয়ক্ষতি থেকে উত্তরণ ও একটি আধুনিক পরিবহন বান্ধব শহর গড়ার লক্ষ্যে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ২০২৪ সালের মধ্যে তিনটি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি পথে মেট্রোরেল চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ এর কাজ চলমান এবং এমাসেই জনগণ এই লাইন থেকে আংশিক সুবিধা পাবে।মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড থেকে জানা যায় যে,ঢাকায় আরও তিনটি

মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।সব লাইন যখন চালু হবে তখন রাজধানীবাসীএই প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি ভাবে পাবে।

আশা করা যায় যে, এমআরটি লাইন-৬ চালু হলে এই রুটের নিচের রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কিছুটা কমবে। যারা সিএনজি অটোরিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে তারা মেট্রো ব্যবহার করতে আগ্রহী হলে রাস্তাগুলোতে ছোট গাড়ির সংখ্যা কমে যাবে এবং কিছুটা হলেও যানজট নিয়ন্ত্রণে আসবে। মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক সব সুবিধা। এই মেট্রোরেল প্রকল্পটি কর্মঘণ্টা ও যানজট কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করেছেন। প্রকল্পটি রেল বেজড হওয়ায় এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচল করবে এর ফলে যাত্রীদের ভ্রমণে সময় কম লাগবে। গন্তব্যে পৌঁছাতে কতটা সময় লাগবে তা আগে থেকে জানা থাকবে বলে যাত্রীরা সময়মত স্টেশনে পৌঁছে গেলে সহজেই তার গন্তব্যে হাজির হতে পারবেন। আগে থেকে ভ্রমণের সময় জানা থাকার ফলে অনেক কর্মঘণ্টা বেঁচে যাবে যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে।

জাপানি প্রতিষ্ঠান এর নির্মাণে জড়িত এবং পরামর্শক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছে। জাপান বহু বছর এই মেট্রোরেল পরিচালনা করছে, টোকিও’র মেট্রোরেল অফিসের সময় প্রচণ্ড ভিড় থাকে এবং অফিসগামী মানুষ সেটা সাচ্ছন্দে ব্যবহার করে। তাদের কোনো ধরনের দুর্ঘটনার রেকর্ড নেই। আমাদের দেশেও জাপানের প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এই মেট্রোরেল পরিচালনা করা হবে। অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারের (ওসিসি) মাধ্যমে পুরো সিস্টেমটা পরিচালিত হবে। এতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, মুভিং ব্লক কমিউনেকশন বেজড টেলিকন্ট্রোল সিস্টেম এবং অটোমেটিক ট্রেন অপারেশন বা এটিও থাকবে। ট্রেনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সেন্ট্রাল কন্ট্রোল থেকেই নিয়ন্ত্রিত হবে। ট্রেন অটোমেটিক স্টপ কন্ট্রোলের মাধ্যমে কোথায়, কখন থামাতে হবে সেটি নির্ধারিত হবে এবং এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারনে চালকের বেশী কিছু করার থাকবে না। প্রোগ্রাম রুট কন্ট্রোলার সিস্টেমের মাধ্যমে ট্রেনের রুটগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার ফলে মেট্রোরেল পরিচালনায় তেমন কোনো সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশের মতো একটি ছোট এবং জনবহুলদেশ মেট্রোরেল প্রকল্প থেকে অনেক সুবিধা পেতে পারে। মেট্রোরেল প্রতিদিনের যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার পাশাপাশি একসঙ্গে প্রচুর সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে চলমান অন্যান্য পরিবহনের মাধ্যমগুলোর ওপরও চাপ কমিয়ে দেবে। এর ফলে বর্তমান যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হবে।দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়াপদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বাংলাদেশ যোগাযোগ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন যুগে প্রবেশ করবে। এর মধ্যে পদ্মা সেতুর সুফল মানুষ পেতে শুরু করেছে, বাকী প্রকল্পগুলোর সুফল সামনের দিনগুলোতে পাওয়া যাবে।

মেট্রোরেল চালু হলে যোগাযোগে স্বাধীনতা আসবে, অর্থনীতির গতি বাড়াবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মেট্রো রেল ঢাকার ১৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য যাতায়াত সহজ করবে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে গতিশীল করবে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মেট্রোরেল পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর লোকবল লাগবে এবং এই প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থান হবে যা জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।মেট্রো রেলের কারণে বিদ্যমান গণপরিবহণ ব্যবহারে নারীদের যে অনীহা আছে তা দূর হবে ফলে তারা মেট্রো রেলে ভ্রমণে আগ্রহী হবে ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে। মেট্রোরেল চালু হলে এই সুবিধা ব্যবহার করে ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব কমার সম্ভাবনা রয়েছে, এর পাশাপাশি যানবাহনের সংখ্যা কমলে পরিবেশ দূষণ কমাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে। বিশ্বব্যাংক, বুয়েট এবং বিভিন্ন সংস্থা মেট্রোরেল প্রকল্পের নানা দিক নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে। সেসব তথ্য উপাত্ত অনুসারে জানা যায় যে, ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩.৮ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ফলে ফলে বার্ষিক ৪.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, যা জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঢাকার যানজট ৬০ শতাংশ কমাতে পারলে বাংলাদেশ ২.৬ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারে। মেট্রো রেল প্রকল্পটি প্রতি বছর ২.৪ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে যা জিডিপির ১.৫ শতাংশের সমান।

বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় ঢাকার মেট্রোরেল এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। দেশের পরিবহন খাতের জন্য এটা একটা বড় ঘটনা। আশা করা যায় যে এ ধরনের পরিবহন মানুষের জীবনধারা পরিবর্তন এবং তাদের উৎপাদনশীল সময় বৃদ্ধি করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মেট্রোরেল বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় স্বপ্ন প্রকল্প, এর বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। উন্নয়নের ধারবাহিকতায় বাংলাদেশ পৃথিবীর মেট্রোরেল ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাতারেযোগ দিতে যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব, সময় সাশ্রয়ী, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে পরিবহনখাতে সুদূরপ্রসারী ভুমিকা রাখবে এটাই প্রত্যাশা।

তথ্য সূত্রঃ
১। দ্রুত চালু ও যথাযথ সেবা দেওয়াই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি, দি ডেইলি স্টার, আগস্ট ৩১, ২০২১।
২। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, যোগাযোগ–পরিবহনে নতুন যুগে বাংলাদেশ, প্রথম আলো, ১৩ নভেম্বর ২০২১।
৩। মেট্রোরেল : একটি অর্র্থনৈতিক বিশ্লেষণ, শিবলী কায়সার, যুগান্তর, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
৪।মেট্রোরেল : একটি অর্র্থনৈতিক বিশ্লেষণ, শিবলী কায়সার, যুগান্তর, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২।
৫। ‘জাপানের প্রযুক্তিতে পরিচালনা করা হবে ঢাকার মেট্রোরেল’, সাইফুল হক মিঠু, জাগো নিউজ ২৪ ডট কম, ২৯ নভেম্বর ২০২২।

ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এম ফিল, গবেষক ও কলামিস্ট

;

অল্প সময়ে অনেক ধর্মঘটের ধকলটা কার?



প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বহুদিন দেশে হরতাল-ধর্মঘট ছিল না। আবার শুরু হয়ে গেছে এসবের ধকল। মজার ব্যাপার হলো এবারের ধর্মঘট অভিনব। একজনের দায় আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে ঘন ঘন ধর্মঘট ডেকে দেয়া হচ্ছে নির্দ্বিধায়। পরিবহন ধর্মঘটের নামে স্থল, জল, হাঁটাপথ সবকিছুতেই বাধা দেয়া হচ্ছে হঠাৎ করেই। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে- যেদিন বিরোধী দল বা বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশের ডাক দিচ্ছে সেই দিনকে উপলক্ষ্য করে শাসক দল সেই বিভাগে তিনদিন আগে থেকেই সব পরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে দিচ্ছে। পরিবহন সমিতির উপর দায় চাপিয়ে শুধু সেই বিভাগের জেলা-উপজেলা, গ্রাম-গঞ্জ থেকে নয়- ভিন্ জেলা বা দেশের ভিন্ন কোন এলাকা থেকে সমাবেশমুখী যানবাহন চলাচল করতে বাধা দেয়া হচ্ছে।

যে উদ্দেশ্যে এসব ধর্মঘট ডেকে আড়ালে থেকে কৌতুক করা হচ্ছে ধর্মঘটীদের সে উদ্দেশ্য কি আসলে সফল হচ্ছে? এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক শুরু হয়েছে। সাধারণ জনগণ এর জন্য খুবই বিব্রত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছে। অথচ এ ব্যাপারে সরকার বা প্রশাসনের কোন বিকার নেই।

ঘন ঘন ধর্মঘটের ফলে বিরোধী প্রতিবাদের ভাষার সাথে আরো বেশি তেজ ও জেদ লক্ষ্য করা গেছে। দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে ছয়টিতে ইতোমধ্যে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ শেষ হয়েছে। ছয়টি সমাবেশে ধর্মঘটের কোন সুফল না থাকা সত্ত্বেও সিলেটের বিভাগীয় সমাবেশ ১৯ নভেম্বরের দুদিন আগে হবিগঞ্জসহ সব জেলা থেকে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। পথের সকল বাঁধা বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে বিএনপি সমর্থকরা সেসব সমাবেশে বহু আগে থেকে হাজির হয়ে সমাবেশগুলোকে উচ্ছল প্রাণসঞ্চালণা দিয়েছে। কুমিল্লা বিভাগীয সম্মেলনে একই ঘটনা দেখা গেছে। এমনকি ৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিভাগীয সম্মেলনের দুদিন আগেই সমর্থকরা এসে হাজির। এখানে একসঙ্গে দুই-তিন হাজার মোটর সাইকেলের র‌্যালি নিয়ে নওগাঁ, চাপাই নবাবগঞ্জ ও নাটোর থেকে হুইসেল বাজিয়ে সমর্থকরা আগের দিন এসে উপস্থিত হয়েছে। আগের রাতে জড়ো হওয়া সমর্থকরা সময় কাটানোর জন্য যাতে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে যাতে না পারে সেজন্য বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে বাধা দেয়া হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ধীরগতি করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ধর্মঘটের ফলে তারা আগেই সমাবেশস্থলে আসায় তাদের উপস্থিতি ও গণমাধ্যমে ভরপুর প্রচারণা দেখে যারা শুধু নির্দিষ্ট দিনে আসতো বা আসতে চাইতা না তারাও যে কোন প্রকারে সমাবেশে হাজির হয়েছে।

অর্থাৎ, সমাবেশের একদিনের প্রচারণা এবার তিনদিন আগে থেকেই প্রচারিত হয়ে বিরোধী শক্তিকে আরো বেশি উজ্জীবিত করে তুলেছে। অর্থাৎ, শাসক দলের ধর্মঘট ডাকার প্রয়াস একটি ছলনা হিসেবে প্রতীয়মান হয়ে যাওয়ায় সাধারণ ও ভুক্তভোগী মানুষ আরো বেশি উৎসাহী ও কৌতুহলী হয়েছে বিভাগীয় সমাবেশগুলির প্রতি। তারা বলছেন, যেমন ঠাকুর, তেমন মুগুর। পথে পথে তল্লাশি, হোটেলে অভিযান ইত্যাদির জন্য সমর্থকগণ সমাবেশস্থলের মাঠে তাঁবু গেড়ে একসঙ্গে অবস্থান করছেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাইতো তারা তিন-চারদিন আগে থেকেই পুটলিতে চিড়া-মুড়ি, নাড়ু বেঁধে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে সমাবেশস্থলে হাজির হয়ে পিকনিক করে গান গাইতে সুযোগ পেয়েছে। সেখানে তারা সারি সারি চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবান্না করে খাওয়ারও সুযোগ পেয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- এটা ঘটতো না যদি শাসক দলের অহেতুক ভুল নীতি ব্যবহারের বাস্তব প্রতিচ্ছবির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কথা জানা থাকতো।

এভাবে বার বার জনসভাকে কেন্দ্র করে এধরণের হঠকারীতামূলক পরিবহন ধর্মঘট ডাকা শাসক দলে উন্নয়ন কাজ করার জনপ্রিয়তা যতটুকু ছিল সেটুকুও ম্লান করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। জনসভার বিরুদ্ধে ডাকা এসব ধর্মঘট তাদের জনভীতিকে আরো প্রামাণ্য করে তুলছে এবং এটা তাদের জন্য আরো বুমেরাং হচ্ছে বৈ কিছু নয়।

আর সরকারের ভয়ে পরিবহন সমিতিগুলো উপায়ন্তর না দেখে নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য ধর্মঘট ডেকে আড়ালে থেকে মজা করছে। প্রশাসনযন্ত্র তাদের চাকুরী বাঁচানোর জন্য ধর্মঘটে দায়সারা দায়িত্ব পালন করছে। সবাই এসব উদ্ভট সিদ্ধান্তের কাজকে ছলনা ও এক ধরণের প্রতারণা মনে করে মনক্ষুন্ন হয়ে যেনতেন কাজ মনে করছে। ফরিদপুর বিভাগের মহাসমাবেশকে ঘিরে গণপরিবহন ধর্মঘটের পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয়ার অভিযোগ শোনা গেছে। এতে একদিক এসব ধর্মঘট বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জনসমাগমকে আরো বেশি বেগবান করে সফল সমাবেশ করে চলেছে। বিশ্লেষকগণ মনে করেন, দেশের সব মানুষ তো আর রাজনীতি করে না। জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী এসব ধর্মঘট না ডাকলে বিভাগীয় সমাবেশগুলো এত প্রাণ পেত না।

খুলনা সমাবেশের আগে সেখানকার বিরোধী নেতারা বলেছেন, যানবাহন বন্ধ করে কোন লাভ নেই। ‘মনে চাইলে মানুষ পায়ে হেঁটেও মক্কা যেতে পারে।’ ফরিদপুরের জনসভায় বক্তারা বলেন, পরিবহন ধর্মঘট সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দুর্গে লক্ষ মানুষ জমায়েত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানাচ্ছে। তবুও সরকার খেলার নামে অরাজনৈতিক কথাবার্তা বলে অবজ্ঞা করছে। এবার নির্বাচন নিয়ে যেনতেন খেলা খেলতে দেয়া হবে না। মানুষ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাই সব বিভাগীয় সমাবেশের বহু আগেই ধর্মঘট ডাকা হলেও জনসমাগম ঠেকানো যায়নি। গত কয়েকদিন ধরে নেতাদের মধ্যে বাকযুদ্ধ ও পাল্টা বাকযুদ্ধ চলছেই। জনভোগান্তির কথা ভাবনায় নেই কারো।

দেশের বাকী জনগণতো ‘ওয়াচডগ’। তারা গণমাধ্যমে ধর্মঘটের নামে নিরীহ ভুক্তভোগী মানুষের দুর্দশা দেখে সহানুভূতি প্রকাশের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছে। কারণ, এসব ধর্মঘট তো আর একটি-দুটি নয়। অনেক হবে। হয়তো সামনে আরো অনেক হতে থাকবে। তবে এসব পরিবহণ ধর্মঘট কি কোন জনসমাবেশ ঠেকাতে সক্ষম? নাকি শুধু জনভোগান্তি সৃষ্টির কারণ?

আরেকটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঢাকায় একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সূবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানের মহাসমাবেশকে ঘিরে লক্ষ্যণীয় ছিল। সেটা হলো- বিআরটিসি বাসে দলীয় ব্যানার টাঙ্গিয়ে আসা। উন্মুক্ত মাঠে ফটক বানিয়ে পুলিশি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দলীয় সমাবেশ করাকে অনেক গণমাধ্যম আওয়ামী লীগের ভয় পাবার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া ডলারের রিজার্ভ সংকট ঠেকাতে আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণকে অথর্নীতিবিদগণ প্রথম কিস্তি পাবার পর কঠিন প্রেসক্রিপশণ হাতে ধরিয়ে দেবার আশঙ্কা করছেন। যার মূল মিটিং আইএমএফ এখনও করেনি এবং বিদেশী সাংবাদিকরা দেশের অর্থনীতিকে আইসিইউ-এ থাকার সংগে তুলনা করেছেন। তা-না হলে এই সময়ে আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণ এত প্রয়েজনীয় মনে হলো কেন?

একটি দলীয় অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির জন্য সরকারি পরিবহন ব্যবহার করা যায় না। এমনকি সেজন্য সরকারী পরিবহন বা যানবাহন ভাড়া করারও বিধান নেই। এটা দেশবাসীর দৃষ্টিকটু লাগায় সমালোচনার উদ্রেক করেছে।

একদিকে বিরাধী দলের সমাবেশকে পন্ড করার মানসে পরিবহণ ধর্মঘট চালু থাকা এবং সরকারের নির্লিপ্ত থাকার ভূমিকা অন্যদিকে সরকারী যানবাহনে দলীয় ব্যানার লাগিয়ে ঢাকায় সমাবেশস্থলে সমর্থক নিয়ে আসাটা বড় ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। নিজেরটা সরকারী নিরাপত্তার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও অনেকটা যান্ত্রিক কিন্তু বিরোধীদেরটা হচ্ছে স্বত:স্ফুর্ত ও প্রাকৃতিক। আজকাল গণমাধ্যমের কল্যাণে এসবের কোনটাই সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায় না। প্রবাদে আছে- ‘নিজের বেলা আটিসাঁটি, পরের বেলা চিমটি কাটি’- অহেতুক নিষ্ফল পরিবহন ধর্মঘট ডেকে এমন ভাব প্রদর্শণ করছি কেন?

আর এগুলোই কোন শাসনকালের ইতিহাসের প্রতিপাদ্য হিসেবে লেখা হয়ে থাকে। নাগরিকদের কল্যাণের জন্য গৃহীত যে কোনকিছুই একদিন মহান হয়ে ভেসে আসে। হযরত ওমর রাতের বেলা দু:খী প্রজাসাধারণের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে একা একা চুপি চুপি দেখতে যেতেন। দরিদ্র মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে এক রাতে তিনি শুধু পানির পাত্র উনুনে জ্বাল দিতে দিতে অভুক্ত সন্তানদেরকে সান্তনা দিতে দেখা এক অসহায় মায়ের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাদের জন্য নিজেই গাধার পিঠে করে খাবার বহন করে এনে দিয়ে মানব কল্যাণে ইতিহাসের এক উজ্জল অংশ হয়ে আজও বেঁচে আছেন। আমরা গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেনের বুকের লেখা শ্লোগানকে বুলি করছি, নিজের অবস্থান খেয়াল না করে অপরের কথা বলা নিয়ে বার বার উপহাস করছি। কিন্তু নিজেরা ভাল হতে চেয়েও ভাল হতে পারছি কই?

ঢাকায় লক্ষ কর্মী-সমর্থকের সমাবেশের দিনেও নিজের ভিটা ও দুর্গে যখন আরো ভিন্ন লক্ষ লক্ষ প্রতিবাদী মানুষ গণতন্ত্র, ভোটাধিকার প্রয়োগ, জ্বালানি সংকট, উচ্চদ্রব্যমূল্য নিয়স্ত্রণের দাবি জানাতে জড়ো হয় তখন সেটাকেও গুরুত্ত্ব দিয়ে ভাবার বিষয়। এগুলোকে নিছক খেলার সংগে তুলনা করাটাও ঠিক নয়। ‘পুকুরে বাচ্চারা ঢিল ছুঁড়ে খেলায় মত্ত হলে অগভীর জলে বাস করা ব্যাঙদের অকালমৃত্যু ঘটতে পারে’-একথা ভুলে গেলে চলবে কি করে? এজন্য দায়িত্বরত থাকা সবাইকে আরো দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে হয়। কারণ দ্রব্যমূল্য সন্ত্রাসের এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষেরা সেই অসহায় ব্যাঙের মতো অতি অগভীর পুকুরে বাস করছে।

বার বার সরকারি ইঙ্গিতের সমর্থনে পরিবহন ধমর্ঘটের ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ঝান্ডা যখন লোভী ব্যবসায়ীরা আরো অগ্নিমূল্যের দিকে তাড়া করে নিয়ে যায় এবং ছা-পোষা, দরিদ্র মানুষকে পরিবারসহ পেটের ক্ষুধায় কাতর করে নির্ঘুম রাখতে বাধ্য করে তখন বড় বড় সমাবেশের নামে প্রতিযোগিতা করে অর্থ ব্যয় করা ও জৌলুষ দেখানোর নামে মানুষের কষ্ট বাড়ানো কি সমীচিন মনে হয়? এত অল্প সময়ে এসব অনেক বেশি ধর্মঘটের ধকলটা আসলে কার?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

 

;

শান্তিচুক্তির ২৫ বছর: পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়নের শত্রু কারা?



ড. মাহফুজ পারভেজ
২৫ বছর আগে শান্তিচুক্তির দিন অস্ত্র সমর্পণে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা। ছবি : মনজুরুল আলম মঞ্জু

২৫ বছর আগে শান্তিচুক্তির দিন অস্ত্র সমর্পণে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা। ছবি : মনজুরুল আলম মঞ্জু

  • Font increase
  • Font Decrease

এই ছবিটি ২৫ বছর আগে ধারণ করেছিলেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলোকচিত্র সাংবাদিক, দৈনিক পূর্বকোণ-এর মনজুরুল আলম মঞ্জু। মারাত্মক অস্ত্র সজ্জিত আত্মসমর্পণ করতে আসা সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত শান্তি বাহিনীর একটি অংশের ছবিটি এতো বছর পরেও প্রাসঙ্গিক। কারণ পাহাড়ে এখনও বন্ধ হয় নি অস্ত্রবাজ সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দৌরাত্ম্য।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতে পাহাড়ে যখন পালিত হচ্ছে রজত জয়ন্তী, তখন তৎপর শান্তির প্রতিপক্ষ। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক চেষ্টায় আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন গতিশীল হয়েছে। তারপরেও নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে প্রশ্ন উঠেছে, পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়নের শত্রু কারা? কারা রাজনৈতিকভাবে এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী পন্থায় শান্তির অব্যাহত ধারায় বিভেদ ও অশান্তির বীজ বপন করছে?

এসব প্রশ্নের পাশাপাশি সবার মধ্যেই তৈরি হয়েছে বড় আকারের সংশয়। আর তা হলো, চুক্তির আওতায় সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণরূপে অস্ত্রগুলো আদৌ জমা পড়েছে কিনা? যদি হয়ে থাকে, তাহলে কেন অস্ত্রের মহড়া এখনও বন্ধ হয়নি পাহাড়ে? কেন এই সশস্ত্র সন্ত্রাস? কেন পাহাড়ে প্রতিদিন হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি অবাধে চলছে?

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান অস্ত্রধারীরা উপজাতি রাজনীতির ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত। তারা নিজস্ব স্বার্থে বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসমূলক অপকর্ম করছে। এতে বাধা দিতে গিয়ে অনেক উপজতি ও বাঙালি হত্যার শিকার হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করছে সাধারণ মানুষদের। এসব কারণে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দুই যুগ পার হলেও চলছে টানাপড়েন। আর এর ফলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি আজো।

শান্তিচুক্তির ২৫ বছরে পাহাড়ে যুগান্তকারী অবকাঠামোগত ও মানবিক উন্নয়ন সাধিত হলেও হানাহানি আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে পার্বত্য অঞ্চল অশান্ত। সরকারের পক্ষ থেকে অধিকাংশ শর্ত পূরণের কথা বলা হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তাদের শর্তগুলো পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করে আসছে। এহেন বিরোধিতার ধারায় শক্তি পাচ্ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। অন্যদিকে, বাড়ছে হতাশা। পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিরাও ক্ষুব্ধ। চুক্তির কিছু বিষয় বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে প্রবল বিরোধিতা।

সবকিছু ছাপিয়ে প্রধান সমস্যা এখন সন্ত্রাস ও অস্ত্রবাজি। অভিযোগ রয়েছে যে, সশস্ত্র পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলো তাদের অবৈধ অস্ত্রই এখনও জমা দেয়নি বরং তাদের বহরে ধীরে ধীরে যুক্ত হয়েছে এসএমজি, এলএমজি, রাইফেল, স্নাইপার রাইফেলসহ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। আর এই সব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা পুরো পার্বত্য এলাকায় একের পর এক হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে এলাকায় শান্তির পরিবর্তে অশান্তি সৃষ্টি করে চলেছে।

ফলে শান্তিচুক্তির ২৫ বছরেও পাহাড়ে থামেনি অস্ত্রের ঝনঝনানি। এখনো গোলাগুলির শব্দে গভীর রাতে ঘুম ভাঙে বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষের। সশস্ত্র সংঘর্ষে পড়ছে লাশের পর লাশ। অব্যাহত রয়েছে পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলোর সন্ত্রাসী বাহিনীর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। থেমে নেই পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন (সন্তু লারমার গ্রুপ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, (মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা গ্রুপ) পার্বত্য জনসংহতি সমিতি সংস্কারপন্থি ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামের সংগঠনগুলোর সশস্ত্র কর্মকাণ্ড।
এছাড়া পাহাড়ে নতুন করে জন্ম নিয়েছে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) নামে সশস্ত্র গোষ্ঠী। তারা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি বিলাইছড়ি সীমান্ত ঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা কিছু তরুণকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

অথচ একথা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে,
পার্বত্য শান্তিচুক্তি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি, যা পাহাড়ে জাতিগত সংঘাত ও ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও শান্তির পক্ষে তার যে অবস্থান সেটিই তিনি প্রমাণ করেছেন এই পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে।

এই চুক্তির ফলে ২৫ বছরের মধ্যে সরকার তিন পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের জন্য শান্তি প্রতিষ্ঠায় সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি দেখায়নি। এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি কমিশন, আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে অন্তত ৭০ ভাগ বাস্তবায়িত করছে, যার স্পষ্ট প্রমাণ পার্বত্য জনপদ ও পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পার্বত্য-বাঙালিদের জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির ফলে সৃষ্ট অনুকূল ও ইতিবাচক পরিবেশে-পরিস্থিতিতে প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে অনেক পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা চাকরি পেয়েছেন। উচ্চশিক্ষা ও রাজনৈতিকভাবে তারা বেশ এগিয়েছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি বাতাবরণ তৈরি হয়েছে এর মাধ্যমে। এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।

তবে এখনো যেসব সমস্যার সমাধান হয়নি সেজন্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব পাহাড়ি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন রয়েছে তাদেরও আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের মধ্য দিয়েই এগুতে হবে সমস্যা সমাধানের জন্য। সরকারসহ অন্যান্য যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে তারা সবাই যদি আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আন্তরিকভাবে বসে সমাধানের চেষ্টা করেন তাহলে চুক্তির বাস্তবায়ন কঠিন নয়।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক নয়- জনসংহতি সমিতির এমন অভিযোগ সর্বাংশে সত্যি নয়। এসব অভিযোগের রাজনীতির অংশ এবং সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করার অপচেষ্টা স্বরূপ। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ও দেশের সব রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এ ব্যাপারে গঠনমূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হবে। শুধু পরস্পরেকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আলোচনাই একমাত্র পথ।

এটাও মনে রাখা জরুরি যে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় মূল বাধা সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো যেসব সন্ত্রাসী ৬/৭টি গ্রুপ রয়েছে তাদের সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী পথ ছেড়ে পাহাড়ি জনপদে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করার রাজনীতি করলেই শান্তি, উন্নয়ন, সম্প্রীতি আসবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অস্ত্রের কোনও স্থান নেই, এই বাস্তব সত্য সংশ্লিষ্টদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে। তবেই বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

শান্তি ও উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তার সম্পর্ক নিবিড়। ফলে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে নিয়ে একসূত্রে সবাইকে কাজ করতে হবে। দুঃখজনকভাবে পাহাড়ের অনেক উগ্র রাজনীতিক দল ও নেতা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছে এবং শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে নিয়ে একসূত্রে কাজ করছে না। যেমন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর অবস্থানগুলো সরিয়ে নেয়া হয়নি বলে জেএসএস বা অন্য পাহাড়ি সংগঠনের পক্ষ থেকে যে অভিযোগ করা হচ্ছে', তার মধ্যে রয়েছে পার্বত্যাঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতা ও বিদ্বেষ। কারণ, তিন পার্বত্য জেলা সীমান্তবর্তী অবস্থান অত্যন্ত নাজুক ও বিপদজনক। বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে সেখানে। সীমান্তের অপর পাশে ভারতের উত্তপ্ত সাতটি রাজ্যে রয়েছে। পাশেই সামরিক জান্তা-শাসিত মিয়ানমারের অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। আবার, পাহাড়ের অস্ত্রধারী গ্রুপগুলোর পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের বিষয়টিও নিরাপত্তার নানামুখী বিপদ বাড়িয়েছে। অতএব, সকল ধরনের নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলো নিয়েও ভাবতে হচ্ছে সরকার ও নীতি নির্ধারদের। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বদলে মহল বিশেষ কর্তৃক বিদ্বেষ ছড়ানো হলে তা হবে আত্মঘাতী এবং উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বিপদের কারণ।

আবার এটাও বিবেচনায় নিতে হবে যে, পার্বত্য অঞ্চলটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল রূপে পরিগণিত হচ্ছে। তাই নিরাপত্তার অগ্রাধিকারমূল সকল দিক বিবেচনায় সামরিক স্থাপনাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি অত্যন্ত সন্দেহজনক ও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী। অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়গুলোকে দেখতে হচ্ছে সরকারকে। পাহাড়ের সকল রাজনৈতিক পক্ষকেও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারকে সহযোগিতা করা কর্তব্য। এবং শান্তিচুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই পাহাড়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সমস্যাগুলোর সমাধান করে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে হবে।

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব: একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই



নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

  • Font increase
  • Font Decrease

এর আগের জি-২০-এর সভাপতিত্ব ও অন্যান্য অর্জনের মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থা, কিছু দেশের ওপর করের বোঝা কমানো—এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে, যা থেকে নিঃসন্দেহে আমরা লাভবান হবো এবং এগুলোর ওপর ভর করেই আরও মজবুত ভিত্তি তৈরি করব।

আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছি—এখন জি-২০-এর আর কী অগ্রগতি হতে পারে? সামগ্রিকভাবে মানবসভ্যতার উপকারের জন্য একটি মৌলিক মানসিকতার পরিবর্তনকে কি আমরা অনুঘটক বানাতে পারি?

আমার বিশ্বাস—আমরা পারি। পরিস্থিতিই তো আমাদের মানসিকতা তৈরি করে। ইতিহাসজুড়ে মানবসভ্যতার বাস ছিল অভাবের মধ্যে। সীমিত সংস্থানের জন্যই আমরা লড়াই করেছিলাম। আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করত অন্য কেউ সেই সংস্থানের ওপর অধিকার ছাড়ছে কিনা তার ওপর। তখন ভাবনা, আদর্শ এবং ব্যক্তি পরিচয়ের মধ্যে সংঘাত ও প্রতিযোগিতাই ছিল আদর্শ।

দুর্ভাগ্যবশত আজও আমরা সেই একই শূন্য মানসিকতার ফাঁদে আটকে আছি। যখন দেশগুলো ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়ে লড়াই করে, আমরা তখন এর নজির দেখি। এটা লক্ষ করি যে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্ত্র। এটাও দেখি, যখন কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত, তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিষেধক মজুত রাখছে।

কেউ কেউ বিরোধিতা করতে পারেন এই বলে যে, সংঘাত ও লোভ মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। আমি একমত নই। মানুষ যদি সহজাতভাবেই স্বার্থপর হতো, তাহলে আমাদের মৌলিক এককত্ব প্রচার করে চলেছে যে বিপুলসংখ্যক পারলৌকিক ঐতিহ্য এবং সেটার যে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন, সেটার ব্যাখ্যা কী?

পঞ্চতত্ত্ব—ভারতে জনপ্রিয় এমন এক মতবাদ, যা বিশ্বাস করে—সব জীবিত সত্তা এমনকি সব নির্জীব পদার্থও মাটি, পানি, আগুন, বাতাস ও স্থান (স্পেস)—এই পাঁচ মৌলিক উপাদানে নির্মিত। শারীরিক, সামাজিক ও পরিবেশগত মঙ্গলের জন্য আমাদের প্রত্যেকের অভ্যন্তরে ও সবার মধ্যে এ উপাদানগুলোর সমন্বয় অপরিহার্য। ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব এই বিশ্বে একতার ভাবনা প্রচারে কাজ করবে। এ কারণেই আমাদের মূল ভাবনা—‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ।’

এটি শুধু বুলি বা স্লোগান নয়। এটি মানব পরিস্থিতির সাম্প্রতিক যে পরিবর্তন তাতে একটি বিবেচ্য বিষয়, যা আমরা সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি।

আজ আমাদের কাছে পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর যথেষ্ট উৎপাদন করার সংস্থান রয়েছে। আমাদের টিকে থাকার জন্য এখন লড়াইয়ের দরকার নেই। আমাদের এ যুগে আর একটি যুদ্ধেরও প্রয়োজন নেই। আজ আমরা যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি তা হলো—জলবায়ুর পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও অতিমারি, যার সমাধান যুদ্ধ করে সম্ভব নয়। বরং সবার সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্ভব। সৌভাগ্যবশত, আজকের প্রযুক্তি আমাদের বড় পরিসরে মানবজাতির সমস্যাগুলো মোকাবিলার পথ দেখাতে পারে।

মানবজাতির ছয় ভাগের এক ভাগ ভারতে। এখানে বসতি, ভাষা, ধর্মগত, প্রথা ও বিশ্বাসগতভাবে প্রচুর বৈচিত্র্য আছে। ভারত হলো বিশ্বের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাচীনতম প্রথাসহ গণতন্ত্রের ডিএনএ প্রদানে ভারতের অবদান রয়েছে। গণতন্ত্রের জননী হিসেবে ভারতের জাতীয় সচেতনতা কঠোর নির্দেশ দিয়ে নয়; বরং লাখো স্বাধীন কণ্ঠের সমন্বয়ে চালিত।

বর্তমানে ভারত একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতির দেশ। আমাদের নাগরিককেন্দ্রিক শাসনের রূপকল্প, আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্যের সৃজনশীল প্রতিভাকে লালন করার পাশাপাশি একেবারে প্রান্তিক নাগরিকদেরও খেয়াল রাখে।

আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের জাতীয় বিকাশের মধ্যে একটি আপাদমস্তক শাসন পরিচালনার অনুশীলন না করে; বরং নাগরিক নেতৃত্বাধীন ‘গণআন্দোলন’ গড়ে তুলতে।

ডিজিটাল পণ্য তৈরির জন্য আমাদের শক্তিশালী প্রযুক্তি রয়েছে, যেগুলো উন্মুক্ত, ব্যাপক। সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্টের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নতি দিয়েছে এগুলো। যে কারণে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে একটা অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারে ভারতের অভিজ্ঞতা।

আমাদের জি-২০ প্রেসিডেন্সি চলাকালে, আমরা ভারতের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও মডেলগুলোকে অন্যদের জন্য, বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সম্ভাব্য টেমপ্লেট হিসেবে উপস্থাপন করব। আমাদের জি-২০ অগ্রাধিকারগুলো শুধু শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই গঠিত হবে তা নয়, দক্ষিণের সহযাত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। যাদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই অশ্রুত থাকে। আমাদের অগ্রাধিকারগুলোর নজর কেন্দ্রীভূত থাকবে ‘এক পৃথিবী’র নিরাময় সাধন, ‘এক পরিবার’-এর মধ্যে সম্প্রীতি আনয়ন ও ‘এক ভবিষ্যৎ’-এর প্রতি আশা দেওয়ার দিকে।

আমাদের এই গ্রহটির নিরাময়ের জন্যই আমরা ভারতের ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে স্থিতিশীল এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় উৎসাহ জোগাব। মানব পরিবারের মধ্যে সমন্বয়ের প্রচারের জন্য আমরা খাদ্য, সার ও ওষুধের বৈশ্বিক সরবরাহকে রাজনীতিমুক্ত করব। যাতে ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ মানবিক সংকটে পরিণত না হয়। যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারা অবশ্যই আমাদের চিন্তাভাবনায় প্রথম সারিতে থাকবে, ঠিক একটা পরিবারের মতোই।

আগামী প্রজন্মের আশাকে অনুপ্রাণিত করতে আমরা ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে একটি সৎ আলোচনা; গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি প্রশমিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তি বৃদ্ধিতেও উৎসাহ জোগাব। ভারতের জি-২০ এজেন্ডা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কর্মভিত্তিক ও সিদ্ধান্তমূলক। আসুন আমরা ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বকে একযোগে নিরাময়, সমন্বয় এবং আশার সভাপতিত্ব হিসেবে তৈরি করি। মানবকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে আসুন আমরা একযোগে কাজ করি।

;